শর-শাস্ত্র – ৩৫

৩৫.

পর্বত্যকা রাজ্য।

মলয়কেতু মহল থেকে তার সেনাবাহিনীর প্রস্তুতিপর্ব নিরীক্ষণ করছে। তার এককাঁধে আলতো করে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে পদ্মা। মলয়কেতু তাকে বলল,

— দেখো পদ্মে, দেখো এই হল পৌরবরাজের মহা পরাক্রমী সেনাবাহিনী। আমার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় কার সাহস আছে, পদ্মা? আমার বিরুদ্ধে যারা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করছে তাদের তৃণের ন্যায় পদদলিত করতে চলেছি আমি। তাদের সবার মিলিত সেনাবলও আমার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতা ধরে না।

পদ্মার চোখে দৃশ্যত প্রশংসা ফুটে উঠল মলয়কেতুর জন্যে। বলল,

— হ্যাঁ মহারাজ, আপনাকে হারানোর ক্ষমতা এই পঞ্চনদে কারুর নেই। কিন্তু …

— কিন্তু? কীসের সংশয় তোমার আমার প্রতি, পদ্মে?

— ক্ষমা করুন, মহারাজ। আপনার প্রতি আমার কোনো সংশয় নেই। যুদ্ধে আপনাকে আপনার শত্রুরা পরাজিত করতে পারবে না, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত। সঠিক নিয়মে যুদ্ধ হলে যুদ্ধক্ষেত্রে আপনি বিজয়ী হবেন, আমি জানি।

— তবে? তবে কীসের সংশয় তোমার মনে?

— যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ে নয়, আমি অন্দরের শত্রুকে নিয়ে ভাবছি।

মলয়কেতু পদ্মার হাত নিজের হাতে নিল। বলল,

— আমি বুঝেছি তুমি কার কথা বলছ। ওই আচার্য শকুনির দিকে তোমার ইঙ্গিত। আমার প্রমোদ আখেটে কোথায় যাওয়ার কথা ছিল সেই তথ্য মাত্র কয়েক জন জানত, যাদের মধ্যে শকুনি একজন। ও-ই যে সিন্ধুসেনাকে সে- তথ্য জানিয়েছে, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত। ওই দুষ্ট বিশ্বাসঘাতক ব্রাহ্মণকে আমি আমার ত্রিসীমানায় আর ঘেঁষতে দেব না। নিশ্চিন্তে থাকো।

— মহারাজ। ওই ব্রাহ্মণ গত এক বছর আপনার অন্দরমহলে নিত্য অবাধ যাতায়াত করেছে। আপনি কি মনে করেন সে আপনার সেনার বিষয়ে সকল তথ্য ইতিমধ্যে জেনে ফেলেনি? ওই দুষ্ট ব্রাহ্মণ নিঃসন্দেহে সেই সকল তথ্য সিন্ধুসেনা ও তার সঙ্গের কুচক্রীদের জানিয়ে দেবে যাতে তাদের এই যুদ্ধে সুবিধা হয়।

মনে আশঙ্কা দেখা দিল মলয়কেতুর। কথাটা মিথ্যা নয়। যুদ্ধে শত্রুর সেনাবাহিনীতে ঘোড়ার সংখ্যা, হাতির সংখ্যা, তিরন্দাজের সংখ্যা ইত্যাদি তথ্যের সঠিক হিসাব জানলে যুদ্ধে কোন রণনীতি অবলম্বন করা হবে তা স্থির করা সুবিধা হয়ে যায়। অনেক শক্তিশালী সেনাবাহিনীকেও শুধুমাত্র সঠিক রণনীতির সাহায্যে তার চেয়ে ঢের দুর্বল সেনার হাতে পরাজিত হতে হয়েছে এরকম উদাহরণ বহু আছে।

— তুমি কী করতে বলো তবে, পদ্মে?

পদ্মার মুখ গম্ভীর হল। বলল,

— তাকে আটকাতে হবে, মহারাজ। সম্ভবত এখনও ব্রাহ্মণ জানে না যে, আপনি তার ষড়যন্ত্রের কথা জেনে গিয়েছেন। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করুন, মহারাজ। ওই ব্রাহ্মণকে তথা তার দলে যোগ দেওয়া অন্যান্য রাজাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অছিলায় ডেকে পাঠান এখানে। এবং তারপর, সুযোগ বুঝে …

কথা শেষ করল না পদ্মা। কোমল এই মেয়েটাকে যত দেখছে ততই অবাক হচ্ছে মলয়কেতু। সেইসঙ্গে সে ততই দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করছে তার প্রতি। ডান হাত মুঠো করে মুখের সামনে ধরে মলয়কেতু বলল,

— ঠিক বলেছ! ওই বিশ্বাসঘাতক বিভীষণকে আগে সরাতে হবে।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে পদ্মা বলল,

— তাতে আরও একটি সুবিধা হবে, মহারাজ।

— কী সুবিধা?

— শুনেছি এই ব্রাহ্মণকে মগধ রাজদ্রোহী হিসাবে ঘোষণা করেছে। অতএব তার ছিন্ন মস্তক পেলে মগধরাজ প্রসন্ন হয়ে আপনাকে নিজের নিকটে পুনরায় স্থান দেবেন। এবং, কে বলতে পারে, হয়তো ভবিষ্যতে, উপযুক্ত সময়ে মগধরাজ চন্দ্রগুপ্তকে পথ থেকে সরিয়ে গোটা আর্যাবর্তর একচ্ছত্র অধিকার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগও আসতেই পারে। তাই নয় কি?

.

মলয়কেতু ও পদ্মা খেয়াল করল না যে, একজন ভৃত্য তাদের দৃষ্টির আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের সমস্ত আলোচনা শুনছিল। নিঃশব্দে সে সেই স্থান থেকে সরে গেল। এই সংবাদ তাকে যে করেই হোক আচার্য শকুনি অবধি পৌঁছাতে হবে!

***

পাটলিপুত্র, মগধ।

— প্রধানামাত্য মহোদয় সম্রাটের সাক্ষাৎ পেতে দ্বারে অপেক্ষারত।

সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত দ্বাররক্ষীর ঘোষণা শুনে বললেন,

— বিরাজ করুন, মহামাত্য।

কক্ষে প্রবেশ করলেন মহামাত্য রাক্ষস। মুখ তাঁর যথারীতি ভাবলেশহীন। প্রবেশ করে চন্দ্রগুপ্তকে অভিবাদন জানিয়ে তিনি বললেন,

২৪১

— মহারাজ। সময় আসন্ন।

চন্দ্রগুপ্ত সতর্ক হয়ে নড়েচড়ে বসলেন,

— নির্দেশ এসেছে? যাক! অবশেষে!

উত্তর না দিয়ে একটি পত্র তিনি এগিয়ে দিলেন সম্রাটের দিকে। চন্দ্রগুপ্ত সেই ভূর্জপত্র খুলে নিঃশব্দে পাঠ করলেন। তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। বললেন,

— আপনি তৈরি হতে বলুন। প্রস্তুতি দেখে নিন তাদের।

— সকলে প্রস্তুত, সম্রাট। আমি পূর্বেই তাদের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলাম পরিকল্পনা মতো। শুধু আদেশের অপেক্ষায় আছে।

— বেশ।

— কিন্তু সেনাপতি সিংহরণের অবর্তমানে তাদের নেতৃত্ব কে দেবে, সম্রাট? উত্তরে হেসে উঠল চন্দ্রগুপ্ত।

৩৬.

— আচার্য। আসতে পারি?

সকালের পূজা, প্রার্থনা শেষ করে ধ্যান করতে বসেছিলেন চাণক্য। জীবসিদ্ধির গলা পেয়ে তিনি চোখ খুললেন।

— হ্যাঁ। ভেতরে এসো হে, জীবসিদ্ধি।

জীবসিদ্ধি একা নয়, তার সঙ্গে শশাঙ্ক এবং অচেনা একটি যুবক প্রবেশ করল। নবাগত যুবকটি বিদেশি, টানা চোখ-মুখ, শরীরের বর্ণ দেখেই চাণক্য অনুমান করলেন এ নিশ্চয়ই বিধোরক। তাঁকে নির্ভুল প্রমাণ করে পরমুহূর্তে শশাঙ্ক পরিচয় করিয়ে দিল,

— আচার্য, এই হল বাবাক পুত্র বিধোরক।

চাণক্যকে প্রণাম জানাতে চাণক্য তাদের আসন দেখিয়ে দিলেন। চাণক্য লক্ষ করলেন যে, বিধোরক সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটে।

ছেলেটি বসে প্রথমেই চাণক্যকে প্রশ্ন করল,

— আমার পিতা কোথায়, আচার্য?

শশাঙ্ক বলল,

— উনি তোমার পিতাকে খুঁজে দেবেন বলেছি, বিধোরক। পিতা কোথায় আছে তা উনি জানেন এমন কথা বলিনি।

— ও।

কেমন যেন হতাশ হয়ে চুপ করে গেল যুবক। শশাঙ্ক পত্রতে ঠিকই লিখেছিল, যে, ছেলেটি মন্দবুদ্ধি, হাবাগোবা। মনে মনে ভাবল জীবসিদ্ধি।

চাণক্য বিধোরককে প্রশ্ন করলেন,

— তোমার কী মনে হয়? তোমার পিতা কোথায় আছেন?

মাথা না তুলেই বিধোরক উত্তর দিল,

— জানি না। হয়তো রাগ করে চলে গিয়েছে।

— রাগ?

— হ্যাঁ। আমি কাজ শিখতে পারিনি বলে বাবা আমার উপর রাগ করতেন। বলতেন আমি বোকা।

— আমার তা মনে হয় না, বিধোরক।

— তাহলে নিশ্চয়ই কেউ জোর করে নিয়ে গিয়েছে।

— কীভাবে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে বলে মনে হয়? তোমার গৃহের মধ্যে থেকে যে উনি নিখোঁজ হয়েছেন।

উত্তর না দিয়ে বসে থাকল সে। চাণক্য ফের প্রশ্ন করলেন,

— আচ্ছা, এই শঙ্কুমণি নামে যে ব্যক্তি তোমার পিতার কাছে আসত, তাকে দেখেছ নিশ্চয়ই? তাকে কেমন দেখতে মনে আছে?

— হ্যাঁ। দীর্ঘকায়, কাঁধ অবধি কেশ, বলিষ্ঠ যোদ্ধার মতো চেহারা তার। এদেশের মানুষ। কৃষ্ণবর্ণ, মধ্যবয়সি।

চাণক্য কিছুক্ষণ বিধোরকের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবলেন। শশাঙ্কর দিকে তাকিয়ে বললেন,

— নাহ্, ওকে প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই। ওকে গৃহে ফেরত পাঠাতে পারো।

শশাঙ্ক বিধোরককে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে কিছুক্ষণ বাদেই পুনরায় একা এসে ঢুকল তাঁবুতে। জীবসিদ্ধি এতক্ষণ চুপচাপ বসে অপেক্ষা করছিল। শশাঙ্ক ঢুকতে চাণক্যকে প্রশ্ন করল,

— আচার্য, বাবাকের কুটির একবার আপনি নিজে পর্যবেক্ষণ করলে ভালো হয় না? হতে পারে অন্যদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে কোনো গোপন দ্বারের প্রবেশপথ।

চাণক্য অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নিজের কেশশিখায় হাত বুলিয়ে উত্তর দিলেন,

— গুপ্ত পথ সুবিশাল দুর্গে থাকে হে, জীবসিদ্ধি। কোনো কুটিরে সাধারণত তা থাকে না। আর থাকলেও তা বাবাকের কুটিরে অন্তত নেই।

শশাঙ্ক প্রশ্ন করল,

— কিন্তু একথা আপনি এত নিশ্চিত হয়ে কীভাবে বলছেন, আচার্য? আপনি তো সশরীরে সেইস্থানে পদার্পণও করেননি!

— না, করিনি। এবং, তার প্রয়োজনও নেই। সত্যি বলতে, বাবাককে বৃথা খোঁজার চেষ্টা করেও লাভ নেই। সম্ভবত সে এখন ভিন্ন কোনো রাজ্যে আত্মগোপন করে আছে।

শশাঙ্ক উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে,

— সেকী? কিন্তু… কিন্তু আমরা তো বাবাক নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই গ্রাম ঘিরে ফেলেছিলাম। আমাদের অজান্তে একটি পারাবতও গ্রাম ছেড়ে বেরোতে পারবে না আমি নিশ্চিত, আচার্য!

চাণক্য শশাঙ্কর দিকে তাকিয়ে করুণাসূচক সামান্য হেসে বললেন,

— তোমার ও মগধের গুপ্তবাহিনীর কর্মক্ষমতার উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে, শশাঙ্ক। কিন্তু সমস্যাটা হল যে, তুমি এই গ্রামকে নিশ্ছিদ্র সুরক্ষা বলয়ে ঘিরে ফেলার অনেক পূর্বেই বাবাক গ্রাম ত্যাগ করেছিল সেইদিন।

জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,

— অর্থাৎ, আপনি অনুধাবন করতে পেরেছেন বাবাক তার বন্ধ গৃহ থেকে কীভাবে উধাও হয়েছিল?

— হুমম। তোমরাও সহজেই তা অনুধাবন করতে পারতে। যদি গোটা ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটা সবাই অবহেলা না করতে।

— কোন সূত্র?

— বাবাকের কার্যালয় থেকে নির্গত আগুনের ধোঁয়া।

শশাঙ্ক ও জীবসিদ্ধি পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

চাণক্য তাদের দিকে দেখে মৃদু হেসে বললেন,

— তোমার নজরদাররা কুটিরে প্রবেশ করে দেখেছিল বাবাকের কার্যালয়ের চুল্লিতে তখনও নিভু নিভু আগুন রয়েছে। অর্থাৎ, সেখানে কিছু জ্বালানো হয়েছিল। যেহেতু সেটি অস্ত্র নির্মাণের কার্যালয়, অতএব তোমরা ধরেই নিয়েছ যে, সেখানে বাবাক কাজ করছিল নিশ্চয়ই নিরুদ্দেশ হওয়ার পূর্বে। অথচ একবারও তোমাদের মনে সন্দেহ হল না যে, সেখানে কোনো তপ্ত ধাতুর অর্ধনির্মিত অস্ত্র কেন পাওয়া গেল না সেক্ষেত্রে?

বিস্মিত ভঙ্গিতে শশাঙ্ক প্রশ্ন করল,

— কিন্তু তা, আপনি কী করে জানলেন যে সেখানে কোনো অর্ধনির্মিত অস্ত্র আমার পাইনি?

— কারণ আমি জানি সেখানে অস্ত্র নির্মাণ করা হয়নি সেইদিন। আগুন জ্বালানো হয়েছিল সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন প্রয়োজনে।

জীবসিদ্ধি ঘাড় নেড়ে বলল,

— বরাবরের মতোই আমার কাছে আপনার ইঙ্গিত স্পষ্ট নয়, গুরুদেব। ভ্রাতা শশাঙ্কর অবস্থাও যে আমারই মতো সেটাও আমি বুঝতে পারছি। তবে, আমার মনে একটা সন্দেহ হচ্ছে। ওই বিধোরক সম্ভবত গোটা ঘটনায় যুক্ত। সে মোটেই যেরকম নির্বোধ সেজে আছে, বাস্তবে তা নয়। সে-ই তার পিতাকে একাজে সাহায্য করেছে।

— হুম। ঠিকই অনুমান করেছ হে, জীবসিদ্ধি। শশাঙ্ক আর তোমার জন্যে আরও একটা সূত্র রইল। তক্ষশিলা থেকে ফেরার পর থেকে বাবাক পুত্র বিধোরকের পা খুড়িয়ে চলারও এই গোটা ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

শশাঙ্ক সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে নিজের আসনে বসে পড়ল। আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল চাণক্যর প্রতি।

চাণক্য তাকে দেখে মৃদু হেসে পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন,

— বাবাকের এই বন্ধ গৃহ থেকে বিলীন হয়ে যাওয়ার বিষয়টা নিয়ে আমার মনে প্রথম থেকেই একটা অনুমান ছিল ঘটনাটা পত্রে পাঠ করার পর থেকেই। এখানে এসে চারজন নজরদারের কথায় সেই অনুমান সম্পূর্ণ একটি ধারণা নিয়েছে। কিন্তু আমি সে নিয়ে চিন্তিত নই। আমি অন্য একটি বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তিত যা একটু আগে আমি দেখলাম।

দু-জনেই একসঙ্গে প্রশ্ন করল,

— কী দেখলেন?

চাণক্যর ললাটে ভ্রূকুটি ফুটে উঠল। বললেন,

— তোমরা বোধ হয় লক্ষ করোনি। বিধোরকের ডান হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মাথায় এবং বাম হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মধ্যবর্তী স্থানে চামড়া শক্ত হতে কড়া পড়ে গিয়েছে।

৩৭.

সিন্ধুপ্রদেশ। উপত্যকার নিকটেই নিজের সেনাশিবির সাজিয়েছে মলয়কেতু। নিজের তাঁবুতে বসে সে মহামাত্যর সঙ্গে রণকৌশল নিয়ে আলোচনা করছে।

— মহারাজ মলয়কেতুর জয় হোক।

— কী সংবাদ এনেছ, পত্রবাহক?

পত্রবাহক তার হাতের ভূর্জপত্র এগিয়ে দিল রাজার দিকে। মলয়কেতু সেটি খুলে পাঠ করল।

পত্রের শুরুতেই প্রথম সম্বোধনটা দেখে মাথায় আগুন জ্বলে উঠল মলয়কেতুর। তাকে রাজা বলে সম্বোধন পর্যন্ত করেনি ওই দুষ্ট ব্রাহ্মণ! এত বড়ো আস্পর্ধা তার?

পত্রের সম্পূর্ণটা পাঠ করে ক্রোধে মুখ আরক্ত হয়ে উঠল মলয়কেতুর।

মলয়কেতু,

জ্ঞানী পণ্ডিতরা বলেন মূর্খ মিত্রর সঙ্গ করার চেয়ে চতুর শত্রুর সঙ্গও উত্তম হয়। এই বাক্যটি কতটা সত্য তা আপনার সঙ্গে মৈত্রী করে উপলব্ধি করলাম। যদিও আপনার মতো মেরুদণ্ডহীন শাসকের থেকে আমি এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করিনি। মূর্খরা বরাবরই নিজেদের পতন ডেকে আনে। আপনিও তাই করলেন। তবে এই তথ্য জেনে রাখুন যে, আপনাকে আর্যাবর্তর সম্রাট করার কোনো অভিপ্রায় আমার কোনোদিনই ছিল না। সে-যোগ্যতা আপনার নেই। আমি চাণক্য নই, আর্যাবর্তর শাসন আমার লক্ষ্য নয়। আর্যাবর্তর ধ্বংসই আমার মূল লক্ষ্য। আমি জানি আপনি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জেনে রাখুন আমি পঞ্চনদের অন্য শাসকদের ইতিমধ্যে সে-সংবাদ দিয়েছি। তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে সহজ জয়ের যে মনোবাসনা আপনার ছিল, তা আমি হতে দেব না।

আমাকে আলোচনার আমন্ত্রণ পাঠিয়ে যে আমাকে আপনি হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছেন তা আমি জানি। শকুনির চোখ ও কান আপনার আশেপাশেই আছে যা আপনি নিজেও জানেন না। তাই আপনার আমন্ত্রণ আমি প্রত্যাখ্যান করলাম।

আপনার বিনাশ আসন্ন।

ইতি,
শঙ্কুমণি।

পত্রটা ছিড়ে কুটি কুটি করে ফেলল মলয়কেতু। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মহামন্ত্রী

সুদীপ্তকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

— সেনা তৈরি?

সুদীপ্তক উত্তর দিলেন,

— হ্যাঁ, মহারাজ।

— আর সিন্ধুর সেনাদের অবস্থান কী?

— সিন্ধুসেনার সেনাবাহিনী উপত্যকার মধ্যে অবস্থান করছে। আগামীকাল তারা উপত্যকায় প্রবেশ করবে।

— আর আমাদের সেনার অবস্থান?

— পর্বতের মাঝের সরু পথ দিয়ে সিন্ধের সেনা প্রবেশ করবে। খোলা প্রান্তরে আমাদের সেনা তাদের অপেক্ষা করছে। সিন্ধের সেনাবাহিনী সরু পথে প্রবেশ করলেই তারা ফাঁদে পা দেবে। খোলা প্রান্তর থেকে আমরা তাদের উপর আক্রমণ করলে সহজেই আমরা গোটা বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারব। তারা পিছিয়ে সরু উপত্যকার পথ ছেড়ে বেরোতে বেরোতে আমরা তাদের অর্ধেক সেনাবল ধ্বংস করে দিতে পারি।

— দারুণ রণকৌশল নিয়েছেন, মহামাত্য! সাধু।

— ধন্যবাদ, মহারাজ।

— আর বাকি দুই রাজ্যেও আমরা আক্রমণ করব। সে প্রস্তুতি কি হয়েছে?

— হ্যাঁ, মহারাজ। মলয়নগর ও কাশ্যপনগরের সীমান্তে আমাদের সেনা প্রস্তুত। শুধুমাত্র আপনার আদেশের অপেক্ষায় আছে।

— অতি উত্তম। আগামীকালই তবে আমাদের বিজয় অভিযান শুরু হোক! কালকেই একসঙ্গে তিন স্থানে আক্রমণ করবে পর্বত্যকা সেনা!

কিছুটা ইতস্তত করে মহামাত্য সুদীপ্তক বললেন,

— মহারাজ। তিন ভিন্ন স্থানে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে আমাদের সমস্ত সেনাবল ব্যবহার করতে হয়েছে। আমাদের নিজেদের রাজ্যে এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী নেই বললেই চলে। আমি আপনাকে একবার বিবেচনা করে দেখতে অনুরোধ করব যে, এরূপ নিজেদের রাজধানীকে অরক্ষিত রাখা কি সমীচীন?

— আমাদের আক্রমণ যারা করতে চলেছিল, তাদের উপরেই আমরা আগে

আক্রমণ করতে চলছি, মহামন্ত্রী। অতএব আমাদের কিছুর ভয় নেই।

— আপনি বোধ হয় আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য কুলূতের কথা ভুলে যাচ্ছেন, মহারাজ।

— তাদের তো নিজেদেরই রাজ্যে বিশৃঙ্খল অবস্থা। মহারাজ সুবর্মাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এতদিন সেই সংবাদ গোপন রাখা হয়েছে বলে প্রজারা অসন্তুষ্ট। এদিকে শুনলাম চিত্রবর্মাকে বন্দি করা হয়েছে রাজাকে হত্যার অপরাধে। অতএব তাদের পক্ষে আমাদের বিরুদ্ধে সেনা সংগঠিত করা অসম্ভব এই মুহূর্তে।

— কিন্তু আপনি একজনের কথা ভুলে যাচ্ছেন, মহারাজ।

— কে? কার কথা বলছেন?

— চাণক্য! শেষ পাওয়া সংবাদে সে কিন্তু কুলূতেই অবস্থান করছে। আমি নিশ্চিত সে ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছে পঞ্চনদের পাঁচ রাজ্য ও পারস্যের সঙ্গে শকুনির যোগাযোগের কথা। সে বিস্ময়করভাবে গোটা ব্যাপারে উদাসীন। আমার এই লক্ষণ ভালো লাগছে না, মহারাজ।

— সে তো কুলূত অধিগ্রহণে ব্যস্ত। আর তা ছাড়া সেই-বা কী করে নেবে? যদি তর্কের স্বার্থে ধরেও নিই যে চাণক্য আমাদের রাজধানীতে আক্রমণ করল। তাতেই-বা লাভ কী? আমাদের সেনা সিন্ধুসেনাকে পর্যুদস্ত করে আমাদের রাজধানীতে ফিরে গেলে সহজেই তাদের মুষ্টিমেয় মগধ সেনাকে পরাজিত করে রাজ্যছাড়া করতে পারি।

.

সুদীপ্তক সন্তুষ্ট হয়েছেন বলে মনে হল না। কিন্তু মুখে কিছু না বলে শুধু চুপ থাকলেন। তাঁর কেন জানি মন বলছে আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হচ্ছে, ঘটনাক্রম ততটা সহজ হবে না। চাণক্য। এই এক ব্রাহ্মণকে নিয়ে তিনি বড়োই চিন্তিত থাকেন। এই ব্রাহ্মণ শিক্ষকটির সঙ্গে তাঁর একবার দেখা হয়েছিল অনেক বছর আগে একটি জ্ঞানসভায়। সেসময়ে চাণক্য নিজের কেশশিখা খুলে রাখতেন। শোনা যায় তিনি নন্দ সাম্রাজ্য ধ্বংস করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন এবং যতদিন না তাঁর উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে ততদিন নিজের কেশশিখা না বাঁধার প্রতিজ্ঞা করেছেন। এই কুরূপ, দাঁত উঁচু, কৃষ্ণকায় ব্রাহ্মণ ও তাঁর প্রতিজ্ঞা নিয়ে সকলেই পরিহাস করছিল তাঁর অজ্ঞাতে। কিন্তু যখন চাণক্য মঞ্চে উঠলেন, সভার সকলে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

সুদীপ্তকের আজও মনে আছে চাণক্যর প্রতিটা কথা। রাজ্য, দেশ, জনপদ, রাজা ইত্যাদি নিয়ে তিনি সেদিন যা ধারণা ও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সভায়, তা এককথায় বৈপ্লবিক। সুদীপ্তক বুঝেছিল যে, এই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্রাহ্মণ কোনো সাধারণ মানুষ নন। সম্ভবত চাণক্যর প্রতিজ্ঞা অন্যের কাছে যতটা অসম্ভব মনে হচ্ছে, চাণক্যর নিজের কাছে বোধ হয় তা ততটা অসম্ভব নয়। তার কয়েক বছর পরেই সুদীপ্তকের অনুমান ঠিক প্রমাণিত করে মৌর্য সাম্রাজ্যের স্থাপনা হয়।

.

— কোথায় হারিয়ে গেলেন, মহামাত্য?

মলয়কেতুর ডাকে তাঁর চিন্তাজালে ছেদ পড়ল। বর্তমানে ফিরে এলেন সুদীপ্তক। মলয়কেতু বলল,

— আপনি আমার আদেশ পাঠিয়ে দিন আমার সেনার কাছে। আগামীকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গেই যুদ্ধ শুরু হোক। আমাদের বিজয়রথ যাত্রা শুরু করুক!

সুদীপ্তক দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বললেন,

— যথা আজ্ঞা।

*জ্ঞানসভা–প্রাচীনকালে বিভিন্ন রাজারা তাঁদের রাজ্যে পণ্ডিতদের আলোচনা সভার আয়োজন করতেন। দেশি ও বিদেশি বিশিষ্ট পণ্ডিত ও গুণীজনদের আমন্ত্রণ করা হত তাঁদের বক্তব্য রাখতে।

৩৮.

চাণক্য সম্মুখে তাকিয়ে থাকলেও কিছু দেখছেন না। কপালে গভীর ভ্রূকুটি থেকে বোঝা যাচ্ছে তিনি কিছু ভাবছেন। শশাঙ্ক তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, জীবসিদ্ধি তাকে হাত তুলে থামতে ইশারা করল। চাণক্যর চিন্তাসূত্রে ছেদ না পড়াই ভালো। চাণক্য সময়মতো নিজেই ব্যাখ্যা করবেন।

কিন্তু চাণক্যর চিন্তায় বাধ সাধল তাঁবুর বাইরে থেকে এক প্রহরীর ডাকে।

— পাটলিপুত্র থেকে আচার্য চাণক্যর জন্যে পত্র আছে।

জীবসিদ্ধি উঠে গিয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে পত্র নিয়ে প্রবেশ করল। চাণক্যর দিকে বাড়িয়ে দিতে চাণক্য সেটা না নিয়ে তাকেই বললেন,

— পাঠ করে শোনাও।

জীবসিদ্ধি ভূর্জপত্র খুলে পড়তে শুরু করল,

প্রিয় আচার্য চাণক্য,

প্রণাম নেবেন। জনগণনার কাজের শেষ ধাপ আসন্ন। আপনাদের রাজধানীতে প্রত্যাবর্তনের সময় এসেছে।

ইতি,
কাত্যায়ন।

জীবসিদ্ধি পত্র পাঠ করে হতাশ ভঙ্গিতে চাণক্যর দিকে চাইল। বলল,

— আপনার আর অমাত্য রাক্ষসের এই রহস্যময় পত্রালাপ আমার কাছে বড়োই পীড়াদায়ক হয়ে যাচ্ছে। দয়া করে ব্যাখ্যা করুন।

চাণক্য আলগা হেসে বললেন,

— তুমি নিশ্চয়ই এতদিনে কিছু অনুমান করেছ?

— হ্যাঁ। অনুমান করতে পারি ‘জনগণনা’ কথাটি এই ক্ষেত্রে সাংকেতিক গুপ্ত শব্দ।

— হুমম। তবে সে-বিষয়ে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যার সময় এখনও আসেনি হে, জীবসিদ্ধি। এইটুকু নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে, দীর্ঘ সময় মগধের বাইরে থাকার পর এবার আমাদের নিজগৃহে ফেরার সময় এসেছে।

শশাঙ্ক তাদের কথার মাঝে বাধা দিয়ে অভিমানী সুরে বলল,

— না না, আপনি ও ভ্রাতা জীবসিদ্ধি কিন্তু প্রসঙ্গ পালটে দিচ্ছেন, আচার্য। এ ভারি অন্যায় তোমার, জীবসিদ্ধি। মানছি, বর্তমানে গুরুদেবের ভার চন্দ্রগুপ্ত তোমার উপর দিয়েছেন। কিন্তু, তাই বলে কি আচার্য চাণক্য শুধুই তোমার? আমাকে অন্ধকারে রেখে, এই বাবাকের উধাও হওয়ার রহস্যের সমাধান না করেই তোমরা অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারো না!

কথা শেষে তিনজনই হেসে উঠল। চাণক্য সোজা হয়ে উঠে বসে বললেন,

— তোমার অভিযোগ যথার্থ হে, শশাঙ্ক। তোমায় তোমার পরিবারের থেকে আলাদা রেখে দেওয়া আর আমার উচিত নয়। গান্ধারের অধ্যায় শেষ করে তোমাকে নিজগৃহে ফেরার অনুমতি এবার দিতেই হবে।

হঠাৎ গম্ভীর হয়ে চাণক্য বললেন,

— কিন্তু গান্ধার পর্ব যে এই সমস্ত ঘটনার তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ, তা ভাবলে কিন্তু ভুল করবে। পক্ষান্তরে আমি বলব এই রহস্য অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। আমি যতটা অনুমান করেছিলাম প্রথমে, এখানে এসে আমার মনে হচ্ছে এখানকার ঘটনাক্রম আমার ধারণার চেয়েও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। আসন গ্রহণ করো, জীবসিদ্ধি। চেষ্টা করি তোমাদের ধূম্রমোচন করার।

.

চাণক্য কিছুটা ভেবে নিয়ে ব্যাখ্যা শুরু করলেন,

— গোটা ঘটনায় মূল ভূমিকা যে পালন করেছে এবং এখনও করে চলেছে সে হল বাবাক পুত্র বিধোরক। সে প্রথম থেকেই তোমাদের চোখে ধুলো দিতে নিজের যে ‘নির্বোধ’ ছবি প্রক্ষেপ করেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি নিশ্চিত তার ও তার পিতার শকুনির সঙ্গে যোগাযোগ আছে।

জীবসিদ্ধি বিস্মিত স্বরে বলল,

— এমন অনুমান আমারও হয়েছিল। কিন্তু, আপনি নিশ্চিত কীভাবে হচ্ছেন, আচার্য?

— সে-প্রসঙ্গে শেষে আসছি। প্রথমেই বলি যে বাবাককে গুরুত্ব দিয়ে, তার পুত্র বিধোরককে উপেক্ষা করাটা শশাঙ্কের ক্ষেত্রে বড়ো ভুল হয়েছে। যেহেতু সে অস্ত্রনির্মাণ শিল্পে অশিক্ষিত তাই তাকে প্রথম থেকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিষয়টা পত্রে জানানোর পরেও শশাঙ্ককে সঠিক নির্দেশ দেওয়া আমারও উচিত ছিল, কিন্তু ঘটনাক্রমে সেইসময়ে কুলূতের রহস্যমৃত্যু নিয়ে এতটাই জড়িয়ে ছিলাম যে, এই বিষয়ে গভীরে তলিয়ে ভাবা হয়নি। এটা নিঃসন্দেহে আমার ভুল।

সবচেয়ে বড়ো ভুল হয়েছে বিধোরককে তক্ষশিলায় বিনা নজরদারিতে একলা যেতে দেওয়া। তোমরা অনুমানই করতে পারোনি যে, তার মতো অল্পবুদ্ধি একটি যুবক কিছু করতে পারে। আসলে কাজের অজুহাতে বিধোরক তক্ষশিলায় গিয়েছিল শকুনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তোমাদের চোখে ধুলো দিয়ে শকুনির দেওয়া একটি অস্ত্র নিয়ে সে ফিরে আসে এখানে।

শশাঙ্ক কথায় বাধা দিয়ে বলল,

— না, আচার্য। বিধোরক গ্রাম ছাড়ার ও পুনরায় প্রবেশ করার সময়ে তার সমস্ত জিনিসপত্র, কাঁধের ঝোলা থেকে প্রতিটি বস্তু পরীক্ষা করা হয়েছিল। সে কোনো নতুন অস্ত্র নিয়ে ফেরেনি।

চাণক্য ঠোঁটের এককোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিলেন,

— এ জগতের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র যা, সেটা কোনো খাপ বা শরাধারে নিয়ে মানুষ চলে না। এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র হল ‘বুদ্ধি’, যা মানুষ নিজের মস্তিষ্কে নিয়ে চলে। যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, অনুমান করা যায় না। একজন মানুষ তার মস্তিষ্কে কত ভয়ংকর পরিকল্পনা সযত্নে লালন করে চলেছে তা বাইরে থেকে দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারে না। বিধোরকও তক্ষশিলা থেকে ফিরে এসেছিল একটি পরিকল্পনা নিয়ে, যা আচার্য শকুনির মস্তিষ্কপ্রসূত।

.

প্রথম থেকে শুরু করা যায়। বাবাক আসলে জেনেশুনেই সেই বিশেষ ধরনের বাণ বানায় শকুনির সেই তিরন্দাজ হত্যাকারীর জন্যে। সে এবং তার পুত্র গান্ধারের একটি গ্রামে থাকে তাই তাদের ধারণা ছিল যে, শুধুমাত্র একটি তিরের সাহায্যে ওদের খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া ওই বাণ ব্যবহার করে ইতিমধ্যে আমাদের জন্যে জাল ফেলা হয়েছে। অতএব, আমাদের শত্রুপক্ষ একটা ভুল করে ফেলে। তারা ধরেই নেয় যে, আমরা শুধুমাত্র তাদের এগিয়ে দেওয়া সূত্র ধরেই এগোব। অন্য পথ ধরেও যে আমাদের গুপ্তচররা সমান্তরাল পথে অনুসন্ধান চালিয়ে যাবে তা ওরা ধারণা করতে পারেনি।

কিন্তু গুপ্তচরদের অনুসন্ধানে লাভ হল। মাত্র কয়েকটি বাণ বাদে আর কোনো সূত্র ছিল না, তাই একবছরেরও বেশি সময় লাগল বটে। কিন্তু শেষপর্যন্ত বাবাকের কুটিরে শশাঙ্ক হাজির হল। বাবাক আর তার পুত্র পড়ল বিপদে। বাবাক ও তার পুত্র যে যথেষ্ট চতুর তা বোঝা যায় তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ থেকে।

বাবাক বুঝতে পারল, বাণের কথা অস্বীকার করে লাভ নেই। মগধের সৈনিকরা সংবাদ নিয়েই এসেছে। অস্বীকার করলে বরং তাদের মনে সন্দেহ হবে যে, তার সঙ্গে শকুনির যোগাযোগ আছে। তা ছাড়া কুটির খুঁজলেই যেখানে ইতিমধ্যে জমিয়ে রাখা তিরগুলো পাওয়া যাবে, সেখানে অস্বীকার করা বৃথা। অতএব, এখানে খুবই বুদ্ধিমানের মতো সে তিরের কথা স্বীকার করল, কিন্তু সেই বাণ কে বা কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে সেই বিষয়ে সে নিজের অজ্ঞতা জানাল। সেই মুহূর্তেই শশাঙ্কর সন্দেহ তার দিক থেকে অনেকটাই সরে গেল। তাই নয় কি, শশাঙ্ক?

লজ্জিত ভঙ্গিতে ‘হ্যাঁ’ সূচক ঘাড় নাড়ল শশাঙ্ক। চাণক্য তার উদ্দেশে বললেন,

— তোমার নিজেকে দোষী ভাবার কারণ নেই, শশাঙ্ক। এটাই মানুষের সাধারণ মনস্তত্ত্ব, মানুষের প্রকৃতি। এরপর আরও একটা দুর্দান্ত চাল দিল বাবাক। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হল তার সেই ক্রেতার নাম, সে কোন নাম বলল? শঙ্কুমণি। ভেবে দেখো হে শশাঙ্ক, এইখানে তোমার প্রশ্নের উত্তরে যদি সে বলত যে ওই ব্যক্তির নাম তার জানা নেই, তবেই আবারও তোমার সন্দেহ জাগত তার প্রতি। তাই বাবাক আমাদের দিকে সেই নামটা ছুড়ে দিল, যা আমরা ইতিমধ্যে জানি! আচার্য শকুনি বা শঙ্কুমণি নামটা বলায় তার দিক থেকে সন্দেহ আরও কমল, কিন্তু আমরা কি বাস্তবে কোনো নতুন তথ্য পেলাম? একদমই না। অন্য কোনো নাম বললে আমরা সেই নামের সূত্র ধরে খোঁজ নিতে পারতাম। কিন্তু শকুনির নাম বলায় আমরা বুঝেই গেলাম যে সেটা ছদ্মনাম এবং ওই নিয়ে ভেবে লাভ নেই।

.

চাণক্য কিছুটা থেমে বললেন,

— তার সেই ক্রেতার চেহারার বর্ণনা দেওয়ার সময়ও সে আরও একটি চাতুর্যের নজির দিয়েছিল বটে। কিন্তু সে-প্রসঙ্গে পরে আসছি। আপাতত এই অবধি বলে তাৎক্ষণিক রক্ষা হল বটে। কিন্তু এবার তোমাদের বজ্রমুষ্টি থেকে পালাবে কোন উপায়ে? কারণ তুমি তাদের জানালে যে, মগধের গুপ্তচররা তাদের উপর নজর রাখবে অষ্টপ্রহর। বাবাক ও তার পুত্র বুদ্ধিমান বটে এই চক্রব্যূহ থেকে বেরোনোর মতো উপায় তারা অনেক ভেবেও স্থির করতে পারল না। শশাঙ্কর থেকেই জেনেছি যে, নজরবন্দি হওয়ার প্রথম কয়েক দিন তারা কেউই বিশেষ কুটির থেকে বের হয়নি। আসলে সেইসময়ে তারা উপায় ভাবছিল। কিন্তু কোনো উপায় না পেয়ে শেষে তারা স্থির করল যে, এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে তাদের আচার্য শকুনির পরামর্শের প্রয়োজন। পিতার উপর সর্বক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে, অতএব শকুনির কাছে যেতে হবে পুত্র বিধোরককেই। তাই তক্ষশিলায় কাজে যাওয়ার অছিলায় সে যোগাযোগ করল শকুনির সঙ্গে।

শশাঙ্ক আবারও বাধা দিয়ে বলল,

— কিন্তু বিধোরক সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়তে গিয়েছিল। আমি তক্ষশিলার প্রধানাচার্য ভদ্রভট্টর কাছে খোঁজ নিয়েছিলাম বিধোরকের কথার সত্যতা যাচাই করতে, আচার্য। বাস্তবে সে সেখানে মাঝে মাঝে কাজ করে বলে জানিয়েছেন তিনি।

— হুমম। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু পথে কোথাও যে শকুনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনি, সেকথার নিশ্চয়তা কী?

মুখ থেকে আফশোসের শব্দ নির্গত হল শশাঙ্কর। চাণক্য পুনরায় তাঁর ব্যাখ্যায় ফিরলেন,

— আচার্য শকুনির মস্তিষ্ক থেকে আরও একটি দুর্দান্ত পরিকল্পনা জন্ম নিল। বিধোরক ফিরে এল গ্রামে। কিন্তু সে ফিরে এল এক পা খোঁড়া হওয়ার ভান করে। এসে জানাল সে পায়ে চোট পেয়েছে।

জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,

— অর্থাৎ, ছেলেটি আসলে খোঁড়া নয়? কিন্তু, এই ভান করে তার কী লাভ হল? এরকম অপ্রয়োজনীয় একটি কাজ করার উদ্দেশ্যই-বা কী, আচার্য?

চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,

— কী বলছ হে, জীবসিদ্ধি? অপ্রয়োজনীয় কোনটাকে বলছ? এই গোটা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে সবচেয়ে অপরিহার্য অঙ্গ হল ওই বিধোরকের পা টেনে টেনে হাঁটার মিথ্যা অভ্যাসটা!

৩৯.

হতভম্বভাবে চাণক্যর দিকে তাকিয়ে রইল জীবসিদ্ধি ও শশাঙ্ক।

তাদের মুখ দেখে চাণক্যর মনে পড়ে গেল তাদের ছাত্রাবস্থার স্মৃতি। ঠিক এভাবেই হতবুদ্ধি হয়ে তাঁর ছাত্ররা বসে থাকত পাঠের শুরুতে তাঁর গুরুকুলে। নীতিশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র অতি গম্ভীর বিষয়। ছাত্ররা প্রথমেই ভূর্জপত্রের কঠিন শ্লোক পাঠ করে হতবুদ্ধি হয়ে যেত। তখন চাণক্য তাদের সেই শ্লোকের সহজ ব্যাখ্যা করে বোঝাতেন। অতি কঠিন কিছুকেও সরলভাবে বোঝানোর জন্যে আচার্য চাণক্যর সুখ্যাতি ছিল। চাণক্য বলতেন, নিজের শেখার ইচ্ছা থাকার পরেও কোনো পাঠ যদি শিক্ষকের বোঝানোর পরেও কঠিন মনে হয়, তবে জানবে তুমি ভুল শিক্ষকের কাছে পাঠ নিতে গিয়েছ। ত্রুটি বিদ্যার থাকে না, ত্রুটি থাকে শিক্ষক অথবা ছাত্রদের মধ্যে।

শশাঙ্ক ও জীবসিদ্ধির মুখের বিহ্বল ভাব দেখে তাঁর পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। যেন মনে হয় এই সেদিনের কথা, অথচ মাঝখানে কতগুলো ঋতু এসে চলে গিয়েছে। চাণক্য নিজের অন্তরে জানেন যে, তিনি জীবনে সবচেয়ে সুখী ছিলেন সেই সময়টাতে। জীবন তাঁকে বহু ভূমিকায় পরিচিতি দিয়েছে। রাজনীতিবিদ, তার্কিক, বিদ্রোহী, কৌটিল্য, সাম্রাজ্য-পতনকারী, সাম্রাজ্য-নির্মাণকারী, মহামাত্য- কিন্তু তিনি অস্তর থেকে শুধুই একজন শিক্ষক। তাই তো এত বছর বাদেও নিজেকে তিনি তক্ষশিলার আচার্য হিসাবেই পরিচয় দেন।

চন্দ্রগুপ্তসহ এই পাঁচ সন্তানসম ছাত্র তাঁর বড়োই প্রিয়। মনে মনেই হেসে উঠলেন চাণক্য। তক্ষশিলায় তাঁর দিনগুলো ছিল বড়োই মধুর। গোটা দিন তাঁর কাটত তাঁর প্রিয় বস্তু ও মানুষদের মাঝে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপূর্ব প্রাঙ্গণ, পুস্তক, তাঁর প্রিয় ছাত্ররা, পিতাসম তাঁর প্রধানাচার্য ভদ্রভট্ট এবং…।

শেষ নামটা মনে পড়তেই মনের গভীরে একটি সুপ্ত যন্ত্রণা যেন বহুদিন পর আবার জেগে উঠল। ভালোলাগার স্মৃতি কেটে গিয়ে গভীর বিষাদময় একটা একটা নাম, কিছু স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল চাণক্যর হৃদয়ে।

.

অতীতের ঘোর কাটিয়ে চাণক্য জোর করে বর্তমানে ফিরে এলেন। জীবসিদ্ধি ও শশাঙ্ক তাঁর ব্যাখ্যার অপেক্ষায় অনুগত ছাত্রর মতোই উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করছে।

চাণক্য পুনরায় তাঁর কথার রেশ ধরে বললেন,

— কী জানি বলছিলাম? ও হ্যাঁ, বিধোরকের খোঁড়া হওয়ার ভান করার বিষয়ে। বেশ, তবে এবার মূল রহস্যের সমাধানে আসি।

কয়েক মাস আগে শশাঙ্কর লেখা পত্রতেই একটি তথ্যের উল্লেখ ছিল যা বাবাক উধাও হয়ে যাওয়ার সংবাদ জানার পরেই আমার মনে একটা সন্দেহের উদ্রেক করে। বাবাক ভিনদেশি চৈনিক। এবং, পত্রে এও উল্লেখ ছিল যে, চেহারার দিক থেকে পিতা পুত্রের অনেক মিল আছে। যদিও পিতা বয়স্ক এবং পুত্র যুবক।

আরও একটা তথ্য এখানে এসে জানলাম যে, বাবাকের মুখে গোঁফ ও দাড়ি ছিল। ছেলের মুখে তা নেই, তাই তাদের দেখতে সম্পূর্ণ ভিন্ন লাগে। কিন্তু যদি কোনোভাবে সেই পার্থক্যটুকু মাত্র কিছুক্ষণের জন্যে অতিক্রম করা যায়, তবে?

চাণক্য একটি ভূর্জপত্র টেনে নিয়ে কালিতে খাগের কলম ডুবিয়ে নিয়ে লিখতে শুরু করলেন,

দরজা ২— পুত্র বেরোয়, প্রথম প্রহর

দরজা ১- পিতা বেরোয়, প্রথম প্রহরের শেষে/দ্বিতীয় প্রহরের শুরুতে দরজা ১– পিতা ফিরে আসে, দ্বিতীয় প্রহরে

দরজা ১– পুত্র বেরোয়, সময়ের কথা প্রথম নজরদার সঠিক বলতে পারেনি। দরজা ২- পুত্র ফিরে আসে, তৃতীয় প্রহর।

কয়েকটি বাক্য পর পর লিখে ভূর্জপত্রটি এগিয়ে দিলেন দুই শিষ্যের দিকে। বললেন,

— দেখো, এই হল চার নজরদারের বক্তব্য থেকে পিতা-পুত্রের কুটির থেকে বেরোনোর ও প্রবেশ করার ক্রম। পুত্র অর্থাৎ বিধোরক প্রথম দ্বার দিয়ে দ্বিতীয়বার কখন বেরিয়েছিল তা প্রথম নজরদার সঠিক বলতে পারেনি। সে আমাকে জানিয়েছে সম্ভবত পুত্র পিতার ফেরার পূর্বেই ফিরেছিল। কিন্তু কথাটা ভুল। কারণ বাবাককে প্রথম দ্বার দিয়ে বেরোতে সেই দ্বারের দ্বিতীয় নজরদারও দেখেছিল। স্মরণে রেখো যে, এই দ্বিতীয় নজরদার কিন্তু বাবাকের পিছু নিয়েছিল এবং তার সঙ্গেই দ্বিতীয় প্রহরে ফিরেছিল। অতএব, যদি বিধোরক পিতার আগেই কুটির থেকে বেরিয়ে থাকে প্রথম দরজা দিয়ে, তবে সেসময়ে দ্বিতীয় নজরদারের থাকার কথাই নয়। অথচ সে জানাচ্ছে সে বিধোরককে একবার বেরোতে দেখেছে। অতএব, আমরা নির্দ্বিধায় ধরে নিতে পারি, বিধোরক পিতার ফিরে আসার পরেই বেরিয়েছিল প্রথম দরজা দিয়ে।

তাকে এরপর ফিরতে দেখা যায় তৃতীয় প্রহরে, পেছনের দরজা, অর্থাৎ দ্বিতীয় দরজা দিয়ে। অতএব, দ্বিতীয় দরজার দুই নজরদার ধরেই নেয় যে, সেই যে সকালের প্রথম প্রহরে পুত্র বেরিয়েছিল, সে-ই ফিরে এসেছে। অতএব, কারুর মনেই কোনোরকমের সন্দেহের উদ্রেক হয়নি।

কিন্তু ভালো করে এই তালিকাটা দেখো। এখানে বিধোরককে মোট দু-বার বেরোতে দেখা গিয়েছে, কিন্তু কুটিরে ঢুকতে দেখা গিয়েছে মাত্র একবার। তাই নয় কি?

.

চাণক্য খানিকটা থেমে আবার বললেন,

— পিতা মানে বাবাক প্রথম দ্বার দিয়ে বেরোয় এবং হাটে যায়। তার সঙ্গে থাকা নজরদার সর্বক্ষণ তার উপর দৃষ্টি রেখেছিল, শুধুমাত্র এক জায়গায় বাদে। বাবাক শুঁড়িখানায় প্রবেশ করে এবং মাত্র কিছুক্ষণ বাদেই বেরিয়ে আসে। এই… এইখানেই গোটা রহস্যের মূল উত্তর লুকিয়ে আছে। শুঁড়িখানায় যে প্রবেশ করেছিল সে পিতা বাবাক বটে, কিন্তু যে বেরিয়ে এসেছিল সে ছিল পুত্র বিধোরক। আগে থেকেই পিতার সেদিনের পরিধান করা বস্ত্রের অনুরূপ বস্ত্র পরিধান করে শুঁড়িখানায় অপেক্ষা করছিল পুত্র। আর তার মুখে ছিল পিতার মতোই নকল গোঁফ দাড়ি। এই শুঁড়িখানার মালিকটি নির্ঘাত গোটা ঘটনায় যুক্ত। তাকে বন্দি করতে হবে।

যাই হোক, পিতা শুঁড়িখানায় ঢুকল, পুত্র আগে থেকেই পরিকল্পনামতো তার অপেক্ষায় ছিল সেখানে। পিতার থেকে কাঁধের ঝোলাটি নিয়ে তারই ছদ্মবেশে শুঁড়িখানা থেকে বেরিয়ে এল পুত্র। নজরদার তার উপর দৃষ্টি রাখছিল কুড়ি হাত দূর থেকে। অতএব, ওই দূরত্বে শরীরের আকৃতি, উচ্চতা এক হওয়ায় পুত্রকে পিতা ভেবে নেওয়াটা তার পক্ষে স্বাভাবিক। তার মনে যদিও-বা কোনো সন্দেহ আসার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল, সেটাও সেইসময়ে থাকল না কেন জানো?

— কেন, আচার্য?

চাণক্য হেসে বললেন,

— এখানেই শকুনি তোমার গুপ্তচরদের মাত দিয়ে গিয়েছে হে, শশাঙ্ক! পিতাকে পুত্র বলে সন্দেহ হয়নি কারণ চেহারার সামান্য পার্থক্য বাদেও তোমাদের মস্তিষ্কে তাদের মধ্যে আরও একটা পার্থক্য ততদিনে শেকড় গজিয়ে ফেলেছে। এবং, সেটা হল পুত্রের ওই পা খুঁড়িয়ে চলার বিষয়টা! তক্ষশিলা থেকে ফেরার পর থেকেই প্রায় একমাস ধরে তোমরা দেখেছিলে বিধোরককে খুঁড়িয়ে হাঁটতে। অতএব, তোমাদের মস্তিষ্কে এই কথাটা গেঁথে বসেছিল যে, “পিতা স্বাভাবিক হাঁটে, পুত্র খুড়িয়ে হাঁটে’! তাই যখন শুঁড়িখানা থেকে পিতার ছদ্মবেশে পুত্র বেরিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে কুটিরে ফেরার পথ ধরল, তোমার নজরদারের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ রইল না যে, সেই ব্যক্তি বাবাক নয়, সে বিধোরক!

.

চাণক্য কিছুক্ষণ চোখ বুজে দৃশ্যটা মানসপটে দেখার চেষ্টা করলেন। মনে মনে আচার্য শকুনির বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা না করে তিনি পারলেন না। চোখ খুলে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে বসে থাকা দুই শিষ্যের উদ্দেশে বললেন,

— ওহে জীবসিদ্ধি, ওহে শশাঙ্ক, মনুষ্যের মস্তিষ্ক অতি অদ্ভুত বস্তু। যে মানুষের সাধারণ মনস্তত্ত্ব ও স্বভাবের সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিচিত হয়, তার পক্ষে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া, বা, কাউকে নিজের ইচ্ছেমতো চালনা করা কতটা সহজ তার উদাহরণ এই ঘটনা। শকুনি এ খেলায় অসম্ভব পারদর্শী তা নিশ্চয়ই তোমরা অনুমান করতে পারছ। অর্থাৎ, সামনের প্রথম দ্বার দিয়ে গৃহে প্রবেশ যে করেছিল সেইদিন দ্বিতীয় প্রহরে, সে বাবাক নয়, সে ছিল তার পুত্র বিধোরক। আমি নিশ্চিত নজরদার পিতা বলে ভুল করে পুত্রের পিছু নিতেই বাবাক শুঁড়িখানা থেকে ছদ্মবেশ ধরে গ্রাম ত্যাগ করেছিল। অতএব, বুঝতেই পারছ শশাঙ্ক, তোমার এই গ্রাম সুরক্ষাবেষ্টনীতে ঘিরে ফেলার এক প্রহর পূর্বেই বাবাক গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করেছে। যথেষ্ট সময় ছিল তার হাতে, সে সময় তাকে তার পুত্র করে দিয়েছিল।

এইবার পুত্র বিধোরক তার আসল খেলা শুরু করল। নিপুণভাবে নিজের ভূমিকা পালন করল। মনে করে দেখো, চারজন নজরদারই জানিয়েছে যে, বাবাক কুটিরে ফিরে এসে তার কার্যালয়ের চুল্লিতে আগুন জ্বেলেছিল। সকলেই ধরে নিয়েছিল যে, বাবাক কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবে তো সেসময়ে কুটিরে বাবাক ছিলই না। ছিল পুত্র বিধোরক যে অস্ত্রনির্মাণের কাজ জানেই না। তাহলে সে আগুন কেন জ্বালল পিতার চুল্লিতে?

উত্তরের আশায় পুনরায় শিষ্যদের দিকে চাইলেন চাণক্য। কিন্তু উত্তর না আসায় নিজেই উত্তরটা দিলেন,

— কারণ বিধোরকের পরিধানের ওই পিতার ছদ্মবেশ, নকল গোঁফ-দাড়ি জ্বালিয়ে ফেলা নিতান্তই প্রয়োজনীয় ছিল! ভেবে দেখো, যদি বাবাকের উধাও হওয়ার খবর পেয়ে কুটিরে প্রবেশ করে তোমরা দেখতে যে, বাবাকের পরনের কাপড় পড়ে রয়েছে তার কাঁধের ঝোলার সঙ্গে, তবে কি পরমুহূর্তেই তোমাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হত না? সম্ভাবনা ছিল যে, গোটা পরিকল্পনাটাই তোমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যেত সেই বস্ত্র পেলে। তাই সেগুলো আগে আগুন জ্বালিয়ে তাতে নিক্ষেপ করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই কারণেই তোমরা পরের প্রহরে প্রবেশ করে দেখেছিলে যে, কার্যালয়ের চুল্লিতে খানিক আগেও কিছু জ্বালানো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তপ্ত ধাতুর কোনো অর্ধনির্মিত অস্ত্র তোমরা পেলে না। কারণ কোনো অস্ত্র সেখানে তপ্ত করা হয়নি! আগুনে জ্বালানো হয়েছিল বিধোরকের ছদ্মবেশের বস্ত্র!

অনেকক্ষণ টানা কথা বলায় চাণক্যর গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। চাণক্য পাশে রাখা পেয়ালা থেকে দু-ঢোঁক জল পান করে বললেন,

— হুমম। এর পরের কাজ সহজ ছিল। ছদ্মবেশ ছেড়ে, তা পুড়িয়ে, বিধোরক আরও একবার বেরোয় প্রথম দরজা দিয়ে এবং বাজারের পথ হয়ে পেছনের দ্বিতীয় দরজা দিয়ে পুনরায় কুটিরে প্রবেশ করে। অবশ্যই পিতার ছদ্মবেশ ছাড়ার পর থেকে গোটা সময়টা সে পুনরায় খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। তৃতীয় প্রহর অবধি পরিকল্পনামতো সে অপেক্ষা করল। কারণ পিতা বাবাককে যথেষ্ট সময় দেওয়ার প্রয়োজন ছিল যাতে সে গ্রামের সীমানা ছেড়ে দূরে চলে যেতে পারে সেই সময়ের মধ্যে। তৃতীয় প্রহরে সে একে একে দুই দ্বার দিয়ে বেরিয়ে এসে পিতার খোঁজ করল এবং নজরদারদের জানাল যে, তার পিতা কুটিরে নেই। তোমরা প্রবেশ করে দেখলে বাবাকের কাঁধের ঝোলাটা রাখা থাকলেও, সে নেই। পরবর্তী ঘটনা তো তুমি আমার থেকে বেশিই ভালো করে জানো, শশাঙ্ক।