স্যার যথারীতি ক্লাসে ঢুকেই বোর্ডের লেখাটা দেখে মুচকি হেসে বললেন, ‘বুঝেছি তোরা নতুন কিছু শিখতে চাস।
আচ্ছা দেখ Cats & Dogs যদি লিখিস মানেটা কি হয় বল দেখি?
দেখিস বাপু পাল পাল কুকুর বিড়াল বলে বসিস না। এ হল বর্ষাকালের হেভি বৃষ্টি। যে বৃষ্টিতে আমরা বাড়িতে খিচুড়ি খাওয়ার বায়না করি। যে বৃষ্টিতে আমরা স্কুলে রেনি ডে বলে ছুটি দিই। তেমন প্রবল বৃষ্টিকে বলে Cats and dogs। হ্যাঁ এবার যদি তোরা বানান ভুল করে Cut বানান লিখে ফেলিস, তখন কী হবে?
Cut someone some slack- কাউকে অতিরিক্ত সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।’
এভাবে কখন যে দেবেশ স্যার চল্লিশ মিনিটের ক্লাসটা শুধু পড়াতে পড়াতে কাটিয়ে দিতেন ছেলেরা টের পেত না। কিন্তু তবুও স্যারকে কেউ পছন্দ করত না তার একটাই কারণ স্যার কোনো সাজেশন দিতেন না। অমুক প্রশ্ন পরীক্ষায় আসবে ভালো করে করিস এমন কথা সব স্যারেরা বললেও দেবেশ স্যারের মুখ দিয়ে শোনা যেত না। আর স্যার প্রশ্নও করতেন যথেষ্ট ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে। এই কারণে ছেলেরা স্যারকে দেখলেই ব্যঙ্গ করতে ছাড়ত না।
দেবেশ স্যারের স্ত্রী অঞ্জনাও বলত, ‘দিনরাত ছাত্রদের জন্য নোট তৈরি না করে নিজের ছেলেটাকে আরেকটু পড়ালে তো কাজে আসতো।’ দেবেশ স্যারের একটাই কথা, ‘আমার কাছে সব ছাত্র সমান।’
কী ধাতু দিয়ে যে তৈরি স্যার কেউ বুঝতে পারত না। কিছুতেই যেন স্যারের রাগ নেই, বিরক্তি নেই।
অর্ণবের সামনেই দেবেশ স্যারকে নিয়ে গোটা ক্লাস মজা করে, মিম বানায়। ক্যারিকেচার করে দেখায় স্যারের হাঁটাচলা। অনেকেই হয়তো জানেই না অর্ণব দেবেশ স্যারের ছেলে। কারণ দেবেশ স্যারের কাছে যেহেতু বিহারীনাথের সমস্ত ছেলেই সমান তাই স্কুলে স্যারের নির্দেশে বাবা বলে ডাকার অনুমতি ছিল না অর্ণবের। ভুল করে অর্ণব বাড়িতেও কখনও কখনও স্যার বলে ডেকে ফেলে। অর্ণবের মা রেগে বলত, ‘হ্যাঁ ওকে স্যার বলেই ডাকবি। ও বাবা হলো কবে! কোন কর্তব্যটা পালন করেছে ও ছেলের!’ যে যাই বলুক, বাবার ওপরে কোনো রাগ ছিল না অর্ণবের। শুধু একটাই দুঃখ ছিল, কেন সবাই বাবাকে নিয়ে ওভাবে বলে। কেন বাবাকে স্কুলের সবাই অসম্মান করে! অর্ণব একদিন বাড়িতে সন্ধেবেলায় ইংরেজিতে প্যারাগ্রাফ লিখতে লিখতে আনমনে বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তোমার কষ্ট হয় না? এই যে স্কুলে তোমায় নিয়ে সবাই এত মজা করে, একটুও সম্মান যে করে না তোমায় তোমার দুঃখ হয় না?’
দেবেশ স্যার অন্যমনস্কভাবে বলেছিল, ‘দুঃখ খুব সাময়িক একটা অনুভুতি মাত্র। সাফল্যের অনুভূতি বহুদিন স্থায়ী হয়। তুই এসব নিয়ে ভাবিস না। কেউ তোকে আমার নামে কিছু বললে ঝগড়া-মারামারি করবি না।’ অর্ণব বুঝেছিল, বাবার যে একেবারেই দুঃখ হয় না এমনটা নয়। বাবা হয়তো পাত্তা দেয় না দুঃখটাকে। কিন্তু বাবার চোখের কোণে একটা অদ্ভুত হতাশার ছবি দেখতে পেয়েছিল অর্ণব। তাই ও চেষ্টা করত বাবাকে খুশি রাখতে। বিহারীনাথ স্কুলের কারোর রোলমডেল দেবেশ স্যার না হলেও অর্ণবের আদর্শ উনি। শুধু বাবা হিসেবে নয়, শিক্ষক হিসেবেও। বাবা যখন ক্লাসে পড়ায় তখন ওই মানুষটাকে অচেনা লাগে। মনেই হয় না একই বাড়িতে থাকে ওরা।
প্রতিদিন স্কুলে ঢুকে অর্ণব একটু ভয়ে ভয়েই ক্লাসে ঢোকে অর্ণব। এই হয়ত দেখবে ক্লাসে লেখা আছে, এবারে গাধা আসবে ইংলিশ পড়াতে। বাবা এসে আবার ব্ল্যাকবোর্ড মুছবে নিজের হাতে। সব স্যারেরা মারুন না মারুন একটা করে লাঠি নিয়ে ক্লাসে আসেন। কিন্তু দেবেশ স্যার চক, ডাস্টার নিয়ে। তাই উনি যে ছেলেদের মারেন না এটাও স্কুল শুদ্ধ সবাই জেনে গিয়েছিল। কে জানে কেন আজকাল স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না ওর।
ফাইভ সিক্সে যখন পড়ত তখন ব্যাপারটা এতটা বাড়াবাড়ির জায়গায় যায়নি। নাইন থেকে বিষয়টা বেশি বেড়েছে। মা বলেছে, ‘তোর বাবা এমনই। বেখেয়ালে আনমনা। কী আর করবি? স্কুলে যদি বাবাকে নিয়ে সবাই রাগায় দেখিস তাহলে তুই বন্ধুদের বলবি না, এটা তোর বাবা।’
অর্ণব স্কুলে ঢুকেই দেখল, আজ উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট আউট হয়েছে। এখন আর স্কুলের দেওয়াল থেকে রেজাল্ট দেখতে কম ছাত্রই আসে। সকলেই ইন্টারনেটে দেখে নেয়। তবুও স্কুলে ভিড় কিছু কম নেই। মার্কশিট নিতে হয়তো। অফিসের সামনে লম্বা বারান্দার দিকে তাকিয়ে ওর বুকটা কেঁপে উঠল। বাবাকে ঘিরে ধরেছে অন্তত গোটা পঁচিশ ছেলে। দূর থেকেই অর্ণবের পা দুটো অবশ হয়ে গেল। বাবাকে কী তবে এরা ঘেরাও করেছে! মারবে নাকি? এমনিতেই তো বাবার শরীরে তেমন জোর নেই। মনের জোরেই ঘোরে। ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে অর্ণবের। ও কি পারবে দেবেশ স্যারকে বাঁচাতে ছাত্র হিসেবে? তবে এরা উচ্চমাধ্যমিকে ইংলিশে ব্যাক পেয়েছে নাকি? তাই বাবাকে ঘেরাও করেছে?
ভয়ে ভয়েই ভিড়ের দিকে এগুলো অর্ণব। কিন্তু সামনে ঠেলেঠুলে যেটা দেখল সেটা তো ওর অবিশ্বাস্য লাগছে। বাবাকে একটা চেয়ারে বসিয়েছে ছেলেরা। সামনে মিষ্টির হাঁড়ি, ফুল রাখা। সবাই লাইন দিয়ে প্রণাম করে বলেছে, ‘স্যার ক্ষমা করুন আমাদের। অনেকভাবে অপমান করেছি আপনাকে। কিন্তু এক্সাম হলে ঢুকে বুঝেছিলাম, আপনি ভাগ্যিস সাজেশন ভিত্তিক পড়াননি। তাই আমরা ইংরেজিতে এত ভালো রেজাল্ট করতে পেরেছি। বিনোদিনী গার্লস, বিবেকানন্দ বয়েজের বেশিরভাগ স্টুডেন্ট ইংলিশে ব্যাক পেয়েছে স্যার। এবারের কোশ্চেন পেপার যিনি সেট করেছিলেন উচ্চমাধ্যমিকে তিনি গোটা সিলেবাস চষে কোশ্চেন করেছিলেন। আপনি স্যার ওভাবে পড়িয়েছিলেন বলেই আমরা একজনও ইংলিশে ব্যাক পাইনি।’ দেবেশ স্যারের মুখে এই প্রথম অর্ণব এত হাসি দেখল। অর্ণব চিৎকার করে বলল, ‘বাবা… বাবা…’
বাবা শুনতে পেল না ভিড়ের মধ্যে।
দেবেশ স্যার নাইনের ক্লাসে ঢুকে দেখল বোর্ডে লেখা, Sorry Sir.
স্যার লিখলেন, আর যদি তোরা বানান ভুল করে লিখে ফেলিস— Sorrow তার আবার অনেকগুলো মানে হয়— যেমন ধর— Sadness, Unhappiness। মনে রাখিস দুঃখও অনেক প্রকার হয়।
ছেলেরা চেঁচিয়ে বলল, ‘স্যার আপনি থাকলে আমাদের কপালে দুঃখ নাচবে না। আমরা ইংরেজিতে ঠিক পাস করে যাব।’
ক্লাসশুদ্ধু সবাই হাসছে। একমাত্র অর্ণবের চোখে জল। অতিরিক্ত গর্বে বা আনন্দে চোখ জল এসে পড়ে, লাইফ সায়েন্স স্যার বুঝিয়েছিলেন মনে হচ্ছে।
