সোম-শাস্ত্ৰ – ১

১.

আজকে সেজে উঠেছে মগধের রাজধানী পাটলিপুত্র। চারিদিকে মানুষজন পথে বেরিয়ে এসেছে নতুন বস্ত্র পরে এবং অলংকারে সজ্জিত হয়ে। বিনামূল্যে আহার এবং পানীয় দেওয়া হবে প্রতিটি মানুষকে। আজ উৎসব! আজ মহা সমারোহ পৰ্ব!

হবে নাই-বা কেন? আজ এক বিশেষ দিন। আজকে মগধের সম্রাট, বা, বলা ভালো সমগ্র আর্যাবর্তর সম্রাট, স্বয়ং চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর বিবাহ!

.

পাটলিপুত্রর রাজপ্রাসাদ সুসজ্জিত করা হয়েছে বিভিন্ন ফুল এবং বর্ণময় সজ্জাবস্তু দিয়ে। প্রদীপ সাজানো হয়েছে মহলের প্রতিটি বাতায়ন ও ছাদের ধারে। যদিও এই দিনের আলোয় সেগুলো প্রজ্বলিত নয়। এগুলি সূর্যাস্তের পর প্রজ্বলন করা হবে।

দাসদাসী এবং রাজপুরুষরা ছুটে বেড়াচ্ছে ব্যস্তভাবে। আয়োজনে যেন কোনো ত্রুটি না থাকে আজ! মহামাত্য কৃষ্ণনাথের চোখে গত কয়েক রাত্রি নিদ্রা নেমে আসেনি চিন্তায়। তাঁরই উপর তো সবচেয়ে অধিক দায়িত্ব। একে এই বিশাল আয়োজন, তার উপর এই মুহূর্তে মহলে রয়েছেন বহু ভিন রাজ্যের আমন্ত্রিত রাজপুরুষরা। তাদের আপ্যায়ন ও যত্নের সামান্যতম ত্রুটিতেও প্রশ্নের মুখে পড়বে মগধের গৌরব। প্রতিটি রাজপুরুষের ভিন্ন প্রয়োজন, ভিন্ন খাদ্যাভ্যাস। তাদের প্রত্যেককে তুষ্ট করতে হবে।

এই মুহূর্তে মহলে আজকের মহাভোজের এবং বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলেছে। পুষ্করিণীর ধারে, বিবাহ মণ্ডপসজ্জা করছে একদল কর্মচারী। তাদের কাজের দিকে নজর রাখছেন মহামাত্য। মাঝে মাঝেই এক-দু-জন করে তাঁর

কাছে এসে এসে তাদের প্রয়োজন জানিয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা মাথায় তাদের কথা শুনছেন এবং প্রয়োজনমতো নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি। বয়স হয়েছে তাঁর। যদিও বার্ধক্য ছাপ ফেলেনি কৃষ্ণনাথের স্বাস্থ্যে। তবে শারীরিকের চেয়েও মানসিক দিক থেকে ক্লান্ত। প্রায় গোটা দেশ পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। সব মিটে গেলে সম্রাটকে বলে তিনি কয়েক দিন বিশ্রাম নেবেন।

সম্রাটের কথা মনে হতেই খানিকটা মনমরা হলেন বৃদ্ধ। কতই-বা বয়স হবে চন্দ্রগুপ্তর? নেহাতই সদ্য কৈশোর পেরিয়েছেন। অথচ কী বিশাল দায়িত্ব দৃঢ় হাতে সামলে চলেছেন তিনি। আর এখন এই বিবাহ…

— প্রণাম মহামাত্য।

চিন্তায় ছেদ পড়ল কৃষ্ণনাথের। ঘুরে দেখলেন ব্রাহ্মণের বেশে এক যুবক তাঁর উদ্দেশে দু-হাত জোড় করে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।

— আহ্! জীবসিদ্ধি মহাশয়! প্ৰণাম।

সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর গুরুভ্রাতা এবং পরম মিত্র জীবসিদ্ধিকে দেখে তিনি এগিয়ে গেলেন তার দিকে। জীবসিদ্ধি বলল,

— আপনাকে এক দর্শনেই অনুমান করা যাচ্ছে যে, আপনি কয়েক রাত্রি জাগরণ করেছেন। এত চিন্তা কীসের, আর্য?

— চিন্তার বিষয় কি কম? এত বড়ো অনুষ্ঠান! এত অতিথি! মগধের মানসম্মান জড়িয়ে আছে এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে।

— বুঝতেই পারছি। তবে নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখুন, আর্য। মগধের মানসম্মানের সঙ্গে সঙ্গেই, তার মহামাত্যর স্বাস্থ্যও মূল্যবান।

এতক্ষণে হাসলেন কৃষ্ণনাথ। জীবসিদ্ধি বলল,

— আমি পাকশালার দিকটা পর্যবেক্ষণ করে এসেছি। ঠিকঠাক সব। এদিকে সব ঠিক আছে?

— হ্যাঁ। সব ঠিকই আছে আয়োজন।

— আর সম্রাট?

মুখে ছায়া নেমে এল বৃদ্ধের। বললেন,

— সম্রাট অতিথিদের অভ্যর্থনা করেছেন যথাযথ। নিজের রাজধর্মে কোনো

ত্রুটি রাখেননি। তবে…

কথাটি অসম্পূর্ণ রেখেই থেমে গেলেন বৃদ্ধ। জীবসিদ্ধি গম্ভীর হয়ে বলল,

— বুঝতে পারছি।

একটু ত্রুটি চোখে পড়ায় মণ্ডপসজ্জার কর্মচারীদের উদ্দেশে কয়েকটি নির্দেশ দিলেন কৃষ্ণনাথ। তারপর পুনরায় জীবসিদ্ধির দিকে ফিরে বললেন,

— তিনি কথা বলছেন না বিশেষ কারুর সঙ্গেই। আমি সকলকে নির্দেশ দিয়েছি তাঁকে বিরক্ত না করতে। কোনো প্রয়োজন থাকলে যেন আমায় আগে বলে। সম্রাটকে যেন দূরে রাখা হয় এইসব থেকে।

— ঠিক করেছেন!

নির্মীয়মাণ বিবাহমণ্ডপের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই কথাটা বলল জীবসিদ্ধি।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রশ্ন করল,

— কন্যাপক্ষ কখন আসবে?

— তাঁরা গতকালই রাজধানীতে এসে উপস্থিত হয়েছেন। অন্য একটি মহলে আছেন। সংবাদ এসেছে যে, তাঁরা রাজমহলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন ইতিমধ্যে। তবে তো বেশিক্ষণ সময় লাগবে না তাঁদের এখানে উপস্থিত হতে।

— আজ্ঞে, হ্যাঁ।

অঙ্গবস্ত্রটি এককাঁধে গুছিয়ে নিয়ে জীবসিদ্ধি বলল,

— তবে আমি একবার সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসি।

— হ্যাঁ। তাই করুন। আর আচার্য? তিনি কখন আসবেন?

— যখন উনি সঠিক সময় মনে করবেন। সেই সময় যে কখন, তা স্বয়ং বিষ্ণু জানেন একমাত্র।

২.

দালান পার করে সোজা সম্রাটের অন্দরমহলে ঢুকে এল জীবসিদ্ধি। তাকে দেখে দ্বারের দু-জন প্রহরীর একজন ভিতরে ঢুকে গেল। জীবসিদ্ধি রাজরক্ষীদের পরিচিত। তাই তাকে আসতে দেখেই সম্রাটের কাছে তার আগমনের কথা জানিয়ে দিতে গেল। খানিক বাদেই সে বেরিয়ে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে দ্বারের দু-পাশে মূর্তিবৎ পূর্বের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। অর্থাৎ, জীবসিদ্ধির প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন সম্রাট।

কক্ষে প্রবেশ করে জীবসিদ্ধি দেখল একটি চারপায়া কাষ্ঠাসনে বসে আছেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত। তিনজন ব্যক্তি তাঁকে ঘিরে রেখেছেন। আজকে রাত্রের বিবাহের বস্ত্র তাঁর গায়ে চড়িয়ে তাঁরা দেখছেন মাপ ঠিক আছে কি না। চন্দ্রগুপ্ত নির্লিপ্তভাবে বসে আছেন। মুখে তাঁর কোনোরকম অভিব্যক্তি না থাকলেও, জীবসিদ্ধি তাঁর সঙ্গে বহু বছরের পরিচিতির সুবাদে জানে যে, তিনি মনে মনে অসম্ভব বিরক্ত হচ্ছেন।

জীবসিদ্ধিকে দেখে সম্রাটের মুখে তাঁর পরিচিত হাসি ফুটল না। শুধু তার প্রতি একবার শীতল দৃষ্টি হানলেন।

গোটা মগধে যে কয়েক জন মুষ্টিমেয় ব্যক্তি আজকে এই বিবাহে অসন্তুষ্ট, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত স্বয়ং তাদের মধ্যে একজন। সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে অধিক অপ্রসন্ন আজকে নিজের বিবাহ নিয়ে।

জীবসিদ্ধি এগিয়ে গিয়ে সম্রাটকে প্রণাম জানিয়ে বলল,

— সম্রাটের জয় হোক। আপনাকে এই অপূর্ব অলংকার শোভিত রাজবেশে সূর্যের মতোই দীপ্তমান লাগছে। তবে বলে রাখি, মগধের ভাবী মহারানিও কিন্তু রূপে কম যান না। তাঁর রূপের ছটায় স্বয়ং অপ্সরারাও ম্রিয়মাণ।

কণ্ঠে ক্ষোভ ঝরে পড়ল সম্রাটের,

— উপহাস করছ হে, জীবসিদ্ধি? উপহাস করছ আমায় নিয়ে?

সম্রাটের কথায় কক্ষে উপস্থিত ব্যক্তিরা থেমে গিয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে বিস্ময় আর ভীতি। তারা সম্রাটের হঠাৎ ক্ষোভের কারণ অনুধাবন করতে পারছে না।

তবে তারা না জানলেও চন্দ্রগুপ্তর অসন্তোষের কারণ জীবসিদ্ধি জানে; ভালোভাবেই জানে। এবং, তাতে সম্রাটকে দোষ দেওয়া যায় না। তাঁর জায়গায় জীবসিদ্ধি নিজে থাকলে সেও এইরূপ ক্ষোভ প্রকাশ করত।

— একান্ত!

কক্ষে উপস্থিত অন্যদের প্রতি নির্দেশ দিল জীবসিদ্ধি। দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করল সম্রাট এবং জীবসিদ্ধি বাদে সকলে।

কক্ষ খালি হতে আনুষ্ঠানিক সম্ভাষণ ত্যাগ করে জীবসিদ্ধি বলল,

— ভ্রাতা চন্দ্র। আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। তুমি তো জানোই এই বিবাহে আমারও মত ছিল না। কিন্তু গুরুদেবের এই সিদ্ধান্ত যে তোমার এবং মগধের পক্ষে হিতকর, সেটা অস্বীকার করা যায় না।

উঠে দাঁড়ালেন চন্দ্রগুপ্ত। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,

— তাই বলে আমার জীবনের এত বড়ো একটি সিদ্ধান্ত তিনি আমার মতের বিরুদ্ধে নেবেন? তুমি কি বুঝতে পারছ আমার মনের অবস্থা? আর কয়েক প্রহর পরেই আমি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে চলেছি আমারই পরম শত্রুর কন্যার সঙ্গে! আমি স্ত্রী রূপে গ্রহণ করতে চলেছি, আমার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারী, আমার পরম-শত্রু ধনানন্দর কন্যা দুর্ধরাকে!

জীবসিদ্ধির মুখে কোনো সান্ত্বনাবাণী জুটল না। হ্যাঁ, এটা সত্য। সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর ভাবী মহারানি আর কেউ নয়, স্বয়ং ধনানন্দর একমাত্র কন্যা রাজকুমারী দুর্ধরা। সেই ধনানন্দ যার স্বৈরাচারী শাসন থেকে, কয়েক বর্ষ পূর্বেই মগধকে মুক্ত করেছিল আচার্য চাণক্য এবং চন্দ্রগুপ্ত। সেই ধনানন্দ যার অত্যাচারের বলি হয়েছিল চন্দ্রগুপ্তর পরিবার। সারাজীবন যার প্রতি প্রবল ঘৃণা নিয়ে বেড়ে উঠেছে চন্দ্রগুপ্ত, আজ তাকেই নিজের আত্মীয় বানাতে বাধ্য হচ্ছে সে।

এবং, এর মূলে আছেন স্বয়ং আচার্য বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য। তিনি বাদে আর কারই-বা ক্ষমতা আছে এই পৃথিবীতে যে সম্রাট চন্দ্রগুপ্তকে কোনো কাজে বাধ্য করেন? আচার্যই চন্দ্রগুপ্তর এই বিবাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটিকে বিবাহ না বলে বরং একটি রাজনৈতিক চুক্তি বলাই সমীচীন।

কয়েক মাস পূর্বেই একদিন হঠাৎ রাজমহলে এসে হাজির হয়েছিলেন আচার্য চাণক্য। জীবসিদ্ধিও সেসময়ে সেখানেই উপস্থিত ছিল। চন্দ্রগুপ্ত তাদের নিজের কক্ষে এনে বসাতে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই চাণক্য বললেন,

— সম্রাট। আমি মনে করি তোমার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় উপস্থিত হয়েছে।

কথাটা শুনে চন্দ্রগুপ্ত ও জীবসিদ্ধি অবাক হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী চমক বাকি ছিল তখনও। চন্দ্রগুপ্তকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চাণক্য ফের বললেন,

— তোমার বিবাহ ধনানন্দর একমাত্র কন্যা রাজকুমারী দুর্ধরার সঙ্গে দেওয়ার নির্ণয় নিয়েছি আমি।

চন্দ্রগুপ্ত এবং জীবসিদ্ধি দু-জনেই কয়েক মুহূর্ত আচার্যর মুখের দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। প্রথমে তারা ভেবেছিল আচার্য কৌতুক করছেন। কিন্তু চাণক্যর মুখ দেখেই দু-জন বুঝতে পারল তাঁর মুখে কৌতুকের কোনো আভাস নেই। চন্দ্রগুপ্তই বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বলল,

— এ আপনি কী বলছেন, আচার্য?

ডান হাত তুলে চন্দ্রগুপ্তকে থামিয়ে দিলেন চাণক্য। বললেন,

— এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, চন্দ্রগুপ্ত। আমি ইতিমধ্যে ধনানন্দর অমাত্য রাক্ষসের নিকট বিবাহপ্রস্তাব দিয়ে দূত পাঠিয়েছি। কয়েক দিন পরেই তার ও ধনানন্দ সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করে বিবাহের তিথি চূড়ান্ত করে আসব।

— কিন্তু, আচার্য…

জীবসিদ্ধির কথাও মাঝপথে কেটে দিলেন চাণক্য,

— জীবসিদ্ধি, তোমার গুপ্তচররা যে সংবাদ এনেছে, যে প্রাক্তন সম্রাট নন্দর কয়েক জন সমর্থক একত্রিত হয়েছে বিদ্রোহ করার উদ্দেশ্যে এবং ধনানন্দর ও তার অমাত্য রাক্ষস, সম্রাট চন্দ্রগুপ্তকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে তৎপর হয়েছেন, একথা তুমি সম্রাটকে জানিয়েছ?

— আজ্ঞে হ্যাঁ।

চাণক্যর এই ‘চন্দ্রগুপ্ত’ থেকে ‘সম্রাট’, আনুষ্ঠানিক সম্ভাষণের পরিবর্তনের অর্থ হচ্ছে তাঁর এই কথাগুলো তিনি আর ব্যক্তিগত স্তরে বলছেন না। অতএব তাঁর কথার গুরুত্ব এবার যেন চন্দ্রগুপ্ত তাঁর শিষ্য হিসাবে নয়, একজন সম্রাট হিসাবে বিবেচনা করেন। চাণক্য বললেন— সম্রাট, আপনি কি এর তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারছেন? নন্দ এক অযোগ্য শাসক হলেও, তার অমাত্য রাক্ষস একজন সুদক্ষ প্রশাসক। নন্দ মদ ও আমোদে ডুবে থাকত এবং বাস্তবে সাম্রাজ্য সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করতেন রাক্ষস। অতএব, তাঁর সমর্থক এই রাজ্যে কম নয়। তিনি যদি আমাদের শত্রুর আসনে বসেন এবং বিদ্রোহে ইন্ধন দেন, সেটা আমাদের পক্ষে চিন্তার বিষয়। কিন্তু, অমাত্য রাক্ষস নিজে ধনানন্দর প্রতি অনুগত এবং ধনানন্দর কন্যা দুর্ধরাকে নিজের কন্যাজ্ঞানে স্নেহ করেন। অতএব, তাঁর সঙ্গে তোমার বিবাহ হলে তাঁর আনুগত্য আপনার প্রতি কিছুটা হলেও আসবে। এবং, ধনানন্দ নিজের জামাতার জীবনহানি করে, নিজের পুত্রীকে বৈধব্য জীবনের দিকে ঠেলে দেবে না কখনোই। অর্থাৎ, এই বিবাহে আপনার জীবনহানির আশঙ্কা দূর হবে এবং সেইসঙ্গে বিদ্রোহের বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার পূর্বেই ধ্বংস হবে।

— কিন্তু আচার্য! এ যে ধনানন্দ! আপনি কি ভুলে গেলেন তার অত্যাচারের কথা? তার অপমানের কথা? তার কন্যাকে আপনি মগধের মহারানি করতে চাইছেন? তাকে আমায় স্ত্রীর মর্যাদা দিতে বলছেন?

— হুম। শোনো সম্রাট, মিত্রদের সর্বদা নিকটে রাখতে হয়, কিন্তু শত্রুকে তার চেয়েও নিকটে রাখতে হয় সর্বদা।

— কিন্তু, আচার্য…

উঠে দাঁড়িয়েছেন চাণক্য ইতিমধ্যে। অর্থাৎ, আলোচনার ইতি হয়েছে। তিনি আর কোনো কথা শুনতে রাজি নন। চন্দ্রগুপ্ত অসহায়ভাবে জীবসিদ্ধির দিকে চাইল। জীবসিদ্ধি গম্ভীর মুখে দু-পাশে মৃদু ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিল যে, এই বিবাহ প্রস্তাবের বিষয়ে সেও পূর্বে কিছুই জানত না। সে নিজেও চন্দ্রগুপ্তর মতোই বজ্রাহত।

এরপর এই প্রসঙ্গে কোনো কথাতেই চাণক্য কর্ণপাত করেননি। আচার্য চাণক্যর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা স্বয়ং সম্রাটেরও নেই।

.

কয়েক দিন পর সত্যিই চাণক্য জীবসিদ্ধিকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাসিত ধনানন্দর কাছে যান এবং বিবাহ তিথি ঠিক করে ফেলেন। এই সিদ্ধান্তে যে ধনানন্দ খুশি হয়েছিলেন তা নয়। কিন্তু, যেখানে স্বয়ং সিংহাসনে আসীন মগধ সম্রাট চাণক্যর সম্মুখে বিবশ, সেখানে পরাজিত ও নির্বাসিত সম্রাট তার বিরোধিতা করেন কোন সাহসে?

সব কথাই মনে পড়ে যাচ্ছিল জীবসিদ্ধির। চন্দ্রগুপ্ত বিষণ্ণ দৃষ্টিতে বাতায়নের সামনে দাঁড়িয়ে, রাজমহলের সজ্জা প্রস্তুতির দিকে চেয়ে আছেন। জীবসিদ্ধি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— দেখো, ভ্রাতা। আমার সত্যি বলতে তোমায় বলার মতো কিছুই নেই। তোমার বিবাহ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক চুক্তি একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই। কিন্তু, একটি কথা তোমায় আমি বলতে চাই। আচার্যর সঙ্গে আমি ধনানন্দর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। সেইসময়ে আমার রাজকুমারী দুর্ধরার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে এবং সামান্য বাক্য বিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল। আমি এইটুকু তোমায় বলতে পারি যে রাজকুমারী দুর্ধরা এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী। পিতার প্রকৃতি দিয়ে তার বিচার কোরো না। এই পুরো ব্যবস্থায় আমি আচার্যর সঙ্গে অন্তত একটি বিষয়ে একমত। রাজকুমারী দুর্ধরা মগধের যোগ্য মহারানি হবেন।

বাতায়নের দিক থেকে চোখ না ফিরিয়েই চন্দ্ৰগুপ্ত বলল,

— সে মগধের যোগ্য রানি হবে বটে। কিন্তু, আমার স্ত্রী হবে কি? তাকে কি আমি কোনোদিন ভালোবেসে নিজের স্ত্রীর আসন মন থেকে দিতে পারব? সেও কি কোনোদিন তার পিতার চরম শত্রুকে স্বামী হিসেবে হৃদয়ে স্থান দিতে পারবে?

.

জীবসিদ্ধির কাছে এ প্রশ্নের উত্তর ছিল না। তবে তাকে উত্তর দিতেও হল না, কারণ সেসময়েই বাইরে শঙ্খধ্বনি শোনা গেল। আর এক প্রহরী এসে জানাল,

— সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর জয় হোক! মহারাজ, কন্যাপক্ষ রাজমহলে এসে উপস্থিত হয়েছেন।

৩.

প্রধান ফটক দিয়ে কনেপক্ষের অতিথিরা প্রবেশ করতেই তাদের উদ্দেশে পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগল মহলের বাসিন্দারা। একদল লোকের মধ্যে প্রবেশ করলেন ধনানন্দ। তাঁর পাশের ব্যক্তিকেও চিনতে অসুবিধা হল না জীবসিদ্ধির— অমাত্য কাত্যায়ন। যদিও অমাত্য ‘রাক্ষস’ নামেই সে বেশি পরিচিত মগধের জনতার মাঝে। মগধের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।

এরপরেই ঢুকল একটি পালকি। ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে সেটি। তাতে পর্দার আড়ালে যে স্বয়ং রাজকুমারী দুর্ধরা আছেন তা বলে দিতে হয় না। পালকি থেকে নামলেন রাজকুমারী। তৎক্ষণাৎ একদল নারী এবং কয়েক জন সৈনিক তাঁকে ঘিরে, পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে দক্ষিণ মহলের অন্দরে নিয়ে গেল। নন্দরাজের সময়ে ওটিই রাজকুমারী দুর্ধরার মহল ছিল।

একটু বাদেই নিজের পূর্ব মহল থেকে বেরিয়ে এলেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত। মাথায় উষ্ণীষ, পরনে রাজবেশ। এগিয়ে আলিঙ্গন করলেন ধনানন্দ এবং চন্দ্রগুপ্ত। মুখে দু-জনেরই কষ্টকৃত হাসি। এরপর দু-জনেই কোনো কথা না বলে যে যার মহলের পথ ধরলেন।

পুরো ব্যাপারটা দূরে বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে লক্ষ করছিল জীবসিদ্ধি। চন্দ্রগুপ্ত ও ধনানন্দর আলিঙ্গন দৃশ্য দেখে বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে।

আলিঙ্গন করার মুহূর্তে দু-জনই যে অপরজনের বুকে তরবারি বসিয়ে দেওয়ার কথা কল্পনা করছিলেন, এ বিষয়ে জীবসিদ্ধি নিশ্চিত। শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির কারণে কোনোটাই করা সম্ভব হচ্ছে না উভয়ের পক্ষেই— তিনি আচার্য চাণক্য।

অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করল জীবসিদ্ধি। তার স্পষ্ট মনে আছে, মগধের সিংহাসন দখলের পর চন্দ্রগুপ্তসহ বাকি সকলেরই মত ছিল ধনানন্দকে হত্যা করা হোক। সেইসময়ে তাঁকে গৃহবন্দি রাখা হয়েছে। ধনানন্দ নিজেও গৃহবন্দি অবস্থায় নিজের মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। কিন্তু আচার্য চাণক্য বললেন, ধনানন্দকে হত্যা করা হবে না। তাকে সপরিবার মগধ ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হবে। তাকে প্রাণদণ্ড নয়, নির্বাসিত করা হবে।

প্রতিবাদ করেছিল সকলেই। কিন্তু চাণক্য নিজের নির্ণয়ে অটল রইলেন। এই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া সেইসময়ে বাকিরা বুঝতে অক্ষম হলেও, চাণক্য ভুল করেননি। আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আচার্য কোনোদিন নেননি।

ধনানন্দকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার সুফল পরবর্তীকালে বুঝতে পেরেছিল তারা। দেশবাসী যেখানে নন্দদের হিংস্র, অত্যাচারী সম্রাট বলেই চিনত, সেখানে সারাদেশের জনগণের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল নব্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দয়ালু মনোভাবের কথা। সকলেই জানল যে সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর হৃদয় এতটাই বিশাল যে, তিনি তাঁর পরম শত্রুকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন।

চতুরঙ্গের মাত্র একটি মোক্ষম চালে সম্পূর্ণ আর্যাবর্তের জনমত মৌর্যদের পক্ষে প্লাবিত করে দিয়েছিলেন চাণক্য। শুধু তাই নয়, ধনানন্দকে হত্যা করলে তাঁর অনুগামীরা সাধারণ জনতাকে ও সৈনিকদের বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করত। সে-সুযোগ তারা পেল না।

তবে ধনানন্দ নিজে যে রাক্ষসের সঙ্গে মিলে রাজদ্রোহের চেষ্টা করবেন সে-সম্ভাবনার কথাও ভেবেই রেখেছিলেন চাণক্য। আর সেই কারণেই যেদিন জীবসিদ্ধির গুপ্তচররা সংবাদ আনল যে, তারা বিদ্রোহ এবং গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা করছে, চাণক্য সেই মুহূর্তে নিজের দ্বিতীয় চাল দিলেন। রাজকুমারী দুর্ধরার সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তর বিবাহের প্রস্তাব দিলেন।

জীবসিদ্ধি ভেবেই অবাক হচ্ছে যে, এই অসম্ভব বুদ্ধিমান, ক্ষুরধার মস্তিষ্ক মানুষটি কতদূর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ভেবে রেখেছেন। অস্বীকার করা যায় না যে, এই বিবাহের ফলে মগধ এবং সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত অত্যন্ত লাভবান হবেন। রাজকুমারীর সঙ্গে বিবাহের ফলে মগধের সিংহাসনে চন্দ্রগুপ্তর অধিকার আরও অনেকটাই মজবুত হয়ে যাবে। এর ফলে তিনি আর সিংহাসন দখলকারী সম্রাট নন, বরং পূর্ব সম্রাটের কন্যাকে বিবাহসূত্রে প্রকৃত সম্রাট হবেন।

এ ছাড়াও বিদ্রোহের সম্ভাবনা দমন করা গেল এবং নন্দর তরফ থেকে তার প্রাণসংশয় হওয়ার সম্ভাবনা আর থাকছে না বললেই চলে। চাণক্য জানে সামনে বড়ো যুদ্ধ আসছে। আচার্য শকুনি প্রতিক্ষণে দেশের কোনো কোণে বসে ষড়যন্ত্রের চক্রব্যূহ রচনা করে চলছেন। কোনদিক থেকে তাঁর পরবর্তী আঘাত আসবে তা কেউ জানে না। এর মধ্যে নন্দ, বা, বলা ভালো রাক্ষসও মৌর্যদের বিরুদ্ধে যোগ দিলে তা আশঙ্কার কথা হবে। তাই এই বিবাহের দ্বারা একবাণে একাধিক পাখি শিকার করতে চলেছেন চাণক্য।

কিন্তু চন্দ্রগুপ্তর কথা ভেবে জীবসিদ্ধির আফশোস হচ্ছে। হাজার হোক চন্দ্রগুপ্ত তার বাল্যমিত্র। এই বিবাহের সংবাদে সে ও তাদের অন্য পাঁচ গুরুভ্রাতাও হর্ষিত হতে পারেনি। অক্ষয়, শশাঙ্কসহ ছয়জন ছাত্রের কেউই মেনে নেয়নি খুশিমনে। তারা, অর্থাৎ আচার্য চাণক্যর ছয় শিষ্য বহু বছর ধরে অভিন্নহৃদয় মিত্র। সেই গুরুকুলের সময় থেকেই তারা একে অপরের গুরুভ্রাতা। নন্দ রাজ্যের পতনে চাণক্য ও চন্দ্রগুপ্ত ছাড়াও এই পাঁচজনের বিশেষ ভূমিকা ছিল। প্রত্যেকেই নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দেশকে নন্দদের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিল। অতএব স্বাভাবিকভাবেই তাদের কারুরই এই বিবাহে মত নেই। চন্দ্রগুপ্তর বিবাহ এতটাই অকস্মাৎ এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে হচ্ছে যে, জীবসিদ্ধি বাদে অন্য চার ছাত্র আজ এখানে উপস্থিত পর্যন্ত থাকতে পারেনি। তারা প্রত্যেকেই মগধের বিভিন্ন অংশে নিজ নিজ গুরুদায়িত্ব সামলাচ্ছে। বিশেষ করে শকুনির সন্ধানের কাজ গত বছর তাদেরই উপর দিয়েছেন চাণক্য।

.

ছোটো থেকেই জীবসিদ্ধি শুনে এসেছে যে, বিবাহ হল দুটি হৃদয়ের মিলনের অনুষ্ঠান। কিন্তু এক্ষেত্রে তা যে শুধুই রাজনৈতিক পদক্ষেপ হয়ে রইল। হৃদয়ের কথা কেই-বা ভাবে? চাণক্য অন্তত ভাবেন না। আচ্ছা, আচার্যর জীবনে কি কখনো প্রেম এসেছিল? তিনি কি জানেন ভালোবাসার মর্ম? অনুরাগের অনুভূতি? তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন, এমন কোনো নারী কি এই জগতে থাকতে পারে যে চাণক্যকে নিজের হৃদয় অর্পণ করেছিল? নাহ্, এ বোধ হয় সম্ভব নয়। নিজের মনেই এইসব এলোমেলো চিন্তায় ডুবে ছিল জীবসিদ্ধি।

অন্যমনস্ক হয়ে চলতে চলতে আবার পাকশালের কাছে এসে পৌঁছে গিয়েছে জীবসিদ্ধি। বিশাল, বিস্তৃত জায়গা জুড়ে বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয় সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। জীবসিদ্ধি নিজেও পূর্বে কোনোদিন এত আয়োজন চাক্ষুষ করেনি। সে যতই দেখছে ততই বিস্মিত হচ্ছে।

সমস্ত পাকক্রিয়ার পর্যবেক্ষণ করছেন জীমূতবাহন নামে এক রন্ধন বিশেষজ্ঞ। জীবসিদ্ধি আগ্রহী দৃষ্টিতে সব দেখছে দেখে জীমূতবাহন এগিয়ে এলেন তার দিকে

— প্রণাম, ব্রাহ্মণদেব।

হেসে জীবসিদ্ধি বলল,

— প্রণাম, মহাশয়। আপনাকেই খুঁজছিলাম। এখানের বেশিরভাগ বস্তুই আমার কাছে অজানা। জানতে কৌতূহল হয় এই খাদ্যবস্তুর বিষয়ে।

উৎসাহে জীমূতবাহন মহাশয়ের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। অনেকটা একজন শিল্পীকে তার শিল্প সম্বন্ধে জানতে চাইলে যেমন হয়ে থাকে।

জীমূতবাহন শুরু করলেন,

— খাদ্যের স্বাদ বুঝতে গেলে আগে আপনাকে খাদ্যকে বুঝতে হবে। খাদ্য তিন প্রকার। সাত্ত্বিক, যা হল মুনিঋষিদের খাদ্য। যেমন, ফল, দুধ, মধু। রাজসিক, যা আপনার কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। আর আছে তামসিক, যা মানুষের চরিত্রের দোষত্রুটি তথা অন্যান্য তমোগুণ প্রকাশ করে। যেমন ধরুন মাংস, মদিরা ইত্যাদি। আজকের ভোজসভায় সকল প্রকার খাদ্যের আয়োজন আছে মহাশয়। সুকাধন্য, সামিধন্য, শাক, পায়োবর্গ, মদ্যবর্গ, মামসাবর্গ সব।’

জীবসিদ্ধিকে নিয়ে তিনি একদিকে আনলেন যেখানে সবজি, মশলা প্রভৃতি ধোয়া ও বাছাই চলছে। সেদিকে ইঙ্গিত করে জীমূতবাহন বললেন,

— দেখুন। রন্ধনের পূর্বে অনেকগুলি ধাপ থাকে কাঁচা সামগ্রীকে আগে রন্ধনের উপযুক্ত করে তোলার। প্রথম ধাপ ‘শোধন’। সবজি ও ফলাদির খোসা ছাড়ানো, হিং-কে ব্যবহারের পূর্বে ঘি-তে আগে ভেজে নেওয়া, জিরে চালুনিতে চেলে নেওয়া, সব শোধনের অন্তর্গত। এরপর আসে ‘নিদান পরিবর্জন’ অর্থাৎ খাদ্যসামগ্রী থেকে শ্লেষাত্মক উৎপাদক সরিয়ে ফেলা। এ ছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে। কোন খাদ্য ভোজনের পূর্বে খেলে খিদে বাড়ে, বা, কোন বস্তু ভোজনের পরে খেলে পাচন প্রক্রিয়া ভালো হয়। সব খেয়াল রাখতে হয়।

জীবসিদ্ধি দ্রুত উৎসাহ হারাচ্ছে। কিন্তু এই মহাশয় তাকে এখনই ছাড়তে রাজি নন। তিনি তাকে অন্য একটি অংশে নিয়ে এলেন।

— এখানে ডাল রন্ধন চলছে। তিন ধরনের ডাল। উরদ, মুসুর ও মুগ ওদিকের বিশাল জালায় দুধ এসেছে। মহিষ, ছাগ ও গোদুগ্ধ আলাদা আলাদা। কারণ তাদের ব্যবহার আলাদা। এদিকে দই থেকে পানীয় ঘোল তৈরি হচ্ছে। ওদিকে দেখুন, ওই বিশাল হাঁড়িতে দুধ, গুড় তথা কিছু বিশেষ তৃণ ফুটিয়ে এক উপাদেয় মধু-পানীয় তৈরি হচ্ছে। এদিকে পুরি তৈরি হচ্ছে সামান্য শুকিয়ে রাখা মেথি পাতা দিয়ে। মণ্ড পুরোটা মাখা হচ্ছে দুধ ও ঘি দিয়ে। এতে রুটি বা পুরির স্বাদ বৃদ্ধি হয় এবং সুগন্ধ হাতে লেগে থাকে ভোজনের দু-প্রহর পরেও। মামস বা মাংস জাতীয় খাদ্য ওইদিকে। মৃগ মাংস হল সবচেয়ে সুস্বাদু মাংস। উত্তর ভারত থেকে তা আনানো হয়েছে নুনের মধ্যে করে। এই মাংস যত পুরোনো হয়, ততই সুস্বাদু। এবং এইখানে…

বলার প্রয়োজন ছিল না। দেখাই যাচ্ছে। এটা মদিরা জাতীয় পানীয়র অংশ। বিশাল বিশাল পিপে রাখা হয়েছে আলাদা আলাদা করে। কিছু বলার পূর্বেই তাকে বাধা দিয়ে জীবসিদ্ধি বলল,

— আমি মদিরা পান করি না। তাই এতে আমার আগ্রহ নেই।

কিছুটা মুষড়ে পড়লেন জীমূতবাহন। কিন্তু জীবসিদ্ধির আর ধৈর্য নেই। এখন এই মানুষের থেকে বিদায় নিতে পারলে সে বাঁচে। জীমূতবাহন পুনরায় তাকে অন্য একটি অংশে নিয়ে যেতে চাইছিলেন।

— এইদিকে চলুন। ওদিকে পলান্ন…

তাঁর কথার মাঝেই ডাক পড়ল,

— জীবসিদ্ধি মহাশয়!

জীবসিদ্ধি ঘুরে দেখল অমাত্য কৃষ্ণনাথ তাকে ডাকছেন। সম্ভবত কোনো প্রয়োজনে। তাকে দেখে হাতে চাঁদ পেল জীবসিদ্ধি।

জীমূতবাহনের দিকে ফিরে বলল,

— ক্ষমা করবেন। এখন একটু যেতে হবে। বাকিটা পরে শুনব। প্রণাম! জীমূতবাহনের মুখ দেখে মনে হল ঠিক যেন একটি শিশুর হাত থেকে তার

প্রিয় পুতুলটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। জীবসিদ্ধি যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে প্রস্থান করল।

*চরক সংহিতা অনুযায়ী,

সুকাধনা – cereals

সামিনা — pulses

শাক – সবজি

পায়োবর্গ— dairy products

মদ্যবর্গ — alcoholic beverages

মামসাবর্গ — meat

৪.

রাজকুমারী দুর্ধরার কক্ষ। নিজের কক্ষ যেভাবে ছেড়ে গিয়েছিল কয়েক বছর পূর্বে, এখনও প্রায় একইরকম আছে। রাজভৃত্যরা গত কয়েক বছর তার অনুপস্থিতিতে পরিষ্কার রেখেছে এই কক্ষ। তাই সকালে এই কক্ষে পা দিতেই অনেকগুলো স্মৃতি এসে ভিড় করছিল দুর্ধরার মনে।

কক্ষ একই আছে, তাতে বসবাসকারী মানুষটাও একই থাকবে। কিন্তু তার মধ্যেই কয়েকটি বছরে সব ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। দুর্ধরা কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি তাকে এই রাজমহল ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু একদিন তাই হল।

দুর্ধরা বুদ্ধিমান। আসন্ন সময়ের অশনিসংকেত এই মহলের চার দেয়ালের মধ্যে থেকেও তার নজর এড়িয়ে যায়নি। তার পিতার আমোদপ্রমোদের সঙ্গে সঙ্গেই মাদকাসক্তি ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। তার সঙ্গে তাল মেলাতে প্রজাদের উপর রাজকরের বোঝা বেড়ে চলছিল। এর ফলেই প্রজাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছিল কয়েক বছর যাবৎ। দুর্ধরা দেখতে পেত তার পিতৃসম অমাত্য কাত্যায়নকে বার বার ব্যর্থ মনোরথে পিতা ধনানন্দর কাছ থেকে ফিরতে। মহামাত্য অনেক চেষ্টা করত পিতাকে সঠিক পথে চালনা করতে। কিন্তু ধনানন্দ ক্রমেই শাসক থেকে স্বৈরাচারী হয়ে উঠছিলেন। এমনকী তাঁর একান্ত অনুগত কাত্যায়নকেও তিনি সর্বসমক্ষে হেয় করতে পেছপা হতেন না। তাঁর আমোদে বাধা দিয়ে কাজের কথা বলার জন্যে তার পিতা ধনানন্দই কাত্যায়নকে ‘অমাত্য রাক্ষস’ বলে সম্ভাষণ করতেন। অন্য সভাসদদের ও প্রজাদের মুখে মুখে ক্রমে কাত্যায়নের এই নামই ছড়িয়ে পড়ল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি ফোটে না, তাই বোঝার উপায় ছিল না সে মনে মনে দুঃখিত হত কি না। অথচ এত কিছুর পরেও অমাত্য কাত্যায়ন প্রাচীরের মতোই স্থির দাঁড়িয়ে মগধকে রক্ষা করে চলেছিল। তাই দুর্ধরা ভাবেনি যে মহা পরাক্রমী মগধকে কোনোদিন পরাস্ত হতে হবে। ক্রমে সেই দিনটাও এল। দুর্ধরার মনে আছে, একদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই তার কাছে অমাত্য রাক্ষস ছুটে এসে বলেছিল,

— আমরা পরাজিত হয়েছি, রাজকুমারী। আপনি এই মুহূর্তে গোপনে রাজমহল ত্যাগ করুন।

প্রথমে কথাটার তাৎপর্য বুঝতে পারেনি দুর্ধরা। পরে বুঝতে পেরে তার হৃদয় আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল। সে জানতে চেয়েছিল,

— মহল ত্যাগ করব? আমাদের দুর্গে শত্রু প্রবেশ করবে?

সময় নেই, রাজকুমারী। যতটা সম্ভব মূল্যবান হিরা, মাণিক্য ও অলংকার সঙ্গে নিয়ে নিন।

— কিন্তু… কিন্তু পিতা? আপনি? আপনারা কী করবেন?

— সম্রাট… সম্রাট বন্দি শত্রুর হাতে! আমি তাঁকে ত্যাগ করতে পারব না। এই রাজসেবক তার রাজার সঙ্গেই মৃত্যুবরণ করবে, রাজকুমারী। আপনি আপনার সখী ও দাসীদের সঙ্গে মগধ ত্যাগ করুন অবিলম্বে!

— না! আমি কিছুতেই আপনাদের মৃত্যুর মুখে ফেলে ভীরুর মতো পলায়ন করতে পারব না। আপনি আমায় অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছেন। প্রয়োজনে আমি হাতে অস্ত্র নেব!

সেই মুহূর্তে আবেগহীন বলে কুখ্যাত অমাত্য রাক্ষসের চোখের কোণে অশ্রুবিন্দু দেখেছিল দুর্ধরা। আর্দ্র কণ্ঠে মিনতি করেছিল পর্বতের মতো অটল মানুষটি,

— দোহাই রাজকুমারী! আমার কথা শুনুন। নিজের এবং অন্য নারীদের সম্মান রক্ষা করুন। যদি আমাকে আপনি এত বছরে একবারের জন্যেও পিতাজ্ঞানে সম্মান করে থাকেন, তবে এই আমার শেষ অনুরোধ আপনার কাছে।

এরপর আর কিছু বলতে পারেনি দুর্ধরা। নিজের দু-জন বাল্যসখী কৃষ্ণকলি ও মধুবন এবং সেইসঙ্গে প্রায় ত্রিশজন নারীকে নিয়ে মগধ ত্যাগ করে দুর্ধরা।

পরের দু-দিন দুর্ধরা আত্মগোপন করে অপেক্ষা করেছিল পিতা ও অমাত্যর মৃত্যুসংবাদের। কিন্তু বিস্ময়করভাবেই তা এল না। বরং দুর্ধরা জানতে পারে যে, ক্ষমতা দখলকারী এক তরুণ অধিনায়ক এবং তার ব্রাহ্মণ গুরু নাকি কাউকে হত্যা করেনি। সকলের সামনে দু-টি বিকল্প রেখেছে। হয় তাদের সঙ্গে যুক্ত হও অথবা নির্বাসনে যাও।

প্রথমে এই সংবাদ বিশ্বাস করেনি দুর্ধরা। কিন্তু তার কয়েক দিন পশ্চাৎ যখন তার পিতা এবং অমাত্য অক্ষত ফিরে এল, সেদিন মনে মনে ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ দিয়েছিল সে। রাক্ষসকে নাকি পুনরায় মহামাত্য পদে বহাল করতেও চেয়েছিল শত্রুরা। কিন্তু রাক্ষস রাজি হননি।

পিতা ধনানন্দ আগামী কয়েকটি বছর শুধুই নিজের অপমানের জ্বালায় দগ্ধ হয়েছেন দিনরাত।

কিন্তু দুর্ধরার মনে জেগেছিল কৌতূহল। কে এই চন্দ্রগুপ্ত? যে নাকি বিজিত পক্ষের প্রতিটি নারীকে সসম্মানে বেঁচে থাকার বিকল্প দিয়েছে। কে এই সেনানায়ক যে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির রক্ত ঝরাতে অস্বীকার করেছে?

অমাত্য রাক্ষসের পুরো বিষয়টায় কী দৃষ্টিভঙ্গি সেটা বোঝা যায়নি। তিনি নিজেও মুখ ফুটে কিছু বলেননি। কিন্তু পিতা ধনানন্দ এইসব কিছুকে চূড়ান্ত অপমান হিসাবেই দেখেছেন। তাকে জীবনদান করাটা সবচেয়ে বড়ো অপমান

বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু এর চেয়েও বড়ো অপমান বাকি ছিল।

কয়েক মাস পূর্বেই হঠাৎ রাজকুমারী জানতে পারেন যে, তাঁর সঙ্গে সেই অজানা সেনানায়ক, বর্তমানে মগধ নরেশ, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর বিবাহপ্রস্তাব রাখা হয়েছে মগধের পক্ষ থেকে। কিন্তু প্রস্তাবপত্রের আড়ালে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত স্পষ্ট যে, এই প্রস্তাব অস্বীকার করার ফল ভালো হবে না! বোঝাই যায় এই পত্রের প্রেরক এই বিবাহ সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর। এবং, তার পিতা ধনানন্দর হাতে কোনো বিকল্প রাখেনি।

রাক্ষস এসেছিল দুর্ধরার মত নিতে। তিনি এও বলেছিলেন যে, তিনি এই বিবাহে রাজি নন। দুর্ধরা অসম্মত হলে তিনি তাই জানাবেন মগধকে। এবং, এর ফলে যেকোনো বিপদের মোকাবিলা তিনি করবেন।

দুর্ধরা তার রাজধর্ম পালন করে সম্মতি জানায়। সে জানত অসম্মতির ফল কী হতে পারে। এরপর যেদিন দু-জন ব্রাহ্মণ তার কাছে আসে তার মত শুনতে, সেদিনই তাদের সম্মতির কথা জানিয়ে দেন দুর্ধরা। কারণ রাজকুমারী বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই বিবাহ করতে অস্বীকার করলে রাজরোষ নেমে আসবে তার পিতার উপর। রাজকুমারী তা হতে দেবেন না। তিনি নিজের রাজধর্ম পালন করে শত্রুর সঙ্গে একই শয্যা গ্রহণ করবেন, প্রয়োজনে ধর্ষিত হবেন। কিন্তু তার কারণে নিজের প্রিয়জনের প্রাণ বিপন্ন করবেন না।

.

নিজের শয্যায় বসে সমস্ত কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল রাজকুমারী দুর্ধরার। প্রতিটি নারীর স্বপ্ন থাকে এক স্বপ্নপুরুষকে জীবনসঙ্গী করার। কিন্তু আজ তাঁর বিবাহ। এবং, রাজকুমারী নিজের হবু স্বামীকে চোখেও দেখেননি। জানেন না তিনি যে আগামী দিনে কী ধরনের অত্যাচার অপেক্ষা করে আছে তাঁর জন্যে। বহুক্ষণ দমন করে রাখা অশ্রু চোখ ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছিল তাঁর। কিন্তু না! তাঁকে দৃঢ় থাকতে হবে। ভেঙে পড়লে চলবে না। এই তাঁর রাজধর্ম, যা তিনি পালন করবেন।

.

বহুক্ষণ পূর্বেই তাঁর এবং তাঁর কক্ষে উপস্থিত দু-জন সখীর জন্যে ভোজন দিয়ে গিয়েছে এক ভৃত্য। স্বর্ণ থালায় সাজানো খাদ্য ও স্বর্ণ পানপাত্রে দেওয়া পানীয় রাজকুমারীর জন্যে। এবং, সেইসঙ্গে দুটি সাধারণ পেতলের থালা ও পেয়ালায় খাদ্য ও পানীয় তাঁর দুই সখীর জন্যে।

গরম খাবার ঠান্ডা হয়ে জুড়িয়ে গিয়েছে এতক্ষণে। খাবার সুযোগ হয়নি, কারণ এই থালা তিনটি রেখে যাওয়ার পর পরই একজন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। পর পর তিনজন তাঁর কক্ষে এসেছিল। শেষজন এই খানিকক্ষণ পূর্বেই কক্ষ ত্যাগ করল। তাই এতক্ষণ ভোজন করার সুযোগ পায়নি কেউই।

রাজকুমারীর দীর্ঘ মেঘঘন কেশে সুগন্ধি তৈল মালিশ করে দিচ্ছে তাঁর দু-জন সখী। এই কাজ শেষ হলেই তারা ভোজন করবে।

হঠাৎ কেশে টান লাগায় দুর্ধরা বলে ওঠেন,

— উফ! কৃষ্ণ! কোনদিকে মন তোমার?

— ক্ষমা করবেন, রাজকুমারী।

— তুমি দেখছি অন্যমনস্ক হয়ে আছ, কৃষ্ণ। কী হয়েছে?

— কি… কিছু না, রাজকুমারী।

দ্বিতীয়জন, অর্থাৎ মধুবন বলে বসল,

— আপনার বিবাহ নিয়ে শুধু কৃষ্ণ নয়, আমিও চিন্তিত রাজকুমারী। কোন বর্বরের সঙ্গে আপনার…

কথা শেষ করতে না দিয়েই দুর্ধরা বলে উঠলেন,

— মধু! তোমায় বলেছি না? এই বিষয়ে কোনো কথা তোমাদের মুখে শুনতে চাই না আমি। যা হচ্ছে, তা আমি মেনে নিয়েছি। ব্যস! এই আমার ভবিতব্য। এই আমার রাজধর্ম।

কেশ পরিচর্যা শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে। রাজকুমারী বললেন,

— এইবার তোমরা আহার শুরু করো। আমার ক্ষুধা নেই।

মধুবন বরাবরই বেশি কথা বলে। আর কৃষ্ণকলি শাস্ত, মুখচোরা। মধুবন বলল,

— আপনি না খেলে আমরাও এই আহার মুখে তুলব না, রাজকুমারী। কি, তাই তো, কৃষ্ণ?

কৃষ্ণকলি কিছু একটা ভাবছিল। একটু চমকে উঠে বলল,

— হ… হ্যাঁ। হ্যাঁ।

দুর্ধরা উঠে বসলেন। বললেন,

— বেশ। একটু মেজ এগিয়ে দাও আমার দিকে। আমি তৃষ্ণার্ত।

ভোজন সাজানো চারপায়া মেজটা দু-জন মিলে ঠেলে শয্যার সামনে এনে রাখল। সোনার পানপাত্রটির দিকে হাত বাড়িয়েও থেমে গেলেন রাজকুমারী। তিনি দেখলেন তিনটি পানপাত্রেই একই পানীয় দেখা যাচ্ছে। ভুরু কুঁচকে বিরক্তস্বরে বললেন,

— আরে, একী? এ কী ধরনের অপদার্থ রাজকর্মী? আমায় সুরা দিয়েছে। এদের কি এইটুকু জ্ঞান নেই যে, ক্ষত্রিয়রা সুরা পান করে না! মধু, যাও, বাইরে দাসকে বলো আমার জন্যে সোম এনে দিতে। অথবা, অন্য কোনো পানীয়।

মধুবন উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে বাধা দিয়ে কৃষ্ণকলি উঠে দাঁড়াল,

— ন… না, না! আ… আমি যাচ্ছি। তুমি এখানে থাকো। আমি যাই। বলে দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করল কৃষ্ণকলি।

সে বেরিয়ে যেতে দুর্ধরা বলল,

— কৃষ্ণর আজ হয়েছে কী?

মধুবন ততক্ষণে নিজের পাত্রের পানীয় শেষ করে ফেলেছে অর্ধেক। উত্তর দিল,

— বোধ হয় আপনার জন্যে ওর মন ব্যাকুল। আপনার বিবাহ নিয়ে….

আবার এই প্রসঙ্গ শুনতে ইচ্ছে করল না দুর্ধরার। তাই কথা ঘুরিয়ে রাজকুমারী বললেন,

— এই আমার পানপাত্রের পানীয়ও তুমিই পান করো। নাও।

সখীর পানপাত্রে নিজের পাত্র থেকে সবটুকু পানীয় ঢেলে দিলেন রাজকুমারী। নিজে অপেক্ষা করতে লাগলেন আলাদা পানীয় আসার।

পুনরায় নিজের ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিলেন রাজকুমারী দুর্ধরা। হঠাৎই পর পর দুটি শব্দে তাঁর চিন্তাসূত্রে বাধা পড়ল। প্রথমে ধাতব কিছু পতনের শব্দ এবং পরমুহূর্তে ভারী একটি শরীরের পতনের শব্দ।

সেদিকে দৃষ্টি ঘোরাতেই আতঙ্কে মুখ থেকে চিৎকার বেরিয়ে এল রাজকুমারীর। কারণ মেঝেতে পড়ে আছে তাঁর প্রিয় সখী মধুবন। হাত থেকে পানপাত্র আগেই খসে পড়েছে। মধুবনের মুখ থেকে গ্যাঁজলা জাতীয় কিছু বের হচ্ছে। চোখ দুটি উলটে গিয়েছে, সারাশরীর থরথর কাঁপছে মেঝেতে।

রাজকুমারীর চিৎকার শুনে কক্ষের বাইরে থেকে প্রহরী ও দাসীদের প্রবেশের কয়েক মুহূর্তকালের মধ্যেই কাঁপুনি থেমে গেল মধুবনের শরীরে। নিষ্প্রাণ নিথর দেহ এলিয়ে পড়ল!