ঘরোয়া – অর্পিতা সরকার

‘আসুন জেঠু, ‘মায়ার বাঁধনে’ আপনি একদম ঘরোয়া পরিবেশ পাবেন।’ বছর ত্রিশের ছেলেটা আগে আগে দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ফুল ঘেরা রাস্তাটা দিয়ে। ফুল দেখেই উদয়ের মনটা ভালো হয়ে গেল। মিনতি বরাবরই বাগান প্রিয়। অফিসে পৌঁছাতেই এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা বললেন, ‘বসুন স্যার। দেখুন স্যার এখানে চার্জ হয়ত একটু বেশি কিন্তু ‘মায়ার বাঁধন’ নামটা কিন্তু সার্থক। এখানে আমরা আপনাকে একবারে ঘরোয়া পরিবেশ দেব। মনেই হবে না বৃদ্ধাশ্রমে আছেন।’

উদয় মুচকি হেসে বলল, ‘আমার বয়েস বাহাত্তর। আমি কিডনির রোগে ভুগছি প্রায় বছর তিনেক। ডাক্তার বললেন, এবারে দিনগোনা শুরু করতেই পারি। বয়সজনিত কারণে বিভিন্ন অরগ্যান কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই আমি থাকব না, থাকবে আমার স্ত্রী মিনতি। ঘরোয়া পরিবেশের প্রয়োজন নেই বুঝলেন। ঘরোয়া শব্দটাতেই আমার ইদানীং বড্ড অ্যালার্জি হয়ে গেছে। এর থেকে বরং প্রফেশনাল অনেক ভালো। আমি টাকা দেব আপনারা সুস্থ পরিষেবা দেবেন। ঘরোয়া মানেই আবারও আপন ভেবে ফেলবে মিনতি, ওখানেই আমায় ভয়।’ ভদ্রমহিলা বললেন, ‘বুঝলাম না স্যার। সবাই তো বৃদ্ধাশ্রমে এসে ঘরোয়া পরিবেশই চায়।’

উদয় চক্রবর্তী চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে হাঁপ নিয়ে বলল, ‘আসলে ঘরোয়া শব্দটাকে আমরা পাপোশের মতো ব্যবহার করে ফেলি।’ ভদ্রমহিলা হাত জোড় করে বললেন, ‘আমি শ্রাবণী গুপ্ত। এই আশ্রমের দায়িত্বে আছি। বিষয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে। যদি একটু খুলে বলেন।’

বছর চল্লিশের শ্রাবণীর দিকে এতক্ষণে বেশ ভালো করে তাকালো উদয়। সবজে রঙের একটা শাড়ি অত্যন্ত যত্ন করে পরা, স্টেপ কাট চুল, মাথার ওপরে সানগ্লাসটা তোলা, বাঁ হাতে একটা ঘড়ি, ডান হাত নিরাভরণ। কানে দুটো ছোট্ট সাদা পাথর। ঝুটা হিরে না অরিজিনাল সেটা বোঝা উদয়ের কম্ম নয়। এতই যদি বুঝবে তাহলে আপন জনদের আগে চিনতে পারত। সেটাই যখন পারেনি তখন একটা সাদা পাথরের তফাত ধরা পড়বে ওর চোখে, এমন আশা ও করে না। তবে সব মিলিয়ে শ্রাবণীর মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব আছে। মিনতির মতো নয়। একটু যেন আলাদা। পথিক যে সব গাছের নীচে হাক্লান্ত হয়ে বসে হাঁপাতে পারে, গামছা নেড়ে হাওয়া খেতে পারে তেমন গাছ নয়। শ্রাবণী যেন একটু শৌখিনভাবে যত্নে বেড়ে ওঠা গাছ। ইউক্যালিপটাস বা পাতাবাহার। যে ছায়া দিলেও সেই ছায়ায় দাঁড়াতে মানুষ দু’বার অন্তত ভাববে। কিন্তু মিনতি হল বটবৃক্ষ, যার নীচে শান্তিতে দু’দণ্ড বসা যায়। বসতে দেয় বলেই কি বটগাছের নীচেটা নোংরা আবর্জনা করে রেখে দিতে পারে মানুষ?

শ্রাবণী কৌতূহল মিশ্রিত চাউনি নিয়ে তাকিয়ে আছে উদয়ের দিকে। উদয় গল্প বলার ঢঙে বলল, ‘সময় হবে এ বুড়োর গল্প শোনার?’

শ্রাবণী হেসে বলল, ‘আমি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তাই মানুষের গল্প শোনাই আমার কাজ। এই আশ্রম চালানোর অনেকটা খরচ আমি চেম্বার থেকেই আয় করি। শনি আর রবি দু’দিন চেম্বার করি। তাই নিশ্চিন্তে বলুন। মহাভারত হলেও অধৈর্য্য হব না।’ শ্রাবণীর কথা বলার ভঙ্গিমাটা বড় মধুর। উদয়ের বুকের ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস সশব্দে বেরিয়ে এলো।

উদয় বলল, ‘আমার আর মিনতির বিয়েটা হয়েছিল খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে। আমার বাবা ছিলেন খবরের কাগজের পোকা। সকালে তিনটে কাগজ ছিল তাঁর বাঁধা। কাগজ পড়াটা ছিল বাবার নেশার মতো। ওখান থেকেই মিনতিকে খুঁজে বের করেছিলেন বাবা। বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল- পাত্রী সুন্দরী, গৌরবর্ণা, বিএ পাস, গান জানা, ঘরকর্মে নিপুণা ও ঘরোয়া।

আমার বাবা বিশ্বরূপ চক্রবর্তীর চোখ আটকে গেল ওই ঘরোয়া শব্দটিতে। তখন আমি সদ্য রেলে জয়েন করেছি। সরকারি চাকুরে বলে পাত্র হিসাবে বাজারে দর কিছু কম ছিল না। আমরা তিনভাই দুই বোন। আমি হলাম বড়। দুই বোনের বিয়ে আগেই দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু পিছনে দুই ভাই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যারা আমার থেকে মাত্র দেড় বা আড়াই বছরের ছোট তাই বাবা আমায় সংসারী করতে মনোনিবেশ করলেন।’

গলাটা সামান্য পরিষ্কার করে নিয়ে উদয় বলল, ‘বিরক্ত হচ্ছেন না তো ম্যাডাম?’

শ্রাবণী নিবিষ্ট মনে শুনছিল। উদয়ের কথা বলার ঢঙে বেশ একটা গল্পপাঠের আবেশ রয়েছে। শ্রাবণী মাঝের বিরতিতে বলে উঠল, ‘আহা থামলেন কেন বলুন। আদৌ বিরক্ত হচ্ছি না। বরং ইন্টারেস্টিং।’

উদয় আবারও বলতে শুরু করল, ‘তারপর এক রবিবারের দুপুরে মামা, মামী, কাকা, পিসিদের সঙ্গে নিয়ে বাবা রওনা দিলেন মেয়ে দেখতে। বিলক্ষণ আমিও ছিলাম সঙ্গে। শিক্ষিত ছেলে, না দেখে বিয়ে করতে পারি না।

মিনতির দিদির বিয়ে হয়েছে, আরেক দাদা আমারই বয়সী। সেই সকলকে আপ্যায়ন করে বসাল। মিনতির বাবা-মায়ের পাত্র খুবই পছন্দ হল। দুপুরে রাজকীয় ভোজনের পরে বৈকালিক চা-পর্বের সময় মিনতি চায়ের ট্রে হাতে এসে উপস্থিত হল আমাদের সামনে। সুন্দরী বললেও কম বলা হবে। ঠিক যেন ক্যালেন্ডারের মা দুর্গা। বেশ সচ্ছন্দ চলন ভঙ্গিমা। কোনো জড়তা নেই। এসেই গুরুজনদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। আমার দিকে নমস্কারের ভঙ্গিমা। কলেজে পড়া মেয়ে, বেশ স্মার্ট। মামী গান শুনতে চাইলে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সুন্দর দুখানা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনালো। সব কিছুর মধ্যেই ঘুরে ফিরে ঘরোয়া কথাটার পুনরাবৃত্তি হচ্ছিল। মিনতির মাও এসে বললেন, ‘মেয়ে আমার খুব ঘরোয়া। বাইরে নেচে বেড়ায় না। কলেজ আর বাড়ি এটাই জগৎ ছিল।’

আমি তখনও বুঝতে পারিনি, কলেজ লাইফে দুটো বন্ধু থাকলে বা দুখানা সিনেমা দেখলে দোষটা কী হত?

আমার বাবাও দেখলাম ঘরোয়া কথাটার ওপরেই জোর দিলেন। নামমাত্র গানের প্রশংসা করেই বললেন, ‘আসলে ঘরোয়া মেয়েই আমাদের পছন্দ।’ ওটা যে বিশেষ কোনো গুণ সেটাই তো বোধগম্য হল না। বিএ পাস, সুন্দরী, স্মার্ট, গান জানে এসব গুণগুলো ম্রিয়মাণ করে দিতে সক্ষম ওই ঘরোয়া গুণটা। মিনতির বাবা-মাও ওটাই প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পড়ে লেগে গিয়েছিল যে তাদের মেয়ে ঘরোয়া। আমার বাবা থেকে মামা সকলেই ওই একই কথার চর্চা চালাচ্ছিল, ঘরোয়া বলেই না ছুটে ছুটে আসা।

মিনতিকে আমার পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কারণ ঘরোয়া গুণের কারণেই আমাদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল।

আমি বিয়ের দিন থেকেই বুঝেছিলাম, মিনতি চেষ্টা করছে। আপ্রাণ চেষ্টা, নিজেকে ঘরোয়া প্রমাণ করার চেষ্টা। সেই কারণেই বিয়ের পরের দিন থেকে ওর সেই সচ্ছন্দ হাঁটাচলায় একটা জড়তা এসেছে। নিজেকে ঘরোয়া আর লক্ষ্মী বউ প্রমাণ করার চেষ্টায় গলার স্বরে একটা অদ্ভুত ভয় কাজ করছে যেন। যত আত্মীয়স্বজন, সকলেই বলে যাচ্ছিল, এখনকার দিনে এমন লক্ষ্মীমন্ত ঘরোয়া স্বভাবের মেয়ে পেলে কোথায় গো বিশ্বরূপ কাকু? বাবার হাসি চওড়া হচ্ছিল। গর্ব করে বলছিলেন, ‘তবে? খবরের কাগজের নেশা এতদিনে একটা ভালো কাজ করল আমার। বড়বৌমাটিকে কেমন এনেছি বলো?’

আমি মিনুকে ফুলশয্যার ঘরে একলা পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘মিনতি তুমি যেমন, তেমন থাকো। বদলাতে চেষ্টা করো না।’

মিনতির গলার স্বরে অসহায়তা স্পষ্ট হল। আমার কথায় ভরসা পেয়ে বলল, ‘স্কুলে আমি ছিলাম দামাল মেয়ে। কলেজে বন্ধুদের লিডার। হাতে মাইক নিয়ে বক্তৃতা দিতাম কলেজ ভোটের সময়। মিটিং, মিছিল করে বেরিয়েছি। আমি ঘরোয়া নই একেবারেই। ঘরের চার দেওয়াল আমাকে আকর্ষণ করে না উদয়। বরং নীল আকাশ, গমগম রেলস্টেশন, উত্তাল শহর আমার অনেক আপন। কিন্তু আমার বাবা কাগজে বিজ্ঞাপন লিখল, আমি ঘরোয়া। তোমার বাবাও সেই গুণের জন্যই বিয়েটা দিলেন। বাবাকে মিথ্যে বলার বদনাম থেকে বাঁচাতে নিজেকেই বদলাতে হবে।’

আমি বুঝেছিলাম, যন্ত্রণায় ওর ফর্সা মুখ নীলচে হয়ে যাচ্ছে। মিনতি বলল, ‘আমি এম. এ. তে ভর্তি হলাম। তারপর পড়া হল না, বিয়ের দেখাশোনা শুরু হয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যেই বিয়ে হয়ে গেল।’

মিনতি ঘরোয়া শব্দের মান রাখতে নিজেকে একটু একটু করে রোজ বদলাতে লাগল। হারমোনিয়ামের রিডগুলোতে ধুলোর প্রলেপ জমল। দুই দেওর, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী সকলের দেখাশোনা করতে করতে কবেই যেন ঘরোয়া, বড্ড বেশি ঘরোয়া হয়ে গেল মিনতি। দুই ননদ এলে তাদের যথাসাধ্য যত্ন করা থেকে আত্মীয়দের কাছে লক্ষ্মী বউ হয়ে থাকাতেই এখন আনন্দ পায় মিনতি। নিজের অতীত, স্কুল কলেজের দামাল মেয়েটা ওকে ছেড়ে পালিয়ে গেছে কবেই। মিনতি ধীরে ধীরে ঘোর গৃহিণী হয়ে উঠল। আমাদের দুই সন্তান হল। দুই ছেলে। দুজনের পড়াশোনার প্রয়োজনে আবার মিনতি বই হাতে নিল। গল্পের বইপত্র পড়তে ভালোবাসা মিনু, কত দিন পরে আবার পাঠ্য বই হাতে তুলল।

আমরা দুজনেই সংসারী। দুজনেরই অনেক স্বপ্ন ছিল। সেগুলো সারাদিনের পরিশ্রান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিয়ে দুজনে আলোচনা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তাম। পরের দিন আবার ছুট। স্বপ্নগুলোও ঘুমিয়ে পড়তো শান্ত হয়ে আমাদের চোখের পাতায়। দুই ভাইয়ের বিয়ে দিলাম। দুই ভাইয়ের বউই চাকুরীরতা। ছোট ভাই নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করেছিল। আর মেজভাই বলেই দিয়েছিল, সার্ভিস করা মেয়ে চাই। ঘরোয়া একমাত্র রয়ে গেল মিনতি। দুই জাকেও তাড়াতাড়ি অফিসের ভাত ধরে দিত ও, আমাদের তিন ভাইয়ের সঙ্গে। বাবা গত হলেন। সব কাজ মিনু ওর ওই দুটো হাত দিয়ে খেটে তুলল। আমাদের সংসার কিন্তু যৌথ থাকল। কারণ ভাইয়ের বউরা বুঝে গিয়েছিল, বড়দি ঘরোয়া মানুষ। তাই তার কাছে সন্তানদের দায় চাপিয়ে দিব্য অফিসে যাওয়া যাবে। আমাদের দুই ছেলেও কথায় কথায় ওর মাকে বলতে শুরু করল, ‘সারাটা দিন তো ঘরেই থাকো। জামা-প্যান্টগুলো গুছিয়ে রাখতে পারো না?’

মিনতির বাপের বাড়ি নেই, ঘুরতে যাওয়া নেই, নতুন শাড়ি পরে সাজগোজ নেই, বড্ড কম বয়সে বুড়িয়ে গেল মিনু। সারাদিন চোখে মুখে একটা ভয় ভয় আতঙ্ক। এই বুঝি কেউ ওকে বলল, সারা দিন তো ঘরেই থাকো তাও কিছু করতে পারো না? সারাদিন ত্রস্ত হয়ে মিনু ওর বাবার বিজ্ঞাপনের মিথ্যে কথার দায় নিয়ে চলেছিল।

দুই ছেলের বিয়ে দিলাম আমরা। সবার গোছানো সংসার হল। কিন্তু হঠাৎ মিনু সব ভুলে গেল। ওর নিজের হাতের সাজানো সংসারটাকেও ভুলে গেল। এদিকে আমার কিডনির রোগ ধরা পড়ল। দিন ফুরিয়ে আসছে আমার।

মিনতি যেহেতু আর কাজ করতে পারে না, তাই সংসারে ওর মূল্য কমেছে। ঘরোয়া মিনুর এখন বড্ড বার টান হয়েছে। সে শুধুই বাড়ির পিছনের দীঘিটার পাড়ে গিয়ে বসে থাকে। রান্নাঘরে মোটে ঢুকতে চায় না। শুধু ছাদে গিয়ে আকাশ দেখে, নয়তো চৌমাথায় দাঁড়িয়ে জনস্রোতের শহর দেখে। ঘরে তার মন টেকে না। বাড়ির কাউকে সে বিশ্বাস করে না। খায় শুধু আমার হাতে।

ডাক্তার দেখালাম অনেক। সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, ‘দীর্ঘদিনের চাপা কষ্টের ফল হতে পারে। আবার অ্যালঝাইমার হতে পারে।’ সকলেই বলল, মনের কষ্ট কিছুই ছিল না বড়বৌদির। সবসময় হাসি মুখে কাজ করত। বাড়িসুদ্ধ সকলেই এ কথা মানতে নারাজ যে মিনতি কষ্ট চেপে রেখেছে। বরং সবাই অ্যালঝাইমার রোগটাকেই চেপে ধরল। কিন্তু আমি জানি নিজেকে বদলে ফেলার কষ্ট ঠিক কী!

মুশকিলটা হল, আমি আর বেশিদিন নেই যে পৃথিবীতে। মিনতি যেদিন থেকে ওর ঘরোয়া পোশাকটা ত্যাগ করেছে সেদিন থেকে ওর সংসার ওকেও ত্যাগ করতে চায়। ওকে নিয়ে রোজই অসন্তোষ। তাই ভাবছি ওকে এখানে নিয়ে আসব। কিন্তু প্লিজ ওকে প্রফেশনালি দেখবেন আপনারা। টাকার বিনিময়ে ওর সেবা করবেন। ঘরোয়া পরিবেশে পড়ে আবারও যদি ওর আকাশ দেখার স্বপ্নটা নষ্ট হয়ে যায় তখন?’

শ্রাবণী রুমাল দিয়ে নিজের চোখ দুটো মুছে বলল, ‘আপনি ওনাকে নিয়ে আসুন। দুর্গাপুজোর আগেই আনুন। আমরা এই আবাসনে পুজো করি। সকলে খুব আনন্দ করে।’

উদয় আনমনে বলল, ‘ষষ্ঠীর দিন হাঁড়ি ভর্তি ঘুগনি, অষ্টমীতে লুচি, নবমীতে খাসির মাংস, দশমীতে মাছের পদ রান্না করতে করতে পুজো কেটে যেত মিনতির। সকলে দল বেঁধে ঠাকুর দেখতে গেলেও মিনু রাতের খাবারের জোগাড়ে ব্যস্ত থাকত। এতগুলো পুজো কাটিয়ে দিল ও হেঁসেলেই। আমি হলাম অপদার্থ স্বামী। কিছুই করতে পারলাম না সংসারের বিরুদ্ধে গিয়ে।’

মিনতিকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসার সময় কেউই তেমন আপত্তি করল না। বরং সকলের মুখেই স্বস্তির চিহ্ন দেখল উদয়। ভাগ্যিস মিনু সকলকে ভুলে গেছে। নাহলে বেচারা বড্ড কষ্ট পেত। যাদের জন্য ও ঘরোয়া হল, যাদের জন্য ও নিজের গোটা জীবনটা চার দেওয়ালের মধ্যে কাটিয়ে দিল, ঘর ছাড়ার সময় তারাই কেউ আপত্তি করল না। এমনকি ওদের দুই সন্তানও নয়। তারাও নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তবে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল। আগে যতবার উদয় মিনতিকে সিনেমা নিয়ে যেতে চেয়েছে বা বেড়াতে যেতে বলেছে ততবারই মিনতি সংকুচিত হয়ে বলেছে, ‘বাবা-মা সন্ধেতে চা পাবে না তো। অথবা রাতের রান্না করতে হবে যে।’

এই প্রথম উদয় যখন বলল, ‘মিনু আমরা ঘুরতে যাবো। একটা ফুলঘেরা বাগানে। বাড়িটির নাম মায়ার বাঁধন।’ মিনতি আলমারি খুলে হাসি মুখে বলল, ‘কোন শাড়িটা পরে যাই বলো দেখি!’ আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে উদয় দেখল যত্নে ভাঁজ করা কত শাড়ি একবারও পরা হয়নি মিনুর। কত অল্পবয়সী রং সময় হারিয়েছে। তবুও একটা আকাশি রঙের তাঁতের শাড়ি বের করে উদয় বলল, এটা পরে নাও। নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মিনু চুপটি করে।’

উদয় একটা গাড়ি করে নিজেদের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস তুলে মিনুকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে। বৃদ্ধাশ্রমটার সবই ভালো শুধু ওই মায়ার বাঁধন নামটা আর ঘরোয়া পরিবেশেই আপত্তি উদয়ের। নিজের জন্ম ভিটে, সাজানো সংসার ছেড়ে আর কোনো মায়ার বাঁধনে জড়াতে চায় না উদয় মিনুকে। শেষ বয়েসটুকু ও বাঁচুক প্রাণ খুলে। আর যেন ঘরোয়া হওয়ায় প্রতিযোগিতায় শামিল না হতে হয় ওকে।

মায়ার বাঁধনে একটা সুন্দর সাজানো ঘরে ওদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন শ্রাবণী। মিনতিকে প্রথম দিনেই দায়িত্ব দিয়েছেন শ্রাবণী। ‘আজ থেকে বাগানের দায়িত্ব আপনার। দুটো মালি আছে, আপনি তাদের অর্ডার করবেন শুধু। নির্দেশ দেবেন কী কী করতে হবে।’ উদয় মনে মনে হাসছিল। অর্ডার করবে মিনতি? সে অভ্যেস আছে ওর? অন্যের নির্দেশ পালন করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে মিনু। সর্বদা ভীত সংকুচিত হয়ে সকলের মন জোগানোর বৃথা চেষ্টা করে গেল গোটা জীবনটা। আটষট্টি বছর বয়সে এসে আচমকা এমন দায়িত্ব পেলে কী আর পারবে? আগামীকাল উদয় হয়তো দেখবে মিনু নিজেই মালিদের সরিয়ে দিয়ে বাগানের ঘাস তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ভোরে অ্যালার্ম দিয়ে বিছানা ছাড়া মিনতির দীর্ঘদিনের অভ্যেস। এখন আর অ্যালার্ম লাগে না। মাথাতেই ঘড়িটা ফিট করে রেখেছে মিনু। ঘুম ভেঙে দেখল, মিনতি বিছানায় নেই। ঘুম চোখেই বাইরে বেরিয়ে এসে উদয় দেখল, একটা লাল ফাইবারের চেয়ারে বসে আছে মিনু। হাতে চায়ের কাপ। বাগানের দুজন মালিকে শেখাচ্ছে গোলাপ গাছের গোড়ায় কোন সার দিতে হয়। নতুন মিনতিকে দেখে আবারও বাঁচতে ইচ্ছে করছে উদয়ের। উদয় পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই কিশোরীর গলায় মিনতি বলে উঠল, ‘আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি মনে হচ্ছে।’

উদয় হেসে বলল, ‘আপনাকেও খুব চেনা লাগছে। বিনোদবিহারী কলেজের মিটিংয়ে বক্তৃতা রাখছিলেন মনে হচ্ছে।’ মিনতি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ ঠিকই। আপনার কোন ইয়ার?’

উদয়ের দুটো চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ভুলে যাক মিনতি ওর জীবনের বঞ্চনার কথা, ঘরোয়া হবার কথা, ওদের প্রেমটা বরং শুরু হোক সম্পূর্ণ অচেনা হিসাবে। আরও কিছুদিন বাঁচতে চায় উদয়। আরও কিছুদিন ভালোবাসতে চায় মিনুকে। ঢাকিরা পুজোর মহড়ায় মেতেছে। কাছেই ঢাকের আওয়াজ। মিনতি বলল, ‘ওই যে দক্ষিণের শিউলি গাছের নীচে কত শিউলি পড়েছে দেখেছেন? ছোটবেলায় ফ্রকের কোচলে শিউলি কুড়িয়ে আনতাম।’ উদয় নিজের হাতটা মিনতির দিকে বাড়িয়ে বলল, ‘শাড়ির আঁচলে কুড়াই চলো।’

মিনতির মুখে অষ্টাদশীর লজ্জা। সংকোচে উদয়ের হাতটা ধরে বলল, ‘চলুন।’

শিউলি গাছের নীচে ওরা ফুল কুড়োচ্ছিল। মিনতির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে গিয়ে ধরা পড়েছে উদয়। এ যেন ওর এত বছরের ঘর করা স্ত্রী নয়, এ যেন ওর দুই সন্তানের মা নয়, এ যেন চক্রবর্তী বাড়ির ঘরোয়া বড়বউ নয়, এ মিনতি শুধুই উদয়ের প্রেমিকা। যে গুনগুন করে গান গাইছে, ফুল কুড়াচ্ছে, আনন্দে হাসছে। মাঝে মাঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে উদয়কে। ফিসফিস করে উদয় বলল, ‘ক্ষমা করো মিনতি, আমায় ক্ষমা করো।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *