২৫.
অমাত্য শ্রীশৈল এসে চাণক্যকে প্রণাম জানালেন,
— প্রণাম, মহামতি।
চাণক্য প্রতি-প্রণাম জানিয়ে বললেন,
— প্রণাম, মহামাত্য মহাশয়। আপনাকে আপনার কাজের মাঝে এভাবে ডেকে আনার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু একটা প্রশ্ন করা যে বড়োই জরুরি হয়ে পড়েছে, আর্য। কথা দিলাম এর পর আর কোনো প্রশ্ন আমি আপনাকে করব না।
— কী প্রশ্ন, আচার্য? বলুন?
— মহারাজকে যেদিন হত্যা করা হয়, সেইদিন কি তিনি বার বার জলপান করছিলেন?
এই প্রশ্নে শ্রীশৈলকে এতটাই বিস্মিত মনে হল যেন তিনি কোনো অলৌকিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর পাশে দাঁড়ানো জীবসিদ্ধিও অবাক হল এরকম অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে। কিন্তু শ্রীশৈলর উত্তরে জীবসিদ্ধি আরও বেশি অবাক হল,
হ্যাঁ, তাই তো। আপনি বলায় মনে পড়ছে। মহারাজ সেদিন বারান্দায় দাঁড়ানোর পর থেকেই বার বার জল চাইছিলেন। কিন্তু আপনি কী করে জানলেন সেকথা? এই সামান্য ব্যাপারটা তো আমারই মনে ছিল না। আপনাকে কে বলল?
চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,
— কেউ বলেনি, অমাত্য মহাশয়। এটি আমার যুক্তিনির্ভর অনুমান মাত্র। আমার শেষ সংশয়টুকু দূর করার জন্যে ধন্যবাদ। আপনাকে আর বিব্রত করব না। আগামীকাল উৎসব, আপনি তার প্রস্তুতি কাজে ব্যস্ত, তা আমি জানি। আপনি
আসতে পারেন। ধন্যবাদ।
শ্রীশৈলর মনে প্রশ্ন ছিল কিন্তু চাণক্যর কথার পর আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না, তাই তিনি প্রণাম জানিয়ে কক্ষ থেকে চলে গেলেন। তিনি বেরিয়ে যেতে জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,
— এই প্রশ্নের মানে কী, আচার্য? আপনি জানলেনই-বা কেমন করে এরকম অদ্ভুত তথ্য? দয়া করে আমায় ব্যাখ্যা করুন, আচার্য।
চাণক্য হাত তুলে জীবসিদ্ধিকে থামিয়ে বললেন,
— শান্ত, হে জীবসিদ্ধি, শান্ত। সঠিক সময়ে উত্তর পাবে সব কিছুর। কিন্তু আপাতত আমি নিজের প্রাতঃভোজ সম্পন্ন করব।
***
জীবসিদ্ধি আসনে বসে পা অধৈর্য ভঙ্গিতে নাড়াচ্ছে আর গুরুকে তাড়া দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা অতি কষ্টে সংবরণ করছে।
চাণক্য আহার শেষে নিশ্চিত্ত ভঙ্গিতে, ধীরে-সুস্থে তাঁর মধুমিশ্রিত দুধে চুমুক দিচ্ছেন এবং আড়চোখে জীবসিদ্ধিকে লক্ষ করছেন। জীবসিদ্ধির অধৈর্য ভাবটা ক্রমশই বাড়ছে আর তিনি সেটা দেখে নিজের চুমুকের মধ্যকার সময়ের ব্যবধান আরওই বাড়িয়ে চলেছেন। অন্যতম প্রিয় শিষ্যকে এইরূপ নিরীহ উৎপীড়ন করে তিনি মজা পান।
আধা পেয়ালা শেষ করে তা নামিয়ে রেখে চাণক্য একটি তৃপ্তিসূচক শব্দ করলেন মুখে। তারপর জীবসিদ্ধিকে প্রশ্ন করলেন,
— আগে তোমার মতামত শুনতে চাই। কে মহারাজ সুবর্মার হত্যাকারী?
জীবসিদ্ধি উত্তর দিল,
— হত্যাকারী অবশ্যই শকুনির সেই বিশেষ তিরন্দাজ। কারণ বিন্দু স্বীকার করেছে যে, এই বিশেষ বাণ সাধারণ ধনুর্ধরদের পক্ষে ব্যবহার করা কঠিন। কী উপায়ে সে সকলের চোখের সামনে এই অসম্ভব কাজ সম্ভব করেছে নিজে সম্পূর্ণ অদৃশ্য থেকে তার ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই তা আমি স্বীকার করি। কিন্তু আপনার প্রশ্নের উদ্দেশ্য সেটা নয়। আপনি জানতে চাইছেন যে, এই ঘটনার অন্তরালে কে আছে। বা, কার আদেশে হত্যা করা হয়েছে মহারাজকে। তাই তো?
চাণক্য উত্তর না দিয়েই তাকিয়ে রইলেন জীবসিদ্ধির দিকে। জীবসিদ্ধি নিজেই বলল,
— আমি নিশ্চিত চিত্রবর্মার কাজ এটা। রাজসিংহাসন লাভের আশায় তিনিই তাঁর অগ্রজের হত্যা করিয়েছেন। তবে এই গোটা ষড়যন্ত্র তাঁর একার নয়। এটা সম্পূর্ণ শকুনির মস্তিষ্কপ্রসূত। ওই বিষাক্ত তির ব্যবহার করে হত্যা করার উদ্দেশ্য যাতে পরবর্তীকালে সেই বাণ পাটলিপুত্রে পাঠিয়ে আমাদের এখানে আনা যায়। শকুনি জানত যে, ওই বাণ দেখে আপনি কুলূতে না এসে পারবেন না। আপনাকে আসতেই হবে এখানে।
চাণক্য আবারও প্রশ্ন করলেন,
— আমাদের এখানে আমন্ত্রণ দিয়ে আনার উদ্দেশ্য কী বলে তোমার মনে হয়?
— সেটা কি এতদিনে স্পষ্ট নয়, আচার্য? আপনাকে মগধের সুরক্ষাবলয়ের বাইরে এনে হত্যা করাই তার উদ্দেশ্য। এটা তো জলের মতো পরিষ্কার কয়েক দিন আগে সেই রাতের ঘটনার পর।
চাণক্য দুদিকে ঘাড় নেড়ে বললেন,
— না হে জীবসিদ্ধি, না। এখানেই সবচেয়ে বড়ো ভুল হয়ে গেল তোমার। গোটা ঘটনাটা যে সাজানো সে-বিষয়ে আমি তোমার সঙ্গে একমত। কিন্তু ঘটনা এতটা সরল নয়। না না, ভুল বললাম। আসলে রহস্য অতীব সরল। যাকে জটিল করে সাজানো হয়েছে একটিমাত্র বিশেষ উদ্দেশ্যে।
জীবসিদ্ধি দু-হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল,
— আপনার কথার কোনো মানেই আমি বুঝতে পারছি না, আচার্য।
চাণক্য নিজের কেশশিখায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— বেশ, তোমায় আমি একটা অতি সহজ সূত্র দিচ্ছি। যদি বলি শকুনির সেই রহস্যময় তিরন্দাজ, মহারাজ সুবর্মার হত্যার সময়ে ছিলই না, তবে কি তুমি কিছু অনুমান করতে পারো?
জীবসিদ্ধি কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলল,
— আপনি বলতে চাইছেন কোনো ধনুর্ধর ওই বিশেষ বাণ ব্যবহার করে হত্যা করেছে রাজাকে? আপনি কি… আপনি কি বিন্দুকেই সন্দেহ করছেন?
— একদমই না। আমি কোনো ধনুর্ধর বা প্রতিযোগীকেই সন্দেহ করছি না। সত্যি বলতে আমি কাউকেই সন্দেহ করছি না। কারণ সন্দেহের ধাপ আমি অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি। আমি নিশ্চিতভাবেই জানি হত্যাকারী কে।
— কে?
— আগেই বলেছি, ‘কে?’-র চেয়ে এখানে ‘কীভাবে?’ বেশি জরুরি। কীভাবে হত্যা করা হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরের শেষেই, কে হত্যাকারী তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তাই আগে আমি এই গোটা রহস্যের সবচেয়ে জটিল অংশের, সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যাটা তোমায় বলব। আমার ব্যাখ্যার শেষে তুমি নিজেই নিশ্চিতভাবে বুঝে যাবে হত্যাকারী কে।
শ্বাসরুদ্ধ করে জীবসিদ্ধি শুনছে। চাণক্য বলতে শুরু করলেন,
— আমরা এখনও পর্যন্ত সেইদিন এই প্রাঙ্গণে ও মহলের বারান্দায় উপস্থিত সকলের থেকে হত্যাকাণ্ডর বিষয়ে কী কী জেনেছি তা আরও একবার মনে করা যাক। নীচে প্রাঙ্গণে উপস্থিত সকলে দেখেছে মহারাজ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই পড়ে গেলেন। চিত্রবর্মা আবছাভাবে, মাত্র একমুহূর্তের জন্যে দেখেছিলেন কালোমতো কিছু একটা দ্রুত ছুটে আসে মহারাজের দিকে, যেটা চিত্ৰবৰ্মা কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারেন যে আসলে সেটা একটা বাণ। অমাত্য শ্রীশৈল দেখেছিলেন মহারাজ হঠাৎই টলমল করে পড়ে গেলেন মেঝেতে। দু-জনই মহারাজের দিকে ছুটে যান, চিত্রবর্মা আগে মহারাজের কাছে পৌঁছোন এবং তাঁকে সোজা করতে দেখা যায় তাঁর কণ্ঠের একদিকে বাণ বিদ্ধ হয়ে আছে। এবং, তার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানেই রাজা মারা যান। তাই তো?
— ঠিক তাই।
— এইবার মূল প্রশ্ন হল, কীভাবে হত্যাকারী ধনুকে তির চড়িয়ে, নিক্ষেপ করে এই কাজ করল অথচ কেউ দেখতে পেল না। যদি প্রাঙ্গণে উপস্থিত কেউ, বা, উচু পাঁচিলে থাকা কোনো সৈনিক এই কাজ করে থাকে তবে তাকে নিশ্চিতভাবেই কেউ-না-কেউ দেখতে পেত। আবার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রবর্মা, শ্রীশৈল অথবা তাদের থেকে কিছুটা দূরে দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীদের পক্ষেও ধনুক ব্যবহার করে তির নিক্ষেপ করা সম্ভব নয় সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে। যদি ধরেও নিই যে বারান্দায় সেখানে উপস্থিত সকলেই ষড়যন্ত্রে মিলিত এবং সকলেই মিথ্যা। বলছে তাহলেও একটা সমস্যা থেকে যায়, সেটা হল যে মহারাজ সুবর্মার কণ্ঠে তির বিদ্ধ হয়েছে, অর্থাৎ সামনের দিকে। মহারাজ উৎসবের সময়ে যে বারান্দার থেকে সামনে প্রাঙ্গণের দিকে মুখ করে ছিলেন। অর্থাৎ চিত্রবর্মা, অমাত্য এবং সৈনিকরা ছিল মহারাজের পেছনের দিকে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার সময়ে মহারাজ তাদের দিকে পেছন ফিরে ছিলেন। অতএব তাদের পক্ষে মহারাজের কণ্ঠে ধনুর্বাণ ব্যবহার করে তির বিদ্ধ করা সম্ভব ছিল না।
— তবে? তবে কি আমার সন্দেহই ঠিক? ভিনদেশের প্রযুক্তিতে বানানো কোনো শর নিক্ষেপকারী অস্ত্র?
— যন্ত্র প্রযুক্তির ব্যবহারে উন্নত ও শক্তিশালী হতে পারে জীবসিদ্ধি, কিন্তু অদৃশ্য হতে পারে কি? তাহলে যে সেটা প্রযুক্তি নয়, জাদুবলে। সে-সম্ভাবনার স্থান আমার যুক্তিভিত্তিক বাস্তব ব্যাখ্যায় অপ্রয়োজনীয়। না হে জীবসিদ্ধি, আমি তোমায় আশ্বস্ত করছি কোনোরকম অদ্ভুত, অজানা যন্ত্রের ব্যবহার এই ক্ষেত্রে হয়নি।
জীবসিদ্ধি কিছুটা দমে গেল। হতাশ ভঙ্গিতে বলল,
— তাহলে আপনি বলতে চাইছেন সাধারণ ধনুক ব্যবহার করেই তির নিক্ষেপ করা হয়েছিল? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? সেখানে উপস্থিত এতজনের দৃষ্টি এড়িয়ে কি ধনুকের থেকে বাণ নিক্ষেপ সম্ভব?
— এইবার তুমি সঠিক পথে চলেছ, জীবসিদ্ধি। একদম সঠিক প্রশ্ন। সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে কি একটা ধনুক থেকে বাণ নিক্ষেপ করা সম্ভব? উত্তরটা হল— না। সম্ভব না। কখনোই সম্ভব না।
— তবে?
— এর উত্তর তুমি নিজেই আমায় কয়েক দিন আগে দিয়েছিলে, জীবসিদ্ধি। কথার মাঝে তুমি বলেছিলে যে, যদি-বা সকলের দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে একটি বাণ আনা সম্ভবও হয়, গোটা একটা ধনুক আনা কখনোই সম্ভব না। এটাই এই রহস্যের উত্তর, জীবসিদ্ধি। এই গোটা হত্যাকাণ্ডে ধনুক ব্যবহার করাই হয়নি। মহারাজের মৃত্যু বাণ বিদ্ধ হওয়ার ফলে হয়ইনি। তাঁর মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়! বাণের ফলায় লাগানো বিষ নয়, খাদ্য বা পানীয়র সঙ্গে মুখপথে গ্রহণ করা কোনো বিষের ফলে মৃত্যু হয় মহারাজের।
অবাক বিস্ময়ে জীবসিদ্ধির মুখ হাঁ হয়ে গিয়েছে। কথা বলতে ভুলে গিয়েছে সে। তার মাথায় সব আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে। জীবসিদ্ধিকে বিস্ময়ের ভাব কাটিয়ে ওঠার সুযোগ না দিয়েই চাণক্য পুনরায় বলে উঠলেন,
— হ্যাঁ, জীবসিদ্ধি। আমার বিশ্বাস মহারাজ সুবর্মাকে সেদিন উৎসব শুরুর ঠিক আগেই বিষ দেওয়া হয়েছিল খাদ্য বা পানীয়র মাধ্যমে। এমন কোনো বিষ যা প্রভাব দেখানো শুরু করে ধীরে ধীরে। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে তা মানুষের শরীরে ছড়িয়ে যায় এবং একসময়ে হৃদগতি স্তব্ধ করে। মহারাজ উৎসব দেখেছিলেন দাঁড়িয়ে, শরীরে ধীরে ধীরে অস্বস্তি বাড়ছিল। তিনি তাই বার বার জল পান করছিলেন। কারণ ততক্ষণে বিষ রাজার শরীরে তার ক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। এ ধরনের বেশিরভাগ বিষের প্রাথমিক উপসর্গ হল বার বার গলা শুকিয়ে যাওয়া। সব সূত্র থেকেই আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম যে, মহারাজকে বিষ দেওয়া হয়েছিল। তাই একটু আগেই মহামাত্যকে প্রশ্ন করলাম যে, রাজা সেদিন বার বার জল খেতে চাইছিলেন কি না। তার উত্তর থেকে আমার যুক্তিনির্ভর অনুমান এইবার নিশ্চিত সত্য বলে প্রমাণিত হল। মহারাজ সুবর্মাকে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এবং, সে-বিষ তাঁর শরীরে তিরবিদ্ধ হওয়ার পূর্বেই প্রবেশ করেছিল।
২৬.
অনেকক্ষণ কথা বলায় চাণক্যর গলা শুকিয়ে গিয়েছে। তাই আরও একচুমুক দুধে গলা ভিজিয়ে নিয়ে তিনি আবার শুরু করলেন,
— ভেবে দেখো, প্রাঙ্গণে উপস্থিত দর্শকরা কী দেখেছিল। তারা দেখেছিল যে, মহারাজ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই মেঝেতে পড়ে যান। বারান্দায় উপস্থিত থাকা প্রত্যেকে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পায় মহারাজের গলায় তির বিদ্ধ হয়ে আছে। অতএব সকলে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিল যে, রাজা তিরের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। আমার এখানেই প্রথম সন্দেহ জাগে। তির সামনে থেকে এসে বিধলে, রাজা সুবর্মার পড়া উচিত পিঠের দিক করে, বুকের দিকে নয়। কারণ ছুটে আসা তিরের ধাক্কায় তাঁর শরীর পিছিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু সকলেই বলেছে যে মহারাজ উলটো হয়ে পড়েছিলেন যে কারণে প্রথমে কেউই তির দেখতে পায়নি।
চাণক্য নিজের আঙুল নিজের কণ্ঠের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন,
— দ্বিতীয় যে বিষয়টা ঠিক মেলাতে পারছিলাম না সেটা হল তির বিদ্ধ হওয়ার ভঙ্গি। সকলেই বলেছে যে, বাণের গোটা ফলাটাই প্রায় গলায় গেঁথে গিয়েছিল। অথচ বিন্দুর সাহায্যে করা পরীক্ষার ফলে এটা স্পষ্ট যে, পাঁচিল থেকে হোক বা নীচের প্রাঙ্গণ, কোনো স্থান থেকেই বাণ নিক্ষেপ করে সেটা সম্ভব নয়। যদি-বা কোনো অত্যন্ত প্রতিভাধর ধনুর্ধরের নিক্ষেপ করা বাণ বারান্দায় দাঁড়ানো কোনো মানুষের শরীর বিদ্ধ করতে সক্ষমও হয়, তবে সেই বাণের মধ্যে এতটা গতি অবশিষ্ট থাকতে পারে না যে, সেটা গোটা ফলা অবধি ঢুকে যাবে মানুষের শরীরে। কিন্তু রাজা সুবর্মার ক্ষেত্রে ঠিক সেইটাই হয়েছিল। কোনো ধনুক ব্যবহার করেই সেটা সম্ভব নয়। এবং, এই ক্ষেত্রেও ধনুক ব্যবহার হয়নি।
মহারাজকে আগেই বিষ দেওয়া হয়েছিল। হত্যাকারী অপেক্ষাতেই ছিল কখন বিষ কাজ করা শুরু করবে এবং মহারাজ সুবর্মা ঢলে পড়বেন মৃত্যুর কোলে। কিন্তু পরবর্তী পদক্ষেপের জন্যে একটা বিষয় অত্যন্ত জরুরি ছিল, মহারাজের মৃত বা প্রায় মৃত শরীর মেঝেতে ঢলে পড়ার পর বাকি নাটকটা মঞ্চস্থ করার জন্যে হত্যাকারীকে মৃতদেহের কাছে সবচেয়ে প্রথমে পৌঁছানো ছিল আবশ্যক। তাই সে কিছুটা এগিয়েই গিয়েছিল মহারাজের পতনের আগে থেকেই তার দিকে। মহারাজ পড়ে যেতেই সে সবার প্রথমে ছুটে গেল তাঁর কাছে এবং বসে পড়ল বারান্দায় উপস্থিত অন্যদের দিকে পিঠ করে। মহারাজ পড়েছিলেন বুকের উপর ভর করে। হত্যাকারী তাঁকে সোজা করল, নিজের অঙ্গবস্ত্রের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা একটি বিষাক্ত বাণ বের করল এবং সজোরে গেঁথে দিল মৃতদেহের কণ্ঠে। গোটা ব্যাপারটাই ঘটল মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে। নীচে প্রাঙ্গণে থাকা লোকেদের বা দুর্গের প্রাচীরে দাঁড়ানো প্রহরীদের কারুর পক্ষেই দেখা সম্ভব ছিল না নীচু পাঁচিল ঘেরা বারান্দার আড়ালে কী ঘটল। আবার সেই ঘটনা বারান্দায় সেসময়ে উপস্থিত থাকা কেউই প্রত্যক্ষ করল না কারণ রাজার শরীরের উপরের অংশ আড়াল করে ছিল তাঁর সামনে ঝুঁকে বসে থাকা হত্যাকারীর শরীর। সকলে এগিয়ে এল এবং দেখল মহারাজের কণ্ঠে তির গেঁথে আছে এবং ধরেই নিল যে যখন মহারাজ বারান্দার ধারে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা দেখেছিলেন সেই সময়েই কেউ সম্মুখ থেকে তাঁর দিকে বাণ নিক্ষেপ করেছে।
আরও একচুমুকে অনেকটা দুধ গলায় ঢেলে চাণক্য বললেন,
— হত্যার পদ্ধতিটা যখন বুঝতেই পারলে তখন আশা রাখি হত্যাকারী কে সেটা বুঝতে আর অসুবিধা থাকে না।
জীবসিদ্ধি উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল,
— চিত্রবর্মা!
— হুমম। ভেবে দেখো, আমরা যে কয়েক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি সেদিনের ঘটনা নিয়ে, তাদের মধ্যে একমাত্র একজনই বলেছে যে, সে বাণের মতো কিছু একটা উড়ে আসতে দেখেছে, যেটা নিঃসন্দেহে মিথ্যা কথা। চিত্রবর্মা এই কথা ইচ্ছা করে বলেছিল আমাদের ও অন্য সকলকে বিভ্রান্ত করতে। তার কথায় সকলেরই মনে এই ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে, তারা মহারাজকে বাণ বিদ্ধ হয়ে মেঝেতে ঢলে পড়তে দেখেছে। কিন্তু বাস্তবে কেউই মহারাজকে শরবিদ্ধ হতে দেখেনি। তারা শুধুই তাঁকে পড়ে যেতে দেখেছিল মেঝেতে। আসলে মহারাজ প্রথমে ঢলে পড়েছিলেন এবং তার পরে সকলের দৃষ্টির আড়ালে বাণ দ্বারা বিদ্ধ হয়েছিলেন। চিত্রবর্মা অত্যন্ত সুকৌশলে সকলকে বিভ্রান্ত করেছেন।
তুমি এইবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে, তুমি রহস্য সমাধানের কতটা কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলে হে, জীবসিদ্ধি। যখন তুমি বলেছিলে যে, বাণ বা ছুরির মতো ছোটো জিনিস নিজের বস্ত্রের মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু ধনুক লুকিয়ে রাখা সম্ভব না। এক্ষেত্রে ঠিক সেই কৌশলটাই ব্যবহার করা হয়েছে। তিরবিদ্ধ মৃতদেহ দেখে সকলেই ধরে নেবে যে, ধনুকের সাহায্যে নিক্ষেপ করা বাণের আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে। এমনকী মৃতদেহের শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা গেলেও কারুর সন্দেহ হবে না কারণ বাণের ফলায় তীব্র মারণ বিষ আছে। কেউ ধারণাই করতে পারবে না যে, মহারাজের মৃত্যু যে বিষে হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকারের। তিরের ফলার বিষ প্রায় তৎক্ষণাৎ প্রাণ নেয়। আর মহারাজকে আগেই যে বিষ দেওয়া হয়েছে তা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে কিছুটা সময় নিয়ে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের কেশশিখায় অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে চাণক্য বললেন,
— গোটা বিষয়টা যে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত এবং সেই ব্যক্তি কে তা আশা করি বুঝতে পারছ? কয়েক বছর আগে পাটলিপুত্রর রাজমহলের অন্দরে গান্ধারের দূতের হত্যা, নকল স্বর্ণমুদ্রার ঘটনা আর এই কুলূতের হত্যাকাণ্ডর মধ্যে মিল পাচ্ছ না, জীবসিদ্ধি? প্রথম ক্ষেত্রে একটি বিষাক্ত শলাকা, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তক্ষশিলায় অলৌকিক উপদ্রব আর এইবার এই তির ব্যবহার। এই সবগুলি ব্যবহার হয়েছে মূল সমাধান বা মূল সমস্যা থেকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে। ‘তির- ধনুক’ দুটি শব্দ একে অন্যের সঙ্গে সর্বদা অবিচ্ছেদ্য। সকলেই ধরে নেয় বিনা তিরে ধনুকের গুরুত্ব নেই আবার ধনুর ব্যবহার ছাড়া তিরের কোনো ব্যবহার নেই। অথচ এখানে ঠিক সেটা করা হয়েছে। এই কৌশল চিত্রবর্মা ব্যবহার করলেও আসলে এ যে আচার্য শকুনির মস্তিষ্কের ফসল সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত! এত সহজ একটি কৌশল, অথচ কতটা কঠিন তার সমাধান সেটা ভাবো। যে সমাধান করার জন্যে একজন নিরীহ মেধাবী মানুষকে প্রাণ দিতে হল।
— কে? কার কথা বলছেন?
— তাঁর কথা বলছি যিনি আমারও আগে হত্যার আসল পদ্ধতিটা ধরে ফেলেছিলেন। এবং, তাই তাঁকে প্রাণ দিতে হল- রাজবৈদ্য চক্রাচার্য!
২৭.
— বোধগম্য হল না। বৈদ্য হত্যার পদ্ধতি ধরে ফেলেছিলেন? কিন্তু তাহলে সেকথা তিনি আপনাকে সেইদিন জানাননি কেন?
জীবসিদ্ধির প্রশ্নের উত্তরে দু-দিকে ঘাড় নেড়ে চাণক্য বললেন,
— না জীবসিদ্ধি, তিনি তখনও পর্যন্ত জানতেন না। তিনিও অন্য সকলের মতোই প্রথমে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি সত্য অনুমান করেছিলেন। অন্তত আংশিকভাবে তিনি রহস্যের সমাধান করতে পেরেছিলেন। প্রথমে মৃতদেহে বিধে থাকা তিরের ফলায় বিষ থাকায় তিনিও ধরেই নিয়েছিলেন যে, মৃতদেহে যে সমস্ত বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা গিয়েছে সেগুলো সেই বিষাক্ত বাণেরই প্রভাবে হয়েছে। তাই তিনি মৃতদেহের পাকস্থলীতে থাকা অপাচ্য খাদ্য পরীক্ষা করেননি সেই সময়ে। কিন্তু পরবর্তীকালে আমার সঙ্গে আলোচনায় আমি সে-প্রসঙ্গ তুলি। সত্যি বলতে আমিও কিন্তু সেইসময়ে একবারের জন্যেও ভাবিনি যে, রাজাকে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আসলে তুমি তো জানোই যে, আমি যে বৃহৎ ‘অর্থশাস্ত্র’ রচনা করছি তাতে মৃতদেহ পরীক্ষা নিয়ে একটি অধ্যায় রাখছি। সেই উদ্দেশ্যেই শব ব্যবচ্ছেদ নিয়ে আমার অধ্যয়ন ও কৌতূহল দুইই আছে। আমি সেই কৌতূহলবশেই সেইদিন মৃতদেহে বিষাক্ত খাদ্য উপস্থিত কি না তা পরীক্ষা পদ্ধতির প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। সেটাই বৈদ্যর জীবনে কাল হয়ে এল।
.
আফশোসের দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাণক্য বললেন,
— আমার কথায় বৈদ্য চক্রাচার্যর মনের গভীরে একটা প্রশ্ন অঙ্কুরিত হল। তার মনে হল, সত্যিই তো, তিনি আলাদা করে মৃতর পেটে থাকা অপাচ্য খাদ্যের পরীক্ষা করেননি। যদি তাতেও বিষ থেকে থাকে? কিন্তু এখন তো আর উপায় নেই। কারণ সুবর্মার মৃতদেহ একমাস পূর্বেই ভস্মীভূত হয়েছে। তবে? এখন কী উপায়? এই ভাবনায় তিনি প্রচুর অধ্যয়ন করলেন। খুঁজলেন যে কিছু তাঁর নজর এড়িয়ে গিয়েছে কি না। আর তখনই তাঁর নজর ওই যে তোমার পাশে রাখা পুস্তকের একটি অংশে পড়ল, যে অংশটা তুমি একটু আগে পাঠ করলে। মৃতদেহ চিতার অগ্নিতে ভস্ম হয়ে যাওয়ার পরেও যদি দেখা যায় যে, পাকস্থলী সম্পূর্ণ ভস্ম হয়নি, তবে বুঝতে হবে যে পাকস্থলীতে কোনো বিষাক্ত পদার্থ ছিল! বৈদ্য তাঁর মনের সন্দেহ পরীক্ষা করার একটা উপায় পেলেন। তিনি ভাবলেন যদি এটা জানা যায় যে, মহারাজ সুবর্মাকে দাহ করার সময়ও এটা ঘটেছিল কি না, তবে বোঝা যাবে মহারাজের পেটে বিষ ছিল কি না।
এদিকে মহারাজ সুবর্মার মারা যাওয়ার কথা যেহেতু গোপন রাখা হয়েছে অতএব ধরে নেওয়া যায় মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েক জন দেহ স র সময়ে সেখানে উপস্থিত ছিল। তাদের কারুর থেকে জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পেয়ে যাবেন বলে ভাবলেন তিনি। এবার, কে ছিল সেখানে মৃতদেহ সৎকারের সময়ে? সেকথা ভাবতে প্রথমেই তাঁর মাথায় এল চিত্রবর্মার নাম, যে কিনা আবার বৈদ্যর মিত্রস্থানীয়। নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস ভাবো জীবসিদ্ধি, বৈদ্য তাঁর সন্দেহের নিরসন করতে গেলেন স্বয়ং হত্যাকারীর কাছে।
বিস্মিত জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,
— তার মানে চিত্রবর্মাই চক্রাচার্যকে হত্যা করেছে?
গম্ভীর মুখে উপর-নীচে মাথা নাড়ালেন চাণক্য,
— হুমম। অনুমান করতে পারি, যখন সেইদিন চিত্রবর্মা ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন রথে, পথেই তাঁর দেখা হয় চক্রাচার্যর সঙ্গে। তিনি নিজের সন্দেহের কথা জানান চিত্রবর্মাকে। চিত্রবর্মার মাথায় বলতে গেলে বজ্রপাত হল। চিত্রবর্মা বুঝতে পারল যে, বৈদ্যর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না! কারণ একবার চক্রাচার্য যদি নিজের সন্দেহের কথা আমায় বলে তবে আমি নিঃসন্দেহে হত্যা-পদ্ধতিটি ধরে ফেলব। বৈদ্য তাঁর সরল প্রকৃতিতে তাঁকে সন্দেহ না করলেও আমি কিন্তু সহজেই বুঝে যাব হত্যাকারী কে যদি একবার রাজার খাদ্যে বিষ থাকার কথা আমি জানতে পারি। অতএব চিত্রবর্মা বুঝল যে, নিজেকে বাঁচানোর _ স্বার্থে রাজবৈদ্যর মুখ চিরতরে বন্ধ করতেই হবে।
চিত্রবর্মা আর বৈদ্যর মধ্যে সেইদিন কী কথোপকথন হয়েছিল আমার জানা নেই। কিন্তু অনুমান করতে পারি চিত্রবর্মা একান্তে গোপন কথা আলোচনার অজুহাতে বৈদ্যকে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। যেহেতু আগে থেকে কাউকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে চিত্রবর্মা মহল থেকে বেরোয়নি অতএব তার কাছে নিজের তরবারিটি বাদে অন্য কোনো অস্ত্র ছিল না। তাই নিজের তরবারি দিয়েই সে চক্রাচার্যকে হত্যা করে। তার শরীরের সামান্য অলংকার খুলে নেয় যাতে মনে হয় এ কাজ দস্যুদের।
খানিক থেমে চাণক্য বললেন,
— মনে করে দেখো, বৈদ্য যেদিন খুন হলেন সেইদিনই আমি একটা বিষয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম। হত্যাকারী বৈদ্যকে হত্যা করে সেই অস্ত্রে লেগে থাকা রক্ত তারই অঙ্গবস্ত্রে মুছে নিজের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। রক্তাক্ত অস্ত্র মৃতদেহের সঙ্গে ফেলে আসা অধিক সহজ নয় কি? তাহলে কেন হত্যাকারী অস্ত্র হত্যাস্থলেই ত্যাগ করল না? তার কারণটা এখন স্পষ্ট। বৈদ্যকে চিত্রবর্মা হত্যা করেছিল নিজেরই তরবারি দিয়ে, যার হাতলে রাজচিহ্ন খোদাই করা আছে। অতএব সে-অস্ত্র তার পক্ষে ঘটনাস্থলে ফেলে আসা কোনোমতেই সম্ভব ছিল না।
.
চক্রাচার্যর মৃতদেহর কথা স্মরণে এল জীবসিদ্ধির। গোটা রহস্য তার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। চাণক্য অন্যমনস্কভাবে কেশশিখায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— বৈদ্যর গৃহে গিয়ে তাঁর অধ্যয়ন কক্ষে ছড়িয়ে থাকা বই দেখে আমার মনে সন্দেহ হয় যে, সম্ভবত তিনি কোনো এক পুথিতে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছেন যার ফলে তাঁকে হত্যা করা হল। হয়তো আমিও সেই তথ্য খুঁজে পাব যদি ভাগ্যদেবতা সহায় হয়। অতএব গোপনে সেইসমস্ত পুস্তক ও ভূর্জপত্র এখানে আনালাম। কারণ তোমারই মতো আমিও প্রথম দিন থেকেই চিত্রবর্মা ও শ্রীশৈলকে বিশ্বাস করিনি। তাই আমি চাইনি কেউ জানুক যে, আমি সেইসমস্ত পুস্তক পড়েছি। এবং, দু-দিন প্রচুর পুস্তক পাঠের পর অবশেষে তোমার হাতে ধরা ওই ভূজপত্রে, ওই বিশেষ অংশটি খুঁজে পাই। এরপর যতই ভাবতে থাকি, ততই প্রতিটা সূত্ৰ একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকল। এতদিন ধরে গোটা রহস্যের উপর থাকা অস্বচ্ছ পর্দাটা ক্রমশ সরে যায়। একবার এই বাণ-রহস্যের সমাধান হতেই বাকিটা সহজেই ধরা দিল।
.
জীবসিদ্ধির চোয়াল শক্ত হল। বলল,
— এর অর্থ দাঁড়ায় যে, চিত্রবর্মাও আচার্য শকুনির সঙ্গে তাঁর অশুভ ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়েছে।
— হুমম। অতএব, উত্তর-পশ্চিমের যে সকল জনপদ মগধের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছে, তার সংখ্যা পাঁচ নয়, ছয়। মলয়কেতু আর চিত্রবর্মা শত্রু নয়, বরং তারা একত্রে লিপ্ত হয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তে। কুলূতের সীমান্তে পর্বত্যকা রাজ্যের সেনাশিবির যে শুধুমাত্র একটি সাজানো নাটকের অংশ তা নিশ্চয়ই তুমি পূর্বেই অনুমান করতে পেরেছ। এটা করা হয়েছে যাতে চিত্রবর্মার কথায় আমরা সহজে বিশ্বাস করি; যাতে মগধ বিশ্বাস করে যে, মলয়কেতু কুলুতে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে। সেটাও আমাদের বিভ্রান্ত করার আরও একটা প্ৰচেষ্টা মাত্র।
চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,
— ভেবে দেখো হে, জীবসিদ্ধি। যদি মলয়কেতুর উদ্দেশ্য সত্যিই কুলত আক্রমণের হয়ে থাকত, তবে তারা গত একমাস ধরে অপেক্ষা কেন করে থাকবে? শুধুমাত্র মহারাজ সুবর্মা বেঁচে আছেন এই কারণে তারা কুলূতের সীমান্ত অতিক্রম করবে না এই যুক্তি কি আদৌ বাস্তবসম্মত?
জীবসিদ্ধি কিছুক্ষণ ভেবে প্রশ্ন করল,
— শুধুই কি চিত্রবর্মা নাকি সঙ্গে শ্রীশৈলও এই চক্রান্তে জড়িত?
— নাহ্। তিনি জড়িত থাকলে একটু আগে আমার প্রশ্নের উত্তরে সত্য বলতেন না। মহারাজের বার বার গলা শুকিয়ে যাওয়ার কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছেন সত্যিই। তিনি জড়িত থাকলে আমায় মিথ্যা বলতেন যে, সেরকম কিছুই ঘটেনি ওইদিন। তিনি মহারাজের হত্যার সঙ্গে জড়িত নন। তবে…
কথা শেষ না করে কিছু ভাবতে শুরু করলেন চাণক্য। জীবসিদ্ধির প্রশ্নে তাঁর চিন্তায় ছেদ পড়ল,
— তাহলে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, আচার্য? চিত্রবর্মাকে কি বন্দি করার নির্দেশ দেব আমাদের সেনাকে?
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায় জীবসিদ্ধি বলল,
— ওহ্! আরও একটা সংবাদ আপনাকে জানাই। গতকালকেই মগধের সেনা গোপনে প্রবেশ করেছে নাগরে। ছোটো ছোটো দলে আসায় কেউ সন্দেহ করেনি। তারা ইতিমধ্যে দুর্গের অন্দরে প্রবেশ করেছে এবং চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। আপনি আদেশ দিলেই এই দুর্গ আমরা দখল করতে পারি।
চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,
— যাক, সময়মতো কাজ হয়েছে। কুলূতে প্রবেশ করার দিন, চিত্রবর্মাকে বলা একটা সামান্য মিথ্যা আমাদের পক্ষে লাভজনক হয়েছে। চিত্রবর্মা প্রশ্ন করায় আমরা জানিয়েছিলাম মগধ সেনা আমাদের দু-দিন পর রওনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দু-দিন পূর্বেই কয়েকশো সেনা রওনা দিয়েছিল কুলূতের উদ্দেশে। তুমি পূর্বেই অনুমান করেছিলে যে, মূল সেনাবাহিনীকে পথে বিলম্বিত করার বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। চওড়া পাহাড়ি পথে ধস নামিয়ে সে-চেষ্টা ইতিমধ্যে করা হয়েছে। আমাদের শত্রুরা জানে যে, সেনা এখানে পৌঁছাতে আরও অন্তত তিনদিন সময় লাগবে। কিন্তু তারা যেটা জানে না তা হল, বিভিন্ন ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে, পায়ে হাঁটা পাহাড়ি পথে ইতিমধ্যে মগধের কয়েকশো সৈনিক এসে পৌঁছেছে এখানে। এরকম একটা দুর্দান্ত পরিকল্পনা ভেবে বের করার জন্যে তোমায় সাধুবাদ জানাই। কুলুতের এই দুর্গ দখল আমরা করতেই পারি। কিন্তু একটা সমস্যা আছে, জীবসিদ্ধি।
— কী সমস্যা, আচার্য?
— ভুলে যেয়ো না আমাদের কাছে কিন্তু চিত্রবর্মার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। সে গোটা বিষয়টা অস্বীকার করলে আমরা কী করব?
বিব্রত হল জীবসিদ্ধি। বলল,
— তাহলে এখন উপায়?
চাণক্যর দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন,
— আরও একদিন আমরা চিত্রবর্মার এই নাটকে অংশগ্রহণ করব। তবে এইবার নাটকের লিপি আমরা লিখব। এই নাটকের সূত্রপাত আমাদের শত্রুরা করেছে, কিন্তু এর যবনিকাপাত আমরা করব হে, জীবসিদ্ধি।
তখনই কথায় বাধা পড়ল। দরজায় কেউ করাঘাত করল। জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,
— কে?
বাইরে থেকে উত্তর এল,
— গান্ধার থেকে জরুরি সংবাদ এসেছে, ব্রাহ্মণদেব।
২৮.
আচাৰ্য,
প্রণাম নেবেন। অস্ত্রনির্মাতা বাবাক নিখোঁজ। আমরা সর্বক্ষণ তার গৃহের উপর নজর রাখছিলাম। অথচ সে নিজের গৃহের মধ্যে থেকেই অদৃশ্য হয়েছে। ঠিক যেন কোনো জাদুবলে হাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে গিয়েছে নিজের গৃহের চার দেয়ালের অন্দর থেকেই। তার পুত্রও আমাদের মতোই হতবাক। সন্দেহ করছি শকুনির লোক বাবাককে অপহরণ করেছে। কিন্তু কীভাবে এ সম্ভব হল জানা নেই।
বাবাক আমাদের হাতের একমাত্র সূত্র ছিল শকুনি অবধি পৌঁছানোর। আপনার উপস্থিতি এই পরিস্থিতিতে একান্ত কাম্য।
ইতি,
আপনার একান্ত অনুগত ছাত্র,
শশাঙ্ক।
পত্র হাতে নিয়ে চাণক্য কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তাঁর কপালে ভ্রূকুটি।
শকুনি পর্বত্যকা রাজ্যে মলয়কেতুর মহলে যাতায়াত করলেও তা করে সম্পূর্ণ গোপনে, অতি সন্তর্পণে। সেটা তার স্থায়ী ঠিকানা নয়। তার সকল ক্রিয়াপ্রণালী সে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য কোনো স্থান থেকে। এই কেন্দ্রস্থলটার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত শকুনির অন্ত সম্ভব নয়। কোন রাজ্যে বসে শকুনি তার চক্রান্ত সাজাচ্ছে তা জানা প্রয়োজন। এমন কোনো স্থান যেখানে সে সকলের নজরের আড়ালে থাকছে, অথচ আর্যাবর্তর সকল সংবাদ তার নখদর্পণে থাকে। অথচ গত দু-বছরে গোটা আর্যাবর্ত খুঁজেও এরকম কোনো স্থান পাওয়া যায়নি। একমাত্র সূত্র ছিল এই বাণ। চাণক্যর উদ্দেশ্য যদি এই সূত্র ধরে একবার শকুনির ধনুর্ধরকে বন্দি করা যায়, তবে তার থেকে শকুনির মুখ্য কার্যালয়ের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হবে।
এহেন অবস্থায় যদি বাবাক মগধের গুপ্তচরদের বজ্রমুষ্টি থেকে বেরিয়ে যায়, তবে গত দু-বছরের সকল প্রচেষ্টা বৃথা হয়ে যাবে।
পত্র জীবসিদ্ধিও পাঠ করেছে। সেও চাণক্যর মতোই বিস্মিত। নিজের মনেই জীবসিদ্ধি বলে উঠল,
— এটা কীভাবে সম্ভব? আগের পত্র থেকে তো মনে হয়েছিল শশাঙ্ক আর তার গুপ্তচররা সম্পূর্ণ সুরক্ষাবর্তে ঘিরে রেখেছে বাবাককে। তবে সে কীভাবে তাদের চোখে ধুলো দিল? মিত্র শশাঙ্ক মূর্খ নয়, বরং সে অতি চতুর। তবে?
চাণক্য মাথা নেড়ে বললেন,
— এ হতে দেওয়া যায় না, জীবসিদ্ধি। আগামীকালই আমরা রওনা হব। সবচেয়ে দ্রুতগামী দুটো ঘোড়া তৈরি রাখতে বলো। মগধের সম্পূর্ণ সেনা এখানে রেখে আমরা দু-জন গান্ধারের উদ্দেশে যাত্রা করব।
— আর এখানকার পরিস্থিতি?
— আগামীকালই যে কুলূতের প্রতিষ্ঠাদিবস। এবং, কালকেই এখানকার ঘটনাক্রমের শেষ ধাপ ঘটবে। আগামীকালই কুলূতের পতন হবে এবং মগধের সেনা দখল নেবে রাজধানীর। পরবর্তী পদক্ষেপ সেনাপতি নিজেই নিতে পারবেন। তার জন্যে আমাদের এখানে সশরীরে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন হবে না।
— বেশ। কিন্তু কী হতে চলেছে আগামীকাল, গুরুদেব?
.
চাণক্য উত্তর না দিয়ে কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলেন জীবসিদ্ধির দিকে। হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন জীবসিদ্ধির দিকে। তার কাঁধে হাত রেখে অদ্ভূত কণ্ঠে বললেন,
— নিজের গুরুকে ক্ষমা করো, জীবসিদ্ধি। আমি নিজের অজান্তেই তোমার জীবন বিপন্ন করে ফেলছিলাম। একটি সরল সত্য আমি এতদিন চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও দেখতে পাইনি। কৌটিল্য বোধ হয় বাস্তবেই বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে হে, জীবসিদ্ধি।
জীবসিদ্ধি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল গুরুর দিকে। চাণক্যর মুখে এ ধরনের কথা কোনোদিন আগে শোনেনি জীবসিদ্ধি।
— আপনি কী বলছেন, আচার্য? আমি অনুধাবন করতে পারছি না আপনার কথার অর্থ।
চাণক্য জীবসিদ্ধির চোখে চোখ রেখে বললেন,
— তুমি কি এখনও বুঝতে পারছ না যে, কুলুতের এই গোটা চক্রান্তের মূল উদ্দেশ্য কী? কেন আমাদের এখানে ডেকে আনা হল আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে সেই অশুভ বাণটি পাঠিয়ে? কেন মহারাজ সুবর্মাকে এরকম অদ্ভুত কৌশলে মরতে হল? কেন মহারাজের ভূমিকায় তোমাকে অবতীর্ণ হতে বলা হল? কেন মলয়কেতু ফাঁকা সেনা ছাউনি ফেলে অপেক্ষা করছে কুলূতের সীমান্তে? কেন এত মিথ্যা আমাদের চারিদিকে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে?
— কেন বুঝতে পারব না? কারণটা অতি সরল। আপনাকে মগধের বাইরে এনে হত্যার চেষ্টা করতে এই গোটা চক্রান্ত রচনা হয়েছে।
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু-দিকে তীব্র অসন্তোষের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন চাণক্য।
— না হে জীবসিদ্ধি, না। এখানেই ভুল। গোটা চক্রান্ত আমাকে মগধের বাইরে বের করে আনার জন্যে করা হয়নি, জীবসিদ্ধি। এই জাল রচনা করা হয়েছে তোমাকে মগধের বাইরে আনতে! গোটা ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হল তোমাকে হত্যা করা! হ্যাঁ জীবসিদ্ধি, শকুনির লক্ষ্য আমি নই। শকুনির মূল লক্ষ্য তুমি!
.
এত কম সময়ের ব্যবধানে জীবসিদ্ধি কখনো এতবার পর পর বিস্মিত হয়নি। তার মস্তিস্ক এইবার ধীরে ধীরে সমস্ত সূত্র যেন জুড়ে ফেলতে পারছে। একটা আবছা চিত্র ফুটে উঠছে তার মনে।
চাণক্য বললেন,
— এইবার বুঝতে পারছ, জীবসিদ্ধি? সব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হচ্ছে কি? জীবসিদ্ধি শুধু দুটি শব্দ বলতে পারল,
— কিন্তু কেন?
— কারণটা আমি বলেছিলাম বহু আগেই, জীবসিদ্ধি। আমি বলেছিলাম যে, তুমি শত্রুদের জন্যে ক্রমেই ভয়ানক হয়ে উঠছ। মগধের শক্তির যে কয়েকটি স্তম্ভ আছে তার মধ্যে একটি হল মগধের শক্তিশালী গুপ্তচর বাহিনী; যারা গোটা আর্যাবর্তর প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে। ঠিক যেন কোনো অষ্টপাদ মাকড়সার জাল যার একটি সরু শাখায় সামান্য আলোড়ন হলেও তা জানতে পারে কেন্দ্রে বসে থাকা সদাসতর্ক অষ্টপাদ। সে থাকতে মগধ সুরক্ষিত! কারণ সে থাকতে দেশের শেষপ্রান্তে যদি কোনো বৃক্ষ থেকে একটি পত্রও অসময়ে খসে পড়ে, তা আমার ও চন্দ্রগুপ্তর কানে পৌঁছে যায় তোমার মাধ্যমে। সেই জালের একটি শাখা কেটে দিলেও লাভ হয় না কারণ অষ্টপাদটি সেই জাল আবার পুনরায় বিস্তার করে। অতএব এই জালকে অকার্যকর করার একমাত্র উপায় সেই জালের কেন্দ্রে থাকা মূল অষ্টপাদকে শেষ করা। মগধের এই গুপ্তচর বাহিনীর জাল যে তোমারই বিস্তার করা, জীবসিদ্ধি। তুমিই সেই জালের কেন্দ্রে থাকা সদাসতর্ক মাকড়সা। তাই তোমাকে সরাতে পারলে মগধকে চরম আঘাত করা যাবে! মগধের এই শক্তিশালী গুপ্তচর চক্র সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। অভেদ্য মগধ হয়ে পড়বে দুর্বল, জেয়!
উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরময় পদচালনা শুরু করল জীবসিদ্ধি। বিড়বিড় করে বলল,
— বুঝতে পারছি। এইবার গোটা চিত্র পরিষ্কার হচ্ছে। গত বছর চন্দ্রগুপ্ত আর দুর্ধরার বিবাহের সময়ে পাটলিপুত্রে গিয়ে চিত্রবর্মা আমায় দেখে। আমার সঙ্গে তার অগ্রজ রাজা সুবর্মার চেহারার সাদৃশ্য তার চোখে পড়ে। পরবর্তীকালে শকুনির সঙ্গে তার যোগাযোগ হলে এই কথাটি শকুনিকে কথাপ্রসঙ্গে সম্ভবত বলে ফেলেছিল চিত্রবর্মা। আর সেই তথ্য জানতে পেরেই এই সুবিশাল ষড়যন্ত্র রচনা করেন আচার্য শকুনি। হত্যা করা হয় রাজাকে। সুকৌশলে ব্যবহার করা হয় সেই বিশেষ বাণ। শকুনির নির্দেশে মলয়কেতুর সেনা ছাউনি ফেলে কুলূতের সীমান্তে। এই কারণেই পত্রে আমায় আসার জন্যে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছিল। আমরা ভাবি যে সত্যিই কুলূত বিপন্ন। আমরা এখানে এলাম এবং শকুনির জালে ধরা দিলাম।
— হ্যাঁ, জীবসিদ্ধি। এবং, নিশ্চিতভাবেই জেনো যে, ঠিক যেভাবে রাজা সুবর্মাকে হত্যা করা হয়েছে, আগামীকাল সেভাবেই তোমাকেও হত্যা করার চেষ্টা করা হবে। এবং, তখনই আমরা এই খেলায় আমাদের শেষ দান দেব।
জীবসিদ্ধি পুনরায় বসে পড়ল। বলল,
— কিন্তু… কিন্তু আচার্য, আমি আজীবন অদৃশ্য থেকেছি। আমায় সকলেই শুধুমাত্র আপনার ছায়াসঙ্গী, আপনার অনুগত শিষ্য হিসাবেই জানে। আমায় শকুনি হত্যা করতে চাইছে, এর তাৎপর্য আপনি বুঝতে পারছেন?
মুখের ভাব গম্ভীর হল চাণক্যর। বললেন,
— হুমম। বুঝতে পারছি হে, জীবসিদ্ধি। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, শকুনি জানে যে, তুমিই মগধের গুপ্তচরদের প্রধান। যে তথ্য আমাদের অত্যন্ত কাছের বিশ্বস্ত কিছু ব্যক্তি ব্যতীত কারুর জানার কথা নয়। অর্থাৎ, আমাদের অত্যন্ত কাছের কেউ, বিশ্বস্ত কেউ শকুনির সঙ্গে যুক্ত!
২৯.
কুলুতের রাজধানী নাগর আজ আবার উৎসবের জন্যে সেজে উঠেছে। রাজমহল থেকে খবর এসেছে যে, মহারাজ সুবর্মা এখন অনেকটাই সুস্থ। মহলের বারান্দা থেকে প্রজাদের দেখা দেবেন। তাতে শত্রুদের কাছে এই বার্তা যাবে যে, তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কুলূত এখনও শত্রুদের জবাব দিতে পারে, কারণ তার রাজা এখনও জীবিত। তাই আজকে আবার মহল জুড়ে সাজো সাজো ব্যবস্থা।
তবে এইবার সুরক্ষাব্যবস্থার উপর আরও জোর দেওয়া হয়েছে। প্রাঙ্গণের প্রতিটি কোণে, প্রাচীরের উপরে দু-হাত অন্তর দূরত্বে, সৈনিক মোতায়েন করা হয়েছে। তারা সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি রেখে চলেছে চারিদিকে। তির ধনুক দূর, একটি পক্ষী আকাশ থেকে নীচে নামলেও তা সৈনিকদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না। অতএব প্রাঙ্গণ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।
.
আর কিছুক্ষণ পরেই উৎসব শুরু হবে। নাগরের জনগণের প্রাঙ্গণে আসা শুরু হয়ে গিয়েছে সকাল থেকেই।
জীবসিদ্ধির কক্ষে প্রবেশ করলেন চাণক্য। দু-জন বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী জীবসিদ্ধিকে রাজবেশে সাজিয়ে তুলেছে। তার তদারকি করছেন স্বয়ং যুবরাজ চিত্রবর্মা ও মন্ত্রী শ্রীশৈল। জীবসিদ্ধির পরনে রেশমের বস্ত্র, স্বর্ণ অলংকার, মাথায় চেপেছে রাজার উষ্ণীষ। তার মাথায় এখন শোভা পাচ্ছে কাঁধ অবধি নেমে আসা কাঁচাপাকা চুল, ঠোঁটের উপরে সরু গোঁফ। চাণক্যকে দেখে জীবসিদ্ধি হাসল।
চিত্রবর্মা চাণক্যকে দেখে বলে উঠলেন,
— দেখুন আচার্য চাণক্য, আপনার শিষ্য কেমন রাজার ভূমিকায় সাবলীল অভিনয় করছে।
এই কথায় চাণক্য নিজের মনে হাসলেন। জীবসিদ্ধি শুধু রাজার ভূমিকায় নয়, পৃথিবীর যেকোনো পেশার মানুষের ভূমিকাতেই সাবলীল অভিনয় করতে পারে। বাস্তবের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনটাই একসময় তার রঙ্গমঞ্চ ছিল।
বাইরে দিনের দ্বিতীয় প্রহর শুরুর ঘণ্টা শোনা গেল। শ্রীশৈল বললেন,
সময় হল, মহাশয় জীবসিদ্ধি। এইবার চলুন ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে যাওয়া যাক। আপনি প্রস্তুত তো?
— হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত।
— আমি নিজে সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ আয়োজন করেছি। তাই আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদ। কোনো বাণের ক্ষমতা নেই আপনার অবধি পৌঁছানোর। আগেরবার যে অলৌকিক উপায়েই তা ঘটে থাকুক, এইবার তা হবে না। তবুও, আপনি যে আমাদের রাজ্যের স্বার্থে এতবড়ো ঝুঁকি নিচ্ছেন সে-কারণে আমরা আপনার কাছে অন্তর থেকে ঋণী।
চিত্রবর্মা যোগ দিলেন,
— হ্যাঁ, জীবসিদ্ধি। আমি হৃদয়ের গভীর থেকে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চাই। আসুন, আজকের এই উৎসব শুরু হওয়ার পূর্বে আমরা কুলূতের সৌভাগ্য কামনায় সোমরস পান করি।
জীবসিদ্ধি বলল,
— কিন্তু মহারাজ, আমি আর গুরুদেব যে মদিরা পান করি না। তবে, আপনাদের শুভকামনায় দ্রাক্ষারস পানে আপত্তি নেই।
— বেশ, বেশ। আমি এখুনি ব্যবস্থা করছি।
বলে সাজিয়ে রাখা পানপাত্র দুটি তুলে নিয়ে চিত্রবর্মা চলে গেলেন। সকলের অলক্ষে চাণক্য ও জীবসিদ্ধি নিজেদের মধ্যেই দৃষ্টি বিনিময় করল।
শ্রীশৈল আবারও আশ্বস্ত করার জন্যে বললেন,
— প্রত্যেককে আগে তল্লাশি করে তবেই মহলের প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কারুর পক্ষেই, বাণ-ধনু তো দূরস্ত, একটি ছুরি পর্যন্ত নিয়ে প্রবেশ করা সম্ভব নয়, আচার্য।
কিছুক্ষণ পরেই দু-পেয়ালা উৎকৃষ্ট দ্রাক্ষারস এনে চিত্রবর্মা চাণক্য ও জীবসিদ্ধির হাতে তুলে দিলেন। প্রথমে চাণক্যর হাতে পেয়ালা তুলে দেওয়ার সময়ে চাণক্য ইচ্ছে করে তাঁর এগিয়ে দেওয়া হাত উপেক্ষা করে অন্য হাত থেকে অন্য পেয়ালাটি নিতে গেলেন, কিন্তু মুহূর্তে চিত্রবর্মা তার ডান হাতের পেয়ালাটি বাড়িয়ে দিলেন চাণক্যর হাতে। ঘটনাটা জীবসিদ্ধিও নজর করল। অর্থাৎ, শুধুমাত্র বাম হাতের পেয়ালাতেই বিষ আছে, যা শুধুমাত্র জীবসিদ্ধির জন্যেই বরাদ্দ। জীবসিদ্ধি নির্দ্বিধায় সেই পেয়ালাটি নিল।
দু-জন কর্মচারী ইতিমধ্যে কক্ষ ত্যাগ করেছে। চিত্রবর্মা এরপর নিজের এবং মন্ত্রীর জন্যে সোমরস ঢালতে, কক্ষের একপাশে রাখা পাত্রের দিকে এগিয়ে গেলেন। তখনই চাণক্য সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন করে শ্রীশৈলর নজর জীবসিদ্ধির দিক থেকে ঘুরিয়ে দিল। ঠিক সেই সুযোগেই মেজের উপর একটি ফুলদানের আড়ালে রাখা একটি দ্রাক্ষারস ভরতি পেয়ালার সঙ্গে জীবসিদ্ধি নিজের হাতের পেয়ালাটি বদলে ফেলল।
চাণক্য অনুমান করেছিলেন যে, এরকমই কিছু একটা করার চেষ্টা চিত্রবর্মা করবেন। কারণ, তিনি কর্মচারীদের থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন যে, প্রথমবারেও একই কাজ তিনি করেছিলেন। উৎসবের সূচনার আগে সকলে একসঙ্গে মঙ্গলকামনায় পান করেছিলেন। মানুষের প্রবৃত্তিই হল যে পথে একবার সাফল্য এসেছে, সেই পথই দ্বিতীয়বার অনুসরণ করা। কারণ তারা মনে করে একবার সফল হয়েছে মানেই তা বার বার হবে।
তাই পূর্বেই কক্ষে সাজিয়ে রাখা পানপাত্রের মধ্যে একটিতে দ্রাক্ষারস ভরে লুকিয়ে রেখেছে জীবসিদ্ধি। ঠিক করেই রেখেছিল যে, চাণক্য অথবা জীবসিদ্ধিকে পান করতে আমন্ত্রণ করলেই তারা দ্রাক্ষারস চাইবে সোমের বদলে। সোমরসের পেয়ালাও ইচ্ছে করেই কক্ষে শেষ কোণে রাখা হয়েছিল যাতে সেটি চিত্রবর্মা আনতে গেলে অন্তত কয়েক মুহূর্ত জীবসিদ্ধির দিক থেকে তাঁর নজর ঘুরে যায়, আর জীবসিদ্ধি তার হাতের দ্রাক্ষারসের পেয়ালা বদলে ফেলার সুযোগ পায়। জীবসিদ্ধির গোটা কক্ষটাই চাণক্যর সাজানো একটি নাটকের রঙ্গমঞ্চ।
চারজন নিজের পেয়ালা তুলে ঈশ্বরের উদ্দেশে মঙ্গলকামনা করল এবং পান করল। যতক্ষণ না জীবসিদ্ধি পেয়ালার সম্পূর্ণ পানীয় গলাধঃকরণ করল, ততক্ষণ চিত্রবর্মা তার উপর থেকে একবারের জন্যেও দৃষ্টি সরালেন না। পুরো পানীয় জীবসিদ্ধি পান করতে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। পান শেষে সকলে এগিয়ে গেল প্রাঙ্গণমুখী বারান্দার দিকে।
