শর-শাস্ত্র – ১

১.

সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর সভাকক্ষ। ভারী মখমল ও রেশমের পর্দায় সুসজ্জিত। মধ্যিখানের ছাদ থেকে সবচেয়ে বড়ো ঝাড়বাতিটি জ্বলছে। এর চেয়ে বেশি আলোর প্রয়োজন এই মুহূর্তে নেই কারণ এখন সন্ধ্যার সময় বলে দিনের ভিড় নেই। শুধুমাত্র তিনজন ব্যক্তি বসে আছেন। রাজসিংহাসনে আসীন স্বয়ং সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, তাঁর পাশের আসনেই বসে আছে জীবসিদ্ধি এবং তৃতীয় ব্যক্তি তাঁদের গুরু আচার্য চাণক্য।

চাণক্য অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে কী জানি ভাবছেন, চন্দ্রগুপ্ত এবং জীবসিদ্ধি নিজেদের মধ্যেই ফিসফিস করে হাস্যকর কিছু আলোচনা করছেন কারণ তাঁদের দু-জনেরই ঠোঁটে মিটমিটে হাসি। আলোচনা ফিসফিস করে করার কারণ যাতে তাঁদের আলোচনা চাণক্য শুনতে না পান।

.

— আচার্যর প্রেমিকা ছিল এটা বিশ্বাস করার চেয়ে, ভবিষ্যতে মানুষ আকাশে উড়তে পারবে এটা বিশ্বাস করা আমার পক্ষে সহজ।

কথাটা বলে চন্দ্রগুপ্ত আরও একবার আড়চোখে তাঁদের গুরুর দিকে দেখে নিলেন। জীবসিদ্ধি হাসি লুকোতে মুখে হাত রেখে বলল,

— খবরটা কিন্তু সোজা গান্ধার থেকে আসছে, হে ভ্রাতা। আমার এক অন্যতম বিশ্বাসযোগ্য সূত্র মারফত জানতে পেরেছি যে, পাষাণকঠিন চাণক্যর প্রতিও নাকি একজন নারী দুর্বল ছিলেন। এবং, সেই নারীকে আমরাও দেখেছি ছাত্রাবস্থায়।

চন্দ্রগুপ্তর চোখ কৌতূহলে চকচক করে উঠল,

— সে কী হে? কে সেই নারী?

— ভদ্রে, সুভাষীনিকে মনে আছে?

চন্দ্রগুপ্তর মুখ অল্প খুলে গিয়েছে, চোখে বিস্ময়ের ছাপ। আরও একবার গুরুদেবের দিকে চোরাদৃষ্টিতে দেখে নিয়ে উত্তেজনা চেপে প্রশ্ন করলেন,

— প্রধানাচার্য ভদ্রভট্টর ভগিনী সুভাষীনি?

সবজান্তার মতো উপর-নীচে মাথা নাড়ল জীবসিদ্ধি। চন্দ্রগুপ্তকে চমকে দিয়ে পেরে সে প্রসন্ন হয়েছে। বলল,

— আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম নামটা শুনে। আসলে আমরা তখন কিশোর মাত্র, এত কিছু বুঝতাম না। কিন্তু তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে ভদ্রে, সুভাষীনি মাঝে মাঝেই আসতেন গুরুকুলে? আমাদের মতোই মুগ্ধ হয়ে আচার্যর পাঠ শুনতেন। আমরা ভাবতাম আমাদের মতোই হয়তো তিনিও আচার্যর একজন গুণমুগ্ধ। কিন্তু কে বলতে পারে, হয়তো তিনি আচার্যকে গুরুর চেয়েও বেশি কিছু ভাবতেন মনে মনে।

চন্দ্রগুপ্ত ছাদের দিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করলেন তাঁর কৈশোরের কথা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— হতেই পারে। নারীর মন কেই-বা কবে বুঝেছে।

সুযোগ পেয়ে জীবসিদ্ধি কটাক্ষ করে বলল,

— কেন? এখনও রানি দুর্ধরার মন বুঝতে পারলেন না, হে সম্রাট?

চন্দ্রগুপ্ত মুখ ভার করে বললেন,

— তিনি আমার উপর রেগে আছেন গতকাল থেকে। কিন্তু কেন রেগে আছেন সে-বিষয়ে আমার কোনো ধারণাই নেই। কৌতুক করে নাও ভ্রাতা সময় থাকতে। বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনিও শীঘ্রই তোমার কপালে দাম্পত্য সুখ প্রদান করেন। এমনিতেই তোমার এই সন্ন্যাসবেশ আমার দু-চোখের বিষ!

জীবসিদ্ধি পালটা কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল তখনই চাণক্যর গলা শোনা গেল,

— তোমার প্রধানমন্ত্রীর আর কতক্ষণ বিলম্ব হবে হে, চন্দ্রগুপ্ত? আমার সন্ধ্যাকালীন প্রার্থনার সময় হয়ে গেল যে।

কথা শেষ হবার আগেই বাইরে থেকে প্রহরীর কণ্ঠ শোনা গেল,

— প্রধানামাত্য মহোদয় সভায় পদার্পণ করছেন!

.

রেশমের পর্দা সরিয়ে সভায় অমাত্য রাক্ষস প্রবেশ করলেন। তাঁর একহাতে একটি ভূর্জপত্র এবং অন্যহাতে লাল কাপড়ে মোড়ানো কিছু একটা রয়েছে। এগিয়ে এসে তিনি সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত এবং চাণক্যকে প্রণাম জানালেন। চন্দ্রগুপ্ত ইশারা করতে তিনি নিজের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসলেন সম্রাটের ঠিক ডান দিকে।

— আপনাদের অপেক্ষা করানোর জন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আসলে আজকে রাজকোষে জমা পড়া রাজকরের হিসাবটা কোষাধ্যক্ষের থেকে আজকেই বুঝে না নিলে অকারণ বিলম্ব হত। স্বর্ণমুদ্রা ব্যতীত শুধুমাত্র রৌপ্যমুদ্রা ও অন্যান্য ছোটো মুদ্রায় এরকম বিপুল অর্থের হিসাব রাখতে সমস্যা হচ্ছে সকলেরই।

চন্দ্রগুপ্ত ও জীবসিদ্ধি একে অন্যের প্রতি একবার শুধু অস্বস্তিসূচক দৃষ্টি বিনিময় করল। স্বর্ণমুদ্রার কথা উঠতেই তাঁদের দু-বছর আগের ঘটনার কথা স্মরণে এসে যায় বার বার। চাণক্য অবশ্য নির্বিকার। তাঁর মুখ দেখে তাঁর মনে কী চলে বোঝার উপায় নেই।

অমাত্য রাক্ষস বললেন,

— আপনাদের অযথা আর সময় নষ্ট না করে কী কারণে আজকের আলোচনা সভা, সেটা বলি। আজকে সকালে এই পত্র এসেছে উত্তরের পার্বত্য প্রদেশের আমাদের মিত্ররাজ্য কুলূতের রাজধানী নাগর থেকে। পত্রটি আগে আমি আপনাদের পাঠ করে শোনাই।

সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর জয়।

বড়ো বিপদে পড়ে কুলূত আজকে মগধের সাহায্যপ্রার্থী হয়েছে। আমাদের রাজা সুবর্মাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এই মুহূর্তে তিনি শয্যাশায়ী। প্রতিবেশী রাজ্য অর্থাৎ পর্বত্যকার রাজা মলয়কেতু আমাদের সীমানায় সৈন্যশিবির বসিয়ে অপেক্ষারত। রাজার এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে সে আমাদের রাজ্য দখল করতে তৎপর। প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার মানুষের ভিড়ে ও কড়া সুরক্ষাবেষ্টনীর মধ্যেও কোন অলৌকিক উপায়ে আততায়ী মহারাজের উপর শর নিক্ষেপ করতে সক্ষম হল এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই।

এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের মহামতি চাণক্যর বুদ্ধিমত্তা ও উপদেশ বড়োই প্রয়োজন। আমি প্রার্থনা করি তিনি যত শীঘ্র সম্ভব আমাদের রাজ্যে পদার্পণ করে আমাদের এই সমূহ বিপদের থেকে উদ্ধার হওয়ার মার্গ নিদর্শন করুন।

আমাদের সেনাসংখ্যা সীমিত এবং আক্রমণ হলে পর্বত্যকার বিপুল সেনার প্রতিরোধ করতে সক্ষম নয়। মগধের কাছে আমার অনুরোধ যেন অবিলম্বে তার সেনাবলে আমাদের সাহায্য করেন। এক বিশেষ প্রয়োজনে আর্য জীবসিদ্ধির উপস্থিতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে ছদ্মবেশে আপনাদের এই রাজ্যে প্রবেশ করার অনুরোধ রইল। আশা রাখি, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত আমাদের এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

ইতি,

চিত্রবর্মা

পাঠ শেষ করে প্রধানামাত্য রাক্ষস সম্রাটের দিকে তাকালেন। মুখে তাঁর  বরাবরের মতোই কোনো ভাব প্রকাশ পাচ্ছে না।

চন্দ্রগুপ্ত দু-দিকে ঘাড় নেড়ে বললেন,

— যেহেতু কুলত মৌর্য সাম্রাজ্যের অঙ্গ অতএব সাহায্য আমি করব। আগামীকালই আপনি উত্তরে উপযুক্ত সংখ্যক সেনা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। কিন্তু আচার্যকে মগধের সীমানার বাইরে পাঠানোর প্রশ্নই আসে না।

কিছুটা থেমে চাণক্যর দিকে তাকিয়ে চন্দ্রগুপ্ত আবার বললেন,

— গতবার আচার্যকে রাজ্যের বাইরে যেতে দিয়ে আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। না না, এই পত্র যে কোনো ফাঁদ নয় তার কী নিশ্চয়তা আছে? আচার্যর অনুপস্থিতিতে মগধের উপর আবার কোনো বিপদ ঘনিয়ে আসবে না তার নিশ্চয়তা কী?

চাণক্য এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিলেন, এইবার বললেন,

— গতবারের তুলনায় এইবার একটি গুরুত্বপূর্ণ তফাত আছে, সম্রাট। আমি নিশ্চিত যে, আমার অনুপস্থিতেও মগধ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। কারণ এখন মগধের প্রধানমন্ত্রী পদে আছেন মহামতি কাত্যায়ন। তাঁর বুদ্ধি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে।

নিজের প্রশংসা নিজেরই একদা প্রধান-শত্রুর মুখে শুনে তিনি খুশি হলেন কি না সেটা যথারীতি তাঁর মুখ দেখে বোঝা গেল না। চন্দ্রগুপ্ত এইবার তাঁর দিকে ফিরে বললেন,

— ক্ষমা করবেন প্রধানামাত্য, আমার কথার ভুল ব্যাখ্যা করবেন না। আমি আপনার কর্মনিষ্ঠা ও বুদ্ধির প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রাখি। কিন্তু তবুও আপনিও নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, আচার্য চাণক্যর মগধ ছেড়ে যাওয়াটা বিপজ্জনক। এমনকী তাঁর প্রাণ সংশয়ও আছে।

সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে অমাত্য রাক্ষস বললেন,

— আমি সম্রাটের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। যতদিন না আচার্য শকুনি ধরা পড়ছে, ততদিন আপনার পাটলিপুত্র ছেড়ে বেরোনোও নিরাপদ নয়।

চন্দ্রগুপ্ত বললেন,

— প্রসঙ্গত, আর্য জীবসিদ্ধি, আপনার গুপ্তচররা আচার্য শকুনির বিষয়ে কিছু সন্ধান পেয়েছে কি?

জীবসিদ্ধি হতাশ ভঙ্গিতে বলল,

— এখনও অবধি না। আসলে আমাদের হাতে সূত্র প্রায় কিছুই নেই। আমাদের কাছে একমাত্র সূত্র হল কয়েকটি বিষাক্ত বাণ যা দিয়ে আমাদের সৈনিকদের মগধে এবং ইন্দ্রজিৎকে তক্ষশিলায় হত্যা করা হয়েছিল। আমার কিছু বিশেষ গূঢ় পুরুষ সেই বিশেষ বাণ এবং তাতে ব্যবহার হওয়া বিষের সূত্র ধরে সারাদেশে খোঁজ করছে গত দু-বছর ধরে। কিন্তু গোটা আর্যাবর্তর এই বিশাল পরিধিতে মাত্র এই সূত্রের উপর নির্ভর করে কারুর সন্ধান পাওয়া কতটা কঠিন তা আপনারা অনুমান করতেই পারছেন।

চাণক্য বললেন,

— কী বলছে তোমার পক্ষিরা?

— ভিন্ন ভিন্ন সংবাদ দিচ্ছে সকলে। সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হল, আমার তিনজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত গূঢ়পুরুষ স্বতন্ত্র তিনটি সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, আচার্য শকুনি গান্ধারে বিদ্রোহীদের হাতে চার বছর পূর্বেই নিহত হয়েছেন, যা আমরা জানি সত্য নয়।

চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,

— এগুলো রাজনীতির পরিচিত কৌশল। আমার নিশ্চিত মৃত্যুসংবাদও যে কতবার মগধ পেয়েছিল তার হিসাব কাত্যায়ন দিতে পারবেন।

জীবসিদ্ধিকে খুব একটা সন্তুষ্ট মনে হল না। নিজের মনেই একবার বলল,

— কিন্তু আমার সূত্রগুলো এতটাই বিশ্বস্ত যে, তাঁদের এভাবে ভুল পথে কীভাবে শকুনি চালনা করতে সক্ষম হলেন সেটাই ভেবে আমি বিস্মিত। তাঁরা এর আগে কখনো বিফল হননি। প্রতিবার সঠিক খবর এনেছেন আমার কাছে

চন্দ্রগুপ্ত বললেন,

— আমি সম্পূর্ণ আস্থা রাখি জীবসিদ্ধির গুপ্তচর বাহিনীর উপর। আমিও নিশ্চিত যে, খুব শীঘ্রই আমরা কোনো একটা সূত্র পাবই। কিন্তু আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। আচার্যকে বা জীবসিদ্ধিকে মগধের বাইরে যেতে দেওয়ার কারণ দেখি না। মগধের রাজসভায় বিচক্ষণ অমাত্যের অভাব নেই। তাঁদেরই কাউকে যেতে বলুন আপনি প্রধানামাত্য মহোদয়।

অমাত্য রাক্ষস কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। সেটা লক্ষ করেই চাণক্য বললেন,

— আপনার বোধ হয় আরও কিছু বলার ছিল, মাননীয়?

অমাত্য রাক্ষস একবার চাণক্য এবং একবার চন্দ্রগুপ্তর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,

— পত্রের সঙ্গে আরও একটি বস্তু তারা পাঠিয়েছে। মহারাজ চিত্রবর্মা আততায়ী যে তিরের আঘাতে আহত হয়েছেন, সেই বাণটিও পাঠিয়েছেন।

কোলের উপর লাল কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা জিনিসটা সাবধানে বের করলেন অমাত্য রাক্ষস।

তিরের মুখে একটুকরো কাপড় জড়িয়ে রাখা হয়েছে যাতে সেটার বিষাক্ত ফলার সংস্পর্শে কেউ না আসে। কিন্তু তবুও বোঝা যায় সেটার আকার সাধারণ তিরের চেয়ে আলাদা। পালক লাগানো অন্য মাথায় লাল সুতো অতি যত্নে পেঁচানো। এই বিশেষ ধরনের বাণ সকলের অতিপরিচিত।

জীবসিদ্ধি এবং চন্দ্রগুপ্ত একসঙ্গে বলে উঠল,

— শকুনি!

* কুলূত / কিলিত – বিয়াস নদীর উপত্যকায় অবস্থিত রাজ্য, বর্তমানে যা হিমাচল প্রদেশের অন্তর্গত। ‘কুলু’ নামটি সম্ভবত এখান থেকেই এসেছে।

২.

চাণক্যর কপালে চিন্তার ভাঁজ। একদৃষ্টিতে তিরটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

— মগধের কাছে জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য প্রার্থনার কারণটা বোধ হয় আমি অনুমান করতে পারছি। কুলূতরাজ সুবর্মা বোধ হয় ইহজগতে নেই। এই বাণের ফলায় থাকা বিষ মানুষের রক্তের সংস্পর্শে এলে সেই ব্যক্তির মৃত্যু অবধারিত। পত্রতে রাজার মৃত্যুসংবাদটি লেখা হয়নি কারণ সম্ভবত রাজার মৃত্যুর খবর তারা সাধারণের কাছে প্রকাশ করেনি এখনও।

জীবসিদ্ধি বলল,

— পত্র মাঝপথে যদি শত্রুপক্ষের হাতে পড়ে যায়, সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই পূর্ণ সত্য লেখা হয়নি। আমার কাছে খবর আছে যে, কয়েক সপ্তাহ পূর্বে মহারাজ সুবর্মা তাঁর মহলের বারান্দা থেকে বসন্ত উৎসব পর্যবেক্ষণ করার সময়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রাজমহলের বাইরে জমায়েত হওয়া অনেক মানুষই তা দেখেছে। তার মানে আসলে তাঁর উপর বাণ নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়েছে।

চাণক্য বললেন,

— কিন্তু এই বাণটি যে সম্পূর্ণ বিষয়টির গুরুত্ব অনেকটা বাড়িয়ে দিল, সম্রাট। বিষয়টা খতিয়ে দেখতে হচ্ছে।

অমাত্য রাক্ষস বললেন,

— কিন্তু আচার্য চাণক্য, এই সম্পূর্ণ বিষয়টা যদি ষড়যন্ত্র হয়?

জীবসিদ্ধি বলল,

— আমার মতে আচার্য পাটলিপুত্রতেই থাকুন। আমি সেখানে গিয়ে আগে অবস্থা বিচার করি।

চন্দ্রগুপ্ত বললেন,

— আরও একটা বিষয় বুঝতে পারছি না। হঠাৎ জীবসিদ্ধির নাম আলাদা করে উল্লেখ কেন করা হল? তাকে বিশেষভাবে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে পত্রে। এর কারণ কী হতে পারে?

— এর উত্তর আমিও অনুমান করতে পারছি না। তবে আমি কুলূত না যাওয়ার কোনো কারণ দেখি না। আমাদের হাতে সূত্র কম তা বোঝাই যাচ্ছে। এদিকে জীবসিদ্ধির গুপ্তচরদের তদন্তও এখনও অবধি বিশেষ ফলপ্রসূ হয়নি। এহেন অবস্থায় সশরীরে একবার কুলূতে উপস্থিত হলে হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হাতে আসতে পারে। এই সুযোগ নষ্ট করতে পারি না আমি। বরং, আমি ও জীবসিদ্ধি বরাবরের মতোই বেরিয়ে পড়ি গোপনে। আমাদের সঙ্গে থাকুক মুষ্টিমেয় কিছু সৈনিক। এভাবে আমরা দ্রুত পথ অতিক্রম করতে পারব। আমাদের পেছনে আসুক মগধের কয়েক হাজার সৈনিক।

কিছুক্ষণ সকলেই চুপ করে চাণক্যর কথা বিচার করলেন। জীবসিদ্ধি বলল,

— বেশ। তবে আমার একটি পরামর্শ আছে। সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে একটু ভিন্ন পন্থা নিতে পারি আমরা।

— কীরকম?

চন্দ্রগুপ্তর প্রশ্নে জীবসিদ্ধি মৃদু হেসে বলল,

— আগে কয়েক হাজারের সৈন্যদল কুলূতের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাক। তাদের মধ্যে থাকবে একটি বিশেষ রাজকীয় ধ্বজাসমেত ঘোড়ার গাড়ি, যাতে যদি-বা শত্রুরা আমাদের গতিবিধি নজর করে, তাদের ধারণা হবে যে, ওই ঘোড়ার গাড়িতেই আমি আর গুরুদেব যাচ্ছি। আমরা, সঙ্গে ছদ্মবেশে থাকা কয়েক জন সৈনিক নিয়ে এর দু-দিন পর রওনা দেব। কয়েক হাজার সৈনিকের পথ চলতে সময় লাগবে। আমরা কয়েক জন ঘোড়ার সফর করব, তাই কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের অতিক্রম করে যাব। নাগরে আমরাই আগে পৌঁছে যাব ছদ্মবেশে।

— সাধু! সাধু হে, জীবসিদ্ধি! তোমার অন্তরের ঘুমস্ত সদাসতর্ক গুপ্তচরের সত্তাটি যে সম্পূর্ণ জেগে উঠেছে।

চাণক্য হেসে বলে উঠলেন। পরিকল্পনাটি চন্দ্রগুপ্ত ও রাক্ষসেরও পছন্দ হয়েছে। চন্দ্রগুপ্ত বললেন,

— দারুণ পরিকল্পনা। তবে তাই হোক। কিন্তু, তবুও আমার মন সায় দিচ্ছে না আপনাদের দু-জনকে এতদূর পাঠাতে।

— আহা! মহাপরাক্রমী জীবসিদ্ধি থাকতে আমার ভয় কী?

গুরুর এ জাতীয় বক্রোক্তিতে জীবসিদ্ধি শুধু নাক নিয়ে একটা ‘হুফ’ শব্দ করল।

রাক্ষস কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন,

— পর্বত্যক মলয়কেতুর কিছু একটা করতে হবে। শুনছি নাকি সে উত্তরের পার্বত্য প্রদেশের অন্যান্য রাজাদের সঙ্গে মিলে বিদ্রোহের পরিকল্পনা নিচ্ছে। কুলূতের সীমানায় তার সৈন্যের তাঁবু ফেলাটা কিন্তু সেইরকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চন্দ্রগুপ্ত বিরক্তির সঙ্গে বললেন,

— মলয়কেতুর পিতা পৌরবরাজ বাস্তবে একজন মহান রাজা ছিলেন। কিন্তু মলয়কেতু হঠাৎ আমার বিরুদ্ধে মাথা তোলার সাহস পাচ্ছে কোথা থেকে?

চাণক্য বললেন,

— সম্ভবত তাকে অন্য কেউ সাহস দিচ্ছে আড়াল থেকে।

চন্দ্রগুপ্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,

— এই কারণেই বলেছিলাম যে, আমার বিবাহে যখন বরাহটি এসেছিল, তখনই ওকে গুপ্তঘাতক দিয়ে হত্যা করিয়ে দিতাম। দোষ ধনানন্দর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যেত।

নিজের প্রাক্তন প্রভু ধনানন্দর প্রতি এমন অবিচারের কথা শুনে অমাত্য রাক্ষস মুখ থেকে একটা ‘ঘোঁত্’ শব্দ করলেন। যদিও মুখ গম্ভীর রাখলেন।

তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়লেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত,

— আরে প্রধানামাত্য মহোদয়, আমি আপনার সঙ্গে কৌতুক করছি মাত্র! ক্ষমা করবেন আমায়।

চাণক্যর নিজের ঠোঁটেও হাসির রেখা একমুহূর্তে দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। গলার স্বর গম্ভীর রেখে বললেন,

— এমন কথাবার্তা সম্রাটের মুখে শোভনীয় নয়।

— বিশেষ করে যখন তিনি সম্রাটের শ্বশুরমশাই।

চন্দ্রগুপ্ত মিত্রর প্রতি একবার রোষের দৃষ্টি হেনে প্রসঙ্গ পালটে অমাত্য রাক্ষসের উদ্দেশে,

— বাদ দিন। তাহলে জীবসিদ্ধির পরিকল্পনা মতোই আপনি ব্যবস্থা করুন। আজকের সভা তাহলে এখানেই ইতি করছি।

সকলেই একসঙ্গে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। চাণক্য ও জীবসিদ্ধি বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে চন্দ্রগুপ্ত পিছু ডাকলেন,

— গুরুদেব।

দু-জন চলা থামিয়ে পেছনে ফিরলেন। চন্দ্রগুপ্ত আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন,

— আপনারা খুব সাবধানে থাকবেন। বিদায়, আচার্য। বিদায়, ভ্রাতা।

৩.

উত্তর আর্যাবর্তর পার্বত্য প্রদেশের রাজা মলয়কেতুর রাজপ্রাসাদের অন্দরে এক গোপন সভা বসেছে। আজকে এই সভায় উপস্থিত হয়েছেন উত্তরের চার রাজ্যের রাজা।

কক্ষে মলয়কেতু প্রবেশ করতেই অন্য চারজন উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানালেন। মলয়কেতু নিজের আসন গ্রহণ করে সকলের উদ্দেশে বললেন,

— আমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে আজকে এখানে, এই গুপ্তসভায় উপস্থিত হওয়ার জন্যে প্রথমেই আপনাদের সাধুবাদ জানাই। আজকের এই সভায় উপস্থিত থেকে আপনারা যে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তা আগামী দিনে শুধুমাত্র আমাদের পার্বত্য প্রদেশেরই নয়, গোটা আর্যাবর্তর ভবিষ্যৎ নির্মাণে উপযোগী প্রমাণিত হবে। আপনারা যদিও সকলেই সকলকে চেনেন, তবুও আমি পৌরবরাজ মলয়কেতু, এই সভার অনুসূচক হিসাবে আপনাদের সকলের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।

মলয়কেতু নিজের বামদিক থেকে শুরু করলেন,

প্রথমেই আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন মলয়নগরের* মহারাজ সিংহনাদ। উপস্থিত হয়েছেন কাশ্যপনগরে** মহারাজা পুষ্করক্ষ, সিন্ধের শাসক সিন্ধুসেনা এবং সুদূর পারস্যের*** মহারাজ মেঘনন্দ। আমরা আজকে একই উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়েছি, আমাদের একই শত্রু এবং সেই শত্রু আর কেউ নয় সেই শত্রু হল মগধরাজ চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য!

কথা থামিয়ে একবার উপস্থিত চারজনের মুখের উপর চোখ বুলিয়ে নিলেন মলয়কেতু। তাঁর কথার যতটা প্রভাব মলয়কেতু ভেবেছিলেন তাঁর শ্রোতাদের উপর পড়বে, তা পড়েনি। রাজা সিন্ধুসেনা তো একবার ‘হাই’-ও তুললেন। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে মলয়কেতু আবার বলা শুরু করলেন,

— আমার পিতা পৌরবরাজ পুরুর সঙ্গে মৈত্রী করে চন্দ্রগুপ্ত ও তার কুচক্রী গুরু কৌটিল্য মগধ বিজয় করে। তার এবং পিতার মধ্যে সাম্রাজ্য সমান দু- ভাগে ভাগ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওই কৌটিল্য। কিন্তু পিতার অসময়ে মৃত্যুর সঙ্গেই তাদের প্রতিশ্রুতি মগধ ভুলে যায়! চন্দ্রগুপ্ত একাই মগধের সিংহাসনে আসীন হয়! এই বিশ্বাসঘাতকতা, এই অপমান কি আমরা, পার্বত্য রাজ্যরা মেনে নেব?

পুষ্করক্ষ মলয়কেতুর জ্বালায় নুনের ছিটে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বললেন,

— সেইসঙ্গে শুনলাম আপনার মনোবাসনায় জল ঢেলে চন্দ্রগুপ্ত রাজকুমারী দুর্ধরাকে বিবাহও করেছেন।

এই কথায় অন্য তিনজনের ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি ফুটে উঠল। মলয়কেতুর মুখ লাল হয়ে উঠেছে। তার এই মুহূর্তে ইচ্ছে করছে চারজনেরই পেটে তরবারি চালিয়ে দিতে। এই উদ্ধত রাজারা কেন তার কথা মানবে না? সে পর্বত্যক পৌরবরাজ পুরুর সম্ভান! তার পিতার সম্মুখে এরা মাথা নুইয়ে চলত, তবে তার বেলায় কেন এরকম অভদ্রতা?

বড়ো অসহায় লাগে মলয়কেতুর। আসলে সে এক মহান রাজার উত্তরাধিকারী হলেও পিতার কোনো গুণ বা সহজাত নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা পায়নি।

আজকের বক্তব্যের কথাগুলো তাকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই ব্রাহ্মণ যেভাবে শিখিয়েছে সে চেষ্টা করেছে সেভাবেই বলার, কিন্তু পারছে না। ওই ব্রাহ্মণকে ওর ভয় করে। লোকটার আশেপাশে থাকলেই অস্বস্তি হয় ওর। অথচ তাঁকে ছাড়া এতবড়ো ষড়যন্ত্র রচনা করার ক্ষমতাও মলয়কেতুর নেই। আজকের এই গুপ্তসভাও তারই পরামর্শে সে ডেকেছে। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। তবুও পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার জন্যে মলয়কেতু বলল,

— আমি বিশ্বাস করি আমার পিতার মৃত্যুতেও ওই দুষ্ট চাণক্যর হাত আছে। আমরা একত্রিত হলে আমরা মগধকে পরাজিত করতে পারব।

সিন্ধুসেনা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

— আপনার বিশ্বাস অবিশ্বাসের উপর কিছুই নির্ভর করে না, মলয়কেতু। অনেকে তো আবার এও বিশ্বাস করে যে, পৌরবরাজ পুরুর মৃত্যুর পেছনে আপনার হাত আছে। সে-প্রসঙ্গ থাক। আর আপনি যতটা সহজে বলছেন যে, মগধকে পরাজিত করা যাবে, তা আপনি কীসের ভিত্তিতে বলছেন? সকলেই জানে যে, আর্যাবর্তর যেকোনো প্রান্তে একটি কপোত ডানা ঝাপটা দিলেও সেই শব্দ চাণক্যর কানে যায়। তার উপর এই মুহূর্তে আবার তাদের মূল শত্রু অমাত্য রাক্ষসসহ নন্দর একদল সমর্থক এখন চন্দ্রগুপ্তর আনুগত্য স্বীকার করেছে। নন্দকন্যাকে বিবাহের পশ্চাৎ মগধ এখন আরও শক্তিশালী। কে বলতে পারে হয়তো আজকের সভার খবরও ইতিমধ্যে ওই কৌটিল্যর কানে পৌঁছেও গিয়েছে।

— সেটা ঘটলে আমি জানব যে, আমাদের এই কক্ষেরই কেউ সেই ডানা ঝাপটানো কপোত। এবং, সেই কপোতের শুধু ডানা কেটেই আমি সন্তুষ্ট থাকব এরকম ভাবার কোনো কারণ নেই, মহারাজ।

কথাটি কে বলল দেখার জন্যে প্রত্যেকের ঘাড় ঘুরে গেল যেদিক থেকে কণ্ঠস্বরটি ভেসে এসেছে সেদিকে। কক্ষের পর্দাঢাকা অন্ধকার কোণ থেকে একটি আকৃতি ধীরপায়ে আলোয় এসে দাঁড়াল। ব্যক্তি একজন ব্রাহ্মণ, কপালে তিলক, মুণ্ডিত মস্তকে কেশশিখা এবং বেশভূষা থেকেই বোঝা যায়। ঠোঁটের কোণে কুটিল হাসি এবং চোখের তাচ্ছিল্য প্রমাণ করে যে, একটু আগেই চারজন রাজাকে দেওয়া হুমকিটা নিতান্তই কথার কথা নয়। প্রয়োজনে তা করার ক্ষমতাও আছে এবং করবেনও।

ব্রাহ্মণকে দেখে খানিকটা একপাশে সিটিয়ে গেল মলয়কেতু। হঠাৎ তাঁকে দেখে বিস্মিত সে নিজেও হয়েছে কারণ ব্রাহ্মণের উপস্থিতির কথা তার নিজেরও জানা ছিল না।

— আপনি? আপনি কে?

রাজা সিন্ধুসেনা প্রশ্নটা করে মলয়কেতুর দিকে তাকালেন উত্তরের আশায়। কিন্তু, উত্তর স্বয়ং নবাগত ব্যক্তিই দিলেন,

— আমার নাম শঙ্কুমণি। পেশায় তক্ষশিলার শিক্ষক ছিলাম এবং গান্ধাররাজ অম্বির প্রাক্তন প্রধানামাত্য। আমার এই নাম সম্ভবত আপনাদের কাছে অপরিচিত, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে, বিগত সময়ে মগধের দয়ায় আমার অপর নামটি আপনাদের সকলের কাছেই পরিচিতি পেয়েছে। আপনারা আমায় চিনবেন আচার্য শকুনি নামে।

.

চারজন অতিথির মুখেই মৃদু গুঞ্জন উঠল নামটা শুনে। গত দেড় বছর ধরে গোটা আর্যাবর্তে যে ব্যক্তির সন্ধানে মগধের সেনা ও গুপ্তচররা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার নাম মৌর্য সাম্রাজ্য ও আশেপাশের সকল জনপদই জানে।

সকলেই শকুনির দিকে চাইল। নিজেদের মতামত জানানোর আগে এই ব্রাহ্মণের ভূমিকা জেনে নিতে চাইছে প্রত্যেকেই। আচার্য শকুনি প্রত্যেকের মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন,

— আমার একমাত্র উদ্দেশ্য হল চাণক্যকে পরাজিত করা। এবং, মগধের পরাজয় মানেই চাণক্যর পরাজয়। আপনারা আজকে উপস্থিত হয়েছেন মানেই আপনারাও তাই চান। অতএব শত্রু যখন সকলেরই এক, তখন আমাদেরও এক হওয়াতেই সকলের লাভ। কিন্তু আপনারা ঠিকই বলেছেন, মগধ এই মুহূর্তে ঐরাবতসম শক্তিশালী। সেই হস্তীর মুণ্ডচ্ছেদ করা এখনই সম্ভব নয়। যদিও একদিন আমরা সেটাও করব। কিন্তু তার পূর্বে মগধকে পঙ্গু অবশ্যই করতে হবে। মগধের অন্যতম শক্তির জায়গায় আমরা আঘাত করতে চলেছি শীঘ্রই।

* মলয়নগর – মলয়গিরি অঞ্চল/মালব্য

** কাশ্যপনগর – কাশ্মীরের প্রাচীন নাম। কথিত আছে কাশ্যপহৃষির নামে এই জায়গার নামকরণ হয়েছিল।

*** পারস্য – পারশিয়া।

৪.

দু-সপ্তাহেরও বেশি টানা পথ চলার পর অবশেষে কুলূতের রাজধানী নাগর প্রবেশ করলেন চাণক্য এবং জীবসিদ্ধি। মূল ফটকে অভিজ্ঞান মুদ্রা দেখিয়ে প্রবেশ করতে হল তাঁদের। সুরক্ষার বেশ কড়াকড়ি চলছে বোঝা যায়। চাণক্য ও জীবসিদ্ধি দু-জনেই নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রাখল। চাণক্যর পরিচয়পত্রে তাঁকে অবস্তির পণ্ডিত দেখানো হয়েছে আর জীবসিদ্ধিকে একজন মগধের বণিক।

চাণক্য চাপাস্বরে জীবসিদ্ধিকে বললেন,

— বসন্ত উৎসবের ঘটনার পর থেকেই সুরক্ষা ব্যবস্থা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সম্ভবত।

.

জীবসিদ্ধি আর চাণক্য প্রবেশ করে ততক্ষণ অপেক্ষা করল যতক্ষণ না তাদের সঙ্গের আটজন ছদ্মবেশী সৈনিকও নগরের দ্বার পার করল। জীবসিদ্ধির নির্দেশমতো প্রত্যেকে একে অন্যের থেকে সামান্য ব্যবধান রেখে চলছে, যাতে তাদের দখলে কেউ এটা না বুঝতে পারে যে, এরা একসঙ্গে একটি দল।

নাগর নগরের মাঝখানে অবস্থিত রাজপ্রাসাদ। রাজপ্রাসাদের মূল ফটকে নিজেদের মগধের রাজমুদ্রা দেখিয়ে প্রবেশ করল দু-জন এবং তারপর একে একে তাদের আট অঙ্গরক্ষক সৈনিক। চাণক্য কুলূতের সৈনিকদের বললেন,

— আমাদের দয়া করে আর্য চিত্রবর্মার কাছে নিয়ে চলুন। এবং, আমাদের ঘোড়াগুলো দীর্ঘ পথযাত্রায় ক্লাস্ত। এদের আস্তাবলে নিয়ে যান।

.

চাণক্য এবং জীবসিদ্ধিকে সভাকক্ষে অপেক্ষা করতে বলে সৈনিক চলে গেল। কিছুক্ষণ বাদেই কক্ষে প্রবেশ করলেন এক সৌম্যকান্তি যুবক এবং এক মধ্যবয়সি ব্যক্তি। দু-জনেরই বেশভূষা থেকে বোঝা যায় তাঁরা রাজপুরুষ। যুবক প্রণাম জানিয়ে বললেন,

— মহামতি চাণক্য এবং তাঁর সু-শিষ্য জীবসিদ্ধিকে নাগরে স্বাগত জানাই। আমি রাজা সুবর্মার ভ্রাতা চিত্রবর্মা। আপনাদের হয়তো মনে নেই কিন্তু আমাদের পূর্বেও সাক্ষাৎ হয়েছে। আর ইনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শ্রীশৈল।

চাণক্য লক্ষ করলেন শ্রীশৈল জীবসিদ্ধির দিকে তাকিয়ে আছেন স্থিরদৃষ্টিতে। মুখ কিছুটা ফাঁক হয়ে আছে তাঁর। চাণক্য বললেন,

— আমার সত্যিই আপনাকে স্মরণে নেই। কোথায় আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল বলুন তো?

চিত্রবর্মা বললেন,

— সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর বিবাহ অনুষ্ঠানে। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মহারাজ সুবর্মা যেতে না পারায়, কুলূতের পক্ষ থেকে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আমিই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। যদিও এত অতিথিদের মধ্যে আপনাদের স্মরণে থাকার কথাও নয়। তা ছাড়া সেই অনুষ্ঠানে যা কাণ্ড হয়েছিল…। আচার্য, আপনি যেভাবে সমস্যার সমাধান করেছিলেন তা আমার জানা। আর সেই কারণেই আমাদের বর্তমান সমস্যাকালে আমার প্রথমেই আপনার কথা স্মরণে এসেছিল। আমি তো আশঙ্কায় ছিলাম যে, হয়তো আপনি আসবেন না। আপনি আসায় যে আমি অন্তত কতটা বুকে বল পেয়েছি তা আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। কিন্তু আপনারা নিজেদের আগমনের সংবাদ পূর্বেই কেন আমাদের পাঠালেন না, মহামতি? তাহলে আমরা আপনাদের যথাযোগ্য সম্মানে নাগরে স্বাগত জানাতে পারতাম।

— তাতে ঝুঁকি ছিল, আর্য। আপনিও জানেন যে, এই মুহূর্তে মগধ ও কুলূত দুই রাজ্যকেই শত্রুদের আক্রমণের থেকে সাবধানে থাকতে হবে। তাই আমরা যতটা সম্ভব গোপনে এসেছি।

— আপনার এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের জন্যে ধন্যবাদ, আচার্য।

জীবসিদ্ধিও লক্ষ করেছে যে, প্রধানমন্ত্রী এখনও তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কেউ একটানা নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলে সকলের যেমন অস্বস্তি হয়, জীবসিদ্ধিরও তাই হচ্ছে এখন। তার অস্বস্তির পরিমাণ সাধারণের থেকে একটু বেশিই হচ্ছে, কারণ বহু বছরের অভ্যাসে সে নিজেকে অদৃশ্য রাখতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। চাণক্যই তাকে শিখিয়েছেন যে, একজন প্রকৃষ্ট গুপ্তচর সে-ই যে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। যে সকলের সম্মুখে থেকেও অদৃশ্য। যে এতটাই সাধারণ, যাকে আর পাঁচজন নাগরিকের থেকে আলাদা করে মনে রাখা যায় না। জীবসিদ্ধি নিজেকে সেভাবেই আজীবন প্রস্তুত করেছে।

জীবসিদ্ধির অস্বস্তিভাব লক্ষ করেই চিত্রবর্মা সহাস্যে বললেন,

— প্রধানমন্ত্রী মহোদয়কে ক্ষমা করবেন। আসলে তিনি বিস্মিত, যেমন পাটলিপুত্রে প্রথমবার আর্য জীবসিদ্ধিকে দেখে আমিও হয়েছিলাম।

প্রধানমন্ত্রী শ্রীশৈল লজ্জিত হয়ে চোখ সরিয়ে বললেন,

— আমি দুঃখিত, আর্য জীবসিদ্ধি। আমাদের বিস্ময়ের কারণটা জানলে আপনিও উপলদ্ধি করতে পারবেন।

চিত্রবর্মা বললেন,

— সে-প্রসঙ্গ আজকে তোলা থাক। আমি নিশ্চিত কালকে সকালে মহারাজ সুবর্মার প্রতিকৃতি দেখে আর্য জীবসিদ্ধিও আমাদের মতোই বিস্মিত হবে। আজ সূর্যাস্তের দেরি নেই, আপনারাও দীর্ঘ পথ সফরে ক্লান্ত। আপনারা আজকে বিশ্রাম করুন, আপনাদের সঙ্গের সৈনিকদেরও আপনাদের কক্ষের নিকটেই বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। খালি আমার একটি প্রশ্নের উত্তর প্রার্থনা করি, আচার্য।

— হুম। বলুন?

— মগধের সেনা কতদিনে নাগরে প্রবেশ করবে বলে আপনাদের অনুমান?

এবং তাদের সংখ্যা কত?

চাণক্য খানিক ভেবে বললেন,

— আমরা মগধ ছেড়ে রওনা দেওয়ার দু-দিন পর সেনারা মগধ ছেড়েছে। তাই, অনুমান করি আগামী সাতদিনের মধ্যে তারা পৌঁছে যাবে। পার্বত্য এলাকার সংকীর্ণ পথ দিয়ে আমরা এসেছি বলে আমাদের সময় অনেকটাই কম লেগেছে। দেড় হাজার সেনাবাহিনী ওই পথে আসতে পারবে না। তাই তারা তুলনামূলক সমতল পথ ধরে কুলূতে প্রবেশ করবে। যদিও তাদেরও পথে পাহাড় পড়বেই। তবুও সেই পথ অনেকটাই প্রশস্ত।

চিত্রবর্মা এবং শ্রীশৈল একে অন্যের দিকে তাকাল। মনে হল চাণক্যর কথায় তাঁরা কিছুটা স্বস্তি বোধ করলেন। চিত্রবর্মা বললেন,

— আমরা খুবই নিশ্চিন্ত হলাম, আচার্য। দশদিন বাদে আমাদের কুলূত রাজ্যের শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তার আগে মগধের সেনা এখানে থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। কেন, সে-প্রশ্নের উত্তর আগামীকাল আপনাদের সবিস্তার বলব। আজ আর আপনাদের ধরে রাখব না। আপনারা বিশ্রাম করুন। শুভসন্ধ্যা।