‘হ্যালো আপনি রক্তিমা সান্যাল বলছেন? সল্টলেক তো?
আপনি গায়িকা রক্তিমা সান্যাল তো?’
রক্তিমা ঘুমের ঘোরেই বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ইয়েস। কে আপনি?’ মোবাইলের স্ক্রিনের ওপরেই ডিজিটাল নম্বরে দেখা যাচ্ছে রাত দুটো বাজে। এই সময় এসব রসিকতার মানে কী? ওদিকের ভদ্রলোক বললেন, ‘ম্যাডাম আমি ডক্টর সাত্যকী রায় বলছি। আপনার হাজব্যান্ড গুরুতর অসুস্থ হয়ে আমাদের নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছেন। অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। উনিই আপনার ফোন নম্বর দিলেন। ওনার সেন্স চলে যাচ্ছে।’
চমকে উঠে পড়েছে রক্তিমা।
শুভ্রর অ্যাক্সিডেন্ট? কখন কীভাবে হল? শুভ্র তো নিজে ড্রাইভ করে না ওর প্যানিক অ্যাটাকের পর থেকেই, তবে কি লক্ষণ চালাতে গিয়েই… ঘুম ভাঙা চোখ আর মস্তিস্ক দুটোই বড় অকেজো হয়ে আছে রক্তিমার। পার্ক উড নার্সিংহোমে ভর্তি আছে শুভ্র। রক্তিমাকে যেতে হবে কিন্তু চোখ দু’টো যেন কিছুতেই খুলতে চায় না। এক রাশ ক্লান্তি এসে জমা হয়েছে রক্তিমার চোখে। পর পর দিন পাঁচেক গানের শো ছিল রক্তিমার। সেই ক্লান্তি এখনও জমে আছে শরীরে। তাই হয়ত এমন একটা খবর পাওয়ার পরও ও উঠতে পারছে না। এই মুহূর্তে ঠিক কাকে ফোন করা উচিত? রক্তিমার আত্মীয়দের নাকি শুভ্রর কলিগদের? মাথা কাজ করছে না রক্তিমার। দুশ্চিন্তার মধ্যেই রেডি হয়ে গ্যারেজ থেকে নিজের গাড়িটা বের করল রক্তিমা। এই প্রথম স্টিয়ারিংয়ে হাত দিতে হাতটা কেঁপে উঠল ওর।
সম্ভবত শুভ্রর দুর্ঘটনার কথাটা শোনার পর থেকেই ভিতরে একটা অজানা ভয় কাজ করছে।
ডক্টরের বলা অ্যাড্রেস অনুযায়ী যাচ্ছে রক্তিমা। হঠাৎই ওর কানে বাজল আপনার হাজব্যান্ডের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। শুভ্র আর রক্তিমার এনগেজমেন্ট হয়ে গেলেও বিয়েটা তো এখনও হয়নি। শুভ্র হঠাৎ ওকে ওয়াইফ বলে পরিচয় দিল কেন? ও তো সাধারণত উড বি বলেই পরিচয় করায় ওকে। হয়ত ডক্টর ধরে নিয়েছে ওটাই।
শুভ্রর বাবা-মা দুজনেই চেন্নাইয়ে থাকে। এত রাতে ওঁদের না জানানোই ভাল। ওর মা আবার হাইপার টেনশনের পেশেন্ট বলে শুভ্র কোনো কিছুই জানায় না ওদের। ওদের এনগেজমেন্টের দিনও ওঁরা উপস্থিত ছিলেন না। তখন শুভ্রর মায়ের হঠাৎ করেই বেশ শরীর খারাপ করেছিল। রক্তিমার আত্মীয় স্বজনরা অবশ্য সকলেই বিরক্ত হয়েছিল শুভ্রর পরিবারের এমন আচরণে। কিন্তু কেউই সামনে কিছু বলতে পারেনি। কারণ শুভ্রর একার আন্তরিকতা সব কমতিকে ঢেকে দিচ্ছিল। আমন্ত্রিতরা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেছিল শুভ্রর মত ছেলে হয় না। শুভ্রর সঙ্গে রক্তিমার পরিচয়টা যে দীর্ঘবছরের এমন নয়, এই গানের জগতে এসেই ওর সঙ্গে পরিচয়। বছর দেড়েক হবে। রক্তিমার কেরিয়ারটা তখন টালমাটাল অবস্থা থেকে একটু স্থিরতার দিকে এগিয়েছে তখনই আলাপ হয়েছিল শুভ্রর সঙ্গে একটা মিউজিক লঞ্চ পার্টিতে। ধীর স্থির ছেলেটি নিজেই এগিয়ে এসে বলছিল, ‘ম্যাজিক্যাল ভয়েসের অধিকারিণী আপনি। আপনার স্বপ্নিল রাতের প্রতিটি গান আমার অন্তত বার পাঁচেক করে শোনা।
৭৪৫৬.করুন করুন, নম্বরটা প্রেস করুন’
শুভ্রর বলা নম্বরটা নিজের ফোনে প্রেস করতেই ও ইশারায় কানে শোনার ইঙ্গিত করেছিল।
‘স্বপ্নিল রাত
জোছনার ডাক
অপেক্ষায় কাটছে সময়’
লাজুক হেসেছিল রক্তিমা। ওর গাওয়া গান শুভ্রর রিংটোন।
শুভ্র সেদিন আর বেশি কথা বলেনি, যাওয়ার সময় বলেছিল, ‘আশাকরি খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে আমাদের।’
হ্যাঁ, দেখা হয়েছিল ওদের। শুভ্র তখন কোনো একটা বড় দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। ওখানের একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ওরা। রক্তিমাকে অনেকেই বলেছিল, যখন বাজার পড়তির দিকে তখন এসব স্টেজ শো করবি, এখন শুধু মুভিতে গাইবি আর নিজস্ব অ্যালবাম তৈরি করবি ব্যস। কিন্তু ফোনটা এসেছিল বর্ষাকালে। উপুরচুপুর বৃষ্টি পড়েও আকাশ সেদিন কোনোভাবেই ক্লান্ত হচ্ছিল না। বাচ্চা মেয়ের কান্নার মতই একটানা কেঁদে চলেছিল যেন।
ফোনটা রিসিভ করতেই শুভ্র ভরাট গলায় বলেছিল, ‘হয়ত আপনার আমায় মনে নেই, সেটাই স্বাভাবিক। ধ্রুবতারার কীসের দায় নাবিককে মনে রাখার? বরং নাবিক ধ্রুবতারাকে অস্বীকার করলে পথভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা প্রবল।’
ওর কথা শুনে একটু থমকে রক্তিমা বলেছিল, ‘কে বলুন তো আপনি?’
একটু দম নিয়ে শুভ্র বলেছিল, ‘ওই যে আপনার অগনতি ভক্তর মাঝে মিশে যাওয়া একজন, যার ফোনের রিংটোন থেকে বাড়ির কলিংবেলে আপনি আছেন।’ আর চিনতে অসুবিধা হয়নি রক্তিমার।
শুভ্র চৌধুরীকে এত সহজে ভুলে যাবে রক্তিমা, এতটা সাধারণে মিশে যাওয়া চেহারা নয় শুভ্রর। বরং ওর কথা বলার স্টাইল, আলগা মেশার ধরণ, ভিড়ের মাঝে ওকে পৃথক করতে সাহায্য করে। শুভ্র যেন মনে করার সুযোগ দিয়েছিল রক্তিমাকে কয়েকটা সেকেন্ড নিঃস্তব্ধ থেকে। রক্তিমার উত্তর পাবার আগেই নিজে বলেছিল, ‘ম্যাডাম আমায় বাঁচান। সেদিন ওই মিউজিক লঞ্চের পার্টি থেকে ফেরার পরে কলার তোলার নেশাটা পেয়ে বসেছিল। মানে মিস রক্তিমা সান্যালকে আমি চিনি, উনি আমার সঙ্গে গল্প করেছেন বলার পরে পুজো কমিটি আমায় চেপে ধরেছে। বলছে ওনাকে একবার আধঘণ্টার জন্যও যদি স্টেজে তোলা সম্ভব হয় তাহলে জাগৃতি সংঘের মান বেড়ে যাবে। বুঝতে পারছেন কলার তোলার বিপদ। ক্লাব এখন আমার হাতে আপনার ওইদিন সন্ধ্যার পারিশ্রমিক আর উপহার দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। ম্যাডাম উদ্ধার করুন প্লিজ। এই বয়েসে ঢপবাজ খেতাব পাওয়া বড় অসম্মানের।’
রক্তিমা স্বভাববহির্ভূত ভঙ্গিমায় হেসে উঠেছিল শুভ্রর বলার ধরনে। শান্ত গলায় বলেছিল, ‘বেশ আসুন। আমার অ্যাড্রেসটা লিখে নিন।’
শুভ্র বলেছিল, ‘কী যে বলেন ম্যাডাম? আমি যদি এতদিনে এইটুকু হোমওয়ার্ক না করি তাহলে ফ্যান বলার যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগবে যে।
আমি আপনার ফ্ল্যাটের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সিকিওরিটিকে এক প্যাকেট সিগারেট দিলাম, টাকাও দিতে চাইলাম, কিন্তু আপনি পারমিশন না দিলে ইনি এন্ট্রি করতে দেবেন না বলে দিলেন। বুঝলাম,মহাভারতের যুগের যুধিষ্ঠির কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। রক্তিমা কানে ফোনটা নিয়েই ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল, দেখেছিল শুভ্র বেশ দামি একটা গাড়ি পার্ক করাচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসছে ওর ফ্ল্যাটের দিকে। শুভ্রর লি� পাঁচতলায় আসতে যতটুকু সময় নেয় তারমধ্যেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দ্রুত হাতে একটু গুছিয়ে নিয়েছিল ও।’
দরজা খুলতেই শুভ্র নমস্কারের ভঙ্গিমায় বলেছিল, ‘আমার সাহসকে আশা করি আপনি প্রশ্রয় না দিলেও ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখেছেন।’
শুভ্রর কথা বলার ভঙ্গিমাটা বেশ ইউনিক। ফ্ল্যাটারির গোত্রে ফেলা যায়না। শুভ্রকে সোফায় বসতে বলে চা দিতে বলল রক্তিমা। শুভ্র হেসে বলেছিল, ‘ম্যাডাম এবারে কিন্তু আপনিই সাহস জোগালেন। আমি সর্বত্র গিয়ে বলতে পারব রক্তিমা সান্যাল আমায় চা খাইয়ে তবে ছেড়েছেন।’ রক্তিমা সামনের সোফায় বসে টুকিটাকি গল্প করতে করতেই শুনেছিল, শুভ্র এতদিন ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করত। রিসেন্ট কলকাতায় একটা মিউজিক কোম্পানিতে ইনভেস্ট করেছে। ওর মা এককালে রেডিওতে গাইতেন। সেই থেকেই গানের প্রতি নেশা। তবে গলায় ভগবান সুর দেননি বলে গানটা ওই বাথরুমেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। রক্তিমার সঙ্গে একটা কাজ করতে ইচ্ছুক শুভ্র। কিন্তু ওর কোম্পানি এখনও বেশ নতুন তাই সাহস করে প্রপোজাল দিয়ে উঠতে পারেনি। শুভ্র ওদের ক্লাব থেকে পাঠানো চেক আর মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলে রেখে ইতস্তত করে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘ম্যাডাম আজ তাহলে চলি।’ রক্তিমা প্রতিনমস্কার জানিয়েছিল।
শুভ্র বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার বেজে উঠেছিল রক্তিমার ফ্ল্যাটের বেল। দরজা খুলতেই সিকিউরিটি হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম ওই যে স্যার এসেছিলেন উনি আপনাকে এটা দিতে ভুলে গেছেন।’
রক্তিমার একটু অবাক লেগেছিল। ক্লাব থেকে পাঠানো মোটা অ্যামাউন্টের চেকটা অলরেডি দেখে নিয়েছিল রক্তিমা। সত্যি বলতে কী এতটা ও আশা করেনি। ও এমন কিছু প্রতিষ্ঠিত গায়িকা নয়। সদ্য উঠছেই বলা চলে। তাকে যে মাত্র ঘন্টাখানেক গাওয়ার জন্য এত টাকা দেওয়া হবে এটা যেন কল্পনার বাইরে। আরও কী দিতে চায় শুভ্র? প্যাকেটটা খুলে একটু চমকে উঠেছিল রক্তিমা। একটা বেশ দামি গাউন। শ্যাম্পেন কালারের এমন গাউন ও একজন নামী অভিনেত্রীকে পরতে দেখেছিল। গাউনটা খুলতেই ছোট্ট একটা চিরকুট মেঝেতে পড়েছিল। চিরকুটে লেখা, ‘সাহসকে মার্জনা করবেন। কিন্তু এটা সেদিন দেখে কেন জানি না মনে হয়েছিল, শুধু আপনার জন্যই একে যত্ন করে বানিয়েছে এর সৃষ্টিকর্তা। যদিদুঃসাহস মনে হয় তাহলে ফেরত পাঠাবেন। যদি অন্ধভক্তের শ্রদ্ধা ভাবতে পারেন, তাহলে হয়ত এটা আপনার অঙ্গে শোভা পাবে।’
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ে গাউনটা ফেলেই বুঝেছিল রক্তিমা, এটা কোন দোকান থেকে কেনা নয়, রীতিমত অর্ডার দিয়ে তৈরি করানো। সেটা আর লজ্জায় বলতে পারেনি শুভ্র। আচমকাই একটা ভাললাগা বাতাস আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছিল ওকে। হাঁসফাঁস করলেও খুব যে জোর করে বেরোতে চেয়েছিল ও সেটাও হয়ত নয়। তাই ধীরে ধীরে শুভ্র ওর ফ্যান থেকে বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। কে জানে কেন কারণে-অকারণে শুভ্রর সঙ্গে ওর দেখা হয়ে যাচ্ছিল আচমকাই। দুজনেই নরম হেসে বলত, ‘আবার দেখা।’ শুভ্র বলত, ‘হঠাৎ দেখা ষ্টুডিওর গেটে।’
শুভ্রর মিউজিক কোম্পানি ‘সপ্তসুরের’ ফার্স্ট মিউজিক লঞ্চ ডেটে রক্তিমার হাতে রিমোটটা তুলে দিয়ে শুভ্র বলেছিল, ‘তুমি শুভ সূচনা করো।’ এইভাবেই একটু একটু করে ওরা একে অপরের কাছের হয়ে গিয়েছিল। রক্তিমা বুঝতে পেরেছিল, শুভ্রর মত ভালো ওকে আর হয়ত কেউই বাসবে না। এতটা সম্মান ও হয়ত আর কারোর কাছ থেকেই পাবে না। চব্বিশঘন্টা কেজো কথা আর স্বার্থসন্ধানীদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে যখন বেশ ক্লান্ত হয়ে যেত রক্তিমা তখন শুভ্রই ওর জন্য নিয়ে আসতো মন ভাল করার চাবিকাঠি। কখনও শালপাতায় মোড়া চাঁপাফুল, কখনও দুটো জুঁইয়ের মালা। টেবিলে নামিয়ে বলত, ‘আচ্ছা রক্তিমা তোমার মনে হয় না এরা তোমার গান শুনতে এল। এদের সম্মান রক্ষার্থে একটা খালি গলায় হালকা মুডে হয়ে যাক।’ শুধু রক্তিমা নয় শুভ্রও হয়ত বুঝেছিল, ভালোবাসা এভাবেই হয় আচম্বিতে। লম্ফঝম্প না করে কখন যেন ধীরে ধীরে মনের সিংহাসনে সায়ী জায়গা করে নেয়। তখন আর মস্তিষ্কের বিশেষ কিছুই করার থাকে না। রক্তিমার সব এ্যালবাম রিলিজ হয় এখন সপ্তসুর থেকেই। রিসেন্ট ওদের এনগেজমেন্টও হয়ে গেল বেশ ধুমধাম করে। গানের জগতের শুধু নয় অভিনয় জগতেরও বহু সেলিব্রিটি উপস্থিত ছিল ওদের এনগেজমেন্ট পার্টিতে। শুভ্র নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে, ওরা সাজাচ্ছে মনের মতো করে।
ম্যাডাম, পার্কিং ওদিকে। নার্সিংহোমের গেটে দাঁড়িয়ে সিকিউরিটি নির্দেশ দিল গাড়ি পার্কিংয়ের। যন্ত্রচালিতের মত গাড়ি থেকে নেমে রিসেপশনে ঢুকেই বলল, ‘ডক্টর সাত্যকী রায়কে কোথায় পাব? প্লিজ হেল্প মি।’ একজন মহিলা জানালেন, ‘একটু ওয়েট করতে হবে ম্যাম। স্যার রাউন্ড সেরে সবেমাত্র গেছেন, এখুনি আসবেন।’ রক্তিমা ধপ করে বসে পড়ল একটা চেয়ারে। কোন রুমে ভর্তি আছে শুভ্র? একবার যদি ওকে দেখা যেত। ঠিক সেই সময়েই রক্তিমার ফোনটা বেজে উঠল। ‘মিস রক্তিমা সান্যাল? আপনার হাজব্যান্ডকে ওটিতে নিয়ে যেতে হবে। আপনি কী আসছেন?’
রক্তিমা জানাল সে নার্সিংহোমেই আছে।
একজন ইয়ং ডক্টর আর নার্স ওর দিকেই এগিয়ে এসে বলল, ‘রক্তিমা সান্যাল?
প্লিজ সাইন করুন। ওনার একটা অপারেশন করতে হবে।’ রক্তিমার মাথাটা ঘুরছে। কী করে হল এসব! কথা বলার শক্তিটাও যেন হারিয়ে গেছে। ডক্টরের নির্দেশ মত সাইন করে দিয়ে বলল, ‘ডক্টর, খুব সিরিয়াস কিছু কী?’
ডক্টর ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘মাথার বাঁ পাশে ব্লাড ক্লট বাঁধছে। ওটাই অপারেট করতে হবে।
আপনি রিসেপশনে গিয়ে ফরম্যালিটিসগুলো ফিলআপ করুন।’ রক্তিমা যন্ত্রচালিতের মত সবকিছু করে যাচ্ছিল। ওরা যেখানে যা টাকা পেমেন্ট করতে বলছিল সেটাই করছিল, যেখানে সাইন করতে বলছিল সেখানেই করছিল। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে নার্স এসে জানালেন, শুভ্র আউট অফ ডেঞ্জার। আইসিইউতে রয়েছে শুভ্র। আরও ঘন্টাখানেক পরে রক্তিমাকে দেখতে দেবে জানাল। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে দেখল সাড়ে চারটে মত বাজে। এখনও সকাল হতে বেশ দেরি। ছটা নাগাদ ফোন করবে বাড়িতে। শুভ্রর বাড়িতে জানানো কি ঠিক হবে? থাক বরং। আগে বাবাকে কল করে আসতে বলবে রক্তিমা। শুভ্রর বাড়িতে এখনই জানাবে কিনা বাবার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করে নেবে।
মুহূর্তগুলো যেন কাটতে চাইছে না। অপেক্ষার মুহূর্তরা সত্যিই বড় দীর্ঘ হয়। আসলে শুভ্রর জন্য রক্তিমাকে কখনও এতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। শুভ্র অপেক্ষা করতে দেয়নি একমুহূর্তও। ও বলে, ‘আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব রক্তিমা, এতেই আমার আনন্দ।’ ষ্টুডিও থেকে বেরিয়েই দেখতে পেত শুভ্রর গাড়ি। আজ হয়ত শুভ্র সেই সব একতরফা অপেক্ষার শোধ তুলছে রক্তিমার ওপরে এভাবেই। অস্থির হয়ে মুহূর্ত গুণতে বাধ্য করছে রক্তিমাকে। নার্সের ডাকে চমক ভাঙল ওর। ওকে ইশারায় ডাকছে। অবশ পা দুটো হঠাৎই যেন প্রাণ পেল ওর। যাক এতক্ষণে ও শুভ্রকে একবার অন্তত দেখতে পাবে। পোশাক পরিয়ে দিল ওকে, আইসিইউ-তে নিয়ে যাচ্ছে।
শুভ্র হয়ত এখনও ওষুধের ঘোরে ঘুমিয়ে আছে। ও জানতেই পারল না ওর রক্তিমা সারাটা রাত নার্সিংহোমের কড়িডোরে বসে ছিল শুধু ওকে একবার দেখবে বলে।
আইসিইউ রুমে ঢুকেই চমকে উঠল রক্তিমা। ‘এটা কে? এ তো শুভ্র নয়? দিব্যজ্যোতি এখানে কী করছে?’
রক্তিমা ডক্টর সাত্যকিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘শুভ্র কোথায় ডক্টর? আপনি যে বললেন শুভ্র অসুস্থ হয়েছে?’
ডক্টর একটু অবাক হয়েই বললেন, ‘হ্যাঁ ম্যাম ইনিই তো আপনার হাজব্যান্ড। দিব্যজ্যোতি। আসলে উনি আজ বাইক দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। ওনার এক ফ্রেন্ড এসে ওনাকে এখানে এডমিট করেন। তখন ওনার সেন্স ছিল। উনিই আপনাকে জানাতে বললেন, আপনার কন্ট্যাক্ট নম্বর দিয়ে বললেন, ওনার ওয়াইফকে জানিয়ে দিতে। আমরা ওনার কথা মতই আপনাকে কন্ট্যাক্ট করি। এখন আপনি যদি বলেন ইনি আপনার হাজব্যান্ড নন সেটা কীভাবে হয় ম্যাডাম?’ রক্তিমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে দিব্যকে দেখে। কেন এতদিন পরে দিব্য নার্সিংহোমে ওর ফোন নম্বর দিয়ে ওকে স্ত্রীর পরিচয় দিল? কী উদ্দেশ্য দিব্যর? সাত্যকি রায় অল্প হেসে বললেন, ‘ম্যাডাম এখন অভিমানের সময় নয়। জানি আপনার হাজব্যান্ড জোরে বাইক চালাচ্ছিলন বলে হয়ত আপনি রাগ করেছেন। একটু শান্ত হন ম্যাডাম। উনি এখন আউট অফ ডেঞ্জার। আর দু’ঘণ্টার মধ্যে আপনার সঙ্গে কথাও বলতে পারবেন।
একটু ওয়েট করুন বাইরে। নার্স আপনাকে ডেকে নেবেন। ডক্টর আর দাঁড়ালেন না। রোগীর সঙ্গে উনিও লড়েছেন সারারাত। তাই এখন বিশ্রামের সময়।
হতবাক হয়ে যাচ্ছে রক্তিমা। দিব্য ওকে কেন স্ত্রী বলে পরিচয় দিল এটাই মাথায় ঢুকছে না।
আইসিইউ থেকে বেরিয়ে শুভ্রকে কল করবে বলেই নার্সিংহোমের বাইরে বেরোল রক্তিমা। শুভ্রকে বললে তো দিব্যর সঙ্গে ওর কীভাবে পরিচয় তার আপডেটও দিতে হবে। এখন থাক। দিব্যর জ্ঞান ফিরলে আগে জানতে হবে ও কেন এমন করল।
ভাবনার মধ্যেই আচমকা একটা বুম ধরে একজন রিপোর্টার জিজ্ঞাসা করল, ‘ম্যাডাম শুনলাম আপনার হাজব্যান্ড নাকি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে কাল মধ্যরাতে। এখন কেমন আছেন উনি?’
রক্তিমা দিশাহারা গলায় বলল, ‘আপনারা এখানে? নার্সিংহোমে মিডিয়াদের খবর দিল কে?’
কথা বলতে বলতেই আরেকটা চ্যানেল এসে বলল, ‘ম্যাডাম আমরা অনেকক্ষণ ধরে ওয়েট করছি। আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত গায়িকা, বলতে গেলে সেলিব্রিটি। তবুও আপনি আপনজনের জন্য রাত্রি জাগছেন উৎকণ্ঠার সঙ্গে। কোথাও গিয়ে কি মধ্যবিত্ত মানসিকতা কাজ করছে?
এখন উনি কেমন আছেন ম্যাডাম?’
ভিড় বাড়ছে নার্সিংহোমের গেটের বাইরে। রক্তিমা দায়সারা বলল, ‘হ্যাঁ, এখন উনি ভাল আছেন। আউট অফ ডেঞ্জার। প্লিজ আপনারা এখন আসুন।’
তারপরেও ভেসে আসছিল প্রশ্ন। ‘এনগেজমেন্ট হয়েছিল সেটা আপনারাই জানিয়েছিলেন, বিয়ের খবর মিডিয়ার কাছে গোপন রাখার কি আলাদা কোন উদ্দেশ্য ছিল?’
‘আচ্ছা আপনি তো আপনার হাজবেন্ডের মিউজিক কোম্পানি সপ্তসুরের এম ডি এখন। এটাই কি বিয়ের উপহার ছিল?’
রক্তিমা এখনও বুঝতে পারছে না দিব্য কেন ওকে ওয়াইফ বলে পরিচয় দিল এই নার্সিংহোমে। এই মিডিয়াদেরই বা কে খবর দিল? সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
শুভ্রর ফোন ঢুকছে রক্তিমার ফোনে। ফোনটা রিসিভ করতেই শুভ্র বলল, ‘এভাবে আমায় অপমান করতে তোমার একটুও বাঁধল না রক্তিমা?’
টিভিতে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার বললে, ‘ও এখন আউট অফ ডেঞ্জার? তুমি ডিভোর্সি হলেও তো আমার কোনো সমস্যা হত না রক্তিমা। কিন্তু এভাবে মিথ্যে বললে আমায়? একটার পর একটা কল আসছে, জিজ্ঞাসা করছে আমি কি ড্রাঙ্ক ছিলাম? কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল? পাবলিক ভাবছে আমি তোমার হাজব্যান্ড, আমি অসুস্থ।’
রক্তিমা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘এটা একটা ট্র্যাপ শুভ্র। প্লিজ বিলিভ মি। আমি চিনি না দিব্যজ্যোতিকে।’
শুভ্র হেসে বলল, ‘কেন মিথ্যে বলছ রক্তিমা? দিব্য আর তুমি একই মঞ্চে গান গাইছো তার ছবিও ভাইরাল হয়েছে। আই কান্ট বিলিভ দিস রক্তিমা।
তুমি এভাবে আমাকে’
শুভ্র কান্না ভেজা গলায় ফোনটা কেটে দিল।
রক্তিমা নার্সিংহোমের একটা বেঞ্চে বসে পড়ল ধপ করে। ‘এ কী হল? এভাবে সব গোছানো জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে নাকি রক্তিমার?’
বাবাও ফোনে একই টোনে কথা বলল, ‘এটা কে রক্তিমা? তুই সারারাত একজন অপরিচিত মানুষের জন্য নার্সিংহোমে বসে ছিলিস কেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আর মিডিয়া চ্যানেলগুলো একে নিয়ে তোর বাইট পোস্ট করছে। তুই বলেছিস, ও এখন আউট অফ ডেঞ্জার, কিন্তু কেন?
শুভ্র বলছে ও এ বিষয়ে কিছুই জানে না। এসব কী হচ্ছে রক্তিমা?’ বাবার গলায় উদ্বেগের সুর। পাশ থেকে মায়ের গলাও শোনা যাচ্ছে, ‘কবে আর আমাদের শান্তি দিয়েছে ও?’
দিব্যর জ্ঞান ফিরেছে। ধীর পায়ে এসে রক্তিমা দাঁড়াল দিব্যর বেডের পাশে। শান্ত স্বরে বলল, ‘এসবের মানে?’
দিব্য ক্লান্ত স্বরে বলল, ‘সেদিন আমিও ঠিক এভাবেই জানতে চেয়েছিলাম, এসবের মানে? তুমি বলেছিলে, জীবনে জিততে গেলে নাকি কিছু ঘাসকে মাড়িয়ে যেতে হয়। সেদিন আমি তোমার সেই ঘাস ছিলাম। আজ আমি জিততে চাই রক্তিমা। সর্বস্ব হারিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে চাই। তুমিও নিজেকে ঘাস মনে করতেই পারো।’
রক্তিমা বুঝতে পারছিল দিব্য প্রায় তিনবছর পরে এসেছে হিসেব বুঝে নিতে। কিন্তু সামনে কোন সমতল রাস্তা দেখতে পারছিল না ও। সামনেই একটা বিশাল খাদ। রক্তিমা শান্ত গলায় বলল, ‘দিব্য তুমি কী চাও? টাকা? কত টাকা চাও বল? এখানে তোমার ট্রিটমেন্টের সব টাকা আমি মিটিয়ে দিয়েছি। বল কী চাও?’
দিব্য কষ্ট করে হেসে বলল, ‘শুভেচ্ছাকে ফেরত চাই। এনে দাও। তোমার জীবন তোমায় ফেরত দিয়ে দেব।’
রক্তিমা একটু ভেবে বলল, ‘সেটা যে সম্ভব নয় তুমি জানো।’ দিব্য বলল, ‘তাহলে আমার পক্ষেও আর কিছু সম্ভব নয়। আমার নির্দেশ মতই চলবে এ খেলাটা।
বাই দ্য ওয়ে, আমায় কবে রিলিজ করবে একটু খোঁজ নিও প্লিজ। আমার আর ভালো লাগছে না তোমায় ছাড়া। প্লিজ বাড়ি নিয়ে চলো।’
রক্তিমা কিছু বলার আগেই দেখল, ডক্টর ঢুকলেন। হেসে বললেন, ‘অবজারভেশনে রাখব তিনদিন। তারপর ছুটি।
আরে আপনি সেলিব্রিটি হওয়ায় মিডিয়ার অত্যাচার বেড়েই চলেছে।’
রক্তিমা নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে এল। চুপচাপ নিজের গাড়ি নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকল। বিধ্বস্ত লাগছে ওর। এমন একটা ঝড় যে আর ওর জীবনে আসতে পারে কল্পনাও করতে পারেনি ও। ও নিশ্চিন্ত ছিল যে গাছগুলো ঝড়কে বয়ে আনবে তাদের ও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। ভাবতেও পারেনি ওদের মধ্যে একটা গাছের তখনও প্রাণ ছিল।
শুভ্রকে বার চারেক কল করার পরেও রিসিভ করল না ও। বেশ বুঝতে পারছে রক্তিমা ভাঙনের শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এ ভাঙনকে আটকাতে হবে ওকে।
স্নান সেরে, এত বেলায় ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে গেল সপ্তসুরের উদ্দেশ্যে।
ধাক্কাটা খেল সপ্তসুরের গেটে। যে চেনা সিকিউরিটি ওকে রোজ সেলাম ঠোকে সে বিনীতভাবে বলল, ‘ম্যাডাম, শুভ্রস্যার আপনাকে অফিসে যেতে বারণ করেছে। অর্ডার আছে আপনাকে যেন ভিতরে না ঢুকতে দেওয়া হয়।’ সপ্তসুরের সমস্ত স্টাফ ঢুকে যাচ্ছে ওর পাশ দিয়ে নিজেদের আইডেন্টিটি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে। আর ও দাঁড়িয়ে সিকিওরিটিকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, আজকে বেশ কটা রেকর্ডিং-এর কাজ আছে। সিঙ্গাররা আসবেন। আমার থাকাটা অত্যন্ত জরুরী। সিকিওরিটি মাথা নীচু করে বলল, ‘আমায় ক্ষমা করবেন ম্যাডাম। স্যারের হুকুম আছে।’
গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা চলল রক্তিমা শুভ্রর গল্ফগ্রিনের ফ্ল্যাটে। গতকাল রাত থেকে যা যা হয়েছে সব বলতে হবে ওকে।
শুভ্র ফ্ল্যাটে একাই বসেছিল। বেল বাজাতে ওর মেড এসে দরজা খুলল। শুভ্রর সামনে বিরাট স্ক্রিনের টিভিটা চলছে। শুভ্রর সামনে সেন্টার টেবিলে একটা অ্যাশট্রে। সেখানে বেশ কিছু সিগারেটের ধ্বংসাবশেষ। হাতে রিমোট নিয়ে নিউজ চ্যানেলগুলো চেঞ্জ করে চলেছে ক্রমাগত।
রক্তিমা গিয়ে ওর পাশে বসে বলল, ‘প্লিজ শুভ্র লিসেন টু মি। আমাকে বলার সুযোগ দাও। তারপর তুমি সিদ্ধান্ত নিও।’ শুভ্র গলা তুলে বলল, ‘শ্যামল ম্যাডামের জন্য কফি নিয়ে এস, উইদাউট সুগার। আর দুধটা একটু বেশি দিও। ওহ তুমি তো জানো শ্যামল ম্যাডাম কেমন কফি পছন্দ করে।’
রক্তিমা শুভ্রর হাতের ওপরে হাতটা রেখে বলল, ‘শান্ত হও।’ গতকাল রাত থেকে যা যা ঘটেছে সবটা শোনার পরে শুভ্র বলল, ‘মানে? কিন্তু কেন এই ছেলেটা তোমায় এভাবে বদনাম করতে চাইছে কেন রক্তিমা?’
রক্তিমা বলল, ‘দেখ, আমি আর ও একই সঙ্গে গানে গানের মঞ্চে পারফর্ম করেছিলাম। তুমি তো জানো ওই রিয়েলিটি শো-ই আমায় প্রথম ব্রেক দিয়েছিল গানের জগতে। জাজেরা প্রতিদিন বলতেন, রক্তিমা আর দিব্যজ্যোতির মধ্যে কম্পিটিশন রোজ বেড়েই চলেছে। এদের দুজনের মধ্যেই একজন হবে ফার্স্ট, একজন সেকেন্ড। যে ফার্স্ট হবে তার মিউজিক অ্যালবাম রিলিজ করবে টি এল সি কোম্পানি। আমাদের মত নতুনদের জন্য দারুণ সুযোগ। তারপর হঠাৎই দেখলাম, বেশ কটা এপিসোডে দিব্য অ্যাবসেন্ট। ওই প্ল্যাটফর্মে আমি ফার্স্ট হলাম। আমার অ্যালবাম রিলিজ হল। আমি প্লে ব্যাকের সুযোগ পেলাম। সত্যি বলতে কী ধীরে ধীরে ভুলেও গিয়েছিলাম দিব্যকে।
ওকে আর কোন স্টেজ শোতেও গাইতে দেখিনি কখনও।
ছেলেটা যেন ভোজবাজির মত হাপিস হয়ে গিয়েছিল।
আবার ওকে আমি দেখলাম গতকাল রাতে।
এখনও এটাই ক্লিয়ার হয়নি কেন ও আমাকে ওর স্ত্রীর পরিচয় দিল?’
শুভ্র বলল, ‘তোমার প্রতি কোন দুর্বলতা ছিল ওর তখন? রক্তিমা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, না শুভ্র। কখনও ফিল করিনি।’
শুভ্র মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে ও বিশ্বাস করেছে রক্তিমাকে। কিন্তু দিব্যর এমন আচরণের কারণটা খুঁজে চলেছে।
হঠাৎই চমকে উঠল ওরা দুজনেই। টিভির স্ক্রিনে দিব্যর মাথায় ব্যান্ডেজ করা মুখটা ফুটে উঠল। ‘আমাদের বিয়েটা তো আজকের নয়। তখন আমরা গানে গানের রিয়ালিটি শো এর কম্পিটিটর। প্রেম দানা বাঁধে তখন থেকেই। তখনই আমরা সকলের অজান্তে বিয়ে করি। আর তারপর নিজের স্ত্রীর সঙ্গে একই মঞ্চে প্রতিযোগিতায় নামতে ইচ্ছে করেনি। তাই আর যাইনি ওই কম্পিটিশনে। আমার স্বপ্ন ছিল রক্তিমা গায়িকা হোক, হয়েছে।’
একজন রিপোর্টার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিন্তু শুভ্র’
কথাটা শেষ না করতে দিয়েই দিব্য বলল, ‘হ্যাঁ সপ্তসুরের মালিক। রক্তিমার সব অ্যালবাম ওই কোম্পানি থেকেই রিলিজ করে। এটা আমাদের দুজনের সিদ্ধান্ত। আমিই ওকে বলেছিলাম, সপ্তসুরে কাজ করতে।’
শুভ্র ছিটকে উঠে পড়ে বলল, ‘রক্তিমা প্লিজ তুমি এসো এখান থেকে। এনাফ ইজ এনাফ। এত মিথ্যে দিয়ে একটা সম্পর্ক গড়তে যাচ্ছিলে তুমি?’
রক্তিমার দেওয়া এনগেজমেন্টের আংটিটা নিজের আঙুল থেকে খুলে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘দিব্যকে নিয়ে ভাল থেকো।’
রক্তিমাও নিজের আঙুলের আংটিটা টেবিলে রেখে বেরিয়ে এল। কীভাবে বিশ্বাস করাবে শুভ্রকে যে এটা পুরো একটা নিখুঁত গেম প্ল্যান। আদৌ হয়ত দিব্যর কোন বড় দুর্ঘটনাই ঘটেনি। হয়ত ওই ডক্টর সাত্যকি রায় যুক্ত এই খেলার সঙ্গে। এলোমেলো ভাবনার মধ্যেই নিজের ফ্ল্যাটে এসে দরজা বন্ধ করল রক্তিমা।
ভিতরে ঢুকেই দেখল বাবা-মা দুজনেই গম্ভীর মুখে বসে আছে। ওদের কাছেও রক্তিমার নিজের ফ্ল্যাটের এক সেট চাবি থাকে। এই প্রথম বোধহয় সেটার সদ্ব্যবহার করল বাবা।
রক্তিমার দিকে স্পষ্ট তাকিয়ে মা বলল, ‘দিব্যজ্যোতি নামটা বছর তিন-চার আগে প্রায়ই শুনতাম। না শুধু টিভিতে নয়, আমাদের বাড়িতেও। তোর মুখেই শুনেছিলাম, দিব্য মনে হচ্ছে পরের রাউন্ডে এগিয়ে যাবে। আমি ফার্স্ট হতে পারব না। এমন উৎকণ্ঠায় তুই তখন থাকতিস। তারপর একদিন হঠাৎই তোর মুখে বেশ শান্তির চিহ্ন দেখেছিলাম। আর টিভিতে গানে গানে রিয়ালিটি শোতে ওই ছেলেটিকে আর দেখিনি। একটা বোধহয় অ্যানাউন্স করা হয়েছিল, দিব্যজ্যোতি অসুস্থ থাকায় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে পারছে না। বিষয়টা ঠিক কী হয়েছিল রুনু?’
মায়ের দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল রক্তিমা।
বাবা বলল, ‘হ্যাঁ রে, ছেলেটাকে তুই সত্যিই তখন বিয়ে করেছিলিস? সব খবরে যে বেরোচ্ছে বিষয়টা।’
রক্তিমা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘না ওর সঙ্গে আমি কোনোদিন বিয়ে করিনি। তবে শুভ্রর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ভেঙে গেল মা।’ মা আবারও শক্ত গলায় বলল, ‘দেখো, সত্যিটা কতদিন বাবা-মায়ের থেকে লুকিয়ে রাখতে পারো।’ দুজনেই চলে গেল রক্তিমার ফ্ল্যাট থেকে।
এত বড় ফ্ল্যাটে ও একা। একদম একা। চারিদিকে সাজানো আসবাব। একদিকে ওর তানপুরা, হারমোনিয়াম। ওর সব দুঃখের সঙ্গী তানপুরাটাকেই টেনে নিল রক্তিমা। কিন্তু আজ যেন তানপুরার তারগুলোও বিদ্রোহ করে উঠে বেসুরো বেজে উঠল। গলা দিয়ে যে সুরটা বেরোল সেটা যেন ওর নয়।
ভয়ে ভয়েই সরিয়ে রাখল তানপুরাটা।
উঠে গিয়ে দাঁড়াল ওর এতদিনের অর্জিত সমস্ত প্রাইজ আর মেমেন্টোর সামনে। গানে গানের মেমেন্টোতে ঝকঝকে অক্ষরে লেখা আছে রক্তিমা সান্যাল।
নামটা যেন বিদ্রুপ করে উঠল ওকে। ওখানে লেখা থাকা দরকার ছিল দিব্যজ্যোতি চৌধুরী।
প্রায় সাতদিন অতিক্রান্ত দিব্যর অ্যাক্সিডেন্টের। ওকে রিলিজ করে দেওয়া হয়েছে। খবর সবই পেয়েছে রক্তিমা। মিডিয়া কভারেজ করছিল রক্তিমা সান্যালের হাজবেন্ডের শারীরিক অবস্থার আপডেট প্রতিমুহূর্তে পাওয়ার জন্য যেন মানুষ বসে আছে! কিন্তু মিডিয়া জানে কোন খবরের রিচ বেশি হবে। স্ক্যান্ডালের গন্ধ মেশা খবর পরিবেশন তাই ইদানিং একটু বেশিই করছে মিডিয়া। সঙ্গে আছে দিব্যর নিজের দেওয়া বাইট। এ কদিন যা যা রেকর্ডিং ছিল সব বাতিল করেছে রক্তিমা। কারণ আচমকাই ওর গলা থেকে যেন বিদায় নিয়েছে গান। ওর সব থেকে শান্তির স্থান ছিল শুভ্র। সব কিছুর শক্তি ছিল ও। সেই শুভ্র ওকে একলা করে দিতে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ হয়ে গেছে। গান তো দূরের কথা বাঁচাই যেন দুর্বিসহ হয়ে গেছে ওর কাছে। মানসিক এই টানাপোড়েনে সুরের সাধনা হয় না অন্তত।
আজ খবর পেল রক্তিমা, সপ্তসুরে ঢুকেছে দিব্য। ওর অ্যালবাম রিলিজ করবে শুভ্র। রক্তিমার অভ্যস্ত জীবনটা তছনছ করে দিল দিব্য। ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল রক্তিমা।
দিব্য কখন এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি শুভ্র। সপ্তসুরের কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত ছিল ও।
দিব্য এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘তোর কষ্ট হচ্ছে না রে দাদাভাই? আসলে ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণাটা অব্যক্ত হয়।’ শুভ্র ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ কষ্ট তো হচ্ছেই। রক্তিমাকে আমি হয়ত ক্ষমা করে দিতাম যদি ও শেষ মুহূর্তেও সত্যিটুকু বলত। কিন্তু ও স্বীকার করল না নিজের অপরাধটা। শুভেচ্ছার মৃত্যুর দায়টুকু এড়িয়ে গেল নিশ্চিন্তে।
নে, তুই সপ্তসুরের দায়িত্ব নে। দেখ শুভ্রজ্যোতি চৌধুরী এবারে তার ছন্দহীন নিজের জীবনে ফিরতে চায়। এসব তুই বুঝে নে ভাই। এ কোম্পানি আমি কিনেছিলাম শুধু তোর জন্য।’
দিব্য বলল, ‘জানিস দাদাভাই, শুভেচ্ছা স্বপ্ন দেখত আমি একটা মিউজিক কোম্পানির মালিক হব। নিজে গাইব, সঙ্গে তৈরি করব আরও অনেক ট্যালেন্টকে।’
শুভ্র তখন আমেরিকার এক স�ওয়্যার কোম্পানিতে জয়েন করেছে। আমেরিকাতেই ফোনটা পেয়েছিল শুভ্র। বেশ উত্তেজিত গলায় দিব্য বলেছিল, দাদাভাই, আমি এই রাউন্ডে রক্তিমাকে টপকে গেলাম। আমিই ফার্স্ট হব দেখিস। ভাইটার গানের নেশা সেই ছোটবেলা থেকে। বাবার কাছে মারও খেয়েছে দিব্য এই গানের জন্য। দাদা পড়াশোনায় তুখোড়, আর ভাই মিডিওকার হলে যা হয় আরকি। কিন্তু ভাইয়ের গলায় যে সুর আছে সেটা বুঝতে পারত শুভ্রও। তাই বাবা-মাকে রাজি করিয়েই ভাইকে গানের স্কুলে ভর্তি করেছিল শুভ্র। ভাইকে নিয়ে গর্বের অন্ত ছিল না শুভ্রর। গানে গানে রিয়ালিটি শো এর মাঝেই দিব্যর ছোটবেলার বেস্টফ্রেন্ড আর বড়বেলার প্রেমিকা শুভেচ্ছা সুইসাইড করল। করণটা অনেক জিজ্ঞাসা করেও প্রথম জানতে পারেনি শুভ্র। ভাই একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। গান তো দূরের কথা কথা বলাও বন্ধ করে দিল দিব্য। যেন একটা জীবন্ত লাশ। মায়ের চোখের জল শেষ হয়ে গেল ছোটছেলের জন্য কেঁদে কেঁদে। বাবা গম্ভীর হয়ে গেল আচমকাই। একটা প্রাণচ্ছল বাড়ি যেন মুহূর্তে শ্মশানে পরিণত হল।
শ্মশানের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে রক্তিমার ফ্ল্যাটে। ফোনটাও সুইচড অফ করে দিয়েছে রক্তিমা। চোখের সামনে ভাসছে সেই সন্ধের দৃশ্যটা।
গানে গানের দুটো রাউন্ডে পর পর এগিয়ে গেছে দিব্য। দিব্যর প্রেমিকা শুভেচ্ছা এসে জড়িয়ে ধরেছে দিব্যকে।
দিব্য উত্তেজনায় হাঁসফাঁস করতে করতে বলেছে, ‘শুভেচ্ছা শুধু তুমি চেয়েছিলে বলেই আমার এই রিয়েলিটি শোতে আসা। তুমি যতক্ষণ পাশে আছো ততক্ষণ আমায় জয় কেউ আটকাতে পারবে না।’
রক্তিমার সিক্সথ সেন্স বলছিল দিব্যই এবারের উইনার। ওর অ্যালবামই বেরোবে। হেরে যেতে হবে রক্তিমাকে।
হঠাৎই মাথায় দুর্বুদ্ধি ভর করেছিল। মিডিয়া ডেকে গোপনে বলেছিল, ‘রক্তিমা আর দিব্যজ্যোতির মধ্যে কোনো প্রেম চলছে না তো?’
মিডিয়া ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে খবর করেছিল। ইনোসেন্ট, পজেসিভ শুভেচ্ছার ফোন কলের অপেক্ষাতেই ছিল রক্তিমা।
দিন দুয়েক আগেই দিব্যর সঙ্গে এমনিই কয়েকটা সেলফি তুলেছিল রক্তিমা। শুভেচ্ছা পরিষ্কার গলায় প্রশ্ন করেছিল, ‘তোমাদের কি সত্যিই কোন সম্পর্ক আছে? দিব্য বলেছে নেই। তোমরা শুধুই বন্ধু।’
রক্তিমা ওর হোয়াটসঅ্যাপে নিজেদের ছবিগুলো পাঠিয়ে বলেছিল, ‘তুমিই বিচার করো। আমার থেকে তো তুমিই ভাল চেনো দিব্যকে।’
রক্তিমা ভেবেছিল ওদের সাময়িক ঝগড়া হবে। দিব্য ডিস্টার্বড থাকবে। ভাল গাইতে পারবে না পরের রাউন্ডে। এগিয়ে যাবে রক্তিমা। কিন্তু ভাবতেও পারেনি বোকা শুভেচ্ছা এই সামান্য কটা ছবি দেখে আত্মহত্যা করে ফেলবে।
দিব্য সেদিন সন্ধেবেলা বিধ্বস্ত অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছিল রক্তিমার সামনে। বলেছিল, ‘ফার্স্ট হতে চাইলে বলতে পারতে আমি সরে যেতাম। এভাবে আমার শুভেচ্ছাকে শেষ করে দিলে?’ রক্তিমা চেষ্টা করেছিল বোঝানোর, ও শুভেচ্ছার সঙ্গে মজা করেছিল। কিন্তু দিব্য সেদিন কিছুই শোনেনি। বলেছিল, ‘যাও, এ পুরস্কার তোমার। আর আসেনি দিব্য গান গাইতে। কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। এদিকে রক্তিমা পাচ্ছিল একটার পর একটা ব্রেক। কিন্তু কখন যে ওর জীবনের চাকাটা ব্রেক কষে স্থির করে দেবে দিব্য ও ভাবতেই পারেনি।’
সপ্তসুরের একজন এমপ্লয়ি জানাল, ‘ম্যাডাম এ কোম্পানি শুভ্রজ্যোতি চৌধুরী তার ভাই দিব্যজ্যোতি চৌধুরীকে দিয়ে দিলেন। আজ থেকে দিব্যবাবুই আমাদের মালিক।’
আপমানে, লজ্জায় নীল হয়ে যাচ্ছে রক্তিমা। তার মানে শুভ্র এই দেড় বছর ধরে অভিনয় করে গেল ওর সঙ্গে। এত এত অভিনয় করে গেল ছেলেটা। ভালোবাসার অভিনয়ে শুভ্রকে একশোতে দুশো দেওয়া উচিত রক্তিমার। আসলে ভাইয়ের সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে এসেছিল শুভ্র ওর জীবনে।
চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে খবরের কাগজের প্রথম পাতায় চোখ রাখল শুভ্র। গায়িকা রক্তিমা সান্যাল নিরুদ্দেশ। থানায় ডায়েরি করে গেছেন ওর বাবা-মা।
শুভ্রর বাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে বাজছে রক্তিমার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত। এই গানটা বড় ভাল গাইত।
‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার
গানের ওপারে।
আমার সুরগুলি পায় চরণ,
আমি পাই নে তোমারে।
দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার
গানের ওপারে।
বাতাস বহে মরি মরি,
আর বেঁধে রেখো না তরী।
এসো এসো পার হয়ে মোর
হৃদয়-মাঝারে।
দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার
গানের ওপারে।’
শুভ্রর চোখ বেয়ে জলের ধারা। ফিসফিস করে বলল, ‘হয়ত আমি অভিনয় করতে করতে তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম রক্তিমা। শুধু ক্ষমা করতে পারলাম না বলে এটা অভিনয়ই রয়ে গেল তোমার কাছে।’
‘তোমার সাথে গানের খেলা
দূরের খেলা যে,
বেদনাতে বাঁশি বাজায়
সকল বেলা যে।’
