৭. ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ঘেঁষে

০৭.

জিপো যথাসম্ভব নিজেকে সঙ্কুচিত করে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ক্যারাভ্যান দোলার সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখে উলঙ্গ আতঙ্কের ছায়া কেঁপে উঠছে। ওর শরীর থেকে ইঞ্চি খানেক দূরে একই ছন্দে দুলছে ট্রাকের ইস্পাত আবরণ।

ব্লেক এখন ট্রাকের পাশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে পেছনের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে ও মরগ্যান ও জিপোকে লক্ষ্য করছে।

বুইকের প্রচণ্ড গতিবেগের সঙ্গে তাল রেখে ভারসাম্য বজায় রাখতে ওরা তিনজন কিছু একটা আঁকড়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ক্রমাগত ঝাঁকুনির সঙ্গে সঙ্গে তিনটে শরীর দুলছে।

জিপো আশ্চর্য হয়ে বললো, তাহলে এখনও একটা লোক ট্রাকের ভেতরে রয়েছে।

হ্যাঁ, রয়েছে কিন্তু ভয়ের কোনো কারণ নেই। লোকটা মারা গেছে। যাকগে, শোনো জিপো, তোমাকে এই ইস্পাতের চাদরটা যে করে থোক খুলতে হবে। কারণ টমাস যে বেতার সংকেত চালু করেনি সে বিষয়ে আমাদের নিশ্চিন্ত হওয়া দরকার।

ব্লেক কাজের শুরু থেকে এই প্রথম একটা প্রস্তাবের মতো প্রস্তাব করলো, আচ্ছা, বেতার সংকেত পাঠানোর যন্ত্র তো ট্রাকের ব্যাটারিতেই চলে। তা এক কাজ করলে হয় না? ট্রাকের তলায় ঢুকে ব্যাটারির তার দুটো কেটে দিলে হয় না?

মরগ্যান যেন হাতে চাঁদ পেলো, ঠিক বলেছ! জিপো, তুমি তাহলে চটপট ট্রাকের নীচে ঢুকে পড়ো, ব্যাটাবির তার কেটে দাও, তাড়াতাড়ি করো।

গম্ভীর মুখে জিপো, ট্রাকের নীচে কাজ করা সম্ভব নয় ফ্র্যাঙ্ক। যে কোন মুহূর্তে ট্রাকটা দুলে উঠতে পারে তাহলে আমাকে চাপা পড়তে হবে।

মরগ্যান হায়েনার স্বরে গর্জে উঠলো, আশা করি আমার কথা তোমার সনে গেছে। জলদি কাজ শুরু করো।

জিপো গজগজ করতে করতে যন্ত্রপাতির ঢাকনাটা খুললো। একটা স্ক্রু–ড্রাইভার এবং একটা তার কাটার কাঁচি বাক্স থেকে বের করলো।

মরগ্যান পাশের জানলার পর্দা সরিয়ে সতর্কভাবে বাইরে দেখলো।

ওরা এখন মাঝারি রাস্তায় এসে পড়েছে। কিটসন গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্যারাভ্যানটা বিপজ্জনকভাবে এপাশ ওপাশ দুলছে। রাস্তায় যদি কোনো দ্রুতগামী পুলিশ উপস্থিত থাকতো তাহলে সে নির্ঘাত তার মোটরবাইক নিয়ে ওদের তাড়া করতো। কিন্তু কিটসনকে আস্তে চালানোর জন্য অনুরোধ করার কোনো উপায় নেই। থাকলে মরগ্যান তাকে সাবধান করে দিতে। সুতরাং প্রধান সড়কে পৌঁছে বুইকের গতিবেগ যে কমাতে হবে, তাতেও কিটসনের বিচার বুদ্ধির ওপরেই তাদের নির্ভর করতে হবে।

তখন জিপো মেঝেতে উপুড় হয়ে ট্রাকের নীচে ঢোকার চেষ্টা করছে। প্রথমতঃ স্বল্প পরিসরের জন্য সে অসুবিধেয় পড়েছে। তার ওপর মস্তিষ্কে চেপেবসা ভয়টা তো আছেই। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর সে ট্রাকের তলায় নিজের শরীরটাকে প্রবেশ করালো। তখন মরগ্যান একটা টর্চ এগিয়ে জিপোর হাতে দিলো।

জিপো চিত হয়ে ট্রাকের তলায় পৌঁছতেই পাটাতনের গায়ে একটা বিশ্রী লাল দাগ দেখতে পেলো। ওর মুখ থেকে ইঞ্চিকয়েক ওপরেই যে রক্তের দাগ সেটা ভালো করে বুঝবার আগেই কয়েকটা আঠালো, উত্তপ্ত রক্তের ফোঁটা জিপোর মুখের ওপর এসে পড়লো।

সে শিউরে উঠে মুখ সরিয়ে নিতে চেষ্টা করলো। কিন্তু ট্রাকের মেঝের ওপিঠেই পড়ে থাকা টমাসের রক্তাক্ত দেহের সান্নিধ্য তাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুললো।

জিপো কাঁপা হাতে অন্ধের মতো ব্যাটারির তার দুটো খুজতে লাগলো।

অবশেষে একটা তারের সন্ধান পেলো, কিন্তু সেটা আবার নাগালের বাইরে। তাই সে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো। আমি হাত পাচ্ছি না, ফ্র্যাঙ্ক। আমাদের ওপর থেকে চেষ্টা করতে হবে।

ওপর থেকে দেখবে কোন দিক দিয়ে? সব বন্ধ। ঠিক আছে এক মিনিট অপেক্ষা করো। মরগ্যান যন্ত্রপাতি রাখার বাক্স থেকে ধাতু কাটার একটা লম্বা হাতলওলা কচি বের করলোকঁচিটা ট্রাকের তলায় ঠেলে দিয়ে। এই নাও, এটা দিয়ে কাটো।

হয়ে গেছে। এবার আমাকে বেরোতে দাও।

হামাগুড়ি দিয়ে জিপো বেরিয়ে আসছিলো, হঠাৎই একটা অস্ফুট শব্দে তার হাত–পা যেন বরফ হয়ে এলো, ঘাড়ের ওপর সজারুর কাঁটার মতো চুলগুলো দাঁড়িয়ে উঠলো।

ট্রাকের পাটাতনের ওপিঠ থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো সেই সঙ্গে এক অস্ফুট গোঙানি–তারপরই কিছু একটানড়ার শব্দ। পার্থিব আতঙ্কে জিপো কুঁকড়ে গেলোযেন কোনো অশরীরীর হাত তাকে স্পর্শ করতে আসছে।

উন্মাদের মতো জিপো চিৎকার করে উঠলো, সরে যাও–যেতে দাও আমাকে! সরে যাও! সে পায়ের এলোপাথাড়ি ধাক্কায় ব্লেককে সরাতে চাইলো। অন্ধ আতঙ্কে তার হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছে।

ব্লেক খেঁকিয়ে উঠে ওর পাঁজরে একটা ঘুষি মারলো থাম, শালা! আচমকা আঘাতে জিপোর দম বন্ধ হয়ে এলো। বুকে হেঁটে ব্লেক ট্রাকের তলা থেকে বেরিয়ে এলো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কোট ঝাড়তে লাগলো।

মরগ্যান ব্লেকের ছাই রঙা মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকালো, কি হয়েছে?

এমন সময় জিপো হাঁপাতে হাঁপাতে বেরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়েই ট্রাকের গায়ে লেগে জামাটা ফেঁসে গেলো। জিপোর মুখ ফ্যাকাসে, আঠালো রক্তের ফোঁটাগুলো হাতের ঘষায় ওর গালে গলায় বিশ্রীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

ও–ও বেঁচে আছে। সে মৃদুস্বরে বললো, আমি স্পষ্ট শুনেছি। ও নড়ছে ট্রাকের ভেতরে।

মরগ্যানের মুখভাব কঠিন হলো।

তাহলে টমাস এখন আর ট্রান্সমিটার ব্যবহার করতে পারছেনা। তালাও বিকল করতে পারছে না। মনে হয়, ঐ তালা বা ট্রান্সমিটার চালু করার বোতামগুলো ট্রাকের ব্যাটারিতেই চলে। আপাততঃ ব্যাটারিই যখন অকেজো, তখন আর ভয় কি? যাকগে, এসো জিপো, এই ইস্পাতের চাদরটা এবার ভাঙা যাক। তা না হলে টমাসকে শেষ করা যাবে না।

জিপো শিউরে উঠলো না–না–আমি না। টমাসের কাছে রিভলবার আছে। আছে না? ইস্পাতের ঢাকনা ভাঙলেই ও আমাকে গুলি করবে।

কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলো মরন। সে জানালা দিয়ে আবার বাইরে চোখ রাখলো। প্রধান সড়ক ও মাঝারি রাস্তার চৌমাথায় এসে ওদের গাড়ি পৌঁছেছে। ধীরে ধীরে কিটসন বুইকের গতি, কমিয়ে আনলো…একসময় একেবারে থেমে গেলো। মরগ্যান দেখলো, তাদের সামনে প্রধান  সড়কের ওপর গাড়ি, রাস্তা আর আগের মতো নির্জন নয়।

এখন যদি টমাস রিভলবার চালিয়ে একটা হট্টগোলের সৃষ্টি করে, তাহলে রাস্তার লোকে নির্ঘাৎ সেই শব্দ শুনতে পাবে–এবং বিপদে পড়বে।

এ সমস্যার উত্তর মরগ্যানের জানা নেই। ব্লেক বললো, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক, ফ্র্যাঙ্ক। পুলিশ এই বড় রাস্তায় সবসময়েই টহল দেয়। যদি গুলির শব্দ হয়। তাহলে ওরা শুনতে পাবে…

হা–অপেক্ষাই করতে হবে।

জিপো স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের রক্ত মুছলো। ঘেন্নায় তার গা গুলিয়ে উঠছে।

মরগ্যান ট্রাকের সামনে গিয়ে ইস্পাত আবরণীর ওপর কান চেপে ধরে কোনো শব্দ শুনতে চাইলো।

উঁহু–কিছুই তো শুনতে পাচ্ছি না? তোমরা কি ঠিক শুনেছো?

হা–টমাসের নড়াচড়ার শব্দও পরিষ্কার শুনেছি।

মরগ্যান ঘুরে দাঁড়ালো। জিপো, শুধু শুধু বসে থেকো না। ট্রাকের তালাটা একটু নেড়েচেড়ে দেখো। যত তাড়াতাড়ি তুমি কাজ শুরু করবে, টাকাটা ততো তাড়াতাড়িই আমাদের হাতে আসবে।

জিপো উঠে ট্রাকের পেছনের দিকে গেলো।

বুইক আবার চলতে লাগলো। মরগ্যান পর্দা সরিয়ে দেখলো অন্যান্য দ্রুতগামী গাড়িগুলো একের পর এক তাদের বুইক ও ক্যারাভ্যানকে অতিক্রম করে চলেছে। কিটসন গাড়ির গতি ঘণ্টায় তিরিশ মাইল রেখেছে দেখে মরগ্যান স্বস্তি পেলো।

জিপো ট্রাকের পেছনটা পরীক্ষা করেই হতাশ হয়ে পড়লো। ট্রাকের তালা খোলা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

মরগ্যান ট্রাকের পিছন দিক থেকে এসে জিপোকে বললো। কি, দেখে কিরকম মনে হচ্ছে?

তালাটা যে মজবুত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঠিক ঠিক কম্বিনেশন বের করতে গেলে প্রচুর সময়ের দরকার।

দরজা ভাঙার কোনো পথ আছে?

উঁহু–তা সম্ভব নয়। দেখেছো, কি জিনিষ দিয়ে এটা তৈরী? অত সহজে ভাঙা যাবে না। হয়তো প্রচুর সময় পেলে দরজা কেটে সেটা খোলা সম্ভব হতে পারে।

তুমি বরং কম্বিনেশন নম্বরটাই চেষ্টা করে দেখো–যদি বের করতে পারো। ক্যারাভ্যানের ছাউনিতে পৌঁছতে এখনও চল্লিশ মিনিট সময় লাগবে। শুধু শুধু সময়টা বসে বসেনষ্ট করবে কেন? এখন থেকেই কাজ শুরু করে দাও।

মরগ্যানের দিকে জিপো এমনভাবে তাকালো–যেন তার মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে সে সন্দিহান।

জিপোর স্বরে আকুতি, এখন? এখন কি করে হবে? এই গোলমাল, গাড়ির দোলানির মধ্যে কাজ করা সম্ভবনয়। তুমি বুঝতে পারছে না, ফ্র্যাঙ্ক, চাকতি ঘোরানোর সময় আমাকে একমনে কান খাড়া করে শুনতে হবে। কিন্তু এই গাড়ি–ঘোড়ার গোলমালের মধ্যে, তা কি সম্ভব–তুমিই বলো?

মরগ্যান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু তার বুকের যন্ত্রণা ক্রমশঃই বাড়ছে। সে জানে এখন জিপোকে চাপ দিলে সর্বনাশের কিছু বাকি থাকবে না। তাই আহত টমাসের কথা ভাবলো সত্যিই কি লোকটা বেঁচে আছে? নাঃ…একের পর এক দুর্ঘটনা পরিস্থিতিকে ক্ৰমশঃ জটিল করে তুলছে। বলা যায় না, সে কাজটাকে প্রথমে যতোটা কঠিন মনে করেছিলো, হয়তো কার্যক্ষেত্রে দেখা যাবে কাজটা তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

মরগ্যান আচমকা উন্মাদের মতো ইস্পাতের প্রাচীরে ঘুষি মেরে অসহায়ভাবে চেঁচিয়ে উঠলো, এর মধ্যে রয়েছে দশ লক্ষ ডলার। ভেবে দেখো একবার। ঠিক এই দেওয়ালের ও পিঠেই রয়েছে কুবেরের সম্পদ। দশ লাখ ডলার। যে করে তোক টাকাটা আমরা নেবোই। তার জন্যে জাহান্নামে যেতেও আমি প্রস্তুত।

ওদিকে কিটসন তখন অন্যান্য গাড়ির গতিপথ বাঁচিয়ে অত্যন্ত সতর্কভাবে সে গাড়ি চালাচ্ছে–জিনির দিকে নজর দেবার তার সময় ছিলো না। কিন্তু প্রধান সড়কে পৌঁছেই সে দেখলো, তার সামনে টানা নির্জন রাস্তা। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ির গতি কমিয়ে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে–গতিপথ ঠিক করে নিয়ে তারপর সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

সীটের মধ্যে গা এলিয়ে জিনি রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসেছিল। মুখের বিবর্ণতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। শরীরের কাপুনিকে গোপন করতে ও হাত দুটোকে হাঁটুর ফাঁকে আড়াল করেছে।

কিটসন ট্রাকের ভেতরে পড়ে থাকা লোকটার কথা ভাবলো, ঐ দেহটাকে টেনে হিঁচড়ে বের করবার কথা মনে পড়তেই সে শিউরে উঠলো। একটা মিশ্র অনুভূতির ঢেউ খেলে গেলো তার শরীরে। কিন্তু লোকটা কি বেতারে সাহায্য চেয়ে সংকেত পাঠিয়েছে? …হয়তো ওরা এখন সরাসরি এগিয়ে চলেছে পুলিশের পাতা ফাঁদে ধরা দিতে।

কিটসন বললো, টমাস যদি ইতিমধ্যে বেতারে খবর পাঠিয়ে থাকে, তাহলে হয়তো আমরা পুলিশের জালে ধরা দিতেই এগিয়ে চলেছি।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে, ঠোঁট উলটে জিনি, জবাব দিলো, কিন্তু আমাদের কি করবার আছে বলো?

 কিছুই নেই। যাকগে। ক্যারাভ্যানে চড়তে হয়নি দেখে আমি খুব খুশী হয়েছি। ওর ভেতরে ওদের নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে।

জিনি আচমকা তীক্ষ্ণ স্বরে, শুনতে পাচ্ছো?

কিটসনের হৃদপিণ্ডটা থরথর করে কাঁপতে লাগলো। সত্যিই দ্রুতবেগে ধেয়ে আসা পুলিশ সাইরেনের কান ফাটানো আর্তনাদ ওদের দিকে এগিয়ে আসছে।

সমস্ত গাড়িই তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে ধীরগামী যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট পথের দিকে এগিয়ে চললো। পলকের মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেলো।

এবার আরও জোরে শোনা গেল সাইরেনের আর্তনাদ। তারপরেই কিটসনের চোখে পড়লো দ্রুতবেগে এগিয়ে আসা পুলিশের গাড়িটার ওপর। তার পেছনে সার বেঁধে ছুটে আসছে চার চারটে মোটরবাইক চড়া দ্রুতগামী পুলিশ। তাদের পেছনে আরও দুটো পুলিশের গাড়ি। ঘণ্টায় আশী মাইলেরও বেশী বেগে গাড়িগুলো তাদের অতিক্রম করে ছুটে গেলো মাঝারি সড়কের দিকে।

কিটসন ও জিনি তারা পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করলো।

 কিটসন ভাঙা গলায় বললো, একটুর জন্য আমরা ঐ রাস্তাটা পার হয়ে এসেছি। আর সামান্য দেরী হলেই পুলিশের ঝামেলায় পড়তে হতো।

তার বক্তব্যকে ঘাড় নেড়ে জিনি সম্মতি জানালো।

ওরা আরও মাইলখানেক যাওয়ার পর হঠাৎই লক্ষ্য করলো, ওদের সামনের গাড়িগুলো ক্রমশঃ তাদের গতিবেগ কমিয়ে আনছে। আরো দূরে নজর চালাতেই ওরা দেখলো গাড়ির এক লম্বা সারি ধীরে ধীরে নিজেদের গতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।

কিটসন অশান্ত ও উত্তেজিতভাবে বললো, সামনে রাস্তা বন্ধ। নিশ্চয়ই পুলিশ রাস্তা আটকেছে। তাহলে সর্বনাশের আর কিছু বাকি নেই দেখছি।

জিনি ভরসা দিলো, চুপচাপ বোসো। এখন সাহস হারালে চলবে না।

বহু সময় অপেক্ষা করার পর গাড়িগুলো আবার চলতে শুরু করলো। কিটসনও ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো। দূরে রাস্তার অবরোধটা সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।

রাস্তার ওপর আড়াআড়িভাবে দুদুটো পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ফাঁক দিয়ে একটি একটি করে গাড়ি শম্বুক গতিতে এগিয়ে চলেছে। গাড়ি দুটোর কাছাকাছি দুজন পুলিশ অফিসার দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি গাড়ি থামতেই ওদের মধ্যে একজন অফিসার গাড়ির ভেতর ঝুঁকে চালকের সঙ্গে দু একটা কথা বলেই তাকে এগোতে নির্দেশ করছে।

জিনি বললো, সবকিছু আমার ওপর ছেড়ে দাও। আমিই ওর সঙ্গে কথা বলবো।

কিটসন জিনির সাহসে অবাক হলো। ক্যারাভ্যানের ভেতরে ওরা তিনজন কি ভাবছে। সেটা সে আন্দাজ করতে চেষ্টা করলো। ওরা এই রাস্তা অবরোধটা দেখতেই পাবে না, তাই বুইকের এই শম্বুক গতিতে হয়ে পড়বে সংশয়াচ্ছন্ন। মনে মনে প্রার্থনা করলো, ক্যারাভ্যানের ভেতরে ওরা যেন কোনরকম গোলমাল বাঁধিয়ে না বসে।

দশ মিনিট বাদে ওরা অবরোধের সামনে এসে পড়লো।

নির্বিকার মুখে, নিছক উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্কার্টটাকে জিনি হাঁটুর ওপরে তুলে ধরলো। পায়ের ওপর পা তুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।

কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারটি জিনির দিকে এগিয়ে এলো। প্রথমে ওর মুখে… তারপর ওর নগ্ন হাঁটুর দিকে চোখ রাখলো। তার রোদে পোড়া তামাটে মুখে প্রশংসার হাসি ফুটলো। কিটসনের দিকে তাকাবার প্রয়োজনই মনে করলো না।

বুইকের গায়ে হেলান দিয়ে সে সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে জিনিকে বললো, আপনারা কোত্থেকে আসছেন জানতে পারি কি?

জিনি বললো, ডুকাস থেকে। আমরা মধুচন্দ্রিমা কাটাতে বেরিয়েছি। তা ব্যাপার কি, অফিসার? এতো হৈ চৈ কিসের জন্য?

অফিসার প্রশ্ন করলো, আপনারা কি ওয়েলিং কোম্পানীর একটা ট্রাককে রাস্তায় দেখেছেন? ট্রাকটাকে দেখলে ভোলার কথা নয়। কারণ ওটার গায়ে বড় বড় হরফে ওয়েলিং কোম্পানির নাম লেখা আছে।

কই, না তো। কোনো ট্রাকই আমাদের চোখে পড়েনি, তাই না আলেক্স?

কিটসন মাথা নাড়লো।

জিনি হাস্যতরল কণ্ঠে বললো, কেন, আপনারা ট্রাকটা হারিয়ে ফেলেছেন বুঝি? কি কারণেই খুশী খুশী স্বরে হেসে উঠলো।

জিনির হাঁটু থেকে চোখ না সরিয়েই অফিসারটি হাসলো।

 যাকগে, ছেড়ে দিন ওসব কথা। এবার আপনারা যেতে পারেন। আশা করি আপনাদের মধুচন্দ্রিমা শুভ হোক। কিটসনের দিকে চেয়ে, শুভ হওয়া সম্পর্কে আমার অন্ততঃ কোনো সন্দেহই নেই, মশায়–জানি না আপনার আছে কিনা! আচ্ছা, এবার তাহলে এখোন।

কিটসন গাড়ি নিয়ে সামনে এগোলো। একটু পরেই ওরা পুলিশের অবরোধ পার হয়ে রাস্তায় এসে পড়লো।

কিটসন হাঁফ ছেড়ে শক্ত মুঠোয় বুইকের স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরলো, ও খুব জোর বেঁচে গেছি। লোকটাকে তুমি দারুণ ঘোল খাইয়েছ।

জিনি স্কার্ট ঠিক করে হাঁটু ঢাকলো, এসব লোককে বোকা বানানো খুব সহজ। দেখবার মত কিছু একটা পেলেই হলো। কাজ টাজ ভুলে শুধু সেদিকে চেয়ে থাকবে। হাতব্যাগ খুলে সিগারেট বের করে কিটসনকে বললো, চলবে নাকি?

দাও একটা।

জিনি সিগারেট ধরিয়ে কিটসনের ঠোঁটে দিলো। সিগারেটে জিনির নরম ঠোঁটের লিপস্টিকের ছোঁয়া আছে দেখে কিটসন আমেজ ভরে এক গভীর টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লো।

জিনি এবার নিজের জন্যে আর একটা সিগারেট ধরালো।

পরবর্তী দশ মাইল নীরবতার পর জিনিই বললো, সামনের চৌমাথায় ডানদিকে ঘুরবে। সেই রাস্তাটাই ফন হ্রদের রাস্তা।

সামনের রাস্তায় নজর রাখতেই আকাশের দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। কিটসন দেখলে একটা হোডার প্লেন তাদের লক্ষ্য করে উড়ে আসছে। রাস্তা থেকে বড়জোর শ–তিনেক ফুট ওপর দিয়ে প্লেনটা উড়ে আসছে।

ঐ দেখো।

 হাওয়ায় চড়া শিসের ঝাপটা তুলে হোডার প্লেনটা বুইক ও ক্যারাভ্যানের ঠিক ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেলো।

জিনি বললো, হুঁ, তাহলে ওরা দেখছি কাজ শুরু করতে খুব একটা দেরী করেনি। জিনি হাতঘড়িতে দেখলো বারোটা দশ–মানে ওয়েলিং এজেন্সীর ট্রাক থামানোর পর মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট পার হয়েছে। অথচ সেই সামান্য পঁয়তাল্লিশ মিনিট জিনির কাছে মনে হলো পঁয়তাল্লিশ বছর।

ক্যারাভ্যানের ভেতরে তিনজনেই হোডার প্লেনের শব্দ শুতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ার্ত জিপো হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে উপুড় হলো, আতঙ্কে যেন কুঁকড়ে গেলো। শব্দ শোনামাত্রই সে বুঝেছে প্লেনটা তাদেরই খোঁজ করছে।

পুলিশী অবরোধের কাছে পৌঁছানো মাত্রই তিনজনেই মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়েছিল। মরগ্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞায় ওর ৪৫বের করেছে। বিনা যুদ্ধে ধরা দিতে সে রাজি নয়।

বুইক আবার যখন তার গতিতে ফিরে এলো তিনজনে তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

মরগ্যান একবার কোট খুলে তার ক্ষতস্থানটা দেখাল জিনির বেঁধে দেওয়া ব্যান্ডেজটা রক্তে ভিজে লাল হয়ে উঠেছে। ক্ষতস্থানে আবার রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

প্রথম থেকেই ব্লেক মরগ্যানের সুনজরে পড়ার চেষ্টায় ছিল। এখন সুযোগ পেয়েই সে উঠে দাঁড়ালো। জিপোকে ডিঙিয়ে এগিয়ে গেলো ক্যারাভ্যানের তাকে রাখা প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্সটার দিকে।

ব্লেক বাক্সটা খুলতে খুলতে ব্যস্তস্বরে বললো, দাঁড়াও ফ্র্যাঙ্ক, আমি এখুনি ব্যান্ডেজটা ঠিক করে দিচ্ছি।

মরগ্যানের মাথা তখন ঝিমঝিম করছে, চারিদিক অন্ধকার লাগছে। রক্তপাতের পরিমাণ দেখে সে মনে মনে শঙ্কিত হলো। ব্লেবের কথায় মাথা হেলিয়ে ক্যারাভ্যানের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসতে চেষ্টা করলো।

অস্বস্তি ও আশঙ্কা ভরা চোখে জিপো মরগ্যানকে দেখে ভাবলো, ফ্র্যাঙ্ক যদি এ অবস্থায় মারা যায়, তাহলে আমরা কি করবো? যে কোন জটিল পরিস্থিতিতেই মাথা ঠাণ্ডা রেখে সমাধান করার ব্যাপারে মরগ্যানের জুড়ি নেই। ফ্র্যাঙ্ক মারা গেলে আমরা গিয়ে পড়বো অথৈ জলে।

মিনিট কয়েকের মধ্যে ব্লেক নতুন একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে রক্ত বন্ধ করতে সক্ষম হলো।

এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। এক গ্লাস চলবে নাকি?

মরগ্যান তিক্তস্বরে বললো, চলুক, ক্ষতি কি? এখন তো মজা লুটবার সময়। অতএব খোলে বোতল…।

তিন গ্লাসে বেশ খানিকটা করে নির্জলা হুইস্কি ঢেলে জিপো ও মরগ্যানের দিকে দুটো গ্লাস এগিয়ে দিলো ব্লেক।

ওরা সবেমাত্র গ্লাসে চুমুক দিয়েছে, এমন সময় হঠাৎই ওরা অনুভব করলো ওদের বুইক বড় রাস্তা ছেড়ে আচমকা বাঁক নিলো। পর মুহূর্তেই রাস্তার প্রতিক্রিয়াবশতঃ ক্যারাভ্যানটা প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকুনি তুলে লাফাতে লাফাতে এগিয়ে চললো।

তিনজনে চটপট নিজেদের গ্লাস শেষ করে ফেললো। মরগ্যান দাঁতে দাঁত চেপে ক্যারাভ্যানের জ্বালানি ও বুকের জমাট তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা সহ্য করে চললো।

মিনিটখানেকের মধ্যে গাড়ির গতি কমতে কমতে একেবারে থেমে গেলো।

 কিছুক্ষণ পরে ক্যারাভ্যানের দরজা খুলে গেলো। খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে জিনি ও কিটসন।

মরগ্যানের বিবর্ণ পান্ডুর মুখ দেখে কিটসন দুশ্চিন্তায় প্রশ্ন করলো, কোনো রকম অসুবিধে হয় নি তো?

মরগ্যান বাইরে তাকালো। ওরা এখন রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়েছে এক ফার বনের শীতল ছায়া রাজত্বে। পাহাড়কে পাকে পাকে জড়িয়ে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে ফন হ্রদের দিকে। এখান থেকে ফন হ্রদের দূরত্ব, ছ মাইল।

মাথার ওপরে উড়োজাহাজের গর্জন শোনা যাচ্ছে। এখানে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করলে বিপদের সম্ভাবনা আছে।

মরগ্যান ট্রাকের দিকে দেখিয়ে, টমাস এখনও বেঁচে আছে। ওকে যে করে থোক একেবারে শেষ করতে হবে।

ব্লেক নির্বিকার মুখে খাবারের বাক্সটা জিনির হাতে তুলে দিলো।

এতক্ষণে কিটসন প্রতিবাদ করলো। টমাসকে নিয়ে কি করবে তোমরা? খুন করবে ওকে?

নিষ্ঠুর বাঁকা হাসি ফুটলো মরগ্যানের মুখে। নয়তো কি জামাই আদর করবো? ক্যারাভ্যান বন্ধ করে যা বলছি তাই করো।

জিপো তীক্ষ্ণ কর্কশ স্বরে, থামো। আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি। টমাসকে খুন করার মধ্যে আমি নেই। আমার কাজ ট্রাকের তালা খোেলা–তাই খুলবো, ব্যস্। অন্য কিছুর মধ্যে থাকতে আমি রাজী নই…।

মরগ্যান খিঁচিয়ে উঠলো চুপ করো। ৪৫ পলকে তার হাতে উঠে এলো। ইস্পাতের চাদরটা আমাকেই খুলতে হবে, জিপো; ভালো চাও তো যা বলছি তাই করো! নইলে তোমার ঐ ভুড়িকে ঝাঁঝরা করে দেবো।

মরগ্যানের মুখের নৃশংস কুটিল অভিব্যক্তি জিপোকে ঠাণ্ডা করে দিলো, ঝাঁকিয়ে উঠলো। আমাকে ছেড়ে দাও ফ্র্যাঙ্ক। আমাকে এখান থেকে বেরোতে দাও।

মরগ্যান কিটসনের দিকে ফিরে, আমার কথা তোমার কানে যায় নি? ক্যারাভ্যান বন্ধ করে চাকা খুলতে শুরু করো।

ক্যারাভ্যানের দরজা বন্ধ করে কিটসন ফিরে চললো। মানসিক উত্তেজনায় বুইকের পেছনের ঢাকনা তুলে ও একটা স্ক্র–জ্যাক বের করে আনলো। আসন্ন নৃশংস অধ্যায়ের কথা ভেবে তার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠলো। কিটসন জ্যাক ঘুরিয়ে বুইকের সামনের চাকা মাটি থেকে তুলতে লাগলো…

তখন মরগ্যান জিপোকে সাবধান করে দিচ্ছে, শোনো জিপো। এখন থেকে তুমি তোমার টাকার যশ উপার্জন করার চেষ্টা করো। এ পর্যন্ত তো শুধু হাওয়ায় গা লাগিয়ে ঘুরেছে। এবার কঠিন সমাজের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নাও। ইস্পাতের এই হতচ্ছাড়া ঢাকনাটা তোমার খুলতেই হবে।

 জিপো ইস্পাত আবরণীর কাছে গিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে রইলো। ব্লেক একবার জিপোর দিকে, একবার মরগ্যানের দিকে অস্বস্তিতে দেখতে লাগলো।

জিপো দেখলো ইস্পাতের চাদরটা তেমন মজবুত নয়। ট্রাকের দরজার মতো এটার পেছনে তেমন যত্ন নেয় নি ওয়েলিং এজেন্সী।

মরগ্যানও সেটা বুঝতে পারলো।

 যাও, ছোট শাবল আর হাতুড়িটা নিয়ে এসো, এটাকে ভাঙতে বেশি সময় লাগবে না।

ইস্পাতের ঢাকনা ভাঙার পরের কথা মনে করে, জিপো কর্কশ স্বরে বললো, টমাস ভেতরে বসে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে। আমাকে দেখামাত্রই ও সঙ্গে সঙ্গে গুলি করবে।

যা বলছি, চটপট করো।

 জিপো যন্ত্রপাতির বাক্স থেকে হাতুড়ি আর একটা ছোট শাবল নিয়ে এগিয়ে এলো। ওর হাত এত কাঁপছে যেন এখুনি শাবল আর হাতুড়িটা ওর হাত থেকে খসে পড়বে।

মরগ্যান অধৈর্যভাবে চেঁচিয়ে উঠলো, শীগগির করো! জলদি! এতে ভয় পাওয়ার কি আছে তা বুঝতে পারছি না।

টমাস যদি আমাকে গুলি করে তাহলে ট্রাকের তালা খুলবে কে? জিপো শেষ অস্ত্র হিসেবে মরগ্যানের নাকের ডগায় ওর তুরুপের তাস ছুঁড়ে মারলো। কাজ হলো।

মরগ্যান ক্রোধভরে, দাও, ও দুটো আমার হাতেইদাও! ..শালা, ভীতুর ডিম। দাঁড়াও। তোমাকে আর তোমার ঐ নদের চাঁদ ইয়ারকে আমি শায়েস্তা করছি। তোমরা যদি ভাবো পায়ের ওপর পা তুলে দু লাখ ডলার পাবে, তবে ভীষণ ভুল করবে।

মরগ্যান হাতুড়ি আর শাবলটা জিপোর হাত থেকে হ্যাঁচকা মেরে কেড়ে নিলো। শাবলটাকে ইস্পাতের ঢাকনা ও জানলার জোড়ের মুখে ঠেকিয়ে হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করলে শাবলটা ইস্পাতের চাদরকে সামান্য ঠেলে ঢুকে গেলো ভেতরে।

ক্রমাগত হাতুড়ির ঘা মেরে শাবলটা যখন ইঞ্চি ছয়েক ভেতরে ঢুকে গেলো মরগ্যান তখন থামলো। হাতুড়ি ফেলে ব্রেকের দিকে ঘুরে। জিপোর মতো তুমিও কি ভয়ে কেলিয়ে পড়ল।

কাঁধের খাপ থেকে ৩৮রিভলবারটা হাতে নিয়ে ব্লেক বললো, তুমি প্রস্তুত হলেই আমি প্রস্তুত

মরগ্যান বাঁকাভাবে হাসলো। কি ব্যাপার? তুমি কি এখন নিজের দু লাখ ডলারকে বাঁচাতে চাইছো?

বাজে কথা ছাড়া ফ্র্যাঙ্ক। কাজ শুরু করো। টমাসের মোকাবিলা করার জন্য আমি প্রস্তুত

মরগ্যান শাবলের প্রান্তে সবলে চাপ দিতে যাবে। ক্যারাভ্যানের গায়ে তিনবার টোকা দেবার শব্দ এলো। মরগ্যান চাপা স্বরে, সাবধান! কেউ আসছে।

ব্লেক জানলার পর্দা সরিয়ে উঁকি মারলো।

জিনি রাস্তার ধারে গুছিয়েই বসেছিলো, ওর কাছ থেকে গজ কয়েক দূরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে তার পেছনে একটা ক্যারাভ্যান। সম্ভবতঃ, তাদের মতোই আরো কেউ ক্যারাভ্যান নিয়ে ফন হ্রদের দিকে চলেছে।

একটা রোদে পোড়া লালমুখো মধ্যবয়স্ক লোক খুশী খুশী মুখে গাড়ি থেকে নামলো। তার সঙ্গিনী একজন সুশ্রী মহিলা ও একটি দশ বারো বছরের ছেলে। ওরা গাড়িতে বসেই বুইক ও ক্যারাভ্যানটাকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে লক্ষ্য করতে লাগলো।

মধ্যবয়স্ক লোকটার হেঁড়ে গলা কানে এলো, কি ব্যাপার? চাকা বিগড়েছে মনে হচ্ছে? জিনিকে লক্ষ্য করে বললো, বলেন তো সাহায্য করি

জিনি মিষ্টি হেসে না, না–তার কোনো দরকার নেই। আমার স্বামী একাই পারবেন। ধন্যবাদ।

লোকটা বললো, আপনারা কি ফন হ্রদের দিকেই যাচ্ছেন?

 হ্যাঁ।

আমরাও সেখানেই যাচ্ছি। গত গ্রীষ্মের ছুটিতেও গিয়েছিলাম। আপনারা আগে কোনদিন ওখানে গেছেন নাকি?

উঁহু।

দেখবেন। জায়গাটা খুব ভালো লাগবে। এক কথায় চমৎকার। তার ওপর সুব্যবস্থা তো আছেই ওহ, –হহ, আমার নামটাই বলিনি–আমার নাম ফ্রেড ব্র্যাডফোর্ড। ঐ যে গাড়িতে আমার স্ত্রী–মিলি আর ওর পাশেই আমার ছেলে। আপনাদের ছেলেমেয়েদের দেখছি না!

জিনি ওর কথায় খোলা হাসিতে ফেটে পড়লো। ওর হাসি ব্লেককে অবাক করলো। সত্যি মেয়েটা অভিনয় জানে বটে।

ব্র্যাডফোর্ড অপ্রস্তুতে পড়তেই জিনি তাড়াতাড়ি বলল, না, এখনও পর্যন্ত নেই। আমরা মধুচন্দ্রিমা কাটাতে ফন হ্রদে যাচ্ছি।

এবার ব্র্যাডফোর্ড হো হো করে হেসে উঠলো। হাসির দমকে তার চোখের কোণ চিকচিক করে উঠলো।

ওঃ দারুণ দিয়েছেন। আরে শুনেছো, মিলি! ওরা কোথায় মধুচন্দ্রিমা কাটাতে যাচ্ছে, আর আমি বোকার মত জিজ্ঞেস করছি ওদের ছেলেমেয়ে আছে কিনা! হোহোহোঃ …!

মহিলাটি গাড়ি থেকেই বিরক্ত হয়ে ভ্রূকুঁচকে বললো, তোমার সব সময়েই ঐ রকম। চলে এসো। ফ্রেড–ওদের শুধু শুধু বিরক্ত করছে।

হা–ঠিক বলেছো। আমারও তাই মনে হয়…আচ্ছা তাহলে চলি মিসেস…এই দেখুন কাণ্ড, আপনার নামটাই জানা হয় নি।

হ্যারিসন। আমার স্বামীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত।

তাতে কি হয়েছে? হয়তো ফন হ্রদে গিয়ে আমাদের আবার দেখা হবে। তখনই বকেয়া আলাপের পালাটা সেরে নেওয়া যাবে। আর নিতান্তই যদি দেখা না হয়, তাহলে আপনাদের শুভ মধুচন্দ্রিমা কামনা করি।

ধন্যবাদ।

গাড়িতে উঠে ব্যাডফোর্ড হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিলো পাহাড়ী রাস্তা ধরে।

 মরগ্যান ও ব্লেক অস্বস্তিভরে পরস্পরের দিকে তাকালো।

ব্লেক চিন্তিতভাবে বললো, এখন যদি টমাস রিভলবার চালাতে শুরু করে তাহলে ওরা গুলির শব্দ শুনতে পাবে।

মরগ্যান মরিয়া হয়ে পেলে পাক। এই বনে কি কেউ শিকার করে না? ওরা ভাববে কোনো শিকারী শিকারের পেছনে ছুটছে। এসো, কাজ শুরু করা যাক।

কিটসন এমন সময় জানলা দিয়ে ডেকে বললো, কি ব্যাপার? ভেতরে কি হচ্ছে?  

তুমি যেখানে আছে, সেখানেই থাকো। কাউকে এদিকে আসতে দেখলেই আমাদের সাবধান করে দেবে। আমরা আর দেরী করতে পারছি না।

শিউরে উঠলো কিটসন, ওর সারা শরীর যেন গুলিয়ে উঠলো।

ক্যারাভ্যানের জানালা বন্ধ করে দিলো মরগ্যান, ব্লেকের দিকে ফিরে ঘাড় নাড়ালো, এসো, এড তাহলে শুরু করা যাক।

চলো।

মরগ্যান শাবলটা নীচের দিকে হ্যাঁচকা মারতেই জিপো ভয়ে মুখ ঢাকলো দু–হাতে।

ওয়েলিং এজেন্সীর ট্রাকচালক ডেভ টমাস পড়ে ছিলো ট্রাকের মেঝেতে। চৌচির, রক্তাক্ত চোয়ালের যন্ত্রণায় সব অনুভূতিকে অসাড় করে দিয়েছে। শুধু সাহসকে সম্বল করে সে কোনোরকমে বেঁচে আছে।

মরগ্যানের রিভলবারের গুলি তার মুখের নিম্নাংশকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যাবার পথে টমাসের চোয়ালের হাড় চুরমার করে জিভকে দু ফালি করে সরাসরি গুলিটা বেরিয়ে গেছে।

এই আকস্মিক আঘাত ও যন্ত্রণার প্রতিক্রিয়া টমাসের মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময়ের জন্য আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই তার জ্ঞান ফিরেছে। সঙ্গে সঙ্গেই টমাস অনুভব করেছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য সে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

টমাস ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভাবতে চেষ্টা করলো। চালকহীন ট্রাকটা কি করে ছুটছে, ভেবে সে অবাক হলো!

এভাবে এক নাগাড়ে রক্তপাত হওয়ার পরে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম তা টমাস জানে। তবে মরতে সে ভয় পায় না। এখন যদি কোনো এক বিচিত্র মন্ত্রবলে সে বেঁচেও ওঠে তবুও খুব একটা লাভবান হবে বলে মনে হয় না, কারণ একটা ফাটা চৌচির চোয়াল ও আধখানা জিভ নিয়ে সে কি করে লোকসমাজে থাকবে? তাছাড়া বোবা হয়ে বাকি জীবনটা কাটানোর যন্ত্রণা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না।

এবার ট্রাকের এপাশ ওপাশ টলমল দোলানির দিকে মন সংযোগ হলো। কিছুক্ষণ চিন্তার পর সে সিদ্ধান্ত নিলো, ট্রাকটাকে কোনো গাড়িতে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নাঃ। মতলবটা মন্দ নয়। কিন্তু এরা কি শেষ রক্ষা করতে পারবে? আপাততঃ তার কর্তব্য হলো এই মুহূর্তেই বেতার যন্ত্র চালু করে বিপদ সংকেত পাঠানো, পুলিশকে জানানো ট্রাকের অবস্থিতির কথা। যেখানেই ওটা লুকানো থাকুক না কেন, পুলিশ ঠিক খুঁজে বের করবেই।

এখুনি এই কাজটা করা তার উচিত। কিন্তু বেতার যন্ত্রটা ঠিক তার পেছনেওপর দিকে। তাকে একপাশে কাত হয়ে ওপরে হাত বাড়াতে হবে। পাশ ফেরামাত্রই অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হবে ভেবে টমাস চোখ বুজে একইভাবে নিশ্চল হয়ে পড়ে রইলো। নেকড়ের হিংস্রতায় ভরা মুখটার কথা, সাপ কালো শীতল চোখ জোড়ার কথা–যে লোকটা তাকে গুলি করেছিল তার কথা ভাবতে লাগলো। টমাস লোকটার পরিচয় পেয়ে অবাক হলো। আর ঐ মেয়েটা, যে স্পোর্টস কারটা চালাচ্ছিলো সেও নিশ্চয়ই এর মধ্যে আছে। ওদের পুরো মতলবটা প্রশংসার দাবী রাখে। বিশেষ করে ঐ দুর্ঘটনার দৃশ্যটা। কিন্তু তবুও ডাকসন সোজাসুজি বেতারে খবর দিয়েছিলো এজেন্সীকে। জানতে চেয়েছিলো তাদের কর্তব্য।

টমাস তন্দ্রাচ্ছন্ন মস্তিষ্কে ভাবলো, ঐ ফুলের মতো কচি মেয়েটা কি করে এই নৃশংস ভয়ঙ্কর কাজে জড়িয়ে পড়লো।

মেয়েটার কথায় টমাসের মনে পড়লো ক্যারির কথা–তার তেরো বছরের ছোট্ট মেয়েটার কথা।

ক্যারীর মাথার চুল অনেকটা ঐ মেয়েটার মতোই, তামাটে। কিন্তু ওর মতো ক্যারী অতোটা সুন্দরী নয়। অবশ্য ক্যারির বয়স এখনো অনেক কম–বড় হলে হয়তো আরও সুন্দরী হবে।

ক্যারী তাকে খুব শ্রদ্ধা করে, বলে, ওর বাবার মতো সাহসী তোক আর নেই। নইলে দশ লক্ষ ডলার ভর্তি একটা ট্রাক চালিয়ে নিয়ে যাওয়া কি চাট্টিখানি কথা।

টমাস ভাবলো, ক্যারি যদি আমাকে এ অবস্থায় দেখতো, তাহলে ওর সমস্ত স্বপ্নই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেতো। সামান্য একটু ব্যথার ভয়ে, যন্ত্রণার ভয়ে আমি পাশ ফিরে বেতারে খবর দিতে পারছি না দেখলে ও লজ্জা পেতো।

ট্রাকের টাকা রক্ষা করার জন্য টমাস যদি নিজের জীবনও দিয়ে দেয়, তবুও ক্যারী এতোটুকু দুঃখ পাবে না। বরং বন্ধুদের বলবে তার বাবা কিভাবে বীরের মতো প্রাণ দিয়েছে। না, টমাস ওর কাছে ছোট হতে পারবে না।

এখন তার করণীয় কাজ দুটি, প্রথমতঃ বেতারে বিপদ সংকেত ছড়িয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়তঃ বোতাম টিপে সময় নির্ভর তালাকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অকেজো করে দেওয়া।

তালাকে অকেজো করার বোতামটা স্টিয়ারিং হুইলের ঠিক পাশে রয়েছে। ওটাকে নাগালে পেতে টমাসকে উঠে বসে সামনে ঝুঁকে পড়তে হবে। কিন্তু এই নড়াচড়ায় তার ভাঙা চোয়ালের হাল যে কি হবে ভেবে সে ঘামতে লাগলো।

ক্যারী ট্রাক রক্ষা করার ব্যাপারে টমাসকে সমর্থন করলেও, হ্যারিয়েট–তার স্ত্রী যে করবে না, সেটা টমাস ভালোই জানে। হ্যারিয়েট টমাসের অবস্থাটা বুঝবে, কিন্তু ক্যারী যে ছোট, অবুঝ।

মিনিট পাঁচেক লাগলো সাহস করে প্রস্তুত হতে তারপর সে যখন পাশ ফিরতে চেষ্টা করলো, সঙ্গে সঙ্গেই যন্ত্রণার তীব্র ছুরি কেটে বসলো তার হৃদপিণ্ডে। টমাস মুহূর্তে আবার জ্ঞান হারালো।

টমাসের ঘুম ভাঙলো হাতুড়ি পেটার অপ্রত্যাশিত বিকট শব্দে। চোখ মেলেই দেখলো জানলা ও ইস্পাতের পাতের ফঁক দিয়ে এসে পড়া এক চিলতে মধ্যাহ্নের আলো। দৃষ্টি ক্রমশঃ স্বচ্ছ হতেই দেখলো, একটা শাবল আংশিক ঢুকে রয়েছে ইস্পাত আবরণী ও জানলার ফাঁকে।

টমাস ভাবলো, তাহলে ওরা আমাকে শেষ করতে আসছে। তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

দুর্বল হাতে রিভলবার বের করার চেষ্টা করলো। মরগ্যান গুলি করার সময়, টমাস রিভলবার ছোঁড়ার সুযোগ পায়নি। তাই সে আগে থেকেই প্রস্তুত হতে চায়।

টমাসের রিভলবার ৪৫ স্বয়ংক্রিয় কোল্ট। তাই একটু ভারী। রিভলবারটা হাতে নিতেই মনে হলো খুব ভারি, আরেকটু হলেই পড়েও যাচ্ছিলো বন্দুকটা। অতিকষ্টে নামিয়ে আনলো তার ডান পাশে। আর বন্দুকের নলটা তাক করে রাখলো ট্রাকের জানলার দিকে।

ঠিক আছে শালা, এসো এবার! ভাবলো টমাসআমার একদিন কি তোমার একদিন! ক্রমশঃ চমক দেবো, জীবনভর ইয়াদ রাখবে! আর অপেক্ষা করতে পারছি না। তাড়াতাড়ি করো। মরার আগে জীবনের শেষ যুদ্ধে জিততে চাই।

এমন সময় তার কানে এলো কারো চাপা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর, সাবধান। কেউ আসছে!

এরপর দীর্ঘ নীরবতা। টমাস অনুভব করলো, অনুভূতিকে স্থাবর করে দিতে চাইছে। সে মনের জোরকে সম্বল করে লড়ে চললো, কোনোরকমে জাগিয়ে রাখলো তার মনের চেতনা।

নিজের মনেই উচ্চারণ করলো টমাস, তাড়াতাড়ি করো! এ অবস্থা আমি আর সইতে পারছি না! ….

হঠাৎই শুনতে পেলো কারো উত্তেজিত স্বর, এখন যদি টমাস রিভলভার চালাতে শুরু করে তাহলে ওরা শব্দ শুনতে পাবে।

টমাসের রিভলবার ক্রমশঃ ভারী ঠেকছে। সে বুঝলো, জানালা লক্ষ্য করে তাকিয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। দরজা খুললেই টমাস গুলি চালাবে। তখন লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না।

টমাস প্রতীক্ষায় রইলো। যন্ত্রণায় তার শ্বাস–প্রশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে। তবুও অপেক্ষা করে চললো।

জানলায় শাবলের চার দিতেই সড়াৎ করে ওপরে উঠে গেলো ইস্পাতের চাদর। টমাসের চোখের দৃষ্টি আবদ্ধ হলো ট্রাকের খোলা জানলায়।

ব্লেক ও মরগ্যান সরে দাঁড়ালো জানালার কাছে থেকে। দরজার দু–পাশে ওরা কান খাড়া করে অপেক্ষা করতে লাগলো। কিন্তু কোনো শব্দই কানে এলো না। ওরা মুখ চাওয়া–চাওয়ি করলো।

শালা, চালাকি করছে না তো? প্রশ্ন করলো ব্লেক।

হতে পারে।

জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে দিলো মরগ্যান, আর খুঁজে চললো দরজা খোলার হাতলটা।

টমাস লক্ষ্য করতে লাগলো মরগ্যানের কার্যকলাপ। তার চোখ আধবোজা; তর্জনী চেপে বসেছে রিভলবারের ট্রিগারে সাফল্যের অনিশ্চয়তায় তার মন সামান্য আশঙ্কিত।

অবশেষে দরজাটা খুলে ফেললো মরগ্যান। দরজার পাল্লাটা গিয়ে থামলো ব্লেকের সামনে। সুতরাং ব্লেকের পক্ষে ভেতরে নজর রাখা সম্ভব হলো না। একদিকে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল, অন্যদিকে ট্রাক, এবং সামনে ট্রাকের খোলা দরজার পাল্লা–একরকম বন্দীই হয়ে পড়লো ব্লেক। মরগ্যান বিদ্যুৎগতিতে ট্রাকের ভেতরে উঁকি মেরেই বাইরে শরীরটাকে বের করলো।

সে সেই কয়েক মুহূর্তে দেখলো একটা লোক বিভ্রভাবে ট্রাকের মেঝেতে পড়ে রয়েছে তার চোখ বোজা, মুখের রঙ ফ্যাকাসে।

ব্লেকের দিকে ফিরে মরগ্যান চাপা স্বরে বললো, কোনো ভয় নেই। ও মারা গেছে।

মনে মনে টমাস ভাবলো। পুরোপুরি নয় বন্ধু, একটু পরেই সেটা জানতে পারবে।

টমাস প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির জোরে রিভলবার ধরা হাতটা ঈষৎ উঁচিয়ে ধরলো। আ আস্তে মরগ্যান সতর্ক ভঙ্গীতে ট্রাকের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো।

 টমাসের বন্দুক মরগ্যানের দিকে নিশানা করা অতিরিক্ত সাবধানতা বশে। কারণ তার দৃঢ় বিশ্বাস টমাস মৃত। ঐ রকম ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মুখ। মৃতের মতো রক্তহীন, পান্ডুর শরীর নিয়ে বেঁচে থাকা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

মরগ্যান ব্লেকের দিকে ফিরে, ওকে এখান থেকে বের করে বাইরে কবর দেওয়া যাক। কি। বলো? ব্লেক তখন কৌতূহলভরে জানলা দিয়ে টমাসকে দেখছে।

টমাস এমন সময় চোখ খুললো।

সাবধান। প্রচণ্ড চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু দরজাটা তার শরীরে চেপে বসায় সে অসুবিধেয় পড়লো।

মরগ্যান ওকে গুলি করার সঙ্গে সঙ্গেই টমাস ট্রিগার টিপলো।

ঠিক একই মুহূর্তে দুটো বন্দুকের শব্দ বিস্ফোরিত হলো।

মরগ্যানের গুলিটা টমাসের গলায় বিঁধে গেল সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলো।

টমাসও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। মরগ্যানের পেটে তার গুলি লেগেছে। হাঁটু ভেঙে ট্রাকের ভেতর মরগ্যানের মুখটা টমাসের কোলে গিয়ে পড়লো।

জিপো ভাঙা কর্কশ গলায় এক তীব্র আর্তনাদ করে উঠলো।

ব্লেক ট্রাকের দরজাটা ঠেসে ধরলো মরগ্যানের বেরিয়ে থাকা পায়ে। কোনরকমে একপাশ হয়ে ক্যারাভ্যানের দেওয়াল ও ট্রাকের দরজার ফাঁক দিয়ে সে এদিকে এসে দাঁড়ালো। ব্লেক মরগ্যানের দেহটাকে চিত করে দিলো।

মরগ্যান ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকিয়ে, শেষ পর্যন্ত আমি হেরে গেলাম, এড। তার স্বর এতই অস্পষ্ট ছিল যে ব্লেকের বুঝতে কষ্ট হলো। তবে টাকাটা তোমাদের কাজে আসবে। তোমাদের প্রত্যেকেরই কাজে লাগবে। এই দশ লাখ ডলার…গুড লাক…

হঠাৎই ব্লেকের খেয়াল হলো। সে এক অদ্ভুত চিন্তা করে চলেছে। যদি শেষ পর্যন্ত ট্রাকের তালা তারা ভাঙতে পারে, তাহলে দুলাখ ডলারের জায়গায় তারা প্রত্যেকে আড়াই লাখ করে পাবে। কারণ তাদের অংশীদারের সংখ্যা এই মুহূর্ত থেকে চারজন।

.

০৮.

একটা বসবার ঘর, একটা শোবার ঘর। একটা ছোট্ট রান্নাঘর এবং তার চেয়েও ছোট্ট একটা স্নানঘর–এই নিয়েই গোটা কেবিনটা।

আধুনিকভাবে সাজানো–গোছানো শোবার ঘরে দুটো বিছানা–তাছাড়া প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তো আছেই। বসবার ঘরটাও চেয়ার, সোফা ইত্যাদিতে ছিমছামভাবে সাজানো। অর্থাৎ চারজন শোবার পক্ষে কোনরকম অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

এই কেবিনটা হ্রদের এক প্রান্তে। এবং অন্যান্য কেবিনগুলোর থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। কেবিন ভাড়া দেবার জন্য ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি বেশ সবজান্তার হাসি ফুটিয়ে জিনিকে বলল, এই কেবিনটা বিশেষভাবে মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্যই তৈরী। এই কেবিনে আগে যারা ছিলো। তারা গতকাল রাতেই ছেড়ে চলে গেছে।

হ্যাডফিল্ড কর্মচারীটির নাম। জিনি আর কিটসন এখানে এসে পৌঁছলে সে তখন ওদের পাশে এসে রাস্তা দেখিয়ে ওদের ইঙ্গিত কেবিনের দিকে নিয়ে গেছে।

হ্যাডফিল্ড মাঝে মাঝে অবাক চোখে কিটসনের দিকে দেখছিলো। ভদ্রলোককে কেমন যেন উত্তেজিত দেখাচ্ছে চুপচাপ বসে রয়েছেন ব্যাপার কি? কে জানে, হয়তো আসন্ন ফুলশয্যার রাতের কথা ভেবে বিব্রত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু হ্যাডফিল্ড–এরকম সুন্দরী বউ পেয়ে ভদ্রলোক বিব্রত কেন–কারণ খুঁজে পেলো না।

মেয়েটাও কেমন যেন বিচলিত হয়ে পড়েছে। অবশ্য সেটা স্বাভাবিক। কারণ প্রত্যেক সুন্দরী মেয়েই মধুচন্দ্রিমার নামে কিছুটা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। হ্যাডফিল্ড ওদের কথা আবেগভরে ভাবলো। কোথায় ক্যারাভ্যান রাখতে হবে, কোথায় হ্রদে বেড়ানোর জন্য নৌকো ভাড়া পাওয়া যাবে–সবই দেখিয়ে দিলো। আরো বললো, কেউ কখনো তাদের বিরক্ত করবে না। তারা নিজেদের খুশিমতো দিন কাটাতে পারে।

এখানকার লোকেরা বেশ মিশুকে, মিসেস হ্যারিসন। হ্যাডফিল্ড বলতে বলতে ওদের কেবিনটা দেখালো। জিনিকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলো। তারা সবসময়েই আপনাদের সুখ সুবিধের দিকে নজর রাখবে, গল্প–সল্প করবে। …আমার মনে হয়, আপনারা বোধহয় নির্জনতাই বেশি পছন্দ করবেন। অন্তত প্রথম কয়েকদিন, কি বলেন? যাক গে–ও নিয়ে ভাববেন না। মিসেস হ্যারিসন, আমি সবাইকে বলে দেবোখন। আপনারা গুছিয়ে না বসা পর্যন্ত কেউ আপনাদের বিরক্ত করবে না।

ওদের চারজনের একমাত্র অন্ধকারের প্রতীক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিলো না। সারাদিনের ধকলে ওদের কাছে ঐ সময়টুকু অসহ্য ও ক্লান্তিকর মনে হয়েছে। জিনি কেবিনে ঢুকেই শোবার ঘরে ঢুকে সটান বিছানায় শুয়ে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ও ঘুমিয়ে পড়লো। কিটসন বাইরে পাহারায় থেকেছে। একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করেছে আর ক্যারাভ্যানের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে। ব্লেক ও জিপোকে নিরুপায় হয়েই টমাস ও মরগ্যানের মৃতদেহের সঙ্গে ক্যারাভ্যানের ভেতরে থাকতে হয়েছে। না, ওদের সময়টা খুবই খারাপ কেটেছে।

জিপো আর ব্রেক অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেবিনের ভেতরে চলে এসেছে।

পরিশ্রান্ত জিপোর অবস্থা ব্লেকের চেয়েও খারাপ। সে এসেই একটা চেয়ারে বসে দুহাতে তার মুখ ঢাকলো। তার চোয়ালের পাশে একটা লম্বা কাটা দাগ। ব্লেকের আঘাতের ফলেই ঐ ক্ষত। ফন হ্রদে আসার পথে জিপো হঠাৎ ক্যারাভ্যানের দরজা খুলে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিলো। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে সে ক্যারাভ্যানের ধাতব দেওয়ালে পাগলের মতো মাথা খুঁড়ছে। হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো একরোখাভাবে ব্লেকের সঙ্গে সমানে যুঝে গেছে।

অবশেষে ব্লেক তাকে চোয়াল লক্ষ্য করে সজোরে ঘুষি মেরেছে। এছাড়া জিপোকে সামলানোর আর কোনো উপায়ই ছিলো না। তারপরে যখন জ্ঞান ফিরেছে সে চুপচাপ ক্যারাভ্যানের মেঝেতে বসে থেকেছে। অন্ধকারের প্রতীক্ষায় তাদের আটটি ঘণ্টা ক্যারাভ্যানের ভেতরে কাটাতে হয়েছে। মাছির দৌরাত্ম্যর জন্য জানালাগুলো এটে বসে সময় গুনেছে– এ অভিজ্ঞতার কথা ওরা সহজে ভুলবে না।

ব্লেক আর কিটসন গেছে অন্ধকার ঘন জঙ্গলের ভেতরে টমাস ও মরগ্যানের মৃতদেহ কবর দেবার জন্য। জিপোর নানান যন্ত্রপাতির মধ্যে একটা বেলচা ছিল। সেটা দিয়েই মাটি খুঁড়তে শুরু করেছে।

ব্লেক আর কিটসন বিষণ্ণ চাঁদের মরা আলোয় নিঃশব্দে কাজ করে চললো অত্যন্ত সতর্কভাবে। কারণ অদূরেই খোলানীল হ্রদের জলে নৈশবিহারে ব্যস্ত দম্পতিদের কথোপকথন নৌকো থেকেও স্পষ্ট কানে আসছে। তাছাড়া পাড়ে পায়চারিরত অতিথিদেরও তারা দেখতে পাচ্ছে। হঠাৎই তারা মাথা নীচু করে লুকিয়ে পড়লো–বুকের ধুকপুক শব্দ আচমকা বেড়ে উঠলো। ব্লেক ও কিটসনের ঠিক পাশ ঘেষে একজোড়া তরুণ–তরুণী বেরিয়ে এলো। ওরা এই স্বপ্নিল আঁধারে জঙ্গলের নির্জনতাকেই বেছে নিয়েছে। ওরা চলে যেতেই কিটসন আবার কাজ শুরু করলো।

মাঝরাতে ওদের কাজ শেষ হলো। ওপরের মাটি সমান করে তার ওপর ভাঙা ডালপালা ও শুকনো পাতা ছড়িয়ে দিলো ব্লেক। ওরা শ্রান্ত দেহে কেবিনের দিকে ফিরে চললো।

জিনি ৩৮ রিভলবারটা কোলের ওপর রেখে গা এলিয়ে অপেক্ষা করছিলো। আর জিপোর দিকে লক্ষ্য রাখছিলো।

ব্লেক কেবিনে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলো। তারপর ব্লেক ও কিটসন চেয়ারে বসলো। কিটসনের মুখের রঙ ফ্যাকাশে রক্তহীন। তার গালের একটা ছোট পেশী, থেকে থেকেই কেঁপে উঠছে। মুখে ঘামের ফোঁটা চকচক করছে।

ব্লেক জিনিকে বললো, কোনো গোলমাল করে নি তো?

জিনির মুখমণ্ডল পান্ডুর। চোখের নীচে কালি। দেখে মনে হচ্ছে ওর বয়েস যেন অনেক বেড়ে গেছে। শরীরের জৌলুষও অনেকটা কমে এসেছে। কিন্তু বরাবরের মতোই শীতল ও নির্বিকার ভাবে। না। …তবে বরাবরই বলছিলো। আমাকে ছেড়ে দাও, আমি বাড়ি যাবো।

 ব্লেক কঠিন স্বরে বললো, ট্রাকের তালা খোলার পর বাড়ি কেন। ও নরকে গেলেও আমার কোনো আপত্তি নেই।

জিপো ওদের কথাবার্তায় পাশ ফিরে তাকালো। ঘরের উজ্জ্বল আলোয় কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে চারপাশে দেখলো। তারপর ওদের তিনজনকে দেখেই সোফার ওপর উঠে বসলো। উত্তেজনায় জিপোর হাত কাঁপতে লাগলো, মুখ সংকুচিত হলো।

এড, তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও…। আমার ভাগের টাকার দরকার নেই। ওটা তোমরাই নিয়ে নিও। ঐ হতচ্ছাড়া ট্রাকের সঙ্গে আমি আর কোন সম্পর্কই রাখতে চাই না। তাই বলছি, আমার প্রাপ্য দু লক্ষ ডলার নিয়ে তোমরা আমাকে রেহাই দাও। ফ্র্যাঙ্ক যদি অতো করেনা বলতো, তাহলে আমি এ কাজে হাত দিতাম না। এখনও যদি তোমাদের রাজা হবার সাধ থাকে তো লেগে থাকো–আমি ওর মধ্যে নেই। আমি সোজা আমার কারখানায় ফিরে যাচ্ছি।

ব্লেক কিছুক্ষণ ধরে জিপোর আপাদমস্তক জরীপ করলো, কিন্তু আমার তা মনে হয় না, জিপো।

শোনো–এড একটু ভালো করে ভেবে দেখো। আমার অংশের সমস্ত টাকাই আমি তোমাদের দিয়ে দিচ্ছি। দু লাখ ডলার নেহাত কম নয়। কিন্তু তার বদলে আমি শুধু বাড়ি যেতে চাইছি।

ব্লেক নির্লিপ্তভাবে, উঁহু–আমার ধারণা, সেরকম ছেলেমানুষী তুমি করবে না।

এবার জিপো কিটসনের দিকে ফিরে করুণ সুরে, আলেক্স। তুমি তো জানেনা, এই কাজটা কি রকম বিপজ্জনক। আমরা প্রথমে কেউ রাজি হইনি, মনে আছে? কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক আমাদের এ কথা সেকথা বলে ঠিক রাজি করেছিলো। চলো, আমরা চলে যাই। এড আর জিনিই ট্রাকের সমস্ত টাকা ভাগ করে নিক। ও টাকায় আমাদের প্রয়োজন নেই। তুমি আর আমি একসঙ্গে কাজ করবো। আমাদের দিন স্বচ্ছলভাবেই কেটে যাবে…বিশ্বাস করো, আলেক্স, বাকি জীবনটা আমরা নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারবো।

ব্লেক নরমস্বরে বললো। ন্যাকামো ছাড়ো, জিপো। তুমি এখানেই থাকছে। এবং ট্রাকের তালা খুলছে–এই আমার শেষ কথা।

পাগলের মতো করে জিপো বললো, না, না–এড, আমাকে যেতেই হবে। এই কাজের শেষ দেখার মতো সাহস আমার নেই। তবে কি করে ট্রাকের তালা খুলতে হয় সেটা তোমাদের বলে দিয়ে যাবো। তখন তুমি আর জিনি সহজেই তালা খুলতে পারবে কিন্তু আমাকে আর থাকতে বোলো না। আমাদের ভাগের পাঁচ লাখ ডলার তোমরা এমনিতেই পেয়ে যাচ্ছে। কারণ আমার টাকাটা আমি তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি, আর আলেক্স ওর অংশটা জিনিকে দিয়ে যাবে…

আমাদের তুমি ছেড়ে দাও, এড। আমরা চলে যাচ্ছি…।

ব্লেক কিটসনকে বললো, তুমিও কি চলে যেতে চাও?

কিটসন মরগ্যানের আকস্মিক ভয়ঙ্কর মৃত্যুতে সাময়িকভাবে স্থবির হলেও ধীরে ধীরে হারানো সাহস ফিরে পাচ্ছে। রাত্রির অন্ধকারে দু–দুটো মৃতদেহকে কবর দেওয়ার দুঃস্বপ্নের প্রভাবকে সে ক্রমশঃ কাটিয়ে উঠেছে। সে বেশ বুঝতে পারছে, এখন তারা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে সেখান থেকে ফেরা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। একমুখী রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। এখন কিটসনের নিজের প্রাণ ছাড়া আর কিছুই হারাবার ভয় নেই, কিন্তু লাভের দিকে রয়েছে আড়াই লাখ ডলার, সোনালী ভবিষ্যৎ আর জিনির সঙ্গ। না। সে এখন চাক বা না চাক, ফিরে যাওয়ার প্রশ্ন এখন অবান্তর।

কিটসন ব্লেকের চোখে চোখ রেখে নিষ্কম্প স্বরে বললো, না।

জিপো মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করলো। শোনো, আলেক্স–তুমি কি বলছো, তা তুমি নিজেই জানো না। তুমি এই বিপদের মধ্যে এদের সঙ্গে থেকে কি করবে? তার চেয়ে আমার কারখানায় চলো। মনে কোরো না এ কাজ করে তোমরা রেহাই পেয়ে যাবে! শেষ পর্যন্ত তোমরা বিপদে পড়বেই। তার চেয়ে এখনই এসবের সংস্রব ত্যাগ করা ভালো। আলেক্স, তুমি চলে এসো আমার সঙ্গে।

কিটসন জিনির দিকে আড়চোখে তাকালো, না জিপো, তা হয় না।

জিপো গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে, তাহলে আমি চললাম। কিন্তু মনে রেখো এখানে থেকে তোমার ভালো কোনদিনই হবে না। তিন তিনটে লোক এই ট্রাকের কারণেই মারা গেছে। তাদের রক্তের দাম কোনদিনই তোমরা দিতে পারবেনা। –পারবে? ফ্র্যাঙ্ক বলেছিলো, পৃথিবীটাকে হাতের মুঠোয় ধরবে। …ওর অন্তিম পরিণতির কথা কি মনে করিয়ে দিতে হবে? একরাশ ভিজে মাটির নীচে স্যাঁতসেঁতে একটা গর্তে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে। ওর রাজা হবার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। তুমি কি এখনো বুঝতে পারছে না, আলেক্স? তোমরা কেউই কি বুঝতে পারছে না, যে এসবের শেয় কোনদিনই ভালো হয় না, হতে পারে না? ঠিক আছে, তাহলে আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও–আমি চললাম।

ব্লেক চট করে হাত বাড়িয়ে জিনির কোলে পড়ে থাকা ৩৮ টা তুলে নিলো। জিপোর বুক– লক্ষ্য করে নিষ্ঠুরভাবে উঁচিয়ে ধরলো।

 ট্রাকটা তোমাকে খুলতেই হবে, জিপো। নইলে ফ্র্যাঙ্কের পাশে তোমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবো।

জিপো বুঝল, ব্লেক ঠাট্টা করছেনা। সে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে ৩৮—এর কালো নলটার দিকে তাকিয়ে রইলো জিপোর মুখে অপ্রসন্নতার স্পষ্ট ছায়া। আচ্ছ তাহলে তাই হোক। তুমি আমাকে গায়ের জোরে আটকে রাখতে চাইছে, কিন্তু এতে কিছু লাভ হবেনা। কারণ–এ কাজের শেষ পরিণতি ভালো হবে না–হতে পারে না।

ব্লেক বন্দুকটা নামিয়ে রাখলো।

সে বিরক্ত হয়ে, তোমার বকবকানি শেষ হয়েছে?

জিপো মাথা ঝাঁকিয়ে, আমার আর কিছুবলার নেই। কিন্তু তোমাকে বারবার সাবধান করে দিয়েছি এড। সেটা মনে রেখো।

ব্লেক অন্য দুজনের দিকে। তাকিয়ে বলল, ঠিক আছে। তাহলে জিপোযখনরাজি হয়েছে, এবারে আমরা আলোচনায় বসতে পারি। এখন আমরা চারজন। তার মানে আমরা প্রত্যেকে আরও পঞ্চাশ হাজার ডলার করে বেশি পাবো। আর পরিকল্পনা যা ছিলো সেই মতোই কাজ চলবে। কিটসন–তুমি আর জিনিনতুন বিয়ে করা স্বামী–স্ত্রীর মতোই অভিনয় চালিয়ে যাও। আমিআর জিপোক্যারাভ্যানের ভেতরে ট্রাক নিয়ে পড়ে থাকবো। টাকাটা হাতে আসামাত্রই আমরা চারজন চারদিকে কেটে পড়বো–রাজি?

ঘাড় নেড়ে সবাই সম্মতি জানালো। ঠিক আছে, তাহলে এই কথাই রইলো। ব্লেক দরজার দিকে এগিয়ে তালা থেকে চাবিটা বের করে পকেটে রাখলো। আচ্ছা আমি তাহলে শুতে চললাম, আজকে যথেষ্ট পরিশ্রম হয়েছে। ব্লেক জিপোর পেটেএকটা খোঁচা মেরে, ওঠো, মোটুরাম—চেয়ারে গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমাকে সোফাটা ছেড়ে দাও। মনেহয় সোফাতে শোবার অধিকার বর্তমানে একমাত্র আমারই আছে।

জিপো উঠে চেয়ারের দিকে এগিয়ে চললো। ব্লেক সোফায় বসেজুতো খুলতে খুলতে কিটসনকে লক্ষ্য করে বললো, পাশের ঘরে তোমার জন্য আর একটা খাট পাতা আছে আলেক্স। যাও, গিয়ে শুয়ে পড়ো–স্বামীর কর্তব্য পালনে মন দাও।

কিটসন পরিশ্রান্ত ভাবেই একটা চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো হাই তুলে ঘুমোবার চেষ্টা করলো।

 জিনি পাশের ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে চাবি দিয়ে দিল।

ব্লেক ব্যঙ্গের সুরে বললো, তোমার দুর্ভাগ্য আলেক্স। মনে হচ্ছে তোমার মতো স্বামীকে জিনির ঠিক পছন্দ হয় নি।

কিটসন বিরক্তিভরে বললো, ওঃ–তুমি থামবে!

জিনির পরদিন সকাল সাতটার কিছুপরেই ঘুমভা ঙলো। বসবার ঘরে এসে ও জানলার পর্দাগুলো সরিয়ে দিলো। বাইরের আলো আসতেই তিনজনে জেগে উঠলো।

ব্লেক বিরক্তিসূচক শব্দ করে উঠে রিভলবারের খোঁজে পকেট হাতড়াতে লাগলো।

তখনো কিটসনের ঘুমের আমেজ কাটেনি। সে মাথা তুলে পিটপিট করে জিনির দিকে তাকালো। জিনি রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

জিপো শরীরের ম্যাজম্যাজে ভাবটা কাটিয়ে আড়মোড়া ভাঙলো। আহত চোয়ালে হাত বোলাতে বোলাতে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো যন্ত্রণায়।

রান্নাঘর থেকে জিনি বললো, তোমরা তাড়াতাড়ি ক্যারাভ্যানে যাবার তোড়জোড় করো, এরমধ্যেই কিন্তু হ্রদের ধারে লোকজনের ভিড় শুরু হয়েছে।

ব্রেক কলঘরের দিকে গেলো। মিনিট দশেক পরেই সে দাড়ি কামিয়ে, স্নান সেরে বেরিয়ে এলো। জিপোকে বললো, যাও, চান–টান সেরে নাও। তোমার গা থেকে মোষের মত বোটকা গন্ধ বেরুচ্ছে।

স্নান সেরে জিপো ঘরে ঢুকতেই দেখলো, জিনি একটা ট্রেতে প্রাতঃরাশ সাজিয়ে সবার ঘরে নিয়ে এসেছে।

জিনি ট্রেটা ব্লেকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, এগুলো নিয়ে ক্যারাভ্যানের ভেতরেই, তোমরা খাওয়া দাওয়া সেরে ফেলল।

ট্রেতে রাখা কফি, ডিম সেদ্ধ, কমলালেবুর রসও স্যান্ডউইচের দিকে তাকিয়ে ব্রেক ট্রেটা জিনির হাত থেকে নিলোশোনো সুন্দরী, এখন থেকে তোমরা আমার কথামতো চলবে। কারণ এ দলের পরিচালনার ভার এখন আমার।

জিনি তাচ্ছিল্যভাবে, পরিচালনার ভার? তার মানে? এ দলের পরিচালনার দায়িত্ব কারোরই নেই–মরগ্যানেরও ছিলো না। আমরা শুধু পরিকল্পনানুযায়ী কাজ করে যাব। প্রথম থেকেই ঠিক ছিলো তুমি আর জিপো কেবলমাত্র রাত্রিবেলাতেই কেবিনে আসবে। আর সারাটা দিন তোমাদের ক্যারাভ্যানের ভেতরেই আত্মগোপন করে থাকতে হবে। এখন যদি তুমি তোমার মত বদলে থাকো, তো সে কথা বলো।

ব্লেক ব্যঙ্গভরে বললো, আচ্ছা–খুব কথা শিখেছো দেখছি। তার মানে, ক্যারাভ্যানে বসেই আমাদের খানাপিনা সারতে হচ্ছে? ব্যাপার কি। তোমাদের দাম্পত্য জীবনযাত্রায় অসুবিধে ঘটাচ্ছি বলেই কি আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছো?

কোনো জবাব না দিয়ে জিনি রান্নাঘরের দিকে ফিরে চললো।

কিটসন উঠে দাঁড়িয়ে, এড, সব সময়ে জিনির পেছনে লাগাটা আমি পছন্দ করি না।

ব্লেক খিঁচিয়ে উঠলো, থামো! আর সাফাই গাইতে হবেনা। যাও, বাইরে গিয়ে দেখো, আশেপাশে লোকজন আছে কিনা। না থাকলে ক্যারাভ্যানের দরজাটা চটপট খুলে দেবে।

কিটসন বাইরে গিয়ে চারপাশে কাউকে দেখলো না। সে ব্লেককে ডেকেই সঙ্গে সঙ্গে ক্যারাভ্যানের দরজাটা খুলে দিলো।

ক্ষিপ্রগতিতে ব্লেক আর জিপো ক্যারাভ্যানের ভেতরে ঢুকলো।

ব্লেকের চোখ চকচক করলো, যাও, এবার মৌজ করা গিয়ে। তুমি সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়বে বলে মনে হয় না।

হাতলে চাপ দিয়ে কিটসন ক্যারাভ্যানের দরজা সশব্দে বন্ধ করে দিলো। কিটস কেবিনে ফিরে এলো।

তখন জিনি আরও কয়েকটা স্যান্ডউইচ তৈরী করছে।

 কিটসন এসে কলঘরে ঢুকে, স্নান সেরে, দাড়ি কামিয়ে, নতুন পোষাক পরে বেরিয়ে এলো।

বসবার ঘরে এসে দেখলো, জিনি টেবিলের ওপর ডিম সেদ্ধ ও স্যান্ডউইচ সাজিয়ে রেখেছে।

 ওঃ–চমৎকার হয়েছে। কিন্তু কার জন্য তা তো ঠিক বুঝতে পারছি না। তোমার না আমার?

সকালে, আমার কিছু খাওয়ার অভ্যেস নেই। বলে একটা কাপ নিয়ে জিনি কিটসনের দিকে আংশিক পেছন ফিরে অদূরেই একটা আরাম কেদারায় বসলো।

কিটসন একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলো। এমনিতেই সে ক্ষুধার্ত ছিলো, তার ওপর স্যান্ডউইচের সুবাস তাকে যেন পাগল করে তুললো, মনে মনে জিনির রান্নার প্রচুর তারিফও করলো।

খাওয়া–দাওয়ার পরে ভাবছি, একটু বেরোবো৷ কিটসন বললো, নৌকায় হ্রদটাচক্কর দেওয়া যাবে কি বলো?

হুঁ।

কিটসন জিনির সংক্ষিপ্ত উত্তরে হতাশ হলো।

ক্যারাভ্যানে ওদের খুব কষ্ট হবে। জিনির সঙ্গে কথা বলার প্রয়াস পেলো কিটসন, বাইরে তেমন ছায়াও নেই। দুপুরে ক্যারাভ্যানের ভেতরটা গরম হয়ে পড়বে।

সে ওরা বুঝবে। নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিলো জিনি।

 হ্যাঁ–তা ঠিক। …আচ্ছা, তোমার কি মনে হয়? জিপো ট্রাকের তালা খুলতে পারবে?

 জিনি অধৈর্য ভঙ্গী করলো, আমি কি করে জানবো?

 না মানে, জিপো যদি না পারে তবে কি করবো?

সে কথা আমাকে জিজ্ঞেস করছে কেন? নিজে না পারো তবে ব্লেককে জিজ্ঞেস কর।

আচমকা উঠে পড়লো জিনি। কফির কাপ নিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে।

কিটসন অনুভব করলো, তার চিন্তার ছাপ ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎই খাওয়ার ইচ্ছেটা নষ্ট হয়ে গেলো, কয়েক চুমুকে কফিটা শেষ করে সে কাপ–প্লেট নিয়ে এগোলো রান্নাঘরের দিকে।

কাপ–প্লেট রেখে কিটসন বলে জিনি, আমি বিরক্ত করতে চাইনি। তবে ভেবে দেখো, আমাদের একটু ঘোরাফেরা করা দরকার। কারণ বোঝাতে হবে, আমরা হনিমুনে এসেছি। আমাদের সম্পর্কটাকে কয়েকদিনের জন্য ভুলে থাকা যায় না? বুঝতেই তো পারছো শুধু… আচমকা থেমে গেলো কিটসন।

জিনি কিটসনের দিকে পেছনফিরে কেমন যেন কাঁপা গলায়, দোহাই তোমার। আমাকে একটু একা থাকতে দাও। দয়া করে পাশের ঘরে যাও।

কিটসন জিনির কথায় দুঃখ পেয়ে ঘুরে এসে জিনির মুখোমুখি দাঁড়ালো। তখনই নজরে পড়লো জিনির পরিবর্তনটা। সজীবতার রেশটুকু মিলিয়ে মুখে ফুটে উঠেছে গ্রীষ্মের আকাশের বিৰ্ণতা। কিটসন ভাবলো নাঃ। মেয়েটা নিজেকে যতোটা সমর্থ মনে করে ততোটা নয়। গতদিনের বীভৎস ঘটনাগুলো কিটসনকে যেমন করেছে ওর মনেও তেমনি বীভৎসভাবে আঘাত করেছে।

ঠিক আছে। আমি এখুনি চলে যাচ্ছি। বলে কিটসন বসবার ঘরে চলে গেলো।

কিটসন জিনির কান্না শুনতে পেলো। এ কাজের হতাশ পরিণতির ইঙ্গিতই যেন বয়ে নিয়ে এলো সেই হালকা, অস্ফুট কান্নার সুর। শেষ পর্যন্ত জিনিও তাহলে কাঁদছে? তাদের সাফল্যের আশা এখন সুদূরপরাহত।

নীরবে কিটসন ধূমপান করে চললো অস্বস্তিকর প্রতীক্ষায়। হঠাৎ একসময় জিনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সোজা গিয়ে ঢুকলো শোবার ঘরে।

কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার পর জিনি এসে বললো, চলো, যাওয়া যাক।

কিটসন দেখলো জিনির সাজসজ্জায় কোথাও খুঁত নেই কিন্তু চোখের অস্বাভাবিকতা ওর অস্থির মানসিক অবস্থার কথা জানিয়ে দিচ্ছে।

কিটসন উঠে দাঁড়িয়ে, একটা খবরের কাগজ পেলে মন্দ হতো না।

হ্যাঁ, মনে হয় বাইরেই পাওয়া যাবে।

জিনি দরজায় দিকে এগিয়ে গেলো। ওর পরনে একটা হাল্কা সোয়েটার এবং শ্যাওলা সবুজ স্ন্যাক্স। এই পোশাক ওর কমনীয় দেহ সৌন্দর্য যেন আরো ফুটে বেরোচ্ছে। কিটসনের এই মুহূর্তে জিনিকে আরো বেশি ভালো লাগলো।

কেবিনের বাইরে আসতেই সূর্যের প্রখর তাপ ওদের শরীরে যেন আছড়ে পড়লো। ওরা ক্যারাভ্যানটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে অনুমান করার চেষ্টা করলো ক্যারাভ্যানের আভ্যন্তরীণ উত্তাপ।

দুজনে নিঃশব্দে পাশাপাশি হেঁটে চললো।

সামনেরজঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা রাস্তা সোজা হ্যাডফিল্ডের অফিসের দিকে চলে গেছে। তার অফিসের পাশেই আছে একটা মুদিখানার দোকান। জঙ্গলের ছায়াঘেরা অঞ্চল পার হয়ে ওরা যখন কাঠের অফিস বাড়িটার সামনে এলো, তখন জিনি কিটসনের হাত আঁকড়ে ধরলো। ওর ঠাণ্ডা স্পর্শে কিটসন চমকে জিনির দিকে তাকালো।

বিষণ্ণভাবে জিনি হাসতে চেষ্টা করলো, আমার ব্যবহারের জন্য কিছু মনে করো না। মাঝে মাঝে আমার অমনি হয়। এখন বেশ আছি।

কিটসন জিনির নরম হাতে চাপ দিয়ে, না, না ঠিক আছে। সত্যিই তো, কাল সারাটা দিন ধরে কম ধকল গেছে।

এমন সময় অফিস থেকে হ্যাডফিল্ড বেরিয়ে এলো। ওদের দেখেই আকর্ণ বিস্তৃত হেসে, এই যে মিঃ হ্যারিসন, কিটসনের দিকে হাত বাড়িয়ে ধরলো হ্যাডফিল্ড, কেমন লাগছে জায়গাটা, বলুন…আমি বেশ বুঝতে পারছি মশায়, আপনি দারুণ সুখে আছে। আপনি না বলতেই কি রকম ধরে ফেলেছি দেখলেন? আরে মশায়, আপনার মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, জায়গাটা আপনার খুব ভালো লেগেছে, আর তাছাড়া মিসেস্যারিসনের মতো সুন্দরী স্ত্রী পেলে আপনি কেন, যে কোনো স্বামীই সারাটা জীবন সুখে কাটিয়ে দেবে–কি বললেন মিসেস হ্যারিসন?

প্রাণ খুলে হেসে উঠলো জিনি। কিটসন অস্বস্তিভরে হ্যাডফিল্ডের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে হাত রাখলো।

জিনি হাসতে হাসতেই বললো, আপনাকে ধন্যবাদ, মিঃ হ্যাডফিল্ড। এতো প্রশংসাও করতে পারেন আপনি… যাকগে, আমরা কিন্তু খবরের কাগজের খোঁজে এসেছিলাম। আছে নাকি?

ভুরুজোড়া ঊর্ধ্বমুখী হলো হ্যাডফিল্ডের, খবরের কাগজ? বলেন কি মিসেস? আজ পর্যন্ত কোন  খদ্দেরকে আমি খবরের কাগজ খোঁজ করতে শুনিনি। কারণ মধুচন্দ্রিমা কাটাতে এসে কেউ বাইরের খবরে নজর দেয়না। তবে খবরের কাগজ আছে। আর আজকের সবচেয়ে জোর খবর ওই ট্রাক লুঠের ব্যাপারটা।

হ্যাডফিল্ড খবরের কাগজ আনতে গেলে জিনি ও কিটসন পরস্পরের দিকে অর্থপূর্ণ চোখে তাকালো।

হ্যাডফিল্ড চারটে খবরের কাগজ নিয়ে এসে বলল, ভাবলাম, আপনারা হয়তো সবকটা কাগজই দেখতে চাইবেন–তাই নিয়ে এলাম। তবে হেরাল্ড–এ পাবেন সাচ্চা খবর।

রুদ্ধশ্বাসে কিটসন বললো। না, আমি সবকটা কাগজই নেবো। মানেখবরগুলো। একটু যাচাই করে দেখবো আর কি।

সে হ্যাডফিল্ডকে কাগজের দাম মিটিয়ে দিলো।

জিনির শরীরের বিশেষ অংশের দিকে তাকিয়ে, আপনাদের কোনোরকম অসুবিধে হচ্ছেনা তো, মিসেস হ্যারিসন? কিছু করার থাকলে বলুন, আমি এখুনি

না, তার কোনো প্রয়োজন নেই, মিঃ হ্যাডফিল্ড। আমাদের কোনো অসুবিধেই হচ্ছে না।

কথা শেষ করে জিনি সামনের মুদী দোকানে গিয়ে ঢুকলো; আর কিটসন কাগজের প্রথম পৃষ্ঠার খবরগুলোতে চোখ বোলাতে লাগলো।

বড় বড় হরফে প্রতিটি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাতেই ট্রাক লুঠের খবর ছাপানো হয়েছে। সেই সঙ্গে ট্রাকটারছবিও ছাপানোরয়েছে। এমনকি ডার্কসনওটমাসেরছবিও। সৈন্যবাহিনীরতরফ থেকে ট্রাক উদ্ধার সম্পর্কিত খবরের জন্য এক হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।

পুলিসের তরফ থেকে ট্রাকের ড্রাইভার টমাসকে লুঠেরাদের একজন বলে সন্দেহ করেছে। আর এই সন্দেহের কারণ টমাসের নিরুদ্দেশ হওয়া।

একমনে কিটসন কাগজ পড়ছিলো আর বুকের ভেতর দ্রিমি দ্রিমি শব্দ হচ্ছে–হঠাৎ ফ্রেডব্র্যাড ফোর্ডের ডাকে তার চমক ভাঙলল। গতকাল এই ভদ্রলোকই তাকে চাকা পাল্টানোর কাজে সাহায্যে করতে চেয়েছিলো। সম্ভবতঃ সেও এসময়ে খবরেরকাগজেরজন্যেইহ্যাডফিল্ডেরঅফিসে এসেছে।

এই যে–মিঃ হ্যারিসন। কেমন লাগছে এখানে? সুন্দর জায়গা। তাই না? … তা খবরের কাগজ এর মধ্যেও পেয়ে গেছেন দেখছি?

হ্যাঁ, এইমাত্র পেলাম।

আপনি নিশ্চয়ই ট্রাক লুঠের খবরটা পড়ছিলেন? আজ সকালেই আমি রেডিওতে পুরো ঘটনাটা শুনলাম। ওরা সন্দেহ করছেট্রাকটাকে নিশ্চয়ই আশেপাশের কোনো জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তাই অনুসন্ধানী দল হেলিকপ্টারে করে সব রাস্তার ওপর নজর রাখছে কিন্তু কোথায় কি? ট্রাকের কোন পাত্তাই নেই।

হুঁ, বলে কিটসন কাগজগুলো ভাজ করে ফেললো।

কিন্তু মিঃ হ্যারিসন। এতগুলো চোখকে ফাঁকি দিয়ে কি করে ওরা ট্রাকটাকে লুকিয়ে রেখেছে? ড্রাইভার ব্যাটা নিশ্চয়ই ওদের লোক? আপনার কি মনে হয়?

হতে পারে।

 কিন্তু রক্ষীটার কি দশা হলো দেখুন তো! কিনাম যেন লোকটার? ..ওঃ, হাডার্কসন। …আমার মতে, ওয়েলিং কোম্পানীর তরফ থেকে ওর পরিবারকে নিয়মিত সাহায্য করা উচিত।

হ্যাডফিল্ড মাথা নাড়লো। উঁহু–ট্রাকটা এখানকার জঙ্গলে লুকিয়ে রাখার মতো বোকামি ওরা করবেনা। কারণ সময়ে অসময়ে, সবসময়েইওইজঙ্গলদিয়ে নোকজন চলাফেরাকরে। হয়তোএখান থেকে আরো ওপরে ফক্স উডেই লুকিয়ে রেখেছে। ঐ রাস্তায় লোকজনের চলাচল অনেক কম, আর বড় রাস্তা থেকে অনেক দূরেও জায়গাটা।

কিন্তু খবরদার। ভুলেও আমার ছেলেকে এসংবাদ দেবেন না, মশাই, শুনলেই সে হয়তো পাহাড় বেয়ে ফক্স উড পর্যন্তই ছুটবে, কি যে ভূত চেপেছে মাথায়…।

জিনি জিনিসপত্র ভর্তি একটা প্যাকেট নিয়ে মুদী দোকান থেকে এলো।

ব্র্যাডফোর্ড টুপি খুলে জিনিকে অভিবাদন জানিয়ে, সুপ্রভাত, মিসেস হ্যারিসন। পথে আর কোনো অসুবিধে হয় নি তো?

না। হাসলো জিনি। প্যাকেটটা কিটসনের হাতে দিয়ে তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, কিটসনের বাহু আঁকড়ে ধরলো। হ্রদে বেড়াবার জন্য নৌকো পাওয়া যাবে, মিঃ হ্যাডফিল্ড?

নিশ্চয়ই, কেন নয়। এই তো বেড়াবার সময়। একটু পরেই রোদের তাপ অসহ্য হয়ে উঠবে। আপনি তো জানেন কোথায় নৌকো ভাড়া পাওয়া যায়, সেখানে চলে যান, জো আপনাকে সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবে।

আচ্ছা, তাহলে আমরা চলি।

ব্র্যাডফোর্ড বললো, দরকার মনে করলেই চলে আসবেন, মিসেস হ্যারিসন। কুড়ি নম্বর কেবিনে আমরা আছি। আপনাদের ঘর থেকে বড় জোর সিকি মাইল দূরে হবে। আপনাদের দেখলে মিলি খুব খুশী হবে।

হ্যাডফিল্ড ব্র্যাডফোর্ডকে কনুইয়ের খোঁচা মেরে, আরে মশাই। আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো? কোথায় ওনারা এসেছেন মধুচন্দ্রিমা কাটাতে, আর আপনি বলছেন কিনা আপনার ঘরে গিয়ে সময় নষ্ট করতে?

জিনি হেসে কিটসনের হাত ধরে, কাঁধে মাথা রেখে এগিয়ে চললো।

ওদের দিকে একদৃষ্টে ব্র্যাডফোর্ড ও হ্যাডফিল্ড চেয়ে রইলো। না, জিনির মতো সুন্দরী স্ত্রী পেলে হ্যাডফিল্ড এই মুহূর্তেই কিটসনের সঙ্গে জায়গা বদল করতে রাজি।

জিনি ঘরে এসে রান্নাঘরে জিনিষপত্রের প্যাকেট নামিয়ে রাখলো। কিটসন অতি সন্তর্পণে বাইরে এসে ক্যারাভ্যানের পাশে দাঁড়ালো। কেউ তাকে লক্ষ্য করছেনা দেখে জানলায় আস্তে আস্তে টোকা মারলো।

ব্লেক ঘর্মাক্ত মুখে জানলা খুলে, কি চাই? ওঃ, ভেতরে যা গরম, তার ওপর হতচ্ছাড়া মাছিগুলোর জ্বালায় একটু স্থির হয়ে কাজ করার জো নেই! তা–কি চাই তোমার?

কাগজগুলো জানলা দিয়ে ভেতরে গুঁজে কিটসন বললো, তোমাদের জন্য খবরের কাগজ এনেছি। আর কিছু দরকার থাকলে বলল।

না, কিছু দরকার নেই। যাও, কাটো। বলেই ব্লেক সশব্দে জানলা বন্ধ করে দিলো।

সে দরজার কাছে ঘুরে দাঁড়ালো–কেবিন থেকে নিয়ে আসা একটা টুলে বসে জিপো কাজ করছে। ট্রাকের দরজায় কান পেতে সে ইপ্সিত শব্দের প্রতীক্ষা করছে।

অসহ্য গরম ক্যারাভ্যানের ভেতরে, ব্রেক বাধ্য হয়েই তার কোট, জামা সব খুলে ফেলেছে। তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে ক্যারাভ্যানের মেঝেতে বসে কাগজ পড়তে শুরু করলো।

প্রায় আধঘণ্টা পর কাগজ একপাশে ছুঁড়ে ফেলে উঠে ব্লেক জিপোর কাজ দেখতে লাগলো।

একাগ্র মনে চোখ বুজে জিপো পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে কান খাড়া করে শুনে চলেছে আর ঘুরিয়ে চলেছে কম্বিনেশন চাকতি।

বিরক্তিভরে ব্লেক বললো সেই তখন থেকেকি শুরু করেছে? তুমি কি মনে করেছ, টানা দশ ঘণ্টা ধরে শুধু এই করে যাবে?

জিপো চমকে রাগত কণ্ঠে, থামো। কানের কাছে এমনি বকবক করলে কি করে কাজ করবো বলতে পারো?

ব্লেক ঘাম মুছে, আমি আর এই বন্ধ ক্যারাভ্যানে থাকতে পারছি না। একটু হাওয়া না পেলে আমি মারা যাবো। আচ্ছা, এক কাজ করলে হয়না ? জানলার পর্দাটাকে ক্যারাভ্যানের গায়ে সেঁটে যদি আমরা জানলাটাকে খুলে দিই? তাহলে হাওয়াও আসবে, আর মাছিও ঢুকতে পারবে না।

যা করবার তুমিই কোরো। আমাকে দিয়ে যদি ট্রাকের তালা খোলাতে চাও, তাহলে আর বিরক্ত কোরো না।

আগুন ঝরা চোখে জিপোর দিকে তাকিয়ে ব্লেক যন্ত্রপাতি রাখার তাক থেকে একটা হাতুড়ি আর কিছু পেরেক বের করে পর্দাটাকে ক্যারাভ্যানের দেওয়ালে গেঁথে দিলো। হাত বাড়িয়ে জানলার পাল্লা খুললো।

অদূরে বিশাল হ্রদ, ব্লেক দেখলো জিনি ও কিটসন একটা নৌকোয় উঠছে। কিটসন বলিষ্ঠ হাতে নৌকা চালিয়ে চললো। ঈর্ষায় ব্রেক চাপা আক্রোশে ফেটে পড়লো। শালা, খুব ফুর্তি লুটছে। ওর জায়গায় আজ আমারই থাকা উচিত ছিলো। ঐ যে, শালা জিনিকে নিয়ে মৌজ করছে।

জিপো কর্কশ স্বরে, তুমি কি দয়া করে একটু চুপ করবে। এভাবে বিরক্ত করলে কাজ করবো। কিভাবে?

আচ্ছা, আচ্ছা বাবা–ঠিক আছে। ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ো না।

স্থির চোখে কম্বিনেশন চাকতিটার দিকে চেয়ে, জিপো ভাবলো এতক্ষণ ধরে পরিশ্রমই সার হয়েছে কম্বিনেশনের একটানম্বরও সে মেলাতে পারে নি। হয়তো এইভাবে দিনের পর দিন তাকে কম্বিনেশন চাকতি নিয়েই থাকতে হবে হয়তো কোনদিনই এই ট্রাকের তালা সে খুলতে পারবেনা।

নাঃ, এবারে একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার। হাতের আঙুলগুলোয় যেন খিল ধরে গেছে।

 জিপো জানালার সামনে এসে বাইরের বাতাসের স্পর্শ পেয়ে বুক ভরে শাস নিলো। বায়ু চলাচলের ফলে ক্যারাভ্যানের ভেতরটা স্বাভাবিক হয়েছে।

ব্লেক বললো, ঐ তালাটাকে অন্য কোনোভাবে খোলা যায় না?

ফ্র্যাঙ্ককে তো আমি আগেই বলেছিলাম। তালা খোলার কাজটা নেহাত সহজ হবেনা। হয়তো শেষ পর্যন্ত আমি নাও খুলতে পারি।

ব্রেক জিপোর চোখে চোখ রাখলো। তাই নাকি? তবে আমার মনে হয় তালাটা খুললেইতুমি ভালো করবে। জিপো আমার কথা, তালা তোমাকে খুলতেই হবে।

জিপো যেন কুঁকড়ে গেলো, বিড়বিড় করে, আমি তো আর ম্যাজিক জানিনা! হয়তো এ তালা পৃথিবীর কারো পক্ষেই খোলা সম্ভব নয়।

ব্রেক হিংস্র স্বরে বললো, অন্ততঃ এই একটা ক্ষেত্রে তোমাকে ম্যাজিক দেখাতেই হবে। যাও, কাজ শুরু করো। যত বেশি সময় কাজ করবে ততো তাড়াতাড়ি তালাটা খুলবে।

জিপো আবার গিয়ে ট্রাকের দরজার গায়ে কান চেপে ধরলো। তারপর সেই আগের মতো আবার কম্বিনেশন চাকতি ঘোরাতে লাগলো।

জিপো সন্ধ্যের আগেই ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লো। তালা খোলার আর কোনো চেষ্টাই করলোনা।

জিপোর উদভ্রান্ত অবস্থা দেখে ব্লেক চুপচাপ ভেতরে ভেতরে কেশ শঙ্কিত হয়ে পড়লো।

জিপো এই গরমে একটানা বারো ঘণ্টা কাজ করেছে। মাঝখানে শুধু এক ঘন্টা বিশ্রাম পেয়েছে। এখন পর্যন্ত সে কেবল একটি মাত্ৰ নম্বর মেলাতে সক্ষম হয়েছে। তার অনুমান আরও পাঁচটা নম্বর তাকে খুঁজে বের করতে হবে। তবু ভাল যে তার বারো ঘন্টা পরিশ্রম একেবারে বৃথা যায় নি। হয়তো আগামীকালই আরো দুটো নম্বর জিপো খুঁজে পাবে। হয়তো এ সপ্তাহেই ট্রাকের তালা খুলে যাবে।

একটু অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই কিটন ক্যারাভ্যানের দরজা খুলে দিলো। ওরা ক্ষিপ্রগতিতে কেবিনের ভেতরে ঢুকে পড়লো।

ওদের খাবারের ব্যবস্থা জিনি করেই রেখেছিলো, ওরা খেতে শুরু করলো গোগ্রাসে। ব্লেক মাঝে মাঝে কিটসনের দিকে গভীরভাবে দেখছিলো। সারাদিনের উত্তাপে কিটসনের মুখ তামাটে। তারমানে জিনিকে নিয়ে ও সারাটা দিন বাইরে কাটিয়েছে। ব্লেকের মনে ঈর্ষা ও ক্রোধে ভরে গেলো।

একমনে খেয়ে চললো জিপো। খাওয়ার শেষে ওর ক্লান্তি ও হতাশার ছাপ মিলিয়ে আবার সুস্থ ও সতেজ হয়ে উঠলো।

ব্রেক খাওয়া শেষ করে একটা আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিলো। একটা সিগারেট ধরিয়ে বললো তিনজনকে, শোনো, আজ সামান্য কাজ এগোনো গেছে। জিপো একটা কম্বিনেশন নম্বর মেলাতে পেরেছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এখন থেকে রাতেও ক্যারাভ্যানে পাহারায় থাকা দরকার। কেউ হয়তো অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে ক্যারাভ্যানের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দরজা খোলার চেষ্টাকরতে পারে, সেটা আমি চাই না। কিটসন, এই রাতে পাহারা দেবার দায়িত্বটা তোমাকেই নিতে হবে। তোমার সারাদিনে কোনো কাজই থাকে না, সুতরাং রাতে এই সামান্য কষ্টটুকু তুমি সইতে পারবে।

কিটসন উপলব্ধি করলো, ব্লেকের কথায় যুক্তি আছে। রাতে কোনো চোর–ছ্যাচোড়ের মাথায় ক্যারাভ্যান লুঠ করার মতলব গজিয়ে ওঠাটা স্বাভাবিক।

কিটসন উঠে দাঁড়ালো। ঠিক আছে। আমি তাহলে ক্যারাভ্যানেই যাচ্ছি।

ব্লেক ভীষণ অবাক হলো, প্রস্থানরত কিটসনের দিকে চেয়ে রইলো। কিটসন বাইরে বেরিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। আজ সকালটা তার ভালোই কেটেছে। বাইরের লোকের সামনে অভিনয় হলেও সে জিনিকে অন্তরঙ্গভাবে কাছে পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত তার মনে ক্ষীণ আশাও জন্মেছে জিনি কি তাকে ভালবাসতে শুরু করেছে?

কিন্তু একেক সময় জিনির চোখে চেয়ে তার মনে হয়েছে এর সবটাই বুঝি অভিনয়–তার বেশি কিছুনয়। কিন্তু কিটসন তবু হাল ছাড়েনি। তার এখন একমাত্র নেশা জিনি গর্ডন।

জিনির দিকে তাকিয়ে ব্লেক বললো, আজ আমি আর জিপো বিছানায় শোবো, তুমি সোফায় শোবে। সারাদিন আমরা কম পরিশ্রম করি নি। সুতরাং আমাদের বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। তোমার তাতে আপত্তি না কি?

জিনি নির্লিপ্তভাবে, না–আপত্তি থাকবে কেন?

ব্রেক অচঞ্চল চোখে চেয়ে, অবশ্য জিপো যদি সোফায় শুতে চায়, তবে,

ধন্যবাদ–তার কোনো প্রয়োজন হবেনা। আমি সোফাতেই শুতে পারবো। ব্লেকের ইঙ্গিত বুঝতে জিনির অসুবিধে হয় নি।

ব্লেক হেসে ঘরের তাকে রাখা এক প্যাকেট তাসনামিয়ে ভাঁজতে শুরু করলো। তোমারযাইচ্ছে। কি, এক হাত তাস হবেনাকি?

না, আমি এখন একটু বাইরে হাঁটতে যাবো। কিন্তু ফিরে এসে যেন ঘরটা খালি পাই।

ব্লেক তখনও হাসছে। নিশ্চয়ই খালি পাবে। এই, জিপো, চলো আমরা শোবার ঘরে গিয়ে তাস খেলি। বিছানায় বসেই তাস পাতা যাবে।

জিপো শোবার ঘরে চলে গেলো।

যাক, তোমার ঘর তাহলে খালি করে দিলাম, জিনি। কিন্তু আলেক্সের সঙ্গে দিন কিরকমকাটলো। শেষ পর্যন্ত কি ওর গলায় ঝুলেই পড়লে নাকি?

জিনি শান্তস্বরে পাল্টা প্রশ্ন করলো, আমার সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কের কি সেই কথাই ছিলো?

না, তা নয়। কিন্তু বলা তো যায় না। তোমার কোমল হৃদয়ের মধ্যে কখন কি ঘটে যায়। অবশ্য কিটসনকে পছন্দ করার মেয়ে আমেরিকায় খুব কমই আছে। তবে সে যে তোমাকে মন প্রাণ সঁপে দিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

সদর দরজার দিকে জিনি এগোলো।

ব্লেক বললো, আমরা দুজনে জুটি বাঁধলে কেমন হয়। সুন্দরী? ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখলে হয় না?

তোমার মাথার ঠিক নেই। বলেই জিনি বাইরের অন্ধকারে বেরিয়ে গেলো। সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেলো।

ব্লেকের মনে হলো এখুনি জিনির পেছনে ছুটে যায়। তার সঙ্গে এরকম ভাবে কথা বলার পরিণতি যে ভালো নয়, সেটা ওকে সমঝে দেয়–কিন্তু তাহলে কিটসন ক্যারাভ্যান থেকে বেরিয়ে আসবে।

সুতরাং ব্লেক নিজেকে সংযত করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে শোবার ঘরে এলো।

 বিছানায় জিপো বসেছিলো। তার মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে অস্বস্তি বোধ করছে।

ব্লেককে দেখেই সে বললো, এড, তুমি মেয়েটাকে ছেড়ে দাও। একেই আমাদের হাতে সমস্যার অন্ত নেই, তার ওপর মেয়ের ঝামেলা।

ওঃ, থামো দেখি, বলে বিছানায় বসে তাস বাঁটতে লাগলো।

 জিনির ফিরে আসার শব্দ পেলো রাত এগারোটা নাগাদ। কলঘরে জল পড়ার শব্দ—সম্ভবতঃ জিনি স্নান করছে।

ব্লেক তাসগুলো প্যাকেটে ভরে ফেললো, এসো জিপো, এবার শোয়া যাক। কাল অন্ধকার থাকতে থাকতেই আমরা ক্যারাভ্যানে ঢুকবো।

আলো নিভিয়ে দিতেই ক্লান্ত জিপো নাক ডাকতে শুরু করলো।

ব্লেক অন্ধকারে চোখ মেলে কান খাড়া করে জিনির নড়াচড়ার শব্দ শুনছে। মিনিট কয়েক পরেই  বসবার ঘর থেকে আলো নেভানোর শব্দ পেলো।

নারী সংক্রান্ত ব্যাপারে সরাসরি পদ্ধতিতেই ব্লেকের বিশ্বাস। তার মতে ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা সময়ের অপব্যবহারের নামান্তর। সুতরাং

সুতরাং গায়ের চাদর ছুঁড়ে ফেলে ব্লেক উঠে বসলো। নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে গেলো। অতি সন্তর্পণেদরজা খুলে বসবার ঘরে গিয়ে ব্লেক আস্তে আস্তে শোবার ঘরের দরজাবন্ধ করে দিলো।

সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের আলো জ্বলে উঠলো। জিনি সোফায় উঠে বসলো। ওর পরনের ফিকে নীল রাত্রিবাস ব্লেকের কামনাকে আরো দুর্দম করে তুললো। সে একগাল হেসে সোফার কাছে গিয়ে, ভাবলাম, তোমার সঙ্গে একটু গল্প গুজব করে, আসি। দেখি–সরে বসো একটু।

জিনি স্থিরভাবে বসে চাপা স্বরে আদেশ করলো বেরিয়ে যাও।

ওহ–হো–তুমি দেখছি এখনো আমার ওপর রেগে আছো? কিন্তু জানো তোমার জন্যে আমি কতো কি ভেবে রেখেছি? লক্ষ্মীটি জিনি, একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখো– নিজেদের ভাগের টাকা পেয়ে গেলে আমরা দেশ–বিদেশে ঘুরবো। তোমাকে প্যারিসে, লন্ডনে নিয়ে যাবো। তুমি কি আমার সঙ্গীহতে রাজি নও?

জিনি আবার বললো, আমি তোমাকে বেরিয়ে যেতে বলেছি।

না, তেমন করে না বললে তুমি শুনবে না দেখছি–ব্লেক জিনিকে জড়িয়ে ধরে কাছে টানতেই অনুভব করলো, তার বুকে কোনো ধাতব বস্তুর কঠিন পরশ।

পলকের মধ্যেই জিনি তার বুকে একটা ৩৮ চেপে ধরেছে। 

জিনি ইস্পাত শীতল স্বরে আদেশ করলো, আস্তে আস্তে তোমার হাত সরিয়ে নাও খুব ধীরে ধীরে হাত সরাবে নয়তো একেবারে ঝাঁঝরা করে দেবো।

 ব্লেক অতি ধীরে জিনির শরীর থেকে হাত সরিয়ে নিলো। আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে কাঠ। কেন যেন তার মনে হলো জিনি সত্যি সত্যি তাকে নৃশংসভাবে খুন করতে পারে। ব্লেক মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাত তুললো। চোখের দৃষ্টি ৩৮–এর নলের ওপর।

এবার উঠে দাঁড়াও। আস্তে আস্তে হাত দুটো মাথা থেকে নামাবে না।

ব্লেক পায়ে পায়ে পেছোতে লাগলো।

জিনি রিভলবারটা ব্লেকের বুক লক্ষ্য করে ধরে। বেরোও ঘর থেকে। যদি দ্বিতীয় দিন এরকম সুযোগ নেবার চেষ্টা করো তাহলে তোমাকে কুকুরের মতো গুলি করে মারবো। এবার নিজের ঘরে কেটে পড়ো, দরজার বাইরে আর এসো না।

আচ্ছা, সুন্দরী। তোমাকে আমি দেখে নেবো। এখন থেকে সাবধানে থেকো। এডওয়ার্ড ব্লেক কখনো অপমানের বদলা নিতে ছাড়ে না।

জিনি ব্যঙ্গসুরে বললো, থাক, থাক–অনেক হয়েছে। এখন রাস্তা দেখুন, শ্রী যুক্ত বাবু। এরপর থেকে প্রস্তুত হয়ে অভিসারে আসবেন।

ব্লেক শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। রাগে অপমানে তার সর্বশরীর কাঁপছে।

জিনি যদি ভেবে থাকে যে ওর ভাগের দু-লাখ ডলার ওকে দেওয়া হবে, তাহলে ভীষণ ভুল করবে। জিনিকে সে উচিত শিক্ষা দেবে। তাকে বন্দুক দেখানোর যে কি ভয়ঙ্কর পরিণাম সেটা সে হাড়ে হাড়ে সমঝে দেবে।

ব্লেক কিটসনকেও ছাড়বে না। জিনি আর কিটসনকে সে এমন দাওয়াই দেবে যা ওরা জীবনে ভুলবেনা।

দশ লাখ ডলার যখন হাতে আসবে, তখন সে কিটসনকে গুলি করে শেষ করবে। আর জিনি? জিনির জন্য তার অন্য মতলব আছে।

অন্ধকারের মধ্যে ব্লেক হিংস্রভাবে হেসে উঠলো।

আড়াই লাখ ডলারের চেয়ে সাড়ে সাত লাখ ডলারের আবেদন যে কোনো মানুষেরকাছেই অনেক বেশি, ব্লেকের কাছে তো গোটা সাম্রাজ্য।

ব্লেক শুয়ে শুয়ে ভাবলো টাকাটা নিয়ে সে কিভাবে খরচ করবে।

একসময় আরো একটা অদ্ভুত চিন্তা ব্লেকের মাথায় এলো। জিপোকেও যদি সে সরিয়ে দেয়, তাহলে কেমন হয়? তখন পুরো টাকাটাই সে একা ভোগ করবে।

দশ লাখ সাড়ে সাত লাখের চেয়েও অনেক বেশি। ফ্র্যাঙ্ক বলেছিলো, পৃথিবীকে সে হাতের মুঠোয় রাখবে।

হু দশ লাখ ডলার থাকলে এই পৃথিবীটাকে সে এক হাটে কিনে আরেক হাটে বেচতে পারবে। সে সহজেই হতে পারে এই পৃথিবীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট।