৩০.
কুলূতের প্রতিষ্ঠা দিবসের বার্ষিক অনুষ্ঠানে মেতে রয়েছে গোটা মহল। অনেক মানুষ এসেছে। আঞ্চলিক গীতি ও সেই তালে তালে নৃত্য প্রদর্শন, শারীরিক কলা প্রদর্শন, পুরস্কার বিতরণ ছাড়াও আরও হরেক অনুষ্ঠানে গমগম করেছে মহলের প্রাঙ্গণ। মহারাজকে বারান্দায় সুস্থ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সকলেই খুশি। তবে সৈনিকরা এরই মধ্যে সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলেছে সকলের উপর।
জীবসিদ্ধি রাজার পোশাকে দাঁড়িয়ে সব দেখছে এবং মাঝে মাঝে নীচে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। মাঝে মাঝে কয়েক বার জল চেয়েছে এবং গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে চিত্রবর্মাকে শুনিয়ে। হিসাবমতো আর কিছুক্ষণ বাদেই জীবসিদ্ধির অসুস্থ হয়ে ঢলে পড়ার কথা। চাণক্য আপাতত একটা বিষয় নিয়েই সন্দেহে আছেন। তাঁর উপস্থিতিতে জীবসিদ্ধির কাছে পৌঁছে চিত্রবর্মার পক্ষে তার শরীরে তির বিধিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সময়মতো চাণক্যকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করেছে। সেটা কী হতে পারে তা চাণক্য অনুমান করতে পারছেন না।
অনুষ্ঠান যখন পূর্ণমাত্রায় পৌঁছেছে ঠিক সেইসময়েই কুলূতের এক সৈনিক বারান্দায় ঢুকে বলল,
— আর্য চিত্রবর্মা! মহলের ভেতরে একজন আগন্তুক ধরা পড়েছে! তার কাছে ধনুক আর কিছু অদ্ভুত আকারের বাণ পাওয়া গিয়েছে।
চিত্রবর্মা চেঁচিয়ে উঠলেন,
— সেকী? সেই লোক নিশ্চয়ই! এ-ই নিশ্চয়ই আমাদের কাঙ্ক্ষিত হত্যাকারী! তাকে এই মুহূর্তে বন্দি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন যে, আরও কোনো গুপ্তঘাতক মহলে প্রবেশ করেছে কি না।
একটু চুপ থেকে ইতস্তত করে চিত্রবর্মা বললেন,
— কিন্তু এই মুহূর্তে আমি বা মহারাজ উৎসব ছেড়ে যেতে পারি না। লোকের সন্দেহ হবে। অমাত্য শ্রীশৈল, আপনি আর আচার্য চাণক্য এই মুহূর্তে ওই গুপ্তঘাতককে জিজ্ঞাসাবাদ করুন! জীবসিদ্ধির সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চাণক্য তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললেন,
— হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন কুমার। আমি এখুনি যাই, এ-ই নিশ্চয়ই সেই হত্যাকারী যাকে আমরা এতদিন ধরে খুঁজছি। চলুন, মহামাত্য মহাশয়! শীঘ্র চলুন!
চাণক্য দ্রুত একবার জীবসিদ্ধির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে শ্রীশৈলকে নিয়ে বারান্দা ছেড়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। বারান্দায় রইল জীবসিদ্ধি এবং চিত্রবর্মা। তাদের থেকে বেশ কিছুটা তফাতে দাঁড়ানো জনাদশেক মগধ ও কুলূতের দেহরক্ষী সৈনিক।
চাণক্য শ্রীশৈলর সঙ্গে মহলের ভেতরে এলেন। চাণক্য জানেন নীচে গিয়ে যে ব্যক্তিকে পাওয়া যাবে সে বেচারা সম্ভবত নিরীহ কোনো প্রজা যাকে অচেনা কেউ অর্থের লোভে ধনু-বাণ নিয়ে প্রবেশ করতে বলেছে। চিত্রবর্মা একাধিক বিষাক্ত বাণ রেখেছে সঙ্গে। তারই মধ্যে কিছু এই ব্যক্তির সঙ্গেও দিয়েছে। এই ধরা পড়া ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে কিছুই তথ্য পাওয়া যাবে না।
কিছুটা এগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে দাঁড়িয়ে পড়লেন। শ্রীশৈলর হাত ধরে তাঁকেও দাঁড় করালেন। যে সৈনিকটির পিছু পিছু তাঁরা নামছিলেন চাণক্য তাকে নির্দেশ দিলেন,
— তুমি যাও। ওই আততায়ীকে বন্দি করে রাখো। তবে অকারণ প্রহার বা অত্যাচার কোরো না। আমরা পরে যাব।
সৈনিকটি কিছুটা অবাক হল এরকম নির্দেশে কিন্তু কিছু বলল না, চলে গেল। মন্ত্রী শ্রীশৈল অবাক হয়ে বলল,
— আমরা যাব না, আচার্য? কুমার চিত্রবর্মা যে বললেন…
চাণক্য ততক্ষণে শ্রীশৈলকে টেনে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করেছেন। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বললেন,
— না, অমাত্য মহাশয়, এখন আমাদের বারান্দায় উপস্থিত থাকতে হবে। কারণ এই আটক লোকটি এই নাটকের একটি সামান্য পার্শ্বচরিত্র মাত্র। মূল পর্বের যবনিকাপাত যেখানে হবে সেটা প্রত্যক্ষ করতে হবে তো। চলুন, চলুন! শীঘ্র চলুন। চরমক্ষণ আসন্ন!
.
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা জীবসিদ্ধি তার উপর চিত্রবর্মার সতর্ক দৃষ্টি টের পাচ্ছে। যেভাবে শিকারি চতুষ্পদ তার শিকারকে লক্ষ রাখে সেভাবেই তার পতনের অপেক্ষা করছেন চিত্রবর্মা। ধীরে ধীরে জীবসিদ্ধি ও নিজের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনছেন, যাতে জীবসিদ্ধি পড়ে গেলেই তিনি সবার আগে পৌঁছে যান তার কাছে। কিন্তু খুব কাছে গেলে হবে না। ব্যবধান রাখতে হবে যাতে উপস্থিত মগধের সৈনিকরা বলে যে, জীবসিদ্ধির পতনের সময়ে তার কাছে চিত্রবর্মা ছিল না। তাঁর উপর কোনো সন্দেহ আসবে না।
প্রমাদ গুনছে জীবসিদ্ধি। এইবার…!
.
অসুস্থ হয়ে টলে গিয়ে ভারসাম্য হারানোর ভঙ্গিতে পড়ে গেল জীবসিদ্ধি। নীচে প্রাঙ্গণে উপস্থিত নাগরিক ও সৈনিকদের মধ্যে আলোড়ন উঠল। একদিকে কাত হয়ে বারান্দার মেঝেতে পড়ল। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই টের পেল চিত্রবর্মা তার কাছে এসে ঝুঁকে পড়লেন তার উপর।
চিত্রবর্মা দ্রুত নিজের অঙ্গবস্ত্রের ভাঁজ থেকে লুকানো বিষাক্ত বাণ বের করে আনলেন। সৈনিকরা এসে পড়েছে প্রায়। অচৈতন্য জীবসিদ্ধির কণ্ঠ লক্ষ করে বাণ বসিয়ে দিতে গেলেন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে চিত্রবর্মা টের পেলেন তাঁর নিজের কণ্ঠে ধারালো ধাতব একটি স্পর্শ।
চিত্রবর্মা খেয়াল করলেন জীবসিদ্ধির চোখ খোলা, সম্পূর্ণ সজাগ এবং ডান হাতে একটি ছুরি ধরে আছে তাঁর গলায়। বিদ্যুদ্বেগে অন্য হাত দিয়ে জীবসিদ্ধি চেপে ধরল চিত্রবর্মার বিষাক্ত তির ধরা হাতটা। জীবসিদ্ধি শান্ত শীতল কণ্ঠে বলে উঠল,
— খেলা শেষ, চিত্রবর্মা। কথা দিচ্ছি তোমার হাত সামান্য নড়লেই এই মুহূর্তটিই তোমার জীবনের অস্তিম মুহূর্ত হবে।
প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই চিত্রবর্মার পেছন থেকে চাণক্যর গলা ভেসে এল,
— কোনোরকমের চতুরতার চেষ্টা বৃথা হবে, কুমার। জীবিত থাকতে চাইলে হাত থেকে ওই অশুভ জিনিসটা ফেলে দিন।
চিত্রবর্মা ডান হাত আলগা করতেই বিষাক্ত বাণটা মেঝেতে পড়ল। চাণক্য ততক্ষণে চিত্রবর্মা আর জীবসিদ্ধির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। পা দিয়ে বাণটা একদিকে সরিয়ে দিলেন। চিত্রবর্মা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। জীবসিদ্ধির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
— কি… কিন্তু কীভাবে? বিষ তো প্রভাব বিস্তার করছিল।
হেসে উঠলেন চাণক্য। জীবসিদ্ধি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
— তোমার বিষ আমি পান করিনি। বার বার জল চাওয়া, অসুস্থ হওয়ার ভঙ্গি করা গোটাটাই অভিনয়। তুমি তো আমায় এখানে অভিনয় করাতেই ডেকে এনেছিলে, কুমার। আমি আর আচার্য শুধুমাত্র তার দৃশ্যটা নিজেদের মতো করে অভিনয় করেছি।
চিত্রবর্মার গলায় ততক্ষণে মগধের সৈনিকরা তরবারি ধরেছে। কুলূতের সৈনিকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রীশৈলও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখে যাচ্ছে। চিত্রবর্মা পরিস্থিতি নিজের দিকে চালনা করার শেষ চেষ্টা করল। চিৎকার করে নিজের সৈনিকদের আদেশ দিল,
— তোমরা দেখছ কী? নিজের ভাবি রাজাকে রক্ষা করো!
চাণক্য হাত তুলে কুলূতের সৈনিকদের উদ্দেশে বললেন,
— ইনিই তোমাদের মহারাজের হত্যাকারী। মহামাত্য শ্রীশৈল, আপনি আদেশ দিন সৈনিকদের। মহারাজের মৃত্যু হয়েছে এবং পরবর্তী রাজা যেহেতু ঘোষণা হয়নি, অতএব নিয়ম অনুযায়ী সেনা আপনার আদেশে চলবে। আপনি গোটা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।
শ্রীশৈল হাত তুলে কুলূতের সেনাদের নিরস্ত করলেন। বললেন,
— অস্ত্র নামাও।
চিৎকার করে উঠলেন চিত্ৰবৰ্মা,
— বিশ্বাসঘাতকতা কোরো না, শ্রীশৈল! আমিই তোমার যুবরাজ!
শ্রীশৈল চাণক্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— কী হচ্ছে আমি কিছুটা অনুমান করতে পারলেও পুরোটা বুঝতে অক্ষম, আচার্য। কী ঘটছে এখানে? কেন কুমার জীবসিদ্ধিকে হত্যা করতে চাইছিলেন?
চাণক্য বললেন,
— আপনাকে, অমাত্যদের ও কুলূতের সেনাপতিকে আমি সকল কথা বুঝিয়ে বলব। সকলকে এখানে উপস্থিত হতে বলুন। কিন্তু তার আগে, মগধের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে, মহারাজ সুবর্মা ও বৈদ্য চক্রাচার্যকে হত্যার অভিযোগে এবং সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর মিত্র জীবসিদ্ধিকে হত্যার চেষ্টা করার অভিযোগে চিত্রবর্মাকে মগধ বন্দি করল।
.
কুলূতের সকল অমাত্য ও সামন্তরা হাজির হলে চাণক্য তাদের সকলকে গোটা ঘটনা শুরু থেকে বুঝিয়ে বললেন। অবশ্যই জীবসিদ্ধিকে হত্যার আসল উদ্দেশ্যের কথাটা সুকৌশলে এড়িয়ে গেলেন ব্যাখ্যা দেওয়ার সময়ে। সবশেষে চাণক্য বললেন,
— আরও একটি তথ্য আপনাদের জানিয়ে রাখি। মগধের সেনা এই মহলের চারিদিক ঘিরে ফেলেছে এবং মহলের অন্দরেও তারা উপস্থিত। অতএব আমরা চাইলে এখুনি কুলূতের পতন হবে। মগধ নিজের মৈত্রীধর্ম পালন করতে কুলূতের সাহায্যে সেনা পাঠিয়েছে। কিন্তু মগধের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আমরা কুলূতকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করতেই পারি। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র কুলূতের থেকেও তাদের প্রিয় মহারাজ সুবর্মাকে কেড়ে নিয়েছে। তাই মগধ আর কুলূত উভয়েই চিত্রবর্মার এই ষড়যন্ত্রের শিকার। একজন ব্যক্তির অধার্মিক আচরণে আমি চাই না মগধের সঙ্গে কুলূত সংঘাতে যাক। আমি চাই কুলূত সসম্মানে মগধ সাম্রাজ্যের অংশ হোক। কথা দিচ্ছি কুলূতকে বঞ্চিত করা হবে না।
.
চাণক্যর প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া, কুলূতের কারুর আপত্তির কারণ বা উপায় কোনোটাই ছিল না। অতএব মন্ত্রী পরিষদ ইচ্ছায় হোক বা বাধ্যতায়, সম্মতি জানাল রাজসভায়।
সভাশেষে সকল মন্ত্রী, অমাত্য রাজসভা ত্যাগ করল। শুধু চাণক্য, জীবসিদ্ধি এবং শ্রীশৈল রয়ে গেল। মাথায় হাত দিয়ে বৃদ্ধ শ্রীশৈল বললেন,
— আমি এখনও ভাবতেই পারছি না। এত গভীর ষড়যন্ত্র? সত্যি বলতে সুবর্মার সঙ্গে চিত্রবর্মার বহুদিন ধরেই মতভেদ চলছিল। প্রজারাও চিত্রবর্মাকে পছন্দ করে না। মহারাজের হত্যার নেপথ্যে যে সে থাকতেও পারে এরকম একটা সম্ভাবনা যে আমার মনে ছিল না তা বললে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু প্রমাণের অভাবে আমি নিরুপায় ছিলাম।
চাণক্য কিছুক্ষণ চুপ করে শ্রীশৈলর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। নিজের কেশশিখায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— হুমম। কুলূত পর্ব তবে শেষ হল। আগামীকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গেসঙ্গেই আমি আর জীবসিদ্ধি রওনা হব। কিন্তু সব রহস্যের যখন সমাধান হয়েই গেল, তখন আপনিই-বা বাকি থাকেন কেন? স্বীকারোক্তি করেই ফেলুন মহামাত্য মহোদয়।
জীবসিদ্ধি বিস্মিত হল, কীসের কথা বলছেন চাণক্য? কিন্তু শ্রীশৈলর দিকে চোখ পড়তেই জীবসিদ্ধি দেখল বৃদ্ধর মুখ রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছে। বৃদ্ধ আমতা আমতা করে বললেন,
— আমি… কী বললেন… মানে বুঝলাম না, মহামতি?
চাণক্য ঠোঁটের একপাশে হাসি এনে বললেন,
— কেন অস্বীকার করছেন, মহাশয়? আপনি ভালো করেই জানেন আমি কীসের কথা বলছি। আপনি কি বাস্তবে ভেবেছিলেন যে, আমি ভুলে গিয়েছি এত বড়ো একটা ঘটনা? আপনি ছাড় পেয়ে যাবেন? আপনি নিশ্চয়ই জানেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত জানতে পারলে এই অপরাধের শাস্তি কী বরাদ্দ করবেন।
বৃদ্ধ আসন ছেড়ে ভূমিতে বসে চাণক্যর পায়ে লুটিয়ে পড়লেন।
— আমায় ক্ষমা করুন, আচার্য! বড়ো ভুল করে ফেলেছি! আমার উপায় ছিল না, আচার্য! রাজা সিন্ধুসেনা আমায় জোর করে এই কাজ করিয়েছিল!
জীবসিদ্ধি বিস্মিত হয়ে চাণক্যর কাছে জানতে চাইল,
— আচার্য, কী হচ্ছে এটা? কীসের অপরাধের কথা বলছেন অমাত্য?
চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,
— আমাকে হত্যার চেষ্টায় সিন্ধুপ্রদেশের রাজা সিন্ধুসেনার সঙ্গে লিপ্ত হওয়ার অপরাধ হে, জীবসিদ্ধি। বলেছিলাম না? এই কাজ চিত্রবর্মার নয়, অন্য কারুর। চিত্রবর্মা ব্যতীত প্রধানামাত্য ছাড়া আর কেই-বা পারে গভীর রাতে মহলের অন্দরে গুপ্তঘাতকের প্রবেশপথ করে দিতে গোপনে?
শ্রীশৈল চাণক্যর কাছে হাতজোড় করে বললেন,
— আমি জানতাম না, আচার্য। রাজা সিন্ধুসেনা আমায় একবারও বলেনি যে, সে আপনাকে হত্যা করতে লোক পাঠিয়েছে। সে বলেছিল যে, আপনার কাছে সে গোপনে রাত্রিবেলা দূত মারফত জরুরি পত্র পাঠাবে। তাই আমি রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু পরের দিন যখন জানতে পারলাম যে, আপনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে সেরাত্রে, তখন ভয়ে আমি আর সেকথা স্বীকার করতে পারিনি, মহামতি চাণক্য। আমার এই অপরাধ ক্ষমা করুন, আচার্য! আমি ভিক্ষা চাইছি আপনার কাছে।
চাণক্য কিছুক্ষণ ভাবলেন। যদিও জীবসিদ্ধি বুঝতে পারল চাণক্য শুধুমাত্র ভাবার ভঙ্গি করছেন। জীবসিদ্ধি নিশ্চিত যে চাণক্য পূর্বেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করে রেখেছেন। চাণক্য বললেন,
— বেশ, উঠুন অমাত্য। আপনি যেহেতু বলছেন যে, আপনি জানতেন না সিন্ধুসেনার প্রকৃত উদ্দেশ্য, তাই আপনার এই অপরাধ এই একবারের জন্যে আমি মার্জনা করে দিতে পারি। কিন্তু তার বদলে আপনাকে মগধের অধীনে কাজ করতে হবে, অমাত্য। শপথ করুন নিজের পূর্বপুরুষদের নামে যে, আপনি মগধের অনুগত থাকবেন আজীবন।
— আমি নিজের পূর্বপুরুষের, আমার সন্তানদের নামে শপথ করছি, আচার্য।
— হুমম। তবে ক্ষমা করলাম আপনাকে। আপনার অপরাধের কথা আমার ও জীবসিদ্ধির মধ্যেই থাকবে। শুধু তাই নয়, আপনাকে মগধের প্রতিনিধি হিসাবে কুলূতের শাসনভার দিলাম। মগধের অন্যান্য প্রতিনিধি ও সামন্তরা আপনাকে একাজে সাহায্যে করবে। মগধের আদেশ অনুযায়ী কাজ করলে কুলূত সুরক্ষিত থাকবে।
— বেশ, আচার্য। তাই হবে।
— হুমম। আপনি আসতে পারেন। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা মনে রাখবেন, শ্রীশৈল। মগধের সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনোরকম বিশ্বাসঘাতকতার চেষ্টা আপনি বা আপনার কোনো মন্ত্রী করলে কিন্তু আপনার অপরাধের কথা মগধাধিপতি সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর কানে পৌঁছে যাবে। আমার শিষ্যরা আবার আমায় নিয়ে একটু বেশিই রক্ষণশীল। তাই এই কথা সম্রাট জানতে পারলে তিনি সম্ভবত শত্রু-মিত্র বিচার নির্বিশেষে গোটা কুলূত রাজ্যকে ধূলিসাৎ করবে। এই ধ্বংসের জন্যে কিন্তু আপনি দায়ী থাকবেন। অতএব, আশা রাখি আপনি আগামীতে এই সম্ভাবনা বিচার করেই প্রতিটি পদক্ষেপ নেবেন। ধন্যবাদ।
৩১.
মলয়কেতু আখেটে* বেরিয়েছে। জঙ্গলের মধ্যে তার একটি প্রমোদ প্রাসাদ আছে। সেখানে একদল সৈন্য নিয়ে সে আপাতত থাকছে। তবে আখেটের চেয়ে সে বেশি। উৎসাহী এখন অন্য একটি বিষয়ে। সেটি হল— পদ্মা। পদ্মা মেয়েটির মধ্যে কী যেন জাদু আছে। মলয়কেতু রাজা হয়েও সেই মেয়েটিকে এখনও নিজের সম্পূর্ণ বশে আনতে পারেনি। তার আর পদ্মার মধ্যে যেন এক প্রেমময় ধরা-ছোঁয়া খেলা চলে। মলয়কেতু এই খেলা খুবই উপভোগ করছে। মলয়কেতুর দুই রানি বিষয়টা ভালো চোখে দেখছেন না। কারণ তাঁদের মনে আশঙ্কা যে, স্বামীর যা মতিগতি তাতে শীঘ্রই সম্ভবত ওই স্ত্রীলোক ছলে ভুলিয়ে রানি হয়ে বসবে। নিজেদের সম মর্যাদা এক কুলহীন নর্তকীকে তাঁরা দিতে নারাজ।
পদ্মা দুই রানির সর্বক্ষণের বিষদৃষ্টি থেকে বাঁচতেই যখন মহারাজকে প্রস্তাব দিল যে, এই মহল ছেড়ে, কয়েক দিনের জন্য যদি অন্য কোথাও যাওয়া যায়; মলয়কেতু সে সুযোগ লুফে নিয়েছে। আখেটে সে সৈন্য, অস্ত্র ছাড়াও সঙ্গে নিয়েছে পদ্মাকে।
আজকেও ভোরবেলায় শিকারে বেরিয়েছে মলয়কেতু। তার রথে তার সঙ্গেই পদ্মাও আছে। গত দু-দিনও সে ছিল। নিরীহ বন্যপ্রাণীদের হত্যা করে নিজের বীরত্ব দেখিয়ে নারী হৃদয়কে প্রভাবিত করার সুযোগ মলয়কেতু ছাড়েনি।
— আখেট অতি বিপজ্জনক তোমার মতো একজন কোমল নারীর পক্ষে, প্রিয়ে।
মলয়কেতুর এই কথায় পদ্মা মলয়কেতুর হাত চেপে ধরে উত্তর দিয়েছিল,
— পঞ্চনদের** সবচেয়ে শক্তিশালী বীর সম্রাটের সঙ্গে থাকলে আমার কীসের ভয়?
দিনের প্রথম প্রহর শেষের দিকে। কিন্তু আজ শিকার সেভাবে পায়নি মহারাজ মলয়কেতু। আসলে তার মন আজ শিকারে নেই। তার রাজধানী থেকে সংবাদ এসেছে গতকাল। সিন্ধুসেনা তার সৈন্যদের সমরের জন্যে তৈরি করেছে। তারা রাজধানী ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে গতকালই।
মলয়কেতুর বারংবার সেই বোবা গুপ্তচরটির কাছ থেকে পাওয়া পত্রের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সিন্ধুসেনার পত্রে ‘কেতু’ নামে উল্লেখ করা ব্যক্তি যে চাণক্য সেটা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছিল। সিন্ধুসেনা পত্রে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে কেতুকে কুলূতেই হত্যা করবে সে। চাণক্যর উপর গুপ্তঘাতকের যে আক্রমণ হয়েছিল সে- সংবাদ মলয়কেতুর কানে এসেছে ইতিমধ্যে। সব যে মিলে যাচ্ছে! ওই শকুনি, রাক্ষস, আর সিন্ধুসেনা মিলে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এ ধারণা প্রতিমুহূর্তে তার মনে আরও মজবুত শেকড় গজিয়ে চলেছে। কিন্তু মলয়কেতু হয়তো পর্বতেশ্বর পুরুর মতো বীর নয়, কিন্তু সে এখনও পঞ্চনদ ভূভাগের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা। সে জীবিত থাকতে কি সিন্ধুসেনা তার নগরে আক্রমণ করার বোকামি করবে? শকুনি কি তবে রাত্রির অন্ধকারে দুর্গের প্রবেশদ্বার খুলে দিয়ে শত্রুদের ঢোকার পথ করে দেবে? কিন্তু তাহলে শকুনি কেন চাইছে যেন চাণক্যর হত্যা না করা হয়? মহামাত্য সুদীপ্তক তাঁকে বলেছেন অগ্র-পশ্চাৎ বিচার না করে কোনো নির্ণয় না নিতে। কিন্তু চিত্ত বিচলিত হয়ে আছে মলয়কেতুর।
গহিন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে রথ ছুটছিল মলয়কেতুর। সামনের দিকে একদল সৈনিক জঙ্গল কেটে তার এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিচ্ছে। তবে গতি মন্থর হয়েছে এখন সেই কারণে। রথে দাঁড়িয়ে, জঙ্গলের দিকে দৃষ্টি রেখে মলয়কেতু এগিয়ে চলেছে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে পদ্মা। হঠাৎই একটা ঘটনা ঘটল যার জন্যে কেউই প্রস্তুত ছিল না।
একটি বড়ো, ঝুরিনামা গাছের পাশ থেকে রাজার রথ বেরোনোর সময়ে হঠাৎই পদ্মা চেঁচিয়ে উঠল,
— মহারাজ! গাছের পাতার ফাঁকে ওটা কী?
পরমুহূর্তে উপরের গাছের ডাল থেকে একটি মানুষের শরীর ঝাঁপিয়ে নেমে এল মহারাজের রথে! আশেপাশের সৈনিকরা কিছু করে ওঠার আগেই সেই বিশালদেহী কৃষ্ণবর্ণ লোকটি একটি বড়ো তরবারি তুলে নামিয়ে আনল মলয়কেতুর গলা লক্ষ করে!
কিন্তু সেই তরবারি মলয়কেতুর গলার বদলে হাতে এসে বসল। কারণ সঠিক সময়ে ধাক্কা দিয়ে মলয়কেতুকে নিশ্চিত মৃত্যুর পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছে পদ্মা
হিংস্র ভঙ্গিতে, ‘ভীমার কাজে বাধা দিস না! সরে যা বেশ্যা!” বলে চেঁচিয়ে উঠল লোকটা। একধাক্কায় পদ্মাকে ছিটকে ফেলে দিল রথ থেকে এবং পুনরায় তরবারি তুলে নিল রাজার উপর আঘাত করার জন্যে।
— জয়, মহারাজ সিন্ধুসেনার জয়!
জয়ধ্বনি দিয়ে তরবারি নামিয়ে আনা হাতটা কিন্তু মাঝপথেই থেমে গেল। কারণ ততক্ষণে রাজার সঙ্গে থাকা সৈনিকদল আচমকা আঘাতের ঘোর কাটিয়ে সতর্ক হয়ে পড়েছে। তিনটি বাণ একসঙ্গে এসে বিধল ভীমার শরীরে! যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল ভীমা। কিন্তু তার শরীরে আসুরিক শক্তি বরাবরই। তাই আরও একবার কাঁপা হাতেই তরবারি চালাল সে মলয়কেতুকে লক্ষ করে। কিন্তু মলয়কেতু সহজেই সেই আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে, তরবারি ঢুকিয়ে দিল ভীমার পেটে। কিছুক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকল ভীমা। যেন সময় থেমে গিয়েছে কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপরই রথ থেকে গড়িয়ে পড়ল ভীমার প্রাণহীন দেহ।
ছুটে এল সৈনিকরা।
— মহারাজ! আপনি ঠিক আছেন তো?
মলয়কেতুর হাতের আঘাত যথেষ্ট গভীর। খুবই যন্ত্রণা হচ্ছে তার। কিন্তু মুখে বীরত্ব ফুটিয়ে বলল,
— আমি ঠিক আছি। কিন্তু… কিন্তু পদ্মা কই? পদ্মা, তুমি ঠিক আছ তো?
পদ্মা তখন উঠে বসেছে। শরীরে ধুলো লেগে গিয়েছে। রথ থেকে পড়ে গিয়ে হাতের চামড়া ছড়ে গিয়েছে।
রথ থেকে নেমে মলয়কেতু এগিয়ে গেল পদ্মার দিকে। তাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে আলিঙ্গন করল। আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বলল,
— তুমি আমার জীবন রক্ষা করলে, প্রিয়ে! সঠিক সময়ে তুমি আততায়ীকে দেখতে না পেলে, আমায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে না দিলে আমার নিয়তিতে আজ নিশ্চিত মৃত্যু লেখা ছিল। পদ্মা, বলো তুমি কী চাও? যা চাইবে পর্বত্যকা মলয়কেতু তোমায় আজ তাই দেবে! না না, তুমি চাইবে কেন? আমিই দেব! তুমি হবে আমার রানি!
পদ্মা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— কিন্তু মহারাজ, এ কে ছিল? কে আপনাকে হত্যা করতে ঘাতক পাঠিয়েছে?
দাঁতে দাঁত চেপে মলয়কেতু বলল,
— সিন্ধুসেনা! সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রচনা করেছে! সম্মুখসমরে আমার সেনার সঙ্গে যুদ্ধে সে পারবে না জেনেই এভাবে আমায় আগেই পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে সে! এর সাজা সে পাবে! প্রত্যেকে পাবে!
—
*আখেট — শিকার।
**পঞ্চনদ অঞ্চল— ভারতের উত্তর অংশ যেখানে পাঁচটা নদী বয়ে গিয়েছে।
৩২.
শুকনো কাঠ, পাতা জড়ো করা আগুনে হাত সেঁকছে জীবসিদ্ধি। আগুনের গা ঘেঁষে, মুখোমুখি উলের দুটি আলোয়ানে আপাদমস্তক ঢেকে জবুথবু বসে আছেন চাণক্য। দূরে কোথাও জংলি পশু ডেকে উঠল।
চাণক্য ও জীবসিদ্ধির সঙ্গে আরও জনা কুড়ি সৈনিক গত কয়েক দিন যাত্ৰা করে এখন তারা গান্ধারের সীমানায় আছে। চাণক্যর ইচ্ছে ছিল শুধু ওঁরা দু-জন যাত্রা করবেন। কিন্তু এই ঠান্ডায় গরম পোশাক, তাঁবু ইত্যাদি ছাড়া দীর্ঘ পথ যাত্রা সম্ভব নয়। অতএব মগধের কয়েক জন সৈনিককে সঙ্গে নিতে হয়েছে। আজকে রাত্রের মতো তারা তাঁবু গেড়েছে একটি ছোটো পাহাড়ের পাদদেশে। উত্তর থেকে বইতে থাকা হিমেল হাওয়ার তীব্র ঠান্ডার থেকে পাহাড়টা তাদের কিছুটা আড়াল দিয়েছে।
.
চাণক্যর দিকে তাকিয়ে জীবসিদ্ধি বলল,
— অদূরেই জঙ্গল, আচার্য। সাবধানে থাকবেন রাত্রে। পাহাড়ি নেকড়ে বা অন্য কোনো বন্যজন্তু আপনার সঙ্গে নীতিশাস্ত্র আলোচনা করতে আসতে পারে।
চাণক্য শিষ্যের বক্রোক্তি উপেক্ষা করে উত্তর দিলেন,
— রাতকীটদের ডাক শুনতে পাচ্ছ তো চারদিকে? বন্যজন্তুর আগমনে তাদের এই ডাক থেমে যাবে। কীটদের শব্দ কোনোদিক থেকে থেমে গেলেই সতর্ক হবে।
আগুন একটু কমে গিয়েছে দেখে আগুনে আরও কিছু শুকনো কাঠ ফেলে দিল জীবসিদ্ধি।
— সময় থাকে তবে কি একবার তক্ষশিলা হয়ে যাবেন নাকি, আচার্য? প্রধানাচার্য – গত দু-বছরের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার গান্ধার যাচ্ছি আমরা। যদি আপনাকে দেখলে খুশি হবেন।
— হুমম।
— আচার্য, আপনার কী মনে হয়? ওই অস্ত্রনির্মাতা বাবাক কি গ্রাম থেকে পালিয়ে গিয়েছে?
— মনে হয় না সে পালাতে সক্ষম হয়েছে। গোটা গ্রাম ঘিরে রেখেছে মগধের সৈনিক। আমার ধারণা তাকে কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
— কিন্তু তার উপর তো ছদ্মবেশে নজর রাখা হয়েছিল। তবে শকুনি কীভাবে জানল সেকথা?
— হয় বাবাক অথবা তার পুত্রের থেকেই জেনেছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু হঠাৎ একজন ক্রেতাকে রক্ষা করতে পিতা-পুত্র কেন রাজদ্রোহের ঝুঁকি নেবে?
— কিন্তু সে-ব্যক্তির পুত্র তো গ্রামে রয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছে শশাঙ্ক। সে নিজেও নিরুদ্দিষ্ট পিতাকে খুঁজছে।
— হুমম। পিতা তার পুত্রকে ছেড়ে একা পালিয়ে যাবে বলে মনে হয় না। তাই সম্ভাবনা আছে যে তাকে শকুনি জোর করে অপহরণ করেছে। কিন্তু কোন উপায়ে তা সম্ভব সেটা পত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
— অর্থাৎ, এক জটিল রহস্যের সমাধান হতে-না-হতেই দ্বিতীয় একটি রহস্য এসে উপস্থিত হল।
— ওহে জীবসিদ্ধি, বিশ্বের সকল রহস্যই জটিল থাকে, যতক্ষণ না তার সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। একবার সমাধান পাওয়া গেলেই সব সরল মনে হয়।
— আরও একটা প্রশ্ন আমার মনে রয়ে গিয়েছে, আচার্য। কুলূতের উপর আক্রমণের আশঙ্কা যখন আর নেই এবং কুলূত আমাদের বশ্যতা স্বীকার করেই নিয়েছে, তবে কেন আমরা মগধের বিশাল সেনা সেখানেই রেখে এলাম? অস্তত অর্ধেক সেনা কি মগধে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়াই সমীচীন ছিল না?
মৃদু হেসে চাণক্য বললেন,
— প্রয়োজন আছে, জীবসিদ্ধি। যথাসময়ে জানতে পারবে।
জীবসিদ্ধি কিছুক্ষণ চুপ করে আগুনের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল,
— গান্ধার বরাবরই আর্যাবর্তর অন্যতম জরুরি একটি অঙ্গ। তার কারণ গান্ধার হল এই দেশের প্রবেশদ্বার। এখানে গোপনে মগধের গুপ্তচর নিযুক্ত করার আদর্শ স্থান হল বিশ্ববিদ্যালয়।
চাণক্য জীবসিদ্ধির কথার ইঙ্গিত ধরেই বললেন,
— হুমম। কিন্তু তুমি তো জানোই এই বিষয়ে প্রধানাচার্যের অভিমত কী। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতির ঘোর বিরোধী। তিনি কিছুতেই আমাদের গূঢ়পুরুষদের নিজের বিহারে স্থান দেবেন না।
— ওই কারণেই বলছিলাম, যদি আবার একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করে আপনি নিজে কথা বলে আচার্য প্রমুখকে রাজি করাতে পারেন।
— না হে, জীবসিদ্ধি। কোনো লাভ হবে না তাতেও। তুমি তো জানোই আচার্য কতটা জেদি ও একরোখা মানুষ। তিনি একবার যখন ঠিক করেছেন যে, তাঁর শিক্ষাস্থানে রাজনীতির প্রবেশ নিষেধ, তখন তিনি তাতেই অটল থাকবেন।
জীবসিদ্ধি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— আমায় এই কথাটা বলার জন্যে ‘মার্জনা করবেন। কথাটা আমি তাঁকে কোনোরকম অসম্মান না জানিয়েই বলছি। কিন্তু, যদি আমি প্রধানাচার্যকে না জানিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী হিসাবে নিজের কোনো গুপ্তচরকে নিযুক্ত করার ব্যবস্থা করি?
চাণক্য ক্ষীণ হেসে বললেন,
— প্রধানাচার্য ভদ্রভট্ট আমার নিজের গুরু ছিলেন। আমার যা কূটনীতির শিক্ষা তিনিই আমায় প্রদান করেছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছে বলে একবারও এই ভ্রান্ত ধারণা মনে এনো না জীবসিদ্ধি, যে, তাঁর মস্তিষ্ক অচল। তোমার গুপ্তচররা ঠিকই ধরা পড়ে যাবে। তিনি একজন মহান শিক্ষক যিনি বিদ্যাদানকেই নিজের একমাত্র ব্রত করেছেন এবং কোনোদিন সক্রিয় রাজনীতিতে আসেননি। কিন্তু বৃদ্ধের মস্তিষ্ক আজও ক্ষুরধার। আমার দৃঢ় বিশ্বাস দু-বছর আগে তিনিও ধূমে মেশানো মাদকের প্রভাবে না থাকলে নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌতিক রহস্যের সমাধান করে ফেলতেন। আমার সাহায্যের তাঁর প্রয়োজন পড়ত না যদি তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতেন।
জীবসিদ্ধি হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চাণক্য আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— রাত্রি গভীর হল, জীবসিদ্ধি। চলো, যে যার তাঁবুতে ফেরা যাক। কালকে সকালে আশা করি শশাঙ্কর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে।
***
প্রায় এক যোজন পথ পরের দিন সকালে অতিক্রম করে নির্দিষ্ট গ্রামের সীমানায় পৌঁছাল চাণক্য ও জীবসিদ্ধিসহ ছোট্ট দলটি। সীমানায় তাঁদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষায় ছিল শশাঙ্ক।
ছদ্মবেশের প্রয়োজন ফুরিয়েছিল তাই এখন তার পরনে সম্পূর্ণ রাজ-আধিকারিকের পোশাক। অঙ্গবস্ত্রের রং তার উচ্চ পদমর্যাদার ইঙ্গিত করছে। চাণক্যর সবচেয়ে কাছের ছয় ছাত্রের একজন সে। শশাঙ্কর হাতের একটি বিশেষ বালা সেই ইঙ্গিত বহন করে।
.
চাণক্য ও জীবসিদ্ধিকে দেখে শশাঙ্ক হাসিমুখে এগিয়ে গেল। প্রথমে নিজের গুরুদেবের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল এবং তারপর প্রিয় মিত্র তথা গুরুভ্রাতা জীবসিদ্ধিকে আলিঙ্গন করল।
— কেমন আছ, ভ্রাতা? প্রায় দেড় বছর পর সাক্ষাৎ হল তোমাদের সঙ্গে। চন্দ্র কেমন আছে?
জীবসিদ্ধি উত্তর দিল,
— আমরা সকলেই ভালো আছি, ভ্রাতা। চন্দ্রগুপ্তও দাম্পত্য জীবন উপভোগ করছে তোমারই মতো। তোমার স্ত্রী এবং সদ্যোজাত কন্যাসন্তান কেমন আছে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শশাঙ্ক বলল,
— কী আর বলি, মিত্র। কন্যার ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদটুকু পেয়েছি মথুরা থেকে। জানিয়েছে স্ত্রী ও কন্যা সুস্থ আছে। কন্যাকে চোখেও দেখার সুযোগ আমার হয়নি। কারণ তখন আমি এখানে। ভেবেছিলাম এদিকের কাজ মিটে যাবে শীঘ্র। কিন্তু অদৃষ্ট দেখো, সমস্যা সমাধান হওয়ার পরিবর্তে আরও জটিল হয়ে গেল। কিন্তু তুমি কবে বিবাহ করবে হে, জীবসিদ্ধি? গুরুদেব, আমার একটি অনুরোধ আছে।
— বলো, শশাঙ্ক।
— আমার কন্যার নামকরণ আমি চাই আপনি করুন। আমার এই অনুরোধ আপনাকে রাখতেই হবে, আচার্য।
চাণক্য হেসে বললেন,
— এ আমার পরম সৌভাগ্য, শশাঙ্ক।
আরও দু-এক কথা আলাপচারিতা করতে করতেই গ্রামে প্রবেশ করল তারা। একদল সেনা এখানে ছাউনি ফেলেছে। চাণক্য ও তার সফরসঙ্গী সৈনিকদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা ছিল আগেই।
জীবসিদ্ধি আর চাণক্যকে একটি তাঁবুতে এনে শশাঙ্ক বলল,
— দীর্ঘ পথ যাত্রায় আপনারা ক্লান্ত। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে নিন আগে।
চাণক্য আপত্তি করলেন,
— বিশ্রাম নিতে আমরা আসিনি, শশাঙ্ক। কে বলতে পারে হয়তো তোমার সুরক্ষাবলয় ভেদ করে ইতোমধ্যে বাবাক লোকটি পলাতক হয়েছে। এবং, প্রতি মুহূর্তের বিলম্বে আমাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
শশাঙ্ক কিছুটা অপ্রতিভ হয়ে বলল,
— না, আচার্য। আমি নিশ্চিত গ্রামের সীমানা সে পার করতে পারেনি। এমনিতেই আমার সৈনিকরা প্রতিটি প্রবেশপথে নজর রেখেছিল প্রথম থেকেই। বাবাক নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই গোটা গ্রাম আমরা ঘিরে ফেলি। গত কয়েক সপ্তাহ কাউকে ঢুকতে বা বেরোতে দেওয়া হয়নি। সে নিঃসন্দেহে এই গ্রামেই কোথাও লুকিয়ে আছে। কিন্তু এই গ্রামটি বড়ো এবং অনেক বাসিন্দার বসবাস এখানে। তাই সম্পূর্ণ গ্রাম অন্ধের মতো খুঁজে দেখা সম্ভব নয়। তা ছাড়া সেটা করতে যে লোকবল লাগবে, তা আমাদের নেই। আমাদের নজর এড়িয়ে কীভাবে যে নিজের গৃহ থেকেই অদৃশ্য হল… সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন।
চাণক্য বললেন,
— এরকম না, গোড়া থেকে বলো, শশাঙ্ক।
— বলব। বলব বলেই তো আপনার সাহায্য চাইলাম, আচার্য। কিন্তু আপনারা আগে একটু বিশ্রাম নিন। আমি আগামী প্রহর শুরু হতেই আসব। তখন আলোচনা করা যাবে। কিন্তু তার আগে আমায় কুলূতের সমস্ত ঘটনার কাহিনি শোনান আপনারা।
৩৩.
শশাঙ্ক গুরুদেবের খাদ্যরুচির কথা মাথায় রেখেই চাণক্যর সম্মুখে গুড় মেশানো এক পেয়ালা ধূমায়িত দুধ রেখেছে। সে নিজে ও জীবসিদ্ধিও দুধের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছে, তবে বলা বাহুল্য তাতে গুড়ের পরিমাণ চাণক্যর পেয়ালার এক চতুর্থাংশ। চাণক্য তৃপ্তি সহকারে চুমুক দিয়ে কিছুটা দুধ পান করে শশাঙ্ককে বললেন,
— গোটা ঘটনা খুলে বলো, শশাঙ্ক। অতি সামান্য কোনো বিষয়, তা যতই গুরুত্বহীন মনে হোক, সেটাও উহ্য রেখো না।
শশাঙ্ক গত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ সারাদিন শুধু এই বিষয়েই ভেবেছে। অতএব ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ দিতে তাকে বিশেষ বেগ পেতে হল না।
— বাবাকের গৃহে শুধু সে আর তার পুত্র থাকে। তার স্ত্রী বহু বছর পূর্বে গত হয়েছে। গৃহেই তার নিজস্ব অস্ত্র নির্মাণের কর্মশালা যেখানে বাবাক ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অস্ত্র বানিয়ে থাকে। সে নিজেই কারিগর এবং তার পুত্র পিতাকে সাহায্য করলেও সে নিজে কারিগরি এখনও শিখে উঠতে পারেনি এই কথা সে নিজেও স্বীকার করেছে এবং গ্রামের অন্যদের থেকেও তার কথার সত্যতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। এই ছেলেটির নাম বিধোরক। কমবুদ্ধি, সহজ, সরল বছর কুড়ি-একুশের যুবক। কাজ বলতে বাবার কাজে সাহায্য আর মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়তে কাজ করে সামান্য আয় হয়।
পিতা-পুত্র যে কুটিরে থাকে সেটার বর্ণনা দেওয়া প্রয়োজন। যদিও আপনি স্বচক্ষেও দেখবেন খুব শীঘ্রই।
কুটিরটি গ্রামের মাঝামাঝি অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে। আশেপাশে অন্য কোনো গৃহস্থ কুটির নেই। কুটিরের দু-ধারে, উলটো কোণে দুটি দরজা যা থেকে দুটি পায়ে হাঁটা পথ দু-দিকে চলে গিয়েছে। যদিও দুই পথ দিয়েই গ্রামের হাটে যাওয়া যায়। কুটিরের মাঝ বরাবর উঁচু পাঁচিল থাকায় এবং এই দুই দরজার অবস্থান এরকমই যে একজন নজরদারের পক্ষে দুইটি দরজার উপরেই নজর রাখা সম্ভব নয়। অতএব, আমাদের চব্বিশ ঘণ্টা চারজন নজরদার নিযুক্ত করতে হয়েছিল। এক-একটি দরজার জন্যে দু-জন বরাদ্দ। এদের মধ্যে একজন নজর রাখবে আর দ্বিতীয়জন যদি বাবাক কোনো দ্বার দিয়ে গৃহ ত্যাগ করে তবে সে তার পিছু নেবে। মোটকথা, বাবাককে কখনোই চোখের আড়াল হতে দেওয়া চলবে না। যদিও বাবাকের এই ব্যবস্থায় কোনো আপত্তি ছিল না। তার অস্ত্র এরকম ভয়ংকর কাজে ব্যবহার হচ্ছে জেনে সে আমাদের সম্পূর্ণ সহযোগিতা করতেই রাজি হয়েছিল।
.
প্রথম দু-দিন পিতা বা পুত্র দু-জনেই কুটির ছেড়ে একবারও বের হয়নি। তৃতীয়দিন বিধোরক আমার কাছে কয়েক দিনের জন্যে তক্ষশিলা মহাবিদ্যালয়ে যাওয়ার অনুমতি চায়। সেখানে কিছু কাজে তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে বলে জানায় এবং কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরে আসবে তাও বলে। তাকে অকারণ আটকে রাখার কোনো কারণ ছিল না, তাই তাকে যেতে দিই। এবং, কথামতো সে ফিরেও আসে চারদিন পরেই।
এই মাঝের কয়েক দিন পিতা একলাই ছিল গৃহে। দু-একজন মানুষ আসত তার কাছে রোজই কিছু কিছু দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী নিতে বা মেরামত করতে। কোদাল, ছুরি, ইত্যাদি। কিন্তু তারা সকলেই এই গ্রামেরই বাসিন্দা। সন্দেহজনক কাউকেই এর মধ্যে আসতে দেখা যায়নি বাবাকের কাছে।
পুত্র ফিরে আসার পরেও তাদের জীবনযাপনে কোনো বিশেষ পরিবর্তন আসে না। মাঝে মাঝে কেউ বের হয়, হাটে যায়, ফিরে আসে। সত্যি বলতে আমরাও কিছুটা অধৈর্যই হয়ে পড়ছিলাম। উল্লেখযোগ্য কিছুই ঘটছিল না প্রায়, একমাস কেটে গেলেও।
এরপরেই একদিন আচমকাই ঘটনাটা ঘটল। আমরা যা হওয়া কখনোই সম্ভব নয় বলে ভেবেছিলাম, সেটাই ঘটে। নজরদারদের অনেকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেও যেটুকু জেনেছি, তা আপনাকে বলি।
সেইদিন দিনের প্রথম প্রহরে পুত্র, মানে বিধোরক কুটির ছেড়ে বেরিয়েছিল। প্রহর শেষের দিকে বা দ্বিতীয় প্রহরের শুরুর সময়ে বাবাক বের হয় প্রথম দরজা দিয়ে অর্থাৎ প্রথম রাস্তা দিয়ে। নিয়মমতো তার পিছু নেয় সেখানে অপেক্ষায় থাকা আমাদের দুই গুপ্তচরের একজন। বাবাক গ্রামের হাটে পৌঁছায়। রোজকার মতো খাদ্যসামগ্রী কেনে, একটু শুঁড়িখানায় ঢোকে এবং মাত্র কয়েক মুহূর্ত পরেই বেরিয়ে আসে সেখান থেকে একটি সুরাপাত্র সঙ্গে নিয়ে। এটাও নতুন কিছু নয়। মাঝে মাঝেই পিতা বা পুত্র সুরাপান করে। এরপর বাবাক সোজা নিজের কুটিরেই ফিরে আসে। কেউই সন্দেহজনক কিছু আচরণ লক্ষ করেনি সেদিন।
এরপরেই পুত্র বেরিয়ে এসে একজন নজরদারকে জিজ্ঞেস করে যে, তার পিতাকে সে বেরোতে দেখেছে কি না। কারণ পিতার তার সঙ্গে দুপুরের আহার করার কথা ছিল কিন্তু তিনি গৃহে নেই। প্রথম দরজার নজরদাররা জানায় যে, হ্যাঁ, বাবাক বেরিয়েছিল এবং বেশ কিছুক্ষণ আগে ফিরেও এসেছে। বিধোরক এরপর দ্বিতীয় পথে নজর রাখা দু-জনের কাছে একই কথা জিজ্ঞেস করে। তারা জানায় যে, বাবাককে তারা কেউই বেরোতে বা ঢুকতে দেখেনি। অতএব, তার পিতার গৃহেই থাকার কথা। কিন্তু বিধোরক বলল যে, পিতা গৃহে নেই। নজরদাররা একত্রিত হয় এবং তাদের বক্তব্য ও সময় মিলিয়ে দেখা যায় যে, বাবাক প্রথম পথ ধরে বেরিয়েছিল, গ্রামের হাটে যায় এবং সেই পথেই ফিরে আসে। সে যে ফিরছিল তার প্রমাণ হিসাবে কুটিরে তার ঝোলা, ক্রয় করা সবজি, চাল ও সুরা ভরতি পাত্রটিও পাওয়া যায়। এমনকী সে যে নিজের কার্যালয়ে আগুন জ্বেলে কাজ করছিল তার প্রমাণও দেখা যায়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে জলজ্যান্ত মানুষটিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।
.
চাণক্য কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা না বলে মাটির দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করে বসে রইলেন। দুধে চুমুক দিতেও ভুলে গিয়েছেন। খানিকক্ষণ ভাবার পর বললেন,
— সেদিন কুটিরের বাইরে নজর রাখার কাজে বহাল থাকা চারজনের সঙ্গে কথা বলতে চাই। তাদের এখানে পাঠাও, শশাঙ্ক। তবে, এক এক করে পাঠাবে। আমি প্রত্যেকের থেকে আলাদা আলাদাভাবে সেদিনের ঘটনার বিবরণ শুনতে ই। এরপর প্রয়োজনে এতদিন ধরে যে কয়জন ব্যক্তি নজরদারির কাজে নিযুক্ত ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলব।
শশাঙ্ক উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— বহুদিন আপনার সংশ্রবে থাকার দরুন আমি পূর্বেই অনুমান করেছিলাম যে, আপনি তাদের সঙ্গে আলাদা কথা বলতে চাইবেন। তাই ওই চারজনকে ইতিমধ্যেই এই শিবিরে নিয়ে এসেছি। আমি এখুনি এক একজনকে পাঠিয়ে দিচ্ছি আপনার কাছে। আমি জানি এই রহস্যের সমাধান আপনি করতে পারবেন, আচার্য। আপনারই আশায় এতদিন আছি যে, আপনি একবার এসে পড়লেই আমার গৃহে ফেরার সময় হবে। নিজের কন্যার মুখ দর্শন করতে আমি যে বড়োই উদগ্রীব, আচার্য।
বলে হেসে তাঁবু থেকে প্রস্থান করল শশাঙ্ক।
৩৪.
দরজা ১, নজরদার ১।
চাণক্য প্রশ্ন করলেন,
— তুমি ও তোমার সঙ্গী কতক্ষণ নজর রেখেছিলে সেইদিন?
— আমাদের বরাদ্দ সময় ছিল দিনের চার প্রহর, মহামতি। গোটা সময়টাই আমি ছিলাম আমার স্থানে।
— হুমম। সঠিকভাবে স্মরণ করে বলো, তুমি সেইদিন কোন কোন ব্যক্তিকে ঢুকতে ও বেরুতে দেখেছিলে।
— বাবাক বেরিয়েছিল প্রথম প্রহরের শেষের দিকে।
— প্রথম প্রহর শেষের দিকে না দ্বিতীয় প্রহরের শুরুতে?
— তা হতে পারে, মহামতি। নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।
— হুম। বেশ, তারপর? তুমি পিছু নিয়েছিলে?
— আজ্ঞে না। আমি নিজের স্থানে অপেক্ষা করেছিলাম। আমার সঙ্গী পিছু নেয় বাবাকের।
— তারপর?
— বাবাক ফিরে আসে দ্বিতীয় প্রহরের মাঝামাঝি এবং আমার সামনে দিয়েই কুটিরে প্রবেশ করে।
— ভিতরে প্রবেশের পর সে আর বের হয়নি?
— আজ্ঞে না। সে নিজের কার্যালয়ে ঢুকে কাজ শুরু করেছিল।
— কীভাবে জানলে সেটা?
— কুটিরে তার কার্যালয় থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখেছিলাম। সে আগুন জ্বালিয়ে অস্ত্র নির্মাণের কাজ করলে এই ধোঁয়া বেরোয়। আগেও দেখেছি।
— এরপর আর কেউ বেরিয়েছিল?
— হ্যাঁ। বিধোরক একবার বের হয়েছিল হাটের পথে
— কখন বেরিয়েছিল? পিতা ফিরে আসার আগে, না, পরে? তাকে ফিরতে দেখেছিলে?
— ঠিক মনে করতে পারছি না। সম্ভবত পিতা ফেরার পূর্বেই। নিশ্চিত মনে নেই, মহামতি। তবে, তারপর আরও একবার তাকে বেরোতে দেখি তৃতীয় প্রহরের সময়ে, নিজের পিতার খোঁজ জিজ্ঞেস করে আমাদের কাছে।
— তুমি কী বললে?
— আমরা জানালাম যে, বাবাক হাট থেকে বহু পূর্বেই ফিরে এসেছে। কুটিরে না থাকলে নিশ্চয়ই দ্বিতীয় দ্বার দিয়ে আবার কোথাও বেরিয়েছে।
— আর কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে তুমি দেখোনি?
গোটা সময়ের মধ্যে একবারও তুমি নিজের স্থান ত্যাগ করোনি?
— না, আচার্য। কোনো তৃতীয় ব্যক্তি আসেনি বা বের হয়নি। আমি সর্বদাই সেখানে ছিলাম।
.
দরজা ১, নজরদার ২।
চাণক্যর প্রশ্ন,
— তুমি প্রথম কাকে কুটির থেকে বেরোতে দেখেছিলে?
— দ্বিতীয় প্রহরের শুরুর সময়ে বাবাক বেরোয় হাটের উদ্দেশে।
— তুমি তার পিছু নিয়েছিলে? তার গতিবিধি কী ছিল সেদিন?
— হ্যাঁ। আমিই তার পিছু নিয়েছিলাম। বাবাক প্রথমে খোলা বাজারে কিছু সওদা করে সবজি, আনাজ ইত্যাদি। তারপর একটি শুঁড়িখানায় প্রবেশ করে। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বেরিয়ে আসে।
— সেই সময়ে তুমি কোথায় ছিলে?
— বাইরে অপেক্ষা করছিলাম।
— তার মানে ওই সময়ে সে তোমার নজরের আড়ালে ছিল।
— সে মাত্র কিছুক্ষণ, আচার্য। বেরোনোর পূর্বে বাবাকের কাঁধের ঝোলা খুলে দেখা হয়েছিল, তাতে কোনো অস্ত্র বা শর ছিল না। তাই শুঁড়িখানায় কারুর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলেও কোনো লাভ তার হত না। আর ওই শুঁড়িখানার একটিমাত্র দ্বার ছিল যেখানে আমি অপেক্ষায় ছিলাম। অতএব, অন্য পথ দিয়ে বাবাকের পলায়ন করারও সম্ভাবনা ছিল না।
— হুমম।
— তারপর সে সোজা কুটিরে ফিরে আসে। মাঝে কোথাও দাঁড়ায়নি। এরপর কুটির থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখে বুঝি যে কাজে হাত দিয়েছে।
— এরপর আর কাউকে বেরোতে বা প্রবেশ করতে দেখেছিলে?
— বাবাক পুত্র বিধোরক একবার বেরিয়েছিল মনে হয় হাটের দিকে। দ্বিতীয়বার তাকে আবার বেরোতে দেখি যখন আমাদের কাছে পিতা কোথায় তা জানতে চায় বেরিয়ে।
— হুমম। তুমি কতদূর থেকে পিছু নিচ্ছিলে বাবাকের?
— যাতে আশেপাশে কারুর সন্দেহ না হয় তাই বেশ কিছুটা দূর থেকেই কারুর উপর নজর রাখা নিয়ম। তাই আন্দাজ বিশ-পঁচিশ হাত দূরে দূরে আমি সর্বদা ছিলাম বাবাকের।
— বেশ। তুমি আসতে পারো।
.
দরজা ২, নজরদার ১।
— তোমার নজরদারির ভার কতক্ষণের ছিল?
— দিনের চার প্রহর, আচার্য।
— তুমি সেইদিন কাকে বেরোতে বা প্রবেশ করতে দেখেছিলে সেটা বলো।
— দিনের প্রথম প্রহরে, প্রভাতে বিধোরক বেরিয়ে যায় এবং অনেক পরে ফিরে আসে।
— কতক্ষণ বাদে?
— তা ধরুন, তৃতীয় প্রহরের শুরুতে।
— হুমম। তাকে আর বেরোতে দেখেছিলে?
— হ্যাঁ। তৃতীয় প্রহরের মাঝামাঝি সে আবারও বেরিয়ে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসে। পিতাকে আমরা ফিরতে দেখেছি কি না জানতে চায়। আমরা জানাই যে, আমরা আজকে সকাল থেকে তার বাবাকে একবারও দেখিনি। তবে সে গৃহেই ছিল আগের প্রহরেও। কারণ তার কার্যালয় থেকে ধোঁয়া নির্গত হচ্ছিল।
— হুমম। গোটা সময়ে তুমি ছিলে নিজের স্থানে?
— হ্যাঁ, আচার্য। মাঝে অল্প সময়ের জন্যে যদি-বা আমি নাও থেকে থাকি, আমার সঙ্গীটি ছিল। কোনো সময়েই আমাদের দু-জনের নজর এড়িয়ে বাবাকের কুটিরে প্রবেশ বা বাহির হওয়া সম্ভব ছিল না।
— হুম। তুমি আসতে পারো। সেদিন তোমার সঙ্গী যে ছিল তাকে পাঠিয়ে দাও।
.
দরজা ২, নজরদার ২।
— সেইদিন কে বেরিয়েছিল এবং কে প্রবেশ করেছিল স্মরণ করে বলো।
— সকালে বিধোরক বেরিয়েছিল এবং, অনেক দেরিতে ফিরে এসেছিল। — কতক্ষণ বাদে?
— সঠিক বলতে পারব না। তবে, অনেক বেলায়। তৃতীয় প্রহর হবে।
— আর কাউকে প্রবেশ করতে দেখেছিলে?
— না, ব্রাহ্মণদেব।
— তারপর?
— বিধোরক তার পিতার খোঁজ করতে আসে। বলে যে এতক্ষণে তো পিতার ফিরে আসার কথা, কিন্তু পিতা কুটিরে নেই। আমরা তাকে আশ্বাস দিয়ে বলি যে, চিন্তার কিছু নেই, তার সঙ্গে সর্বদাই আমাদের একজন থাকে। কিন্তু এর উত্তরে যখন ছেলেটা বলে যে উলটো দিকের দরজার দু-জন প্রহরী বলল যে, বাবাক ফিরে এসেছে, তখন আমাদের মনে সন্দেহ হয়। আমরা কুটিরে প্রবেশ করি, ওদিকের দু-জনকেও ডাকা হয়। এবং, যখন কোথাও বাবাককে খুঁজে পাওয়া যায় না তখন আমরা দলপতি শশাঙ্ককে খবর পাঠাই।
— কুটিরে প্রবেশ করে তোমরা কী দেখেছিলে?
— বাবাকের ঝোলা শুধু রাখা আছে। ওই ঝোলা নিয়েই সে হাটে গিয়েছিল বলে জানায় ওই দ্বারের দু-জন। এবং, সে যে ফিরে এসেছিল তার যথেষ্ট প্রমাণও আমরা পাই। তার ঝোলায় টাটকা সবজি এবং সদ্য ক্রয় করা মদিরার একটি পাত্রও ছিল। শুধু তাই নয়, বাবাকের কার্যালয়ের চুল্লিতে তখনও নিভু নিভু আগুনের থেকে বোঝা যায় যে, সে খানিক পূর্বেও সেখানে নিজের কাজ করছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে কুটিরের ভেতর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা রীতিমতো দেয়াল, পাতাল পরীক্ষা করে দেখেছি যে, কোনো গোপন পথ আছে কি না কুটিরে। কিন্তু না আচার্য, বিশ্বাস করুন ওই দুটি দরজা ভিন্ন আর কোনো পথে ওই কুটিরে প্রবেশ বা বেরোনো সম্ভব নয়।
— হুমম।
.
শেষজন বেরিয়ে যাওয়ার পর জীবসিদ্ধি চাণক্যকে প্রশ্ন করল,
— কী বুঝলেন, গুরুদেব?
চাণক্য উত্তর দিলেন,
— আমার আরও এক পেয়ালা মধু দেওয়া দুধের প্রয়োজন।
— এই তো এক পেয়ালা শেষ ….
— আহা! তুমি তো জানোই, জিভে মধুর ছোঁয়া না পেলে আমার মস্তিষ্ক সচল হয় না।
