অভিশপ্ত বাড়ি – অর্পিতা সরকার

‘বলুন ম্যাডাম, প্লিজ এভাবে কাঁদবেন না। আমাদের সঙ্গে একটু কো-অপারেট করুন প্লিজ। আপনি যদি পুলিশের কথার উত্তর না দেন, তাহলে আমরা আপনার টিপাইকে খুঁজে বের করব কী করে!’

কিছুতেই বর্ণালী ব্যানার্জীর চোখের জল থামছে না। কথাও জড়িয়ে যাচ্ছে। রূপালি পর্দায় চোখে ভেসলিন দিয়ে কান্না, আর এই কান্নার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এখানে কোনো স্ক্রিপ্ট নেই, কাঁদার দৃশ্য নেই। হয়তো শ্যুটিংয়ের সময় এই কান্নার দৃশ্যটাই রাইট টেক করতে বেশ কসরৎ করতে হয় পরিচালককে। কিন্তু এখন জনপ্রিয় অভিনেত্রী বর্ণালীর দু’চোখ বেয়ে যে নোনতা জলের ধারা নেমেছে সেটা আর্টিফিসিয়াল নয়। ছোট এবং বড়পর্দার অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ বর্ণালী। মোটামুটি সব বাঙালি বাড়িতেই সন্ধের টিভি সিরিয়ালে বর্ণালীকে সকলেই রোজ দেখেন। সেই কাজপাগল, অত্যন্ত সুন্দরী অভিনেত্রীর সাক্ষাৎকার বেশ কয়েকবার নিয়েছে সুদর্শন। বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেন বর্ণালী ব্যানার্জী। কিন্তু আজ যে ওঁর এমন রূপ দেখবে, সেটা কল্পনাও করতে পারেনি সুদর্শন। দীর্ঘদিন ধরে ‘রং মিলান্তি’র সম্পাদক ও। তাছাড়াও ফিল্মি দুনিয়ার সাংবাদিক। সেই সূত্রেই রূপালি পর্দার খবরাখবর ওর নখদর্পণে। এমনকী স্টুডিও পাড়ার ফিসফাসগুলোও ও জানে। টলিউডের সমস্ত ফিল্ম আর্টিস্ট ওকে চেনে। ”রং মিলান্তি” পত্রিকার ফ্রন্ট পেজে একবার বর্ণালীর ছবিও বের করেছিল সুদর্শন, ”পুজোর সাজে বাঙালিয়ানা” নামে। তাই বর্ণালীর সঙ্গে পরিচয় ওর প্রায় বছর চারেক আগেই। কিন্তু এই তথ্যটা জানা ছিল না যে, বর্ণালীর একটা বছর আড়াইয়ের বাচ্চা আছে। সুদর্শনের কাছে এটা একটা চমকপ্রদ ঘটনা। বর্ণালী ডিভোর্সি এটা জানত সুদর্শন। কিন্তু বাচ্চা আছে, এটা জানা ছিল না।

একটা ইন্টারভিউয়ে বর্ণালী নিজেই বলেছিলেন, ‘তখন সদ্য সিরিয়ালে জয়েন করেছি। প্রথম সিরিয়ালের সেটেই প্রেমে পড়ে যাই রণদীপের। আমার বয়েস তখন মাত্র একুশ। আমরা মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে নিই। কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই বুঝতে পারি, অভিনয়টা আমার প্যাশন আর রণদীপের শুধুই জীবিকার প্রয়োজন। যখন বুঝতে পারছিলাম রণদীপ অভিনয়কে ভালোবাসে না, তখনই একটু কষ্ট শুরু হয়েছিল। তারপর হঠাৎই ও একটা চাকরি পেয়ে গেল। দুটো সিরিয়ালের পরেই অভিনয় ছেড়ে দিল। তাতেও কিছু প্রবলেম হয়নি আমার। কিন্তু চাকরিটা পাওয়ার পরে ও জোর করতে লাগল, আমাকে অভিনয় ছেড়ে দিতে হবে। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা মিসম্যাচ। তাই কাদা ছোড়াছুড়ি না করে ভদ্রভাবে মিউচ্যুয়াল ডিভোর্স নিয়ে নিলাম। এরপর ও ওর জগতে, আর আমি আরও বেশি করে ডুব দিলাম আমার কাজের জগতে।’

সুদর্শন প্রশ্ন করেছিল, ‘আর বিয়ে করবেন না?’

বর্ণালী হেসে বলেছিলেন, ‘ঘর পোড়া গরু তো, তাই ভয় হয়। এই বেশ ভাল আছি। কাজ, হাততালি, সাফল্য বা চূড়ান্ত সমালোচনা, আপনাদের পত্রিকা আর আমি।’

ঠিক সেই কারণেই স্টুডিও পাড়ার ঘরের লোক রাতুল যখন বলল, ‘সুদর্শনদা কোথায়? এদিকে বড় খবর, শিগগির এসো। বর্ণালী ম্যাডামের বাচ্চা হারিয়ে গেছে শ্যুটিং সেটে’ তখন বেশ চমকেছিল সুদর্শন।

সাধারণত চব্বিশ ঘণ্টা স্টুডিওতে চা-জলখাবার সরবরাহ করা রাতুল ভুল খবর দেয় না সুদর্শনকে। কারণ, সুদর্শনকে চমকদার খবর দিলেই কড়কড়ে নোটটা পেয়ে যায় রাতুল সুদর্শনের কাছ থেকেই।

সুদর্শন চমকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বর্ণালী মানে? ”দেবপ্রিয়ার” বর্ণালী ব্যানার্জী?’

দেবপ্রিয়া বর্ণালীর হিট সিনেমা, ওখান থেকেই ওকে মানুষ বেশি চিনেছে।

রাতুল বলল, ‘আরে হ্যাঁ। পুলিশ এসেছে স্টুডিওতে।’

সুদর্শন আর একটুও দেরি না করে খবরের লোভে পৌঁছে গেছে স্টুডিওপাড়ায়। শুধু কি খবরের লোভে? নিজের মনকে অবশ্য তাই বলল সুদর্শন।

বর্ণালী কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, ‘শ্যুটিংটা স্টুডিওতে হচ্ছিল না অফিসার। হচ্ছিল দেবীপুরের একটা পোড়োবাড়িতে। পরিচালক রাকেশ চৌধুরীর মুভি। ভৌতিক মুভি বলেই অরিজিনালিটি আনার জন্য অমন একটা বাড়ি চুজ করা হয়েছিল।’

‘দেবীপুর মানে ওই হুগলী জেলার?’

বর্ণালী বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার। আমরা গত তিনদিন ধরে ওখানে একটা লজে ঘর ভাড়া করে আছি পুরো টিম। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত শ্যুটিং চলছিল। বাড়িটার একটু বদনাম আছে। ভূতের বাড়ি বলে লোকে। আমাদের মুভি ”দক্ষিণের ঘরটার” শ্যুটিং চলছিল। হঠাৎই আমি ডায়লগ বলতে বলতেই শুনতে পেলাম টিপাইয়ের ভয়ঙ্কর চিৎকার। আমি অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম। সিন কাট হয়ে গেল। রাকেশ বলল, ‘কী হল বর্ণালী?’

আমি এদিকওদিক তাকিয়ে টিপাইকে খুঁজছিলাম। আমার মেড বেলা বসে বসে শ্যুটিং দেখছিল। ওর কোলেই বসে ছিল টিপাই। হঠাৎই দেখি, বেলা আছে কিন্তু টিপাই নেই। বেলাকে জিজ্ঞাসা করতে ও বলল, দু’মিনিট আগেও বেলার কাছ থেকে চকলেট চেয়েছে। বেলা দিয়েওছে। তারপর মুহূর্তের মধ্যে গেল কোথায় সেটা ও বুঝতে পারছে না। গোটা ইউনিটের সবাই খোঁজাখুঁজি করছিল। ওই বাড়ির বেশিরভাগ ঘর তালা বন্ধ। তালাগুলোয় জং ধরা। দুটো-তিনটে ঘর তালা খোলা ছিল। তাও দেওয়ালে ফাটল ধরেছে, বুনো গাছ উঠেছে। ওই তিনটে ঘরের উদ্দেশ্যেই সবাই ছুটলাম। গিয়ে দেখলাম তৃতীয় নম্বর ঘরে টিপাইয়ের হাতের গাড়িটা পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে, টিপাই নেই।’ বর্ণালী আবারও ফুঁপিয়ে উঠলেন।

পরিচালক, সহ পরিচালক পাশেই ছিলেন। তাঁরা বললেন, ‘সিঁড়িটা অর্ধেক ভাঙা, তবুও আমার টিমের ক্যামেরাম্যান সুরজিৎ কোনোমতে লাইফ রিস্ক নিয়ে ছাদে উঠেও দেখে এসেছে, কোথাও নেই টিপাই। এখন প্লিজ আপনারা কিছু করুন। দেবীপুর থানার পুলিশকে আমরা ইনফর্ম করেছি। কিন্তু তাঁরা গা-ছাড়াভাবে জানালেন, এই চত্বরের সবাই জানে ওটা ভূতুড়ে বাড়ি। দিনের বেলায়ও কেউ ঢোকে না। হঠাৎ আপনারা ওর ভিতরে করছিলেন কী? আর আপনাদের পারমিশনই বা কে দিল?’

সুদর্শন বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, আপনারা পারমিশন নিয়েছেন কার কাছ থেকে?’

বর্ণালী তখন নিজের ফোন থেকে টিপাইয়ের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো দেখাতে ব্যস্ত মহিলা পুলিশকে।

সুদর্শনের কথায় পরিচালক রাকেশ বললেন, ‘ওই বাড়ির কেয়ারটেকার রতন মল্লিকের কাছ থেকে। উনি বললেন, বাবুরা নাকি বহুদিন আগে সব যে যার বিদেশে চলে গেছে। ভাইয়ে ভাইয়ে মনোমালিন্যের কারণে এত বড় সম্পত্তি বিক্রি হচ্ছে না। তাই রতনই মাঝে মাঝে এসে একটু পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। এতকাল এ-বাড়ির নুন খেয়েছে, তাই কৃতজ্ঞতাবশেই করে। আমরা তা সত্ত্বেও ওর হাতে চার হাজার টাকা দিয়ে বলেছিলাম, তিনদিনের শ্যুটিং আছে। রতন বলেছিল, টাকা নিয়ে কী করব? আমি একা মানুষ, যা আছে চলে যায়। তবুও জোর করে দিতে নিয়েছিল। আমাদের শ্যুটিং চলাকালীন একদিন ঘণ্টাখানেক বসেও ছিল চেয়ারে। দূরে বসে শ্যুটিং দেখছিল। বলেছিল, কত বছর পরে এ বাড়ির উঠোনে মানুষের পায়ের ধুলো পড়ল। তারপর অবশ্য আর আসেনি। এসেই বা করবেটা কী? বাড়িতে কোন মূল্যবান জিনিস আছে যে পাহারা দিতে আসবে!’

একজন পুলিশ বললেন, ‘আপনারা ওই বাড়িটার খবর পেলেন কোথা থেকে?’

রাকেশ বললেন, ‘গুগল সার্চ করে। মিত্রদের ভূতুড়ে বাড়ি নামে পরিচিত বাড়িটা। আমাদেরও ভূতের সিনেমা, কিন্তু বুঝতেই তো পারছেন কম বাজেটের সিনেমা, তাই সেট বানানোর বদলে এরকম কোনো রেডিমেড জায়গায় শুট করলে খরচ কমে। সেই ভেবেই এগিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন, আমরা কার্বলিক অ্যাসিড ছড়িয়ে নিয়েছিলাম। তাছাড়া বিকেলের পরে আর শ্যুটিংও করিনি। যা হত ওই সূর্যের আলো থাকতে থাকতে। কী করে যে এমন অঘটন ঘটে গেল জানি না।’

টিমের প্রত্যেকের মুখেই বেশ দুশ্চিন্তা।

বর্ণালীর মেক-আপবিহীন মুখ। চোখদুটো কেঁদে কেঁদে ফুলে গেছে।

সুদর্শনের যে বর্ণালীর প্রতি একটু হলেও দুর্বলতা আছে, সেটা এর আগেও ও নিজে টের পেয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ থাকা উচিত ভেবেই নিজের দুর্বলতার কথা কোনোদিনই প্রকাশ করেনি সুদর্শন। সত্যি বলতে কী এই সাংবাদিকতার কারণেই ওরও প্রেমে বিরতি পড়েছে। তাই বিয়ের পিঁড়িতে বসার ইচ্ছেটুকুও অবশিষ্ট নেই। মা প্রায়ই আক্ষেপ করে, ছেলেটা বিয়ে করল না বলে। সুদর্শনের কলিগরা বলে, ওর নাকি মহিলাতে অ্যালার্জি। সেই সুদর্শন যেদিন প্রথম বুঝেছিল, বর্ণালীর প্রতি ও একটু হলেও দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেদিন নিজে ইন্টারভিউ নিতে না এসে টিমের ছেলে অশোককে পাঠিয়েছিল। কিন্তু আজ এমন একটা খবর শুনে না এসে থাকতে পারেনি। না শুধু ফিল্মি দুনিয়ার টিআরপি বাড়ানোর জন্য নয়, বর্ণালীর বিষয়টা দেখবে বলেই।

পুলিশ তখনও নানারকমের প্রশ্ন করছিল।

সুদর্শন বর্ণালীর পাশে গিয়ে বসে বলল, ‘একটা অত্যন্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব? যদি ইচ্ছে না হয় উত্তর দেবেন না।’

বর্ণালী কান্নাভেজা চোখে করুণ দৃষ্টিতে তাকালেন, ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘বলুন।’

‘আপনার কোনো সন্তান আছে বলে তো জানতাম না। ইন্টারভিউয়ে কখনও বলেননি তো টিপাইয়ের কথা।’

বর্ণালী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমার নিজের গর্ভের নয় হয়তো, কিন্তু টিপাই আমারই সন্তান। আমার দাদার বাচ্চা। বাচ্চা হতে গিয়েই বৌদি মারা যায়। দাদাও কেমন একটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সংসার থেকে। টিপাইকে আমি আর মা মানুষ করি। টিপাই আমাকে পিসিমণি নয় মা বলেই ডাকে। ও আমার সন্তান। ওর জন্যই দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছি। মা একটু অসুস্থ থাকায় টিপাইকে আমার বাড়িতে এনে রেখেছি বেশ কয়েক মাস। আউটডোরে শ্যুটিং থাকলে ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যাই। সঙ্গে বেলা যায় ওকে দেখাশোনা করতে। আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না ও টানা তিন-চারদিন। সেই জন্য এবারেও নিয়ে গিয়েছিলাম।’

সুদর্শন কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘পুলিশ বা আপনার মুভির টিমের ওপরে আমার ভরসা নেই একেবারেই। এদের কাজের পদ্ধতি তো এতদিন ধরে দেখছি, তাই কত দেরিতে যে তদন্ত শুরু করবে সেটা বোঝা মুশকিল। তার থেকে চলুন আমি আর আপনি দুজনে যাই ওই বাড়িতে। টিপাই বাচ্চা ছেলে, হয়তো কোনো অলিগলিতে ঢুকে পড়ে আর বেরোতে পারছে না।’

বর্ণালী আর একমুহূর্ত দেরি না করে কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে বললেন, ‘চলুন। বেলা, চাবি নিয়ে তুমি বাড়ি চলে যাও। মা ফোন করলে এখনই টিপাইয়ের কথা কিছু বলবে না। যা বলার আমি বলব।’

সুদর্শনের গাড়িতে উঠেই বর্ণালী বললেন, ‘প্রচণ্ড ভয় পেলে যে চিৎকারটা করে বাচ্চারা সেটাই করেছিল টিপাই। আর ও ভয় পেলে চিৎকার করে ”মা” বলে। আমায় ডাকে তখন।’

সুদর্শন নিজেই ড্রাইভ করছিল। নরম গলায় বলল, ‘মাঝে কোথাও দাঁড়াব একটু, খাওয়া-দাওয়া করে নেবেন?’

বর্ণালী বললেন, ‘টিপাইও তো কিছুই খায়নি। ওকে খুঁজে পাই, তারপর খাব।’

সুদর্শন বলল, ‘না খেলে খুঁজবেন কী করে? মাথা ঘুরে পড়ে গেলে তখন আরেক বিপদ। আরেকটা কথা বলি, আমার বাবা বলতেন, বিপদের সময় একটাই কাজ মন দিয়ে করতে হয়। মাথাটাকে প্রচণ্ড শান্ত রাখা। শান্ত মাথার ভাবার ক্ষমতা বেশি। আর মাথা তখনই শান্ত থাকে যখন শরীরটা সাথ দেয়।’

বর্ণালী আচমকা বললেন, ‘আচ্ছা, আপনি হঠাৎ আমার উপকার করতে এলেন কেন?’

সুদর্শন হেসে বলল, ‘এটা অবশ্য ঠিক। ইদানীং কেউ উপকার করতে চাই বলে হাত বাড়ালেই ভয় করে। মনে হয়, কোনো অভিসন্ধি নেই তো? কিন্তু এক্ষেত্রে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন বর্ণালী, আমি সুন্দরী মহিলার সুযোগ নেব না। তবে হ্যাঁ, টিপাইকে খুঁজে পাওয়ার পরে মা আর ছেলের একটা ছবি দিয়ে চারপাতা স্টোরি করার অনুমতি দিতে হবে।’

বর্ণালী বললেন, ‘টিপাইকে খুঁজে দিন শুধু। আপনাকে ছয়পাতা স্টোরি করার অনুমতি দেব।’

সুদর্শন হাইওয়েতে একটা ধাবার ধারে গাড়িটা দাঁড় করাল। বর্ণালীর অনিচ্ছাসত্ত্বেও জোর করে ওকে খাওয়াল, নিজেও খেয়ে নিল।

 দেবীপুরে ওই বাড়িটার সামনে যখন ওরা পৌঁছল তখনও সূর্যটা আকাশে দোল খাচ্ছে। দস্যি ছেলেকে যেমন তার মা ডাকলেও সে ছেলে খেলা ছেড়ে কিছুতেই যেতে চায় না, ঠিক তেমনই বাড়ির পথে পাড়ি দিয়েও বাড়িতে ঢোকার আগে আরেকটু খেলে নিচ্ছে। এখনই ঝপ করে সন্ধে নামবে বেশ বোঝা যাচ্ছে। সন্ধের আগেই ওই বাড়িতে ঢোকার ইচ্ছে ছিল সুদর্শনের। তাই দেবীপুর থানায় না গিয়ে সোজা বাড়িতে গেছে।

বর্ণালী বললেন, ‘একবার কি থানায় ইনফর্ম করা উচিত যে আমরা এসেছি?’

সুদর্শন বলল, ‘ওরা যদি পেত তাহলে নিশ্চয়ই কলকাতা পুলিশকে জানত। আর আপনার নম্বর ওরা নিয়ে গেছে। তার মানে এখনও টিপাই মিসিং। চলুন, সময় নষ্ট না করে ভিতরে ঢুকি।’

বাড়িয়ে গেট বলতে পাল্লাই দুটো কাঠের দরজা। তাতে লোহার কারুকার্য। দরজাটা এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে। না তালা নেই, শুধু বন্ধ আছে।

সুদর্শন বলল, ‘আচ্ছা, আপনারা যে রতনের কাছ থেকে পারমিশন নিয়েছিলেন, ওকে পেলেন কোথায়?’

বর্ণালী বললেন, ‘রাকেশ প্রথম একা এসেছিল, সেদিন এই বাড়ির উঠানে রতন বসেছিল। ওকে জিজ্ঞাসা করতেই ও এটা বলেছিল, অসুবিধা নেই পড়েই থাকে এ বাড়ি। তারপর আমরা যেদিন এসেছিলাম ওর হাতে কিছু টাকা দেওয়া হয়। তারপর আমরা ঢুকে পড়ি। তিনদিন ছিলাম এখানে একটা জনপ্রাণীকে ঢুকতে দেখিনি বাড়িতে। সব জায়গায় শ্যুটিংয়ের লোকজন এসেছে শুনলেই সর্বত্র প্রচুর মানুষ ছুটে আসে শ্যুটিং দেখতে। সুযোগ পেলে আর্টিস্টদের সঙ্গে সেলফিও তোলে। এই প্রথম আমরা এসেছি জানার পরও এই বাড়িতে একটা বাচ্চাও উঁকি দেয়নি। রাকেশ বলেছিল, যাক নিশ্চিন্তে কাজ করা যাবে এখানে।’

সুদর্শন বলল, ‘তার মানে, রতন এখানে থাকে না। মানে এটা ওর বাড়ি নয়। আশেপাশেই থাকে হয়তো। সে পরে খোঁজা যাবে। এখন চলুন আলো থাকতে থাকতে ভিতরটা দেখে নিই।’

দরজাটা বেশ ভারী। সুদর্শন জোরে ঠেলার পরেও পুরোটা খুলল না, সামান্য ফাঁক হল মাত্র। আরেকবার ঠেলতেও গোটাটা খোলেনি। একটা মানুষ ঢোকার মতো জায়গা হল।

বর্ণালী বললেন, ‘আগেরদিন টিমের চারজন ধাক্কা দিয়ে খুলেছিল।’

সুদর্শন বলল, ‘আমাদের একজন করে ঢোকার জায়গা হয়ে গেছে, আসুন।’

সুদর্শন আগে ঢুকল, তারপর বর্ণালী।

বিশাল উঠোনওয়ালা জমিদারবাড়ি। উঠোনটা বেশ পরিষ্কার আছে। কেউ রীতিমত পরিষ্কার রাখে। কারণ, সদ্য গতকাল শ্যুটিং পার্টি এখান থেকে গেছে, একটা টুকরো নোংরা নেই উঠোনে। সুদর্শন এদিকওদিক তাকাচ্ছিল সবটা দেখে নেওয়ার জন্য। ঠিক তখনই বেশ জোরে ক্যাঁচ করে আওয়াজ হয়ে মেইন দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। বর্ণালী হয়তো টিপাইয়ের জন্য অন্যমনস্ক, তাই খেয়াল করল না। সুদর্শন বেশ অনুভব করছে বাড়িতে কেউ একজন ঢুকল, তারপর বন্ধ করে দিল দরজাটা। পিছন ফিরে দেখা উচিত কে। কিন্তু সুদর্শনের কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। পা দুটো বড্ড ভারী লাগছে আচমকা। কেউ যেন জোর করে চেপে ধরে রেখেছে পা দুটো। এত জায়গায় গেছে সাংবাদিকতার কারণে, তাই স্বাভাবিকভাবেই সাহস কিছু কম নেই ওর, তারপরেও এমন একটা অদ্ভুত অনুভূতির সঙ্গে ও পরিচিত ছিল না একেবারেই। একটা লাঠির আওয়াজ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ঠুক ঠুক করে লাঠি ঠুকে কেউ একজন হাঁটছে, যে ডান পা’টা একটু ঘষে হাঁটে। পিছন ঘোরার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল সুদর্শন। বর্ণালী ওর থেকে মাত্র একহাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

সুদর্শনের সামনে এসে দাঁড়াল একজন বছর সত্তরের বৃদ্ধ। হাতে লাঠি, চুলগুলো সব সাদা। পরনে পাজামা আর ঢোলা পাঞ্জাবি। বিরক্তিসূচক গলায় বলল, ‘আপনারা কারা? না আর শ্যুটিং করতে দেব না। যান এখান থেকে। বড়কর্তা, বড়গিন্নি রাগ করেছেন খুব।’

বর্ণালী ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘রতনকাকা, আমার ছেলেটা হারিয়ে গেছে এই বাড়িতে। তাই খুঁজতে এসেছি।’

ঘোলাটে চোখে তাকাল রতন। ফিসফিস করে বলল, ‘ও ছেলে আর আপনি খুঁজে পাবেন না।’

সুদর্শন এতক্ষণে নিজের শরীরে শক্তিটুকু ফিরে পেল। পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘কেন, খুঁজে পাবে না কেন? আপনি তো এ-বাড়ির কেয়ারটেকার, আপনিই তো অনুমতি দিয়েছিলেন এখানে শ্যুটিং করার, তাহলে এ-বাড়ি থেকে বাচ্চা হারিয়ে গেলে তার দায় আপনি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করতে পারেন না।’

রতন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে সুদর্শনের দিকে। ওর চোখের দৃষ্টিতে কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে সুদর্শনের।

রতন হেসে বলল, ‘তো আমার নামে তোমার কাগজে লিখে দিও। পারলে পুলিশে দাও আমায়।’

বর্ণালী এসব বচসা দেখে হন্তদন্ত হয়ে এসে রতনের সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘টিপাই আমার ছেলে। ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না রতনকাকা। আমায় সাহায্য করুন। কোথায় ও?’

বর্ণালীর চোখের জলে বুড়োর মুখের ভাঁজ হওয়া চামড়ায় অল্প হলেও করুণা ফুটে উঠল। একটু গম্ভীর স্বরে বলল, ‘টিপাই ভালো আছে। ও যত্নে আছে। তোমরা বাড়ি ফিরে যাও। বড়বৌরানি ওকে খুব আদরে রেখেছেন।’

মানেটা কী? কী বলছে লোকটা? বাচ্চাটা বর্ণালীর। তাকে না নিয়েই বাড়ি চলে যাবে ওরা! বাচ্চাটা কোথায় বুড়োটা সব জানে! কিছুতেই বলছে না! পুলিশের রুলের বাড়ি কয়েক ঘা পড়লেই বুড়োর এসব গল্প বেরিয়ে যাবে।

সুদর্শন বলল, ‘তো বাচ্চাটা কোথায় আছে আমাদের দেখানো যাবে?’

বর্ণালী কেঁদেই চলেছেন। আর এদিক-ওদিক উদ্ভ্রান্তের মতো তাকাচ্ছেন। ভাবছেন, এই বুঝি টিপাই ”মা” বলে ডেকে উঠবে।

রতন সুদর্শনের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল। শীতল গলায় বলল, ‘দেখে কী লাভ? ও যাবে না আপনাদের সঙ্গে।’

উঠোনে দাঁড়িয়েই সুদর্শন অনুভব করল ঝপ করে সন্ধে নেমে গেছে। এ-বাড়িতে আকাশ ছাড়া আর কোথাও দিয়ে আলো ঢোকে না। আকাশের আলো নিভে গেলেই এ-বাড়ি থমথমে অন্ধকার হয়ে যায়। ফোনের ফ্ল্যাশলাইট অন করল সুদর্শন।

রতন বলল, ‘দোতলায় যেতে হবে। বড়বৌরানির ঘর দোতলার কোণে।’

রতন আগে আগে চলল লাঠি ঠুকে ঠুকে। পিছনে সুদর্শন, শেষে বর্ণালী। রাকেশ ঠিকই বলেছিলেন, সিঁড়ি বলে কিছুই নেই। সব সিঁড়িরই দুটো দিক ভেঙে গেছে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাতে দুটো পা এক সঙ্গে দিয়ে ওঠা যায় না। সিঁড়িতে রীতিমত ঝোপ হয়ে গেছে ফার্নজাতীয় গাছের।

সুদর্শন বলল, ‘সাবধানে বর্ণালী।’

বর্ণালী ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘হুঁ, সাবধানেই যাচ্ছি।’

দোতলার বারান্দাটা বেশ লম্বা। একটানা লম্বা বারান্দা। কেউ একটা গুনগুন করে গান গাইছে। সুদর্শন কান পেতে শুনল।

‘খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়াল বর্গি এল দেশে…

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে…’

খুব মিষ্টি গলায় সুর করে কেউ গাইছে। এ-বাড়িতে মানুষ থাকে না বলেছিলেন রাকেশ। তিন দিন ধরে ওঁরা শ্যুটিং করেছেন, জনপ্রাণী ছেড়ে একটা বেড়াল অবধি দেখতে পাননি, বললেন বর্ণালী। অথচ গানটা তো এই দোতলার কোনো ঘর থেকেই আসছে। যদিও সব ঘরগুলোই বন্ধ রয়েছে। বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। জং ধরে গেছে সব তলায়। একতলায় তবুও তিনটে ঘর খোলা পড়ে আছে। দোতলায় সব বন্ধ। বারান্দার ওপরে ভাঙা ঝাড়লন্ঠন, বা কোথাও শ্বেতপাথরের টেবিল তিন পায়ের ওপরে হেলে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও পাথরের রং আর শ্বেত নেই। রতন একটাও কথা বলছে না। শুধু পা টেনে যাওয়ার আওয়াজ। নিস্তব্ধ পরিবেশ। ঝিঁঝিঁরাও ডাকছে না। তাই রতনের পা ঘষা, লাঠির ঠুক ঠুক আওয়াজকে ছাড়িয়ে ছড়ার সুরে গানটা আরেকটু জোর হল।

বর্ণালী ফিসফিস করে বললেন, ‘আতরের গন্ধ পাচ্ছ?’

সুদর্শন বলল, ‘আতর না ধূপ এখনও বুঝতে পারিনি। তবে গন্ধটা একটু তীব্র।’

বর্ণালী সুদর্শনের হাতটা চেপে ধরলেন। বললেন, ‘আমার পায়ের উপর দিয়ে কিছু একটা সরে গেল যেন। ঠাণ্ডা একটা অনুভূতি পেলাম।’

সুদর্শন বর্ণালীর হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘দিনের আলোয় আসা উচিত ছিল। এখন আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই।’

একটা বাচ্চার ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ পেল ওরা। বর্ণালী সুদর্শনের হাতটা চেপে ধরল। সুদর্শন বুঝল এটাই টিপাইয়ের গলা।

বারান্দার শেষ প্রান্তে এসে রতন বলল, ‘এই ঘরে থাকেন বড়বৌরানি। উনিই আপনার ছেলেকে মানুষ করবেন।’

গোটা বাড়ি নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। ইলেক্ট্রিসিটি নেই পরিচালক রাকেশ বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমরা জেনারেটর দিয়ে কাজ চালাচ্ছিলাম। বাড়িতে কোনো ইলেকট্রিক লাইন নেই বর্তমানে। কোনো এককালে ছিল, কিন্তু বর্তমানে সব সুইচ ভেঙে পড়ে আছে।’ তাহলে ওই দরজার ফাঁক দিয়ে আলো আসছে কোথা থেকে! বর্ণালীর হাত ঘামছে, কাঁপছে তিরতির করে, সেটা বেশ অনুভব করতে পারছে সুদর্শন।

রতন বলল, ‘আসুন।’

দরজাটা খুলতেই ধূপের গন্ধটা এসে ঝাপটা দিল নাকে। জুঁই ফুলের সুবাস। বিশাল বড় ঘর। ওপর থেকে ঝুলছে ঝাড়লন্ঠন। মাঝে একটা বিশাল পালঙ্ক। নিখুঁত সাজানো একটা ঘর।

রতন বলল, ‘আমাদের বড়বৌরানি।’

বর্ণালী দেখল, এক গা গয়না আর রূপালীপাড় তসরের শাড়ি পরে এক মহিলা বিছানায় শুয়ে থাকা টিপাইয়ের মুখে নাক দিয়ে কী যেন শুঁকছেন।

রতন বলল, ‘বাচ্চাদের মুখে একটা দুধ দুধ গন্ধ থাকে না, ওটা বৌরানির খুব প্রিয় গন্ধ। ওটাই শুঁকছেন হয়তো।’

আরও ছোট বাচ্চার আরও বেশি গন্ধ থাকে। টিপাইয়ের যেহেতু বছর আড়াই বয়স, তাই ওই গন্ধের তীব্রতা কমেছে। তবে টিপাইয়ের প্রিয় খাদ্য এখনও দুধ। তাই গন্ধটা ওর মুখে অল্প হলেও পাচ্ছেন মহিলা। প্রাণ ভরে যেন শ্বাস নিচ্ছেন। মহিলার মুখটা দুর্গাপ্রতিমার মতো। কিন্তু কপালে বা সিঁথিতে সিঁদুরের রেখা নেই। সম্ভবত অবিবাহিত বা বিধবা।

বর্ণালী বললেন, ‘আমরা এই ক’দিন যে ছিলাম, ইনি যে এখানে থাকেন বুঝতে পারিনি তো।’

সুদর্শন বলল, ‘আমি তো একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, লাইটগুলো জ্বলছে কী করে?’

ভদ্রমহিলা টিপাইকে কোলে তুলে নিলেন। বারবার কানের কাছে বলেই চলেছেন, ‘মা ডাক। ডাক মা বলে ডাক আমায়!’

টিপাই অপলক তাকিয়ে আছে। অচেনা লোকের কোলে ও কোনোদিনই থাকে না। তাই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলেছে। মহিলার চোখ দুটো আচমকা রক্তের মতো লাল হয়ে উঠল। নিজের গলা থেকে তিনটে সোনার হার খুলে টিপাইয়ের গলায় পরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এবারে মা বলে ডাক।’

বর্ণালী বললেন, ‘অকারণে এভাবে টিপাইকে কষ্ট দিচ্ছে কেন?’

সুদর্শন মুখে আঙুল চাপা দিয়ে বলল, ‘চুপ। কথা নয়। আগে দেখুন বিষয়টা।’

মহিলা হাত থেকে সোনার চুড়ি খুলে টিপাইয়ের ছোট্ট ছোট্ট হাতে পরিয়ে দিলেন। সেটা টিপাইয়ের হাত থেকে খুলে পড়ে গেল নীচে। টিপাইকে রেগেমেগে বিছানায় ঠুকে বসিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মা বলে ডাক আমায়। ডাক মা বলে।’

টিপাই যেহেতু ডাকছে না, ক্রমশ অসহিষু� হয়ে যাচ্ছেন মহিলা। উত্তেজনায় চুলের খোঁপাটা গেল খুলে। কোমর অবধি চুল ছড়িয়ে গেল। কথা নেই বার্তা নেই মহিলা আচমকা ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করলেন। আর বেশ রাগতস্বরে বলতে শুরু করলেন, ‘দেখ, নাচ দেখ। তোরা তো পুরুষমানুষ। নাচ-গান, বাইজি তোদের বেশি পছন্দ। দেখ আমি কেমন নাচতে পারি দেখ।’

রতন ফিসফিস করে বলল, ‘এবারে চলুন। বৌরানি এখন কিছুক্ষণ নাচবেন।’

বর্ণালী বললেন, ‘যাব মানে? আমার টিপাইকে না নিয়ে আমি কোথাও যাব না।’

রতন বলল, ‘পিছনে ঘুরে দেখুন।’

সুদর্শন পিছনে ঘুরতেই দেখল, দুটো হাড়গিলে লোক হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকদুটো এতটাই রোগা যে, ওদের উপস্থিতি বুঝতেই পারেনি সুদর্শন। রতনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওরা কারা?’

রতন বলল, ‘ওরা বড়বৌরানির লেঠেল। ওরা কোনোদিন এ-বাড়ি ছেড়ে, বৌরানিকে ছেড়ে যায়নি। দীর্ঘদিন ওরা না খেয়ে থেকেছে, তবুও ছেড়ে যায়নি।’

বর্ণালী বললেন, ‘তো ওরা কী করবে? আমাদের মারবে?’

রতন বলল, ‘মারবে না তো। শুধু বেঁধে রাখবে। বৌরানির নাচের সময় কেউ বিরক্ত করলে তাকে বেঁধে রাখে এরা।’

সুদর্শন দেখল দুটো হাড়গিলে চেহারা ওদের কাছে এগিয়ে আসছে। বর্ণালী ভয়ে চোখ বন্ধ করে দিলেন।

ডিগডিগে রোগা লোকগুলো এসেই সুদর্শনের মুখ শুঁকতে লাগল। ওদের গা থেকে একটা পচা, বিশ্রী গন্ধ আসছিল। সুদর্শনের বমি হয়ে যাবে মনে হচ্ছিল।

রতন বলল, ‘সরে যাও দারোয়ান রঘুনাথ।’

রতনের কথায় ওরা একটু সরে দাঁড়াল।

রতন বলল, ‘জমিদারি চলে গেছে বহুদিন। শেষ বংশধর চলে গেছে বিদেশে। এরা যেহেতু এ-বাড়ির নুন খেয়েছিল, তাই রঘুনাথ আর শিবনাথ দুজনে এ-বাড়ির মাটি ছেড়ে যেতে পারেনি কখনও। দীর্ঘদিন অনাহারে থেকেছে। তাই খাবারের গন্ধ পেলেই উত্তেজিত হয়ে যায়।’

সুদর্শন ভাবল, ধাবায় ওরা রুটি আর তড়কা, চিকেন খেয়েছিল অনেকক্ষণ আগে। এরা এখনও সেই গন্ধ পাচ্ছে কী করে! এরা কি জীবিত আছে, নাকি মৃত! রতনকে জিজ্ঞাসা করতেও সাহস হচ্ছে না। তবুও এ-বাড়িতে ও-ই একমাত্র সুস্থভাবে কথা বলছে ওদের সঙ্গে।

রতন বলল, ‘চলুন আপনাদের নিশ্চিন্তে বাইরে অবধি পৌঁছে দিয়ে আসি।’

বর্ণালী বললেন, ‘আমার ছেলে! টিপাই!’

রতন বলল, ‘নিজে চোখেই তো দেখলেন ও যথেষ্ট ভালো আছে। এখন চলুন।’

বর্ণালী প্রায় কঁকিয়ে উঠলেন।

সুদর্শন বর্ণালীর হাতে চাপ দিয়ে বলল, ‘বেরিয়ে চলুন।’

বর্ণালী ওর হাত ছাড়িয়ে সোজা উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটলেন ওই বড়বৌরানির ঘরের দিকে। বাইরে থেকেই জোরে ডাকলেন, ‘টিপাই…’

টিপাইও ঘর থেকেই ডাকল, ‘মা…’

সুদর্শন চোখের সামনে দেখল, বৌরানির নাচ থেমে গেল। টিপাইকে ধরে বুকের মধ্যে নিয়ে বললেন, ‘আরেকবার ডাক মা।’

টিপাই বর্ণালীর দিকে তাকিয়ে ডাকল, ‘মা’

সুদর্শন পাশ ফিরে দেখল, রতন নেই। রোগা রোগা লোকদুটো এসে ওর মুখের কাছ থেকে ঘ্রাণ নিতে শুরু করেছে। সুদর্শনের বমি উঠে আসছে। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কেউ যেন বরফ শীতল হাত দিয়ে ওর গলাটা টিপে দম বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সুদর্শন আপ্রাণ চেষ্টা করছে ছাড়ানোর। কিন্তু ওর নাকে একটা পচা গন্ধের ঝাপটায় দমটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বর্ণালীর গলাটা মৃদু শুনতে পাচ্ছে, ‘ওকে ছেড়ে দিন, ও আমার ছেলে।’

চোখে সূর্যের আলো পড়তে চোখ মেলল সুদর্শন। গোটা গায়ে অসহ্য ব্যথা। একটা পোড়োবাড়ির ভাঙা বারান্দায় পড়ে আছে ও। ঝটিতে গতকাল রাতের সব মনে পড়ে গেল ওর। কোনোমতে কষ্ট করে উঠেই এদিকওদিক তাকিয়ে খুঁজছিল বর্ণালীকে। দেখল, কোথাও নেই বর্ণালী। সামনের যে ঘরে কাল আলো জ্বলছিল, সেটাও বন্ধ এখন। রীতিমত জং ধরা একটা তালা ঝোলানো।

ঘরের সামনে একটা বাঁধানো ছবি পড়ে আছে। তার কাঁচটা কিছুটা ভাঙা। ছবিটা দেখে চমকে উঠল সুদর্শন। এ তো সাদা-কালো বর্ণালীর ছবি! হুবহু এক মুখ! এক চেহারা! শুধু সাজপোশাক আলাদা। ছবিটা সঙ্গে নিয়ে ওই ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল সুদর্শন। উঠোনে বর্ণালী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন, দু’হাতে আঁকড়ে রেখেছেন টিপাইকে। নিজের ব্যাগ খুঁজে জলের বোতল পেল ও, তাতে জল খুব সামান্যই আছে। সেটাই বর্ণালীর মুখে ছেটাতে ওঁর জ্ঞান ফিরল।

সুদর্শন বলল, ‘আর এক মুহূর্ত নয়, চলুন শিগগির।’

বর্ণালী টিপাইকে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো গেটের দিকে ছুটে গেলেন। গেট আজ খোলা।

গাড়িতে বসে দুজনেই হাঁপাচ্ছে। টিপাইয়ের গায়ে প্রবল জ্বর। একটা হোটেল ভাড়া করে ওদের ঘরে ঢুকিয়ে দিল সুদর্শন। টিপাইকে ইমিডিয়েট ডক্টর দেখাতে হবে।

খোঁজ করতে করতে একজন বয়স্ক ডক্টরের নাম শুনে তাঁর বাড়িতেই গেল সুদর্শন। ডক্টর সবটা শুনলেন। তাঁর বয়স অন্তত তিয়াত্তর বছর। বললেন, ‘বেঁচে ফিরে এসেছেন এটাই অনেক। বাচ্চাটা এখনও ট্রমায় আছে। আমি ওষুধ দিচ্ছি।’

সুদর্শন আধ ভাঙা ছবিটা ডাক্তারের সামনে দিয়ে বলল, ‘চেনেন এঁকে?’

ডাক্তার বললেন, ‘আমার বাবা চিনতেন। আমি তখন ফোর-ফাইভে পড়ি, তখন শুনেছিলাম এক অপরূপ সুন্দরী বাইজি নিয়ে এসেছেন জমিদারদের বড়কর্তা। গুঞ্জাবাই নাম। সে সপ্তাহে একবার করে বের হত জমিদারবাড়ি থেকে। রাস্তায় যাকে পেত, তাকেই দান করত কিছু কিছু। বলত, ”পাপ ধুয়ে ফেলছি।” এ হল সেই গুঞ্জাবাইয়ের ছবি। এর দুয়ারেই পড়ে থাকতেন জমিদার শশীশেখর। এদিকে বড়বৌরানি একটা বাচ্চার জন্য হাহাকার করতেন। ”মা” ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল ছিলেন। পাড়ার ছোট বাচ্চা দেখলেই তাকে জড়িয়ে ধরে বলতেন, ”আমায় একবার মা বলে ডাকবি?” এই বলতে বলতে মাথাটা প্রায় খারাপ হয়ে গিয়েছিল। শশীশেখর নপুংসক ছিলেন, কিন্তু বন্ধ্যা দোষ দেওয়া হল বড়বৌরানিকে। শেষে এক পূর্ণিমার রাতে বড়বৌরানি একটা সাদা বেনারসি শাড়ি পরে, সিঁথির সিঁদুর তুলে, হাতের শাঁখা ভেঙে ঢুকলেন ওই বাইজির ঘরে।

গুঞ্জাবাই তখন নাচছিল শশীশেখরের সামনে। বড়বৌরানি নাকি সমান তালে নেচেছিলেন ওখানে। বলেছিলেন, ”আমিও পারি পুরুষের মন জয় করতে। আবার আমি খুন করতেও পারি।”

একই দিনে গুঞ্জাবাই, শশীশেখর আর বড়বৌরানির দেহ পাওয়া গিয়েছিল ওর ঘর থেকে।

ছোট-তরফের সবাই এমন ঘটনার পরে বাড়ি-ঘর ছেড়ে কলকাতা পালিয়ে গেছিলেন। পড়েছিল ক’জন দারোয়ান আর ওদের বাজার সরকার। তারা শুনেছি রাত হলেই বৌরানিকে দেখতে পেত। তারপর যা হয়, ধীরে ধীরে সবাই চলে গেছিল। আর কয়েকজন না খেতে পেয়ে মরে পড়েছিল ওই বাড়িতেই। শহরের একপ্রান্তে বলে ওদিকে কেউ বড় একটা যায় না। কলেজ টাইমে আমরা দু-একবার ওদিক দিয়ে এসেছি। কিন্তু দুপুরেও গা ছমছম করে বলে আর যাইনি।’

ডাক্তারবাবু ওষুধ বানিয়ে দিলেন।

হোমিওপ্যাথি ওষুধই টিপাইকে দিলেন বর্ণালী।

সুদর্শন বলল, ‘তাহলে রতন কেন এখনও বাড়ি পাহারা দেয়?’

ডাক্তারবাবু বললেন, ‘রতন চন্দ্র নামে ওদের একজন বাজার সরকার ছিল বলে শুনেছি। সে তো ছাদ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল। কোন রতনের কথা বলছেন বলুন তো?’

সুদর্শন আর কথা না বাড়িয়ে ফিরে এল হোটেলে। টিপাই খেয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু জ্বরটা ছাড়েনি। ঘুমের ঘোরেই চমকে উঠছে। ওষুধ খাইয়ে দিলেন বর্ণালী। তারপর বললেন, ‘টিপাই ওই মহিলাকে মা বলে ডাকার পরে কী হয়েছিল আপনার মনে আছে?’

সুদর্শন ঘাড় নেড়ে বলল, ‘না মনে নেই। আমি একটা তীব্র পচা গন্ধে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক কী হয়েছিল জানি না।’

বর্ণালী বললেন, ‘আমাকে হঠাৎ রতন বলল, ”গুঞ্জাবাই আপনি চলুন। মা ডাক শুনেছেন বৌরানি, এখুনি ছেড়ে দেবেন ওকে।” আমি কিছুই না বুঝে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম ওই মহিলা কোথায় যেন চলে গেল! আমি টিপাইকে নিয়ে কী করে নীচের উঠোনে এলাম জানি না। গুঞ্জাবাই কে? কিছুই বুঝলাম না।’

সুদর্শন বলল, ‘বর্ণালী, লাঞ্চ করেই আমরা কলকাতা রওনা দেব।’

বর্ণালী সুদর্শনের হাতের ওপরে হাতটা রেখে বললেন, ‘এভাবে বন্ধুর মতো পাশে থেকো প্লিজ।’

সুদর্শন ক্লান্তভাবে হেসে বলল, ‘লাঞ্চে কিছুই খেতে পারব না আমি। এখনও নাকের কাছে ওই লোকগুলোর মুখ ভাসছে, যারা আমাদের মুখ শুঁকছিল।’ টিপাইকে নিয়ে ওরা ফিরে এল কলকাতায়। সুদর্শন রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও স্বপ্ন দেখল, দুটো হাড়সর্বস্ব লোক ওর মুখের কাছে এসে নাক দিয়ে টেনে নিচ্ছে খাবারের গন্ধ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *