২০.
জীবসিদ্ধি উঠে দাঁড়িয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের প্রণাম জানিয়ে বলল,
— আপনাদের ব্যস্ততার মধ্যে কিছুটা সময় নেওয়ার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী। তবে, আপনারা আসতে পারেন যদি আপনাদের আর কোনো প্রয়োজন না থাকে।
জীমূতবাহন, মলয়কেতু এবং ভুবন বেরিয়ে গেলেও অন্যরা নিজের নিজের আসনে বসে রইলেন। মহামাত্য কৃষ্ণনাথকে খুবই ক্লান্ত লাগছে। রাক্ষসও বসে আছেন নিজের জায়গায়। তিনি কিছু ভাবছিলেন। বাকিরা কক্ষ ত্যাগ করতে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। চাণক্যর উদ্দেশে বললেন,
— আচার্য, সব কিছুরই যখন উত্তর দিলেন তখন আমার মনের সংশয়ও দূর করুন। যদিও, আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেন কি না সেটা আপনার অভিরুচি।
চাণক্য অনুমান করতে পারছিলেন কী সেই প্রশ্ন। তবুও বললেন,
— কোন প্রশ্ন, আর্য রাক্ষস?
— সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর পানীয়ে কে বিষ মেশাল? তবে কি রাজমহলে দ্বিতীয় কোনো হত্যাকারী আছে?
চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,
— না, আর্য। আপনাকে আমি নিশ্চিতরূপে বলতে পারি যে, রাজমহলে আর কোনো হত্যাকারী নেই।
তবে? আমি যে নিজে দেখেছি যে, সম্রাটের পানীয়ে বিষ ছিল?
চন্দ্রগুপ্ত বলে উঠলেন,
— এই রহস্যের উত্তর সম্ভবত আমি অনুমান করতে পারছি। বোধ হয় আমি জানি যে, আমার পানীয়ে কে বিষ দিয়েছে।
তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসি।
— কে? কে সম্রাট?
রাক্ষসের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চন্দ্রগুপ্ত জীবসিদ্ধির দিকে তাকিয়ে, কৌতুকের ভঙ্গিতে নিজের ভ্রূ জোড়া তুললেন।
জীবসিদ্ধি উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলল,
— আপনার অনুধাবন সঠিক। আমায় ক্ষমা করবেন সম্রাট। আপনার পানীয়ে আমিই বিষ মিশিয়েছিলাম।
রাক্ষস, রাজকুমারী এবং কৃষ্ণনাথ, তিনজনের মুখ থেকেই বিস্ময়সূচক শব্দ বেরিয়ে এল একইসঙ্গে। তাঁদের দৃষ্টিতে অপার বিস্ময়। যদিও চন্দ্রগুপ্তর ঠোঁটের কোণে হাসি লেগেই রয়েছে।
উৎসাহিত ভঙ্গিতে তাঁর আসনের হাতলে মুষ্টির আঘাত করে বললেন,
— আহ্! আমি জানতাম! আজকে দুপুরে আমার কক্ষে যখন আচার্য অন্য কোনো দাসের পরিবর্তে তোমায় আমার অভুক্ত খাদ্য এবং পানীয় নিয়ে যেতে বললেন, সেই মুহূর্তেই আমার মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তার বিশেষ কোনো তাৎপর্য অনুমান করতে পারিনি। কিন্তু খানিক পূর্বেই যখন আচার্য ধনানন্দকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করলেন, তখনই আমার মনে পড়ে গেল। আমার কক্ষে আচার্য গোপনে তোমায় কিছু একটা নির্দেশ দিচ্ছিলেন।
হার মানার ভঙ্গিতে দু-হাত তুলে জীবসিদ্ধি হেসে বলল,
— যথার্থ অনুমান করেছ, ভ্রাতা। তোমার অনুধাবন ক্ষমতা শীঘ্রই গুরুদেবকে অতিক্রম করবে, আশা রাখি।
নাসিকা থেকে একটি শব্দ নির্গত হল চাণক্যর। অনেকটা যেন তিনি বলতে চাইলেন, ‘আশা থাকা ভালো। দুরাশা নয়!’
রাক্ষস বললেন,
— কিন্তু আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না! এর অর্থ কী?
চাণক্য ডান হস্ত উঠিয়ে বললেন,
— আমারই আদেশে জীবসিদ্ধি সম্রাটের পানপাত্রের অবশিষ্ট পানীয়ে বিষ মিশিয়েছিল।
— কিন্তু, কেন?
ক্ষমা করবেন, আর্য কাত্যায়ন। এই সামান্য ছলনার সাহায্য আমায় নিতেই হয়েছে। এই নির্দেশ এই কারণেই দিয়েছিলাম যাতে আপনার উপস্থিতিতে রাজকুমারী এবং সম্রাট, উভয়েরই পানীয় পরীক্ষার সময় তাতে বিষ পাওয়া যায়।
মনে মনে চাণক্য ভাবলেন, সম্রাটের খাদ্যে এমনিতেই বিষ থাকে সাধারণত। কিন্তু আজকে বিশেষ দিনে তা দেওয়া হয়নি। অন্যথায় এমনিতেই বিষ পাওয়া যেত তাঁর উচ্ছিষ্ট খাদ্যে। জীবসিদ্ধিকে আলাদা করে আর বিষ প্রয়োগ করতে হত না।
রাক্ষস প্রশ্ন করলেন,
— কিন্তু, কেন?
— পরিস্থিতি বাধ্য করেছে, আর্য। রাজকুমারী দুর্ধরার পানীয়ে বিষ প্রয়োগ করে তাঁকে কেউ হত্যার চেষ্টা করেছে। আপনারা আমাদের, অর্থাৎ, মগধের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেন। এবং, এই বিবাহ সেই মুহূর্তে স্থগিত করে পাটলিপুত্র ত্যাগ করতেন। অতিথিদের মধ্যে ধনানন্দ এই সংবাদ ছড়িয়ে দিলে আর কোনোভাবেই আমরা আপনাদের আটকাতে পারতাম না। সেই অভিলাষই ছিল ধনানন্দর। কিন্তু রহস্যের সমাধানের জন্যে আমার সময় প্রয়োজন ছিল, যা আপনারা আমাকে দিতেন না। তাই আমাকে বাধ্য হয়ে সেই মুহূর্তে এই ছলটি করতে হল। যদি সম্রাটের পানীয়েও বিষ পাওয়া যায়, এবং, তার সাক্ষী যদি নন্দের বিশ্বস্ত অমাত্য থাকে, তবে পরিস্থিতিতে কিছুটা সমতা আসে। অর্থাৎ আপনারা একতরফা আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ করতে পারবেন না। আমাদের কাছেও পালটা অভিযোগের অস্ত্র থাকবে। সম্রাটকে হত্যার চেষ্টা সাধারণ ব্যাপার নয়, অতএব আপনারাও ভেবেচিন্তে নির্ণয় নিতে বাধ্য হবেন। আপনারাও সেই কারণেই ঘটনাটি অতিথিদের মধ্যে রটিয়ে দেওয়ার সাহস করলেন না। এর ফলে আমি সময় পেয়ে গেলাম। এই সামান্য ছল ব্যতীত আমি এই রহস্যের সমাধান করতে পারতাম না, আর্য। এই কারণে আমি আপনার এবং রাজকুমারীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
রাক্ষসের মুখে এই প্রথম একটি অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। সেটি অসন্তোষের না প্রশংসার তা অনুমান করা গেল না স্পষ্ট। ঠোঁটের ফাঁকে তিনি কিছু একটা শব্দ বললেন। তা স্পষ্ট শোনা না গেলেও, জীবসিদ্ধির মনে হল কথাটি ‘কৌটিল্য’!
বাইরে থেকে প্রহর ঘণ্টার ধ্বনি ভেসে এল। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হয়েছে।
আর সঙ্গেসঙ্গেই যেন সকলের মনেই প্রশ্নটা এল – ‘এইবার কী?’
চন্দ্রগুপ্ত একবার দুর্ধরার দিকে দেখলেন। রাজকুমারী নিশ্চুপ বসে আছেন। তাঁর গাল বেয়ে এখনও অশ্রুধারা নামছে।
নারীর বিষয়ে অসহায় পুরুষমাত্রেই তার মিত্রদের শরণাপন্ন হয়ে থাকে। চন্দ্রগুপ্তও তাই এই মুহূর্তে তার একমাত্র মিত্রস্থানীয় ব্যক্তির দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পরামর্শ চাইলেন। জীবসিদ্ধি তাকে নিঃশব্দে দুর্ধরার দিকে ইশারা করল।
আসন ছেড়ে দুর্ধরার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন চন্দ্রগুপ্ত। দুর্ধরা লক্ষ করেননি তাঁকে। তিনি ফাঁকা দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন দেয়ালের দিকে।
— রাজকুমারী।
চিন্তায় ছেদ পড়তেই নিজের সম্মুখে দাঁড়ানো চন্দ্রগুপ্তকে নজরে পড়ল দুর্ধরার। মুহূর্তে তিনি উঠে দাঁড়ালেন আসন ছেড়ে। চন্দ্রগুপ্তর সম্মুখে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
চন্দ্রগুপ্ত বললেন,
— রাজকুমারী, আপনাকে যে দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, সেই কারণে আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আপনার মানসিক অবস্থা আমি অনুমান করতে পারছি। তাই আমার মনে হয় আমাদের বিবাহ স্থগিত থাক। আপনাকে আর কেউ আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ করতে জোর করবে না। একথা আজকে আপনাকে আমি দিলাম। আপনি চাইলে এই পাটলিপুত্রতেই আপনার নিবাসের ব্যবস্থা করতে পারি। আপনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের মহলে থাকুন। কারুর রাজনৈতিক চুক্তির অংশ আপনি নন।
শেষ কথাটি একটু জোরেই বললেন চন্দ্রগুপ্ত যাতে কথাটা চাণক্যর কান অবধি পৌঁছায়। চাণক্য অবশ্য এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ একাগ্রতার সঙ্গে একটি গুড়ের মধুদ্রব্যে মনোনিবেশ করেছেন। তবে জীবসিদ্ধি নিশ্চিত কথাটি তিনি শুনেছেন।
চন্দ্রগুপ্ত বললেন,
— আপনি বিশ্রাম নিন, রাজকুমারী। আপনার কোনোরকম অসম্মান এই পাটলিপুত্রতে হবে না। আপনার দুই সখীর যথাযথ মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে, তা আপনাকে আমি আশ্বাস দিচ্ছি। আমি মহামাত্যকে ঘোষণা করে দিতে বলেছি যে, বিবাহ হবে না।
অবাক নয়নে দুর্ধরা চেয়ে রয়েছে তার সম্মুখে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে। এই প্রথমবার দুর্ধরা লক্ষ করল যে, এই তরুণ অসম্ভব সুপুরুষ। তার দীপ্ত মুখে এবং চোখে এক অদ্ভুত মায়াভরা আকর্ষণ আছে।
দুর্ধরাকে নমস্কার জানিয়ে ফিরলেন চন্দ্রগুপ্ত। অমাত্য কৃষ্ণনাথের উদ্দেশে আদেশ দিতে যাচ্ছিলেন তিনি, তখনই তাঁকে কেউ ডাকল,
— দাঁড়ান, সম্রাট।
রাজকুমারী তাঁকে ডেকেছেন। মুহূর্তে এক অব্যক্ত আশায় চন্দ্রগুপ্তর হৃদয় লাফিয়ে উঠল কি?
— বলুন, রাজকুমারী।
— এই বিবাহে কি আপনার মত ছিল?
— না। ছিল না।
পুরুষের মধ্যে প্রেমিককে চিনতে পারার ক্ষমতা প্রতিটি নারীর থাকে।
রাজকুমারী দুর্ধরা প্রশ্ন করলেন,
— আর এখন? আপনার কি আমায় বিবাহে আপত্তি আছে?
— আমি…
বাক্যহারা হয়েছেন চন্দ্রগুপ্ত। কী করেই-বা তিনি বলবেন যে, এই মুহূর্তে তিনি এই অপরূপ, প্রজ্ঞা নারীকে নিজের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নেওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছে দমন করে রয়েছেন।
তাই উত্তর দিতে পারলেন না চন্দ্রগুপ্ত। যদিও দুর্ধরার যা জানার তা তাঁর জানা হয়ে গিয়েছে। তাঁর মুখের রক্তিমাভাব তার প্রমাণ।
চোখ নামিয়ে তিনি বললেন,
এই বিবাহ আজকে স্থগিত হলে তাতে আমার পিতারই উদ্দেশ্য সফল হবে। আমি তা চাই না। বাকিটা আপনার বিচার্য।
চন্দ্রগুপ্তর পক্ষ থেকে কোনো উত্তর আসছে না দেখে চোখ তুলে চাইলেন দুর্ধরা। দেখলেন তাঁর সামনে তরুণটি তাঁর দিকে মোহাবিষ্টর দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। এ দৃষ্টি সম্রাটের নয়। এ দৃষ্টি প্রেমিকের। দুর্ধরা অনুভব করলেন সেই দৃষ্টির দিকে তিনি বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারছেন না। কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তাঁর।
যুগলের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে উঠল জীবসিদ্ধি।
চাণক্যর দিকে তাকাতে সে লক্ষ করল চাণক্য অন্যদিকে চেয়ে আছেন। মুখে নির্লিপ্ত ভঙ্গি। তবে তাঁর ঠোঁটের কোণে এক ঝলক হাসি যেন দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।
চন্দ্রগুপ্ত এবং দুর্ধরা এখনও একে অন্যের দিকে চেয়ে আছেন। তাঁরা এই মুহূর্তে নিজেদের পরিবেশ ও পরিস্থিতির সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনবহিত। জীবসিদ্ধি
তাঁদের কাছে গিয়ে বলল,
— ওহে, ভ্রাতা। নির্ণয় যখন তোমরা নিয়েই ফেলেছ, তখন আর দেরি কোরো না। বিবাহলগ্ন যে আসন্ন!
জীবসিদ্ধি দ্রুত দাস-দাসীদের নির্দেশ দিয়ে সম্রাট ও রাজকুমারীকে যে যার নিজের কক্ষে তৈরি হতে পাঠিয়ে দিল। প্রসন্নচিত্তে ফিরে এল সে চাণক্যর পাশে। চাণক্য ততক্ষণে তাঁর পাত্রের সবক-টি মধুদ্রব্য শেষ করেছেন।
রাক্ষস উঠে দাঁড়িয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন চাণক্যর দিকে। হাতজোড় করে বললেন,
— মহামতি।
পাত্রটি একদিকে সরিয়ে রেখে রাক্ষসের দিকে চেয়ে চাণক্য বললেন,
— বলুন, আর্য।
— আপনি, আপনারা আরও একবার পরাজিত করেছেন আমায়। শুধু বুদ্ধিতে ও যুদ্ধে নয়, চন্দ্রগুপ্তর উদারতার কাছেও আমি পরাজিত। আমি আপনাকে আশ্বাস দিতে চাই যে, আমার পক্ষ থেকে মৌর্যদের উপর কোনোরকম আঘাত বা বিরোধিতা ভবিষ্যতে আসবে না। কিন্তু তার বদলে আমিও আপনার থেকে একটি আশ্বাস চাই।
— কী আশ্বাস চান আমার থেকে, মহাশয়?
— দুর্ধরা আমার কন্যাসমা। আমি আশ্বাস চাই যে, তার কোনোরকম অসম্মান বা কষ্ট এই রাজমহলে হবে না! সে যেন তার যথাযথ সম্মান পায় এই পাটলিপুত্রে।
উঠে দাঁড়ালেন চাণক্য। রাক্ষসের চোখে চোখ রেখে বললেন,
— আপনি নিজেই সেটা নিশ্চিত করছেন না কেন?
— অর্থাৎ?
— আর্য, পূর্বেও আপনাকে আমি যে অনুরোধ করেছিলাম, তা আরও একবার করছি। তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল, আমরা বিরোধী পক্ষ ছিলাম। কিন্তু এখন তো আর সে-পরিস্থিতি নেই। তাই আপনাকে আমি আরও একবার নিজের নির্ণয় বিবেচনা করতে অনুরোধ করছি। আমার একান্ত ইচ্ছা যে, আপনি পুনরায় মগধের প্রধানামাত্য পদ গ্রহণ করুন।
— কিন্তু…
ততক্ষণে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন মহামাত্য কৃষ্ণনাথ। তিনি রাক্ষসের দু-হাত চেপে ধরে বললেন,
— কোনো কিন্তু নয়, আর্য! আচার্য চাণক্য যে গুরুদায়িত্ব আমার স্কন্ধে দিয়ে নিজে অবসর নিয়েছিলেন, সে-দায়িত্ব নেওয়ার পক্ষে আমি বড়োই বৃদ্ধ এবং ক্লান্ত। এ দায়িত্ব আপনি নিয়ে আমায় নিষ্কৃতি দিন!
চাণক্য বললেন,
— মগধের দায়িত্ব আপনি পুনরায় নিলে আমি এবং কৃষ্ণনাথ বড়োই নিশ্চিত হই। বয়োজ্যেষ্ঠ আর্য কৃষ্ণনাথের উপর আমি সমস্ত দায়িত্ব চাপিয়ে নিজে অবসর নিয়ে বড়োই অন্যায় করেছিলাম তাঁর প্রতি। আমায় সেটি শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিন।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাক্ষস বললেন,
— বেশ, আমি বিবেচনা করে দেখব।
হাসি ফুটল চাণক্য এবং কৃষ্ণনাথের মুখে।
রাক্ষস প্রশ্ন করল,
— কিন্তু আচার্য, আপনি নিজেই কেন এই দায়িত্ব নিচ্ছেন না?
নিজের কেশশিখায় হস্তচালনা করতে করতে চাণক্য বললেন,
— আহ্, আমি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকি আজকাল, মহাশয়। আমি অর্থশাস্ত্রের প্রভূত সূত্র লিপিবদ্ধ করার মহাযজ্ঞে ব্রতী হয়েছি। তা ছাড়া আরও একটি কারণ আছে… যাক গে! ওকথা আজকের দিনের জন্যে নয়। আসুন, এবার আমরা বিবাহের মঞ্চের দিকে এগোই। ওহে, জীবসিদ্ধি! চলো, চলো! বিলম্ব কোরো না হে
সকলে বেরিয়ে যেতে কক্ষ থেকে বেরিয়ে তাদের পিছু নিল জীবসিদ্ধি। সে মনে মনে ভাবল, শেষপর্যন্ত তবে আচার্য চাণক্যর উদ্দেশ্যই সফল হল। আচ্ছা, আচার্য কতদূর পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন? এই বিবাহের উদ্দেশ্য কি তবে শুধুই চন্দ্রগুপ্তর আসন মজবুত করা নয়? তবে কি তিনি পূর্বেই ভেবে রেখেছিলেন যে, দুর্ধরার বিবাহ হলেই তিনি রাক্ষসকেও তাদের পক্ষে টেনে নেবেন? রাক্ষস তাদের পথের কাঁটা বহুদিনের। আচার্যই বলেন, রাজনীতিতে কেউ চিরশত্রু বা চিরমিত্র হয় না। এক বাণে আরও একবার একাধিক শিকার করলেন চাণক্য। পুরোটাই কি তাঁর পূর্বপরিকল্পিত?
কে জানে! চাণক্যকে বোঝা দুষ্কর।
সামনের থেকে আরও একবার ডাক দিলেন চাণক্য,
— ওহে, জীবসিদ্ধি! পিছিয়ে রইলে যে? এসো, এসো! আজ যে আমাদের চন্দ্রগুপ্তর বিবাহ!
***
শুভলগ্নে বর-বধূ অগ্নিকে সাক্ষী রেখে মালাবদল করল। পূজারি বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে ঘোষণা করতেই শঙ্খধ্বনি বেজে উঠল চারিদিকে। সকলে নবদম্পতির উদ্দেশে পুষ্পবৃষ্টি করল।
বিবাহ সম্পন্ন করে বর-বধূ উঠে দাঁড়াল। তারা এগিয়ে এল এককোনায় দাঁড়িয়ে থাকা সন্ন্যাসীবেশী ব্রাহ্মণের দিকে।
দু-জনেই তাঁর সম্মুখে এসে তাঁর পদস্পর্শ করল।
চাণক্য নবদম্পতির মস্তকে দু-হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন,
— সদা সুখিনো ভবস্তু।
.
তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং মহারানি দুর্ধরা এগিয়ে গেলেন বারান্দার দ্বারের দিকে।
মহলের বাইরে কয়েক হাজার নাগরিক পাটলিপুত্রর রাস্তায় এই গভীর রাত অবধি অপেক্ষা করে আছে। তাদের সম্রাট এবং মহারানির দর্শন পেতে।
চন্দ্রগুপ্ত এবং দুর্ধরা বারান্দায় দেখা দিতেই প্রবল হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল সম্পূর্ণ পাটলিপুত্র নগরী।
উপসংহার:
বিবাহ অনুষ্ঠানের পর দশদিন কেটে গিয়েছে। আজকেও একটি বিশেষ দিন ছিল কারণ আজকে মগধের মহামাত্য পদের দায়িত্ব নিয়েছেন অমাত্য রাক্ষস।
সন্ধ্যা নেমেছে পাটলিপুত্রে। রাজমহলের ঐশ্বর্য, বৈভব থেকে দূরে, নগরের এক নির্জন স্থানে, নিজের ছোট্ট কুটিরে সন্ধ্যা আহ্নিক শেষ করছিলেন আচার্য চাণক্য। তাঁর কানে ঘোড়ার খুরের শব্দ এল। দেখলেন কুটিরের বাইরে ঘোড়া থেকে নামছেন প্রধানামাত্য রাক্ষস। চাণক্য তাঁকে সম্ভাষণ করে বললেন,
— আসুন, অমাত্য।
রাক্ষস কুটিরে প্রবেশ করে প্রণাম জানালেন চাণক্যকে। তাঁর মুখোমুখি বসে রাক্ষস প্রশ্ন করলেন,
— অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু কিছু কথা আপনার সঙ্গে বলা একান্তই প্রয়োজনীয়। তাই আজকে আমি নিজেই চলে এলাম।
— খুব ভালো করেছেন, অমাত্য। আপনাকেও অনেক কিছু বলার আছে আমার। তিন বছর পূর্বে পাটলিপুত্রর রাজমহলের অন্দরে গান্ধারের দূতের হত্যা থেকে শুরু হয়ে, গত বছরে স্বর্ণমুদ্রা দেশে ব্যবহার নিষিদ্ধ করা অবধি, সব কিছুই আপনাকে বুঝিয়ে বলার সময় এসেছে।
— কিন্তু তার আগে আমায় বলুন আচার্য, কেন আপনি আমাকে এতটা বিশ্বাস করেন? কেন আমাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিতে এইবার আপনি মরিয়া ছিলেন?
চাণক্য মৃদু হেসে বললেন,
— ঠিক যে কারণে আপনি আমাকে বিশ্বাস করেন, সেই একই কারণে আমিও আপনাকে বিশ্বাস করি। কারণ আমরা দু-জনই জানি যে, আমাদের মূল উদ্দেশ্য এক। আমরা দেশের ভালো চাই। মগধকে আরও শক্তিশালী করতে চাই, যাতে ভবিষ্যতে অলকশেন্দ্রর মতো কোনো বিদেশি শক্তি পুনরায় আমাদের দেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে। আর আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হল, আপনাকে রাজধানীর দায়িত্ব দিয়ে আমাকে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোনিবেশ করতে হবে, অমাত্য। আমি নিশ্চিত এই মুহূর্তে মগধের সবচেয়ে বড়ো শত্রু দেশেরই কোনো এক স্থানে বসে আমাদের বিরুদ্ধে চরম আঘাত হানার পরিকল্পনা করছে। কোনো-না-কোনো উচ্চাভিলাষী জনপদের রাজাকে আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করছে, অথবা, আমার বা সম্রাটের প্রাণহানি করার চক্রান্ত সাজাচ্ছে। অথচ আমাদের কাছে তাকে খুঁজে পাওয়ার একমাত্র সূত্র হল কয়েকটি শর।
— শর? মানে, বাণ? কার কথা বলছেন আপনি? কে মগধের শত্রু?
চাণক্য পাথর ঘষে একটা প্রদীপ জ্বেলে সেটা দু-জনের মাঝে রাখলেন। বললেন,
— আচার্য শকুনি!
—
References:
1. T Ganapati Sastri, Koutaliyam Arthaśā -stra – Srimulǎkhyaya vyakhyā, Rastriya Sanskrit Samsthan, New Delhi, Edition 2002, Part 1 and 2.
2. P Sarkar, et.al. Traditional and ayurvedic foods of Indian origin, Journal of Ethnic Foods, Volume 2, Issue 3, September 2015, pages 97-109
3. Wine in Ancient India by D K Bose, KM Connor and Co., 1922.
4. History of Wine from Ancient India, malicethoughts. blogspot.com (http://malicethoughts blogspot com/201৪/04/ history-of-wine-from-ancient-india.html)
