স্কুল থেকেও অবজেকশন এসেছিল সাবর্ণর এই মাদুলি, আংটি, তাবিজ পরা নিয়ে। কিন্তু ওর মা স্কুলে এসে এমনভাবে দুঃখ করে গেছে ওর গুচ্ছের ফাঁড়া নিয়ে যে হেডস্যার আর সাহস পেলেন না এসব খুলে ফেলতে বলতে। অগত্যা ওর হাতে মায়ের গুরুদেব কাম জ্যোতিষ কাম ত্রিকালজ্ঞ বাবাজির দেওয়া আংটির সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকল। গলায় ঘোড়ার ঘণ্টার মত একগুচ্ছ মাদুলির টুংটাং আওয়াজ নিজের কানেই বিসদৃশ লাগতে শুরু করল। তার সঙ্গে বেড়ে গেল বন্ধুদের লেগপুল, স্যার-ম্যামদের হাসি। কারোর দোষ দেয় না সাবর্ণ, ওর সব রাগ গিয়ে পড়ে ওই ভণ্ড বাবাজির ওপরে। মা যতবার জোর করে ওর আশ্রমে নিয়ে যায় ততবারই ও খেয়াল করে গুরুজির গ্যারেজে গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। ইনোভা থেকে স্কর্পিও, ফরচুনার গাড়ির ছড়াছড়ি। লাস্টবার গিয়ে দেখেছিল, অডি দাঁড় করান আছে গ্যারেজে। ঝকঝকে দুধ সাদা অডি।
সাবর্ণ বলেছিল, ‘মা উনি তো বাবাজি ওনার এত গাড়ি হবে কী? কেনেন কেন?’
মা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেছিল, ‘সবই ওনার ভক্তরা জোর করে দিয়ে যায়, আসলে ওনার পাথরে আর মাদুলিতে মানুষের এতটাই উপকার হয় যে তারা স্বেচ্ছায় সব দিয়ে যায়।’ বাবাজির এই সবজান্তা ভাবটাই বড় বিরক্ত লাগে সাবর্ণর। ওর শুধুই মনে হয় ঈশ্বরকে ডাকার জন্য মাধ্যমের কেন প্রয়োজন হবে?
কিন্তু মা ওকে নিয়ে রীতিমত আতঙ্কে থাকে। এই বোধহয় ওর কোন বিপদ হল। মায়ের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে এই অদ্ভুত অত্যাচারগুলো সহ্য করে নেয়। মায়ের ধারণা সাবর্ণ ক্লাসে ভাল রেজাল্ট করে ওর নিজের বুদ্ধি বা পড়াশোনার জন্য নয়। সবই নাকি বাবাজির তাবিজ আর আংটির জোরে। সাবর্ণদের বাড়িতে এখন সবকিছুই চলে বাবাজির মর্জি মতো। বাবাজি বলে দেন ওরা কোন কোন বারে কী কী খেতে পারবে। সাবর্ণ দেখত আগে বাবা এসবের প্রতিবাদ করত। মায়ের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হত। মায়ের কান্নাকাটি চলত। বাবা তবুও রাগ করে শনিবার নিরামিষের দিনে ডিম ভেজে খেতে বসত।
তারপর হঠাৎ করেই ও লক্ষ করল, বাবা আর ঝগড়া করা প্রতিবাদ করা ছেড়ে দিয়ে চুপ করে গেল। মা সেই সুযোগে গুরুদেবের দেওয়া সমস্ত বিধান ওদের সংসারে কায়েম করে দিল। ইদানিং বাড়িটাকে ওর নিয়মের জেলখানা মনে হয়। স্কুল থেকে ফিরলে জুতোটার মুখও দক্ষিণ দিকে রাখা যাবে না। খেতে বসার আগে গুরুর ছবিতে প্রণাম করে বসতে হবে। এ এক বিড়ম্বনা। বাবা একদিন রেগে গিয়ে নিজের হাতের গলার সব কিছু খুলে দিয়েছিল, পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, এসব তাবিজ কবজ আমি পরব না। তারপর থেকেই মা বাবার সঙ্গে ঠান্ডা একটা ব্যবহার করে। মায়ের ওই ব্যবহারটা বাবা মেনে নিলেও সাবর্ণর জন্য খুব কষ্টকর। মা রেগে গেলে ওকে আর ‘তুই’ বলে ডাকে না ‘তুমি’ বলে ডাকে। তাতেই যথেষ্ট কষ্ট হয় ওর। কিন্তু এই পাথরের জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। সাবর্ণর বাবা বড় চাকরি করলেও এভাবে অযথা ঠকতে রাজি নয় বলেই এ ব্যাপারে মাকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তাতে অবশ্য মাকে আটকানো যায়নি। শিবচরণ মুখোপাধ্যায় তার একমাত্র সন্তান সায়ন্তনী মুখোপাধ্যায়ের জন্য অফুরন্ত অর্থের ভান্ডার রেখে গেছেন। মা আপাতত দাদুর রেখে যাওয়া টাকা এই বাবাজির পায়ে ঢেলে চলেছে। সাবর্ণ বাবার সঙ্গেও আড়ালে এই নিয়ে কথা বলে দেখেছে, বাবার চোখেও অসহায়তা স্পষ্ট। বাবা মিনমিন করে বলেছে, ‘একবার যদি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো যেত তোর মাকে তাহলে খুব ভাল হত। আসলে তোকে নিয়ে বড্ড প্রোটেকটিভ তোর মা। তাই অযথা দুশ্চিন্তা করতে করতেই এমন ভয় জন্মেছিল মনে। সেই ভয় থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে এসব পাথর-কবজের আশ্রয় নিয়েছে। বাড়তে বাড়তে এখন বিষয়টা চুড়ান্ত জায়গায় চলে যাচ্ছে।’ সাবর্ণ বলেছিল, ‘বাবা স্কুলে বন্ধুরা লেগপুল করে।’ বাবা ঘাড় নেড়ে বলেছিল, ‘জানি আমার অফিসেও কলিগরা মুখ টিপে হাসত। কিন্তু এসবে তো তোর মায়ের কিছু যায় আসে না। সে আমাদের ভাল চাইতে গিয়ে অত্যাচার করছে সেটা বুঝলে তবে না বোঝাবি? দেখেছিস তো ইদানিং আমার ওপরে রাগ থেকে দায়সারা কথা বলে।’ সাবর্ণ বুঝেছিল বাবা নিরুপায়। তাই বাবা এ ব্যাপারে চুপ করে থাকার পক্ষপাতী। কারণ দিনের শেষে শান্তি সকলেরই কাম্য।
এসব ব্যাপারে ওর একমাত্র পরার্মশ করার বন্ধু ঋতম। ওকেই ও প্রাণের কথা খুলে বলতে পারে। ভরসা করতে পারে সেই কথাগুলো ভাসতে ভাসতে বারোয়ারি হয়ে যাবে না। আজকেও টিফিন পিরিয়ডে ঋতম বলল, ‘কষ্ট পাস না, তুই তো জানিস দুর্নিবার বরাবরই এরকম। অন্যের পিছনে লেগে আনন্দ পায়।’ সাবর্ণ ক্লান্ত হেসে বলল, ‘আমাদের বাড়ির পরিবেশটা গত দুবছরে আরও খারাপ হয়ে গেছে রে। আসলে ভালবাসার অত্যাচারে আমি অতিষ্ট। শুক্রবার টক খাওয়া যাবে না, শনিবার নিরামিষ, রবিবার লাল জামা পরা যাবে না.এমন কয়েকগুচ্ছ নিয়মের বেড়াজলে হাঁসফাঁস করি বাড়িতে। স্কুল বা কোচিংয়ে কেউ লেগপুল করলেও মনে হয় যেন বাড়ির থেকে ভাল আছি বাইরে। বিশ্বাস কর ঋতম, স্কুল থেকে ফিরে জুতো দুটো রাখার সময় আমায় মাথায় রাখতে হয় যেন দক্ষিণ মুখো না হয়। এভাবে আর কতদিন বলত? মায়ের যে আমায় নিয়ে কেন এত ভয় কে জানে? আর ওই বাবাজি মায়ের এই দুর্বলতাটাকেই কাজে লাগিয়ে চলেছে। আর আমাদের জীবনটাকে নরক করে দিয়েছে।’ ঋতম বন্ধুর মন ভাল করার জন্যই বলল, ‘এসব ছাড়। আইপিএল দেখব আজ রনজয়স্যারের টিউশন থেকে ফিরে।’ সাবর্ণ হেসে বলল, ‘তুই তো আরসিবি। আমি ভাই ধোনির জন্য সিএসকে ছেড়ে বেরোতে পারব না।’ ঋতম বলল, ‘তোর ধোনি হয়ত বেরিয়ে যাবে, তুই রয়ে যাবি নাকি?’
সাবর্ণ ঘাড় নেড়ে বলল, ‘পাক্কা’
ঋতম বলল, ‘শোন কাকিমাকে বলে আসবি টিউশন সেরে আমার বাড়িতে আসবি। মা আজ ফিসফ্রাই বানাবে। আর পপকর্ন কিনে আনব, খেতে খেতে ম্যাচ জমে যাবে।’ সাবর্ণ বলল, ‘একমাত্র তোর বাড়ি বললে ছাড়বে। কিন্তু খবরদার আজ বৃহস্পতিবার ফিসফ্রাই খেয়েছি জানলে বাঁচিয়ে রাখবে না।’ ঋতম ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘জানবে না পাগল। চল বেল পড়ে গেল। আজ ক্লাসে আবার সন্তোষস্যার আসবেন। যত ভাল করেই পড়া বল স্যারের মনে সন্তোষ আসবে না।’ সাবর্ণর একমাত্র খোলা বারান্দা ঋতম। যতক্ষণ ঋতম সঙ্গে থাকে ততক্ষণ মনটা শিমুল তুলোর মত হালকা লাগে। আজকে ওর বাড়িতে আইপিএল দেখতে গেলে আরও কিছুক্ষণ আনন্দে কাটবে সাবর্ণর। দমবন্ধ করা চ্যাটার্জী বাড়ির থেকে অনেক ভাল কাটাবে ও।
স্কুল থেকে বাড়ি ঢুকেই দেখল বাড়িতে হইহই পড়ে গেছে। মালাপিসি আর মা দুজনেই খুব ব্যস্ত। ওদের বাড়ির দোতলার দক্ষিণের ঘরটা যেটাতে আগে ওর দাদু থাকতেন সেটা পরিস্কার করতে লেগেছে দুজনে। দাদু মারা যাবার পরে ওই ঘরটা পড়েই ছিল। একমাত্র পিসিমণি এলে ওই ঘরটাতেই থাকে। তাও তো পিসিমণির চোখ অপারেশনের পর আসা অনেকটাই কমে গেছে। দাদাভাইও সদ্য চাকরি পেয়েছে, তাই বাড়ি ছেড়ে এসে থাকাই হয় না পিসিমণির। দাদাভাইয়ের ফ্যান ছিল সাবর্ণ সেই ছোট থেকে। পিসিমণি ওকে ডাকে টিনটিন বলে। সেই সূত্রেই দাদাভাই মজা করে বলত, ‘তাহলে আমি তোর ক্যাপ্টেন হ্যাডাক।’ দাদাভাই পড়াশোনায় তো ভাল ছিলই বরাবর, সঙ্গে দুর্দান্ত গিটার বাজাতো। রকস স্টাইলে গান গাইত। বেশ একটা ভবঘুরে লুক ছিল দাদাভাইয়ের। ছোট থেকেই ওর সব অপকর্মের সঙ্গী হত সাবর্ণ। বছরখানেক আগে যেবার শেষ দাদাভাই এসেছিল এ বাড়িতে সেবার ওর হাতের আংটি আর গলার মাদুলি দেখে বলেছিল, ‘আর সময় নষ্ট করছিস কেন টিনটিন, সোজা গিয়ে বটতলায় পশরা সাজিয়ে বসে পড়। গায়ে একটা উত্তরীয়, হালকা দাড়ি, লালচে চোখ, বাবা টিনটিন লাগবে।’ দুঃখ পেয়ে সাবর্ণ বলেছিল, ‘দাদাভাই তুমিও মজা করলে?’
দাদাভাই বলেছিল, ‘ওরে আমেরিকায় ষোলো বছরে ছেলেপিলে সাবালক হয়ে যায়, অন্য ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করে। আর তুই এখনও মা যা পরাচ্ছে তাই পরে ছাগলছানার মত ম্যা ম্যা করছিস?
এসব খুলে দিয়ে পড়াশোনায় মন দে। মামীকে দেখিয়ে দে এসব বুজরুকি ছাড়াই তুই ভাল রেজাল্ট করতে পারবি। আরে পাগলা বিদ্রোহ করতে হয় মাঝে মাঝে।’
আজকেও দক্ষিণের দাদুর ঘরটা পরিষ্কার হচ্ছে দেখে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। নিশ্চয়ই পিসিমণিরা আসছে। কদিন মা ব্যস্ত থাকবে। ওর দিকে একটু কম খেয়াল দিতে পারবে। আনন্দেই জিজ্ঞাসা করল সাবর্ণ, ‘মা পিসিমণিরা আসবে বুঝি? আর দাদাভাই?’
মা নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, ‘ওরে সুবু আমাদের অনেক ভাগ্য রে। যাঁর পায়ের ধুলো এ বাড়িতে পড়ছে সেটা আমি কখনও কল্পনা করতে পারিনি। আমার গুরুদেব আসবেন। দিন চার-পাঁচ থাকবেন।’ সাবর্ণর মনটা তিক্ততায় ভরে গেল। মায়ের দিকে তাকিয়ে ভাবতে অবাক লাগে মা ফিলোজাফিতে অনার্স, মাস্টার্স করেছে। গুরুদেবের কথা বলার সময় মনে হয় না একজন উচ্চশিক্ষিত মহিলা এমন বলছে।
মা আগে এমন ছিল না। কেন যে এভাবে পরিবর্তন হল মায়ের কে জানে!
আজকে ঋতমদের বাড়িতে খেলা দেখবে শুনে তেমন কোন চেঁচামেঁচি করল না মা। কারণ আজ বড় ব্যস্ত। গুরুদেবের জন্য সমস্ত ব্যবস্থা নিখুঁত চাই।
টিউশন সেরে ঋতমদের বাড়িতে যখন পৌঁছাল তখন পেটে কয়েকশো ইঁদুর ক্রিকেট খেলছে।
ওদের বাড়ির রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ফিসফ্রাইয়ের পাগল করা গন্ধ। ঋতমের মায়ের ইউটিউবে কুকিংয়ের একটা চ্যানেল আছে। কাকীমার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার প্রায় ওয়ান মিলিয়ন। কাকীমা প্রায়ই শেখানে বিভিন্ন রেসিপি নিয়ে হাজির হয়। জি বাংলা রান্নাঘরেও কাকীমা গিয়েছিল কয়েকবার। চন্দননগরে কাকীমা একটা ফার্স্টফুডের কর্ণার ওপেন করবার প্ল্যানও করেছে। কাকীমার সঙ্গে গল্প করতে সাবর্ণর খুব ভালো লাগে। কোনো কুসংস্কার নেই, বেশ স্মার্ট মহিলা। কাকীমা বলে, ‘তোমাদের এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের আমার খুব ভালো লাগে। তোমরা সব পরিস্থিতিকে বেশ স্পোর্টিংলি নাও। স্পষ্ট কথা বলতে দ্বিধা বোধ কর না।’
গরম গরম ফিসফ্রাই মুখে দিতেই ওদের পাশে সোফায় এসে বসল সঞ্জীবনদা। ইঞ্জিনিয়ারিং থার্ড ইয়ারে পড়ে। নিজেকে বিশাল কিছু মনে করে। ফুটবল খেলে দারুণ তাই নিজেকে মেসি বলে পরিচয় দেয়। ছেলেটার মধ্যে একটা সবজান্তা ভাব আছে। যেটা একেবারেই সহ্য করতে পারে না সাবর্ণ। এর সঙ্গে আবার ঋতমের বেশ বন্ধুত্ব আছে। ঋতম আসলে ছেলেটার ফ্যান। ফুটবল খেলতে যায় একসঙ্গে।
সাবর্ণ আর ঋতম নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে গল্প করছিল। সাবর্ণ বলল, ‘কালকে আমাদের বাড়িতে মায়ের গুরুদেব আসছেন। এবার তো বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে যাবে। মাকে দেখলাম, দাদুর ঘরটা পরিষ্কার করাচ্ছে।’ ঋতম বলল, ‘কিন্তু তোর দাদুর ঘরে তো নাকি তোর দাদুর ভূত রয়েছে। তুইই তো বলেছিলি তোর মা নাকি নিজে দেখেছে। হ্যাঁ রে তোর পিসিও কি দেখেছিল?’ সাবর্ণ ঘাড় নেড়ে বলল, ‘সেটা জানি না। তবে একবার পিসিমণি বলেছিল, বাবা এই ঘরেই আছে।’ ঋতম বলল, ‘একটা কাজ করবি এই গুরুদেবের দুর্লতম জায়গা খুজে বের করতে হবে তোকে। তারপর সেই জায়গায় খোঁচাতে হবে বুঝলি?’ ঘাড় নেড়ে সাবর্ণ হ্যাঁ বলার আগেই ওর প্লেট থেকে একটা ফিসফ্রাই তুলে নিয়ে ওদের গা ঘেঁষে বসে সঞ্জীবনদা বলল, ‘বল সাবর্ণ সিএসকে কেমন খেলছে? এই তোরা কি নিয়ে আলোচনা করছিলিস রে ভূত? ভূতে আমার হেভি ইন্টারেস্ট। মানে ছোট থেকেই ভূত দেখার জন্য আমি প্রচুর পরিশ্রম করেছি। তোরা বিশ্বাস করবি না হয়ত, আমি চার্চ থেকে বয়েজ হোস্টেল যেখানে যেখানে লোকজন ভূত আছে বলেছে সেখানে সেখানে দৌড়ে গেছি। এই সাবর্ণ তোর দাদুর ঘরে একরাত থাকার ব্যবস্থা করে দিবি রে?’
ঋতম ইশারায় বারণ করছে সঞ্জীবনদাকে। কারণ ঋতম জানে সাবর্ণর নিজেরই কোন মতামতের গুরত্ব নেই ওদের বাড়িতে। তাই এমন হুট করে কাউকে নিয়ে যেতে পারে না ওদের বাড়িতে। একমাত্র ঋতমকেই যা একটু বিশ্বাস করে কাকীমা, তাই ও আজও সাবর্ণর বাড়িতে অবাধে যাতায়াত করতে পারে। সঞ্জীবনের প্রশ্নে একটু ঘাবড়ে গিয়ে সাবর্ণ বলল, ‘না মানে ভূত আদৌ আছে কিনা কেউ জানে না।’
সঞ্জীবন কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ‘কেন মনে হচ্ছে বলত এবারে মুম্বাই জিতবে?’
কিছুক্ষণ মেশার পরে সাবর্ণ বুঝল সঞ্জীবন ছেলেটা এমনিতে মন্দ নয়, তবে নিজেকে নিয়ে ভীষণ অহঙ্কার করতে ভালোবাসে। আমিত্বে টইটম্বুর যাকে বলে।
ঋতমের একটু ভয় করছিল, সঞ্জীবনদার যা জেদ কোনোদিন রাতের অন্ধকারে না সাবর্ণর দাদুর ঘরে ঢুকে বসে থাকে।
সাবর্ণ বাড়িতে ঢুকতেই বাবা খাবার টেবিলে বলল, ‘আমি দিন পাঁচেকের জন্য অফিস ট্যুরে চেন্নাই যাচ্ছি। কাল ভোরে ফ্লাইট।’ সাবর্ণর খুব কষ্ট হচ্ছিল আজ। বাবাও কেমন এই সময়টা বাড়ির বাইরে কাটিয়ে দেবে। ওই গুরুদেবের যাবতীয় জ্ঞান মানতে হবে শুধু ওকেই। হাজার গরম করলেও ও স্যান্ডোগেঞ্জি পরে থাকতে পারে না। কারণ ওর গলায় ঝুলছে বিভিন্ন আকৃতির তাবিজ, মাদুলি। রাস্তায় বেরোলেই ও গলার বোতামটা অবধি আটকে বের হয়। যাতে এগুলো দেখা না যায়। সঞ্জীবনদা আজকে কী সুন্দর একটা ভি-নেক টিশার্ট পরেছিল, ঋতমও বলল এরকম টিশার্ট একটা কিনবে। এসব তো স্বপ্ন সাবর্ণর কাছে। মা গম্ভীর মুখে বলল, ‘সত্যিই অফিস ট্যুর নাকি গুরুদেবের মুখোমুখি হতে চাও না তাই?’
বাবা রুটির টুকরো মুখে পুরে বলল, ‘উনি গুরুদেব শুধু নন কিন্তু, উনি একজন জ্যোতিষীও। সঙ্গে আবার রত্নবিক্রেতা। তাই শুধু গুরুদেব বলে ওনার যোগ্যতাকে তুমি ছোট কর না প্লিজ।’ মা বলল, ‘কেন উনি তোমাদের কোন ক্ষতিটা করেছেন? ওনার পাথর আর মাদুলি পরেই সুবু এত বড় বড় ফাঁড়ার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে।’ বাবা খাওয়া থামিয়ে বলল, ‘সুবুর যে ফাঁড়া ছিল সেটাও ওনারই বক্তব্য। সুতরাং এসব বিস্তারিত আলোচনা না করাই শ্রেয়। আমি কাল বেরোচ্ছি, এটুকু জানালাম।’
বাবা উঠে গেল হাত ধুতে। মা কিছুক্ষণ সাবর্ণকে লক্ষ করে বলে গেল, ‘অবিশ্বাসীদের গুরুদেব কোনোদিনই ক্ষমা করেন না। বিশ্বাসটাই আসল।’
সাবর্ণ সকালে উঠে টিউশন যাওয়ার আগেই দেখল বাবা ব্যাগ নিয়ে রেডি। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘সাবধানে থাকিস।’ বাবার ওপরে একটু অভিমানই হচ্ছে, ওই বাবাজি আসছে শুনে বাবা ওকে একা রেখে কী সুন্দর পালিয়ে যাচ্ছে! আবার আদিখ্যেতা করে বলার কী দরকার-‘সাবধানে থাকিস?’ বাবা খুব ভালো করে জানে ও কেমন থাকবে এই পাঁচদিন।
বাবা বেরিয়ে গেল। মা চুপচাপ। সাবর্ণ কোনোমতে দুপিস ব্রেড খেয়ে চলে গেল পড়তে।
টিউশন থেকে ফিরেই দেখল, বাড়ির সামনে একটা অডি গাড়ি রাখা আছে। বুঝতে অসুবিধা হল না মায়ের সর্বস্বত্যাগী বাবাজি এসেছেন। বাড়ি ঢুকে বুঝল, উনি একা আসেননি, সঙ্গে আরও তিনজন সঙ্গী এসেছে। যাদের কাজ চব্বিশঘণ্টা গুরুদেবের সেবা করা। স্নানের জল বাথরুমে দিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে, মাথা মুছিয়ে দেওয়া অবধি এরাই করে।
সাবর্ণ বাড়িতে ঢুকে স্কুলে যাবে বলে রেডি হচ্ছিল, মা বলল, ‘আজ আর স্কুলে গিয়ে কাজ নেই। গুরুদেবের কাছে কাছে থাকবি। উনি আশীর্বাদ করবেন।’ গুরুদেবকে প্রণাম করে এসেছে সাবর্ণ স্নান করে। ওনার পাশে পাশে থাকার কী প্রয়োজন না বুঝেই ও বলল, ‘মা আজ স্কুলে ম্যাথ টেস্ট নেবেন স্যার। তাই যেতেই হবে।’ মায়ের মুখে বিরক্তি। গজগজ করে বলল, ‘বাবা তো আজকেই অফিসের কাজ দেখিয়ে চলে গেছে, তুইও ক্লাস টেস্টের নাম করে চলে যা।’ সাবর্ণ জানে কথায় কথা বাড়বে তাই চুপচাপ খেয়ে স্কুলে বেরিয়ে গেল।
সাবর্ণ আজ খুবই কম কথা বলছিল স্কুলে। মন দিয়ে ক্লাস টেস্ট দিল। ঋতমের কথার উত্তর দিচ্ছিল দায়সারা। ঋতম ওর মুখ দেখেই বুঝে গিয়েছিল ওর আজ কেন মুড অফ আছে। তাই আর সঞ্জীবনদার প্ল্যানটার কথা বলা হল না ওকে। তবে সাবর্ণকে এর হাত থেকে বাঁচাতেই হবে ঋতমকে। এভাবে প্রাণচঞ্চল ছেলেটাকে নিশ্চুপ হতে দিতে পারে না ও। তাহলে আর বেস্টফ্রেন্ড কীসের? যা করার আজ রাতেই করতে হবে। সেরকমই একটা প্ল্যান বানিয়েছে ও আর সঞ্জীবনদা।
সাবর্ণকে বললে ভাল হত হয়ত, কিন্তু যদি সাকসেসফুল না হয় ওদের প্ল্যান তাহলে ছেলেটার আরও মনখারাপ হয়ে যাবে। তাই আগে কাজ করে পরে নাহয় বলবে।
সাবর্ণ সন্ধের থেকেই গুরুদেবের ঘরে বসে ওনার বিশ্বজয়ের গল্প শুনছে। ঘরের দেওয়ালে দাদুর একটা বিশাল ছবি টাঙানো। লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রী সুবর্ণ নারায়ণ চ্যাটার্জী। সাবর্ণর ইচ্ছে হচ্ছিল দাদু লাঠি হাতে এসে এই গুরুদেবের সামনে একবার দাঁড়িয়ে বলুক, ‘বুজরুকির জায়গা পাওনি হে?’ কথার শেষে দাদু ‘হে’ যোগ করত বলে সাবর্ণর খুব মজা লাগত।
গুরুদেব বলে চলেছেন ওনার বিচিত্র সব অভিযানের কথা। কীভাবে উনি একদিনে এভারেস্টের মাথায় চড়েছিলেন তার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। সাবর্ণর খুব ইচ্ছে করছিল জিজ্ঞাসা করতে, আচ্ছা বাবাজি আপনার ছবি বা নাম কাগজে আসেনি কেন?
কিন্তু মায়ের গদগদ ভাব দেখে আর সাহস পেল না। উনি পর্বত থেকে এবারে নেমে এলেন সমুদ্রে। সমুদ্রের নীচে বিনা অক্সিজেনে তিনদিন অতিবাহিত করার গল্প ফাঁদলেন। সাবর্ণ মনে মনে ভাবছিল, অনন্তস্যার ঠিকই বলেছেন, সাবর্ণর সায়েন্স নিয়ে পড়ার যোগ্যতা নেই। এসব আজগুবি গল্প শোনাই ওর যোগ্যতা।
গুরুদেব আহারে বসবেন। মা আর মালাপিসি দুজনে ব্যস্ত হয়ে গেল খাবার সাজাতে। সে এক এলাহী কাণ্ড! কী নেই সেখানে? মাছের তিনরকম পদ থেকে মাংস, পোলাও, রাধাবল্লভী, রাবড়ি, মিষ্টি।
খাওয়া-দাওয়ার পরে সাবর্ণ নিজের ঘরে বসে পড়ছিল। সামনে মাধ্যমিক। সারাটা সন্ধে গেল ওই গাঁজাখুরি গল্প শুনে। তাই আজ রাত পর্যন্ত একটু পড়তে হবে। টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়ছিল সাবর্ণ, রাত তখন কটা খেয়াল ছিল না। হঠাৎই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, দুটো কাঁটাই কম্পিটিশন করে ছুটছে একটার দিকে। বই বন্ধ করে বাথরুমে যাবে বলেই বারান্দায় এসে দাঁড়াল। স্পষ্ট শুনল কারা যেন কথা বলছে খোলা ব্যালকনিতে। এদিকে দাদুর ঘর থেকে লাঠির ঠকঠক আওয়াজ আসছে। ঠিক যেভাবে দাদু ঘুম না এলে রাতে পায়চারি করত ওরকম আওয়াজ। এতদিন ভেবেছে, মায়ের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন নিশ্চয়ই কল্পনা করে নিয়েছে দাদুর আত্মা ঘুরে বেড়ায় এ বাড়িতে। কিন্তু আজ নিজের কানে শুনল আওয়াজটা। একটু ভয় ভয় করছে সাবর্ণর। চুপচাপ বাথরুম করে এসে নিজের ঘরে লক করে শুয়ে পড়ল ও। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও জানে না। হঠাৎই দরজায় দুম দুম আওয়াজ শুনে দরজাটা খুলে দেখল- মা দাঁড়িয়ে আছে। সাবর্ণর তখনও ঘুম ভাঙেনি ঠিক করে। মা বলল, ‘শিগগির চল গুরুদেব তোকে ডাকছেন।’ একি অদ্ভুত অত্যাচার রে বাবা! রাত তিনটের সময় ওকে টেনে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গুরুদেবের আদেশে।
ঘরে ঢুকতেই দেখল, গুরুদেবের বিধ্বস্ত চেহারা। সেই প্রশান্তির চিহ্ন নেই চোখে মুখে। কেমন যেন ভয়ে তটস্থ হয়ে আছেন। সাবর্ণ যেতেই উদভ্রান্তের মত ওর হাতের আংটি, গলার মাদুলি সব খুলে নিলেন। মা বলল, ‘একি করছেন গুরুদেব? ওর যে আঠারো বছরে ফাঁড়া আছে বলেছিলেন? ওর যে সবে ষোলো!’ গুরুদেব সব জিনিসগুলো মেঝেতে রেখে বললেন, ‘আমি স্বপ্নাদেশ পেয়েছি মা, তোমার ছেলের সব ফাঁড়া-বাধা কেটে গেছে। স্বয়ং ঈশ্বর আমায় নির্দেশ দিলেন, ওর অঙ্গে যেন আর কোনো অলংকার না থাকে। ও আজ থেকে মুক্ত। ওকে আর কোনোদিন এসব পরাতে হবে না সায়ন্তনী। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।’ মা গুরুদেবের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।
কিন্তু গুরুদেব আপনি যে বলেছিলেন তিন-চারদিন আমার বাড়িতে অধিষ্ঠান করবেন, তাহলে আজ ভোরেই কেন চলে যাচ্ছেন? আমার কি যত্নে কোন ত্রুটি হলো?’ গুরুদেব মায়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘না মা কোন ত্রুটি হয়নি। কিন্তু আমায় ফিরতে হবে। আশ্রমে হঠাৎই একটা কাজের ডাক এসেছে। মনে রেখ মা ওর সব বাধা কেটে গেছে। ওকে আর কোনো কিছু পালন করতে হবে না।’
গুরুদেব পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেলেন সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে। সাঙ্গপাঙ্গরাও আধোঘুমে ছিল পাশের ঘরেই। তারাও বাবাজির কাণ্ড দেখে হতভম্ব।
সাবর্ণর ওজন যেন কয়েক কেজি কমে গেছে। উফ কী শান্তি। কিন্তু এ রহস্য উদ্ধার করতে হবে ওকে। কীভাবে ঘটল এ ম্যাজিক?
স্কুলে যাওয়ার রাস্তায় দেখল সঞ্জীবনদা আর ঋতম দাঁড়িয়ে আছে। ঋতম ওকে দেখেই বলল, ‘সাবর্ণ তোর দাদুর আত্মা আছে তোদের বাড়িতে। শোন আমরা ভেবেছিলাম, তোকে ওই গুরুদেবের ভণ্ডামির হাত থেকে উদ্ধার করব। তাই আমরা দুজনে মাঝরাতে তোদের খোলা ব্যালকনিতে উঠেছিলাম মই বেয়ে। তোর দাদুর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে থমকে গেছি ভাই। নাইট ল্যাম্পের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, তোর দাদু লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। গম্ভীর গলায় বলছেন, আমার নাতির হাত থেকে ওই সব আজকেই খুলে ফেলবি। আর এ বাড়িতে এক মুহূর্ত থাকলে গলা টিপে মেরে দেব। গুরুদেব তখন ভয়ে হেঁচকি তুলছিল। আমি আর সঞ্জীবনদা ভয়ে তাড়াতাড়ি করে পালিয়ে এসেছি।’ সঞ্জীবনদা বলল, ‘ভাই সাবর্ণ ক্ষমা করিস ভাই। তোর দাদুর আত্মাকে নিয়ে মনে মনে ঠাট্টা করেছিলাম। ভেবেছিলাম ভূত বলে কিছু হয় না। কিন্তু তোর দাদুকে গতকাল রাতে স্পষ্ট দেখে বুঝলাম, আত্মার অস্তিত্ব সত্যি আছে।’ ঋতম বলল, ‘শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা রক্তের স্রোত বয়ে গিয়েছিল কালকে। যাকগে আল্টিমেটলি তোর দাদুই হলেন হিরো। মৃত্যুর পরেও নাতিকে বাঁচাতে মাঠে নামলেন।’ সঞ্জীবনদা বলল, ‘সত্যি রে ভদ্রলোকের ওপরে আমার সম্মান বেড়ে গেল। একদিন দিনের বেলায় তোদের বাড়ি গিয়ে তোর দাদুর ছবিতে মালা পরিয়ে দিয়ে আসবো।’
কেন কে জানে ঋতমের মতো সঞ্জীবনদাকেও আজকে খুব আপন মনে হচ্ছে। এরা দুজনে ওকে বাঁচাবে বলে এত রিস্ক নিয়ে ওদের ব্যালকনিতে উঠেছিল মাঝরাতে! এদের ফিসফিস আওয়াজই গতকাল শুনেছিল ও। ঋতম সাবর্ণর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ থেকে দুর্নিবাররা বেকার হয়ে গেল রে।’
বেশ কাটছিল দিনগুলো। স্কুলে লেগপুল নেই, নিজের শরীরেও অযথা ভার নেই, ভাগ্য নামক অলীক কিছুর হাতে নিজেকে সমর্পণ না করে পরিশ্রম করার ইচ্ছে বেড়েছে সাবর্ণর। টেস্টের রেজাল্ট খুব ভালো করেছে ও। মা আবার আগের মত স্বাভাবিক। ‘এদিকে বসিস না’, ‘ওদিকে হাঁটিস না’-এর চাপ নেই। বাবা-মায়ের মধ্যেও আর সেই উত্তপ্ত কথোপকথন নেই। সব মিলিয়ে এখন বাড়িতে সাবর্ণর বেশ ভালই লাগে। পিসিমণি আসবে দুদিন পরেই, সঙ্গে দাদাভাইও। সেইজন্য পড়ার মাঝেও মনে একটা আনন্দ হচ্ছে সাবর্ণর। দুপুর বারোটা নাগাদ বাবা অফিস থেকে ফোন করে বলল, ‘আমার আলমারিতে একটা ব্লু কালারের ফাইল আছে একটু খুঁজে রাখতো। আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি, ড্রাইভারের হাতে দিয়ে দিবি। সেকেন্ড হাফে মিটিং আছে, ওই ফাইলটা লাগবে।’ সাবর্ণ বাবার বলা কথা মত চাবি দিয়ে আলমারি খুলে ফাইল খুঁজতে খুঁজতে কয়েকটা জিনিস দেখতে পেল। দাদুর সেই লাঠিটা, দাদুর পাঞ্জাবি-পায়জামা, আরেকটা নকল মোটা শেপের গোঁফ সঙ্গে একটা কাঁচা-পাকা চুলের পরচুলা। এরকমই মোটা গোঁফ আর চুল ছিল সুবর্ণ নারায়ণ চ্যাটার্জীর। পেশায় জাঁদরেল উকিলের সঙ্গে বেশ মানিয়ে যেত দাদুকে ওই মোটা গোঁফে।
ফিক করে হেসে ফেলল সাবর্ণ।
বাবার ফাইলটা মায়ের হাতে দিয়ে বলে গেল, ড্রাইভারকে দিয়ে বাবার অফিসে পাঠিয়ে দিতে।
নিজে স্কুলব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ও। ময়ূরপঙ্খী ঘাটে দাঁড়িয়ে একটা একটা করে জিনিস ভাসিয়ে দিল গঙ্গার জলে। সুশোভন চ্যাটার্জীর সেদিন মধ্যরাতে সুবর্ণ নারায়ণ চ্যাটার্জী সাজার গল্পটা নাহয় আজীবন লুকানোই থাক।
সাবর্ণ ফিসফিস করে বলল, ‘থ্যাংক ইউ বাবা। লাভ ইউ।’
