আঁধারপুরের যাত্রী – অর্পিতা সরকার

‘তুই দেখছিস না তো? সত্যি করে বল বুনি, তুই দেখছিস না তো?’

মাত্র বারো বছরের নীলাঞ্জন মাথা ঝাঁকিয়ে চলছে আর একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে, ‘বুনি তুই দেখছিস না তো? চিটিং করছিস না তো?’

আতঙ্কিত হয়েই নয়না বলল, ‘না দাদাভাই দেখছি না।’

নয়নার থেকে মাত্র তিন বছরের বড় নীলাঞ্জন। কিন্তু বোনের ওপরে তার সব থেকে বেশি অধিকারবোধ। যখন নয়না জন্মালো তখন নীলাঞ্জন খুব খুশি হয়েছিল। যদিও ক্রিকেট আর ফুটবলে নেশা ছিল ওর। পুতুল নিয়ে খেলবে ভাবেনি কখনও। কিন্তু ব্যাট, বল ফেলে রেখে ও চোখ পিটপিট করা পুতুলটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকত। তিন-সাড়ে তিনের ছেলের হাতে কচি মেয়েকে দিতে চাইত না নীলাঞ্জনের মা গার্গী। কিন্তু বোনকে একবার আদর করে কোলে নেওয়ার জন্য ছটফট করত নীলাঞ্জন। মা বলত, ‘নীল তুই আরেকটু বড় হয়ে নে, তারপর বোনের সব দায়িত্ব তোর।’ নীলাঞ্জনও তাই ভেবেছিল। ও বড় হয়ে বোনের সব দায়িত্ব নেবে। কিন্তু সবই কেমন যেন থমকে গেল। ঠিক বর্ষাকালের বাতাসের মতো। গুমোট হয়ে গেল চারিদিক। শুধু আকাশ জুড়ে কালো মেঘেদের সারি। পাহাড়ের মতো প্রতিনিয়ত বৃষ্টি হলেও এ মেঘ সরে রোদ উঠবে না বুঝে গেল সবাই।

ডক্টর বলে দিলেন নাইনটি পার্সেন্টেজ ভিশন চলে গেছে। বাকিটুকুও চলে যাবে খুব তাড়াতাড়ি। খেলতে গিয়ে বলটা মাথার যেখানে লেগেছিল, সেখানটার সঙ্গে চোখের সংযোগ আছে। তাই ড্যামেজটা চোখের হলেও আঘাতটা চোখে নয়, একেবারে মাথায়। তখন নীলাঞ্জন ক্লাস সিক্সের স্টুডেন্ট। বোনকে নিয়ে তার একটা সুন্দর জগৎ। একটা পুতুল পুতুল মেয়ে দিনরাত দাদাভাই বলে ডাকে, ওর সব কথা শুনে চলে। ওর রাজ্যের ও একাই রাজা। আর মন্ত্রী হল ওর বোন নয়না। রাজামশাইয়ের কথাই শেষ কথা যার কাছে। বাবা, মা, মাধুরীপিসি, অর্কদা সবার আড়ালে এই জগৎ। মাধুরীপিসি চব্বিশঘন্টা ওদের দুই ভাই-বোনের দেখাশোনা করেও ওদের লুকানো জগতের কোনো হদিশ পায়নি। অর্কদা সবসময় ওদের গাড়ি চালিয়ে স্কুলে, আঁকার স্কুলে নিয়ে গিয়েও বুঝতে পারেনি ওদের দুই ভাই-বোনের রাজত্বের কথা। মা, বাবা অফিস থেকে ফিরে এসে সব ঘরগুলো খুঁজেও দেখতে পায়নি ওদের নদীর ধারের রাজ্য আঁধারপুরের কথা।

যেহেতু আলমারি আর খাটের মাঝের একচিলতে জায়গায় বোন আর ও সাজিয়েছে ওদের রাজ্যটাকে, তাই নীলাঞ্জন তার নাম দিয়েছে আঁধারপুর। কিন্তু ও কখনও ভাবতেই পারেনি ওর নিজের জগৎটাই অন্ধকার হয়ে যাবে আস্তে আস্তে। স্কুলে বোর্ডে লিখলে দেখতে অসুবিধা হচ্ছিল থেকেই সূত্রপাত হয় চোখের সমস্যাটার।

গার্গী চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় ভেবেছিল চোখে পাওয়ার এসেছে নীলাঞ্জনের। কারণ নীলাদ্রিরও ছোট বয়েস থেকেই মোটা ফ্রেমের চশমা ছিল। শুধু নীলাদ্রি বললে ভুল হবে, নীলাঞ্জনের দুই কাকা, এক পিসিরও চোখে চশমা সেই ছোট বয়েস থেকেই।

নীলাদ্রি আফসোসের সুরে বলেছিল, ‘সেই বাপের ধাতটাই পেলি রে? জানো গার্গী, আমারও ক্লাস সেভেনে প্রথম চোখের সমস্যা ধরা পড়েছিল। মাইনাস পাওয়ার।’

গার্গী বলেছিল, ‘তোমাদের বাড়ির সকলেরই তো তাই।’

কিন্তু আই স্পেশালিস্ট অরূপ ঘোষ যখন বারংবার দেখার পরে বললেন, নীলাঞ্জনের ভিশন চলে যাচ্ছে তখন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গার্গী। আঁতকে উঠে বলেছিল, ‘কী বলছেন ডক্টর?’

ডক্টর ভুল কিছু বলেননি। তাই গত দু’বছরের সমস্ত চেষ্টাকে বিফল করে দিয়ে নীলাঞ্জন সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেল। ইন্দোর থেকে চেন্নাই সব ঘুরেছে গার্গী আর নীলাদ্রি ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেনি। দৃষ্টি শক্তি হারিয়েছে নীলাঞ্জন। গার্গী বা নীলাদ্রির গলায় দীর্ঘশ্বাসের স্বর শোনা গেলেও নীলাঞ্জন আচমকাই কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছে। সেই চনমনে ক্রিকেট, ফুটবলপ্রেমী ছেলেটা হঠাৎই যেন বড্ড বড় হয়ে গেছে। কঠিন গলায় জিজ্ঞাসা করেছে, ‘মা আমাকে তো আর স্কুলে রাখবে না। তাহলে আমি ঠিক কী করব?’

নীলাদ্রি নিজের চোখের জল লুকিয়ে ছেলেকে বুঝিয়েছে হেলেন কেলারের কথা। নীলাদ্রি গলায় এতটুকু কষ্টের প্রকাশ না করেই স্বাভাবিকভাবে বলেছে, ‘কেন? তুই তো এবার থেকে ব্রেইল মেমোরিয়াল স্কুলে পড়বি। আমি তো কথা বলে এসেছি ওদের প্রিন্সিপালের সঙ্গে। দেখবি ওখানে তোর কত বন্ধু হবে।’

নীলাঞ্জন ভাবুক গলায় বলেছে, ‘এই স্কুলের সাগ্নিক আর স্বর্ণাভ তাহলে আর বন্ধু নয় তো আমার? ওরা তো চোখে দেখতে পায়, ওরা কী করে অন্ধ ছেলের বন্ধু হবে? তার মানে পাপা নতুন স্কুলের সব ছেলে আমার মতোই ব্লাইন্ড, তাই না?’

গার্গী ডুকরে কেঁদে ওঠে ছুটে পালিয়েছে পাশের ঘরে। নীলাদ্রি মনকে কঠিন করেছে অদম্য চেষ্টায়। বুঝেছে ছেলেকে ফেস করতে হবে। গার্গী কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না নীলের এই অন্ধত্ব। চোখ ডোনেট করা যায় কিনা, তা নিয়েও কথা বলেছে। কিন্তু সেটাও নাকি সম্ভব নয়। ওর চোখের শিরাগুলো শুকিয়ে যাওয়াটাই রোগ। মেনে নিয়েছিল গার্গী আর নীলাদ্রি। ব্রেইল মেমোরিয়াল স্কুলে অ্যাডমিশন করিয়ে দেওয়া হয়েছিল নীলকে। কিন্তু যেহেতু ও জন্মান্ধ নয়, তাই প্রথম প্রথম খুবই অসুবিধা হত। নীলাঞ্জন রাগে গুম হয়ে বসে থাকত। ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ত এদিক ওদিক। তারপর নিজেই চেষ্টা করে করে হাতড়ে হাতড়ে শিখে গেছে সবটুকু।

আবার চেঁচিয়ে উঠল নীলাঞ্জন, ‘বুনি তুই সোজা গিয়ে সেন্টার টেবিল থেকে রিমোটটা নিয়ে আসবি।’

নয়না ছুটে গিয়ে রিমোটটা এনে ধরিয়ে দিল দাদাভাইয়ের হাতে।

রাগে চেঁচাতে লাগল নীল। ‘বুনি, তুই চোখ খুলে রেখেছিস কেন?’

নয়না ভয়ে ভয়ে বলল, ‘না দাদাভাই, আমি চোখ বন্ধ রেখেছি।’

নীলাঞ্জন রেগে গড়গড় করে বলল, ‘বল তো কতগুলো স্টেপ ফেলে গেলি আর কতগুলো স্টেপ ফেলে এলি?’

নয়না ভয়ে ভয়ে বলল, ‘গুণিনি তো।’

নীল আবার বলল, ‘আজ থেকে তুই আঁধারপুরের কেউ নয়। যা এখান থেকে।’

নয়না চেষ্টা করে চোখ বন্ধ করে হাঁটতে। কিন্তু পারে না যে। তাই চোখ খুলে ফেলে। দাদাভাই কী করে যে বুঝে ফেলে, ন’ বছরের নয়না কিছুতেই বুঝতে পারে না। দাদাভাইকে কষ্ট দিতে ও চায় না। কান্না পেয়ে যায় ওর। দাদাভাই যদি বুঝতে পারে নয়না ওকে মিথ্যে বলছে, নয়না চিটিং করেছে, তাহলে দাদাভাইয়ের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। চুপ করে নিজের ঘরের জানালার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। নয়না জানে দাদাভাই জানালার বাইরে কী চলছে কিছুই বুঝতে পারে না। তবুও কোনো একদিকে তো তাকিয়ে থাকতে হবে, তাই হয়তো।

নয়না ভয়ে ভয়েই দাদাভাইয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘আর দেখব না দাদাভাই। এবারের মতো ক্ষমা করে দে।’

নীলাঞ্জন নয়নাকে পাশে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলল, ‘আমি জানি বুনি, তোর চোখ বন্ধ করে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। দমবন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু দেখ আমি যেমন অন্ধ হয়ে গেলাম, তেমন যদি তুইও অন্ধ হয়ে যাস, তখন তো তোর খুব অসুবিধা হবে। আমি যেমন সব জায়গায় ধাক্কা খেতাম, যন্ত্রণা হত, কিছুই পারতাম না। সেগুলো তোর ক্ষেত্রে হবে না। তুই অন্ধ হয়ে গেলেও ছুটতে পারবি। তাই তোকে আমি সব শিখিয়ে রাখছি। তোকে অন্ধ হয়েও সব কাজে পারফেক্ট হতে হবে বুনি।’

নয়না ওর ছোট্ট মাথায় ছোট্ট ক্ষমতায় বুঝে নেয় দাদাভাইয়ের কথা মতো ওকে অন্ধ হতেই হবে। ওকে চেষ্টা করতে হবে। চোখ বন্ধ করে সব কাজ ওকে করতে হবে, চোখ খুলে নয়। ক্লাস সিক্সের নয়না যতক্ষণ বাড়িতে থাকে সবসময় চোখ বন্ধ করে সব করে। দাদাভাইয়ের কাছে বসে ব্রেইল সিস্টেমে অক্ষর চেনে। আস্তে আস্তে নয়নার কাছেও আঁধারপুর খুব কাছের হয়ে যায়। প্রায় বছরখানেকের চেষ্টায় নয়না এখন দাদাভাইয়ের মতোই না তাকিয়ে করতে পারে সবকিছু। গার্গী আর নীলাদ্রি মেয়েকে অনেক বুঝিয়েছে, দাদার মতো অন্ধ নয়না নয়, তাই সে যেন চোখ বন্ধ করে কোনো কাজ না করে। কিন্তু দুজনেরই অফিস থাকায় নীলাঞ্জন আর নয়নার জগতে ঢুকতে পারে না ওরা সেভাবে। তাছাড়া নয়নার ওপরে ওর দাদাভাইয়ের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। বাবা, মা, মালতীপিসি, টিচার, আন্টি সবার থেকে বেশি ভালোবাসে ও দাদাভাইকে। তাই দাদাভাইয়ের কথাই শেষ কথা ওর কাছে। নীলাঞ্জনও মন দিয়ে বোনকে অন্ধ বানাতে প্রস্তুত।

* * *

আজ ওদের স্কুল ছুটি পড়েছে। সামার ভ্যাকেশন। অখণ্ড অবসর। বাবা, মা দুজনেই অফিসে। মালতীপিসি রান্নার পরে ড্রয়িং রুমে বসে সিরিয়ালে মশগুল হয়ে আছে।

নয়না আর নীলাঞ্জন দুজনেই এই মুহূর্তে ওদের কল্পনার জগৎ আঁধারপুরে রয়েছে। নয়নার আজকের টাস্ক গন্ধ শুঁকে বলে দেওয়া সেটা কী জিনিস! নীলাঞ্জনের সামনে নয়না বসে আছে। চোখে কালো কাপড় বেঁধে নিয়েছে ও। যদি চোখ খুলতে মন চায় তাহলেও যেন খুলতে না পারে।

দাদাভাই ওর নাকের কাছে একটা করে জিনিস আনছে আর বলছে, ‘শুঁকে বল, এটা কী?’

নয়না যেটা পারছে সেটা চেঁচিয়ে বলছে, ‘এটা বই।’ ‘এটা ইরেজার।’

কখনও গন্ধ শুঁকেও বলতে ব্যর্থ হচ্ছে।

নয়না বুঝতে পারছে, ও যখনই ব্যর্থ হচ্ছে তখনই দাদাভাই রাগী গলায় বলছে, ‘তুই পারছিস না কেন? নিজেকে অন্ধ মনে কর বুনি। তাহলেই পারবি। ভাব, ভালো করে ভাব এই গন্ধটা তুই কোথায় পেয়েছিস? কোন জিনিস থেকে? মনে কর।’

নয়না অনেক চেষ্টা করেও বলতে পারেনি।

নীলাঞ্জন নিজের টেস্টের জন্য রেডি। নয়না যা এনেছে ওর নাকের সামনে তাই শুঁকে বলে দিয়েছে জিনিসটা কী! অবাক হয়েছে নয়না। দাদাভাই তো দেখতে পায় না, তাহলে সব সঠিক বলছে কী করে?

* * *

দিনগুলো এভাবেই কাটছিল নীলাঞ্জনের। অন্ধকার, নিকষ অন্ধকার ওর জগৎ। ও বারবার চেষ্টা করে সেই আলো ঝলমল দিনগুলোকে চোখের সামনে আনতে। কিন্তু স্মৃতির পাতায় আস্তে আস্তে তলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। এখন শুধুই অন্ধকার বিশাল একটা প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। লোকজনের হাসি, চেঁচামেচি, মজা এগুলো ও সহ্য করতে পারে না কিছুতেই। বারবার ওর মনে হয়, ছুটে গিয়ে আনন্দ করা লোকগুলোর চোখ দুটো অন্ধ করে দিই। দেখি তারপর কীভাবে হাসে ওরা। মায়ের করুণা মিশ্রিত কথা, বাবার স্তোকবাক্য কিছুই যেন সহ্য করতে পারে না ও। অসহ্য লাগে এই বাড়িটা। যখনই মনে পড়ে, এই বাড়ির সবাই সব দেখতে পায় শুধু ও ছাড়া, তখন মাথার মধ্যে একটা আগ্নেয়গিরির উপস্থিতি টের পায় ও। বাবা টিভি দেখছে, দেশের খবরাখবর। মাথার দু’পাশের শিরাগুলো দপদপ করতে শুরু করে নীলাঞ্জনের। এই পৃথিবীর কিছুই দেখা হল না ওর। প্রতিবার পুজোর ছুটিতে ওরা বেড়াতে যেত। যেবার কাশ্মীর গিয়েছিল সেবার টিউলিপের বেড দেখে নীলাঞ্জনের মনে হয়েছিল, এই বুঝি স্বর্গ। যখন মানালি গিয়েছিল, তখন রোটাং পাসে স্নো ফল দেখে মনে হচ্ছিল এটাই বুঝি স্বর্গ। এমন অনেক কিছু দেখেই নীলাঞ্জনের না দেখা স্বর্গর কথা মনে হত। কিন্তু এখন তো সব অন্ধকার। গতবার ওরা ভাইজ্যাগ বেড়াতে গিয়েছিল। সমুদ্রের ঢেউ আর হাওয়া শুনে বুঝতে পেরেছিল ওরা বিচে বসে আছে। ওইটুকুই অনুভূতি। বাকি চারিদিক অন্ধকার। বাড়ির এই ঘরের সঙ্গে বিচের কোনো পার্থক্যই নেই। নয়না বালিতে লাফালাফি করছিল। বেলুন কেনার সময় বলছিল, ‘আমি সবুজ বেলুন নেব।’ তার থেকেই নীল বুঝতে পারছিল, নয়না সব দেখতে পাচ্ছে। সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউগুলোকেও দেখতে পাচ্ছে। ওর খুব ইচ্ছে করছিল, ছুটে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে। হয়তো সমুদ্রের অত জলের ঝাপটা ওর চোখে লেগে আবারও ওর চোখটা ঠিক হয়ে যাবে। পরমুহূর্তেই নিজের বোকামির কথা ভেবে ও লজ্জা পেয়েছে। তাহলে তো শাওয়ারে স্নান করার সময়ই ওর চোখে জলের ঝাপটা লেগে ও আবার সব দেখতে পেত। কিন্তু ও জানে, ও আর কিছুতেই দেখতে পাবে না। বড় বড় ডক্টররা বলেই দিয়েছেন, এটা রেয়ারেস্ট কেস। কিছুতেই ঠিক হবার নয়। সত্যিই নীলাঞ্জন বড্ড স্পেশাল গডের কাছে।

ওই জন্যই ওর রোগটাও রেয়ার বানিয়েছে গড। ইদানীং আর বেড়াতে যাওয়ার কথাতে উত্তেজিত হয় না নীল। আর নিজের ব্যাগ গোছায় না এক সপ্তাহ ধরে। বরং হালকা স্বরে বলে, ‘আমার টিকিট কেটে টাকা নষ্ট করো না মা। আমি মালতীপিসির কাছে বাড়িতে রয়ে যাব। তোমরা ঘুরে এসো।’

কিন্তু মা বা বাবা কেউই ওর কথা না শুনে ওকে নিয়েই বেড়াতে যায়। এই যেমন এবারে গরমের ছুটিতে তিনদিনের জন্য গ্যাংটকের টিকিট কেটেছে। আর তিনদিন পরেই বেড়াতে যাওয়া। নীলের মধ্যে কোনো উত্তেজনা নেই। না ও পাহাড় দেখতে পাবে, না বরফ, না ঝর্ণা। ও তো শুধুই অন্ধকার দেখবে। হয়তো অনুভূতিতে একটু ঠান্ডা লাগবে মাত্র।

নয়না এসে লাফাতে লাফাতে খবর দিয়েছে, ‘দাদাভাই এবারে গ্যাংটকে গিয়ে রোপ-ওয়েতে চাপব।’

নীল স্থির গলায় বলেছে, ‘আমি যাব না বুনি। তোরা ঘুরে আয়। আমার কাছে তো সব সমান।’

নয়না দাদার মাথায় হাত রেখে বলেছে, ‘দাদাভাই তুই চল। আমিও কিছু দেখব না। তোর মতোই আঁধারপুরের মানুষ হয়ে ঘুরব গ্যাংটকে। তুই যেভাবে চোখ বন্ধ রেখে সব কিছু বুঝতে শিখিয়েছিস, সেভাবে ঘুরব।’

নয়নার কথায় রাজি হয়েছে নীল পাহাড়ে যেতে।

* * *

নীলাদ্রি আর গার্গীও বহুদিন পরে আবার বেড়াতে এসেছে। একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবনের থেকে একটু হলেও মুক্তি। এমনিতেই নীলাঞ্জনের জন্য সবসময় মনখারাপ থাকে ওদের। একটা প্রাণচঞ্চল ছেলেকে চোখের সামনে শুকিয়ে যেতে দেখল ওরা। বাবা-মা হয়েও কিছুই করতে পারল না ওরা। এই গ্লানি সবসময় কুরে কুরে খায় ওদের। তবুও অফিস বাড়ির বাইরে একটু প্রাণ খুলে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে ওরা। পাহাড়ের ওপরে এই নিরিবিলি জায়গায় সুন্দর বাংলোটা বুক করে দিয়েছে নীলাদ্রির একটা বন্ধু।

গার্গী ঢুকেই বলেছে, এত উঁচুতে কখনও থাকেনি ওরা। পাহাড়ে এলেও বেশিরভাগ সময়ই সমতল জায়গায় হোটেলে থেকেছে এতদিন। এই প্রথম একেবারে পাহাড়ের ওপরে রয়েছে ওরা। নীচে তাকালেই বিশাল খাদ। বাংলোর পিছনে বৌদ্ধ প্যাগোডা দেখা যাচ্ছে।

ব্যালকনির গার্ডেন চেয়ারে বসে আছে নীল আর নয়না।

নীল বলছে, ‘বল তো এখন কীসের গন্ধ রয়েছে বাতাসে?’

নয়না অনেক শুঁকে বলল, ‘বুঝতে পারছি না রে।’

নীলাঞ্জন হেসে বলল, ‘ধুর পাগলি, এটা বৃষ্টির গন্ধ। বাতাসে বৃষ্টির গুঁড়ো মিশে আছে।’

নয়না আপন মনে বলছিল, ‘জানিস দাদা আমরা যে বাংলোটাতে আছি তার পিছন দিকে মন্দিরের মতো কিছু আছে। তাতে অনেক রঙের পতাকা টাঙানো আছে। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ… পতপত করে উড়ছে পতাকাগুলো।’

নীলাঞ্জন হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হল ওর হাসি। তাতে আনন্দের থেকে কান্নাই বেশি মিশে আছে। নীল বলল, ‘বুনি, তুই যে বলেছিলিস তুই কিছু দেখবি না। অন্ধ হয়ে বেড়াবি। ঠিক আমার মতো।’

নয়না বলল, ‘আমার তো ভয় করছে রে দাদাভাই। এত উঁচুতে বাংলোটা। সামনে এই যেখানে আমরা বসে আছি তার ধারে বিশাল খাদ। পড়ে গেলেই মরে যাব আমরা। তাই একটু দেখে ফেলেছি আমি।’

নীলাঞ্জন হাসছিল, আর ওর দৃষ্টিহীন দুটো চোখ দিয়ে অনর্গল জল পড়ছিল। ফিসফিস করে বলল, ‘সবার মতো তুইও আমায় মিথ্যে বললি বুনি?’

নয়না ভয়ে কেঁদে ফেলে বলল, ‘আর দেখব না কিছু, প্রমিস।’

নীলাঞ্জন উদাস গলায় বলল, ‘আমি তোকে কষ্ট দিচ্ছি। আমি সেলফিস। তোকে দেখতে দিচ্ছি না কিছু।’

কথাটা বলতে বলতেই নয়নার বলা ভয়ঙ্কর খাদের দিকে এগিয়ে গেল নীলাঞ্জন। বলল, ‘আমি চললাম বুনি। তুই এবার থেকে সব কিছু দেখ, দু’চোখ ভরে দেখ।’

নয়না কাতর গলায় বলল, ‘দাদাভাই। আমি আর দেখব না কিছু, প্লিজ।’

নীলাঞ্জন আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘না তুই দেখবি। আজ থেকে তোর চোখে আমি পৃথিবী দেখব। তুই যা দেখবি সব আমায় বলবি।’

নয়না জড়িয়ে ধরল নীলকে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘এখন পাহাড়ে সন্ধে নামছে। ওই ধাপে ধাপে আলো জ্বলে উঠছে। ঠিক যেমন কালীপুজোর দীপাবলিতে আমরা ছাদে আলো জ্বালাই অমন।’

নীল বলল, ‘গুণে গুণে বল কতগুলো আলো দেখতে পাচ্ছিস বুনি?’

‘এক দুই তিন চার…’

নীলাঞ্জন কল্পনা করছিল পাহাড়ের ধাপে ধাপে প্রদীপ জ্বলে উঠছে। নয়না চারপাশের সবকিছু বলছে দাদাকে। নীলাঞ্জনের আবার বড্ড ভালো লাগছে এই পৃথিবীটা। একটা মিষ্টি বুনি আছে ওর। যার চোখ দিয়ে ও সবকিছু দেখতে পাচ্ছে।

নয়না বলল, ‘দাদাভাই, দূরে ওই লম্বা গাছগুলো কী গাছ রে?’

নীলাঞ্জন মুচকি হেসে বলল, ‘পাইন গাছ। আর কী দেখেছিস বল বল’

‘ওই তো হলদে ফুলে দুটো প্রজাপতি বসেছে… যা উড়ে গেল।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *