২৮. পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ থেকে উৎখাতদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত আইন-প্রণয়ন

অষ্টবিংশ অধ্যায়– পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ থেকে উৎখাতদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত আইনপ্রণয়ন

।।পার্লামেন্টের আইনের দ্বারা বলপূর্বক মজুরির হ্রাস-সাধ।।

সামন্ততান্ত্রিক পোস্তবর্গের বাহিনীগুলিকে ভেঙ্গে দেওয়া এবং জমি থেকে জনগণকে সবলে উৎখাত করার ফলে যে-সর্বহারা-সংখ্যার সৃষ্টি হল, সেই “মুক্ত” সর্বহারা-সংখ্যা যত দ্রুত বেগে বিশ্বের প্রাঙ্গণে নিক্ষিপ্ত হল, সম্ভবত সেই সংখ্যাকে তত দ্রুত নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষমতা নবজাত ম্যানুফ্যাকচারগুলির ছিল না। অন্য দিকে, চিরাভ্যস্ত জীবন-যাত্রা থেকে আচমকা বিচ্ছিন্ন এই লোকগুলিও তেমন চটপট তাদের নোতুন পরিবেশের শৃংখলার সঙ্গে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে পারল না। তারা দলে দলে পরিণত হল ভিখারী, লুঠেরা ও ভবঘুরে—কিছুটা নিজেদের প্রবণতা থেকে কিন্তু বেশিটা ঘটনার প্রকোপ থেকে। এই কারণেই পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে এবং গোটা ষোড়শ শতাব্দী ধরে গোটা ইউরোপ জুড়ে চলল ভবঘুরে-বৃত্তির বিরুদ্ধে রক্তাক্ত আইন-প্রণয়ন। বর্তমান শ্রমিক-শ্রেণীর পিতৃ-পুরুষদের দণ্ডিত হতে হল তাদের জোর করে ভবঘুরে ও নিঃষে রূপান্তরিত হবার দরুন। আইন তাদের গণ্য করল “স্বেচ্ছামূলক” অপরাধী হিসাবে এবং ধরে নিল যে, পুরনো অবস্থার অধীনে কাজ করা তাদের নিজেদের সদিচ্ছার উপরে নির্ভর করে, অথচ যে-অবস্থা এখন আর বিদ্যমান নেই।

ইংল্যাণ্ডে এই আইন-প্রণয়ন শুরু হল সপ্তম হেনরির আমল থেকে।

অষ্টম হেনরি, ১৫৩. বৃদ্ধ ও কাজ করতে অক্ষম ভিখারীরা পেল একটা করে ভিখারী ‘লাইসেন্স’। অন্য দিকে, শক্ত-সমর্থ ভবঘুরেদের জন্য বরাদ্দ হল কশাঘাত ও কারাবাস। তাদের বেঁধে দেওয়া হত গাড়ির পেছনে এবং ক্রমাগত চাবুক মারা হত যে-পর্যন্ত না তাদের শরীর থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করত; তারপরে শপথ নিতে হত যে তারা ফিরে যাবে নিজ নিজ জন্মভূমিতে বা গত তিন বছর যেখানে বাস করেছে, সেখানে এবং নিজেদেরকে নিয়োজিত করবে শ্রমে।” কী কঠোর পরিহাস! অষ্টম হেনরির ২৭তম বিধানে পূর্বোক্ত আইনটির পুনরাবৃত্তি করা হল কিন্তু সেই সঙ্গে নতুন নোতুন ধারা যুক্ত করে তাকে আরো জোরদার করা হল। ভবঘুরেবৃত্তির জন্য দ্বিতীয় বার গ্রেফতার হলে আবার চাবুক মারা হবে এবং সেই সঙ্গে কানের অর্ধেকটা কেটে দেওয়া হবে; কিন্তু তৃতীয় বার ঋলন হলে লনকারীকে দাগী অপরাধী এবং সাধারণ স্বার্থের শক্ত হিসাবে ফাসী দেওয়া হবে।

যষ্ঠ এডোয়ার্ড : তাঁর রাজত্বের প্রথম বছরের ১৫৪৭ সালের একটি বিধানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যদি কেউ কাজ করতে অস্বীকার করে, তা হলে যে-ব্যক্তি তাকে কুড়ে বলে নিন্দা করেছে, সে সেই ব্যক্তির শোলাম (Slave) হিসাবে বাধা থাকতে বাধ্য থাকবে। মনিব তাকে খেতে দেবে রুটি আর জল, পাতলা ঝোল এবং ফেলে-দেওয়া। মাংস, যা সে উপযুক্ত বলে মনে করে। তার অধিকার থাকবে, চাবুক ও শিকলের সাহায্যে, তাকে দিয়ে যেকোনো কাজ করাবার-তা, সে কাজ যতই জঘন্য হোক না। কেন। যদি কোন গোলাম এক পক্ষ কাল গরহাজির থাকে, তা হলে সে সারা জীবনের জন্য গোলামিতে দণ্ডিত হবে এবং তার কপালে ও পিঠে “S” এই অক্ষরটি ছাপ মেরে দেওয়া হবে, যদি সে তিন বার পালিয়ে যায়, তা হলে তাকে দুবৃত্ত বলে ফাসী দেওয়া হবে। মনিব তাকে বিক্রি করতে পারে, দিয়ে দিতে পারে, গোলাম হিসাবে ভাড়া খাটাতে পারে—ঠিক যেন সে একটা ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পত্তি বা গোজাতীয় পশু। যদি গোলামেরা মনিবের বিরুদ্ধে কোনো কিছু চেষ্টা করে, তা হলেও তাদের ফাসী কাঠে প্রাণ দিতে হবে। শান্তিরক্ষী বিচারক’ (জাস্টিস অব দি পিস’) শিকারের মত সেই বদমাশদের খুঁজে বার করবে। যদি এমন ঘটে যে, একজন ভবঘুরে (Vagabond) কুড়েমি করে তিন দিন কাটিয়ে দিয়েছে, তাকে তার জন্মভূমিতে নিয়ে যাওয়া হবে, আগুন-গরম লাল-গনগনে এক লোহা দিয়ে তার বুকের উপরে একে দেয়া হবে ” এবং শিকল পরিয়ে দিয়ে কাজে লাগানো হবে রাস্তায় কিংবা অন্য কোনো খাটুনিতে। যদি ভবঘুরেটি তার জন্মভূমির ভুল ঠিকানা দিয়ে থাকে, তা হলে তাকে আজীবন এই জায়গার, এর অধিবাসীদের কিংবা পৌর-নিগমের গোলাম হয়ে থাকতে হবে, এবং তার গায়ে “S” অক্ষরটি ছাপ মেরে দেওয়া হবে। সকল মানুষেরই অধিকার আছে, ভবঘুরে দের ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাবার এবং তাদের শিক্ষানবীশ হিসাবে কাজ করাবার ছেলে হলে ২৪ বছর বয়সের যুবক হওয়া পর্যন্ত আর মেয়ে হলে পরে ২০ বছর বয়সের যুবতী হওয়া পর্যন্ত। যদি তারা পালিয়ে যায়, তা হলে এই বয়স পর্যন্ত তারা হবে তাদের মনিবদের গোলাম; মনিবেরা যদি চায়, তা হলে তারা তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে পারে, চাবুক দিয়ে মারতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রত্যেক মনিবই পারে তার গোলামের গলায়, হাতে বা পায়ে একটা লোহার বলয় পরিয়ে রাখতে, যাতে করে তাকে সহজেই চেনা যায় বা তার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।[১] এই বিধানটির শেষ অংশে সংস্থান রাখা হয়েছে যে, যদি কোন জায়গা বা লোক তাদের খাদ্য ও পানীয় যোগাতে এবং কাজ জোগাড় করে দিতে ইচ্ছুক থাকেন, সেই জায়গা বা লোক কিছু গরিব মানুষকে নিযুক্ত করতে পারে। এই ধরনের প্যারিশ-গোলাম ইংল্যাণ্ডে উনিশ শতকের অনেক কাল পর্যন্ত রাখা হয়েছে। তাদের বলা হত “চৌকিদার”।

এলিজাবেথ, ১৫৭২ : ১৩ বছরের কাছাকাছি বয়সের লাইসেন্সবিহীন ভিখারীদের কঠোর ভাবে বেত মারা হবে এবং বাঁ কানে দাগিয়ে দেওয়া হবে, যদি না কেউ তাদের দু বছরের জন্য কাজে নেয়; এই অপরাধ দ্বিতীয় বার করলে, তাদের বয়স যদি ১৮ বছরের বেশি হয়, তা হলে ফাসী দেওয়া হবে—যদি না কেউ তাদের দুবছরের জন্য কাজে নেয়; কিন্তু তৃতীয় বার অপরাধ করলে আর দয়া দেখানো হবে। না, জনস্বার্থের বিরোধী হিসাবে ফাসী দেওয়া হবে। অনুরূপ আইন : এলিজাবেথের ১৮ নং বিধান, অনুচ্ছেদ ১৩, এবং ১৫৯৭ সালের আরো একটি। [২]

প্রথম জেমস : ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে এমন যে-কোন লোককে ঘোষণা করা হত বদমাশ এবং ভবঘুরে বলে। শান্তিরক্ষী বিচারকদের কর্তৃত্ব ছিল সংক্ষিপ্ত অধিবেশনে তাদের প্রকাশ্যে চাবুক মারানোর এবং প্রথম বারের অপরাধের জন্য ৬ মাসের কারাদণ্ড দেবার, দ্বিতীয় বারের অপরাধের জন্য ২ বছরের কারাদণ্ড দেবার। জেলে থাকা কালে ঐ বিচারকের বিবেচনা অনুযায়ী যত বার ঠিক মনে করা হবে, তাকে তত চাবুক মারা হবে। সংশোধনের অতীত ও বিপজ্জনক বলে বিবেচিত দুবৃত্তদের বাঁ হাতে “R” অক্ষরটি দাগিয়ে দেওয়া হবে এবং কঠোর শ্রমে নিয়োজিত করা হবে। এই আইনগুলি কার্যতঃ বলবৎ ছিল আঠারো শতকের সূচনাকাল পর্যন্ত, খারিজ করা হয় কেবল অ্যানের ১২ নং বিধানের দ্বারা, অনুচ্ছেদ ২৩।

একই রকমের আইন পাশ করা হয়েছিল ফ্রান্সে, যেখানে সতেরো শতকের মাঝা মাঝি প্যারিসে গড়ে উঠেছিল ভবঘুরেদের (ছন্নছাড়াদের) এক রাজা। এমন কি চতুর্দশ লুই-এর রাজত্বকালের গোড়ার দিকেও ১৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে কোন স্বাস্থ্যবান লোককে যদি কর্মহীন জীবনধারণের উপায়হীন অবস্থায় দেখা যেত, তাকে সরাসরি গোলাম হিসাবে দাঁড়-টানা জাহাজে পাঠিয়ে দেওয়া হত ( ১৭৭৭ সালের ১৩ই জুলাইয়ের অধ্যাদেশ)। নেদারল্যাণ্ডস-এর জন্য পঞ্চম চালস-এর আইন (অক্টোবর, ১৫৩৭), হল্যাণ্ডের রাজ্য ও শহরগুলির জন্য প্রথম বিধি (১০ মার্চ, ১৬১৪), ইউনাইটেড প্রভিন্সেস-এর “প্ল্যাকাট” (২৬শে জুন, ১৬৪৯) ইত্যাদি একই প্রকৃতির আইন।

এইভাবেই কৃষি-জনসংখ্যাকে, উৎকট ও বীভৎসআইনের সাহায্যে, প্রথম জোর করে জমি থেকে উৎখাত করা হল, বাড়ি-ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল; তার পরে, চাবুক মেরে শায়েস্তা করা হল, দাগী করে দেওয়া হল এবং নিপীড়নে-নির্যাতনে মজুরি ব্যবস্থার নব-বিধানের জন্য তৈরি করে নেওয়া হয়।

এটাই যথেষ্ট নয় যে সমাজের এক মেরুতে শ্রমের অবস্থাগুলি মূলধনের আকারে স্তুপীকৃত হল এবং অন্য মেরুতে দলে দলে মানুষ সমবেত হল—এমন সব মানুষ যাদের শ্রমশক্তি ছাড়া বেচবার মত আর কিছু নেই। এটাও যথেষ্ট নয় যে তারা তা স্বেচ্ছায় বিক্রি করতে বাধ্য হল। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনে অগ্রগতি গড়ে তোলে এমন এক শ্রমিক শ্ৰেণী, যা শিক্ষা, ঐতিহ্য ও অভ্যাসের দরুন ঐ উৎপাদন-পদ্ধতির অবস্থাগুলিকে দেখে প্রকৃতির নিয়মাবলীর মত স্বতঃসিদ্ধ ঘটনা হিসাবে। ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতির সংগঠন যদি একরাব পূর্ণ বিকশিত হয়ে যায়, তা হলে তা সমস্ত প্রতিরোধের অবসান ঘটায়। একটি আপেক্ষিক উত্ত-জনসংখ্যার নিরন্তর প্রজনন শ্রমের যোগান ও চাহিদার নিয়মটির দাবি মেটায় এবং, স্বভাবতই, মজুরিকে ধরে রাখে এমন এক চাপের মধ্যে, যা মূলধনের প্রয়োজন সাধন করে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক-সমূহের নিরেট কর্তৃত্ব ধনিকের কাছে শ্রমিকের বশ্যতাকে সম্পূর্ণ করে তোলে। অর্থ নৈতিক অবস্থাবলীর বাইরে, প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগ অবশ্য তখনো ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ব্যতিক্রম হিসাবে। মামুলি ঘটনা-প্রবাহে, শ্রমিককে ছেড়ে দেওয়া যায় “উৎপাদনের প্রাকৃতিক নিয়মাবলী”-র উপরে অর্থাৎ, মূলধনের উপরে তার নির্ভশীলতার উপরে-যে-নির্ভরশীলতার উদ্ভব ঘটে খোদ উৎপাদনের অবস্থাগুলি থেকেই এবং চিরস্থায়ীভাবে নিশ্চয়ীকৃত হয় সেগুলির দ্বারাই। ধনতান্ত্রিক উৎপাদনের ঐতিহাসিক উৎপত্তিকালে ব্যাপারটা ভিন্নরকম। উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণী চায় রাষ্ট্রের ক্ষমতার দ্বারা মজুরি নিয়ন্ত্রণ করতে, অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনের সীমার মধ্যে তাকে ধরে রাখতে, শ্রম-দিবসকে দীর্ঘতর করতে এবং স্বয়ং শ্রমিকে অধীনতার স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে বেঁধে রাখতে-বুর্জোয়া শ্রেণী এটা করতে চায় এবং করতে পারেও। আদিম সঞ্চয়নের এটা একটা আবশ্যিক উপাদান।

চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যে মজুরিশ্রমিক শ্রেণীর উদ্ভব খটে, তারা তখন এবং তার পরবর্তী শতকে ছিল জনসংখ্যার কেবল একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ—এক দিকে গ্রামাঞ্চলে চাষীদের স্বাধীন স্বত্বাধিকারের দ্বারা এবং অন্য দিকে শহরে গিল্ড-সংগঠনের দ্বারা তারা তাদের অবস্থান ছিল সুরক্ষিত। গ্রামে এবং শহরে মনিব এবং শ্রমিক সামাজিক ভাবে ছিল খুব কাছাকাছি। মূলধনের কাছে শ্রমের বশ্যতা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক, অর্থাৎ, উৎপাদন-পদ্ধতির নিজেরাই তখনো ছিলনা কোন নির্দিষ্ট ধন তান্ত্রিক চরিত্র। স্থির মূলধনের তুলনায় অস্থির মূলধনের প্রাধান্য ছিল অনেক বেশি। সুতরাং, মূলধনের প্রত্যেকটি সঞ্চয়নের সঙ্গে মজুরি-শ্রমের চাহিদা বৃদ্ধি পেত, অন্য দিকে, শ্রমের মোগান তাকে অনুসরণ করত মন্থর গতিতে। জাতীয় উৎপাদনের একটা বৃহৎ অংশ—যা পরবর্তী কালে পরিবর্তিত হল ধনতান্ত্রিক সম্মনের ভাণ্ডারে তা তখন পর্যন্ত প্রবেশ করত শ্রমিকের পরিভোগ ভাণ্ডারে।

মজুরি-শ্রম সম্পর্কে আইন-প্রণয়ন ( শুরু থেকেই যার লক্ষ্য ছিল শ্রমিকের শোষণ এবং অগ্রগতির সঙ্গে যা থেকে গেল সমান ভাবে শ্রমিকের স্বার্থবিরোধী )[৩] ইংল্যাণ্ডে সূচিত হয় ১৩৪৯ সালে তৃতীয় এভোয়ার্ডের শ্রমিক-বিধি” (স্ট্যাটিউট অব লেবর”) প্রণয়ন থেকে। ১৩৫০ সালে ফ্রান্সে রাজা জন-এর নামে জারি করা অধ্যাদেশ এই “শ্রমিক-বিধি”-র অনুরূপ। ইংল্যাণ্ডে ও ফ্রান্সের আইন পাশাপাশি চলত এবং তাদের বিষয়বস্তুও হত অভিন্ন। কর্ম-দিবসের বাধ্যতামূলক সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত শ্রম বিধি সম্পর্কে আমি আগেই আলোচনা করেছি (দশম অধ্যায়, তৃতীয় পরিচ্ছেদ); সুতরাং এখানে আর সে বিষয়ে ফিরে যাবনা।

‘শ্রমিক-বিধি’ গৃহীত হয়েছিল কমন সভার জরুরি উদ্যোগে। জনৈক টোরি সরল মনে বলেন, আগে গরিবেরা দাবি করত এত উচু মজুরি যে তাতে শিল্প ও সম্পদ বিপন্ন হত। পরে তাদের মজুরি হল এত নিচু যে তাতেও শিল্প ও মজুরি সমান ভাবে, বরং সম্ভবত, আরো বেশি ভাবে বিপন্ন হল, তবে অন্য দিক থেকে[৪] শহর এবং গ্রামের জন্য, জিনিস-পিছু এবং দিন-পিছু, এক মজুরি-তালিকা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হল। কৃষি-শ্রমিকদের নিজেদের ভাড়া খাটাতে হত বছরের জন্য, শহরের শ্রমিকদের “খোলা বাজারে”। আইনে যে-মজুরি নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে বেশি দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল, বেশি দিলে, ছিল কারাদণ্ডের বিধান; কিন্তু বেশি দেওয়ার চেয়ে বেশি নেওয়া ছিল আরো কঠোর ভাবে দণ্ডনীয়। (এলিজাবেথের ‘শিক্ষানবিশ বিধির ১৮ ও ১৯ ধারায় বেশি মজুরি-দাতার জন্য যেখানে ১০ দিনের কারাদণ্ডের ব্যবস্থা, সেখানে বেশি মজুরি-গ্রহীতার জন্য ব্যবস্থা ২১ দিনের কারাদণ্ডের। ১৩৪৪ সালের একটি বিধি এই দণ্ড আরো বর্ধিত করল এবং মনিবদের ক্ষমতা দিল দৈহিক শাস্তির সাহায্যে আইনতঃ ধার্য মজুরিতে শ্রম আদায় করে নিতে। রাজমিস্ত্রি ও ছুতোর-মিস্ত্রির যে-সব সন্মিলন, চুক্তি ও শপথের মাধ্যমে নিজেদেরকে পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ করে, সেগুলিকে অসিদ্ধ ও অবৈধ বলে ঘোষণা করা হল। চতুর্দশ শতাব্দী থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত শ্রমিকদের কোনো সম্মিলন ছিল বে-আইনী; ঐ বছরে ট্রেড ইউনিয়ন-বিরোধী আইন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ১৩৪৪ সালের শ্রম বিধি রএবং তার বিবিধ অনুবিধির আসল মর্মবাণী স্পষ্ট ভাবে প্রকট হয়ে পড়ে এই ঘটনায় যে, রাষ্ট্র মজুরির সর্বোচ্চ মাত্রা বেঁধে দিলনা।

ষোড়শ শতকে শ্রমিকদের অবস্থা আরো বেশি খারাপ হয়, যা আমরা আগেই জানি। আর্থিক মজুরি বেড়ে গিয়েছিল সত্য, কিন্তু টাকার মূল্য যে-হারে কমে গিয়েছিল, তথা জিনিসপত্রের দাম যে-হারে বেড়ে গিয়েছিল, সেই হারে নয়। সুতরাং, বাস্তবিক পক্ষে মজুরি পড়ে গিয়েছিল। যাই হোক, শ্রমিকদের দাবিয়ে রাখার আইন গুলি চালু ছিল এবং সেই সঙ্গে ছিল, “যাদের কেউ কাজে নিতে চায়না, তাদের কান কেটে দেবার এবং দাগ মেরে দেবার ব্যবস্থা। শিক্ষানবিশ বিধি ৫ এলিজাবেথ, অনুচ্ছেদ ও শান্তি রক্ষী বিচারকদের ক্ষমতা দান করল কতকগুলি মজুরি বেঁধে দিতে এবং বছরের ঋতু এবং জিনিসপত্রের দাম অনুযায়ী সেগুলি সংশোধন করতে। প্রথম জেমস শ্রম-সংক্রান্ত এই নিয়ন্ত্রণগুলিকে তন্তুবায়, সুতো-কাটনি এবং শ্রমিকদের সম্ভাব্য সকল রকমের বর্গের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করলেন।[৫] শ্রমিক-সম্মিলন-বিরোধী আইন গুলিকে দ্বিতীয় জজ সম্প্রসারিত করলেন ম্যানুফ্যাকচার সমূহের ক্ষেত্রে। যথাযথ ম্যানুফ্যাকচার-আমলে ধনতান্ত্রিক উৎপাদন-পদ্ধতি মজুরি-সংক্রান্ত আইনগত নিয়ম কানুনগুলিকে সমভাবে অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকরী করে দেবার মত যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করেছিল; কিন্তু পুরনো অস্ত্রাগারের এই অস্ত্রগুলিকে আবশ্যকমত ব্যবহার করার অধিকার হাতছাড়া করতে শাসক শ্রেণীগুলি রাজি ছিলনা। তবু দ্বিতীয় জজের ৮নং বিধান প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দর্জিদের জন্য, লণ্ডনের ভিতরে ও আশেপাশে, একমাত্র সাধারণ শোকের দিন ছাড়া, ২ শিলিং ৭.৫ পেন্স-এর চেয়ে বেশি দৈনিক মজুরি নিষিদ্ধ করে দিল; তবু তৃতীয় জজের ১৩নং বিধানের ৬৮নং অনুচ্ছেদ রেশম-তন্তুবায়দের মজুরি নিয়মনের কর্তৃত্ব শান্তিরক্ষী বিচারকদের হাতে তুলে দিল; তবু ১৭০৬ সালে, উচ্চতর আদালতের দু-দুবার রায় দিতে হল কেবল এই ব্যাপারটা স্থির করতে যে শান্তিরক্ষী বিচারকদের নির্দেশ অ-কৃষি-শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিনা; তবু, ১৭৯৯ সালে, পালমেন্টের একটা আইনে এই আদেশ জারি করল যে স্কচ খনি-শ্রমিকদের মজুরি এলিজাবেথের একটি বিধান এবং ১৬৬১ ও ১৬৭১ সালের দুটি স্কচ আইনের ধারা নিয়মিত হতে থাকবে। ইতিমধ্যে পরিস্থিতি কেমন পুরোপুরি বদলে গিয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় এমন একটি ঘটনায়, যা ইংল্যাণ্ডের পালমেন্টের নিম্নতর পরিষদে আর কখনো শোনা যায়নি। যে-পরিষদ-ভবনে ৪০০ বছর ধরে প্রণীত হয়েছে কেবল মজুরির সর্বোচ্চ মাত্রা সংক্রান্ত আইন, যার উপরে মজুরি কখনো উঠতে পারবেনা, সেই ভবনে ১৭৯৬ সালে হুইটব্রেড কৃষি-শ্রমিকদের জন্য উত্থাপন করলেন একটি আইনগত সর্বনিম্ন মজুরি বেঁধে দেবার প্রস্তাব। পিট এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন, যদিও স্বীকার করলেন, “গরিবদের অবস্থা নিষ্ঠুর।” সর্বশেষে, ১৮১৩ সালে মজুরি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইনগুলি প্রত্যাহৃত হল। সেগুলি হয়ে পড়েছিল অদ্ভুত অবান্তর ব্যাপার কেননা ধনিক তার কারখানা পরিচালনা করত তার ব্যক্তিগত আইন-প্রণয়নের দ্বারা, এবং গরিব-করের দ্বারা পুষিয়ে দিতে পারত কৃষি-শ্রমিকের মজুরিকে যথাসম্ভব ন্যতম হারে। মালিক এবং শ্রমিকের মধ্যে চুক্তি, নোটিস দেওয়া ইত্যাদির মত শ্রম-বিধির অন্তর্গত সংস্থানগুলি যা লংঘন করলে মালিকের বিরুদ্ধে কেবল দেওয়ানি ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিন্তু যা লংঘন করলে শ্রমিকের বিরুদ্ধে নেওয়া যায় ফৌজদারি ব্যবস্থা, সেগুলি আজও পর্যন্ত (১৮৭৩) পুরোদমে বলবৎ আছে। ট্রেড ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বর্বর আইনগুলি ১৮২৫ সালে সর্বহারা শ্রেণীর ভীতিপ্রদ চেহারার সামনে ভেঙে পড়েছিল। তা সত্বেও, সেগুলি তখন ভেঙে পড়েছিল কেবল আংশিক ভাবে। পুরনো বিধির কতকগুলি সুন্দর অংশের অবলুপ্তি ঘটে কেবল ১৮৫৯ সালে। সর্বশেষে, পালমেন্টের ১৮৭১ সালের ২৯শে জুনের আইনটি ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে আইনত স্বীকৃতি দান করে এই শ্রেণীর আইনের অবশেষগুলিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার ভান করল। কিন্তু ঐ একই তারিখের আরেকটি আইন (হিংসা, হুমকি ও পীড়ন সংক্রান্ত ফৌজদারী আইনের সংশোধনী আইন) কার্যত পুরনো ব্যবস্থাই নোতুন নামে পুনর্বহাল করল। শ্রমিকেরা ধর্মঘট ও তালাবন্ধ’-এর সময় যেসব উপায় অবলম্বন করতে পারত, এই সংসদীয় প্রকৌশলের দ্বারা সেগুলিকে সমস্ত নাগরিকদের সার্বজনিক আইনসমূহ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হল এবং স্থাপন করা হল বিশেষ দণ্ডবিধির অধীনে, যার ব্যাখ্যা করবেন স্বয়ং মালিকেরাইশান্তিরক্ষী বিচারক হিসাবে তাদের ভূমিকায়। দু বছর আগে এই একই কমন-সভা এবং এই একই মিঃ গ্ল্যাডস্টোন সু-পরিচিত সরাসরি ভঙ্গিতে শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার বিশেষ দণ্ডবিধির অবসান ঘটাবার জন্য একটি প্রস্তাব (‘বিল’ ) উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু সেটিকে “দ্বিতীয় পাঠ” (“সেকেণ্ড রিভিং” ) এর বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি, এবং এই ভাবে ব্যাপারটাকে টেনে নেওয়া হয় যে পর্যন্ত না টোরিদের সঙ্গে মৈত্রীবদ্ধ হয়ে “মহান্ লিবারল পাটি” যে-সর্বহারা-শ্রেণী তাকে ক্ষমতায় এনেছিল, তারই বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মত সাহস সঞ্চয় করতে না পেরেছিল। এতটা বেইমানি করেও “মহান লিবারল পার্টি” তৃপ্ত হলনা; শাসক শ্রেণীগুলির সেবায় যারা সব সময়েই আগ্রহী, সেই বিচারকদের সে অনুমতি দান করল “ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে পুরনো আইনগুলিকে আবার খুড়ে তুলতে এবং সেগুলিকে শ্রমিক সম্মিলনগুলির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে। আমরা দেখতে পাই, ৫০০ বছর ধরে নিলজ্জ অহংকারের সঙ্গে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মালিকদের চিরস্থায়ী ট্রেড ইউনিয়ন হিসাবে কাজ করে আসার পরে শেষ পর্যন্ত ইংরেজ পালমেন্ট জনসাধারণের চাপে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আইনকানুনগুলি পরিত্যাগ করল।

বিপ্লবের প্রথম ঝড়েই, ফরাসী বুর্জোয়া শ্রেণী শ্রমিকদের হতে থেকে সম্মিলিত হবার সদ্য-অর্জিত অধিকারটি কেড়ে নেবার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। ১৭৯১ সালের ১৪ই জুন এক হুকুম জারি করে শ্রমিকদের সমস্ত রকমের সম্মিলনকে ঘোষণা করল “স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ঘোষণার বিরুদ্ধে একটি অপপ্রয়াস” বলে, যার জন্য দণ্ড নির্ধারিত হল ৫০০ লিভ র জরিমানা এবং সেই সঙ্গে এক বছরের জন্য সক্রিয় নাগরিকের যাবতীয় অধিকার থেকে বঞ্চনা[৬] এই যে আইন, যা রাষ্ট্রীয় বাধ্যতা-প্রয়োগের মাধ্যমে, মূলধন এবং শ্রমের মধ্যেকার সংগ্রামকে নিবন্ধ রেখেছে এমন মাতার মধ্যে যা সব সময়েই হয় মালিকের পক্ষে অনুকূল, তা বেঁচে আছে বহু বিপ্লব ও রাজবংশের উত্থান পতন সত্ত্বেও। এমনকি, “সন্ত্রাসের রাজত্ব” পর্যন্ত এর গায়ে হাত দেয়নি। কেবল। অতি সম্প্রতি এই আইনটিকে খারিজ করা হয়েছে। এই বুর্জোয়া ক্ষমতা জবর দখলের (কু দে-তা’-র) পক্ষে এর চেয়ে বেশি মেজাজমাফিক ওজর আর নেই। এই আইনটির ব্যাপারে সিলেক্ট কমিটি’-এ ‘রিপোর্টার’ চ্যাপেলিয়ার বলেন, “ধরে নেওয়া গেল যে, মজুরি এখন যা আছে, তা থেকে একটু বেশি হওয়া উচিত ততটা বেশি হওয়া উচিত যে, যে সেই মজুরি পায় তার পক্ষে প্রাণ-ধারণের অত্যাবশ্যক দ্রব্যাদির অভাবজনিত চূড়ান্ত নির্ভরতার অবস্থা থেকে প্রায় ক্রীতদাসত্বের অবস্থারই মত, থেকে তাকে মুক্ত করে, কিন্তু তবু শ্রমিকদের নিজেদের স্বার্থ-সম্পর্কে কোনো বোঝাপড়ায় তাদেরকে আসতে দেওয়া হবে না এবং যাতে করে চূড়ান্ত নির্ভরতার অবস্থা থেকে প্রায় ক্রীতদাসত্বের অবস্থারই মত, তা থেকে নিষ্কৃতি পাবার মত কোন কিছু করতে পারে; কেননা, সে ক্ষেত্রে তাদের প্রাক্তন মনিবদের তথা বর্তমান শিল্পোদ্যক্তাদের, স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হবে”, কেননা, কর্পোরেশনগুলির ভূতপূর্ব মনিবদের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলন হল—আন্দাজ করুন তো, কি তা হল ফরাসী সংবিধানের দ্বারা উদ্ভাসিত কর্পোরেশনগুলির পুনর্বাসন।[৭]

————

১, “এসে অন ট্রেড …”-এর গ্রন্থকার বলেন, ষষ্ঠ এভোয়ার্ডের রাজত্বকালে ইংরেজরা বাস্তবিকই ঐকান্তিক ভাবে ম্যানুফ্যাকচারে উৎসাহদান এবং গরিবদের কর্ম সংস্থানে মনোনিবেশ করে। এটা আমরা জানতে পারি একটি উল্লেখযোগ্য বিধি থেকে, যার শুরুটা এই রকম সমস্ত ভবঘুরেকে চিহ্নিত করে দেওয়া হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ( এসে অন ট্রেড, পৃঃ ৫)।

২. টমাস মোর তাঁর ‘ইউটোপিয়া’য় বলেন, “Therfore the on covetous and unsatiable cormaraunte and very plage of his native contrey maye compasse aboute and inclose many thousand akers of grounde together within one pale or bedge, the husbandmen be thrust owte of their owne, or els either by coneyne and fraude, or by violent oppressioo thcy by put besydes it, or by wrongs and injuries thei be so weried that tney be compelled to sell all : by one meanes, therfore, or by other, either by hooke or crooke they muste needes departe awaye, poore, selye, wretched soules, men, women, husbands, wiues, fatherlesse children, widowes, wofull mothers with their yonge babes, and their whole householde smal in substance, and muche in numbre, as husbandrye requireth many handes. Awaye thei trudge, I say, owte of their knowen accustomed houses, fyndynge no place to reste in. All their housholde stufle, which is very little woorthe, thoughe it might well abide the sale : yet beeynge sodainely thruste owte, they be constrayned to sell it for a thing of nought. And when they haue wandered abrode tyll that be spent, what cant they then els doe but steale, and then justly pardy be hanged, or els go about beggyng. And yet then also they be caste in prison as vagaboundes, because they go aboute and worke not : whom on man wyl set a work though thei neuer so wilyngly profre themselues therto.’ এই সমস্ত গরিব পলাতক, যাদের সম্বন্ধে টমাস মোর বলেন যে তারা চুরি করতে বাধ্য হয়েছে। অষ্টম হেনরির রাজত্বকালে তাদের মধ্যে ৭,২০০ জন বড় ও ক্ষুদে চোরকে নিধন করা হয়। (হলিনশেড, ডেস্ক্রিপশন অব ইংল্যাণ্ড, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ১৬৮)। এলিজাবেথের আমলে, দুবৃত্তদের দলে দলে বেঁধে নেওয়া হত এবং এমন একটি বছরও যেনা, যখন তাদের ৩০০ থেকে ৪০০ জন ফাসি-কাঠের খোরাক হত না। (স্টাইপ : ‘অ্যানালস অব দি রিফর্মেশন এলিজাবেথ’স হাপি রেইন, ১৭৭৫)। এই স্ট্রাইপেরই তথ্য অনুসারে, সমার্সেটে এক বছরে ৪০ জনকে ফাসী দেওয়া হয়, ৩৫ জন লুঠেরার হাত পুড়িয়ে দেওয়া হয়, ৩৭ জনকে চাবুক মারা হয় এবং ১৮৩ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয় সংশোধনের অতীত ভবঘুরে হিসাবে। যাই হোক, তাঁর মতে এই বিরাট সংখ্যক করেদী আসল অপরাধীদেৱ এক পঞ্চমাংশও নয়, বিচারকদের অবহেলা এবং জনসাধারণের নির্বোধ অনুকম্পার প্রসাদে বাকিরা পার পেয়ে যায়। অন্যান্য কাউন্টির অবস্থাও ভাল নয়, কতকগুলির অবস্থা আরো খারাপ।

৩. যখনি আইন-সভা মনিব এবং মজুরের মধ্যে পার্থক্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন সব সময়েই মনিবেরা থাকে তার সদস্য,’ বলেন অ্যাডাম স্মিথ। ‘Lesprit des lois, cest la propriete,’ বলেন লিঙ্গুয়েত।

৪. সফিজিন্স অব ফ্রী ট্রেড, লেখক জনৈক ব্যারিস্টার, লণ্ডন, ১৮, পৃঃ ২০৬। তিনি রুষ্ট ভাবে বলেন, “নিয়োগকর্তার পক্ষে হস্তক্ষেপ করতে আমরা তো যথেষ্ট তৎপর ছিলাম, এখন কি নিযুক্তদের পক্ষে কিছুই করা যায় না?

৫. প্রথম জেম্স-এর ২নং বিধির একটি ধারা থেকে আমরা দেখতে পাই যে কিছু কাপড়-প্রস্তুকারক ‘শান্তিরক্ষী বিচারক হিসাবে নিজেরাই তাদের নিজেদের দোকানগুলিতে মজুরির সরকারি হার নির্ধারণের দায়িত্ব গ্রহণ করল। জার্মানিতে, বিশেষ করে, ত্রিশ বছরের যুদ্ধের পরে, মজুরি দাবিয়ে রাখার বিধি-বিধান সর্বত্র চালু ছিল। যেসব অঞ্চলকে জনশূন্য করা হয়েছে, সেখানে চাকর ও মজুরের অভাব বড় ঝামেলার ব্যাপার। সমস্ত গ্রামবাসীকে নিষেধ করে দেওয়া হয় একক পুরুষ বা একক নারীকে ঘর ভাড়া দিতে; এদের সকলের সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করতে হবে, এবং যদি এরা চাকর হতে অস্বীকার করে তবে কারাগারে নিক্ষেপ করতে হবে এমনকি এরা যদি দৈনিক মজুরিতে চাষীর জন্য বীজ বোনা বা শস্য বেচা-কেনার মত অন্য কাজে নিযুক্তও থাকে, তবু। (ইম্পিরিয়াল প্রিভিলেজেস অ্যাণ্ড স্যংশনস ফর সাইলেসিয়া।) পুরো এক শতাব্দী ধরে ক্ষুদে জার্মান শাসকদের বিধিগুলির মধ্যে ধ্বনিত হত দুর্জন ও দুর্বিনীত ইতর জনতার বিরুদ্ধে হুংকার, যারা তাদের দুর্ভাগ্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করত, আইন-নির্দিষ্ট মজুরিতে অতৃপ্ত থাকত। রাষ্ট্র যে মজুরি তালিকা স্থির করে দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি মজুরি দিতে ব্যক্তিগত ভূস্বামীদের নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তবু ১০০ বছর পরবর্তী কালের তুলনায় কাজের অবস্থা যুদ্ধের পরে মাঝে মাঝে উন্নততর ছিল। ১৯৬২ সাইলেসিয়ার খেতি-চাকরেরা সপ্তাহে দুদিন মাংস খেত, যেখানে আমাদের এই শতকে এমন সব অঞ্চলও আছে, সেখানে বছরে তিন বার মাত্র মাংস দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। তা ছাড়া, পরবর্তী শতাব্দীর তুলনায় যুদ্ধের পরে মজুরি উচ্চতর ছিল। (জি ট্যোগ)

৬. এই আইনের প্রথম ধারাটিতে বলা হয়েছে, ‘L,anean-tissement de toute espece de corporations du meme etat et profession etant l’une des bases fondamentales de la constitution francaise, il est defendu de les retablir de fait sous quelque pretexte et sous quelque forme que ce soit.’ Article IV. declares, that if “des citoyens attaches aux memes professions, arts et metiers prenaient des deliberations, faisaient entre enx des conventions tendantes a refuser de coucer ou .a n’accorder qu’a un prix determine le secours de leur industrie ou de leurs travaux, les dites deliberations et conventions…seront declarees inconstitutionnelles, attentatoires a la liberte et a la declaration des droits de l’homme, andı’; felony, thereforr, as in the old labour-statutes. (“Revolutions de Paris, Paris,’ 1791, to III p. 523)

৭. Buchez et Roux: Historie Parlementaire, t. x p. 195.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *