রক্তগোলাপ – অর্পিতা সরকার

|| ১ ||

পিছন থেকে এসে পূবালীকে জাপটে জড়িয়ে ধরেছে নিশান। পূবালী রান্নাঘরে টুকিটাকি কাজ করছিল। এখন নিশানের আসার কথাও নয়। ও এখন দোকানে থাকে। ফিরতে ফিরতে সেই রাত। নিশান আর পূবালীর দুজনের সংসার। নিশানের মা হঠাৎ মারা যাওয়ায় ওর দিদিই পূবালীর সঙ্গে নিশানের বিয়ে ঠিক করেছিল। শম্পাদি বলেইছিল আমাদের মধ্যবিত্ত সংসার, তাই গরিবের মেয়েই আনবো বউ করে। পূবালীর মতো গরিব বাড়ির মেয়ের বিয়ে যে বিনা খরচে হতে পারে এটা বোধহয় পূবালীর বাবা, মাও ভাবতে পারেনি। পূবালী খুবই ঘরোয়া মেয়ে। নিশানের ছোট্ট সংসারের ওই গৃহকর্ত্রী। তাই নিজের হাতে নিপুণ করে সাজিয়ে রেখেছে ওদের দুজনের সংসারটাকে। বিয়ের মাত্র ছয়মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনও পূবালীর গা থেকে নতুন বউয়ের গন্ধ যায়নি। নিশান আচমকা ওকে জড়িয়ে ধরেছে। তলপেটের শাড়ি সরিয়ে হাত বোলাচ্ছে নাভির কাছে। শিউরে উঠলো পূবালী। এমন আচমকা আদরে হাঁসফাঁস করে বলল, ”ছাড়ো ছাড়ো। তুমি না এতো জ্বালাও”

নিশান বলল, ”আমার বউ আমি কখন আদর করব তা কি কারোর পারমিশন নিয়ে করব?” দ্রুত হাতে পূবালীর ব্লাউজের হুকগুলো খুলে মুখ ঘষতে শুরু করল নিশান। দুটো পায়রা একসঙ্গে যেন ঝাঁপিয়ে পড়লো নিশানের ঠোঁটের সামনে। পুরুষ মানুষের বন্য আবেদনের সঙ্গে পারবে কেন পূবালী! শুধু এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিলো জানালাগুলো বন্ধ আছে কিনা। নিশানের আদরে ওর শরীরেও উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। হাতের নুনের কৌটাটা গ্যাসের টেবিলে রেখে দিয়ে নিজেই দুটো হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলো নিশানকে। নিশান ওর কানের লতিতে চুমু খেয়ে কানে কানে বলল, ”ঘরে চল। উঁহু ব্লাউজটা খোলা থাক।” পূবালীকে টেনে নিয়ে গেল বিছানায়।

দুটো শরীরে সুতোর অস্তিত্ব নেই। মিশে যাচ্ছে দুটো শরীর। আচমকা চমকে উঠল নিশান। আলতা! আলতা এল কোথা থেকে পূবালীর পায়ে! তাছাড়া পূবালীর গায়ের রং তো বেশ ফর্সা। এই শ্যামলা, নিটোল, আলতা আর নূপুর পরা এ দুটো কার পা?

নিশান পূবালীর পায়ের পাতায় চুমু খেতে গিয়েই শিউরে উঠল। ঘরের লাইটটা জ্বালতেই পূবালী বলল, ”লাইট জ্বাললে কেন? ইস লজ্জা করছে বন্ধ করো। জানালার ফাঁক দিয়ে যথেষ্ট আলো আসছে তো, আবার লাইট কেন?”

নিখুঁত ছিপছিপে একটা শরীর। গায়ে কোনো পোশাকের চিহ্ন নেই। না, পা দুটোওতো নিরাভরণ। আলতা বা নূপুরের চিহ্ন নেই সেখানে! তাহলে নিশান তখন কার পা দেখল?

শরীরের উত্তেজনা ক্রমশ প্রশমিত হয়ে গেল নিশানের। সেই উষ্ণতা আর নেই। কেমন যেন ঝিমুনি আসছে। বিছানায় ছটফট করছে পূবালী। নিশানের আদরে তার শরীর জেগে উঠেছে। নিশানকে টেনে কাছে নিয়ে এল ও। ঠোঁটে ঠোঁটটা ডুবিয়ে বলল, ”কি হল? আদর করতে ইচ্ছে করছে না? সম্পূর্ণ করো প্লিজ।”

নিশান আবারও ভয়ে ভয়ে তাকালো ওর পায়ের দিকে। না আলতা নেই ওর পায়ে। পূবালীকে চুমুতে চুমুতে পাগল করে দিচ্ছিল নিশান। আবারও নিজের শরীরে উষ্ণতা ছড়ানোর আয়োজন। নাভিতে ঠোঁট ঠেকানোর আগেই দেখল একটা লালচে জড়ুল। এ জরুল তো পূবালীর শরীরে নেই! চিৎকার করে উঠল নিশান। ”জড়ুল কোথা থেকে এল? কে তুমি?” ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলো পূবালী। গায়ের কাপড়টা খাটের পাশ থেকে টেনে গায়ে জড়িয়ে লাইটটা আবারও জ্বাললো ও। নিশান কাঁপছে বিছানায় বসে। পূবালী ওকে চেপে ধরে বলল, ”কী হয়েছে? তুমি আজ এমন কেন করছ? কী গো, বলো না কী হল?”

ভয়ে পূবালীর বুকটা শুকিয়ে গেছে। গরিব ঘরের মেয়ে সে। এখনও দুই বোন অবিবাহিত। বিয়ের পর থেকে নিশানকে সুখী করার জন্য সব কিছু করতে রাজি ও। এমন স্বামী ও কপাল করে পেয়েছে। পূবালীর কী পছন্দ অপছন্দ সেদিকে যে কেউ নজর দেবে এ যেন স্বপ্ন ছিল ওর কাছে। সে স্বপ্নও পূরণ হল নিশানকে পেয়ে। পায়ের নেলপালিশ থেকে শুরু করে হাতের চুড়ি অবধি পছন্দ করে কিনে দেয় নিশান। মাঝে মাঝেই জুঁইয়ের মালা এনে ওর খোঁপায় জড়িয়ে দিয়ে বলে, ”আজ জুঁইয়ের মালার দাম সব থেকে বেশি। তাই একটা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম তোমার জন্য। শেষ খদ্দেরটাকে ফিরিয়ে দিলাম।” পূবালী হেসে বলেছে, ”ধুর এসব কেন? মালাটা বেচে দিতে পারতে তো। তাহলে সত্তর টাকা পেতে। আমার খোঁপায় তো শুকিয়ে যাবে।”

নিশান বলে, ”তবুও এই লোভ সম্বরণ করে তোমার জন্য উপহার নিয়ে আসাটাই আমার ভালোবাসা। আরে ফুলের দোকানদার বলে কি নিজের বউকে ফুল গিফ করতে পারব না? সবই বেচে দেব?

এই যে ভ্যালেন্টাইনস ডের দিন গোলাপ ফুলের দাম উঠল পার পিস পঞ্চাশ টাকা। সেদিন যদি তোমায় গোলাপ না দিলাম তাহলে আর কিসের প্রেমিক আমি? অন্যদিন তো দশটাকা থাকে দাম।” গত ছয়মাসে কোনো সমস্যা হয়নি ওদের সংসারে। ভালোবাসার ঘাটতি হয়নি দুজনের মধ্যেই। আজ হঠাৎ এমন কী ঘটলো যে নিশান এমন অস্বাভাবিক ব্যবহার করছে! নিশান নিজে বি.এ পাশ করে চাকরি-বাকরির চেষ্টা করার আগেই ওর বাবা আচমকাই অসুস্থ হয়ে যায়। তখন বাবার ব্যবসা ফুলের দোকানটাতেই বসেছিল। তারপর বাবা মারা যাবার পরে নিশানই ব্যবসাটার হাল ধরেছিল। ওরই এক ছোটবেলার বন্ধু অরিত্রর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যবসাটাকে বাড়িয়েছে। বিয়ে বাড়ির খাট সাজানো থেকে শুরু করে কনের ফুলের সাজ এমনকি গাড়ি সাজানোর পর্যন্ত কন্ট্রাক্ট নেয় ওরা। বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে ব্যবসাটা। শ্রাদ্ধ থেকে বিয়ে সবেতেই ফুল সাপ্লাইয়ের ডাক পড়ে পুষ্পভাণ্ডারের।

এই মধ্যদুপুরে বাড়ি আসার তেমন কোনো কারণ নেই আজ। অরিত্র এসে দোকানে বসেছিল বলেই পূবালীকে আদর করতে বাড়ি চলে এসেছিল নিশান। স্কুটিতে উঠতেই অরিত্র মজা করে বলেছিল, ”হয় হয়, ঘরে নতুন বউ এলে এমনই হয়।” নিশান ওর কথাকে পাত্তা না দিয়েই চলে এসেছিল। পূবালী বিছানার এক কোণে বসে আছে; চোখে মুখে ভয়। নিশানের চোখদুটোতেও আতঙ্ক। দুজনেই যেন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে অব্যক্ত ভয়ার্ত চাউনি দিয়ে। নিশান আবারও ভয়ে ভয়ে তাকালো পূবালীর আলতা নূপুরবিহীন নিরাভরণ পা দুটোর দিকে। পূবালীকে আচমকা আবারও হ্যাঁচকা টানে বিছানায় ফেলল নিশান। ওর শরীরে জড়ানো বাঁধনবিহীন হালকা করে জড়িয়ে রাখা শাড়িটাকে উদ্ভ্রান্তের মতো সরিয়ে কিছু একটা খুঁজে চলেছে নিশান। ভয় করছে পূবালীর। নিশানের চোখ দুটো রক্তবর্ণ, হাতের তালু গরম, চোখে মুখে বিভ্রান্তি চিহ্ন স্পষ্ট। পূবালী বলল, ”কী খুঁজছো তুমি? একটু বলবে কী খুঁজছো? জল খাবে?”

নিশান ফিসফিস করে বলল, ”লাল জড়ুলটা। যেটা এখুনি দেখলাম নাভির কাছে। ওটা কোথায় গেল?”

পূবালী আতঙ্কিত হয়ে বলল, ”আমার পেটে কোনো লাল জড়ুল নেই। বিশ্বাস করো।” নিশান মাথাটা প্রবলভাবে নেড়ে বলল, ”আমি ভুল দেখিনি। ছিল এখুনি ছিল। বিশ্বাস করো পূবালী এখুনি ছিল।”

নিশান জামা প্যান্ট পরে বেরিয়ে গেল। পূবালী অবশ শরীরটা নিয়ে বসে রইল। উষ্ণ শরীরটা ক্রমশ শীতল হয়ে গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠতেই যেন ইচ্ছে করছে না। খিদেও মরে গেছে।

তবুও অবশ শরীরটাকে টেনে নিয়ে গেল বাথরুমে। এক বালতি জল ঢালতে হবে। কেন কে জানে আজ নিশানের ওই বিভ্রান্ত দৃষ্টি, ওর শরীরে অতিপাতি করে জড়ুল খোঁজার চেষ্টা…সব মিলিয়ে মাথাটা কাজ করছে না পূবালীর। বাথরুমে শাওয়ারটা নতুন লাগিয়েছে নিশান। পূবালীকে চোখ টিপে বলেছিল, ”একসঙ্গে ভিজব দুজনে।” শাওয়ারে স্নান করায় এখনও অভ্যস্ত হয়নি পূবালী। এতদিনের অভ্যেস বালতি করে জল নিয়ে মগে করে মাথায় ঢালা। বাপের বাড়িতে তো সেভাবে বাথরুমে কল ছিল না। উঠোনের টিউবওয়েল থেকে জল নিয়ে বাথরুমে ঢুকে স্নান সারতো ওরা। বাথরুম বলতে টিনের চালের একটা চারকোনা ছোট ঘর। নিশান বড্ড শৌখিন। বাথরুমে সুন্দর একটা আয়না, স্টিলের ট্যাপ কল, শাওয়ার লাগানো আছে। মাঝেমাঝে পূবালীর নিজেকে স্বর্গের রাজকন্যা মনে হয়। বাথরুমের ওই আয়নায় নিজের ভেজা শরীরটা দেখে নিজেকেই ভালোবাসতে মন হয় ওর। শাওয়ারটা লাগানো হয়েছে দিন দশেক হল, কিংবা তার বেশিই হবে। নিশান শাওয়ারে স্নান করলেও পূবালী এখনও পুরোনো অভ্যাসেই রয়ে গেছে। ওর ওই বালতি-মগের ঠোকাঠুকিটাই বেশি ভালো লাগে।

তবুও আজ শাওয়ারটা চালিয়ে দিল।

চোখ বন্ধ করে দাঁড়ালো শাওয়ারের নীচে। আচমকাই একটা আঁশটে গন্ধ এসে নাকে লাগল। চোখটা খুলতেই চমকে উঠল পূবালী। ওর গোটা গা ভেসে যাচ্ছে রক্তে! লাল রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে ওর কপাল থেকে চিবুক বেয়ে উন্মুক্ত বুকে। চিৎকার করে উঠে শাওয়ারটা বন্ধ করল পূবালী। বাথরুমের মেঝেতেই বসে পড়ল ও। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল সাদা পাথরের মেঝেতে কোথাও রক্তের ফোঁটা নেই। অদ্ভুত তো! অথচ ওর হাত লাল হয়ে গেছে রক্তে। আবারও হাতটা নিজের চোখের সামনে এনে মেলে ধরল। না, মাথার সিঁদুর নয়। এটা রক্তই। নাকের কাছে এনে শুকলো, নিশ্চিত হল সিঁদুর নয়। ট্যাপ কলটা খুলতে ভয় করছে ওর। যদি বালতিতে রক্ত পড়ে!

তবুও নিজের গায়ের রক্তগুলো ধোবে বলেই কলটা খুলে দিল। সাদা জল পড়ছে দেখে মনটা শান্ত হল। কিন্তু শাওয়ার দিয়ে কী পড়ল ওর গায়ে! শীত করছে ওর। অনেকক্ষণ এভাবে ভিজে গায়ে বাথরুমে বসে আছে। বালতি থেকে বেশ কয়েক মগ জল গায়ে মাথায় ঢেলে বেরিয়ে এল পূবালী। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস ওর তেমন নেই। ভূতের সিনেমা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এসব আচমকা ঘটনা দেখে তো সবই ভৌতিক মনে হচ্ছে! সাদা চোখে যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আজকে সকালেও নিশান এই শাওয়ারে স্নান করেছে। ওর গায়ে তো রক্ত পড়েনি। তাহলে কেন পূবালীর গায়েই পড়ল রক্তের চাপ ফোঁটাগুলো! কাঁচা রক্তের গন্ধ বেয়ে নামল শরীরের বাঁকগুলো দিয়ে!

ফাঁকা বাড়িতে কেমন একটা ভয় ভয় করতে শুরু করল পূবালীর। সিঁড়ি দিয়ে পায়ে পায়ে ছাদে উঠে গেল ও। সামনের মাঠে একদল ছেলে ফুটবল খেলছে। পায়ে বল নিয়ে দৌড়াচ্ছে, চেঁচাচ্ছে, উল্লাস করছে দেখে জোরে নিশ্বাস নিল পূবালী। গা ছমছমে ভাবটা কেটে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। বুকটা ভার হয়ে গিয়েছিল। ভয়ে শিরদাঁড়ার ভিতর দিয়ে ঠান্ডা রক্তকণিকার চলাচল অনুভব করছিল ও। ছেলেদের বল পায়ে দৌড় দেখে আবারও যেন প্রাণ ফিরে পেল ও। আচমকা খেয়াল করল ও ছাদের মাঝখান থেকে ছাদের কিনারাতে এসে পৌঁছেছে। আরেকটু এগোলেই নীচে পড়ে যাবে। কেউ যেন তার সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলছে ওকে। কার্নিশটা ধরে আপ্রাণ লড়াই করছে পূবালী। নীচে রাস্তায় নীলাদিকে দেখেই চিৎকার করে উঠল, ”ও নীলাদি কোথায় যাচ্ছ? এসো আমাদের বাড়িতে।” নীলাদি ওপরের দিকে তাকাতেই পিঠের দিকের চাপটা হালকা হল ওর। যে ঠেলছিল সে যেন বিরক্ত হয়ে হাত সরিয়ে নিল। জোরে নিশ্বাস নিল পূবালী। নীলাদি ওর ননদের ছোটবেলার বান্ধবী। প্রায়ই এসে বসে পূবালীর কাছে। বিয়ের মাত্র বছর দুয়েকের মধ্যেই স্বামীকে হারিয়ে বিধবা হয়ে ফিরেছিল বাপের বাড়িতেই। এ পাড়ার সব কাজে ডাক পড়ে নীলাদির। পুজোর জোগাড় থেকে কারোর ব্যাংক-পোস্ট অফিসের দরখাস্ত জমা দেওয়ার কাজেও ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো ওই নীলাদি। নীলাদিও হাসি মুখে সকলের সব কাজ করে দেয়। নীলাদির ভাই আর ভাইয়ের বউ অন্যত্র ফ্ল্যাট কিনে চলে গেছে। তাই অত বড় বাড়িটাতে প্রাণী বলতে নীলাদির সত্তর বছরের বৃদ্ধা মা আর নীলাদি। বাবার স্টেশনারি দোকানটাকে আবার দাঁড় করিয়েছে নীলাদি। গায়ের রং এখনও ফেটে পড়ছে। টানা টানা চোখে কারোর দিকে তাকালে সে কুপোকাত হতে বাধ্য। এ পাড়ার অনেকেই নীলাদির প্রেমে পড়েছে। বিশেষ করে অরুণাভদা যে নীলাদির জন্য চিরকুমার রয়ে গেল এটা নিশানই পূবালীকে বলেছিল। পূবালী বলেছিল, ”কেন বিয়ে করল না কেন? অরুণাভদা তো বেশ দেখতে, চাকরিও করে ভালো তাহলে নীলাদি বিয়েটা কেন করল না?” পূবালীর সরল প্রশ্নের উত্তরে নিশান বলেছিল,”নীলাদি একটু বেশিই ভালোবাসে অরুণাভদাকে। তাই বিয়েটা করল না।” পূবালী আরও অবাক হয়ে বলেছিল, ”বুঝলাম না গো।” নিশান হেসে বলেছিল, ”নীলাদি বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই বিধবা হয়ে গিয়েছিল। ওর হাজবেন্ড মারা যায় অ্যাকসিডেন্টে।

তাই নীলাদি মনে করে তার সংস্পর্শে এলে ক্ষতি হবে। তাই অরুণাভদাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।”

পূবালীর সেদিন থেকেই নীলাদিকে খুব ভালো লাগে। অদ্ভুত একটা ব্যক্তিত্ব আছে মহিলার মধ্যে। আবার বেশ সহজে মিশেও যেতে পারে সকলের সঙ্গে।

নীচে থেকেই চেঁচিয়ে বলল নীলাদি, ”কেন রে কী হয়েছে? একটু বাজারে যাচ্ছিলাম।” পূবালী তাও ডাকল, ”একবার এসো না গো, প্লিজ এসো।”

নীলাদি আর দেরি না করেই পূবালীদের দরজায় কড়া নাড়ল। কোনোমতে সিঁড়িটা দুমদাম করে প্রায় ছুটেই নামল পূবালী। দরজাটা খুলতেই নীলাদি বলল, ”ওমা মুখটা এমন কালো কেন? নিশান ঝগড়া করেছে? কিছু বলেছে নাকি রে?” নীলাদি পূবালীকে তুই করেই ডাকে। বড্ড আপন মনে হয় ডাকটা। পূবালী কোনো কথা না বলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

নীলাদি মাথায় হাত রেখে বলল, ”বোকা মেয়ে। নিশান খুব ভালো ছেলে। হয়তো দোকানে কারোর সঙ্গে গন্ডগোল হয়েছে, মাথা গরম ছিল তাই তোকে দু কথা বলেছে। এতে কেউ কাঁদে পাগলী?” পূবালী চোখের জল মুছে ভাঙা গলায় বলল, ”এ বাড়িতে কেউ আমায় মেরে ফেলতে চায় নীলাদি। আমি বেশ বুঝতে পারছি। আমার সাজানো সংসার তার পছন্দ নয়।”

নীলাদি একটু ভেবে বলল, ”কী ভুল বকিস তুই? এ বাড়িতে আছে টা কে? নিশান আর তুই ছাড়া আর তো কেউ নেই। শম্পা তো কালেভদ্রে আসে। আর তাছাড়া শম্পার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়। ও তোর খুব প্রশংসা করে। বলে— নীলা একটু দেখিস আমার ভাইয়ের বউটাকে। বেচারা একা একা কত সামলাবে বল দেখি।”

শম্পা নিশানের বড়দি। সত্যি বলতে কি শম্পাদির জন্যই পূবালী নিশানের বউ হয়ে এই সংসারে এসেছে বিনা পণে।

পূবালী জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে বলল, ”মানুষ নয় নীলাদি। অন্য কেউ। কোনো খারাপ আত্মাও হতে পারে। এসো তুমি বাথরুমে এসো, শাওয়ারটা চালাও দেখো রক্ত পড়বে।” নীলাদি সাহসী মেয়ে। মাঝরাতে হাতে টর্চ নিয়ে পাড়ার যে কারোর প্রয়োজনে হাজির হতে পারে সে।

নীলাদি বলে,”আমার এমন ভাগ্য যমেও ছোঁবে না। নাহলে অমন রাজপুত্রের মতো স্বামীকে খুইয়ে ফেলি!” নীলাদি কিছুতেই মেনে নিতে পারে না স্বামীর অপঘাতে মৃত্যুটা। বারংবার নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করে। তাই হয়তো সারাদিন কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। যাতে ভুলে থাকতে পারে সহজেই। নীলাদির পিছন পিছন সাহসে ভর করে পূবালীও গিয়ে দাঁড়াল বাথরুমের চৌকাঠে। নীলাদি ভিতরে ঢুকতেই পূবালী বলল, ”বাঁ দিকের ট্যাপটা।” নীলাদি শাওয়ারের কলটা খুলতেই স্বচ্ছ জলের ধারা ওপর থেকে তির বেগে নেমে এল বাথরুমের সাদা মেঝেতে। নীলাদি অসময়ে ভিজে যাবার ভয়ে সরে এল একটু। বলল, ”কই রে? রক্ত কোথায়? এ যে বিশুদ্ধ জল বেরচ্ছে। সেটাই যদিও স্বাভাবিক। শোন তোর পেট গরম হয়েছিল। দিন রাত ওই ফুচকা, রোল খাবি তো হবে না? মৌরি ভেজানো জল খা পরপর সাতদিন। ভুলভাল ভয় পাস না। আমার স্বামী অপঘাতে মারা গেল, রাতভোর ঠায় বসে থাকতাম খাটের ওপরে। সে সেদিন অফিস যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে। তাই সে চলে যাবার পরেও বসে থাকতাম তার অপেক্ষায়। কতবার ফাঁকা ঘরে তাকে ডেকেছি। বলেছি, একটিবার এস না গো। কিছু বলার থাকলে বলে যাও তোমার নীলাকে। কোথায় কী! নিজের কান্নার জলে গাল ভিজেছে। সে আসেনি। কোনোদিন তার পায়ের আওয়াজও শুনিনি আমাদের শোবার ঘরে। ওসব আত্মা বলে কিছু হয় না রে।” পূবালী জড়িয়ে ধরল নীলাকে।

”নীলাদি এ সংসারের ওপরে কেউ একটা কিছু করেছে বিশ্বাস করো তুমি। আজ তোমার ভাই দুপুরে এসে আমার সারা শরীরে পাগলের মতো লালচে জড়ুল খুঁজছিল। যেটা আমার শরীরে নেই। বলছিল, আমি নাকি পায়ে আলতা পরেছিলাম, কোথায় গেল? এসব উল্টোপাল্টা কথা বলতে বলতে ফিরে গেল দোকানে। আমার খুব ভয় করছে গো।”

নীলা একটু ভেবে বলল, ”ঠিক আছে তুই দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে ঘরে টিভি চালিয়ে থাক। আমি দেখি একবার মুকুন্দদার সঙ্গে কথা বলে। ওর এসব তান্ত্রিকদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে শুনেছি। লোকটা প্রায়ই তারাপীঠে যায়। দেখি কী করা যায়। নাহলে মৃত্যুঞ্জয়কাকুকে একবার ডেকে আনব বাড়িতে।”

নীলাদি যতক্ষণ এ বাড়িতে ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত পূবালীর ভয় করেনি। যেমনি নীলাদি চলে গেল অমনি গা ছমছম করতে শুরু করল।

তবুও টিভিটা একটু জোরে চালিয়ে দিল পূবালী। রাতের জন্য রান্না করতে হবে। দুপুরের খাবারগুলোর কিছুটা পড়েই আছে। তবুও জোর করে নিজেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করছে পূবালী। ওর কেন যে মনে হচ্ছে আজ এ বাড়িতে ওর সঙ্গে সঙ্গে কেউ একটা ঘুরছে!

 || ২ ||

”কী রে এত মনমরা হয়ে রয়েছিস কেন? বাড়ি গেলি আসার সময় স্কুটি ছাড়া হেঁটে এলি, কী ব্যাপার রে? বৌয়ের সঙ্গে ঝগড়া হল?” অরিত্র গাঁদার মালার হিসেবগুলো লিখতে লিখতে বলল। নিশান অন্যমনস্কভাবে বলল, ”না রে ঝগড়া নয়। অদ্ভুত একটা ঘটনা হল দুপুরে। এখনও তার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। কেন যে এমন অকল্পনীয় ঘটনাটা ঘটল তার হিসেব খুঁজে পাচ্ছি না। আর স্কুটিটা ফেরার পথে গন্ডগোল করছিল। এক্সেলেটরে চাপ দেবার আগেই স্পিড বাড়ছিল আপনাআপনি। তাই দেবেশের গ্যারেজে দিয়ে এলাম। স্কুটি আর কদিন? এত কাল তো হয় হেঁটে নয় সাইকেলেই কাটল। সেটা সমস্যা নয় রে। এ এক অন্য গন্ডগোল, হিসেব মিলছে না কিছুতেই।”

অরিত্র হেসে বলল, ”সব কিছুর কারণ খুঁজতে যাস না তো। এই যে আমি হঠাৎই নিজের ব্যবসায় লোকসান করলাম। তুই হাত বাড়ালি বন্ধু হিসাবে, আমিও কিছু না ভেবেই তোর দোকানে এসে বসলাম মাত্র মাস পাঁচেক আগের ঘটনা। তারপর থেকে দেখ দুজনে তোর ফুলের দোকানটাকে কত বড় করলাম। ব্যবসা বাড়ল। এগুলোর পিছনে কি সেভাবে কোনো কারণ আছে?

নেই বুঝলি। তবুও তুই হাতটা বাড়িয়ে ছিলিস বলেই আজ অরিত্র বেঁচে গেল।”

নিশান হেসে বলল, ”আরে ধুর। তোর শুধু এক কথা। তুই আসার পরে কি আমার লাভ হয়নি? আগে বিয়ে বাড়ির ডেকোরেশনের কাজগুলো সব ছেড়ে দিতে হত। এখন পুরোটা তুই আর বিট্টু সামলাচ্ছিস।

আসলে কি জানিস কিছু খুব অদ্ভুত বিষয় ঘটছে আমার জীবনে। ঠিক বলে বোঝাতে পারব না তোকে।

পূবালী এমনিতে খুব ভালো মেয়ে। খুব সংসারী। আমাকে ভালোবাসে প্রাণ দিয়ে। কিন্তু আজ দুপুরে ওর মধ্যে অদ্ভুত সব কাণ্ড দেখলাম। কেন যে এমন হল তার হদিশ নেই বুঝলি?”

অরিত্র বলল, ”ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এসব হয়। রাতে গিয়ে আদর করে দিস মিটে যাবে।”

নিশান একটু হাসল।

দোকান বন্ধ করে দুজনে বাড়ির রাস্তা ধরল।

অরিত্র ওর বাড়ির দিকে চলে যাওয়ার পরেই গা ছমছম করতে শুরু করল নিশানের। বাগদি পুকুরের ধার দিয়েই রোজ যায়। শর্টকাট রাস্তা ওটা। আজ যেন রাস্তাটা অনেক বেশি মনে হচ্ছে। একই নারকেল গাছ যেন চারবার ক্রস করছে ও। থমকে দাঁড়াল নিশান।

কিছুটা এগোতেই দেখতে পেল পূবালী দাঁড়িয়ে আছে আলো-অন্ধকারে। নিশান ওর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ”এত রাতে বাইরে কী করছ?”

পূবালী কথার উত্তর না দিয়ে পুকুরের ধার দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নিশানও ওকে অনুসরণ করছে। কিন্তু প্রায় ছুটে হাঁফিয়ে গিয়েও কিছুতেই যেন পূবালীর হাতটা ধরতে পারছে না। পূবালী ওর ঠিক চার পা আগেই রয়ে যাচ্ছে। নিশান হাঁফাতে হাঁফাতে চিৎকার করল, ”ওদিকে কোথায় যাচ্ছ? যেও না, সাপ-খোপ থাকতে পারে।” পূবালী ওর দিকে হাত বাড়াল। নিশান হাতটা ধরতেই চমকে উঠল। পূবালীর হাতটা হিমশীতল। বাগদি পুকুরের জলে রোজ চৌধুরীদের দোতলার বারান্দার আলোটা পড়ে। আজ সে আলোও বোধহয় বন্ধ আছে। পুকুরের জলটা নিকষ কালো।

নিশান চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছে না পূবালীর ঠান্ডা হাতটা। পূবালীর মুখে অদ্ভুত একটা ভয়ঙ্কর হাসি। নিশান কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আপ্রাণ ছুটল বাড়ির দিকে।

বাড়ির গেটের সামনে এসে আছাড় খেয়ে পড়ল। পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা বোধহয় উড়েই গেল।

গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছে না ওর।

যখন জ্ঞান ফিরল, দেখল ও বিছানায় শুয়ে আছে। রানা আর পূবালী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে তাকিয়ে আছে। রানা ওদের পাশের বাড়িতেই থাকে। নিজের ভাইয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় ও।

পূবালী বলল, ”এখন ঠিক আছ?” নিশানের গলা থেকে বুক যেন শুকিয়ে গেছে। পূবালী হয়তো আঁচ করেই জলের গ্লাসটা সামনে ধরল। নিশান একটু উঠে গ্লাস থেকে জলটা ঢকঢক করে খেয়ে আবার শুয়ে পড়ল। পূবালী কোনো প্রশ্ন না করেই রানাকে বলল, ”তুই বাড়ি যা। কাকিমা খেতে বসবে তুই গেলে। দাদা তো এখন ঠিক আছে। একটু ঘুমিয়ে নিলে ঠিক হয়ে যাবে।”

রানা ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে গেল। পূবালী শান্ত গলায় বলল, ”কিছু খাবে তুমি?”

নিশান বলল, ”তুমি বাইরে বাগদি পুকুরের ধারে কী করছিলে এত রাতে?”

পূবালী মাথা নীচু করে আছে। নিশান দেখল নিজের পায়ের বুড়ো আঙুলে একটা সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা। মনে পড়ে গেল পড়ার সময় আঙুলে লেগেছিল সজোরে।

পূবালী কোনো কথা না বলে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মাথাটা গরম হয়ে গেল নিশানের। একটু জোরেই বলল, ”আমি একটা প্রশ্ন করেছি পূবালী উত্তর দাও। রাত নটার সময় তুমি বাড়ির পিছনের ওই পুকুরের ধারে কী করছিলে?”

পূবালী বলল, ”আমি বাড়িতেই ছিলাম কোথাও যাইনি বাড়ি থেকে। তোমার পড়ে যাবার আওয়াজ পেয়ে গ্রিল খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখি তুমি অজ্ঞান হয়ে গেছ। তাই আমি রানাকে দেখতে পেয়ে ডেকেছিলাম। ও আর আমি তোমায় তুলে এনে বিছানায় শুইয়েছিলাম।” কথাটা বলতে বলতেই পূবালী ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

নিশান বেশ বুঝতে পারল কোনো কারণে পূবালী ওকে মিথ্যে বলছে। পুকুর পাড়ে ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল পূবালী। সম্পূর্ণ ভুলে যায়নি ও।

নিশান বিরক্ত হয়ে বলল, ”মিথ্যে কথা বলার অভ্যেসটা দেখছি বেশ ভালোই রপ্ত করেছ।”

পূবালী কান্নাভেজা গলায় বলল, ”নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ। মনে পড়ে যাবে তুমি কোথায় গিয়েছিলে।” ছুটে অন্য ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিল পূবালী। আওয়াজটা কানে এসে পৌঁছাল নিশানের। নিশান পায়ে ব্যথা নিয়েই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ঘরের বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চমকে উঠল। এই বড় আয়নাটা ও শখ করে লাগিয়েছে বিয়ের পরেই। পূবালীকে এই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছিল, ”রোজ এখানে দাঁড়িয়ে সুন্দর করে সাজবে।” পূবালী হেসে বলেছিল, ”বাড়ির মধ্যে এত সেজে কী করব?”

নিশান ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ ঘষতে ঘষতে বলেছিল, ”তোমার পরিপাটি সাজগোজগুলো আমি ধ্বংস করব।” লজ্জা পেয়ে নিশানের বুকে মুখ লুকিয়েছিল পূবালী। এত সিঁদুর ওর বুকে লাগল কী করে? সাদা জামায় সিঁদুর আর লিপস্টিকের দাগ। নিশান নিজের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। কী হচ্ছে এসব ওর সঙ্গে? দোকান বন্ধ করে রোজকার মতো বাড়ি ফিরছিল ও, কোথা দিয়ে কী ঘটে গেল!

বিছানায় রাখা ফোনটা বাজছে। নিশান চট করে জামাটা খুলে ফেলল, সম্ভবত পূবালী বা রানা ওর মুখে জল ছিটিয়ে ছিল, তাই জামাটা একটু ভিজে ভিজে রয়েছে। সিঁদুরের লালচে রংটা জলের ঝাপটায় আরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। ভিতরের গেঞ্জিটা অবধি হালকা লালচে হয়ে রয়েছে। এত সিঁদুর এখনকার কোনো মেয়েই তো মাথায় পরে না। তাহলে এল কোথা থেকে!

ভাবনার মধ্যেই ফোনটা রিসিভ করল নিশান। আননোন নম্বর থেকে ফোন। হয়ত কারোর ফুলের অর্ডার আছে। ভোরের ট্রেনে যেহেতু ফুল আসে। তাই অনেকেই রাতে ফোন করে অর্ডারের ফুল জানিয়ে রাখে নিশানকে। ফোনটা রিসিভ করতেই একটা মেয়ে মিষ্টি গলায় ফিসফিস করে বলল, ”আঠেরটা গোলাপ আর ছটা জুঁইয়ের মালা লাগবে, পাওয়া যাবে কাল রাত ঠিক নটায়।”

নিশান বলল, ”যাবে। আপনার নাম?”

মেয়েটা হেসে বলল, ”আপনি রেখে দেবেন, আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসব।” ফোনটা রেখে দিল নিশান।

ক্লান্ত শরীরেই পাশের ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা দিল। ”পূবালী, দরজা খোলো প্লিজ।”

কোনো সাড়া নেই। রান্নাঘরে খাবার ঢাকা দেওয়া রয়েছে। দুজনে একসঙ্গে বসে টিভি দেখতে দেখতে রোজ খায়। গত ছমাসে এটাকেই ওরা রুটিন বানিয়ে নিয়েছে। সারাদিনের গল্পের ঝুলি খুলে বসে পূবালী।

মেয়েটা আজ অভিমান করে না খেয়ে শুয়ে পড়ল। খাবার দেখেই খিদে পেয়ে গেল নিশানের। কিন্তু বিয়ের পর থেকে অনেক বলা সত্ত্বেও পূবালী কোনোদিন ওকে ছেড়ে খায়নি। একা একা খেয়ে নিতেও কেমন লাগছে ওর।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।

আবারও পূবালীর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করল নিশান। কোনো সাড়া নেই। হয়তো না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। আজ দুপুর থেকে যা যা ঘটে চলেছে ওর সঙ্গে তার কোনো সমাধান এখনও অবধি খুঁজে পায়নি নিশান। গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল যেন।

এসব অশরীরী আত্মায় কখনও বিশ্বাস করে না ও। কিন্তু পূবালীর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে ওর কোনো একটা বড় সমস্যা হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন একটা অন্য আত্মা ভর করেছে ওর ঘাড়ে। খাবার বেড়ে টেবিলে এসে বসল নিশান। খেতে শুরু করেই মনে হল কেউ যেন ঠিক ওর পাশের চেয়ারে বসে ওর খাওয়া লক্ষ্য করছে। তার নিশ্বাসের ভারী আওয়াজ ওর কানে এসে পৌঁছেছে। খিদের চোটে তাড়াতাড়ি খেতে গিয়ে গলায় লাগল। কেউ যেন ওর দিকে জল সমেত গ্লাসটা এগিয়ে দিল।

ঢকঢক করে জলটা খেয়ে নিয়ে নিশান থালার অবশিষ্ট ভাতগুলো খেয়ে নিল। বারবার পাশের চেয়ারের দিকে তাকাল ও। কাউকে দেখতে পাচ্ছে না নিশান। কিন্তু ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে ওখানে কেউ একজন বসে ওর খাওয়ার তদারকি করছে। কেউ যেন সংসারের কর্ত্রীর মতো খেয়াল রাখছে ওর যত্নের। যেটা রোজ পূবালী করে সেটাই যেন কেউ করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পূবালীর দরজা বন্ধ। কেউ যেন ফিসফিস করে বলছে, ”পেট ভরল? আর দুটো ভাত নেবে?”

নিশানের পাগল পাগল লাগছে। কোনোমতে হাত ধুয়ে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ক্লান্ত শরীরে ঘুম নামতে বেশি সময় নিল না।

ঘুমের মধ্যে টের পেল পূবালী এসে ওর পাশে শুয়েছে। পূবালী যে সাবান, যে ক্রিম ব্যবহার করে, তার গন্ধ এসে নাকে লাগল। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই জড়িয়ে ধরল পূবালীকে।

নিত্যদিনের অভ্যাসের মতোই ওর বুকে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল নিশান। আচমকা নিঃশ্বাসে খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। জড়িয়ে আছে চোখ দুটো, কিছুতেই খুলতে পারছে না যেন। অনেক চেষ্টা করেও চিৎকার করতে পারছে না ও। অথচ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে নিশানের। জড়িয়ে ধরে থাকা পূবালীর শরীরটা অন্যদিন ওকে উষ্ণতা দেয়। আজ যেন ফ্রিজের বরফে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ওর নাক, মুখ। ও দুহাত দিয়ে আপ্রাণ ঠেলতে চেষ্টা করছে পূবালীকে। কিন্তু এত ঠান্ডা শক্ত একটা শরীরকে কিছুতেই ঠেলে সরাতে পারছে না নিশান। গলা দিয়ে আর্ত চিৎকার বেরিয়ে এল বোধহয় ওর। তখন অনুভব করল শরীরটা আবার আগের মতো হালকা লাগছে। ভারী হাতটা সরে গেছে ওর শরীর থেকে। পাশে রাখা জলের বোতলে জল নেই। রোজ এটা ভরে রাখে পূবালী। আজ ফাঁকা। কোনোমতে ঘুমের ঘোরেই টলতে টলতে বাইরে এসে টেবিলে রাখা একটা জলের বোতল তুলে নিতে নিতে খেয়াল করল বাথরুমে লাইট জ্বলছে।

লাইট তো ও নিভিয়ে দিয়েছিল বলেই মনে হচ্ছে। তাহলে হয়তো তারপর পূবালী গিয়েছিল। দুপা এগিয়ে লাইটটা বন্ধ করতে যেতেই দেখতে পেল পূবালী নীচু হয়ে বমি করছে।

নিশান তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে পূবালী পিঠে হাত রেখে বলল, ”কষ্ট হচ্ছে? খাওয়া-দাওয়া করনি বলে হয়ত অম্বল হয়ে গেছে।”

চোখে-মুখে জল দিয়ে পূবালী বলল, ”আমি কদিনের জন্য বাপের বাড়ি যাব। আমার কেমন একটা দমবন্ধ লাগছে এখানে।” নিশান বলল, ”সে যাও কিন্তু আগে তোমায় একটা ডাক্তার দেখাই তারপর যেও।”

পূবালী ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, ”কিসের ডাক্তার?”

নিশান কঠিন চোখে তাকিয়ে বলল, ”পাগলের ডাক্তার। এই অকারণে আমায় মেরে ফেলার যে পাগলামি তুমি করছ সেটার কারণটা আমায় জানতে হবে তো।”

পূবালী শান্ত গলায় বলল, ”বেশ দেখিও। আমাকে পাগল প্রমাণ করলে যদি তোমার সুবিধা হয় তাহলে তাই করো।”

পূবালী অনেকটা জল খেয়ে পাশের ঘরে গিয়েই শুয়ে পড়ল।

 || ৩ ||

সকাল হতেই পূবালীর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। এ সময় তো কেউ ফোন করার নেই ওকে। এমন সময় ওর ফোন ওই কালেভদ্রে বাজে। ওই বরং রোজ একবার করে বাপের বাড়িতে ফোন করে সবার খোঁজ নেই। আর মাঝে মাঝে দোকান থেকে নিশান করে। এমনিই ”কী করছ পূবালী?” জিজ্ঞাসা করে ধরে থাকে কিছুক্ষণ তারপর বলে, ”কাস্টমার এসেছে রাখলাম।” পূবালী বেশ বোঝে আচমকা মিস করার কারণেই ওই ছোট্ট ফোনগুলো করে নিশান। অজানা প্রাপ্তিতে ভরে ওঠে ওর মন। হঠাৎই ছাদে জামাকাপড় মেলতে মেলতে পূবালীর ইচ্ছে করে দু-কলি বেসুরো গেয়ে উঠতে। নিশানের এমন বেসামাল ভালোবাসাগুলো পেতে পেতে এই ছ-মাসে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে পূবালী যে-কোনো দিন না পেলে মনখারাপ হয়। নিশান যেদিন ওকে মিস করে একটা দু-সেকেন্ডের ফোন করে সেদিন পূবালীর সামনের বেরঙীন ধূসর পথঘাটও রঙিন হয়ে যায়। কেউ ওকে মিস করছে এই অনুভূতিটাই ওর গলা দিয়ে গাইয়ে নেয় দু-কলি।

ফোনের স্ক্রিনে ফুটেছে— বড়দি।

ফোনটা রিসিভ করেই নিজেকে সামলাতে পারে না পূবালী। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে ও। বড়দি বোধহয় ওকে কাঁদার সুযোগ দেয়। তারপর বলে, ”কী হয়েছে রে? নীলা কালকে রাতে ফোন করে বলল, তোর নাকি ওই বাড়িতে ভয় করছে? মাকে দেখেছিস নাকি?”

পূবালী বলল, ”না দিদি মা নয়। মায়ের ছবিতে আমি রোজ ফুল, ধূপ দিই। মা যেন আমায় আশীর্বাদ করেন। মায়ের আত্মা নয় এটা। এ খুব সর্বনেশে আত্মা। তোমার ভাই আমায় সন্দেহ করছে। আমিই নাকি তাকে মেরে ফেলতে চাই। যাকে ঘিরে আমার দিনরাত্রি আমি নাকি তাকে মেরে ফেলতে চাই। এ কথাটা শোনার আগে আমার মৃত্যু হলে ভালো হত বড়দি।” শম্পা ধমকের সুরে বলল, ”চুপ কর দেখি। কাঁদতে বসিস না প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চার মতো। প্রথম থেকে আমাকে বল, ঠিক কী কী ঘটেছে তোদের সঙ্গে?” গতকাল দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত যা যা ঘটেছে নিশানের অজ্ঞান হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে নিশানের জামা-ভর্তি সিঁদুর লেগে থাকা সমস্তটা শোনার পর শম্পা বলল, ”ঠিক আছে তুই মনখারাপ করিস না। আমি ভাইকে ফোন করছি। আর নীলার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে, ও আজকে বিকেলে এক তান্ত্রিককে নিয়ে আসবে বলেছে।” পূবালী ভয়ে ভয়ে বলল, ”কিন্তু বড়দি এসব তান্ত্রিক-ফান্ত্রিক শুনলে যদি ও আবার রেগে যায় তখন?”

শম্পা একটু ভেবে বলল, ”ভাই তো বিকেল চারটের সময় দোকানে থাকে, কোনোদিনই বাড়ি ফেরে না। নীলাকে বলছি তখন আনতে। এখুনি ভাইকে কিছু বলার দরকার নেই।

হ্যাঁ রে ভাই তো বেরিয়ে গেছে নাকি?”

পূবালী বলল, ”হ্যাঁ, সে তো ফার্স্ট ট্রেনে ফুল নামবে বলে যেমন যায় তেমনই গেছে। নিজেই চা করে খেয়ে গেছে। আমায় ডাকেনি অবধি। এত ঘেন্না করছে বড়দি ও আমায়! আমার হাতের চাটুকুও খাবে না ও!”

শম্পা সান্ত্বনা দেওয়ার ঢঙে বলল, ”চিন্তা করিস না। আমি নিজে পছন্দ করে তোকে এনেছি। তোর কোনো অযত্ন আমি হতে দেব না।” শম্পা ফোনটা রেখে দিয়েছে। পূবালীর শরীরে যেন কোনো জোর নেই। পা দুটো অবশ লাগছে। আসলে মনের সঙ্গে শরীরের বড্ড ভাব। একজনের ওপরে অত্যাচার হলেই আরেকজনও গোমড়া মুখে বসে থাকে। মনটা আজ সত্যিই খারাপ। নিশান যদি ওকে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে চায়, গ্রামের সবাই বলবে পূবালীর চরিত্র খারাপ। বাড়ির সবাই আরেকটা মানুষের খরচ চালাতে হবে ভেবে চিন্তিত হবে। ঠিক কী করা উচিত পূবালীর! কোনো দোষ না করে এত বড় শাস্তি পাবে ও। তারপরেও সিংহাসনের শিবঠাকুর বসে বসে এটা দেখবে? সেই ছোট্ট থেকে শিবের মাথায় জল ঢালে ও। উপোস করে শিবের ঘরে প্রদীপ জ্বালে। কোনোবার এর অন্যথা হয়নি। তারপরেও ওর ওপরে ঘটা এমন অন্যায় যদি তিনি মেনে নিতে চান তবে তাই হোক।

পূবালী চুপচাপ বসে আছে জানালার দিকে তাকিয়ে।

এ পাড়ার সকলের আজকের দিনটা শুরু হয়ে গেছে কর্মব্যস্ততা দিয়ে। ভোলাজেঠু দুধের ড্রাম সাইকেলে চাপিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরছে। অরুণও খবরের কাগজের বোঝা নিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে পা দিয়েছে।

রিনিদি মেয়ের হাত ধরে স্কুলের পথে চলেছে। সকলের কত কাজ। একমাত্র পূবালীই বসে আছে চুপ করে। ওর যেন কিছুই করার নেই। অথচ অন্যদিনে এই সময় উঠে ও বাসি কাপড় ছেড়ে, স্নান সেরে নেয়। রান্নাঘরেও ঢুকে যায়। জলখাবার রেডি করে রাখে। বিন্তিদি কাজ সেরে যাওয়ার পথে টিফিন কেরিয়ারটা নিয়ে চলে যায়। নিশানের পুষ্পভাণ্ডারে দিয়ে অন্য কাজে যায়।

তারপর পূবালী নিশানের এনে দেওয়া ফুলের মালা দিয়ে ঠাকুরের পুজো করে।

বিন্তিদির কেচে দেওয়া জামাকাপড় ছাদে শুকাতে দিয়ে আসে, নিজের জলখাবার নিয়ে জমিয়ে বসে।

ব্যস্ততায় কেটে যায় পূবালীর সকালটা। এই বাড়িতে আসার পরে আজকে প্রথম ওর নিজেকে এমন বেকার মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন ও একটা দ্বীপে বসে আছে। এই সাজানো সংসার যেন ওর নয়। দ্বীপের চারিদিকে অথৈ জল। একটু পা বাড়াতে গেলেই ডুবে মরতে হবে। খাটের ওপরে পা গুটিয়ে বসে আছে ও। না, এ ঘরটা ওদের ঘর নয়। এটা নিশানের মায়ের ঘর ছিল। এখন ফাঁকা থাকে। পূবালী সকালে ঠাকুর পুজোর পরে নিশানের আনা রজনীগন্ধার চেন মালাটা মায়ের ছবিতে পরিয়ে ধূপ ঘুরিয়ে যায়। আর মাঝে মাঝে বিছানার চাদর পাল্টে কেচে দেয়। একমাত্র বড়দি বা অন্য কোনো আত্মীয় এলে এই ঘরে তারা শোয়। পূবালী এ বাড়িতে আসার পরে প্রথম এই ঘরে নিশানকে ছাড়া আলাদা থাকল একটা গোটা রাত। নিশানের স্বভাবই ওকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানো। এখন পূবালীরও সেটাই অভ্যেস হয়ে গেছে। বিয়ের পর পর একটু অসুবিধা হত, ঘুমের মধ্যেই নিজের গা থেকে ওর হাত সরিয়ে দিত। তারপর কী করে যেন সব অভ্যেস হয়ে গেল। এখন নিশানের ওই উষ্ণ আদর ছাড়া, ওর ছোঁয়া ছাড়া ঘুমই আসে না। কালকেও প্রথম রাতে একটু ঘুমিয়ে গেলেও তারপর সমানে জেগে ছিল। এমনকি বমিও হয়েছে মধ্যরাতে। একদিনেই যেন নিজের সবটুকু হারিয়ে ফেলল পূবালী।

ক্লান্ত মন আর অবসন্ন শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মাথাটা একবার ঘুরে গেল ওর। তবুও বাথরুমে ঢুকে ভয়ে ভয়ে শাওয়ারের দিকে তাকাল। নবটা ঘোরালেই হয়ত কাঁচা রক্তে ভেসে যাবে ওর শরীরটা। তাই এমনি কলটা খুলে বালতি থেকে বেশ কয়েক মগ জল ঢালল নিজের মাথায়।

খিদের মতো অবুঝ অনুভূতি পূবালী এ জন্মে আর দ্বিতীয় দেখেনি। ওর সংসার ভেঙে গেছে। নিশানের ভালোবাসা চলে গেছে ওর ওপর থেকে। হয়তো কালকেই বিতাড়িত হবে এ বাড়ি থেকে, ওর গোটা পৃথিবীটা আচমকাই মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেছে তার মধ্যেও পেটের মধ্যে অবুঝ বেয়াদপ অনুভূতিটা জানান দিচ্ছে সে ঠিক জাগ্রত আছে। খিদে পেয়েছে পূবালীর। অসম্ভব খিদে। এই অবুঝ বেহায়া খিদের ওপরে অকারণেই রাগ হল পূবালীর। তাই শুকনো মুড়ি চিবিয়ে জল খেল ঢকঢক করে। মনে মনে বলল, ভালোমন্দ খেয়েখেয়ে বড্ড নোলা বেড়েছে নারে! এরপর থেকে এটুকুও জুটবে না রাক্ষসী।

রান্নাঘরে ঢুকে নিশানের জন্য একটু জলখাবার বানিয়ে দিতে হবে। বিন্তিদি এখুনি আসবে। হয়তো নিশান ওর বানানো খাবার আর খাবে না। তবুও যতক্ষণ পর্যন্ত আছে ততক্ষণ দায়িত্বটুকু পালন করে যাবে ও।

চাউমিনের প্যাকেট আছে বেশ কয়েকটা। ফ্রিজে গাজর, বিনসও রয়েছে। ডিম দিয়ে চাউমিন বানিয়ে দেবে আজকে। রোজই রুটি, পরোটা বানায়। আজ নাহয় অন্য কিছু হোক। সকালটা যে আজ বড্ড মনখারাপি বাতাসে ভারী।

চাউমিন রেডি হবার আগেই বিন্তিদি হুটোপাটি করে ঢুকল। ঘর মোছার বালতি নিয়ে জল ভরতে দিয়েই ঝাঁট দিতে শুরু করল। হঠাৎই ”ও বাবাগো বলে” চিৎকার করে উঠল বিন্তিদি। গ্যাসটা অফ করে ছুটে গেল পূবালী।

বিন্তিদি তখনও কাঁপছে। পূবালী দেখল, একটা শাড়িতে ফাঁস লাগান, ওদের ঘরের ফ্যান থেকে ঝুলছে শাড়িটা।

চমকে উঠল পূবালী। এটা তো ওর বিয়ের বেনারসি শাড়িটা। সকাল থেকে এ ঘরে ঢোকেনি ও। রাতে নিশান একাই শুয়েছিল। তবে কি নিশান নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল? এত ঘৃণা ওর ওপরে!

বিন্তিদি হাতের ঝাঁটা ফেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ঝুলন্ত বেনারসিটার লাল রঙের দিকে।

পূবালী নিজেও বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে ফ্যান থেকে ঝোলা শাড়িটার দিকে।

বিন্তিদি বলল, ”বৌদিমণি একি করতে যাচ্ছিলে গো তুমি!

এই তো মাত্র ছয়মাস আগে ওই শাড়িটা পরে বিয়ে হল তোমার, এত সোহাগ তোমাদের দুজনের মধ্যে, এরই মধ্যে একটু মন কষাকষি হয়েছে তো একেবারে মরতে যাচ্ছিলে! আমাদের মতো জীবন হলে কী করতে গো? সেই কোন ষোলো বছর বয়সে বিয়ে হয়ে এসেছিলাম। রোজ বরের মার খেতে খেতে অভ্যেস করে ফেললাম। তারপর দেখল মেরে আর লাভ হচ্ছে না, হাতের সুখটুকু ছাড়া। তাই দু-বছরের মেয়েকে কোলে দিয়ে অন্য সংসার পাতল। সেই থেকে লোকের বাড়ি কাজ করে মেয়েকে বড় করলাম। লেখা-পড়া শেখাচ্ছি। মরতে মন হয়েছে কিন্তু মরিনি। আর তুমি এমন ঘর বর ছেড়ে মরতে যাচ্ছিলে! ছি ছি বৌদিমণি।”পূবালী বেশ বুঝতে পারল এখন বিন্তিদিকে অন্য কোনো কথা বোঝাতে গিয়ে লাভ নেই। পূবালী যে এই শাড়ির ফাঁসের ব্যাপারে কিছুই জানে না এটা বললেও বিশ্বাস করবে না বিন্তিদি। নিজের চোখকে কেউ অবিশ্বাস করে না। বিন্তিদিও করবে না বুঝেই পূবালী বলল, ”আদর বেশি পাওয়া মুশকিল। কম পেলেই তখন হিসেব-নিকেশ শুরু হয়ে যায়। তুমি হাতের কাজ সেরে নাও। জলখাবারটা তাড়াতাড়ি নিশানকে পৌঁছে দিয়ে এস।” বিন্তিদি পূবালীর পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ”এমন ভাবতে নেই। ভাববে না।”

পূবালী বিছানার ওপরে উঠেও নাগাল পেল না ফ্যানের। সামনের টুলটা নিয়ে এসে তার ওপরে উঠে শাড়িটা খুলে নিল।

পূবালীর মাথায় আচমকা একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করল, সামনেই ওর কাপড়ের আলমারি। আলমারিতে এত শাড়ি থাকতে বেনারসি কেন? তবে কি নিশান বের করেনি শাড়িটা? তবে কী গতকাল থেকে যে পূবালীর গোছানো সংসারটা ভেঙে তছনছ করে দিতে চাইছে সেই এসব করছে! মাথাটাও কাজ করছে না পূবালীর। ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চুপ। যদি নিশান একবার ফোন করে।

 || ৪ ||

”একি রে পায়ে কী হল?” নিশানের পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকিয়ে অরিত্র বলল। নিশানের গোটা শরীরে ব্যথা। কালকে অমন সজোরে পড়েছে সিমেন্টের উঠোনে। কেউ যেন ওকে পিছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছিল, কিছুতেই টাল সামলাতে পারেনি ও। সেই ব্যথা যেন আরও বেড়েছে। প্রায় সারারাত ঘুম না হওয়ায় চোখ দুটোও জ্বলছে। মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বাগদি পুকুরের ধারে পূবালী কী করছিল অত রাতে? ওকে বাড়ির উঠোনে ঠেলে ফেলেই বা দিল কে?

পূবালীর এমন অস্বাভাবিক ব্যবহারের কারণ কী?

গোলাপ আর জুঁইয়ের মালাগুলো সরাচ্ছিল অরিত্র।

কালরাতের ফোনের কথাটা মনে পড়ে গেল নিশানের।

বলল, ”আঠেরোটা গোলাপ আর ছটা মতো জুঁইয়ের মালা রেখে দে তো আলাদা সরিয়ে। একজনের অর্ডার আছে।”

বিট্টু বলল, ”দাদা এই একমাসের খাতার হিসেবটা একটু দেখে নেবেন তো। আপনারা দোকানে না থাকাকালীন যারা এসেছিল তার হিসেব তোলা আছে।”

নিশান অন্যমনস্কভাবেই খাতাটা নিল।

চোখ আটকে গেল একটা লাইনে। শ্মশানযাত্রী— তিন ডজন গোলাপ।

নিশান বলল, ”বিট্টু মৃতদেহর ওপরে তো সাদা ফুল দেওয়া হয়। রজনীগন্ধার মালা নেয়। গোলাপ কারা নিয়েছিল? এটাও কি এখন নতুন ফ্যাশন নাকি!”

বিট্টু ফিসফিস করে বলল, ”দাদা সেদিন সব সাদা ফুল বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের ডেট ছিল তো। রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ আমার বাড়ির কড়া নাড়ছিল এরা। খুলতে বলল, ফুল লাগবে। আমি বললাম, দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। ফুলের স্টকও শেষ। কিছুতেই শুনবে না। পারলে আমার কলার ধরে। গোলাপের যা স্টক ছিল, দোকান বন্ধ করে আমি আমার ঘরে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেগুলো দেখিয়ে বললাম, দেখুন বিশ্বাস না হয়। কোনো সাদা ফুলের মালা নেই। জনা পাঁচেক লোক খাটিয়ায় বেঁধে একটা মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছিল। তার মধ্যে থেকেই একজন বলল, অপঘাতে মরেছে তো, ছাড় ওই গোলাপ দিয়েই কোনোমতে জ্বালিয়ে দিতে হবে চল। সকাল হলে মুশকিল, পুলিশ কেস হবে। কথা না বলে ওরা তিন ডজন লাল গোলাপ নিয়ে দাম দিয়ে চলে গিয়েছিল। এরকম আরও কিছু আছে। বেশিরভাগই দোকান বন্ধ হবার পরে আমার ঘর থেকে দিয়েছি।”

নিশান খাতাটা সরাতেই বিন্তিদিকে দেখতে পেল। রোজকার মতো আজকেও হাতে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিশান অবশ্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় ভেবেছিল পূবালী আজ জলখাবার করে পাঠাবে না।

বিন্তিদি ওকে ইশারায় ডাকছে। নিশান বলল, ”দাও টিফিনটা।” বিন্তিদি তবুও ইশারায় ডাকল নিশানকে। দোকানের বাইরে যেতেই ফিসফিস করে বলল, ”বৌদিমণির খুব মনখারাপ। চুপ করে ঘরে বসেছিল। দেখো ভালোমন্দ কিছু না করে বসে। একটু খেয়াল রেখো।” টিফিন কেরিয়ারটা খুলতেই চাউমিনের গন্ধে মনটা ভরে গেল। পেটের খিদেটা যেন শতগুনে বেড়ে গেল। অরিত্র বলল, ”আজ যে আদর বেশি রে নিশান।” পূবালী রোজই বেশি করে টিফিন পাঠায়। অরিত্র আর বিট্টুকে দিয়েই খায় নিশান।

নিশান ওদের ভাগ করে দিয়ে চামচে করে নিজের মুখে খাবারটা দিয়েই থু করে ফেলে দিল। তীব্র নুনে পুড়ে গেছে যেন। অরিত্র আর বিট্টুও এক চামচ খেয়েই বলল, ”বৌদি রোজ রান্না করে, খুব সুন্দর হয়। আজ হয়তো কোনো কারণে খারাপ হয়ে গেছে।” অরিত্র বিট্টুর হাতে টাকা দিয়ে বলল, ”ছুটে যাবি দৌড়ে আসবি। নবীন ময়রার দোকান থেকে কচুরি আর তরকারি নিয়ে আয়।”

চাউমিনটা খেয়েই বোঝা যাচ্ছে ভুল করে দুবার নুন দেওয়া নয়। বরং ইচ্ছে করে বেশি নুন দিয়ে দিয়েছে পূবালী। পুরো নুনের কৌটো যেন ঢেলে দিয়েছে ও। যাতে খাবার দেখেও খেতে না পারে ঈশান। রাগে ভিতরটা উত্তপ্ত হয়ে উঠল ঈশানের। কেন এরকম করছে পূবালী!

ডক্টর সুদর্শন সরকারের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রাখতে হবে। কালকে যাতে পূবালীকে একবার দেখান সম্ভব হয়। এভাবে তো জীবন চলতে পারে না। সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে এ চত্বরে বেশ নামডাক আছে ডক্টরের। অরিত্র সব শুনে বলল, ”বেশ আমি গিয়ে একটা নাম লিখিয়ে দিয়ে আসি। আজকে নাম লেখালে কালকে টাইম পাবি।”

দুপুরে আর বিট্টুকে পাঠাল না বাড়িতে। থাক আর বাড়ির খাবারে দরকার নেই। হোটেলেই খেয়ে নিল নিশান।

মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। পূবালী কেন এমন করছে। এমনিতে তো খুবই শান্ত মেয়ে, নিশান অন্ত প্রাণ। এরকম অস্বাভাবিক ব্যবহার করছেই বা কেন!

ভাবনার মধ্যেই চোখ লেগে গিয়েছিল নিশানের। আচমকাই ফোনটা বেজে উঠল। রিসিভ করতেই গতকাল রাতের সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বরের মেয়েটা আদুরে গলায় বলল, ”আমার ফুলগুলো আলাদা রেখেছেন তো!

আমার বাড়িতে একটু পৌঁছে দিয়ে যাবেন প্লিজ।”

নিশান একটু গম্ভীর গলাতেই বলল, ”এক্সট্রা চার্জ লাগবে।” মেয়েটা বলল,”দেব। আজকে ঠিক সন্ধে আটটা নাগাদ আসবেন।”

নিশান বলল, ”ঠিকানা বলুন।”

ফোনটা কেটে গেল। অদ্ভুত মেয়ে তো। কোথায় যেতে হবে সেটা বলল না!

রাত আটটায় ফোনটা আবার বাজছে। নিশান রিসিভ করতেই মেয়েটা বলল, ”আপনার দোকানের বাঁ দিকের গলি দিয়ে ঢুকে সোজা রেললাইন ধরে কয়েক পা আসুন।”

বিট্টুই দোকান বন্ধ করে রোজ। পাশের মন্দিরে বেশ কিছু মহিলা পুজো দিতে এসেছে, অরিত্র তাদের মালা বেচতে ব্যস্ত।

আঠেরোটা গোলাপ আর ছটা জুঁইয়ের মালা নিয়ে নিশান বেরিয়ে এল দোকান থেকে। মেয়েটা কে জানতে খুব ইচ্ছে করছে। নাম বলছে না, ঠিকানা বলছে না, চাইছে কী?

অজানার প্রতি মানুষের এই অমোঘ আকর্ষণ বোধহয় জন্ম মুহূর্ত থেকেই। তাই ফুলের ক্যারিব্যাগটা নিয়ে বুড়ো আঙুলে ব্যথা, শরীরে ক্লান্তি নিয়েই নিশান গেল মেয়েটার বাড়িতে ফুল পৌঁছে দিতে।

ফোনটা বাজছে। রিসিভ করতেই আবার সেই রহস্যময়ীর মিষ্টি কণ্ঠস্বর। ”ডান দিকের সিঁড়ি দিয়ে স্টেশনে উঠবে না। তুমি রেললাইন ধরে সোজা এগিয়ে এস। ভয় পাচ্ছ নাকি?”

পুরুষের পৌরুষে আঘাত লাগে এই ভীতু শব্দটা শুনলে। নিশান বলল, ”ভয়ের কিছুই নেই। তবে ওদিকে তো কোনো বাড়ি আছে বলে আমি জানি না। স্টেশন চত্বর শেষ। তারপর তো শুধুই রেললাইন।” মেয়েটা আচমকা নিশানকে আপনি থেকে তুমি বলছে কেন কে জানে! পাড়ার কোনো পরিচিত মেয়ে বদমাইশি করছে নাকি ওর সঙ্গে?

মেয়েটা বলল, ”আমার সঙ্গে গল্প করতে করতে এগিয়ে এস প্লিজ।”

নিশান সম্মোহিতের মতোই এগোচ্ছে। কে এই মেয়ে? একে চেনার জেদ পেয়ে বসেছে ওকে।

রেললাইন ধরে অন্ধকারে এগিয়ে যাচ্ছে নিশান। থ্রু ট্রেনগুলো হু হু করে পেরিয়ে যাচ্ছে ওর পাশ দিয়ে। আচমকাই লাইনের ধারে জোরে হোঁচট খেল নিশান। হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কিন্তু পাথুরে মাটিতে নয়, কোনো একটা নরম জিনিসের ওপরে পড়েছে ও।

মেয়েটা ফোনে খিলখিল করে হেসে উঠল। ফোনের টর্চটা জ্বালতেই নিশান দেখল ও একটা মৃতদেহের ওপরে পড়েছিল। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল ওর।

মেয়েটা ফোনে বলছে, ”ও আমাকে গুনে গুনে আঠেরোটা গোলাপ দিয়েছিল প্রেম করার সময়, আর জুঁইয়ের মালা ছটা। সব তোমার দোকানের। তাই ফেরত দিলাম। ফুলগুলো ওর বডির ওপরে ছড়িয়ে দাও।”

ফোনটা কেটে গেল, একটা ঠান্ডা হাসির তরঙ্গ ওর চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।

ভালো করে টর্চ মেরে দেখল নিশান। ছেলেটাকে ও চেনে। পাশের পাড়াতেই বাড়ি, নাম অর্জুন।

বিশুকাকার মেয়ের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছিল। মৃত শরীরের কোথাও কোনো ক্ষতর চিহ্ন নেই। শুধু চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। আর জিভটা বেরোনো রয়েছে কিছুটা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অসম্ভব ভয় পেয়েছিল কিছু দেখে। চোখ দুটো তাকানো অবস্থাতেই রয়েছে।

কান ঘেঁষে একটা থ্রু ট্রেন পেরিয়ে গেল জান্তব আওয়াজ তুলে।

শরীরটা টলছে নিশানের। হাতের ফুলগুলো অর্জুনের শরীরের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে কোনোক্রমে পালিয়ে এল নিশান।

বারবার মনে হচ্ছে একটা তীব্র হাওয়া যেন ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে রেললাইনের মধ্যে। হয়তো ওর শরীরটাও পিষে যাক ট্রেনের তলায় এটাই তার চাহিদা।

নিশান দোকানে ঢোকার আগেই রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে হড়হড়িয়ে বমি করে ফেলল। অর্জুনের ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখ দুটো আর ওর বরফ শীতল শরীরটা ভাসছে চোখের সামনে। কেউ ওকে দেখেনি তো ওখানে? ফুলগুলো ওর বডির ওপরে ফেলে আসা কি ভুল হল? পুলিশ যদি ওই ফুলের সূত্র ধরে আসে ওর দোকানে। কী সব ভাবছে নিশান। এ চত্বরে ফুলের দোকান কি ওর একার আছে? তাছাড়া কোনো কাস্টমার যদি কিনে নিয়ে যায় তার দায় কি ওর! দোকানে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল নিশান। জলের বোতলটা থেকে জল খেল ঢকঢক করে। বিট্টুকে ইশারায় ডেকে বলল, ”সেদিন যারা রাতে তোর কাছ থেকে গোলাপ কিনেছিল তাদের কাউকে চিনিস?”

বিট্টু বলল, ”হ্যাঁ চিনি তো। ওই তো বিশুকাকার মেয়ের বর অর্জুন ছিল, আর ওর দুটো বন্ধু পলাশ আর সূর্য ছিল। বাকিগুলোকে মুখ চেনা হলেও নাম জানি না ঠিক।

পরে শুনলাম বিশুকাকার মেয়ে রুমেলা নাকি আত্মহত্যা করেছে। ওকেই বোধহয় পোড়াতে নিয়ে যাচ্ছিল।”

নিশান বলল, ”পুলিশ কেস হয়নি?”অরিত্র বলল, ”হয়েছিল তো। ওই অর্জুন তো বহুদিন ফেরার ছিল বলে শুনেছি। মেয়ের শোকে বিশুকাকাও তো চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। অর্জুনের বোধহয় শাস্তি হয়নি। কেন বলত? এতদিন পরে এসব কথা বলছিস?”

নিশান বলল কিছু না। বড়দির অনেকগুলো মিসড কল হয়ে গেছে ফোনে।

ফোনটা করতেই বড়দি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ”তুই কোথায় ভাই?”

নিশান বলল, ”কী হয়েছে বড়দি?”

শম্পা বলল, ”তুই শিগগির বাড়ি যা। পূবালী মিথ্যে বলছে না ভাই।”

নিশান বড়দির কথার সারমর্ম বুঝতে পারল না।

অরিত্রকে বলল, ”শরীরটা ভালো লাগছে না, বাড়ি যাচ্ছি।”

 || ৫ ||

”ইনি কে নীলাদি? তান্ত্রিক বলে তো মনে হচ্ছে না গো।”

পূবালীর চোখে কৌতূহল। নীলাদি বলল, ”কেন মরার খুলি ছাড়া বুঝি কেউ তান্ত্রিক হতে পারে না? সব আছে। ওনাকে বসতে দে।”

নীলাদি বলল, ”আসুন মৃত্যুঞ্জয়কাকা। এখানে বসুন।”

মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক, পূবালীর দেওয়া চেয়ারে না বসে নিজের কাঁধের ঝোলা থেকে একটা হলদে আসন বের করে বসে বললেন, ”সে তো এবাড়িতেই আছে রে নীলা। বড্ড জেদি সে। মাত্র উনিশ বয়েস কিনা। তাই রক্ত গরম।

সংসার পাততে চেয়েছিল ভালোবেসে। কিন্তু পারেনি। তাকে মেরে দিয়েছে তার বর। তাই কারোর সুখের সংসার দেখলেই জ্বলে যায়। নিশানকে চায়। নিশানকে নিজের কাছে নিয়ে যেতে চায়। নিশান ওর বউকে সন্দেহ করবে, রাগ করবে, তারপর পাগল হয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করবে, এটাই ওর চাল।

পূবালীর পেটে বাচ্চা এসেছে জেনে সে আরও রেগে গেছে। নিশানকে চায় ও। সাজানো সংসার তছনছ করে দিতে চায়।” নীলা বলল, ”কী নাম মেয়েটার?”

মৃত্যুঞ্জয় বললেন, ”রুমেলা।” পূবালী কাঁদতে কাঁদতে বলল, ”কিছু একটা ব্যবস্থা করুন আপনি। আমাদের মেরে ফেলবে সে।”

পূবালীর কথা শেষ হবার আগেই মৃত্যুঞ্জয় গোঙাতে শুরু করলেন। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। নীলা বলল, ”কী হল কাকু? অমন কেন করছেন?”

মৃত্যুঞ্জয় কোনোমতে নিজের ব্যাগ থেকে একটা চিমটের মতো জিনিস ধরল হাতে। তারপর আর কথা না বাড়িয়ে প্রায় ছুটে পালাল উঠোন পেরিয়ে। যাওয়ার সময় একটা ছোট্ট পুটলি দিয়ে বলল, ”যে ঘরে রোজ থাকিস সে ঘরে নয়। অন্য ঘরে এটা রেখে আজ রাতটা থাকিস।”

পূবালী কাঁদছে। নীলা ওর পিঠে হাত রেখে বলল, ”চিন্তা করিস না। ভালো ব্রাহ্মণ ডেকে বাড়িটাতে একটা পুজো দেব কালকেই।” নীলা চলে গেছে। পূবালী একাই বসে আছে ভূতুড়ে বাড়িটাতে। টি.ভি চালাতেও ভুলে গেছে। ওর প্রিয় সিরিয়ালগুলোও দেখতে মনে নেই আজ।

বাড়িতে কেউ একটা রাগে ধপাধপ পা ফেলছে সেটা বেশ বুঝতে পারছে পূবালী। যেন কাউকে খুব রাগিয়ে দিয়েছে ও। নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে পূবালী। কতক্ষণ ওকে বাঁচিয়ে রাখবে কে জানে!

নিশান এসেছে, কোনোমতে টলতে টলতে দরজাটা খুলে দিল পূবালী। নিশান কিছু বলার আগেই ওর বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।

নিশান ওর পিঠে হাত রেখে বলল, ”কী হয়েছে?”

পূবালী বলল, ”রুমেলা কে নিশান? সে মারা যাবার পরেও কেন তোমায় চায়! কেন সে আমার গর্ভে আসা তোমার সন্তানকে মেরে ফেলতে চায়? কেন সে আমার সাজানো সংসারের সবটুকু তছনছ করে দিতে চায়! আমি কী করেছি তার? সে কেন তোমাকে চায় নিশান?”

নিশান বলল, ”একটু জল দাও। শান্ত হয়ে বসো। বলছি সব।

তার আগে একটা কাজ সারতে হবে আমায়।

শিবনাথকাকুকে একটা ফোন করতে হবে।”

ফোনটা ধরেই নিশান বলল, ”শিবনাথকাকু আমায় বিশুকাকার ফোন নম্বরটা একটু দেবেন? আরেকটা কাজ করতে হবে। আপনার বাড়ির নীচের তলাটা ভাড়া দেবার জন্য ভাড়াটে খুঁজছিলেন শুনলাম, আমার ভাড়া লাগবে। আমি কালকেই যেতে চাই। সমস্যা কিছুই নেই। বাড়িতে একটু কাজ করাবো, পূবালীর শরীরটা খারাপ তাই কদিন থাকতে চাইছি।”

পূবালী জল এনে দাঁড়াতেই নিশান বলল,”বলোনি তো আমি বাবা হতে চলেছি!”

পূবালী বলল, ”আমিও বুঝতে পারিনি। নীলাদি আজ মৃত্যুঞ্জয় নামের একজন তান্ত্রিককে এনেছিলেন, তিনি বললেন।” নিশান বলল, ”মৃত্যুঞ্জয়জেঠু এসেছিল আমাদের বাড়িতে? কী বলল?”

পূবালী সবটা বলতে বলতেই কাঁদছিল। এমন কী মৃত্যুঞ্জয়বাবুকেও মারতে চেষ্টা করেছিল সে! অবশেষে উনি প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে গেছেন।

নিশান পূবালীকে পাশে বসিয়ে বিশুকাকাকে ফোন করল। আজ সন্ধেতে ও যার নির্দেশে অর্জুনের মৃতদেহের ওপরে ফুল দিয়ে এসেছিল তার নম্বরটা কনফার্ম করতে চায় নিশান।

বিশুকাকা ফোন ধরেই বলল, বল নিশান।

নিশান বলল, ”কাকা৭৪৩৪০৩২৭ এই নম্বরটা তুমি চেন?”

বিশুকাকা একটা জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ”এটা তো রুমির নম্বর ছিল রে। এত দিন পরে কেন জানতে চাইছিস রে রুমির নম্বর? সে ফোন তো দীর্ঘদিন সুইচড অফ হয়ে পড়ে আছে। পুলিশ অর্জুনদের বাড়ি থেকে ফোনটা সিজ করেছিল, শেষে আমায় ফেরত দিয়ে গেছে। রুমির বাকি সব জিনিসের সঙ্গে ওটাও রাখা আছে ওর ঘরে। ও ঘরে আমরা আর ঢুকি না। বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে রেখেছি।”

ফোনটা কেটে দিয়ে নিজের ফোনের দিকে আবার তাকাল নিশান। এই নম্বর থেকেই ওকে গতকাল রাতে, আজকে বারবার ফোন করা হয়েছে।

রান্নাঘরে আচমকাই বাসন ফেলার আওয়াজ হতে শুরু করল। কেউ যেন ধুপধাপ করে বাসন ফেলছে রেগে রেগে। পূবালী বলল, ”শিগগির মায়ের ঘরে চল। মৃত্যুঞ্জয়বাবু একটা ছোট কাপড়ের পুঁটলি দিয়েছেন ওইঘরে রাখতে। তাহলে আরও ঢুকতে পারবে না ওখানে।”

নিশান আর পূবালী মায়ের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। পূবালীর মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেছে। নিশানেরও মাথার ঠিক নেই। কেন রুমেলার আত্মা এরকম করছে ওদের সঙ্গে। ওরা তো রুমেলার মৃত্যুর জন্য দায়ী নয়। যে ওদের মৃত্যুর জন্য দায়ী তাকে ও মেরে ফেলেছে অলরেডি। তাহলে ওরা কেন! রুমেলার রাগের কারণ হাতড়াতে শুরু করল নিশান।

চোখের সামনে ভেসে উঠল বেশ কিছু দিন আগের দৃশ্যটা।

বসন্ত তখনও আসেনি। বাতাসে তখনও হালকা শীতের আমেজ। রাতে গায়ে হালকা ঢাকা দিতে হচ্ছে। নিশান রোজকার মতই আড্ডা দিতে বেরিয়েছিল। নান্টুদার চায়ের দোকানে ঢুকতেই অরিত্রর লেগপুলিং শুরু হয়েছিল।

”এইসব ব্লু-ছবি দেখা ছাড় ভাই। এবারে একটা বিয়ে করে ফেল।” চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই কথাটা বলল, অরিত্র।

নিশান বলল, ”নান্টুদা একটু কড়া করে, চিনি কম একটা লিকার।”

কাঠের বেঞ্চে বসে চায়ের অর্ডার দিয়ে নিশান ভ্রু কুঁচকে বলল, ”এটা কবে থেকে জানলি যে বিয়ে করলে ব্লু দেখতে হয় না? দুদিন পরে এতেই ফিরে আসতে হয়। যখন ওই একই ডাল-ভাতে ফুরিয়ে যাবি তখন। আমাদের অনুপমদা তো বলেই দিয়েছে—

‘আমি ওবেলার ডাল-ভাতে ফুরিয়ে গেছি

গেলাসের জলে ভাসবো না-না-না…’

বুঝলি কিছু? বউ দুদিন পরে ডাল-ভাতের মতোই হয়ে যাবে। আর তুইও ফুরিয়ে যাবি। তাই ব্যাক টু ব্লু-ফিল্ম।” অরিত্র বলল, ”আজকাল জ্ঞানটা একটু বেশিই ঝাড়ছিস মনে হচ্ছে। সে যাইহোক, আজ ক্লাবে আসছিস তো? সরস্বতী পুজোর চাঁদাটা কিন্তু হেভি বেশি হয়ে যাচ্ছে মাইরি। শালা বাপের হোটেলে খাই, বলতে গেলে আধা বেকার। ওই ফোন রিচার্জের কমিশনের টাকা তো নিজের চা- সিগারেটেই চলে যায়। এরপর দু-হাজার করে চাঁদা দিতে পারব না। আর বস সরস্বতী পুজো হচ্ছে এটা, দুর্গা পুজো নয়।” নিশান ঘাড় নেড়ে বলল, ”কথাটাতে যুক্তি আছে জানিস। আমার পক্ষেও ওই ফুলের ব্যবসা করে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। নেহাত সেই ছোটবেলা থেকে সবুজ সংঘের সদস্য তাই ছাড়তে পারছি না। আজ মিটিংয়ে আমিও বলবো, পাঁচশোর বেশি চাঁদা দিতে পারব না।” অরিত্র বলল, ”তবুও তো তোর বাবা তোর জন্য একটা ব্যবসা জমিয়ে দিয়ে গেল বল। আমার যে কী হবে! বাবার যেটুকু ছিল দাদাকে পড়াতে ঢেলে দিল। দাদা কলেজের প্রফেসর হয়ে ফ্ল্যাট কিনে বৌদি এনে গুছিয়ে নিলো। বাড়িতে এক পয়সা দেয় না জানিস। ফোন রিচার্জের সঙ্গে কম পুঁজির একটা ব্যবসা ফাঁদতে হবে বুঝেছিস। নাহলে আর উপায় কী? মিডিওকারদের চাকরি কোথায়!”

নিশান বলল, ”দেখেই মনে হয় ফুলের ব্যবসা। আরে দশটাকায় পাইকারি কিনে বারোতে বেচি। কত লাভ থাকে বল? তারপরে পচা, শুকিয়ে যাওয়ার লোকসান আছে। নেহাত পাশেই কালীমন্দিরটা ছিল আর বাঙালিদের এখনও দেব-দ্বিজে ভক্তি আছে বলে জবার মালার সেলটা ডাউন হয় না আমার। বাবা মারা যাবার পরে মার্কেটের ধার শোধ করতেই বছর ঘুরে গেল। দোতলায় একটা ঘর তুলবো তারপর এসব বিয়ের কথা ভাববো। দিদি একটু দেবে বলেছে। দেখা যাক।”

”চোর চোর”… একটা মেয়ে ছুটছে, সামনে একটা ছেলে। নিশান কিছু না বুঝেই নিজের পাটা বাড়িয়ে দিল একটু।

ছেলেটা হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ছেলেটার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল গয়নার বেশ বড় বাক্সটা। রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লো বেশ কিছু হার-বালা-কানের দুল। নান্টুদার চায়ের দোকানের অল্প আলোতেও নিশান দেখল বেশিরভাগ গয়নার ডিজাইনই একটু পুরোনো ধাঁচের। এরকম ডিজাইনের গয়নাই নিশানের মা ওর দিদির বিয়েতে দিয়েছিল। দিদি বলেছিল, ”মায়ের নিজের বিয়ের সব গয়না আমায় দিয়ে দিল মা। তোর বউয়ের জন্য খুব কম রইল ভাই। তবে চিন্তা করিস না তোর বউকে আমি দেব।” তখনই গয়নাগুলো দেখেছিল নিশান। ঠিক এরকম ধরণের সাবেকি ডিজাইন ছিল।

অরিত্র আর নিশান গয়নাগুলো যত্ন করে তুলে বাক্সের মধ্যে ভরে দিল। মেয়েটা তখনও হাঁপাচ্ছে। এতক্ষণে নিশান ভালো করে তাকাল মেয়েটার মুখের দিকে। আরে এ তো বিশ্বনাথকাকার মেয়েটা। কী যেন নাম…

অরিত্র বলল, ”এই রুমেলা তুই এই অন্ধকারে এত গয়না নিয়ে যাচ্ছিস কোথায়? একা কেন? তোর মা কোথায়?”

রুমেলা বেশি কথা না বলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ”পালিশ করে আনছিলাম। দোকান থেকে বেরিয়েছি আর ওই চোরটা পিছু নিয়েছিল। এখানটা অন্ধকার দেখে ছিনিয়ে নিল। আমি বাড়ি যাচ্ছি। বাক্সটা একটা ব্যাগের মধ্যে ভরে নিল রুমেলা।” নিশান বলল, ”তোমায় পৌঁছে দেব?”

রুমেলা অল্প হেসে ঘাড় নেড়ে বলল, ”না লাগবে না।”

ওদের পিছনে ফেলে একটু এগিয়ে গেল রুমেলা।

অরিত্র বলল, ”আমার কিন্তু ব্যাপারটা একটু গোলমেলে ঠেকল।” নিশান ভ্রু কুঁচকে বলল, ”তুমি তো বস ছোট থেকেই ব্যোমকেশ। তাই তোমার সবই গোলমেলে ঠেকে।

এমনকি দত্ত গিন্নি দুপুরের রোদে চারবার ছাদে কেন যায় সে খোঁজ নিতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে যাচ্ছিলিস আরকী! দয়া কর মেরে ভাই। সেই প্রাইমারি থেকে তোর গোয়েন্দা হবার নেশায় আমরাও কম সমস্যার সম্মুখীন হইনি।” অরিত্র একমুখ হেসে বলল, ”আরে দত্ত গিন্নির তেঁতুলের আচারটা যে তোদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম সেটা মনে রাখলি না। এই তো শালা বন্ধুত্ব।” নিশান কিছু বলার আগেই অরিত্র বলল, ”ওই দেখ গুরু, বলছি না কোনো গড়বড় আছে। রুমেলা ওই ঝোপটার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। কেন ভাই, আবার ওই চোর এসে ওর হাত থেকে যাতে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিতে পারে? ও তো বলল বাড়ি যাবে। বিশুকাকার বাড়ি তো ডান দিকের রাস্তায়। তাহলে রুমেলা কেন বাঁ দিকে ঝোঁপে দাঁড়িয়ে আছে।”

আধো অন্ধকারেই একটা বাইক এসে দাঁড়ালো রুমেলার সামনে। নিশান আর অরিত্র কিছু বোঝার আগেই বাইকটা হাওয়া হয়ে গেল। নিশান বলল, ”মনে হচ্ছে তোর কথাই ঠিক। মেয়েটা গয়না চুরি করে কোন লাভারের সঙ্গে ভাগলো বুঝলি।”

অরিত্র বলল, ”বোঝ কাণ্ড। কলেজে ভর্তি হয়েছিল এ বছর। রোজই আমার বাড়ির সামনে দিয়ে কলেজ যেত।”

নিশান চোখ টিপে অরিত্রর বুকে আচমকা হাত বুলিয়ে বলল, ”ব্যথা আছে নাকি বাবু? আহা গো।

তুই তো শালা এমন বলছিস যেন তোর বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া সব মেয়েকে তোর প্রতি দুর্বল থাকতে হবে।”

অরিত্র একটু ঘন গলায় বলল, ”রুমেলা কোনো খারাপ চক্করে পড়ল না তো? আমাদের কি বিশুকাকাকে জানানো উচিত?” নিশান প্যান্ট ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ”কোনো লাফরাতে আমি নেই বস। এমনিতেই পাড়ার লোকজন আমাদের দেখতে পারে না। বলে বখে যাওয়া ছেলে। তারপর লোকের মেয়ে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মরি আর কী! তাছাড়া এই মেয়েটা ক্লাস নাইনে পড়তে আমায় প্রোপোজ করেছিল। আমি রাজি হইনি দেখে হেভি রেগে ছিল আমার ওপরে। পরে দেখলাম অন্য একটা ছেলের সঙ্গে ঘুরছে। যা ইচ্ছে করুক বস, আমি এসবে নেই।

চল ক্লাবে দেখা হচ্ছে রাতে।” অরিত্র একটু মনমরা হয়েই বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।

 দিন দুই পরেই পাড়ায় হুলস্থুল পড়ে গেল। রুমেলা নাকি বিয়ে করেছে। অরিত্র বলেছিল, ”দেখলি সেদিন আমরা ঠিক ধরেছিলাম। মেয়েটা ওই ব্যানার্জী পাড়ার অর্জুন নামের লোফার টাইপ ছেলেটার সঙ্গে পালিয়েছে। বিশুকাকা বলল, রুমেলা নাকি ওদের বাড়ির সব গয়না আর বেশ কিছু টাকা নিয়ে পালিয়েছে।”

নিশান নিরাসক্তভাবে বলেছিল, ”তো এখন আছে কোথায়? ওই অর্জুনদের বাড়িতে?”

অরিত্র বলল, ”তাই হবে। তবে অর্জুনের বাবারও নাকি ভীষণ অমত এ বিয়েতে।”

রুমেলা পালিয়ে যাবার প্রায় দিন সাতেক পরে নিশান বসেছিল দোকানে, একাই ছিল। তখনও অরিত্র জয়েন করেনি পুষ্পভাণ্ডারে।

হঠাৎই অর্জুনের বাইকটা এসে থেমেছিল নিশানের দোকানের সামনে। নিশান দেখেছিল, একটা লালচে রঙের শাড়ি পরে, এক সিঁথি সিঁদুর পরে বাইকের পিছনে বসে আছে রুমেলা। ওকে দেখে একটু অহংকারী গলায় অর্জুনকে বলেছিল, ঘোষ মার্কেটে বড় ফুলের দোকানে যেতে পারতে। ওখানে ভ্যারাইটি পাওয়া যায়।

অর্জুন হেসে বলেছিল, ”তোমার সঙ্গে যখন প্রেম করতাম তখন নিশানের দোকান থেকেই তো ফুল নিয়ে গিয়ে দিতাম। দে নিশান আজ একটু ফ্রেস জুঁই আর গোলাপ দে তো। বাড়িতে আজ মেনে নিল বুঝলি। তাই অফিসিয়াল ফুলশয্যাটা আজকেই হবে।” রুমেলার মুখে আচমকা একমুঠো আবিরের ছোঁয়া।

নিশানের ভালোই লেগেছিল ওদের দেখে। যাক, প্রেম করেছিল, পালিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বিয়েটা তো ঠিকঠাক করেছে। বাড়িতেও মেনে নিয়েছে শুনে খুশিই হয়েছিল। রজনীগন্ধার স্টিক, জুঁইয়ের মালা, গোলাপ মিলিয়ে অনেক ফুল কিনেছিল অর্জুন।

নিশান একটা জারবেরার বাঞ্চ রুমেলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, ”এটা আমার উপহার তোমাদের বিয়েতে।” রুমেলা হাসি মুখেই নিয়েছিল।

অর্জুনও স্বাভাবিকভাবেই ওটার দাম না দিয়ে বাকি সবফুলের দাম মিটিয়েছিল।

তারপরেও রুমেলাকে একদিন দেখেছিল বাজারে। অর্জুনের সঙ্গে নয়, সেদিন একাই ছিল। নিশানকে দেখে বলেছিল, ”শুনলাম নাকি তোমার বিয়ে ঠিক হচ্ছে? তার মানে বিয়েতে আপত্তি নেই, শুধু প্রেমেই আপত্তি?”

নিশান ওর এসব কথার উত্তর না দিয়ে বলেছিল, ”ভালো থেকো।”

রুমেলা যখন ক্লাস নাইনে পড়ত নিশান তখন সদ্য কলেজ পাস করেছে। একদিন মাঠ থেকে ক্রিকেট খেলে ফিরছিল, রুমেলা সম্ভবত টিউশন পড়তে যাচ্ছিল সাইকেল নিয়ে। ওকে দেখেই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ”তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।” নিশান বলেছিল, ”হ্যাঁ বলো।” পাশের পাড়ার মেয়ে রুমেলা। চেনে না এমন নয়।

রুমেলা বলেছিল, ”আমি তোমায় ভালোবাসি। তোমায় খুব পছন্দ করি।” নিশান হেসে বলেছিল, ”তুমি এখন অনেক ছোট। ভালো করে লেখাপড়া করো।” রুমেলা কোনো উত্তর না দিয়ে জোরে সাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। আর কখনও নিশানকে দেখলেও কথা বলত না। নিশান এমনিতেই একটু প্রাইভেট পার্সন। তাই উপযাচক হয়ে কথা বলেনি কোনোদিন। পরে ফিসফাস শুনেছিল বিশুকাকার মেয়েটা নাকি প্রেম করছে। তারপরে তো আচমকাই অর্জুনের সঙ্গে বিয়ের খবর পেয়েছিল।

কোনোদিন তো রুমেলার সঙ্গে আর কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি নিশান। তাহলে ওকেই কেন টার্গেট করল রুমেলা! পূবালী সবটা শুনে বলল, ”মৃত্যুঞ্জয়বাবু বলছিলেন ও নিজে সংসার করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি বলেই নাকি এই আক্রোশ।”

বাইরে হিসহিস করে কথা বলছে রুমেলা। নিশান ইশারায় পূবালীকে চুপ করতে বলল।

রুমেলা বলছে, ”তোর দোকানের ফুলে বিষ ছিল। তাই ফুলশয্যার রাত থেকেই আমার সংসারে অশান্তি শুরু হল। অর্জুন আমার সব গয়না-টাকা নিয়ে নিয়েছিল। আমারই বিয়ের বেনারসি শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলেছিল। তোর দোকানের কাঁটাওয়ালা গোলাপ ফুল দিয়ে বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল আমায় শ্মশানে।

তোকে তো আমি চেয়েছিলাম। কেন তুই আমার হোসনি?”

নিশান পূবালীর কানে মুখ লাগিয়ে বলল, ”চুপ। একটা শব্দ করব না আমরা।”

বাইরে ধপাধপ আওয়াজ হয়েই যাচ্ছে। ঘরে দুটো মানুষ আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

দুজনেরই বোধহয় ভোরের দিকে চোখ লেগে গিয়েছিল। নিশান স্বপ্ন দেখল, একটা লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়িতে ঝুলছে রুমেলার অর্ধ-উলঙ্গ দেহটা। ভরাট শরীরে সর্বত্র অত্যচারের কালশিটে দাগ। শ্যামলা বুকেও কামড়ের লালচে দাগ সুস্পষ্ট। যেন সারারাত কেউ অমানুষিকভাবে ভোগ করেছে শরীরটাকে।

গলায় ভারী শাড়ির কালশিটে পড়ে গেছে।

ওই অর্ধ-উলঙ্গ শরীরটা যেন ছুটে ধরতে আসছে নিশানকে, চমকে ঘুমটা ভেঙে গেল নিশানের। দেখল পাশে পূবালী নেই। ঘরের জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে।

ভোরে উঠে ফুল আনতে যায় নিশান। আজ যাওয়া হয়নি। কে জানে বিট্টু যাবে কিনা!

বাইরে বেরোতেই দেখল পূবালী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। ভয়ে আঁতকে উঠল নিশান।

হসপিটালে যখন নিয়ে গিয়ে পৌঁছাল তখন ডক্টর দেখে বললেন, মিসক্যারেজ হয়ে গেছে। তবে একেবারে ফার্স্ট স্টেজ তো, শরীরে তেমন এফেক্ট হবে না। একটু ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করান।

পূবালী নিশ্চুপ হয়ে শুয়েছিল। চোখের কোণে জল। আস্তে করে বলল, ”বাথরুম পেয়েছিল যেতে যাচ্ছিলাম। ওই রাক্ষুসী ঠেলে ফেলল আছড়ে।”

পূবালী একদম স্তব্ধ হয়ে গেছে। ঠিক যেন বাজ পড়া তালগাছ। কে বলবে এই মেয়েটা দুদিন আগেই কথায় কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ত।

শুকনো মুখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে নিশানের দিকে। সেদিন বাড়ি ফেরার সময় তাহলে বাগদি পুকুরের ধারে রুমেলাই ছিল পূবালীর ছদ্মবেশে। ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল মৃত্যুর দিকে। নিশান ঠিক করেই নিল, ওবাড়িতে এখুনি ফেরা যাবে না। শিবনাথকাকার বাড়িতেই ভাড়া থাকবে ওরা। এর মধ্যে তান্ত্রিক ডেকে কিছু একটা করাতে হবে।

আত্মায় কোনোদিন বিশ্বাস না করা নিশানের ভয় করছে রুমেলার এমন প্রতিশোধস্পৃহা দেখে।

নিশান অরিত্র আর বিট্টুকে নিয়ে বাড়িতে গেল। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস একটা গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে গেল শিবনাথ কাকার বাড়িতে। পূবালীকে কালকেই ছেড়ে দেবে হসপিটাল থেকে। ওকে নিয়ে সোজা উঠবে শিবনাথকাকার একতলায়। বাড়িটাতে তালা লাগিয়ে বেরিয়ে এল।

অরিত্র সবটা শুনে বলল, ”এদিকে একটা ঘটনা ঘটেছে রে। পুলিশ এসেছিল দোকানে। অর্জুনের বডি পাওয়া গেছে রেললাইনের ধারে। বুকের ওপরে ফুল ছড়ানো ছিল। তাই সব ফুলের দোকানে খোঁজ করছে কালকে কে কে ফুল কিনতে এসেছিল তার লিস্ট বানাচ্ছে।”

নিশান বলল, ”অর্জুনের খুনিকে পুলিশ কোনোদিনই খুঁজে পাবে না। যেমন রুমেলার মৃত্যুর পরে অর্জুন বহুদিন ফেরার হয়ে গিয়েছিল। পুলিশ খুঁজে পায়নি। তেমনই অর্জুনের খুনিকেও পাবে না বুঝলি। কারণ অর্জুনকে মেরেছে রুমেলা নিজে। রুমেলার ধারণা আমার দোকানের ফুলে ওর ফুলশয্যার খাট সাজানো হয়েছিল তাই ও সুখী হয়নি। আমার দোকানের গোলাপ দিয়ে ওর শেষ যাত্রা হয়েছে তাই ও মরেও শান্তি পাচ্ছে না। সেই কারণেই পূবালীর মিস ক্যারেজ করে দিল ও। শেষ করে দেবে আমার সংসারটা।

জানিস অরিত্র আমি কোনোদিন ভূত বা আত্মায় বিশ্বাস করতাম না। আজ করি। আমাদের বেঁচে থাকা যখন অনিশ্চিত হয়ে গেছে তখন করি।”

অরিত্র বলল, ”আমার বাবার একজন জানাশোনা তান্ত্রিক আছেন। দেখি ওনার সঙ্গে কথা বলে।”

 || ৬ ||

পূবালীকে নিয়ে নিশান উঠেছে শিবনাথকাকার ভাড়া বাড়িতে। পূবালী বড্ড চুপচাপ হয়ে গেছে। উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। বড়দি ফোনে নিশানকে বলেছে, ”ওকে কদিন আমার কাছে রেখে যা। মেয়েটার ওপর দিয়ে যা গেল। মৃত্যুঞ্জয়জেঠু জানিয়েছে, রুমেলার উপদ্রব তাড়াতে হলে দুটো কাজ করতে হবে। এক, বিশুকাকাদের বাড়িতে পূবালীর বিয়ের বেনারসির খুঁটে একটা গাছের শিকড় বেঁধে রেখে আসতে হবে রুমেলার আইবুড়ো বেলার ঘরে। আর, দুটো রজনীগন্ধার মালায় মন্ত্র পড়ে দেবেন উনি। সেটা রেখে আসতে হবে অর্জুনদের বাড়িতে যেখানে রুমেলার ফুলশয্যা হয়েছিল।”এটা করতে গিয়ে অবশ্য নিশানের প্রাণহানি হতে পারে। কারণ রুমেলা মেরে ফেলতে পারে ওকে। কিন্তু ওইদুটো করতে পারলে হয়ত ওর আত্মাকে নিশান আর পূবালীর জীবন থেকে তাড়ানো সম্ভব। পুরোটাই করতে হবে রাতের অন্ধকারে।

নিশান বুঝতে পারেনি কেন বেনারসি আর কেনই বা ফুলের মালা। তবে এই নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি। দিনের আলোয় যাওয়া যাবে না। রাতে ঢুকবে কী করে নিজের বাড়িতে! ওখানে ঢুকলেই তো রুমেলা ওকে শেষ করে দেবে। মৃত্যুঞ্জয়জেঠুর বাড়িতে গিয়ে বেশ কিছু জিনিস নিয়ে এসেছে নিশান। এভাবে তো জীবন চলতে পারে না। যেভাবেই হোক ওদের বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে রুমেলার আত্মাকে।

রাত্রি তখন প্রায় দশটা। পূবালী কিছুতেই ছাড়বে না ওকে। আঁকড়ে ধরে আছে। নিশান ওকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল, ”আমি একা যাব না। অরিত্র আর বিট্টু যাবে।” কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়জেঠু বলেছেন ”কাক-পক্ষীও যেন টের না পারে।”

কোনোমতে পূবালীকে বুঝিয়ে বেরিয়ে এল নিশান। হয়তো আজকেই ওর জীবনের শেষ দিন। আর হয়তো পূবালীর সঙ্গে দেখা হবে না ওর।

কয়েকদিনের অব্যবহারে বাড়ির উঠোনে ধুলো জমেছে। শুকনো পাতা পড়ে আছে উঠোন জুড়ে। কেমন যেন ভূতুড়ে বাড়ি মনে হচ্ছে ওর।

বাড়ির সামনে যেতেই দেখল একটা লালচে গরু বসে আছে।

মৃত্যুঞ্জয়জেঠুর কথা মতো এদিকে-ওদিক তাকাল। না কোনো মাংসাশী প্রাণী তো নেই এখানে। থাকার তো কথা ছিল।

তবুও বেশি যুক্তিতে না গিয়ে ব্যাগ থেকে মাংসের টুকরোগুলো ছুঁড়ে দিল গরুর সামনে। অবাক হয়ে দেখল গরুটা মাংস খেয়ে নিচ্ছে চিবিয়ে চিবিয়ে। কিন্তু গরুর পাকস্থলী তো মাংস হজম করতেই পারে না। তাহলে!

দূরে দূরে ছুঁড়ে দিল মাংসগুলো।

গরুটা বুভুক্ষুর মতো ছুটে ছুটে খেতে শুরু করল মাংসগুলো।

নিশান তাড়াতাড়ি বাড়ির তালা খুলে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে আলমারি থেকে বের করল পূবালীর বিয়ের লাল বেনারসিটা।

তাড়াহুড়োয় ঘরের লাইটটা নেভাতেও ভুলে গেল। বাইরে বেরিয়ে তালা দেবার সময় দেখল ঘরে আলো জ্বলছে। বাইরের গেটে দেখল যথারীতি গরুটা সোজা হয়ে শুয়ে আছে। একটুও জায়গা নেই নিশানের বেরোনোর। নিশান এগোতে যেতেই সেই হিসহিসে গলা। ”যাক ওই ছোটলোকের বেটিটাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েছিস খুব খুশি হয়েছি। ওই বেটি বড় বর সোহাগী। আদরে মাটিতে পা পড়ে না। এসো নিশান, আমি আর তুমি এই বাড়িতে সংসার পাতব। আমায় তুমি আদর করবে, আমি তোমার জন্য রান্না করে রাখব। এসো আমরা সংসার পাতব।”

নিশান বেশ বুঝতে পারছে একটা দড়ি মতো কিছু দিয়ে ওর গলায় টান দিচ্ছে কেউ। শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ওর। পূবালীর মুখটা মনে পড়ছে। আর হয়তো দেখা হবে না ওর সঙ্গে।

তবুও শেষ শক্তি দিয়ে আরও দু-টুকরো মাংস ছুঁড়ে দিল উঠোনের শেষ প্রান্তে।

দেখল গরুটা দৌড়ে গেল। নিশানের গলার ফাঁসটাও একটু আলগা হল।

ছুটতে ছুটতে পৌঁছাল বিশুকাকার বাড়িতে। বেল বাজাতেই কাকিমা এসে দরজা খুলল। নিশান বেশি কথা না বলে বলল, ”কাকিমা এখুনি রুমেলার ঘরটার চাবি খুলে দাও। এখুনি দাও। ও আমাদের মেরে ফেলবে না হলে। বিশুকাকা কথাটা শুনেই ছুটে গিয়ে চাবি নিয়ে এসে খুলে দিল দরজাটা।”

ঘরটা খুলতেই ভ্যাপসা মরা পচা গন্ধটা নাকে এসে লাগল নিশানের। বেনারসির খুঁটে শিকড়টা বেঁধে শাড়িটা রেখে এল রুমেলার বিছানায়।

রীতিমত হাঁফাচ্ছে নিশান। তবুও ভয়ে স্কুটিতে চাপেনি। যদি অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে দেয় রুমেলা।

অর্জুনদের বাড়িতে পুলিশ এসেছিল। পরে নিশান গিয়েছিল ওদের বাড়ি। নিশানকে দেখেই অর্জুনের বাবা বললেন, ”কি চাই? হ্যাঁ অর্জুন খুন হয়েছে।

কেন, কে করেছে আমরা জানি না। সকাল থেকে লোকের উত্তর দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত।”

নিশান গেট থেকে একটু ভিতরে ঢুকতেই অর্জুনের বাবা বললেন, ”তোমায় যেন কোথায় দেখেছি। ওহ পুষ্পভাণ্ডারের ছেলেটা না?”

নিশান ঘাড় নেড়ে বলল, ”কাকু খুব বিপদে পড়ে এসেছি। একবার অর্জুনের ঘরটা কোন দিকে দেখান।”

কিছু না বুঝেই অর্জুনের বাবা পাশের ঘরের দিকে আঙুল দিয়ে বলল, ”ওইদিকে। কিন্তু কেন?”

নিশান আর দেরি না করে ছুটে গিয়ে রজনীগন্ধার গোড়ে মালা দুটো অর্জুনের বিছানায় রেখে ছুটে বেরিয়ে এল। হাঁফাচ্ছে ও। হৃৎপিণ্ড এতটাই লাফাচ্ছে মনে হচ্ছে এখুনি থমকে যাবে। অর্জুনের বাবা কোনো প্রশ্ন করার আগেই নিশান বলল, ”রুমেলা সবার ক্ষতি করছে। তাই একজন তান্ত্রিকের কথা মতো মালা দুটো রেখে গেলাম।”

নিশান ভাড়া বাড়িতে ফিরছে। আর হাঁটার ক্ষমতা নেই। একটা টোটোয় উঠল ও। হঠাৎই শুনল কান্নার আওয়াজ। কেউ একজন গুমরে গুমরে কাঁদছে।

নিশান চারিদিকে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। শুধু কান্নার আওয়াজটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

বাড়ি ফিরতেই পূবালী ওকে জড়িয়ে ধরল। নিশান অবসন্ন গলায় বলল, ”রুমেলা কাঁদছিল পূবালী। সম্ভবত ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।”

পরের দিন ওরা নিজেদের বাড়িতে ফিরে দেখল বাড়িটা যেন লন্ডভন্ড হয়ে আছে। কেউ যেন সারারাত ধরে তাণ্ডব চালিয়েছে। নিশান আর পূবালীর বিয়ের ছবিগুলো কুটিকুটি করে ছেঁড়া।

মৃত্যুঞ্জয়জেঠু গোটা বাড়িটা ভালো করে ঘুরে বললেন, ”পালিয়েছে।” বাড়ির চারপাশে কী সব ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, ”এবারে শান্তিতে থাক।”

পূবালী আর নিশান দুজনেই হাতে হাতে আবার গোছাতে লাগল ওদের সংসারটা। এলোমেলো সংসারটা আবার সাজাতে হবে খুব যত্ন করে।

বাড়ির চারিদিকে যেন এখনও রুমেলার অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন বারবার বলছে, ”ভালোবাসার ঘর আমি ভেঙে তছনছ করে দেব।”

পূবালীর মুখে এখনও ভয়ের ছায়া। বাইরে একটা পাতা পড়লেও যেন ও ভয় পেয়ে যাচ্ছে। একটা বেড়াল ডাকলেও আঁকড়ে ধরছে নিশানকে। নিশান খুব যত্ন করে পূবালীকে বোঝাচ্ছে, ”এ বাড়িতে এখন আমরা দুজনেই আছি। কোনো তৃতীয় ব্যক্তি নেই।” তবুও যেন, মধ্যরাতের বিছানায় পূবালীকে আদর করতে গেলে থমকে যাচ্ছে নিশান। মনে হচ্ছে আবার পূবালীর শরীরে ওই লালচে জড়ুলটা দেখবে না তো। মনে হচ্ছে কেউ যেন ওদের ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে হিংস্র চোখে দেখছে ওদের সঙ্গম দৃশটুকুও। নিশান বুঝেছে সময়কে আরেকটু সময় দিতে হবে, তবেই সে ভুলিয়ে দেবে রুমেলাকে। এখনও রুমেলা যেন টাটকা বিভীষিকা ওদের জীবনে।

নিশান কড়া নির্দেশ দিয়েছে বিট্টুকে—”সাদা ফুল না থাকলে ফিরিয়ে দিবি শ্মশানযাত্রীকে। কিন্তু খবরদার লাল রঙের রক্তগোলাপ দিবি না মৃতদেহকে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *