সোম-শাস্ত্ৰ – ১৫

১৫.

এই কক্ষটি অন্যান্য কক্ষের তুলনায় আয়তনে ছোটো। সেই কারণে মাত্র কয়েক জন মানুষ একসঙ্গে উপস্থিত হওয়াতেই কক্ষে ভিড় জমে গিয়েছে বলে মনে হচ্ছে জীবসিদ্ধির।

কক্ষের শেষ মাথায় বসে আছেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত। তাঁর পাশে দু-জন অঙ্গরক্ষক সৈনিক। গম্ভীর মুখে বসে আছেন তিনি। তাঁর পরনে এখন একটি গেরুয়া রেশমের ধুতি এবং গাঢ় সবুজ অঙ্গবস্তু। মাথায় ধুতির সঙ্গেই মিল রেখে গেরুয়া উষ্ণীষ, যাতে একটি ময়ূরপুচ্ছ শোভা বৃদ্ধি করছে। তাঁর কণ্ঠে, বাহুতে এবং কর্ণে স্বর্ণালংকার।

তবে কক্ষে এই মুহূর্তে উপস্থিত অন্য দুই রাজপুরুষের তুলনায় তাঁরই অলংকার কম। ধনানন্দ এবং রাক্ষস পূর্বের বেশেই আছেন। ধনানন্দ মুখে বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে বসে আছেন একটি আসনে। আজ সকাল থেকেই এই একই মুখের ভাব তাঁর। জীবসিদ্ধি নিশ্চিত নয় এটার কারণ মৌর্যদের আতিথেয়তা নাকি এটিই ধনানন্দর স্বাভাবিক মুখভঙ্গি। কারুর দিকে তাকাচ্ছেন না তিনি। খালি পূর্বের মতোই ঢিলে অঙ্গুরীয়টি মাঝে মাঝে আঙুল থেকে বার বার খোলা-পরা করছেন।

রাক্ষসকে দেখলে জড়বৎ প্রস্তরমূর্তি বলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। স্থিরভাবে তিনি বসে আছেন ধনানন্দর পাশের আসনে। মুখে যথারীতি তাঁর কোনো অভিব্যক্তি নেই। জীবসিদ্ধি লক্ষ করেছে, রাক্ষস চোখের পলকও খুবই কম ফেলেন। যে কারণে তাঁর মুখ দেখলে ভ্রম হয় যেন প্রস্তরখণ্ডে কোনো এক শিল্পী নাক-চোখ-মুখ খোদিত করেছে। এবং, সে-শিল্পী মোটেই পটু নয়। কারণ মূর্তির মুখে সে কোনোরকম স্বাভাবিক অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

এ ছাড়া অমাত্য কৃষ্ণনাথ আছেন। বৃদ্ধর অবস্থা করুণ। মানসিক চাপ আর তিনি নিতে পারছেন না। বার বার বিহ্বল দৃষ্টিতে চন্দ্রগুপ্ত, চাণক্য এবং জীবসিদ্ধির দিকে ক্রম অনুসারে চাইছেন।

চাণক্য বসে আছেন চন্দ্রগুপ্তর পাশের আসনে। দ্বিধাহীন ভঙ্গিতে মধু আর গুড় মিশ্রিত সেই বিশেষ পানীয়টির চতুর্থ পেয়ালা শেষ করছেন। কক্ষের অন্যান্য সকলের ধৈর্যহীনতার প্রতি তিনি সম্পূর্ণ উদাসীন।

জীমূতবাহনও উপস্থিত আছেন কক্ষে এবং তাঁর সঙ্গেই সেই ভুবন নামক ভৃত্যটিকেও উপস্থিত করা হয়েছে। তাঁরা দু-জন এই সভায় তাঁদের জরুরি তলবের কারণ বুঝতে অক্ষম। কারণ, কোনো ঘটনাই তাঁদের জানা নেই। তাঁদের মুখের ভাবেই তাঁদের বিহ্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। একদল গুরুত্বপূর্ণ রাজপুরুষের মধ্যে তাঁরা নিজেদের আরওই গুটিয়ে নিয়েছেন।

আর একদম কোণের একটি আসনে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার বৃথা চেষ্টা করছে মলয়কেতু। তার মনের ভাব অনুমান করতে জীবসিদ্ধির অসুবিধা হচ্ছে না। সে আর দ্বিতীয়বার চাণক্যর মুখোমুখি না হওয়ার বিনিময়ে নিজের অর্ধেক রাজ্যও দান করতে পারে সম্ভবত।

তবে এই মুহূর্তে, মলয়কেতুর চেয়েও বেশি অপ্রস্তুত যে দু-জন, তাঁরা হলেন স্বয়ং সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত এবং রাজকুমারী দুর্ধরা।

দু-জনের এই প্রথম সাক্ষাৎ, যা হওয়ার কথা ছিল আরও অর্ধেক প্রহর পরে। বিবাহের পূর্বে বর-বধূর সাক্ষাতের নিয়ম নেই। কিন্তু যেখানে বিবাহই হচ্ছে না, সেখানে আর নিয়ম-রীতির তোয়াক্কা কোনো পক্ষই করেনি।

চন্দ্রগুপ্ত এবং রাজকুমারী দুর্ধরা আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন একে অন্যের থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে রাখতে।

চাণক্যর ঠিক পাশের আসনেই বসে থাকা জীবসিদ্ধির মুখ থেকে একটা আফশোসের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। লাল বস্ত্রে অপরূপ সুন্দরী লাগছে দুর্ধরাকে। তাঁকে বলিষ্ঠ, সুপুরুষ চন্দ্রগুপ্তর পাশে রাজযোটকের মতোই মানিয়ে যেত। কিন্তু হায় রে নিয়তি! মিত্র চন্দ্রগুপ্তর জন্যে জীবসিদ্ধির করুণা হল।

.

পানপাত্রের মধু-পানীয় সবটুকু শেষ করে ধীরে-সুস্থে উঠে দাঁড়ালেন চাণক্য। চন্দ্রগুপ্তর দিকে চেয়ে বললেন,

— সম্রাটের আজ্ঞা হলে কয়েকটি কথা আমি উপস্থিত সকলের সম্মুখে বলতে চাই।

চন্দ্রগুপ্ত মৃদু ঘাড় নাড়লেন একবার। চাণক্য প্রতি-উত্তরে ধন্যবাদ জানিয়ে রাজকুমারী দুর্ধরার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন,

— রাজকুমারী, এই কক্ষে উপস্থিত প্রায় সকলেই আজকের ঘটে যাওয়া অঘটনের কথা জানেন। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে ঘটনাটি সকলের থেকে গোপন রাখা হয়েছে এবং তাই উপস্থিত কয়েক জনের কাছে তা সম্পূর্ণভাবেই অজানা। আপনি কি দয়া করে ঘটনার সংক্ষেপ আরও একবার সকলের সম্মুখে বলবেন?

রাজকুমারী দুর্ধরা কিছুটা দ্বিধা করলেও তা ঝেড়ে ফেলে বললেন,

— আজ দিনের বেলা আমার কক্ষে আহার সাজিয়ে দিয়ে যায় মগধের এক ভৃত্য। কিন্তু তারপরেই কক্ষে তিন অতিথি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসায় তা গ্রহণ করতে আমার এবং আমার… আমার সখীদের বিলম্ব হয়। আহার শুরুর আগেই আমি নিজের পানপাত্রে সুরা দেখতে পাই। আমি সুরা পান করি না। তাই আমার সখী কৃষ্ণকলিকে আমি পাঠাই আমার জন্যে সোম আনতে। কিন্তু এরই মধ্যে আমার পানপাত্রের সুরা পান করে ফেলে আমার অন্য সখী মধুবন। এবং, পলকের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। আমার অনুমান করতে অসুবিধা হয়নি যে, আমার পানীয়ে বিষ প্রয়োগ করে কেউ বা কারা আমায় হত্যার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই সুরা আমার পরিবর্তে মধুবন পান করার কারণে সেই বিষে তার মৃত্যু হয়েছে। জীবসিদ্ধি একবার সকলের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিল। জীমূতবাহনের মুখ ‘হাঁ’ হয়ে গিয়েছে এবং তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা দাসটি কেঁপে উঠেছে। মলয়কেতুর মুখের ভাব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না এই দূরত্ব থেকে। এ ছাড়া কারুরই ভাবভঙ্গিতে বিশেষ পরিবর্তন নজরে পড়ল না।

চাণক্য পুনরায় রাজকুমারীর উদ্দেশেই বললেন,

— আপনার কক্ষে একে একে যে তিন অতিথি এসেছিলেন তাঁদের নামগুলো সকলের জ্ঞাতার্থে আরও একবার দয়া করে বলে দেবেন।

— আমার পিতা, আর্য কাত্যায়ন এবং মলয়কেতু।

— হুম। এটা কি সত্যি যে খাদ্যনিরক্ষক এবং মগধের কর্মচারী ব্যতীত, আপনার খাদ্যে বিষ মেশানোর সুযোগ সেই অতিথিদেরও সমানরূপে ছিল?

রাজকুমারী কিছুটা দ্বিধাভরে উত্তর দিলেন,

— হ্যাঁ।

— এবং, আপনার দুই সখীরও সেই সুযোগ ছিল।

— হ্যাঁ, ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন যেখানে নিজেই সেই বিষের শিকার হয়েছে, অতএব তাকে আশা করি আপনি সন্দেহের তালিকা থেকে অব্যাহতি দেবেন?

দুর্ধরার কণ্ঠে তার ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি স্পষ্ট। চাণক্য উত্তর দিলেন,

— অবশ্যই। কিন্তু এ ছাড়াও আরও একজনের পক্ষে আপনার পানীয়ে বিষ মেশানোর সুযোগ ও যথেষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। তাই নয় কি?

প্রমাদ গনল জীবসিদ্ধি।

দুর্ধরার মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠেছে।

— আরও একজন? কার কথা বলছেন আপনি?

— আপনার কথা বলছি, রাজকুমারী। অস্বীকার করতে পারবেন, যে, আপনার পক্ষে এই কাজ সহজেই করা সম্ভব? খাদ্যের দায়িত্বে থাকা জীমূতবাহন মহাশয়ের কাছে যে তালিকা আপনাদের পক্ষ থেকে এসেছে, সেটিতে স্পষ্টভাবে ‘সোম’-এর পরিবর্তে ‘সুরা’ লেখা রয়েছে আপনার খাদ্যতালিকায়। আমি যদি বলি যে, এটি অজান্তে ঘটে যাওয়া বিচ্যুতি নয় বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এটি করা হয়েছে?

— আপনি কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন, আচার্য?

— এই বিবাহে আপনি বাধ্য হয়ে মত দিয়েছেন। এবং, এই আজীবনের ‘পাশ’ থেকে মুক্তি পেতে আপনি যেকোনো মূল্য দিতে পারেন। যদি আমি বলি, আপনিই নিজের সুরায় বিষ দিয়ে নিজের বাল্যসখীকে হত্যা করেছেন? এবং, এই কাণ্ডটি করতে আপনাকে আপনার দ্বিতীয় সখী কৃষ্ণকলি দেখে ফেলেছিল। তাই সে কাউকে কিছু বলতে পারেনি। ভয়ে পেয়ে পলায়ন করে। কিন্তু আপনি তাকে ও হত্যা করলেন নিজস্ব বিশ্বস্ত সৈনিকের সাহায্যে। তাহলে আপনি কী বলবেন?

কক্ষের অন্যদিক থেকে গর্জন শোনা গেল,

— ব্রাহ্মণ! মুখ সামলে, ব্রাহ্মণ! ভুলে যাস না কার সঙ্গে কথা বলছিস। ও ধনানন্দর একমাত্র পুত্রী রাজকুমারী দুর্ধরা!

বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই হুংকার স্বয়ং ধনানন্দর। জীবসিদ্ধি সতর্ক হয়ে নিজের কোমরে লুকোনো কৃপাণটির হাতলে আঙুল ছোঁয়াল। দু-জন রক্ষীও সতর্ক হয়েছে। কক্ষের প্রত্যেকে সোজা হয়ে বসেছে।

রাজকুমারী দুর্ধরার মুখে রক্তিমাভাব ফুটেছে। প্রবল ক্রোধমাখা দৃষ্টি হেনে চলেছেন চাণক্যর প্রতি।

চাণক্য বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে, রাজকুমারীর চোখে চোখ রেখে পুনরায়

প্রশ্ন করলেন,

— বলুন, রাজকুমারী। আমি যদি বলি আপনিই দুইটি হত্যা করেছেন, তবে আপনি কী বলবেন আত্মপক্ষ সমর্থনে?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জোরে হেসে উঠলেন রাজকুমারী।

বললেন,

— তাহলে আমি বলব আপনি উন্মাদ! না না! উন্মাদ নয়। আপনি একটি নীচ শয়তান! আপনি একটি ধূর্ত শেয়াল! আমি মূর্খ যে, একমুহূর্তের জন্যে হলেও আমি আপনার কথায় বিশ্বাস করেছিলাম। আমি বিশ্বাস করেছিলাম যে, আপনি নিজের কথা রাখবেন এবং নিরপেক্ষভাবে প্রকৃত দোষীকে খুঁজে বের করবেন। আমি ভুল ভেবেছিলাম! আপনি সত্যোদ্ঘাটনের নামে শুধুই প্রহসন করবেন তা আমার বোঝা উচিত ছিল। বাহ্, আচার্য কৌটিল্য! বাহ্! আমি নিশ্চিত এরপর আপনি এটাও প্রমাণ করে দেবেন যে, আমিই সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর আহারেও বিষ দিয়েছি। আপনি নিজেও জানেন যে, কী অসম্ভব সুপরিকল্পিতভাবে আপনি সম্পূর্ণ কাহিনি সাজিয়েছেন। আপনি ভালোই জানেন যে, আমি এর বিরুদ্ধে কোনোই প্রমাণ দিতে পারব না। সম্পূর্ণ ঘটনার সময় কক্ষে আর কেউ ছিল না। আমার কথার সমর্থন করার মতো কেউ নেই জীবিত!

— ঠিক তাই। আপনার প্রতি সহজেই সন্দেহ গিয়ে পড়ে রাজকুমারী। আপনার বর্ণনা করা সম্পূর্ণ ঘটনার সত্যতার প্রমাণ দেওয়ার মতো কোনো সাক্ষী। নেই। এবং, ঠিক সেই কারণেই আমি নিশ্চিত হতে পেরেছি যে, আপনি নির্দোষ!

১৬.

চাণক্যর শেষ কথাটা শুনে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন রাজকুমারী। প্রশ্ন করলেন,

— কী বললেন? কী বললেন আপনি?

স্মিত হেসে চাণক্য বললেন,

— আমি জানি আপনি নির্দোষ, রাজকুমারী।

.

শুধু রাজকুমারী নন, হতচকিত হয়েছে সকলেই। তবে সবচেয়ে হতবাক হয়েছে জীবসিদ্ধি। তার ভ্রূ যুগল ললাটের পথে অনেকখানি উত্থিত। মুখ হতেও বিস্ময়সূচক শব্দ নির্গত হয়েছে তার।

এ কী বলছেন আচার্য চাণক্য? রাজকুমারী নির্দোষ? কিন্তু এই ধারণায় তিনি কীভাবে পৌঁছালেন?

চাণক্য জীবসিদ্ধির দিকে একবার চাইলেন। মৃদু হেসে সভার সকলের উদ্দেশে ব্যাখ্যা দেওয়ার ভঙ্গিতে শুরু করলেন,

— পরিস্থিতি বিচারে আমার মনে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ ছিল রাজকুমারী দুর্ধরার প্রতি। প্রথমে সন্দেহ ছিল হয়তো তিনি নিজেই বিষ মিশিয়েছেন নিজের সুরায়। কিন্তু পরবর্তীকালে আমি নিশ্চিত হই যে, বিষ অন্য এক ব্যক্তি মিশিয়েছে। কে সেই ব্যক্তি এবং কীভাবে সেই সিদ্ধান্তে আমি উপনীত হলাম, সেকথায় আমি আসছি। কিন্তু তাতেও রাজকুমারীকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারছিলাম না। কারণ হতে পারে তিনি নিজের হাতে বিষ দেননি, কিন্তু তিনি যে হত্যাকারীর একজন অনুসঙ্গী নন তার নিশ্চয়তা কী? হতেই পারে যে, তিনিও এই চক্রান্তে অংশীদার। বিষ প্রয়োগকারীর সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার সম্ভাবনা যে প্রবল!

দুর্ধরার দিকে চেয়ে চাণক্য বললেন,

— রাজকুমারীকে আমি কথা দিয়েছিলাম যে, প্রকৃত অপরাধীকে আমি তাঁর সম্মুখে হাজির করবই। সেই অপরাধী তিনি স্বয়ং হলেও আমি সেই কথা রাখতাম। কিন্তু তাঁর সম্বন্ধে নিশ্চিত হলাম যখন কথোপকথনের মাঝেই জীবসিদ্ধি উল্লেখ করে যে, রাজকুমারীর জবানবন্দির কোনো সাক্ষী নেই। তিনি আমাদের যে ঘটনাসমূহের কথা বলেছেন, তা ঘটার সময়ে কক্ষে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি উপস্থিত ছিল না। আর সেখানেই আমি আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই।

ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটেছে চাণক্যর। জীবসিদ্ধির মনে পড়ে যায়, ঠিক এই ভঙ্গিতেই তিনি তক্ষশিলায় ছাত্রদের পড়াতেন। এভাবেই তাদেরকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজনীতি ও অর্থশাস্ত্রর কঠিন থেকে কঠিনতম বিষয়ও জলবৎ সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন।

চাণক্য বললেন,

— আপনারা ভেবে দেখুন। যদি রাজকুমারী পূর্বেই জেনে থাকেন যে, তাঁর পানপাত্রে বিষ আছে এবং তিনি সেটি ব্যবহার করে নিজের সখীকে হত্যা করতে চলেছেন, তবে তাঁর পক্ষে কি এটাই স্বাভাবিক নয় যে, তিনি কক্ষে সেই মুহূর্তে সাক্ষী উপস্থিত রাখবেন? এবং, তা তিনি অতি সহজেই করতে পারতেন। তাঁর দ্বিতীয় সখী কৃষ্ণকলি কক্ষ ত্যাগ করলেও, তাঁর দ্বারের বাইরেই বেশ কয়েক জন সৈনিক ও দাস-দাসী উপস্থিত ছিল সেই সময়ে। যেকোনো অজুহাতে, তাদের মধ্যে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে তিনি নিজের কক্ষে সেই সময়ে ডেকে নিতেই পারতেন অনায়াসে। তাতে পুরো ঘটনাটি তৃতীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তির চোখের সামনে সংঘটিত হত। পরবর্তীকালে সে রাজকুমারীর কথার সত্যতার প্রমাণ দিত। এবং, তাতে রাজকুমারী অতি সহজেই নিজের উপর থেকে সমস্ত সন্দেহের মেঘ সরিয়ে দিতে পারতেন।

.

বিষয়টা সকলের মস্তিষ্কে প্রবেশ করার জন্যে কয়েক মুহূর্ত থামলেন চাণক্য তারপর বললেন,

— কিন্তু, তিনি তা করেননি। তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো চেষ্টাই করেননি। অথচ, তিনি দোষী হলে সর্বপ্রথম তিনি সেটাই করতেন না কি? যেকোনো অপরাধীর সাধারণ প্রবৃত্তি হচ্ছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্যে সাক্ষী রাখা। বিশেষ করে এই ক্ষেত্রে, যেখানে এত গভীর একটি ষড়যন্ত্র সুচারুরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে, সেখানে এই সাধারণ সতর্কতা তিনি অবশ্যই অবলম্বন করতেন। নিঃসন্দেহে রাজকুমারী দুর্ধরা যেখানে একজন অসম্ভব বুদ্ধিমতী এবং স্থিরমস্তিষ্ক নারী। তাঁর পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনে যাবতীয় ব্যবস্থা সহজেই করে ফেলা সম্ভব ছিল। কিন্তু তিনি সেরকম কিছুই করেননি। তাঁর কথার সত্যতার কোনো প্রমাণ নেই, কোনো সাক্ষী নেই। কেন? উত্তর সহজ। তার কারণ তিনি সত্যিই জানতেন না যে, পাত্রে বিষ আছে। কারণ তিনি নিরপরাধ।

কক্ষের সকলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে আছে চাণক্যর দিকে। পলক ফেলতেও ভুলে গিয়েছে সকলে।

চাণক্য পুনরায় বললেন,

— এখানে তর্ক করা যেতেই পারে, সে রাজকুমারী হয়তো সময় পাননি কাউকে তা মনে করি না। তার কারণ, রাজকুমারীর পানীয়ে বিষ অনেক আগেই মেশানো ডাকার। বা, তাড়াহুড়োয় এটা হয়তো তাঁর নিছক ভুল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমি হয়েছিল। বিষ মেশানোর পরেও বহুক্ষণ সময় সেই পানীয় এবং অন্যান্য আহারাদি অস্পৃষ্ট পড়ে ছিল। অর্থাৎ, রাজকুমারী এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত থেকে থাকলে, তাঁর কাছে যথেষ্ট সময় ছিল চিন্তাভাবনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার। আপনাদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জানি, যে, আমি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছি যে, পানীয়ে বিষ অনেক আগেই মেশানো হয়েছে। সে-বিষয়েই আসছি এইবার।

চাণক্য বললেন,

— এইবার আসা যাক সন্দেহের তালিকার দ্বিতীয় ব্যক্তির কথায়। রাজকুমারীর দ্বিতীয় সখী কৃষ্ণকলি। তার আচরণ পুরো ঘটনায় সবচেয়ে সন্দেহজনক এবং অস্বাভাবিক। রাজকুমারীর থেকেই আমরা জানতে পারি যে, কৃষ্ণকলি আজ সকালে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। সকাল থেকে স্বাভাবিক থাকলেও, এর মধ্যেই তার সঙ্গে কোনো একটি ঘটনা ঘটে, যার ফলে সে চিন্তিত হয়ে গিয়েছিল। এবং, এও জানতে পারি যে ‘সোম’-এর পরিবর্তে নিজের পানপাত্রে ‘সুরা’ দেখে রাজকুমারী প্রথমে মধুবনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর জন্যে সোমরস আনতে। কিন্তু, কৃষ্ণকলি নিজে থেকেই সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় এবং দ্রুত স্থানত্যাগ করে। সেই মুহূর্ত থেকেই সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, অর্থাৎ ইচ্ছে করে পালিয়ে যায়। আমি কি সঠিক বলছি, রাজকুমারী?

প্রশ্ন করে রাজকুমারীর দিকে চাইলেন চাণক্য। তাঁকে সমর্থন করে দুর্ধরা ঘাড় নাড়লেন।

চাণক্য পুনরায় সকলের দিকে ফিরে বলতে শুরু করলেন,

— বেশ, বেশ। অর্থাৎ, কৃষ্ণকলির আচরণ থেকে একথা স্পষ্ট যে, সে জানত রাজকুমারীর পানীয়ে বিষ আছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তবে কি সে-ই হত্যাকারী? তাতে আমার উত্তর: অবশ্যই নয়। যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ করা যাক একবার। তার উদ্দেশ্য যদি রাজকুমারীকে হত্যা করাই হত, তবে সে কখনোই পানপাত্রের ‘সুরায় বিষ প্রয়োগ করত না। কারণ সে রাজকুমারীর বাল্যসঙ্গী। রাজপ্রাসাদেই তার জীবনের বেশিরভাগ অংশ কেটেছে এবং রাজ রীতি-নিয়ম, বিশেষ করে রাজকুমারী দুর্ধরার স্বভাবচরিত্র তার অজানা নয়। নিশ্চিতভাবেই কৃষ্ণকলির জানা ছিল যে, রাজকুমারী সুরাপান করেন না। অতএব, জেনেশুনে সে কখনোই সুরাভরা পানপাত্রে বিষ মেশাবে না। রাজকুমারীকে হত্যার উদ্দেশ্য থাকলে সে সহজেই বিষ পানীয়ের পরিবর্তে অন্যান্য যেকোনো আহারে মিশিয়ে দিত।

আরও একবার বিরতি নিয়ে চাণক্য বললেন,

— কিন্তু যদি ধরে নেওয়া যায়, সে রাজকুমারীকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিষ দেয়নি? সে যদি এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে? হয়তো অন্য কারুর নির্দেশে সে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই পানপাত্রে বিষ মিশিয়েছিল, যাতে সেই বিষে মধুবনেরই মৃত্যু হয়? কিন্তু তাই যদি হবে, তাহলে সে ভয় পেয়ে পলায়ন কেন করবে? তাতে তো তার উপর সন্দেহ এসে পড়ছে! বরং, সে যদি সেইসময়ে রাজকুমারীর আশেপাশেই থাকত, তবে তো তার উপর সন্দেহ কম হত। তাকে তো রাজকুমারী নিজেও সন্দেহ করেনি। তবে সে পলাতকা হল কেন?

চাণক্য থামতেই চন্দ্রগুপ্ত প্রশ্ন করল,

— আরও একটা প্রশ্ন আসছে। সে যদি নির্দোষ হয়েই থাকে, তবে পানীয়ে বিষ আছে জেনেও, সেই কথা কাউকে বলেনি কেন?

— যথাযথ প্রশ্ন, সম্রাট! তার এই আচরণের একটাই ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কৃষ্ণকলি হত্যাকারীকে পানীয়ে বিষ মেশাতে দেখে ফেলেছিল। এবং, সে-ব্যক্তি এমন কেউ যার নামে সে অভিযোগ করতে ভয় পেয়েছিল। এমনকী সে এই কথাটা রাজকুমারীকেও বলতে পারেনি। এই কারণেই আমার প্রাথমিকভাবে সন্দেহ হয়েছিল রাজকুমারীর উপর। কারণ কৃষ্ণকলি যদি রাজকুমারীকেই নিজের পাত্রে বিষ মেশাতে দেখে থাকে, সে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করবে রাজকুমারী আত্মহত্যার চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে সে বাধা দিত। তাই না? কিন্তু কৃষ্ণকলি সেইরকম কিছুই করেনি। অর্থাৎ, পানীয়ে বিষ এমন কোনো ব্যক্তি মিশিয়েছে যার বিরুদ্ধে স্বয়ং রাজকুমারীর কাছেও মুখ খুলতে সে ভয় পেয়েছে। এবং, তারপরই যখন সেই পানীয় রাজকুমারী পান করতে অস্বীকার করেন, তখন সম্ভবত আমারই মতো তারও মনে সন্দেহ দেখা দেয়। তারও মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, রাজকুমারী নিজেই সেই বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাই কৃষ্ণকলি ভয় পায় এবং পলাতকা হয়। কারণ সেই পরিস্থিতিতে কাউকেই সে আর বিশ্বাস করতে পারে না। এবং, কৃষ্ণকলি যে তাকে বিষ মেশাতে দেখে ফেলেছিল, এ তথ্য হত্যাকারীর অজানা ছিল না। সেই কারণেই সুযোগ বুঝে কৃষ্ণকলিকে আমরা খুঁজে পাওয়ার পূর্বেই হত্যা করা হয়।

কক্ষের প্রতিটা ব্যক্তির মুখে-চোখে উত্তেজনা প্রকাশ পাচ্ছে। জীবসিদ্ধি নিজেও নিশ্বাস বন্ধ করে শুনে চলেছে আচার্যর বিশ্লেষণ।

চাণক্য একে একে উপস্থিত প্রত্যেকের মুখে দৃষ্টি বুলিয়ে বললেন,

— এইবার প্রশ্ন আসে, কে সেই ব্যক্তি?

১৭.

বুকের উপর এসে পড়া দীর্ঘ কেশশিখায় হস্তচালনা করলেন চাণক্য। কক্ষে উপস্থিত একজন ব্যক্তিও সামান্যতম নড়ছেন না। শুধু উপরের ঝাড়বাতির আলোয়, শ্বেতপাথরের মেঝেতে তৈরি হওয়া দীর্ঘ ছায়াসমূহ মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে।

আরও একবার উপস্থিত প্রত্যেকের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে চাণক্য শুরু করলেন,

— এখানে উপস্থিত প্রতিটি ব্যক্তি সন্দেহের আওতায় পড়ে। আমরা একে একে প্রত্যেককে হত্যাকারী হিসাবে বিবেচনা করব এবং পরিস্থিতি তথা হাতে থাকা তথ্যের তদনুসারে বিশ্লেষণ করব। প্রথমেই আসি জীমূতবাহন মহাশয় এবং ভৃত্য ভুবনের কথায়। তারা দু-জনই রাজকুমারীর খাদ্য ও পানীয়ের সংস্পর্শে এসেছে আজকে। তাদের দু-জনেরই সুযোগ ছিল বিষ প্রয়োগের। কিন্তু, তাদের মধ্যে জীমূতবাহন মহাশয় রাজকুমারীর কক্ষে প্রবেশই করেননি। অতএব, কৃষ্ণকলি তাকে বিষ মেশাতে নিজের চোখে দেখে থাকতে পারে না। অপরদিকে, ভৃত্য ভুবন রাজকুমারীর কক্ষে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু তার পক্ষেও কক্ষে এসে বিষ মেশানোর চেয়ে সহজ ছিল পাকশাল থেকে রাজকুমারীর কক্ষ অবধি আহার্য আনার পথে বিষ মেশানো। তাই নয় কি? তা ছাড়া, যদি ধরেও নিই যে, তাদের দু- জনের মধ্যে কাউকে কৃষ্ণকলি বিষ মেশাতে কোনোভাবে দেখেও থাকে, তাহলে তার সে-বিষয়ে চুপ করে থাকার কোনো যুক্তি থাকে পারে না। সে তৎক্ষণাৎ এই কথা সকলকে জানিয়ে দিত নিঃসন্দেহে। অতএব যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ করলেই এই দু-জন ব্যক্তিকে সহজেই সন্দেহের তালিকা থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া চলে।

জীবসিদ্ধি একবার জীমূতবাহন এবং ভুবনের দিকে দেখল। তাঁরা সম্ভবত আচার্যর কথা শুরুর পর থেকে এই প্রথমবার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তাদের দুর্দশা দেখে, এই পরিস্থিতিতেও মনে মনে কৌতুক অনুভব করল জীবসিদ্ধি। এই দুই হতভাগ্য কিছুই না জেনে, নিজেদের অজ্ঞাতেই রাজ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। চাণক্য না থাকলে, তারা এত সহজে নিষ্কৃতি পেত কি না তা বলা কষ্টকর। কারণ রাজকীয় অপরাধের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়েই নির্দোষ কোনো এক সামান্য ব্যক্তির বলি হয়ে থাকে। কারণ বিনা বিচারে দুর্বলদের দণ্ড দেওয়ার রীতি সুপ্রাচীন।

চাণক্য বলে চলেছেন,

— তাহলে বাকি রইল তিনজন। সকালে রাজকুমারীর কক্ষে আসা তিন অতিথি। প্রত্যেকেই একে একে কক্ষে এসেছিলেন আহার দিয়ে যাওয়ার পর। তাঁদের প্রত্যেকেই রাজকুমারীর পালঙ্কর সম্মুখের আসন গ্রহণ করেছিলেন। এবং উল্লেখযোগ্য যে, ঠিক সেই আসনের পাশেই, মেজের উপরে আহার এবং পানীয় রাখা ছিল। রাজকুমারী নিজের প্রসাধন কার্যে ব্যস্ত ছিলেন। অতএব প্রত্যেকেরই সমান সুযোগ ছিল, রাজকুমারীর পানপাত্রে বিষ মিশিয়ে দিয়ে যাওয়ার।

কক্ষের প্রত্যেকের দৃষ্টি এই মুহূর্তে তিন ব্যক্তির উপর পড়ল। চাণক্য কথা শুরু করতেই আবার প্রত্যেকের চোখ তাঁর দিকে ঘুরে গেল।

— প্রথমেই কক্ষে এসেছিলেন অমাত্য কাত্যায়ন। আমি পুনরায় একবার রাজকুমারীকে একটি প্রশ্ন করব। রাজকুমারী, আপনি দয়া করে আরও একবার স্মরণ করে বলুন যে, কাত্যায়ন আপনার কক্ষে থাকাকালীন আপনার সখীদের মধ্যে কোনজন আপনার কেশচর্চা করছিল এবং কোনজন আপনার মুখোমুখি বসে অঙ্গে প্রসাধন করছিল।

দুর্ধরার দিকে চাইতে সে উত্তর দিল,

— এ প্রশ্ন আপনি আমাকে আগেও করেছেন। যদিও এই প্রশ্নের গুরুত্ব আমি অনুধাবন করতে অক্ষম, কিন্তু আপনার প্রশ্নের উত্তর আমি আরও একবার দিচ্ছি। আমার কেশ পরিচর্যা করছিল মধুবন এবং আমার সম্মুখে বসে ছিল কৃষ্ণকলি।

— হুম। আপনি নিশ্চিত তো?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। আর্য কাত্যায়ন কক্ষে থাকাকালীন পুরো সময়টাই তাই অবস্থান ছিল দু-জনের।

— অতি উত্তম। এইবার তবে আমি সকলকে অনুরোধ করব, এই সময়ে রাজকুমারীর কক্ষে প্রত্যেকের অবস্থান মানসপটে চিত্রিত করুন। পালঙ্কে বসে আছেন রাজকুমারী, তাঁর পশ্চাতে বসে তার কেশচর্চা করছে মধুবন। তাদের মুখোমুখি, কিছুটা দূরত্বে রাখা আসনে বসে আছেন অতিথি এবং রাজকুমারীর একদম সম্মুখে, মেঝেতে বসে আছে কৃষ্ণকলি। অর্থাৎ, অতিথির দিকে পিছন ফিরে আছে কৃষ্ণকলি। আমি কি সঠিক বলছি, রাজকুমারী?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ।

— আর্য কাত্যায়ন, আমি কি সঠিক বলছি?

সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন রাক্ষস।

তাঁর সম্মতি পেয়ে চাণক্য বললেন,

— অতি উত্তম। তাহলে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, কাত্যায়নের উপস্থিতির সম্পূর্ণ সময়টাই কৃষ্ণকলি তাঁর দিকে পিছন ফিরে ছিল। অর্থাৎ, যদি তিনি পানীয়ে বিষ মিশিয়ে থাকেন, তবে তা মধুবন বা রাজকুমারীর চোখে পড়ার সম্ভাবনা অধিক। কিন্তু সে ঘটনা কৃষ্ণকলির দৃষ্টিগোচর হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ, প্রায় অসম্ভব।

প্রত্যেকের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে। একমাত্র রাক্ষসের মনের ভাব তাঁর মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই।

চাণক্য বলে চলেছেন,

— এইবার আরও একবার আমায় স্মরণ করিয়ে দিন, রাজকুমারী। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অতিথি যখন আপনার কক্ষে ছিল, সেইসময়ে কি কৃষ্ণকলি এবং মধুবনের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছিল?

প্রশ্নটার তাৎপর্য বুঝতে পেরেই উত্তর দেওয়ার পূর্বে দুর্ধরার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

— হ-হ্যাঁ!

— অর্থাৎ, ধনানন্দ এবং মলয়কেতু যে সময়ে আপনার কক্ষে ছিল, সেসময়ে কৃষ্ণকলি ছিল আপনার পশ্চাতে। তার দৃষ্টি বরাবর দু-জন অতিথি একে একে বসে ছিল। এবং, নিঃসন্দেহে এই দু-জন অতিথির মধ্যেই কোনো একজনকে সে রাজকুমারীর পানপাত্রে বিষ মেশাতে দেখেছিল।

.

— এ মিথ্যে! আ-আমি কিছুই জানি না! আমি কিছু করিনি!

কক্ষের কোণ থেকে কথা, বা, বলা ভালো, আর্তনাদ ভেসে এল মলয়কেতুর। চাণক্য বলে উঠলেন,

— অতি উত্তেজনা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়, মহারাজ। আসন গ্রহণ করুন।

— আমি… আমি…

— আসন গ্রহণ করুন, মলয়কেতু!

শেষ আদেশটা সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর কণ্ঠ থেকে ভেসে এল। তাঁর আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা মলয়কেতুর নেই। সে প্রায় ভগ্ন প্রস্তরখণ্ডর মতোই খসে পড়ল আসনে। তার জীবনের শেষ আশার জ্যোতিটাও যেন কেউ ফুৎকারে নিভিয়ে দিয়েছে।

তার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে চাণক্য পুনরায় মুখ খুললেন,

— কিন্তু আবার একই প্রশ্ন এসে যায়। কুমার মলয়কেতুকে রাজকুমারীর পানীয়ে বিষ মেশাতে দেখলে, কৃষ্ণকলি কেন চুপ থাকবে? তা ছাড়া মলয়কেতুর কথা যদি বিশ্বাস করতে হয়, তবে সে আমাদের পূর্বে জানিয়েছে যে, কৃষ্ণকলি বার বার তার দিকে ভীত দৃষ্টিতে চাইছিল। আসলে কুমারের বুঝতে সামান্য ভুল হয়েছে। কৃষ্ণকলি ভীত দৃষ্টিতে মলয়কেতুকে দেখছিল না। আসলে সে বারংবার ভয় মেশানো চোখে মলয়কেতুর পাশের মেজে রাখা রাজকুমারীর পানীয়ের স্বর্ণ-পেয়ালার দিকে চাইছিল। অর্থাৎ, এই সময়ে কৃষ্ণকলি জানত যে, পানীয়ে বিষ মেশানো আছে। কিন্তু, সব জেনেও তাকে চুপ থাকতে হয়েছে। ভয়ে এবং বিভ্রান্তিতে! একটি অপ্রত্যাশিত দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে সে এতটাই হতচকিত হয়ে গিয়েছিল যে, তার করণীয় কী সেটাই সে বুঝে উঠতে পারেনি। কারণ কৃষ্ণকলি কিছুতেই বুঝতে পারছিল না যে, একজন পিতা তার আদরের পুত্রীকে বিষ দিয়ে হত্যার চেষ্টা কেন করবে?

১৮.

কক্ষের প্রতিটি চোখের দৃষ্টি এই মুহূর্তে ধনানন্দর উপর গিয়ে আটকেছে। ধনানন্দ নিজের আসনে বসে আছেন নিশ্চুপ। এই পুরো সময়টা তিনি অন্যদিকে চেয়ে ছিলেন। কিন্তু, এইবার তিনি সোজাসুজি চাণক্যর চোখে চোখ রাখলেন।

আচমকা হাসিতে ফেটে পড়লেন তিনি। হাসি থামিয়ে বললেন,

— খল ব্রাহ্মণ! আমার পুত্রীকে নিজের কথার জালে জড়াতে না পেরে, এইবার আমাকে খুনি বলে নিজেদের পিঠ রক্ষার চেষ্টা? আমি আমার নিজের আদরের কন্যাকে বিষ দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছি? আরে, কেউ এই ব্রাহ্মণের চিকিৎসা করাও! রাজবৈদ্যকে ডেকে একে কিছু জড়িবুটি দিতে বলো। এর তো মস্তিষ্কবিকৃতি আছে। এ ব্রাহ্মণ যা খুশি বলে চলেছে যে!

চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,

— নিজের কন্যাকে হত্যার উদ্দেশ্য তোমার কখনোই ছিল না, ধনানন্দ। সেই কারণেই তোমারই আদেশে রাজকুমারী দুর্ধরার পানীয়ের স্থানে ‘সোম’-এর পরিবর্তে ‘সুরা’ লেখা হয়েছিল। কারণ ভালোভাবেই তোমার এ তথ্য জানা ছিল যে, ক্ষত্রীয় তথা রাজপরিবারের সদস্যরা সুরা পান করে না। রাজকুমারী দুর্ধরাও কখনোই এই পানীয় নিজে পান করতেন না এবং নিশ্চিতভাবেই তা তিনি নিজের কোনো এক সখী বা দাস-দাসীকে তা পান করতে দেবেন। সেই অন্য ব্যক্তি, সে যে-ই হোক না কেন, তার বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হতেই সকলেই ধরে নেবে যে, রাজকুমারীকে বিষ প্রয়োগের দ্বারা হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। দৈবাৎ তালিকায় পানীয়ের স্থানে ক্ষুদ্র একটু ভুলের কারণে তার প্রাণ রক্ষা হয়েছে। কেউ সন্দেহ করবে না যে, বিষ এই কারণেই ‘সুরা’ ভরতি পানীয়ে মেশানো হয়েছে, যাতে তা কোনোপ্রকারেই রাজকুমারী পান না করেন।

অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নিজের কেশশিখায় হস্তচালনা করে চাণক্য বললেন,

— রাজকুমারীর কক্ষে থাকাকালীন তুমি রাজকুমারীর চোখ এড়িয়ে তাঁর জন্যে সাজিয়ে রাখা বিশেষ স্বর্ণ পানপাত্রে বিষ ঢেলে দাও। কিন্তু রাজকুমারী দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হলেও, সেই মুহূর্তে রাজকুমারীর পশ্চাতে বসে তাঁর কেশসজ্জা করতে থাকা কৃষ্ণকলি তোমায় দেখে ফেলে। তুমিও তাকে দেখলে এবং ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বললে। সে বুঝতে পারল না কী ঘটছে! তবে কি ধনানন্দ তাঁর কন্যাকে হত্যা করতে চলেছেন? কিন্তু, তা যে অসম্ভব! কৃষ্ণকলি ভালোভাবেই জানে যে, রাজকুমারী দুর্ধরা তার পিতার কতটা প্রিয়পাত্রী। তবে? কী মেশালেন তিনি? নিশ্চয়ই বিষ? কিন্তু, কেন? তাকে কেন চুপ থাকতে বললেন ধনানন্দ? সে মুখ খুললে কি তবে তার বিপদ হবে? সব মিলিয়ে কৃষ্ণকলি সম্পূর্ণভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। চিন্তায় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ার কারণে ভুল করে ফেলে কাজে। ভীত দৃষ্টি বারংবার তার চলে যাচ্ছিল সেই সাজিয়ে রাখা পানপাত্রর দিকে। তার মনের অবস্থা সহজেই আমি অনুমান করতে পারছি। কিন্তু এরপরেই যখন রাজকুমারী নিজের পানপাত্রে সোমের পরিবর্তে সুরা দেখে তা বদলে দেওয়ার কথা বলে, তখন তার মনে সন্দেহ ঢোকে। তবে কি রাজকুমারী আর তার পিতা মিলে কোনো গূঢ় ষড়যন্ত্র রচনা করছেন? কিন্তু সে মুখ খুললে তো তারই বিপদ! অতএব সে কক্ষ ত্যাগ করার সুযোগ পেতেই দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করে। আর সেখানেই সে করে ফেলে মস্ত ভুল!

চাণক্য পুনরায় ধনানন্দর দিকে চেয়ে বললেন,

— ধনানন্দর মুখেই শুনেছি আজকে দুপুরে, যে, তাঁর নিজের বিশ্বস্ত সৈনিকরা রাজকুমারীর কক্ষের বাইরে প্রহরারত ছিল। আমার ধারণা, ধনানন্দ রাজকুমারীর কক্ষ থেকে নিজে বেরিয়েই তাঁর বিশ্বস্ত সৈনিকদের নির্দেশ দেন যে, কক্ষ থেকে কৃষ্ণকলি বের হলেই যেন তাকে গোপনে হত্যা করা হয়। কৃষ্ণকলি নিজে লুকিয়ে থাকতে উত্তর মহলে গিয়েছিল, নাকি, ধনানন্দর সৈনিকরা তাকে ভয় দেখিয়ে জোর করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। অথবা, এও সম্ভব যে, কৃষ্ণকলি ধনানন্দর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই নিজের মনের সন্দেহ দূর করার আশায় কক্ষ ত্যাগ করেছিল। কিন্তু, ধনানন্দর পক্ষে যে কোনোভাবেই তাকে জীবিত রাখা সম্ভব নয়! কারণ সে তার চক্রান্তের একমাত্র সাক্ষী। কৃষ্ণকলি মুখ খুললেই তার সমস্ত ষড়যন্ত্রের উপর থেকে পর্দা উঠে যাবে। তাই এমনই ব্যবস্থা নেওয়া হল, যাতে সে কোনোভাবেই না মুখ খুলতে পারে। তাকে সরিয়ে ফেলা হল এই পৃথিবী থেকে। একটি নয়, গত কয়েক প্রহরে দু-দুটি হত্যা করেছে ধনানন্দ। প্রথমটি নিজের হাতে, দ্বিতীয়টি নিজের বিশ্বস্ত সৈনিকের মদতে।

ধনানন্দ পুনরায় বলে উঠলেন,

— বাহ্ রে, কুটিল ব্রাহ্মণ! বাহ্! তুই যে এত দুর্দান্ত মনগড়া কাহিনি রচনা করতে পারিস তা তো জানা ছিল না। আমি মুগ্ধ! কিন্তু কী জানিস রে, কৌটিল্য? এগুলো শুধুই মনগড়া কাহিনিমাত্র! এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই! সব আমাকে ফাঁসানোর চক্রান্ত। হে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত! আমি তো আপনার হবু শ্বশুর, আমার এই অপমান আপনি মেনে নেবেন? এই ব্রাহ্মণ হতে পারে আপনার গুরু, আপনার কোনো এককালের শিক্ষক। কিন্তু আমাকে আপনার সম্মুখে, বিনা প্রমাণে, এভাবে অপমান করার অধিকার কি তার আছে?

চন্দ্রগুপ্ত বললেন,

— গুরুদেব। ক্ষমা করবেন, কিন্তু একথা সত্য। আপনি এখনও অবধি যা যা বলেছেন তা পুরো ঘটনার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা দেয় বটে। কিন্তু সমস্তটাই আপনার ধারণামাত্র। এর থেকে প্রমাণ কি করা যায় কিছু?

চাণক্য ফিরলেন চন্দ্রগুপ্তর দিকে। বললেন,

— ধারণা নয়, সম্রাট। এ হল যুক্তিনির্ভর অনুধাবন। যে তত্ত্ব সকল ঘটনার সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে, সেটি নিঃসন্দেহে সত্য। তবে হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। প্রমাণ বিনা কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এবং, আমি আপনাদের সকলের সামনে যে ব্যাখ্যা তুলে ধরেছি, তার যথাযথ প্রমাণ দেব।

পুনরায় ধনানন্দ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,

— তাই নাকি? বেশ, বেশ। দেখি মান্যবর পণ্ডিত কী প্রমাণ দেন। আজকে সারাদিন তাঁর যে এই বৃথা ভাবনায় গিয়েছে এটা ভেবেই আমার বড়ো কষ্ট হচ্ছে। সারাদিন এত কুটিল ব্যাখ্যা ভেবেও শেষ পর্যন্ত আমাকে অপরাধী প্রমাণ করা সম্ভব হল না কৌটিল্যর পক্ষে! হায় হায়!

ঠোঁটের কোণে একটি কুটিল হাসি ফুটে উঠল চাণক্যর। ধনানন্দর দিকে চেয়ে বললেন,

— ভুল হচ্ছে তোমার, ধনানন্দ। তোমাকে আমি প্রথমবার কথা বলেই হত্যাকারী বলে শনাক্ত করতে পেরেছিলাম। আমার অনেকটা সময় লেগেছে রাজকুমারীর ভূমিকা সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে। তুমিই যে হত্যাকারী সে-বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহই ছিল না। আমার মনে একমাত্র দ্বিধা ছিল যে, তোমার কুকর্মের সঙ্গে রাজকুমারী যুক্ত কি না। বিষ যে তুমি মিশিয়েছ এ তথ্য আমার বহু আগেই জানা ছিল। তোমার সঙ্গে আজ দুপুরে কথা বলার মাঝে নিজের অজান্তেই সে- তথ্য তুমি নিজে আমাকে দিয়ে ফেলেছ। ওহে, জীবসিদ্ধি!

জীবসিদ্ধির দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন চাণক্য,

— তুমি কি স্মরণ করতে পারো এক প্রহর পূর্বে, আমার ও ধনানন্দর কথোপকথন? আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বলার মাঝে ‘বিষপ্রয়োগ’ শব্দটি ব্যবহার করলেও, একবারও আমি উচ্চারণ করিনি যে, সেই বিষপ্রয়োগ কীসের মাধ্যমে করা হয়েছিল। রাজকুমারীর সঙ্গেও অন্য কোনো ব্যক্তিকে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয়নি এই ঘটনার পর। বিষপ্রয়োগ কীভাবে বা কীসের মাধ্যমে করা হয়েছে সে-তথ্য আমাদের কয়েক জন ব্যতীত নন্দদের কেউ জানত না। তাই নয় কি, রাজকুমারী?

দুর্ধরা সম্মতি জানিয়ে বললেন,

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। আমার সঙ্গে আজ সকালের পর এই প্রথম পিতা, কাত্যায়ন মহাশয় বা আর্য মলয়কেতুর সাক্ষাৎ হচ্ছে। আমি আপনি ও জীবসিদ্ধি ব্যতীত কারুর সঙ্গেই এই বিষয়ে কোনো কথা বলিনি।

— বেশ, বেশ। আর্য কাত্যায়ন, আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, বিষ প্রয়োগের বিষয়ে সম্পূর্ণ তথ্য আপনারই জানা ছিল না। সম্পূর্ণ বিষয়টা আপনি প্রথম জানতে পারেন পরীক্ষাগারে গিয়ে। তাই তো?

শুধু উপর-নীচে ঘাড় নাড়লেন রাক্ষস।

চাণক্য পুনরায় তাঁকে প্রশ্ন করলেন,

— এবং, আপনার সঙ্গে তার পূর্বে ধনানন্দরও সাক্ষাৎ হয়নি। তাই নয় কি?

আরও একবার সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন রাক্ষস।

চাণক্য বললেন,

— বেশ, বেশ। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, আমার সঙ্গে আজ দুপুরে প্রথমবার কথোপকথনের সময়েই ধনানন্দ কীভাবে জানলেন যে, বিষ প্রয়োগ পানীয়ের মাধ্যমেই করা হয়েছে? ওহে জীবসিদ্ধি, একবার স্মরণ করো তো। ধনানন্দ কথার মাঝে, মগধের প্রতি অভিযোগ জানাতে গিয়ে ঠিক এই উক্তিটি বলেছিলেন কি না: ‘মগধের পাচক পানীয় বানাল। মগধের ভৃত্য তা কক্ষ পর্যন্ত নিয়ে এল।’

চকিতে ধনানন্দর কথাগুলো মনে পড়ে গেল জীবসিদ্ধির। উত্তেজিত হয়ে বলল,

— হ্যাঁ, হ্যাঁ! ঠিক! তাই তো! ঠিক এই কথা বলেছিল ধনানন্দ।

আবার ধনানন্দর দিকে ফিরলেন চাণক্য। বললেন,

— হুম। তিনি কীভাবে এই তথ্য জানলেন যে, বিষ পানীয়তেই মেশানো হয়েছিল? এ তথ্য রাজকুমারী, তুমি, আমি এবং সম্রাট বাদে কেউ জানত না। পরবর্তীতে কাত্যায়ন জেনেছিলেন। কিন্তু, ধনানন্দ নিজেই সেইসময় স্বীকার করেছিল যে, কাত্যায়নের সঙ্গে তার তখনও সাক্ষাৎ হয়নি। অতএব আমরা ব্যতীত একমাত্র একজন ব্যক্তিরই এটা জ্ঞাত থাকা সম্ভব, যে খাদ্যে নয়, পানীয়ে বিষ ছিল। আর সেই ব্যক্তি আর কেউ নয়, হত্যাকারী স্বয়ং!

এই প্রথমবার ধনানন্দকে কিছুটা বিবর্ণ লাগল। তার ঠোঁটের থেকে তার আত্মবিশ্বাসী হাসিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গিয়েছে। ভ্রূ কুঞ্চিত করে ভাবছেন তিনি। কিন্তু পরমুহূর্তে বললেন,

— এও মিথ্যে কথা! আমি অস্বীকার করছি। গুরুর তালে যে তার শিষ্য তাল মেলাবে তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে? এতে কিছুই প্রমাণ হয় না!

চাণক্য বললেন,

— যথার্থ বলেছ, ধনানন্দ। এটা প্রমাণ নয়। এটা তো শুধুমাত্র তোমাকে বোঝালাম যে, তুমি নিজেকে যতটা বুদ্ধিমান মনে কর, তা তুমি নও। বরং, তুমি একজন মূর্খ, যে নিজের অপরাধের প্রমাণ নিজেই উত্তেজনার বশে আমার হাতে তুলে দিয়েছ আজকে প্রথম সাক্ষাতেই। যদিও এই তথ্য এবং আমার ও জীবসিদ্ধির সাক্ষী তোমায় অপরাধী প্রমাণ করার পক্ষে যথেষ্ট। তবুও আমি আরও একটি প্রমাণ এইবার সকলের সম্মুখে আনব। এবং, তাতেই প্রশ্নাতীতভাবে তোমার অপরাধ প্রমাণিত হবে, ধনানন্দ!

১৯.

বাইরে থেকে ঢোল, বাঁশি আরও অনেক ধরনের শব্দ মিলিয়ে এক মধুর সুর ভেসে আসছে। এই সুর প্রেম-রসের। এই মুহূর্তের কক্ষের পরিবেশের সঙ্গে তা এক চরম বৈপরীত্য সৃষ্টি করছে।

চাণক্য কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন। সম্ভবত তিনি ধনানন্দর থেকে প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ আশা করছিলেন। কিন্তু ধনানন্দ এইবার কিছুই বললেন না। তাঁর দুই চোখের তারার স্বাভাবিক ঔদ্ধত্য বর্তমানে আর ফুটে উঠছে না। বরং জীবসিদ্ধির মনে হল তাতে এইবার দেখা দিচ্ছে ভীতি।

খানিকটা নিজের মনেই চাণক্য বলতে শুরু করলেন,

— এই সুবৃহৎ অনুষ্ঠানের মধ্যে, বিশেষ করে যেখানে এত অতিথির সমাগম, সেখানে বিষ নিয়ে প্রবেশ করা কঠিন নয়। কিন্তু তবুও, যেখানে শত্রুপক্ষর ঘরে ঢুকে আঘাত হানার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, অতএব বিষটিকেও গোপনে নিজের সঙ্গে আনার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। বিষ এমনভাবেই রাজমহলে প্রবেশ করানো হবে যাতে তা কোনোভাবেই খুঁজে না পাওয়া যায়।

চাণক্য ধনানন্দর চোখে চোখ রেখে বললেন,

— ধনানন্দ, আজ তোমার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের সময় থেকেই লক্ষ করেছি একটি সামান্য বিষয়। তোমার হাতের দশ আঙুলে দশটি সুদৃশ্য স্বর্ণ অঙ্গুরীয় শোভা পাচ্ছে। কিন্তু তার মধ্যে তোমার বাম হাতের মধ্যমার রত্নখচিত অঙ্গুরীয়টি অন্য নয়টির থেকে আলাদা। কারণ সেটি তোমার আঙুলের সঠিক মাপে বসেনি। আজ বারংবার খেয়াল করেছি তোমায় সেটি খোলা-পরা করতে। খানিক পূর্বেও করছিলে। লক্ষ করলেই ওই আঙুলে তোমার অন্য একটি অঙ্গুরীয়র দাগ চোখে পড়ে। অর্থাৎ, সাধারণত ওই আঙুলে অন্য একটি ছোটো অঙ্গুরীয় শোভা পেয়ে থাকে, এই পীতাম্বর রত্ন বিশিষ্ট অঙ্গুরীয়টি নয়। এটি নূতন। তাই নিজেকে প্রশ্ন করলাম, এটি কি শুধুই আজকের দিনের বিশেষ সাজ? নাকি….

মুহূর্তে মনে হল ধনানন্দর মুখ থেকে সমস্ত রক্ত যেন কেউ শুষে নিয়েছে। কিছুক্ষণ কোনো কথা না বলে মাটির দিকে চেয়ে রইলেন শুধু। এরপর যখন মুখ খুললেন, তখন তাঁর কণ্ঠ থেকে পূর্বের সমস্ত তেজ বিদায় নিয়েছে।

— দুর্ধরা, তুমি নিজের কক্ষে যাও। এ সভায় তোমার উপস্থিতির কোনো প্রয়োজন নেই।

দুর্ধরার দিকে না তাকিয়েই বলে উঠলেন ধনানন্দ

দৃঢ়কণ্ঠে দুর্ধরা উত্তর দিলেন,

— না! আমি সবটা শুনতে চাই!

— ভিতরে যাও, দুর্ধরা! তোমার পিতা তোমায় আদেশ দিচ্ছে! যাও! যাও, এখান থেকে!

— ধনানন্দ!

বরফ শীতল অথচ ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল স্বয়ং সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর মুখ থেকে,

— আপনি ভুলে যাবেন না যে, যাঁর সঙ্গে আপনি কথা বলছেন, তিনি মগধের হবু মহারানি। তাঁকে আদেশ দেওয়ার অধিকার আপনার নেই। অতএব, সেই ধৃষ্টতা আপনি পুনরায় করবেন না।

ধনানন্দ একবার চন্দ্রগুপ্তর দিকে চেয়েই চোখ নামিয়ে নিলেন।

চন্দ্রগুপ্ত আবার বললেন,

— এই কক্ষে সম্পূর্ণ সত্য জানার অগ্রাধিকার যদি কারুর থেকে থাকে, তবে আমি মনে করি তা নিঃসন্দেহে রাজকুমারী দুর্ধরার।

জীবসিদ্ধি লক্ষ করল রাজকুমারী এই প্রথমবার তাকালেন চন্দ্রগুপ্তর দিকে। তাঁর মুখে মুহূর্তের জন্যে রক্তিমাভাব ফুটল।

চাণক্য দুর্ধরার দিকে চাইলেন তাঁর অনুমতি নেওয়ার ভঙ্গিতে। দুর্ধরা মৃদু মাথা ঝোঁকালেন চাণক্যর উদ্দেশে।

চাণক্যর চোখের দিকে চোখ পড়ল জীবসিদ্ধির। তাতে অন্তর্ভেদী উজ্জ্বল দৃষ্টি। শিকারকে ফাঁদে ফেলার পর শ্বাপদ শিকারির চোখে অনেকটা এই দৃষ্টি থাকে।

দু-পা এগিয়ে, আসনে উপবিষ্ট ধনানন্দর সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন চাণক্য। ডান হস্ত তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

— তোমার ওই অঙ্গুরীয়টি একবার দাও।

চোখ তুলে চাণক্যর চোখে চোখ রাখলেন ধনানন্দ। তাতে তীব্র আক্রোশ! —

— সর্বনাশ হোক তোর কুটিল ব্রাহ্মণ!

পরমুহূর্তে তিনি দু-হাত সামনে বাড়িয়ে চাণক্যের কণ্ঠ লক্ষ করে আসন ছেড়ে লাফিয়ে পড়লেন।

কিন্তু তাঁর হাত চাণক্যর কণ্ঠ অবধি পৌঁছানোর পূর্বেই তাঁকে থামতে হল। কারণ ধনানন্দর নিজের কণ্ঠে ততক্ষণে স্পর্শ করেছে একটি ছোটো কৃপাণের ধারালো ডগা।

সদাসতর্ক জীবসিদ্ধি এরকম একটি প্রতিক্রিয়া আশা করেই চাণক্যর পেছন পেছনেই এগিয়ে এসেছিল। কোমরে লুকোনো গোপন ছুরিটা বের করে তার আচার্য আর ধনানন্দর মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে তার বেশি সময় লাগেনি।

চন্দ্রগুপ্তর ইশারায় দু-জন সৈনিক এগিয়ে এসে ধনানন্দকে বল প্রয়োগ করে পুনরায় বসিয়ে দিল তার আসনে। তার দুপাশেই দাঁড়িয়ে থাকল তারা।

চাণক্য এক পা নড়েননি নিজের স্থান থেকে। তাঁর ঠোঁটে বিদ্রূপাত্মক হাসি। আরও এক পা এগিয়ে এসে নিজেই ধনানন্দর বাম হাতের মধ্যমা থেকে বড়ো অঙ্গুরীয়টি সহজেই খুলে নিলেন। ধনানন্দর কণ্ঠে তখনও ধারালো ফলাটা ধরে রেখেছে জীবসিদ্ধি।

ধনানন্দর দিকে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে অঙ্গুরীয় নিয়ে সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। ধনানন্দর কণ্ঠে তার হাতের কৃপাণটি চালিয়ে দেওয়ার তীব্র ইচ্ছা দমন করে, কৃপাণটি খাপে চালান দিয়ে আচার্যর পিছনেই ফিরে গেল জীবসিদ্ধি।

অঙ্গুরীয়টি সকলের দেখার নিমিত্ত চাণক্য একবার তুলে ধরলেন। মাথায় বসানো বড়ো পাথরটি একদিকে ঘোরাতেই সেটি একদিকে খুলে গেল অনেকটা ঢাকনা খোলার মতো। রত্নের নীচে একটি গুপ্ত কোটর দেখা গেল।

চাণক্য সেটি খোলা অবস্থায় আরও একবার সকলের উদ্দেশে প্রদর্শন করলেন। বললেন,

— এই হল প্রমাণ। এই বিশেষ অঙ্গুরীয়টির এই গুপ্ত কোটরেই মারণ বিষ রেখেছিল ধনানন্দ। রাজকুমারীর দৃষ্টি এড়িয়ে এভাবেই উপরের রত্নটি সরিয়ে সেই বিষ তার পানীয়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই বিষেই মৃত্যু হয়েছে মধুবন নামক যুবতীর। এবং, ধনানন্দকে বিষ মেশাতে দেখে ফেলায়, নিজের বিশ্বস্ত সৈনিকদের দিয়ে কৃষ্ণকলি নামের দ্বিতীয় যুবতীকেও হত্যা করা হয়। এই অঙ্গুরীয়টির বাইরের স্বর্ণের ঔজ্জ্বল্যের সঙ্গে এই কোটরের ঔজ্জ্বল্য তুলনা করলেই দেখা যাচ্ছে যে, কোটরের স্বর্ণের ঔজ্জ্বল্য ক্ষীণ’। অর্থাৎ, এই স্বর্ণ দীর্ঘ সময় বিষের সংস্পর্শে ছিল।

চন্দ্রগুপ্তর পাশের মেজে আংটিটি রেখে দিয়ে চাণক্য তাঁকে বললেন,

— আমার আর কোনো বক্তব্য নেই, সম্রাট। বাকি নির্ণয় আপনার।

প্রথমে চন্দ্রগুপ্ত এবং তারপর দুর্ধরার দিকে চেয়ে সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে, নিজের আসনে এসে উপবিষ্ট হলেন আচার্য চাণক্য।

একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন চন্দ্রগুপ্ত। বললেন,

— ধনানন্দ, আচার্য চাণক্যর কথায় কয়েক বর্ষ পূর্বে আমি তোমায় জীবনদান করেছিলাম। তার জন্যে এই মুহূর্তে আমার আফশোস হচ্ছে। সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করার অভিপ্রায় আমার নেই। আমি দুঃখিত এবং ক্রুদ্ধ। কিন্তু…।

কথা থামিয়ে চন্দ্রগুপ্ত তাকালেন দুর্ধরার দিকে। দু-হাতে মুখ ঢেকে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।

চন্দ্রগুপ্ত পুনরায় মুখ খুললেন,

— কিন্তু, এই কক্ষে সবচেয়ে বেশি যিনি আঘাত পেয়েছেন, তাঁর শোকের সম্মুখে আমার ক্রোধ অতি তুচ্ছ। তাই ধনানন্দ, তোমার ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার একমাত্র তাঁরই আছে বলে আমি মনে করি। রাজকুমারী দুর্ধরা এ বিষয়ে যা নির্ণয় নেবেন, আমি তাই মেনে নেব। তাঁর নির্ণয়ই আমার নির্ণয় হবে।

অশ্রুভেজা চোখে চন্দ্রগুপ্তর দিকে চাইলেন দুর্ধরা। এতগুলো বছর যাঁকে ঘৃণা করে এসেছেন তিনি, তাঁকে আজ সম্পূর্ণ অন্যরূপে চিনতে পারছেন দুর্ধরা। কে এই পুরুষ? যিনি নিজের ক্রোধকেও বশ করতে সক্ষম? কে এই বিস্ময় তরুণ সেনানায়ক?

দুর্ধরার অশ্রুসিক্ত চোখ দুটির দিকে চাইতেই হৃদয়ে একটি মোচড় অনুভব করলেন চন্দ্রগুপ্ত। গভীর একটি বিষণ্ণতা আচ্ছন্ন করল তাঁর মন। আহা! কীই-বা দোষ এই মেয়েটির? অথচ কত ঝড়ের মধ্যেই না তাঁকে এনে ফেলা হয়েছে। বারংবার তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর পিতা তাঁকে ব্যবহার করেছে। আর তিনি নিজে? তাঁরাও কি এই মেয়েটিকে ব্যবহার করেননি? জোর করে পরিস্থিতির চাপে তাঁকে বিবাহে বাধ্য করেছেন তাঁরা। হায়! না না! এই অন্যায় তিনি করতে পারেন না। এই কোমল নারীর চোখের জল তিনি সহ্য করতে পারবেন না। দরকারে চাণক্যর বিরুদ্ধে গিয়েও তিনি এই অন্যায়ের প্রতিরোধ করবেন। মনে মনে নির্ণয় নিলেন চন্দ্ৰগুপ্ত।

দু-চোখের অশ্রু মুছে উঠে দাঁড়ালেন রাজকুমারী দুর্ধরা। এগিয়ে গেলেন ধনানন্দর দিকে। দৃঢ়কণ্ঠে বললেন,

— পিতা, আমি লজ্জিত। আমি ব্যথিত। আপনি কী করে এই ঘৃণ্য কার্য করতে পারলেন?

চোখ তুলে চাইলেন ধনানন্দ। তাঁকে বৃদ্ধ, দুর্বল লাগছে। বললেন,

— তোমার জন্যে! আমি যে তোমারই জন্যে করেছি, দুর্ধরা! কী করে তোমায় তুলে দিতে পারতাম আমি এই এদের হাতে? তুমি যে আমার জীবনের চেয়েও দামি!

মুহূর্তের জন্যে কি দুর্বল হলেন দুর্ধরা? পিতার প্রতি তাঁর হৃদয়ে সহানুভূতি জাগল? রাজকুমারীর মুখ দেখে অনুমান করতে পারল না জীবসিদ্ধি।

তবে তার পরের শব্দগুলি বলার সময় তাঁর কণ্ঠ সামান্য কাঁপল,

— আর কৃষ্ণকলি ও মধুবন? তারা আপনার কন্যাসমা ছিল না? তাদের হত্যা করেছেন আপনি। সম্রাট চন্দ্রগুপ্তকেও হত্যার চেষ্টা করেছেন। ধিক্কার আপনাকে।

চিৎকার করে প্রতিবাদ করলেন ধনানন্দ,

— না! আমি চন্দ্রগুপ্তকে বিষ দিয়ে হত্যার চেষ্টা করিনি! বিশ্বাস করো আমার কথা!

উত্তর ভেসে এল চাণক্যর মুখ থেকে,

— বিশ্বাস করলাম। সম্রাটের পানীয়ে তুমি বিষ মেশাওনি। তা আমি জানি।

— তবে? তবে কে?

— সে প্রশ্নের উত্তর তোমার জানা নিষ্প্রয়োজন।

আর কোনো ব্যাখ্যা দিলেন না চাণক্য।

পরবর্তী কথাগুলো বলার পূর্বে একবার শ্বাস নিলেন দুর্ধরা। তাঁর কণ্ঠের দৃঢ়তা ফিরে এসেছে,

— আমি আদেশ দিচ্ছি। এই মুহূর্তে আপনি পাটলিপুত্র ত্যাগ করবেন। ভোরের আলো ফোটার পূর্বে আপনি মগধের সীমানা পার করবেন এবং ভবিষ্যতে কোনোদিন মগধের ভূমিতে আপনি পা রাখবেন না। আমার সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করলে আপনার প্রাণরক্ষার দায়িত্ব আমার নয়। জানবেন আপনার কন্যাকে আপনি আজকে তার অন্য দুই সখীর সঙ্গেই হত্যা করেছেন।

নিজের আসনে ফিরে এলেন দুর্ধরা। দ্বিতীয়বার পিছন ফিরে তাকালেন না।

বিস্মিত হয়েছে জীবসিদ্ধি। তবে তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হয়েছেন চন্দ্রগুপ্ত। কে এই নারী? তাঁকে একটু আগে কোমল, দুর্বল ভেবেছিলেন তিনি। ভুল করেছিলেন!

উঠে দাঁড়ালেন ধনানন্দ। একবার চাইলেন কন্যার দিকে। মুখ ফিরিয়ে বসে আছেন দুর্ধরা। ধনানন্দ চাইলেন তাঁর বিশ্বস্ত অমাত্যর দিকে। রাক্ষস তাঁর দিকে একবার চোখে চোখ রেখে তা নামিয়ে নিলেন। এই অবস্থায় তিনি কন্যাসমা দুর্ধরাকে পরিত্যাগ করতে পারেন না। রাজকুমারীর যে এখন তাঁকে বড়ো প্রয়োজন। এই অচেনা মানুষের মধ্যে তিনিই যে তাঁর একমাত্র আপন মানুষ রয়ে গেলেন।

চন্দ্রগুপ্ত ইশারা করতে দু-জন সৈনিক ধনানন্দকে সঙ্গে নিয়ে প্রস্থান করল।

একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন চাণক্য। সেটি স্বস্তির না আফশোসের, তা জীবসিদ্ধি অনুমান করতে পারল না।

* বিষের সংস্পর্শে এলে স্বর্ণের ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়। এই তথ্য অর্থশাস্ত্রে লেখা আছে। যে কারণে অতীতে রাজাদের সোনার থালা বাসনে খাবার খাওয়ার নিয়ম ছিল। যাতে আহারে বিষ থাকলে তা বোঝা যায়।