শর-শাস্ত্র – ৫

৫.

— সুপ্রভাত, আচার্য।

চাণক্য তাঁর অভ্যাসমতো ভোরবেলা উঠে পূজাপাঠ সেরে ধ্যান করছিলেন। নিজের কক্ষের দরজায় করাঘাত শুনে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতে জীবসিদ্ধি প্রবেশ করল।

জীবসিদ্ধি ভেতরে ঢুকে জানতে চাইল,

— চিত্রবর্মা বা শ্রীশৈল এসেছিল নাকি?

— নাহ্। এখনও না।

— তাঁদের কাউকেই আমার সুবিধার লাগছে না। আপনার কী ধারণা?

— জীবসিদ্ধি, কোনো তথ্য ছাড়াই কারুর সম্বন্ধে আমার ধারণা জন্মায় না। আগে তো শুনি তাঁদের বক্তব্য কী। রাজা সুবর্মাকে কীভাবে হত্যা করা হল সেটা জানি আগে।

আবার দরজায় করাঘাত হতে জীবসিদ্ধি উঠে গিয়ে দ্বার খুলে দিল। চিত্রবর্মা ও শ্রীশৈল দু-জনেই প্রবেশ করে প্রণাম জানালেন চাণক্যকে।

— আপনাদের প্রাতঃভোজ, পূজা আদি সম্পূর্ণ হয়েছে? এখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো? কোনো অসুবিধা হলে নির্দ্বিধায় আমাকে স্মরণ করবেন মহামতি।

চাণক্য উত্তর দিলেন,

— হুম। আমরা নিজেদের আহারের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিয়েছি, আর্য। আমরা স্বপাক আহার করি সাধারণত। আর আপনাকে জানাই কোনো অসুবিধা হচ্ছে না আমাদের।

— তবে আপনাদের যদি অনুমতি থাকে আমরা কি আপনাদের সঙ্গে এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করতে পারি?

— অবশ্যই। দয়া করে আসন গ্রহণ করুন আপনারা।

চিত্রবর্মা ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীশৈল চাণক্যর মুখোমুখি বসতে চাণক্য জিজ্ঞেস করলেন,

— এইবার বলুন আমাদের থেকে আপনি কী পরামর্শ আশা করছেন?

প্রশ্নের উত্তর শ্রীশৈল দিলেন,

— প্রথমত আপনাদের কাছে আমাদের একটি স্বীকারোক্তি আছে। আমরা পত্রে একটি অসত্য কথা লিখেছিলাম, সেটা এইক্ষণে জানিয়ে রাখি। আপনার স্মরণে আছে নিশ্চয়ই যে, পত্রে জানিয়েছিলাম, আমাদের রাজা সুবর্মা গুরুতর আহত হয়ে শয্যাশায়ী। কথাটা মিথ্যা।

— হুম, তিনি মৃত। বাণের আঘাতে তাঁর মৃত্যু ঘটেছে।

শ্রীশৈল একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— আমি জানতাম আপনি এই কথাটা অনুমান করতে পারবেন। কারণ, আসল পরিস্থিতির গম্ভীরতা সঠিক অনুমান না করলে আপনি এখানে সশরীরে আসতেন না। আশা করি, এইবার বুঝতে পারছেন আচার্য কেন আপনার পরামর্শের আমাদের প্রয়োজন। গত একমাস যাবৎ আমাদের রাজ্য শাসকহীন হয়ে রয়েছে। এই গোপন কথা আমাদের মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েক জন ব্যতীত আর কেউ জানে না।

— হুম। কিন্তু, কেন? রাজসিংহাসনে বসতে আর্য চিত্রবর্মার আপত্তি কোথায়?

উত্তরে চিত্রবর্মা বললেন,

— আচার্য, যদি জ্যেষ্ঠভ্রাতার মৃত্যুর সমাধান হওয়ার আগেই আমি রাজসিংহাসনে বসি, তবে জনসাধারণের মনে সন্দেহ জাগবে যে, তাঁকে হত্যা করার পেছনে আমার হাত আছে। আমি এই অপবাদ নিয়ে সিংহাসনে বসতে পারব না, আচার্য!

— তাহলে আপনারা আমাদের কাছে কী সাহায্য চাইছেন?

— আমি চাই আপনি মহারাজ সুবর্মার হত্যারহস্যের সমাধান করুন।

— কিন্তু আমি যে সেই রহস্যের সমাধান করতে পারবই তার নিশ্চয়তা কী? তা ছাড়া তাতে সময় লাগবে। ততদিনের মধ্যে যে পর্বত্যক মলয়কেতু আক্রমণ করবে না, তাই-বা কে বলতে পারে? আমি নিশ্চিত ইতিমধ্যে প্রজাদের মনে সন্দেহ জেগেছে যে, হয়তো তাঁদের রাজা মৃত। আমার কিন্তু মনে হয় না শত্রুরা আগামী দশদিন অপেক্ষা করবে। তারাও নিশ্চিতভাবে সন্দেহ করছে যে, সম্ভবত তাদের আক্রমণ বৃথা যায়নি।

— আপনি ঠিকই বলেছেন, আচার্য। আর সেই সমস্যার একটি সমাধানও আছে। আর সেই সমাধান আমাদের দিতে পারেন, আর্য জীবসিদ্ধি।

জীবসিদ্ধি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল,

— আমি?

— আজ্ঞে হ্যাঁ, মহাশয়। আপনি।

— ক্ষমা করবেন, আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। সত্যি বলতে আপনার পত্রে আমাকে বিশেষ করে আসতে অনুরোধ করার কারণও আমার অনুমানের বাইরে।

চিত্রবর্মা ও শ্রীশৈল একে অপরের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন। চিত্রবর্মা বললেন,

— আমার সঙ্গে আসুন আপনারা। আপনাদের আমি কিছু দেখাতে চাই।

.

চিত্রবর্মা ও মন্ত্রী শ্রীশৈল তাঁদের দুই অতিথিকে নিয়ে কয়েকটি কক্ষ পেরিয়ে একটি বড়ো কক্ষে নিয়ে এল। সেই কক্ষের দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে ভেষজ রঙে আঁকা বেশ কিছু রাজপুরুষের প্রতিকৃতি। একটি বিশেষ ছবির সামনে এসে চিত্রবর্মা বললেন,

— এই হলেন আমাদের রাজা সুবর্মা।

.

ছবিটা দেখতেই চাণক্য ও জীবসিদ্ধির মুখ থেকে বিস্ময়সূচক শব্দ নিজে থেকেই বেরিয়ে এল। কারণ চিত্রতে যে রাজপুরুষটিকে দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে জীবসিদ্ধির আশ্চর্য চেহারাগত মিল। মাথায় শির পরিবর্তে কুঞ্চিত ঘন কেশ ও রাজবেশ বাদে আর কোনো পার্থক্য নেই।

চাণক্য ও জীবসিদ্ধির বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে চিত্রবর্মা বললেন,

— সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর বিবাহের অনুষ্ঠানে পাটলিপুত্র গিয়ে আমিও জীবসিদ্ধিকে দেখে একইরকম বিস্মিত হয়েছিলাম। আশা করি, এইবার আপনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর গতকালের ব্যবহারের জন্যে তাঁকে ক্ষমা করবেন, জীবসিদ্ধি মহাশয়। তিনিও একই কারণে কালকে আপনাকে দেখে বিস্মিত হয়ে চেয়ে ছিলেন আপনার দিকে।

শ্রীশৈল বললেন,

— আমি সত্যিই খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম কাল। এই মিলের কথা রাজকুমার চিত্রবর্মা কয়েক মাস পূর্বে পাটলিপুত্র থেকে ফিরে এসেই বলেছিলেন মহারাজ ও আমাকে। কিন্তু অস্বীকার করব না, আমি কিন্তু বিশ্বাস করিনি যে, এরকম ঘটতে পারে। আমি ভাবছিলাম যে, হয়তো সামান্য মিল আছে, রাজকুমার একটু বেশিই বলছেন। কিন্তু কালকে জীবসিদ্ধি মহাশয়কে দেখেই বুঝতে পারি যে, রাজকুমার কিছু ভুল বলেননি।

তাঁর কথার রেশ ধরেই মৃদু হেসে চিত্রবর্মা বললেন,

— যদিও এই চিত্রটি দশ বছর আগের। অতএব জীবসিদ্ধিকে মহারাজ সুবর্মার ভূমিকায় উত্তীর্ণ হতে গেলে খানিকটা অতিরিক্ত ছদ্মবেশের প্রয়োজন পড়বে। সে- ব্যবস্থা আমি আগেই করে রেখেছি।

— মহারাজের ভূমিকায় মানে? আপনি চান আমিই স্বর্গীয় মহারাজ সুবর্মার ছদ্মবেশ ধরি?

জীবসিদ্ধির ভ্রূ কপালে উঠেছে। চিত্রবর্মা বললেন,

— হ্যাঁ, মহাশয়। অন্তত প্রতিষ্ঠা দিবস অবধি আপনাকে এই কষ্টটুকু কয়েক বার সইতে হবে। শত্রুরা অপেক্ষা করে আছে নিশ্চিত হতে যে, রাজা সুবর্মা মৃত। দশদিন বাদে যদি প্রতিষ্ঠা দিবসে রাজা জনসমক্ষে না আসেন তবে তারা নিশ্চিত হবে যে, তাদের বাণ বিফল হয়নি এবং তৎক্ষণাৎ রাজ্যে হামলা হবে। কিন্তু যদি জীবসিদ্ধি রাজার রূপে একবার দেখা দেন, তবে শত্রুরা দ্বন্দ্বে পড়বে এবং আমরা হাতে আরও সময় পেয়ে যাব। ততদিনে মগধের সেনাও এসে পড়বে। তাঁদের সাহায্যে আমরা রাজ্যের সুরক্ষাব্যবস্থা গুছিয়ে নিতে পারব। অন্তত কুলুতের কথা ভেবে আপনি দয়া করে আমায় নিরাশ করবেন না, আর্য

জীবসিদ্ধি। অনুরোধ রইল।

— চাণক্য এতক্ষণ শুনছিলেন এই কথোপকথন। এইবার বললেন,

— হুম। আপনাদের পরিকল্পনা হল জীবসিদ্ধিকে রাজা সাজিয়ে প্রজাদের সম্মুখে উপস্থিত করা, যাতে শত্রুদের কাছেও এই বার্তা পৌঁছায় যে, মহারাজ সুবর্মা জীবিত। তাতে তাদের কুলূত আক্রমণের পরিকল্পনা দোলাচলে পড়ে যাবে, আক্রমণ করতে বিলম্ব করবে। মগধের সেনাবাহিনী ততদিনে কুলূত প্রবেশ করবে। উত্তম পরিকল্পনা। কিন্তু যদি কেউ চিনে ফেলে যে, এ আসল রাজা নয়?

— তা হওয়া সম্ভব না। কারণ আমরা জীবসিদ্ধিকে রাজবেশে দর্শন করাব রাজমহলের তৃতীয়তলার বারান্দা থেকে। সেখান থেকেই মহারাজ সুবর্মা উৎসবের দিনে অনুষ্ঠান দেখতেন। বারান্দা অনেকটা উচ্চতায় ও জনগণের ভিড় থেকে অনেকটাই দূরে থাকার কারণে কেউই স্পষ্ট দেখতে পাবে না জীবসিদ্ধি মহাশয়ের মুখ।

চাণক্য খানিকটা ভেবে জানতে চাইলেন,

— যদি আমি খুব ভুল না করে থাকি, তবে সেই বারান্দাতেই কি মহারাজ শরবিদ্ধ হয়েছিলেন?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ।

— সেক্ষেত্রে কখনোই আপনার এই পরিকল্পনায় আমি সম্মতি দিতে পারছি না, আর্য। ক্ষমা করবেন।

চিত্রবর্মা ও শ্রীশৈল দু-জনেই অসহায়ের মতো প্রশ্ন করলেন,

— কেন?

— কারণ সেক্ষেত্রে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে, রাজার উপর পুনরায় আঘাত হানা হবে। আবারও হত্যার চেষ্টা করবে গুপ্ত ঘাতক একই উপায়ে। এবং, সেই কারণে জেনেশুনে আমি জীবসিদ্ধিকে প্রাণ সংশয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারি না। যদি না…

— যদি না?

শ্রীশৈলর প্রশ্নের উত্তরে চাণক্যর কথার শেষটুকু জীবসিদ্ধি করল,

— যদি না তার আগেই আচার্য মহারাজ সুবর্মার হত্যারহস্যের সমাধান করে ফেলতে পারেন।

৬.

— আমিও সেটাই চাই, আচার্য। সেই কারণেই তো সর্বপ্রথম আপনার কথাই আমার মাথায় আসে এই সংকটকালে।

চিত্রবর্মা উৎসাহী ভঙ্গিতে জীবসিদ্ধির কথার সমর্থন করল।

চাণক্য একমুহূর্ত ভেবে শ্রীশৈলর উদ্দেশে বললেন,

— মহাশয়, আমি প্রথমেই মহারাজ যে স্থানে শরবিদ্ধ হয়েছিলেন সেই স্থান দেখতে চাই।

মহামন্ত্রী চাণক্য এবং জীবসিদ্ধিকে পথ দেখিয়ে মহলের অন্যপ্রান্তে নিয়ে চললেন।

.

সেগুন কাঠের বড়ো একটি দরজা ঠেলে চারজন একটি প্রশস্ত খোলা বারান্দায় এসে পড়ল। শ্রীশৈল বললেন,

— এই সেই বারান্দা, আচার্য। বারান্দা থেকে নীচে তাকালে দেখতে পাবেন মহলের সামনের বিশাল খোলা প্রাঙ্গণ। এই প্রাঙ্গণের দ্বার বিশেষ কিছু উৎসবের দিনে জনসাধারণের জন্যে খুলে দেওয়া হয়। নাগরিকরা এই প্রাঙ্গণে একত্র হয়ে উৎসব পালন করে এবং রাজা একই বারান্দা থেকে তা প্রত্যক্ষ করেন। এটাই বরাবরের রীতি। সেদিনও দোল উৎসবে মেতে ছিল সকলে। তখনই অঘটন ঘটে গেল।

একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মহামন্ত্রী।

চাণক্য জানতে চাইলেন,

— আমায় সেদিনের দৃশ্য আপনারা দু-জন বর্ণনা করুন। সর্বপ্রথমেই বলুন মহারাজ সুবর্মা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে বা বসে ছিলেন সেই সময়ে।

উত্তর চিত্রবর্মা দিলেন,

— ওই আপনি যেখানে এখন দাঁড়িয়ে, ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মহারাজ। ওখানেই দাঁড়িয়ে দোল খেলা শেষের প্রতিযোগিতা দেখছিলেন।

— আর আপনারা? আপনারা কোথায় ছিলেন?

কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চিত্রবর্মা বললেন,

— ঠিক এইখানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর ওই বারান্দার ডান দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর্য শ্রীশৈল।

সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে চিত্রবর্মার কথা সমর্থন করলেন মন্ত্রী।

— তারপর?

চিত্রবর্মা উত্তর দিলেন,

— আমি মহারাজের দিকেই দেখছিলাম। হঠাৎই খেয়াল করলাম কালো মতো কিছু একটা ছুটে এল মহারাজের দিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ছুটে গেলাম সঙ্গেসঙ্গে তাঁর কাছে। জ্যেষ্ঠভ্রাতার কাছে গিয়ে বসে পড়তেই দেখতে পেলাম তাঁর গলায় বিদ্ধ হয়ে থাকা বাণটা! বুঝতে বাকি রইল না যে, একটু আগে মুহূর্তের জন্যে ধেয়ে আসা বস্তুটি কী!

— হুম। তারপর?

বিমর্ষ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝুলিয়ে চিত্রবর্মা উত্তর দিলেন,

— তারপর আর কী? কিছুই করার সুযোগ পেলাম কই, আচার্য? মহারাজ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন। রাজবৈদ্য বলেছিলেন যে, তিরের আঘাত থেকে যদি-বা মহারাজের প্রাণ বেঁচেও যেত, তীব্র বিষক্রিয়ার থেকে

কোনোভাবেই রক্ষার কোনো উপায় ছিল না তাঁর।

— রাজবৈদ্য মহাশয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে একবার। তাঁর মতামত জানা প্রয়োজন। যাই হোক, এবার আপনি বলুন, অমাত্য শ্রীশৈল। সেদিন কী ঘটেছিল?

মহামন্ত্ৰী খানিকটা বিস্মিত হয়ে বললেন,

— আর্য চিত্রবর্মা যা বললেন, তাই। আমি আর আলাদা কী বলব, আচার্য?

চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,

— একই ঘটনা আলাদা আলাদা দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কতটা ভিন্ন হতে পারে তা আপনার ধারণার বাইরে, আর্য। তক্ষশিলায় এক দর্শনশাস্ত্রের গুণী আচার্য বলতেন যে ‘বাস্তব’ ব্যাপারটাই নাকি আপেক্ষিক এবং সেটি দর্শকদের উপর নির্ভরশীল। আমি আপনার জায়গা থেকে সেইদিন আপনি যা যা প্রত্যক্ষ করেছেন, সেটা জানতে চাই। কৃপা করে আপনি আরও একবার আমাদের বলুন যে, সেইদিন কী ঘটেছিল।

একটু ভেবে নিয়ে শ্রীশৈল বললেন,

— আমি ওই যে… বারান্দার ওখানটায় দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা দেখছিলাম। হঠাৎই মহারাজের দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম উনি কেমন জানি টলমল করছেন এবং পরমুহূর্তে মাটিতে পড়ে গেলেন কাটা গাছের মতোই। আমি ছুটে গেলাম, ততক্ষণে চিত্রবর্মা মহারাজের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন, ঝুঁকে মহারাজকে সোজা করতেই তিনি চিৎকার করে উঠলেন। আমি প্রথমে দেখতেই পাইনি, কাছে যেতেই দেখলাম মহারাজের নিথর দেহ আর তাঁর গলা থেকে বেরিয়ে আছে একটি বাণ! উফ! বড়ো ভয়ংকর সেই দৃশ্য!

— তার মানে মহারাজের কাছে চিত্রবর্মাই আগে পৌঁছেছিল, তারপর আপনি?

— হ্যাঁ।

চাণক্য চিত্রবর্মার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন,

— মহারাজ কীভাবে মাটিতে পড়েছিলেন? মানে, মুখের উপর নাকি পিঠ মেঝেতে ছিল?

— যেমন মন্ত্রী মহাশয় বললেন, ঠিক তাই। জ্যেষ্ঠ উলটে পড়েছিলেন। তাই প্রথমেই আমি তাঁর গলায় লেগে থাকা বাণটি দেখতে পাইনি। মেঝেতে বসে পড়ে তাঁকে সোজা করে শোয়াতেই তিরটা দেখতে পেলাম।

— আশেপাশে তখন আপনারা দু-জন বাদে আর কেউ ছিল না?

— দরজার পাশে দু-জন রক্ষী দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের করার কিছুই ছিল না। তারাও মহারাজকে তিরবিদ্ধ হতে দেখেই ছুটে আসে সঙ্গেসঙ্গেই। নীচের প্রাঙ্গণে উপস্থিত অনেক দর্শকও সম্ভবত রাজাকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখতে পেয়েছিল। কারণ প্রতিযোগিতা তখনই থামিয়ে দেওয়া হয়।

— হুম। আচ্ছা, দোল উৎসব শেষে কীসের প্রতিযোগিতা চলছিল?

— অনেক ধরনের প্রতিযোগিতাই চলছিল, আচার্য। ঘোড়ার দৌড়, মল্লযুদ্ধ, তিরন্দাজি …

চাণক্য হাত তুলে কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিলেন চিত্রবর্মাকে। বললেন,

— কী বললেন? তিরন্দাজি? সেইসময়ে এই প্রাঙ্গণে তিরন্দাজি প্রতিযোগিতা চলছিল?

শ্রীশৈল উত্তর দিলেন,

— অঘটনের মুহূর্তে তিরন্দাজি প্রতিযোগিতাই চলছিল বটে। আপনি যা সন্দেহ করছেন সেটা আমরাও ভেবেছি। কিন্তু কিছুতেই ব্যাপারটা মিলছে না। প্রতিযোগিতায় আমাদের রাজ্যসহ অন্য রাজ্যের অনেক তিরন্দাজও অংশগ্রহণ করেছিল ঠিকই; কিন্তু একজন যত ভালো ধনুর্ধরই হোক না কেন, কয়েকশো লোকের দৃষ্টি এড়িয়ে মহারাজের ওপর বাণ নিক্ষেপ করা কীভাবে সম্ভব?

— অনেক কিছুই প্রাথমিকভাবে অসম্ভব মনে হয়, যতক্ষণ না সেটার উপায় বোঝা যাচ্ছে। যতই অসম্ভব হোক, সেই প্রতিযোগীদের মধ্যেই কেউ যে ছদ্মবেশী আততায়ী হতে পারে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না পুরোপুরি। কিন্তু সেই প্রতিযোগীরা কি বর্তমানে এখানে আছেন এতদিন পরেও? তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে খুব ভালো হত।

উত্তর চিত্রবর্মা দিলেন,

— আছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই এখানেই আছেন এই নাগরে। মহারাজের মৃত্যুর সংবাদ কেউ না জানলেও তাঁর ওপর তির চালিয়ে প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে, এটা সকলেই জানে। অতএব সেইসময়ে প্রাঙ্গণে উপস্থিত কাউকে গত একমাসে নাগর ছাড়তে দেওয়া হয়নি। সেইসময়েই উপস্থিত প্রত্যেকের তল্লাশি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই বিশেষ ধরনের বিষাক্ত তির কারুর কাছ থেকেই পাওয়া যায়নি। তাই আপনাদেরই অপেক্ষায় আমি ঘোষণা করিয়ে দিই যে, মহারাজ সুস্থ হয়ে ওঠা অবধি কেউ যেন রাজধানী ছেড়ে না যায়। প্রতিযোগীদের রাজ্যের খরচে ততদিন অতিথিগৃহে রাখার ব্যবস্থা হবে।

চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,

— আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছেন, আর্য। এই প্রতিযোগীদের সঙ্গে কথা বলব আমি। তবে তার আগে একবার দয়া করে রাজবৈদ্যকে উপস্থিত হতে বলবেন কি? মানে, যিনি মহারাজ সুবর্মার মৃতদেহ পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁর মতামত জানাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

— নিশ্চয়ই, আচার্য। এখুনি তাঁকে খবর দিচ্ছি।

৭.

মধ্য আর্যবর্তর কোনো এক স্থান।

— হে মাতা। শুনছেন?

মাথায় করে এক ঝুড়ি শুকনো কাঠ নিয়ে যাচ্ছিল মসিন্দা। তার সংসারে সে আর তার রুগ্‌ণ স্বামী ছাড়া আর কেউ নেই। তাই কাঠ জোগাড় করতে তাকেই যেতে হয় জঙ্গলে। কিছু কাঠ নিজের বাড়ির রান্নার জন্যে রেখে বাকি কাঠ অন্য কারুর কাছে বিক্রি করে চাল কেনে সে। এভাবেই রোজকার অভাবের সংসার চলে তাদের দুটি মানুষের।

মসিন্দার শরীরে এখনও যৌবন ধরা পড়ে। তাই মসিন্দার স্বামী রুগণ বলে অনেক পুরুষই সুযোগ খোঁজে তার কাছে আসার। মসিন্দা যে কাউকে সুযোগ দেয় না, তাও নয়। অভাব আর খিদে বড়ো বালাই। তাই সে সাধারণত পুরুষদের চোখে তাচ্ছিল্য বা কাম দেখতেই অভ্যস্ত; প্রায় সব নারীই তাতেই অভ্যস্ত। তাই ‘মাতা’ সম্বোধন উপেক্ষা করা কোনো নারীর পক্ষেই কোনোদিন সম্ভব নয়।

মসিন্দা দাঁড়িয়ে দেখল তাকে যে ডেকেছে সেই ব্যক্তির পোশাক অতি সাধারণ। বণিকও হতে পারে, আবার সৈনিকও। হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে ভদ্রগোছের এক যুবক।

— আমাকে বলছেন?

যুবক উত্তর দিল,

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। আসলে আমি একজন পথিক। একজনের সন্ধানে আছি। আমার নাম অক্ষয়। আসছি অঙ্গরাজ্য থেকে।

— হ্যাঁ, আমি এখানকার সবাইকেই চিনি। আপনি যে এই জায়গার মানুষ নন তা বুঝতেই পারছি। কার সন্ধান চাইছেন আপনি?

— শুনেছি এই গ্রামে এক অত্যন্ত গুণী কামার থাকেন? তাঁর সন্ধান দিতে পারেন?

মসিন্দা এইবার সন্দেহের দৃষ্টিতে লোকটিকে আপাদমস্তক দেখে বলল,

— আপনি একজন কামার খুঁজতে এতদূর এসেছেন?

লোকটি হেসে উত্তর দিল,

— আসলে অঙ্গের রাজা নতুন সেনাবাহিনী গড়ে তুলছেন। তাঁর প্রয়োজন প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, বর্ম, ঢাল ইত্যাদির। সেই কারণে সারাদেশ জুড়েই আমার মতো অনেক অনুচর পাঠিয়েছেন গুণী কামারদের খুঁজে নিযুক্ত করতে।

— ওহ, আচ্ছা।

সন্দেহের মেঘ দূর হল মসিন্দার মন থেকে। বলল,

— আমার সঙ্গে আসুন। আমি গ্রামেই ফিরছি। ওখানে বল্লভ আমাদের কামার। আমি তার কাছে আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।

বলে মসিন্দা হাঁটতে শুরু করল খেতের মাঝের সরু আল ধরে। পেছন পেছন অক্ষয়ও আলের পথ ধরল। যেতে যেতে মসিন্দা বলতে লাগল,

— বল্লভের হাতে জাদু আছে। ও দারুণ কাজ জানে লোহার। আপনি যেমন খুঁজছেন ঠিক সেইরকম কাজ পাবেন ওর কাছে দেখবেন।

.

কিছুক্ষণ চলার পর একটি ছোটো কুটির দেখিয়ে মসিন্দা বলল,

— ওই যে, বল্লভের বাড়ি। ওই আওয়াজ শুনুন লোহার, সকাল সকাল কাজ শুরু করে দিয়েছে।

হাসিমুখে অক্ষয় বলল,

— অনেক ধন্যবাদ, মাতা।

মসিন্দা বিদায় নিতে অক্ষয় কামারের বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

.

লোহায় বার বার একই ছন্দে ভারী লোহার আঘাতের শব্দের কারণে একটু জোর কণ্ঠেই অক্ষয় ডাক দিল,

বল্লভ আছেন নাকি?

— কে?

— আমি অক্ষয়, কামার বল্লভের খোঁজে এসেছি।

— ভেতরে আসুন।

কুটিরের একটিই ঘরের এক কোণে কামারশাল বানানো হয়েছে। সেখানেই বসে একটি কুডুলের ফলা ঠুকে ঠুকে কাঠের হাতলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে বল্লভ।

অক্ষয়ের দিকে একবার দেখে নিয়ে জানতে চাইল,

— কী প্রয়োজন বলুন?

অক্ষয় তার অঙ্গবস্ত্রের ভাঁজ থেকে একটি কাপড়ে মোড়া তির বের করে সেটা বল্লভের দিকে এগিয়ে দিয়ে জানতে চাইল,

— এই বাণ কি আপনার বানানো?

বল্লভ একবার সেদিকে দেখেই বলল,

— না। এরকম অদ্ভুত তির আমি জন্মে দেখিনি।

একটা দীর্ঘশ্বাস লুকোল অক্ষয়। তিরটা সে আবার রেখে দিতে যাচ্ছিল, তবুও একবার প্রশ্ন করল,

— কেউ এরকম তির বানায় কি না, জানেন?

বিরক্তির ভঙ্গিতে বল্লভ বলল,

— এই সকাল সকাল কাজের মধ্যে কী অকারণ ব্যাপার নিয়ে পড়লেন, মহাশয়? আমার অনেক কাজ আছে।

অক্ষয় সঙ্গেসঙ্গে বলল,

— আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আপনার সময়ের দাম হিসাবে এই সামান্য মুদ্রা রাখলাম। বল্লভ এইটা আশা করেনি। কিন্তু লোকটি সত্যিই একটি তাম্রমুদ্রা রেখে বেরিয়ে যাচ্ছিল দেখে পিছু ডাকল বল্লভ,

— দাঁড়ান, দাঁড়ান। একবার দেখি ওটা, দিন তো।

.

কামারের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তিরটি এগিয়ে দিল অক্ষয়। বল্লভ সেটি হাতে নিয়ে নাড়িয়েচাড়িয়ে দেখে বলল,

— এটা তো একদম অন্য ধরনের তির। ফলা সূক্ষ্ম, ছোটো, খুব কম ধাতু ব্যবহারে বানানো। খুবই দক্ষ হাতের কাজ। এরকম তির আমাদের এদিকে কেউ বানায় না। তবে…

— তবে?

— তক্ষশিলায় একজন আছেন যিনি এরকম তির বানান বলে শুনেছি।

— কে? তাঁর নাম জানেন?

— বাবাক। সে ভিনদেশি এক অস্ত্র কারিগর। বহুদিন আগে তার কাছে কয়েক মাস আমি শিক্ষা নিয়েছিলাম। বাণটি তো পুরোনো বলে মনে হচ্ছে না। এটা কোথায় পেলেন? এটা আপনার কী প্রয়োজন?

প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার জন্যেই অক্ষয় আরও একটি মুদ্রা বের করে প্রথম মুদ্রাটির পাশে রাখল। তিরটি ফেরত নিয়ে আবার অঙ্গবস্ত্রের মধ্যে ঢেকে ধন্যবাদ জানিয়ে আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না। কুটির থেকে বেরিয়ে গিয়ে জঙ্গলের ধারের উঁচু একটি টিলার দিকে হাঁটা দিল।

টিলার উপরে পৌঁছে মুখে দু-আঙুল দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ করতেই জঙ্গল থেকে একটি পারাবত উড়ে এসে তার সামনে বসল। বোঝা যায় পাখিটি প্রশিক্ষিত।

অক্ষয় কোমরের কাপড়ের ভাঁজ থেকে একটি ফাঁকা মাদুলি, মোম, একটুকরো ভূর্জপত্র এবং একটি পাখির পালকের কলম বের করে আনল। খানিকটা কালো কালিও সঙ্গে ছিল। ভূর্জপত্রে অদ্ভুত বঙ্কিম ভঙ্গিতে অক্ষয় লিখল কয়েকটি ছাড়া—

ছাড়া শব্দশর, কামার, বাবাক, তক্ষশিলা।

এরপর একটি অদ্ভুত কাণ্ড করল সে। কাগজের উপরের বাম কোণ আর নীচের ডান কোনা সামান্য ছিঁড়ে দিল লেখা বাঁচিয়ে। সোজা ভাঁজ না করে প্রথমে আড়াআড়ি, তারপর উপর-নীচের কোনাকুনি ভাঁজ করে সেটাকে ফাঁকা মাদুলির মধ্যে ভরে ফেলল। দুটি চকমকি পাথর ঘষে আগুন ধরিয়ে গলা মোম দিয়ে মাদুলির মুখ আটকে সেটি পারাবতটির পায়ে বেঁধে দিয়ে উড়িয়ে দিল উত্তরের আকাশে। পাখিটি আকাশে উড়ে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করল অক্ষয়। এরপর আরও একবার একই শব্দ করে দ্বিতীয় একটি পাখি ডেকে আগের কাজেরই পুনরাবৃত্তি করল। তবে দ্বিতীয় পারাবতটিকে সে পূর্বের দিকে উড়িয়ে দিল।

প্রথমটির গন্তব্য তক্ষশিলা এবং দ্বিতীয়টির গন্তব্য পাটলিপুত্র। কারণ সকল গূঢ়পুরুষের উপরেই জীবসিদ্ধির নির্দেশ আছে যে, জরুরি গুপ্ততথ্য যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়। সব গুপ্ততথ্য, সংকেত ও সংবাদের একটি করে অনুলিপি যেন রাজধানীতে প্রেরণ করা হয় যাতে কোনোভাবে যদি প্রথম পারাবত তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে নাও পৌঁছায়, তবুও যেন সেই গুপ্ততথ্য মগধের গুপ্তচরদের প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছে যায় দ্বিতীয় পাখির মাধ্যমে। গুপ্তচর চক্রের, দেশের সকল গোপন তথ্যের কেন্দ্রীয়করণ কয়েক বছর আগেই জীবসিদ্ধি শুরু করেছে।

অক্ষয় যদিও মনে করে এধরনের বাড়তি ব্যবস্থা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু জীবসিদ্ধির সঙ্গে বহু বছরের পরিচয়ের কারণে অক্ষয় ভালোই জানে জীবসিদ্ধির সদাসতর্ক স্বভাবের কথা। জীবসিদ্ধির কাছে গুপ্ততথ্য সম্পর্কিত কোনো সতর্কতাই অতিরিক্ত নয়।

৮.

— মাননীয় আচার্য চাণক্যর সাক্ষাতে আমি বড়োই আনন্দিত হলাম। আপনার অনেক নাম শুনেছি লোকমুখে, কিন্তু সম্মুখ সাক্ষাতে গর্বিত অনুভব করছি, মহামতি।

চাণক্য প্রতি-প্রণাম জানিয়ে রাজবৈদ্যকে আসন গ্রহণ করতে বললেন। রাজবৈদ্য বলতে চাণক্য ও জীবসিদ্ধি যেমন অনুমান করেছিল যে, বৃদ্ধ কোনো ব্যক্তি হবে, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কুলূতের রাজবৈদ্য চক্রাচার্য একজন বছর চল্লিশের যুবক। মেদহীন শরীরের কারণে তাঁকে দেখতে আরও বেশি যুবকের মতোই লাগে।

ইনিও কক্ষে ঢুকে জীবসিদ্ধিকে দেখে অবাক হলেন।

চাণক্য তাঁকে বললেন,

— আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা আমাদের জন্যেও বড়োই প্রয়োজনীয়, মহোদয়। বুঝতেই পারছি যে, একটি মস্ত গুপ্ততথ্যের বোঝা আপনাকেও গোপনে নিজের মধ্যে নিয়ে চলতে হচ্ছে গত একমাস ধরে।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চক্রাচার্য বললেন,

— হ্যাঁ, আচার্য। মহারাজ সুবর্মার মৃত্যুসংবাদ যে মুষ্টিমেয় কয়েক জন মাত্র মানুষ জানেন, আমিও তাদের মধ্যে একজন। এতবড়ো একটি দুঃসংবাদ যে গোপন রেখে নির্বিকারে নিত্যকার কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন তা বলে বোঝাতে পারব না।

—  মহারাজকে সেইদিন বারান্দায় ঢলে পড়তে তো অনেকেই দেখেছিল।

— হ্যাঁ।

— আপনার কাছে কেউ জিজ্ঞেস করতে আসেনি যে, মহারাজের কী হয়েছে? কারণ সকলে নিশ্চয়ই জানে যে, আপনিই রাজার চিকিৎসা করছেন।

— হ্যাঁ, তা তো বটেই। রোজই জিজ্ঞেস করছে। আমি গত একমাসে এত মিথ্যে বলেছি, যা সম্ভবত আমার তিন পুরুষের বলা মিথ্যার চেয়ে বেশি।

— হুম। আর অচেনা কেউ আসেনি? রাজার খোঁজ নিতে?

— অচেনা? না, সেরকম তো কেউ আসেননি। যে কয়েক জন এখন অবধি আমার কাছে এসে সেদিনের কথা জানতে চেয়েছেন প্রত্যেকেই আমার পরিচিত।

— সন্দেহজনক কেউ তাহলে আপনার কাছে আসেনি?

— নাহ্। কেউ না।

চাণক্য কী যেন ভাবলেন, তারপর অন্য মূল প্রসঙ্গে চলে গেলেন,

— মহারাজের মৃতদেহ পরীক্ষা করে আপনার অভিমত জানতে চাই।

একটু ভেবে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে দক্ষ ভঙ্গিতে বললেন,

— মহারাজ সুবর্মার মৃত্যু আমার ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই হয়ে গিয়েছিল। মহারাজকে ততক্ষণে যদিও সরিয়ে এনে ভেতরেই কক্ষে পালঙ্কে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল। মহারাজের কণ্ঠে বিদ্ধ ছিল একটি বাণ, তাঁর কণ্ঠনালির বামদিকে। বাণটির ফলা যেখানে শেষ হয়েছে, তার পর থেকে কিছুটা লাল সুতো বাঁধা ছিল। তিরটি এতটাই তীব্রগতিতে কণ্ঠে আঘাত করেছে যে, ফলা ছাড়িয়ে সুতো বাঁধা কিছুটা অংশও ঢুকে ছিল গলায়। বাণটির অবস্থান দেখে মনে হয়েছিল যে, বাজার সম্মুখের দিক থেকেই শর নিক্ষেপ করা হয়েছে নিঃসন্দেহে। তবে সেটা কণ্ঠনালির বামদিকে এমনভাবে বিদ্ধ হয়েছিল যাতে মনে হয় যেন হত্যাকারী সামান্য বামদিকে ছিল। কণ্ঠের আঘাতটি প্রাণঘাতী ছিল, তবে মহারাজের মৃত্যু সেই শরের আঘাতে হয়নি। তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বিষক্রিয়ার ফলে।

চাণক্য প্রতিটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। প্রশ্ন করলেন,

— আপনি নিশ্চিত?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। মহারাজের শরীর কালচে, দাঁত, নখ কালচে নীল হয়ে গিয়েছিল। যদি বাণের আঘাতেই মহারাজের মৃত্যু হয়ে থাকত, তবে তাঁর হৃদ্‌গতি থেমে যেত। এর ফলে রক্তের চলাচল বন্ধ হয়ে যেত এবং বিষ শরীরে রক্তের সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে পড়তে পারত না। নখ কালচে হয়ে যাওয়ার মানে বিষ আগে ছড়িয়েছে, তারপর মহারাজের মৃত্যু হয়েছে।

— তিরের ফলায় বিষ ছিল?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। খুবই ভয়ংকর ও দ্রুত কার্যকরী বিষ। আমি নিজে তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছি। গলার ক্ষতর কালচে রক্তের দাগ থেকেও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ক্ষতে বিষক্রিয়া হয়েছে।

— শরীরে আর কোনো ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন ছিল?

— আজ্ঞে, না আচার্য। আমার অন্তত চোখে পড়েনি।

— মৃতদেহের সর্বাঙ্গে তৈল লেপন করে পরীক্ষা করেছিলেন কি?

সামান্য চমকে উঠে বৈদ্যর ঠোঁটে হাসি ফুটল। একবার জীবসিদ্ধি এবং তারপর চাণক্যর দিকে তাকিয়ে বললেন,

— আমার সত্যিই জানা ছিল না যে, এই বিষয়েও আপনার এতটা জ্ঞান আছে, আচার্য। মৃতের শরীরে তেল মাখিয়ে পরীক্ষা করলে যে ছোটোখাটো আঘাত বা ক্ষতচিহ্নও সহজেই চোখে পড়ে, এই পদ্ধতি খুব বেশি মানুষের জানা নেই। আমি তো জানতাম আপনার বিষয় অর্থশাস্ত্র।

চাণক্য ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে উত্তর দিলেন,

— অর্থশাস্ত্র একটি গোটা দেশকে সুশাসনে রাখার উপায় বলে, মহাশয়। দেশ মানে শুধুই অর্থনীতি, কর, রাজা, প্রজা নয়। এর সঙ্গেই থাকে অপরাধ, হত্যা এবং তদত্ত। এইসবের জ্ঞান ছাড়া অর্থশাস্ত্র অসমাপ্ত। আমি গত কয়েক বছর ধরে অর্থশাস্ত্রর একটি সম্পূর্ণ পুস্তক লেখার কাজে নিমজ্জিত আছি। তাতে শাসনব্যবস্থা ছাড়াও এই সকল বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব।

— এ তো অতি উত্তম উদ্যোগ! আমার শুভকামনা রইল। এবং, আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি যে, আমি মহারাজ সুবর্মার মৃতদেহ তৈল লেপন করেই পরীক্ষা করেছি। কণ্ঠে বিষাক্ত তিরের ক্ষতটি ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন ছিল না।

চাণক্য নিজের বুকের উপর পড়ে থাকা লম্বা কেশশিখায় আনমনে হাত বুলিয়ে শুধু বললেন,

— হুমম। আর, শবব্যবচ্ছেদ?

চক্রাচার্য সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বললেন,

— গোপনীয়তার স্বার্থে মহারাজের শবব্যবচ্ছেদও আমি নিজেই করেছি, আচার্য। শুধুমাত্র বিষক্রিয়ার প্রমাণ সুস্পষ্ট।

চাণক্যকে বেশ কিছুটা সন্তুষ্ট মনে হল জীবসিদ্ধির। বোঝাই যাচ্ছে রাজবৈদ্যর পরীক্ষা পদ্ধতির বিবরণ শুনে তিনি খুশি হয়েছেন। চাণক্য বললেন,

— হুমম। আপনি খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে মহারাজের প্রতি নিজের শেষ দায়িত্বটি পালন করেছেন, মহাশয়। আপনাকে ধন্যবাদ এবং আপনার সঙ্গে কথা বলতে আপনাকে এখানে ডেকে পাঠিয়ে আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যে আশা করি আমাদের ক্ষমা করবেন। আপনি বিচক্ষণ মানুষ তাই নিশ্চয় বুঝতেই পারছেন যে, এইসব তথ্য আমার জানা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, আপনি কি পাকস্থলীতে অবশিষ্ট খাদ্য অগ্নিতে দিয়েও পরীক্ষা করেছিলেন?

এই প্রথমবার খানিকটা থতোমতো খেলেন বৈদ্য। উত্তর দিলেন,

— না, তা করিনি। কিন্তু, কেন?

— আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন যে, অগ্নিতে ‘চিট চিট’ শব্দ ও অগ্নিশিখায় এবং ধোঁয়ায় রঙের পরিবর্তন লক্ষ করা গেলে, তা বিষক্রিয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।’

অপ্রতিভ দেখাল চক্রাচার্যকে। কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

— না, আচার্য। তা আমি করিনি। আসলে তীব্র বিষের উপস্থিতি যেখানে কণ্ঠের ক্ষতস্থান ও তিরের ফলায় প্রমাণিত, সেখানে আবার আলাদা করে বিব খোঁজার প্রয়োজন বোধ করিনি। তা করার কি প্রয়োজন থাকতে পারে, মহামতি?

— তা হয়তো নেই। আসলে দেখছিলাম আপনি কতটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কাজ করেছেন। আসলে এতে গোটা ব্যাপারটা একটা সম্পূর্ণতা পেত। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

হাতজোড় করে চক্রাচার্য বললেন,

— আমায় লজ্জা দেবেন না, আচার্য। আমার সৌভাগ্য যে, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল আজকে। যদিও এই সাক্ষাতের কারণটা বড়োই দুঃখজনক আমি প্রার্থনা করি যেন মহারাজের হত্যাকারী ধরা পড়ে এবং চরম শাস্তি পায়। প্রয়োজনে আমায় নির্দ্বিধায় আবার স্মরণ করবেন। আজকে তবে আজ্ঞা দিন। প্রণাম।

*এই অধ্যায়তে উল্লিখিত সকল মৃতদেহের শরীরে বিষ বা আঘাত চিহ্নের পরীক্ষা করার পদ্ধতির উল্লেখ অর্থশাস্ত্রে করা আছে।
মৃতের পাকস্থলীতে পাওয়া খাবারে বিষ থাকলে সেই খাদ্যের অংশ আগুনের সংস্পর্শে আনলে ‘চিট চিট’ জাতীয় শব্দ হয় বা আগুনের মধ্যে রামধনুর মতো রং দেখা দেয়।
শরীরে আঘাত বা ক্ষত খোঁজার জন্যে মৃতদেহে তেল মাখিয়ে পরীক্ষা করার পদ্ধতিও অর্থশাস্ত্রে চাণক্য লিখে গিয়েছেন।

৯.

— ওহে জীবসিদ্ধি, এত একাগ্রচিত্তে কী ভাবছ?

নাগরের রাজমহলে চাণক্যর কক্ষে বসে জীবসিদ্ধি প্রদীপের শিখার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে কিছু ভাবছিল। চাণক্য তাঁর সন্ধ্যাকালীন আহ্নিকে চোখ বুজে ধ্যানমগ্ন হয়ে ছিলেন এতক্ষণ। জীবসিদ্ধির থাকার ব্যবস্থা চাণক্যর কক্ষের মুখোমুখি কক্ষেই করা হয়েছে। জীবসিদ্ধির নির্দেশে তাদের দ্বারের বাইরে দু-জন প্রহরী সর্বক্ষণ পালা করে প্রহরা দিচ্ছে। না, কুলূতের প্রহরীদের উপর জীবসিদ্ধি ভরসা করে না, তাই তাঁদের সঙ্গেই আসা মগধের সৈনিকদেরকেই প্রহরার দায়িত্ব দিয়েছে সে।

রাতের আহার দু-জনেরই শেষ। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যেতে ইচ্ছা করছে না জীবসিদ্ধির। তাই আচার্যকে বিরক্ত না করে তাঁরই কক্ষে চাণক্যর আহ্নিক সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা করছিল। চিন্তায় ডুবে থাকার জন্যে সে খেয়ালই করেনি কখন আচার্য চাণক্য চোখ খুলে ধ্যানভঙ্গ করেছেন ইতিমধ্যে।

চাণক্যর প্রশ্নে তাঁর দিকে ফিরল জীবসিদ্ধি। হঠাৎই তার গুরুর সঙ্গে খানিকটা কৌতুক করার ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। চাণক্যর প্রতি ছদ্ম আহ্বান জানানোর ভঙ্গিতে জীবসিদ্ধি উত্তর দিল,

— আপনি তো বলেন আপনি নাকি মানুষের মনের কথা পড়তে পারেন। তবে নিজেই বলুন দেখি, কী ভাবছিলাম।

— এ তোমার মিথ্যা অভিযোগ, জীবসিদ্ধি। মনের কথা পড়ে ফেলার ক্ষমতা আমার নেই এবং এ দাবি আমি কোনোদিন করিনি। আমি বলি যে, মানুষের অভিব্যক্তি, মুখের ভাব, শারীরিক ভাষা অভ্যস্ত চোখে পাঠ করা সম্ভব, যা থেকে অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তিনির্ভর অনুমান করা সম্ভব যে, তার মনে কী চলছে।

— ওই একই হল। তা আপনার ‘যুক্তিনির্ভর অনুমান’ আমার ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য তা বলুন দেখি।

চাণক্য তার ছাত্রের এহেন স্পর্ধায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হন না। গত কয়েক বছরে তাঁদের সম্পর্ক গুরু-শিষ্য স্তর পার করে এখন অনেকটাই পিতা-পুত্রের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জীবসিদ্ধিও আজকাল সাহস করে তার আচার্যকে অনেক কিছুই বলে ফেলে যা ছাত্রাবস্থায় তার পক্ষে ভাবাও দুষ্কর ছিল। তারা উভয়েই জানে যে, জীবসিদ্ধি তার আচার্যের প্রতি কতটা অনুগত এবং তাঁকে নিজের মনে সর্বোচ্চ সম্মানের আসনেই রাখে। তাই তাঁদের মধ্যে এহেন মশকরা চলে।

চাণক্যর ঠোঁটের একপাশে হাসির আভাস দেখা গেল। তিনিও ছদ্ম তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন,

— এইটা তো খুব সহজ। তুমি মগধের কথা ভাবছিলে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে তুমি পাটলিপুত্রর সুরক্ষার ব্যাপারে ভাবছিলে।

জীবসিদ্ধি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে চাণক্যর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে উত্তর দিল,

— একদম ভুল। আমি আজকে রাত্রের আহারে সুস্বাদু আপেলটির কথা ভাবছিলাম।

— হুমম। এই যে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে না পারা, ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলা, এটাও কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ। এর থেকে বোঝা যায় যে, সেই ব্যক্তি সত্য গোপন করার চেষ্টা করছে। নিজের গুরুকে মিথ্যা কথা বলা মহা পাপ হে, জীবসিদ্ধি। তাই স্বীকার করেই নাও যে, আমি ঠিক অনুমানই করেছি।

এইবার সশব্দে হেসে উঠল জীবসিদ্ধি এবং তার হাসিতে যোগ দিলেন চাণক্য। জীবসিদ্ধি হাসির মাঝেই বলল,

— আপনার এই শারীরিক ভাষা পাঠের পদ্ধতিও সম্ভবত আপনি নিজের পুস্তকে নথিভুক্ত করতে চলেছেন?

— অবশ্যই। কে বলতে পারে, হয়তো সুদূর ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি অবলম্বন করেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

জীবসিদ্ধি পরাজিতর মতো দু-হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে বলল,

— বেশ, বেশ। আমি পরাজয় স্বীকার করছি। কিন্তু আপনি কীভাবে অনুমান করলেন যে, আমি মগধের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত?

— সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? তুমি বরাবরই সাবধানী এবং সেই কারণেই তুমি এযুগের শ্রেষ্ঠ গূঢ়পুরুষ** হতে সক্ষম হয়েছ। তাই রাজধানী ছেড়ে বেশিদিন আমাদের বাইরে থাকায় তোমার মনে আশঙ্কা আছে। তা ছাড়া আজকে অন্তত দু- বার আমি তোমাকে মগধের সৈনিকদের কাছে খোঁজ নিতে দেখেছি যে, পারাবত মারফত কোনো পত্র পাটলিপুত্র থেকে এসেছে কি না। অতএব আমার পক্ষে অনুমান লাগানো বেশ সহজ।

— আর-আপনি চিন্তিত নন?

— নাহ্। রাক্ষস রাজ্য সামলে নেবে।

কথাটা বলার সময়ে চাণক্য জীবসিদ্ধিকে নজর করছিলেন। প্রদীপের আলোয় তিনি স্পষ্ট দেখলেন জীবসিদ্ধির মুখ গম্ভীর হল। চাণক্য সরাসরি প্রশ্ন করলেন,

— তুমি বোধ হয় এখনও অমাত্য রাক্ষসকে বিশ্বাস করে উঠতে পারোনি।

জীবসিদ্ধি আরও গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল,

— না। আমি কাউকেই বিশ্বাস করি না।

— আমায় করো তো?

— হ্যাঁ।

— আর আমি রাক্ষসের উপর বিশ্বাস রাখি। তাই তোমারও কিছুটা রাখা উচিত। কিছুটা অধৈর্য ভঙ্গিতে জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,

— কিন্তু কেন? কেন তাঁর উপর আপনার এই আস্থা? সে কি এতগুলো বছর ধরে ধনানন্দর প্রতি অনুগত ছিল না? আমাদের প্রধান শত্রু তো আসলে সে-ই ছিল।

— ভুল করছ, জীবসিদ্ধি। আমি রাক্ষসের উপর নয়, নিজের মানুষের প্রবৃত্তি চেনার ক্ষমতার উপর আস্থা রাখি। আর অমাত্য রাক্ষসের নন্দের প্রতি আনুগত্য ছিল না, তার আনুগত্য ছিল মগধের প্রতি। সে জানে যে মগধকে রক্ষা করার উপায় হল চন্দ্রগুপ্তকে রক্ষা করা। এবং, সে তা করবেই।

জীবসিদ্ধি সন্তুষ্ট হয়েছে বলে মনে হল না। উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

— আমি জানি না, আচার্য। একথা সত্যি যে, রাক্ষস যেদিন থেকে আমাদের পক্ষে এসেছে সেদিন থেকেই তার প্রতিটি গতিবিধির উপর আমি নজর রেখেছি। সন্দেহজনক কিছুর ইঙ্গিতই যে তার দিক থেকে দেখা যায়নি, সেটাও স্বীকার করি। কিন্তু এখন, আপনার বা আমার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে যে সে আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে না, তার নিশ্চয়তা কই? যাই হোক। শুভরাত্রি, আচার্য।

জীবসিদ্ধি চাণক্যর কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিক দরজা টেনে দিল। চাণক্য বন্ধ দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসলেন। তারপর প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে মেঝের উপর গরম কাপড় পেতে করা বিছানায় শুয়ে পড়লেন।

***

সিন্ধুপ্রদেশের রাজসভায় নিজের মদিরা প্রবর্তিত নিদ্রা ভেঙে উঠে আসতে বাধ্য হয়েছেন মহারাজ সিন্ধুসেনা। এই গভীর রাত্রিতে এক দূত তাঁর কাছে একটি পত্র বয়ে নিয়ে এসেছে। পত্রের প্রেরকের নাম শুনে সিন্ধুসেনার নেশার ঘোর কাটতে সময় লাগেনি। যথাশীঘ্র এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে সেই দূতকে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত করার নির্দেশ দিয়েছেন সিন্ধুসেনা।

দু-জন সৈনিক তাঁর সামনে এক ব্যক্তিকে এনে হাজির করল। সেই ব্যক্তি মুখ ঢেকে এসেছে গোপনীয়তার স্বার্থে। মহারাজের সামনে এসে মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে অভিবাদন জানাল লোকটি,

— মহারাজ সিন্ধুসেনার জয় হোক। আমি নিপুণক, এসেছি মগধ থেকে। এই গভীর রাত্রে আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী, তবে গোপনীয়তা রক্ষার্থে অন্ধকারের চেয়ে সহজ মাধ্যম আর কীই-বা হতে পারে। আমি আপনার জন্যে আমার প্রভুর পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।

— এই প্রস্তাব কি মগধের পক্ষ থেকে আসছে?

— আজ্ঞে না। এবং, এটা অত্যন্ত জরুরি যেন মগধ কোনোভাবেই এই পত্রের কথা জানতে না পারে। আমার প্রভু এই প্রস্তাব গোপনে আপনার অবধি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন।

যদিও প্রভুর নামটা সিন্ধুসেনা আগেই শুনেছে, তবুও আরও একবার নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করলেন,

— কে তোমার প্রভু?

— অমাত্য কাত্যায়ন!

দূত যুবকটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন মহারাজ সিন্ধুসেনা। জিজ্ঞেস করলেন,

— এই পত্র যে সত্যিই অমাত্য রাক্ষ… মানে, অমাত্য কাত্যায়নের পক্ষ থেকে আসছে, তার প্রমাণ কী?

উত্তর না দিয়ে দূত নিজের কোমরে বাঁধা কাপড়ের ছোট্ট পুঁটলি থেকে একটি ভূর্জপত্র বের করে রাজার দিকে এগিয়ে দিল। সিন্ধুসেনা সেটি হাতে নিয়ে ভাঁজ খুলে প্রদীপের আলোর কাছে নিয়ে গিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখলেন।

পত্রের একদম শেষে দেখতে পেলেন তাঁর পরিচিত একটি চিহ্ন। অমাত্য রাক্ষসের অঙ্গুরীয় মুদ্রা*** সিলমোহর!

*সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে তার শারীরিক ভাষা, অভিব্যক্তি বা চোখের দৃষ্টি থেকে সে সত্য বলছে নাকি মিথ্যা তা বোঝার উপায়ের উল্লেখ অর্থশাস্ত্রে আছে।

**গূঢ়পুরুষ – গুপ্তচর/গোয়েন্দা / spy।

***অঙ্গুরীয় মুদ্রা – signet ring, নির্দিষ্ট ব্যক্তির চিহ্ন বা সিলমোহর খোদাই করা আংটি।