শর-শাস্ত্র – ৪০

৪০.

— মহারাজ সিন্ধুসেনা! মহারাজ!

— কী? কী হয়েছে, সেনাপতি? পূর্বের দিক থেকে এত কোলাহল কীসের?

— মহারাজ! আমাদের উপর আক্রমণ হয়েছে! দুই পাহাড়ের মাঝের গিরিপথ ধরে উপত্যকা পার করার সময়ে আমাদের সেনার উপর অতর্কিত শর-বৃষ্টি শুরু হয়! আমাদের সেনা দুই পাহাড়ের মাঝের মৃত্যুকূপে আটকে পড়েছে, মহারাজ!

— কিন্তু… কিন্তু কে? কে আক্রমণ করল আমাদের?

— মহারাজ, আমাদের উপর পর্বতেশ্বরের সেনা আক্রমণ করেছে।

চমকে উঠল সিন্ধুসেনা,

— পর্বতেশ্বর? মানে, মলয়কেতু? কিন্তু সে কেন আমাদের উপর আক্রমণ করবে?

সিন্ধুপ্রদেশের প্রধানামাত্য পাশ থেকে বললেন,

— মহারাজ, মলয়কেতু কি তবে মগধের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে?

সিন্ধুসেনার কপালে স্বেদবিন্দু ফুটে উঠেছে। মগধ অবধি কোনোরকম আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিল না সে। মগধেও যেহেতু তার দ্বার খুলে দেওয়ার কথা অমাত্য রাক্ষসের অতএব সেখানেও সহজ জয় নিশ্চিত জেনেই যুদ্ধে এগিয়েছে সে।

তখনই আরও একটা সংবাদ তার কাছে নিয়ে এল আর এক গুপ্তচর,

— মহারাজ! মহারাজ! পার্বত্য প্রদেশ থেকে ভয়ংকর দুঃসংবাদ আছে।

— কী সংবাদ এনেছ, গুপ্তচর?

— মলয়কেতুর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল মলয়নগরের রাজা সিংহনাদ, কাশ্যপনগরের রাজা পুষ্করক এবং পারস্যের রাজা মেঘনন্দ। মলয়কেতু তার আলোচনা সভার মধ্যেই মহারাজ সিংহনাদ আর পুষ্করককে হত্যা করেছে। সঠিক সময়ে আচার্য শকুনির থেকে সংবাদ পেয়ে মেঘনন্দ মাঝপথ থেকে ফিরে গিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে!

রাগে দাঁতে দাঁত চেপে সিন্ধুসেনা বলে উঠল,

— বিশ্বাসঘাতক মলয়কেতু! এইবার আমি নিশ্চিত হলাম যে, সে আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তার পিতার মতোই মগধের সঙ্গে মৈত্রী করেছে! আমি

ওকে ছাড়ব না!

তখনই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংবাদ এল আরও একবার,

— মহারাজ! দুঃসংবাদ আছে!

সিন্ধুসেনা গম্ভীরমুখে বললেন,

— হায় ইন্দ্ৰদেব! তুমি আজকে কেন এমন বিরূপ হলে আমার প্রতি? বলো দূত! কী ঘটছে এখন পূর্বে?

— মহারাজ, আমাদের সেনা পরাজয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। অর্ধেক সেনা নিহত হয়েছে। আপনার আদেশের অপেক্ষায় আছে তারা।

সিন্ধুসেনা একবার তার মন্ত্রী এবং সেনাপতির দিকে তাকাল। দু-জনই বিষণ্ণ চিত্তে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। সিন্ধুসেনা আদেশ দিল,

— সেনাদের পিছিয়ে আসতে বলো। আমরা পরাজিত হয়েছি।

***

একটা উঁচু টিলার উপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করছে মলয়কেতু। তার জয় নিশ্চিত। সিন্ধুসেনার সেনাবাহিনী পিছিয়ে যাচ্ছে ক্রমশই। সিন্ধের অর্ধেক সেনা নিহত হয়েছে। উচিত জবাব দিতে পেরেছে সে ষড়যন্ত্রকারীকে। বাকি দু-জনকে সে হত্যা করেছে গতকালই। পারস্যের কাপুরুষটা পালিয়েছে, তবে জীবনে আর তার রাজ্যে পা দেওয়ার সাহস করবে না। শুধু আফশোস একটাই রয়ে গেল যে, শকুনি পালাতে পেরেছে। মহলের অন্দরেই যে তার গুপ্তচর আছে সে-বিষয়ে আর সন্দেহ নেই মলয়কেতুর। কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না। মহামাত্য এবং পদ্মা বাদে কেউ এই মুহূর্তে তার বিশ্বাসের পাত্র নয়।

— পর্বতেশ্বর মহারাজ মলয়কেতুর জয়!

মলয়কেতু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজের সেনাপতির দিকে দৃষ্টি ফেরাল।

— বলো, কী সংবাদ?

— আমরা বিজয়ী হয়েছি, মহারাজ! সিন্ধের সেনা পিছিয়ে যাচ্ছে। আপনার আদেশ কী, মহারাজ? আমরা কি তাদের পিছু ধাওয়া করে আক্রমণ করব? নাকি তাদের পালিয়ে যেতে দেব?

— কখনোই নয়! পালিয়ে যেতে দেব না ওদের। এটাই আমাদের সুযোগ! আমরা ওদের পিছু নিয়ে ধাওয়া করব এবং ওদের সম্পূর্ণ সেনাবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে দেব।

— সাবধান, মহারাজ। এ কাজ কিন্তু খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সিন্ধুর সেনার যা অবস্থা হয়েছে দুই পাহাড়ের মাঝের সরু পথে আটকে গিয়ে তা আমাদের সঙ্গেও ঘটতে পারে। এই সাবধানবাণী পাশ থেকে বললেন মহামাত্য সুদীপ্তক। কিন্তু জয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মলয়কেতু তাঁর কথায় কর্ণপাত করল না। সে বলে উঠল,

— ঝুঁকি না নিলে বড়ো কিছু অর্জন করা যায় না, মহামাত্য। সেনাপতি, সামস্তদের বলুন সিন্ধুসেনার বাহিনীকে ধাওয়া করে আক্রমণ চালিয়ে যেতে।

সেনাপতি একবার সুদীপ্তকের দিকে চেয়ে উত্তর না দিয়ে রাজার প্রতি নিঃশব্দ অভিবাদন জানিয়ে প্রস্থান করল। সুদীপ্তক শুধু একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন যেন এইবার তাঁর মনের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়।

***

কুলুতের রাজধানী নাগরের দুর্গের প্রাঙ্গণে হেঁটে বেড়াচ্ছেন সেনাপতি সিংহরণ। তিনি মগধের সেনাপতি এবং সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর একান্ত বিশ্বস্ত মানুষ। চাণক্য গান্ধার যাওয়ার আগে তাঁকেই কুলূতের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন। সঙ্গে এও বলে গিয়েছেন যে, খুব শীঘ্রই আগামী পদক্ষেপের জন্যে তৈরি থাকতে। আজীবন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটিয়েও সিংহরণ যুদ্ধ পছন্দ করেন না। এই পুষ্পবাগিচা তাঁকে অনেক বেশি শাস্তি দেয়। লাল রক্তের চেয়ে লাল গোলাপ তাঁর কাছে বেশি কাঙ্ক্ষিত। অথচ গোটা আর্যাবর্ত তাঁকে এযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা বলে জানে। শুধু তাই নয়, এককালে তিনি যখন গান্ধারের সেনাপতি ছিলেন, সেসময়ে চাণক্য তাঁর কাছে কিশোর চন্দ্রগুপ্তকে পাঠিয়েছিলেন যুদ্ধকলা শিখতে। তাই তিনি সম্রাটের অস্ত্র- গুরুও বটে।

— সেনাপতি সিংহরণ।

এক সামন্ত এসে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানাল তাঁকে। সিংহরণ তার দিকে ঘুরতে একটি পত্র বাড়িয়ে দিল সৈনিক। বলল,

— গান্ধারের সীমান্ত থেকে আচার্য চাণক্যর পত্র এসেছে।

সিংহরণ পত্রটি নিয়ে দ্রুত পাঠ করলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। বললেন,

— মলয়কেতুর আদেশে সমস্ত সেনা রাজধানী ছেড়ে যুদ্ধ করতে রাজ্যছাড়া। রাজধানী অরক্ষিত রয়েছে। আমাদের সেনাবাহিনী তৈরি তো, সামন্ত?

— হ্যাঁ, সেনাপতি। মগধের সঙ্গে কুলূতের সেনা জুড়ে আমরা এই মুহূর্তে যথেষ্ট শক্তিশালী।

— আশা রাখি, আমাদের শক্তি প্রদর্শনের বিশেষ প্রয়োজন পড়বেও না। আমাদের দিক থেকে প্রায় রক্তপাতহীন হবে এই যুদ্ধ।

— আদেশ করুন, সেনাপতি।

— আজকে দ্বিতীয় প্রহরেই আমরা দু-লক্ষ সেনা নিয়ে পর্বত্যকা রাজ্য দখলের উদ্দেশ্যে কুচ করব। আমাদের উদ্দেশ্য হবে মলয়কেতু সিন্ধুর সেনার সঙ্গে যুদ্ধশেষে তার রাজধানী ফিরে আসার আগেই রাজধানী দখল করা।

— কিন্তু সেনাপতি, যদি অভয় দেন তো একটা কথা বলি।

— বলুন, সামন্ত।

— আমরা মাত্র দু-লক্ষ সেনা নিয়ে অরক্ষিত রাজধানীর দখল নিতে পারব ঠিকই। হয়তো দুর্গের আড়ালে থেকে কয়েক দিন মলয়কেতুর সেনাকে প্রতিহতও করতে পারব। কিন্তু তা বেশিদিনের জন্যে নয়।

— জানি, সামস্ত। তার বেশি প্রয়োজনও আমাদের পড়বে না।

— একথা এত বিশ্বাসের সঙ্গে আপনি কীভাবে বলছেন সেনাপতি?

— কারণ আমি আচার্য চাণক্যর উপর বিশ্বাস রাখি।

৪১.

জীবসিদ্ধি এবং শশাঙ্ক কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল। বিস্ময়ের ঘোর এখনও মুখে কথা জোগাচ্ছে না। গোটা ব্যাপারটা প্রথম থেকে গুছিয়ে ভাবার চেষ্টা

করছে তারা।

জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,

— কিন্তু গুরুদেব…

চাণক্য উৎসাহী ভঙ্গিতে জীবসিদ্ধির দিকে চেয়ে বলল,

— বলো, জীবসিদ্ধি। যা প্রশ্ন মনে আছে, তা বলে ফেলো।

— সবই এখন স্পষ্ট হল, আচার্য। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি না। বাবাক ও বিধোরকের এত কিছু করার প্রয়োজন কী? তারা কেন এক অচেনা তিরন্দাজকে রক্ষা করতে নিজেরা এত কিছু করল? গোটা বিষয়টায় কোনো একটা দিক যেন এখনও উন্মোচন হওয়া বাকি আছে।

চাণক্য গম্ভীর হলেন। বললেন,

— হুম। ঠিকই বলেছ হে, জীবসিদ্ধি। পিতা-পুত্র কেন এত কিছু করল? তারা তো কিছু না করেও নিজেদের দৈনন্দিন জীবন কাটিয়ে যেতে পারত। একদিন- না-একদিন মগধ হতাশ হয়ে ফিরে যেত তাদের নজরবন্দি দশা থেকে মুক্তি দিয়ে। তবে কোন গূঢ় কারণে এত আয়োজন? এই প্রশ্ন আমিও কুলূত থেকে গান্ধার আসার পথে বারংবার ভেবেছি। কিন্তু উত্তর পাইনি। তোমারই মতো আমারও মনে হয়েছে কোনো একটা রহস্য আছে যা আমরা ধরতে পারছি না। উত্তরটা আমি এখানে এসে খুঁজে পেলাম বিধোরকের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর

— বিধোরক?

— হুমম। এবার তাকে বন্দি করার সময় এসেছে।

শশাঙ্ক বলল,

— আমি এখুনি সৈনিকদের আদেশ দিচ্ছি ওই মিথ্যাবাদীকে বন্দি করে এখানে হাজির করতে। ওর মুখ খোলানো কঠিন হবে না। আমরা শকুনির তিরন্দাজ হত্যাকারীর সম্বন্ধে কিছু সূত্র নিশ্চয়ই খুঁজে পাব।

চাণক্য হাত তুলে শশাঙ্ককে বাধা দিয়ে বললেন,

— না, শশাঙ্ক। তাকে এখান অবধি বন্দি করে আনাটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। আমরা নিজেরাই বরং তার কুটিরে যাব তাকে বন্দি করতে। তোমরা সঙ্গে অস্ত্র নাও এবং দশজন সৈনিককে সঙ্গে আসতে বলো।

শশাঙ্ক কিছুটা অবাক হয়ে বলল,

— ঝুঁকি? কীসের ঝুঁকি, আচার্য?

চাণক্য উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর দেখাদেখি জীবসিদ্ধি আর শশাঙ্কও উঠে দাঁড়াল।

.

বাবাকের কুটিরে যখন চাণক্য পৌঁছালেন তখন সূর্য অস্ত গিয়েছে। আকাশে তখনও কিছুটা রক্তিম আভা লেগে আছে।

.

— বিধোরক! গৃহে আছ?

দরজার বাইরে থেকে শশাঙ্ক ডাক দিল। চাণক্যর কথামতো পেছনের দরজায় চারজন সৈনিক অপেক্ষায় রয়েছে এবং আরও চারজন সৈনিক গাছের আড়ালে লুকিয়ে আছে। দরজায় শুধুমাত্র চাণক্য, জীবসিদ্ধি, শশাঙ্কসহ দু-জন সৈনিক দাঁড়িয়ে আছে।

কিছুক্ষণ বাদেই দরজা খুলে প্রদীপ হাতে বিধোরক বেরিয়ে এল। তাদের দেখে বলল,

— ও, আপনারা। পিতার কোনো খোঁজ পেলেন বুঝি?

শশাঙ্ক কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। উত্তর চাণক্য দিলেন,

— না, বিধোরক। পাইনি এখনও। আমরা এসেছি তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে। এই কুটিরে কোনো গোপন দ্বার আছে কি না সেটাও আমি পরীক্ষা করে দেখতে চাই নিজে।

— ও। আসুন।

দু-জন সৈনিকসহ তারা তিনজন কুটিরে প্রবেশ করল। তিনজন আসন গ্রহণ করল, মুখোমুখি বসল বিধোরক। তাদের মাঝখানে রাখা প্রদীপটা ঘরটাকে ভালোই আলোকিত করছে। দু-জন সৈনিক দাঁড়িয়ে রইল। চাণক্য বসে কিছুক্ষণ তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে দেখে বিধোরক বলল,

— কই? আপনি গোপন দরজা খুঁজবেন না? আমিও সাহায্য করব। আমার বাবা ছাড়া কেউ নেই। তাঁকে খুঁজে দিন।

চাণক্য উত্তর না দিয়ে আরও কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

— বিধোরক, ওই বিশেষ তির যে বানাতে দিয়ে যেত তোমাদের, তার বর্ণনা দাও।

— সকালেই তো বললাম, ব্রাহ্মণদেব।

— দয়া করে আরও একবার বলো।

— মধ্যবয়স্ক, কৃষ্ণবর্ণ, বলিষ্ঠ দীর্ঘকায় শরীর। এই দেশের মানুষ।

চাণক্য হেসে বললেন,

— প্রায় একই বর্ণনা তোমার পিতাও শশাঙ্কর কাছে বলেছিল শুনেছি। এই বর্ণনা শুনেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। কেন জানো? কারণ এই বর্ণনার ঠিক বিপরীত হল— অল্পবয়সি কিশোর, গৌরবর্ণ বিদেশি। মধ্যম উচ্চতা, শরীর আর পাঁচটি কিশোরের মতোই সাধারণ। ভেবে দেখো জীবসিদ্ধি, এই বর্ণনা কার সঙ্গে মেলে?

পাঁচজনেরই দৃষ্টি একসঙ্গে ঘুরে গেল বিধোরকের দিকে। চাণক্য বললেন,

— মানুষের মনস্তত্ত্ব বড়োই অদ্ভুত। ধরো কারুর কাছে এমন একজন ব্যক্তির বর্ণনা দিতে বলা হল যাকে সে আড়াল করতে চায়। তবে স্বাভাবিকভাবেই কী করবে? সে আসল ব্যক্তির ঠিক উলটো বর্ণনা দেবে যাতে আসল ব্যক্তির সঙ্গে কোনোভাবেই মিল খুঁজে পাওয়া না যায়।

বিধোরকের মুখে এখনও একইরকমের কৈশোরের সারল্য। সে চাণক্যর কথার ইঙ্গিত বুঝতে পারছে বলে মনে হল না। শশাঙ্কর এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে! চাণক্যর কথা! এ কীভাবে সম্ভব? এ কী বলছেন আচার্য চাণক্য?

চাণক্য দৃঢ়ভঙ্গিতে বলে চলেছেন,

— তোমার পিতার উধাও হয়ে যাওয়ার রহস্যের সমাধান অনেক আগেই আমি করতে পেরেছিলাম চার নজরদারের কথা থেকেই। কিন্তু এত কিছুর উদ্দেশ্য স্পষ্ট হচ্ছিল না। যদি ধরেও নিই যে, তোমরা শকুনির কথায় কাজ করছ, তবুও তোমার পিতা তার নিজের এবং পুত্রের জীবন বিপন্ন কেন করবে এক ক্রেতাকে বাঁচাতে? কাকে আড়াল করতে তোমার পিতা রাষ্ট্রদ্রোহের মতো চরম দণ্ডনীয় অপরাধ করতেও পিছপা হলেন না? এর উত্তর আমিও ভেবে পাইনি। উত্তরটা আমিও খুব অপ্রত্যাশিতভাবেই পেলাম। স্বীকার করছি আমি আগে থেকে অনুমান করতে পারিনি তোমার বিষয়ে, বিধোরক। কিন্তু তোমার সঙ্গে সকালে সাক্ষাতের সময়েই দুটি বিষয় নিয়ে মনে সন্দেহ জাগে। প্রথমটা অবশ্যই ওই ব্যক্তির বর্ণনা নিয়ে যা বুঝতে পারি ঠিক তোমার বিপরীত। দ্বিতীয়ত যেটা চোখে পড়ে সেটা হল তোমার হাতের দুটি কড়া। একবার নিজের দু-হাত আলোর কাছে ধরবে, বিধোরক?

আজ্ঞাকারী ছাত্রের ন্যায় বিধোরক তার দু-হাত মেলে ধরল প্রদীপের কাছে। কক্ষে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি তার হাতের উপর এসে পড়ল। চাণক্য বললেন,

— আজ সকালেই আমি এই দু-হাতের, দুটি ভিন্ন স্থানে এই কড়া দেখেছিলাম। কড়া পড়ে দীর্ঘ সময় ধরে চামড়ার একই জায়গায় ঘর্ষণের ফলে। যেমন কয়েক বর্ষ যাবৎ অত্যধিক লেখালেখির ফলে ইদানীং আমার ডান হস্তের তর্জনীর একধারে কড়া পড়ে যাচ্ছে। একজন হলধর কৃষকের যেমন দু-হাতের আঙুলের গোড়ায় কড়া থাকে। সেরকমই ডান হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মাথায় এবং বাম হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মধ্যবর্তী স্থানে চামড়া শক্ত হয়ে কড়া পড়ে গিয়েছে। এই কড়া আমি আগেও দেখেছি কয়েক জনের হাতে। যেমন কুলুতে দেখেছিলাম এই একইরকমের কড়া বিন্দুর দু-হাতে। বহু বছর ধরে বাম হাতে ধনুক ধরে, ডান হাতের দু-আঙুলের সাহায্যে গুণে বাণ টেনে বাণ চালানোর অভ্যাস থাকলে হাতে এই বিশেষ দুই স্থানে এরকম কড়া পড়ে। তোমার আঙুলে এরকম কড়া পড়ার অর্থ হল যে, তুমি অমানুষিক রকমের অভ্যাস করেছ এবং তুমি একজন দক্ষ ধনুর্ধর। আমি কি ভুল বললাম, বিধোরক?

মুহূর্তের মধ্যে জীবসিদ্ধি ও শশাঙ্ক দেখল হাবাগোবা বিধোরকের মুখের ভাব বদলে তাতে একটি নৃশংস ভাব ফুটে উঠল। ঠিক যেন কোনো জংলি চতুষ্পদ শিকারিদের সম্মুখে এসে পড়েছে।

বিস্ময়ের ঘোর কেটে গিয়ে কিছু করার আগেই আচমকা সামনে থাকা প্রদীপের শিখায় ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল বিধোরক! গোটা কুটির ডুবে গেল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে!

৪২.

সেনাছাউনিতে নিজের রাজকীয় তাঁবুতে বসে আছে রাজা মলয়কেতু। তার সঙ্গী পদ্মা এবং প্রধানমন্ত্রী সুদীপ্তক। সবে সোমরসের একটি পাত্র শেষ করে দ্বিতীয় পাত্রে চুমুক দিয়েছেন রাজা। তখনই উদ্বিগ্ন হয়ে সেনাপতি প্রবেশ করল। প্রবেশের আগে অনুমতি নেওয়ার কথাও তার মনে রইল না।

— মহারাজ! মহারাজ!

মলয়কেতু কিছুটা বিরক্ত হলেও সেনাপতির মুখ দেখে অনুমান করতে পারল গুরুতর কোনো বিপদ হয়েছে। জানতে চাইল,

— কী হয়েছে সেনাপতি? যুদ্ধ তো আমরা জয় করেছি। সিন্ধুসেনা মৃত। তাহলে কী কারণে তুমি উদ্‌বগ্ন?

— মহারাজ! আমাদের সেনা আক্রান্ত! উপত্যকা পার করার সময়ে আমাদের উপর আক্রমণ করা হয়েছে। কেউ একই রণনীতিতে আমাদের উপর আক্রমণ করেছে, যেভাবে আমরা সিন্ধের সেনাকে ধ্বংস করেছি!

— সেকী? কিন্তু কে আক্রমণ করবে আমাদের উপর?

— এখনও আমরা নিশ্চিত নই। এমনকী আমাদের শত্রুর সেনাসংখ্যা সম্বন্ধেও আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি! আক্রান্ত সৈনিক কয়েক জন এসে জানিয়েছে বিশাল এক সেনাবাহিনী আমাদের আক্রমণ করেছে!

মন্ত্রী সুদীপ্তক হায় হায় করে উঠলেন,

— সর্বনাশ হয়েছে, মহারাজ! আমি পূর্বেই সাবধান করেছিলাম। ওই দুটি পাহাড়ের মাঝের গিরিপথ মৃত্যুফাঁদ। আমি সাবধান করেছিলাম যে, ওই পথে আমাদের সেনা যেন না এগোয়।

গলা কাঁপতে লাগল মলয়কেতুর,

— চ… চুপ করুন! একদম চুপ! সেনাবাহিনীর কত ভাগ আটকে আছে উপত্যকা অঞ্চলে?

শেষ প্রশ্নটা সেনাপতির উদ্দেশে করা হয়েছে। সেনাপতি উত্তর দিল,

— অর্ধেক সেনা আটকে আছে।

— বেশ। বাকি অর্ধেক তো আমাদের সঙ্গেই আছে। আমরা রাজধানীর কাছাকাছিই আছি। একবার আমাদের রাজধানীর সুরক্ষিত প্রাচীরের অন্দরে প্রবেশ করলেই আমরা সুরক্ষিত। আমরা যত দ্রুত সম্ভব রাজধানীর দিকে এগোব।

প্রধানমন্ত্রী সুদীপ্তক বললেন,

— কিন্তু আমাদের বাকি অর্ধেক সেনার কী হবে, মহারাজ? আমরা হয়তো সুরক্ষিতভাবে পৌঁছে যাব। কিন্তু যারা উপত্যকা অঞ্চলে অচেনা যুদ্ধে লিপ্ত? তাদের কী হবে?

মলয়কেতু উত্তর দেওয়ার পূর্বেই পদ্মা বলে উঠল,

— রাজার জীবনের দাম সবচেয়ে বেশি। প্রতিটা যুদ্ধেই মূল লক্ষ্য থাকে যেন মহারাজের প্রাণসংশয় না ঘটে, তাই না প্রধানামাত্য মহাশয়? তাই আমার মনে হয় মহারাজ উচিত কথাই বলেছেন। আমাদের অর্ধেক সেনা নিয়ে দুর্গে প্রবেশ করা উচিত।

পদ্মার কথায় মলয়কেতু দ্বিগুণ উৎসাহে বলল,

— হ্যাঁ। সেনাপতি, আপনি রাজধানীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। সেনাপতির মুখের অভিব্যক্তি কঠিন হল। বললেন,

— বেশ, মহারাজ। আপনারা এগিয়ে যান। কিন্তু আমি আমার সহযোগীদের পরিত্যাগ করতে পারব না। আপনারা এগিয়ে যান। আমি ফিরে যাচ্ছি উপত্যকা অঞ্চলে। সৈন্যদের মধ্যে কেউও যদি আমার সঙ্গী হতে চায়, তাহলে আমি তাদের বাধা দিতে পারি না।

মলয়কেতু প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করলেও কিছু বলতে পারল না। মহামাত্য সুদীপ্তক বলে উঠলেন,

— আমিও আপনার সঙ্গে যেতে চাই, সেনাপতি

মলয়কেতুর আজ্ঞার অপেক্ষা না করেই দু-জন বেরিয়ে গেল তাঁবু থেকে। বিহ্বল মলয়কেতু একা দাঁড়িয়ে রইল তাদের গমনপথের দিকে চেয়ে। তখনই অনুভব করল নিজের হাতে নারী হাতের স্পর্শ। পদ্মা তার কানের কাছে মুখ রেখে বলল,

— আপনার সঙ্গে আমি আছি, মহারাজ। আমি আমার মহারাজকে পরিত্যাগ করব না।

***

মাত্র কয়েক হাজারের সেনাদল নিয়ে রাজধানীর সীমান্তে এসে দাঁড়িয়েছে মলয়কেতু। তার বেশিরভাগ সেনাই সেনাপতি ও মহামাত্যকে অনুসরণ করে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যুদ্ধক্ষেত্রেই গিয়েছে।

নগরের বন্ধদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে একজন সামস্ত এগিয়ে গেল দ্বারের কাছে।

— দ্বার খোলো শীঘ্র! মহারাজ মলয়কেতু অপেক্ষা করছেন। আমাদের পশ্চাতে শত্রুসেনা ধাবমান! শীঘ্র আমাদের প্রবেশ করতে দাও।

কিন্তু ওদিক থেকে কোনো শব্দ এল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পুনরায় সামন্ত বলল,

— কোথায় আছ, সৈনিকরা? দ্বার খোলো এখুনি! শত্রুরা যে কাছে এসে পড়ছে প্রতিমুহূর্তের বিলম্বে।

মলয়কেতু পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখল দিগন্তরেখা বরাবর ধুলোঝড় উঠেছে। বুক কেঁপে উঠল মলয়কেতুর। কারণ সে জানে ওটা ধুলোঝড় নয়। ওটা কোনো এক বিশাল সেনাবাহিনীর রণমত্ত, ক্রমধাবমান পদক্ষেপে ওঠা ধুলোর কুণ্ডলী! ওই, এখন তাদের পতাকাটা দেখা যাচ্ছে। ধুলোর জন্যে সেটার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ক্রমশই তা স্পষ্ট হয়ে আসছে।

নগরের উঁচু প্রাচীরের উপর কাদের যেন পদক্ষেপ শোনা গেল। কিছুক্ষণ বাদেই ঠিক প্রধান দ্বারের উপরে এসে দাঁড়ালেন সিংহরণ।

মলয়কেতু চেঁচিয়ে উঠল,

— কে রে তুই?

সিংহরণ চেঁচিয়ে উত্তর দিল,

— আমি মগধের সেনাপতি সিংহরণ। সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর আদেশে এই নগর এখন মৌর্যদের অধীনে।

— কী বলছে এই উন্মাদটা? সামন্ত, এখুনি বাণ নিক্ষেপ করে একে হত্যা করো।

কিন্তু পরমুহূর্তে প্রাচীরের উপরে সারিবদ্ধভাবে কয়েক হাজার মগধের সৈনিক উঠে দাঁড়াল প্রত্যেকের হাতের ধনুক, বাণ চড়িয়ে নীচে দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনীর দিকে নিশানা বাঁধা। হয়তো-বা মলয়কেতুর সেনার সিংহরণের সেনার যুদ্ধ শুরু হত। কিন্তু তার আগেই এক সৈনিক কাঁপা গলায় বলল,

— ম… মহারাজ! দেখুন!

কয়েক জন সৈনিক পেছন থেকে আসতে থাকে সেনাবাহিনীর দিকে। একটি উঁচু টিলার উপর রাজধ্বজা হাতে কয়েক জন ঘোড়সওয়ারকে এখন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। পতাকার চিহ্ন স্পষ্ট হয়েছে। নীল-সবুজ ধ্বজে শোভা পাচ্ছে স্বর্ণালি পেখম মেলা ময়ূর চিহ্ন। পতাকা দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসতেই বুক কেঁপে উঠল মলয়কেতু ও তার সেনাবাহিনীর। অপরদিকে চরম উল্লাসে ফেটে পড়ল প্রাচীরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদল। কারণ এই ধ্বজা, এই চিহ্ন সকলের পরিচিত। ভয়ভীত কণ্ঠে গুঞ্জন উঠল মলয়কেতুর সেনার মধ্যে। একটাই শব্দ তারা উচ্চারণ করল সকলে,

— মৌর্য!

দূরে ছোটো টিলার উপর দাঁড়িয়ে থাকা সম্পূর্ণ সামরিক সাজে ঘোড়ার উপর বসে মৌর্যবাহিনীকে যে সেনানায়ক পরিচালনা করছে, তাকে তার সেনাদলের কেউ চিনতে না পারলেও মলয়কেতু ঠিকই চিনেছে। বিশাল মৌর্য বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং তাদের সম্রাট!

চন্দ্রগুপ্ত বহুদূর থেকেও যেন মলয়কেতুর হৃদয়ের ভয় টের পেল। সম্মুখ ও পশ্চাৎ দু-দিক থেকে দ্বৈত আক্রমণে অসহায় মলয়কেতুর দিকে তাকিয়ে চন্দ্রগুপ্তর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। নিজের তরবারি মাথার উপর তুলে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য হুংকার দিয়ে উঠল,

— আক্রমণ!

***

স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মলয়কেতু। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। তীব্র ভয়ে তার মস্তিষ্ক জবাব দিয়ে দিয়েছে। তার সেনা তার নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকেই যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়ছে। মলয়কেতু বজ্রাহতর মতো নিজের ঘোড়ার পিঠে স্থাণু দাঁড়িয়ে আছে সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে।

পদ্মা তার হাত ধরে টান দিল,

— মহারাজ! এখুনি এই যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়তে হবে আমাদের।

মলয়কেতু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তার পাশের ঘোড়ায় বসে থাকা পদ্মার দিকে। আবার বলল সে,

— চলুন, মহারাজ! আর বিলম্ব নয়! চলুন, আমার সঙ্গে। আমরা বনের ভেতরের সেই প্রমোদ কুটিরে পালিয়ে যাই। আমি সঙ্গে আছি আপনার মহারাজ! চলুন!

মলয়কেতু ভাবনা চিন্তা করার অবস্থায় এমনিতেও ছিল না। অতএব ঘোরলাগা অবস্থায় পুতুলের মতো পদ্মার দেখানো পথে তাকে অনুসরণ করল।

***

মৌর্যদের জয় নির্বিকল্প হয়েছে। সিদ্ধ ও পর্বত্যকা রাজ্যের সর্বত্র এখন ময়ূর চিহ্নের বিজয়পতাকা উড়ছে। মলয়কেতু আবারও তার সেনা, তার রাজ্যকে পরিত্যাগ করে ভীরুর ন্যায় পালিয়েছে।

বন্দি অবস্থায় আনা হয়েছে মহামাত্য সুদীপ্তক ও সেনাপতিকে। হঠাৎ প্রবল জয়ধ্বনির মধ্যে সেনাদের মধ্যে থেকে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল এক দীপ্তমান যুবক। যুবক তাদের দু-জনের পরিচিত হলেও, পরনে সামরিক সাজ, বর্ম ও চারিদিক থেকে ওঠা হর্ষধ্বনি থেকে তাদের বুঝতে বাকি রইল না এই যুবকের পরিচয়।

‘মগধাধীশ সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর জয়!’
‘মহা পরাক্রমী বীর, সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর জয়!’
‘আর্যাবর্ত শাসক চন্দ্ৰগুপ্ত মৌর্যর জয়!’

মাথার সামরিক শিরস্ত্রাণ খুলে চন্দ্রগুপ্ত বলল,

— একী? এঁদের এভাবে বন্দি কেন করা হয়েছে? এখুনি মুক্ত করো মহামাত্য ও সেনাপতিকে।

দু-জন সৈনিক এগিয়ে এসে সুদীপ্তক ও সেনাপতিকে বন্ধনমুক্ত করল। চন্দ্রগুপ্ত বললেন,

— আপনার সাক্ষাৎ পেয়ে আমি হর্ষিত হলাম, আর্য সুদীপ্তক। আমার গুরু আচার্য চাণক্যর কাছে আপনার প্রশংসা শুনেছি। আর সেনাপতি, আপনি ধন্য! আপনি বিপদে নিজের সেনাকে পরিত্যাগ করেননি। আপনি বীর আর্য! চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর অভিবাদন গ্রহণ করুন।

সুদীপ্তক নিশ্চিত হতে পারছে না যে, তার সামনে দাঁড়ানো মগধপতি তাদের সঙ্গে পরিহাস করছে কি না। পরাজিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও সেনাপতির প্রতি কোন বিজয়ী রাজা সম্মান প্রদর্শন করে?

চন্দ্রগুপ্ত আবারও বললেন,

— আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, আপনাদের সেনাবাহিনীর প্রাণহানি আমরা করিনি। অন্তত চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব রক্তপাতহীন হয় সেভাবেই রণকৌশল অবলম্বন করতে। আপনাদের অর্ধেক সেনা গিরিপথে আটকে আছে। আমরা শুধুই তাদের পথ আটকে তাদের উপত্যকায় আটকে রেখেছি। প্রাণহানি তাদের হয়নি বলাই চলে।

এইবার বিস্মিত হলেন সুদীপ্তক ও সেনাপতি। সুদীপ্তক বললেন,

— বেশ, শুনে খুশি হলাম, সম্রাট। কিন্তু আমাদের সঙ্গে আপনি কী করতে চান?

বিন্দুমাত্র চিন্তা না করেই চন্দ্রগুপ্ত উত্তর দিলেন,

— আমার ইচ্ছা আপনি আমাদের মৌর্যদের মার্গদর্শন করুন! আমি আচার্য চাণক্য ও মহামতি রা— মানে কাত্যায়নের আশীর্বাদ পেয়েছি ইতিমধ্যে। আপনি ও সেনাপতি যদি আমাদের সঙ্গে যোগ দেন তবে আমি খুবই খুশি হব। এটাই আমার একান্ত অনুরোধ আপনাদের প্রতি, আর্য।

সেনাপতি এবং সুদীপ্তক একে অন্যের মুখের দিকে একবার চেয়ে নিল। সেনাপতি বলল,

— আর যদি আমরা আপনার সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকার করি?

— তবে আপনারা মুক্ত।

— আমরা মুক্ত? আপনি আমাদের নিঃশর্তে মুক্তি দেবেন?

— অবশ্যই। এই আমার গোটা সেনাবাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে আমি কথা দিলাম। আপনারা যদি আমায় সাহায্য করতে ইচ্ছুক না হন তবে আপনারা মুক্ত। আপনাদের সৈনিকদের জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য। তারা যদি স্বইচ্ছায় মৌর্যসেনার অংশ হতে চায় তবে তারা স্বাগত। অন্যথায় তারা মুক্ত।

সেনাপতি সিংহরণ এতক্ষণ সব শুনছিলেন। সম্রাটের কথা শেষ হতে তিনি বন্দি সেনাদের উদ্দেশে বললেন,

— শুনলে? শুনলে তোমরা আমাদের সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর কথা? এইবার বলো! তোমরা কি সেই রাজার বিশ্বস্ত থাকতে চাও যে রণভূমিতে তোমাদের পরিত্যাগ করে কাপুরুষের মতো নিজের প্রাণ রক্ষা করে পলায়ন করে? নাকি, সেই সম্রাটকে নিজেদের অধিনায়ক হিসাবে পেতে চাও যে নিজের সৈনিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের রক্ত ঝরিয়ে তাদের গৌরবময় জয় এনে দেয়?

অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল মগধের সেনা আবারও প্রবল জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়ল। মলয়কেতুর সেনাদের মন বুঝতে অভিজ্ঞ সুদীপ্তক ও সেনাপতির সময় লাগল না। সুদীপ্তক জানে গোটা ঘটনাটা এমনভাবেই ঘটানো হয়েছে যাতে বিনা যুদ্ধে, স্বইচ্ছায় পর্বত্যকার সেনা মৌর্যদের সঙ্গে যোগ দেয়। এই গোটা পরিকল্পনা কার মস্তিষ্কপ্রসূত সেটাও অনুমান করতে অসুবিধা হচ্ছে না তার। নাহ, সত্যিই আপনি এযুগের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি, আচার্য। মনে মনে প্রশংসা না করে থাকতে পারলেন না সুদীপ্তক।

.

— তাহলে? আপনাদের নির্ণয় কী, মহামাত্য? সেনাপতি?

প্রশ্নটা করে হাসিমুখে নিজের ডান হাত তাঁদের দিকে বাড়িয়ে দিলেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত। প্রথমে সুদীপ্ত এবং তারপর সেনাপতি সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাতের উপর নিজেদের ডান হাত রাখলেন।

এইবার মৌর্যসেনার হর্ষধ্বনিতে যোগ দিল পর্বত্যকা সেনাবাহিনী।

৪৩.

কুটির অন্ধকার হতেই জীবসিদ্ধি তার সহজাত প্রবৃত্তি অবলম্বন করেই, তরবারি হাতে চাণক্যর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে টের পেল পাশ থেকে একজন প্রহরী ও শশাঙ্ক চিৎকার করে ঝাঁপাল বিধোরক যেখানে বসে ছিল সেদিকে। অন্ধকারে ধস্তাধস্তির মধ্যেই কেউ একজন সবেগে দরজার দিকে ছুটল বলে মনে হল, পেছনে কেউ ধাওয়া করল। কিন্তু হঠাৎ প্রথমজনকে থেমে যেতে হল।

পরমুহূর্তে দরজার দিক থেকে আলো ঢুকল ঘরে, দু-জন প্রহরী কুটিরে প্রবেশ করল। একজনের হাতে খোলা তরবারি, অন্যজনের হাতেও তাই, সঙ্গে অন্য হাতে মশাল। তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিধোরক। মাটি থেকে উঠছে শশাঙ্ক আর একজন সৈনিক। তার হাতে একটা ছোটো ছুরি। সেটা সে সম্ভবত এতক্ষণ নিজের কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রেখে বসে ছিল। শশাঙ্কর হাতে এক জায়গায় সামান্য কেটেছে দেখল জীবসিদ্ধি। সম্ভবত ওই ছুরির আঘাতেই। জীবসিদ্ধি অনুমান করতে পারল কী ঘটেছে। ঘর অন্ধকার করে পালানোর চেষ্টা করেছে বিধোরক, শশাঙ্ক আর এই প্রহরীর সঙ্গেই ধস্তাধস্তি হচ্ছিল। কিন্তু চিৎকার শুনে বাইরে লুকিয়ে থাকা সৈনিকরা দরজা দিয়ে ঢুকে আসায় বিধোরক পালাতে পারেনি।

দ্রুত ঘুরে গিয়ে পেছনের দরজার দিকে দৌড়াল বিধোরক। কিন্তু কুটিরের ভেতরে থাকা দ্বিতীয় সৈনিক তার পথ আটকে দাঁড়াল। ততক্ষণে পেছনের দরজা দিয়েও দু-জন সৈনিক ঢুকে এসেছে। বিধোরককে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। ইতোমধ্যে মাটিতে যে সৈনিকটি পড়ে ছিল সেও উঠে দাঁড়িয়েছে। পেছন থেকে সে ঝাঁপিয়ে বিধোরকের ছুরি ধরা হাত চেপে ধরল। অপর হাতটি ততক্ষণে শশাঙ্ক ধরে ফেলেছে।

— নিষ্ফল প্রতিরোধ কোরো না, বিধোরক! তুমি যতই দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হও না কেন, মগধের ছ-জন প্রথম সারির সশস্ত্র যোদ্ধার সঙ্গে তুমি পেরে উঠবে না।

চাণক্য বলে উঠলেন ঠান্ডা গলায়। জীবসিদ্ধি আশা করেনি চাণক্যর কথায় ফল হবে। কিন্তু তা হল। বিধোরক তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা বন্ধ করল। ধীরে ধীরে হাতের মুষ্টি আলগা করে দিতে তার হাত থেকে ছুরিটা পড়ে গেল মেঝেতে। সৈনিক দু-জন মুহূর্তে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে বিধোরকের দু-হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। বিধোরককে হাঁটুতে ভর করে মেঝেতে বসাল সৈনিকরা। চাণক্য ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন,

বিধোরক। তোমায় আমি কিছু প্রশ্ন করব। সেগুলোর যথাযথ উত্তর পেলে তোমার প্রাণরক্ষার দায়িত্ব আমি নিতে পারি এবং তোমায় কোনো নির্যাতন করা হবে না, কথা দিতে পারি। অন্যথায় তুমি জানো তো, লোকে বলে মগধের কারাগারের সামন্তদের সামনে প্রস্তরখণ্ডও মুখ খোলে।

— বিধোরক এতক্ষণ মাথা নীচু করে ছিল। এইবার চোখ তুলে চাণক্যর চোখে চোখ রাখল। বলল,

— জীবন মৃত্যুর কথা কেই-বা বলতে পারে, চাণক্য? ওই যে দেখো, আমি এই কক্ষে মৃত্যুর ঘ্রাণ পাচ্ছি, চাণক্য। তুমি কি পাচ্ছ তার গন্ধ? সে কিন্তু ইতিমধ্যে থাবা বসিয়েছে!

তার চোখের দৃষ্টিতে ও কথায় যেন কিছুর অশুভ ইঙ্গিত পেল জীবসিদ্ধি। সম্ভবত চাণক্যও সেরকমই কিছু অনুভব করেছেন কারণ জীবসিদ্ধি দেখল চাণক্য তাঁর অস্তরভেদী চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন বিধোরকের দিকে, যেন তিনি তার মনের কথা বোঝার চেষ্টা করছেন। হঠাৎই চাণক্যর চোখে তীব্র আতঙ্ক ফুটে উঠল।

— না! না না না! হে বিষ্ণু! না!

ভয়মাখা কণ্ঠে চাণক্য কথা বলতে বলতেই তাকালেন শশাঙ্কর দিকে। জীবসিদ্ধি আচার্যর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেল কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ছে শশাঙ্ক! তার চোখের মণি উলটে যাচ্ছে। প্রবল খিঁচুনিতে মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে তার।

শশাঙ্কর দিকে ছুটে গেল জীবসিদ্ধি ও চাণক্য। শশাঙ্কর শরীর ধরে ফেলল তারা দু-জন। চাণক্য উন্মাদের মতো শশাঙ্কর শরীর ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চিৎকার করছেন,

— না, না! বিষ্ণু রক্ষা করো! চোখ খোলো, শশাঙ্ক! দয়া করে চোখ খোলো!

জীবসিদ্ধিও হতবুদ্ধির মতো শশাঙ্ককে ডাকছে,

— কী হচ্ছে তোমার, মিত্র? কী হচ্ছে শশাঙ্কর, আচার্য?

— ওই ছুরির ফলায় বিষ ছিল! যে বিষ বাণে ব্যবহার করা হত!

শশাঙ্কর মুখ থেকে গ্যাঁজলা বেরোনো শুরু হয়েছে। মস্তিষ্কে বায়ু পৌঁছাতে না পেরে মুখ নীল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। গ্যাঁজলা ওঠা মুখেই শশাঙ্ক শুধু উচ্চারণ করল,

— আচার্য… কন্যা… নাম…

শেষবারের মতো একবার কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল শশাঙ্ক। পাথরের মতো তার মাথা নিজের কোলে নিয়ে চাণক্য বসে রইল, শশাঙ্কর এক হাত নিজের দু- হাতে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল জীবসিদ্ধি।

জীবসিদ্ধির কানে হাসির আওয়াজ এল। ভেজা চোখের জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল বিধোরক হাসছে! অট্টহাস্যে ফেটে পড়েছে সে তাদের দেখে।

জীবসিদ্ধি সহ্য করতে না পেরে তরবারি তুলে বিধোরককে হত্যা করতে উদ্যত হতে চাণক্য তার হাত চেপে থামাল। শশাঙ্কর নীল হয়ে যাওয়া মুখের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই, ‘না’ সূচক ঘাড় নেড়ে তাকে থামতে ইঙ্গিত করল।

বিধোরক এখনও হেসে চলেছে। হাসতে হাসতেই বলল,

— কী চাণক্য? হত্যা করো আমায়! শিষ্যর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে নাকি আমায় জীবিত রেখে শকুনির সন্ধান জানবে? কী করবে তুমি কৌটিল্য?

আরও জোরে হেসে উঠল সে। বলল,

— তোমার এক শিষ্যকে রক্ষা করতে পেরেছ বটে কিন্তু দ্বিতীয়জনকে পারলে না? জানো চাণক্য, আমার আচার্য আমাকে বলেছিল যে, তুমি যদি একবার এখানে পৌঁছে যাও তবে আমাদের কৌশল তুমি সহজেই ধরে ফেলবে। তাই আমি আজকে সকাল থেকেই তৈরি ছিলাম তোমার জন্যে। ভেবেছিলাম অপূর্ণ কাজ আমি সম্পূর্ণ করে দিতে পারব। গুরুদেব বলে জীবসিদ্ধি সদাসতর্ক। তাই আশা করেছিলাম কুটির অন্ধকার হতেই জীবসিদ্ধি আমাকে ধরতে ঝাঁপাবে, ছুরি চালানোর সময়ও ভেবেছিলাম তোমার এই দ্বিতীয় ছাত্রকেই আঘাত করলাম। কিন্তু অদৃষ্টের কী পরিহাস দেখো, জীবসিদ্ধি! তুমি আমায় না আটকে নিজের গুরুকে রক্ষা করতে গেলে, আর তোমার জায়গায় প্রাণ দিল শশাঙ্ক।

জীবসিদ্ধি এগিয়ে গিয়ে পর পর কয়েক বার বিধোরকের মুখ লক্ষ করে ঘুসি চালাল।

রক্তাক্ত অবস্থাতেও তার হাসির বেগ আরও বাড়ল। চাণক্য এখনও শশাঙ্কর মাথা কোলে নিয়ে বসে আছেন। জীবসিদ্ধি থামতে প্রশ্ন করলেন,

— কীভাবে? কীভাবে শকুনি এত কিছু জানল আমাদের বিষয়ে? আমার ছাত্রদের পরিচয়, তাদের অভ্যাস, এইসব কীভাবে সে জানল?

মুখ থেকে একদলা থুথু আর সঙ্গে জীবসিদ্ধির আঘাতে ভেঙে যাওয়া কয়েকটা দাঁত মেঝেতে ফেলে বিধোরক উত্তর দিল,

— বিস্মিত হলে, কৌটিল্য? তুমি অনুমানও করতে পারবে না কিছু, চাণক্য! গুরুদেব তোমাদের ও তোমার মূল শক্তিস্তম্ভ ছয়জন ছাত্র বিষয়ে সব কিছু জানেন! জানো চাণক্য, তোমায় আমি ঘৃণা করি! তোমার নিজের অহং পূর্ণ করতে তুমি অগণিত মানুষকে ব্যবহার করেছ। নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে, দেশকে স্বাধীন করার মিথ্যা উদ্দেশ্য দিয়ে নিজের সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলে; আমার তিন ভ্রাতাও ছিল। তোমার কথায় উদবুদ্ধ হয়ে তারা যুদ্ধে গিয়েছিল মগধের বিরুদ্ধে। মনে পড়ে পাটলিপুত্রে তৃতীয় তথা শেষ আক্রমণের কথা? যে ছোটো সৈন্যদল তোমার কথায় বিশ্বাস রেখে সেদিন পাটলিপুত্র আক্রমণ করেছিল তাদের মধ্যে ওরাও ছিল। ওরা জানতই না যে, ওরা তোমার যুদ্ধজয়ের চতুরঙ্গে বলিপ্রদত্ত গুটি মাত্র!

চাণক্য স্তব্ধ হয়ে বসে রয়েছেন। বিধোরক আরও একবার বিষ উগরে দিয়ে বলল,

— অবিভক্ত আর্যাবর্ত তোমার সর্বগ্রাসী উচ্চাভিলাষ মাত্র! মৌর্য সাম্রাজ্য শুধুমাত্র নন্দর দরবারে তোমার অপমানের প্রতিশোধের নিদর্শন! তোমার এই স্বপ্নের জন্যে যে মানুষরা প্রাণ দিয়েছে তাঁদের নাম কে মনে রাখল, কৌটিল্য? ইতিহাসে কি লেখা থাকবে তাঁদের নাম? না, সবাই ভুলে যাবে, ভুলে গিয়েছে! আমার তিন ভাইয়ের মৃতদেহ পর্যন্ত আমরা পাইনি! ভাইদের মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে মা মারা যায় যুদ্ধের পরেই। তুমি মহান হলে আমার পরিবার ধ্বংসের মূল্যে। এরকম কত হাজার পরিবার আজ অবধি তুমি ধ্বংস করেছ তার সংখ্যা জানো, চাণক্য? আজ শশাঙ্কও তোমারই উচ্চাভিলাষের বলি হয়েছে।

জীবসিদ্ধি চেঁচিয়ে উঠল,

— শশাঙ্কর নাম তোর মুখে আমি শুনতে চাই না খুনি!

জীবসিদ্ধিকে উপেক্ষা করে বিধোরক আবার বলল,

— আমরা যে স্বজন হারানোর শোক সহ্য করেছি তা এবার তুমি অনুভব করবে, কৌটিল্য! যেন সহজ মৃত্যু তোমার শাস্তি নয়; এই শোক, প্রিয় মানুষের মৃত্যুর সাক্ষী থাকার অসহায়তার অনুভূতিই তোমার সাজা! নিজের স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার হতে দেখবে তুমি! মৌর্য সাম্রাজ্য ধ্বংস হবেই!

চাণক্য বিধোরকের দিকে মুখ ফেরালেন। তাঁর মুখে কাঠিন্যের ভাব,

— শকুনির মুখ্যালয় কোথায় বিধোরক? কোথায় লুকিয়ে আছে সে?

বিধোরক কয়েক মুহূর্ত চাণক্যর দিকে তাকিয়ে থাকল অপলক দৃষ্টিতে। তারপর আবার অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল। হাসি থামিয়ে বলল,

— শকুনির সন্ধান চাও, চাণক্য? তবে জেনে রাখো, সে তোমার এক হস্ত দূরে এসে দাঁড়ালেও তুমি তাকে ধরতে পারবে না! আর্যাবর্তকে ধ্বংস সে করবেই।

শশাঙ্কর মাথা কোল থেকে সযত্নে মাটিতে নামিয়ে রেখে চাণক্য উঠে দাঁড়ালেন। ধীর পদক্ষেপে হাঁটুর উপর বসে থাকা বন্দি বিধোরকের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। ঝুঁকে তার মুখের সামনে নিজের মুখ নিয়ে এসে বললেন,

— উত্তর আমার এখনই চাই। কৌটিল্য কতটা নৃশংস হতে পারে সে-ধারণা তোমার নেই। বিশ্বাস করো তুমি উত্তর না দিলে আমি নিজে তোমার সেই দশা করব যে মৃত্যুও তোমাকে দেখে ভয় পাবে। আমি আর মাত্র একবার প্রশ্ন করব বিধোরক—শকুনি কোথায়, বিধোরক?

চাণক্যর কণ্ঠে, কথা বলার ভঙ্গিতে কিছু একটা ছিল যা কক্ষে উপস্থিত সকলের হৃদয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিল একমুহূর্তের জন্যে। চাণক্য শাস্ত রয়েছেন, স্বাভাবিকের চেয়েও যেন অধিক শান্ত। কিন্তু তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি শব্দে যেন আসন্ন প্রলয়ের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

বিধোরকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। জীবসিদ্ধির মনে হল আজ সন্ধ্যা থেকে এই প্রথমবারের জন্যে বিধোরক ভয় পেয়েছে। বিধোরক কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

— আচার্য শকুনির সন্ধান চাও তুমি? বেশ, তবে জেনে রাখো। সে মৃত!

কথাটা শেষ হতেই বিধোরকের মুখের ভেতর থেকে কিছু কামড়ানোর শব্দ হল। পরমুহূর্তে তার মুখ থেকে গলগল করে রক্ত ও সঙ্গে কিছু একটা মাংসপিণ্ড বেরিয়ে এল। জীবসিদ্ধির বুঝতে সময় লাগল যে, সেটা একটা মাড়ি থেকে ছিন্ন হয়ে যাওয়া জিহ্বা!

একজন সৈনিক চেঁচিয়ে উঠল,

— হে ঈশ্বর! শয়তানটা নিজের জিভ কামড়ে কেটে ফেলেছে! আত্মহত্যা করতে চাইছে! ওকে বাঁচাতে হবে।

চাণক্য হাত তুলে সকলকে থামতে বললেন। বিধোরককে বাঁচানোর কোনো প্রয়াস করতে বারণ করলেন হাতের ইশারায়। জীবসিদ্ধি বলল,

— কিন্তু আচার্য…

চাণক্য তাকে আবারও হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। চাণক্য স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা, ক্রমাগত মুখ থেকে রক্ত বেরোতে থাকা বিধোরকের দিকে। জীবসিদ্ধি সে-দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে ফেলল। প্রায় প্রত্যেকেই তাই করল। কিন্তু চাণক্য গোটা সময়টা স্থির, ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। যতক্ষণ না বিধোরকের ছটফটানি থেমে গিয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা রক্তের মধ্যে তার দেহ স্থির হয়ে গেল।

তারপর ধীর পদক্ষেপে হেঁটে চাণক্য আবার শশাঙ্কর মৃতদেহর কাছে গিয়ে পুনরায় বসলেন। তাঁর পুত্রসম শিষ্যর মাথাটা আবার নিজের কোলে নিলেন এবং বিড়বিড় করে বললেন,

— আমায় ক্ষমা করো, শশাঙ্ক। আমায় ক্ষমা করো!

৪৪.

মলয়কেতু ও পদ্মা গত দু-দিন হল আত্মগোপন করে আছে জঙ্গলের ধারে নির্জন প্রান্তরে অবস্থিত একটি ভবনে। মলয়কেতু গত দু-দিন শুধুই মদ্যপান করেছে এবং বাকি সময়টুকু সেই নেশায় অঘোরে ঘুমিয়েছে। পদ্মা তার যত্নের ত্রুটি করেনি।

পদ্মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে সোমরসের নেশার ঘোরে মলয়কেতু বলছে,

— সবাই ভাবছে আমি শেষ। আমি আর কিছুই করতে পারব না। ওরা, সবাই একসঙ্গে চক্রান্ত করেছে। কিন্তু ওরা ভুলে যাচ্ছে যে, আমি পৌরবরাজ মলয়কেতু! বীর পুরুরাজের রক্ত আমার ধমনীতে। আমি এবারের মতো হেরে গেলেও আবার আমি জিতব। ওই কুলহীন চন্দ্রগুপ্ত যদি পারে তবে আমি কেন পারব না? তাই না, পদ্মা?

পদ্মা মলয়কেতুর চুলে আঙুল চালাতে চালাতে উত্তর দিল,

— হ্যাঁ, মহারাজ।

মলয়কেতু আবারও বলল,

— কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না, পদ্মা। আমার নিজের প্রধানমন্ত্রী, সেনাপতি আমার সঙ্গ ছেড়েছে। শুনলাম তারা চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে! এটা কি বেইমানির চরম নজির নয়?

— হ্যাঁ, মহারাজ!

— শোনো পদ্মা, তোমায় ছাড়া আমি কাউকে বিশ্বাস করি না! কাউকে না! একবার আমায় নিজের করে নাও, পদ্মা! আর কত অপেক্ষা করাবে আমায়? আমি পুনরায় রাজসিংহাসনে বসলে তুমি হবে আমার রানি! রাজরানির সম্মান দেব আমি তোমায়!

— হ্যাঁ, মহারাজ। আর অপেক্ষা নয়।

পদ্মা ঝুঁকে পড়ে মলয়কেতুর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। গভীর চুম্বনে দুটি ঠোঁট আবদ্ধ থাকল বেশ কিছুক্ষণ। মলয়কেতুর শরীর নেশার মধ্যেও কেঁপে উঠছিল উত্তেজনায়।

মলয়কেতুর ঠোঁট ছেড়ে পদ্মা তাকে দেখে হাসল। মলয়কেতু তার কোলে মাথা রাখা অবস্থাতেই হাত বাড়িয়ে আরও একবার পদ্মাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে চাইল। পদ্মা বলল,

— মহারাজ। আপনি মত্ত।

— আমি তোমার নেশায় মত্ত হয়েছি, পদ্মা! এসো, আজকে আমায় প্রত্যাখ্যান কোরো না।

— কিন্তু মহারাজ, আপনার যে ঘুম পাচ্ছে।

মলয়কেতু যেন তার কথাতেই অনুভব করল যে, সত্যিই তার চোখ নিদ্রায় ভারী হয়ে আসছে। মলয়কেতু তন্দ্রা ও নেশার ঘোরে প্রশ্ন করল,

— তাহলে এখন কী করব, পদ্মা?

পদ্মা মলয়কেতুর চুলে আবারও আঙুল চালানো শুরু করেছে। বড্ড আরাম লাগে মলয়কেতুর তার মাথায় এভাবে কেউ আঙুল চালিয়ে দিলে। পদ্মা বলল,

— আপনি আমার কোলে মাথা রেখে এভাবেই ঘুমিয়ে পড়বেন, মহারাজ।

— কিন্তু আমার যে ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না, পদ্মা। কিন্তু নিদ্রা আমার চোখের পাতা ভারী করে দিচ্ছে। কী করি, পদ্মা?

— আপনি চোখ বন্ধ করুন, মহারাজ। আমি বরং আপনাকে একটি গল্প শোনাই।

— গল্প শোনাবে, পদ্মা? কাহিনি? জানো পদ্মা, এভাবেই আমার মাতা আমাকে কাহিনি শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত ছোটোবেলায়। আমার না মাতাকে আজ অনেক বছর পর খুব মনে পড়ছে। পিতার কথাও মনে পড়ছে। তাঁকে আমি নিজের হাতে বিষ…

— ওকথা থাক, মহারাজ। আপনি নাহয় গল্প শুনুন। চোখ বুজে গল্প শুনুন।

মলয়কেতুর চোখের পাতা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাও সে বলল,

— বেশ। কাহিনি শোনাও আমায় তুমি। কীসের কাহিনি শোনাবে আমায় তুমি?

— এই কাহিনির কোনো নাম নেই, মহারাজ। শুধু কাহিনিটা আছে। আপনি শুনবেন?

— হুমম।

— বেশ। এক দেশে একটি বালিকা ছিল। তার জন্ম হয়েছিল বড়ো অশুভ সময়ে। নক্ষত্রের দিশা অনুযায়ী সেই বালিকার জন্ম অশুভ। তাই তার জন্মের পরেই প্রথমে ঠিক করা হল, এই কন্যাকে জীবিত রাখা হবে না। তাই তার পিতা ও পরিবার চাইল তাকে তখনই হত্যা করতে। কিন্তু শুধু তার মাতার জন্যে সেযাত্রা সেই শিশুটি রক্ষা পেল। মহারাজ, আপনি কি জেগে আছেন?

— হ্যাঁ, বলো… তারপর?

— তারপর সকলের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়ে মেয়েটি বড়ো হল, বালিকা থেকে কিশোরী বয়সে পদার্পণ করল। সে জানত না তার দোষ কী। শুধু জানত যে সে অশুভ! তার সংস্পর্শে কোনো পুরুষ কোনোদিন এলে, সেই পুরুষের মৃত্যু অনিবার্য। তাই সেই কন্যার বিবাহ কোনোদিন সম্ভব ছিল না। মাতার অকালে মৃত্যুর পর থেকে কেউ তাকে কোনোদিন ভালোবাসেনি, কোনোদিন ভালোবাসবেও না। সে বুঝতে পারে যে সে সুন্দরী, কিন্তু সে যে অশুভ। তাই পরিবারের কাছে সে ছিল বোঝা। সকলে বলত ও মেয়ে নয়, ও বিষকন্যা! মহারাজ, আপনি কি এখনও শুনছেন?

— হুমম…

— এরপর একদিন সেই মেয়েটার গ্রামে এক প্রাজ্ঞ ব্রাহ্মণ এলেন। সকলে সেই ব্রাহ্মণকে খুব আদর আপ্যায়ন করল। এই ব্রাহ্মণ গ্রামে এসে সেই অশুভ কিশোরীটির কথা জানতে পারলেন। কী আশ্চর্য, সেই মেয়েটিকে কাছে ডাকলেন। বড়োমানুষদের কাছে লাঞ্ছনা, কামুক দৃষ্টি ও স্পর্শ পেতেই এতদিনে অভ্যস্ত। তাই যখন সেই প্রাজ্ঞ ব্রাহ্মণ তার মাথায় সস্নেহে হাত রেখে তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘মা, তোর বড়ো কষ্ট আমি জানি। তোর মতো অনেক মেয়ের অশ্রুজলে এই দেশের ভূমি সিক্ত হয়েছে, মা। এখানে তোর কিছুই নেই রে। যাবি আমার সঙ্গে? তোর মতোই অনেক কন্যা থাকে এক জায়গায়। ওখানে সবাই সমান, কেউ তোকে হীনদৃষ্টিতে দেখবে না, মা। যাবি আমার সঙ্গে সেখানে?” জীবনে সেই প্রথমবার আনন্দে চোখে অশ্রু এসেছিল মেয়েটার। সেই ব্রাহ্মণের সঙ্গেই সেই কিশোরী আশ্রমে আসে। সেখানে আরও অনেক মেয়ের সঙ্গেই তাকে বিভিন্ন যুদ্ধকলা, ভাষা, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। খাদ্যের সঙ্গে নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে বিষ তাকে দেওয়া হতে থাকল সেই ব্রাহ্মণ ও এক দক্ষ আয়ুর্বেদাচার্যর তত্ত্বাবধানে। সেই বিষের পরিমাণ বয়সের সঙ্গেসঙ্গেই বাড়ানো হত, যাতে যৌবনে সেই কন্যাদের শরীরে বিষের প্রাকৃতিক প্রতিষেধক গড়ে ওঠে। সেই কন্যাটিকে নতুন নাম দেওয়া হয়। যে পরিচয় আজীবন তার কাছে অভিশাপ ছিল, এই আশ্রমে সেই পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে নিজের উপাধি নিয়েছিল সেই মেয়েটি। বিষকন্যা! হ্যাঁ, সে বিষকন্যা! মহারাজ, আপনি কি বিষকন্যাদের বিষয়ে শুনেছেন? নিশ্চয়ই শুনেছেন?

— হুমম…

অস্পষ্ট অস্ফুট শব্দ এল মলয়কেতুর মুখ থেকে।

— মহারাজ, একটি গোপন কথা বলি আপনাকে। কাউকে বলবেন না কিন্তু কথাটা। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, বিষকন্যাদের শরীরে এত বিষ থাকে যে, তাদের স্পর্শে বা চুম্বনে বা দংশনে মানুষের মৃত্যু হয়। এ তথ্য একদমই ভুল। এই ভুল তথ্য ইচ্ছে করেই মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের বিভ্রান্ত করতে, তাদের মনে ভয় সঞ্চার করতে। আসলে এই নারীরা সহজেই সাধারণের মতো জীবনযাপন করতে পারে। সাধারণ পরিস্থিতিতে তাদের থেকে কারুরই কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আসলে তাদের শরীরে বিষ থাকে বটে, তবে তা শুধুমাত্র তাদের নিজের শরীরকে কোনোরকম বিষের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু এর ফলে বিষকন্যারা এই বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর গুপ্তঘাতকও বটে। সহজেই নিজেদের শরীরের বিভিন্ন অংশে, দাঁতে, যোনিতে বা ঠোঁটে তীব্র বিষ মেখে সহজেই স্বাভাবিক থাকতে পারে। কারণ, সেই বিষ ভুলক্রমে তাদের শরীরে প্রবেশ করলেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু, অন্য মানুষদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, তাদের শরীরের অঙ্গে বা ঠোঁটে মাখা বিষের প্রভাবে তাদের চুম্বনে, দংশনে বা সংগমে অন্য ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এই তথ্য কিন্তু অতি গোপন। তাও আপনাকে বললাম, কেন জানেন? কারণ আমি বিশ্বাস রাখি যে, আপনি এই কথা কোনোদিন কাউকে বলবেন না। মহারাজ, আপনি কি এখনও জেগে আছেন?

কোনো উত্তর এল না মলয়কেতুর দিক থেকে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল পদ্মা। মলয়কেতুর শরীরে নীলচে আভা ফুটে ওঠা অবধি বসে রইল সে অপেক্ষায়। যখন বুঝল যে মলয়কেতুর নিশ্বাস ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠছে, তখন তার মাথাটা নিজের কোল থেকে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল পদ্মা। দ্বার খোলা রেখেই ভবন থেকে বেরিয়ে এল। দুটি ঘোড়া বাঁধা ছিল প্রাঙ্গণে। একটিকে বাঁধন খুলে ছেড়ে দিল পদ্মা, অপরটির পিঠে চড়ে বসে পূর্বের অভিমুখে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।

***

শশাঙ্কর অস্তিম-ক্রিয়া তক্ষশিলার প্রাঙ্গণে সম্পূর্ণ রাজকীয় সামরিক সম্মানে সমাধা করা হয়েছে। মৃতদেহ মগধ অবধি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় জেনে চাণক্যই বলেছিলেন,

— অন্তত তক্ষশিলা অবধি শশাঙ্ককে নিয়ে চলো, জীবসিদ্ধি। নিজের গুরুকুলের চেয়ে পুণ্যভূমি আর কীই-বা হতে পারে? আশা করি, শশাঙ্কর আত্মা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে তাতে।

শশাঙ্কর চিতাভস্ম একটি মাটির ছোটো কলসে নিয়ে চাণক্য ও জীবসিদ্ধিসহ মগধ সেনার ছোটো দলটি পাটলিপুত্রর পথ ধরেছে।

গোটা পথে চাণক্য একবারের জন্যেও সেই কলসটি নিজের দৃষ্টির বাইরে হতে দেননি। বলেছেন এই অন্তিম চিহ্নটুকু শশাঙ্কর স্ত্রী, পরিবারের হাতে সমর্পণ না করা অবধি তিনি স্বস্তি পাবেন না। জীবসিদ্ধি এত বছরের পরিচিতিতে চাণক্যকে খুব কমই দেখেছে এতখানি অনুভূতিপ্রবণ হতে। জীবসিদ্ধি উপলব্ধি করেছে যে, শিষ্যদের প্রতি তাঁর পাষণ-হৃদয় গুরুর মনে কতটা গভীর অথচ অব্যক্ত ভালোবাসা আছে।

পথে চাণক্য কথা বলেছেন খুব কম। জীবসিদ্ধির কথার উত্তর যতটা কম কথায় দেওয়া সম্ভব ততটাই বাক্য ব্যবহার করেছেন। তবে যাত্রাপথের মধ্যেই জীবসিদ্ধি জানতে চেয়েছিল,

— আচার্য, বিধোরক কোন যুদ্ধের কথা বলছিল? যে যুদ্ধে রাজধানী আক্রমণ করতে গিয়ে তার পরিবার মারা গিয়েছিল, সে-বিষয়টা কী?

চাণক্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন,

— তুমি তো জানোই জীবসিদ্ধি, সম্মুখসমরে ধনানন্দর বিশাল সেনাকে পরাস্ত করা আমাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিল না। তাই আমাকে এক কূট-রণকৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। আমার উদ্দেশ্য ছিল মগধের প্রান্ত জনপদগুলো আগে দখল করা, যাতে রাজধানীকে অন্য রাজ্যের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা যায়। এর ফলে রাজধানীর সঙ্গে বাণিজ্যপথ বন্ধ হবে। ক্রমশই খাদ্য ও অন্য জরুরি সামগ্রীর অভাব দেখা দেবে, যার ফলে সেনা ও প্রজাদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাবে এবং মগধের অন্দরেই বিদ্রোহ সৃষ্টি হবে। আমরা এভাবেই মগধকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে দুর্বল করে তবেই পরাস্ত করেছিলাম তাদের।

জীবসিদ্ধি বলল,

— হ্যাঁ, সে তো জানি, আচার্য।

চাণক্য বললেন,

— হুমম। কিন্তু মগধের প্রান্তের বা সীমান্তবর্তী রাজ্য জয় করতে গেলে আগে প্রয়োজন ছিল সেখান থেকে মগধের সেনাকে সরিয়ে দেওয়া। এই কাজ কিন্তু কঠিন ছিল জীবসিদ্ধি, কারণ ভুলে যেয়ো না সেইসময়ে ধনানন্দর মহামাত্য ছিল স্বয়ং রাক্ষস। তাকে অন্য অন্য রাজ্য থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করার একমাত্র উপায় ছিল যদি কোনোভাবে নন্দ ও রাক্ষসের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়া যায় যে, রাজধানী পাটলিপুত্র আক্রান্ত। একমাত্র রাজধানীতে আক্রমণ হলে, তবেই নন্দ তার বাহিনীকে অন্য রাজ্য থেকে সরিয়ে পাটলিপুত্রে নিয়ে আসত রাজধানীর সুরক্ষার কথা ভেবে। অতএব, আমার প্রয়োজন ছিল একটি সেনাদলের যারা পাটলিপুত্র আক্রমণ করবে। এই সেনাদলকে আমি কখনোই আমার আসল উদ্দেশ্য বলিনি। বলিনি যে, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে চলেছে রাজধানীতে আক্রমণ করে মগধের বিশাল সেনার কাছে পরাস্ত হওয়া। তারা আমার জন্যে ছিল উচ্চতর মহৎ উদ্দেশ্যসিদ্ধির স্বার্থে বলিপ্রদত্ত কয়েকটি প্রাণ।

চাণক্য কিছুক্ষণ চুপ করে চোখ বুজে রইলেন। চোখ না খুলেই বললেন,

— আমি জানতাম তারা নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে চলেছে আমারই দেখানো পথ অনুসরণ করে। তাদের আমি মিথ্যা বীরত্বের দিবাস্বপ্ন দেখিয়েছিলাম। বিশ্বাস জাগিয়েছিলাম মনে যে, আমার রণনীতি অনুযায়ী তারা যুদ্ধে গেলে তাদের জয় হবে। তারা আমার মিথ্যা কথায় আশ্বস্ত হয়ে পাটলিপুত্রে আক্রমণ করে। রাজধানীতে আক্রমণ হতে ধনানন্দর আদেশে মগধের সমস্ত সেনা রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হয়ে যায় অন্যান্য রাজ্যকে অরক্ষিত রেখেই। এবং, সেই সুযোগেই আমরা দখল নিই সেইসব অরক্ষিত রাজ্যের। পরবর্তী ঘটনার সাক্ষী তুমি নিজে ছিলে। কিন্তু এর মূল্য দিতে হয়েছিল সেই সেনাবাহিনীকে যারা নিজেদের অজান্তেই আমার আদেশে পাটলিপুত্রে আক্রমণ করে প্রাণ দিয়েছিল। সেই বাহিনীতেই বিধোরকের পরিবারের সদস্যরাও ছিল।

চাণক্য থেমে চোখ খুললেন। জীবসিদ্ধি কোনো কথা বলল না, একদৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে বসে রইল। শুনতে পেল চাণক্য বলছেন,

— এই মানুষদের মৃত্যুর দায় আমার, শুধুই আমার। আমি এই পাপ মাথা পেতে নিয়েছি এবং এর ফলে যদি মৃত্যুর পর ঈশ্বরের আদেশে আমাকে নরকের অগ্নিতে অনন্তকাল পুড়তে হয়, তবুও আমি রাজি। কিন্তু, আমি আমার জীবনে যে অসংখ্য তথাকথিত অধর্মের মার্গ অবলম্বন করেছি, সেই সকল পাপের দায় স্বীকার করে নিয়েও আমি বলতে পারি, যে তার কোনোটাই আমি নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা ভেবে করিনি। আমি আজ অবধি যা যা করেছি শুধুমাত্র এই দেশের, আমার মাতৃভূমির হিতের স্বার্থে করেছি। এবং, একই পরিস্থিতিতে, আমি পুনরায় ঠিক তাই করব!

জীবসিদ্ধি অবাক চোখে তার গুরুর দিকে দেখল। তার মনে পড়ে যাচ্ছে মহাভারতের কাহিনি। কুরুক্ষেত্রর যুদ্ধর শেষে শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল স্বেচ্ছায়। ধর্মযুদ্ধ জয়ের জন্যে কি সেও বারংবার অধর্মের পথ অবলম্বন করেনি? সে তো দেবতা ছিল, স্বয়ং বিষ্ণু। আর এই বিষ্ণু তো সাধারণ মানবমাত্র। অথচ কী অদ্ভুত মিল তাদের…।