সোম-শাস্ত্ৰ – ৫

৫.

নিজের কক্ষে পদচালনা করছেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত। মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

একটি আসনে বসে আছে জীবসিদ্ধি। জীবসিদ্ধি লক্ষ করছে চন্দ্রগুপ্তকে। চন্দ্রগুপ্ত দুশ্চিন্তায় থাকলেই এভাবে পদচালনা করেন। একই জায়গায় বার বার গোলাকারে হেঁটে বেড়ান। এটা আগেও একাধিকবার লক্ষ করেছে জীবসিদ্ধি।

— ব্যাপারটা কে কে জানে?

চন্দ্রগুপ্ত প্রশ্ন করতেই, নিজের ঠোঁটে হাত দিয়ে তাকে চুপ করতে ইঙ্গিত করল জীবসিদ্ধি। নিজের আসন ছেড়ে প্রথমেই উঠে গিয়ে কক্ষের দ্বার বন্ধ করল। অতীতে বহু বছর আচার্য চাণক্যর জন্যে গুপ্তচরবৃত্তি করার ফলে জীবসিদ্ধির মধ্যে এক সহজাত সতর্কতার ভাব তার চারিত্রিক বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাইরে দু-জন রাজপ্রহরী মোতায়েন আছে এমনিতেই। কারুর পক্ষেই তাদের বার্তালাপ বাইরে থেকে শুনতে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবুও দ্বাররুদ্ধ না করে কথা শুরু করতে জীবসিদ্ধির আপত্তি।

নিজের আসনে ফিরে এসে বলল,

— আপাতত গোপন রাখা হয়েছে অন্যান্য অতিথিদের থেকে। আমি, মহামাত্য কৃষ্ণনাথ এবং আমাদের কয়েক জন রক্ষী জানে। আর জানে ধনানন্দ এবং রাক্ষস। তাদের জানাতে বাধ্য হয়েছি রাজকুমারীর অনুরোধে। এ ছাড়া কয়েক জন বিশ্বস্ত রাজরক্ষী জানে। উপায়ও নেই তাদের না জানিয়ে।

— তারা অন্য কাউকে জানাবে না এমন ভাবার কারণ কী?

— এই দু-জনের সঙ্গে সর্বক্ষণ একজন করে বিশ্বস্ত রাজরক্ষীকে থাকতে নির্দেশ দিয়েছি। রক্ষীর সামনে কথা বলতে পারবে না কেউই।

— আর অন্য রক্ষীরা?

— তাদের এই মহলে প্রহরায় থাকতে বলেছি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত। এর ফলে তারা অতিথিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবে না।

— বেশ। আর?

— রাজকুমারীর দ্বিতীয় সখী নিরুদ্দেশ এখনও। তবে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করতে পারেনি আমি নিশ্চিত। সে এখানেই কোথাও আছে। বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারবে না। রাজার আদেশে প্রধান দ্বার আমি রুদ্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছি। কোনো অবস্থায় যেন কাউকে প্রবেশ করতে বা বাহিরে যেতে না দেওয়া হয়। শুধু একজন ব্যতীত। তিনি এলে যেন তৎক্ষণাৎ তাকে এই দক্ষিণ মহলে আনা হয়।

চলা থামিয়ে জীবসিদ্ধির দিকে চেয়ে চন্দ্রগুপ্ত প্রশ্ন করলেন,

— তা ‘তিনি’ কখন আসছেন?

— একজন সৈনিক দ্বারা সংবাদ পাঠিয়েছি আচার্যর কাছে। চলে আসবেন আশা করছি কিছুক্ষণের মধ্যেই।

পুনরায় পদচালনা শুরু করলেন চন্দ্রগুপ্ত।

জীবসিদ্ধি নিজের আসনে বসেই কক্ষের সজ্জা দেখতে শুরু করল। সে একজন উত্তম পর্যবেক্ষক। আচার্যর সমান না হলেও, অন্যদের থেকে তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বেশি নিঃসন্দেহে।

মখমলের ভারী রক্তিম পর্দা ঝুলছে বাতায়নের দু-ধারে ও দ্বারে। ছাদ থেকে মস্ত ঝাড়বাতি। এর সঙ্গে আজকের বিশেষ অবসরে ছাদে ও দেয়ালে পুষ্পমালা দিয়ে সাজানো হয়েছে। আসবাব সাজানো। একমাত্র সম্রাটের নিজের আসনটি নির্দিষ্ট স্থানে নেই, কারণ তাতে সম্রাট খানিক পূর্বেই উপবিষ্ট ছিলেন। আর একটি ত্রিপায়া মেজের উপর চন্দ্রগুপ্তর অর্ধভুক্ত খাদ্যের কিছু অংশ রয়ে গিয়েছে।

সম্রাটের আহারের মাঝেই মধুবন নামক যুবতীর হত্যা সংবাদ নিয়ে প্রবেশ করেছিল জীবসিদ্ধি। হত্যাকারীর আসল নিশানা যে রাজকুমারী দুর্ধরা, তা বলাই বাহুল্য। অতএব, আহার সমাপ্ত না করেই চন্দ্রগুপ্ত আসন ত্যাগ করেছেন।

চিন্তায় ছেদ পড়ল বাহিরে রক্ষীর ভারী কণ্ঠস্বরের ঘোষণায়,

— মহামতি চাণক্য দ্বারে উপস্থিত হয়েছেন।

জীবসিদ্ধি দ্রুত উঠে গিয়ে দ্বার খুলে দিল।

কক্ষে প্রবেশ করলেন বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য। মুণ্ডিত মস্তকে দীর্ঘ কেশশিখা বিশিষ্ট সন্ন্যাসীর বেশ তাঁর। অঙ্গবস্ত্রের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতে থাকা উপবীত-সূত্র তাঁর ব্রাহ্মণকুলের পরিচয় দেয়। বিস্তৃত ললাটে ত্রিপুণ্ড টিকা কাঁধে তাঁদের অতিপরিচিত কাপড়ের ঝোলা। দত্তসারি অনিয়মিত হওয়ায় এই কৃষ্ণবর্ণ, মধ্যম উচ্চতার ব্যক্তির মুখের গঠনে এক ধরনের কুরূপতা প্রকাশ পায়। কিন্তু তাঁর অত্যধিক উজ্জ্বল দুটি চোখে তাঁর অন্য সমস্ত শারীরিক বৈশিষ্ট্যহীনতাকে ছাপিয়ে যায়। সেই দু-চোখের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি যেন সম্মুখ ব্যক্তির হৃদয়ের গহিন কোণের সমস্ত গোপন রহস্য প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম।

চাণক্য প্রবেশ করতেই সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত ও জীবসিদ্ধি তাঁর পদ স্পর্শ করে প্রণাম করল। তাদের মস্তকে হাত রেখে ব্রাহ্মণ বললেন,

— সদা সুমতি ভবঃ।

জীবসিদ্ধি একটি আসন এগিয়ে দিতে চাণক্য তা গ্রহণ করলেন। জীবসিদ্ধি দ্বার রুদ্ধ করে পুনরায় এসে বসল নিজের স্থানে।

চন্দ্রগুপ্ত এবং জীবসিদ্ধির মুখের পানে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন চাণক্য। চন্দ্রগুপ্ত তাঁর চোখে চোখ রাখছেন না। নিজের বিবাহ নিয়ে তিনি গুরুর উপর ক্ষুণ্ণ। চাণক্য নিজেও তা জানেন। অতএব জীবসিদ্ধির উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন,

— হুম। কী ঘটেছে?

— হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, আচার্য!

— সম্রাটকে?

— আজ্ঞে না। রাজকুমারী দুর্ধরার পানীয়ে কেউ মারণ বিষ মিশ্রিত করে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে!

— সেকী? সে ঠিক আছে তো?

এই প্রথমবার কণ্ঠে ঔৎসুক্য প্রকাশ পেল চাণক্যর।

— হ্যাঁ, রাজকুমারী ঠিক আছেন। ভাগ্যক্রমে সেই পানীয় তিনি পান করেননি। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন চাণক্য। জীবসিদ্ধি বলল,

— কিন্তু সেই বিষ তাঁর এক সখীর প্রাণ নিয়েছে, আচার্য! এবং, তাঁর দ্বিতীয় সখী নিরুদ্দেশ। সন্দেহ করা হচ্ছে সে-ই এই হত্যার সঙ্গে যুক্ত।

চাণক্য হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

— ওহে, জীবসিদ্ধি। শুরু থেকে বলো পুরো ঘটনা।

.

জীবসিদ্ধি আজ সকাল থেকে ঘটা সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করল আচার্যকে। অন্তত সে যেটুকু জানতে পেরেছে, সেটুকু। পুরো সময়টা চন্দ্ৰগুপ্ত একটিও কথা না বলে শ্বেতপাথরের মেঝের দিকে চেয়ে থাকলেন। এটা তার গুরুর প্রতি তার অসন্তোষ প্রকাশের একটি পদ্ধতি। যদিও চাণক্য সব জেনেশুনেও তাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করলেন। তাতে চন্দ্রগুপ্তর অসন্তোষের মাত্রা আরও কিছুটা বৃদ্ধি পেল।

সব শুনে চাণক্য কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন,

— ধনানন্দর কী বক্তব্য এই বিষয়ে?

জীবসিদ্ধি উত্তর দিল,

স্বাভাবিকভাবেই সে কন্যার সুরক্ষার কথা ভেবে বিবাহ স্থগিত রাখতে চাইছে। অমাত্য রাক্ষসও তাই বলেছেন। আমি তাদের কোনোভাবে থামিয়েছি। অন্য অতিথিদের কাছে এই সংবাদ প্রকাশ করা হয়নি এখনও।

খানিক থেমে জীবসিদ্ধি বলল,

— কিন্তু গুরুদেব, তাদের দাবি অগ্রাহ্য করা যায় না। এই রাজমহলে, এক হত্যাকারী ঘুরছে। হত্যাকারী ধরা না পড়লে ধনানন্দকে বেশিক্ষণ আমরা আটকে রাখতে পারব না। তা ছাড়া রাজকুমারীও বাল্যসখীর মৃত্যুতে শোকাহত। তিনিও এই অবস্থায় বিবাহে রাজি হবেন বলে মনে হয় না।

চাণক্য প্রশ্ন করলেন,

— বিবাহলগ্ন কোন সময়ে?

— রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের শুরুতে।

— এখন দিনের শেষ প্রহর শুরু হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, আমাদের হাতে সময় দুই প্রহরেরও কম। তার পূর্বেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। অন্যথায় এই বিবাহ সম্ভব হবে না।

এইবার আর থাকতে না পেরে চন্দ্রগুপ্ত বললেন,

— এই বিবাহ সম্পন্ন করা কি এতটাই প্রয়োজনীয়?

— হুম। এই বিবাহের প্রয়োজনীয়তা যদি আপনি এখনও নিজে থেকে উপলব্ধি করতে সক্ষম না হয়ে থাকেন, তবে আর আমার বুঝিয়ে বলেও কোনো ফল হবে না। আর তা ছাড়া, এই বিবাহ এই ক্ষণে এসে সম্পন্ন না হলে মৌর্যদের সম্মান শেষমাত্র অবশিষ্ট থাকবে না। যে সম্রাট তার হবু স্ত্রীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, তার উপর অন্যান্য প্রজা ও করদাতা জনপদের রাজারাও ভরসা রাখবে না।

পুরো কথা চাণক্য চন্দ্রগুপ্তর দিকে না তাকিয়েই বললেন। তাঁর দৃষ্টি চলে গিয়েছে সম্রাটের অর্ধভুক্ত আহারের দিকে। কিছুক্ষণ কিছু ভাবলেন চাণক্য। বললেন,

— ওহে, জীবসিদ্ধি।

— বলুন, আচার্য।

একপাশে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে জীবসিদ্ধিকে কিছু বললেন আচার্য। সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল জীবসিদ্ধি।

তখনই বাইরের প্রহরী ঘোষণা করল মহামাত্য কৃষ্ণনাথ এসেছেন।

কথা শেষ করে দ্বারের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে চাণক্য প্রশ্ন করলেন,

— কৃষ্ণনাথ মহাশয় বিষয়টি জানেন?

— এক প্রহরীকে পাঠিয়েছিলাম তাঁকে ঘটনাটা জানাতে। সম্ভবত সেই শুনেই তিনি উপস্থিত হয়েছেন এখানে।

চাণক্য দ্বার খুলে দিতেই প্রবেশ করলেন কৃষ্ণনাথ। তাঁকে দেখে জীবসিদ্ধির মনে হল যেন সকালের থেকেও পাঁচ বছর বয়স বেড়ে গেছে বৃদ্ধের। চোখ কোটরাগত হয়ে গিয়েছে তাঁর। অসহায় কণ্ঠে চাণক্যকে বললেন,

— আচার্য! আচার্য! এ দায়িত্ব থেকে আমায় মুক্তি দিন! দয়া করুন! আপনি প্রধানমন্ত্রী পদ ত্যাগ করার পর আপনারই অনুরোধে আমি এই পদ গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু এই গুরুদায়িত্ব আমার পক্ষে যে আর সামলানো সম্ভব হচ্ছে না। ভাবতে পারেন, হত্যা! এই রাজপ্রাসাদে, আজকের দিনে, হবু মহারানিকে হত্যার প্রচেষ্টা! কী অনর্থ! কী অনৰ্থ!

বৃদ্ধর দু-কাঁধে হাত রাখলেন চাণক্য। বললেন,

— আপদকালে ভেঙে পড়ার মানুষ তো আপনি নন, আর্য। এখনই তো আমাদের মস্তিষ্ক শীতল রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ ভাবার আদর্শ সময়। পূর্বে এর চেয়েও গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন আমরা হয়েছি, মহামাত্য মহাশয়। তাই নয় কি? এক বর্ষ পূর্বে যখন সারাদেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিল, তখনও আপনি পাশে ছিলেন আমাদের।

জীবসিদ্ধি মনে মনে ভাবল, হ্যাঁ এবং সেই ধাক্কা সামলাতে গিয়েই বৃদ্ধ প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য আরও ভেঙে পড়েছে।

কিছুটা শান্ত হয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালেন মহামাত্য কৃষ্ণনাথ। চাণক্য আবার বললেন,

— আমায় সাহায্য করুন, আর্য কৃষ্ণনাথ। কথা দিচ্ছি এই গুরুদায়িত্ব থেকে আপনাকে আমি মুক্তি দেব। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত, মনে রাখবেন এই মুহূর্তে আপনি মগধের মহামাত্য। এবং, মগধের অন্দরমহলে আঘাত করা হয়েছে।

— বেশ! বলুন মহামতি, আমায় কী করতে হবে?

— রাজকুমারীর বিষ মিশ্রিত পানীয়র পাত্র ও আহার ইতিমধ্যে পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছে বলে জীবসিদ্ধি জানিয়েছে। এইবার সেইসঙ্গে সম্রাটের ওই অর্ধভুক্ত আহারও পরীক্ষা করতে হবে।

কৃষ্ণনাথের মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল। অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,

— কিন্তু কেন, আচার্য? সম্রাটের শরীরে কি বিষক্রিয়া দেখা দিয়েছে?

— না।

— তবে? আহার এবং পানীয় তো সম্রাট গ্রহণ করেছেন ইতিমধ্যে। তবে কেন তা পরীক্ষা করব? তা ছাড়া আপনারই নির্দেশে সম্রাটের খাদ্য কোনো খাদ্যপরীক্ষক পরীক্ষা করে না তাঁর আহার গ্রহণের পূর্বে।

— আপনাকে সব বুঝিয়ে বলতে সময় লাগবে। তবে আপাতত এই কথা কাউকে বলার প্রয়োজন নেই যে, সম্রাট আহার গ্রহণ করেছেন ইতিমধ্যে। আপনি গিয়ে অমাত্য কাত্যায়নকে নিয়ে আসুন। জীবসিদ্ধি ততক্ষণে এই আহার আর পানীয় নিয়ে আপনার অপেক্ষা করবে পরীক্ষা গৃহের সামনে। আমি চাই এই পানীয় এবং আহার, ধনানন্দদের বিশ্বাসযোগ্য কোনো মানুষের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করা হোক। তাই কাত্যায়নকে সঙ্গে যেতে অনুরোধ করুন।

বিস্ময়ের ভাব পুরোপুরি কাটল না অমাত্য কৃষ্ণনাথের মুখের ভাব থেকে। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকলেন। বেরিয়ে গেলেন রাক্ষসের উদ্দেশে।

জীবসিদ্ধিকে ইশারা করতে সেও স্বর্ণ থালা ও পানীয় নিয়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। তারা বেরিয়ে যেতে চন্দ্রগুপ্ত চাণক্যকে প্রশ্ন করল,

— আপনি সন্দেহ করছেন আমার আহার বা পানীয়তেও বিষ ছিল?

মৃদু হেসে চাণক্য বললেন,

— থাকলেও যে তোমার শরীরে তা প্রভাব ফেলবে না, তা তুমি ভালোই জানো।

কথাটা মিথ্যে নয়। এই গোপন তথ্যটি মুষ্টিমেয় কয়েক জন মাত্র জানে। বাল্যকাল থেকেই চন্দ্রগুপ্তর আহারে নির্দিষ্ট মাত্রায় বিষ মিশিয়ে তাকে নিয়মিত খাইয়ে গিয়েছেন চাণক্য। চন্দ্রগুপ্তর বয়সের সঙ্গে সঙ্গেই সেই বিষের মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আজও তার আহারে বিষ মেশানো হয়ে থাকে চাণক্যর নির্দেশে। যে কারণে সম্রাটের আহার কোনো খাদ্য পরীক্ষকের গ্রহণ না করার কড়া নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন চাণক্য। বিষের মাত্রা এখন এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, সেই আহার গ্রহণ করলে যেকোনো সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটবে।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বিষ গ্রহণের ফলে চন্দ্রগুপ্তর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে, যেকোনো বিষই তার ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকী বিষধর সর্পের দংশনেও তার মৃত্যু হবে না। কারণ চন্দ্রগুপ্তর শরীরে বিষের প্রভাব পড়ে না।

চাণক্য বহু বর্ষ পূর্বেই জানতেন যে, ভবিষ্যতে চন্দ্রগুপ্ত এই আর্যাবর্তর সম্রাটের সিংহাসনে বসলে, তাকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা শত্রুরা করবেই। এবং, গুপ্তহত্যার সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতিটি হল বিষপ্রয়োগ। শুধু খাদ্যে নয়, অস্ত্রের ধারালো অংশ বিষাক্ত করে, অথবা বিষধর নাগ ব্যবহার করেও হত্যা করার উদাহরণ আছে। চন্দ্রগুপ্তকে এই সকল সম্ভাবনা থেকে সুরক্ষিত করতে চেয়েছিলেন চাণক্য। যে কারণে, আজকে তার খাদ্যে বা পানীয়ে বিষ থাকলেও তার প্রভাব চন্দ্রগুপ্ত বুঝতে পারবে না। এই গোপন তথ্য স্বয়ং মহামাত্য কৃষ্ণনাথেরও অজানা।

চন্দ্রগুপ্ত প্রশ্ন করলেন,

— তাহলে এবার কি করণীয়, আচার্য?

— হুম। আপাতত তুমি নিজের বিবাহের প্রস্তুতি নাও। এবং, আমার জন্যে কিছু মধুদ্রব্য আনতে নির্দেশ দাও কাউকে। জানোই তো, ও ছাড়া আমার মস্তিষ্ক সচল হয় না।

গুরুদেবের এই অত্যধিক মধু প্রীতি তার অজানা নয়। বলল,

— সে-ব্যবস্থা করছি। কিন্তু আপনি জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবেন আশা করি?

— হুম। রাজকুমারীরা সম্ভবত দক্ষিণ মহলে উঠেছেন। অতএব সেখানকার একটি কক্ষেই ব্যবস্থা কোরো। সেখানেই আমি যাই। সময় যে বড়োই কম আমার হাতে।

— বেশ। তাই হবে। প্রথমেই কাকে দিয়ে শুরু করতে চান?

— অবশ্যই পুরো ঘটনার যিনি মূল লক্ষ্য। রাজকুমারী দুর্ধরা!

৬.

রাজকুমারী দুর্ধরার কক্ষেই মৃতদেহ রাখা রয়েছে এখনও। চাণক্য প্রথমে সেই কক্ষে এসে মৃতদেহ দেখলেন কাছে গিয়ে। আঙুলের নখ ও ঠোঁট নীলাভ। বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর চিহ্ন স্পষ্ট মৃতদেহে।

কক্ষের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন চাণক্য। শয্যার কাছে মেজটি রাখা। তাতে এখন অবশ্য কিছু নেই। কারণ বাকি খাদ্য পরীক্ষা করতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে।

চাণক্য বললেন,

— ভোজনের থালা রাখা মেজটি বোধ হয় ওইদিকে রাখা ছিল। তাই ওটা টেনে শয্যার কাছে আনার সময় খানিকটা পানীয় চলকে মেঝেতে পড়েছে দেখেছি। হুম।

কথাটা স্বগতোক্তি করলেন চাণক্য। কারণ তিনি জানেন যে, তাঁর এই কথাটা প্রতিপাদন করার মতো কেউ এই মুহূর্তে কক্ষে নেই।

কক্ষে মাত্র দু-জন সৈনিক মৃতদেহের পাহারা দিচ্ছে। রাজকুমারীকে অন্য একটি কক্ষে স্থানান্তরিত করা হয়েছে স্বাভাবিকভাবেই।

কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন চাণক্য। এক সৈনিক তাঁকে রাজকুমারী দুর্ধরার বর্তমান কক্ষের দ্বার অবধি পথ দেখিয়ে নিয়ে এল। দ্বাররক্ষী চাণক্যর আগমন ঘোষণা করতে ভিতর থেকে রাজকুমারীর কণ্ঠে দ্বার খুলে দেওয়ার আদেশ ভেসে এল।

শয্যার উপর বসে আছেন রাজকুমারী দুর্ধরা। চোখে এখনও আর্দ্রতা থাকলেও মুখে তাঁর দৃঢ়তা ফুটে উঠেছে। চাণক্য তাঁকে শক্ত থাকতে দেখে মনে মনে প্রশংসা করলেন।

দু-হাত জোড় করে প্রণাম সেরে চাণক্যকে একটি আসনের দিকে ইঙ্গিত করলেন দুর্ধরা। আসন গ্রহণ করে চাণক্য বললেন,

— আপনাকে এই অসুখকর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত, রাজকুমারী।

— এর চেয়েও অসুখকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমায় কয়েক বর্ষ পূর্বেই যেতে হয়েছে, আচার্য। সে নিয়ে আপনাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।

কথার মধ্যে চাণক্যর প্রতি শ্লেষ গোপন করার কোনো প্রচেষ্টা করলেন না দুর্ধরা। চাণক্য তাঁর ব্যঙ্গোক্তি গায়ে না মেখে প্রশ্ন করলেন,

— ক্ষমা করবেন, রাজকুমারী। কিন্তু আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতেই হবে আমায়।

— বলুন।

বাইরে থেকে দ্বাররক্ষী পুনরায় জীবসিদ্ধির আগমনের ঘোষণা করল। চাণক্য অনুমতি দিতে কক্ষে প্রবেশ করল জীবসিদ্ধি। তার চোখে তার স্বভাবজাত সতর্ক দৃষ্টি। সে চাণক্য এবং তারপর রাজকুমারীকে অভিবাদন জানাল।

তার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন চাণক্য,

— যে কার্য বলেছিলাম তা হয়েছে?

মুখে উত্তর না দিয়ে উপর-নীচে ‘হ্যাঁ’ সূচক মৃদু ঘাড় নাড়ল জীবসিদ্ধি। চাণক্যই তাকে অন্য একটি আসনে বসতে ইঙ্গিত করলেন।

পুনরায় দুর্ধরার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন,

— রাজকুমারী দয়া করে আরও একবার আমাদের বর্ণনা করুন কী ঘটেছিল।

— আমার সঙ্গে কক্ষে আমার দুই সখী ছিল। মধুবন ও কৃষ্ণকলি। আমাদের আহার্য ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল দেখে আমি তাদের আহার শুরু করতে বলি। কিন্তু নিজের পানপাত্রে সোমের পরিবর্তে সাধারণ সুরা দেখে আমি কৃষ্ণকলিকে পাঠাই আমার জন্যে অন্য পানীয়র ব্যবস্থা করতে। কারণ আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম। মধুবন নিজের পানপাত্র খালি করে ফেলেছে দেখে আমি নিজের পানীয় মধুবনের পাত্রে ঢেলে দিই। আর সেটা পান করতেই…।

থেমে যান রাজকুমারী।

চাণক্য প্রশ্ন করলেন,

—যে দাসী আপনার কক্ষে আহার্য সাজিয়ে দিয়ে গিয়েছিল তাকে লক্ষ করেছিলেন?

— না। মনে করতে পারছি না তাকে।

— হুম। ঠিক আছে। তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে না। আপনি আমায় বলুন, আপনার এই দুই সখীদের আপনি কত বছর চেনেন?

— বাল্যসখী দু-জনেই।

— অথচ তাদেরই মধ্যে একজন এই মুহূর্তে নিখোঁজ। এর কি কোনো ব্যাখ্যা আপনার কাছে আছে? আপনার কি মনে হয় সে-ই আপনার পানীয়ে বিষ মিশিয়েছিল?

— না! কৃষ্ণকলি নিজে থেকে এই কাজ করতে পারে না।

— বেশ। তার মানে আপনি সন্দেহ করছেন যে, তাকে কেউ বা কারা লোভ বা ভয় দেখিয়ে এই কাজ করিয়েছে। তাই তো?

উত্তর দিলেন না দুর্ধরা।

চাণক্য পরবর্তী প্রশ্নে চলে গেলেন,

— আপনি কি কৃষ্ণকলিকেই নিজের জন্যে পানীয় নিয়ে আসার আদেশ দিয়েছিলেন? এই প্রশ্নে খানিকটা ভাবলেন রাজকুমারী। ঘাড় নেড়ে বললেন,

— আজ্ঞে না। আপনার প্রশ্নে এখন আমার স্মরণে আসছে, আমি মধুবনকেই বলেছিলাম আমার পানীয় বদলে দিতে। কিন্তু কৃষ্ণকলি নিজেই যেতে চাইল।

— হুম। অর্থাৎ, সে পলায়ন করার উদ্দেশ্য নিয়েই কক্ষ ত্যাগ করেছিল। নিজের বুকের উপর থাকা লম্বা কেশশিখায় আলতোভাবে হস্ত চালনা করে

চাণক্য পুনরায় প্রশ্ন করলেন,

— রাজকুমারী। একবার ভেবে বলুন তো, আপনার সখী কৃষ্ণকলির আচরণে কি কোনোরকম অসংগতি লক্ষ করেছিলেন আজকে?

— হ্যাঁ। করেছিলাম। আমি এবং মধুবন দু-জনই লক্ষ করেছিলাম যে কৃষ্ণকলি আজ অন্যমনস্ক ছিল। একধরনের অস্থিরতা ছিল তার চিত্তে। তাকে সেই প্রশ্ন আমি করেওছিলাম একবার যে, তার চিত্ত আজ চঞ্চল কেন। কিন্তু সে উত্তর দেয়নি।

— হুম। ক্ষমা করবেন রাজকুমারী আপনার সখী কৃষ্ণকলির প্রতি কিন্তু আমার সন্দেহ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। তার আচরণ সবদিক থেকেই ইঙ্গিত করছে যে, সে দোষী। আশা করছি এই প্রহর শেষ হওয়ার পূর্বেই তাকে খুঁজে পেয়ে যাবে সৈনিকরা।

রাজকুমারী কোনো কথা না বলে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন। জীবসিদ্ধি বুঝতে পারল চাণক্যর কথায় রাজকুমারী একমত নন। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে নিজের সখীর পক্ষ নিয়ে বলার মতো কিছু পাচ্ছেন না তিনি।

চাণক্য পুনরায় প্রশ্ন করলেন,

— কৃষ্ণকলির এই অন্যমনস্ক ভাব কি আজ প্রভাতের সময় থেকেই ছিল? নাকি, বিশেষ কোনো ঘটনার পর তার মধ্যে এই অস্থিরতা দেখা দেয়?

এইবার একটু ভেবে উত্তর দিলেন রাজকুমারী,

— না। এখানে আসার আগে অবধি সে স্বাভাবিক ছিল। আমার কক্ষ থেকে অতিথিরা বিদায় নেওয়ার পর থেকেই তার মধ্যে অস্থিরতা প্রকাশ পেতে শুরু করে।

ভ্রূ কুঁচকে গিয়েছে চাণক্যর।

— অতিথি?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ।

— কারা?

আমার পিতা, আর্য কাত্যায়ন এবং পৌরবরাজ মলয়কেতু। তিনজন এসেছিলেন একে একে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

— এরা আপনার কক্ষে দাসী আহার্য রেখে যাওয়ার আগে এসেছিল, নাকি, পরে?

উত্তর দিতে গিয়ে থেমে যান রাজকুমারী দুর্ধরা। তিনি বুদ্ধিমতি, অতএব এই প্রশ্নের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগে তাঁর। নীচুস্বরে উত্তর দিলেন,

— প্রত্যেকেই পরে এসেছিলেন।

— হুম। অর্থাৎ, তাঁরা যখন এই কক্ষে ছিলেন, তখন মেজে আপনার খাদ্য ও পানীয় রাখা ছিল। তাই নয় কি?

কণ্ঠ কিছুটা উপরে উঠিয়ে দুর্ধরা বললেন,

— আপনি কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন, আচার্য চাণক্য? নিজেদের সুরক্ষাব্যবস্থার গাফিলতির ভার এড়াতে কি এইবার আপনি আমারই আপনজনদের আমাকে হত্যা করার প্রচেষ্টার দোষে দোষী সাব্যস্ত করতে চাইছেন?

শান্ত ভঙ্গিতে চাণক্য বললেন,

— অবশ্যই না। আমি শুধু তথ্যগুলো বলছি। কাউকে দোষী বা নির্দোষ বলার সময় এখনও আসন্ন নয়। কিন্তু রাজকুমারী, আপনার পিতা ও কাত্যায়ন মহাশয় যে আপনার আপনজন তা আমি মানছি। কিন্তু পৌরবরাজ মলয়কেতুর আপনার সঙ্গে কী প্রয়োজন থাকতে পারে তা ভেবে পাচ্ছি না, রাজকুমারী।

কিছুটা বিব্রত ভাব দেখা দিল দুর্ধরার মুখে। বললেন,

— পৌরবরাজ আমার সঙ্গে…

হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে চাণক্য বললেন,

— না, না। আপনি প্রথমজনের থেকেই শুরু করুন।

দুর্ধরা ইতস্তত করছেন দেখে চাণক্য বললেন,

— আপনার নিকটজনের সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত আলোচনার কথা আমি সাধারণ পরিস্থিতিতে জানতে চাইতাম না কখনোই। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই আপনাকে আমি অনুরোধ করব দয়া করে আমায় সবটা বলবেন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে, এই প্রসঙ্গ আমাদের তিনজন ব্যতীত কেউ জানতে পারবে না। কী হে, জীবসিদ্ধি?

জীবসিদ্ধি আচার্যর সমর্থনে বলল,

— আপনি চাইলে আমি এই কক্ষ ত্যাগ করতে পারি। কিন্তু আমার অনুরোধ আচার্যর কাছে তথ্য গোপন করবেন না। তাতে আপনারই লাভ হবে, রাজকুমারী।

রাজকুমারী জীবসিদ্ধির উদ্দেশে বললেন,

— আপনার কক্ষ ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই।

উঠে দাঁড়িয়েছিল জীবসিদ্ধি। দুর্ধরার এই কথায় তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পুনরায় জীবসিদ্ধি আসন গ্রহণ করল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুর্ধরা বললেন,

— বেশ। আমি আজকের সব আলোচনার কথাই খুলে বলছি। কিন্তু আপনাকে কথা দিতে হবে যে, আপনি তদন্তের সময়ে আপনার ও পিতার মধ্যকার শত্রুতা দূরে রেখে নিরপেক্ষভাবে বিচার করবেন।

চাণক্য নিজের ডান হস্তের তর্জনী তুলে উপরের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,

— সত্যের কোনো বিকল্প নেই। পক্ষপাতদুষ্ট সত্য মিথ্যার চেয়েও বিপজ্জনক। প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আমি ব্যক্তিগত আবেগকে সদাই দূরে রাখি। চণক পুত্র বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য আপনাকে কথা দিচ্ছে, আমি আপনার সম্মুখে প্রকৃত অপরাধীকে হাজির করবই! সে যে-ই হোক না কেন নিজের দোষের বিচার সে পাবেই!

৭.

— ভৃত্য আহারাদি সাজিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর তিনজন এসেছিলেন আমার কক্ষে। কেউই বেশিক্ষণ ছিলেন না যদিও। প্রথম আসেন আর্য কাত্যায়ন। কিছুক্ষণ বসে ছিলেন আমার কক্ষে।

রাজকুমারী দুর্ধরাকে বাধা দিয়ে চাণক্য প্রশ্ন করলেন,

— ক্ষমা করবেন। বাধা দিচ্ছি আপনাকে। আপনার কক্ষ থেকেই আমি এখানে এসেছি। পানীয়-আহার রাখা মেজটি আপনার পালঙ্ক থেকে কিছুটা দূরে ছিল সম্ভবত। এবং, ঠিক তার পাশেই একটি আসন রাখা ছিল। রাক্ষ… (মাঝপথেই কথা থামিয়ে) মানে…. কাত্যায়ন মহাশয় কি তাতেই আসন গ্রহণ করেছিলেন?

এই গম্ভীর পরিস্থিতিতেও হাসি পেল জীবসিদ্ধির। কাত্যায়নকে সাধারণত তারাও অন্য সকলের মতোই ‘অমাত্য রাক্ষস’ বলেই সম্বোধন করে। আচার্য মুখ ফুটে সেই সম্বোধন করে ফেলেছিলেন একটু হলেই দুর্ধরার সামনেই। দুর্ধরা খানিকটা বিরক্তির সঙ্গেই বললেন,

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। শুধু তিনি একা নন, বাকি দু-জনও একই আসনে, একই স্থানে বসেছিলেন।

— হুম। বেশ। কী প্রসঙ্গে আলোচনা করেছিল সেই বিষয়ে যদি আলোকপাত করেন, রাজকুমারী।

রাজকুমারী কিছুটা কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলেন,

— আর্য কাত্যায়ন আমাকে পুনরায় একবার আমার নির্ণয় পুনর্বিবেচনা করতে বললেন। বললেন, এখনও সময় আছে। আমি যদি আপত্তি করি এই বিবাহে, তবে তিনি নিজে দেখবেন যেন আমার প্রতি কোনো অন্যায় না হয়। আমি তাঁর কন্যাসমা। আমি যেন পরিবারের কথা ভেবে এই বিবাহ করতে বাধ্য না হই। আমার কোনোরকম পীড়া তিনি সহ্য করতে পারবেন না।

চাণক্যর ঠোঁটের কোণে একটি মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠতে দেখল জীবসিদ্ধি। রাজকুমারী লক্ষ করার পূর্বেই তা মিলিয়ে গেল।

রাজকুমারী বললেন,

— আমি তাঁকে বলি যে, এই বিবাহ আমি নিজের মতে করছি। কোনোরকম চাপে পড়ে নয়। তিনি যেন আমায় নিয়ে চিন্তা না করেন। তিনি আরও কয়েক বার একই কথা আমায় বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু, আমি শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিরস্ত করে বিদায় জানাই।

— বেশ, বেশ। এই পুরো সময়ে আপনি কী করছিলেন? এবং, আপনার দুই সখী কোথায় ছিল?

— তারা কক্ষেই ছিল। আমি তখন সবে স্নান সম্পন্ন করে, পালঙ্কে বসে ছিলাম। আমার দুই সখী আমার ভেজা কেশ শুকিয়ে দিচ্ছিল ও পদ ধৌত করে দিচ্ছিল।

— আপনি নিশ্চয়ই অতিথির দিকে মুখ করে ছিলেন?

— সেটাই স্বাভাবিক নয় কি?

— কোন সখী আপনার পদ ধৌত করছিল এবং কোনজন কেশ শুকাচ্ছিল, তা কি আপনি স্মরণ করতে পারেন?

— অবশ্যই পারি। কৃষ্ণকলি আমার সম্মুখে মেঝেতে বসে পদ গোলাপ জলের পাত্রে ধৌত করছিল এবং মধুবন আমারই পালঙ্কে বসে ধুনি জ্বেলে তার সুগন্ধি ধোঁয়া দিয়ে আমার কেশ শুকিয়ে দিচ্ছিল।

জীবসিদ্ধির দৃষ্টি রাজকুমারীর পরিপাটি করে বাঁধা এবং অলংকার দিয়ে সাজানো, সুদীর্ঘ কেশরাশির দিকে চলে গেল স্বাভাবিকভাবেই।

চাণক্য কিছুক্ষণ ছাদের দিকে চেয়ে ভাবলেন। সম্ভবত রাজকুমারীর বর্ণনা করা কক্ষের তৎকালীন দৃশ্য মানসপটে অনুমান করার চেষ্টা করছেন। রাজকুমারীও কয়েক মুহূর্ত কথা না বলে তাঁকে ভাবার সময় দিলেন। যতক্ষণ না আচাৰ্য নিজেই তাকে কথা বলতে অনুরোধ করলেন।

— বেশ। তারপর বলুন, রাজকুমারী।

— এরপর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন আমার পিতা।

চুপ করে যান রাজকুমারী দুর্ধরা। জীবসিদ্ধির বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, পরবর্তী কথোপকথন চাণক্যকে বলতে দ্বিধাবোধ করছেন দুর্ধরা।

রাজকুমারীর দ্বিধাবোধের কারণ চাণক্য নিজেও অনুমান করতে পারছেন। আর তাই তিনি বললেন,

রাজকুমারী, আমি পুনরায় আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, এই মুহূর্তে আমি একজন নিরপেক্ষ সত্যসন্ধানী মাত্র। আপনার কথা আমি গোপন রাখব এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ কোনোভাবেই আমার যুক্তিনির্ভর চিন্তাসূত্রকে মেঘাচ্ছন্ন করবে না। কিন্তু সত্য অনুধাবন করতে গেলে আগে সম্পূর্ণ সত্য আমার জানা প্রয়োজন। তাই অনুরোধ করব, আপনি নির্দ্বিধায় আমাকে সব কথা বলতে পারেন।

চাণক্যর চোখে চোখ রেখে রাজকুমারী দুর্ধরা কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থাকলেন। সম্ভবত তিনি বুঝে নিতে চাইছেন যে, তাঁর সামনে বসা ব্রাহ্মণটিকে বিশ্বাস করা যায় কি না। তারপর বললেন,

— পিতা প্রথমে এসে জানতে চাইলেন আমি কেমন অনুভব করছি। আমি সত্যই মন থেকে এই বিবাহ মেনে নিয়েছি কি না। আমি তাঁকে বললাম তাঁর এই প্রশ্ন করার কোনো অধিকার নেই। কারণ আজকে আমাকে এই পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত করার জন্যে তিনিও সমানভাবে দায়ী! তিনি যদি আমোদ-আসক্তিতে দীর্ঘকাল ডুবে না থেকে মহামাত্যর কথায় কর্ণপাত করতেন, তবে আজকের এই দিন দেখতে হত না।

জীবসিদ্ধির ভ্রূ ললাটের আর একটু কাছে উঠেছে। রাজকুমারীর চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সম্মুখে কটু সত্য বলার ক্ষমতা তাকে অবাক করছে। চাণক্য অবাক হয়েছেন কি না সেটা তাঁর মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল না। বরং তাঁর উজ্জ্বল চোখে শংসার দৃষ্টি ফুটেছে।

চাণক্য বললেন,

— হুম। তারপর?

— পিতা বললেন, তিনি নিজের এবং আমার এই অপমানের কথা ভুলবেন না। এর প্রতিশোধ নেবেন তিনি। মগধের সিংহাসন তিনি পুনর্দখল করবেন একদিন ঠিকই। তিনি এইটুকু বলে নিজেই আমার কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।

— হুম।

— আমি পুনরায় আশা করব আমি যা যা বললাম তা এই কক্ষের বাইরে যাবে না।

— নিশ্চয়ই। আচ্ছা, এই বাক্যালাপের সময়ে আপনার এবং আপনার দুই সখীর অবস্থান কী ছিল?

একটু ভেবে রাজকুমারী উত্তর দিলেন,

— আমি নিজের স্থানেই বসে ছিলাম। পালঙ্কে। তবে এই সময়ে মধুবন আমার সম্মুখে বসে চন্দনের প্রলেপ দিয়ে আমার হাত ও পায়ের চর্চা করছিল। কৃষ্ণকলি আমার পিছনে বসে আমার কেশে সুগন্ধি তেল দিয়ে দিচ্ছিল।

আরও একবার চাণক্য কক্ষে সকলের অবস্থানটা অনুমান করে নিলেন নিজের মনে।

এরপর বললেন,

— বেশ। সকল কথা অকপটে আমায় বলার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ, রাজকুমারী। এরপর বলুন, তৃতীয় অতিথি কেন আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিল?

রাজকুমারী দুর্ধরার পাশেই মেজের উপর এক পাত্র সোম রাখা আছে। এইবার অবশ্যই এটি পরীক্ষা করে রাখা হয়েছে। সেটি তুলে দু-চুমুক সোম পান করলেন রাজকুমারী। অনেকক্ষণ কথা বলায় গলা শুকিয়ে গিয়েছে তাঁর।

পান করে, পাত্র নামিয়ে রেখে বললেন,

— তৃতীয়জন হলেন রাজকুমার মলয়কেতু।

— হুম। আপনার পিতা ও অমাত্য কাত্যায়নের আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য আমি অনুমান করতে পেরেছিলাম। তবে এই পৌরবরাজের পুত্র মলয়কেতুর আপনার সঙ্গে কী প্রয়োজন তা আমিও অনুমান করতে পারছি না, রাজকুমারী।

— আপনার জানার কথা নয়, তবে কয়েক বর্ষ পূর্বে রাজকুমার মলয়কেতু আমায় বিবাহ প্রস্তাব দিয়েছিল।

— তাই নাকি?

চাণক্য জীবসিদ্ধির দিকে চাইলেন। এই তথ্য জীবসিদ্ধিরও অবগত নয়। তার গূঢ়পুরুষরা রাজকুমারী দুর্ধরার সম্বন্ধে পূর্বে অনেক সংবাদ জোগাড় করেছিল বটে। কিন্তু এই তথ্যটি তাদের অধরা ছিল।

রাজকুমারী মৃদু উপর-নীচে মাথা নাড়িয়ে বললেন,

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। আমাদের নির্বাসিত হওয়ার এক বর্ষ পরেই এই প্রস্তাব আসে মলয়কেতুর তরফ থেকে। তিনি পূর্বে আমায় দেখেছিলেন সম্ভবত। আমার যদিও তাঁকে স্মরণে ছিল না সেইসময়ে। তিনি নিজেই আসেন আমার পিতার কাছে, বিবাহ প্রস্তাব নিয়ে। আমি প্রত্যাখ্যান করি।

— কেন?

চাণক্য রাজকুমারীর চোখে চোখ রেখে প্রশ্নটা করলেন। দুর্ধরা খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— তাঁকে আমার ব্যক্তিত্বহীন পুরুষ বলে মনে হয়েছিল প্রথম দর্শনেই। তা ছাড়া, আমার এইটুকু অনুধাবন করার মতো রাজনীতিজ্ঞান আছে রাজকুমার মলয়কেতু নিজের রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে এই প্রস্তাব দিয়েছেন। চন্দ্রগুপ্ত… ক্ষমা করবেন, সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে মৈত্রী পূর্বে পৌরবরাজ নন্দদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন একথা সকলের জ্ঞাত। কিন্তু তারপর মগধের সম্রাট হলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। মলয়কেতু ফিরে গেলেন তাঁর পার্বত্য রাজ্যে। অতএব, স্বাভাবিকভাবেই নিজের অবস্থান নিয়ে বিশেষ প্রসন্ন নন তিনি।

চাণক্য বললেন,

— হুম। আমাদের সাহায্যের পরিবর্তে, অর্ধেক আর্যাবর্তর দাবি করেছিলেন রাজকুমার মলয়কেতু।

কণ্ঠে প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ ফুটিয়ে রাজকুমারী বললেন,

— তাই নাকি? তারপর? আপনিও নিশ্চয়ই তাঁকে সেই আশ্বাস দিয়েছিলেন? কিন্তু তারপর তাঁর সাহায্যে আমাদের উৎখাত করার পর ছলে-বলে তাঁকেও ফেরত পাঠালেন তাঁর রাজ্যে।

ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে চাণক্যর। বলেন,

— আমি তাঁকে যা আশ্বাস দিয়েছিলাম, তা তিনি পেয়েছেন। আমি যা বলি, তার দায় আমার। কিন্তু অন্যে সেটা শুনে কী বুঝল, তার দায় আমার নয়!

রাজকুমারী দুর্ধরার ঠোঁটের কোণেও হাসি দেখা গেল। বললেন,

— আপনি অত্যন্ত চালাক, আচার্য।

আচার্য নিজের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসেন। জীবসিদ্ধি বুঝতে পারছে তার গুরু নিজের প্রশংসা শুনে তৃপ্ত। যদিও তার বহিঃপ্রকাশ করলেন না। পরের প্রশ্নে চলে গেলেন চাণক্য,

— কিন্তু আজ আপনার কক্ষে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

— আমি তাঁকে সেইসময়ে প্রত্যাখ্যান করায় তিনি অপমানিত হয়েছিলেন। তাই আজ যেহেতু পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমাকে বিবাহসূত্রে বাঁধা পড়তে হচ্ছে আমার পিতার শত্রুর সঙ্গে, সেই সুযোগে আমায় নিয়ে বিদ্রূপ করার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন তিনি। আমায় বললেন যে, সেইদিন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে আমি যে কত বড়ো ভুল করেছি সেটা আজ আমি উপলব্ধি করতে পারছি কি না। বললেন যে, সেইদিন অন্তত তাঁকে বিবাহের বিষয়ে আমার মতামত প্রকাশের জায়গা ছিল, যেটা আজ আমার নেই।

— হুম! আপনি তাকে কী বললেন?

— আমি তাঁকে বললাম, মগধের ভাবী মহারানির সাক্ষাৎ পাওয়ার বাসনা

রাখলে, ভবিষ্যতে যেন তিনি পূর্বে অনুমতি নিয়ে আসেন।

এইবার সশব্দে হেসে উঠলেন চাণক্য। জীবসিদ্ধির দিকে চেয়ে বললেন, 

— ওহে, জীবসিদ্ধি। শোনো, শোনো! রাজকুমারী মাত্র একটি বাক্যে কেমন নিজের এবং মলয়কেতুর অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁর কাছে।

জীবসিদ্ধি মুখে কিছু না বললেও, সেও দুর্ধরার রাজোচিত উত্তর শুনে মুগ্ধ হয়েছে। জীবসিদ্ধি শুধু একবার রাজকুমারীর উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানাল।

হাসি থামিয়ে চাণক্য প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁর পরবর্তী প্রশ্ন কী হবে তা অনুমান করেই রাজকুমারী উত্তর দিলেন,

— এই সময়ে আমার এবং আমার দুই সখীর অবস্থান পূর্ববৎই ছিল। অর্থাৎ, মধুবন আমার সম্মুখে বসে হাত ও পায়ের পরিচর্যা করছিল, এবং কৃষ্ণ আমার পিছনে চুল বেঁধে দিচ্ছিল।

পরবর্তী কয়েক মুহূর্ত ভাবনায় ডুবে গেলেন চাণক্য। আনমনা ভঙ্গিতে নিজের কেশশিখায় হস্ত চালনা করলেন বার কয়েক। তারপর প্রশ্ন করলেন,

— রাজকুমারী, আপনি কি এই তিন অতিথিদের অথবা আপনার সখীদের মধ্যে কাউকে আপনার পানীয়ে কিছু মিশ্রণ করতে দেখেছেন?

— না।

— তাদের কি সে-সুযোগ ছিল? অর্থাৎ, এটা কি সম্ভব যে, আপনার চোখের আড়ালে এদের মধ্যে কেউ আপনার পানীয়ে বিষ মিশিয়েছে?

ভ্রূ কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবলেন দুর্ধরা। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— সেভাবে ভাবতে গেলে সে-সুযোগ প্রত্যেকেরই ছিল। আমি কখনোই কারুর দিকে সর্বক্ষণ চেয়ে ছিলাম না।

— আপাতত আপনাকে আমার শেষ প্রশ্ন। আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, আপনার সখী কৃষ্ণকলি বা আপনার তিন অতিথিদের মধ্যে কেউ আপনাকে হত্যা করতে চায়?

— না! আমি বিশ্বাস করি না।

— এমনকী মলয়কেতুও না? হয়তো অপমানের উত্তর দিতে এসে পুনর্বার অপমানিত হয়ে তিনি আপনার প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে আপনার পানীয়ে বিষ মিশিয়ে দিয়েছেন।

নির্দ্বিধায় রাজকুমারী উত্তর দিলেন,

— না! তার সেই সাহস নেই। সেই সাহস থাকলে তাকে আমি প্রত্যাখ্যান করতাম না।

চাণক্যর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা একমুহূর্তের জন্যে ফুটে মিলিয়ে গেল। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তিনি বললেন,

— হুম। বেশ। আমরা আপাতত বিদায় নেব। অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। সব কথা নির্দ্বিধায় আমায় বলার জন্যে আরও একবার আপনাকে ধন্যবাদ, রাজকুমারী। এসো হে, জীবসিদ্ধি।

চাণক্য বেরিয়ে গেলেন কক্ষ থেকে। তাঁর দেখাদেখি জীবসিদ্ধিও উঠে দাঁড়িয়েছে। তবে বেরোনোর আগে জীবসিদ্ধি দ্বারের চৌকাঠে থেমে গেল। পেছন ফিরে বলল,

— রাজকুমারী দুর্ধরা।

রাজকুমারী মুখ তুলে তার দিকে সপ্রশ্ন নেত্রে চাইলেন। জীবসিদ্ধি বলল,

— আমি আপনাকে একটি আশ্বাস দিতে পারি। মগধে কেউ আপনার অসম্মান ও মর্যাদাহানি করবে না। সম্রাটের গুরুভ্রাতা এবং বাল্যমিত্র হিসাবে এইটুকু আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি। তিনি একজন আদর্শ সম্রাট এবং তার চেয়েও মহৎ একজন মনুষ্য। নারীর প্রাপ্য সম্মান তিনি দিতে জানেন।

দুর্ধরার মন কিছুটা হলেও হালকা হল সম্ভবত। বললেন,

— ধন্যবাদ।

রাজকুমারীকে আরও একবার অভিবাদন জানিয়ে কক্ষ ত্যাগ করল জীবসিদ্ধি।

৮.

চওড়া শ্বেতপাথরের বারান্দা ধরে পাশাপাশি ধীরপায়ে হাঁটছেন চাণক্য ও জীবসিদ্ধি। চাণক্য অন্যমনস্কভাবে চলছেন। চিন্তায় এতটাই ডুবে আছেন যে, বারান্দার ধার ঘেঁষে দাঁড়ানো প্রহরীদের অভিবাদনের প্রতি-অভিবাদনও জানাচ্ছেন না। সাধারণত তিনি এই সৌজন্য দেখিয়ে থাকেন সকলকে। জীবসিদ্ধি যদিও প্রতি-অভিবাদনে প্রত্যেকের উদ্দেশে একবার করে মৃদু ঘাড় নাড়াচ্ছে উপর-নীচ। জীবসিদ্ধির মনে অনেকগুলো প্রশ্ন জাগছে। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রশ্ন করে গুরুদেবের চিন্তাসূত্রে ছেদ ফেলা উচিত হবে না জেনে চুপ করেই চলেছে চাণক্যর পাশে পাশে।

একটি কক্ষে চাণক্যর জন্যে ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকটি আসন মুখোমুখি রাখা হয়েছে। জীবসিদ্ধি পথ দেখিয়ে চাণক্যকে সেই কক্ষের সামনে নিয়ে এল। যদিও তিনি এখনও চিন্তায় ডুবে আছেন।

কক্ষে ঢুকতেই দু-জন ব্রাহ্মণকে প্রণাম জানাল দুই সৈনিক। তাঁদেরই অপেক্ষায় কয়েক জন সেখানে আগে থেকেই বসে আছে। দু-জন সৈনিকের মধ্যে আরও দু-জন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে। একজন জীবসিদ্ধির পরিচিত। ইনি রন্ধন বিশেষজ্ঞ

জীমূতবাহন। দ্বিতীয়জন অপরিচিত, ভৃত্য স্থানীয় কেউ।

তাদের দেখেই জীমূতবাহন বলে উঠলেন,

— আর্য! আমাদের কাজে কি কোনো ত্রুটি হয়েছে? এই দুই সৈনিক আমাদের হঠাৎ তলব করে আনল।

চাণক্যর চিন্তা কেটে গিয়েছে। সামনে তাকিয়ে দু-জন অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখে, ঘাড় ঘুরিয়ে জীবসিদ্ধির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলেন।

জীবসিদ্ধি পরিচয় করিয়ে দিল,

— ইনি জীমূতবাহন মহাশয়। আজকের পাকশালের সমস্ত দায়িত্ব ওঁর। আর …. উত্তর পাশের সৈনিকটি দিল,

সম্রাট আদেশ দিয়েছিল, রাজকুমারীর কক্ষে যে ভৃত্য খাদ্য ও পানীয় দিয়ে গিয়েছিল তাকে আপনার সামনে হাজির করতে। এই সেই ভৃত্য, মান্যবর।

— ওহ্!

ভৃত্যটি ভয়ে প্রায় কাঁপছে। যদিও তার জানার কথা নয় তাকে এখানে আনার প্রকৃত কারণ। তবে সম্ভবত তার আশঙ্কা, কোনো কারণে রাজকুমারী ক্ষুণ্ণ হয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজার তলব দাসদের পক্ষে সুখকর বার্তা নিয়ে আসে না।

সৈনিক জীমূতবাহনকে কিছু একটা ইশারা করল। জীমূতবাহন একবারে না বুঝলেও, পরক্ষণেই বুঝলেন। বললেন,

— আচার্য চাণক্য। সম্রাটের আদেশে আপনার জন্যে এই বিশেষ মধু-পানীয় এনেছি আমি।

চাণক্যর মুখে হাসি ফুটেছে। একটি আসন গ্রহণ করে বললেন,

— আহা! অতি উত্তম! আমার মস্তিষ্ক সজাগ করার প্রয়োজন বড়ো।

মস্তিষ্কের সঙ্গে তার আনা মধু-পানীয়ের কী সম্পর্ক, জীমূতবাহন তা অনুধাবন করতে না পারলেও, সে প্রশ্ন না করে একটি বড়ো ঢাকা দেওয়া পানপাত্র এগিয়ে দিল চাণক্যর দিকে।

চাণক্য সেটি হাতে নিয়ে এক চুমুক দিলেন। চোখ বুজে কয়েক মুহূর্ত স্বাদ নিলেন। এই কয়েক মুহূর্ত জীমূতবাহন উদগ্রীব, উত্তেজিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন চাণক্যর দিকে।

চোখ খুলে চাণক্য বলে উঠলেন,

— সাধু! সাধু! এমন চমৎকার পানীয় আমি পূর্বে কোনোদিন পান করেছি বলে স্মরণ করতে পারি না! এ তো দেবপেয়!

হাতজোড় করে গদগদ ভঙ্গিতে জীমূতবাহন বললেন,

— আমি জানতাম! আমি জানতাম এই পানীয় আপনার ভালো লাগবেই! এই পানীয় আপনার মতো মহামতি ব্রাহ্মণদের জন্যে উৎকৃষ্ট পানীয়। এই পানীয় বানানো হয়…

পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকেই তাকে বাধা দিয়ে জীবসিদ্ধি বলল,

— আপনি আসন গ্রহণ করুন। আপনাকে কিছু প্রশ্ন করবেন আচার্য।

চাণক্য বলল,

— ওহে, জীবসিদ্ধি। প্রশ্ন কয়েক মুহূর্ত পরে করলেও বিশেষ ক্ষতি নেই। কিন্তু জীমূতবাহন মহাশয়কে বলতে দাও। এই পানীয় একটি শিল্পসম আর এর কারিগর স্বয়ং শিল্পী! বলুন মহাশয়, কী আছে এই পানীয়ে?

উত্তেজনায় ফেটে পড়বেন মনে হল জীমূতবাহন। বললেন,

— পূর্ণিমার রাত্রে ধান ভেঙে লাল চাল বের করা হয়। সেই রাত্রেই তা গুঁড়ো করে মণ্ডাকারে রাখা হয়। এই চালের মণ্ডে দুধ ও গুড় মিশিয়ে ফোটানো হয় যতক্ষণ না তা ঘন গাঢ় হয়ে আসে। এক প্রহর এটিকে তাম্রপাত্রে রাখা হয় যাতে দুধে তাম্রের গুণ ও ঘ্রাণ মিশে যায়। এরপর এতে মিশ্রিত করা হয় পবিত্র পিপুল বৃক্ষের শেকড়ের চূর্ণ। এই চূর্ণ বানানোরও নিয়ম আছে, আচার্য! এই চূর্ণ পূর্বেই বানিয়ে আগে চাররাত্রি চাঁদের আলোয় রেখে দিতে হয়। চন্দ্রমার রশ্মি যেভাবে সাগরের জলে প্রভাব ফেলে, সেভাবেই তা আমাদের শরীরে ও খাদ্যের স্বাদ এবং গুণে প্রভাব ফেলে।

— সাধু! এ পানীয় স্বৰ্গীয়!

আরও একচুমুক পান করলেন চাণক্য। তাঁর এই প্রশংসা, সামনের ব্যক্তিটির বিশ্বাস অর্জনের কৌশলও হতে পারে। আবার বাস্তবেই প্রশংসা হতে পারে। চাণক্যর এই মাত্রাতিরিক্ত মধু-দ্রব্য প্রীতি তাঁর নিকটজনমাত্রেই জানা সকলের। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন জিহ্বার সঙ্গে মস্তিষ্কের যোগাযোগ আছে। জিভে মিষ্টস্বাদের স্পর্শে তাঁর মস্তিষ্কর কোষিকা নাকি সজাগ হয়ে ওঠে। যদিও এমন নিদান স্বয়ং মহামতি চড়কও দিয়েছেন বলে জানা নেই।

চাণক্য এইবার দ্বিতীয় ব্যক্তির দিকে মনোযোগ দিলেন,

— আর তোমার নাম?

— আজ্ঞে, ভুবন।

— তুমি আজ রাজকুমারী দুর্ধরার কক্ষে আহার্য নিয়ে গিয়েছিলে?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ।

— তুমি নিজে কি তার পানীয় বা খাদ্যে কিছু মিশ্রিত করেছিলে?

— আজ্ঞে?

— করেছিলে কি?

— আজ্ঞে, না! আমি কেন …

— অন্য কাউকে করতে দেখেছিলে?

— আজ্ঞে, না!

— পথে কোথাও থেমেছিলে? বা, কারুর সঙ্গে পথে সাক্ষাৎ হয়েছিল?

— আজ্ঞে, না!

— এত দ্রুত উত্তর দিয়ো না। ভেবে-চিন্তে বলো।

— না, ব্রাহ্মণদেব। আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি সাজিয়ে দেওয়া আহার্যের দু-চাকার ‘ঠেলাগাড়ি’ নিয়ে সোজা রাজকুমারীর মহলের কক্ষে হাজির হয়েছিলাম। খালি দ্বারে দু-জন প্রহরী আমার তল্লাশি নিয়েছিল প্রবেশের পূর্বে।

— হুম। আর আহার্যগাড়িতে সাজিয়ে কে দিয়েছিল?

উত্তর জীমূতবাহন দিলেন,

— আজ্ঞে, আমি। আমার উপস্থিতিতে, আমারই কথামতো সাজানো হয়েছিল আহার। রাজকুমারীর ভোজন বলে কথা! তাই আমি নিজেই তদারকি করেছিলাম মান্যবর। কিন্তু কেন এ প্রশ্ন? আমার কি কোনো ত্রুটি হয়েছে?

— হ্যাঁ, মহাশয়। একটি ভুল হয়ে গিয়েছে আপনার সম্ভবত। আপনি রাজকুমারী ও তার সখীদের জন্যে একই পানীয় দিয়েছিলেন। আপনার মতো বিচক্ষণ মানুষের এই ভুল কীভাবে হয়, মহাশয়?

নিজের বাম হস্তের তালুতে ডান হস্তের মুষ্টি দিয়ে আঘাত করে জীমূতবাহন উত্তেজিতভাবে উত্তর দিলেন,

— আমি জানতাম! আমি জানতাম কোথাও একটা ভুল হচ্ছে! তালিকায় ভ্রান্তি আছে! কিন্তু আমার উপর নির্দেশ ছিল তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা করার।

— স্পষ্ট করে বলবেন? কীসের ভ্রান্তি? কোন তালিকার কথা বলছেন?

— সকল রাজ অতিথিদের খাদ্যাভ্যাস আলাদা। তাই এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রত্যেক গণ্যমান্য অতিথিদের জন্যে আলাদা খাদ্যতালিকা পূর্বেই আমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সেই অনুযায়ী আমি তাদের ভোজন পাক করাতে পারি। অন্যান্য কর্মীরা শিক্ষিত নয়, তাই আমাকেই দায়িত্ব নিয়ে তাদের নির্দেশ দিয়ে রন্ধন করিয়ে নিতে হয়। সেরকমই নন্দদের তরফ থেকেও প্রাক্তন মহারাজ তথা রাজকুমারীর খাদ্যতালিকা আমার কাছে এসেছিল গতকালই।

তখনই আমার চোখে পড়েছিল যে, রাজকুমারীর পানীয় তালিকায় সুরা লেখা আছে। আমিও অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু তালিকা অনুযায়ী আমাকে চলতেই হত।

চাণক্য নিজে কোনোদিন মদিরা জাতীয় পানীয় পান করেন না। মদিরা জাতীয় যেকোনো পানীয় তিনি নিজে অপছন্দ করেন এবং রাজপুরুষদের মদিরাসক্তির তীব্র নিন্দা করেন। তাই তাঁর কাছে সুরা ও সোমের পার্থক্য নেই।

চাণক্য প্রশ্ন করলেন,

— মহাশয়, আমার অজ্ঞতার জন্যে আমি দুঃখিত। কিন্তু, আমি বুঝতে পারছি না রাজকুমারীকে সুরা পরিবেশন করা যায় না কেন?

জীমূতবাহন হাতজোড় করে বললেন,

— ক্ষমা করবেন। আমার এই বিষয়টা আপনাকে প্রথমেই বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল। দেখুন, মদিরা মূলত দু-প্রকার। সুরা এবং সোম। সুরা সৃষ্টি হয় ধান বা গম জাতীয় শস্য পাতন’ করে। রাজপুরুষ ও ক্ষত্রিয়রা এই শস্য থেকে পাতন করা যেকোনো মদিরাকেই নিম্নশ্রেণির মানুষদের পানীয় বলে মনে করেন। রাজপুরুষ, ক্ষত্রিয় তথা অন্যান্য উচ্চবর্ণের মানুষ শুধুমাত্র সেই মদিরা গ্রহণ করেন যা ফুল বা ফলের রস থেকে বানানো হয়। যেমন ধরুন, সোমরস বা মৈরেয়া। ঋগবেদে সোমরসকে দেবরাজ ইন্দ্রর পেয় বলা হয়েছে। সেরকমই রামায়ণে শ্রীরামচন্দ্রর মৈরেয়া পানের উল্লেখ আছে। তাই সোমাদি পানীয়কে রাজপুরুষ, মনীষী তথা সস্তদের পানীয় ধরা হয়। তাই রাজকুমারীর তালিকায় সোমের পরিবর্তে সুরা দেখে আমি চমকিত হয়েছিলাম।

চাণক্য প্রতিটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। মদিরার মধ্যেও যে উঁচু- নীচুর বৈষম্য আছে তা আজই তিনি প্রথমবার জানলেন।

চাণক্য প্রশ্ন করলেন,

— আপনার বৈদিক ও শাস্ত্রজ্ঞান দেখে আমি অভিভূত, মহাশয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায় যে, তারপরেও আপনি রাজকুমারীকে সুরা দিলেন কেন? কারুর সঙ্গে এই নিয়ে পূর্বে আলোচনা করে নেওয়া উচিত ছিল না কি?

উত্তর দিতে জীমূতবাহন ইতস্তত করতে লাগলেন। উপস্থিত অন্য রক্ষী আর ভৃত্যর সম্মুখে তিনি কিছু একটা বলতে চাইছেন না, সেকথা অনুমান করেই জীবসিদ্ধি বলে উঠল,

— আচার্য, এই ভৃত্যকে আপনার আর কোনো প্রশ্ন না থাকলে তাকে যেতে বলি?

চাণক্য ইঙ্গিত বুঝে উত্তর দিলেন,

— হ্যাঁ। তুমি যাও। আর সৈনিকরাও যেতে পারো। আমার আর কোনো প্রশ্ন আপাতত নেই।

ভৃত্যটি এতক্ষণে বোধ হয় স্বস্তির নিশ্বাস নিল। রক্ষীদের সঙ্গেই সেও কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে বাইরে রক্ষীরা দ্বার রুদ্ধ করল।

চাণক্য পুনরায় জীমূতবাহনের দিকে মনোযোগ দিলেন।

— এইবার বলুন, মহাশয়।

— আচার্য, আমার অপরাধ নেবেন না। আসলে নন্দদের বংশ পরিচয় আমার অজানা নয়। তারা জাতে ‘নাই’**। মহাপদ্মনন্দরা ক্ষৌরকার ছিলেন। তাই আমি ভেবেছিলাম হয়তো নন্দরা সুরাপান করে থাকেন। এই নিয়ে কাউকে প্রশ্ন করারও সাহস আমার হয়নি! এই প্রশ্ন কাকে করতাম, আচার্য? এই কথা সম্রাট বা নন্দদের কানে গেলে আমার কি গর্দান থাকত? আপনাদের দু-জনকে অনুরোধ দয়া করে এই কথা অন্য কাউকে বলবেন না! অন্যথায় আমি ঘোর বিপদে পড়ে যাব!

নন্দদের ইতিহাস সকলেই জানে। শিশুনাগ রাজবংশের রাজার ক্ষৌরকার ছিল ধনানন্দের পিতা মহাপদ্মনন্দ ও তার পুত্ররা। আসলে মহাপদ্মনন্দ ছিল এক শূদ্র দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুনাগ রাজার অবৈধ সন্তান। তাই তাদেরও জাতে শূদ্র বলেই ধরা হত। কিন্তু মনে মনে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনছিল মহাপদ্মনন্দ। একদিন রাজা শিশুনাগের ক্ষৌরকার্য করার সময়ে তার গলায় ক্ষুর চালিয়ে হত্যা করে মহাপদ্মনন্দ। সেইসঙ্গেই রাজার অন্য পুত্রদের হত্যা করে সিংহাসন দখল করে সে। তাই জন্মসূত্রে শূদ্র নন্দদেরকে কেউই সম্মানের চোখে কোনোদিন দেখেনি। অতএব, নন্দ বংশের রাজকুমারী যে রাজকীয় সহবত পালন না করে সুরাপান করতে পারে এমন সন্দেহ অনেকেরই মনে থাকা স্বাভাবিক।

.

হাত নাড়িয়ে জীমূতবাহনকে আশ্বস্ত করলেন চাণক্য। বললেন,

— আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনার দ্বিধার কারণ বুঝতে পারছি। এই কথা আমরা তিনজন ব্যতীত কেউ জানবে না।

— অশেষ ধন্যবাদ, আচার্য!

— আপনাকে আর আটকে রাখব না। আপনার অনেক কার্যভার আছে অনুমান করতে পারছি। আপনি আসতে পারেন। তবে একটি বস্তু আমার প্রয়োজন। না না, একটি না, দুটি।

— কী, আচার্য?

— প্রথমত রাজকুমারীর খাদ্যতালিকাটি। দ্বিতীয়ত আরও একটি পাত্র এই অমৃতসম মধু-পানীয়! দয়া করে এই দুটি আমার এই কক্ষেই পাঠিয়ে দেবেন, মহাশয়।

উঠে দাঁড়িয়ে পুনরায় দু-জন ব্রাহ্মণকে প্রণাম জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন জীমূতবাহন। জীবসিদ্ধি কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল কিন্তু সে-সুযোগ পেল না। দ্বারের সম্মুখে অমাত্য কৃষ্ণনাথ ও প্রাক্তন অমাত্য রাক্ষস উপস্থিত হয়েছেন। উত্তেজিতভাবে, অনুমতির অপেক্ষা না করেই কক্ষে প্রবেশ করলেন কৃষ্ণনাথ। কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

— আচার্য! আপনার অনুমানই সঠিক! সম্রাটের পানীয়েও বিষ পাওয়া গিয়েছে!

* পাতন – distillation

**নাই— নাপিত, ক্ষৌরকার

৯.

— আপনি নিশ্চিত, মহা অমাত্য কৃষ্ণনাথ?

প্রশ্নটা করলেন আচার্য চাণক্য। এই সংবাদে চাণক্য বিস্মিত হওয়ার ভান করলেন।

কৃষ্ণনাথ উত্তর দিলেন,

— হ্যাঁ, আচার্য! আমার এবং আর্য কাত্যায়নের চোখের সামনেই পরীক্ষা করা হয়েছে!

চাণক্য এইবার রাক্ষসের উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন,

— আপনিও নিশ্চিত যে শুধু রাজকুমারী নয়, সম্রাটের পানীয়েও বিষ ছিল?

— হ্যাঁ।

সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন রাক্ষস। জীবসিদ্ধি পূর্বেও লক্ষ করেছে। সব পরিস্থিতিতেই সমান মুখের ভাব রাখতে পারেন ইনি। তাঁর মুখ দেখে তাঁর মনের অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। রাক্ষসের পিতৃদত্ত নাম মগধে খুব কম মানুষই মনে রেখেছে। ধনানন্দ প্রদত্ত এই নাম পরবর্তীকালে তাঁর উপাধিবিশেষ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই সম্বোধনের প্রতিও তিনি সমানভাবেই উদাসীন।

চাণক্য পানপাত্র থেকে আরও কিছুটা মধু-পানীয় চুমুক দিয়ে বললেন,

— ক্ষমা করবেন। আপনাকে এই অপূর্ব পানীয় নিবেদন করতে পারলাম না। তবে জীমূতবাহন মহাশয় নতুন পেয়ালাটি পাঠালে তা আপনি স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতে পারেন।

— তার প্রয়োজন নেই। ধন্যবাদ।

পানপাত্র পুনরায় নামিয়ে রেখে, তাতে ঢাকা দিয়ে চাণক্য বললেন,

— আপনাকে কিছু প্রশ্ন করার ছিল, আর্য। আপনি দয়া করে নিজের পছন্দমতো একটি আসন গ্রহণ করলে খুশি হতাম।

নিজের ইচ্ছায় তিনি বসলেন, নাকি, অনিচ্ছাতেই বসলেন তা বোঝা গেল না। তবে রাক্ষস একটি আসন গ্রহণ করলেন ঠিকই।

চাণক্য কৃষ্ণনাথের দিকে ফিরে বললেন,

— আপনি চিন্তিত হবেন না। এখনই কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই। আপনি বরং নিখোঁজ মেয়েটির খোঁজ করুন। তাকে তো খুঁজে পেয়ে যাওয়া উচিত এতক্ষণে। একবার সৈনিকদের কাছে খোঁজ নিন, মহাশয়।

জীবসিদ্ধি বলল,

— গোপনে তল্লাশি চালাতে হচ্ছে মহল জুড়ে। যাতে অতিথিদের সন্দেহ না হয়। তাই সম্ভবত সময় বেশি লাগছে। আপনি আসুন মহামাত্য মহোদয়। আশা করি মেয়েটিকে খুঁজে পেয়ে যাবে সৈনিকরা। দেখুন, ইতিমধ্যে হয়তো পেয়েও গিয়েছে তার সন্ধান।

সম্মতি জানিয়ে কৃষ্ণনাথ চলে গেলেন। চাণক্য এইবার রাক্ষসের দিকে ফিরে বসলেন,

— আর্য কাত্যায়ন, অনেক সময় পর সাক্ষাৎ হল আপনার সঙ্গে। আপনার শরীর-স্বাস্থ্য ভালো আছে তো?

— হ্যাঁ। ধন্যবাদ।

— আর মহারাজ…ওহ! ক্ষমা করবেন! মানে, ধনানন্দর শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক আছে তো?

জীবসিদ্ধি বুঝতে পারছে আচার্য কী করছে। এই মুহূর্তে মুখোমুখি দুই ব্যক্তি বহু বছর ধরে একে অন্যের প্রতিপক্ষ ছিল। মগধ জয়ের পর, চাণক্য নিজেই একবার বলেছিলেন যে, মগধের পতন তিনি আরও পাঁচ বর্ষ পূর্বেই ঘটাতে পারতেন, যদি না তাঁর পথের কাঁটা হিসাবে অমাত্য রাক্ষস থাকতেন। চাণক্য এই মুহূর্তে তাঁর কথার দ্বারা প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ ছুড়ে দিচ্ছেন রাক্ষসের প্রতি।

রাক্ষস নিজেও ব্রাহ্মণসস্তান। মুণ্ডিত মস্তক, কেশশিখা ও উপবীত তাঁর প্রতীক। কিন্তু তাঁর বেশ চাণক্যর মতো সন্ন্যাসী বেশ নয়। তাঁর কন্ঠে একটি স্বর্ণহার, কানে কুণ্ডন, মণিমুক্তা খচিত একাধিক অঙ্গুরীয় তাঁর প্রতিটি আঙুলে শোভা পাচ্ছে। তাঁর অঙ্গবস্ত্র এবং ধুতিটিও মূল্যবান রেশমের তৈরি। রাক্ষস বিশালবপু, কিঞ্চিৎ স্থূলতনু এবং গৌরবর্ণ। চাণক্য এবং রাক্ষসকে মুখোমুখি দেখে জীবসিদ্ধির মনে হচ্ছিল যেন ঈশ্বর কোনো এক দৈব কৌতুকবশে, ঠিক বিপরীত আতির দুই ব্যক্তিকে একই সময়ে, একই স্থানে উপস্থিত করেছেন।

চাণক্যের ব্যঙ্গোক্তি রাক্ষস গায়ে মাখলেন না। অন্তত তাঁর ভাবভঙ্গিতে প্রকাশ পেল না কিছু। সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তিনি বললেন,

— এই বিবাহ আমার মতে স্থগিত রাখা হোক, আচার্য। রাজকুমারী দুর্ধরার যে প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনা আছে এই রাজমহলে, তা কেউ না জানলেও আপনি তো উপলব্ধি করতেই পারছেন, আশা করি?

— হুম। ঠিকই বলেছেন। কিন্তু মহাশয়, প্রাণ সংশয় যে শুধু রাজকুমারীর আছে, তা তো নয়। সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যরও প্রাণনাশের প্রচেষ্টা করা হয়েছে! আপনি নিজেই তো তার খাদ্য ও পানীয় পরীক্ষার সময় উপস্থিত ছিলেন। আপনি নিজেই দেখেছেন যে তার পানীয়েও বিষ ছিল।

তৎক্ষণাৎ কিছু উত্তর দিতে পারলেন না রাক্ষস। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— আপনার কি ধারণা একই ব্যক্তি এর জন্যে দায়ী?

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চাণক্য পালটা প্রশ্ন করলেন,

— আপনার কী ধারণা?

— রাজবৈদ্য মহাশয়ের মতে বিষ দুটি ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

— অভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় কি?

— তা যায় না। কিন্তু…

— কিন্তু?

— এখনও অবধি সমস্ত তথ্য ইঙ্গিত করছে যে, রাজকুমারীর সখী কৃষ্ণকলি তার পানীয়ে বিষ দিয়েছে। যদি সে-সম্ভাবনা সত্যি বলেও ধরে নিই, তাহলে প্রশ্ন আসে যে, তার পক্ষে সম্রাটের পানীয়ে বিষ দেওয়া কীভাবে সম্ভব?

— আপনার কথায় প্রতীত হচ্ছে যে, আপনি বিশ্বাস করেন না যে, রাজকুমারীর সখী কৃষ্ণকলি দোষী?

— আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন এখানে গুরুত্বহীন।

চাণক্য কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে রাক্ষসের দিকে চেয়ে থেকে বললেন,

— রাজকুমারীর কক্ষে আজকে আপনি গিয়েছিলেন।

এটা প্রশ্ন নয়, উক্তি বুঝেই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দিলেন না রাক্ষস। চাণক্য প্রশ্ন করলেন,

— কী ছিল সাক্ষাতের উদ্দেশ্য, আমি জানতে পারি?

— আমি কি আপনাকে বলতে বাধ্য?

দু-হাত সম্মুখে তুলে, আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে চাণক্য বললেন,

— একেবারেই নয়! আপনি মগধের অতিথি। বাধ্যবাধকতার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু আর্য, আমি আপনাকে একবার পরিস্থিতির বিচার করতে অনুরোধ করব। আমি জানি আপনি বিচক্ষণ ব্যক্তি। আশা করি, আপনি একথা উপলব্ধি করতে পারবেন যে, আমাকে সব কথা বলাটাই শ্রেয়।

রাক্ষস চুপ করে আছেন দেখে চাণক্য আবার বললেন,

— রাজকুমারী দুর্ধরা আপনার কন্যাসমা তা আমার জানা। এবং, তিনি মগধের ভাবী মহারানি। তাই তাঁর হিতাহিতের দায়িত্ব আমার ও আপনার উভয়েরই ওপরে বর্তায়। এবং, তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, আৰ্য!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমাত্য বললেন,

— বেশ। বলুন, কী জানতে চান?

— রাজকুমারীর সঙ্গে আপনার কী কথা হয়েছিল?

— আমি তাকে বলি যে আরও একবার যেন তিনি ভেবে দেখেন, এই বিবাহ তিনি করতে ইচ্ছুক কি না। কারণ একথা বুঝতে অসীম বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। যে, তিনি শুধুমাত্র পরিস্থিতির চাপে এই বিবাহপ্রস্তাবে রাজি হয়েছেন। পিতা তথা পরিবারের অন্য প্রিয়জনদের হিতের কথা ভেবেই তিনি মত দিয়েছেন। একথা

আপনারও অজানা নয়, আচার্য।

— হুম। আপনি কোন স্থানে বসেছিলেন তাঁর কক্ষে?

রাক্ষস আশা করেছিলেন চাণক্য বিবাহের বিষয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু, চাণক্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন করায় এই প্রথম কিছুটা অপ্রতিভ দেখাল রাক্ষসকে। প্রশ্নের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে তিনি বললেন,

— আপনি যা জানতে চাইছেন তা অনুধাবন করতে পারছি। হ্যাঁ, আমি ঠিক তাঁর আহার্য সাজানো মেজের পাশের আসনেই বসেছিলাম। আপনি কি মনে করেন আমি রাজকুমারী দুর্ধরার পানীয়ে বিষ দিয়েছি

— দিয়েছেন কি?

— অবশ্যই না! যদিও আপনি সম্ভবত আমার কথা বিশ্বাস করবেন না।

চোখে কৌতুকের আভাস ফুটল চাণক্যর। বললেন,

— আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন এখানে অবাস্তর।

— কিন্তু, তাতে আমার লাভ কী? আমার কন্যাসমা দুর্ধরাকে হত্যা করার উদ্দেশ্য কী হতে পারে আমার?

— একাধিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে, আর্য কাত্যায়ন। হতে পারে আপনি পরাজয় স্বীকার করতে পারছেন না নিজের মনে! অথবা, হতে পারে আপনার সঙ্গে ধনানন্দর কোনো মতবিরোধ ঘটেছে। তার প্রতি ক্রোধে আপনি তার কন্যাকে হত্যা করতে চাইছেন। আমি আরও বেশ কিছু সম্ভাবনা আপনার সম্মুখে উপস্থিত করতে পারি, আর্য।

— অযৌক্তিক এবং হাস্যকর! রাজকুমারীকে হত্যার চেষ্টা এবং সম্রাট চন্দ্রগুপ্তকে হত্যার চেষ্টা আপনাদের সুরক্ষা-ব্যবস্থার ব্যর্থতা প্রমাণ করে। অথচ আপনি ‘কৌটিল্যোচিত’ ভঙ্গিতে তা আমাদের দিকেই পরিচালিত করতে চাইছেন! বিন্দুমাত্র উত্তেজনা প্রকাশ পেল না রাক্ষসের কণ্ঠে। সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই কথাগুলো বললেন তিনি।

চাণক্য কিছুক্ষণ তাঁর চোখে চোখ রেখে থাকলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন,

— হুম। শেষ প্রশ্ন। আপনি রাজকুমারীর কক্ষে যতক্ষণ উপস্থিত ছিলেন, ততক্ষণ রাজকুমারী ও তাঁর দুই সখী কী করছিল?

খানিক ভেবে রাক্ষস উত্তর দিলেন,

— রাজকুমারী দুর্ধরা পালঙ্কে বসেই ছিলেন। আর একজন তাঁর কেশে কিছু করছিল, আর একজন পা ধুয়ে দিচ্ছিল!

— বেশ। আচ্ছা, এই ঘটনা ঘটার পর কি রাজকুমারীর সঙ্গে আপনার বা ধনানন্দর সাক্ষাৎ হয়েছে?

— না। শুনলাম তাকে অন্য কক্ষে নিয়ে গিয়ে সুরক্ষা আবর্তে ঘিরে রেখেছে আমাদের এবং মগধের প্রহরীদল। আমাদের তো কিছু জানানোই হচ্ছে না! আমি শুধু এইটুকু জানতাম যে, রাজকুমারীকে বিষ দিয়ে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু ভুলবশত মারা গিয়েছে তাঁর সখী। ঠিক কী ঘটেছে, কে মারা গিয়েছে সেটাও আমার জানা ছিল না। আমি কিছুক্ষণ আগেই সবটা শুনলাম আর্য কৃষ্ণনাথের কাছে।

— হুম! ধন্যবাদ, আর্য।

উঠে দাঁড়ালেন রাক্ষস। বললেন,

— এই বিবাহ তবে স্থগিত হবে না? রাজকুমারী কি এই ঘটনার পরেও বিবাহ করতে রাজি হবেন?

— এখনও বিবাহ লগ্নে বিলম্ব আছে। এখনই কোনো নির্ণয় নেওয়ার সময় আসেনি বলেই আমি মনে করি।

আর কোনো বাক্যব্যয় না করে কক্ষ ত্যাগ করলেন রাক্ষস।

চাণক্য পুনরায় তাঁর পাত্র থেকে কিছুটা পানীয় গলাধঃকরণ করে বললেন,

— জীবসিদ্ধি, এইবার পরবর্তী ব্যক্তিকে ডাকো।

সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে জীবসিদ্ধি দ্বার খুলে বেরিয়ে এল। সম্মুখে বারান্দায় উপস্থিত একজন প্রহরীর উদ্দেশে বলল,

— আর্য ধনানন্দকে গিয়ে জানাও, আচার্য চাণক্য তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অভিলাষী। তাকে এই কক্ষে উপস্থিত হতে বলো। তাকে জানিয়ো যে, এটি সম্রাটের অনুরোধ।

জীবসিদ্ধি ভালোভাবেই জানে যে, রাজার ‘অনুরোধ’ বলে কোনো বস্তু হয় না। তার ‘অনুরোধ’ এবং ‘আদেশ’ সমরূপে ব্যবহৃত দুটি শব্দমাত্র। জীবসিদ্ধি এও জানে যে, এই ‘অনুরোধ’-এর অর্থ ধনানন্দও জানেন।