ছেলে পোঁতা শ্মশান – অর্পিতা সরকার

‘ছেলেটাকে পুঁতে দিয়ে আসতে হবে তো বাসন্তী?’ বাসন্তী তখনও এলোথেলো হয়ে দাওয়ায় বসেছিল।

আচমকা কান্নাভেজা লাল চোখ দুটো দিয়ে তাকাল মানিকের দিকে। দাঁত চেপে বলল, ‘মিনসে মরেও শান্তি দেবে না। তোর বাপের কর্ম এসব। কাট, আগে বাড়ির পিছনের নিমগাছটা কাট।’ মরা ছেলেকে দাওয়ায় নামিয়ে রেখে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘরে ঢুকে চৌকির নীচে থেকে কাটারিটা বের করে হনহন করে ছুটছিল বাড়ির পিছনের পুকুরের ধারের নিমগাছটার দিকে।

এই নিয়ে ছেলে পোঁতা শ্মশানে বার তিনেক গেল মানিক। তিনবার ও বাবা হল। তিনবারই ওর পুত্র সন্তান জন্মালো। কিন্তু ষষ্ঠী পুজোর আগেই তাদের মাটি চাপা দিয়ে আসতে হয়েছে।

মানিক তখন গুজরাটে গিয়েছিল কাজ করতে। বাড়িতে নতুন বউকে রেখে গিয়েছিল। আর ছিল মানিকের বাবা। মৃত্যুঞ্জয় বলেছিল, ‘বৌমা আমার মেয়ের মতো। তুই যা মানিক, আমিই ওকে সংসারের খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দেব।’

মানিক বরাবরই একটু বোকাসোকা ছেলে। পাড়ার সবাই জানত মানিকের মাথার অর্ধেকটা বেলুনের মতো হাওয়া দিয়ে ভর্তি। লোকে বিনা পয়সায় গায়ে গতরে খাটিয়েও নিয়েছে মানিককে সেই স্কুল থেকে। স্কুল থেকে ফেরার পথে কামরাঙা গাছের নিচে যখনই দাঁড়িয়েছে একটা কামরাঙা পাড়বে বলে তখনই লক্ষ্মীকান্তজেঠু বাড়ির দাওয়া থেকে হাঁক দিত, ‘ওরে মানকে উঠোনে আয়। ওই দেখ কুয়ো থেকে দু’বালতি ঠান্ডা জল তুলে দে বাবা। আর ওই দেখ, গরুটা আমার শুকিয়ে মরছে। ওকে ডাবায় একটু খড় ফেলে দে, বসে বসে চিবিয়ে যাক।’ অথবা জেঠু বলত, ‘একছুটে দত্তদের দোকান থেকে সর্ষের তেল আর দু’তাড়া বিড়ি এনে দে দেখি।’ হাতে বইয়ের থলি নিয়েই ছুটতো মানিক। ফিরে আসার পর দু’টো কামরাঙা পাড়লেও জেঠু বকবে না। পাড়ার এমন অনেকের বিনামূল্যের কাজের লোক ছিল মানিক। অশোকাকাকিমা, রত্নাজেঠিমা, বিনুপিসি, কাবেরীবৌদি ওকে দেখলেই অন্তত দু’-তিনটে করে কাজ বলত।

স্কুল ফেরত মানিকের খিদে পেত সেই সময় এত ফরমায়েশ ওর মোটেই ভালো লাগত না। তবুও মানিক কোনোদিন গুরুজনের মুখের ওপর না বলতে পারেনি। লেখাপড়ায় সাদামাটা হলেও স্কুলে মানিকের বেশ নামডাক ছিল। সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেল থেকে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্যান্ডেলের বাঁশ জোগাড় করাতেও ডাক পড়ত মানিকের। পরোপকারী স্বভাবটা ওর সেই ছোট্ট থেকেই। মা ভাতের থালা সামনে ধরে দিয়ে বলত, ‘ঠকাবে ঠকাবে তোকে নিজের লোকরাই ঠকাবে মানকে।’ আর কবে বুদ্ধি হবে তোর? মায়ের হাতের অমৃত সমান সয়াবিনের তরকারি দিয়ে জব্বর করে ভাত মেখে খেতে খেতেই মানিক বলত, ‘দেখো মা, আমার হাতের পেশিতে কত শক্তি। কাজ করলে শক্তি আরও বাড়বে বলেছেন আমাদের অঙ্কের হারাধন মাস্টারমশাই।’

মানিককে বোঝানো যে সরলার কম্ম নয় সেটা খুব তাড়াতাড়ি বুঝে গিয়েছিল ও। হাজার হোক মা তো, ছেলের স্বভাব বুঝতে বাকি ছিল না মায়ের। পরোপকারী ছেলের জন্য মাঝে মাঝে গর্বে বুকটা ফুলে উঠত সরলার। যখন পাড়ার কেউ এসে বলত, ‘অনেক ভাগ্যি করে অমন ছেলে পেটে ধরেছিলে গো মানিকের মা। আজ বিষু�জ্যাঠা রাস্তায় পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। হয়তো মরেই যেত। মানিক তাকে তুলে এনে জল খাইয়ে সুস্থ করল। অনেক পুণ্য জমেছে তোমার ছেলের।’

আনন্দে চোখে জল আসত সরলার। খুব স্বপ্ন ছিল ছেলে লেখাপড়া শিখে চাকরি করবে। কিন্তু অর্ধেক মাথায় যার ফাঁকা সে যে লেখাপড়ায় বেশিদূর যাবে না সেটা বুঝতে পারেনি ওর মা। তবে পরিশ্রম করতে পিছপা হয়নি মানিক। মায়ের ইচ্ছেপূরণ করার জন্য লেখাপড়া নিয়ে লেগে থাকত ও। কিন্তু মায়ের আদর ওর কপালে বেশিদিন সইল না। মাধ্যমিক পাস করতে না করতেই মা মারা গেল সাতদিনের জ্বরে। জ্বরটা যে কোথা থেকে এল, সেটাই বলতে পারল না রতন ডাক্তার। সাদা সাদা ওষুধ খেয়েও মায়ের কপালের উত্তাপ কমল না। মা চলে যেতে বড্ড একা হয়ে গেল মানিক। বাবার সঙ্গে কোনোদিনই আত্মার সম্পর্ক ছিল না ওর। বাবা সংসারের কর্তা, মা তাকে ভয় করে চলত, তাই মানিকও ভয় পেত বাবাকে। মা ছাড়া এ বাড়িতে থাকবে কী করে ও?

তখনই মাধবজ্যাঠা গুজরাটে কাজের কথা বলল। সোনার দোকানে কাজ করবে, প্রচুর টাকা কমাবে। টাকার কথায় বাবার চোখ চক চক করে উঠল। লেখাপড়া ছাড়িয়ে মানিককে পাঠিয়ে দিল গুজরাটে। মানিকও মা ছাড়া এবাড়ি থেকে পালাতে পেরে বেঁচে গেল। বছর দুয়েক লেগেছিল কাজ শিখতে। পরিশ্রমী মানিক ভালোই টাকা কমাতে লাগল। প্রতি মাসে মোটা টাকা পাঠাতে লাগল বাবাকে। গুজরাটের কাজে মন বসে গিয়েছিল মানিকের। মাধব জ্যাঠা বলেছিল, ‘মানিক বাবার হাতে সব দিস না। মদে ওড়াবে। তুই জমা কিছু। পাকা ঘর করতে হবে, বিয়ে করতে হবে।’

সর্বনাশ! মানিকেরও আবার বিয়ে হবে! কে করবে ওর মতো বোকা ছেলেকে বিয়ে! তবে মাধবজ্যাঠাকে ও সম্মান করত। যা বলত শুনে চলত। তাই সব টাকা বাবাকে না পাঠিয়ে কিছু কিছু জমাচ্ছিল। বছর চারেক আগে দেশে ফিরে বড় উঠোনের একপাশে তিনটে কোঠা ঘর করেছিল। পুরোনো দু’কুঠুরি মাটির ঘরদুটোকে রান্নাঘর করে দিয়েছিল। তারপরেই মাধব জ্যাঠা বলেছিল, এবারে তোর একটা বিয়ে দেব। তোর ওই উড়নচণ্ডী বাপ তো ছেলের কথা ভাবে না। পারলে নিজেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে। এত বয়েস হল লোকটার ছুঁকছুঁকানি গেল না। বৌমা আমাদের অনেক পুণ্য করেছিল রে মানিক। তাই অমন স্বামীর ঘর বেশিদিন করতে হল না।’ বাবাকে কোনোদিনই আপন ভাবতে পারেনি মানিক।

মায়ের ওপরে অযথা অত্যাচার, ওকে ভয় দেখানো সব মিলিয়ে ছোট থেকেই বাবা ওর আপন হয়নি। তবুও জন্মদাতা বলেই সম্মান করত মানিক। কিন্তু মানিকের বিয়ের কথা উঠতেই বাবা বেঁকে বসল। বলতে শুরু করল, ‘দুজনের সংসার চলে যায়। বিয়ে করলে বউকে খাওয়াবে কী?’

গ্রামের সবাই একবাক্যে বলতে শুরু করল, ‘কাঁচা টাকার লোভে মৃত্যুঞ্জয় দাস মানিকের বিয়ে দিতে চাইছে না।’ শেষে মাধবজ্যাঠা দাঁড়িয়ে থেকে বাসন্তীর সঙ্গে মানিকের বিয়ে দিল। মানিক তো কোনোদিন কল্পনাই করতে পারেনি ওর আবার বিয়ে হবে। ওর আবার সংসার হবে। গরিবের সংসারের গোছানো মেয়ে বাসন্তী। এসেই দুই পুরুষমানুষের হালছাড়া সংসারের হাল ধরল। দু’দিনেই সংসারের হাল ফেরালো যেন। মানিক, বাসন্তীর হাতের রান্না খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলল, ‘এ যেন ঠিক আমার মায়ের হাতের রান্না।’ বোকা বলে মানিককে কোনোদিন অযত্ন করেনি। বরং স্বামী ভেবে সম্মান করেছে, আগলে রেখেছে। ও বাড়ি ছেড়ে গুজরাট যাওয়ার সময় বাসন্তীর চোখে জল দেখেছে। মানিক কখনও ভাবেনি মা ছাড়া অন্য কেউ তার জন্য কাঁদতে পারে। আগে মানিক বছরে একবার আসতো বাড়ি। এখন তিনমাস অন্তর বাড়ি ফেরে দিন পাঁচেকের জন্য। মালিক ওকে ছুটি দেয়। কারণ ও যখন ফেরে তখন দিনে রাতে কাজ করে পুষিয়ে দেয়। বিশ্বস্ত বলে কারখানায় ওর নাম আছে।

বিয়ের তিনমাস পরে বাড়ি ফিরে দেখেছিল, ‘বাসন্তী ওর বুকে মুখ লুকিয়ে খুব কেঁদেছিল। কাকুতি মিনতি করে বলেছিল, আমায় ওখানে নিয়ে চল। ঝুপড়ি ভাড়া করে রেখো আমায়, আমার কোঠা বাড়ি চাই না।’

সোনার দুটো ছোট ফুল কানে পরিয়ে দিয়ে মানিক বলেছিল, ‘এখন আর মনখারাপ কেন করছ? বলছি তো তিনমাস পর পরই বাড়িতে আসব।’ বাসন্তীর কান্না থামেনি কানের দুল পেয়েও। সে মানিকের পায়ে ধরে বলেছিল, ‘আমায় নিয়ে চলো এ বাড়িতে আমার ভয় করে।’

মানিক হেসে বলেছিল, ‘পাগলী। বাবা আছে তো ভয় কিসের। তাছাড়া গ্রামের সবাই আমায় ভালোবাসে কোনো ভয় নেই।’ একাই ফিরে এসেছিল মানিক। পরেরবার ফিরে শুনেছিল ও বাবা হতে চলেছে। পাড়ায় সবাই ওকে দেখে হেসে হেসে বলছিল, ‘বাবা হলে খাওয়াবি কী? ‘ আনন্দে মানিকের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। বাড়িতে ঢুকেই বুঝেছিল, কিছু একটা গোলমাল আছে। বাবা কলপাড়ে বসে বসে বমি করছে। বাসন্তী নিজের মনে কাজ করে যাচ্ছে। মানিককে দেখে ছুটে এসে বলেছিল, ‘খবরটা কি আমি দেব? নাকি পাড়ার সবাই দিল?’ পরশুদিন বিনু জেঠিমা এসেই ধরে ফেলল, বলল, ‘তুই তো পোয়াতি রে বউ। মানিক ব্যাটা বিয়ের ছয়মাসের মধ্যেই…’ লজ্জায় লাল হল বাসন্তী।

মানিক বলল, ‘কিন্তু বাবার হয়েছে কী? বমি হচ্ছে কেন?’

বাসন্তী যেন একটু অবজ্ঞার সুরে বলল, ‘বমি তো আমার হওয়ার কথা। তোমার বাপ কেন বমি করছে আমি কী জানি!’ মানিক রতন ডাক্তারকে খবর দিল। ওষুধ খেল, কিন্তু বমি বন্ধ হল না। দিন সাতেকের মধ্যেই বিছানা নিল বাবা। বাসন্তীর তেমন হেলদোল নেই। মানিক যতটা পারল করল কিন্তু বাবা দশ দিনের মধ্যে মারা গেল।

লোকে বলল, মদ খেয়ে খেয়ে মৃত্যুঞ্জয় লিভারটাই পচিয়ে ফেলেছিল। বাবার কাজ মিটিয়ে ফিরে গেল মানিক। এত ছুটি মালিক ওকে দেবে না। আবার বাসন্তীর বাচ্চা হবার সময়েও ছুটি নিতে হবে।

বাবা হল মানিক। বাসন্তীর কোল জুড়ে এল রাজপুত্রের মতো ছেলে, কিন্তু বয়েস যেমনই পাঁচদিন হল অমনি সে ছেলে চোখ বুজলো। বাবা ডাক শোনা আর হল না।

বাসন্তী কেঁদে কেঁদে বুকের কাপড় ভিজিয়ে ফেলল। মানিক ওই একরত্তি ছেলেকে কাপড়ে জড়িয়ে পুঁতে দিয়ে এল ছেলে পোঁতা শ্মশানে। পাড়ার উত্তর বরাবর বামুনদিঘির পারে বট গাছের নীচে এই শ্মশান। এখানে দাহ হয় না। শুধু ছোট্ট বাচ্চা মারা গেলে পুঁতে দিয়ে যায় তার বাড়ির লোক। সেই থেকেই এর নাম ছেলে পোঁতা শ্মশান।

লোকে বলে রাতের বেলা ওর পাশ দিয়ে গেলে নাকি কচি গলায় কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। ছেলে পোঁতা শ্মশানের এমন অনেক গল্প আছে। গ্রীষ্মের দুপুরে নাকি একদল রাখাল একবার গরু চরাতে গিয়ে ছোট্ট বাচ্চার কোমরের বিছে আর হাতের বালা পেয়েছিল। তিনটে রাখাল মিলে বিশে মিত্তিরের সোনার দোকানে সেটা বেচে তাই দিয়ে মদ খেয়েছিল। পরের দিন তিনজনই বমি করতে করতে মরে যায়। সেই থেকেই ছেলে পোঁতা শ্মশানের নামে আতঙ্ক ছড়িয়ে যায়। কুমুদবৌদি একবার বামুনদিঘি থেকে জল নিয়ে ফিরছিল শীতের বিকেলে, তখনও বাচ্চার পায়ের নূপুরের আওয়াজ পেয়েছে। কেউ যেন রূপোর মল পরে টলমল পায়ে চলে বেড়াচ্ছে। কুমুদবৌদির সাতদিন জ্বর নামেনি। ক্রমাগত ভুল বকছিল। সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিল কুমুদবৌদি।

এমন অনেক কথা ছড়িয়ে আছে চন্দনপুরে গ্রামের মাঠে-ঘাটে। দিনের আলোয় ছাড়া ওই দিঘির ধার মাড়ায় না কেউ। দু’দুটো রাজপুত্রের মতো সন্তানকে মানিক নিজে হাতে পুঁতে দিয়ে এসেছে ওই ছেলে পোঁতা শ্মশানে। তিন নম্বর মরা বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখ দিয়ে নিজের অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ল ওর। বাচ্চাগুলো একে একে মরে যাওয়ার পর থেকেই বাসন্তী কেমন যেন হয়ে গেছে। লোক বলে মানিকের বউয়ের মাথাটায় যেন একটু গন্ডগোল দেখা দিয়েছে। মুখে হাসি নেই। চোখে সর্বদা ভয়।

মানিকও ভেবেছে গুজরাটের কাজটা ছেড়ে দিয়ে শ্যামনগরের শহরে একটা কাজ নেবে। এবারে এসে বড় সোনার দোকানদারের সঙ্গে কথাও বলেছে। ওর হাতের কাজ দেখতে চেয়েছে দোকানদার। মাইনে হয়তো ওখানের মতো অত পাবে না, কিন্তু বাসন্তীকে বাড়িতে একা রেখে যেতে আর মন চাইছে না মানিকের। মাসখানেকের মধ্যেই ওদিকের পাট মিটিয়ে ফিরে আসবে।

হাতে কাটারিটা নিয়ে রণমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাসন্তী। কোনোদিন মানিককে তুই বলে না। আজ তাও বলছে।

‘শিগগির ওই নিম গাছটা কেটে দে। ওখানেই তোর বাপ থাকে। আমার ছেলে জন্মালেই তাকে খেয়ে নেয় মিনসে।’ কোলে মরা ছেলে নিয়ে মানিক স্থির দৃষ্টিতে বাসন্তীকে দেখছিল। বাসন্তীর চোখ দুটো যেন জ্বলছিল। হনহন করে বাড়ির পিছনের দিকে যাচ্ছে দেখেই, কাঁথা জড়ানো মৃত ছেলেটাকে আবার দাওয়ায় শুইয়ে রেখে ছুটে গিয়ে বাসন্তীকে চেপে ধরল। ‘করছো কী? ওই নিমগাছকে গোটা পাড়ার লোক পুজো করে। কারোর পক্স হলে ওই নিমগাছের পাতা দিয়ে তার গায়ে বুলিয়ে দেয়, তুমি সেই গাছকে কেটে দেবে? আর এর মধ্যে আমার বাবা কোথায় আছে! দেখো বাচ্চাগুলো মরে যাচ্ছে সেটা কষ্টের কিন্তু অযথা মরা বাপকে ধরে টেনো না।’ বাসন্তী ধপ করে বসে পড়ল মাটিতে। কাটারিটা নিয়ে লুকিয়ে ফেলল মানিক। ছেলে কোলে নিয়ে চলল পুঁতে আসতে।

প্রত্যেকটা বাচ্চা মারা যাবার পরে বাসন্তী ছটফট করে। পাগলের মতো নিজের পেটে কিল ঘুষি মারতে থাকে। এবারে একেবারে চুপ। শুধু নিম গাছটা কাটতে হবে বলে জেদ ধরেছিল। ছেলেটাকে মাটি চাপা দিয়ে বেশ খানিকক্ষণ দিঘির ধারে বসে রইল মানিক। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। বাসন্তী লাল শুকনো চোখ মেলে তাকিয়ে থাকবে। কিছুক্ষণ বসেই থাকল মানিক।

মনে মনে গজরাচ্ছে বাসন্তী। ও জানে এ কার কীর্তি। গোটা পাড়ার লোককে ও বোঝাতে চেয়েছে এ মৃত্যুঞ্জয়ের কীর্তি। ওর গর্ভের সন্তানকে বাঁচতে দেবে না। পাড়ার কেউ ওকে বিশ্বাস করছে না। সবাই ভাবছে ওর মাথাখারাপ হয়ে গেছে। মাথাটা এখন ওর ঠিকই আছে। খারাপ তো হয়েছিল বিয়ের মাসখানেক পরে। মানিক যখন গুজরাট চলে গেল তখন ও আর শ্বশুর ছিল বাড়িতে। মানিকের সামনে বড় বড় কথা বলেছিল শ্বশুর। মধ্যরাতে দরজায় টোকা শুনে ভয়ে ভয়ে দরজা খুলেছিল বাসন্তী। বাবার কিছু হয়নি তো! অসুস্থ হয়নি তো! দরজা খুলতেই রাক্ষসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর ওপরে। টেনে হিঁচড়ে ওর শাড়ি-ব্লাউজ ছিঁড়ে কিছু বোঝার আগেই ওকে ধ্বংস করেছিল। আপন মনে চলে গিয়েছিল নিজের ঘরে। যাওয়ার সময় বলেছিল, ‘মানিক আমার ছেলে হলে কি হবে, একটা অকর্মা। তোমায় সব সুখ আমি দেব।’

ইচ্ছে করছিল কাটারি দিয়ে গলাটা নামিয়ে দিতে।

কিন্তু নতুন বউ তাই মুখ বুজে ছিল। মুখে রা কাটেনি। শুধু বিভীষিকার মতো প্রতিটা রাত কাটিয়েছে। মাঝরাতে দরজায় টোকা পড়েছে বাসন্তী। ভয়ে কাঁটা হয়ে থেকেছে। কোনোভাবেই দরজা খোলেনি ও। তবুও রক্ষা পায়নি। সকলের সামনে মৃত্যুঞ্জয় মা ছাড়া ডাকত না বাসন্তীকে আর আড়াল পেলেই ওকে ছুঁয়ে দেখার ধান্দা করত।

মানিক ফিরতেই গুজরাট যাবে বলে বায়না ধরেছিল বাসন্তী। কিন্তু মানিক নিয়ে যেতে চায়নি। বলেছিল, ‘ওখানে চারটে ছেলে মিলে একটা ঘরে থাকে। বাসন্তীর সম্মান থাকবে কী করে!’ বাসন্তী বলতে পারেনি রোজ এই বাড়িতে ওর সম্মান যায়। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যা করতে হবে নিজেকেই করতে হবে।

ভর দুপুরে আবারও একদিন শ্বশুর এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর ওপরে। সেদিনও ওর শরীরটা ছিঁড়ে খেয়েছিল। সেদিন থেকেই শ্বশুরের খাবারে একটু করে বিষ মেশাতে শুরু করে ও। দিন সাতেক পর থেকে বমি শুরু হয় মৃত্যুঞ্জয়ের।

বাসন্তী তখন মা হতে চলেছে। বাচ্চাটা ওর আর মানিকের ভালোবাসার ফসল না মৃত্যুঞ্জয়ের নোংরা কামনার সেটাই বুঝতে পারছিল না বাসন্তী। মানিকের সামনে দাঁড়াতেও যেন লজ্জা করছিল। অথচ ও জানে মানিককে বললে কখনোই বাবার নামে এসব কথা বিশ্বাস করবে না।

বেশিদিন টেকেনি শ্বশুর, মরে বাসন্তীকে বাঁচিয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকেই রাতের অন্ধকারে একটা ঠান্ডা হাত ওকে রোজ ছুঁয়ে যায়। ওর বুক, তলপেট সেই ঠান্ডা হাতের নখে ছিঁড়ে যায়। জ্বালা করে শরীরটা। সকালে উঠে আয়নায় দাঁড়িয়ে দেখে ছেঁড়া জায়গাগুলো। একমাত্র মানিক বাড়িতে থাকলে ওই হাতটা কদিনের জন্য রেহাই দেয় বাসন্তীকে। নাহলে প্রতিরাতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ওর গোটা শরীরে সাপের মতো কিলবিল করে ঘুরে বেড়ায় আঙুলগুলো। খামচে ধরে বাসন্তীর শরীরের নরম জায়গাগুলো। এর মধ্যেই মানিক বাবা হয়েছিল, বাসন্তী মা। কিন্তু একটাও সন্তান প্রাণে বাঁচল না। বাসন্তীর স্থির বিশ্বাস এ কাজ মৃত্যুঞ্জয়ের। এই ঘরে ও দুটো মানুষের নিশ্বাস সহ্য করবে না। তাই বাসন্তীর বাচ্চাগুলোকে মেরে দিচ্ছে। জন্মানোর ঠিক দিন পাঁচেকের মধ্যেই মরে যাচ্ছে বাচ্চাগুলো। বাসন্তীর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে গোটা গ্রামকে, ‘মৃত্যুঞ্জয়ের ভূত এবাড়িতেই আছে।’ কিন্তু বললে হয়তো, পাড়ার লোক ওকেই পাগল বলবে। আসল ঘটনা বললে ওকেই দুশ্চরিত্র বলে ছেড়ে দেবে মানিক। যাবে কোথায় বাসন্তী? মানিককে হাতে পায়ে ধরে বলতে হবে এখানে ফিরে আসতে। কী হবে ওখানে বেশি মাইনে পেয়ে? ঘরই যদি শূন্য থাকে। মা ডাক শোনা আর হল না বাসন্তীর। হেলথ সেন্টারের দিদিমণি বলেছে, ‘বাসন্তী বছর দুয়েক আর কোনো বাচ্চা নিও না। তোমার শরীরের বড় ক্ষতি হচ্ছে।’ ঝিম ধরে বসে আছে বাসন্তী। পাশের বাড়ির কাকিমা ভাত-তরকারি সব দিয়ে গেছে। বলেছে, ‘আজ আর হাঁড়ি চড়াস নে বউ। আগুন না জ্বালাই আজ ভালো।’ বাসন্তীর গলা দিয়ে আজ আর ভাত নামবে না। মানিক ফিরতে এত দেরি কেন করছে! বাপটা কি ওকেও খাবে আজ নাকি? দিয়ে একা ভোগ করবে বাসন্তীকে! মা মরা বাসন্তীর যাওয়ারও জায়গা নেই। তাই এই ঘর কামড়ে পড়ে থাকতে হবে ওকে।

উঠোনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চোখটা বুজে এল ওর। ঘরে গিয়ে বিছানায় এলিয়ে দিল ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরটা। ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পারছে কেউ ওর শরীরে হাত বোলাচ্ছে। হাতটা ভীষণ ঠান্ডা। শীতের পুকুরের জলের মতো ঠান্ডা। চোখটা জড়িয়ে লেগে আছে বাসন্তীর, খুলতেও পারছে না ও। এদিকে ঘিনঘিনে হাতটাকে ঠেলে সরাতেও পারছে না। গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না ওর। এদিকে ওই ঠান্ডা হাতটা ওর বুক থেকে কোমরে, কোমর থেকে পেটে নেমে চলছে। যোনিদ্বারে এখনও ব্যথা টনটন করছে। বাচ্চা হওয়ায় এখনও কাঁচা যোনিদ্বার। হাতটা যেন ওখানেই যেতে চাইছে। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল ও। সঙ্গে সঙ্গেই ঠান্ডা হাতটা অদৃশ্য হল ওর শরীর থেকে। আজ অবধি হাতের মালিককে বা হাতটাকে ও দেখতে পায়নি। শুধু ঘিনঘিনে অনুভূতিতে বুঝতে পারে এটা ওর মৃত শ্বশুর। মরেও নারী শরীরের প্রতি লোভ যায়নি বুড়োর। নাকি নিজের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ফিরে আসে। আর বাসন্তীর কোল ফাঁকা করে দেয়। কিন্তু গ্রামের লোককে বোঝাবে কী করে ও। আর মানিক তো আরও বুঝতে চাইবে না।

উঠোনে কলের আওয়াজ পেয়ে বুঝল মানিক বাড়ি ঢুকে স্নান সারছে। কথা না বলে রান্নাঘরে ঢুকে কাকিমার দেওয়া ভাত তরকারি থালায় সাজিয়ে দিল বাসন্তী। আসন পেতে জলের গ্লাসটা সামনে রাখল। মানিক খেতে বসেই বলল, ‘তুমি খেয়েছো বাসন্তী?’

বাসন্তী ধরা গলায় বলল, ‘খেয়েছি তো, তবুও পেট ভরেনি। তিন তিনটে ছেলেকে খেয়েও খিদে পায় এখনও।’ মানিক ওকে হাত ধরে টেনে বসালো নিজের পাশে। জোর করে ভাত মেখে ওর মুখে দিয়ে বলল, ‘তোমার কিছু হলে আমি কী নিয়ে বাঁচব বলতো? আর কটা মাস যেতে দাও, এখানেই কাজে ঢুকব। কথা বলে এসেছি। তারপর আর তোমায় ছেড়ে কোনোদিন যাব না। গুজরাটে ফিরেই মালিককে বলে দেব, আমার পাওনা মিটিয়ে দিতে। চিন্তা করো না। আবার আমরা বাবা-মা হবো।’

বাসন্তীর নিজের কপালের ওপরেই হিংসা হয়। এমন স্বামী তার, এত চরিত্রবান ভালো মানুষকে অনেক ভাগ্য করে পেয়েছে ও। কিন্তু তারপরেও সুখের ঘরে সবসময় চাবি দিয়ে রেখে দিয়েছে ওই শয়তান বুড়োটা।

মানিক খেয়ে হাত ধুয়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। কালকে সকালে ট্রেন। ভয়ে আবারও বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে বাসন্তীর। আবার ওই ঠান্ডা হাতটা ঘুরে বেড়াবে ওর শরীরে। আঁচড়ে দেবে, চেপে ধরবে, যন্ত্রণায় ঘেন্নায় কঁকিয়ে উঠবে ও। রেহাই নেই এর থেকে।

মানিক চলে গেছে আজ তিনদিন হল। বাসন্তী কোনোরকমে দুটো ভাতে ভাত ফুটিয়ে খাচ্ছে। মানিক সব বাজার হাট করে রেখে গেছে। মুদির দোকান, সবজি, মাছের দোকানে টাকা দিয়ে বলে গেছে, বাসন্তীর বাড়িতে সব পৌঁছে দিতে। কিন্তু সেসব ঝুড়িতে পচে যাচ্ছে। রান্না করতে ইচ্ছে করছে না ওর। শুধুই ছেলেটার জন্মের সময়ের চিৎকার করে কান্নাটা ভাসছে কানের মধ্যে।

বালতি বালতি জল ঢেলেও গা থেকে ওই ঘিনঘিনে নোংরা হাতটার ছোঁয়ার অনুভূতিটাকে কিছুতেই সরাতে পারে না ও। বারান্দায় বসে বসে একটু শুকিয়ে যাওয়া শাকগুলো কেটে রাখছিল বাসন্তী। টাকা দিয়ে কেনা জিনিস নষ্ট করতেও মনে বাজে। সেই সময়েই আনন্দ মন্ডলের বোন ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়াল বাসন্তীর উঠোনে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘বৌদি গো, তোমার শ্বশুর কাল গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে। আমার দাদার ছেলে হয়েছে তো। বৌদি আঁতুড়ে ছিল, ওই সিঁড়ির নীচের ঘরটায়। বৌদি নিজে চোখে দেখেছে, ধুতি আর ফতুয়া পরে মাথায় সেই হনুমান টুপি পরে একটা লোক ভাইপোর দিকে হাত বাড়াচ্ছিল। বৌদি ভাইপোকে চেপে ধরেছিল, তাই নিতে পারেনি।’ বাসন্তী বলল, ‘এতদিন তো সবাইকে কানে কামড়ে বলতাম আমি মিনসে এই বাড়িতেই আছে। ওই নিম গাছে আছে। কেউ তো শোনেনি সে কথা। লোকে বলত, মানিকের বৌয়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এবারে বুঝুক লোকজন, বাসন্তী ভুল বলেনি। আনন্দের বোনের চোখে তখন ভয়ের আঁকিবুঁকি।’

তারপরের দিনেও সবে কলঘর থেকে স্নান সেরে বেরিয়েছে বাসন্তী। শুনতে পেল উঠোনে কারা যেন কথা বলছে। শিবনাথ মুখুজ্জের মেয়ে পদ্মা গতকালই বাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়ি এসেছে। মাত্র একমাসের বাচ্চা। পদ্মাও ভোরের দিকে ঘুম চোখে মৃত্যুঞ্জয়দাদুকে তার ছেলের মশারির আশেপাশে ঘুরতে দেখেছে। ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল পদ্মা। তারপরেই মৃত্যুঞ্জয় পালিয়েছে। সেই সাদা ধুতি লাল পেড়ে, আর সাদা ফতুয়া, মাথায় হনুমান টুপি, এ পোশাক কারোর ভোলার নয়।

দিন সাতেকের মধ্যেই এ পাড়ায় রটে গেল মৃত্যুঞ্জয় দাসই তার নিজের তিন তিনটে নাতিকে খেয়েছে। এখন পাড়ার কচি বাচ্চা দেখলেই তাকে খাওয়ার তালে আছে। গ্রামের প্রধান নিজে এলো বাসন্তীর বাড়িতে। লোক দিয়ে কাটানো হল নিমগাছটা। এক তান্ত্রিক ডেকে যজ্ঞ করানোর কথাও বলল পাড়ার লোকজন। আজ বড় নিশ্চিন্ত লাগছে বাসন্তীর। ঘাড়ের ওপরে ওই নিমগাছটা নেই বলে। পাড়ার লোকজন গাছটাকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করত, তাই বাসন্তীর ইচ্ছে থাকলেও কাটা হয়নি। আজ কাটা পড়ল মৃত্যুঞ্জয়ের বাসা। রাতে একটু নিশ্চিন্তে ঘরে ঘুমালো বাসন্তী। এ কদিন রাত হলেই লোকের বাড়িতে গিয়েছিল মৃত্যুঞ্জয় সেজে ভয় দেখাতে। শ্বশুরের ধুতি, ফতুয়া পরে, মাথায় হনুমান টুপি পরে আর যাত্রাদলের থেকে পাওয়া গোঁফ লাগিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে। মানিক নাকি কবে একবার যাত্রা করেছিল পাড়ায়। তখনই এক সেট গোঁফ দাড়ি পেয়েছিল যাত্রাদলের থেকে। সেটাই আলমারিতে ছিল। সেসব পরে মৃত্যুঞ্জয় সেজে ভয় দেখিয়ে বেড়াতে হয়েছে বাসন্তীকে। বেশ কয়েকটা রাত ঘুম হয়নি পরপর।

নিশ্চিন্তে আজ ঘুমাবে। আজ আর ওই হাতটা ওকে খুবলে খাবে না। নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল বাসন্তী। আচমকাই একটা তীব্র কষ্টে ঘুমটা ভেঙে গেল ওর। কেউ যেন গলাটা চেপে ধরে আছে ওর কিছুতেই নিশ্বাস নিতে পারছে না ও। কানের কাছে মৃত্যুঞ্জয়ের হিসহিসে গলা, ‘আমায় মেরে, গাছ কেটে বেঁচে যাবি মনে করবি? আমার ভিটে থেকে আমায় তাড়াবি তুই? আজ তোকে সঙ্গে করে দিয়ে আসব তোর ওই ছেলেদের যেখানে পুঁতে এসেছিস সেখানে।’ বাসন্তী সব শক্তি দিয়ে ঠেলে ফেলে দিল মৃত্যুঞ্জয়কে। অন্ধকারে কাউকে দেখতেই পাচ্ছিল না ও। মাথার কাছে রোজই কাটারি নিয়ে শুয়ে থাকত বাসন্তী।

ওটা নিয়েই এলোপাথাড়ি চালাতে লাগল। ঘর থেকে বেরিয়ে এসেও উঠোনে বনবন করে ঘোরাতে লাগল কাটারিটা। হঠাৎই আ করে চিৎকারে শব্দে বুঝতে পারল কারোর একটা লেগেছে। ছুটে গিয়ে বারান্দার লাইটটা জ্বালালো বাসন্তী। মাটিতে পড়ে ছটফট করছে মানিক। কাতর স্বরে বলল, ‘আমি ফিরে এসেছিলাম বাসন্তী। ওখানের কাজে জবাব দিয়ে ফিরে এসেছিলাম। মাধবজ্যাঠা ফোনে বলল, পাড়ার সবাই নাকি বাবাকে দেখছে ভূত হয়ে ঘুরতে, তাই ফিরে এলাম। ট্রেনটা দেরি করল, তাই রাত এগারোটা বেজে গেল।’ মানিক জ্ঞান হারালো। বাসন্তী উদ্ভ্রান্তের মতো চেঁচাতে লাগল। পাশের বাড়ির সবাই এসে দেখল উঠোন রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মানিকের বুকে কাটারিটা আমূল বসে আছে।

সবাই ধরাধরি করে হেলথ সেন্টারে নিয়ে গেল, শহরের হাসপাতালে নিয়ে গেলেই ভালো হত। কিন্তু এত রাতে নিয়ে যাওয়া একটু মুশকিল ছিল।

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মানিকের মৃত্যু হল। পাড়ার সবই ভাবল, মৃত্যুঞ্জয় ভূতের কাজ এটা। নাতিগুলোকে খেয়েছে, ছেলেকেও এভাবে খুন করল।

বাসন্তী আর কথা বলেনি সেদিনের পর থেকে। প্রতিরাতে ওই নোংরা হাতটা ওর অসাড় শরীরকে খাবলে যায়। এখন আর তেমন ঘেন্না করে না বাসন্তীর। কেমন যেন পাথর হয়ে গেছে ওর মনটা। শরীরের অঙ্গগুলোও যেন অনুভূতি হারিয়েছে।

মানিক মারা যাবার পরেও বাসন্তী বেঁচে ছিল দিন সাতেক। কিন্তু হঠাৎই সাতদিন পরে একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনে মাঝরাতে দিকভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গেল ছেলে পোঁতা শ্মশানে। বাসন্তী স্পষ্ট দেখল সাদা কাঁথায় জড়ানো ওর তিনটে ছেলেই শুয়ে আছে। সেদিকেই ছুটে গেল বাসন্তী। মা ডাক স্পষ্ট শুনতে পেল ও।

সকালে চন্দনপুরের বামুনদিঘিতে সকলে বাসন্তীর মৃতদেহকে ভাসতে দেখল। শেষ হয়ে গেল মানিকের গোটা পরিবার। আজও চন্দনপুরের লোকজন ছেলে পোঁতা শ্মশানের পাশ দিয়ে গেলে, একজন মাকে দেখে যে তার সন্তানদের আদর করছে। লোকে বলে, বাসন্তী ছেলে আগলে রয়ে গেছে ওই শ্মশানেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *