৪৫.
গোটা পাটলিপুত্র সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর জয়ের উৎসব পালনে ব্যস্ত। সম্রাট পঞ্চনদ জয় করেছেন। এখন আর্যাবর্তর উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশ মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। কিন্তু ঠিক বিপরীত চিত্র রাজমহলের অন্দরে। চন্দ্রগুপ্তর রাজমহলে গভীর শোকের ছায়া। বহু বছর পর আজ আবার পাঁচ গুরুভ্রাতা একত্রিত হয়েছে একই স্থানে। ঠিক যেমন দেশের উত্তর-পশ্চিমের ভার ছিল শশাঙ্কর উপর। একইভাবে তার ছাত্র পুরুষদত্ত যার উপর আর্যাবর্তর পূর্ব অংশের দায়িত্ব দিয়েছেন চাণক্য। আর্যাবর্তর মধ্যভাগের দায়িত্ব পালন করে অক্ষয় এবং পশ্চিমের সীমানার দায়িত্বে আছে আদিত্য। রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে দেশ পরিচালনা করে চন্দ্রগুপ্ত এবং গোটা আর্যাবর্তে ছড়িয়ে থাকা গুপ্তচর বাহিনীর কেন্দ্রে আছে জীবসিদ্ধি।
চাণক্য প্রথম থেকেই জানতেন যে, একসময় গোটা আর্যাবর্ত শাসনের ভার আসবে চন্দ্রগুপ্তর উপর। একা একজন রাজা কখনোই পারবে না এই বিশাল দেশের শাসন পরিচালনা করতে যদি না দেশের বিভিন্ন অংশের দায়িত্ব আলাদা আলাদা করে দেওয়া যায়। এবং, সেই দায়িত্ব তারাই পালন করতে পারবে যারা নিজেরাও এক-একজন রাজা হওয়ার যোগ্য। তাই একজন নয়, একে একে বিভিন্ন রকমের চারিত্রিক পরীক্ষা করে ছয়জন ছাত্র বেছে নিয়েছিলেন চাণক্য তাঁর গুরুকুল থেকে। তাদের একত্রে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন চাণক্য। যার ফলে এরা প্রত্যেকেই কুশল যোদ্ধা, রাজনীতিজ্ঞ এবং মগধ শাসনের মূল ছয়টা স্তম্ভ। এই ছয় গুরুভ্রাতা ছাত্রাবস্থা থেকেই একে অন্যের সুহৃদের চেয়েও বেশি। তারা বাস্তবেই যেন ভিন্ন মাতার গর্ভে জন্ম নেওয়া ছয় ভ্রাতা। কিন্তু সুরক্ষা স্বার্থে চন্দ্রগুপ্ত ভিন্ন বাকি পাঁচজনের প্রকৃত পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি কোনোদিন। সকলের চোখে তারা মগধের প্রতিনিধি মাত্র। কিন্তু চাণক্যই শুধু জানেন যে, মৌর্য সাম্রাজ্য আসলে পরিচালনা করছে ছয়জন। চন্দ্রগুপ্ত সম্মুখ দিবালোকে দাঁড়িয়ে এবং অন্য পাঁচজন আঁধারে দাঁড়িয়ে গোপনে প্রতিদিন দেশকে রক্ষা করে চলেছে।
তাই আজকে আবার তারা একত্রিত হয়েছে তাদের ভ্রাতার অন্ত্যেষ্টিতে, শেষ বিদায় জানাতে। শশাঙ্কর মৃত্যুতে তারা প্রত্যেকেই শোকাহত। বিশেষ করে জীবসিদ্ধি। কারণ তক্ষশিলা গুরুকুলে শশাঙ্কর সঙ্গেই তার প্রথম সখ্যতা হয়েছিল। চাণক্যর আশ্রমে জীবসিদ্ধিকে প্রথমবার নিয়ে এসেছিল এই শশাঙ্কই। তাই শশাঙ্কর মৃত্যু সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে সম্ভবত তারই উপর।
শশাঙ্কর অস্থিপাত্র ঘিরে বসে আছে চাণক্য ও অন্যরা। কারুরই মুখে কোনো কথা নেই। পুরুষদত্ত কিছুটা নিজের মনেই বলে উঠল,
— আমি ভাবতেই পারছি না শশাঙ্ক মৃত। এ কীভাবে হতে পারে? আচার্য, জীবসিদ্ধির মুখে আমি গোটা ঘটনাই শুনেছি। শশাঙ্কর প্রকৃত পরিচয় ওই হত্যাকারী কীভাবে জানল?
চন্দ্রগুপ্ত তার কথার রেশ ধরেই বলল,
— শুধু শশাঙ্ক নয়, ভুলে যেয়ো না জীবসিদ্ধিকেও হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে ইতিমধ্যে। অর্থাৎ, আমাদের সকলের বিষয়েই আমাদের শত্রু জানে।
অক্ষয় বলল,
— কিন্তু, তা কী করে সম্ভব? এই গোপন তথ্য আমরা ব্যতীত কেউ জানে না। যদি-বা ধরেও নিই যে, শকুনি যেহেতু তক্ষশিলায় আচার্য ছিল আমাদের ছাত্রাবস্থায়, সে অনুমান করতে পারে যে, আমাদের কয়েক জনের মধ্যে আজও সখ্যতা রয়েছে। কিন্তু, বিধোরক বিশেষ করে ‘ছয়’ ছাত্রের সংখ্যাটাও উল্লেখ করেছে। একথা তার পক্ষে কখনোই জানা সম্ভব নয়। আমাদের অন্দর থেকেই কেউ গোপন তথ্য শকুনিকে জানাচ্ছে। কিন্তু আমরা কয়েক জন বাদে আর কেউ যে জানেই না এ তথ্য।
— একজন জানে।
জীবসিদ্ধির কথায় সকলেই তার দিকে তাকাল। আদিত্য প্রশ্ন করল,
— কার কথা বলছ তুমি, জীবসিদ্ধি?
উত্তর না দিয়ে জীবসিদ্ধি চাণক্যর দিকে চাইল। তার মনের সন্দেহের কথা অনুমান করতে পেরেই চাণক্য বললেন,
— আমি জানি তুমি কার কথা বলছ। তুমি অমাত্য রাক্ষসের কথা বলছ, তাই তো? তুমি এখনও তাঁকে সন্দেহ করো যে, তিনি আমাদের শত্রুপক্ষ।
— আমার এ সন্দেহ কি অমূলক, আচার্য? একসময় সে-ই কিন্তু ছিল আপনার চরম শত্রু।
চাণক্য চন্দ্রগুপ্তর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
— তোমারও কি একই মত, চন্দ্ৰ?
চন্দ্রগুপ্ত দু-দিকে মাথা নেড়ে বলল,
— না। গত এক বছরে আমার প্রধানমন্ত্রী পদে অমাত্য রাক্ষসকে আমি পর্যবেক্ষণ করেছি। তার প্রতি সন্দেহ আমারও ছিল। কিন্তু এখন তা দূর হয়েছে। এর সঠিক কারণ আমি বলতে পারব না, কিন্তু ধরে নিন এটা আমার একটা অনুভূতি। তা ছাড়া দুর্ধরা তার উপর বিশ্বাস রাখে।
আদিত্য বলল,
— রানি দুর্ধরা বালিকাবস্থা থেকে রাক্ষসকে দেখে আসছে। অতএব, তার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব থাকবেই। তার মতামত এখানে কুয়াশাচ্ছন্ন হবে।
চন্দ্ৰগুপ্ত বলল,
— আমার কিন্তু সেইরকম মনে হয় না। তা ছাড়া রাক্ষস তো সবেমাত্র এক বছর হল আমাদের সঙ্গে আছেন। শকুনি তো তার পূর্বেও আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে।
চাণক্য হাত তুলে সকলকে থামতে ইঙ্গিত করলেন। সকলেই আলোচনা থামিয়ে গুরুর মতামত শোনার অপেক্ষায় চুপ করল। চাণক্য ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
— আমি জানি অমাত্য রাক্ষসকে আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস করাটাকে তোমরা ভুল ভাবো। তোমরা সন্দেহ করো যে, সে-ই আমাদের শত্রু। কিন্তু তোমরা কেউই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুধাবন করতে সক্ষম হচ্ছ না। এবং, সেটা হল মনস্তত্ত্ব। সব কিছুর আড়ালে আমি যে মনস্তত্ত্বের ইঙ্গিত পাচ্ছি তা আমাকে বিচলিত করছে।
চাণক্য একটু থেমে বললেন,
— অমাত্য রাক্ষস ছিলেন আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই যদি-বা ধরে নিই যে, তোমাদের আশঙ্কায় সত্যতা আছে এবং তিনি আমার থেকে প্রতিশোধ নিতে চান, তবে তাঁর প্রতিশোধও হবে রাজনৈতিক। অর্থাৎ, তিনি আঘাত করবেন মগধের সিংহাসনে, তাঁর শাসনব্যবস্থায়। আমাদের থেকে মগধের অধিকার কেড়ে নেওয়াটাই হত তাঁর পক্ষে যথাযথ প্রতিশোধ। কিন্তু বিধোরকের কথাগুলো মনে করে দেখো। শকুনির উদ্দেশ্যর কথা সে আমাদের বলেছে। শকুনি মগধকে শাসন করতে চায় না, সে চায় মগধকে ধ্বংস করতে! অমাত্য রাক্ষস কোনোদিনই এতে লিপ্ত হবেন না। দেশের প্রতি তাঁর প্রেম আমার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
চাণক্যর ললাটে ভ্রূকুটি ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
— শকুনির এই প্রতিশোধের পদ্ধতি যেন বড্ড বেশি ব্যক্তিগত। প্রায় তিন বছর পূর্বে যখন পাটলিপুত্রর রাজপ্রাসাদে গান্ধারের দূতকে সে হত্যা করিয়েছিল যাতে অন্য রাজ্যরা আমাদের অবিশ্বাস করে, সেই আঘাত ছিল রাজনৈতিক। কিন্তু দু-বছর পূর্বে সে ব্যবহার করল আমারই প্রাক্তন ছাত্র ইন্দ্রজিৎকে। এবং, এইবার আমার প্রতিপক্ষ ছিল আমারই দোষে পরিবার হারানো প্রতিশোধকামী বিধোরক। হত্যার চেষ্টা করল আমার ছাত্রদের। তিন বছর পূর্বের ঘটনার সঙ্গে শেষ দুটি ঘটনাকে মেলাতে পারছি না আমি। কিছু যেন বদলে গিয়েছে এর মধ্যে। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তত্ত্ব উঠে আসছে। না না হে, জীবসিদ্ধি, শকুনি মগধকে নয়, সরাসরি আমাকে আঘাত করতে চাইছে বারংবার। মগধের পতন তার মূল উদ্দেশ্য হলে আমাকে সর্বপ্রথম হত্যা করার চেষ্টা করত সে। কিন্তু শকুনি আমাকে হত্যা করতে আগ্রহী নয়, সে আমার চোখের সামনে আমার ছাত্র, আমার স্বপ্ন আমার জীবনের উদ্দেশ্যকে ধ্বংস করতে চাইছে। এ আঘাত বড্ড ব্যক্তিগত। তার আঘাতের লক্ষ্য মগধ নয়, তার লক্ষ্য আমি।
জীবসিদ্ধি বলল,
— আপনি কী ইঙ্গিত করছেন, আচার্য?
— আমি চিন্তিত, জীবসিদ্ধি। খুব চিন্তিত। আমি এতদিন যে আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে শকুনির সঙ্গে বুদ্ধির যুদ্ধ শুরু করেছিলাম, সে-আত্মবিশ্বাস আমি এই মুহূর্তে অন্তত রাখতে পারছি না।
চন্দ্রগুপ্ত বলে উঠল,
— একথা বলবেন না, গুরুদেব! শশাঙ্কর মৃত্যুর প্রতিশোধ আমাদের নিতেই হবে! আপনি পরাজয় স্বীকার করে নিলে আমরা এই যুদ্ধ যে অর্ধেক হেরেই গেলাম, আচার্য।
চাণক্য আবারও মাথা নেড়ে বললেন,
— আমি পরাজয় স্বীকার করছি না, চন্দ্রগুপ্ত। কিন্তু আমি এই মুহূর্তে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে গোটা বিষয়টা আবার প্রথম থেকে ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমাদের প্রাথমিক ধারণার সঙ্গে বাস্তব মিলছে না। আমি হয়তো তোমাদের বোঝাতে পারছি না, কিন্তু এটুকু জেনে রাখো যে, কোথাও কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা এখনও আমাদের দৃষ্টিতে আসেনি। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে, গোটা সমস্যার সমাধান সূত্র আমার সম্মুখেই আছে, কিন্তু তা আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমার কোথাও একটা মারাত্মক ভুল হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা জীবসিদ্ধি, বিধোরকের শেষ কথাগুলো তোমার মনে আছে?
— সব মনে আছে। কিন্তু আপনি ঠিক কোন কথাটার বিষয়ে বলছেন?
— সে বলেছিল শকুনি আমাদের ধরা-ছোঁয়ার ঊর্ধ্বে। সে মৃত। এই কথার কী অর্থ করো তোমরা?
আদিত্য বলল,
— সে নিশ্চিতভাবেই আমাদের বিভ্রান্ত করতে এই কথা বলেছে।
চাণক্য কোনো উত্তর দিলেন না। গভীর ভ্রূকুটি তাঁর কপালে। আদিত্য বলল,
— আমরা মূল আলোচনা থেকে বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছি, আচার্য। আপনি এবং চন্দ্রগুপ্ত নিশ্চিত যে, অমাত্য রাক্ষস এইসবের আড়ালে নেই?
চাণক্যর মুখের ভাব পরিবর্তিত হল। স্মিত হেসে বললেন,
— হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে তাঁর সাহায্য ছাড়া কখনোই পঞ্চনদ জয় সম্ভব হত না। তোমরা কেউই গোটা ঘটনা জানো না। তাই তোমাদের মনে অমাত্য কাত্যায়নের প্রতি এখনও প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে।
.
তখনই কক্ষের দ্বার খুলে অমাত্য রাক্ষস এবং রানি দুর্ধরা প্রবেশ করলেন।
— আসতে পারি, আচার্য?
— আসুন, অমাত্য। আসুন, রানি। আপনাদের সঙ্গে এই তিনজনের পরিচয় করিয়ে দিই। এরা আমার ছাত্র এবং চন্দ্রগুপ্তর গুরুভ্রাতা আদিত্য, অক্ষয় ও পুরুষদত্ত।
রানি দুর্ধরা বললেন,
— আপনাদের সঙ্গে আমার সম্মুখে পরিচয় না থাকলেও আমি সম্রাটের মুখে আপনাদের বিষয়ে সব কিছুই শুনেছি। অনুকূল পরিস্থিতিতে আপনাদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ বড়োই হর্ষের হত। কিন্তু আপনাদের ভ্রাতা শশাঙ্কর মৃত্যুতে আমিও দুঃখিত।
রাক্ষস যথারীতি অভিব্যক্তিহীন মুখে সকলকে প্রণাম জানিয়ে একটি আসনে বসলেন। চাণক্য বললেন,
— আপনাকে নিয়েই কথা হচ্ছিল, অমাত্য কাত্যায়ন। আমার মনে হয় গত কয়েক মাসের ঘটনাক্রম এইবার ওদের জানার সময় এসেছে। অমাত্য রাক্ষস নিরুৎসাহিত কণ্ঠে বললেন,
— আপনার যা অভিরুচি, আচার্য চাণক্য।
চাণক্য উপস্থিত সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন,
— বেশ। তবে প্রথম থেকে শুরু করা যাক।
৪৬.
চাণক্য বলতে শুরু করলেন,
— যেদিন কুলূত থেকে পত্র এল সেইদিনই অমাত্য কাত্যায়ন বলেছিলেন যে, মলয়কেতুর কিছু ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কারণ সে মূর্খ হলেও পঞ্চনদের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা এবং জানা যাচ্ছে সে অন্য রাজাদের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করছে। জীবসিদ্ধির মাধ্যমে এই খবর আসে যে, মলয়কেতুকে পরিচালনা করছে অন্য কেউ। সে ব্যক্তি যে আচার্য শকুনি, তা অনুমান করা কঠিন কিছু ছিল না। আমি এবং অমাত্য আলোচনা করি। কাত্যায়নের মতামত ছিল যে, মলয়কেতুকে সরিয়ে ফেলাই শ্রেয়। কিন্তু তাতে কী লাভ হত? তার জায়গায় অন্য কাউকে শকুনি ব্যবহার করা শুরু করত। তাই এমন কিছু করার প্রয়োজন ছিল যাতে শত্রুকে তার শেকড় থেকে নষ্ট করে দেওয়া যায়। শুধু তাই নয়, এমন কিছু করতে হত যাতে গোটা পঞ্চনদ আমরা সহজেই জয় করে মগধের অন্তর্গত করতে পারি। আমি চেয়েছি কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে। নিজেদের সেনাক্ষয় ও অযথা যুদ্ধ না করে যে যুদ্ধ জয় করা যায়, সেটাই শ্রেষ্ঠ জয় নয় কি?
আমি আর অমাত্য কাত্যায়ন একটি সুদূর বিস্তারিত পরিকল্পনা রচনা করি। তাতে অনেকগুলো ছোটো বড়ো চরিত্র আমরা সাজিয়ে তুলি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার মূল মন্ত্র একটাই ছিল— গোপনীয়তা। প্রতিটি চরিত্র নিজেদের কাজটুকু শুধু করবে, কিন্তু গোটা পরিকল্পনার বিষয়ে কেউই জানবে না।
সেই অনুযায়ী, প্রথম দান হিসাবে মলয়কেতুর অন্দরমহলে আমি নিজের এক বিশ্বস্ত বিষকন্যা, পদ্মাকে নিযুক্ত করি। তার কাজ ছিল মলয়কেতুর কাছাকাছি পৌঁছানো, তাকে নিজের রূপে, ছলে বশ করা। তার বিশ্বাস জয় করে তার মনে শকুনি তথা অন্য ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে বিষ ঢেলে দেওয়া। বিষকন্যার শুধুই ঠোঁটে বিষ থাকে না, তার কথাতেও বিষ থাকে বই কী
পদ্মার থেকেই জানতে পারি যে, শকুনি ও মলয়কেতুর সঙ্গে কোন কোন রাজা যোগ দিয়েছে। পরবর্তী ধাপ ছিল তাদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নেওয়া, যার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। যেমন সিন্ধুসেনা। এরপরের চাল দিলেন অমাত্য কাত্যায়ন। তিনি একটি পত্র লিখলেন সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে। সংকেতের শব্দগুলো অনেক ভাবনাচিন্তার পর আমরা ঠিক করেছিলাম। কেন সেই শব্দগুলো জরুরি, সেকথায় পরে আসছি। কিন্তু সেই পত্রের শেষে অমাত্যের নিজস্ব অঙ্গুরীয় মুদ্রার ছাপ সিন্ধুসেনাকে বিশ্বাস করানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল যে, অমাত্য তার সঙ্গে মিলে মগধের পতন করতে চান। আমি ইচ্ছা করেই নিজে কুলূত যাওয়ায় রাজি হয়েছিলাম। যাতে আমাদের শত্রুদের মনে হয় যে, চাণক্যর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়েই অমাত্য কাত্যায়ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। কারণ আমাদের সঙ্গে তার এই মৈত্রী বিষয়টা নিয়ে অনেকেই মনে সন্দেহ পোষণ করে। কথাগুলো বলার জন্যে আমাকে ক্ষমা করবেন কাত্যায়ন, কিন্তু অনেকেই এখনও মনে করে যে, তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
চাণক্য আরও একবার সকলের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে নিলেন। জীবসিদ্ধিসহ অন্য সকলেই লজ্জিত ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে নিল। চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,
— কাত্যায়ন তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর নিপুণকের মাধ্যমে পত্র পাঠালেন সিন্ধু সেনার কাছে। তাতে বিশেষ কিছু তথ্যের সংক্ষিপ্ত উত্তর চাওয়া হয়েছিল। সিন্ধুসেনা সেইমতোই সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে পত্রের উত্তর লিখল। নিপুণক সেই উত্তর নিয়ে রওনা হল। এবং, এখানেই শুরু হল আমাদের পরিকল্পনার তৃতীয় ধাপ। নিপুণক নিজে না গিয়ে, কাত্যায়নের পূর্ব নির্দেশমতোই সিন্ধুসেনার সেই পত্র মাঝপথে তুলে দিল রোচকের হাতে। রোচক একজন মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং তাকেই বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ ছিল, সে বোবা। তাকে বলা হল। এই পত্ৰ মগধ অবধি পৌঁছে দিলেই তার সাজা ক্ষমা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমার ছিল না। আমি শুধু তার মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতিটা নিজের প্রয়োজনে বদলে দিয়েছিলাম। রোচক পার্বত্য প্রদেশে প্রবেশ করতেই নিপুণক কাত্যায়নের নির্দেশে একটি বেনামে পত্র লিখল মলয়কেতুর উদ্দেশে। সেই পত্রে পরোক্ষভাবে পত্রবাহক রোচকের কথা জানানো হল তাকে কারণ আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যেন রোচক পৌরব রাজ্য পার করার সময়ে ধরা পড়ে এবং সিন্ধুসেনার পত্র মলয়কেতুর হাতে পৌঁছায়। সেইমতোই রোচককে ইচ্ছে করেই ভুল পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল যাতে তার উপর সন্দেহ হয় প্রহরীদের।
পরিকল্পনামতোই রোচক ধরা পড়ল এবং যখন মলয়কেতু দেখল যে, এই লোকটি বোবা এবং অশিক্ষিত, অতএব এর থেকে কোনো তথ্যই পাওয়া যাবে না, অতএব তার গর্দান নিল। এই পত্রের সাংকেতিক শব্দগুলো আমি ও কাত্যায়ন এমনভাবেই ভেবে বের করেছিলাম যাতে সেই পত্র মলয়কেতু পাঠ করলে তার মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, এখানে তার পর্বত্যকা রাজ্যে আক্রমণ করার কথা বলা হয়েছে। যেমন, মগধকে লেখা হল পর্বত, ভদ্রকেতু হল গৃধ্র যাতে গৃধ্র পড়লেই শকুনের কথা মাথায় আসে। মলয়কেতুর মনেও যথারীতি শকুন অর্থাৎ শকুনির উপর সন্দেহের বীজ প্রবেশ করল।
কথায় বাধা দিয়ে চন্দ্রগুপ্ত বললেন,
— কিন্তু আচার্য, যদি এই পত্র পাঠ করে মলয়কেতু ভিন্ন ব্যাখ্যা করত? তাহলে? চাণক্যর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। বললেন,
— সেক্ষেত্রে তার মনে সন্দেহে জাগিয়ে তোলা হত। আমাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী পত্রের ব্যাখ্যা মলয়কেতু না করলে, তার মাথায় সেই ব্যাখ্যা প্রবেশ করানোর দায়িত্ব ছিল পদ্মার উপর। সত্যি বলতে সে আমাদের পরিকল্পনার মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে অভূতপূর্ব পারদর্শিতার সঙ্গে। পদ্মা মা-কে তোমার বীররত্ন পুরস্কার দেওয়া উচিত, চন্দ্রগুপ্ত।
চাণক্য কিছুটা বিরতি নিয়ে বললেন,
— গোটা পরিকল্পনায় বাধ সাধলেন মলয়কেতুর মন্ত্রী সুদীপ্তক। তিনি বুদ্ধিমান, তিনি রাজাকে হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বললেন। আমার অনুমান ছিল যে, শুধুমাত্র একটি পত্র দিয়ে কাজ হবে না। মলয়কেতুর মনে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে এ বিশ্বাস দৃঢ় করতে আরও একটি চাল দিতে হবে আমাদের। এইবার গোটা ঘটনাক্রমে আরও একবার গতি আনার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। এই কাজে সাহায্য করল পদ্মা। তার আবদারে মলয়কেতু তাকে নিয়ে আখেটে গেল জঙ্গলে। আমি এইবার আমার চতুর্থ চাল দিলাম। এখানে আমি ব্যবহার করলাম মগধের কারাগারে থাকা আরও এক বন্দিকে। ভীমা! ভীমাকে মনে পড়ে, চন্দ্রগুপ্ত? জীবসিদ্ধির অন্তত তার কথা মনে থাকা উচিত।
জীবসিদ্ধি বলল,
— আপনার পত্রে নামটা দেখে কিছু একটা পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ছিল বটে। কিন্তু এই নামটা আগে ঠিক কোথায় শুনেছি তা কিছুতেই স্মরণ করতে পারিনি।
— সেকী? পাটলিপুত্রর সেই শৃঙ্খল-হত্যাকারীর কথা ভুলে গেলে এই ক-বছরেই? তিন বছর পূর্বে পাটলিপুত্রর পথে পথে, রাত্রে যে উন্মাদ হত্যাকারী পতিতা নারীদের হত্যা করে গোটা নগরে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, সেই ভীমার কথা ভুলে গেলে?
চন্দ্রগুপ্ত ও জীবসিদ্ধি চমকে উঠে বলল,
— ভীমা!
— হ্যাঁ, সে-ই।
চন্দ্ৰগুপ্ত বলল,
— কিন্তু তাকে তো আমি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলাম তখনই!
চাণক্য বললেন,
— এবং আমি সেই আদেশই পালন করেছি সম্রাট, শুধু তিন বছর বিলম্বে। তুমি তো জানতে জীবসিদ্ধি, তার বিষয়ে। মনে পড়ে?
জীবসিদ্ধি বলল,
— হ্যাঁ। আপনি বলেছিলেন যে, এই বলশালী উন্মাদ আমাদের অস্ত্র হতে পারে যদি তাকে প্রশিক্ষিত করা যায়।
— হ্যাঁ তাকে মানসিকভাবে প্রশিক্ষিত করে আমাদের নির্দেশমতো কাজ করা এক অস্ত্র বানাতে আমরা সক্ষম হয়েছি গত তিন বছরে। আমার নির্দেশে কাত্যায়ন ভীমাকে পাঠালেন শিকারের পথে জঙ্গলের মাঝে যেন সে মলয়কেতুকে হত্যা করে। কিন্তু এবারও, আমাদের উদ্দেশ্য বাস্তবে তাকে হত্যা করা ছিল না। তাই ভীমার বিষয়ে পূর্বেই সতর্ক করে দেওয়া হয় পদ্মাকে। তার কাজ ছিল মলয়কেতুর প্রাণ রক্ষা করা যাতে মলয়কেতু সম্পূর্ণভাবে পদ্মার উপর বিশ্বাস করতে শুরু করে। এদিকে ভীমাকে নির্দেশ দেওয়া ছিল সে যেন বলে যে, সিন্ধুসেনার আদেশে সে মলয়কেতুকে হত্যা করতে এসেছ। পদ্মা এখানেও আরও একবার নিজের পারদর্শিতার পরিচয় দিয়ে আমাদের উদ্দেশ্য সফল করল। মলয়কেতু তার উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস করল এবং তার মনে এইবার নিশ্চিত ধারণা হল যে, সিন্ধুসেনা, শকুনিসহ অন্য রাজারা কাত্যায়নের সঙ্গে মিলে গিয়েছে। এবং, তারা মলয়কেতুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
অনেকক্ষণ কথা বলায় গলা শুকিয়ে যাওয়ায় চাণক্য থামলেন। আদিত্য তাঁর দিকে জল এগিয়ে দিল। তা পান করে তিনি বললেন,
— ধন্যবাদ, আদিত্য। তো, এই ছিল আমার আর কাত্যায়নের পরিকল্পনা। পদ্মাই মলয়কেতুর মস্তিষ্কে এই পরিকল্পনা দেয় যে, সে যেন শকুনিসহ অন্য রাজাদের জরুরি আলোচনার মিথ্যে অজুহাতে আমন্ত্রণ পাঠায়। এবং, সেই আলোচনা সভায় তাদের হত্যা করে। মলয়কেতু পদ্মার কথামতোই কাজ করল। কিন্তু আফশোস এই যে, শকুনি পূর্বেই মলয়কেতুর মহলে নিজের চর রেখেছিল। যার ফলে এই পরিকল্পনার কথা সে আগেই জেনে ফেলে এবং সেই সভায় সে আসে না। তাই আমাদের প্রধান শত্রু শকুনি বেঁচে গেল।
এদিকে সিন্ধুসেনার বাহিনী চলছিল মগধের পথে। মলয়কেতু ভাবল তারা আসছে তার রাজ্যের উদ্দেশে। অতএব, উপত্যকা অঞ্চলে মলয়কেতু তাদের উপর আক্রমণ করল। সহজেই পরাজিত হল সিন্ধুসেনা। এই ঘটনা যে ঘটবে তা পূর্বেই আমরা জানতাম। তাই সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করল চন্দ্রগুপ্ত। মলয়কেতুর সেনা যখন সিন্ধের সেনার সঙ্গে যুদ্ধজয়ের পরে ফিরছে, তখন তাদের উপর অকস্মাৎ আক্রমণ করল চন্দ্রগুপ্তর সেনা। পূর্বেই যুদ্ধে ক্লান্ত মলয়কেতুর বাহিনীর সৈন্যরা পরাজিত হল সহজেই।
এদিকে ইতিমধ্যে আরও একটি ধাপ আমরা পার করে ফেলেছিলাম সেকথা মলয়কেতু টের পায়নি। মনে আছে জীবসিদ্ধি, তুমি আমায় প্রশ্ন করেছিলে যে, কুলূতের সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ার পরেও কেন আমরা আমাদের সেনা সেখানেই রেখে দিয়েছি? তার কারণ ছিল। মলয়কেতু তিন রাজ্যে আক্রমণ করতে গিয়ে নির্বোধের মতো নিজের রাজধানী ও দুর্গ অরক্ষিত ছেড়ে তার সমস্ত সেনা যুদ্ধে ব্যবহার করছিল। সেই সুযোগে আমার নির্দেশে পর্বত্যকা রাজ্যের প্রতিবেশী রাজ্য কুলূতে বহাল থাকা মগধের সেনা মলয়কেতুর রাজধানীতে আক্রমণ করে। সেনাবাহিনী না থাকায় সহজেই সেনাপতি সিংহরণের নেতৃত্বে মৌর্য সেনা দুর্গ ও রাজধানী দখল করে। অতএব, মলয়কেতুর সেনা ঘর ও বাহির দুই হারাল। এভাবেই সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ* নীতি অবলম্বন করে সহজেই আমরা ছয় শত্রু রাজ্যকে পরাস্ত করে পঞ্চনদ জয় করলাম।
চন্দ্রগুপ্ত প্রশ্ন করল,
— কিন্তু মলয়কেতুর কী হল, আচার্য? সে তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলাতক হয়ে আত্মগোপন করছে।
— সেটাও পদ্মার কথাতেই সে করেছিল, চন্দ্র। যেকোনো সেনাই অর্ধেক মনোবল হারিয়ে ফেলে যদি তাদের রাজা তাদের পরিত্যাগ করে। বিশেষ করে তাদের সেনাপতি ও প্রধানমন্ত্রী সুদীপ্তক যতক্ষণ আছে ততক্ষণ তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেত। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যথাসম্ভব সামান্য যুদ্ধে জয় করা। তাই মলয়কেতু তাদের পরিত্যাগ করায় তাদের মনে যেটুকু প্রতিরোধের ইচ্ছে তাদের হৃদয়ে ছিল তাও শেষ হল। তারা স্বইচ্ছায় মগধের কাছে আত্মসমর্পণ করল।
— আর মলয়কেতু? সে এখন কোথায়?
— তার চিন্তা আমাদের আর করার প্রয়োজন নেই। সে নিজের ভূমিকা পালন করেছে, তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। মলয়কেতুর ব্যবস্থা পদ্মা করেছে। গতকালই তার পত্র পেয়েছি। পদ্মা পাটলিপুত্র ফিরছে। সবাই জানবে যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানিতে মলয়কেতু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
চাণক্য কথা থামাতে কেউই কোনো কথা বলল না। কিছুক্ষণ প্রত্যেকে চুপচাপ বসে রইল নিজের স্থানে। অমাত্য রাক্ষস বললেন,
— আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?
চাণক্য বললেন,
— আচার্য শকুনি আড়াল থেকে বেরিয়ে এইবার সম্মুখে এসেছে। তার সন্ধান চালিয়ে যেতে হবে। যেহেতু সে মাঝে মাঝেই কুলূত ছেড়ে কোথাও যেত এবং কয়েক সপ্তাহ ব্যবধানে ফিরে আসত, অতএব, আমার অনুমান তার মুখ্যালয় আর্যাবর্তর উত্তর-পশ্চিমেই কোথাও আছে। গোটা দেশ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র উত্তর- পশ্চিমে আমাদের সন্ধান চালানো উচিত। ইতিমধ্যে গত তিন বছরে, তিনবার শকুনি আমাদের উপর পরোক্ষভাবে আক্রমণ করেছে। দু-বার সে পরাজিত হলেও এইবার আমাদের একটি মোক্ষম আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে। সবথেকে আশঙ্কার কথা যে, সে আমাদের সম্বন্ধে এমন অনেক গোপনীয় তথ্য জানে যার ধারণা আমাদের পূর্বে ছিল না। তার প্রধান লক্ষ্য জীবসিদ্ধিকে রক্ষা করা গেলেও আমরা শশাঙ্ককে হারিয়েছি। প্রথমত উত্তর-পূর্বের দায়িত্ব অবিলম্বে তোমাদের মধ্যে কাউকে নিতে হবে। মনে রেখো, উত্তর-পূর্ব অঞ্চল হল এই দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার। তাকে সুরক্ষিত করতে না পারলে সমূহ আর্যাবর্তর বিপদ। দ্বিতীয়ত, আমাদের গোপনীয়তার দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। যেহেতু শকুনি তোমাদের বিষয়ে জানে, অতএব তোমাদের পরিবারের উপর বিপদ আসার সমূহ সম্ভাবনা। পরিবারকে ব্যবহার করে সে তোমাদের অবধি পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে। তাই যদি তোমাদের পরিবারের কোনো সদস্য পাটলিপুত্রের বাইরে থেকে থাকে, তাদের জরুরি ভিত্তিতে রাজধানীতে আনার ব্যবস্থা করো। তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থা দ্বিগুণ। করে দাও। অমাত্য কাত্যায়ন এই বিষয়ে তোমাদের সাহায্য করবে। এবং, তোমরা নিজেরাও সতর্ক হয়ে যাও। ধরেই নেবে তোমার প্রতিটি পদক্ষেপের উপর শত্রুর নজর আছে। সামান্যতম অসতর্কতা তোমাদের জন্যে এই মুহূর্ত থেকে প্রাণঘাতী হতে পারে।
চাণক্যর পাঁচ শিষ্যের চোয়াল শক্ত হল। চাণক্য বললেন,
— আমায় আবার প্রথম থেকে নিজের ধারণাগুলোকে সাজাতে হবে। শুরু থেকে আবার আমাকে শুরু করতে হবে। আমাকে অনেক ভাবতে হবে। মন বলছে শকুনির বিষয়ে এমন কোনো রহস্য আছে যা আমরা দেখেও দেখতে পাচ্ছি না। এবং, নিশ্চিতভাবেই জেনে রেখো, শকুনি আবারও আঘাত করবে! আমাদের তাই সবদিক থেকে তার আঘাত প্রতিহত করার জন্যে প্রস্তুত থাকতে হবে।
.
দ্বারের বাইরে থেকে প্রহরীর কণ্ঠ শোনা গেল,
— আর্য শশাঙ্কর স্ত্রী দেবী অহনা এসেছেন।
আলোচনা থামিয়ে চাণক্য বললেন,
— কেউ অহনাকে ভিতরে নিয়ে এসো।
রানি দুর্ধরা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
— আমি যাচ্ছি, আচার্য। এই মুহূর্তে তার পাশে একজন স্ত্রীলোকের থাকা প্রয়োজন।
চন্দ্রগুপ্ত বললেন,
— ধন্যবাদ, রানি। যাও, তাকে নিয়ে এসো এখানে। সবচেয়ে কঠিন কাজটা এবার আমায় করতে হবে। ভদ্রে অহনার হাতে তার স্বামীর অস্থি তুলে দিতে হবে।
দুর্ধরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে চাণক্য বললেন,
— চন্দ্র, যদি তোমার অনুমতি হয় তবে শশাঙ্কর স্ত্রীর হাতে তার স্বামীর অস্থি আমি সমর্পণ করতে চাই।
— আপনি, গুরুদেব?
— হ্যাঁ, চন্দ্র। শশাঙ্কর মৃত্যুর জন্যে যদি কেউ দায়ী হয়, তবে সে আমি। এইটুকু করে যদি আমার পাপ কিছুটা ক্ষমা হয়, সেই সুযোগ আমায় দাও, সম্রাট।
চন্দ্রগুপ্ত হাতজোড় করে বলল,
— একথা বলবেন না, আচার্য। নিজেকে দায়ী করবেন না। আপনি না থাকলে আমাদের কারুরই কোনো অস্তিত্ব থাকত না। তবুও আপনার ইচ্ছাই শিরোধার্য হোক।
রানি দুর্ধরা নিজের বাহু কাঁধে রেখে এক স্ত্রীলোককে নিয়ে প্রবেশ করলেন। কোলে কাপড় জড়ানো একটি একমাস বয়সি শিশুকন্যা কেঁদে চলেছে। যেন পিতার মৃত্যুর শোক তাকেও ছুঁতে পেরেছে। অহনার পরনের বিধবার বেশ এবং চোখে-মুখের অসহায় বিহ্বল ভাবের দিকে এক দৃষ্টি পড়তেই উপস্থিত সকলের হৃদয়ে যেন ধাক্কা দিয়ে গেল। শোকস্তব্ধ সকলেই মাথা নীচু করে শুধুই দাঁড়িয়ে থাকল। চাণক্য অস্থিপাত্র তুলে নিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন। অহনার সামনে গিয়ে মাথা নীচু করে বললেন,
— মা, তোমার স্বামীকে আমি রক্ষা করতে পারিনি। স্বামীকে শেষ দেখাও তুমি দেখতে পাওনি। শশাঙ্ক তার কন্যার মুখদর্শন করে যেতে পারেনি। তোমার ও এই শিশুর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো সাহস আমার নেই। শশাঙ্কর এই শেষ স্মৃতি গ্রহণ করে দয়া করে আমায় কিছুটা অন্তত দায় মুক্ত করো। এবং, সম্ভব হলে এই পুত্রহারা এক পিতাকে ক্ষমা করো।
অহনা ভেজাচোখে শশাঙ্কর অস্থিপাত্র গ্রহণ করল এবং সেইসঙ্গে নিজের কোলের শিশুকন্যাকে চাণক্যর কোলে দিল। কাঁপাস্বরে বলল,
আমার স্বামীর ইচ্ছা ছিল আমাদের কন্যার নামকরণ আপনি করবেন। শুনেছি মৃত্যুর শেষমুহূর্তেও ও…।
কথা শেষ করতে পারল না অহনা। তার গলা ধরে এল। নিজেকে আবারও সামলে নিয়ে বলল,
— আপনি দয়া করে ওর নামকরণ করুন, আচার্য।
চাণক্যর কোলে গিয়ে শিশুকন্যাটির কান্না থেমেছে। চাণক্যর কুরূপ মুখের দিকে চেয়ে শিশুটি হেসে উঠল। তার ছোটো ছোটো দু-হাত দিয়ে চাণক্যর শিখা ধরতে চাইছে।
চাণক্য আর্দ্রস্বরে বললেন,
— প্রতিটি শিশু এই অন্ধকার পৃথিবীতে আসে একটি আশার আলোর কিরণ হয়ে। পৃথিবীতে বড়ো অন্ধকার। এখানে আলোর বড়ো প্রয়োজন। তাই তোমার নাম রাখলাম— জ্যোতি!
***
Author’s Note:
১. *সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ – চাণক্যর কূটনীতির চার উপাদান। ‘সাম’ অর্থাৎ শত্রুর সঙ্গে সন্ধি করা অথবা কাউকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কার্যসিদ্ধি করা (brainwashing)। ‘দাম’ অর্থাৎ আর্থিক বা অন্যপ্রকার লোভ দেখিয়ে কার্যোদ্ধারের নীতি (bribing)। ‘দণ্ড, অর্থাৎ অপরাধীকে সাজা দেওয়া (punishment)। ‘ভেদ’ অর্থাৎ অন্যের গুপ্তরহস্য জেনে তাকে তা প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে নিজের কার্যে ব্যবহার করা (blackmail )।
২. অমাত্য রাক্ষসের অঙ্গুরীয় মুদ্রার ছাপ ব্যবহার করে পত্র লিখে শত্রুদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা অংশটি বিশাখদত্তের ‘মুদ্রারাক্ষস’-এর প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য। চতুর্থ শতাব্দী বা অষ্টম শতাব্দীতে সংস্কৃত কবি বিশাখদত্ত দ্বারা রচিত একটি ঐতিহাসিক নাটক ‘মুদ্রারাক্ষস’ সম্ভবত বিশ্বের প্রথম পলিটিকাল থ্রিলার। জটিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলের মধ্যে দিয়ে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর রাজনৈতিক উত্থান এই নাটকের মূল উপজীব্য। তবে এই নাটকে চাণক্যর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী অমাত্য রাক্ষস। আমার এই উপন্যাস-এর প্রেক্ষাপট ও কাহিনিবিস্তার সম্পূর্ণই ভিন্ন।
৩. বিশ্বাসঘাতক ছয় রাজার নাম ও তাদের রাজ্যের নাম ‘মুদ্রারাক্ষস’ থেকেই নেওয়া। মুদ্রারাক্ষস-এ যে ছয় বিশ্বাসঘাতক রাজার নাম উল্লিখিত আছে যাঁরা মৌর্যদের বিরুদ্ধে তাঁরা হলেন— পার্বত্য প্রদেশের রাজা মলয়কেতু, মলয়নগরের মহারাজ সিংহনাদ, কাশ্যপনগরের মহারাজা পুষ্করক্ষ, সিন্ধের শাসক সিন্ধুসেনা, সুদূর পারস্যের মহারাজ মেঘনন্দ এবং কুল্লুতের রাজা চিত্রবর্মা। মলয়কেতুকে কোনো জায়গায় বলা হয়েছে পুরুষের ভাইয়ের ছেলে, কোথাও বা আবার তার ছেলে। আমি এই উপন্যাসে তাকে এক বীর পুরু রাজার মূর্খ পুত্র হিসাবেই তুলে ধরলাম।
৪. এই উপন্যাসে উল্লিখিত ময়নাতদন্ত (post-mortem) সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য বাস্তবে চাণক্যর ‘অর্থশাস্ত্র’-তে লেখা আছে। মৃতদেহর পরীক্ষা পদ্ধতি, মৃতের পাকস্থলীর অপাচিত খাদ্য পরীক্ষা পদ্ধতি, যাবতীয় পদ্ধতির উল্লেখ চাণক্য করে গিয়েছেন নিজের অর্থশাস্ত্রে। এই বিষয় নিয়ে কয়েকটি রিসার্চ পেপারের উল্লেখ রেফারেন্সে দিলাম।
৫. চাণক্য তাঁর শত্রুদের গোড়া থেকে নিঃশেষ করাতেই বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর চরিত্রের এই দিক ব্যাখ্যা করতে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি আছে যে, চাণক্য কীভাবে কাঁটাঝোপ মারতে তার গোড়ায় দইয়ের তৈরি মিষ্টি ‘মঠঠা’ শরবত ঢেলে দিয়েছিলেন যাতে পিঁপড়ে এসে শেকড় খেয়ে যায়। এই কাহিনির উল্লেখ এখানেও করলাম। গোটা উপন্যাসই সেই কাহিনির রূপক মাত্র, যেখানে বুদ্ধিবলে অন্য শত্রুদেরই ব্যবহার করা হয়েছে অন্য শত্রুদের শেষ করতে।
References:
1. T Ganapati Sāstri, Koutaliyam Arthaśā -stra – Śrimulākhyayā vyäkhyā, Rastriya Sanskrit Samsthan, New Delhi, Edition 2002, Part 1 and 2.
2. Vishakhadutta krit Mudrarakshasha (in Hindi), anubadak- Bharatbhusan Shri Bharatendu Harischandra, Ramnarayan Lal Publishers, 2006.
3. Parth Kumar Chaudhary, Dr Vasudev A Chate, Dr Shreevathsa. Insight into Kautilya Arthashastra with Perspective of Ayurveda, RGUHS Journal of AYUSH Sciences. 2022, Volume: 9, Issue: 1, Page no. 3৪-49, DOI:10.26715/rjas.9_1_2.
4. Sharda Hanumantrao et al: Poisoning in ancient India w.s.r. to Kautilya Arthashastra www.ijaar.in IJAAR VOLUME III ISSUE 1 MAR-APR 2017 page No:150-154.
5. GP Prasad, G Babu, G K Swami, Historical evidences on medicolegal autopsy and toxicological descriptions in Kautilya’s Arthasăstra, Bulletin of the Indian Institute of History of Medicine (Hyderabad), 36(2):167-76, 2006.
6. Prof (Dr) Veenus Jain, Vishkanya: The Poisonous Celibate, International Research Journal of Commerce Arts and Science, Volume ৪, Issue 4, 2017.
7. Sandhya Varadharajan, Forensics in Arthashastra, Sandhya’s Blog(http://sandhya.varadh.com/2020/03/forensics-in arthashastra.html).
৪. Indubala Kachhwa, Mithridatism- Story of a King who consumed poison to be safe, (https://www.linkedin.com/pulse/ mithridatismstory-king-who-consumed-poison-besafe-indubala-kachhawa)
9. Prateek Dasgupta, Visha Kanyas: The Deadly Cult of Poisonous Female Assassins (https://medium.com/teatime- history/visha-kanyas-the-deadly-cult-of-poisonous-female-assassins-3d3৪c7e0d3a9)
লেখক পরিচিতি
ড. অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী। ন্যানো ইলেকট্রনিক্সে পিএইচডি এবং কয়েক বছর বিদেশে গবেষণার পর বর্তমানে কলকাতার এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ইলেকট্রনিক্স বিভাগে অধ্যাপনার সাথে যুক্ত। কাজের ফাঁকে অল্প লেখা, অল্প ছবি আঁকা, এবং প্রচুর বই পড়ার জন্যে সময় বের করে নেন।
