২০. সময়-ভিত্তিক মজুরি

বিংশ অধ্যায় — সময়-ভিত্তিক মজুরি

মজুরিসমূহ নিজেরাই আবার বিবিধ রূপ পরিগ্রহ করে; গতানুগতিক অর্থনৈতিক গ্রন্থগুলিতে এই ঘটনাটা স্বীকৃতি পায় না; এই সব গ্রন্থ একান্তভাবেই ব্যস্ত থাকে প্রশ্নটির বৈষয়িক দিকটি নিয়ে এবং সেই কারণেই তা রূপগত প্রত্যেকটি পার্থক্যকে উপেক্ষা করে। অবশ্য, এই ধরনের সব কটি রূপের বিশদ ব্যাখ্যা মজুরি-শ্রমের বিশেষ পর্যালোচনার অন্তর্ভূক্ত এবং স্বভাবতই এই গ্রন্থের পরিধির মধ্যে পড়ে না। তবু দুটি মৌল রূপের সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা এখানে অত্যাবশ্যক।

স্মরণীয় যে, শ্রম-শক্তি বিক্রি হয় একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য। সুতরাং যে-রূপান্তরিত শ্রমশক্তির রূপে দৈনিক, সাপ্তাহিক ইত্যাদি মূল্য নিজেকে জাহির করে, তা হল সময়-ভিত্তিক মজুরির রূপ, সুতরাং দৈনিক, সাপ্তাহিক ইত্যাদি মজুরির রূপ।

তারপরে লক্ষণীয় যে, শ্রম-শক্তির দাম ও উদ্বৃত্ত-মূল্যের আপেক্ষিক আয়তনে পরিবর্তন সম্পর্কে সপ্তদশ অধ্যায়ে যে-নিয়মগুলি উপস্থিত করা হয়েছে, সেগুলিই একটি সরল রূপ-পরিবর্তনের মাধ্যমে মজুরির নিয়মাবলীতে পরিণত হয়। অনুরূপ ভাবে, শ্রম শক্তির বিনিময়মূল্য এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মোট দ্রব্যসম্ভার যাতে এই বিনিময়মূল্যটি রূপান্তরিত হয়—এই দুয়ের মধ্যকার পার্থক্য এখন আবার দেখা দেয় আর্থিক মজুরি এবং আসল মজুরির মধ্যকার পার্থক্য হিসাবে। মর্মগত রূপ সম্পর্কে ইতিপুর্বেই যা বলা হয়েছে, বাহ-রূপ সম্পর্কে এখানে তার পুনরাবৃত্তি করা অপ্রয়োজনীয়। সুতরাং আমরা সময়-ভিত্তিক মজুরির কয়েকটি বৈশিষ্ট্যসূচক বিষয়ে আলোচনার মধ্যেই নিজেদেরকে নিবদ্ধ রাখব।

যে পরিমাণ অর্থ[১] শ্রমিক তার দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি হিসাবে পায়, সেটা তার আর্থিক মজুরির পরিমাণ বা মূল্যের অঙ্কে পরিমিত তার মজুরির পরিমাণ। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, কর্ম-দিবসের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী, অর্থাৎ দৈনিক যতটা শ্রম কার্যত সরবরাহ করা হয়েছে তদনুযায়ী, একই দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি-শ্রমের অত্যন্ত বিভিন্ন দামের অর্থাৎ একই পরিমাণ শ্রমের জন্য অত্যন্ত বিভিন্ন পরিমাণ অর্থের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।[২] সুতরাং সময়-ভিত্তিক মজুরির বিষয় বিবেচনা করতে গিয়ে আমরা অবশ্যই আবার দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি ইত্যাদির মোট পরিমাণ এবং শ্রমের দামের মধ্যে পার্থক্য করব। তা হলে, এই দাম অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের এই আর্থিক মূল্য কিভাবে বার করা যায়। শ্রমের গড় দাম বার করা যায় যখন শ্রম-শক্তির গড় দৈনিক মূল্যকে কর্মদিবসের গড় ঘন্টার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হয়। ধরা যাক, যদি শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য হয় ৩ শিলিং, তখন ৬টি শ্রম-ঘণ্টার উৎপন্ন-দ্রব্যের মূল্য, এবং যদি শ্রম-দিবসের দৈর্ঘ্য হয় ১২ ঘণ্টা, তা হলে একটি শ্রম ঘণ্টার দাম হবে ৩/১২ শিলিং অর্থাৎ ৩ পেন্স।

এইভাবে প্রাপ্ত শ্রম-ঘণ্টার দামটি কাজ করে শ্রমের দামের একক পরিমাপ হিসাবে।

এ থেকে বেরিয়ে আসে যে, দৈনিক ও সাপ্তাহিক মজুরি ইত্যাদি একই থাকতে পারে, যদি শ্রমের দাম নিরন্তর কমেও যায়। যেমন, যদি অত্যন্ত কাজের দিনটি হয় ১০ ঘণ্টা এবং শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্যটি হয় ৩ শিলিং, তা হলে কাজের ঘণ্টাটির দাম হবে ৩.৬ পেন্স। যখনি কাজের দিনটি বেড়ে দাঁড়ায় ১২ ঘণ্টা তখনি কাজের ঘণ্টার দাম কমে দাড়ায় ৩ পেন্স; যখনই বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ ঘণ্টা, তখনি এই দাম কমে আঁড়ায় ২.৪ পেন্স। এই সব সত্ত্বেও দৈনিক ও সাপ্তাহিক মজুরি থেকে যায় অপরিবর্তিত। বিপরীত দিকে দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি বেড়ে যেতে পারে, যদিও শ্রমের দাম একই থাকে, কিংবা এমনকি পড়েও যায়। যেমন, যদি কাজের দিনটি ১০ ঘণ্টা এবং শ্রম শক্তির দৈনিক মূল্যটি ৩ শিলিং, তা হলে একটি কাজের ঘণ্টার দাম হবে ৩.৬ পেন্স। যদি ব্যবসা বাড়াবার দরুন শ্রমিক কাজ করে ১২ ঘণ্টা, তা হলে শ্রমের দাম অপরিবর্তিত থাকলে, তার দৈনিক মজুরি তখন, শ্রমের দামে কোনো হ্রাস-বৃদ্ধি না। হয়েই, বেড়ে গিয়ে দাড়ায় ৩ শিলিং ৭.২ পেন্স। একই ফল ফলবে যদি তার শ্রমের দীর্ঘতার পরিমাপ না বাড়িয়ে তার তীব্রতার পরিমাপ বাড়ানো হয়।[৩] তা হলে, শ্রমের দাম স্থির থাকলেও, এমনকি পড়ে গেলেও, আর্থিক দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি বাড়তে পারে। শ্রমিকের পরিবারের আয়ের বেলাতেও এই একই জিনিস খাটে, যখনি পরিবারের অভিভাবকটির দ্বারা ব্যয়িত শ্রমের পরিমাণ তার পরিবারের লোক জনদের শ্রমের দ্বারা বর্ধিত হয়। সুতরাং দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি হ্রাস না করেও শ্রমের দাম কমাবার বিবিধ পদ্ধতি আছে।[৪]

সাধারণ নিয়ম হিসাবে এটা বেরিয়ে আসে যে, দৈনিক, সাপ্তাহিক শ্রম ইত্যাদি নির্দিষ্ট থাকলে, দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি নির্ভর করে শ্রমের দামের উপরে, যা নিজেই পরিবর্তিত হয় শ্রমশক্তির মূল্যের সঙ্গে আর নয়ত তার দাম এবং তার মূল্যের মধ্যে পার্থক্যের সঙ্গে।

সময়-ভিত্তিক মজুরির এককগত পরিমাপ হল গড় শ্রম-দিবসের গড় ঘন্টাসংখ্যা দ্বারা বিভক্ত এক দিনের শ্রম-শক্তির ভাগফল (এক দিনের শ্রমশক্তি / একটি গড় শ্রম দিবসের ঘন্টা)। ধরা যাক, গড় শ্রম-দিবসের ঘন্টা সংখ্যা হল ১২ ঘণ্টা এবং শ্রম শক্তির দৈনিক মূল্য ৩ শিলিং। এই পরিস্থিতিতে একটি শ্রম-ঘণ্টার দাম হল ৩ পেল এবং তার মধ্যে উৎপাদিত মূল্য হল ৬ পেন্স। যদি এখন শ্রমিকটি নিযুক্ত খাকে ১২ ঘণ্টার কম (কিংবা সপ্তাহে ৬ দিনের কম), ধরা যাক ৬ বা ৮ ঘণ্টা, তা হলে, শ্রমের এই দাম থাকা-কালে, সে পায় দৈনিক ২ শিলিং বা ১ শিলিং ৬ পেন্স।[৫] যেহেতু আমাদের প্রকল্প ( হাইপোথসিস) অনুসারে, কেবল তার শ্রম-শক্তির মূল্যের সম পরিমাণ মূল্য উৎপাদন করতে তাকে দৈনিক গড়ে কাজ করতে হবে ৬ ঘণ্টা করে এবং যেহেতু ঐ একই প্রকল্প অনুসারে সে প্রত্যেকটি ঘণ্টার মাত্র অর্ধেকটা কাজ করে নিজের। জন্য আর বাকি অর্ধেকটা ধনিকের জন্য, এটা পরিষ্কার যে, সে যদি ১২ ঘণ্টার কম সময় নিযুক্ত থাকে, তা হলে সে ৬ ঘণ্টায় উৎপন্ন সামগ্রীর মূল্য নিজের জন্য পেতে পারে না। পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলিতে আমরা অত্যধিক পরিশ্রমের সর্বনাশা ফলগুলি দেখেছি; এখানে আমরা দেখছি অপ্রতুল কর্ম-নিয়োগ থেকে উদ্ভূত তার দুঃখ-দুর্দশার উৎসগুলি।

যদি ঘণ্টা-প্রতি মজুরি ধার্য হয়, যাতে করে ধনিক আর দিন-প্রতি বা সপ্তাহ-প্রতি মজুরি দেবার দায়িত্ব গ্রহণ করে না, কেবল সেই ক’ ঘণ্টার মজুরি দেবার দায়িত্ব গ্রহণ করে, যে ক’ ঘণ্টার জন্য শ্রমিককে নিযুক্ত করতে সে মনস্থ করে, সে তাকে ঘণ্টা-প্রতি মজুরি গণনার মূল ভিত্তিটির চেয়েও কিংবা শ্রমের দামের একক গত পরিমাপের চেয়েও অল্পতর সময়ের জন্য তাকে নিযুক্ত করতে পারে। যেহেতু একক নির্ধারিত হয় নিম্ন লিখিত অনুপাতটির দ্বারা :

শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য / একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টার শ্রম-দিবস

 সেহেতু তা স্বভাবতই, যে মুহূর্ত থেকে শ্রম-দিবস একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টা দিয়ে আর গঠিত হয় না, সেই মুহূর্ত থেকেই, হারায় তার সকল তাৎপর্য। মূল্য-প্রদত্ত শ্রম এবং মূল্য-বঞ্চিত শ্ৰম-এই দুয়ের মধ্যে সংযোগ বিনষ্ট হয়ে যায়। তখন তাকে তার নিজের জীবন ধারণের জন্য আবশ্যক কোনো শ্রম-সময় না দিয়েই ধনিক শ্রমিকের কাছ থেকে নিঙড়ে নিতে পারে একটা বিশেষ পরিমাণ শ্রম-সময়। নিয়োগের সমস্ত নিয়মিকতাকে সে ধ্বংস করে দিতে পারে, এবং তার নিজের তাৎক্ষণিক সুবিধা, খেয়াল ও স্বার্থ অনুযায়ী কখনো চাপিয়ে দিতে পারে অতিরিক্ত কাজের প্রচণ্ড গুরুভার কখনো চাপিয়ে দিতে পারে আংশিক বা সামগ্রিক কর্মহীনতা। “শ্রমের স্বাভাবিক দাম” দেবার ভাণ করে সে পারে শ্রমিকের জন্য আনুষঙ্গিক ক্ষতি পূরণের কোনো প্রকার সংস্থান না করেই কাজের দিনকে অস্বাভাবিক ভাবে দীর্ঘায়িত করতে। এই জন্য ১৮৬০ সালে লণ্ডনে ঘণ্টা প্রতি মজুরি চাপানোর যে চেষ্টা ধনিকেরা করেছিল, তার বিরুদ্ধে সেখানকার ইমারতি শিল্পগুলির শ্রমিকেরা সংগত কারণেই বিদ্রোহ করেছিল। শ্রম দিবসের আইনগত সীমা নির্দেশের ফলে এই ধরনের অপচেষ্টার অবসান ঘটে, যদিও তা মেশিনারির প্রতিমোগিতা, নিযুক্ত শ্রমিকদের গুণমানে পরিবর্তন এবং আংশিক বা সার্বিক সংকটের দ্বারা সংঘটিত কৰ্মহানির অবসান ঘটায় নি।

দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে শ্রমের দাম আর্থিক অঙ্কে স্থির থাকতে পারে, এবং তবু তার স্বাভাবিক মানের নীচে নেমে যেতে পারে। শ্রমের দাম ( কাজের ঘণ্টার হিসাবে) স্থির রেখে যত বার কাজের দিনকে তার প্রথাগত দৈর্ঘ্যের বাইরে দীর্ঘায়িত করা হয়, তত বার এই ব্যাপারটা ঘটে। যদি এই ভগাংকটিতেঃ শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য/ শ্রম-দিবস, ‘হর বৃদ্ধি পায়, তা হলে ‘লব’ বৃদ্ধি পায় আরো বেশি দ্রুতগতিতে। শ্রমশক্তির মূল্য, তার ক্ষয়-ক্ষতি-সাপেক্ষ হওয়ায়, তার কার্ষের স্থায়িত্বকালের সঙ্গে বৃদ্ধি পায় এবং সেই স্থায়িত্বকালের বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুততর অনুপাতে বৃদ্ধি পায়। অতএব, শিল্পের অনেক শাখায়, যেখানে কাজের সময়ের উপরে কোনো আইনগত সীমা-নির্দেশ ছাড়া সময়-ভিত্তিক মজুরিই সাধারণ নিয়ম, সেখানে কেবল একটি বিশেষ মাত্রা পর্যন্ত, যথা, দশম ঘণ্টার সমাপ্তি পর্যন্ত, শ্রম দিবসকে স্বাভাবিক বলে গণ্য করার অভ্যাস স্বতঃস্ফুর্ত ভাবেই গড়ে উঠেছে ( স্বাভাবিক কাজের দিন”, “বরাজের কাজ”, “কাজের নিয়মিত সময়”)। এই মাত্রার বাইরে কাজ মানেই “ওভারটাইম”, এবং, ঘন্টার মাপের একক ধরে নিয়ে, এর জন্য দেওয়া হয় অপেক্ষাকৃত ভাল পারিশ্রমিক ( ‘বাড়তি মজুরি”) যদিও প্রায়ই এমন অনুপাতে যা হাস্যকরভাবে কম।[৬] স্বাভাবিক কাজের দিনটির অস্তিত্ব এখানে আসল কাজের দিনের একটি ভগ্নাংশ হিসাবে, এবং, প্রায়ই গোটা বছর জুড়ে, শেষোক্তটির স্থায়িত্ব, পূর্বোক্তটির চেয়ে দীর্ঘতর।[৭] একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে কাজের দিনের সম্প্রসারণের সঙ্গে শ্রমশক্তির দামে এই বৃদ্ধি, বিভিন্ন ব্রিটিশ শিল্পে এমন আকার ধারণ করে যে তথাকথিত স্বাভাবিক সময়ে নিচু দাম শ্রমিককে বাধ্য করে অপেক্ষাকৃত ভাল পারিশ্রমিকের বাড়তি-সময়ে (“ওভার-টাইম”-এ) কাজ করতে—যদি সে আদৌ যথেষ্ট মজুরি পেতে চায়।[৮] শ্রম দিবসের উপরে আইনগত সীমা আরোপ এই সুযোগের অবসান ঘটায়।[৯]

এটি একটি সাধারণ ভাবে পরিজ্ঞাত ঘটনা যে, শিল্পের কোনো শাখায় কাজের দিন যত দীর্ঘ হয়, মজুরি তত কম হয়।[১০] কারখানা-পরিদর্শক এ রেভগ্রেভ ১৮৩৯ থেকে ১৮৫৯ অবধি কুড়ি বছরের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনার সাহায্যে এটা প্রমাণ করেন, যে-পর্যালোচনায় দেখা যায় যে ঐ সময়ে ১০ ঘণ্টা আইনের অধীনে কারখানাগুলিতে মজুরি বেড়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে, ‘যে কারখানাগুলিতে কাজ চলত প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা, সেখানে মজুরি পড়ে গিয়েছিল।[১১]

 ‘শ্রমের দাম যদি নির্দিষ্ট থাকে, তা হলে দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরি নির্ভর করে ব্যয়িত শ্রমের পরিমাণের উপরে”—এই নিয়মটি থেকে, সর্বপ্রথমে অনুসৃত হয় যে, শ্রমের দাম যত কম হবে, শ্রমের পরিমাণ অবশ্যই তত বেশি হবে, অথবা কাজের দিন অবশ্যই তত দীর্ঘ হবে-যাতে করে শ্রমিকের পক্ষে এমনকি শোচনীয় গড়পড়তা মজুরিটি পাওয়া সম্ভব হয়। শ্রমের দামের স্বল্পতা এখানে কাজ করে শ্রম-সময় সম্প্রসারণের প্রেরণা হিসাবে।[১২]

অপর পক্ষে আবার, কাজের সময়ের এই সম্প্রসারণ শ্রমের দামে পতন ঘটায় এক সেই সঙ্গে পতন ঘটায় দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরিতে।

শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য /একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টার শ্রম-দিবস

এর দ্বারা শ্রমের মূল্যের নির্ধারণ প্রমাণ করে যে শ্রম-দিবসের শুধুমাত্র দীর্ঘতা-সাধন ঘটালে, তা শ্রমের দামে পতন ঘটাবে, যদি কোনো ক্ষতিপূরণের সংস্থান না হয়ে থাকে। কিন্তু যে-ঘটনাবলী ধনিককে অনুমতি দেয় শেষ পর্যন্ত শ্রম-দিবসকে দীর্ঘায়িত করতে, তাই আবার তাকে প্রথমে অনুমতি দেয় এবং সর্বশেষে বাধ্য করে শ্রমের আর্থিক দাম হ্রাস করতে—যে পর্যন্ত না বর্ধিত ঘণ্টা-সংখ্যার মোট দাম হ্রাস করা হয় এবং, কাজে কাজেই, দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরিও হ্রাস করা হয়। দুটি ঘটনার উল্লেখই এখানে যথেষ্ট। যদি একজন লোক ১২ জন বা দুজন লোকের কাজ করে, তা হলে শ্রমের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, যদিও বাজারে শ্রমশক্তির সরবরাহ স্থির থাকে। শ্রমিকদের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা ধনিককে সুযোগ করে দেয় শ্রমের দাম দাবিয়ে দিতে; অন্য দিকে, শ্রমের দামে এই পতন তাকে সুযোগ করে দেয় কাজের সময়[১৩] নিয়ে আরো মোচড় দিতে। অবশ্য, মজুরি-বঞ্চিত শ্রমের অস্বাভাবিক পরিমাণের উপরে অর্থাৎ গড় সামাজিক পরিমাণের অতিরিক্ত পরিমাণের উপরে এই কর্তৃত্ব অচিরেই ধনিকদের নিজেদের মধ্যেই পারস্পরিক প্রতিযোগিতার উৎস হয়ে ওঠে। পণ্যের দামের একটা অংশ শ্রমের দাম দিয়ে তৈরি। শ্ৰম-দামের এই মজুরি-বঞ্চিত অংশ পণ্যের দামের মধ্যে ধরার আবশ্যকতা নেই। এটা ক্রেতার কাছে উপস্থিত করা যেতে পারে। এই হল প্রথম পদক্ষেপ, প্রতিযোগিতা যেখানে চালিয়ে নিয়ে যায়। দ্বিতীয় যে পদক্ষেপে তা চালিয়ে নেয়, সেটা হল শ্রমদিবসের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে যে উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টি করা হয় সেই উদ্বৃত্ত-মূল্যকে, অন্ততঃ তার একটা অংশকে, বাদ দেওয়া। এই ভাবে একটি অস্বাভাবিক ভাবে পড়ে যাওয়া পণ্যের বিক্রয়-দাম আবার উঠতে থাকে প্রথম দিকে অনিয়মিত ভাবে, তারপরে ধাপে ধাপে স্থিতিলাভ করে; তখন থেকে এই নিম্নতর বিক্রয়-দামই পরিণত হয় মাত্রাহীন কর্ম-কালের শোচনীয় পরিমাণ মজুরির স্থির ভিত্তিতে, যেমন একেবারে গোড়ায় তা ছিল এইসব ঘটনারই ফলশ্রুতি। মজুরির এই গতিবিধি এখানে কেবল মাত্র উল্লেখ করা হল, যেহেতু প্রতিযোগিতার বিশ্লেষণ আমাদের আলোচ্য বিষয়ের এই বিষয়ের এই অংশের অন্তর্ভুক্ত নয়। যাই হোক, ক্ষণেকের জন্য ধনিকের নিজের মুখেই তার কথা শোনা যাক : “বার্মিংহামে মালিকদের নিজেদের মধ্যে বড় একটা বেশি প্রতিযোগিতা নেই; নিয়োগকর্তা হিসাবে তাদের অনেকেই এমন কাজ করতে বাধ্য হয়, যা করতে অন্যথা তারা লজ্জা বোধ করত; এবং তবু আর বেশি টাকা করা হয় না; কিন্তু কেবল জনসাধারণই সুবিধাটা পায়।”[১৪] পাঠকরা স্মরণে রাখবেন যে, লণ্ডনে দুরকমের রুটি-প্রস্তুতকারক আছে, যাদের মধ্যে একরকমের প্রস্তুত কারকেরা তাদের রুটি বিক্রি করে তার পুরো দামে (“পুরো-দামী” রুটিওয়ালা), অন্য রকমের প্রস্তুতকারকেরা তাদের রুটি বিক্রি করে তার স্বাভাবিক দামের নীচে (নিচুদামী রুটিওয়ালা, (ছাড়-দামে বেচনেওয়ালা”)। পুরোদামী সংসদীয় তদন্ত কমিটির সামনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের এই বলে নিন্দা করে, “ওরা এখন টিকে আছে প্রথমতঃ জনসাধারণকে ঠকিয়ে এবং, তার পরে, তাদের লোকদের ১৮ ঘণ্টা কাজের বদলে ১২ ঘণ্টার মজুরি দিয়ে।’ঐ লোকগুলির মাগনা-আদায়-করা এমকে তৈরি করা হয় প্রতিযোগিতা চালাবার হাতিয়ারে এবং আজও পর্যন্ত তাই চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মালিক রুটি-প্রস্তুতকারীদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাই রাতের কাজ থেকে রেহাই পাবার পথে বাধা। একজন বিক্রেতা যে ছাড়-দামে বিক্রি করে অর্থাৎ ময়দার দামের খরচের হিসাবে রুটির যে-দাম হওয়া উচিত তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করে, সে অবশ্যই তা পুষিয়ে নেবে তার লোকগুলির শ্রমের বিনিময়ে। আমি যদি আমার লোকদের কাছ থেকে ১২ ঘণ্টা শ্রম পাই, আর আমার প্রতিবেশী পায় ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা, তা হলে সে আমাকে বিক্রির দামে হারিয়ে দেবে। লোকগুলি যদি বেশি কাজের জন্য বেশি মজুরির জন্য জিদ ধরতে পারত, তা হলে অবশ্য ব্যাপারটা ঠিক হয়ে যেত।এই ছাড়-দামে বিক্রেতাদের দ্বারা নিযুক্ত শ্রমিকদের অনেকেই বিদেশী ও কিশোর, যারা যে-মজুরিই পাক না কেন, তাতেই খুশি থাকতে বাধ্য।”[১৫]

এই পরিতাপ আরো কৌতুহলকর, কেননা এতে প্রকাশ পায় উৎপাদন-সম্পৰ্কসমূহের নিছক বাহরূপটি ধনিকের মস্তিষ্কে কিভাবে নিজেকে প্রতিবিম্বিত করে। ধনিক জানে যে, শ্রমের স্বাভাবিক দামেও একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরি-বঞ্চিত শ্ৰম অন্তর্ভূক্ত এবং ঠিক এই মজুরি-বঞ্চিত শ্রমই হচ্ছে তার লাভের স্বাভাবিক উৎস। উদ্বৃত্ত-মূল্যরূপ অভিধাটা তার কাছে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন, কেননা তা স্বাভাবিক শ্রমদিবসের মধ্যেই অন্তর্ভূক্ত, যার জন্য, সে মনে করে যে, সে প্রাপ্য মূল্য দৈনিক মজুরির আকারে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু “ওভারটাইম”-এর অস্তিত্ব, শ্রমের চলতি দাম অনুযায়ী শ্রম-দিবসের মাত্রাতিরিক্ত দীর্ঘতা-বিধানের অস্তিত্ব, তার কাছে আস্তত্বশীল। ছাড়-দামে বিক্রয়কারীর মুখোমুখি হয়ে, সে এমন কি এই বাড়তি সময়ের জন্য বাড়তি মজুরি পর্যন্ত দাবি করে। সে আবার এটাও জানে না যে, নিয়মিত কর্ম-কালের কাজের দামের মধ্যে যেমন মজুরি বঞ্চিত শ্রম অন্তর্ভূক্ত ঠিক তেমনি এই বাড়তি সময়ের বাড়তি দামের মধ্যেও মজুরি বঞ্চিত শ্রম অন্তর্ভুক্ত। দৃষ্টান্ত : ১২ ঘণ্টার কর্মদিবসের এক ঘণ্টার দাম ৩ পেন্স। ধরা যাক, একটি কাজের ঘণ্টার অর্ধাংশের ম-ফল; অন্য দিকে, ওভারটাইম কাজের ঘণ্টার দাম ও পেন্স কিংবা একটি কাজের ঘণ্টার ও ভাগ মূল্য-ফল। প্রথম ক্ষেত্রে, ধনিক বিনামূল্যে আত্মসাৎ করে কাজের ঘণ্টার অর্ধেকাংশ; দ্বিতীয়টিতে এক তৃতীয়াংশ।

————

১. স্বয়ং অর্থের মূল্যকে এখানে সব সময়ে ধরা হয়েছে স্থির বলে।

২. “শ্রমের দাম হল সেই পরিমাণ অর্থ, যা দেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রমের বাবদে।” (স্যার এভোয়াড ওয়েস্ট, প্রাইস অব কর্ণ অ্যাণ্ড ওয়েজেস অব লেবর”, লণ্ডন ১৮২৬ পৃঃ ৬৭)। “জমিতে মূলধন প্রয়োগ প্রসঙ্গে প্রবন্ধ” শীর্ষক অনামী লেখাটির লেখকও হলেন ওয়েস্ট। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজের একজন সদস্য দ্বারা, লণ্ডন, ১৮১৫ সালে রাষ্ট্রীয় অর্থতত্ত্বের ইতিহাস একটি যুগান্তকারী রচনা।

৩. শ্রমের মজুরি নির্ভর করে শ্রমের দাম এবং সম্পাদিত শ্রমের পরিমাণের উপরে।শ্রমের মজুরি বাড়লে আবশ্যিকভাবেই শ্রমের দাম বাড়বে। এটা নাও ঘটতে পারে। পূর্ণতর কর্মনিয়োগ এবং অধিকতর পরিশ্রমের ফলে শ্রমের মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, অথচ শ্রমের দাম একই থেকে যেতে পারে। “ওয়েস্ট, ঐ, পৃ ৬৭, ৬৮, ১১২। প্রধান প্রশ্নটি হল : “কিভাবে শ্রমের দাম নির্ধারিত হয়?” ওয়েস্ট অবশ্য মামুলি কথাবার্তা দিয়েই তার বক্তব্য শেষ করেন।

৪. আঠারো শতকের শিল্প-বুর্জোয়া শ্রেণীর গোঁড়া প্রতিনিধি, ট্রেড অ্যাণ্ড কমার্স এর সেই লেখকটি এটা লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁকে আমরা অনেকবার উদ্ধৃত করেছি, যদিও তিনি ব্যাপারটিকে উপস্থিত করেছেন গোলমেলে ভাবে: “শ্রমের দাম নয় ( যার দ্বারা তিনি বুঝিয়েছেন দৈনিক বা সাপ্তাহিক আর্থিক মজুরি ), শ্রমের পরিমাণ নির্ধারিত হয় খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক সামগ্রীর দ্বারা অত্যাবশ্যক দ্রব্য সামগ্রীর দাম অত্যন্ত কমিয়ে দিন, আপনি শ্রমের পরিমাণও আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেবেন। মালিক ম্যানুফ্যাকচারারগণ জানে যে, শ্রমের দামের আর্থিক অঙ্ক আদল বদল করা ছাড়াও শ্রমের দাম বাড়ানোর বা কমানোর নানান উপায় আছে। (ঐ, পৃঃ ৪৮, ৩১)। তাঁর “থ্রী লেকচার্স অন দি রেট অফ ওয়েজেস লণ্ডন ১৮৩৮ এ এন অব সিনিয়র নাম না করেও ওয়েস্ট-এর বইটি ব্যবহার করেছেন। তিনি সেখানে লিখেছেন, “শ্রমিকের প্রধান আগ্রহ তার মজুর্বির পরিমাণটিতে”, (পৃঃ ১৫, অর্থাৎ শ্রমিকের প্রধান আগ্রহ সে যা পায় তাতে, তার মজুর্বির আর্থিক পরিমাণটিতে যা সে দেয় তাতে নয়, তার শ্রমের পরিমাণটিতে নয় !

৫. কর্মনিয়োগের সংখ্যায় এই অস্বাভাবিক হ্রাসের ফল আইনের দ্বারা প্রযুক্ত শ্রম-দিবসের সাধারণ হ্রাসের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। শ্রম-দিবসের অনাপেক্ষিক দৈর্ঘ্যের ব্যাপারে প্রথমটির কিছু করার নেই, এবং তা যেমন ১৫ ঘণ্টার শ্রম-দিবসেও ঘটতে পারে, তেমন ৬ ঘণ্টার শ্রম-দিবসেও ঘটতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে শ্রমের স্বাভাবিক দাম গণনা করা হয় দিনে গড়ে ১৫ ঘণ্টা কর্মরত শ্রমিকের উপরে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দিনে ৬ ঘণ্টা হিসাবে। যদি সে একটি ক্ষেত্রে নিযুক্ত হয় কেবল ৭.৫ ঘণ্টার জন্য এবং অন্য ক্ষেত্রে কেবল ৩ ঘণ্টার জন্য, ফল দাড়ায় সেই একই।

৬. “লেস-তৈরিতে) উপরি-সময়ে মজুরির হার এত কম—ঘণ্টা-প্রতি ১/২ পেন্স ও ৩/৪ পেন্স থেকে ২ পেন্স-যে উপরি-সময়ের কাজের ফলে শ্রমিকের স্বাস্থ্যের ও সহ শক্তির যে ক্ষতি হয়, তার প্রতিতুলনায়, তা অত্যন্ত শোচনীয়। এইভাবে যে সামান্য বাড়তি আয় হয়, সেটুকুও খরচ করে ফেলতে হয় বাড়তি পুষ্টির জন্য”, (“শিশু নিয়োগ কমিশন, দ্বিতীয় বিপোর্ট”, পৃঃ ১৬, নং ১১৭)।

৭. যেমন, কাগজে রঙ লাগানোর কাজে এই শিল্পে কারখানা-আইন প্রযুক্ত হবার আগে। “আমরা খাওয়ার জন্য কোনো ছুটি না নিয়ে দিনের সাড়ে দশ ঘণ্টার কাজ শেষ করে ফেলি টা ৩০ মিনিটে আর তার পরে সবটাই ওভারটাইম’; এবং সন্ধ্যা ৬ বাজার আগে কদাচিৎ কাজ ছেড়ে ওঠি; সুতরাং, বাস্তবিক পক্ষে গোটা বছর ধরেই আমরা ‘ওভার-টাইম’ করি।” (শিশু-নিয়োগ কমিশন’-এর সমক্ষে মিঃ স্মিথের সাক্ষ্য প্রথম রিপোর্ট, পৃঃ ১২৫)।

৮. যেমন, স্কচ ‘ব্লিচিং’-কারখানায় “স্কটল্যাণ্ডের কিছু অঞ্চলে (১৮৬২ সালের কারখানা-আইন প্রবর্তনের আগে) এই কাজটি পরিচালনা করা হত এক ধরনের ওভার-টাইম’ ব্যবস্থার মাধ্যমে; কাজের নিয়মিত সময় ছিল দিনে ১০ ঘণ্টা, যার জন্য একজন দৈনিক মজুরি পেত টাকার অঙ্কে ১ শিলিং ২ পেন্স; প্রতিদিন ওভারটাইম হত ৩-৪ ঘণ্টা, যার জন্যে পেত ঘণ্টাপিছু ৩ পেন্স হারে। এই ব্যবস্থার ফল দাঁড়ায় এই নিয়মিত ঘণ্টা কাজ করে কেউ সপ্তাহে ৮ শিলিং-এর বেশি আয় করতে পারত নাওভারটাইম বাদ দিয়ে তারা একটা ন্যায্য দিনের মজুরি পেত না।” (“রিপোর্ট ফ্যাক্টরিজ, ৩০ এপ্রিল ১৮৬৩, পৃঃ ১০)। “দীর্ঘতর সময় কাজ করার জন্য বয়স্ক পুরুষ শ্রমিকদের বেশি মজুরির প্রলোভন ছিল এত প্রবল যে তা প্রতিরোধ করা যেত না।” (ঐ, ১৮৪৮, পৃঃ ৫)। লণ্ডনে বই-বাঁধাইয়ের কাজে নিযুক্ত আছে বহু সংখ্যক তরুণী, বয়স ১৪ থেকে ১৫; তাদের কাজ করার কথা চুক্তিনামা অনুসারে নিদিষ্ট কয়েক ঘণ্টা। সে যাই থাক, প্রত্যেক মাসের শেষ সপ্তাহে তাদের কাজ করতে হয় রাত ১০, ১১, ১২, এমনকি ১টা পর্যন্ত-বয়স্ক শ্রমিকদের সঙ্গে পাঁচ-মিশেলি সংসর্গে। “মালিকেরা তাদের প্রলুব্ধ করে বাড়তি পয়সা ও রাতের খাবারের লোভ দেখিয়ে; তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয় কাছাকাছি কোন হোটেলে। এই ভাবে এই তরুণী-অমৃতপুত্রীদের মধ্যে (শিশু নিয়োগ কমিশন”, পঞ্চম রিপোর্ট, পৃঃ ৪৪, নং ১৯১) যে ব্যাভিচারের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তার ক্ষতিপূরণ হয়ে যায় এই ঘটনায় যে, অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে তারা বহুসংখ্যক বাইবেল ও ধর্মগ্রন্থও বাঁধাই করে থাকে।

৯. ‘রিপোর্টস ফ্যাক্টরিজ’, ৩০ এপ্রিল ১৮৬৩, ঐ দ্রষ্টব্য। ১৮৬০ সালে বিরাট ধর্মঘট ও ‘লক-আউট’ চলাকালে পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন করে, লণ্ডনের শ্রমিকেরা ঘোষণা করেছিল যে, তারা ঘণ্টার হিসাবে মজুরি মেনে নেবে কেবল দুটি শর্তে : ১) কাজের ঘণ্টার দামের সঙ্গে যথাক্রমে ৯ ও ১০ ঘণ্টার স্বাভাবিক কাজের বোজ কায়েম করতে হবে এবং ৯ ঘণ্টার কাজের বরাজের চেয়ে ১০ ঘণ্টার কাজের নোজর বেলায় ঘন্টা-পিছু মজুরি উচু হবে : (3) স্বাভাবিক কাজের রোজের বাইরে প্রতিটি কাজের ঘণ্টাকে ওভারটাইম বলে ধরতে হবে এবং তার জন্য আনুপাতিক ভাবে উচ্চতর হারে মজুরি দিতে হবে।

১০. এটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, যেখানে দীর্ঘতর কাজের দিনই রেওয়াজ, সেখানে অল্পতর মজুরিও রেওয়াজ। (রিপোর্টস ফ্যাক্টরিজ, ৩১ অক্টোবর, ১৮৬৩, পৃঃ ৯)। “যে-কাজের জন্য পাওয়া যায় সামান্য খাবারের খয়রাতি, সেই কাজটাই অত্যধিক লম্বা।” (জনস্বাস্থ্য, ষষ্ঠ রিপোর্ট, ১৮৬৪ পৃঃ ১৫)।

১১. ‘রিপোর্ট ফ্যাক্টরিজ, ৩০ এপ্রিল, ১৮৬০, পৃঃ ৩১, ৩২।

১২. দৃষ্টান্ত স্বরূপ, ইংল্যাণ্ডের হাতে পেরেক তৈরি করার মজুরের যে শোচনীয় সাপ্তাহিক মজুরি পায়, তার জন্যও তাদের খাটতে হয় দৈনিক ১৫ ঘণ্টা করে। এটা দিনের অনেকটা সময় (সকাল ৬টা থেকে রাত আটটা অবধি) এবং মাত্র ১১ পে বা ১ শি পেতে তাকে গোটা সময়টাই দারুণ খাটতে হয়। আর তা ছাড়া আছে যন্ত্রের ক্ষয়-ক্ষতি, আগুন জালানোর খরচ এবং বাজে লোহার জন্য ক্ষতি—সব মিলিয়ে এ থেকেও আবার বেরিয়ে যায় ২২ বা ৩ পেন্স। (শিশু নিয়োগ কমিশন তৃতীয় রিপোর্ট, পৃঃ ১৩৬ নং ৬৭১) ঐ একই সময়ে মেয়েরা পায় সপ্তাতে মাত্র ৫ শি (ঐ, পৃঃ ১৩৭ নং ৬৭১)।

১৩. যদি কোন কারখানা-শ্রমিক প্রচলিত দীর্ঘ সময় কাজ করতে অস্বীকার করত, তা হলে অচিরেই তার জায়গায় এমন কাউকে নিয়োগ করা হত যে, যে-কোনো দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে রাজি হত; এই ভাবে আগের লোকটিকে কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হত।” (কারখানা পরিদর্শকদের রিপোর্ট, ৩০শে এপ্রিল, ১৮৪৮, সাক্ষ্য পৃ ৩৯, ঢাকা ৫৮) “যদি একজন মানুষ দুজনের কাজ করে তা হলে সাধারণত মুনাফার হার বেড়ে যায় শ্রমের বাড়তি যোগানের দরুন তার দাম কমে যায় বলেই এটা হয়।” ও সিনিয়র, ঐ, পৃঃ ১৫)।

১৪. ‘শিশু-নিয়োগ কমিশন’, তৃতীয় বিপোর্ট, সাক্ষ্য, পৃঃ ৬৬, নং ২২।

১৫. “রিপোর্ট ইত্যাদি : রুটি-কারখানার ঠিকা-মজুরদের অভিযোগ সম্পর্কে”, গুন, ১৮৬২, পৃঃ ৫২। সাক্ষ্য, নোট ৪৭৯, ৩৫৯, ২৭। যাই হোক, পুরো-দামী রুটি-ওয়ালারাও তাদের লোকদের রাত ১১টা থেকে পর দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করে তার পরে তাদের কাজ করানো হয় গোটা দিন সেই সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। এ কথা উপরে বলা হয়েছে এবং “পুরোদামী”-দের মুখপাত্র বেনেট নিজেই স্বীকার করেছেন। (ঐ, পৃঃ ২২)।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *