২০.
রোচককে বন্দি করে মলয়কেতুর সম্মুখে হাজির করা হয়েছে। রাজা মলয়কেতু আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিল রোচকের উপর। লোকটার মুখের সঙ্গে মূষিকের আশ্চর্য মিল আছে। ভীত, সন্ত্রস্ত রোচক হাত, মুখ নেড়ে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু কেউই কিছু বুঝতে পারছে না।
মলয়কেতু বিরক্ত ভঙ্গিতে বন্দি রোচকের দু-পাশে দাঁড়ানো সশস্ত্র সৈনিকের উদ্দেশে প্রশ্ন করল,
— এ এরকম বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি করে কেন? এ কি বোবা নাকি?
— হ্যাঁ, মহারাজ।
— এসব নাটক করছে। কারাগৃহে নিয়ে গিয়ে কয়েক ঘা মুষলাঘাত করলেই কথা বেরোবে।
সৈনিক আগেই পরীক্ষা করে দেখেছে যে, লোকটি সত্যিই বোবা সেটা রাজাকে বলল না। পূর্বের অভিজ্ঞতায় সে জানে রাজার সম্মুখে অধিক কথা বলা মানেই নিজের বিপদ ডেকে আনা।
মলয়কেতু নির্দেশ দিল,
— নিয়ে যাও একে কারাগৃহে। কথা বলানোর চেষ্টা করো।
— যথা আজ্ঞা, মহারাজ।
টেনে-হিঁচড়ে দুজন প্রহরী রোচককে রাজসভার বাইরে নিয়ে চলল। তার কাছ থেকে পাওয়া দুটি পত্র ইতিমধ্যে মলয়কেতুর হাতেই রয়েছে। সেটি খুলে আরও একবার পড়ে দেখল সে।
মহামতি দানব,
সাগরের প্রণাম নেবেন। আপনার প্রস্তাবে আমি সম্মত। এটাই আমাদের সুযোগ।
পর্বত আরোহণ করে পনেরো দিন পরের অমাবস্যার রাত্রে আমি নগর পৌঁছাতে পারব। আমার সম্পূর্ণ সেনা আমার সঙ্গে থাকবে।
রাহু ও কেতু দুজনকেই হত্যা করা শ্রেয়। কেতু এখন কুলুতের রাজমহলে আছে। তাকে আমি সেখানেই গুপ্তহত্তা ব্যবহারে হত্যা করব। রাহুর পরিণামও একই হবে।
গৃধ্র আপনার হাতে এবং আসলে আমাদের সমর্থনে আছে শুনে খুশি হয়েছি। সে দ্বার খুলে দিলে আমার কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
আপনি তাঁকে জানিয়ে রাখবেন এই অমাবস্যা তিথির কথা। একবার সেনা প্রবেশ করলেই সিংহাসন আমাদের। আপনি শুধু পাশে থাকবেন মহামতি।
ইতি,
সাগর।
শেষে রয়েছে রাজকুমার সিন্ধুসেনার রাজমুদ্রার ছাপ।
চিৎকার করে নিজের মন্ত্রীর উদ্দেশে মলয়কেতু বলল,
— দেখুন, মহামন্ত্রী দেখুন! এরা আমাকে এতই মূর্খ মনে করে যে, কিছু কিছু শব্দের প্রতিশব্দ ব্যবহার করেই সাংকেতিক পত্র লেখা যাবে আর কেউ কিছুই বুঝবে না। রাক্ষস মানে দানব, সিন্ধু মানে সাগর। কুলূতের রাজমহলে এখন কে অতিথি হয়ে আছে তা সকলের জানা। অর্থাৎ, কেতু হল চাণক্য। পর্বত মানে নিশ্চয়ই আমার রাজ্যের কথা বলা হয়েছে! আমার পর্বত্যক রাজ্য!
.
রাগে নিজের হাতের মুঠোয় দুটি পত্র দুমড়ে-মুচড়ে দিতে দিতে মলয়কেতু বলল,
— সকলে! ওরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে! ওই সিন্ধুসেনা সেইদিনই আমার সঙ্গে— পুরু বংশের উত্তরাধিকার পর্বত্যক মলয়কেতু ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে! এদের আমি দেখিয়ে দেব যে পুরু বংশের রক্তে বইতে থাকা বীর্য এখনও মিলিয়ে যায়নি। যার শৌর্য-বীর্যের গুণগান স্বয়ং বিশ্বসম্রাট অলকশেন্দ্র করেছেন, তাঁরই রক্ত বইছে আমার ধমনীতে!
মন্ত্রীদের প্রতি চিৎকার করে আদেশ দিল মলয়কেতু,
— আচার্য শকুনি কোথায়?
একজন মন্ত্রী সভয়ে বলল,
— তিনি তো এখন এখানে নেই। গতকালই কোথাও চলে গিয়েছেন আবার।
— সেও যে কোথায় যায় বার বার, কে জানে! আপনারা সেনাপতিদের তৈরি হতে বলুন, আমরা যুদ্ধে যাব। ধূলিসাৎ করব এই কুচক্রীদের।
মহামাত্য বললেন,
— মহারাজ, আরও একবার বিবেচনা করে দেখার অনুরোধ করছি।
— কেন? কীসের পুনর্বিবেচনা?
— ভেবে দেখুন। আমাদের কাছে হঠাৎই বেনামি পত্র এল যা থেকে সঠিক সময়ে আমরা জানতে পারলাম যে রাক্ষসের গুপ্তচর আমাদের রাজ্যের সীমানায় প্রবেশ করেছে। কে লিখল সেই পত্র? সে এত কিছু জানালই-বা কীভাবে? তা ছাড়া এই পত্রে ব্যবহার করা এই গুপ্ত ছদ্ম শব্দের মানে সম্পূর্ণ ভিন্নও হতে পারে।
.
কিছুক্ষণ মহামাত্যর দিকে তাকিয়ে রইল মলয়কেতু। তার ভীরু মন দোলাচলে পড়ল এইবার। সত্যিই তো, এই বিষয়গুলো ভাবা উচিত ছিল তার। এখন ভরাসভায় কি সকল অমাত্য তাকে মূর্খ ভাবল? হঠাৎ জেগে ওঠা বীরত্ব নেমে আসছে তার। নিজের স্বাভাবিক ভীরু প্রকৃতি থেকে বেশি সময় সে ভিন্ন থাকতে পারে না। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মলয়কেতু প্রশ্ন করল,
— তাহলে আপনি কী করতে বলছেন, মহামাত্য?
দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন অমাত্য সুদীপ্তক। স্বয়ং মহারাজ পুরুর সময় থেকে তিনি পর্বত্যক রাজ্যের মন্ত্রী। বীরপুরুর পরবর্তীতে এই মূর্খ রাজার অধীনে মন্ত্রী থাকাটা তাঁর পক্ষে দিন দিন বিরক্তিকর হয়ে উঠছে। শিশুকে বোঝানোর ভঙ্গিতে তিনি বললেন,
— মহারাজ, আমি আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছি। হঠাৎ ক্রোধের মধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্ত মূর্খতার পরিচয়। তা ব্যক্তি ও রাজ্যের জন্যে ধ্বংস ডেকে আনে। আমি বলি যে আপনি অপেক্ষা করুন, দেখুন কী হয়। অমাবস্যার রাত্রে আদৌ আমাদের নগরের সীমানায় সিন্ধের সেনা আসে কি না সেটা আগে দেখুন। তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন।
মলয়কেতু বুঝতে পারছে যে, মহামাত্য সঠিক কথাই বলছে। অন্যান্য সভাসদরাও তারই সমর্থনে সম্মতি জানাচ্ছে ঘাড় নেড়ে। কিন্তু, মহামাত্য সুদীপ্তক কি প্রথমেই তাকে মূর্খ বলল? তাকে অপমান করল নাকি? সেটাও ঠিক নিশ্চিত বুঝতে পারল না মলয়কেতু।
— বেশ, তবে তাই হোক। কিন্তু, আমাদের সেনাকে সতর্ক থাকতে বলুন, সেনাপতি। যুদ্ধকালীন তৎপরতা যেন থাকে। আর আমার সুরক্ষা ব্যবস্থার দিকে বাড়তি নজর দিন। প্রয়োজনে দ্বিগুণ রক্ষী নিযুক্ত করুন।
— বেশ।
— এইবার আপনারা তবে আসুন। আমার বিশ্রামের সময় হয়েছে।
সকলে সভা ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই মলয়কেতু ডাক দিল,
— পদ্মা আছ?
সঙ্গেসঙ্গেই ভেতরের ঘরের পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এল পদ্মা। হাতে একটি সোনার থালায় সুগন্ধি তৈল নিয়ে প্রবেশ করল সে। এতক্ষণ সে পর্দার আড়ালে রাজার আদেশের অপেক্ষাতেই ছিল। একদিকে রাখা পাত্র থেকে সোমরস একটি ছোটো পাত্রে ঢেলে এগিয়ে দিল মহারাজের দিকে। মহারাজ সেটিতে চুমুক দিয়ে পদ্মার সঙ্গে ভেতরের কক্ষে চলে গেল।
ভেতরের কক্ষে একটি নীচু আসনে মহারাজ বসতে পদ্মা তার মাথায় ও কাঁধে তেল দিয়ে মালিশ শুরু করল। একটা আরামের নিশ্বাস বেরিয়ে এল মলয়কেতুর মুখ থেকে। সে চোখ বুজে ভাবতে শুরু করল কীভাবে সকলকে উচিত শিক্ষা দেওয়া যায় যাতে পুরুর মতোই এই সিন্ধুসেনা ও অন্য রাজারা তাকেও সম্মান দেবে।
রিনরিনে কণ্ঠে পদ্মা জানতে চাইল,
— মহারাজের কি আরাম লাগছে?
— হুমম?
— জানতে চাইছি, তেল মালিশে কি আমার মহারাজের আরাম লাগছে? ‘আমার মহারাজ’ কথাটা বড়ো মধুর শোনাল মলয়কেতুর কানে। মেয়েটার ব্যক্তিত্বে কিছু একটা আছে যা সহজে ধরা দেয় না। তার মহলের অন্য মেয়েদের মতো নয় যাকে চাইলেই পাওয়া যায়। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই মলয়কেতু উত্তর দিল,
— হ্যাঁ। খুব আরাম।
— মহারাজ কি কিছু নিয়ে চিন্তিত?
— হুমম। চিন্তিত তো বটেই। রাজনীতির ব্যাপার। এসব তুমি বুঝবে না। এখানে সবাই তোমার গৃহের কালসাপ, বুঝলে হে? যারা রোজ তোমারই গৃহে তোমারই ভাঁড়ার থেকে দুধ, কলা খেয়ে যায়।
— সত্যিই এত কিছু আমি বুঝি না, মহারাজ। তবে এটুকু জানি যে, এই উত্তর-পশ্চিমের সমস্ত রাজার চেয়ে শক্তিশালী রাজা হলেন আপনি। আপনার ক্ষমতার ভয় মগধও পায়। আমার এক সখী ওদেশে থাকে। সে-ই বলেছিল। সে তো হিংসায় পুড়ে গিয়েছিল এই শুনে যে আমি আপনার সেবক হিসাবে স্থান পেয়েছি। আমি সত্যিই বেশি বুঝি না, মহারাজ। আমি এক সাধারণ দাসী, আপনাকে সেবা করতে পারলেই খুশি। তবে, সেটাই-বা পারি কই?
— কেন? কী হয়েছে, পদ্মা?
একটা আফশোসের দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটি বলল,
— আপনাকে আমার সঙ্গে দেখলেই তো ওই ব্রাহ্মণ আমাকে তিরস্কার করে।
— কে? শকুনি?
— হ্যাঁ, ও-ই। শকুনিই বটে! পুরো একটা বুড়ো শকুন যেন। কিছু মনে করবেন না মহারাজ, ওর দৃষ্টি আমার ভালো লাগে না। ও কেমনভাবে যেন তাকায় আমার দিকে।
চোখ খুলে পদ্মার দিকে তাকাল মলয়কেতু,
— সেকী? একথা আগে বলনি তো?
— সাহস পাইনি, মহারাজ। ও ব্রাহ্মণকে দেখলেই গা শিউরে ওঠে, ভয় করে। কেমন যেন ধূর্ততা। যেন সে ব্রাহ্মণ তো নয়, সাক্ষাৎ খুনি।
মলয়কেতু আবার চোখ বুজে সোজা হয়ে বসল। মনে মনে ভাবল গা শিউরে তো তারও ওঠে, ভয় তারও করে ওই শকুনিকে। কিন্তু সেকথা স্বীকার করা যারে না। সেদিনের নামহীন সতর্কবার্তার কথা আবার মনে পড়ল তার।
‘আপনি যাদের মিত্র ভাবছেন তারাই বিশ্বাসঘাতক।’
আজকে দূতের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া চিঠির কথাও মনে এল তার। আর তাতেই হঠাৎ আরও একটা প্রতিশব্দ মাথায় এল মলয়কেতুর।
‘গৃধ্র— শকুন’।
২১.
রাতের তৃতীয় প্রহরের শেষের দিকে কোনো এক সময়। নাগরের রাজমহল শাস্ত। খোলা বাতায়ন সমস্ত ঢেকে দেওয়া হয়েছে বাইরের ঠান্ডা হাওয়ার প্রবেশ রুখতে। যে যার নিজেদের কক্ষে ঘুমিয়ে আছে।
জীবসিদ্ধির ঘুম বরাবরই পাতলা। তাই হালকা শব্দেও ঘুম ভেঙে গেল। দরজার বাইরে কিছু একটা পতনের শব্দ হল যেন। জেগে গেলেও চোখ বন্ধ রেখেই শুয়ে থাকল জীবসিদ্ধি। শোনার চেষ্টা করল। প্রায় পরমুহূর্তেই আবারও একই শব্দ হতেই বিছানায় সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে উঠে বসল সে। শয্যার পাশে মাঝারি আকারের তরবারিটা নিয়ে ঘুমোনো তার বহু বছরের অভ্যাস। তার হাত অবচেতনভাবেই সেটি চেপে ধরেছে।
উঠে এসে দরজায় কান লাগাল জীবসিদ্ধি। কেউ একজন বাইরে আছে। মেঝেতে শুয়ে পড়ে দরজার নীচ দিয়ে বাইরে দেখল সে। ঠান্ডা, পাথুরে মেঝে তার খোলা শরীরের চামড়ায় স্পর্শ করতে প্রায় শীতল তরবারি চালানোর অনুভূতি হল। কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই বাইরে কী ঘটছে বোঝার চেষ্টা করল। বাইরে দু-জন থাকার কথা কিন্তু এই মুহূর্তে দেয়ালে লাগানো প্রদীপের মৃদু আলোয় সৃষ্ট ছায়ার গতিবিধি থেকে বোঝা যাচ্ছে মাত্র একজনই আছে। কিছু একটা সমস্যা আছে।
লোকটি তার দরজার বাইরে নয়, মুখোমুখি চাণক্যর কক্ষের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু একটা করছে লোকটা যা জীবসিদ্ধি দরজার নীচ থেকে দেখে বুঝতে পারছে না।
জীবসিদ্ধি দ্রুত নিজের অঙ্গবস্ত্র মেঝেতে ফেলে তার উপর একটি কাঠের মেজের চারটে পায়া বসাল, যাতে টানলে কোনো শব্দ না হয়। মেজটা টেনে দরজার কাছে এনে তাতে চড়ল। এই মহলের প্রতিটি কক্ষের দরজার ঠিক উপরে, বারান্দার দিকে খোলা একটা করে ছোট্ট বায়ুরন্ধ্র* আছে যাতে ঠান্ডায় সমস্ত বাতায়ন বন্ধ থাকলেও বায়ু চলাচল অবরুদ্ধ না হয়। জীবসিদ্ধি সেই ফাঁক দিয়ে উকি দিতেই দেখতে পেল তাদের দুই দ্বাররক্ষী মগধের সৈনিক মাটিতে পড়ে আছে। একটি ছায়ামূর্তি চাণক্যর কক্ষের দরজার সামনে একটি দড়ি দিয়ে বানানো সিঁড়ি লাগিয়ে তাতে চড়ছে। লোকটির গায়ে কুলূতের সামরিক পোশাক। সেও জীবসিদ্ধির মতোই দরজার উপরের বায়ুরন্ধ্রের ফাঁক দিয়ে ভেতরের ঘরে উকি দিচ্ছে। লোকটা নিজের কাপড়ের ভাঁজ থেকে একটি লম্বা, অতি সরু কাঠির মতো কিছু বের করে সেটা মুখের কাছে ধরল।
মুহূর্তে জীবসিদ্ধি বুঝতে পারল ওটা কী। ওটা একটা বাঁকনল”! মেজ থেকে লাফিয়ে নেমে সেটি একদিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দরজা খুলতে গিয়েই জীবসিদ্ধি বুঝল তার দ্বার বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছে আততায়ী। কণ্ঠের সমস্ত জোর লাগিয়ে জীবসিদ্ধি চিৎকার করে উঠল,
— গুরুদেব! সাবধান!
যদি তার গলা চাণক্যর কানে একমুহূর্তের বিলম্বেও পৌঁছে থাকে, তবে এতক্ষণে চাণক্যর মৃত্যু নিশ্চিত। চিৎকার করতে করতেই মেজ তুলে দরজায় সশব্দে ছুড়ে দিল জীবসিদ্ধি। তার উদ্দেশ্য যতটা হয় শব্দ করা যাতে মগধের সৈনিকরা তা শুনতে পেয়ে চলে আসে। কয়েক ক্ষণ বাদেই জীবসিদ্ধির দরজা খোলার শব্দ হল। উদগ্রীব হয়ে জীবসিদ্ধি বাইরে বেরোতেই দেখতে পেল তার দরজার খিল বাইরে খুলে দিয়েছেন স্বয়ং চাণক্য।
চাণক্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জীবসিদ্ধি ছুটে গিয়ে তার দু-কাঁধ চেপে ধরল। মুহূর্তের আশঙ্কায় গুরু-শিষ্য শিষ্টাচারের কথা তার মাথায় থাকল না।
— আপনি ঠিক আছেন, আচার্য? শলাকা আপনাকে আঘাত করেনি তো?
ততক্ষণে চিৎকার শুনে মগধ ও কুলূতের সৈনিকরা ছুটে এসেছে সেখানে। চাণক্য নিজের গায়ের অতিরিক্ত অঙ্গবস্ত্র জীবসিদ্ধির খোলা গায়ে চড়িয়ে দিয়ে, তার দু-হাত নিজের হাতে নিয়ে আশ্বস্ত করলেন,
— শান্ত হও হে, জীবসিদ্ধি। এই হিমশীতল রাত্রে এভাবে বেরিয়ে এলে নিশ্চিত তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমি ঠিক আছি। সঠিক সময়ে সাবধান করেছ তুমি। ঠিক সময়মতো সজাগ হয়ে শয্যার একপাশে গড়িয়ে সরে যাই। তাই এযাত্রা প্রাণ রক্ষা পেল তোমার জন্যে।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল জীবসিদ্ধি। সৈনিকদের উদ্দেশে প্রশ্ন করল,
— আততায়ীটিকে ধরা গিয়েছে?
প্রত্যেকেরই মুখ দেখে বোঝা গেল তারা হতভম্ব। ওরা নিজেরাই বুঝতে পারছে না কী ঘটেছে।
চাণক্য জীবসিদ্ধিকে প্রশ্ন করল,
— তুমি দেখেছ লোকটাকে?
— অন্ধকারে মুখ তো স্পষ্ট নয়। তবে পরনে কুলূতের সৈনিকের পোশাক ছিল।
— হুম। সেই কারণেই এতদূর অবধি ঢুকে আসতে পেরেছে। সকলেই ভেবেছে সেও একজন সৈনিক। সে পলায়নও করতে পারবে সহজেই। মহলের অন্যান্য সৈনিকের ভিড়ে মিশে যাবে সে।
মেঝেতে পড়ে থাকা মগধের দুই সৈনিকের কাছে গিয়ে চাণক্য তাদের নাকের কাছে হাত রেখে ও কবজি ধরে নাড়ি পরীক্ষা করলেন। তারপর অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে বললেন,
— দু-জনই মৃত। ওই দেখো দু-জনেরই গলার কাছে দুটি কাঁটা ফুটে আছে। ওতেই তীব্র বিষ ছিল। তোমার ক্ষণিকের দেরি হলে আজকে আমারও একই পরিণতি হত হে, জীবসিদ্ধি।
জীবসিদ্ধি মগধের সৈনিকদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,
— কিন্তু আমি তো নির্দেশ দিয়েছিলাম মহলের এই আমাদের তলে ওঠার সিঁড়ির মুখে যেন আমাদের মগধের সৈনিকরা প্রতিটি অচেনা ব্যক্তির পরিচয়পত্র পুনরায় পরীক্ষা করে দেখে। তোমরা দেখনি? একটু আগেই কুলুতের যে সৈনিকটি উঠে এসেছে তার পরিচয়পত্র পরীক্ষা করেছিলে?
দু-জন মগধের সৈনিক এগিয়ে এসে জানাল যে, তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকই সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু আততায়ীর কাছে সঠিক পরিচয়পত্রই ছিল। তাই তাদের মনে সন্দেহ জাগেনি। বিভিন্ন প্রয়োজনে সর্বদাই কুলূতের সৈনিক বা কর্মচারীরা এই তলে দিনে বা রাতে আসে। তাদের পরিচয়পত্র দেখে ছেড়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রেও তাই সন্দেহ হয়নি।
জীবসিদ্ধি বলল,
— তাহলে তোমরা আততায়ীকে দেখেছ। তাকে খুঁজে বের করো।
চাণক্য হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
— না হে, জীবসিদ্ধি। তা করে লাভ নেই। এটা খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতোই অসম্ভব হবে। তা ছাড়া সে এতক্ষণে সম্ভবত মহল ত্যাগ করেছে।
.
তখনই একদিক থেকে যুবরাজ চিত্রবর্মা প্রবেশ করলেন,
— আরে, এ কী? কী হয়েছে এখানে?
উত্তেজিত জীবসিদ্ধি তাঁকে দেখেই ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল,
— আপনি জানেন না, তাই না? কুলূতের পরিচয়মুদ্রা ও সামরিক পোশাক পরে হত্যাকারী রাজমহলের অন্দর অবধি প্রবেশ করছে। আর আপনি কিছুই জানেন না যুবরাজ, তাই না?
চাণক্য জীবসিদ্ধির হাত চেপে তাকে চুপ থাকতে ইঙ্গিত দিলেন। জীবসিদ্ধি আরও দু-কথা বলত কিন্তু আচার্যর ইঙ্গিতে চুপ রইল।
চাণক্য বললেন,
— যুবরাজ চিত্রবর্মা, আমাদের দু-জন সৈনিককে অজানা আততায়ী হত্যা করেছে। আমাকেও হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে দেখতেই পাচ্ছেন, তা বিফল হয়েছে জীবসিদ্ধির সতর্কতায়।
চিত্রবর্মাকে বাস্তবিক বিস্মিত মনে হল জীবসিদ্ধির। কয়েক বার মৃত দু-জন সৈনিকের দিকে আর চাণক্যর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— কিন্তু… কিন্তু কীভাবে?
চাণক্য উত্তর দিলেন,
— সৈনিকদের গলায় বিঁধে থাকা কাঁটা দুটি দেখুন। আমার কক্ষে আসুন এবার।
চাণক্যর কক্ষে কয়েকটি প্রদীপ জ্বালাতে ঘর আলোকিত হল। নিজের শয্যার কাছে এসে চাণক্য দেখালেন যে, চাণক্যর মাথার বালিশে একটি একই ধরনের কাঁটা ফুটে আছে। জীবসিদ্ধি বলল,
আততায়ীকে একটি সরু, লম্বাটে কাঠি বের করতে দেখেই চিনতে পারি জিনিসটাকে। ওটা আসলে একটা বাঁকনল। অনেকটা এরকমই একটা নল ব্যবহার করে ফুঁ দিয়ে কাচের কাজ করা হয়। এধরনের একটা অস্ত্র গুপ্তঘাতকরাও ব্যবহার করে থাকে। বাঁকনলের একদিকে বিষাক্ত কাঁটা ভরে, অন্যদিক মুখে নিয়ে জোরে ফুঁ দিলে সেই কাঁটা তীব্রবেগে উড়ে গিয়ে বিদ্ধ করে শিকারকে। তৎক্ষণাৎ, নিঃশব্দ মৃত্যু।
হতভম্ব ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলেন চিত্রবর্মা। এই কাণ্ডের তাৎপর্য বুঝতে তাঁর কিছুটা সময় লাগল। তা বুঝতে পেরেই মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন তিনি চাণক্যর সম্মুখে,
— আপনি বিশ্বাস করুন আচার্য, এ বিষয়ে আমি জড়িত নই! এ কাজ আমার নয়! এ আমার বিরুদ্ধে কারুর চক্রান্ত। কেউ বা কারা আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে চাইছে। আমি মূর্খ নই। আমি জানি যে, আমার রাজমহলের অন্দরে আপনাদের সমস্ত সুরক্ষার দায়িত্ব আমার। আমারই মহলে যদি মহামতি চাণক্যর কোনো বিপদ ঘটে তবে গোটা মগধের রোষ এসে পড়বে আমার উপর। আমি নিজেই নিজের ধ্বংস কেন চাইব, আচার্য? আচার্য, জীবসিদ্ধি আপনারা বিশ্বাস করুন এই বিষয়ে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই।
.
চাণক্য এবং জীবসিদ্ধি একবার একে অপরের দিকে চাইল। চাণক্য চিত্রবর্মার উদ্দেশে বললেন,
— উঠুন, যুবরাজ। আমি আপনার কথা বিশ্বাস করলাম। কিন্তু আপনারই কোনো অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি এই ঘটনায় নিশ্চিতভাবে যুক্ত। অন্যথায় আততায়ী রাজ্যের সৈনিকের পরিচয়পত্র পেত না। তা ছাড়া তার কাছে নিশ্চয়ই মহলের অন্দরের মানচিত্র ছিল যাতে সে সহজেই এত বড়ো মহলের মধ্যেও আমার কক্ষ খুঁজে পেয়েছে।
— আপনি ঠিক বলেছেন, আচার্য। আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি যে, আমি আমার সর্বশক্তি দিয়ে দোষীকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করব। আমি অত্যন্ত লজ্জিত।
— আপনি বিশ্রাম নিন, যুবরাজ। ভোর হতে আর দেরি নেই।
.
চিত্রবর্মা বিদায় নিতে চাণক্য নির্দেশ দিলেন দুই মৃত সৈনিকের মরদেহ পরেরদিনই যেন মগধে তাদের পরিজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পূর্ণ সামরিক সম্মানে তাঁদের অন্তিম ক্রিয়া সম্পন্ন হবে। সকলে বিদায় নিতে চাণক্যর কক্ষে শুধু জীবসিদ্ধি আর চাণক্য রয়ে গেল। চাণক্য বললেন,
— যাও হে, জীবসিদ্ধি। একটু ঘুমিয়ে নাও।
— আজকে আমার আর ঘুম হবে না, আচার্য। আমি বহুবার আপনাকে সাবধান করেছিলাম যে, এই কুলুতের আমন্ত্রণ নিঃসন্দেহে আপনাকে পাটলিপুত্রর সুরক্ষাবলয় থেকে বের করে এনে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই পাঠানো হয়েছিল। আজকে প্রমাণিত হল যে, সেটাই সত্যি।
— হুমম। তাই মনে হচ্ছে বটে। কিন্তু …
— এতে আবার কিন্তু কীসের থাকছে?
— চিত্রবর্মা মিথ্যা বলছে বলে মনে হল না। আবারও বলছি, তার সঙ্গে আমি একটি বিষয়ে অন্তত সহমত, যে, সে আর যা-ই হোক, মূর্খ নয়। নিজের গৃহে ডেকে আমাকে হত্যা করে পরবর্তী দাবানলের তাপ সে কেন নিজের দিকে নেবে?
— সম্ভবত শকুনির নির্দেশে।
— হুমম। আমায় ভাবতে হবে হে, জীবসিদ্ধি। অনেকটা ভাবতে হবে। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই মুহূর্তে নিজ ছন্দে ঘটে চলেছে যার উপর সমগ্র আর্যাবর্তর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
—
*বায়ুরন্ধ্র— ভেন্টিলেটর
**বাঁকনল— ব্লোপাইপ
২২.
পরের দু-দিন চাণক্য সারাদিন শুধুই পুথিপত্র পড়লেন। বৈদ্য চক্রাচার্যর গৃহ থেকে তিনি গোপনে অনেকগুলো পুস্তক আনিয়েছেন। পুস্তক আনানোর বিষয়ে এহেন গোপনীয়তার প্রয়োজন কীই-বা থাকতে পারে তা জীবসিদ্ধি ভেবে পায়নি। চাণক্য সকাল থেকে রাত অবধি নিজের কক্ষে দোর এঁটে পড়ে চলেছেন। কী পড়ে চলেছেন, বা, কী খুঁজে পাওয়ার আশা নিয়ে পড়ছেন তা জীবসিদ্ধির জানা নেই। সম্ভবত তিনি বৈদ্যর হত্যার কোনো সূত্র খুঁজছেন।
জীবসিদ্ধি এই দু-দিনে দু-বার মহারাজ সুবর্মার ছদ্মবেশে সজ্জিত হয়ে তাঁর চালচলন আয়ত্ত করার অভ্যাস করেছে। একাজে তাকে সাহায্য করছেন অমাত্য শ্রীশৈল। আর মাত্র দু-দিন পরেই কুলুতের প্রতিষ্ঠা দিবস, অতএব তাকে মহারাজের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
তবে এই দু-দিনে তাদের কাছে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পত্র এসেছে। প্রথম পত্রটি এসেছে গান্ধার থেকে।
পরমপূজ্য আচার্য, প্রণাম নেবেন।
আগেই জানিয়েছি যে, আমরা ওই বিশেষ ধরনের শরের নির্মাতার খোঁজ পেয়েছি। তার গৃহেই একটি ঘরে তার কার্যালয়। বাবাক ভারতীয় নয়। চেহারায় চৈনিক ছাপ আছে। সে এবং তার পুত্র গৃহে থাকে। পিতাই একমাত্র বাণ বানাতে পারে, পুত্রটি মন্দবুদ্ধি, হাবাগোবা গোছের। পায়ে সমস্যা আছে, খুঁড়িয়ে হাঁটে। বিশেষ কিছুই জানে না কাজকর্ম। পিতার ফলাদি ক্রয় হাতে হাতে জিনিস এগিয়ে দেয়, বাজার থেকে খাদ্য, করে আনে।
তার কার্যালয়ে ওই বাণ বাবাক নিজেই আমাদের দেখিয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ধনুর্ধরের এখানে আসার কথা। আমরা আশা রাখি, দুর্ধর্ষ সেই আততায়ী তিরন্দাজকে আমরা এইবার ধরতে পারব আমাদের জালে।
আমি এবং একদল বিশ্বস্ত গূঢ়পুরুষ সর্বক্ষণ বাবাকের গৃহের উপর নজর রাখছি। তার গৃহের দু-দিকে দুটি দ্বার এবং দুই দুই করে চারজন সর্বক্ষণ সেই দ্বারের উপর নজর রাখে। বাবাক যে দ্বার দিয়েই বের হোক, একজন তার পিছু নেয় যতক্ষণ না সে গৃহে ফিরে আসছে। বলা তো যায় না, হয়তো আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে পথে কোথাও সেই হত্যাকারী বাবাকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে পারে। তা ছাড়া বাবাক নিজেও যে শকুনির হয়ে কাজ করছে না তারও নিশ্চয়তা নেই। তাই তার প্রতিটি গতিবিধির উপরেই নজর রাখা হচ্ছে। আশা রাখি, আগামীতে সুসংবাদ দিতে পারব।
ইতি,
আপনার একান্ত অনুগত ছাত্র, শশাঙ্ক।
দ্বিতীয় পত্র নামহীন। শুধু একটি বাক্য লেখা—
‘সেনার নগরে প্রবেশ সম্পন্ন হয়েছে।’
তৃতীয় পত্র এসেছে পাটলিপুত্র থেকে।
প্রিয় আচার্য চাণক্য,
খেদের সঙ্গে জানাচ্ছি, জনগণনার কাজ খুব একটা অগ্রসর হয়নি। তৃতীয় ধাপ গণনা শুরু করার সময় আসন্ন। সম্রাট আপনাদের কুশলের কথা ভেবে বড়োই চিন্তিত।
বি দ্র আপনি সতর্ক থাকুন।
ইতি,
কাত্যায়ন।
জীবসিদ্ধি পত্রটি পাঠ করে কিছুই বুঝল না। অমাত্য রাক্ষস আবারও সেই একই জনগণনার কথা লিখেছেন। আর সবশেষে হঠাৎ চাণক্যকে সতর্ক কেন থাকতে বললেন? গোটা পত্রের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটা কি সাধারণ সতর্কতাবাণী, নাকি, বিশেষ কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে?
প্রশ্নগুলো চাণক্যকে করতে চাণক্য উত্তর না দিয়ে ‘কুলূতের মধুতে মিষ্টতা নেই’ গোছের কিছু একটা কথা বলে প্রসঙ্গ পালটে এড়িয়ে গিয়েছেন।
তিনি শুধু অমাত্য রাক্ষসের পত্রের উত্তর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন,
প্রিয় অমাত্য কাত্যায়ন,
সম্রাটকে জানাবেন যে, এদিকে সব কুশল। তৃতীয় পর্যায় জনগণনার কাজে ভীমাকে নিযুক্ত করুন।
ইতি,
বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য।
এই ‘ভীমা’ নামটা জীবসিদ্ধির চেনা চেনা মনে হলেও মনে পড়ল না কোথায় যেন শুনেছে এই নাম।
.
গতকালই আর এক গুপ্তচর এসে একটি অদ্ভুত সংবাদ জানিয়েছে। তার কথা অনুযায়ী বহু প্রচেষ্টার পর সে এক রাত্রে গোপনে কুলূতের সীমান্তে অপেক্ষারত মলয়কেতুর সেনাশিবিরে প্রবেশ করেছিল এবং সেখানে গিয়ে যা দেখা গিয়েছে তা বিস্ময়কর।
গুপ্তচর দেখতে পেয়েছে যে, সেই শিবির আসলে খালি। প্রায় কয়েক হাজার সেনার থাকার মতো তাঁবুর ব্যবস্থা থাকলেও বড়োজোর আশি-নব্বইজন সৈনিক আছে গোটা শিবিরে। তাদের একমাত্র কাজ কাউকে শিবিরে ঢুকতে না দেওয়া এবং প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যাবেলায় শিবির জুড়ে কিছুটা দূরে দূরে শুকনো কাঠ একত্র করে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া।
.
গুপ্তচর চলে যেতে জীবসিদ্ধি চাণক্যর কাছে জানতে চেয়েছিল,
এর মানে কী, আচার্য? অযথা সেনাশিবিরের মানে কী? অকারণ ভয় দেখানো? আর এই আগুন কেন জ্বালায় তারা রোজ সন্ধ্যায়?
চাণক্য সম্মতিতে মাথা নেড়ে বললেন,
— হুমম। রাত্রে অনেক জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় যাতে দুরে পাহাড়ের উপর থেকে দেখলে মনে হয় কয়েক হাজার সৈনিক আগুন জ্বেলে তাপ নিচ্ছে। সুন্দর পরিকল্পনা। এই ধূর্ত বুদ্ধি শকুনি ছাড়া আর কারই-বা হতে পারে।
— কিন্তু উদ্দেশ্য কী? কুলূতকে বিভ্রান্ত করা?
চাণক্য একটি অদ্ভুত কথা বলে চোখ বুজলেন,
— কুলূতকে, নাকি, আমাদের?
.
বাকি পুরো সময়টাই চাণক্য চিকিৎসাশাস্ত্রের পুস্তক পড়ে এবং পদ্মাসনে বসে ধ্যান করে কাটালেন। একটিও শব্দ আর তিনি উচ্চারণ করেননি এই বিষয়ে।
২৩.
পরেরদিন সকালে উঠে জীবসিদ্ধি দেখল চাণক্য তখনও নিজের কক্ষ থেকে বের হননি। আচার্য বরাবরই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পড়েন। তাই কিছুটা অবাক হয়ে জীবসিদ্ধি দরজার বাইরে প্রহরারত মগধের দুই সৈনিকের কাছে জানতে চাইল সব ঠিক আছে কি না। উত্তরে এক প্রহরী জানাল,
— আচার্য গতকাল সারারাত জাগরণ করেছেন। তাঁর কক্ষের প্রদীপ সারারাত প্রজ্বলিত ছিল। আমরা কক্ষের ভেতর থেকে তাঁর শব্দ পেয়েছি, দু-একবার বাহিরেও এসেছিলেন। সম্ভবত তিনি সারারাত অধ্যয়নে ডুবে ছিলেন।
তবুও দুশ্চিন্তা হল জীবসিদ্ধির। তাই খানিকটা ইতস্তত করার পর সে চাণক্যর দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে ডাকল।
— আচার্য? আচার্য?
কিছুক্ষণ কোনো শব্দ হল না। জীবসিদ্ধির মনে আশঙ্কার মেঘ সবে জমাট বাঁধতে শুরু করেছিল, ভেতরের খিল সরিয়ে দরজা খুলে দিলেন চাণক্য। চোখের নীচে কালি দেখেই বোঝা যায় যে, প্রহরীদের কথাই ঠিক। চাণক্য সারারাত জেগে ছিলেন।
দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে তিনি জীবসিদ্ধিকে ভিতরে আসতে বললেন এবং নিজে গিয়ে একটি আসনে বসলেন। সারাকক্ষে পুস্তক ছড়িয়ে পড়ে আছে। জীবসিদ্ধি সেগুলো একবার দেখে প্রশ্ন করল,
— ক্ষমা করবেন আপনার নিদ্রাভঙ্গের জন্যে। আসলে আপনি দরজা খুলছেন না দেখে আমার চিন্তা হচ্ছিল।
ঠোঁটের এককোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে চাণক্য বললেন,
— ভাবলে যে এই বুঝি আচার্যকে কেউ তাঁর কক্ষে হত্যা করে দিয়ে গেল। তাহলে আরও একটি রুদ্ধদ্বার হত্যারহস্য সৃষ্টি হত, তাই না? কী বলো হে, জীবসিদ্ধি? যদিও সেক্ষেত্রে তার সমাধান করার জন্যে চণক পুত্র চাণক্য থাকত না।
জীবসিদ্ধি গুরুর এহেন বক্রোক্তির উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল,
— সারারাত ধরে অধ্যয়ন করার কি খুব দরকার ছিল?
আড়মোড়া ভেঙে চাণক্য বললেন,
— অবশ্যই দরকার ছিল। আগামী পরশুই তো প্রতিষ্ঠা দিবস। রহস্যের সমাধান না করে কীভাবে তোমায় বিপদের মুখে ঠেলে দিই বলো?
— তা, যা খুঁজছিলেন, তা পেলেন?
চাণক্য একটি কুঁজো থেকে কিছুটা জল একটি ঘটিতে নিয়ে তা পান করলেন। চোখে-মুখে দিলেন। ঠান্ডাজলের স্পর্শে তাঁর ঘুম কাটল। বললেন,
ওহে জীবসিদ্ধি, তোমার গুরুর সম্ভবত কালের নিয়মে বয়সের ভারে বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছে।
— কথার সত্যতা নিয়ে গুরুর সিদ্ধান্তের উপর আমি প্রশ্ন করছি না। তবে, হঠাৎ এই উপলব্ধির কারণ কী?
চাণক্য চোখ ছোটো করে তাঁর অন্তরভেদী দৃষ্টিতে জীবসিদ্ধির দিকে তাকালেন। নাক দিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের ‘হুফ’ শব্দ করে বললেন,
— কৌতুক করছ গুরুর সঙ্গে, হে জীবসিদ্ধি? চাণক্যর বুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছ?
ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে জীবসিদ্ধি বলল,
— আমি তুলিনি। আপনি স্বয়ং তুলেছেন।
চাণক্য একটি পুস্তক তুলে সেটির একটি পাতা খুলে জীবসিদ্ধির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
—বেশ তো, তবে নিজেই বের করো দেখি এই গোটা রহস্যের সমাধান।
সমস্যার চাবিকাঠি শৈলবিদ্যার এই পুস্তকের একটি শ্লোকে রয়েছে। একাদশ শ্লোক পাঠ করে দেখো।
জীবসিদ্ধি পাঠ করল। চাণক্য জিজ্ঞেস করলেন,
— কী বুঝলে মানে?
জীবসিদ্ধি আরও একবার পড়ল। বলল,
— এটা তো শবব্যবচ্ছেদ করে পরীক্ষা করার একটা পদ্ধতি লেখা রয়েছে।
— কী লেখা রয়েছে সেটা বলো।
— মৃতদেহ সম্পূর্ণ দাহ হওয়ার পরেও যদি পাকস্থলী ভস্মীভূত না হয়, তবে তা পাকস্থলীতে বিষাক্ত দ্রব্যের উপস্থিতির ইঙ্গিত।
জীবসিদ্ধি লক্ষ করল চাণক্যর চোখের নীচে কালি থাকলেও চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে। এই দৃষ্টি জীবসিদ্ধির পরিচিত।
— আপনি কি বৈদ্যর মৃত্যুর সমাধান করে ফেলেছেন?
— শুধু বৈদ্য চক্রাচার্যর নয়, জীবসিদ্ধি। সব রহস্যের সমাধান হয়েছে।
উত্তেজিত হয়ে জীবসিদ্ধি উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
— সেকী? আপনি বলতে চাইছেন আপনি মহারাজ সুবর্মার মৃত্যুরহস্যের সমাধানও করে ফেলেছেন? আপনি জানেন কে হত্যাকারী?
— হ্যাঁ। কে হত্যাকারী এটা তো সহজেই বোঝা যায়, জীবসিদ্ধি। কারুর মৃত্যুতে যার সবথেকে বেশি লাভ সে-ই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হত্যাকারী হয়। এইক্ষেত্রেও তাই। এই রহস্যে ‘কে?’-এর উত্তর গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু যতক্ষণ না ‘কীভাবে?’-র উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল ততক্ষণ হত্যাকারীর বিরুদ্ধে কিছুই প্রমাণ করা যেত না। আর তারপর আরও জটিল প্রশ্নটা হল ‘কেন?’
— অর্থাৎ, আপনি এখন জানেন কোন যন্ত্র ব্যবহারে শর নিক্ষেপ করা হয়েছিল? কোন কৌশলে সকলের চোখ এড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল মহারাজকে?
— হ্যাঁ, জীবসিদ্ধি। সেই কারণেই তো বলছি যে, আমার নিজের বুদ্ধির উপর আমার মনে আজকে সন্দেহ জাগছে। এত সরল সমাধানটা আমার বুঝতে এতদিন সময় লাগল। আমার তীব্র তিরস্কার প্রাপ্য, হে জীবসিদ্ধি। আরও অনেক আগেই আমার বোঝা উচিত ছিল উৎসবের দিন ঠিক কী ঘটেছে। আমি এখন সব কিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, জীবসিদ্ধি।
— আপনি বলতে চান সব সমাধান আপনি পেয়েছেন এই একটি শ্লোক থেকে?
— হুমম। ঠিক তাই। সবথেকে বড়ো কথা এই পাকস্থলী আগুনে না ভস্মীভূত হওয়ার ব্যাপারটা আমি পূর্বেই জানতাম। অথচ কিছুতেই এতদিন মনে পড়ছিল না। গতকাল রাতে এই লেখাটা খুঁজে পাই। তারপর শুধুই বসে ভেবেছি আর সমস্ত সূত্র একে একে জায়গামতো পর পর জুড়ে গিয়েছে।
জীবসিদ্ধি আরও একবার লেখাটা পড়েও কিছু বুঝতে না পেরে অধৈর্যভাবে পুস্তকটি নামিয়ে রাখল। বলল,
— আমি কিন্তু আপনার কথার সূত্র কিছুই ধরতে পারছি না।
— সেকী? এখনও বুঝলে না? সব সূত্র তো তোমার হাতেই আছে, জীবসিদ্ধি। এমনকী তুমি নিজেই কয়েক দিন আগে কথার মাঝে সমাধানটা বলে ফেলেছিলে।
— এ কী বলছেন আপনি? আমি? আমি সমাধান করে ফেলেছিলাম?
— ঠিক তাই। তুমি সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলে নিজেরই অজান্তে। তোমার সেই কথাটা পুনরায় গতকাল রাতে মনে পড়তেই সমাধান পেয়ে গেলাম মহারাজ সুবর্মার হত্যারহস্যের।
জীবসিদ্ধি কিছুক্ষণ ভেবে দু-হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে বলল,
— নাহ্! পারলাম না। এবার আপনিই তবে আমার ধূম্রমোচন করুন, গুরুদেব।
চাণক্যর মুখে পরিতৃপ্তির হাসি ফুটল। বললেন,
— বেশ, বেশ। আমিই তবে বুঝিয়ে বলি। গুরুর তো কাজ হল তার শিষ্যকে মার্গ দেখানো। তাই না? আমিই তবে তোমায় বলছি গোটা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে। কিন্তু তার আগে…
গুরুর পরিহাস হজম করে অধৈর্য ভঙ্গিতে জীবসিদ্ধি বলে উঠল,
— কী তার আগে?
চাণক্য চোখ বুজে বললেন,
— আমি নিজের প্রার্থনা, পাঠ, আদি কার্য সম্পন্ন করি। তোমার গুরু ক্ষুধার্ত, হে জীবসিদ্ধি। যাও আগে তার আহারের জন্যে কিছু ফলাদি নিয়ে এসো। আর হ্যাঁ, সঙ্গে ধূমায়িত এক পেয়ালা দুধে বেশ খানিকটা মধু মিশিয়ে আনতে ভুলে যেয়ো না। তবে তার আগে তোমার আরও একটা কাজ আছে। তুমি আসার সময়ে অমাত্য শ্রীশৈলকে নিয়ে এসো। তাঁকে একটি প্রশ্ন করার আছে আমার।
২৪.
— কুলুতে চাণক্যকে হত্যার চেষ্টা কে করল, মহারাজ মলয়কেতু?
প্রশ্নটা মলয়কেতুর দিকে ছুড়ে দিলেন আচার্য শকুনি। আজকেই শকুনি আবার পর্বত্যকা রাজ্যের রাজধানী মলয়নগরে ফিরে এসেছেন। মহলে প্রবেশ করেই তিনি সরাসরি চলে এলেন মহারাজের খোঁজে অন্দরে এবং অভিবাদনের ধার না ধেরেই সরাসরি প্রশ্ন করলেন তিনি।
মলয়কেতু তখন সবেই আহার সেরে উঠেছে। ব্রাহ্মণের ঔদ্ধত্য দেখে মাথা থেকে পায়ের নখ অবধি জ্বলে গেল মলয়কেতুর। কিন্তু শকুনিকে এখনই ঘাঁটানোর সাহস পেল না। নিজের কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ না করে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মলয়কেতু বলল,
— আপনি এসে গিয়েছেন, আচার্য? উত্তম, উত্তম। কিন্তু কী বললেন, আচার্য? কাকে হত্যা করা হয়েছে?
— হত্যা করা হয়নি মহারাজ, হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি জানতে চাই এই কাণ্ডে আপনার হাত আছে কি না?
মলয়কেতু বাস্তবিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
— আমি? সেকী? সেই সংবাদ আমিও পেয়েছি, কিন্তু আমি তো ভাবলাম এটা আপনার কাজ।
মহারাজের অনুমতির অপেক্ষা না করেই একটি আসনে বসলেন শকুনি। জ কুঁচকে মলয়কেতুর চোখে চোখ রেখে বোঝার চেষ্টা করলেন সে মিথ্যা বলছে না সত্যি। শেষে বললেন,
— না, মহারাজ। আমি না।
— তাহলে নিঃসন্দেহে চিত্রবর্মার কাজ।
— না, সেও করেনি।
— তবে?
— সেটাই তো জানতে চাইছি, মহারাজ। আমার নির্দেশ অমান্য করে কে এই কাজ করল।
মলয়কেতুর আরও একবার রাগ হল। ‘নির্দেশ”? এই ব্রাহ্মণ নিজেকে ভাবে কী? সে তাঁকে ‘নির্দেশ” দেবে?
আবারও রাগ গিলে মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে মলয়কেতু বলল,
— কিন্তু আচার্য, আপনি এতে এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? যে-ই করে থাকুক, সে তো আমাদের ভালোই করার চেষ্টা করছিল। চাণক্য আমাদের আর মগধের পথের মাঝের সবচেয়ে বড়ো কাঁটা। আপনি যখন দেড় মাস পূর্বে বলেছিলেন আপনি মগধের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভটির উপর আঘাত করতে চলেছেন, তখন তো আমি ভেবেছিলাম আপনি চাণক্যর কথাই বলছেন।
শকুনি বিরক্তভাবে মলয়কেতুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কতটুকু জানেন আপনি মগধ সাম্রাজ্যের বিষয়ে? প্রায় গোটা আর্যাবর্ততেই যে সাম্রাজ্য আধিপত্য স্থাপন করে ফেলেছে মাত্র কয়েক বর্ষে, আপনি কি বাস্তবে মনে করেন যে, মাত্র একটি মানুষের উপর তা দাঁড়িয়ে আছে? আপনি কি মনে করেন যে, কুলহীন চন্দ্রগুপ্ত শুধুমাত্র চাণক্যর হাতের পুতুল?
— না… মানে… আমি বলতে চাইছি….
হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে ব্রাহ্মণ বললেন,
— চন্দ্রগুপ্তকে বাল্যকাল থেকে সম্রাট হওয়ার জন্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাকে তক্ষশিলায় নিয়ে গিয়ে নিজের ছাত্র হিসাবে রেখেছিল চাণক্য। সে বিদ্বান, বুদ্ধিমান এবং সেইসঙ্গেই সে বীর অতি কুশল একজন যোদ্ধা। শোনা যায় সে অলকশেন্দ্রের* মহা পরাক্রমী যবন** সেনাদের থেকে যুদ্ধকলায় প্রশিক্ষিত হয়েছিল। তার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অমাত্য রাক্ষস একজন দক্ষ প্রশাসক। নন্দর রাজকুমারীকে বিবাহ করায় এবং রাক্ষস তার পক্ষে আসায় তার সমর্থক রাজাদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া মগধের সুবিশাল সেনাবলের কথা নাই-বা বললাম। কিন্তু এইসব ছাড়াও তার কাছে আছে এমন একজন যে সম্ভবত মগধের কাছে চাণক্যর থেকেও অপরিহার্য।
— কে সে, আচার্য?
— এমন একজন যাকে মগধের শত্রুরা কেউ চেনে না। তার বাস্তব পরিচয় গোটা আর্যাবর্তে মাত্র কয়েক জন বিশেষ ব্যক্তি জানে। সে না থাকলে মগধ পঙ্গু হয়ে যাবে। মগধের সবচেয়ে গোপন এবং অন্যতম শক্তিশালী একটি অস্ত্র সে। নন্দ সাম্রাজ্যের পতনে তার ভূমিকা অন্যতম ছিল, অথচ কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি তার উপস্থিতি।
বিস্ময়ে মলয়কেতুর মুখ হাঁ হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন করল,
— কার কথা বলছেন? কে সেই ব্যক্তি? আর, এত তথ্য আপনি কীভাবে জানেন? এমনকী তার ছাত্রাবস্থার কথাও জানেন আপনি! এগুলো যদি অত্যন্ত গোপন বিষয় হয়েই থাকে, তবে তা আপনার কীভাবে জানা? এ একমাত্র তবেই সম্ভব যদি চাণক্য বা চন্দ্রগুপ্তর অত্যন্ত কাছের ও বিশ্বাসী কেউ আপনার পরিচিত হয়ে থাকে।
এই প্রথমবার শকুনিকে কিছুটা বিব্রত মনে হল। যেন ভুল করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলে ফেলেছেন। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে তিনি বললেন,
— সেকথা আপনার না জানলেও চলবে। আপনি খোঁজ নিন যে, চাণক্যর জন্যে কে গুপ্তহস্তা নিযুক্ত করেছে। যদি আমার অনুমান ভুল না হয় তবে আমাদের পক্ষে থাকা রাজাদের মধ্যেই কারুর কাজ এটা। আমি ঠিক করেছি আমি আরও একবার সকলের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা করতে চাই। তাদের আমি নিজে গোপন সভায় যোগদান করার জন্যে আমন্ত্রণপত্র পাঠাব।
— তাতে কী লাভ হবে, আচার্য?
যেন অতি নির্বোধ কারুর প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে এমনভাবে শকুনি উত্তর দিলেন,
— কারণ আমি দেখা করতে চাই শুনে, অন্য রাজাদের মধ্যে যে-ই এই কাজ করে থাকুক না কেন, তার মনে ভয় ঢুকবে। সে নিশ্চিতভাবেই ভেবে নেবে যে, আমি তার এই পদক্ষেপের কথা জেনে গিয়েছি। এবং, সেই ব্যক্তি ওই সভায় আসবে না। যে আমার আমন্ত্রণে সাড়া দিতে অস্বীকার করবে, মহারাজ জানবেন সে-ই সম্ভবত আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।
মনে মনে এই ব্রাহ্মণের বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারল না। কিন্তু মলয়কেতুর মনে পড়ল গতকাল প্রধানামাত্য সুদীপ্তক একটা অদ্ভুত কথা বলছিল। বৃদ্ধ মন্ত্রী বলছিল তার নাকি শকুনির সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিবারই মনে হয় যে, ব্রাহ্মণ অন্য কারুর বুলি বলছেন এবং তিনি যা বলেন তা আসলে তাঁর নিজের কথা নয়। এরকম অদ্ভুত কথা কেন বৃদ্ধের মাথায় এল তা মলয়কেতু ভেবে পায়নি যদিও।
মলয়কেতু প্রশ্ন করল,
— সবই বুঝলাম কিন্তু আপনার একটা কথার সঙ্গে সহমত হতে পারছি না, আচার্য। চাণক্যকে হত্যা করতে বাধা কোথায়? সে এখন মগধের বাইরে, তাই তাকে হত্যার পরিকল্পনা আমরা কেন করছি না?
— কেননা চাণক্যকে জীবিত থাকতে হবে। কারণ তাকে নিজের চোখে দেখে যেতে হবে তার স্বপ্ন ধ্বংস হতে। তাকে নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হবে তার একচ্ছত্র আর্যাবর্তর পতন, মগধের পতন! কারণ সেটাই হবে চাণক্যর জন্যে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন শাস্তি! এটাই হবে শকুনির চরম প্রতিশোধ!
—
*অলকশেন্দ্র— অ্যালেকজেন্ডার দ্য গ্রেট
**যবন— গ্রিক
