১৫.
আচার্য, আসতে পারি?
সকালের প্রার্থনা ধ্যান শেষ করে সবে ফলের থালার দিকে হাত বাড়িয়েছেন চাণক্য। উত্তর দিলেন,
— এসো হে জীবসিদ্ধি, দ্বার খোলাই আছে।
জীবসিদ্ধি ভিতরে এসে চাণক্যকে প্রণাম করে একটি আসনে চাণক্য মুখোমুখি বসল। বলল,
— তিনটি সংবাদ আছে।
চাণক্য জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন জীবসিদ্ধির দিকে। জীবসিদ্ধি উত্তর দিল,
— প্রথম খবর এসেছে অক্ষয়ের থেকে। বাবাক নামে এক কামারের খোঁজ সে পেয়েছে। এই কামার তক্ষশিলায় থাকে বলে জানা গিয়েছে।
চাণক্য খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে খানিকটা নিজের মনেই বললেন,
— আবার তক্ষশিলা। সব ঘটনা, সব নাম ঘুরে-ফিরে সেখানেই কেন আসে বরাবর?
— এবার আসি দ্বিতীয় পত্রে। সেটি এসেছে অমাত্য রাক্ষসের থেকে। চাণক্য উৎসাহী ভঙ্গিতে এইবার জীবসিদ্ধির কথায় মনোযোগ দিলেন। জীবসিদ্ধি বলল,
— তিনি সংক্ষিপ্ত লেখায় জানিয়েছেন যে, সব ঠিক আছে।
— আর?
— আর জানিয়েছেন যে, মগধের জনগণনার কাজ দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই হল সমস্যা অমাত্য— মন্ত্রীদের। এরা এইসব নিয়েই আছে। এই তথ্য আমাদের জানানোর কী প্রয়োজন? জনগণনা এখন কেন জরুরি?
জীবসিদ্ধির অলক্ষে চাণক্যর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল একমুহূর্তের জন্যে। জিজ্ঞেস করলেন,
— আর তৃতীয় সংবাদ?
— আচার্য শকুনির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। সে মলয়কেতুর রাজমহলে আছে।
উঠে বসলেন চাণক্য। বললেন,
— এটাই প্রত্যাশিত ছিল। প্রথমে গান্ধারের অম্বিক আর এখন মলয়কেতু। এদের দু-জনকেই অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত করা সহজ কিনা। সে এখন আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের একত্রিত করছে। সম্ভবত পার্বত্য প্রদেশের অন্য শাসকরাও যোগ দেবে তার সঙ্গে।
— তাহলে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী, আচার্য?
চাণক্য আবার গা এলিয়ে একটি আপেল ও দইয়ের তৈরি মিষ্টি ‘মঠঠা’ শরবত তুলে নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গেলেন,
— ওহে জীবসিদ্ধি, তোমার মনে আছে তোমার ছোটোবেলার একটি ঘটনার কথা? এই মঠঠার পাত্র দেখে কিছু মনে পড়ে যায়?
জীবসিদ্ধি হেসে বলল,
— অবশ্যই মনে আছে। তক্ষশিলায় আপনি তখন শিক্ষক আর আমরা আপনার ছাত্র। কীভাবে জানি আপনার মঠের প্রবেশপথে কাঁটাঝোপ গজিয়ে উঠেছিল। আসতে-যেতে ছাত্রদের ও অন্যান্যদের পায়ে কাঁটা ফুটছিল। আমরা সকলেই বিরক্ত হয়ে দুটো অপশব্দ ব্যয় করে এড়িয়ে চলে যাচ্ছিলাম।
— হুমম। তারপর?
— আমরা পাঠশালায় বসে আপনার অপেক্ষা করছিলাম। ঢুকতে গিয়ে আপনারও পায়ে কাঁটা বিঁধল। আপনার সঙ্গে ছিল চন্দ্রগুপ্ত। সে তো কোথা থেকে একটা লাঠি নিয়ে এসে সেই কাঁটাঝোপ উপড়ে ফেলতে গেল। আপনি তাকে বাধা দিলেন। বললেন, ‘ঝোপ ভেঙে লাভ নেই, চন্দ্রগুপ্ত। কারণ আবার কয়েক দিন পর পুনরায় এখানে কাঁটাঝোপ গজিয়ে উঠবেই।’ এরপর আপনি একটি অদ্ভুত কাজ করলেন। নিজের কুটিরের ভেতর থেকে একপাত্র মিষ্টি মঠঠা নিয়ে এলেন। আপনার কুটিরে সবসময়ই মিষ্টি কিছু বানানোই থাকত।
জীবসিদ্ধি হেসে উঠল।
— আপনি সেই মিষ্টি শরবত কাঁটাঝোপের গোড়ায় ঢেলে দিলেন এবং আশপাশের মাটিতে ছড়িয়ে দিলেন। অন্য ছাত্ররা আপনার কাণ্ড দেখে হাসাহাসি জুড়ে দিল।
আপেল চিবোতে চিবোতে চাণক্য প্রশ্ন করলেন,
— আর তোমরা? তোমরা হাসছিলে না?
— নাহ্। আমরা মানে আমরা ছ-জন আপনাকে চিনতাম, আচার্য। আমরা জ্ঞানতাম যে, কারণ ব্যতীত কোনো কাজ আপনি করেন না। এই অদ্ভুত কাজেরও কোনো উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আছে আপনার
— হুমম।
— চন্দ্রগুপ্তই জিজ্ঞেস করল আপনাকে যে, এটা আপনি কেন করলেন। আপনি যে উত্তর দিয়েছিলেন সেটা আমি কোনোদিন ভুলব না। আপনি আমাদের বলেছিলেন,
‘ওই মিষ্টি দইয়ের টানে পিঁপড়ে আসবে। তারা এই কাঁটাগাছের শেকড় খেয়ে গাছটাকে মেরে ফেলবে। শেকড় নষ্ট হওয়ায় কাঁটাগাছ আর কোনোদিন সেখান থেকে পুনরায় গজিয়ে উঠতে পারবে না। শত্রুদেরও সবসময় এভাবেই শেষ করতে হয়— সমূলে! তোমরা সকলে সমস্যা এড়িয়ে যাচ্ছিলে, শুধু নিজেরটুকুই ভাবছিলে। কিন্তু দেখো, তোমাদের মিত্র চন্দ্রগুপ্ত কিন্তু সকলের সুবিধার কথা ভেবে গাছ ভেঙে দিতে উদ্যত হয়েছিল। সে এড়িয়ে যায়নি, যদিও তার পদ্ধতি ভুল ছিল। সমস্যা ও শত্রুর অবশেষ রাখতে নেই কখনো। তাকে সমূলে বিনষ্ট করতে হয় যাতে সেটি পুনরায় আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।’*
.
জীবসিদ্ধির গল্প শেষ হতে চাণক্য শান্তস্বরে বললেন,
— হুমম। কথাটা সবসময়ে মনে রাখবে।
— আপনার কি এই মঠঠা দেখে সেই ঘটনা মনে পড়ল এখন নাকি এই কথার অন্য তাৎপর্য আছে?
উত্তর না দিয়ে চাণক্য শুধু হাসলেন।
তখনই দরজায় আরও একবার কড়া নাড়ার শব্দ হল।
— ভেতরে আসুন।
চাণক্য বলতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরী দ্বার খুলে দিল, আর কক্ষে চিত্রবর্মা প্রবেশ করল।
— প্রণাম, আচার্য। সুপ্রভাত, জীবসিদ্ধি মহাশয়।
— সুপ্রভাত, আর্য।
একটি খালি আসনে বসতে বসতে চিত্রবর্মা বললেন,
— কালকের ঘটনা শুনেছেন?
— রাজবৈদ্যর হত্যার?
— আজ্ঞে হ্যাঁ! মর্মান্তিক! সত্যি বলতে চক্রাচার্য শুধুই একজন অত্যন্ত কুশল বৈদ্য নয়, আমার পরম মিত্রও ছিল। আমি তো গতকাল দুপুরে বিশেষ কাজে বেরিয়েছিলাম। ফিরে এসে শুনি এই কাণ্ড। আমি তো ভাবতেই পারছি না। আমি কড়াহাতে এই রাজ্যে দস্যুবৃত্তি দমন করব।
— আপনি মনে করেন এটা দস্যুদের কাজ?
এই প্রশ্নে বিস্মিত হয়ে যুবরাজ প্রশ্ন করলেন,
— মানে? অমাত্য শ্রীশৈল তো তাই বলল। কেন? আপনার কী মনে হয়?
চাণক্য কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— সন্দেহ নয় ঠিক। একটা সম্ভাবনা হতে পারে যে, বেদ্য মহারাজের মৃত্যুর
ব্যাপারে কিছু জানতেন যা গুরুত্বপূর্ণ।
— কিন্তু চক্রাচার্য তো একদিন আগেই আপনার কাছে সব কথা বলেছে। তার আবার নতুন করে কী বলার থাকতে পারে?
— আমি বলিনি যে, এটাই কারণ তাকে হত্যার, আর্য। এটা সম্ভাবনা মাত্র। সেই মর্মেই আমি শ্রীশৈলকে বলেছিলাম যে, বৈদ্যর স্ত্রীর জন্যে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে। কারণ হতে পারে তাঁর স্ত্রীকে তিনি কিছু বলে গিয়েছেন। আজকে সকালেই একবার তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছে আছে।
দু-দিকে ঘাড় নেড়ে চিত্রবর্মা বললেন,
— সে-সম্ভাবনা নেই, আচার্য। কারণ, অনেক বছরের মিত্রতার সূত্রে আমি চক্র ও তার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচিত। তার স্ত্রী শিক্ষিতা না হওয়ায় চক্রর আজীবন আফশোস ছিল যে, সে তার নতুন নতুন জ্ঞানের তত্ত্ব তার জীবনসঙ্গিনীর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে না। ও অনেকবার ওর স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু ওর স্ত্রী… মানে সত্যি বলতে সে একটু মন্দবুদ্ধির স্ত্রীলোক।
— তবে এটা বড়োই আফশোসের কথা।
— তবুও একবার চলুন তার গৃহে। আমি এমনিতেই একবার তার গৃহে যাব। শুধু যুবরাজ হিসাবে নয়, মিত্র হিসাবে চক্রর স্ত্রীর পাশে দাঁড়ানো আমার কর্তব্য। আমার সঙ্গেই আপনারাও চলুন না।
— বেশ তো। আমরা তৈরি, আপনি বেরোলে আমাদের ডেকে নেবেন দয়া করে।
— বেশ, বেশ।
কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল চিত্রবর্মা। জীবসিদ্ধি দ্বার রুদ্ধ হওয়া অবধি অপেক্ষা করার পর বলে উঠল,
— আমার তো মনে হয় এ-ই হত্যাকারী।
— কার?
— রাজার। এবং বৈদ্যর। এ একা অথবা শ্রীশৈলর সঙ্গে মিলে হত্যা করেছে।
চাণক্য উঠে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন,
— ওহে জীবসিদ্ধি, এই হত্যাকাণ্ডে ‘কে’ জরুরি নয়, যতটা না ‘কীভাবে’ এবং ‘কেন’।
— ‘কেন’-র উত্তর কি সহজ নয়? রাজসিংহাসনের লোভে।
— হুম। কিন্তু তাই যদি হয় তবে আমাদের আমন্ত্রণ করা কেন? কেন আমাকে হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে বলবে সে নিজেই?
জীবসিদ্ধি অস্থির ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
— আমি নিশ্চিত এটা আপনাকে মগধ থেকে বের করে আনার জন্যে। আপনার প্রাণ সংশয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে, আচার্য। আপনি দয়া করে আমাকে ছাড়া একা কোথাও যাবেন না। বা, অঙ্গরক্ষক হিসাবে সর্বক্ষণ সঙ্গে অন্তত একজন মগধের সৈনিককে রাখবেন।
— জীবসিদ্ধি, একমাত্র কোনো মূর্খই আমাকে নিজের গৃহে ডেকে এনে হত্যা করে গোটা মগধের রোষ কাঁধ পেতে নেবে। কুলূতের মাটিতে আমার যদি বজ্রপাতেও মৃত্যু হয় তবে চন্দ্রগুপ্ত সেটাকে কুলূতের ষড়যন্ত্র বলেই ধরে নেবে এবং এই গোটা রাজ্য ধুলোয় মিশিয়ে দিতে মগধ সেনার তিনদিন লাগবে বড়োজোর। এবং, এই কথা চিত্রবর্মাও জানে। সে আর যা-ই হোক, মূর্খ নয় যে, নিজের সর্বনাশ নিজে ডেকে আনবে। অতএব, জীবসিদ্ধি এইখানেই তোমার সঙ্গে আমার মত ভিন্ন। তুমি প্রতিমুহূর্তে আশঙ্কায় আছ যে, আমার প্রাণহানির চেষ্টা করা হবে। কিন্তু আমি প্রায় নিশ্চিত যে, চিত্রবর্মা কখনোই নিজের দেশের মাটিতে আমার উপর আক্রমণ করার সাহস করবে না।
চাণক্যর কথায় জীবসিদ্ধিকে খুব একটা সন্তুষ্ট বলে মনে হল না। গজগজ করতে করতে বলল,
— তবুও, সতর্কতা অবলম্বন করাই শ্রেয়। আমি যা বললাম তা আপনি দয়া করে মেনে চলবেন।
চাণক্য তার কথা শুনতে পেলেন বলে মনে হল না। অন্যমনস্কভাবেই নিজের কেশশিখায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— কিছু একটা ঘটছে যা খুব সহজ, একদম আমাদের চোখের সামনেই আছে। কিন্তু আমি সেটা দেখতে পাচ্ছি না। ওই বিশেষ তির এখানে কেন? গোটা বিষয়টায় কি শকুনির কোনো ভূমিকা আছে? থাকলে সেটা কী? কীভাবে সকলের চোখের সামনে হত্যা করা হল রাজাকে অথচ কেউ হত্যাকারীকে দেখতে পেল না? বৈদ্যর হত্যা কি নিতান্তই সমপাত নাকি সেটাও গোটা চক্রজালের অংশ? আমার মন বলছে রাজার মৃত্যুরহস্যের উত্তরটা পেলেই সব সমাধান হয়ে যাবে। অথচ গোটা ব্যাপারটা এতটাই অস্বাভাবিক…
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায় জীবসিদ্ধি চাণক্যর কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলল,
— আচার্য, এখনও কিন্তু সেই তিরন্দাজ প্রতিযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা বাকি। তাদের মধ্যেই হত্যাকারী লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা কিন্তু প্রবল। বা, যদি তা নাও হয়, তাদের থেকে হয়তো কোনো সূত্র পাওয়া যাবে যে, কোন উপায়ে এতদূর থেকে বাণ নিক্ষেপ করা সম্ভব, তাও আবার সকলের দৃষ্টির থেকে নিজেকে লুকিয়ে।
— হুম। আমার মনে আছে, জীবসিদ্ধি। বৈদ্যর স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেই পরের প্রহরে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
.
তখনই বাইরে থেকে ডাক এল,
মহামতি চাণক্য, যুবরাজ চিত্রবর্মা জানালেন রথ প্রস্তুত। তিনি বাহিরে প্রাঙ্গণে আপনাদের অপেক্ষা করছেন।
—
*চাণক্যর পায়ে কাঁটা ফুটে যাওয়ার এই কাহিনি খুবই প্রচলিত লোককাহিনি।
১৬.
চারজনের দলটা গ্রামের সীমার বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরনের পোশাক নিতান্ত সাদামাটা, গ্রাম্য। কিন্তু তাদের যে ঘোড়াগুলো গাছের সঙ্গে খানিক দূরেই বাঁধা আছে সেগুলো দেখলেই অনুমান করা যায় যে, এধরনের জাতের ঘোড়া একমাত্র মগধের বিশেষ রাজকর্মীদের জন্যে বরাদ্দ থাকে। দলপতি শশাঙ্ক বার বার আকাশের দিকে চেয়ে সূর্যের অবস্থান দেখে সময় অনুমান করার চেষ্টা করছে। দুপুরের সূর্য দেখে মনে হয় দিনের তৃতীয় প্রহরের মাঝামাঝি সময় এখন।
— ওই আসছে।
দলের একজন জানাল। সকলেই তাকিয়ে দেখতে পেল যে, গ্রামের মেঠোপথ ধরে একজন লোক হেঁটে আসছে। লোকটি এসে প্রথমে দলপতিকে এক বিশেষ সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানিয়ে বলল,
— খবর ঠিক ছিল, আর্য শশাঙ্ক। অস্ত্রনির্মাতা বাবাকের কুটির এখানেই আছে। এবং, যেটুকু খবর পেলাম গ্রামের ও আশেপাশের লোকেদের সঙ্গে কথা বলে, তিনি যথেষ্ট বিখ্যাত একজন অস্ত্রনির্মাতা। গান্ধাররাজ অম্বিক তাঁকে একসময়ে তাঁর সেনার অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণশালার তদারকির কাজে বহাল করেছিলেন।
অম্বিকের নাম শুনে শশাঙ্কর পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ায় একবার নাক কুঁচকে বললেন,
— অম্বিক বরাবরই মূর্খ। সেই ছাত্রাবস্থা থেকেই চিনি ওকে। ওর কথা বাদ দাও। তবে, এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ বটে। কারণ, অম্বিকের হয়ে রাজ্য চালাত তার মহামাত্য আচার্য শকুনি। অতএব, বলাই চলে যে, বাবাক আসলে শকুনির নির্বাচন। অতএব, এখনও যে শকুনি তাকে দিয়েই অস্ত্র বানাবে এই সম্ভাবনা প্রবল।
— তবে এবার আমাদের করণীয় কী?
— তোমরা গ্রামের লোকেদের মাঝে মিশে যাও। কুটিরের কাছে পৌঁছোও। আমিও যাচ্ছি সেখানেই। আমি নিজেই বাবাককে জিজ্ঞাসাবাদ করব।
.
শশাঙ্ক যা আশা করেছিল, সেইস্থানে পৌঁছে দেখল বাবাকের কুটির তার চেয়ে অনেকটাই বড়ো। কুটিরের দুই ধার থেকে উঁচু পাঁচিল উঠে গিয়েছে। দরজায় কড়া নাড়াতে এক যুবক এসে দরজা খুলে দিল। যুবকের নাক ও চোখ সরু, ভ্রূ কম। দেখেই বোঝা যায় এ আর্যাবর্তর দেশীয় মানুষ নয়। সম্ভবত মোঙ্গলীয়। তবে যুবক পরিষ্কার দেশীয় ভাষায় কথা বলল।
— কী প্রয়োজন, বলুন?
— আমি অস্ত্রনির্মাতা বাবাকের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
— হ্যাঁ, আসুন। তিনি আমার পিতা। এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। আসুন ভিতরে। ছেলেটি শশাঙ্ককে বাড়ির পেছনের দিকে বারান্দায় নিয়ে এল। এক মধ্যবয়সি পুরুষ বারান্দায় একটি তুলোর আসনে গা এলিয়ে গড়গড়া থেকে ধূমপান করছে। এই ব্যক্তিও মোঙ্গলীয় চেহারার। পিতাপুত্রর মুখ ও চেহারার একই গড়ন, তবে পিতার মুখে একগাল কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ। এই বয়সেও বলিষ্ঠ চেহারা এই বিদেশির।
— পিতা, ইনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।
বাবাক ঘাড় ঘুরিয়ে শশাঙ্ককে দেখে সোজা হয়ে বসল।
— বলুন মহাশয়, আপনার কী সেবা করতে পারি?
গদিতেই বাবাকের পাশে বসে শশাঙ্ক বলল,
— আপনাকে একটি বস্তু দেখাতে চাই, মহাশয়।
নিজের অঙ্গবস্ত্রের ভাঁজ থেকে কাপড় জড়ানো তিরটি বের করে আনল শশাঙ্ক। কাপড় সরিয়ে সেটাকে বাবাকের মুখের সামনে ধরতেই বাবাকের চোখে স্পষ্ট চেনার অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। এইবার সরাসরি প্রশ্ন করল শশাঙ্ক,
— এই বাণ আপনি চেনেন?
শশাঙ্ক অপেক্ষা করল বাবাকের উত্তরের। এখন যদি লোকটা অস্বীকার করে যে, এই বাণ সে চেনে না, তবেই স্পষ্ট হয়ে যাবে লোকটির অবস্থান। যে, সে জেনেশুনে মিথ্যে বলছে অর্থাৎ শত্রুদের সঙ্গে সে জড়িত। আর যদি হ্যাঁ বলে, তবে এই সম্ভাবনাই বেশি যে, কামার নিজের অজান্তেই এই বাণ বানায় শকুনির সেই তিরন্দাজ হত্যাকারীর জন্যে।
উপরনীচে মাথা নাড়িয়ে বাবাক উত্তর দিল,
— হ্যাঁ। এটা আমার বানানো।
— আপনি ছাড়া এই বাণ কি আর কেউ বানায়?
— সম্ভবত না। কারণ দেখতেই পাচ্ছেন এই বাণ সাধারণের থেকে ভিন্ন। অন্তত এই বাণটি যে আমার হাতে বানানো সেই বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কিন্তু এই প্রশ্ন কেন করছেন বলুন তো?
শশাঙ্ক একবার বাবা আর তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের দিকে দেখে নিয়ে, একটু ভেবে বলল,
— ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপনীয়। কিন্তু যেহেতু আপনি আমায় সত্য বললেন, তাই আমিও আপনাকে সত্যটা জানাব। অন্তত যতটা জানানো সম্ভব ততটা জানাব। সোজাসুজি বলি, আমি মগধের রাজকর্মচারী। আমরা এক হত্যাকারীর খোঁজ করছি যে এই বিশেষ বাণ ব্যবহার করে।
পিতাপুত্র কিছুটা চমকাল। বাণটা হাতে নিয়ে সেটার উপর এমনভাবে হাত বোলাতে লাগল যেমন পোষা ময়নার গায়ে মানুষ হাত বুলিয়ে দেয়। অনেকটা শিক্ষকের ভঙ্গিতে বলল,
— সাধারণ বাণের ফলায় খাঁজ থাকে যাতে তা শিকারের শরীর থেকে টেনে বের করে আনাটা পীড়াদায়ক হয়। মানে শরীরে বিদ্ধ থাকা ফলা বের করার সময়ে খাঁজে লেগে শরীরের ধমনী, মাংস কেটে বেরোয়। কিন্তু এই বিশেষ বাণে ফলা নেই। মাথার সঙ্গে লাগানো সামান্য লোহার অংশ ঘষে ঘষে সুচালো করা। এই তিরটি ঠিক তির নয়, যেন বড়ো একটি শলাকা। কেন জানেন?
— কেন?
— কারণ আমায় যে এই বাণ বানাতে বলেছিল সে এভাবেই বানাতে বলেছিল। কেন এই বাণের ফলার প্রয়োজন নেই জানেন? যাতে এই শলাকার মতো ফলার মাথায় সহজেই সামান্য বিষ লাগিয়ে দেওয়া যায়। এই বাণ একবার কারুর শরীরে বিদ্ধ হলেই তার মৃত্যু অবধারিত। তাই টেনে বের করে আনার সময়ে শিকারকে অতিরিক্ত যন্ত্রণা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, শিকার ততক্ষণে যমের দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছে।
চমকাল শশাঙ্ক। প্রশ্ন করল,
— আপনি জানতেন যে, এই তিরের মাথা বিষে চুবিয়ে ব্যবহার করার হয়?
— জানতাম না, কিন্তু অনুমান করেছিলাম। তা ছাড়া এধরনের তির বানাতে দেওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু, আমি একজন অস্ত্রনির্মাতা। ক্রেতার ইচ্ছামতো অস্ত্র বানিয়ে দেওয়াই আমার ধর্ম। কোন কাজে তা ব্যবহার হচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব আমার নয়।
— কিন্তু, এই তিরে বিশেষ কী আছে যা শুধু আপনিই বানাতে পারেন?
মৃদু হাসল বাবাক। বলল,
— ফলা না থাকায় এই বাণের ক্ষেত্র কমে যায়, যার ফলে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর হাওয়ার সঙ্গে ঘর্ষণ কম হয়। এতে হাওয়ায় ছুটে যেতে থাকা শরের গতি হ্রাস হয় না। এর ফলে এই বাণ সাধারণ শরের থেকে বেশি দূর অবধি উড়ে যেতে পারে। তিরন্দাজের শিকারের পরিসর অনেক বেড়ে যায় এই বাণের ক্ষেত্রে। কিন্তু এর ফলে একটি সমস্যা হয়।
— কী সমস্যা?
— ভারসাম্য! সাধারণ বাণের ক্ষেত্রে ফলার ওজনের সঙ্গে সমতা এনে দেয় উলটোদিকে লাগানো পালকযুক্ত লোহার এই খাঁজযুক্ত অংশ, যার মধ্যে ধনুকের গুণ ঢুকে যায়। কিন্তু এই বাণের ক্ষেত্রে ফলা না থাকায় দু-দিকের ভার সমান হতে পারে না, যার ফলে এমনিতে এই বাণ ব্যবহারের অযোগ্য বলা চলে। কিন্তু আমি এর সমাধান বের করি।
— সমাধান?
— হ্যাঁ মহাশয়, সমাধান। এই তিরের মাথার দিকে, যেখানে লোহার অংশ শেষ হয়েছে সেখানে এই লাল মোটা সুতো জড়ানো লক্ষ করেছেন? কী ভেবেছেন? এটা শুধুমাত্র অলংকার? না মহাশয়, না। এর বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। শুনে দেখুন, এই সুতোয় ঠিক তেরোটা প্যাঁচ আছে প্রতিটি বাণে। এই মোটা ভারী সুতোই সমতা আনে ল্যাজার দিকের ভারের সঙ্গে। দেখুন।
বাবাক নিজের ডান হাতের তর্জনীর উপর বাণটার মধ্যভাগ রেখে সেটাকে ছেড়ে দিল। বাণ সুন্দরভাবে ঠিক দাঁড়িপাল্লার মতো দোল খেয়ে সোজা হয়ে গেল অনুভূমিকভাবে।
একটি বাণ নির্মাণের মধ্যে যে এতখানি বৈজ্ঞানিক কারিগরি থাকে তা জেনে শশাঙ্ক বিস্মিত হল। কিন্তু দ্রুত আসল কথায় ফিরে এল,
— আপনাকে এই বাণ কে বানাতে দিয়েছিল?
দু-দিকে ঘাড় নেড়ে বাবাক বলল,
— চিনি তাকে। একজন যুবক। যোদ্ধার মতো চেহারা। নাম বলেছিল শঙ্কুমণি।
বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল শশাঙ্ক। তারপর হেসে উঠল,
— শত্রুর কৌতুক জ্ঞানের প্রশংসা না করে পারলাম না। শঙ্কুমণি, শকুনির আসল নাম। আপনাকে যে যোদ্ধা এই বাণ বানাতে দেয় সে যে-ই হোক, শকুনি নয়। ওটা ভুয়ো নাম, বাবাক মহাশয়। বাদ দিন। আমায় বলুন আপনি কি বর্তমানে সেই ব্যক্তির জন্যে তির বানাচ্ছেন?
— আজ্ঞে, হ্যাঁ।
বলে উঠে দাঁড়াল বাবাক। ভেতরের ঘর থেকে ভারী একটি কাঠের পেটি এনে মেঝেতে নামিয়ে রাখল। ডালা খুলতেই ভেতরে এক-শো মতো বাণ দেখা গেল। সবকটাই অবিকল শশাঙ্কর হাতে ধরা বাণের মতো দেখতে। ফলাহীন তীক্ষ মাথা, তার পরেই লাল সুতো জড়ানো।
বাবাক বলল,
— আগেরবার দেড়শো বাণের দাম দিয়ে গিয়েছিল। এখানে এক-শোর বেশি আছে। আরও খান কুড়ি মতো বানানো বাকি।
তার মানে শীঘ্রই তার আসার কথা?
— তাই তো আশা করা যায়। এসে সে যেকোনো একটা তির চালিয়ে পরীক্ষা করে নেয় আগে।
— সাধু।
কিছুক্ষণ ভেবে শশাঙ্ক প্রশ্ন করল,
— তাকে দেখতে কেমন?
— সে এই দেশেরই লোক। লম্বা, চওড়া, পেশিবহুল যোদ্ধার মতো চেহারা। কাঁধ অবধি কালো চুল।
— চেহারায় বিশেষ কোনো কিছু যা দিয়ে লোকটিকে চিহ্নিত করা যায়?
— হ্যাঁ, বাম গালে বড়ো একটা কাটা দাগ আছে। কপাল থেকে, চোখ দিয়ে নেমে গোটা গাল জুড়ে। আগে যুদ্ধে কোনো তরবারির আঘাতের চিহ্ন ওটা।
— বেশ। শেষ প্রশ্ন, আপনি ছাড়া যে অন্য কেউ এই বিশেষ বাণ বানাতে পারে না, সেটা বুঝলাম। কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত যে, এই যে পুরুষটি আপনার থেকে বাণ নিয়ে যায় সে-ই একমাত্র সেই বাণ ব্যবহার করে? এমনও তো হতে পারে যে, একদল তিরন্দাজ আছে যারা এই বাণ ব্যবহার করে!
অসম্মতি প্রকাশ করে দু-দিকে মাথা নাড়ল বাবাক। বলল,
— না, না। এই বাণ চালানো খুবই কঠিন। একমাত্র এক অতি কুশল ধনুর্ধর ব্যতীত কেউ এই বাণ ব্যবহার করতে পারবে না। তাও বহুদিনের অভ্যাসের পরেই তা সম্ভব। তাই আমি নিশ্চিত যে, এই বাণ একমাত্র সেই যুবক যোদ্ধাই চালায় এবং সে-ই আপনাদের কাঙ্ক্ষিত হত্যাকারী।
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে শশাঙ্ক বলল,
— বেশ। পরেরবার সে এখানে আপনার থেকে এই তির ভরতি পেটি নিতে এলেই আমাদের হাতে ধরা পড়বে। আপনার গৃহের বাইরে আমরা প্রতি প্রহরে সর্বক্ষণ নজর রাখব। শিকারি খুব শিগগিরই শিকার হবে, ধরা দেবে আমাদের ফাঁদে।
১৭.
নাগর নগরের দক্ষিণে বৈদ্য চক্রাচার্যর গৃহ। গৃহে আজ শোকের ছায়া। কিছু প্রতিবেশী ও আত্মীয় গৃহের উঠোনে বসে আছেন এবং নিজেদের মধ্যেই মৃদুস্বরে কথা বলছেন। ভিতর থেকে স্ত্রীলোকের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
রাজরথ এসে থামতেই কয়েক জন লোক এগিয়ে এল। চিত্রবর্মাকে দেখে তাঁদের একটাই প্রশ্ন ছিল,
— মৃতদেহ কখন পাওয়া যাবে?
চিত্রবর্মা উত্তর দিলেন,
— একটু বাদেই সৈনিকরা নিজেরাই মরদেহ এখানে পৌঁছে দিয়ে যাবে। আমি নিজে তাদের এই নির্দেশ দিয়েছি। আপনারা দয়া করে আর সামান্য ধৈর্য ধরুন। মৃতদেহ পরীক্ষা শেষ হয়েছে বলেই খবর পেয়েছি ইতিমধ্যে। আমরা চক্রাচার্যর পরিবারকে জানাতে এসেছি।
হাতজোড় করে চিত্রবর্মা এগিয়ে গেল গৃহের দিকে, তার পিছনে চাণক্য ও জীবসিদ্ধি।
ভিতরে ঢুকে তাঁরা দেখলেন এক বৃদ্ধার কাঁধে মাথা রেখে এক স্ত্রীলোক সর্বহারার কান্না কেঁদে চলেছে। তার পাশেই একটি দশ অথবা এগারো বছর বয়সি ছোটোছেলে বসে। চাণক্য ও জীবসিদ্ধি অনুমান করতে পারলেন যে, এ-ই বৈদ্যর সদ্যবিধবা স্ত্রী।
এই পরিস্থিতিতে মহিলাকে কিছু জিজ্ঞাসা করা সম্ভব নয় বুঝেই চাণক্য একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শোকগ্রস্ত মহিলা তাঁদের উপস্থিতি টেরও পেলেন না। তবে চিত্রবর্মাকে দেখে মহিলার পাশে বসে থাকা ছেলেটি উঠে এল। অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করায় ছেলেটিরও চোখ লাল। চিত্রবর্মাকে প্রণাম করে বলল,
— বাবার মৃতদেহ কখন আনতে পারব, যুবরাজ?
— তোমাদের কষ্ট করতে হবে না, ভগীরথ। আমার লোকেরা দেহ নিয়ে আসবে। চক্রাচার্যকে রাজকীয় সম্মানে শেষ বিদায় জানানো হবে। আমি তোমাদের পাশে আছি।
— অজস্র ধন্যবাদ।
— আমার সঙ্গে যাঁরা এসেছেন তাঁরা খুব পণ্ডিত মানুষ, ভগীরথ। ওঁরা তোমার মাতাকে কিছু প্রশ্ন করতে চান। তোমার পিতার মৃত্যুর বিষয়ে সাহায্য করতে এসেছেন।
ছেলেটি একবার চাণক্য ও জীবসিদ্ধির দিকে দেখল, তারপর নিজের মায়ের দিকে দেখল। তাঁদের উদ্দেশ করে বলল,
— ব্রাহ্মণদেব, ক্ষমা করবেন, কিন্তু আমার মাতাকে এখন প্রশ্ন করে লাভ হবে না।
চাণক্য এগিয়ে এসে ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে বললেন,
ওঁকে বিব্রত করার প্রয়োজন নেই। তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?
— করুন।
— তোমার পিতা কি কখনো তোমায় বা তোমার মাতাকে কিছু বলেছিলেন?
— কী বলবেন?
ছেলেটি ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল। চাণক্য বুঝতে পারলেন এভাবে হবে না। প্রশ্ন পালটে জিজ্ঞেস করলেন,
— গত দু-দিনে তিনি কী করছিলেন, বা, তাঁর সঙ্গে কে কে দেখা করতে এসেছিল বলতে পারো?
— পিতা গত দু-দিন বাড়িতেই ছিলেন। প্রচুর পড়াশুনা করছিলেন কিছু একটা নিয়ে। এক-দুইজন মানুষ এসেছিলেন বিকালের দিকে ঔষধি নিতে। বাকি সময়ের কথা বলতে পারি না, কারণ আমি পাঠশালায় ছিলাম।
— বৈদ্য মহাশয় কী বিষয়ে পড়াশুনা করছিলেন বলতে পারো?
— না, তা আমি বলতে পারি না। পিতার কাজ আমি বুঝি না… বুঝতাম না।
শেষ কথাটা বলার সময়ে গলা আটকে এল ছেলেটির। চাণক্য বললেন,
— কী বিষয়ের পুস্তক তিনি পড়েছিলেন জানো? বা, দেখাতে পারো?
ছেলেটি পাশের কক্ষে হাঁটা দিল। তার পিছু পিছু তারা তিনজন ঢুকল। গোটা ঘরে শুধু একটি আসন, একটি চারপায়া পাঠ করার নীচু মেজ আছে। বাদবাকি পুরো ঘর শুধুই চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক পুথিতে ভরা। পড়ার মেজ আর আসনের আশেপাশেই অন্তত খান পঞ্চাশ পুস্তক রাখা। চাণক্য একে একে সেগুলো হাতে নিয়ে দেখলেন সেগুলোর বিষয়বস্তু। অবশেষে ঘাড় নেড়ে বললেন,
— নাহ্, এভাবে কিছুই অনুমান করা যাবে না। আমরা আসি তবে, ভগীরথ। তোমার জন্যে এই মুহূর্তে আমার কাছে সমবেদনা ছাড়া কিছু দেওয়ার নেই। তবে যদি বিষ্ণু চান, তোমার পিতার হত্যাকারীকে তোমার সামনে হাজির করব।
.
গৃহ থেকে বেরিয়ে এসে চিত্রবর্মা বললেন,
— আপনারা ফিরে যেতে চাইলে যান রথ নিয়ে। আমি এখানেই থাকি। আপনারা পৌঁছে শুধু আমার জন্যে রথ ফেরত পাঠিয়ে দেবেন।
— ধন্যবাদ, আর্য।
.
পথে চাণক্য একটাও কথা বললেন না। জীবসিদ্ধিও জিজ্ঞেস করল না। রথ থেকে নেমে মহলে ঢোকার সময়ে চাণক্য বললেন,
— বৈদ্য কী বিষয়ে গত দু-দিন অধ্যয়ন করেছেন সেটা লক্ষ করেছ, জীবসিদ্ধি?
— হ্যাঁ। মৃতদেহর পরীক্ষানিরীক্ষা বিষয়ক পুস্তক সবক-টি। কিন্তু, তা থেকে তো এটা বোঝা সম্ভব নয় আচার্য তিনি কী জানতে চাইছিলেন।
— হুমম। কিন্তু এটা থেকে একটা বিষয় বোঝা সম্ভব যে, আমার অনুমান ভুল ছিল না। বৈদ্যর হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, জীবসিদ্ধি। দু-দিন আগে আলোচনায় তিনি এমন কিছু সূত্র পেয়েছিলেন যা তিনি পুনর্বার খতিয়ে দেখতে চাইছিলেন। এবং, সেটিই সম্ভবত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু সমস্যা হল, যেখানে একমাস পূর্বেই মৃতদেহ ভস্ম হয়ে গিয়েছে সেখানে তিনি কী এমন জরুরি তথ্য পাওয়ার আশা করছিলেন? আর সেটি তিনি কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তি, যে সম্ভবত তাঁর হত্যাকারী, তাঁকে বলতে গেলেনই-বা কেন?
.
কথার মাঝেই চাণক্য কক্ষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। নিজের কক্ষে ঢুকে চাণক্য বললেন,
— জীবসিদ্ধি, শ্রীশৈলকে বলো আমি ওই তিরন্দাজ প্রতিযোগীদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।
— বেশ।
বলে জীবসিদ্ধি বেরিয়ে যাচ্ছিল, চাণক্য পিছু ডেকে বললেন,
— আর শোনো, আমার জন্যে কিছু মিষ্টান্ন বানাতে বলো আমাদের মগধের ভৃত্যকে। আমার মস্তিষ্ক কাজ করছে না। ওহে জীবসিদ্ধি শুনলে….?
শেষ কথাগুলো ইচ্ছে করেই শুনতে না পাওয়ার ভান করে জীবসিদ্ধি দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল।
১৮.
একে একে প্রত্যেক প্রতিযোগীর সঙ্গে কথা বললেন চাণক্য। কিন্তু, তাদের কথা থেকেও নতুন কোনো তথ্যই পাওয়া গেল না। শেষ যাকে ডাকা বাকি ছিল সে প্রতিযোগিতার বিজয়ী হওয়ার দাবিদার। সে বিজয়ী হয়নি কারণ মহারাজের উপর আক্রমণের পরেই প্রতিযোগিতা স্থগিত করে দেওয়া হয়।
জীবসিদ্ধি ছাড়াও এই সময়ে চাণক্যর কক্ষে চিত্রবর্মা ও শ্রীশৈলও উপস্থিত। শেষজনকে যখন ডাকা হল ততক্ষণে চাণক্যও হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবুও শেষ প্রতিযোগী ধনুর্ধরকে ডাকার নির্দেশ দিলেন তিনি। তামাটে বর্ণের এক দক্ষিণ ভারতীয় পুরুষ এসে প্রবেশ করে উপস্থিত সকলকে প্রণাম করল।
— প্রণাম।
— প্রণাম। আপনার নাম?
— বিন্দু।
— আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, যেদিন আপনি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছিলেন সেই সময়েই মহারাজের প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়?
অধৈর্য ভঙ্গিতে বিন্দু বলল,
— আমি জানি, ব্রাহ্মণদেব। এবং, তারপর থেকে আমাদের সকলকে বহুবার রাজসৈনিকরা প্রশ্ন করেছে, রীতিমতো এখানে গৃহবন্দি করে রেখেছে গত একমাস। আমি জানি না আপনার আলাদা করে আর কী জানার থাকতে পারে। আমরা মুক্তি চাই, যুবরাজ। দয়া করে এবার আমাদের সকলকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দিন। আমার পরিবার আমার অপেক্ষায় আছে।
শেষ কথাগুলো চিত্রবর্মাকে উদ্দেশ করে বলা হল। চিত্রবর্মা কিছুটা অপ্রস্তুতে পড়লেন। চাণক্যই তাঁর হয়ে বললেন,
— নিশ্চয়ই ফিরবেন, হে ধনুর্ধর। কিন্তু প্রতিযোগিতার ফলাফল অমীমাংসিত রেখে ফেরাটা যে রাজ্যের পক্ষে অসম্মানজনক। আপনিও তো বিজয়ী হতেন। প্রতিযোগিতার শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর আপনিই ছিলেন শুনলাম। তাই যুবরাজ আর মহামন্ত্রীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল একটু আগেই। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, আগামী কয়েক দিন বাদেই রাজ্যে আবার উৎসব আছে। প্রতিষ্ঠা দিবস। এদিকে মহারাজও আরোগ্যের পথে। তাই আমরা ভাবছিলাম আপনারা আরও কয়েক দিন যদি অপেক্ষা করে যান, তবে একবারে আগের প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণ সেইদিনই আমরা করে দিতাম।
এই কথায় লোকটির মুখের মেঘ কিছুটা কাটল। বলল,
— সেটা তো ভালো প্রস্তাব। এমনিতেই যখন দেরি হয়েই গেল একমাস, আর কয়েক দিন দেরি করাই যায়। মহারাজের আরোগ্যের কথা শুনে হলাম। সাধু।
— সাধু। কিন্তু, অপরাধী যেহেতু এখনও অধরা, তাই আপনাকে আরও একবার আমি বিরক্ত করতে চাই। যদি সেদিনের ঘটনা আপনার স্মৃতি থেকে পুনরায় আমায় বলেন তবে বড়ো ভালো হয়।
একটু ভেবে নিয়ে গুছিয়ে সম্পূর্ণ ঘটনার পুনরাবৃত্তি করল বিন্দু। এর কথাও আর সকলের মতোই হুবহু এক। কেউই কোনো ধনুর্ধর বা সৈনিকদের মধ্যে
কাউকে মহলের দিকে বাণ নিক্ষেপ করতে দেখেনি।
চাণক্য কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ভাবলেন। তারপর বললেন,
— আমি একটা পরীক্ষা করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু সেটা করতে আপনার সাহায্য প্রয়োজন, বিন্দু। আপনি কি আমায় সাহায্য করবেন?
— আমার সাহায্য প্রয়োজন? বেশ, বলুন কী সাহায্য, ব্রাহ্মণদেব?
চাণক্য শ্রীশৈলর দিকে ফিরে বললেন,
— আর্য, আমি একটি পরীক্ষা করতে চাই। খড়, তুলো আদি দিয়ে মোটামুটি একটি মানবাকৃতি পুতুল বানাতে কতক্ষণ লাগবে আপনাদের কর্মচারীদের? পুরো পুতুল লাগবে না, কোমর অবধি হলেই হবে।
কিছুটা বিস্মিত হয়ে বৃদ্ধ মন্ত্রী উত্তর দিলেন,
— তা, এই প্রহরের মধ্যেই হয়ে যাবে।
— বেশ, বেশ। তাহলে এখনই তা বানানো শুরু করার নির্দেশ দিন। তারপর সেটিকে একটি খুঁটির উপর বসিয়ে যেন মহলের প্রাঙ্গণের দিকের ওই বারান্দায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, ঠিক যেখানে মহারাজ সেদিন দাঁড়িয়ে ছিলেন। ব্যাপারটা আপনি দেখে-শুনে করিয়ে নিতে পারবেন, আশা করি?
— উম… মানে… হ্যাঁ, তা হয়ে যাবে। কিন্তু, আপনি কী করতে চাইছেন, আচার্য?
চাণক্য বিন্দুর দিকে ফিরে বললেন,
— আমি চাই আপনি পুতুলটি লক্ষ করে তির নিক্ষেপ করুন।
বিন্দু শঙ্কিত হয়ে বলল,
— আচার্য, আমি নির্দোষ! আমি কিছু করিনি। দেখুন, আমি পূর্বে অঙ্গরাজ্যের সেনাতে ছিলাম। অবসর নিয়েছি কয়েক বছর পূর্বে। আমি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতে বা বিভিন্ন জায়গায় তিরন্দাজির খেলা দেখিয়ে উপার্জন করি। আপনি চাইলে আমায় দেওয়া অঙ্গরাজের প্রশংসাপত্র দেখতে পারেন। আমি বুঝতে পারছি যে, সেদিনের সেরা ধনুর্ধর বলে আপনি আমাকেই সন্দেহ করছেন…।
হাত তুলে তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে চাণক্য বললেন,
— আপনি ভুল করছেন, বিন্দু। আপনাকে অন্যায়ভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করার কোনো অভিপ্রায় নেই। চণক পুত্র চাণক্য তার স্বর্গীয় পিতার নামে শপথ করে বলছে যে, আমি কোনো নির্দোষ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেব না। আমি শুধুমাত্র আপনার কাছে সাহায্য চাইছি মাত্র। সেইরকম মনে করলে আপনি এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নাও করতে পারেন। কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
চাণক্যর কথা বলার ভঙ্গিতে যে আন্তরিকতা ছিল তাতে বিন্দু আশ্বস্ত হল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— বেশ। আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি তা বলবেন।
— অতি উত্তম। ধন্যবাদ। আপনি এখন বিশ্রাম নিন। পুতুলটি বানানো হয়ে গেলেই আপনাকে ডেকে নেব।
***
রোচক গত কয়েক দিন ধরেই পৌরব রাজ্যের মধ্যে দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে। বারংবার পেছন ফিরে দেখছে কেউ পিছু নিচ্ছে কি না। কেউ নেই। কিন্তু ও জানে যে, ও একা নয়। ওই নিপুণক লোকটা আর সেনাধ্যক্ষ সিংহরণ বাজপাখির মতোই কোনো-না-কোনো কোণ থেকে তার উপর নজর রেখে চলেছে। কারণ এই কয়েক দিনে রোচক বহুবার আচমকা কোনো ভরা বাজারে বা নির্জন রাত্রে হঠাৎই দেখতে পেয়েছে সেই দু-জনকে। তাদের দৃষ্টি ওকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ‘কোনো চালাকি নয়। নির্দিষ্ট পথ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করলেই গর্দান যাবে।’
তাই আপাতত পালানোর আশা ছেড়ে নির্দেশমতো পত্র পাটলিপুত্রে পৌঁছে দেওয়াই একমাত্র উপায় ধরে নিয়ে রোচক চলছে। নগরের প্রবেশপথে কড়া প্রহরা দেখে ঘোড়া থামাতে হল রোচককে। অনেক লোক সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। একে একে সকলের পরিচয়পত্র দেখে তবেই প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে প্রহরীরা। কিছুটা বিস্মিত হল রোচক। হঠাৎ এতটা কড়া প্রহরার কারণ কী? মনে মনে ভয় পেল ও। কোনো বিপদ হবে না তো?
কথাটা ভাবার পরক্ষণেই দুটি ঘোড়া সারি ভেঙে ওর পাশে এসে দাঁড়াল। তাকিয়েই নিজের দু-পাশে নিপুণক আর সিংহরণকে দেখতে পেল সে। নিপুণ ক আশ্বাসে, ভঙ্গিতে ইশারা করে বোঝাল যে কোনো ভয় নেই। রোচককে ওরা আগেই একটা ভুয়ো পরিচয়পত্র দিয়েছে বটে। কিন্তু তবুও কেন যেন বিপদের গন্ধ পেল রোচক
— শুনতে পাচ্ছেন না? এগিয়ে আসুন।
চেঁচিয়ে প্রহরী তাড়া দিল। রোচক সত্যিই শুনতে পায়নি। ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে গেল। অন্য এক প্রহরী হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল কিছু। রোচক শুনতে না পেলেও ঠোঁট পড়তে পারে। বুঝল পরিচয়পত্র দেখতে চাইছে। সভয়ে নিজের পরিচয় ভূর্জপত্রটি এগিয়ে দিল সে। সেটি হাতে নিয়ে দেখতেই প্রহরীর ভ্রূ কুঁচকে গেল। পাশেরজনকে ডেকে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কিছু বলল যা রোচক বুঝতে পারল না। কিন্তু কিছু একটা যে গণ্ডগোল হয়েছে তা অনুমান করতে বিলম্ব হল না।
একমুহূর্ত আর দেরি না করে উলটোদিকে ঘোড়া ছোটাতে গেল। কিন্তু, সে- সুযোগ পেল না। এক প্রহরীর ছুড়ে দেওয়া বল্লম ওর কাঁধে আঘাত করল। মুখ থেকে একটা অস্পষ্ট যন্ত্রণা গোঙানির মতো শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেল ঘোড়া থেকে। চারজন প্রহরী এসে জাপটে ধরল ওকে। একজন প্রহরী এসে ওর __অঙ্গবস্ত্রের ভাঁজে খুঁজতে শুরু করল। লুকোনো ভাঁজ থেকে দুটি পত্র পেল। একটি
পত্র খুলে দেখতেই উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করল,
— এই তো! এটিতে সিন্ধুদেশের মুদ্রা! খবর সঠিক ছিল! এই সেই ভিনদেশি গুপ্তচর!
টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে রোচক অসহায় দৃষ্টিতে খুঁজল সেই দু-
জনকে যাদের নির্দেশে সে আজ এখানে এসেছে। একমুহূর্তের জন্যে ভিড়ের মধ্যে সে নিপুণক আর সিংহরণকে দেখতেও পেল। ও শেষবারের জন্যে আশা করল যে, হয়তো তারা দু-জন এগিয়ে আসবে তাকে উদ্ধার করতে। তার জন্যে না হোক, অন্তত এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রের খাতিরে তারা এগিয়ে আসবে ওকে সাহায্য করতে। কিন্তু পরমুহূর্তে তারা দু-জন ভিড়ের সঙ্গে মিশে অদৃশ্য হল।
তখনই সত্যিটা উপলব্ধি করতে পারল রোচক। সব মিথ্যে ছিল! ওকে মুক্তির আশ্বাস, ওর অপরাধ ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি, এই পরিচয়পত্র— সব কিছুই মিথ্যে। বিশাল এই রাজকীয় চতুরঙ্গের খেলায় সে একটি সামান্য গুটিমাত্র, যাকে বিপক্ষের হাতে বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই খেলায় নামানো হয়েছে।
১৯.
প্রাঙ্গণের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে মহলের তিনতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছেন চাণক্য। সেখানে মাঝামাঝি জায়গায় একটি পুতুল রাখা হয়েছে। তাড়াহুড়োয় বানানোর ফলে সেটি রুক্ষ ও কুরূপ হয়েছে।
প্রাঙ্গণে চাণক্য ছাড়াও শ্রীশৈল, চিত্রবর্মা এবং ধনুক হাতে বিন্দু দাঁড়িয়ে আছে। সেইসঙ্গে কয়েক জন প্রহরী। জীবসিদ্ধিকে চাণক্য তিনতলার বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছেন। তার কাজ গোটা ব্যাপারটা উপর থকে নজর করা। শ্রীশৈল প্রশ্ন করলেন,
— ঠিক আছে তো, আচার্য?
চাণক্য বারান্দায় দাঁড়ানো মুর্তিটির দিক থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিলেন,
— হুমম।
সূর্যের তেজ আজকে কম, তার উপর উত্তর থেকে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। তাই অঙ্গবস্ত্রের উপর সকলেই পশমের আলোয়ান জড়িয়ে নিয়েছে। হঠাৎ একটু জোর হাওয়া দেওয়ায় নিজের আলোয়ানটিকে শরীরের উপর আরও একটু ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে চাণক্য বিন্দুর দিকে ফিরলেন। বিশাল প্রাঙ্গণের অনেকটাই দূরে সে দাঁড়িয়ে, তাই চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— বিন্দু, আপনি তৈরি?
— হ্যাঁ, আচার্য।
— বেশ। মনে রাখবেন, ওই পুতুলের কণ্ঠের এইখানে নিশানা করবেন।
আঙুল দিয়ে নিজের গলার বামে ইঙ্গিত করলেন চাণক্য। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বিন্দু ধনুকে বাণ চড়াল। তিরসহ ধনুকের গুণ যতটা সম্ভব পেছনে টেনে ধরল। এক চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত নিশানা স্থির করল। এবং, বাণ নিক্ষেপ করল। বাতাস কেটে বাণ উড়ে গেল এবং পুতুলে আঘাত করতেই পুতুল উলটে পড়ল বারান্দায়। নিজের মানসপটে চাণক্য যেন সেদিনের ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি হতে দেখলেন। কিন্তু, কোথায় যেন কিছু ভুল হচ্ছে। চাণক্যর মন বলছে কিছু একটা ভুল হচ্ছে।
চাণক্য চেঁচিয়ে জানতে চাইলেন,
— জীবসিদ্ধি, তির বিদ্ধ হয়েছে?
— হ্যাঁ, আচার্য।
— বেশ, এবার তবে দ্বিতীয় পরীক্ষা। জীবসিদ্ধি, মূর্তিটি পুনরায় আগের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দাও। তির বিদ্ধই থাক।
এই বলে চাণক্য প্রাঙ্গণের উঁচু, চওড়া প্রাচীরে ওঠার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁরা সকলেই অনেকগুলো সিঁড়ি ভেঙে প্রাচীরের উপর এসে দাঁড়ালেন। বেশ কয়েক জন সৈনিক সেখানে প্রহরা দিচ্ছে যারা চিত্রবর্মাকে দেখে অভিবাদন জানাল।
একইভাবে প্রাচীরের উপর থেকে আরও একবার বিন্দুকে দিয়ে মহলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা পুতুলটির উপর বাণ নিক্ষেপ করালেন চাণক্য। পুতুলটি আবার আগের মতোই পড়ে গেল।
প্রাচীর থেকে নেমে এসে চাণক্য মহলের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাকি তিনজনকেও সঙ্গে আসতে ইশারা করলেন। দ্রুতপায়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরের বারান্দায় উপস্থিত হলেন চাণক্য। দেখলেন মূর্তিটা চিত হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। গলার বামদিকে দুটি তির বিঁধে আছে।
— জীবসিদ্ধি, পুতুল নাড়াওনি তো?
— নাহ্, আচার্য।
— হুমম।
পুতুলটার কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়লেন চাণক্য। বিদ্ধ হওয়া তির দুটি দেখলেন ভালো করে। ততক্ষণে পেছনে অন্য তিনজনও এসে পড়েছে। শ্রীশৈল বলে উঠলেন,
— ঠিক এভাবেই! হ্যাঁ, একইভাবে মহারাজ পড়ে ছিলেন। উফ, কী ভয়ংকর!
চিত্রবর্মা বললেন,
— নিশানা একদম যথাযথ লেগেছে।
এই কথায় একটু অস্বস্তিসূচক নিশ্বাস ফেলল বিন্দু। জীবসিদ্ধি মনে মনে ভাবল যে, বেচারা এখনও নিশ্চিত হতে পারছে না যে, এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করল নাকি আরও বেশি জড়িয়ে গেল। এখন বোধ হয় নিজের সঠিক নিশানা লাগানোর কলার জন্যে তার আফশোসই হচ্ছে। এরকম নিশানা লাগিয়ে ও বোধ হয় নিজেকে সন্দেহের তালিকায় আরও উপরে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু জীবসিদ্ধি লক্ষ করল চাণক্যর কপালে ভ্রূকুটি। কিছু একটা চিন্তা করছেন তিনি। কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না। উঠে দাঁড়িয়ে সকলকে প্রণাম জানিয়ে বললেন,
— সময় ব্যয় করে আমার এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্যে সকলকে অনেক ধন্যবাদ। আর আমি আপনাদের সময় নষ্ট করব না। শুধু আমি বিন্দুকে সামান্য কিছু প্রশ্ন করতে চাই। আর্য, আপনারা উপস্থিত না থাকলেও হবে।
বিন্দুর অস্বস্তি আরও বাড়ল। চিত্রবর্মা আর শ্রীশৈল বুঝতে পারল যে, আসলে চাণক্য তাদের সামনে প্রশ্ন করতে চাইছেন না। তারা বেরিয়ে গেল। চাণক্যর সঙ্গে শুধু জীবসিদ্ধি আর বিন্দু রইল।
.
— এখানে বড্ড ঠান্ডা বাতাস বইছে। ভেতরে আসুন।
ভেতরে ঢুকে চাণক্য প্রশ্ন করলেন,
— আপনার ধনুর্বিদ্যা অসাধারণ! আপনি বাস্তবিকই গুণী মানুষ। আচ্ছা একটা কথার উত্তর দিন, তিরন্দাজি কি বাতাসের গতি ও অভিমুখের উপর নির্ভর নয়?
— আজ্ঞে হ্যাঁ, আচার্য।
— হুম। এই একটু আগে, মানে, যখন তির নিক্ষেপ করলেন তখন কি বাতাস আপনার পক্ষে ছিল, না, বিপক্ষে?
— পক্ষে। দু-বারই বাতাসের অভিমুখে তির নিক্ষিপ্ত হয়েছে। বাতাস মহলের দিকেই বইছে এখন।
— আর যদি তা না হত?
— তাহলে নিশানা লাগানো আরও কঠিন হত।
— হুমম। আপনার বাণের ফলার অর্ধেক অংশ পুতুলের কণ্ঠে বিদ্ধ হয়েছে। আপনি কি নিজের সম্পূর্ণ বলে তির নিক্ষেপ করেছিলেন?
— আজ্ঞে, হ্যাঁ। বাতাসের অভিমুখে বাণ তার সম্পূর্ণ গতিতে গেলেও দূরত্বের কারণে এর চেয়ে বেশি জোরে আঘাত করবে না।
— হুমম। কিন্তু, যদি বাণটি অন্য ধরনের হয়?
— মানে?
জীবসিদ্ধিকে ইশারা করতেই জীবসিদ্ধি কাপড়ের ঝোলা থেকে একটি বাণ বের করে আনল। সেই বিশেষ বাণ যা দিয়ে মহারাজকে হত্যা করা হয়েছে।
সেটি হাতে নিয়ে ভালোভাবে দেখে অবাক হল বিন্দু। বলল,
— এরকম অদ্ভুত বাণ আমি আগে দেখিনি। তবে অনেক তিরন্দাজ তার নিজের সুবিধামতো বাণ বানিয়ে নেয় বটে।
— এই বাণটির ক্ষেত্রে কী মনে হয়?
— এটি নিক্ষেপ করা কঠিন। আমায় এই বাণ দিলে আমি কোনোভাবেই নিশানা লাগাতে পারতাম না। এই বাণ হালকা হওয়ায় গতি হয়তো বেশি, কিন্তু এই দিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে দীর্ঘ অনুশীলন লাগে।
— যদি ধরে নিই যে, কোনো এক ধনুর্ধর এই বাণ ব্যবহারে কুশল। সে যদি আপনার মতো লক্ষ্যভেদ করত আজকে, তবে কি এই বাণ আরও অনেক বেশি প্রবেশ করত পুতুলের কণ্ঠে?
কিছুক্ষণ ভেবে, হাতে বাণটি নিয়ে ওজন আন্দাজ করে বিন্দু উত্তর দিল,
— সম্ভবত না। লক্ষ্যের থেকে দূরত্ব এতটা বেশি হওয়ায় সেটা সম্ভব না।
— পুতুলের জায়গায় মানব থাকলে কি সেটা আরও কম বিদ্ধ হত না?
— অবশ্যই, আচার্য। ঠিকই বলেছেন। যেকোনো প্রাণীর গলার নরম হাড়ও ওই তুলো আর খড় দিয়ে বানানো মূর্তির চেয়ে বেশি শক্ত। তাই সেইক্ষেত্রে তিরের ফলা আরও কম পরিমাণ বিদ্ধ হত শরীরে।
— হুমম।
চাণক্যর কপালের ভ্রূকুটি আরও গভীর হয়েছে। বললেন,
— অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি আসতে পারেন।
উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানিয়েও, বিন্দু বেরোতে কিছুটা ইতস্তত করছে দেখে জীবসিদ্ধি জিজ্ঞেস করল,
— কিছু বলবেন?
— হ্যাঁ… মানে একটা কথা হঠাৎ মাথায় এল।
— বলুন?
— আচার্য, আমি আমার এক বন্ধুর কাছে শুনছিলাম যে, পশ্চিমে নাকি তির নিক্ষেপ করার যন্ত্র বানানোর চেষ্টা চলছে। ধনুক নয়, যন্ত্রের সাহায্যে অনেক বেশি গতিতে তির নিক্ষেপ করা যাবে বলা হচ্ছে। সেইরকম কোনো যন্ত্র ব্যবহারে কিন্তু এরকম দূরত্বেও গভীর ক্ষত করা সম্ভব।
উত্তেজিত ভঙ্গিতে জীবসিদ্ধি বলে উঠল,
— যন্ত্র? শর নিক্ষেপ করার যন্ত্র?
— আজ্ঞে হ্যাঁ, মহাশয়।
চাণক্যকে কিন্তু খুব একটা উত্তেজিত মনে হল না। তিনি বিন্দুর উদ্দেশে বললেন,
— অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি অনেক সাহায্য করলেন।
.
বিন্দু বেরিয়ে যেতেই জীবসিদ্ধি উত্তেজিত ভঙ্গিতে চাণক্যর দিকে ফিরে বলল,
— আচার্য! শুনলেন আপনি? শর নিক্ষেপ করার যন্ত্র! নিশ্চিতভাবেই কোনো যন্ত্রের সাহায্যে হত্যা করা হয়েছে মহারাজকে। সেই কারণেই এই বাণ ফলা ছাড়িয়ে বাঁধা সুতো অবধি প্রবেশ করেছিল রাজার কণ্ঠে। যন্ত্রের সাহায্যেই এই অসাধারণ জোরে বিদ্ধ হয়েছে তির। এটাই তো আমাদের সমস্যার সমাধান!
চাণক্য কিছুক্ষণ ভাবলেশহীন মুখে জীবসিদ্ধির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
— তোমার তাই মনে হয়? কিন্তু তাহলেও তো প্রশ্নটা একই থেকে যাচ্ছে। হত্যাকারী সেই অদ্ভুত যন্ত্র কীভাবে সকলের অজ্ঞাতে ব্যবহার করল? সকলের সামনে একটি অদ্ভুত যন্ত্র বের করে তির নিক্ষেপ করল আর কেউ সেটা দেখতে কীভাবে পেল না?
জীবসিদ্ধি কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল,
— হতে পারে সেই যন্ত্র কোনো দৈনন্দিন ব্যবহারের বস্তুর মতোই দেখতে। তাই সহজেই সেটি গোপনে সকলের আড়ালে ব্যবহার করা যায়। নেহাতই নিরীহ দেখতে কোনো বস্তু যা আসলে কিনা একটি অস্ত্র। এটা কি সম্ভব নয়, আচার্য?
চাণক্যর কপালে ভ্রূকুটি। আবারও শুধু বললেন,
— হুমম।
