নিশান এই উত্তর প্রথম দিচ্ছে এমন নয়, দিন সাতেকের মধ্যে অন্তত সত্তরবার দিতে হয়েছে ওকে এই উত্তরটা।
তাই কোন উত্তেজনা কাজ করছে না আর ওর গলায়। স্বাভাবিক ছন্দে বলল, ‘আশি মতো দিচ্ছিল এখন।’
বিজনকাকু এবারে রীতিমত আফসোসের গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ রে সুবীরদা কিছু বলল না তোকে? মানে বারণ করল না? তুই ছোট থেকে আমাদের পাড়ার গর্ব ছিলিস রে। তুই যখন তোর কোম্পানির থেকে আমেরিকা গেলি তখন সুবীরদার মুখে কত গর্ব। দেখ নিশান, এই দিগদর্শনপুরের আছেই বা কী? নিস্তরঙ্গ একটা গ্রাম। নেহাত সামনে দিয়ে এনএইচ ১২ হাইওয়েটা গেছে তাই দিনরাত বাস-লরির জান্তব আওয়াজ পাচ্ছিস এখন। নাহলে গ্রামে কার বাড়িতে কী রান্না হত, সেটাও পাড়ার লোক জানত। পালদের পুকুরে একটা ঢিল পড়লেও লোকজন জানত। তুই কলকাতা থেকে ফিরে আসতে পারিস আবার এটা আমরাও যেন মেনে নিতে পারছি না রে। তোদের স্কুলের স্যার জগবন্ধুবাবুও বললেন, কেন যে ছেলেটা মাত্র ঊনত্রিশেই এমন একটা সিদ্ধান্ত নিল কে জানে! গোটা ভবিষ্যত পড়ে আছে তোর। আরেকটু ভেবে দেখিস নিশান, বয়েস চলে গেলে আর কিন্তু চাকরি পাবি না।’
বাবাও থমথমে মুখে বলেছিল, ‘চাকরি ছেড়ে দিলি নাকি কোনো গণ্ডগোল হল? না মানে ওরাই কি ছাড়িয়ে দিল?’ নিশান হেসে বলেছিল, ‘আমি ছেড়ে দিলাম বাবা। রোজই আমেরিকা, ইউরোপ করতে হবে। আসলে বিদেশি একটা কোম্পানির উন্নতির জন্য দিনরাত খাটতে ইচ্ছে করল না। আমি ভেবে দেখলাম, এই পরিশ্রমটা যদি আমি আমার গ্রামের জন্য করি বেশ কিছু গ্রামের ছেলে চাকরি পাবে। আমার নিজেরও মনে হবে নিজেদের জন্য কিছু করলাম। ইউনিটেক কোম্পানির লক্ষ লক্ষ এমপ্লয়ির ভিড়ে মিশে যেতে যেতে নিজের পরিচয়টাই হারিয়ে ফেলেছি বাবা।’
সুবীর তরফদার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল ছেলে বাংলাতেই কথা বলছে কিনা! সারাটা জীবন পোস্টম্যানের চাকরি করা মানুষটা অপলক তাকিয়ে বলেছিল, ‘পরিচয় তো এখন হারিয়ে ফেললি। যতক্ষণ কোম্পানিতে ছিলিস ততক্ষণ তোকে লোকে ইঞ্জিনিয়ার বলে চিনত। এই যেমন রিটায়ার করে যাওয়ার পরেও আসেপাশের সব গ্রামে আমায় লোকজন পোষ্টমাষ্টার বলে ডাকে। সারাজীবন মন দিয়ে কাজটা করেছিলাম বলে তো আজ পাঁচটা লোকে চেনে। আর লোকের জন্য না খাটলে লোকে তোকে টাকা দেবেই বা কেন? আমি যখন প্রথম কাজে ঢুকি তখন কত মাইনে ছিল জানিস? ছয়শো টাকা। মন দিয়ে কাজ করে গেছি। তো এখন তুই কী করবি ভেবেছিস? আমাদের যে জমিদারী নেই সেটা তো তুই ভালোই জানিস।’ নিশান বলল, ‘বাবা হাইওয়ের ধারে ওই বিঘে পাঁচেক মতো জমিটা আমার নামে দিয়ে গিয়েছিল না দাদু? যার পেপার্স তুমি আমাকেই দিয়েছিলে রাখতে।’ নিশানের কথা শেষ হবার আগেই বাবা শ্লেষাত্মক স্বরে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ নাতির মুখ দেখার টাকা ছিল না আমার বাবার হাতে। তখন ওই চাষবাস না হওয়া জমিটা তোর নামে লিখে দিয়েছিল। তাও তো রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে কাঠাখানেক ঢুকিয়ে নিয়েছে সরকার। ওতে চাষ করবি নাকি? সোনা ফলাবি ঐ পাথুরে জমিতে? তা ভাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে, আশি হাজারের চাকরি ছেড়ে এসে এখন চাষ কর।’ মা বাইরে দাঁড়িয়ে শুনে চোখের জল ফেলতে ফেলতে এসে বলেছে, ‘শানু আমায় তো ছোটবেলা থেকে তুই সব কথা বলতিস। কী হয়েছে আমায় বল। কেন ছেড়ে দিলি? পঞ্চাননতলায় পুজো দিয়ে এসেছিলাম তুই চাকরি পেতে। সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছিলাম। এই ক’বছর চাকরি করেই কেন তোর মন উঠে গেল রে?’
নিশান অবশ্য এসব কথায় একেবারেই প্রভাবিত হয়নি। বরং ওর মাথায় অন্য নকশায় তখন একটু একটু করে রঙ করছিল ও। মাথার মধ্যে যে নকশাটা রয়েছে সেটা বাস্তবায়িত করতে হবে এই চিন্তাটা অবিরত চলছে। তারই মধ্যে কেন চাকরি ছাড়লির প্রশ্নটা বারংবার আসায় ওর ভাবনায় সাময়িক ছেদ পড়ছে মাত্র। কিন্তু কখনও মিলিয়ে গিয়ে ধূসর রঙ ধারণ করেনি। রঙিন প্রজাপতিরা অনবরত পাখনা মেলতে চাইছে নিশানের স্বপ্নে বা জাগরণে।
আগামীকাল বেশ কয়েকজ মিস্ত্রিকে ডেকেছে ও। জায়গাটা দেখিয়ে এস্টিমেট নিতে হবে। এই কয়েক বছরে নেহাত মন্দ জমায়নি ও। তাছাড়া লোন অ্যাপ্লাই করাও আছে। শুধু জায়গাটা একবার দেখে যাবে। ইনভেস্টিগেশন কমপ্লিট হলেই কেল্লাফতে। মনের মতো করে সাজাতে হবে ‘পথের পাঁচালী’কে। হ্যাঁ ধাবাটার নাম দেবে নিশান পথের পাঁচালী। আর পাঁচটা চলতি ধাবার মতো হবে না এটা। আবার ক্যাফের মতো শুধুই চামচের টাংটাং আওয়াজ শোনা যাবে না। প্ল্যানটা একটু অন্য আছে নিশানের। ধাবার মতো ঘরোয়া একটা পরিবেশ থাকবে, যেখানে ঢুকতে নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষেরও কোনো সংকোচ হবে না। আবার অডি বা মার্সিডিজও ব্রেক কষে দাঁড়াতে দ্বিধা করবে না। বিশ্বাস করে ঢুকতে পারবে উচ্চবিত্তরাও।
পথে যেতে যেতে ছোট্ট বিশ্রাম দেবে ওর পথের পাঁচালী।
কয়েকমুহূর্তের আতিথেয়তা যেন মনে রাখে কাস্টমাররা।
সদ্য চাকরি পেয়ে গঙ্গোত্রী গিয়েছিল নিশান। বাবা-মাকে তীর্থ করাতেও বটে। মায়ের দীর্ঘদিনের শখ ছিল গঙ্গোত্রী যাওয়ার। ওখানেই ছোট্ট একটা গ্রাম হরশিলে পৌঁছেছিল নিশান একাই, ওরা হোটেলেই ছিল।
গ্রামের একটা ঘরে একটু জল চেয়েছিল ও। ঘরের গৃহিণী সুন্দর একটা আসন পেতে দিয়েছিল পাথরের দাওয়াতে। পাথরের গ্লাসে ঠান্ডা জল আর দুটো বাতাসা এনে ধরে ছিল সামনে। আতিথেয়তার সরঞ্জাম ছিল যৎসামান্য। কিন্তু আন্তরিকতার কমতি ছিল না। আর ছিল নিপুণতা। বড় যত্ন করে দু হাত দিয়ে ধরে সম্মান মিশিয়ে দিয়েছিল নিশানকে। ওই যত্নটুকু পথ শ্রমে ক্লান্ত নিশানকে বড় আরাম দিয়েছিল। সেই থেকেই নিশানের দৃঢ় ধারণা হয়েছে, কাস্টমার কেয়ারটা হতে হবে সব থেকে স্ট্রং। যাতে তারা বোঝে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হচ্ছে। মেনুতে দুর্দান্ত আইটেম, দারুণ রান্নার পরেও যেন একজন এসে বলবে, স্যার সব ঠিক আছে তো? টেস্ট ভাল তো? আপনি আমাদের ডাব চিংড়িটা টেস্ট করে দেখতে পারেন, মনে হয় ভাল লাগবে।
এমনিই কিছুটা ঘরোয়া পরিবেশও দিতে চায় নিশান। কিন্তু তার জন্য প্রথম দরকার লোকবল। সেটা ওকে দেবে ওদের পুরনো ক্লাব ‘ঝংকার।’ সন্ধেতে আজও ক্লাবে খালি গলায় গান গায় নীলাভ, সঙ্গে বেঞ্চ বাজিয়ে সঙ্গত করে ঐশিক। স্বপ্ন ছিল একটা ব্যান্ড বানাবে ওরা। ওদিকে সপ্তক আর রিয়ানের ইচ্ছে ছিল সেফ হবে। নিশানের ব্যাচ মেট এরা। দিগদর্শন পুরের প্রতিটা সন্ধেতে একসঙ্গে টিউশনি থেকে ফেরার পথে চলত ওদের ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন দেখা। নিশান মুচকি হেসে বলত, ‘আমি ভবঘুরেই হব এটাই আমার অ্যামবিশন।’ ঝংকার ক্লাবে ওরা কুইজ প্রতিযোগিতা করত, গান- আঁকা কত কিছু।
কিন্তু স্বপ্নগুলো বাস্তবে কারোরই সফল হল না। রিয়ান একটা ফার্স্টফুডের দোকান খুলেছিল,খবর নিয়ে দেখেছে নিশান সেভাবে চলে না। নীলাভ গানের স্কুল খুলেছে, সেখানে ছাত্র-ছাত্রী মিলিয়ে জনা পনেরো। ঐশিক টিউশন করছে। সপ্তক হোটেল ম্যানেজমেন্ট পাস করে, কাছেই একটা চাকরি করছে। অত্যন্ত কম মাইনে পায়। এদিকে সদ্য বিয়ে করে বিপদে পড়েছে। সংসার চালাতে কালঘাম ছুটছে। মোটামুটি ওদের বন্ধুব্যাচের সকলেরই এমন দোদুল্যমান অবস্থা। একমাত্র নিশানই ছিটকে গিয়ে ভাল একটা চাকরি জোগাড় করতে পেরেছিল। সেটা ছেড়ে দিয়েছে শুনে আর সকলের মতো বন্ধুরাও ঠোঁটের ডগায় ইস বলে আফসোস করতে ছাড়েনি।
আফসোস নেই একমাত্র ওর। ও জানে প্রতিমুহূর্তে একটু একটু করে কীভাবে ক্ষয় হচ্ছিল ওর জীবনীশক্তি বিদেশী কোম্পানির ঠান্ডা ঘরে।
সন্ধেতে ঠিক সেই কলেজ লাইফের মতই নিশান এসে দাঁড়াল ওদের ঝংকার ক্লাবে। ঝংকার নামটা বোধহয় দিয়েছিল খোকনকাকু। প্রচুর কবিতা লিখত। ডায়েরি ভর্তি কবিতা। নিশান তখন সবে ক্লাস এইট। হঠাৎই ঘরে পড়তে পড়তে বাইরে হইহল্লার আওয়াজ পেয়েছিল। নিশান ছুটে বাইরে গিয়ে দেখেছিল, রীতিমত কান্নাকাটি পড়ে গেছে ওদের নিঝুম গ্রামটাতে। সন্ধের পর ওদের গ্রামটা নিঝুমই থাকত। তে মাথার মোরে গিয়ে শুনেছিল, মাত্র আঠাশের খোকনকাকু নাকি আত্মহত্যা করেছে। দুদিন আগেই তো স্কুলে যাবার পথে খোকনকাকুকে দেখে কথা বলেছিল নিশান। বেশ হাসি মুখ ছিল। আচমকা মরতে গেল কেন, সেটাই তো মাথায় ঢুকছিল না ওর। পরে শুনেছিল, খোকনকাকুর বাবা নাকি কাকুর কবিতার ডায়েরিগুলো পুড়িয়ে দিয়েছিল। কাকু ওর বাবার দোকানে বসে বসে খদ্দের না সামলে কবিতা লিখছিল। খদ্দের ডেকে ডেকে ফিরে গেছে এক অন্যমনস্ক কবিকে। তাই কবিকে দিতে হয়েছিল তার চরমমূল্য। ব্যবসায়িক চোখে যেগুলো শুধুই আবর্জনা সেগুলোই ছিল কবির বেঁচে থাকার রসদ। সন্তানসম সেই সৃষ্টিকে অগ্নিদগ্ধ হতে দেখেছিল খোকনকাকু চুপচাপ। তারপর বিকেলে যখন বাড়ি ফাঁকা তখন নিজের গায়েও আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
কবিতার সঙ্গেই নিজেকেও শেষ করে দিয়েছিল একইসঙ্গে। কবিতাগুলোও জ্বলেছিল, খোকনকাকুও জ্বলেছিল ওর ডায়েরির মতই। তারপর থেকেই খোকনকাকুর বাবা একেবারে চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। ঝংকার নামটা যেহেতু ছেলের দেওয়া তাই ক্লাবের বাঁশের ঘরটাকে ঢালাই ঘর করে দিয়েছিল খোকনকাকুর বাবা। সামনে শ্বেত পাথরের ফলকে লিখিয়ে দিয়েছিল ঝংকার। ওইভাবেই হয়ত ছেলের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। প্রতিবছর হোলির দিনে ক্লাবে কবিতা কম্পিটিশন করা হয়। যার প্রাইজ আজও খোকনকাকুর বাবাই স্পনসর করে। বয়েস হয়েছে যথেষ্ট। চোখের জ্যোতিও ঘোলাটে হয়েছে। তবুও স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতার কবিতাগুলো মোটা ফ্রেমের চশমার মাধ্যমে পড়ার চেষ্টা করেন। নিশানেরও বড্ড প্রিয় ক্লাবটা। কত স্মৃতি ভিড় করে আসে এখানে দাঁড়ালেই। পনেরোই আগস্ট পতাকা তোলা, প্রভাত ফেরি। সরস্বতী পুজোর অঞ্জলি থেকে দোল উৎসবের প্রসেশন নিয়ে দিগদর্শনপুরের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল ঝংকার ক্লাবটা। এখন বরং এর গরিমা একটু হলেও কমেছে। দিগদর্শনপুরের বহু ছেলে ছোট-বড় চাকরি পেয়ে কলকাতা চলে গেছে। তাই মেম্বার কমে যাওয়ায় সবই হয় একটু নমো নমো করে। বাইরে থেকেই গানের সুর ভেসে আসছিল নিশানের কানে। দরজায় দাঁড়াতেই সেই পরিচিত মুখ দুটোকে একই ভঙ্গিমায় গান গাইতে দেখল। পার্থক্যের মধ্যে নীলাভর হাতে উঠেছে একটা গিটার। কিছু ট্যালেন্ট ঈশ্বর এমন এমন মানুষকে দিয়ে দেন যারা ইচ্ছে করলেও সেই ট্যালেন্ট নিয়ে বেশিদূর এগোতে পারে না। কারণ দু’বেলা দু’মুঠোর জন্য নীলাভর বাবাকে রোজ মুদির দোকানে খাতা লিখতে যেতে হত। গায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখাও সেখানে বিলাসিতা। তাই নীলাভ লোকের বাড়িতে বাড়িতে টিউশন
করে বেড়ায়। তবুও গানটা ওকে ছেড়ে যায়নি দেখেই মনে শান্তি পেল নিশান। ওর পথের পাঁচালীর একমাত্র গায়ক থাকবে নীলাভ।
তারপর বল, প্রস্তাবটা কেমন লাগল? নীলাভ আর ঐশিক দুজনেই গান থামিয়ে বলল, তোর কি সত্যিই মাথাটা গেছে রে? এত বড় একটা চাকরি ছেড়ে এসে এই দিগদর্শনপুরে তুই ধাবা বানাবি? এখানের লোকজনের টাকা আছে? শালা চপ মুড়ি লোকের পয়সায় খেতে ভালবাসে এরা। এরা নাকি পথের পাঁচালীতে গিয়ে নিরালায় গান শুনতে শুনতে খাওয়া-দাওয়া করবে? নিশান গম্ভীর গলায় বলল, সে তোদের চিন্তা করতে হবে না। মাইনে পেলে গাইবি কিনা বল?
নীলাভ আচমকা গেয়ে উঠল,
”শহরে বৃষ্টি নামে জল জমে রাস্তায়
নাগরিক অভিশাপে কবিতারা ভেসে যায়
কাঁচের বৈয়মে রাখা ভালবাসা যতনে
হঠাৎ শব্দ শুনে মহিরূহু পতনের
তুমি আমি মুখোমুখি নিরবতা পালনের গান
শুনে যায়…..”
চলবে নিশান’? নিশান ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘দৌড়াবে। শোন আমি কোনো প্রফেশনাল ব্র্যান্ড চাই না। আমি চাই যারা বসবে তারা বুঝুক, ঘরোয়া পরিবেশে কোনো এক মনযোগী গায়ক এক মনে তাদের মনরঞ্জনের চেষ্টা করছে। ব্যস।’ ঐশিক বলল, ‘কিন্তু আমাদের গান শুনবে রে নিশান? কেমন যেন রূপকথার মত শোনাচ্ছে বিষয়টা।’ নিশান বলল, ‘রূপকথাই তো গড়ে তুলব আমরা। মনে নেই টিউশন থেকে ফেরার পথে আমরা বড় হয়ে কে কী হতে চাই নিয়ে আলোচনা করতাম। নীলাভ আর তুই বলতিস তোরা ব্যান্ড তৈরি করবি। সপ্তক আর রিয়ান এতক্ষণ মুচকি মুচকি হাসছিল।’
নীলাভ আর ঐশিক নিশানের কথায় রাজি হয়ে গেছে দেখে বলল, ‘নিশান, প্লিজ তোর এই আজগুবি প্ল্যানের ভিতরে আমাদের নাম যেন কোনভাবেই ইনক্লুড করিস না।’ নিশান বলল, ‘তোদের জন্যও ভেবে রেখেছিলাম কিন্তু তোরা যদি না আসতে চাস জোর করব না। তবে পথের পাঁচালীর দরজা অলওয়েজ খোলা থাকবে তোদের জন্য। কখনও যদি নিজদের জীবনটাকে একঘেয়ে বোরিং লাগে সেদিন চলে আসিস। যদি কখনও মনে করিস আমি তোদের ঠকাব না তাহলে আসিস।’ সপ্তক বলল, ‘বিয়ে করেছি। অথচ বউয়ের কোন শখই পূরণ করতে পারছি না। মুনমুন খুব ভাল মেয়ে রে। বলে না কিছুই। কিন্তু স্বামী হিসাবে রোজ রোজ হেরে যেতে বড্ড খারাপ লাগে। মুনমুন খুব ভাল আঁকে জানিস তো। ও নিজেও কাজ খুঁজছে একটা।’ নিশান বলল, ‘মুনমুনকে কালকে আমার কাছে নিয়ে আয়। বলবি, কয়েকটা আঁকা যেন সঙ্গে আনে। ইনফ্যাক্ট তোদের বিয়েতে আমি আসতেও পারিনি। তোরা কাল ডিনার করে ফিরবি আমার বাড়ি থেকে।’ সপ্তকের ভ্রুতে প্রশ্ন চিহ্নটা রয়েই গিয়েছিল। শুধু ছোট থেকে নিশানকে চেনার সুবাদে এটুকু জানে যে নিশানের কাছে বেশি প্রশ্ন করে লাভ নেই।
নিশান বেরিয়ে এসেছিল ক্লাব থেকে। গুটিগুটি পায়ে রিয়ান কখন যে ওর পিছু নিয়েছে বুঝতেও পারেনি। আচমকা কাঁধে হাত পড়তে চমকে উঠেছে ও। রিয়ান বলল, ‘এখানে ফার্স্টফুডের দোকান ভাল চলে না রে নিশান। তুই কিন্তু শুধু শুধু এত ইনভেস্ট করবি।’
নিশান হেসে বলল, ‘তুই দিগদর্শনপুরের লোকজনকে খাওয়ানোর জন্য দোকান খুলেছিস। আমি মালদা, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি যাওয়া লোকেদের খাওয়াব। সকলের টাকা নেই ভাবছিস কেন? কখনোও হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে দেখেছিস এখান দিয়ে কী কী গাড়ি যায়? জানিস একেকটা গাড়ির দাম কত? মিনিমাম কুড়ি লাখ, ম্যাক্সিমাম কোটি। তোর মনে হয় গাড়ির মধ্যে বসে থাকা লোকজন গরিব? তারা খাবে এখানে, বিশ্রাম নেবে এখানে। পথের পাঁচালী, সোনার তরী এসব নামের প্রতি আজও বাঙালির টান। শুধু আমাদের সঠিক পাত্রে নিজদের পরিবেশনটুকু করতে হবে। না, সেখানে কোনো চালাকি নয়। একবার বদনাম হয়ে গেলে তোর ধাবার সামনে দিয়ে গাড়ি হু হু করে বেরিয়ে যাবে, স্লো হবে না কোনভাবেই। সেদিন এই আমাদের এন এইচ ১২ ধরে যাচ্ছিলাম বুঝলি রিয়ান, পর পর ধাবাগুলো ফাঁকা। এলইডি লাইট জ্বলছে, দুর্দান্তভাবে সাজানো, সামনে গাড়ি পার্কিংয়ের বিশাল জায়গা, তবুও ফাঁকা। কোনো কাস্টমার নেই। হঠাৎই চোখে পড়ল, কুটুমবাড়ি নামের একটা ধাবা। দেখি লোকজনের ভিড়। কৌতুহলবশত ভিতরে ঢুকেই বুঝলাম, মালিক মানুষের সেন্টিমেন্ট বুঝে নিয়ে ব্যবসা খুলেছে।’ রিয়ান বলল, ‘কিন্তু নিশান আমার তো কোনো পুঁজি নেই রে। আমার দোকানটাই লস খাচ্ছে। আমায় তুই কেন তোর ব্যবসায় ঢোকাবি? নিশান বলল, তোর একটাই কাজ হবে, রাঁধুনিদের ইন্সট্রাকশন দেওয়া আমার মনে হয় এটা তুই বেশ পারবি। রিয়ানের চোখে হাসি।’ হেসে বলল, ‘তুই ব্যাটা স্বপ্ন বেচতে ভালোই পারিস। আছি তোর পথের পাঁচালীতে। নিশান জানে স্বপ্ন দেখা সহজ, স্বপ্ন বিক্রি করাও হয়ত ততটা কঠিন নয়, কঠিন হল সেই স্বপ্নকে সফল করা।’
সপ্তকের স্ত্রী মুনমুন মেয়েটির অনেক গুণ। মেয়েটি শুধু দুর্দান্ত আঁকে তাই নয়, ইন্টিরিওর সম্পর্কেও যথেষ্ট জ্ঞান আছে। নিশান বলল, ‘মুনমুন আমি আমার পথের পাঁচালীকে তোমার পেন্টিং দিয়ে সাজাতে চাই। আমার ওয়ালপেন্টিংগুলোর দায়িত্ব তুমি নাও। আমি তোমার ফিজ দেব, ডন্ট ওয়ারি।’ মুনমুন বেশ ঝকঝকে স্মার্ট মেয়ে। বলল, ‘নামটা যখন আপনি বিভূতিভূষণের কাছ থেকে চুরিই করলেন তখন আমিই বা সৎ থাকি কেন?
আপনার ওয়ালে সত্যজিৎ রায়ের অপু-দুর্গা থেকে ইন্দির ঠাকরুন আঁকব আমি। কাশফুল থেকে চলে যাওয়া ট্রেনের ধোঁয়া থাকবে। পথের পাঁচালী শুধু নামে নয়, থিম পথের পাঁচালী করব আমরা দাদা।’ সপ্তক লুচি আর মাংস মুখে ঢুকিয়ে বলল, ‘যা ইচ্ছে হয় করো। নিশানের পাল্লায় যখন পড়েছ তখন ও তোমায় সর্বজয়ার গ্রামেই নিয়ে যাবে।’ মুনমুনের আগ্রহের শেষ নেই। এই প্রথম কেউ নিশানের ওপরে এতটা ভরসা করল। সপ্তকের স্ত্রী বলে আর মনে হচ্ছে না মুনমুনকে। মনে হচ্ছে যেন নিজের ছোট বোন। যে দাদার উড়ন্ত স্বপ্নকে লাটাইয়ে বেঁধে আকাশে ওড়াতে চাইছে। সুতো কাটা অবস্থায় কিছুতেই ছাড়তে নারাজ।
মুনমুনকে সবটা বোঝাচ্ছিল নিশান, মুনমুন এঁকে চলেছিল ওর স্বপ্নটাকে। ওদের কথার মাঝেই নিশান দেখল মেসেজ ঢুকল, ‘লোন স্যাংশন করে দিয়েছে ব্যাঙ্ক। আর দেরি নয়। দু’মাসের মধ্যে সব কাজ কমপ্লিট করতে হবে ওকে। ১২ই সেপ্টেম্বরেই ওপেনিং। বিভূতিভূষণের জন্মদিনের দিনেই পথের পাঁচালীর উদ্বোধন করবে নিশান। মানুষটার কাছ থেকে যখন এতটা নিলো, তখন এটুকু কৃতজ্ঞতা স্বীকার করাই উচিত।’
পাঁচিল ঘেরা জমিটার গায়ে বড় বড় গাছ ছায়া করে রেখেছে পথের পাঁচালীর মাটিকে। বেশ যত্ন করে গাছগুলোকে বাঁচিয়ে ভিত খুঁড়তে বলল নিশান। জমিতে চাষ হয় না বলে নিশানের দাদুই শিশু থেকে মেহগনি গাছ বসিয়ে দিয়েছিল আজ থেকে বছর বত্রিশ আগে। গাছগুলো এখন বেশ মোটা মোটা হয়েছে। দাদুর হাতে বসানো গাছ বলেই বাবা শত অভাবেও বেচে দেয়নি এদের। নাহলে গাছগুলোর দাম মন্দ নয়। প্রায় এগারোটা শিশু, শাল গাছ আর গোটা ছয়েক মেহগনি গাছের ছায়ায় এমনিতেই স্নিগ্ধ লাগে জায়গাটা। সামনেই সবুজের বুক চিরে চলে গেছে এন এইচ টুয়েলভ। স্নানের পর কালো বাইসনের গা যেমন চকচক করে, নতুন বানানো রাস্তাটার গায়ের রঙেও তেমন জেল্লা। ইঁটের ভিত উঠতে শুরু করেছে পথের পাঁচালীর ঢালাই হবে সামনের সপ্তাহেই। একেবারে দোতলা বিল্ডিং উঠছে। নিশানের খাওয়া ঘুম মাথায় উঠেছে। দিনরাত দাঁড়িয়ে আছে মিস্ত্রীদের সঙ্গে। মাঝে মাঝেই ঐশিক, নীলাভ, রিয়ান, মুনমুন এসে যোগ দিচ্ছে ওর সঙ্গে। এ যেন স্রোতের বিপরীতে হাঁটার লড়াই। এ লড়াইয়ে গ্রামের তেমন কাউকে পাশে পাইনি ও। বরং কানে এসেছে, চাকরি করে যে ক’টা পয়সা জমিয়েছিল নিশান সে কটা পয়সা ওই মাটিতে উড়িয়ে দিয়েই ফিরবে কলকাতা। যত এসব কথা শুনেছে ও ততই যেন জেদটা চেপে বসেছে ওর মধ্যে। রাস্তা থেকে গোটা পার্কিং এরিয়াটা সাদা নুড়ি পাথর বিছিয়ে দিয়েছে। বৃষ্টি হলেও যাতে কাদা না হয়। আবার সৌন্দর্যের কোনো কমতি রাখেনি নুড়ি বিছানো রাস্তাটা, নিজেকে ব্যক্ত করতে কৃপণ নয় সে মোটেই। দেখতে দেখতে চোখের সামনে তৈরি হল পথের পাঁচালী। মুনমুন দিনরাত এক করে খেটে চলেছে। গ্রামের লোকজন বাড়ির বউয়ের এমন বাচালপনা খুব ভাল চোখে দেখছে তা নয়। শুধু সপ্তকের সমর্থন আছে বলেই কেউ কিছু বলে উঠতে পারেনি। মুনমুন বলেছে, ‘দাদাভাই এ আমারও স্বপ্ন। তোমার পথের পাঁচালীতে যারাই আসবে তারা যেন একবার অন্তত জানতে চায়, ওয়াল পেন্টিংএর আর্টিস্ট কে?’ মুনমুনের আঁকার দিকে তাকিয়ে নিশান বলছে, ‘সপ্তক তুই ভাগ্যবান। মুনমুন মারাত্মক ট্যালেন্টেড। আমাদের উচিত ওকে ওর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করা।’ সপ্তক হেসে বলেছে, ‘আসলে নিশান অভাবে ট্যালেন্ট নষ্ট হয়, এটা মানবি তো? আমার কী ক্ষমতা আছে বল ওর এক্সিবিশন করব?’ নিশান নরম গলায় বলেছে, ‘তোর নেই, কিন্তু আমি করব আমার বোনের জন্য।’
নিয়ন আলোয় আর মুনমুনের আঁকায় অপু দুর্গা যেন সত্যিই জীবন্ত হয়ে উঠেছে নিশানের পথের পাঁচালীর বিশাল ডাইনিং হলটাতে। টেবিল কভারগুলোও মুনমুন নিজের হাতে এঁকেছে। এমনকী মাটির ল্যাম্পগুলোতেও গ্রামের পথের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছে ও। অমানুষিক পরিশ্রম করেছে মুনমুন। তাই ভিতরে ঢুকলে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। আগামীকাল নিশানের ধাবার উদ্বোধন। নিশান বলেছে, ‘আমার সর্বজয়াই উদ্বোধক হোক।’ নিশানের মা ফিতে কাটবে। এটাই ওর ইচ্ছে।
কলকাতার বেস্ট কুকদের নিয়ে এসেছে নিশান। ওয়েটার অবশ্য ওদের দিগদর্শনপুরের জনা দশেক বেকার ছেলে। যাদের যোগ্যতা নেহাত কম নয়। প্রত্যেকেই বিএ পাস করে কী করা উচিত বুঝতে পারছে না। তাদেরই নিশান মাসখানেকের ট্রেনিং দিয়ে নিয়েছে। সব স্বপ্নের মতো ঘটে গেল। এখন দুশ্চিন্তা কাস্টমার হবে তো? এ তো আর পুজোর চাঁদা তোলা নয় যে রাস্তায় বাঁশ ফেলে গাড়ি দাঁড় করাবে! অতিথিদের ইচ্ছে হলে তবেই গাড়ির চাকা থামবে এখানে।
হঠাৎই ঐশিক বলল, নিশান তোর ফোনটা বাজছে দেখ। ফোনটা রিসিভ করতেই একজন ভারিক্বি গলার ভদ্রমহিলা বললেন, ‘এটা কি পথের পাঁচালী রেস্টুরেন্ট?’
নিশান একটু ঘাবড়ে গিয়েই বলল, ‘হ্যাঁ বলুন।’ ‘আজ সন্ধেতে কুড়িজনের ডিনার অ্যারেঞ্জ করতে পারবেন? আমার অফিস টিম যাবে ফারাক্কা। তাহলে আপনাদের ওখানেই ডিনার করে যাব। সোস্যাল মিডিয়ায় আপনাদের বিজ্ঞাপন দেখছি ইদানিং।’ নিশান বলল, ‘নিশ্চয়ই। আপনি কি মেনু বলে দেবেন? নাকি আমাদের মেনুতে যেটা থাকবে সেটাই’ ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আপনারা যা খাওয়াবেন সেটাই। শুধু দেখবেন বাঙালিয়ানার লোভে গিয়ে যেন চাইনিজ খাইয়ে দেবেন না।’
নিশানের ঘাবড়ানো মুখের দিকে তাকিয়ে নীলাভ গাইতে শুরু করল,
”খেলবো আজ ওই ঘাসে
তোর টিমে, তোর পাশে”
শোন, আমি আর ঐশিক সোশ্যাল মিডিয়ার যত খাবারের গ্রুপ আছে, যত ফুডিজ পেজ আছে সবেতে বিজ্ঞাপন সেঁটে দিয়েছি বস। তাইলক্ষ্মীর আগমন সুনিশ্চিত।’
নিশানের কানের কাছে বাজছে একজনের কথা, ‘ফিরে তোমাকে আসতেই হবে এই কোম্পানিতে। এসব স্বপ্নের সঙ্গে আমি নেই। স্বপ্ন নয় আমি এটাকে পাগলামি বলব।’ অরুণিমার বলা কথাগুলো এখনও কানের মধ্যে অনুরণন করে চলেছে। ‘আমি কোনো লুজারের সঙ্গে জীবন কাটাতে চাই না নিশান। একই কোম্পানিতে কাজ করার সুবাদেই আমাদের প্রেমটা হয়েছিল। তুমি যখন কোম্পানি ছেড়ে কোন গ্রামে গিয়ে ধাবা খুলে নিজের কেরিয়ারের বিসর্জন দিতে চলেছ, তখন আমিও এ সম্পর্কের ইতি টানছি এখানেই।’
নিশান অপলক তাকিয়েছিল অরুণিমার দিকে। চোখের পলকে ভালোবাসার পারদ নেমে শূন্যে পৌঁছে গিয়েছিল। অথচ নিশান জানত ভালবাসা নামক এ জ্বর কোনোদিন নামবে না ওদের সম্পর্কের থেকে। যেদিন বুঝল এ সম্পর্কের উষ্ণতা হেরে গেল হিমশীতল উদাসীনতার কাছে, সেদিনই প্রথম অনুভব করেছিল ভালোবাসা স্বার্থহীন হয় না। তারপরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিশান ফিরে আসবে ওখান থেকে। শুধু নিজের স্বপ্নের কথা বলতেই অরুণিমা যেভাবে হাতটা ছেড়ে এগিয়ে গিয়েছিল, তারপর পথের পাঁচালী গড়ে ওঠার পরে যে ওর দিকে ফিরেও তাকাবে না সেটুকু বোঝার ক্ষমতা ছিল ওর। যাকে নিজের সবটুকু দিতে চেয়েছিল, পথের পাঁচালীর প্রতিটা ইঁটের সাক্ষী করতে চেয়েছিল সে চলে যাবার পরে আর কেউ ওর পাশে থাকবে কল্পনাও করতে পারেনি। অথচ এখন দেখছে নীলাভ, ঐশিক, রিয়ান, মুনমুন এরা নিজেরাই একে আপন করে নিয়ে নিজেদের মতো প্রচার শুরু করে দিয়েছে। অরুণিমাকে বললেও ও থেকে যেত না এই সম্পর্কে। আর এদের বোধহয় যেতে বললেও থেকে যাবে। কুড়িজন কাস্টমার নিয়ে শুরু হল নিশানদের পথের পাঁচালীর পথ চলা।
দিনগুলো কাটছিল মন্দ নয়। একমাসে খরচ বাদ দিয়ে ইনকাম নেহাত কম নয়। নীলাভ আর ঐশিকের গলাও বেশ ফেমাস হয়ে গেছে পথের পাঁচালীর সঙ্গে। সঙ্গে জমছে রেটিং। খাবারের কোয়ালিটি থেকে পরিবেশ সবেতেই মোটামুটি নম্বর ছিনিয়ে নিচ্ছিল পথের পাঁচালী।
সেদিনও নীলাভ রাত বারোটা নাগাদ ওর গিটার এবং গলাটাকে রেস্ট দেবে বলেই গান বন্ধ করে উঠে পড়েছিল। কাস্টমারও প্রায় ফাঁকা। হঠাৎই একটি মেয়ে কাউন্টারে এসে নিশানকে বলল, ‘উনি কি অনুরোধের গান গাইতে পারেন?’ মেয়েটিকে ভাল করে খেয়াল করল নিশান, পোশাক-আশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ সম্ভ্রান্ত। উচ্চারণে বোঝা যাচ্ছে শিক্ষিত। শুধু চোখের চাউনিতে মনে হচ্ছে মারাত্বকভাবে দিশেহারা। কিছুটা বিভ্রান্ত মনে হচ্ছে। নিশান জোরেই ডাকল নীলাভকে।
নীলাভ কাছে আসতেই বলল, ‘দেখ বস তুই এতদিন গান গাইছিস কেউ কোনোদিন তোকে অনুরোধ করেছে আরেকটা গাওয়ার জন্য?’ নীলাভ একটু ভেবে বলল, ‘দেখ গাইলে শুনেছে ঠিকই, কিন্তু অনুরোধ-উপরোধ তো পাইনি কখনও। কেন বলত?’ নিশান মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, ‘উনি এত রাতে বসে আছেন শুধু তোর গান শুনবেন বলে। ক্যান ইউ ইমাজিন?’
নীলাভ হেসে বলল, ‘পথের পাঁচালীর বয়েস দেখতে দেখতে ছয়মাস হল। প্রতি মাসে ভাল মাইনে পাচ্ছি এখান থেকে, কিন্তু এখনও বুঝতে পারিনি আমার কতটা প্রয়োজনীয়তা আছে এখানে। আজ মন বলছে নীলাভ, তুমি গুরুত্বপূর্ণ বস।’
গিটারটা হাতে নিয়েই নীলাভ গান ধরল.
”তুমি না থাকলে সকালটা এতো মিষ্টি হতো না
তুমি না থাকলে মেঘ করে যেত বৃষ্টি হতো না,
তুমি আছো বলে মন কষাকষি,
করে হাসাহাসি নাক ঘষাঘষি,
রাপা পাপাপা..”
মেয়েটা হঠাৎই নীলাভর গানে গলা মিলিয়ে গাইতে শুরু করল। সঙ্গে মেঝেতে পেন্সিল হিলে আওয়াজ তুলল নাচের ছন্দে।
নিশান দেখল, নীলাভ গান থামিয়ে শুধুই গিটার বাজাচ্ছে। মেয়েটা গেয়ে যাচ্ছে
”তুমি না থাকলে স্বপ্নের রঙ হয়ে যেত খয়েরি
বন বন করে দুনিয়াটা এই পারতো না ঘুরতে….
তুমি না থাকলে রবীন্দ্রনাথ কালীর দোয়াত মাথায় ঠুকে হতো কুপোকাত
রাপা রাপ্পাপা রাম পাম পা”
দুর্দান্ত গলা মেয়েটার। অদ্ভুত ভঙ্গিমায় সাবলীলভাবে গাইছে। মেয়েটা বড্ড মুডি টাইপের। অনেকটা বর্ষার মেঘের আকাশের মতো। এখুনি মেঘ থই থই গোমড়া মুখে বসে ছিল। আবার এখন যেন মুখ জুড়ে রোদের ঝলকানি। নিশানের হাত ধরে টেনে বলল, ‘আপনাকে কি কেউ বলেছে, নিজের চেহারায় সবসময় মালিক মালিক ব্যাপারটা রাখবেন না? যদি না বলে থাকে তাহলে লেটস এনজয়।’
কে জানে কেন নিশানও ওর খামখেয়ালিপনায় সাড়া দিল বহুযুগ পরে। হলে এখন একটাও কাস্টমার নেই। বাইরে শুধুই দ্রুতগামী গাড়ির হুস হুস করে বেড়িয়ে যাবার তাড়া। ঘরে নীলাভর গিটারের সঙ্গে সঙ্গত করছে ঐশিকের ড্রাম। নীলাভ ভরাট গলায় গাইছে.
”তুমি আছ বলে টেক্সাসে বসে তোপসে
মাছেরফ্রাই
নিউজার্সিতে তোমার গাড়িতে হঠাৎ তোমাকে চাই,
তুমি আছ বলে সিসিলিতে আছে সুচিত্রা উত্তম
আজ বাগদাদ, কাল ব্যাবিলনে তোমার সম্মেলন,
তুমি না থাকলে সুকুমার রায়
লুঙ্গি পরে গামছা গলায় খবর পড়ত,
রাপা পাপাপা..”
মেয়েটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘আমি সুচরিতা। আমার ঠাকুমার দেওয়া ব্যাকডেটেড নাম। আমার খুব প্রিয়।’
নিশান হেসে বলল, ‘দারুণ নাম।’
গান শেষ করল নীলাভ। সুচরিতা বলল, ‘আচ্ছা আপনি তো গায়ক। আপনার এই পথের পাঁচালীর কথা আরেকটু ভাবা উচিত নয় কি?’
নীলাভ যে বিলক্ষণ বোঝেনি, সেটা ওর চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সুচরিতা গালে টোল ফেলে হেসে বলল, ‘ডুয়েট গাওয়া উচিত আপনার। একজন ফিমেল সিঙ্গার প্রয়োজন।’ নীলাভ হাসির ছলে বলল, ‘আমি ভবঘুরেই হব এটাই আমার অ্যামবিশন। দেখুন এটা নিশানের অ্যামবিশন ছিল। এখন আমাদের সকলের। যদি আপনিও চান ফিমেল সিঙ্গার হিসাবে জয়েন করতে তাহলে পথের পাঁচালী আপনাকে স্বাগত জানায়।’
নিশান, ঐশিকের সঙ্গে নীলাভও হাসছিল নিজের করা রসিকতায়। কিন্তু সুচরিতা নিশানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘সত্যি? আপনি আমায় রিক্রুট করবেন?’ নিশান এবারে সত্যিই ঘাবড়ে গেছে। এমন সুন্দরী সম্ভ্রান্ত মেয়েকে পথের পাঁচালীর ফিমেল সিঙ্গার হবার প্রস্তাব দেবে এতটা সাহসও ওর নেই। নিশান অপ্রস্তুত গলায় বলল, ‘ম্যাডাম আজ হয়ত আপনি কোন কারণে আপসেট আছেন। তাই নীলাভর করা নিছক মজাটা ধরতে পারেননি। এটা নেহাতই একটা ছোট ধাবা। আমরা কয়েকজ বন্ধু মিলে এটা চালিয়ে থাকি। এখানে চাকরি দেব আপনাকে এমন দুঃসাহস আমার তো নেই।’
সুচরিতা গম্ভীর মুখে বলল, ‘বুঝেছি। কোনো যোগ্যতা নেই আমার তাইতো?’
নিশান কিছু বলার আগেই ঐশিক বলল, ‘বেশ নিশান পথের পাঁচালীর ওনার হলেও আমিও এর একটা পার্ট। আপনি চাইলে থাকতে পারেন এখানে।’ নিশান বলল, ‘কিন্তু ঐশিক ওনার বাড়ি তো দিগদর্শনপুরে নয়। উনি থাকবেন কোথায়?’
সুচরিতা বলল, ‘আমি আপনাদের বিপদে ফেললাম তাই না?’ নীলাভ বলল, ‘নিশান, গেস্টরুমে থাকুক সুচরিতা। ওটা তো করাই হয়েছিল, যদি কোনো ফ্যামিলি হঠাৎ রাতে বিপদে পড়ে অতিথি হয়।’ পথের পাঁচালীর দোতলায় বিশাল হল ঘরের পাশে খান দুই ফ্ল্যাট টাইপের করে রেখেছে নিশান। ভবিষ্যতে যদি ম্যারেজ হল হিসাবে দোতলাটা ভাড়া নেয় কেউ তাহলে ফ্ল্যাট দুটোতে অতিথিরা থাকবে। অথবা হঠাৎই যদি কোনো গেস্ট রাতটুকু কাটিয়ে যেতে চায় এখানে সেই ভেবেই করা হয়েছিল। নীলাভ ওরই একটা ফ্ল্যাটের কথা বলছে। এই মুহূর্তে সুচরিতাকে ফিরিয়ে দেবে এমন ইচ্ছেও নেই নিশানের। পথের পাঁচালীর স্বপ্নে কেউ সামিল হতে চাইছে তাকে চলে যেতে বলতে ও পারবে না। নিশান বলল, ‘সুচরিতা পথের পাঁচালীতে আপনাকে স্বাগত।’
সুচরিতা বড় অযাচিতভাবেই এসেছিল এখানে। দিগদর্শনপুরের পরিবেশে একটু যেন বেমানান। সুচরিতাকে দেখে নিশানের মনে হয় ও যেন ঝাঁ চকচকে জীবন থেকে আচমকাই এসে পৌঁছেছে মাটির কাছাকাছি। মুনমুন এসে জানিয়েছিল, ‘দাদা সুচরিতা একটা প্ল্যান দিয়েছে। পথের পাঁচালীর বিশেষ গেস্টদের জন্য একটা ওয়েলকাম ড্রিংসের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? যেমন ধরুন, গরমে গন্ধরাজ লেবুর ঘোল বা ডাবের জল শাঁসওয়ালা।’
নিশানের মন্দ লাগে না সুচরিতার প্ল্যানগুলো। বেশ নতুনত্ব আছে। কখনও মুনমুন এসে বলে, দাদা সুচরিতা বলছিল, ‘সামনে কয়েকটা ছাতা পেতে টেবিল লাগিয়ে চায়ের একটা সেকশন করতে। সেখানে মাটির ভাঁড়ের চা থেকে তন্দুরি চা সব থাকবে।’ নিশান একপায়ে রাজি।
অনেকেই শুধু চা খাওয়ার জন্য ধাবায় ঢুকে টেবিল আগলে বসে থাকে বেশ খানিকক্ষণ। এতে অন্য কাস্টমারদের অপেক্ষা করতে হয়। চায়ের সেকশান আলাদা করলে সমস্যার সমাধান হয়। প্রায় দিন পনেরো হয়ে গেল সুচরিতা এখানে আছে। নীলাভ, ঐশিক, রিয়ান, মুনমুনের সঙ্গে জমিয়ে বন্ধুত্ব হয়েছে ওর। শুধু নিশানের সামনে এলেই চুপ করে যায়। নীলাভর সঙ্গে যখন গানে গলা মেলায় তখন কাউন্টারে বসেই আড়চোখে তাকায় নিশান। নরম আলোয় ওকে যেন অন্য গ্রহের বাসিন্দা মনে হয় ওর। মাঝে মাঝে চোখাচোখি হলে ঝটিতে চোখ সরিয়েছে নিশান। অদ্ভুত একটা মায়া জড়ানো গলায় সুচরিতা গাইছিল
”শহর জুড়ে যেন প্রেমের মরসুম
আলোতে মাখামাখি আমার এ গ্রীনরুম
কখনও নেমে আসে অচেনা প্যারাসুট
তোমাকে ভালোবেসে আমার এ চিরকুট..”
সমস্ত কাস্টমাররা চলে গেছে। নীলাভ, ঐশিক, রিয়ানও বাড়ির পথে পা বাড়াল। মুনমুনকে রোজই নিয়ে যায় সপ্তক অফিস থেকে ফেরার পথে। পথের পাঁচালীর বিশাল হলে এখন শুধু সুচরিতা আর নিশান। বাইরে দুজন গার্ড আছে। যারা সারারাত পাহারা দেয়।
নিশান এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘তোমার ভয় করে না সুচরিতা? অচেনা জায়গায় একা একা থাকতে? যদি ভয় করে বলতে পার, আমি পড়ার দুজন মেয়েকে বলব তোমার কাছে থাকতে।’ সুচরিতা হেসে বলল, ‘ভয় তো শুধু তোমাকে করে নিশান। সেই প্রথম যেদিন দেখলাম সেদিন থেকে।’
নিশান অবাক হয়ে বলল, ‘আমায়? কিন্তু কেন?’
সুচরিতা বলল, ‘হয়ত নিজের মনকে বশে রাখতে পারি না তাই। যদি ভালোবেসে ফেলি? যদি নিজেকে হারিয়ে ফেলি পথের পাঁচালীর ওই কাশের বনে নিজেকে?’ সামনের দেওয়াল জুড়ে মুনমুনের আঁকা কাশবনের দিকে ইঙ্গিত করল সুচরিতা। নিশানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলল, ‘উঁহু, পৃথিবীর কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি যে ভালোবাসা একতরফা হবে না। তাই নো টেনশন নিশান। বাড়ি যাও নিশ্চিন্তে।’ সুচরিতা ছুটে পেরিয়েছিল সিঁড়িগুলো। নিশান দাঁড়িয়ে দেখছিল ওর চলে যাওয়া।
পথের পাঁচালীকে সফল করতে হবে এই ভাবনা ছাড়া আর কোনো ভাবনা এই ক’মাস ওর মাথায় স্থান পায়নি। দিনরাত ভেবে গেছে আর কী কী ভাবে বাড়ানো যায় ব্যবসাটাকে। দিগদর্শনপুরের মানুষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, ইচ্ছে থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। এখন এই হাইওয়েতে আসা সমস্ত গাড়ি জানে সুস্বাদু খাওয়া আর দারুণ একটা পরিবেশ দিতে পারে একমাত্র পথের পাঁচালী।
তাই কাস্টমার নিয়ে ভাবতে হয় না। বরং আর কয়েকটা টেবিল বাড়লে মন্দ হয় না। এসবের মাঝে সুচরিতার আগমন নিশানকে যে একেবারে ভাবায়নি এমন নয়। বহুবার ভেবেছে, ওর পরিবার সম্পর্কে জানা উচিত। শুধু পরিচয়পত্র দেখে রাতে এখানে থাকতে দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না বোধহয়। কিন্তু ওর ভাবুক চোখদুটোই নিশানকে থামিয়ে দিয়েছে এসব প্রশ্ন করার থেকে।
সুচরিতার চোখদুটো অদ্ভুত মায়া মাখানো। মনে হয় যেন গভীরে বেশ কিছু কষ্টের ঢেউকে জোর করে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। নিশান যতবার ওর দিকে তাকিয়েছে ততবার মনে হয়েছে, নিজের ব্যক্তিগত কথা বলতে চায় না মেয়েটা। পথের পাঁচালীর ভালোর জন্য অনেক কিছু ভাবে। মুনমুন তো ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মাটির পাত্রে মুনমুনকে দিয়ে আল্পনা আঁকিয়ে তাতে জল দিয়ে তারমধ্যে ফুলের পাঁপড়ি ছড়িয়ে রেখেছিল প্রতিটা টেবিলে। জাপানি ফুলগুলোকে বিদায় করেছিল নিজেই। ঐশিককে বেশ জোরেই বলেছিল, নকল সবকিছুর মধ্যে মেকি ব্যাপারটা বড় চোখে লাগে তাই না? এমন ছোট ছোট কত বিষয়ে নজর মেয়েটার। বাইরের চায়ের সেকশনের তন্দুরি চা-টা বেশ নাম করে ফেলেছে। প্রতিটা চায়ের কেটলিতে সুচরিতা আর মুনমুন মিলে সুন্দর করে লিখেছে পথের পাঁচালী।
মেয়েটা এসে পরিবেশটা বেশ বদলে দিয়েছে যেন। নীলাভ, ঐশিক সুযোগ পেলেই সুচরিতার প্রশংসা করে নিশানের কাছে। তবুও কাজের ফাঁকে আলাদা করে লক্ষ করা হয়নি মেয়েটাকে। আজ সুচরিতা এসব কী বলে গেল! ভয় পায় নিশানকে? যদি দুর্বলতা জন্মায় তাই? তবে কি সেদিন রিয়ান ঠিকই বলেছিল? রিয়ান হঠাৎই বলেছিল, ‘নিশান তোর সুচরিতাকে কেমন লাগে রে?’
নিশান নরম্যাল গলায় বলেছিল, ‘ভালো মেয়ে, কাজের মেয়ে।’ রিয়ান হেসে বলেছিল, ‘ইঞ্জিনিয়ররা কি এমন অন্ধ আর নিরেট হয় নাকি রে?’
রিয়ান হয়ত এটাই ইঙ্গিত করতে চেয়েছিল। সুচরিতা কি নিশানকে নিয়ে ওদের কাছে কিছু বলেছে? গতকাল সন্ধেতে সুচরিতা গান করছিল
”ভালোবাসা বাকি আছে
তোমারও আমার কাছে
যা চেয়েছো দিতে আমি পারি না
আমারও সময় ডালে ফুরিয়ে এসেছে পাতা
এত প্রেম কাছে এসে এলো না”
নীলাভ ইশারায় নিশানকে কিছু একটা বলতে চাইছিল যেন। হঠাৎই নিজের বোকামিতে লজ্জা পেল নিশান। সুচরিতা রোজ দুপুরে এসে ওর সামনে ডাবের জলটা সুন্দর করে রেখে বলত, ‘খেয়ে নিলে খুশি হবো। আসলে কেউ কেউ নিজের যত্নটুকুও নিতে জানে না।’
ওর আলতো যত্নটুকু নিশানের মন্দ লাগে না।
কিন্তু এটাকে ভালোবাসা ভাবেনি কখনও। আজ অবশ্য সুচরিতা পরিস্কার করে বুঝিয়েই দিল। নিশান ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে সুচরিতা। ও তাকাতেই ঘরে ঢুকে গেল।
সকালে ঐশিক সবার প্রথমে আসে দোকানে। এমনিতেই পথের পাঁচালীর হেঁসেলে প্রাতরাশ শুরু হয় সকাল নটা নাগাদ। তার আগে শুধু চায়ের কর্নারটা খোলে শ্যামল। ওর ওপরে চায়ের দায়িত্ব দিয়েছে নিশান। তারপর ঢোকে ঐশিক, তখনই সবজির গাড়ি, মাছ, মাংস নিয়ে এসে হাজির হয়। ঐশিক সেগুলোকে মিলিয়ে কিচেনে পাঠিয়ে দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে। তখনই ঢোকে নিশান। মোটামুটি এটাই রুটিন। আজকেও নিশান ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করছিল, ‘মা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বলল, সবই তো হল, এবারে একটা বিয়ে কর।’ মুনমুন বলছিল, ‘ওই সুচরিতা মেয়েটা নাকি তোকে পছন্দ করে। বলিস তো আমি একবার কথা বলে দেখি।’ মায়ের কথা শেষ হবার আগেই ঐশিকের ফোন। রিসিভ করতেই উত্তেজিত গলায় ঐশিক বলল, ‘নিশান পুলিস এসেছে পথের পাঁচালীতে। তুই এখুনি আয়।’
‘সুচরিতা বসু নামের একজনকে এখানে দিন কুড়ি ধরে আটকে রেখেছিলেন?’ নিশানের সামনে প্রশ্নটা ঝুলিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল পুলিশ অফিসার রাকেশ সামন্ত। নিশান বিরক্তির সুরে বলল, ‘এসব কী বলছেন অফিসার? সুচরিতা কোনো বাচ্চা মেয়ে নয়। সে পথের পাঁচালীর একজন এমপ্লয়ি। বহু বেকার ছেলে-মেয়েকে চাকরি দিয়েছে এই ধাবা। সুচরিতাও আমার এখানের এমপ্লয়ি।’ নিশান বলল, ‘রিয়ান সুচরিতাকে ডেকে নিয়ে আয় তো।’ ঐশিক বলল, ‘সুচরিতা নেই। চলে গেছে। ঘর ফাঁকা। তোকে একটা চিঠি দিয়ে গেছে।’
পুলিশ অফিসার বলল, ‘বড়লোকের মেয়েদের কিডন্যাপ করাই কাজ। সামনে একটা রেস্টুরেন্ট বানিয়ে, ভিতরে এসব চলছে? আপনার এমপ্লয়ি? আপনি জানেন সুচরিতা বসু কে? উনি রাইকো কোম্পানির মালিক সুরঞ্জন বসুর মেয়ে। রাইকো কোম্পানির এম ডি। আরে ওনার আন্ডারে অন্তত পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার এমপ্লয়ি। একটা নামী আইটি কোম্পানির এম ডি আপনার ধাবার এমপ্লয়ি ছিলেন? বলছি দাদার কি গাঁজারও ব্যবসা আছে নাকি?’
নিশান একটু থতমত খেয়েছে এবারে। ও নিজেও আইটিতে ছিল এত বছর। রাইকো চেনে না এমন নয়। গুগল করতেই বেরিয়ে এল সুচরিতার ছবি ও বায়োডেটা। চমকে উঠেছে নিশান। ঠিক কী উদ্দেশ্য ছিল সুচরিতার? ওকে এভাবে ফাঁসিয়ে দিল কেন? কেনই বা পথের পাঁচালীতে এসে এভাবে গোপনীয়তা রাখল। ঐশিক বলেছিল, ‘জানিস নিশান সুচরিতা কোনো ফোন ইউজ করে না। এবারে বুঝল নিশান, ফোন থাকলে ট্র্যাক করা যাবে ওকে, তাই এই সতর্কতা। কিন্তু কেন এই নিভৃত যাপন করে গেল কুড়ি দিন? এখন কীভাবে প্রমাণ করবে নিশান যে সুচরিতা স্বেচ্ছায় এখানে ছিল। এমনকী এখানে রোজ সন্ধ্যায় গিটার বাজিয়ে গান গেয়েছে।’
পুলিশ অফিসার সময় নষ্ট করতে নারাজ। বলল, ‘চলুন থানায় চলুন।’
নিশান দেখল কাস্টমারের ভিড় হতে শুরু করেছে। এসব একবার রটলে পথের পাঁচালীকে তুলে দিতে হবে। কারণ মিথ্যের গতিবেগ হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দেয়। সত্য আসে অনেক পরে, বড্ড ধীরে ধীরে। ততদিনে মিথ্যে কালবৈশাখীর মতই সব ছিন্নভিন্ন করে দেয়। পড়ে থাকে ভগ্নাবশেষ। নিশান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চলুন অফিসার।’ মুনমুন ছুটতে ছুটতে এসে বলল, ‘দাঁড়ান একটু। সুচরিতা আসছে। ও নিজে এসে বলবে তারপর আপনি নিশানদাকে নিয়ে যাবেন।’
মুনমুন কানের কাছে এসে বলল, ‘আমার কাছে ফোন নম্বর দিয়েছিল সুচরিতা। বলেছিল, যেদিন আমি এখান থেকে চলে যাব সেদিন কল করো এই নম্বরে।’
মিনিট কুড়ির মধ্যেই ঢুকল সুচরিতা। এসেই অফিসারকে বলল, ‘আমি নিজের ইচ্ছায় এখানে ছিলাম। নিশান বা এখানের আর কেউ আমায় ধরে রাখেনি অফিসার। আপনি যার নির্দেশে এখানে এসেছেন তাকে বলুন, ধরাধরির দরকার নেই। আমি ফিরে যাচ্ছি ওনার বাড়িতে।’
অফিসার কল করলেন সুরঞ্জন বসুকে। ওপ্রান্তের কথা ভালোই শোনা যাচ্ছে। সুরঞ্জন বসু বলছেন, ‘আপনি একবার দেখুন অফিসার মোটা টাকা দান করে দেয়নি তো ওই ধাবায়?’
ফোনটা অফিসারের হাত থেকে নিয়ে সুচরিতা কড়া গলায় বলল, ‘সবাই দানের আশায় বসে থাকে না। কেউ কেউ দুহাত ভরে দিতেও জানে। এনিওয়ে এসব নাটক বন্ধ করো। আমি জানি কোম্পানির গুড উইল নষ্ট করে তোমার মেয়ে হারিয়ে গেছে বলে কোনো বিজ্ঞাপন তুমি দেবে না টিভিতে বা কাগজে। কারণ মেয়ের থেকেও কোম্পানি তোমার বেশি কাছের। তাই তোমার এই গোপন অভিযান এবারে শেষ করো।’
অফিসার চলে গেলেন। নিশান চুপচাপ বসে আছে। কাস্টমারদের সামলাচ্ছে নীলাভ, ঐশিক, রিয়ানরা। সকালের দিকে কাস্টমার একটু কমই থাকে অবশ্য।
সুচরিতা অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল। হঠাৎই নীলাভর গিটারটা নিয়ে কান্নাভেজা গলায় গেয়ে উঠল,
”আমাদের গল্পগুলো
অল্প সময় ঘর পাতালো,
তারপর পথ হারালো
তোমায় আমায় নিয়ে।
আগে যদি বুঝতো তারা
মনের নদীর তল পাবে না,
বেহায়া মুখ পোড়াতো
অন্য কোথাও গিয়ে।”
নীলাভ নয়, বেসুরো গলায় নিশান গেয়ে উঠল,
”বোবা সব মুহূর্তদের
শুনতো কথা চুপটি করে,
বলে নাকি ঘর বানাবে
রামধনুদের নিয়ে।”
সুচরিতা ছুটে চলে গেল ওপরে।
নিশান শুধু বলল, ‘এত মিথ্যে কেন সু?’
সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘সত্যি বললে থাকতে দিতে? হাঁপিয়ে উঠেছিলাম কোম্পানির কেজো কাজে। পালাচ্ছিলাম কোথাও একটা। গাড়িতে নয় বাসে যাচ্ছিলাম। বাসটা এখানেই থেমেছিল। একজন বলেছিল, ‘চল আইটি ইঞ্জিনিয়ারের ধাবা থেকে চা খেয়ে আসি। ভদ্রলোক শুনেছি বিদেশেও ছিলেন।’ কৌতুহলবশতই ঢুকেছিলাম। তারপর এই পরিবেশটা আমায় খুব শান্তি দিয়েছিল। জানি লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইটের বয়স গেছে। কিন্তু সে কথা না শুনলে আমি কী করব। বিশ্বাস করো, ক্লান্ত জীবন থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম মাত্র। ফোনটা পর্যন্ত অফ রেখেছিলাম। জানি না বাবা কিভাবে খুঁজে বের করল।
নিশান আমিও চেয়েছিলাম নীলাভর মত গান গাইতে। কিন্তু দেওয়া হয়নি আমায় সে সুযোগ। পাস করতেই কোম্পানির চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর থেকে শুধুই কাজ।’
নিশান বলল, ‘সব মিথ্যের মত কাল রাতের কথাগুলোও কি মিথ্যে?’
সুচরিতা নিশানকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমার নিশ্বাসের মতো সত্যি। আমি ফিরে এলে আমায় আবার পথের পাঁচালীতে চাকরি দেবে নিশান?’
নিশান আলতো করে ওর মাথায় হাত রেখে বলল, ‘রাইকোর এমডির চেয়ারের বদলে এখানের এমডির চেয়ার যদি বেশি পছন্দের হয়ও চেয়ার ছেড়ে দিতে রাজি।’
সুচরিতা চলে যাবার সময় বলে গেল, ‘নীলাভ মাত্র সাতদিন ম্যানেজ করে নাও ফিমেল সিঙ্গার ছাড়া, তারপর আমি এসে জয়েন করছি। কিন্তু প্লিজ ওই বেসুরোকে দিয়ে গান করিও না যেন। কাস্টমার পালাবে।’ মুনমুন চেঁচিয়ে বলল, ‘সুচরিতা ও গান শুধু সু স্পেশাল হয়ে থাকবে।’
সুচরিতা হাত নাড়ল, ‘ফিরছি।’
