সোম-শাস্ত্ৰ – ১০

১০.

ধনানন্দ বসে আছেন চাণক্যর সম্মুখে। দু-জন একে অন্যের চোখে চোখ রেখে চেয়ে রয়েছেন। কেউ কথা বলা শুরু করেননি এখনও।

জীবসিদ্ধি চাণক্যর ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সতর্ক ভঙ্গিতে। সে ধনানন্দর তরফ থেকে আচমকা কোনো আঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে পারছে না। কারণ ধনানন্দর চোখের দৃষ্টিতে তীব্র আক্রোশ লুকোনোর কোনো চেষ্টা তিনি করছেন না। আর এই কক্ষে এই মুহূর্তে তারা তিনজন ব্যতীত কোনো সৈনিক নেই।

চাণক্য শাস্তভঙ্গিতে বসে আছেন তার চোখে চোখ রেখে। যেন দু-জন এক অদৃশ্য প্রতিস্পর্ধা লড়ছেন শুধুমাত্র দৃষ্টির মধ্য দিয়ে। কে আগে চোখ নামাবে সেটাই দেখার।

চোখ শেষ পর্যন্ত ধনানন্দকেই সরাতে হল। জীবসিদ্ধির কণ্ঠে আটকে থাকা নিশ্বাস এতক্ষণে বের হল। শরীরের পেশি সামান্য ঢিল দিল, তবে সম্পূর্ণ অসতর্ক সে হল না। সে বহু বছর ধরেই কোনোদিন সম্পূর্ণ অসতর্ক হয়নি।

জীবসিদ্ধি এতক্ষণে ধনানন্দর চোখ থেকে দৃষ্টি সরানোর সুযোগ পেয়ে তার বেশভূষার দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ পেল। রাজত্ব গেলেও, রাজকীয় মেজাজটা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন ধনানন্দ। তবে মাত্র কয়েক বর্ষেই অনেকটা বার্ধক্য ছাপ ফেলেছে তার উপর। সেটি পরাজয়ের গ্লানিতে নাকি অত্যধিক মদ্যপানে, তা বলা সম্ভব নয়।

মাথায় উষ্ণীষের মধ্যভাগে বড়ো একটি রত্ন খচিত। পরনে রেশমের পীতাম্বর অঙ্গবস্ত্র এবং ময়ূরকণ্ঠী বর্ণের ধুতি। দুইয়েরই উপর সোনালি জরির কাজ করা। কানে কুণ্ডল, হাতে বাজু এবং বালা, কণ্ঠে শোভা পাচ্ছে একাধিক হার। সব কিছুই স্বর্ণের। হাতের প্রতিটি আঙুলে অঙ্গুরি। তার মধ্যে বাম হস্তের একটি অঙ্গুরি বোধ হয় নতুন, কারণ সেটা ঢিলে; তার আঙুলে সঠিকভাবে বসেনি। আঙুলে দাগ থেকে বোঝা যায় তাতে ছোটো অঙ্গুরি ছিল, এখন বোধ হয় অনুষ্ঠানের কারণে বড়ো রত্নখচিত অঙ্গুরি পরেছেন সেই স্থানে। ধনানন্দর স্বর্ণ ও রত্ন প্রীতির কথা সকলেরই জানা। এর সঙ্গে পাদুকাতেও জরির কাজ করা।

ধনানন্দ অন্যদিকে চেয়ে আছেন, আর অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে ঢিলে অঙ্গুরীয়টি বার বার খোলাপরা করছেন বসে। মনে মনে শাপশাপান্ত করছেন নিঃসন্দেহে সামনে বসা চাণক্যকে। কক্ষের বাতাবরণের এই দম-বন্ধ-করা অবস্থা যেন জীবসিদ্ধি কক্ষে দাঁড়িয়ে টের পাচ্ছে। এখন কক্ষের একমাত্র বাতায়নটি খুলে দিতে পারলে সে খুশি হত।

চাণক্য প্রথম মুখ খুললেন,

— ধনানন্দ!

কোনোরকম সম্মানজনক সম্ভাষণ চাণক্য ব্যবহার করলেন না সম্মুখে ব্যক্তির উদ্দেশে। ধনানন্দর মুখে একটি রক্তিম আভা এক পলকের জন্যে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। শ্বেতমর্মরের মেঝের দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে, তিনি একই ভঙ্গিতে হাতের অঙ্গুরিটি নিয়ে খেলা করতে থাকলেন, যেন শুনতে পাননি চাণক্যের কথা।

চাণক্য পুনরায় বললেন,

— তুমি কি পুরো ঘটনা শুনেছ?

— নাহ্! তোমার প্রহরীরা আমায় রীতিমতো কক্ষে বন্দি করে রেখেছে! কিছুই জানি না! আমার কন্যার প্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করেছে তোমাদের মহলের কেউ! আর আমায় জোর করে কক্ষের বাইরে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না! আমি বার বার প্রশ্ন করতেও কেউই আমায় কিছু জানায়নি।

রাজকুমারীকে কেউ বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি ঠিক আছেন এবং সেই বিষে মারা গিয়েছে তাঁরই এক সখী, মধুবন! এবং, তাঁর দ্বিতীয় সখী কৃষ্ণকলি নিখোঁজ। তার খোঁজ করছে প্রহরীরা। সন্দেহ করা হচ্ছে সে-ই বিষ প্রয়োগ করেছিল।

রাগে ফেটে পড়লেন ধনানন্দ,

— সে কী! আমার কন্যাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে? আর এত বড়ো ঘটনার কথা আমি এই প্রথম তোমার মুখ থেকে কেন জানছি? আমাকে আগেই এই সংবাদ কেন জানানো হয়নি, চাণক্য?

আসনের কাঠের হাতলে মুষ্টি দিয়ে আঘাত করলেন ধনানন্দ। বললেন,

— আর তুমি বলছ ওই কৃষ্ণকলি বিষ দিয়েছে? মিথ্যা কথা! আমি বিশ্বাস করি না! কৃষ্ণকলি আমার কন্যার পরম সখী। আমি নিশ্চিত এই কুকর্ম মগধের কারুর কাজ! যেখানে আমার কন্যার জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেখানে আমি তার বিবাহ দেব না! শুনে রাখো তুমি চাণক্য! বেশিক্ষণ এভাবে তুমি আমাদের মুখ বন্ধ রাখতে পারবে না! অতিথিরাও জানবে সব ঘটনা। একথা অনুমান করতে কারুর অসুবিধা হবে না যে এই কাজ মগধের! বিবাহের অছিলায়, এ এক ঘৃণ্য হত্যার ষড়যন্ত্র!

— হুম।

চাণক্যর থেকে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া না পেয়ে, আরও জ্বলে উঠলেন ধনানন্দ। বললেন,

— আর এই নীচ, কুটিল ষড়যন্ত্র কার মস্তিষ্কপ্রসূত, তা সকলেই অনুমান করতে পারবে!

সময় নিয়ে দু-চুমুক মধু-পানীয় গলাধঃকরণ করে চাণক্য উত্তর দিলেন,

— অভিযোগ মেনে নিতাম, সকলেই মেনে নিত, যদি একা রাজকুমারীর উপর বিষ প্রয়োগের চেষ্টা হত

— অর্থাৎ?

— সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর খাদ্যেও বিষ প্রয়োগ করে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে!

ধনানন্দ আর যাই হোক, এমন একটি সংবাদ আশা করেননি। তাঁর ভ্রূ ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছে।

— চন্দ্রগুপ্তর উপর বিষ প্রয়োগ? এ মিথ্যে কথা!

— নাহ্। সেই কারণেই আমি পরীক্ষার সময়েই অমাত্য কৃষ্ণনাথের সঙ্গে তোমার বিশ্বাসপাত্র রাক্ষসকে উপস্থিত রেখেছিলাম। তাঁর উপস্থিতিতেই বিষ পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে বোধ হয় সাক্ষাৎ হয়নি তোমার। হলে তিনি নিজেই এই সংবাদ জানাতেন তোমায়। অতএব, ঘটনাটা আর শুধুমাত্র রাজকুমারীকে হত্যার চেষ্টা নয়, স্বয়ং সম্রাটকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। তাই অভিযোগের তির মৌর্যর প্রতি যদি ওঠে, তা সমানভাবেই নন্দদের দিকেও ওঠে। আমরা দু-পক্ষই একই তরণির যাত্রী।

ধনানন্দ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকলেন। চাণক্য বললেন,

— আমার কিছু প্রশ্ন আছে।

— আমি উত্তর দিতে বাধ্য নই!

— রাজকুমারীর কক্ষে আজ তিনজন অতিথি প্রবেশ করেছিলেন। প্রত্যেকেই যে সময় কক্ষে উপস্থিত ছিলেন, সেসময়ে আহারাদি সাজানোই ছিল। প্রত্যেকের সুযোগ ছিল বিষ প্রয়োগ করার। অতএব, সন্দেহ কিন্তু তোমার উপরেও পড়ে।

— বাহ্, বাহ্! সাধু, সাধু! মগধের কর্মচারী পানীয় বানাল! মগধের ভৃত্য তা কক্ষ পর্যন্ত নিয়ে এল, সাজিয়ে রাখল! মগধের সুরক্ষাব্যবস্থার মাঝে, মগধের রাজমহলের অন্দরে হত্যার চেষ্টা হল! আর সন্দেহের তালিকায় রইল তিন অতিথি এবং এক বাল্যসখী?

চাণক্যর ললাটে ভ্রূকুটি দেখা দিয়েই মিলিয়ে যেতে লক্ষ করল জীবসিদ্ধি। পরমুহূর্তে চাণক্য প্রশ্ন করলেন,

— তোমার এই কথা থেকে ধারণা হচ্ছে যে, এই বাকি দু-জন সাক্ষাৎপ্রার্থী কে তা তোমার জানা।

— হ্যাঁ। জানা। আমার আগে রাক্ষস কক্ষে এসেছিল তা তো দুর্ধরা নিজেই জানায় আমায়। আর, তার পর মলয়কেতু এসেছিল তাও শুনেছি আমার প্রহরীদের কাছেই। তারাও উপস্থিত ছিল মগধের প্রহরীদের সঙ্গেই, কক্ষের বাইরে।

— হুম। তো, বিষ কে দিয়েছে বলে তোমার সন্দেহ হয়?

— সবচেয়ে বেশি সন্দেহ তো আমার তোমার উপর হয়, আচার্য কৌটিল্য!

— বেশ। আর?

পুনরায় চাণক্যর তরফ থেকে যথাযথ প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ধনানন্দ কিছুটা দমে গেলেন। চুপ করে বসে পুনরায় হাতের আঙুল থেকে বেরিয়ে আসা অঙ্গুরিটি নিয়ে খেলা শুরু করলেন। বললেন,

— ওই মূষিকমুখো রাজকুমারটি! মলয়কেতু! সেও তো তোমার পক্ষের লোক। সেভাবে দেখতে গেলে, সেও মগধের লোক! আর, ওই ভৃত্যটি, যে খাদ্য দিয়ে গিয়েছে, তাকে বন্দি করা হয়েছে কি? তাকে আমাদের জেরা করার সুযোগ দাও! ও-ই যে বিষ দিয়েছে দুর্ধরাকে, সেটা স্বীকার করিয়ে ছাড়াব!

— আমিও নিশ্চিত সেই বিষয়ে।

— কী? যে, ওই দাসটিই বিষ দিয়েছে?

— নাহ্। তোমার লোক যে তাকে পেলে, অত্যাচার করে স্বীকারোক্তি আদায় করবেই, সেই বিষয়ে!

বিড়বিড় করে চাণক্যর উদ্দেশে সম্ভবত কয়েকটি অপশব্দ ব্যবহার করলেন ধনানন্দ।

তাঁর অসন্তোষ অগ্রাহ্য করে চাণক্য আবার প্রশ্ন করলেন,

— কৃষ্ণকলি যদি নির্দোষ হয়ে থাকে, তবে সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বলে কেন মনে হয়?

উত্তর দিলেন না ধনানন্দ। তাঁর কাছে এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর নেই সম্ভবত। চাণক্য পরের প্রশ্নে চলে গেলেন,

— কক্ষে যতক্ষণ ছিলে, রাজকুমারী আর তার দুই সখী কী করছিল?

— দুর্ধরাকে শৃঙ্গার করে দিচ্ছিল।

— কে কোন শৃঙ্গারের কাজ করছিল?

বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে ধনানন্দ উত্তর দিলেন,

— এইসব অর্থহীন প্রশ্নের তাৎপর্য কী? আমার সময়ের মূল্য আছে! এইবার আমি উঠব। এবং, আমি আমার কন্যার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই! তুমি তোমার রক্ষীদের বলো…

কথা শেষ করার পূর্বেই বাধা পড়ল। দ্বার খুলে এক সৈনিক প্রবেশ করল।

ক্ষমা করবেন, মহামতি। গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, তাই আপনাদের বার্তালাপে বিঘ্ন ঘটাতে বাধ্য হলাম।

— বলো? কী হয়েছে? কৃষ্ণকলিকে পাওয়া গিয়েছে?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। কিন্তু…

— কিন্তু? কী?

— উত্তর মহলের ছাদ থেকে ভূপতিত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে, মহামতি।

১১.

উত্তর মহলের পিছনের বাগানে মৃতদেহটি পড়ে আছে, মহলের উঁচু দেয়ালের গা ঘেঁষে। অনেকটা উচ্চতা থেকে দেহটি পতিত হয়েছে। উত্তর মহলের ছাদ থেকেই পতন হয়েছে বলে অনুমান করা যায়। বাতায়ন গরাদহীন হলেও তা দিয়ে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ গলে যাওয়াটা কষ্টকর। তা ছাড়া সকলের নজর এড়িয়ে সেটা সম্ভব নয়। মৃতদেহের প্রাথমিক অবস্থান দেখেই সৈনিকরা অনুমান করছে এটি আত্মহত্যা।

স্বাভাবিকভাবেই আমন্ত্রিত অতিথিদের থেকে এই ঘটনা লুকিয়ে রাখা আর সম্ভব হয়নি। সৈনিকরা যদিও তাদের দূরে রেখেছে ঘটনাস্থল থেকে। মহলের এইদিকটায় তুলনামূলকভাবে লোকজনের চলাচল কম। দু-জন সৈনিক মৃতদেহ দেখতে পেয়ে খবর দেয় অমাত্য কৃষ্ণনাথকে।

মৃতদেহ ঘিরে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েক জন রাজপুরুষ। কারণ অনেক রাজ অতিথিদেরই বাধা দেওয়াটা সাধারণ সৈনিকদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাদের মধ্যে চাণক্য, জীবসিদ্ধি, অমাত্য কৃষ্ণনাথ, ধনানন্দ এবং রাক্ষস উপস্থিত। জীবসিদ্ধি খেয়াল করেছে, অন্যান্য কয়েক জনের মাঝে মলয়কেতুও উপস্থিত হয়েছে ভিড়ের মধ্যে।

রাক্ষস মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে। চাণক্য তাঁর পাশেই এসে দাঁড়ালেন।

— কী মনে হয়, আর্য?

চাণক্যর প্রশ্নের ইঙ্গিত রাক্ষস উপলব্ধি করতে পারলেও সোজাসুজি উত্তর দিলেন না। বললেন,

রাজকুমারীকে হত্যার চেষ্টা করে থাকলে, কৃষ্ণকলির পক্ষে আত্মহত্যা করাটা অস্বাভাবিক নয়।

— অথবা?

উত্তরটা ধনানন্দ দিলেন,

— হত্যা! এ হত্যা! আর কত লুকিয়ে রাখবে মগধ তাদের অপদার্থতা? রাজকুমারীকে হত্যার প্রচেষ্টা এবং তার দুই প্রিয় সখীকে হত্যা করা হয়েছে! এটাই সত্য!

ধনানন্দ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এতক্ষণ গোপন রাখা সংবাদটি সকলের সম্মুখে উত্থাপন করার চেষ্টা করছে বুঝতে পারছে জীবসিদ্ধি।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে জীবসিদ্ধি দ্রুত বলল,

— ভুলে যাবেন না, হত্যার প্রচেষ্টা সম্রাট চন্দ্রগুপ্তকেও করা হয়েছে! তাই বিনা প্রমাণে মগধের দিকে আঙুল না তোলাই সমীচীন, আর্য। বিশেষ করে অতিথিদের সামনে।

চাণক্য নীচুকণ্ঠে বললেন,

— এই বিবাহে নন্দদের অসন্তোষের কথা কারুর অজানা নয়। নন্দরা যদি অভিযোগ করে যে, মগধ দু-জন তরুণীকে হত্যা করেছে এবং মগধ যদি পালটা দাবি করে যে নন্দরা সম্রাটকে হত্যার চেষ্টা করছে, তবে আপনার কী মনে হয়? কাদের অভিযোগ বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে, আর্য? কার কথা রাজ অতিথিরা বিশ্বাস করবে? চাণক্য প্রশ্নটা রাক্ষসকে করলেও উদ্দেশ্য যে ধনানন্দর প্রতি মুখ বন্ধ রাখার বার্তা, তা বুঝতে অসুবিধা হল না।

রাক্ষস ধনানন্দর দিকে ফিরে বললেন,

— আমার মনে হয় প্রমাণ না হওয়া অবধি কাউকে কিছু না জানানোটাই উচিত হবে। কিন্তু, আচার্য…।

— বলুন?

— এই বিবাহ আর সম্ভব নয়। দুটি মৃত্যু ঘটে গিয়েছে ইতিমধ্যে। বর-বধূর সুরক্ষা যেখানে প্রশ্নের মুখে, এ অবস্থায় এই বিবাহ অসম্ভব! তা ছাড়া আমি নিশ্চিত যে, রাজকুমারী দুর্ধরা কখনোই আজকে এই বিবাহ করতে রাজি হবেন না। তাঁর দুই বাল্যসখীর মৃত্যু হয়েছে আজকে!

চাণক্য কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

— হুম। আমি আপনার থেকে কিছুটা সময় চেয়ে নেব। আমি রাজকুমারীকে কথা দিয়েছি যে, রহস্যের সমাধান আমি করব। আমি তা করতে সক্ষম না হলে, এই বিবাহ হবে না এই কথা আমি তাঁকে দিয়েছি। কিন্তু, যদি আমি সক্ষম হই? আর ভুলে যাবেন না, এখানে সিদ্ধান্ত কিন্তু সম্পূর্ণভাবে সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর।

চাণক্যর কথা রাক্ষসের বা ধনানন্দর কারুরই মনঃপূত হয়নি। কিন্তু কিছু বললেন না তাঁরা। ধনানন্দ রাগত ভঙ্গিতে আঙুলের বড়ো অঙ্গুরীয়টি নিয়ে খোলা-পরা করতে শুরু করলেন পূর্বের মতোই। রাক্ষস তাঁর পাশেই পাথরের মতো মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন।

জীবসিদ্ধি সৈনিকদের নির্দেশ দিল মৃতদেহ সরিয়ে ফেলার। অতিথিদের জানানো হল এটা একটা দুর্ঘটনা মাত্র, তাঁরা যেন শাস্ত থাকেন। অন্যদের সঙ্গে নন্দ এবং রাক্ষসও স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হলেন।

সকলে চলে যাচ্ছে দেখে, চাণক্য বললেন,

— ওহে জীবসিদ্ধি, মলয়কেতুকে আটকাও। তার প্রশ্নোত্তর পর্বটা এখানেই সেরে ফেলি।

জীবসিদ্ধি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মলয়কেতুর পথ রোধ করল। দু-জনের মধ্যে কিছু বার্তালাপ হল এবং কিছুক্ষণ বাদেই তাদের চাণক্যর দিকে আসতে দেখা গেল।

মলয়কেতুর মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা যায় যে, নিতান্ত অনিচ্ছাতেই সে আসছে। এসে মেকি হাসি হেসে প্রণাম জানাল চাণক্যকে।

— প্রণাম, আচার্য।

— প্রণাম, পৌরবরাজ। আপনাকে আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে। আপনার অধিক সময় আমি নেব না। আমি জানি আপনি কতটা ব্যস্ত।

শেষের ব্যঙ্গটি মলয়কেতু উপলব্ধি করতে পারল কি না বোঝা গেল না। মলয়কেতু পৌরবরাজ পর্বতেশ্বর পুরুর পুত্র। এবং, এটাই তার একমাত্র পরিচয়। সারাদিন আমোদ, ফূর্তি ছাড়া তার বিশেষ কোনো দায়িত্ব নেই।

মলয়কেতু প্রশ্ন করল,

— আমার থেকে আপনার কী জানার আছে, আচার্য?

চাণক্য বললেন,

— আজ সকালে আপনি রাজকুমারী দুর্ধরার কক্ষে কেন গিয়েছিলেন?

— সৌ… সৌজন্য সাক্ষাৎ!

— হঠাৎ তার প্রতি এই সৌজন্য?

কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে মলয়কেতু। বলল,

— তেমন কিছু নয়। ব্যক্তিগত একটি বিষয়ে…।

— হুম। মহারাজ, আপনি দয়া করে এই বিভ্রান্তি মনে রাখবেন না যে, আপনার এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য আমাদের অজানা। রাজকুমারী নিজেই আমাদের সব জানিয়েছেন। কয়েক বছর আগে আপনার প্রস্তাবের কথাও আমাদের অজানা নয়।

চোখে চোখ রাখছে না মলয়কেতু। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চাণক্য পুনরায় বললেন,

— পঞ্চনদের কয়েকটি ছোটো জনপদের রাজাদের সঙ্গে আপনি যে ইদানীংকালে যোগাযোগ করেছেন সেটাও সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর কানে এসেছে। তিনি এখনও আপনাকে নিজের মিত্র মনে করেন, তাই আপনাকে এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি। মনে রাখবেন কুমার, এমন কোনো কার্যকলাপ করবেন না যাতে সম্রাটকে আপনার প্রতি তাঁর মনোভাব পরিবর্তন করতে হয়।

জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে মলয়কেতু বলল,

— না, না! আমি… মানে আমি….

উত্তরের অপেক্ষা না করেই চাণক্য বললেন,

আজ সকালে যখন রাজকুমারীর কক্ষে আপনি উপস্থিত হয়েছিলেন, সেসময়ের কথা স্মরণে আছে, আশা করি?

— আমি আর কোনোদিন রাজকুমারীর সম্মুখে যাব না। আপনি দয়া করে সব ভুলে যান, মহামতি।

— আপনি আমার প্রশ্নের উত্তরটা সঠিক দিলে সে-বিষয়ে ভেবে দেখতে পারি।

— কী প্রশ্ন?

— মৃতা মেয়েটিকে আগে দেখেছেন?

— না তো।

— সে কী? আজকে সকালে রাজকুমারীর কক্ষে একে দেখেননি?

— ওহ্! হ্যাঁ, হ্যাঁ। দেখেছি একে।

— হুম। মনে পড়ছে তাহলে।

মলয়কেতু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে একবার নিজের অঙ্গবস্ত্র ঠিক করল। চাণক্য বললেন,

— এইবার কষ্ট করে আজকে রাজকুমারীর কক্ষের দৃশ্য স্মরণ করুন।

— আজ্ঞে।

— বেশ, বেশ। এইবার ভেবে বলুন তো, আপনি কক্ষের কোন স্থানে আসন গ্রহণ করেছিলেন?

— কক্ষে একটিই আসন ছিল, আচার্য। তাতেই। তবে, খুবই অল্প সময়ের জন্যে ছিলাম আমি কক্ষে।

— অর্থাৎ, মেজের পাশের আসনটিতে। পাশে সাজিয়ে রাখা ভোজনসামগ্রী দেখেছিলেন?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ।

— আর, রাজকুমারী সেইসময়ে কী করছিলেন?

— তিনি রূপচর্চায় ব্যস্ত ছিলেন।

— ঠিক কী রূপচর্চা করছিলেন?

— তিনি পালঙ্কে ছিলেন। একজন দাসী তাঁর কেশে কিছু অলংকার সজ্জা করছিল আর একজন তাঁর সম্মুখে মেঝেতে বসে হাত না পায়ে কিছু করছিল।

— এই মৃতা মেয়েটি কোনজন?

— ওহ্! হ্যাঁ, মনে পড়েছে। এই মেয়েটি কেশে অলংকার পরিয়ে দিচ্ছিল।

— হুম। তার বা অন্য কারুর আচরণে কিছু অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল?

— না। রাজকুমারী আমার দিকে দৃকপাত করছিলেন না। তবে এই মেয়েটি, কেশচর্চার মাঝে আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখেছিল বটে।

ভ্রূ কুঁচকে গিয়েছে চাণক্যের।

— অদ্ভুত দৃষ্টি বলতে?

— মানে ঠিক বোঝাতে পারব না। তবে, সে যেন আমায় দেখে ভয় পাচ্ছিল। ভীত দৃষ্টিতে বার বার আমার দিকে দেখছিল।

চাণক্য গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়েছেন। মলয়কেতু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল পরের প্রশ্নের। কিন্তু চাণক্য অন্যদিকে চেয়ে আছেন। ললাটে গভীর ভ্রূকুটি। মলয়কেতু বুঝতে পারছে না সে কী করবে। সে কি বিদায় নেবে, না, অপেক্ষা করবে? সে বার বার চাণক্য আর জীবসিদ্ধির মুখের দিকে চাইছে।

চাণক্য নিজের ভাবনায় ডুবে আছেন দেখে, জীবসিদ্ধি শেষপর্যন্ত মলয়কেতুকে বলল,

— আপনি আসুন, মহারাজ। আর কোনো প্রশ্ন বাকি থাকলে আপনাকে পুনরায় বিরক্ত করব।

অতি দ্রুত তাকে প্রতিপ্রণাম জানিয়ে স্থান ত্যাগ করল মলয়কেতু।

চাণক্য ধীরপায়ে হেঁটে চলেছেন। তাঁর পাশেই জীবসিদ্ধি চলেছে। হঠাৎ বড়ো প্রহর ঘণ্টার শব্দে গমগম করে উঠল গোটা রাজমহল।

দিনের অন্তিম প্রহর শেষ হয়েছে। সূর্যদেব তার রক্তিম আভা বিস্তার করে পশ্চিমের আকাশে বিদায় নিচ্ছে। সন্ধ্যার প্রথম প্রহর শুরু হল। সময় ফুরিয়ে আসছে।

১২.

অস্তগামী সূর্যের দিকে চেয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন চাণক্য। জীবসিদ্ধি চাণক্যর সম্মুখে, একটি পাথরের বেদিতে বসল। জীবসিদ্ধি কোনোকালেই প্রকৃতিপ্রেমী নয়। কিন্তু রাজমহলের সুবিস্তৃত বাগানের মধ্যে বিশেষ করে এই অংশটা জীবসিদ্ধির অতি প্রিয়। নন্দ শাসনকালে এখানে সম্রাট ধনানন্দ নারীদের সঙ্গে আমোদ করতেন।

এখন এটি তার এবং সম্রাট চন্দ্রগুপ্তর চতুরঙ্গ খেলার স্থান। সে মাঝে মাঝেই চন্দ্রগুপ্তর সঙ্গে চতুরঙ্গ খেলতে রাজমহলে আসে। তখন এই স্থানেই খেলার ছক পাতা হয়ে থাকে। অনেকগুলো বড়ো পাথরের বেদি করা আছে এখানে মানুষের বসার জন্যে।

চতুরঙ্গকে বলা হয় বুদ্ধির খেলা, কৌশলের খেলা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আচার্য চাণক্য এতে একেবারেই পারদর্শী নন। তাঁকে জীবসিদ্ধি বা চন্দ্রগুপ্ত অতি সহজেই বেশ কয়েক বার পরাজিত করেছে। আসলে খেলা আর বাস্তব যুদ্ধকৌশল এক নয়! বাস্তবের যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো নিয়ম হয় না। সেই খেলা অনেক কঠিন, অনেক ভয়ংকর। এবং, সেই খেলায় তাদের গুরুদেব অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

ফুলের ঘ্রাণ বুক ভরে একবার টেনে নিল জীবসিদ্ধি। পাখির ঝাঁক ধীরে ধীরে ফিরে চলেছে তাদের বাসায়। গাছে গাছে পাখিরা ফিরে আসছে একে একে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে আজকের সন্ধেটা অত্যন্ত মনোরম হত নিঃসন্দেহে। চাণক্যর দিকে চাইল জীবসিদ্ধি। তিনি একইভাবে অপলক দৃষ্টিতে ডুবন্ত সূর্যের দিকে চেয়ে আছেন। তাঁর বুকের উপর এসে পড়া কেশশিখায় অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হস্তচালনা করছেন। চিন্তামগ্ন তিনি।

একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শিষ্যর পাশেই পাথরের বেদিতে বসলেন চাণক্য

— গুরুদেব। কিছু আশার আলো পেলেন?

চাণক্য উপর-নীচে ঘাড় নেড়ে বললেন,

— হুম। আলো তো আছেই। কিন্তু, তা শেষ পর্যন্ত আশার না নিরাশার কারণ হবে, সেটাই সবথেকে বড়ো প্রশ্ন।

— অর্থাৎ?

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করলেন চাণক্য,

— তোমার কী মতামত এই পুরো বিষয়ে? রাজকুমারীকে কে হত্যার চেষ্টা করেছে? একবার কেশে, গলা পরিষ্কার করে জীবসিদ্ধি বলল,

— আপনি সবসময়েই বলে থাকেন যে, সাধারণত সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যাটিই সঠিক হয়ে থাকে। পূর্বেও বহুবার তার প্রমাণ পেয়েছি আপনার সঙ্গে থেকে। সেই হিসাবেই আমি নিশ্চিত যে, বিষ কৃষ্ণকলি নামক যুবতীটিই মিশিয়েছিল রাজকুমারীর পানীয়ে।

— তাতে তার উদ্দেশ্য কী?

— তার নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে আমি মনে করি না। সম্ভবত তাকে কেউ এই কাজ করতে নিয়োগ করেছে। অর্থের বিনিময়ে বা অন্য কিছুর বিনিময়ে। তাই তাকে হত্যা করা হল। কারণ সে মুখ খুললে সমস্যা হবে তার নিয়োগকারীর।

— হুম। তাকে যে হত্যাই করা হয়েছে সেটা নিশ্চিত কীভাবে হচ্ছ?

মৃদু হেসে জীবসিদ্ধি বলল,

— আচার্য, লোকসম্মুখে অস্বীকার করলেও, এ যে হত্যা সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মৃতদেহের পতনের ভঙ্গি দেখলেই অনুমান করা কঠিন নয় যে, তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে।

সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন চাণক্য। জীবসিদ্ধি বলল,

— মগধেরই কেউ এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, এ সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আচার্য। আপনার কী মনে হয়, কার কথায় কৃষ্ণকলি বিষ মিশিয়েছে রাজকুমারীর পানপাত্রে?

চাণক্য এইবার জীবসিদ্ধির মুখপানে চেয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন,

— ওহে, জীবসিদ্ধি। আমি অন্তত একটি বিষয়ে নিশ্চিত যে রাজকুমারীকে হত্যার উদ্দেশ্যে, রাজকুমারীর পানীয়ে তার সখী কৃষ্ণকলি বিষ মেশায়নি।

চাণক্যর কথায় বিস্মিত হয়ে জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,

— আপনি কীভাবে এতটা নিশ্চিত হচ্ছেন, আচার্য?

— সামান্য যুক্তি দিয়ে ভাবলেই বুঝতে পারবে কারণটা। কৃষ্ণকলি এবং মধুবন, দু-জনেই রাজকুমারীর বাল্যসখী। তারাও রাজমহলেই তাদের মেয়েবেলা কাটিয়েছে। অর্থাৎ রাজ রীতিনীতি, আচার-আচরণের সঙ্গে তারা অতিপরিচিত। তাই তারা ভালোভাবেই জানত যে, রাজকুমারী কখনোই সুরাপান করেন না। তাই তারা কখনোই রাজকুমারীর পানপাত্রে, সোমের বদলে ভুল করে সুরা দেওয়া হয়েছে দেখেও তাতে বিষ মেশাবে না। তাই নয় কি?

জীবসিদ্ধি চুপ করে গেল। সে এভাবে ভেবে দেখেনি। কৃষ্ণকলিকে দোষী ধরে নিয়েই জীবসিদ্ধি তার বাকি যুক্তিগুলো সাজিয়েছিল। কিন্তু, প্রথমেই সেটি ভুল প্রমাণিত হওয়ার ফলে সে চতুরঙ্গের প্রথম দানেই ফিরে এসেছে। তাকে পুনরায় বিচার ভাবনা করতে হবে পুরো বিষয়টা নিয়ে।

— অর্থাৎ, বিষ এমন কেউ মিশিয়েছে, যে রাজকীয় আচার-আচরণের সঙ্গে পরিচিত নয়। সেক্ষেত্রে তো সন্দেহ দাসস্থানীয় কারুর উপরেই যায়। ভুবন?

— সে যদি বিষ প্রয়োগ করে থাকত, তবে তাকে খুঁজে পাওয়া যেত না। মনে রেখো, রাজকুমারীর কক্ষে ভোজনাদি রেখে আসার বহু পরে তা গ্রহণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন তাঁরা। এতক্ষণে ভুবন সহজেই রাজমহল ত্যাগ করে পলায়ন করতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। সে এখনও মহলেই আছে।

— জীমূতবাহন? সে রাজকীয় খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে অবগত হলেও, সে নিজেই স্বীকার করেছে যে তার মনে হয়েছিল যে হয়তো নন্দকুলের রাজকুমারী সুরাপান করে থাকেন। জীমূতবাহন সেই ভেবেই বিষ দিয়ে থাকতে পারে পানীয়ে।

— হুমম। সে-ই সব কিছুর দায়িত্বে আছে। খাদ্যপরীক্ষককে ফাঁকি দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব নয়। কিন্তু তাকেও আমার সন্দেহ হয় না।

— কেন?

— তাকে প্রশ্ন করার সময় তাকে জানানো হয়নি যে, রাজকুমারীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। সে দোষী হলে, তার বাচনভঙ্গি, হাবেভাবে তা প্রকাশ পেত। তুমি তো জানোই, জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে প্রত্যেকের ভাবভঙ্গি আমি লক্ষ করি। বার বার চোখের পলক ফেলা, অশান্ত ভঙ্গি, হাতের তালু ঘর্মাক্ত হওয়া এগুলো সবই অপরাধীর লক্ষণ”। যদিও একজন পেশাদার অপরাধীর মধ্যে এগুলো প্রকাশ পায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে জীমূতবাহন একজন সুপ্রতিষ্ঠিত খাদ্য-বিশেষজ্ঞ। তাকে যখন সেই বিশেষ মধু-পানীয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করলাম, তার মধ্যে রীতিমতো উৎফুল্লতা প্রকাশ পাচ্ছিল। অর্থাৎ, হয় সে নির্দোষ, অথবা, একজন দক্ষ খাদ্য- বিশেষজ্ঞের চেয়েও দক্ষতর অভিনেতা।

জীবসিদ্ধি ভেবে বলল,

— আজ সকালেও তার সঙ্গে আমার খাদ্য বিষয়ে কথা হয়েছে। সে প্রকৃতই খাদ্য বিষয়ে অতি উৎসাহী একজন মানুষ। আপনি ঠিকই বলেছেন।

গালে হাত দিয়ে বসল জীবসিদ্ধি। বলল,

— তাহলে বাকি রইল তিনজন। তিন অতিথি। তাই তো?

— না হে, জীবসিদ্ধি। তিন নয়। চারজন।

— চারজন?

— হুম। চারজন।

জীবসিদ্ধির বিস্ময় বেড়েই চলেছে। কার কথা বলছেন চাণক্য?

জীবসিদ্ধির মনের প্রশ্ন অনুমান করেই চাণক্য উত্তর দিলেন,

— ধৈর্য ধরো হে, জীবসিদ্ধি। চতুর্থ সন্দেহভাজন ব্যক্তির কথায় পরে আসছি। আপাতত প্রথম তিনজনের অবস্থানগুলো একে একে বিচার করা যাক। রাজকুমারীকে হত্যার কী উদ্দেশ্য তাদের থাকতে পারে তা একে একে বিচার করা যাক।

— বেশ। প্রথমেই তাহলে শুরু করা যাক….

হাত তুলে জীবসিদ্ধিকে বাধা দিয়ে চাণক্য বললেন,

— ওহে জীবসিদ্ধি, চলো আগে কক্ষে ফিরি। আমার কণ্ঠ যে শুষ্ক হয়ে পড়েছে। অন্ধকারও হয়ে এসেছে।

*জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে সামনের জনের ভাবভঙ্গি থেকে অপরাধী কে তা অনুমান করার পদ্ধতির উল্লেখ অর্থশাস্ত্রতেই আছে।

১৩.

সারা রাজমহল আলোয় সেজে উঠেছে। প্রতিটি ঝাড়বাতি জ্বলছে, প্রতিটি জানলায় আর বারান্দায় সারি বেঁধে প্রদীপ জ্বলছে। এই রূপে কোনোদিন এই প্রাসাদ সেজে উঠতে দেখেনি জীবসিদ্ধি।

কিন্তু তবুও আফশোস হল জীবসিদ্ধির। আফশোস হল দুটি নারীর জন্যে, যারা আজকেই মারা গিয়েছে। হত্যা করা হয়েছে। অথচ কেউ তাদের জন্যে অশ্রুপাত করেনি। না, একজন করেছেন। নিশ্চয়ই করেছেন। রাজকুমারী দুর্ধরা।

আচ্ছা, তিনি কি এই বিবাহ করবেন? তাঁর দুই সখীর মৃত্যুর পর তিনি যদি রাজি না হন, তবে তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। সম্ভবত তিনি রাজি হবেন না। তখন? কী করবেন আচার্য চাণক্য? জোর করবেন? একজন শোকাহত নারীকে তিনি ক্ষমতাবলে বিবাহ দেবেন তাঁর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে? হ্যাঁ, চাণক্য তা পারেন। উদ্দেশ্যসিদ্ধির প্রয়োজনে এই মানুষটা পাষাণের মতো কঠিন হতে পারেন।

.

কক্ষে ঢুকে চাণক্য কিছুটা জল পান করে নিজের আসনে বসলেন। তাঁর মুখোমুখি আসনে বসল জীবসিদ্ধি।

জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,

— আচার্য, আর সময় বেশি নেই।

— হুম।

— এই বিবাহ কি এই পরিস্থিতিতে সত্যই সম্ভব?

বিষণ্ণ লাগল চাণক্যকে। বললেন,

— আমি জানি না হে, জীবসিদ্ধি। সত্যি বলতে, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এই বিবাহ নিয়ে আমার মনেও সংশয় জাগছে। আমি নিশ্চিত নই যে, এই বিবাহে আমার আর মত আছে কি না।

অবাক হল জীবসিদ্ধি।

— সে কী? এই বিবাহ তো আপনার উৎসাহেই হচ্ছে! আপনি এই কথা বলছেন, আচার্য?

উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন চাণক্য। কিছুক্ষণ বাদে উঠে দাঁড়িয়ে কক্ষের মধ্যেই পদচালনা শুরু করলেন।

— ওহে, জীবসিদ্ধি।

— বলুন, আচার্য।

— এসো, সন্দেহভাজনদের নিয়ে আলোচনা করা যাক। তোমার সঙ্গে আলোচনায় এর পূর্বেও বহুবার অপ্রত্যাশিতভাবেই সমাধানসূত্র বেরিয়ে এসেছে। দেখা যাক এইবারও তার পুনরাবৃত্তি হয় কি না।

কথাটা মিথ্যে নয়। বহুবার এভাবেই গুরু-শিষ্য কথোপকথনের মাঝেই চাণক্য সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। হঠাৎ কোনো একটি ঘটনা বা নামের উল্লেখ বা জীবসিদ্ধির উচ্চারণ করা কোনো শব্দের থেকে চাণক্য খুঁজে পেয়েছেন রহস্যের রুদ্ধদ্বারের চাবি। কিন্তু তা নিয়ে জীবসিদ্ধি মোটেই গর্বিত নয়। কারণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো ঘটেছে জীবসিদ্ধির অজান্তেই। বরং, সে কোনোবারই সঠিক সমাধানসূত্র নিজে খুঁজে পায়নি। সে নিজে চাণক্যর আস্থাভাজন দুর্ধর্ষ গুপ্তচর হতেই পারে, কিন্তু অনুধাবন ক্ষমতায় চাণক্যর সমতুল্য কেউ নেই। মাঝে মাঝে জীবসিদ্ধির মনে সংশয় জাগে যে, তার গুরুদেবের পারদর্শিতা অর্থশাস্ত্রে অধিক, নাকি, অনুধাবন-শাস্ত্রে?

জীবসিদ্ধি একবার দীর্ঘনিশ্বাস টেনে বলল,

— বেশ। প্রথমেই আসা যাক প্রাক্তন অমাত্য রাক্ষসের বিষয়ে। সে-ই ছিল রাজকুমারীর কক্ষে আজকে প্রথম অতিথি। সে বুদ্ধিমান, দুর্ধর্ষ, সাহসী এবং এই বিবাহের বিপক্ষে। ধনানন্দর সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ। কিন্তু আমার কানে এই সংবাদও এসে পৌঁছেছে যে ইদানীংকালে তার সঙ্গে ধনানন্দর মতবিরোধ ঘটছে। রাজ্য হারিয়ে ধনানন্দর মস্তিষ্কের ঠিক-ঠিকানা নেই। আগেও যে ছিল তা নয়, তবে ইদানীং কয়েক বৎসর যাবৎ তিনি প্রতিশোধ ছাড়া কোনো চিন্তাই করছেন না। আর তাতেই মতের অমিল হচ্ছে রাক্ষসের সঙ্গে। কিন্তু তাতে রাজকুমারীকে হত্যা করে তাঁর কী লাভ?

উত্তর চাণক্য দিলেন,

— রাক্ষস গত কয়েক বছর ধরেই আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুনে ইন্ধন ঢেলে চলেছেন তা আমাদের অজানা নয়। তুমি ধরেই নিচ্ছ কেন যে তিনি মগধের সিংহাসন ধনানন্দর জন্যেই ফেরত পেতে চাইছেন?

— অর্থাৎ? বুঝতে পারলাম না আপনার কথা, আচার্য।

— ওহে, জীবসিদ্ধি। রাজনীতিতে কেউ কারুর স্থায়ী শত্রু বা মিত্র হয় না। হতেই পারে যে, এতদিন পরোক্ষভাবে মগধ পরিচালনা করার পর, রাক্ষসের মনে স্বয়ং সম্রাটের সিংহাসনে বসার সাধ জেগেছে। কে বলতে পারে? হয়তো তিনি বিদ্রোহের সুযোগে নিজের জন্যে মগধ ফেরত পেতে চান। আর সেই কারণেই ধনানন্দ এবং তার অনুগত রাক্ষসের সম্পর্কে এই ফাটল।

জীবসিদ্ধি বিস্মিত হল। সে কখনোই এই সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেনি। তবে সে নিশ্চিত, চন্দ্রগুপ্তর মস্তিষ্কে এরকম সম্ভাবনা এসেছে। রাজনীতিতে চন্দ্রগুপ্ত চাণক্যর যোগ্য উত্তরসূরি বটে। এইসব বিষয়ে চন্দ্রগুপ্তর মস্তিষ্ক চাণক্যর ছাত্রদের মধ্যে বরাবরই সবচেয়ে এগিয়ে। সেই কারণেই তাঁকে সম্রাট নির্বাচন করেছিলেন আচার্য।

চাণক্য বলে চলেছেন,

— এইবার পরিস্থিতি বিবেচনা করো। যদি রাক্ষসের মনে নিজের জন্যে মগধের অভিলাষ থেকে থাকে, তবে এই বিবাহ তার লক্ষ্যের পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হতে চলেছে। চন্দ্রগুপ্তর আসন আরও শক্ত হবে এই বিবাহে। সেক্ষেত্রে তার পক্ষে রাজকুমারীকে হত্যার চেষ্টা করাটা কি খুব অস্বাভাবিক?

— কিন্তু, আচার্য। রাক্ষস রাজকুমারীকে নিজের কন্যাসমা বলেন।

ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে চাণক্য বললেন,

— আবারও বলছি, রাজনীতিতে কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয় হে, জীবসিদ্ধি।

জীবসিদ্ধি চুপ করে গেল।

চাণক্য বলে চললেন,

— এইবার আসা যাক ধনানন্দর প্রসঙ্গে। সে প্রতিশোধে অন্ধ। এদিকে তার হাতে ক্ষমতা নেই। পূর্বে অন্তত সৈনিকদের কাছে তার কথাই আদেশ ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে রাক্ষসের মানমর্যাদা এবং ক্ষমতা ধনানন্দর চেয়ে অধিক। সৈনিকরা তার কথা শুনতে বাধ্য নয়। তার মস্তিষ্কের স্থিরতা নিয়েও প্রশ্ন জাগছে অনেকের মনে। তার পক্ষে কি মরিয়া হয়ে নিজের কন্যাকে হত্যা করার চেষ্টা খুব অসম্ভব?

— আপনার কী মনে হয়?

অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে দু-দিকে মাথা নাড়লেন চাণক্য। বললেন,

— না। এই বিষয়টাতেই আমার সন্দেহ আছে। রাক্ষস যেখানে আবেগহীন, ধনানন্দ মোটেই তা নয়। যে যতই হীন ব্যক্তিত্বের হোক না কেন, সে একজন পিতা!

— অর্থাৎ, ধনানন্দকে বাদ দেওয়া যায়। সে কখনোই পানীয়ে বিষ মিশিয়ে নিজের কন্যাকে হত্যার চেষ্টা করবে না।

— কথাটা আংশিক সত্য।

— আংশিক? কেন?

চাণক্য এই প্রশ্নটি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে পরের জনের কথায় চলে গেলেন,

— এইবার আসা যাক তৃতীয় ব্যক্তির বিষয়ে। পর্বতকা” মলয়কেতু। তার অবস্থান আমাদের কাছে সম্পূর্ণভাবে অস্পষ্ট। বা, বলা চলে, তারই অবস্থান সবচেয়ে অধিক স্পষ্ট। সে একজন মাংসলোভী শৃগাল বিশেষ। ধূর্ত এবং যেখানে তার লাভ, সে তারই পক্ষে। সে শত্রুপক্ষের কথায় এই কাজ করে থাকতেই পারে।

— কিন্তু তার কি এতটা সাহস আছে?

— মনুষ্যচরিত্র বড়ো বিচিত্র বস্তু, জীবসিদ্ধি। এ বড়োই দুরূহ ও জটিল। আমি নিশ্চিত অদূর ভবিষ্যতে মনুষ্যের মনস্তত্ত্ব নিয়ে শাস্ত্রের কোনো একটি শাখা জন্ম নেবে। মানুষের মনকে এত সহজে বুঝে নেওয়া যায় না। কার পক্ষে কী সম্ভব আর কোনটা অসম্ভব তা এত জোর দিয়ে কখনোই বলা যায় না।

জীবসিদ্ধি হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— অর্থাৎ আমরা সকালে যেখানে ছিলাম, এখনও সেখানেই আছি। সকলেই সম্ভাব্য হত্যাকারী। কিন্তু সেই ব্যক্তিটি কে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।

— চাণক্য একটি প্রদীপের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সেটির আগুন উসকে দিতে দিতে বললেন,

— অবশ্যই স্পষ্ট।

আবারও চমকে উঠল জীবসিদ্ধি। এই নিয়ে আজকে বহুবার চমকেছে সে। উত্তেজিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ল জীবসিদ্ধি,

— অর্থাৎ? আপনি জানেন কে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করেছিল রাজকুমারীকে?

প্রদীপ থেকে হাতে লাগা তেল একটি কাপড়ে মুছতে মুছতে চাণক্য উত্তর দিলেন,

— না। তবে বিষ কে মিশিয়েছে সেটা আমি জানি। আগের প্রহরেই সেটা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। কিন্তু রাজকুমারীকে হত্যার চেষ্টার বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।

— আচার্য! আপনি কী বলতে চাইছেন আমার কাছে স্পষ্ট নয়। পুরোটাই হেঁয়ালির মতো ঠেকছে। আপনি যদি সেই ব্যক্তির নাম জানেনই, তবে আমরা এখানে কীসের অপেক্ষা করছি? তাকে এখনই বন্দি কেন করছি না?

মৃদু হেসে আবার পদচালনা শুরু করলেন চাণক্য। উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, তখনই দ্বারের বাইরে কারুর আগমনের কথা জানাল রক্ষী।

কক্ষে ভুবন নামের ভৃত্যটি প্রবেশ করল। তার হাতে একটি ভূর্জপত্রের অংশ। দুই ব্রাহ্মণকে প্রণাম জানিয়ে হাতের ভূর্জপত্রটি এগিয়ে দিল তার নিকটে থাকা জীবসিদ্ধির দিকে।

— জীমূতবাহন মহাশয় এইটা আপনাদের দিতে বলেছেন। আমি আগেও দু-বার এটা আপনাকে দিতে এসেছিলাম, আপনারা নেই দেখে ঘুরে গিয়েছি।

জীবসিদ্ধি ভূর্জপত্রটি নিয়ে দেখল তাতে পর পর খাদ্যের নাম লেখা আছে। পত্রের উপরে নাম লেখা রাজকুমারী দুর্ধরার এবং নন্দর শিলমোহর দেওয়া তাতে। এটি রাজকুমারী দুর্ধরার খাদ্যতালিকা।

দাসটিকে বিদায় দিয়ে দ্রুত পড়তে থাকল জীবসিদ্ধি। প্রয়োজনীয় অংশে, অর্থাৎ পানীয়ের তালিকা পাঠ করে জীবসিদ্ধি বলল,

— আচার্য, জীমূতবাহন মিথ্যে বলেননি

— হুমম। জানি। এতে সোম নয়, সুরা লেখা আছে। তাই তো?

— আজ্ঞে, হ্যাঁ। ভুল নন্দদের তরফেই হয়েছে।

— ভুল? তুমি নিশ্চিত?

— আপনি কী ইঙ্গিত করতে চাইছেন, আচার্য?

মৃদু হেসে চাণক্য বললেন,

— ওহে, জীবসিদ্ধি। তোমায় বলেছিলাম না? সন্দেহের তালিকায় চতুর্থ একজন আছেন? বলতে পারো সে ব্যক্তি কে?

— আজ্ঞে, না। সকলের কথাই আমরা একে একে বিচার করেছি। কে আপনার সন্দেহের তালিকার চতুর্থ ব্যক্তি?

পদচালনা থামিয়ে জীবসিদ্ধির দিকে চেয়ে চাণক্য বললেন,

— স্বয়ং রাজকুমারী দুর্ধরা!

*পর্বতকা— পার্বত্য প্রদেশের শাসক

১৪.

জীবসিদ্ধি কয়েক মুহূর্ত বজ্রাহতর মতো স্থাণু হয়ে রইল। নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না সে। আচার্য কি একটু আগে সেটাই বললেন যেটা সে শুনল?

হতবাক ভাবটা কাটিয়ে উঠে জীবসিদ্ধি প্রশ্ন করল,

— আচার্য? আপনি কী বলতে চাইছেন? রাজকুমারী দুর্ধরা নিজের পানীয়ে, নিজেই বিষ মিশিয়েছিল?

— একথা আমি বলিনি।

— আপনি একটু পূর্বেই তাই বলেছেন।

— না। আমি বলেছি সন্দেহের তালিকায় তাকেও রাখা যায়। কারণ আজকের সমস্ত ঘটনায় তার লাভ সবচেয়ে অধিক।

— আপনি পুনরায় হেঁয়ালি করছেন, আচার্য! আপনি বলতে চাইছেন রাজকুমারী আত্মহননের অভিপ্রায় নিয়ে বিষ মিশিয়েছিলেন?

— না। আমি তা বলছি না। আমি যা বলতে চাইছি সেটা আগে পুরোটা শুনে নাও। তারপর বিচার করো নিজেই যে, আমার কথা যুক্তিহীন মনে হচ্ছে কি না।

পদচালনা থামিয়ে চাণক্য জীবসিদ্ধির মুখোমুখি আসনে এসে বসলেন। বললেন,

— রাজকুমারী দুর্ধরা একজন অসম্ভব বুদ্ধিমতি এবং দৃঢ়সংকল্প নারী। আশা করি তার চরিত্রের এই বিশেষত্ব তোমার নজর এড়িয়ে যায়নি?

— হ্যাঁ। সেটা ঠিক। কিন্তু তিনি কেন বিষ মেশাবেন নিজেরই পানপাত্রে? এ যে অসম্ভব!

— তাই কি? একবার ভেবে দেখো তো, জীবসিদ্ধি। রাজকুমারীর খাদ্যতালিকায় সোমের পরিবর্তে সুরা লেখাটা কি সত্যিই নিছক ভুলমাত্র? এমন নয় তো যে, কেউ জেনে-বুঝে এই কাজটি করেছে? সেই ব্যক্তি দুর্ধরা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় কি?

— তার মানে…

কথা শেষ করল না জীবসিদ্ধি। চাণক্য সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বললেন,

— হুম। একবার তার অবস্থানটা বিবেচনা করো। সে বাধ্য হয়েছে এই বিবাহে সম্মতি দিতে। নিজের পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে তাকে সেই ব্যক্তির স্ত্রী হতে হচ্ছে, যার কারণেই তার পিতার সমস্ত দুর্দশা। এই বিবাহ সে কোনোদিনই মন থেকে যে মেনে নেয়নি এটা অনুমান করা কঠিন নয়। এহেন পরিস্থিতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সে কতটা মরিয়া সেটাই প্রশ্ন। আশা করি, এইবার তুমি আমার দ্বিধার জায়গাটা অনুধাবন করতে পারছ?

জীবসিদ্ধি অনুধাবন করতে পারছে। আর যতই ভাবছে ততই তার মনে সন্দেহের কালো মেঘ আরও ঘন হয়ে উঠছে। প্রতিটি ঘটনা মিলে যাচ্ছে তার মনে।

রাজকুমারী দুর্ধরা নিজেই যদি খাদ্যতালিকায় সোমের জায়গায় সুরা লিখে থাকেন, তবে সেটির উদ্দেশ্য স্পষ্ট। তাঁর কখনোই সেই পানীয় নিজে পান করার উদ্দেশ্য ছিল না। ভৃত্য সেই পানীয় তাঁর কক্ষে রেখে যাওয়ার পর, কোনো এক সুযোগে তিনি নিজেই তাতে বিষ মিশিয়েছেন। তিনি তাতে বিষ মিশিয়েছিলেন তাঁর সখীর জন্যে! সোমের পরিবর্তে সুরা দিয়ে যাওয়ায়, তিনি অজুহাত পেয়ে গেলেন সেটি নিজে পান না করে তাঁর দুই সঙ্গীর একজনকে তা পান করানোর। একজন সখী মারা গেল। তিনি সকলকে জানালেন যে তাঁর পানীয়ে বিষ ছিল। তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে! এবং ভুলবশত তাঁর সখী মারা গিয়েছে।

দ্বিতীয় সখী নিশ্চয়ই রাজকুমারীকে সন্দেহ করেছিল। এবং, সেই কারণেই তাকেও রাজকুমারী দুর্ধরা নিজেই সরিয়ে দিলেন। নন্দদের সঙ্গে আসা কোনো বিশ্বস্ত সৈনিক বা নিজস্ব অঙ্গরক্ষককে দিয়ে এই কাজ করানো মোটেই কঠিন না।

সকলেই সন্দেহ করবে মগধকে। এবং, এর ফলে বিবাহ সম্পন্ন করা যাবে না। নিখুঁত পরিকল্পনা!

জীবসিদ্ধি আর ভাবতে পারছে না। ধনানন্দর কন্যা হিসাবে দুর্ধরার প্রতি তার মনে প্রথমে শুধুমাত্র ঘৃণাই ছিল। কারণ নন্দদের শাসনকালে, এই পাটলিপুত্রের বুকে গুপ্তচর বৃত্তি করার সময়ে সে নিজের চোখে মগধের দুর্দশা দেখেছে অত্যাচারী ধনানন্দর প্রতি তার মনে তীব্র ঘৃণা জমেছে।

তাই তার কন্যার সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তর বিবাহের বিষয়ে তারও সমান আপত্তি ছিল। কিন্তু তার মন পরিবর্তিত হয় দুর্ধরার সঙ্গে সাক্ষাতে। রাজকুমারী দুর্ধরাকে সে সম্মানের চোখে দেখেছিল। তার মনে হয়েছিল যে, আচার্য মানুষ চিনতে ভুল করছেন না। এই কন্যা তার পিতার অনুরূপ নয়।

কিন্তু এখন জীবসিদ্ধি যতই ভাবছে, ততই নিজের মূর্খামিতে তার আফশোস হচ্ছে। এই সহজ ব্যাখ্যা সে দেখতে না পাওয়ার মতো অন্ধ কীভাবে হল?

জীবসিদ্ধি নিজের সম্মুখে বসা চাণক্যর দিকে চাইল। গম্ভীর মুখে চাণক্য বসে আছেন। তারই দিকে চেয়ে আছেন। তাঁকে উদাস লাগছে।

চাণক্য বললেন,

— ওহে জীবসিদ্ধি, আমি মনে-প্রাণে চাইছি যেন আমার সন্দেহ অমূলক প্রমাণিত হয়। জীবনে এই প্রথমবার আমি চাই যেন ঈশ্বর আমায় ভুল প্রমাণ করেন। কারণ আমি জেনে-শুনে নিজের পুত্রসম শিষ্যর বিবাহ একজন হত্যাকারীর সঙ্গে কীভাবে দিই?

জীবসিদ্ধি কিছু বলতে পারল না। নিজের মস্তিষ্ক থেকে রাজকুমারীর কথা সে সরাতে পারছে না। যতই ভাবছে ততই তার মনে আরও দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাচ্ছে যে সম্পূর্ণ চক্রান্ত রাজকুমারীর।

আচার্য একটি বৃহৎ ভুল করতে চলেছিলেন চন্দ্রগুপ্তর প্রতি। যে নারী নিজের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে নিজের বাল্যসখীর বলি দিতে পারে, সে নিজের স্বামীর কণ্ঠে কৃপাণ চালাতেও দ্বিধা করবে না।

আচার্য চাণক্যকে শোনানোর মতো কোনো সান্ত্বনাবাণী জীবসিদ্ধির কাছে নেই। দৃঢ়কণ্ঠে জীবসিদ্ধি বলল,

— এ বিবাহ হয় না, আচার্য। আর কোনোভাবেই হয় না। আমাদের পক্ষ থেকেই এই বিবাহ স্থগিত করা হোক এইবার। আমি নিশ্চিত রাজকুমারীই বিষ মিশিয়েছেন নিজের পানীয়ে!

চাণক্য কিছু বললেন না। শুধু জীবসিদ্ধির মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি জীবসিদ্ধি পড়তে পারল না।

চাণক্য কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেলেন।

জীবসিদ্ধি পুনরায় বলল,

— ভেবে দেখুন, আচার্য। সমস্ত ঘটনা আমরা শুধুমাত্র দুর্ধরার মুখেই শুনেছি। সে যা বলেছে, তার কতটা মিথ্যা আর কতটা সত্যি তা আমরা জানি না। জানার কোনো উপায়ও নেই। কারণ তার কথার সত্যতার বিষয়ে যে দু-জন প্রমাণ দিতে পারত, যে দুই নারী তারই কক্ষে ছিল, তারা দু-জনেই মৃত!

চাণক্যর ললাটে ভ্রূকুটি দেখা দিয়েছে। তাঁর অন্তর্ভেদী দু-চোখের দৃষ্টি জীবসিদ্ধির উপর নিবদ্ধ।

জীবসিদ্ধি উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলে চলেছে,

— পুরো ঘটনা ঘটার সময়ে কক্ষে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি ছিল না। পুরো ঘটনা আমরা দুর্ধরার মুখেই শুনেছি, এবং বিশ্বাস করেছি! আমি মূর্খ! মহা মূর্খ যে এতক্ষণ সত্যটা চোখের সম্মুখে থেকেও ধরতে পারিনি। ধনানন্দর কন্যা নিজেকে অতি বুদ্ধিমান ভাবে। কিন্তু তার এই পরিকল্পনা কখনোই সফল হবে না। তার বোঝা উচিত যে কারুর না কারুর মনে, আজ হোক বা কাল তার এই কাহিনির প্রতি সন্দেহের উদ্রেক ঘটবেই।

উঠে দাঁড়ালেন চাণক্য। তাঁর ললাটের ভ্রূকুটি গভীর হয়েছে। দু-চোখ অসম্ভব উজ্জ্বল। এগিয়ে এসে জীবসিদ্ধির দু-কাঁধ চেপে ধরলেন। উত্তেজিত ভঙ্গিতে বললেন,

— কী বললে? কী বললে তুমি? তার কথার কোনো সাক্ষী নেই। তাই না? রাজকুমারীর কথার সত্যতার প্রমাণ দেওয়ার মতো কেউ কক্ষে ছিল না। তাই না?

চাণক্যর আচরণে বিস্মিত হচ্ছে জীবসিদ্ধি। হঠাৎ কী হল আচার্যর?

ধীরস্বরে বলল,

— হ্যাঁ, আচার্য! যুক্তি দিয়ে ভাবলে রাজকুমারীর উপর সন্দেহ হবেই! তার কথার সত্যতার প্রমাণ কী?

— যথার্থ! যথার্থ বলেছ হে, জীবসিদ্ধি! কোনো দাস বা রক্ষী দেখেনি মধুবনকে রাজকুমারী দুর্ধরার পাত্র থেকে ঢেলে দেওয়া সুরা পান করতে। কেউ ছিল না কক্ষে।

জীবসিদ্ধিকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন চাণক্য। বললেন,

— ওহে জীবসিদ্ধি, প্রতিবারের মতোই এইবারও তোমাকে ছাড়া এই রহস্যের সমাধান হত না। এইবার এই রহস্যের যবনিকাপাতের সময় আসন্ন।

দ্রুত কক্ষের দ্বার খুলে বাইরে বেরোলেন চাণক্য। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকদের উদ্দেশে বললেন,

— এই মুহূর্তে সম্রাটকে যথাশীঘ্র এই কক্ষে আসতে বলো। সঙ্গে ধনানন্দ, রাক্ষস, রাজকুমারী দুর্ধরা এবং কুমার মলয়কেতুকেও উপস্থিত হতে বলো এই কক্ষে। যত শীঘ্র সম্ভব যাও। যাও, যাও!

কয়েক জন সৈনিক দ্রুত আলাদা আলাদা দিকে ছুটল। চাণক্য দ্বার খোলা রেখেই কক্ষে প্রবেশ করলেন পুনরায়। তাঁর ললাটে আর ভ্রূকুটি নেই। কিন্তু তাঁর

দু-চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল। এ দৃষ্টি জীবসিদ্ধির অতিপরিচিত।

আচার্য চাণক্য রহস্যের সমাধান করে ফেলেছেন। এই দীর্ঘ রহস্যের শেষ অঙ্ক উপস্থিত।