১২. মাঝখানে বিরতি

মাঝখানে বিরতি

১৯৭২ সালে যুদ্ধজয়ের পর যখন পাকিস্তানি বন্দিরা ভারতের উদ্দেশ্যে এ ভূখণ্ড ত্যাগ করে, তখন আমি জানতে পারি প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন ধর্ষিতা নারী এ বন্দিদের সঙ্গে দেশ ত্যাগ করছেন। অবিলম্বে আমি ভারতীয় দূতাবাসের সামরিক অফিসার ব্রিগেডিয়ার অশোক ভোরা এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত মরহুম নুরুল মোমেন খান যাকে আমরা মিহির নামে জানতাম তাঁদের শরণাপন্ন হই। উভয়েই একান্ত সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে এসব মেয়েদের সাক্ষাৎকার নেবার সুযোগ আমাদের করে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নওসাবা শরাফী, ড. শরীফা খাতুন ও আমি সেনানিবাসে যাই এবং মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা লাভ করি।
–নীলিমা ইব্রাহিম, আমি বীরাঙ্গনা বলছি

.

‘প্রতিশোধ! কার প্রতি?’ মহিলা সমাজকর্মী একজন তো আকাশ থেকে পড়লেন। অথচ তারা ঘোষণা দিতে দিতে ব্যারাকে ঢুকেছিলেন যে, তোমরা চলে যেয়ো না। আমরা তোমাদের জন্য কিছু করতে এসেছি, আমরা তোমাদের সাহায্য করতে এসেছি। হাত বাড়িয়ে সাহায্য নেওয়ার বদলে সামনের মেয়েটি বারুদের মতো জ্বলে ওঠে, ‘শুনবেন কার ওপর প্রতিশোধ? এই সোনার বাংলার ওপর, এর সোনার টুকরো ছেলেদের ওপর আর…’

‘ব্যস ব্যস তোমাকে আর ব্যাখ্যা করতে হবে না। কী কথা-প্রতিশোধ!’ তিনি দু’কদম পিছিয়ে যান। ওখানে তখন ভয়ানক অরাজকতা। একজনের বাবা এসেছে মেয়েকে নিতে, সে কিছুতেই যাবে না। আরেকজন সমাজকর্মী তাকে আগ বাড়িয়ে বলছেন, ‘বেশ তো বাবার সঙ্গে যেতে না চাও, আমার বাড়ি চলো!’

‘আপনার বাড়ি? কেন?’ এ মেয়েটি আরেক কাঠি সরেস। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে ওস্তাদ। সে চেঁচিয়ে বলে, আমরা কি চিড়িয়াখানার জন্তু যে, আপনার বাড়ির দরজা খুলে রোজ দর্শনার্থীদের দেখাবেন আর নিজে বাহবা নিবেন?

‘যদি বাহবা নিই তোমার অসুবিধা আছে?’ এবার সমাজকর্মীও রেগে আগুন। ‘পাকিস্তানে গিয়ে তুমি কী করবে? ওখানে তো পতিতালয়ে বিক্রিই হবে?’

‘হলে হব। আপনার অসুবিধা আছে কোনো?’ এ জবাবটা আসে আরেকজনের কাছ থেকে।

‘বাপ রে বাপ, কারা এরা?’ মুক্তির প্রশ্নের জবাবে সেদিনের এক সমাজকর্মী জানান-ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব ধরনের মেয়েই ছিল ওখানে। তবে পরিস্থিতি বুঝতে আমাদের ভুল হয়েছিল। কারণ এটাই ছিল আমাদের জীবনের প্রথম যুদ্ধ। মুক্তিকে তিনি আরো বলেন, এখন একা বসে বসে ভাবি, ওখানে গিয়ে হয়তো তারা বিক্রি হয়ে যাবে, তাদের দিয়ে ব্যবসা করানো হবে, এসব জেনেও এখানে থাকার চাইতে পাকিস্তানে চলে যাওয়াটা তারা প্রেফার করেছিল কেন?

সেদিন সংবাদ পেয়ে কারো কারো বাপ-ভাইয়েরা ক্যান্টনমেন্টে ছুটে আসেন। বিশেষত বাবারা। মেয়ের একগুয়েমি দেখে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বাড়ি ফিরে যান। স্বামীরাও এসেছিল-বউদের নিতে নয়, শাড়ি উপহার দিতে। এটা ছিল তাদের বৈবাহিক ভরণপোষণের শেষকৃত্যানুষ্ঠান।

: এই যে এতগুলি মেয়ে আপনাদের চোখের সামনে দিয়ে দেশ ছেড়ে চলে গেল, এর কোনো অফিসিয়াল রেকর্ড আছে?

: থাকা তো উচিত। যদি নষ্ট না হয়ে থাকে।

: কোথায় থাকতে পারে? কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এটা?

: এটা ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পড়ে সম্ভবত।

: নাকি সমাজকল্যাণ, এখন যেটা মহিলা অধিদপ্তর?

: আরেকটা সোর্স হতে পারে মি. অশোক ভোরা, ভারতীয় দূতাবাসের যিনি মিলিটারি অ্যাটাশে ছিলেন।

: হু, ভারতে থাকতে পারে।

: এটা খুব লজ্জাজনক যে, দেশে কাগজপত্র পাচ্ছি না, বিদেশ খুঁজতে যাচ্ছি। মরিয়মের কাছে ফিরে আসে মুক্তি। ‘আপনি তো শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানে গেলেন না। রয়ে গেলেন। কেন?’ প্রশ্নটা এমন যে, হাতে টিকিট থাকা সত্ত্বেও কোনো প্যাসেঞ্জারকে যেন গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, অস্বস্তিতে মরিয়মের মুখে মাছির মতো ঘাম ফোটে। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। কাঁপা কাঁপা হাত দুটি শাড়ির ভাঁজের নিচে তলপেটে কী যেন খোঁজে। কারণ সমস্যাটা তার নয়, এখন আঙুলের চাপে নিষ্পেষিত হচ্ছে যা–সেই গর্ভাধারের।

মেয়েগুলোর তখন ওয়ার প্রিজনারের স্ট্যাটাস। তারা হানাদার বাহিনীর সদস্যদের হয়তো পাতানো স্ত্রী বা সঙ্গী, একদল ক্রিমিনালের সঙ্গে আরেক দল। ক্রিমিনাল, ভারতের ওপর দিয়ে ট্রেনে চেপে পাকিস্তান চলে যাবে। পরিচয়টা এমন গুলিয়ে ওঠে যে, নয় মাসের খুন-ধর্ষণ-নির্যাতনের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। অবশ্য সবকিছুই তখন উল্টেপাল্টে গিয়েছিল। ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি সৈন্যরা বন্দি। ভারতীয়রা সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওখানে। সেনানিবাসের ভূগর্ভস্থ বাংকার আর টর্চার চেম্বারগুলোর জমাটবাঁধা কালচে রক্তে ঝাঁকে ঝাঁকে উঁশ মাছি। মেঝেতে, দেয়ালের গায়ে চর্বি-মাংসের কালশিটে দাগ। যত্রতত্র মেয়েদের হাতের চুড়ি, লম্বা লম্বা। চুলের স্তূপ। হাড় থেকে পচা-গলা মাংসের দলা তখনো খসে পড়েনি। কোনো প্রতিকার ছাড়াই হঠাৎ সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল। মেয়েরা তখন বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার প্রতীক্ষা করছে। তিনি পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে ওয়ার প্রিজনারদের ভারত পর্যন্ত যাওয়ার ছাড়পত্র দেবেন। এ রকম অনিশ্চয়তায় মরিয়মের পেটের বাচ্চা নড়াচড়া জুড়ে দেয়। পুনর্বাসনকেন্দ্রে গর্ভপাতের সর্বোচ্চ মেয়াদ চার মাস। এর পর বিদেশি ডাক্তারদেরও সাধ্যের বাইরে চলে যাবে। কেন্দ্রের দ্রুত চিকিৎসা কর্মসূচির আন্ডারে মরিয়ম ভর্তি হয়ে গেল। সেখানে চিকিৎসা, বিশ্রাম তারপর গর্ভপাতের লম্বা সিরিয়াল। তত দিনে তার সঙ্গের মেয়েরা যুদ্ধবন্দি সৈন্যদের সঙ্গে ভারত হয়ে পাকিস্তান চলে গেছে।

‘তা না হলে আপনিও যেতেন?’

‘যেতাম হয়তো।’

‘এ ব্যাপারে আপনার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল?’ মুক্তির পেশাদারি প্রশ্নের জবাবে মরিয়ম পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘কোন ব্যাপারে?’

‘এই ধরেন পাকিস্তানে যাওয়ার ব্যাপারে? ওখানে গিয়ে কী করতেন, কোথায় থাকতেন, হেন-তেন এসব।’

‘দেশে থাকলে কোথায় থাকতাম, কী করতাম–হেন-তেন এসব কি তখন ঠিক করা ছিল? বা এখনো কি ঠিক আছে?’ মরিয়মকে উত্তেজিত হতে দেখে মুক্তি চুপ মেরে যায়। ওই জেনারেশনটাই অদ্ভুত। একবার চটে গেলে কথা বলাই হয়তো বন্ধ করে দেবে। তার তখন রেকর্ডার-টেকর্ডার গুছিয়ে, ক্যাসেট-ব্যাটারি কিছু থুয়ে, কিছু নিয়ে সুড়সুড়িয়ে কেটে পড়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

মরিয়মের কপালের ভাঁজ দ্রুত ঘন হয়। আশ্চর্য! মানুষ বদলালেও প্রশ্নের ধরন ধারণ বদলায় না। যখন এসব কথা জিগ্যেস করা হতো, আজ থেকে আটাশ বছর আগে, তখন হয়তো মুক্তি জন্মায়ওনি। এরা প্রশ্নগুলো শিখে ফেলে মায়ের পেটে থাকতে। আমাদের নেতা-নেত্রীরা স্টেজের উঠে চিল্লাফাল্লা করেন–দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হইছে। সেই দু’লক্ষ মা-বোন কই? পাকিস্তানে গেছে না-হয় ত্রিশ-চল্লিশজন! বাকিরা কোথায়? তারা কেমন আছে? মুক্তির কাছে মরিয়মের পাল্টা প্রশ্ন, ‘এখন যে বাংলাদেশের মেয়েরা হরদম পাকিস্তানে পাচার হচ্ছে, ওইখানে বেশ্যাবৃত্তি করছে, এই নিয়ে কারো মাথাব্যথা নাই কেন?’

মুক্তি কাচুমাচু করে। কী বলবে বুঝতে পারে না। তার মনে হয়, তখন আর এখনকার মধ্যে একটা ফারাক আছে। তখন সবে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। ঘা-টা দগদগে। সেই তিরিশ-চল্লিশটা মেয়ে স্বেচ্ছায় পাকিস্তান চলে গিয়ে কাঁচা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়েছে–অনুরাধার ভাষায় যা ছিল প্রতিশোধ।

তখন অবশ্য অনুরাধার কথায় মরিয়মের সায় ছিল না। আর থাকবেই-বা কী করে। কোনো কিছু করার জন্য একটা উপলক্ষ লাগে, অবলম্বনেরও দরকার হয়। একটা বড় বিদ্রোহের পেছনে কিছু পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত ঘটনা থাকে, সেসব পৃথিবীর আরেক প্রান্তে সংঘটিত হলেও।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *