দীপিকা ঘরের সব লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখো অনি ঘরে কেউ নেই। কেউ তোমায় ফলো করছে না।’ ক্লাস ফোরের অরিত্র বাবার দিকে ঘুম চোখে ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে আছে। ওরও ঘুমটা ভেঙে গেছে। দীপিকা ছেলেকে জল খাইয়ে কোনো মতে ঘুম পাড়িয়ে দিল। অনির্বাণ বিছানা ছেড়ে ড্রয়িংয়ে এসে বসেছে। মুখটা থমথম করছে। দীপিকা ওর পাশে সোফায় এসে বসল। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ‘অবচেতন মনের ভাবনাগুলোই স্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে আমাদের কাছে। দেখবে আমরা যখন স্বপ্ন দেখি তখন বহু দূরের দিল্লীবাসী মামাও একই ছাদের নীচের বাসিন্দা হয়ে যায়। এর কোনো বিশেষ কারণ আছে কিনা ডক্টরেরা বলতে পারবেন। তবে আমি একটাই কথা বলতে পারি, স্বপ্নের অর্থ খুঁজতে যেও না অনি খুঁজে পাবে না। বরং অস্থিরতা বাড়বে বৈ কমবে না। চলো ঘুমাবে চলো।’
অনির্বাণ ধীর গলায় বলল, ‘দীপিকা বিশ্বাস করো, আমার মন বলছে এ স্বপ্নের সঙ্গে আমার বর্তমান আর অতীতের কিছু না কিছু যোগসূত্র আছেই। আর ওই মানুষটাকে আমি দেখেছি। আবছা হলেও খুব চেনা ওই মুখের রেখাগুলো। দীপিকা বলল, বেশ আবার দেখলে মনে পড়ে যাবে তুমি কাকে দেখেছো, এখন চলো। বুবাইয়ের আগামীকাল ম্যাথ এক্সাম আছে। সকাল সকাল উঠতে হবে আমায়। ওকে স্কুলে দিয়ে আমি অফিস যাব অনি।’
অনির্বাণ আনমনে বলল, ‘তুমি কি এটা আগে আমায় বলেছিলে?’ দীপিকা বুঝতে না পেরে বলল, ‘কোনটা বলতো?’ অনির্বাণ বিরক্তির সুরে বলল, ‘এই যে বুবাইয়ের আগামীকাল ম্যাথস আছে?’
দীপিকারও আর ভালো লাগছে না। সারাদিন অফিসে খেটে এসে ছেলেকে নিয়ে পড়তে বসাতে হয়। শুধু টিউশনের ভরসায় থাকতে পারে না ও। নিজে একবার না দেখলে শান্তি পায় না। তারপর মঞ্জুদি চলে যায় ওরা অফিস থেকে ঢুকলেই। তাই ডিনার সাজানো, বুবাইকে খাওয়ানো সব ঝামেলা মিটিয়ে রাতটুকু একটু নিশ্চিন্তে ঘুম না হলে পরের দিনটা টানবে কী করে? এই রাত দেড়টার সময় বসে অনির স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার মতো বিলাসিতা করার সময় নেই ওর। দীপিকা বলল, ‘তুমি তাহলে ভাবনা চিন্তা করো, তোমার দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা কর। আমি ঘুমাতে চললাম।’ অনির্বাণ বলল, ‘বললে না তো বুবাইয়ের ম্যাথস এক্সামের কথা কি তুমি সারাদিনে আমায় বলেছিলে?’ দীপিকা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি অফিস থেকে ফেরার পরে বুবাই তো তোমায় বলল। তখন তো তুমি উদায়দার সঙ্গে কলেজের ব্যাপারে কিছু একটা ডিসকাস করছিলে ফোনে। এনিওয়ে, আমি চললাম ঘুমাতে। তুমি এসো।’ অনির্বাণ বলল, ‘দীপিকা আগামীকাল আমারও কলেজ আছে। আমিই নাহয় বুবাইকে ওর স্কুলে ছেড়ে দিয়ে যাব।’
দীপিকা একটু অবাক হয়ে তাকাল অনির দিকে। গার্জেন মিটিংয়ে পর্যন্ত দীপিকাকেই পাঠায় অনি। এক্সামের দিনগুলোতে অনেকের পেরেন্টরা ড্রপ করে দেয় স্কুলে, তাতেও কোনোদিন ইন্টারেস্ট দেখায়নি অনি। বুবাইয়ের সবটুকুই দীপিকা দেখে। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে বুবাইয়ের সঙ্গে আধঘন্টা কার্টুন দেখা ছাড়া। ওই আধঘন্টা বাবা আর ছেলে মিলে অনেক আগডুম-বাগডুম গল্প করে। বুবাই স্কুলের বন্ধুদের গল্পও করে। দীপিকা রোজই কিচেন থেকে শুনতে পায়। এটা ওদের খুব প্রেশাস টাইম। অনি এই টাইমটাতে কোনো ফোন এলেও রিসিভ করে না। বাদবাকি বুবাইয়ের অ্যাবাকাস ক্লাস থেকে সাঁতার সব দায়িত্ব দীপিকার। আজ হঠাৎ হল টা কী? দীপিকা মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না অনির্বাণকে। কী যে ভাবে আনমনে কে জানে! অনি এখনও ডুবে আছে কোনো ভাবনার গভীরে। সেটা ওর ভ্রুর মাঝের ভাঁজ আর চোখের দৃষ্টি থেকেই বোঝা যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটাদুটো যেন একশো মিটারের দৌড় প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে। এখন দুটো কাঁটাই পাল্লা দিয়ে ছুটে পৌঁছে দুইয়ের ঘরে। দুটো দশ বেজে গেছে। দীপিকা বুবাইয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। বুবাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেও চোখ বন্ধ করল। বুবাই ওদের সন্তান হয়ে কেন যে ম্যাথসে এত কাঁচা হল কে জানে! অনির্বাণ মাধ্যমিকে অঙ্কে লেটার পেয়েছিল। পরে অবশ্য ও ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি নিয়ে পড়ে প্রফেসর হয়েছে সেটা আলাদা বিষয়। কিন্তু অঙ্কে ইন্টারেস্ট ছিল না এমন নয়। আর দীপিকা তো বরাবরই সায়েন্সের মেয়ে। ফিজিক্স নিয়ে পড়াশোনা করেছে। ব্যাংকে চাকরি করে। এখনও যদি ওকে কেউ জিজ্ঞাসা করে প্রিয় সাবজেক্ট কি ফিজিক্স না ম্যাথস? ও চোখ বন্ধ করে উত্তর দেবে অঙ্ক।
অথচ বুবাই ম্যাথস দেখলেই প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ‘মাম্মাম ভয় করছে।’
কী করে যে ওর এই ভয়টা কাটানো যায়। অ্যাবাকাসটা যদি এই ভয়টা কাটিয়ে দেয় তো দীপিকা নিশ্চিন্ত হয়ে যাবে। বাদবাকি বুবাই খুব বাধ্য ছেলে। ওদের সবসময়ের পরিচারিকা মঞ্জুদিও বুবাইয়ের নামে একই প্রশংসা করে। এলোমেলো কথা ভাবতে ভাবতেই কখন চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল টের পায়নি দীপিকা। সকাল সাতটায় অ্যালার্ম বাজার শব্দে ধড়ফড় করে উঠল ও। বুবাইকে রেডি করতে হবে। এ এক বড় কাজ। বিছানার পাশে তাকিয়ে দেখল অনির্বাণ নেই। যাঃ বাবা, অনি কি সারারাত ড্রয়িংরুমে কাটল নাকি! দীপিকা উঠে ড্রয়িংয়ে এসে দেখল অনি সোফায় বসে বসে ঢুলছে। মুখটা দেখে কষ্ট হল দীপিকার। মঞ্জুদি এসে গেছে বেল বাজাচ্ছে। বেলের শব্দে অনিও উঠে পড়েছে। দীপিকার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাথাটা টিসটিস করছে একটু কড়া করে চা করে দিতে বলো তো মঞ্জুদিকে। আর শোনো কলেজে আমার ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্টরা অজন্তা যাবে বলে ঠিক করেছে। সম্ভবত আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি আমিই যাব ওদের নিয়ে।’ দীপিকা বলল, ‘ভালোই হবে। বুবাইয়ের এক্সাম শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাহলে আমি কদিন মায়ের কাছ থেকে অফিস করব। বুবাইয়েরও মামাবাড়ি ঘোরা হয়ে যাবে।’ অনি ঘাড় নেড়ে বলল, ‘তাই করো তাহলে।’
দীপিকা বলল, ‘দিনদিন ব্যাংকে যা কাজের চাপ বাড়ছে ওবাড়ি লাস্ট কবে গেছি ভুলে গেছি। মাঝে একদিন মায়ের ওষুধ কিনে দিতে গিয়েছিলাম। মাত্র ঘন্টাখানেক ছিলাম। বাবা-মা দুজনেই বুবাইকে নিয়ে কদিন থাকতে বলছিল। এই সুযোগে ঘুরে আসব। হ্যাঁ গো মহারাষ্ট্র যেতে ছাড়বে তোমাদের স্টুডেন্টদের অভিভাবকরা? এখনকার বাবা-মায়েরা কত ভালো হয়। আমাদের সময় তো মেয়ে সন্ধে ছটার পরে বাড়ির বাইরে আছে মানে মহাভারত উল্টে যাবার অবস্থা হত।’
অনির্বাণ অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘কলেজ তো অনেক দূর, এখন স্কুল এক্সকারসনে উটি নিয়ে গেছে স্টুডেন্টদের জানো? আমাদের বিনয়কদার মেয়ে ইলেভেনে পড়ে। এই তো উটি থেকে ঘুরে এল। বিনয়কদা বলছিল, টিচাররা নাকি অত্যন্ত যত্ন করে ঘুরিয়ে এনেছেন।’ দীপিকা লক্ষ করল, ‘অনি সব কথাই বলছে কিন্তু ভীষণ রকমের অন্যমনস্ক। বুবাইকে রেডি করতে করতেই ম্যাথসে শর্ট কোশ্চেন কেমন আসতে পারে তার একটা ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করছিল দীপিকা বুবাইয়ের মনে। সঙ্গে ম্যাথস অনেকটা ম্যাজিকের মতো, কয়েকটা সংখ্যা পরপর ঠিক করে লিখলেই গেম ওভার হয়ে যায়। এসব বলে বুবাইয়ের অঙ্কে আতঙ্কটা কাটানোর চেষ্টা করছিল। অন্য এক্সামের দিনে বুবাই বেশ ফ্রি মাইন্ডে যায় পরীক্ষা দিতে। কিন্তু ক্লাস টু থেকে শুরু হয়েছে অঙ্কে ভয়। এই ভয়ের চোটেই প্রতিবার জানা অঙ্কগুলো ভুল করে আসে বুবাই। ওর টিচার সন্দীপন বলে, দিদি বাড়িতে সব ঠিক করে গিয়েছিল। খাতা চেক করেও দেখেছে দীপিকা বাড়িতে ঠিক করেছিল যে অঙ্ক সেটাই পরীক্ষাহলে গিয়ে ভুল করে এসেছে। হয়ত পাঁচের জায়গায় সাত লিখে এসেছে। অথবা মাইনাস প্লাসে ভুল করেছে। যেটা ওর একেবারেই করার কথা নয়। গতবার গার্জেন মিটিংয়ে বুবাইয়ের ম্যাথসের ম্যাম রূপকথা বললেন, ‘মিসেস দীপিকা রায়, আপনার ছেলে অরিত্র কেন ম্যাথসে এত ভয় পাচ্ছে একটু নজর করুন প্লিজ। আমরা স্কুলে সবরকম ট্রাই করছি ওদের কোনো বিশেষ সাবজেক্টের ওপরে ভয় কমাতে। কিন্তু বাড়িতেও একটু নজর রাখুন।’ লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিল দীপিকার। এমনিতেই জব করা মায়েদের নামে দোষ হয়, তারা নাকি সঠিকভাবে সন্তানকে সময় দেয় না। আর কীভাবে চেষ্টা করবে দীপিকা!
অনির্বাণ চা খেয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘বুবাই রেডি? তাহলে আমি ওকে ড্রপ করে দিয়ে একবার ট্যাক্সের রাজীবদার সঙ্গে দেখা করে কলেজে ঢুকবো। আজ যখন একটু তাড়াতাড়ি বেরোচ্ছি তখন রাজীবদার কাছে গিয়ে কাজের কথাটা সেরে ফেলব।’ দীপিকা বলল, ‘রাজীবদা তো বলেছিল, ওদের বাড়িটা যাকে দিয়ে ইন্টিরিয়ার করিয়েছিল তাদের বলে আমাদেরটাও কমে করিয়ে দেবে। তারপর তো আর আমরাই যোগাযোগ করিনি।’ অনির্বাণ বলল, ‘সময়ই তো পাই না।’
বুবাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে অনির্বাণ। আজ একটু পরে বেরোলেও চলবে দীপিকার। অন্যদিন ওকে স্কুল বাসে তুলে দেবার জন্য তাড়াহুড়ো করে দীপিকা। শুধু এক্সামের দিনগুলোতে নিজে দিতে যায়। ছেলেটা চায় ওকে এই দিনগুলোতে। কিছুই না, হয়তো মা স্কুলের গেট অবধি গেলে একটু ভরসা পায়।
ওরা বেরিয়ে যাবার পরেই নিজে আরেককাপ চা নিয়ে বসল দীপিকা। আচমকা আজ অনি কেন নিজে যেতে চাইল বুবাইকে দিতে? অনির মধ্যে কাল রাত থেকে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন দেখেছে দীপিকা। কেমন যেন একটু অন্যমনস্কভাব। কিছু যেন অবিরাম চলছে ওর মাথায়। দীপিকা রেডি হয়ে অফিস বেরিয়ে গেল।
দুপুরেই বাড়িতে ফোন করে খোঁজ নিল বুবাইয়ের কাছে, ‘এক্সাম কেমন হয়েছে।’ বুবাই একটা অদ্ভুত কথা বলল দীপিকাকে। বলল, ‘মাম্মাম পাপা বলছিল রূপকথা ম্যামকে পাপা চেনে। কোথায় যেন দেখেছে। ম্যামের কোথায় বাড়ি, বাড়িতে কে কে আছে, সারনেম কী এসব জানতে চাইছিল। আমি তো এত জানি না। শুধু সারনেমটা ঘোষাল শুনে পাপা কেমন যেন হয়ে গেল।’ তারপর আমি স্কুলে ঢুকে গেলাম।
বুবাই বলল, ‘এক্সাম ভালোই হয়েছে।’
দীপিকার চিন্তা বাড়ছে। অনি কেন এমন অদ্ভুত বিহেভ করছে কিছুই তো বুঝতে পারছে না ও। রূপকথা ম্যামকে হয়ত আজকেই প্রথম দেখল অনি তারপরে ওর মনে কেন মনে হচ্ছে রূপকথাকে ও চেনে!
দীপিকা কল করল অনির্বাণকে। ফোনটা রিসিভ করেই অনি বেশ চিন্তিত স্বরে বলল, ‘বুবাইয়ের এক্সাম কেমন হল? পেরেছে সব অঙ্ক?’ দীপিকা বলল, ‘হয়তো পেরেছে। কিন্তু তুমি এত টেন্সড কেন অনি? কিছু হয়েছে?’ বুবাই বলছিল, ‘ওদের ম্যাথস টিচারকে নাকি তুমি চেনো। বুঝতে পারছি না কিছুই।’
গলায় একটু অস্বস্তি মিশিয়ে অনি বলল, ‘ও কিছু না। অনেকের সঙ্গে অনেকের মুখের মিল থাকে, তখন চেনা চেনা লাগে। তাই হয়ত। চলো ক্লাসে যেতে হবে রাখছি।’
দীপিকা রোজই লক্ষ করছে, রাতে ঘুমের আগে অনির্বাণ ব্যালকনিতে পায়চারি করছে। দীপিকাকে বলেছে, ‘একঘুমে সকাল হলেই নিশ্চিন্ত বুঝলে। মাঝে স্বপ্ন না এলেই হয়।’ দিনরাত যেন আতঙ্কে আছে অনি। দীপিকার খুব হেল্পলেস লাগে আজকাল। পরিচিত মানুষটা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। অজন্তা গেলে ভালোই হবে। একটু চেঞ্জ দরকার ওর। তারপর দুজনেরই ছুটি অ্যাডজাস্ট করে একটা ট্যুর প্ল্যান করবে দীপিকা। বুবাই পর্যন্ত পাপার দিকে অপলক তাকিয়ে বলেছে, ‘তুমি কি ভূতের স্বপ্ন দেখো পাপা? আমি তো তোমার পাশেই শুয়ে থাকব। ভূত এলেই ঢিসুম করে দেব।’ পাপাকে সাহস জোগানোর জন্য নিজের লাইট আর সাউন্ড হওয়া বন্দুকটা মাথার কাছে নিয়ে শুয়েছে আজ বুবাই।
আজ দুদিন হল অনির্বাণ কলেজ স্টুডেন্টদের নিয়ে অজন্তা গেছে। সঙ্গে ওর ডিপার্টমেন্টের বিদিশাদি আর রক্তিমদা। দুজনের সঙ্গেই দীপিকার খুব ভালো রিলেশন। বুবাইয়ের বার্থডে পার্টিতেও এঁরা আসেন। বিদিশাদি আর ওনার হাজবেন্ড দুজনেই ভীষণ মিশুকে মানুষ। ওদের বাড়িতেও গেছে দীপিকা। আর রক্তিম স্যার একটু গম্ভীর টাইপ। কিন্তু দীপিকার সঙ্গে ভালোই গল্প করেন। ওরা দুজন গেছে বলেই একটু নিশ্চিন্ত আছে দীপিকা।
বাবা, মা দুজনেই বুবাইকে পেয়ে যেন বাচ্চা হয়ে গেছে। বুবাইও দাদু-দিদাকে পেয়ে খুব খুশি। অনির্বাণের বাবা-মা মারা গেছেন বুবাইয়ের জন্মের আগেই। তাই ঠাকুরদা-ঠাকুমাকে তো চিনলোই না বুবাই। অনির বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। বুবাই তাই দাদু-দিদার অবসর সময়টা বেশ ভরিয়ে রেখেছে এ কদিন। এখান থেকেই ব্যাংকে যাচ্ছে দীপিকা। অনির সঙ্গে দুবেলাই নিয়ম করে কথা হচ্ছে। ওখানে গিয়ে যেন গলার সেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ভাবটা একটু কেটেছে অনির। দীপিকার অন্তত তাই মনে হয়েছে। কিন্তু রাত দুটোর সময় রক্তিমদার ফোনে ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙেছে দীপিকার। রক্তিমদা বললেন, ‘দীপিকা, অনির্বাণ কেমন একটা করছে। প্যানিক অ্যাটাক নাকি বুঝতে পারছি না। আমি আর ওর একই রুম শেয়ার করছি। আচমকা দেখি ও উঠে বসে থরথর করে কাঁপছে। আর বলছে, ওই চোখ দুটো আমার ভীষণ চেনা। তুমি এ বিষয়ে কিছু জানো দীপিকা?’ দীপিকা বলল, ‘রক্তিমদা দিন দশেক আগেও বাড়িতে স্বপ্ন দেখে এরকম করেছিল। বুঝতে পারছি না ঠিক কী সমস্যা হচ্ছে!’ রক্তিমদা বললেন, ‘তুমি ইমিডিয়েট একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করো। একটা কাউন্সেলিং দরকার। সম্ভবত ও কোনো কিছু নিয়ে খুব ডিস্টার্বড আছে। দীপিকা বলল, ফোনটা একবার ওকে দিন।’
অনি ফোন ধরেই ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘দীপিকা ওই চোখদুটো আমার খুব চেনা। তুমি অন্তত বিশ্বাস করো, এটা নিছক স্বপ্ন নয়।’
দীপিকা শান্ত গলায় বলল, ‘কার চোখ দেখতে পাচ্ছ তুমি অনি? তুমি কি সেই মানুষটাকে চেনো?’
অনির্বাণ চুপ করে গেল। ফিসফিস করে কী যেন বলল।
বাড়ি ফিরেও একেবারে চুপ করে আছে অনি। কলেজে সাতদিনের ছুটির অ্যাপ্লিকেশন করেছে। ওর নাকি কলেজ যেতে ইচ্ছে করছে না।
রবিবার সন্ধেতে ডক্টর প্রসূন দাসগুপ্তর কাছে নিয়ে যাবে দীপিকা। অনির্বাণ দু-একবার গাইগুঁই করেছে। যেতে চায় না। কিন্তু দীপিকা আমল দেয়নি। বিদিশাদি ফোনে দীপিকাকে বলেছেন, ‘সেদিন রাতে রক্তিমদার ডাকে আমি ওদের ঘরে যাই। অনির্বাণকে দেখি সে রীতিমত ভয়ে কাঁপছে। চোখের দৃষ্টি অপ্রকৃতিস্থদের মতো। তুমি ওকে খুব তাড়াতাড়ি ডক্টর দেখাও।’ তাই দীপিকা আর বিষয়টাকে শুধুই স্বপ্ন বা অবচেতন মনের ভাবনা বলে ফেলে রাখতে চায় না।
ডক্টর প্রসূন দাশগুপ্তর বয়েস বছর পঞ্চাশ হবে। শান্ত সৌম্য স্থিতধী। ভদ্রলোকের কথা বলার ভঙ্গীতে একটা আকর্ষণী শক্তি আছে। দীপিকা অনির্বাণ চেম্বারে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে চলে আসতে চাইছিল। অনির্বাণই ওর হাতটা চেপে ধরে ছেলেমানুষের মতো বলল, ‘তুমিও থাকো।’
ডাক্তারবাবু ইশারায় দীপিকাকেও বসতে বললেন।
পুরো বিষয়টা শুনলেন মন দিয়ে। তারপর একটা সাদা খাতায় একটা বিন্দু এঁকে বললেন, ‘মিস্টার রায় আপনি এদিকে তাকান। একদৃষ্টে তাকাবেন। কী দেখতে পাচ্ছেন বলুন আমায় আস্তে আস্তে। বাবা বকছে দেখুন আপনাকে, আপনি স্কুলে যেতে চাইছেন না বলে। ওই দেখুন আপনার মা আপনার পিছনে লাঠি নিয়ে তাড়া করেছে। আপনি পালাচ্ছেন, ছুটছেন ছুটছেন কেউ ধরতে পারছে না আপনাকে। কার ভয়ে ছুটছেন মিস্টার রায়?’
অনির্বাণ কাঁপা গলায় বলল, ‘অঙ্কের ভয়ে। শম্ভুচরণ ঘোষাল, আমাদের ক্লাস টিচার। ম্যাথসে গোল্ড মেডেলিস্ট। হাতে লাঠি নিয়ে ঢোকেন। যারা অঙ্ক পারে না তাদের বোর্ডে ডেকে এনে বারবার বুঝিয়ে দেন অঙ্ক। কিন্তু তারপরেও যারা পারে না, স্যার তাদের মারেন।’
ডক্টর বললেন, ‘স্যার আপনাকে খাতায় কম নম্বর দিলেন, আপনি ফেল করে গেলেন, আপনার বাবা বকলো, তারপর?’
দীপিকা অপলক তাকিয়ে আছে অনির দিকে। ‘অনির অঙ্কে ভয় ছিল? কই কোনোদিন বলেনি তো! বরং ও মাধ্যমিকে নাইনটি টু পেয়েছিল সেটাই তো বলে গর্ব করে।’
অনির্বাণ বলল, ‘আমার বাবা ছিলেন আমাদের স্কুলের সেক্রেটারি। তাই স্কুলের সবাই একটু অন্যচোখে দেখত আমায়। একমাত্র শম্ভুচরণ স্যারের এসব ভ্রূক্ষেপ ছিল না। সেক্রেটারির ছেলে বলে বেশি নম্বর দেবেন এমন নয়। ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠতে অঙ্কে ফেল করলাম। রেজাল্ট দেখেই বুঝলাম, বাবা ছেড়ে দেবে না। বাবার প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে যাবে।
তাই বাড়িতে গিয়ে বললাম, ‘সব সাবজেক্টে বেশি নম্বর পেয়েছি, শুধু ম্যাথসে ফেল। শম্ভুস্যার ইচ্ছে করে আমায় কম দিয়ে ফেল করিয়ে দিয়েছে।’
বাবা রাগে গজগজ করলেন। বললেন, ‘মাধ্যমিকে যদি ভাল নম্বর পাস তাহলে ওই স্যারকে দেখে নেব।’
আমি শম্ভু স্যারের কাছে অঙ্কে ভর্তি হলাম। বাবাই ভর্তি করে দিয়ে এল। স্যার খুব যত্ন করে আমায় হাতে ধরে ধরে অঙ্ক কষাতে লাগলেন। ধীরে ধীরে আমার অঙ্কের ভয়টা কেটে গেল। আমি এক বছরের মধ্যে অবলীলায় অঙ্ক কষতে লাগলাম। টেস্টে ভালো নম্বর পেলাম। মাধ্যমিকে বিরানব্বই। বাবা তখন সবাইকে বলতে শুরু করল, ‘শম্ভুস্যারের কাছে টিউশন না পড়লে উনি ভালো করে পড়ান না। স্কুলে কিছুই শেখান না ইচ্ছে করে। স্টুডেন্ট বাড়াবেন বলে স্কুলে অঙ্কে ফেল করিয়ে দেন। চারিদিকে কথাটা আগুনের মতো রটে গেল। স্যার ট্রান্সফার নিলেন। স্যারের চোখে আমার প্রতি ঘৃণা দেখেছিলাম। স্যার কাঁদছিলেন। আমায় বলেছিলেন, ‘মিথ্যে কথার এত জোর? এ যে অঙ্কের সমাধানের থেকেও দ্রুত হয় দেখছি।’
তারপর আর স্যারের খোঁজ পাইনি আমি। অন্য কোন স্কুলে চলে গিয়েছিলেন স্যার। নিজের বাড়িঘর ছেড়ে।
আমার ছেলেরও অঙ্কে ভয়, ঠিক আমার মত। এতদিন পরে শম্ভু স্যার আবার আমার স্বপ্নে আসছেন। সেই চোখ, জল টলটল করছিল আর ঘৃণা ঠিকরে বেরোচ্ছিল। আমি মিথ্যে বলেছি, বাবাকেও মিথ্যে বুঝিয়েছিলাম।’
অনির্বাণ দম নিল। আবার বলল, ‘শম্ভুচরণ ঘোষালের মেয়ে রূপকথা বুবাইয়ের স্কুলের ম্যাথের টিচার। ও যদি চিনে যায় বুবাই আমার ছেলে! আমি ওদের স্কুলের অনুষ্ঠানের ছবিগুলো দেখছিলাম তখনই চিনেছি রূপকথাকে। আমরা যখন পড়তে যেতাম ও বসত স্যারের কাছে। স্যারের মুখটা বসানো। একইরকম দেখতে।’
ডক্টর প্রসূন দাশগুপ্ত বললেন, ‘দীপিকা আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। যেভাবেই হোক শম্ভুবাবুর সঙ্গে একবার অন্তত ওনাকে সামনাসামনি বসাতে হবে। মনের গভীরে যে অপরাধবোধ বাসা বেঁধেছে সেটাকে কাটাতে হবে। নাহলে এ স্বপ্ন মাঝে মাঝেই আসবে। মিস্টার রয় এখন আতঙ্কে ভুগছেন, অপরাধবোধ ওনাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।’
দীপিকা আর অনির্বাণ বাড়ি ফিরছে। দীপিকা ড্রাইভ করছে। ইচ্ছে করেই আজ অনির্বাণের হাতে স্টিয়ারিং দেয়নি। ও এখনও বিধ্বস্ত হয়ে আছে। অস্ফুটে একবার বলল, ‘দীপিকা তুমি কি আমাকে এবার থেকে ঘৃণার চোখে দেখবে? আমি যে অন্যায় করেছি তার কি সত্যিই ক্ষমা আছে? আমি আমার শিক্ষাগুরুকে ঠকিয়েছি। তিনি আমায় হাতে ধরে অঙ্ক শিখিয়েছেন আর আমি তাঁকে বদনাম করেছি। যে পাপের কি কোনো ক্ষমা আছে? বুবাইয়ের সেদিনের স্কুলের অনুষ্ঠানের ফটোগুলো দেখতে দেখতেই রূপকথাকে দেখতে পেলাম। সেই চোখ, সেই মুখ ঠিক যেন শম্ভুবাবু বসে আছেন।’ বুবাই বলল, রূপকথা ঘোষাল। আমরা যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন রূপকথা সম্ভবত ক্লাস সিক্স। তখন থেকেই ও অঙ্কে এক্সপার্ট ছিল। দীপিকা ও নিশ্চয়ই ওর বাবার কাছে আমার ব্যাপারে শুনেছে। হয়তো বুবাইয়ের বাবা হিসেবে আমাকে চিনে যাবে। তারপরে যদি বুবাইয়ের ওপরে কোনো রিভেঞ্জ নেয়? আমার পাপের শাস্তি কি আমার ছোট ছেলেটা পাবে দীপিকা? ওকে কি স্কুল চেঞ্জ করাবে?’
দীপিকা বলল, ‘শান্ত হয়ে বসো। কালকে আমরা একটা জায়গায় যাব। অনির্বাণ অস্থির হয়ে পড়েছিল ক্রমশ। বারবার বলছিল, পাপ বাপকে ছাড়ে না। ঠিক ফিরে আসে। ওইজন্যই বুবাই অঙ্কে ভয় পেতে শুরু করেছে ঠিক আমার মত।’
দীপিকার ফোনে রূপকথার ফোন নম্বর আছে। ক্লাস টিচারের নম্বর স্কুল থেকেই দেয় গার্জেনদের। এবারে ক্লাস ফোরের বুবাইয়ের ক্লাস টিচার রূপকথা। বাড়ি ফিরেই রূপকথাকে ফোনটা করল দীপিকা। ভয় যে করছিল না, তা নয়। যদি ডিরেক্ট অপমান করে দেয়! কিন্তু দীপিকা নিরুপায়। অনির্বাণকে এত অসহায় অবস্থায় ও দেখতে পারছে না। রূপকথা ফোনটা রিসিভ করতেই দীপিকা বলল, আমি ক্লাস ফোরের অরিত্র রায়ের মা বলছি ম্যাম।
রূপকথা শান্ত গলায় বলল, ইয়েস ম্যাডাম বলুন।
দীপিকা বলল, ‘আমি আজ আপনার স্টুডেন্টের বিষয়ে কিছু বলবো না। আমি একটা অন্য বিষয়ে কথা বলবো। আপনার বাবা শম্ভুচরণ ঘোষাল এখন কোথায় থাকেন?
রূপকথা একটু অবাক হয়েই বলল, বাবা রিটায়ার করেছেন। এখন বাড়িতেই আছেন। কেন বলুন তো? দীপিকা বলল, বাড়ি বলতে আপনাদের পুরোনো বাড়িতে?
রূপকথা বলল, না না ওটা তো বিক্রি করে দিয়েছিলাম। এখন একটা ফ্ল্যাট কিনে আছে বাবা আর মা। আমার শ্বশুরবাড়ির পাশেই। কেন বলুন তো?’
দীপিকা বলল, ‘প্লিজ ম্যাম অ্যাড্রেসটা একটু লাগবে আমার। আমি একবার ওনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
রূপকথা ঠিকানাটা দিয়ে বলল, ‘সকালের দিকে আসুন। সন্ধেতে বাবা একটু ব্যস্ত থাকেন।’
অনির্বাণ স্যারের ফ্ল্যাটের সামনে এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পা দুটো অবশ হয়ে গেছে ওর। দীপিকা বলল, ‘বি স্টেডি অনি। এই সুযোগ ওনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও।’
দরজা খুললেন একজন বয়েস ষাটের মহিলা। বললেন, ‘কাকে চান?’
দীপিকা বলল, ‘শম্ভু স্যার আছেন?’ ভদ্রমহিলা ওদের দুজনকেই আপাদমস্তক দেখে বললেন, ‘আসুন ভিতরে আসুন।’
স্যার কাগজ পড়ছিলেন সোফায় বসে। অনির্বাণ দেখল সেই লম্বা টানটান শরীরটা যেন বয়েসে ভারে অল্প হলেও ন্যুব্জ হয়ে গেছে। মাথায় সাদা চুলের আধিক্য। স্যারের বয়েস পঁয়ষট্টি হবে। চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। শুধু বসার ভঙ্গিমাটি সেই একই আছে। ঋজু, দৃঢ় ভঙ্গিমা। কোনো অন্যায়ের সামনেই মাথা ঝোঁকানোর মানসিকতা সম্ভবত আজও তৈরি হয়নি।
অনির্বাণ বেশ ঘামছে। দীপিকা বলল, ‘যাও।’
কত বছর পরে স্যারকে দেখছে অনি। সেই ষোলো বছরে শেষ দেখেছিল। স্যারের একটা ছেলে ছিল মনে পড়ছে। ওদের যখন মাধ্যমিক সে তখন টুয়েলভে পড়ছে। রূপকথা আর ওর দাদা দুজনেই অঙ্কে ভালো ছিল খুব। এই মুহূর্তে ছেলেটার নাম মনে করতে পারছে না অনি।
স্যারের পায়ের কাছে গিয়ে বসল অনি মাথা নিচু করে।
শম্ভুচরণ ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘একি, পায়ের কাছে কেন? সোফায় বসুন।’ অনি বলল, ‘স্যার আমায় চিনতে পারছেন?’
শম্ভুচরণ তীক্ষ্নভাবে তাকাল অনির দিকে। যেন স্মৃতির হলদে পাতা খুঁজে সদ্য গোঁফের রেখা দেখা যাওয়া একটা ছেলের মুখের সঙ্গে বছর চল্লিশের মুখের মিল খোঁজার তীব্র চেষ্টা করে চলেছেন। তারপরেই উৎফুল্ল হয়ে বললেন, ‘আরে এ যে আমাদের অনির্বাণ। সেকেন্ড ব্রাকেট আর থার্ড ব্রাকেট অঙ্কে থাকলেই হাত কাঁপতে শুরু করত। বল বাবা বল, কেমন আছিস তোরা বল।’
অনির্বাণ স্যারের পায়ে হাত দিয়ে বলল, ‘স্যার আপনি আমায় ক্ষমা করেছেন?’
শম্ভুচরণ বললেন, ‘দুষ্টুমির বয়েসে দুষ্টুমি করেছিস, সেসব মনে রাখলে কি চলে? তুই মাধ্যমিকে যেদিন অঙ্কে বিরানব্বই পেলি সেদিন আমি বাড়িতে তোর কাকিমাকে বলেছিলাম, আজ আমার রাজ্য জয়ের আনন্দ হচ্ছে। একদিন এই ছেলেটা সব অঙ্ক ভুল করেছিল বলে একে আমি ফেল করিয়ে দিয়েছিলাম। তুই অঙ্ক পারতিস না তা তো নয়। তুই ভুল করতিস ভয়ে। হয়তো আমাদেরই শেখানোর পদ্ধতিতে ভুল ছিল তাই।’
অনি বলল, ‘স্যার আমি আপনার নামে মিথ্যে রটিয়েছিলাম। আপনাকে ওই স্কুল ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল।’
স্যার বললেন, ‘তাতে কী হল? যে স্কুলে গিয়েছিলাম সেখানেও তো ছেলেদের তৈরি করেছি। তুই প্রফেসার? ওরে এ যে কী আনন্দ।’ দীপিকা একটা প্যাকেট নামিয়ে রাখল স্যারের সামনে। শম্ভুচরণ প্যাকেটটা তুলে দেখলেন, মিষ্টির বড় প্যাকেট আর খান দুই বই।
স্যারের ছেলে ডাক্তার। ডাক্তার রূপাঞ্জন ঘোষাল। অর্থোপেডিক ডিপার্টমেন্টে আছে। অনির্বাণের স্বপ্ন শুনে হো হো করে হেসে বললেন, ‘তাহলে স্বপ্নেও তোকে অঙ্কের ভূতটা ছাড়েনি বল?’ অনির্বাণ বলল, ‘স্যার আমার ছেলেরও আমার মতোই অঙ্কে ভয়।’
শম্ভুচরণ হেসে বললেন, ‘ওকে সপ্তাহে দুদিন পাঠিয়ে দে আমার কাছে। রূপকথাকে দিয়ে পাঠিয়ে দে। ওকে আমি ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি নিয়ে নয়, অঙ্ক নিয়ে পড়িয়েই ছাড়বো।’
অনির্বাণ কাঁদছে, শিক্ষক মারলে যেভাবে কাঁদে সেই ভাবে কাঁদছে। শম্ভুচরণ ওর চোখ দুটো মুছিয়ে দিয়ে বললেন, ‘অপরাধবোধ যাদের মধ্যে তৈরি হয়, ক্ষমা চাওয়ার প্রবণতা যাদের মধ্যে রয়ে যায় তারাই তো মানুষ রে। আমি তোদের প্রকৃত মানুষ করতে পেরেছিলাম বলেই আজ তুই ছুটে এসেছিস আমার কাছে।’
বুবাই শম্ভুচরণ ঘোষালের কাছে সপ্তাহে দুদিন অঙ্ক করতে আসবে এটাই ঠিক হল।
দীপিকা বাড়ি ফিরতে ফিরতে বলল, ‘অনি আজ বড্ড হিংসে হচ্ছিল তোমায়, যখন তোমার স্যার তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছিলেন, তোরা তো আমার সন্তানের মতো। বিশ্বাস করো জীবনে প্রথমবার হিংসে করলাম তোমায়।’
অনির্বাণ বলল, ‘বুবাইয়ের অঙ্ক নিয়ে আর চিন্তা নেই দীপিকা। স্যার ওকে মানুষ করে দেবেন। অপরাধবোধের বোঝাটা সরে যেতে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারছি আমি।’ অনি জোরে শ্বাস টেনে বলল, ‘মুক্তি।’
