১০.
সকালে ঘুম ভেঙে সৈনিকদের থেকে জীবসিদ্ধি জানতে পারল যে চাণক্য অনেকক্ষণ আগেই উঠে পড়েছেন। প্রাতঃকালীন পূজাপাঠ আদি সেরে তিনি মহলের সম্মুখে বারান্দার দিকে গিয়েছেন।
— আচার্যর সঙ্গে প্রহরী আছে?
প্রশ্ন করল জীবসিদ্ধি। তাকে আশ্বস্ত করে প্রহরী জানাল যে আচার্যর সঙ্গে একজন সৈনিক আছে।
কিছুটা স্বস্তিবোধ করল জীবসিদ্ধি। সে এখানে এসে থেকে কিছুতেই নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। ওর বার বার মনে হচ্ছে বিপদ লুকিয়ে ওদের জন্যে অপেক্ষা করছে। চাণক্যর প্রাণ সংশয় হওয়ার আশঙ্কা তার মাথায় সবসময় থাকে।
নিজের কাজকর্ম সেরে জীবসিদ্ধি মূল বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দেখল চাণক্য বারান্দার ধারে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে আশপাশ পর্যবেক্ষণ করছেন। জীবসিদ্ধি ইশারায় মগধের সৈনিকটিকে চলে যেতে বলল। সে থাকতে আলাদা অঙ্গরক্ষকের প্রয়োজন চাণক্যর পড়বে না।
.
— সুপ্রভাত, আচার্য।
তার দিকে চাণক্য ঘুরতে জীবসিদ্ধি দেখতে পেল চাণক্যর হাতে দু-টুকরো গুড়। একটুকরো জীবসিদ্ধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চাণক্য বললেন,
— সুপ্রভাত, জীবসিদ্ধি। এই নাও, আখের রস থেকে বানানো এই গুড়। খুব মধুর স্বাদের সঙ্গে একটা সুগন্ধও আছে। খাও, খাও।
— নাহ্। একদম না! এই সকাল সকাল ওই স্বাদ আমি সহ্য করতে পারব না। সবে কিছু ফল দিয়ে প্রাতরাশ সমাধা করেছি। আপনি কীভাবে যে সকালেই মধুরদ্রব্য খেতে পারেন তা আমার কাছে বরাবরের আশ্চর্য।
চাণক্য নাসিকা দিয়ে একটা ‘হুফফ’ জাতীয় শব্দ করে বললেন,
— জিভে মধুর স্বাদ না পেলে আমার মস্তিষ্ক কাজ করে না। তুমি কীভাবে যে এত কম মধুরদ্রব্য খেয়ে সুস্থ, স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা করো তা বিষ্ণু জানেন।
— ঠিক যেভাবে আর পাঁচটা মানুষ থাকে, সেভাবে।
— হুমম। সেইজন্যেই তারা চাণক্য নয়, বুঝলে হে, জীবসিদ্ধি।
তর্কে গুরুকে হারানো তার পক্ষে অসম্ভব জেনেই জীবসিদ্ধি প্রসঙ্গ পালটাল।
— এই ঠান্ডা সকালে এখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছেন আপনি, আচার্য?
আবার বারান্দা থেকে বাইরে ফিরে, দূরে চাইলেন চাণক্য। নাগর নগরীর শেষ সীমানায় দিগন্তরেখায় হিমালয় পর্বত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চাণক্য উদাস ভঙ্গিতে বললেন,
— প্রকৃতির অপরূপ শোভা দেখছি হে, জীবসিদ্ধি।
জীবসিদ্ধি হাসি চাপার ভঙ্গিতে মুখে হাত দিল। চাণক্য সেটা খেয়াল করে গলায় কপট রাগ ফুটিয়ে বললেন,
— হাসছ কেন? প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কি আমার বোধগম্যের ঊর্ধ্বে?
— নাহ্। ঠিক উলটো। আপনি তো এইসব সৌন্দর্য ইত্যাদির ঊর্ধ্বে। তাই আপনার শিষ্য হিসাবে এইটা বিশ্বাস করতে পারলাম না যে, এই শীতের সকালে আচার্য চাণক্য প্রাকৃতিক শোভা দেখতে খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। ক্ষমা করবেন। কী দেখছেন এখানে দাঁড়িয়ে, আচার্য?
চাণক্য এইবার গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন,
— মহারাজ সুবর্মা এই আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে শরবিদ্ধ হয়েছিলেন। নীচে ছিল একদল লোক, আর দুর্গের উঁচু প্রাচীরে দাঁড়িয়ে ছিল প্রহরীরা, কিছুটা করে তফাতে। ঠিক যেমন এখন দাঁড়িয়ে আছে।
জীবসিদ্ধিও এগিয়ে গিয়ে চাণক্যর পাশে দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখল সত্যিই উঁচু, চওড়া প্রাচীরের উপরে কিছুটা ব্যবধানে এক-একজন সৈনিক দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুটা গুড় ভেঙে মুখে দিয়ে চাণক্য বললেন,
— ধরে নেওয়া যেতে পারে উৎসবের দিন প্রহরী সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এবং, এই চারদিক প্রাচীর ঘেরা বড়ো প্রাঙ্গণে ছিল অনেক সাধারণ নাগরিক এবং সৈনিক। এবার, এই নীচে ভিড় করা মানুষদের মধ্যে থেকেই একজন আততায়ী হতে পারে, অথবা বাইরের জনপদ থেকে আসা প্রতিযোগীদের কেউও হত্যাকারী হতে পারে। আবার, এও হতে পারে যে, এই সৈনিকদের মধ্যেই কেউ হত্যাকারী। হয় এই প্রাচীরের উপর থেকে অথবা নীচের প্রাঙ্গণ থেকে কেউ তির নিক্ষেপ করেছে।
— সেই ক্ষেত্রে কিন্তু আমি বলব প্রাচীরের উপর থেকেই বাণ নিক্ষেপ করা সহজ এবং সেই সম্ভাবনাই বেশি। তা ছাড়া, এই এখনও দেখুন বেশিরভাগ সৈনিকই বল্লমসহ তির-ধনুক অস্ত্রে সজ্জিত দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীরে। দূর থেকে আগত শত্রুর উপর আক্রমণ করার জন্যে ধনুর্বাণই সবচেয়ে কার্যকরী। তাই প্রাচীরে প্রহরা দেওয়া সৈনিকদের হাতে ধনুর্বাণ থাকবেই। তাদেরই মধ্যে কেউ হত্যাকারী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
— হুম।
— তবে প্রাঙ্গণে সেইসময়ে একদল দক্ষ ধনুর্ধরও উপস্থিত ছিল, সেটাও ভুললে চলবে না। নীচ থেকে উপরের দিকে বাণ নিক্ষেপ তুলনামূলকভাবে কঠিন হলেও, একজন দক্ষ ধনুর্ধরের পক্ষে তা একেবারেই অসম্ভব নয়।
— আর সাধারণ নাগরিক? তাদের মধ্যে থেকে কেউ ছদ্মবেশী হত্যাকারী নয় কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছ?
— সাধারণ নাগরিকদের পক্ষে এই কাজ কীভাবে সম্ভব, আচার্য? একটি ছুরি বা সামান্য বিষ না-হয় কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা সম্ভব, কিন্তু একটা গোটা ধনুক কি কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা সম্ভব? প্রহরীদের চোখ এড়িয়ে কি একটা ধনুক আর বাণ নিয়ে এই মহলের প্রাঙ্গণে ঢোকা সম্ভব? কখনোই নয়।
শেষ গুড়ের অংশটাও মুখে দিয়ে চাণক্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— হুমম। সব যুক্তিই তো বুঝলাম, হে জীবসিদ্ধি। কিন্তু কোন জাদুবলে এতগুলো লোকের দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রাজার দিকে তির মারা সম্ভব সেটাই তো বুঝতে পারছি না। কোনো যুক্তিতেই যে এই প্রশ্নের উত্তর হয় না।
একটু ভেবে জীবসিদ্ধি বলল,
— প্রহরীরা নিশ্চয়ই প্রাচীরে দাঁড়িয়ে নীচের প্রাঙ্গণে খেলা দেখায় ব্যস্ত ছিল। এই অবস্থায় নীচে দাঁড়িয়ে থাকা কারুর পক্ষে সবার অলক্ষে ধনুকে বাণ চড়িয়ে সেটা নিক্ষেপ করা সত্যিই অসম্ভব। অতএব, আমার প্রথম যুক্তির দিকেই কিন্তু পাল্লা ভারী হচ্ছে, আচার্য।
— অর্থাৎ, তুমি বলতে চাইছ যে প্রাচীরে সেইসময়ে প্রহরায় থাকা সৈনিকদের মধ্যে থেকেই কেউ হত্যাকারী?
— হ্যাঁ। ভেবে দেখুন, সকল সৈনিক নীচে প্রাঙ্গণের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রতিযোগিতা, উৎসব দেখতে মগ্ন। সেই সুযোগে যদি কোনো একজন সৈনিক বাণ নিক্ষেপ করে, হয়তো তার পাশেরজনও টের পাবে না।
চাণক্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— জীবসিদ্ধি, এই মুহূর্তে প্রাচীরে কতজন প্রহরী আছে গুনে দেখো তো।
— ত্রিশজন। গুনে দেখেছি আগেই।
— বেশ। তাহলে উৎসবের দিন আরও বেশি সংখ্যক প্রহরী ছিল প্রাচীরে। অন্তত আরও কুড়িজন তো ছিল বলেই অনুমান। জিজ্ঞেস করলে সঠিক সংখ্যাটাও জেনে যাব সহজেই।
— হ্যাঁ, ঠিকই।
— তবে এবার বলো, যদি-বা এই নীচের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকশো মানুষের কথা বাদও দিই, ধরে নিই যে তাদের মধ্যে একজনও সেই মুহূর্তে উপরের দিকে দেখছিল না। তারপরেও প্রাচীরে সেই মুহূর্তে প্রহরায় থাকা পঞ্চাশ বা তারও বেশি সৈনিকদের মধ্যে কারুরই চোখে পড়ল না যে তাদেরই মধ্যে একজন ধনুকে বাণ চড়াল, সেটা বারান্দার দিকে তাগ করে নিশানা করল এবং তারপর শর নিক্ষেপ করল। অথচ একজন, মাত্র একজনও সেটা দেখতে পেল না? না হে জীবসিদ্ধি, এ হতেই পারে না।
.
জীবসিদ্ধি কোনো উত্তর দিতে পারল না। দু-জনই কিছুক্ষণ চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল। শেষে জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,
— আচ্ছা দর্শক, প্রতিযোগী ও সৈনিক বাদেও কিন্তু আরও দু-জন এই বারান্দাতেই উপস্থিত ছিল। তাদেরই মধ্যে কেউ, বা, হয়তো দু-জনই একসঙ্গে ষড় করে মহারাজকে হত্যা করেছে। হতে পারে না?
চাণক্য আনমনাভাবে নিজের বুকের উপর এসে পড়া কেশশিখায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,
— সে-সম্ভাবনাও আমি আগেই বিবেচনা করে দেখেছি। হ্যাঁ, চিত্রবর্মা যেহেতু যুবরাজ তাই তাঁর পক্ষে মন্ত্রীর সঙ্গে মিলে রাজাকে হত্যা করার সম্ভাবনা প্রবল। হত্যাকারী হিসাবে তাঁর উদ্দেশ্য বা হেতুও যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু এই বারান্দায় না থাকলেও, দরজার কাছে ও আশেপাশে কিন্তু অন্য প্রহরীরা ছিল। চিত্রবর্মা বা শ্রীশৈল ধনুক থেকে বাণ নিক্ষেপ করলে তারা কেউ-না-কেউ দেখতে পেতই।
জীবসিদ্ধি পেছন ঘুরে বারান্দায় ঢোকার দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
— যদি সেই দরজার কাছে দাঁড়ানো রাজার অঙ্গরক্ষকও এই হত্যাকাণ্ডে যুক্ত হয়? তাহলে?
— হুমম, কিন্তু তাহলেও কিছু সমস্যা থেকে যাচ্ছে। মনে রেখো রাজা সুবর্মা কণ্ঠে তিরবিদ্ধ হয়েছিলেন। সেইসময়ে তিনি এই বারান্দা থেকে প্রাঙ্গণের দিকে সামনে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন; এই আমাদের মতো। সকলেই দেখেছে তাঁকে এই অবস্থাতেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে। কিন্তু চিত্রবর্মা ও শ্রীশৈল এই বারান্দাতেই উপস্থিত থাকলেও তাঁরা কিন্তু ছিলেন মহারাজের পেছনে। অর্থাৎ, মহারাজ সুবর্মা তাঁদের দিকে পিঠ করে ছিলেন। তাই কোনোভাবেই তাঁদের কারুর পক্ষেই মহারাজের সম্মুখ থেকে কণ্ঠে আঘাত করা সম্ভব ছিল না। তবে তাঁরা নিজের হাতে হত্যা না করলেও, তাঁদের মধ্যে কেউ যে রাজাকে হত্যা করতে আততায়ী নিযুক্ত করেনি সেই সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
— ঠিকই। আমার ওদের দু-জনকেই খুব সন্দেহজনক লাগছে।
— তোমার আজকাল বিশ্বের তিন চতুর্থাংশ মানুষকেই সন্দেহজনক লাগে, জীবসিদ্ধি।
গুরুর বক্রোক্তি গায়ে মাখল না জীবসিদ্ধি। প্রাচীরের দিকে তাকিয়ে থাকল। প্রহরীদের পালাবদল হচ্ছে এখন। রাত্রি দু-প্রহর ধরে যারা প্রহরা দিয়েছে এখন তাদের বিশ্রাম, তাদের জায়গায় অন্য একদল প্রহরী আগামী দু-প্রহর প্রহরা দেবে।
জীবসিদ্ধি বলল,
— আজকে তাহলে আপনার পরিকল্পনা কী?
— ওই তিরন্দাজি প্রতিযোগীদের সঙ্গে আজকে কথা বলব। তাদের নিয়ে আসতে বলেছি মন্ত্রী শ্রীশৈলকে।
একটু ভেবে জীবসিদ্ধি বলল,
— আচ্ছা আচার্য, এমনও তো হতে পারে যে, কোনো এক দুর্ধর্ষ ধনুর্ধর এমন কোনো যান্ত্রিক ধনুক নির্মাণ করেছে যা আকারে ছোটো এবং যা দিয়ে সহজেই নিশানা করা যায়?
— হুমম।
— আপনার কী মনে হয়? এই হত্যাকারীই আমাদের কাঙ্ক্ষিত শকুনির সেই ধনুর্ধর? নাকি, অন্য কেউ এই একই ধরনের তির ব্যবহার করে আমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইছে?
একইভাবে উদাস ভঙ্গিতে দূরে হিমালয়ের দিকে তাকিয়েই চাণক্য উত্তর দিলেন,
— মোক্ষম প্রশ্ন, হে জীবসিদ্ধি। মোক্ষম প্রশ্ন।
১১.
গতকাল সারাদিন ভেবেছেন বৈদ্য চক্রাচার্য। একটা সম্ভাবনা গতকাল থেকেই তাঁকে কুরে খাচ্ছে। কিন্তু এখন আর সেটা নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় তাঁর হাতে ছিল না। কিন্তু এটার প্রমাণ কোনোভাবে পাওয়া গেলে বড়ো সুবিধা হত। আয়ুর-শাস্ত্র, শরীরবিদ্যা, শৈল-শাস্ত্রর বিস্তর পুস্তক তিনি পড়েছেন গতকাল। এবং, সবশেষে একটি উপায় তিনি পেয়েছেন। হ্যাঁ, একটা উপায় এখনও আছে।
এই সংশয়ের মীমাংসা একজনই করতে পারবেন। তাঁর কাছেই এখন তিনি। চলেছেন।
***
আরও একবার পত্রটি খুলে দিনের আলোয় মেলে ধরলেন রাজা সিন্ধুসেনা। তাঁর নিজের অক্ষরজ্ঞান নেই, তাই পত্র তিনি পাঠ করতে পারেন না। কিন্তু তাঁর প্রধান অমাত্য শিক্ষিত। তিনিই গতকাল রাত্রে তাঁকে এই পত্র পড়ে শুনিয়েছেন। এবং, তা শুনে গতরাত্রে মহারাজের ঘুম হয়নি।
এখন সকাল হতেই তিনি জরুরি পরামর্শ করতে নিজের দু-জন অমাত্যকে ডেকেছেন। নন্দর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন অমাত্য রাক্ষস কয়েক বার কিছু কাজে পত্র লিখেছিলেন মহারাজ সিন্ধুসেনার কাছে। প্রধানমন্ত্রীই গতকাল পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, সেই পুরোনো পত্র, দফতর থেকে খুঁজে বের করে যদি এই পত্রের সঙ্গে হাতের লেখা মেলানো যায়, তবে আর কোনো সন্দেহ থাকবে না। সেই কারণে এখন মহারাজ অপেক্ষা করে আছেন তাঁর দুই মন্ত্রীর। অধৈর্য ভঙ্গিতে কক্ষের মধ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছেন এবং মাঝে মাঝেই পত্রটি খুলে দেখছেন। যেন বার বার দেখলে তাঁর অক্ষরজ্ঞান হয়ে যাবে।
কক্ষে প্রবেশ করলেন দুই অমাত্য। তাঁদের হাতে দুটি ভূর্জপত্র। দুইটিই জীর্ণ, তবে একটি অন্যটির তুলনায় নতুন।
— পেয়েছেন?
প্রশ্ন করলেন মহারাজ সিন্ধুসেনা। উত্তরে উপর-নীচ ঘাড় নেড়ে প্রধানামাত্য জানালেন,
— হ্যাঁ, মহারাজ। অনেক খুঁজে দুটি পত্র উদ্ধার করা গিয়েছে। একটি প্রায় অপাঠ্য কালি হালকা হয়ে গিয়ে। তবে দ্বিতীয়টির লেখা এখনও কিছুটা পড়া যায়।
জানলার পর্দা সরিয়ে দিলেন একজন অমাত্য এবং একটি মেজ আলোর কাছে রাখলেন। তিনটি ভূর্জপত্র পাশাপাশি রেখে বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে দু-জন অমাত্য পরীক্ষা করলেন।
— কী বুঝলেন?
— এই লেখা অমাত্য রাক্ষসেরই।
সিন্ধুসেনার প্রশ্নের উত্তরে জানালেন প্রধানামাত্য। রাজা সিন্ধুসেনা নির্দেশ দিলেন,
— পত্রটি আরও একবার পাঠ করুন তো, শুনি।
হালকা কেশে গলা পরিষ্কার করে প্রধানামাত্য পড়তে শুরু করলেন,
মহারাজ সিন্ধুসেনা,
প্রথমেই অনুরোধ করব যে, এই পত্র অতি গোপন বিবেচনা করবেন এবং পত্রপাঠ এটি আগুনে নিক্ষেপ করবেন।
এই পত্র বহু পূর্বেই আপনাকে লেখার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু গত এক বছর চাণক্যর উপস্থিতিতে তা সম্ভব হয়নি। তবে এই সময়ের মধ্যে আমি তাঁর মনে নিজের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস রোপণ করতে সক্ষম হয়েছি। এবং, অবশেষে তিনি আমার হাতে পাটলিপুত্রর দায়িত্ব দিয়ে মগধ ছেড়ে বেরিয়েছেন কয়েক দিন পূর্বে।
এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলাম আমি এতদিন। প্রতিহিংসার সময় আসন্ন এবং আমি বিশ্বাস করি এই কাজে পূর্বের মতোই আপনাকে পাশে পাব। মগধের সিংহাসনে আমি আপনাকে অধিষ্ঠিত করার সংকল্পে ব্রতী হয়েছি। চাণক্যর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়েই সিংহাসন দখল করতে হবে মহারাজ… না না, সম্রাট সিন্ধুসেনা। মগধের সেনার একটি বড়ো অংশ এই মুহূর্তে পাটলিপুত্রতে নেই। আপনি নিশ্চয়ই জানেন তারা চাণক্যর সঙ্গে কুলুতের পথে রয়েছে। অতএব, এটাই আমাদের সুবর্ণ সুযোগ। তাই অবিলম্বে এই পত্রের উত্তর আপনি আমার বিশ্বস্ত দূত নিপুণকের মাধ্যমে আমাকে প্রেরণ করবেন।
কিন্তু সাবধান, এই পত্রে কোথাও পরিচিত কারুর নাম ব্যবহার করবেন না। আপনার উত্তরে এইরূপ গূঢ়লেখ রীতি অবলম্বন করবেন:
চন্দ্রগুপ্ত – রাহু
চাণক্য – কেতু
মগধ – পর্বত
পাটলিপুত্র – নগর
মগধ সেনায় আমার বিশ্বস্ত সেনাপ্রধান ভদ্রকেতু – গৃধ্র
আপনি – সমুদ্র
আমি – দানব
.
নগরে প্রবেশ করতে পর্বত আরোহণ কবে করতে চান?
রাহু আর কেতুর কী হবে? রাহুকে বন্দি করলেও কেতুকে হত্যা করা
প্রয়োজন। আপনার কী মত?
কত সৈন্যবল নিয়ে আপনি পর্বতে আসবেন?
গৃধ্র আমাদের সঙ্গে আছে, সে বিশ্বাসঘাতকতা করবে রাজার সঙ্গে। আমার নির্দেশে, আপনার জন্যে সে-ই তিথিতে রাজধানীর দ্বার খুলে দেবে আপনার সেনার প্রবেশের সুবিধার্থে।
উত্তর সংক্ষিপ্ত এবং সাংকেতিক শব্দ ব্যবহারে দেবেন, যাতে এই পত্র না থাকলে আপনার উত্তরের মর্মোদ্ধার অসম্ভব হয়।
জয় হোক।
ইতি,
দানব।
পত্রের শেষে অমাত্য রাক্ষসের নিজের অঙ্গুরীয় মুদ্রার সিলমোহর জ্বলজ্বল করছে।
পত্রটি ইতিপূর্বে অনেকবার শুনেছেন রাজা সিন্ধুসেনা। তিনি পত্রের উত্তর মোটামুটি ভেবেই রেখেছিলেন সারারাতে। তিনি ইতিমধ্যেই নিজেকে বেশ কয়েক বার মগধের সিংহাসনে সম্রাটরূপে কল্পনা করে ফেলেছেন।
ওই নপুংসক মলয়কেতু আর তার নতুন গুরু শকুনিকে একদমই পছন্দ হয়নি সিন্ধুসেনার। ওই দুষ্ট ব্রাহ্মণের এত বড়ো স্পর্ধা যে তাঁকে হুমকি দেয়? বীর সিন্ধুসেনাকে? এইবার সময় এসেছে তাঁর নিজের উত্থানের।
বজ্রের মতো গমগমে স্বরে মহামাত্যকে নির্দেশ দিলেন,
— লিখুন!
প্রধান-অমাত্য দ্রুত ভূর্জপত্র বের করে, কলম কালিতে ডুবিয়ে লিখতে শুরু করলেন।
মহামতি দানব,
সাগরের প্রণাম নেবেন। আপনার প্রস্তাবে আমি সম্মত। এটাই আমাদের সুযোগ।
পর্বত আরোহণ করে পনেরো দিন পরের অমাবস্যার রাত্রে আমি নগর পৌঁছাতে পারব। আমার সম্পূর্ণ সেনা আমার সঙ্গে থাকবে।
রাহু ও কেতু দু-জনকে হত্যা করাই শ্রেয়। কেতু এখন কুলুতের রাজমহলে আছে। তাকে আমি সেখানেই গুপ্তহস্তা ব্যবহারে হত্যা করব।
রাহুর পরিণামও একই হবে।
গৃধ্র আপনার হাতে এবং আসলে আমাদের সমর্থনে আছে শুনে খুশি হয়েছি। সে দ্বার খুলে দিলে আমার কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। আপনি তাঁকে জানিয়ে রাখবেন এই অমাবস্যার তিথির কথা। একবার সেনা প্রবেশ করলেই সিংহাসন আমার…
(কথা থামিয়ে সিন্ধুসেনা বললেন,
— না। ‘আমার’ নয়। লেখো…)
একবার সেনা প্রবেশ করলেই সিংহাসন আমাদের। আপনি শুধু পাশে থাকবেন মহামতি।
ইতি,
সাগর।
কথা থামিয়ে দ্বিতীয় অমাত্যের উদ্দেশে মহারাজ বললেন,
— মদিরা!
ইঙ্গিত বুঝে অমাত্য নিজেই পানীয় ঢেলে পেয়ালা এগিয়ে দিলেন রাজার দিকে। একচুমুকে গোটা পেয়ালা শেষ করে সিন্ধুসেনা বললেন,
— সিলমোহর এনেছেন?
আমতা আমতা করে প্রধানামাত্য বললেন,
— যদি অভয় দেন তো একটা কথা বলি?
— বলুন।
— এ যে বড়ো গভীর চক্রান্ত, মহারাজ? যদি সাংকেতিক ভাষাতেই নিজের নাম লেখা হয়, তবে আর রাজমুদ্রার ছাপ দেওয়ার কী প্রয়োজন? আপনি নিশ্চিত তো যে, আপনি এই উত্তর দিতে চান?
ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল সিন্ধুসেনার। বললেন,
— হ্যাঁ হ্যাঁ! আমি নিশ্চিত। সুযোগ মানুষের জীবনে একবারই আসে মন্ত্রী এবং যে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারে না, সে মূর্খ। আজকে যদি ভয় পেয়ে পিছিয়ে এসে আমি মগধ শাসনের সুযোগ হাতছাড়া করি, তবে ভবিষ্যতে ইতিহাস আমায় হাসির পাত্র হিসাবে চিহ্নিত করবে। রাজমুদ্রার ছাপ দেওয়ার প্রয়োজন কারণ অন্যথায় প্রাপক নিশ্চিত হতে পারবে না যে, প্রেরক আসল ব্যক্তি। যেমন এই পত্রে অমাত্য রাক্ষসের মুদ্রাচিহ্ন না থাকলে আমি নিশ্চিত হতাম না যে, এটি বাস্তবে রাক্ষসেরই লেখা। তা ছাড়া এই পত্রে তো কারুরই নাম বা স্থান উল্লেখ থাকছে না। একমাত্র রাক্ষসের এই পত্র ছাড়া আমার এই লেখার কোনো কোনো তৃতীয় ব্যক্তি ব্যাখ্যা করতে পারবে না।
কথার মাঝেই দুটি পাথর ঠুকে একটি প্রদীপ ধরিয়ে ফেলেছিলেন সিন্ধুসেনা। কথা শেষ করেই অমাত্য রাক্ষসের পত্রটি তিনি আগুনের উপর রাখলেন। দেখতে দেখতে পুরো ভূর্জপত্রটি ছাই আর ধোঁয়া হল।
রাজা সিন্ধুসেনার চোখে তখন প্রদীপের শিখা ছায়া ফেলছে। সেই আগুনে মগধ গ্রাস করার স্বপ্ন তাঁর দু-চোখের মণিতে।
পত্রটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হতে তিনি ফিরলেন তাঁর দুই বিশ্বস্ত অনাত্যর দিকে। পত্র এবং সিলমোহরের সরঞ্জাম এগিয়ে দিলেন প্রধানামাত্য। নিজের ডান হাতের অনামিকার অঙ্গুরি দিয়ে পত্রের শেষে নিজের সিলমোহরের ছাপ এঁকে দিলেন মহারাজ সিন্ধুসেনা।
এবং, সেইসঙ্গেই শুরু হল এক গভীর ষড়যন্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ।
১২.
জীবসিদ্ধি কক্ষের বাইরে অপেক্ষায় থাকা শেষ সৈনিকটিকে ভেতরে ডাকল,
— ভেতরে এসো।
মহারাজ সুবর্মার মৃত্যুর মুহূর্তে উপস্থিত তাঁর পাঁচ অঙ্গরক্ষকদের মধ্যে চারজনকে ইতিমধ্যে একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন চাণক্য। রাজার মৃত্যুসংবাদ যে কয়েক জন মানুষমাত্র জানে তাদের মধ্যে এই পাঁচ দেহরক্ষীও আছে যারা রাজার অত্যন্ত বিশ্বস্ত।
সৈনিকটি ঢুকে চাণক্যকে প্রণাম জানাল। চাণক্য প্রশ্ন করলেন,
— তোমার নাম?
— শূদ্রক।
মহারাজের মৃত্যুর সময়ে তুমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলে?
— হ্যাঁ, আচার্য।
— রাজার মৃত্যুর সংবাদ তুমি কাউকে জানিয়েছ?
— না, আচার্য। এমনকী আমি নিজের স্ত্রীকেও এ বিষয়ে কিছুই বলিনি।
— হুমম। সেইদিন কী ঘটেছিল তোমার মুখে শুনতে চাই।
দেখা গেল এই সৈনিকটি মোটেই গুছিয়ে বলতে পারে না। কথার মাঝে অন্য কথায় চলে যায়। তবে তার এই কথাবার্তা থেকে যেটুকু জানা গেল তা আগের চারজনের বক্তব্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
তারা প্রত্যেকেই বারান্দার দ্বারের কাছে পাহারায় দাঁড়িয়ে ছিল। উৎসব পুরোমাত্রায় চলছিল এবং তিরন্দাজি ও মল্লযুদ্ধ প্রতিযোগিতা নিয়ে সকলেই উত্তেজিত ছিল। হঠাৎই তারা দেখল মহারাজ ঢলে পড়লেন মেঝেতে। মহারাজের কাছে গিয়ে তারা দেখল যে মহারাজ তিরবিদ্ধ হয়েছেন। যুবরাজ চিত্রবর্মা সঙ্গেসঙ্গেই বৈদ্যকে ডেকে আনতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তিরবিদ্ধ হওয়ার মাত্র। কিছুক্ষণের মধ্যেই মহারাজ সুবর্মা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
মহারাজকে আহত হয়ে পড়ে যেতে দেখতে পেয়েছিল নীচে প্রাঙ্গণে উপস্থিত অনেকেই। তাই সেইসময়ে সকলে উৎসব থামিয়ে দেয়।
সেইমুহূর্তে মহামন্ত্রী শ্রীশৈলর নির্দেশে প্রাসাদের দ্বার বন্ধ করা হয় এবং প্রাঙ্গণে উপস্থিত সকল জনতা ও প্রতিযোগীর তল্লাশি নেওয়া হয়। জানানো হয় যে, মহারাজ আহত হয়েছেন তিরের আঘাতে। কেউ মহারাজের দিকে কাউকে বাণ নিক্ষেপ করতে দেখেছে কি না সেটাও জিজ্ঞেস করা হয়।
সকলেই ভেবেছিল যে, সহজেই হত্যাকারীকে ধরা যাবে। কারণ এতজন লোকের মধ্যে কেউ মহারাজের দিকে বাণ চালাবে আর কেউ দেখতে পাবে না, এটা হতেই পারে না। কেউ-না-কেউ নিশ্চয়ই দেখেছে আততায়ীকে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে কেউই এগিয়ে এল না। কেউই দেখেনি হত্যাকারীকে। অথচ আঘাত লাগার সময়ে মহারাজ প্রাঙ্গণের দিকে মুখ করেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। অতএব, হত্যাকারী নিঃসন্দেহেই সামনের দিক থেকে ধনুক থেকে বাণ চালিয়েছে।
সন্ধ্যা হয়ে যায় সকলের তল্লাশি নিতে নিতে। এরপরেও হত্যাকারীর সন্ধান না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই সকলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শুধু ভিনরাজ্যের প্রতিযোগীদের অতিথিশালে রাখা হয়।
.
মোটামুটি এই একই কথা সকলেই জানিয়েছে। জীবসিদ্ধি চাণক্যর মুখ দেখেই অনুমান করতে পারছে যে আচার্য হতাশ হচ্ছেন। পাঁচজন সৈনিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেও নতুন কোনো তথ্যই সামনে আসেনি। কোনো সূত্রই পাওয়া যায়নি।
পঞ্চমজনও চাণক্যর কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে চাণক্য জীবসিদ্ধির দিকে তাকিয়ে শুধু হতাশ ভঙ্গিতে দুদিকে ঘাড় নাড়লেন।
— চিত্রবর্মা ও শ্রীশৈলর কাছে যেটুকু আমরা জেনেছি, সৈনিকরাও এর বেশি কিছুই জানাতে পারল না। সকলেই একই কথা বলছে।
জীবসিদ্ধি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— আচার্য আমার মস্তিষ্কে একটা সম্ভাবনা আসছে।
চাণক্য মিষ্টি ঘোলের শরবতের পেয়ালায় একচুমুক দিয়ে জানতে চাইলেন,
— হুমম। শুনি, কী সম্ভাবনা?
— গোটা ব্যাপারটাই অসম্ভব। আমার মনে হয় এই চিত্রবর্মা ও শ্রীশৈল মিলেই মহারাজ সুবর্মাকে হত্যা করেছে। এবং, এই চক্রান্তে মহারাজের পাঁচ অঙ্গরক্ষকও জড়িত। তাই হত্যাকাণ্ডর সময়ে বারান্দায় উপস্থিত সকলেই একই কথা বলছে। চাণক্য কয়েক মুহূর্ত উত্তর না দিয়ে নিঃশব্দে শরবত পান করলেন। পেয়ালা
অর্ধেক খালি করে নামিয়ে রেখে বললেন,
— হুমম। তুমি বলতে চাইছ যে, এই পাঁচ সৈনিক শেখানো বুলি আমাদের বলে গেল?
— হ্যাঁ, আচার্য।
— শোনো জীবসিদ্ধি, গুছিয়ে মিথ্যা বলাটা কিন্তু সহজ কাজ না। তুমি বা তোমার মতো গুপ্তচরবৃত্তির মানুষরা মিথ্যা কথা বলতে, পরিচয় গোপন রাখতে যতটা অভ্যস্ত, সাধারণ অপরাধী কিন্তু মোটেই তা হয় না। গুছিয়ে মিথ্যে বলতে গেলে হয় কোথাও-না-কোথাও ভুল হবে, অথবা, প্রত্যেকে হুবহু একই বয়ান দেবে। মানে, তাদের ব্যবহৃত শব্দও কিছু ক্ষেত্রে মিলে যাবে। এদের পাঁচজনের ক্ষেত্রে কিন্তু তা ঘটেনি। এই যে শেষের জন, একদমই গুছিয়ে কথা বলতে পারে না। প্রয়োজনীয় কথার মাঝে অনেক অপ্রয়োজনীয় কথা বলে ফেলেছিল। যদি গোটা ঘটনা মুখস্থ করে এসে বলত তাহলে এটা কখনোই হত না। সে নির্দ্বিধায়, একবারও কথার মাঝে দিগভ্রষ্ট না হয়ে অবলীলায় সাজিয়ে-গুছিয়ে বয়ান দিয়ে যেত।
অঙ্গবস্ত্র পরিপাটি করতে করতে চাণক্য আবার বললেন,
— এরপর আবারও আমি শরীরী ভাষায় আসব। কথা বলতে গিয়ে বার বার গলা শুকিয়ে যাওয়া, চোখে চোখ রেখে কথা না বলা, বার বার মাথায় বা শরীরের কোনো অংশে হাত দেওয়া, এগুলো অপরাধীর লক্ষণ জানবে। এদের পাঁচজনের ক্ষেত্রে এরকম কিছুই লক্ষ করিনি। না হে জীবসিদ্ধি, এরা কাল্পনিক কোনো দৃশ্য বর্ণনা করেনি। এরা নিজের চাক্ষুষ করা একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছে নিজেদের মতো করে। এরা মিথ্যা বলেনি।
পেয়ালা পুনরায় তুলে নিয়ে এক চুমুক শরবত গলা দিয়ে নামিয়ে চাণক্য বললেন,
— তা ছাড়া ভুলে যেয়ো না অনেকেই মহারাজকে তিরবিদ্ধ হয়ে বারান্দার মেঝেতে পড়ে যেতে দেখেছে।
জীবসিদ্ধি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সে বাধা পেল। কারণ কেউ কক্ষের দ্বারে আঘাত করছে। আওয়াজ শুনে জীবসিদ্ধি অনুমান করতে পারছে যে, বাইরের ব্যক্তিটি যে-ই হোক সে উত্তেজিত। জীবসিদ্ধি উঠে গিয়ে দ্বার খুলে দিতেই কক্ষে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লেন মহামাত্য শ্রীশৈল,
— আচার্য!
— বলুন, আর্য? আপনি এত উত্তেজিত কেন? কী হয়েছে?
— বৈদ্য… মানে রাজবৈদ্য চক্রাচার্যকে কেউ হত্যা করেছে।
১৩.
মৃতদেহ ঘিরে লোকজন জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক জন কুলূতের সৈনিক তাদের দূরে রেখেছে মৃতদেহর থেকে
এখন সন্ধ্যা হয় হয়। ধুলোমাখা কাঁচা রাস্তার ধারে পড়ে আছে বৈদ্য চক্রাচার্যর মৃতদেহ। তাঁর বুকের বামদিকে একটি গভীর ক্ষত, রক্ত জমে আছে সেখানে। তরবারি বা বড়ো ছুরি ধরনের কিছু দিয়ে হত্যা করা হয়েছে তা এই ক্ষত দেখলেই বোঝা যায়। খোলা চোখের মৃত দৃষ্টিতে এখনও বিস্ময় লেগে আছে। যেন তিনি এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে, তিনি মৃত।
চাণক্য মৃতদেহর পাশে মাটিতে হাঁটু রেখে বসে ক্ষত পরীক্ষা করছেন। জীবসিদ্ধি সন্দিদ্ধ দৃষ্টিতে ভিড় করা লোকেদের দিকে দেখছে। সে অবশ্য মুখ ঢেকে এসেছে। কারণ সাধারণ মানুষ তাকে দেখে ফেললে রাজা সুবর্মার সঙ্গে তার চেহারার মিল পেতে পারে। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় সমস্যা হবে। জীবসিদ্ধি মনে মনে ভাবছে যে, এদের মধ্যেই কেউ খুনি নয় তো? চাণক্য বলেন অপরাধীদের মধ্যে সাধারণত অপরাধস্থলে ফিরে আসার একটা প্রবণতা দেখা যায়।
উঠে দাঁড়িয়ে চাণক্য একবার আশেপাশে দেখে নিয়ে বললেন,
— জায়গাটা নির্জন। কে মৃতদেহ প্রথম দেখেছে?
সৈনিক এক কৃষককে সামনের দিকে ঠেলে দিল।
— আজ্ঞে আমি, ব্রাহ্মণদেব।
— কখন?
— এই তো, বিকেলের দিকে খেত থেকে ফিরছিলাম। তখনই দেখলাম রাস্তার ধারে কেউ শুয়ে আছে। প্রথমে ভাবলাম কেউ মদিরার নেশায় চুর হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু কাছে যেতেই রক্ত দেখতে পেলাম। আমি গিয়ে টহলদার সৈনিকদের ডেকে আনলাম।
— আর কেউ ছিল আশেপাশে?
— নাহ্। কেউ না।
— হুমম। তুমি আসতে পারো।
সৈনিকদের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিয়ে চাণক্য রাজমহলে ফেরার পথ ধরলেন। আচার্যর পাশে জীবসিদ্ধি এবং খানিকটা তফাতে মগধের দু-জন সৈনিক হাঁটছে।
চাণক্যর কপালে ভ্রূকুটি বলে দিচ্ছে যে, তিনি কিছু ভাবছেন। জীবসিদ্ধি জিজ্ঞেস করল,
— কী বুঝলেন, আচার্য? বৈদ্যর মৃত্যু কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
— মৃতদেহর শরীরের থেকে স্বর্ণ আভরণ খুলে ফেলা হয়েছে তা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ?
— হ্যাঁ, তবে কি এটা কোনো দস্যুর কাজ?
— আপাতদৃষ্টিতে তো তাই মনে হয়। নির্জন স্থানে দস্যুরা ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করে বটে। কিন্তু…
— কিন্তু?
— কিন্তু দস্যুরা এমন নির্জন স্থানেই শিকার খোঁজে যেখানে ধনী শিকার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বা, যেসব সড়কে বণিকদের যাতায়াত থাকে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলের আশেপাশের শুধুমাত্র সামান্য চাষের জমি আর রুক্ষ পাহাড়ি পাথর বাদে কিছুই নেই। সেখানে দস্যু কেন থাকবে?
— হতে পারে ব্যাপারটা কাকতালীয়। কপালদোষে বৈদ্য ভুল সময়ে ভুল স্থানে উপস্থিত ছিল।
— ‘কাকতালীয়’ ব্যাপারটায় আমি ঠিক বিশ্বাসী নই, জীবসিদ্ধি। খুঁজলে দেখবে পৃথিবীর বেশিরভাগ ঘটনাই বিশেষ কারণে ঘটে।
— তাহলে আপনি বলছেন চক্রাচার্যর হত্যার সঙ্গে মহারাজ সুবর্মার হত্যার সম্পর্ক আছে?
— চাণক্য চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা থেকে নেমে আশা কেশশিখায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— গতকালই বৈদ্য আমার সঙ্গে কথা বললেন আর আজকে তাঁকে হত্যা করা হল। এই দুটো ঘটনাকে কি উপেক্ষা করা যায়?
— কিন্তু কেন? মানে, হঠাৎ বৈদ্যকে হত্যা করার কী কারণ থাকতে পারে?
— সেই প্রশ্নের উত্তর জানলে সম্ভবত আমরা মহারাজের হত্যারহস্যেরও সমাধান পেয়ে যেতাম। গতকাল মহারাজের মৃতদেহ পরীক্ষা করে যা যা সিদ্ধান্তে তিনি পৌঁছাতে পেরেছিলেন তা সবই আমাদের সবিস্তার বলেছেন। এরপর কি তবে কিছু বাকি থেকে গিয়েছিল? বা, হতে পারে আমার সঙ্গে আলোচনার ফলে তাঁর কিছু মনে পড়ে গিয়েছিল যা তিনি আমায় বলতে চাইছিলেন। কিন্তু, সেটা কী হতে পারে?
— বৈদ্যর স্ত্রী আছে শুনলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে কিছু জানা যেতে পারে। হয়তো তাঁকে কিছু বলেছিলেন বৈদ্য।
— হুম। কালকে ওঁকে প্রশ্ন করতে হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাঁরও জীবন সংশয় থেকে যায়। ওহে জীবসিদ্ধি, মন্ত্রী শ্রীশৈলকে বলে বৈদ্য চক্রাচার্যর স্ত্রীর সুরক্ষায় দু-জন প্রহরী নিযুক্ত করতে বলে দিয়ো।
— বেশ। আর কিছু?
— একটা প্রশ্ন ভাবাচ্ছে।
— কী প্রশ্ন, আচার্য?
— হত্যাকারী বৈদ্যকে হত্যা করে, সেই অস্ত্রটি সঙ্গে নিয়ে গেল কেন? তুমি কি বৈদ্যর অঙ্গবস্ত্রে রক্তের দাগগুলো ভালোভাবে লক্ষ করেছিলে? রক্তের দাগ দেখে বোঝা যায় তরবারি বা ছুরিটা হত্যাকারী ক্ষতস্থান থেকে টেনে বের করে মৃতদেহর শরীরের কাপড়ে ভালোভাবে মুছে নিয়েছে। হত্যাকারীর এতটা কষ্ট করার প্রয়োজন কী থাকতে পারে? তার পক্ষে অস্ত্রটি হত্যাস্থলে ত্যাগ করাটাই সহজ নয় কি?
মহলের প্রাঙ্গণে ততক্ষণে তারা প্রবেশ করেছে। দু-জন প্রহরী তাদের জন্যে দ্বার খুলে দিল। ভেতরে প্রবেশ করতে জীবসিদ্ধি কিছুটা ভেবে বলল,
— অনেকের ক্ষেত্রেই তার নিজস্ব অস্ত্রের প্রতি টান থাকে। যেমন, আমার নিজের এই ছোটো তরবারিটি। এটি আমি বিশেষভাবে অনেক বছর আগে বানিয়েছিলাম। এটি কাপড়ের ভাঁজে সহজেই লুকিয়েও রাখা যায়, আবার সাধারণ ছুরির চেয়ে ভারী ও বড়ো হওয়ায় অসিযুদ্ধেও যথেষ্ট কার্যকরী। অতএব, এই তরবারিটি আমি হাতছাড়া করতে চাইব না।
— হুমম।
.
— আচার্য! আৰ্য জীবসিদ্ধি!
অমাত্য শ্রীশৈলর ডাকে দু-জনই তাঁর দিকে চাইলেন। অমাত্যর সঙ্গে আরও এক ব্যক্তি রয়েছে। অমাত্য বলল,
— কুলুতের দিকে এগিয়ে আসা সেনাদের সেনাপতি দূত মারফত আপনাদের জন্যে পত্র পাঠিয়েছে।
অন্য লোকটি প্রণাম করে নিজের পরিচয়পত্র এগিয়ে দিল জীবসিদ্ধির দিকে। লোকটি সাধারণ পোশাকে থাকলেও সে মগধের সৈনিক। পরিচয়পত্র খুঁটিয়ে দেখে নিশ্চিত হয়ে জীবসিদ্ধি সেটা ফেরত দিল লোকটিকে।
লোকটি পরিচয়পত্র রেখে দ্বিতীয় ভূর্জপত্রটি এগিয়ে দিল চাণক্যর দিকে। কিন্তু চাণক্য সেটা নেওয়ার আগেই জীবসিদ্ধি পত্রটা নিয়ে সাবধানে সেটার ভাঁজ খুলে নিঃশব্দে পাঠ করল। জীবসিদ্ধির এরকম হঠাৎ উৎসাহে চাণক্য কিছুটা অবাক হলেও মুখে তা প্রকাশ করলেন না।
পাঠশেষে চাণক্যর দিকে এগিয়ে দিল। পত্র পাঠ করতে করতে চাণক্যর মুখ গম্ভীর হল। সৈনিকটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
— এটা সত্যি? তোমাদের চলার পথে পাহাড় ধস নেমে বন্ধ হয়ে গিয়েছে?
সৈনিকটি উত্তর দিল,
— হ্যাঁ, আচার্য। রাস্তার বেশিরভাগটাই ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছে পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথরের চাঁইয়ের ভারে। সেই পাথর ভেঙে ভেঙে পথ বের করতে চারদিন সময় লাগবে অন্তত। পুরো পথ প্রশস্ত না হলে বিশাল সেনা নিয়ে চলা অসম্ভব।
— অন্য কোনো পথ নেই?
— না, আচার্য। আপনি তো জানেনই, যে দ্বিতীয় পথ আছে যেটা ধরে আপনারা এসেছেন তাতে সম্পূর্ণ সেনার চলা অসম্ভব। অতএব, মগধের সেনা কুলূতে প্রবেশ করতে কয়েক দিন বেশি সময় লাগবে।
.
শ্রীশৈল এতক্ষণ তাদের কথা শুনছিলেন। এইবার তিনি অসহায় ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,
— সর্বনাশ! তাহলে কী হবে এবার, আচার্য? আর মাত্র ছ-দিন বাদেই কুলুতের প্রতিষ্ঠা দিবস!
মগধের সৈনিকটিকে ইশারায় জীবসিদ্ধি চলে যেতে বলল। সে আবারও তাদের অভিবাদন জানিয়ে বিদায় নিতে জীবসিদ্ধি বলল,
— অতএব আমাকে মহারাজের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেই হচ্ছে।
চাণক্য কিছু বললেন না। কিন্তু গোটা ব্যাপারটা তাঁর ভালো লাগছে না। কোথায় যেন তাঁর অস্বস্তি হচ্ছে।
.
চাণক্য ও জীবসিদ্ধি মহলের সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে এল। চাণক্যর কক্ষে ঢুকে জীবসিদ্ধি সাবধানে দ্বার আটকে দিয়ে বলল,
— আচার্য, পত্রটি আগে আগে আপনার থেকে নিয়ে নেওয়ার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী। আসলে পত্রটির ভাঁজ দেখাটা আমার জন্যে জরুরি ছিল।
জীবসিদ্ধির কথার ইঙ্গিত বুঝতে চাণক্যর একপলক সময় লাগল। উপলব্ধি করতে পেরে তিনি বললেন,
— ওহ্!
পত্রটা মেজের উপর মেলে ধরে প্রদীপের আলোয় দেখাল,
— এটি দেখুন। গুপ্তচরদের মাধ্যমে পাঠানো সমস্ত পত্রে একটি বিশেষ নিয়মের ভাঁজ থাকে। এই ভাঁজ করার নিয়মটা শুধুই প্রাপক ও প্রেরক জানে। এ ছাড়া উলটোদিকে দুটি কোণ সামান্য ছেঁড়া থাকে। এর কারণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।
— হুমম। যাতে পত্র যদি-বা মাঝপথে শত্রু বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তি খুলে পাঠ করে, প্রবল সম্ভাবনা যে পুনরায় সে একইভাবে ভূর্জপত্র ভাঁজ করবে না। সেক্ষেত্রে পত্র সঠিক প্রাপক হাতে পেলেই ভাঁজ দেখে বুঝতে পারবে যে, মাঝপথে তৃতীয় কেউ পত্র পাঠ করেছে কি না।
— একদম ঠিক। এ ছাড়া ভূর্জপত্রের সামান্য দুটি কোণ ছেঁড়া থাকাটা সন্দেহের উদ্রেক করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যদি-বা কোনো অতি সাবধানী শত্ৰু, পত্র বদলে দিয়ে একদম সঠিক ভাঁজ করে নকল পত্র পাঠায়। সেক্ষেত্রেও প্রাপক সহজেই বুঝতে পারবে যে পত্র পালটে দেওয়া হয়েছে কি না। কারণ নকল পত্রের কোণ ছেঁড়া থাকবে না।
চাণক্য কিছুক্ষণ চুপ করে শিষ্যের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, – ওহে জীবসিদ্ধি …
— বলুন, আচার্য?
— আমি অভিভূত
— সেকী? এইটুকুতেই মহামতি আচার্য চাণক্য তাঁর ছাত্রের প্রতি অভিভূত হয়ে গেলেন? অপেক্ষা করুন। আরও আছে।
জীবসিদ্ধি হেসে বলল,
— দুই কোণ ছেঁড়া থাকার এক মানে, এক কোণ ছেঁড়ার মানে আর এক উপরের কোণ ছেঁড়ার এক ইঙ্গিত, আবার নীচের কোণ ছেঁড়া থাকার ইঙ্গিত সম্পূর্ণ আলাদা। এই সমস্ত নিয়ম আমার নিজের বানানো এবং সমস্ত গুপ্তচরদের এই নিয়ম আমি শিখিয়েছি।
— তুমি যদি নিজের আচার্যর মুখ থেকে প্রশংসা শোনার জন্যে এগুলো বলে থাকো তাহলে তোমায় অমি নিরাশ করব না। কিন্তু আগে এটা বলো যে, এই পত্রের ভাঁজ আর ছেঁড়া দেখে কী বুঝলে?
— বুঝলাম যে, এটি মগধ সেনার সঙ্গে থাকা গূঢ়পুরুষের লেখা পত্র বটে। তবে পত্রের লেখা অর্ধসত্য।
— মানে?
পত্রটি চাণক্যর দিকে এগিয়ে দিয়ে জীবসিদ্ধি বলল,
— ঘ্রাণ নিয়ে দেখুন তো।
ভূর্জপত্রটি নিয়ে চাণক্য নাকের কাছে এনে চোখ বুজে ঘ্রাণ নিয়ে বললেন,
— দুধ জাতীয় কিছুর গন্ধ পেলাম যেন। খুবই হালকা যদিও।
— একদম ঠিক। যাক, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আপনার ইন্দ্রিয় তাহলে খারাপ হয়ে যায়নি।
ছাত্রের ইচ্ছাকৃত কটাক্ষের উত্তরে চাণক্য বললেন,
— শোনো হে জীবসিদ্ধি, আমার ইন্দ্রিয় তোমার চেয়ে এখনও এক-শো গুণ ধারালো।
গুরুর ছদ্মরাগ ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা করে অনেকটা জাদুকর যেভাবে তার জাদু দেখায় সেই ভঙ্গিতে পত্রের উলটোদিকটা প্রদীপের শিখার কাছে ধরতেই তাতে লেখা ফুটে উঠল,
‘পাহাড়ের ধস ইচ্ছাকৃত। কেউ আমাদের পথ আটকাতে চেয়েছে। গোপনে কয়েকশো সৈনিক, ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে, পাহাড়ি পথ ধরেছে। পাঁচদিনে তারা কুলূতের সীমানা পার করবে।’
পত্রটি চাণক্যর দিকে এগিয়ে দিয়ে জীবসিদ্ধি হেসে বলল,
— খাগের কলম দুধে ডুবিয়ে লিখলে, তা শুকিয়ে গেলে অদৃশ্য কালির কাজ করে। আপনার বোধ হয় জানা ছিল না, আচার্য?
.
চাণক্য কিছুক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
— ওহে, জীবসিদ্ধি…
— বলুন, আচার্য।
চাণক্যর ঠোঁটের কোণে হাসি। বললেন,
— তুমি কি জানো যে, তুমি শত্রুপক্ষর কাছে দিন দিন কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠছ?
গুরু-শিষ্য উভয়ে হেসে উঠলেন।
১৪.
নিপুণক একটি বড়ো বটগাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাই তুলে আরও একবার রাস্তার দিকে দেখল। ফাঁকা, পাথুরে প্রান্তর ছাড়া কিছুই চোখে পড়ল না ওর। তার মানে লোকটার আসতে দেরি হবে।
কোমরে বাঁধা পশু চামড়ার জলের আধারটা বের করে মুখে লাগিয়ে দু-ঢোঁক জল খেল। গাছের সঙ্গেই তার ঘোড়াটি বাঁধা আছে। ঘোড়াটাও তার স্বামীর মতোই ক্লান্ত। নিপুণক একবার ভাবল বসে পড়বে গাছের ছায়ায়। কিন্তু পরক্ষণেই সেই চিন্তা মাথা থেকে বের করে দিল। কারণ এখন গাছের তলায় বসলেই তার তন্দ্রা আসবে। ঘুমিয়ে পড়া চলবে না তার। তার কাছে এখন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে যা খুব সাবধানে জায়গামতো পৌঁছে দিতে হবে।
আনমনাভাবেই বুকের উপর হাত চলে গেল নিপুণকের। সেখানেই ওর অঙ্গবস্ত্রের গোপন একটি ভাঁজে সিন্ধুসেনার পত্রটি আছে। নিপুণক জানে এই ভূর্জপত্রের গুরুত্ব। এই সামান্য একটুকরো লেখার উপর গোটা আর্যাবর্তর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
আরও একবার রাস্তার দিকে তাকাতেই দূরে দুটি বিন্দু চোখে পড়ল। চোখের উপর হাত রেখে রোদ বাঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করল নিপুণক। হ্যাঁ, দুটো ঘোড়াই বটে। দুটি ঘোড়াই পিঠে দু-জন মানুষকে নিয়ে ছুটে আসছে তারই দিকে।
বেশ কিছুটা সময় লাগল দু-জন অশ্বারোহীর তার কাছে পৌঁছাতে। প্রথমে নেমে এল এক দীর্ঘাঙ্গ, বলিষ্ঠ পুরুষ। নিপুণকের পূর্ব পরিচিত। লোকটি নেমে নিঃশব্দে সামান্য মাথা নেড়ে অভিবাদন জানাল। তারপর দ্বিতীয় ব্যক্তিকে নেমে আসতে ইশারা করল। দ্বিতীয় লোকটি খর্বকায়, ইঁদুরমুখো। নিপুণক কিছুক্ষণ তাকে দেখে প্রথম ব্যক্তির উদ্দেশে প্রশ্ন করল,
— একে দিয়ে কাজ হবে? চিঠি পৌঁছে দিতে পারবে জায়গামতো?
উত্তরে প্রথমজন প্রায় চিৎকার করে বলল,
— নিশ্চয়ই পারবে। না পারলে আমি নিজে ওকে হত্যা করব।
ইঁদুরমুখো লোকটা কেঁপে উঠল। সে জানে যে, এই লোকটা সত্যি কথাই বলছে। নিপুণক ইঁদুরমুখোকে প্রশ্ন করল,
— তোমার নাম কী?
উত্তর প্রথম ব্যক্তি দিল,
— ও বোবা। কথা বলতে পারে না। ওর নাম রোচক। লিখতে পড়তেও পারে না, কানেও কম শোনে।
— ওহ্!
নিপুণক মনে মনে অমাত্য রাক্ষসের বুদ্ধির প্রশংসা করল। গোপন পত্রবাহক হিসাবে এর চেয়ে উপযুক্ত আর কেই-বা হতে পারে? যে পত্র পড়তে পারে না, শত্রুর হাতে ধরা পড়লেও কিছুই বলতে পারবে না।
লোকটা হাত নেড়ে কিছু বলল। নিপুণক জিজ্ঞেস করল,
— ও কী বলছে?
—ও জানতে চাইছে যে, কাজটা করলে ওর সাজা মুকুব হবে কি না।
— ওর সাজা কী ছিল?
— ধর্ষণের যা সাজা মগধে। মৃত্যুদণ্ড।*
— ওহ্!
— হেহে। জিভ কান বিকল হলেও বদমাশটার রস কম নয়।
নিপুণক রোচকের উদ্দেশে জোরে বলল,
— হ্যাঁ, চিঠি তুমি পার্বত্যক রাজ্য পার করিয়ে দিলেই তোমার সাজা আমরা ভুলে যাব। তুমি মুক্ত হয়ে যাবে।
বিশ্রীভাবে হাসল লোকটা। তার হাসি দেখে নিপুণকের মাথা থেকে পা অবধি জ্বলে গেল। তার এমনিতে ইচ্ছে করছে এখুনি এই কীটটাকে মেরে ফেলতে। কিন্তু মনের ইচ্ছা মনেই চেপে রেখে কাপড়ের গোপন ভাঁজ থেকে দুটি পত্র বের করে সেটা এগিয়ে দিল নিপুণক। আবার গলার স্বর তুলে প্রায় চেঁচিয়ে বলল,
— নাও। নিয়ে যাও এটা সাবধানে। এখনই রওনা দাও। আর মনে রেখো আমরা দু-জন কিন্তু গোপনে তোমার উপর নজর রাখব। যদি পালাবার চেষ্টা করো, বা, কোনো চালাকির চেষ্টা করো তবে…
কথায় না বলে নিপুণক একবার নিজের হাত কণ্ঠের এপাশ থেকে ওপাশ অবধি টেনে দেখাল। ইঙ্গিত স্পষ্ট।
ঘাড় নেড়ে রোচক ভূর্জপত্র দুটি নিজের কোমরের কাপড়ে গুঁজে নিয়ে ঘোড়ায় উঠে বসল। মাথা ঝুঁকিয়ে দু-জনকে অভিবাদন জানিয়ে মলয়কেতুর পার্বত্যক রাজ্যের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
—
*অর্থশাস্ত্রের আইন অনুযায়ী মৌর্য সাম্রাজ্যে ধর্ষণের সাজা ছিল মৃত্যুদণ্ড।
***
আছে রাজা মলয়কেতু। খেলার ছলে এক নারীর ঊর্ধ্বাঙ্গের অঙ্গবস্ত্র খুলে ফেলার চেষ্টা করছে রাজা। নারীটিও হেসে উপভোগ করছে এই ধরাছোঁয়ার খেলা।
গত কয়েক দিন হল শকুনি নেই। সে মাঝে মাঝেই কোথাও চলে যায় কয়েক দিনের জন্যে। মলয়কেতুকে কখনো বলে না কোথায় যাচ্ছে। তবে মলয়কেতুর সন্দেহ যে, ব্রাহ্মণ আশেপাশেরই কোনো রাজ্যে যায়। কারণ কয়েক দিনের মধ্যেই সে ফিরে আসে। একবার মলয়কেতু ভেবেছিল যে, ব্রাহ্মণটার পেছনে লোক লাগাবে, দেখবে কোথায় যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সে সাহস হয়নি তার।
শকুনি না থাকলেই মলয়কেতু সুখে থাকে। ওই লোকটার আশেপাশে মলয়কেতুর অস্বস্তি হয়। মলয়কেতুর বার বার মনে হয় যে, এই দুষ্ট ব্রাহ্মণ তাকে যথাযথ সম্মান দেয় না, ব্রাহ্মণ তাকে নির্বোধ ভাবে। শকুনি এমন হাবভাব করে যেন সে-ই রাজা। মলয়কেতুও সুযোগের অপেক্ষায় আছে। সে এমন কিছু ঠিকই একদিন করবে যাতে সকলে ওকে পুরুরাজের মতোই সম্মান ও সম্ভ্রমের চোখে দেখতে শুরু করবে।
তবে আপাতত ব্ৰাহ্মণ না থাকায় সে বিনোদনে ডুবে আছে। তার পাশের দুটি মেয়ের একজনেরও নাম তার মনে পড়ছে না যদিও, তবুও প্রেমিক-প্রেমিকার মতো আচরণ করছে। নাম জানার প্রয়োজনও নেই তার; রাজাদের সবার নাম জানার প্রয়োজন পড়ে না। এরকম অনেক নারী তার বিশেষ বিনোদনের জন্যে নিযুক্ত আছে। মলয়কেতু জানে যে, ফুলে যতদিন মধু আছে ততদিন মৌমাছির অভাব তার হবে না। তবে এই বিশেষ মেয়েটি বড্ড মোহময়। অদ্ভুত লাস্যময়ী তার শরীর, কামাতুর হাসি, চোখে মদিরার নেশা। গত কয়েক মাস ধরেই আছে তার মহলে। এর নামটা জানতে হবে ভাবল মলয়কেতু, যাতে পরেরবার প্রয়োজনে একে ডেকে নেওয়া যায়।
— তোমার নামটা কী যেন সুন্দরী?
— পদ্মা।
অন্য মেয়েটি হিংসার চোখে তাদের দেখছিল। কিন্তু মলয়কেতুর সেদিকে আর খেয়াল নেই। পদ্মা মেয়েটিকে মিষ্টি গলায় বলল,
— ওহ্ হ্যাঁ ভুলেই গিয়েছিলাম। তুমি সত্যিই পদ্মফুলের মতোই সুন্দর। কাছে এসো সুন্দরী।
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল,
— মহারাজ পদ্মা নামে কিন্তু এক নাগিনও ছিল। আমার ঠাকুমা গল্প বলত আমায়।
— বিষ তো বটেই। তোমার চোখেই তো বিষ যাতে আমি ডুবে যাচ্ছি সুন্দরী। মলয়কেতু মেয়েটিকে কাছে টেনে নিতে উদ্যত হচ্ছিল, তখনই তার প্রধানামাত্য কক্ষে প্রবেশ করল। মহারাজকে অনেকদিন পর আবার এরকম দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,
— মহারাজ মলয়কেতু, ক্ষমা করবেন আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে।
মলয়কেতু মুখ তুলে মন্ত্রীকে দেখে বিরক্ত হলেও মুখে তা প্রকাশ না করে বলল,
— না না, বিরক্ত কীসের, আর্য? মহারাজ মলয়কেতু সর্বদা দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। বলুন, কী প্রয়োজন?
মন্ত্রী ইশারা করল দুটি মেয়েকে কক্ষ ত্যাগ করতে। একটি ভূর্জপত্রের চিরকুট রাজার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মহামাত্য বললেন,
— খানিক আগেই একটি পারাবত মারফত এই পত্র এসেছে। আমার মনে হয় আপনার একবার এটি দেখা উচিত।
মলয়কেতু হাত বাড়িয়ে সেটি নিল।
মহারাজ মলয়কেতুর জয়,
আপনি যাদের মিত্র ভাবছেন তারাই বিশ্বাসঘাতক। পৌরব রাজ্য বিপন্ন এবং আপনারও জীবনহানি করার চেষ্টা করা হতে পারে। প্রমাণ চাইলে সেই ভিনদেশি পত্রবাহককে খুঁজুন যে আপনারই দেশের উপর দিয়ে আপনার শত্রুর পত্র নিয়ে আসছে।
ইতি,
আপনার এক শুভাকাঙ্ক্ষী।
মলয়কেতুর নেশার ঘোর পুরোপুরি কাটেনি। পত্রটি পড়ে ঠিক বুঝল না, তবে তার নিজের জীবন সংশয় হতে পারে এইটুকু সে বুঝতে পেরেছে। মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— এটা কী?
— বেনামি পত্র লিখে কেউ আপনাকে সাবধান করতে চেয়েছে, মহারাজ। আপনি আদেশ দিলে এই পত্রে লেখা কথার সত্যতা খতিয়ে দেখতে পারি।
— কীভাবে?
আমাদের রাজ্যে সত্যিই এই মুহূর্তে কোনো গুপ্তচর গোপন কোনো পত্র নিয়ে প্রবেশ করেছে কি না সেটা খুঁজে দেখতে পারি।
— হ্যাঁ, তাই করুন।
— যথা আজ্ঞা, মহারাজ।
অমাত্য বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই মলয়কেতু তাঁকে আর একবার ডাকল,
— মহামাত্য।
পিছু ফিরলেন তিনি,
— বলুন, মহারাজ।
— আপনার কী মনে হয়, এখানে কার ব্যাপারে আমাকে সাবধান করা হয়েছে? কে আমার মিত্র সেজে আমার রাজ্য দখল করার চেষ্টা করছে?
অমাত্য কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বললেন,
— জানি না, মহারাজ।
মলয়কেতু কয়েক মুহূর্ত মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— বেশ। আপনি আসতে পারেন।
মন্ত্রী বেরিয়ে গেল। প্রশ্নের উত্তরটা কেউই মুখে স্বীকার না করলেও মনের গভীরে দু-জনই উত্তরটা বোধ হয় জানে।
