মেয়েটি সুমধুর কণ্ঠে বলল, ‘প্রীতিলতা।’
পার্থ থমকে গিয়ে বলল, ‘ওয়াদ্দেদর?’
প্রীতিলতা হেসে উত্তর দিল, ‘না রায়চৌধুরী।’
পার্থ বলল, ‘আর ডাকনাম?’
মেয়েটা মাথা নিচু করে বলল, ‘বাড়িতে সবাই মাতঙ্গিনী বলে ডাকে। আর ছোটমামা ডাকে সরোজিনী বলে।’
একটু চমকে উঠে পার্থ বলেই ফেলল, ‘কিন্তু এঁরা তো আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব। একটি মেয়ের নাম এতজনের নামে কেন বুঝলাম না।’
প্রীতিলতা হেসে বলল, ‘আমিও ঠিক বুঝিনি। এমন অনেক কিছুই বুঝিনি আমি।’
পার্থ বুঝল, ডাকনামেও বিশেষ সুবিধা করতে পারবে না। তার থেকে বরং প্রীতি কি সরোজ বলে ডাকতে হবে।
‘আপনার শখ কী?’
প্রীতিলতা বলল, ‘বই পড়া।’
যাক, একটা জায়গায় বেশ মিল আছে। না হলে এমন কাঁচুমাচু কাদার তাল টাইপ লাজুক স্বভাবের মেয়েদের পার্থ বিশেষ পছন্দ করে না। এদের দেখলেই মনে হয় নিজের জীবনটা অন্যের কাঁধে সমর্পণ করাই এদের জীবনের একমাত্র ও মুখ্য উদ্দেশ্য।
হয়তো অগ্নিকন্যাদের নামকরণ করে এই মেয়ের মধ্যেও সামান্য স্ফুরণ দেখতে চেয়েছিল বাড়ির লোক। তাতে যে ডাহা ফেল করেছে সেটা প্রীতিলতার নার্ভাসনেস আর আঙুল ঘষা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। পার্থর বাবার আবার এমন ঘরোয়া মেয়েই পছন্দ। তাই রবিবারের খাসির মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে ভাতঘুম ছেড়ে এই মিশনে নামতে হয়েছে।
মেয়েটা লম্বা আঁচল দিয়ে গা, পিঠ, হাত অবধি ঢেকে রেখেছে।
পার্থ বলল, ‘আপনার কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে করতে পারেন।’
প্রীতিলতা মাথা নিচু করে বসে বলল, ‘আমার বড়মামা মানে চিত্তরঞ্জন দাস আপনাকে ব্যাঙ্কে দেখেছিলেন।’
এক ঢোক জল সদ্য মুখে দিয়েছে পার্থ, আরেকটু হলেই গলায় লেগে বিষম খেয়ে বিশ্রী কাণ্ড ঘটে যেতে পারত। পার্থ ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আপনার বাকি মামাদের নাম কী?’
প্রীতিলতা হাসিমুখে বলল, ‘বিনয় আমার মেজোমামা আর রাসবিহারী ছোটমামার নাম। আমার মামারবাড়ির দাদুর বাবা একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। দাদু নিজের বাবাকে লড়তে দেখেছিলেন। তাই ছেলেমেয়েদের এমন নাম রেখেছিলেন। সঙ্গে নাতি-নাতনিদেরও।’
পার্থ ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আপনার বাবার নাম তাহলে ক্ষুদিরাম হল কী করে?’
প্রীতিলতা নরম শান্ত গলায় বলল, ‘ওটা কাকতালীয়। না, ঠিক কাকতালীয় বলব না। মা’কে যারা দেখতে এসেছিল তাদের মধ্যে দাদুর চোখে বাবা অন্তত পাঁচ নম্বর বেশি পেয়েছিল শুধু নামটার জন্য। এবং পাত্র হিসাবে অগ্রগণ্য হয়েছিল। আমার মায়ের নাম, লক্ষ্মী। মানেলক্ষ্মী বাইয়ের নাম অনুকরণে।’
প্রীতিলতার এক কাকিমা এসে পার্থর হাতে স্ন্যাকসের প্লেট আর জুসের গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘গল্প করতে করতে খেয়ে নাও।’
পার্থর কানের কাছে যেন ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’ গান বাজছে… আর ও যেন আমৃত্যু অনশনে বসেছিল, ফলের রস খেয়ে সেই অনশন ভঙ্গ করতে হবে। আচমকাই গায়ের রক্ত গরম হয়ে গেল। দুশো বছর ইংরেজদের অত্যাচারের কথা মনে পড়ে এক নিঃশ্বাসে জুসটা শেষ করে ফেলল পার্থ। ওদের বাড়ির লোকজন এতক্ষণ পর্যন্ত উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। নরম মেয়েকে ব্রিটিশের হাতে ছেড়ে দিয়ে হয়তো একটু শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পার্থ এখনও উল্টোদিকের সোফাতেই বসে আছে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে তারা পার্থর বাবা-মা, ছোটমাসির সঙ্গে গল্পে মেতেছে। প্রীতিলতা মাথা নিচু করেই বসে আছে।
পার্থর এবারে অস্বস্তি হচ্ছে। এভাবে একজন অপরিচিত মেয়ের সামনে ঘটের কলার মতো চুপ করে বসে থাকার মতো বিড়ম্বনা আর নেই। গৃহকর্ত্রী পুজোর সরঞ্জাম সাজিয়ে কম্বলের আসন পেতে ব্রাহ্মণকে বসিয়ে দিয়েছেন, সামনে ঘটের কলাটিও রয়েছে। পুরুতমশাই সবই একবার করে নেড়েচেড়ে দেখছেন, শুধু ঘটের কলাটিকে বাদ দিয়ে। ধুর, এমন নরমসরম মেয়ে বাবা-মায়ের পছন্দ হতেই পারে। কিন্তু পার্থর মোটেই পছন্দ নয়। একটু স্মার্ট না হলে চলে! আজ ঝগড়া কাল ভাব না হলে আর কীসের দাম্পত্য! এ মেয়ের নাম প্রীতিলতা, সরোজিনী যাই দেওয়া হোক এ আসলে শরৎচন্দ্রের নেহাতই নিরীহ নায়িকা। পার্থ চুপচাপ বসে আছে। প্রীতিলতাও চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
হঠাৎ প্রীতিলতা বলল, ‘আপনার যদি কোনো কথা না থাকে তাহলে আমি দুটো কথা বলি?’
পার্থ ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই।’
প্রীতিলতা ওর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন আছেন আপনি? শরীর কেমন?’
পার্থ ভাবছিল, এ আবার কেমন প্রশ্ন? প্রায় আধঘন্টা বসে আছে ওরা। আচমকা এমন প্রশ্ন কেন?
পার্থ একটু হকচকিয়ে বলল, ‘কেন বলুন তো? ভালোই তো আছি। ফাইন।’
প্রীতিলতা বলল, ‘সুন্দরী মেয়ে দেখতে ভালো লাগে? মানে ধরুন ব্যাঙ্কের কাউন্টারে বসে একঘেয়ে কাজ করছেন। সেই সময় একটা সুন্দরী মেয়ে ঢুকল, তখন হাতের জরুরি কাগজটা ছেড়ে তার দিকে কিছুক্ষণ আনমনে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে?’
পার্থ ভাবল, আমি তো ব্রিটিশ নই। আমাদের চোদ্দগুষ্টির কেউ ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত বলেও জানি না। তাহলে প্রীতিলতা এমন বাউন্সার ছুঁড়ছে কেন ওর দিকে!
রুমাল দিয়ে কপালটা মুছে নিতেই প্রীতিলতা এসির রিমোটটা হাতে নিয়ে আরও তিনঘর কমিয়ে আঠেরো টেম্পারেচার করে দিয়ে বলল, ‘এবার ঠিক আছে?
হ্যাঁ বলুন, ইচ্ছে করে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে?’
পার্থ বলল, ‘আপনি হয়তো ব্যাঙ্কের ম্যানেজারদের ঠিক কতটা কাজ করতে হয় বুঝতে পারছেন না। আপনার মতো ওষুধ কোম্পানির জব তো নয়। তাই সময়ের বড্ড অভাব।’
প্রীতিলতা বলল, ‘বুঝলাম। বন্ধুরা একসঙ্গে হলে কোনো হট মেয়েকে নিয়ে গল্প করেন? মানে আলোচনা আর কী!’
পার্থ এবার সত্যিই ঘামতে শুরু করেছে, ‘এসব কী ধরনের প্রশ্ন রে বাবা! এগুলো এমন ওপেনলি কেউ করে?’
পার্থ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘না আমার বন্ধুরা সব স্ট্যান্ডার্ড। ওরা উপযাচিত হয়ে কোনো মেয়ের সঙ্গে কথাও বলে না।’
প্রীতিলতা মুচকি হেসে বলল, ‘ওহ তার মানে আড্ডায় এই ধরনের আলোচনা হয়… রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধান সের্গেই নারাস্কিন বলেছেন, ”রাশিয়ার ভবিষ্যৎ এবং বিশ্বে রাশিয়ার অবস্থান এখন ঝুঁকিতে পড়েছে।
রাশিয়ার নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন দখল করে নেওয়া এবং এর শাসন ক্ষমতায় পরিবর্তন আনা, যাতে তারা আর কখনো পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ না দেখায়।”
আচ্ছা আচ্ছা বুঝলাম। তা ভালো।’
পার্থ যে তোতলা সেটা ও আজকেই প্রথম আবিষ্কার করল। কারণ ও প্রায় তুতলেই বলল, ‘না না, এমন আলোচনা যে সবসময় হয় তা নয়। ওই সবকিছু নিয়েই হয়।’
প্রীতিলতা বলল, ‘এনিওয়ে বাড়ি থেকে বাইরে বেরোনোর সময় কি লাস্ট মোমেন্টে একবার পটিতে যান? মানে সকালে ক্লিয়ার হয়েছে তবুও মনটা খচখচ করছে, আরেকবার ঘুরে আসি এমন মনে হয়?’
পার্থ রীতিমত লজ্জা পেয়ে বলল, ‘এসব প্রশ্নের মানে কী? মানে এগুলো জেনে আপনি ছেলে পছন্দ করবেন?’
প্রীতিলতা ঘাড় নেড়ে বলল, ‘এটা একটা সাইকোলজিক্যাল টেস্ট বলতে পারেন। দেখুন অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা বুঝলেন কিনা। আমরা আগে থেকে চেনা-পরিচিত নই। আজই আমাদের প্রথম দেখা। এই বয়েসে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট হয় বলে আমার ধারণা নেই। হয়তো হয়, কিন্তু আমার আপনাকে দেখে তেমন কিছু ফিলিংস হল না। ওই হাওয়ায় ওড়না উড়ছে বা বুকের মধ্যে লাবডুব আওয়াজটা থমকে গেছে, এমন কিছুই ফিল করলাম না। অগত্যা প্র্যাকটিকাল হতে হল। আমরা এদিকে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ জানানোর সুযোগটুকু পাব না, হয়তো ওদিকে বাড়ির লোকজন গলদা না বাগদা নিয়ে মন কষাকষি শুরু করে দেবে। তাই এই মূল্যবান সময়টুকুতে বুঝে নিতে চাইছি আদৌ কি আমরা ম্যাচ করব? যদি না করি তাহলে গুচ্ছের লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে খাইয়ে, বেনারসি, পাঞ্জাবি কিনে এত খরচাপাতি করে লাভ নেই। দু’দিন পরে আবার ডিভোর্স ল-ইয়ারের পেটে যাবে বেশ কিছু টাকা। বুঝতেই তো পারছেন, কষ্ট করে উপার্জন তো সবাই করে, তাই না? তাই অপচয় যাতে না হয় সেই চেষ্টা করছি।’
পার্থ বলল, ‘বুঝলাম। কিন্তু এইটুকু সময়ে যে আমি সব সত্যি বলবই এমন গ্যারান্টি আপনাকে কে দিল প্রীতিলতা? একঘন্টায় একটা মানুষ চিনে নেবেন এটা একটু বেশিই কষ্টকল্পনা হয়ে গেল না?’
প্রীতিলতা বলল, ‘মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় শেষের ঘন্টা পড়ে যাওয়ার পরেও আট নম্বর কোশ্চেনটা অ্যাটেন্ড করে প্রাণপণ লেখার চেষ্টা করতেন না? নাকি ভাবতেন শেষ পাঁচমিনিটে কী করে সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ এবং গুরুত্ব লিখব, তার থেকে ছেড়েই দিই। নাকি স্যারকে রিকোয়েস্ট করতেন ”প্লিজ স্যার গিভ মি ফাইভ মিনিটস।” জানবেন, শেষপর্যন্ত চেষ্টা করাটা হিউম্যান সাইকোলজি। তার আগেই যারা দায়সারা করে মাঝপথে ছেড়ে দেয় তাদের জেতার মানসিকতাই নেই।’
পার্থ বলল, ‘আপনাকে দেখে আমি ভেবেছিলাম আপনি নেহাতই শান্ত স্বভাবের মেয়ে!’
প্রীতিলতা বলল, ‘এখন কি ভাবছেন ঘুম থেকে উঠেই কলতলায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া করি?’
পার্থ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘আরে না না। তা কেন? এখন মনে হচ্ছে বেশ স্মার্ট।’
প্রীতিলতা হেসে বলল, ‘আমার মামাতো ভাই সুভাষচন্দ্র বলে, সব জিনিসের শেষ দেখে ছাড়া উচিত, চেষ্টা না করে ছেড়ে দিলে মানে তুমি হার স্বীকার করে নিলে।’
পার্থ মুহূর্তের জন্য ঘেঁটে গিয়েছিল। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ”তোমরা আমায় রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।” এটাই মুখস্থ ছিল এতদিন। পরমুহূর্তেই মনে পড়ে গেল, ওহ প্রীতিলতার দাদু তো আসল সর্বনাশটা করে গেছেন। এ সুভাষ সে সুভাষ নয়, মনে পড়তেই নিশ্চিন্ত হল।
প্রীতিলতা পার্থর হাতের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দেখেই পার্থ বলল, ‘হাতে কী দেখছেন?’
প্রীতিলতা বলল, ‘ট্যাটু করেছেন কিনা দেখলাম। ওই আজকাল সবার হয় না, গার্লফ্রেন্ডের নাম বীণা তারপর আচমকা ব্রেকআপের পরে সরস্বতীর ভক্ত হয়ে বীণাপাণি হয়ে যায়। তাই আর কী। আপনি যেভাবে মেয়েদের ওপরে খাপ্পা তাতে সন্দেহ হল ব্রেকআপ হয়েছে কিনা সদ্য।’
পার্থ বলল, ‘হঠাৎ মেয়েদের ওপরে খাপ্পা এটা মনে হওয়ার কারণ?’
প্রীতিলতা বলল, ‘এই বয়েসের সুস্থ-সবল ছেলে কাউন্টারে সুন্দরী মেয়ে এলেও দেখেন না, বন্ধুদের সঙ্গেও মেয়েদের নিয়ে আলোচনা করেন না, তাই বলছিলাম।’
পার্থ হেসে বলল, ‘আপনি তো দেখছি সাইকোলজি গুলে খেয়েছেন।’
প্রীতিলতা বলল, ‘একটা কথা বলব? আপনার যদি আমাকে পছন্দ না হয় স্ট্রেইট বলে দেবেন। ওসব বাড়ি গিয়ে জানাচ্ছি, পরে বলব, এসব করার দরকার নেই।’
পার্থ বলল, ‘আপনি তো আমার সাইকোলজিক্যাল টেস্ট করে নিলেন, আমার তো টেস্ট করা বাকি থাকল। আমরা বরং একদিন বাইরে দেখা করি। সেদিন আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব। তারপর বাড়িতে জানালেই হবে।’
সেই সময়েই বাইরে কেউ একজন ঢুকল। তাকে কেউ একটা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী গো রিক্তা, কেমন আছ? এত দেরি করে এলে?’
রিক্তা নামক ব্যক্তিটি বললেন, ‘ভীষণ ভীষণ ভালো আছি গো লক্ষ্মীদি।’
প্রীতিলতা বলল, ‘আমার দূরসম্পর্কের পিসি। আজকে আসার কথা ছিল। ওই যে পিসি বলল, ভীষণ ভীষণ ভালো আছি তার মানে খারাপ থাকাটাকে ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নরম্যাল ভাবে ভালো আছি না বলে দু’বার ভীষণ বলে নিজের কোনো একটা দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা করছেন।
এই যে আপনি আরেকদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে চান এবং কথা বলতে চান তার মানে আপনি মাপতে চাইছেন, আমি মানুষটা আদতে কেমন? ঘরে একরকম বাইরে একরকম কিনা। ভালো ভালো। যাচাই করে নেওয়া ভালো। একটা গোটা জীবনের ব্যাপার কিনা।’
পার্থ বলে ফেলতে যাচ্ছিল, আমি ইমপ্রেসড আপনার কথাবার্তা শুনে। মানুষকে বিশ্লেষণের ক্ষমতা দেখে। কিন্তু জিভের অতি প্রগলভতাকে কোনোমতে শাসন করে বলল, ‘আপনার ইচ্ছে না থাকলে বাইরে মিট করার বিষয়টা ক্যানসেল করে দিতে পারেন।’
প্রীতিলতা বলল, ‘একবার কেন? আপনি মাসখানেক আমায় নিয়ে ভাবুন, কথা বলুন, তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। চিন্তা করবেন না, বার দুই ফোনে কথা বলে বা দেখা করে বিয়েটা না হলে আমি ফেসবুকে ”স্যাড লাইফ” বলে পোস্ট নামাব না। অথবা ”ভালোবেসে একা ফেলে কেন চলে গেলে” বলে কোনো কবিতাও পোস্ট করব না। কারণ আমার কাছে আমার জীবনটা ভীষণ দামি। আর এমন ঝপাঝপ আমি প্রেমে পড়ি না। তাই নিশ্চিন্তে দেখা করা যেতে পারে।’
পার্থ বলল, ‘তাহলে ফোনে কথা বলে নেব।’
প্রীতিলতা উঠে বলল, ‘চলুন ওঘরে গিয়ে বাগদা না গলদার বাড়া ভাতে জল ঢেলে দিয়ে বলি, আমাদের একটু টাইম লাগবে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানাতে।’
পার্থ বলল, ‘আপনাকে কি আমিই প্রথম দেখতে এলাম নাকি আরও…’
প্রীতিলতা বলল, ‘আরও দুজন এসেছিল। বাতিল করেছে আমায়।’
পার্থ বলল, ‘কারণ?’
প্রীতিলতা হেসে বলল, ‘এই যে সাইকোলজিক্যাল টেস্টের চক্করে। দুজনেরই মনে হয়েছে মেয়েদের এত বেশি প্রশ্ন করার অধিকার নেই। ছেলেরা এসেছে হাটে গরু কিনতে সুতরাং তারাই দেখেশুনে পছন্দ করে কিনবে। গরু কেন খোঁজ নেবে রাখাল কেমন? তাই বাতিল করে গেছে।’
পার্থ বলল, ‘আমিও দুজনকে দেখতে গিয়েছিলাম।’
প্রীতিলতা বলল, ‘তো কে ক্যান্সেল করল? মেয়েটা না আপনি!’
পার্থ একটু ভেবে বলল, ‘সিচুয়েশন। একটি মেয়ের সদ্য ব্রেকআপ হয়েছে। তাই সে সাতদিনের মধ্যে বিয়ে করতে চায়। প্রাক্তনকে দেখাবে বলে। বিয়ের শর্ত একটাই সাতদিনের মধ্যে বিয়ে করতে হবে।’
প্রীতিলতা বলল, ‘তা করলেন না কেন?’
পার্থ বলল, ‘আসলে আমি আমার ওয়াইফের মধ্যে আরেকটু ম্যাচিওরিটি আশা করি।’
‘আর দ্বিতীয় জন?’
প্রীতিলতার প্রশ্নে পার্থ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘এটা মেয়েটিই বাতিল করেছে বলতে পারেন। বা আমি ওর শর্তে রাজি হইনি বলে।’
প্রীতিলতার চোখে কৌতূহল উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।
পার্থ একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘বিষয়টা বড্ড এমব্যারাসিং আরকী। আমার গোঁফ আছে বলে ওঁর আপত্তি। গোঁফ কাটতে হবে বিয়ে করতে গেলে?’
প্রীতিলতা বলল, ‘কেন মৃত দাদুর স্মৃতি মনে পড়ে যায়? নাকি বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ওপরে রাগ? মানে কারণটা ঠিক কী? ভীষণ ইন্টাটেস্টিং তো।’
মাথা নিচু করে পার্থ বলল, ‘উনি বলেছিলেন কিস করলে নাকি সুড়সুড়ি লাগবে, সেটা উনি বরদাস্ত করবেন না। তাই গোঁফ কেটে ফেললে বিয়ে হবে, না হলে নয়।’
প্রীতিলতা হো হো করে হেসে বলল, ‘ইস এইভাবে বাদ দিল আপনাকে!’
পার্থ লজ্জিত হয়ে বলল, ‘গোঁফ কেটে ফেলাই যায় কিন্তু অন্যের ইচ্ছেতে শর্ত মেনে চলতে বিরক্ত লাগে। তাই বলেছিলাম, কাটব না। তাই সে বিয়ে ক্যান্সেল করে দিল।’
প্রীতিলতা বলল, ‘একদম ঠিক করেছেন।’
পার্থ বলল, ‘আরেকজনকে ফোনে আমি বাতিল করেছি। মানে দেখতে যাওয়ার আগেই।’
প্রীতিলতা বলল, ‘কেন সে কি আবার নাক কাটতে বলেছিল নাকি? না মানে বাধাহীন চুম্বনক্ষেত্র তৈরির উদ্দেশ্যে।’
পার্থ বলল, ‘আরে না। সে মেয়ে আমায় রাত দুটোর সময় ফোন করে বলছে— ধরো রাত দুটোয় তোমায় জাগিয়ে দিয়ে বললাম, ”আর ঘুমিও না, আমরা গল্প করব। তাহলে কি তুমি বিরক্ত হবে? রাগ করবে? নাকি আমায় জড়িয়ে ধরে বলবে ভালোবাসি ভালোবাসি।” দু’দিন পরপর রাত দুটোয় ফোন করেছিল মেয়েটা। তাই বাধ্য হয়ে ক্যান্সেল করে দিলাম।’
প্রীতিলতা বলল, ‘ওমা, হাও রোম্যান্টিক শি ইজ।’
পার্থ বলল, ‘হ্যাঁ সুনীল গাঙ্গুলী মাথাটা পুরো খেয়ে নিয়েছে। রাত দুটোয় ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ বলার পরে নেক্সট ডে অফিস গিয়ে যখন কাজে ভুল হবে আর ঝাড় খাবেন তখন বুঝবেন, রাত জেগে থাকার মাহাত্ম্য।”
প্রীতিলতা বাইরে বেরোতেই ওর মা বললেন, ‘মাতঙ্গিনী, তোর কি পার্থকে পছন্দ হয়েছে? তাহলে আজকেই আংটির মাপটা নিয়ে রাখতাম।’
পার্থর মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ‘আচ্ছা আপনারা বাড়িশুদ্ধু লোক ডাকনামের ঠিক কী উপকারিতার কথা জানেন?’
প্রীতিলতার ডাকনাম মাতঙ্গিনী দেওয়ার কারণ কী? সাধারণত ছোট নাম দেওয়া হয় ডাকনাম হিসাবে। এ তো পোশাকি নাম পদ্মলোচন, ডাকনাম পদ্মনয়নের মতো হয়ে গেল।
ঠিক সেই সময় প্রীতিলতার মামা ডাকলেন, ‘সরোজিনী লজ্জা পাস না, তোর মতের মূল্য আমরা দিই। যেটা মনে হচ্ছে বল।’
পার্থ হঠাৎ খেয়াল করল, ওর নিজের স্টেপিংটা কেমন কুচকাওয়াজের মতো হয়ে যাচ্ছে।
ঠিক সেইসময় প্রীতিলতার বাবা বললেন, ‘রাসবিহারী তুমি তাহলে কথা বলে নিও মাতঙ্গিনীর সঙ্গে।’
সর্বনাশ! পার্থর যেন মনে হচ্ছে ও একটা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আখড়ায় এসেছে। যেন এখুনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন করার আদেশ দেবেন দলের নেতা।
আর কিছুক্ষণ এ বাড়িতে থাকলে আর কিছু হোক না হোক আগামীকাল ব্যাঙ্কে গিয়ে জোনাল ম্যানেজারের গালে দুটো থাপ্পড় দিয়ে হয়তো বলেই ফেলবে, এভাবে হয় না। যারা লোন নিতে চাইছে না তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে লোন নেওয়ানোর দায়িত্ব নিতে পারব না। এই বাড়িতে থাকলে নিজেকে স্বাধীন করতে বড্ড মন চাইছে। এমন বেপরোয়া ভয়ঙ্কর ইচ্ছাকে দমন করতে না পারলে চাকরিটা নির্ঘাত যাবে।
প্রীতিলতার ফোন নম্বর ও ওর ফোনে সেভ করে নিয়েছে। বাড়ি ফিরে ওর সঙ্গে কথা বলবে। ক্ষুদিরাম বা লক্ষ্মী বাই সরি লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই। ওঁদের কথাগুলো কেমন একটা। আরেক পিস ফিসফ্রাই নেবে নাকি সুতানটি ছেড়ে ইংল্যান্ডে যাবে টাইপ। তুলনামূলকভাবে প্রীতিলতা অনেক স্বাভাবিক।
প্রীতিলতা ফিকফিক হাসছিল পার্থর মুখের দিকে তাকিয়ে। ফিসফিস করে বলল, ‘ডোন্ট ওরি। আপনাকে কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাবে না। এই বাড়ির সবাই ম্যাক্স টাইম এই মুডেই থাকে। নিজের নামের প্রতি জাস্টিফাই করতে চায় বলে কিনা জানি না। তবে আপনার বাবা কিন্তু টিপিক্যাল বাবা। মানে ওই হয় না, অনেক ছাত্রকে স্কুলে জিজ্ঞাসা করা হয়, ”বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?” কেউ কেউ বলে ”বড় হয়ে আমি ভালো বাবা হতে চাই।” খেয়াল করে দেখাবেন তাদের মুখের মধ্যে একটা বাবা সুলভ গাম্ভীর্য তৈরি হয় সেই নাইন-টেন থেকেই। আপনার বাবাকে দেখেই আমার প্রথম এই কথাটাই মনে হয়েছে। ঠিক বাবা বাবা দেখতে।’
পার্থর এবারে হাসি সামলানো মুশকিল হচ্ছিল। কী বীভৎস বিছুটি মেয়ে! বলে কিনা বাবা হওয়ার অ্যাম্বিশন নিয়ে বড় হয়েছে। তবে কথাটা মন্দ বলেনি, পার্থর বাবার মধ্যে ষোলোর মধ্যে আঠেরো আনা বাবা সুলভ। তাঁর হাব-ভাবে মাঝে মাঝে মা রেগে গিয়ে বলেন, ‘তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ তুমি পার্থর বাবা। আমার নয়। আমার স্বামী। তাই বাড়ি থেকে বেরোলেই, সাবধানে যেও, ব্যাগ সামলে হারিয়ে ফেলো না, রাস্তাঘাটে বেশি এদিক ওদিক যাওয়ার দরকার নেই, বলে শাসন করতে পারো না একজন বছর চুয়ান্নর আধবুড়ি মহিলাকে। ঠিক যেন মনে হয় আমার স্বামী নয়, বাপ বসে আছে।’
বাবার মধ্যে অলটাইম এই বাবা সুলভ বিষয়টা ছিল। বন্ধুরা হোস্টেলে বলত, এই পার্থ, আঙ্কেল কী আন্টির সঙ্গেও এমন বাপ সুলভ টেকনিকেই কথা বলে রে!
প্রীতিলতা মাত্র দশ মিনিট দেখেই, বাবাকে অনেকটা চিনে ফেলেছে। নাহ মেয়েটার হিউম্যান সাইকোলজিতে বেশ ইন্টারেস্ট আছে দেখছি। মানুষ চেনার ক্ষমতাটা মন্দ নয়।
পার্থ সংকুচিতভাবে বলল, ‘আঙ্কেল, আমি আর প্রীতিলতা আরেকটু সময় চাইছি। আসলে গোটা জীবনের ব্যাপার তো। তাই নিজেরা একটু বুঝেশুনে নিতে চাইছি।’
ঘরের মধ্যে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা।
পার্থর বাবা বললেন, ‘সে চেনা বোঝার জন্য তো গোটা জীবন পড়ে আছে। পছন্দ কি পছন্দ নয় সেটা স্ট্রেট না বলার কী আছে?’
পার্থর মায়ের মুখেও উদ্বেগ।
আর প্রীতিলতার বাবা ক্ষুদিরাম আঙ্কেলের মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে সামনে পার্থ নয় স্বয়ং কিংসফোর্ড দাঁড়িয়ে আছে। এমন অদ্ভুত কথা বোধহয় উনি জীবনে প্রথম শুনলেন। দুজনে দুজনকে বিয়ের আগে চিনে নিয়ে তারপর যদি বিয়েটা না হয় তখন একজন তো কষ্ট পাবেই, তার কী হবে? এখনও ক্ষুদিরাম আঙ্কেলের ভ্রুর কোঁচ সোজা হয়নি।
পার্থকে এমন নিশ্চুপ টর্চার থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই প্রীতিলতা বলল, ‘এটা আমাদের দুজনের সিদ্ধান্ত বাবা। বিয়েটা তো আমরা করব, তাই এটুকু স্বাধীনতা আশা করি আমাদের থাকবে।’
স্বাধীনতা কথাটাতে অদ্ভুত কাজ হল। আঙ্কেল আর আন্টি দুজনে একত্রে বলে উঠলেন, ‘নিশ্চয়ই। আমরা দেশের স্বাধীন নাগরিক। অনেক কষ্টে ওই লালমুখোদের কাছ থেকে আমরা সেটা ছিনিয়ে নিয়েছিলাম। কোনো অবস্থাতেই সেটা খর্ব হোক এটা চাইব না।’
পার্থ বেশ বুঝতে পারছিল গোটা ফ্যামিলি এখনও সেই পরাধীন দেশের বাসিন্দা হয়ে রয়ে গেছে। এরা কেউ ইংল্যান্ড-ইন্ডিয়া ম্যাচ দেখেন না। এমনকি প্রীতিলতার ছোটমামা আইপিএল অবধি দেখেন না কারণ সেখানে ইংল্যান্ডের প্লেয়ার আছে।
প্রীতিলতা বলল, ‘স্বাধীনতা কথাটা ইউজ করলেই কেল্লাফতে।’
পার্থ মুচকি হেসে বলল, ‘ইন্টারেস্টিং। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি আমারও যথেষ্ট ফিলিংস আছে। কিন্তু শুধু নামের জন্য নিজেকে স্বাধীনতা সাংগ্রামী ভেবে নেওয়ার কনসেপ্টটা এখনও মাথায় ঢুকল না ম্যাডাম।’
প্রীতিলতা বলল, ‘ওইটুকু তো মগজ আর রাখবেন কোথায়? মগজাস্ত্র তো আর সকলের দখলে থাকে না!’
পার্থ বলল, ‘চট করে বলুন, প্রিয় রাইটার কে?’
প্রীতিলতা বলল, ‘শরৎচন্দ্র থেকে নারায়ণ সান্যাল হয়ে শীর্ষেন্দুবাবুর বাড়ি ঘুরে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইন্দ্রনীল সান্যাল থেকে সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় মোটামুটি সবাই।’
পার্থ হেসে বলল, ‘ব্রিলিয়ান্ট। ঐতিহাসিক পড়া হয়?’
প্রীতিলতা বলল, ‘শরদিন্দু থেকে শ্রী পারাবত পড়েছি সব।’
‘তাহলে এসব নিয়ে ফোনে কথা হতেই পারে।’
প্রীতিলতা হেসে বলল, ‘এই একটা ব্যাপারেই তো মিল পেলাম আপনার সঙ্গে। বাকি তো সব অমিল।’
পার্থ বলল, ‘যেমন?’
প্রীতিলতা হেসে বলল, ‘আমি কিন্তু হ্যান্ডু ছেলে দেখলে রীতিমত তাকাই। না অপলক নয় আড়চোখে। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও থেকে ঋত্বিক রোশন এদের পর্দায় দেখলে কেমন একটা শিরশির করে। আপনার মতো নেহাত ভালোমানুষ নই। আর আমার এই ভালোমানুষ লুকটা মায়ের দেওয়া। মা বলেছিল, পাত্রপক্ষ এলে এমন শান্ত হয়ে থাকতে হয়।’
পার্থ বলল, ‘আজ চলি। ওই যে বাবা মা সবাই উঠে পড়েছে।’
ওদের দুজনের মতামতের ওপরে বিষয়টা ঝুলিয়ে রাখা কারোরই ইচ্ছে ছিল না। সকলের বেশ পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। লজ বুকিং থেকে ক্যাটারিং, মেনু থেকে নমস্কারি এসব নিয়েই কথা বলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আচমকা ব্যক্তি স্বাধীনতার মতো গোলমেলে কথার প্রবেশে বিষয়টা ঘেঁটে গেছে। অগত্যা মুখ বেজার করেই দু’তরফের বিদায় পর্ব শেষ হল।
দিন তিনেক পরে ফোন এল পার্থর।
‘আপনার সময় হবে, তাহলে আজ কফি খেতে যাওয়া যেত।’
প্রীতিলতা বলল, ‘তাহলে অফিস ছুটির পরে যাওয়া যেতে পারে।’
পার্থ ঘড়ি দেখছিল আর হাতের কাজ সারছিল। মেয়েটা যেন প্রথম দিনই ওকে ইররেস্পন্সিবল না ভাবে। টাইমের ব্যাপারে। ঠিক ছ’টায় পৌঁছাবে ক্যাফে কফিতে।
সাড়ে পাঁচটা বাজে, এবারে উঠতে হবে। আজকাল কলকাতার রাস্তায় যা জ্যাম বেড়েছে তাতে গাড়ি নিয়ে যেতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তাই যত কাছেই হোক আধঘন্টা লেগে যাবে। হাতের ফাইলগুলো অফিসের লকারে ঢুকিয়ে দিয়ে চাবিটা ঘুরিয়ে পকেটে রাখতে না রাখতেই অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার রাহুল এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘পার্থদা একটা মেয়ে। আমি বেরিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সিঁড়িতে একটা মেয়েকে দেখলাম। সে তোমায় খুঁজছে পার্থদা।’
পার্থ বলল, ‘তো এতে এত চমকাবার কী আছে?’
রাহুল বলল, ‘না, মানে মেয়েটা মারাত্মক রকমের কী বলব, হট। না মানে সরি… সুন্দরী। মেয়েটা কে পার্থদা?’
রাহুলের এসব ব্যাপারে কৌতূহলের কথা ব্রাঞ্চের কারোর অজানা নয়। ছেলেটা কাজে মারাত্মক এফিসিয়েন্ট। কিন্তু মেয়ে দেখলেই ওর উত্তেজনা একটু বেড়ে যায়।
পার্থ বিরক্তির স্বরে বলল, ‘আমি তো তাকে এখনও দেখিনি রাহুল, তাই জানি না।’
রাহুল বলল, ‘জিজ্ঞাসা করল ”পার্থ বর্মণ আছেন? ওঁকে বলুন বাইরে একজন ওঁর জন্য ওয়েট করছে।” ভাবা যায়! তোমার জন্য অমন একজন ওয়েট করছে।’
পার্থ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, অলরেডি চল্লিশ বেজে গেছে। এখন আবার কোন মেয়ে ওয়েট করছে! প্রীতিলতা নিশ্চয়ই ক্যাফেতে ওয়েট করবে। ছি ছি, ফার্স্ট ডেটে রেপুটেশনটা খারাপ হল।
বাইরে বেরিয়েই ঝটকাটা লাগল। ব্ল্যাক জিন্সের ওপরে রেড টপ পরে দাঁড়িয়ে আছে প্রীতিলতা। ওকে দেখেই চমকে উঠেছে পার্থ। সেই লম্বা হাতা ব্লাউজ আর পিঠে চাপা দিয়ে শাড়ি পরা মেয়েটার কথা মনে পড়ল।
পার্থর মুখ দেখে প্রীতিলতা বলল, ‘এত চমকাচ্ছেন কেন? কফির আমন্ত্রণ জানিয়ে ভুলে গেলেন নাকি!’
পার্থ বলল, ‘আরে না না। চলুন। আসলে এই পোশাকে…’
প্রীতিলতা বলল, ‘সরি, শাড়ি কিন্তু আমি অকেশনালি পরি। সেদিন মেয়ের ওপরে মায়ের অধিকার, সেন্টিমেন্ট জয়ী হয়ে গিয়েছিল। তাই শাড়ি পরেছিলাম মা যেভাবে বলেছিল। আসলে শাড়ি পরাটা একটা আর্ট। যদি কেউ সুন্দর করে শাড়ি ক্যারি করতে পারে তাকে কিন্তু দুর্দান্ত লাগে।’
পার্থর দিকে তাকিয়ে প্রীতিলতা বলল, ‘আপনার অ্যাসিস্টেন্ট দেখলাম মহিলা সম্পর্কে বেশ ইন্টারেস্টেড। নিজের ফর্টিন ফাদার্সের পরিচয় দিয়ে দিলেন মুহূর্তে। আপনাকেও তো বেশ উৎসাহী হয়ে গিয়ে জানালেন হট একটা মেয়ে ওয়েট করছে।’
পার্থ মাথা নিচু করে বলল, ‘রাহুলের বয়সটা কম তো!’
প্রীতিলতা হেসে বলল, ‘বাইরে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেনে যেভাবে ঘড়িটা উল্টো পরে ছুটে বেরিয়ে এসেছেন এতেই আমি নিশ্চিন্ত হলাম। যাক মেয়েদের প্রতি আপনার নিরাসক্তি নেই।’
পার্থ কাজ করতে করতেই ঘড়িটা খুলে রেখেছিল, এটা ও প্রায়ই করে। বেরোনোর আগে পরে নেয়। আজও সেভাবেই তাড়াহুড়ো করে ঘড়িটা পরে বেরিয়ে এসেছে। প্রীতিলতা সেদিকে তাকিয়েই এমন একটা বোমা ছুঁড়ে দিল ওর দিকে।
পার্থ বেশ বুঝতে পারছে প্রীতিলতাকে দেখে প্রথম যে ভাবনাটা ওর মাথায় এসেছিল সেটা হল, নেহাতই আনস্মার্ট বোকা বোকা মেয়ে। এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে, মেয়েটা ধোনির ফ্যান। হেলিকপ্টার শটে রীতিমত পারদর্শী।
গাড়িতে ওর পাশে বসে সিটবেল্ট পরতে পরতে প্রীতিলতা বলল, ‘একটা কথা বলুন আপনাদের কে শিখিয়েছে যে মেয়েদের সামনে গিয়ে মহিলাদের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই বললে মেয়েরা বীভৎস খুশি হবে? এমন ভুলভাল ট্রেনিং যে সব বন্ধুদের কাছ থেকে পেয়েছেন তাদের এককাপ চা-ও আর ফ্রি’তে খাওয়াবেন না বুঝলেন? এরা ভুলভাল ইন্সট্রাকশন দেয়। আমি আপনাকে শিখিয়ে দিচ্ছি কী বলবেন!
বলবেন, চোখ থাকলে সবকিছুই দেখা যায়। তেমনি অবশ্যই দেখি, কিন্তু আপনার মতো আর দেখলাম কোথায়? এসব বলতে হবে বস।’
পার্থ হেসে ফেলে বলল, ‘আপনি কি লাভগুরু নাকি? প্রেম আদৌ করেছেন নাকি বন্ধুদের ট্রেনার হিসাবেই জীবন কাটিয়ে দিলেন?’
প্রীতিলতা বলল, ‘বড় দুর্বল জায়গায় আঘাত করলেন মিস্টার। প্রেমে বড্ড বেশি চোট পেয়েছিলাম কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে। হিস্ট্রির পার্ট-টাইমারের প্রেমে পড়েছিলাম। বলতে পারেন যাকে বলে হাবুডুবু। না না, একতরফা মোটেই নয়। সে প্রফেসরও ক্লাসে ঢুকে মুচকি মুচকি হাসতেন আমায় দেখে। কখনও তাকাতেন আনমনে। ক্লাসসুদ্ধ মেয়েরা বুঝেছিল উনি আমাকে পছন্দ করেন। আমিও সেটা ধরেই এগোচ্ছিলাম। মেইন সাবজেক্ট মানে অনার্সের সাবজেক্ট ইংলিশ বাদ দিয়ে পাশের সাবজেক্ট হিস্ট্রি পড়ে পড়ে পাগল হতে বসেছিলাম। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্যাঙ্গুইন ছিলাম যে, অনার্সে আমি ফেল করলেও হিস্ট্রিতে একশোয় আশি পেতাম।’
পার্থ সিগন্যালে গাড়ি থামিয়ে বলল, ‘তারপর? সেই ভরাডুবি প্রেমের নৌকাটার হল কী? মানে সে নৌকা যে ভাসেনি সেটা তো বেশ বুঝতে পারছি। না হলে আপনি আমার গাড়িতে এই মুহূর্তে বসে থাকতেন না।’
প্রীতিলতা বলল, ‘ভাসা দূরে থাক নৌকাটা একশো মিটারও চলতে পারেনি। আমি একদিন লাঞ্চ ব্রেকে সাহস করে এগিয়ে গেলাম টিচার্স কমন রুমে। ওখানে গিয়েই থরথর বুকে ডাকলাম, ‘অরবিন্দ স্যার…’ ‘
পার্থ বলল, ‘ইনিও ঋষি অরবিন্দ? উফ পারা যায় না।’
প্রীতিলতা বলল, ‘আহা এই সময় কেউ নাম নিয়ে ভাবে? ওটা অতি তুচ্ছ মশাই। অরবিন্দ স্যার একমুখ হাসি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। বললেন, ”বলো প্রীতিলতা।”
আমি ওঁকে ডেকে লবিতে নিয়ে এসে বললাম, ‘আর লুকোছাপা করে লাভ নেই। আমি আপনাকে পছন্দ করি।’
স্যার বললেন, ‘আমিও তোমায় পছন্দ করি।’
আমি বললাম, ‘আমি আপনাকে ভালোবাসি।’
স্যার বললেন, ‘আমি আমৃত্যু চিরকুমার থাকব মা’কে কথা দিয়েছি। তাই বিবাহ বা প্রেম এসব আমি করতে পারব না প্রীতিলতা।’
আমি বললাম, ‘তাহলে ক্লাসে তাকাতেন কেন?’
উনি বললেন, ‘তাকাতে কোনো বাধা নেই। শুধু প্রেম আর বিয়েতে বাধা।’
আজব ক্যারেক্টার বুঝলেন। তারপর যখন মাস্টার্স করছি তখন একদিন মেট্রোতে দেখা স্যারের সঙ্গে। উনি সন্ন্যাস ছেড়ে রীতিমত বিয়ে করেছেন। সুন্দরী বউকে বগলদাবা করে দাঁড়িয়েছিলেন। আমায় দেখে বললেন, ‘এই যে আমার ছাত্রী প্রীতিলতা। ভারি মিষ্টি মেয়ে।’
আমার ইচ্ছে করছিল বলি, ‘স্যার ইনি কি আপনার সাধনসঙ্গিনী?’
স্যার তার আগেই বললেন, ‘আমাদের সেই ক্লাস এইট থেকে প্রেম বুঝলে প্রীতিলতা। বিয়েটা করলাম গতবছর।’
ভাবুন একবার, কত বড় নচ্ছার লোক।’
পার্থ হাসতে হাসতেই গাড়ি পার্ক করিয়ে বলল, ‘ইন্টারেস্টিং কিন্তু। আপনাকে রীতিমত মুরগি করে দিল। লোকটার এলেম আছে বলতে হবে। আপনাকে বোকা বানানো যার তার কম্ম নয়।’
কফি খেতে খেতে পার্থ বলল, ‘তাহলে সাইকোলজিক্যাল অ্যানালিসিস করে কী বের করলেন আমার সম্পর্কে? সেটাই তো শোনা হল না।’
প্রীতিলতা বলল, ‘বলব?’
পার্থ কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বলুন।’
‘আপনি বেশ কয়েকটা মিথ্যে বলেছেন নিজের সম্পর্কে। মেয়েদের প্রতি আপনার একেবারেই ইন্টারেস্ট নেই। নেহাত বাড়িতে বিয়ের প্রেশার দিচ্ছে তাই মেয়ে দেখতে আসা এটা ডাহা মিথ্যে। আপনার নিজের যথেষ্ট ইচ্ছে আছে। শুধু ইচ্ছে নয়, রীতিমত চয়েসও আছে। যাকে তাকে বিয়ে করবেন এমন নয়। শাড়ি জড়ানো আনস্মার্ট প্রীতিলতাকে দেখে ঐজন্যই আপনার বাঁ দিকের ভ্রুটা বিরক্তিতে একটু বেঁকে গিয়েছিল। আপনাদের পাড়ার অনন্যা নামের এক সুন্দরীর প্রতি আপনার মারাত্মক দুর্বলতা ছিল এককালে। হাতে না হোক ঘরের কোনো একটা কোণে একবার বড় হাতের A লিখে রেখে দিয়েছিলেন। অনন্যা আপনাকে পাত্তা দেয়নি। কারণ সে অলরেডি এনগেজড ছিল। সেই কথা জানতে পেরে গুড বয় পার্থ একদিন বেশ ড্রিঙ্ক করেছিল। দুঃখ ভোলার চেষ্টা করেছিল। তারপর বাবার কাছ থেকে উত্তম-মধ্যম অপমানিত হয়ে আর জীবনে ওসব দিকে হাঁটেননি। তবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বিয়ে করলে অনন্যার মতো স্মার্ট আর সুন্দরী বিয়ে করবেন। তাই আমায় এক নজরে দেখে মনে হয়েছিল, স্বাধীনতার আগের এমন বস্তুকে নিয়ে আপনি করবেনটা কী!’
পার্থর কফির কাপ পড়ে আছে টেবিলে। ও চুমুক দিতে ভুলে গেছে।
প্রীতিলতা ওয়েটারকে ডেকে আরেককাপ কফি দিতে বলল। হেসে বলল, ‘কফিটা তো চুমুক দিতেই ভুলে গেছেন।’
পার্থ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলল, ‘এসব ইনফর্মেশন আপনি কোথায় পেলেন? মানে কীভাবে পেলেন?’
প্রীতিলতা হেসে বলল, ‘হোমওয়ার্ক না করেই স্কুলে ঢুকে যাওয়ার মেয়ে আমি নই।
আপনি এমনিতে বেশ সরল মনের। কিপ্টে নন। প্রায়ই ক্লাবের বন্ধুদের খাওয়ান। আমাকে দেখে গিয়ে ওদের বলেছেন, ‘শাড়ি না পরে হট প্যান্ট পরলে মেয়েটাকে বেশি মানাবে।’ ‘
পার্থ গরম কফিতে চুমুক দিয়ে জিভের ডগা পুড়িয়ে ফেলেছে। এমন বাউন্সার খেতে খেতে নিজের নাম ভুলে যাবে পার্থ। আচমকাই হয়তো নিজেকে লর্ড কর্নওয়ালিস ভাবতে শুরু করবে। প্রীতিলতা যেভাবে ওকে নিয়ে লোফালুফি করছে তাতে ওর নিজেকে ব্রিটিশ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। ঠিক যেমন আট হাত ধুতি পরিয়েরা কোট-টাইকে একসময় নাস্তানাবুদ করে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিল তেমনই নামের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা নিয়েই পার্থকে বলে বলে ঘায়েল করছে প্রীতিলতা।
এই মেয়েকে ও আনস্মার্ট বলে বাতিল করবে ভেবেছিল, এখন তো অন্য কারণে বাদ দিতে হবে। এর কাছে যেভাবে ধরা পড়ে যাচ্ছে ও তাতে ভবিষ্যতে সংসারে ঘোর বিপদ ডেকে আনবে।
পার্থর ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখটা দেখে মুচকি হেসে প্রীতিলতা বলল, ‘এত টেনশন করবেন না। আপনার বন্ধুরা অনেকেই চায় আপনার ঊনত্রিশের স্ট্রং উইকেটটা ডাউন হয়ে যাক। তারাই আপনার সঙ্গে এসব বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমায় ফেসবুকের ইনবক্সে মেসেজ করে এসব তথ্য দিয়েছে। আপনার বেশিরভাগ বন্ধুরা তো বিয়ে করে ওই সন্ধের দিকে আড্ডায় এসেই বলে, ”দেখ ব্রো, এ জীবনের পাপ যদি এই জীবনেই স্খলন করে স্বর্গে যেতে চাস তাহলে অবশ্যই একটা বিয়ে করে নে। বিশ্বাস কর, ওর থেকে বড় পাপ আর কিছু নেই। জানবি বিয়ে করে নিয়েছিস মানে এ জীবনের পুরুষ জন্মের পাপ তুই মিটিয়ে ফেললি।”
সেখানে আপনি ফুরফুরে মেজাজে অফিস করে আড্ডায় যান। হাতে বাজারের ব্যাগ থাকে না। বউয়ের আয়রন করা শাড়ির প্যাকেট থাকে না। তাই আপনাকে হিংসে করবে না তো কাকে করবে? সেইজন্যই এরা আপনার বিয়েটা যাতে আমার সঙ্গে হয় সেজন্য আমার সব প্রশ্নের উত্তর বাধ্য ছেলের মতো দিচ্ছিল। আর বারবার বলছিল, আপনি ছেলে খুব ভালো। বিয়েটা যেন আমি করি।’
পার্থ হাঁ হওয়া মুখটা বন্ধ করে বলল, ‘আমি একবার মাত্র ওদের আপনার ছবি দেখিয়েছি আর নামটা বলেছি। তাতেই ফেসবুকে আপনাকে খুঁজে নিল? বাপ রে! এত কর্মদক্ষতা তো পাড়ার সরস্বতী পুজোর সময় দেখা যায় না!’
প্রীতিলতা হেসে বলল, ‘এনিওয়ে যা খোঁজ খবর পেলাম তাতে মানুষটা আপনি মন্দ নন। মোটামুটি আপনার বন্ধুদের কনফারেন্স কলের জিস্ট মতো হিসেব করে বুঝলাম, আপনি মানুষটা একটু শান্তিপ্রিয়। ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। মানে টিভির রিমোট আমার হাতেই থাকবে, আমিই হচ্ছি গডফাদার টাইপ নন। তাই এ বিয়েতে আমার তেমন আপত্তি নেই। আপনি আমার সম্পর্কে হোম ওয়ার্ক করুন। তারপর জানাবেন। বাবা আরেকজন পাত্র সামনের সপ্তাহে আনবে বলছিল। আমি বারণ করেছি। দেখুন মশাই আমি মেইন লাইনে চলতে চলতে আচমকা কর্ড লাইনে উঠে যেতে শিখিনি। আপাতত আমার মনে সাময়িকভাবেও আপনার বাস। সেখানের দরজায় তালা না ঝুলিয়েই আরেকটা দরজা ওপেন করার মতো মাল্টি ট্যালেন্টেড আমি নই।
আপনি ”না” বলে দিলে তখন এ পর্বের শেষে এন্ড লিখে দিয়ে অন্য পর্বে ইন করব।’
পার্থ বলল, ‘আপনার কী মনে হচ্ছে আমার কি এ সম্পর্কে এগোনো উচিত?’
প্রীতিলতা চিকেন নাগেটসে কামড় দিয়ে বলল, ‘এর উত্তর আমি দেব কী করে বলুন তো! আপনি ফোন আ ফ্রেন্ড বা ফিফটি ফিফটি অপশন নিতে পারেন।’
পার্থ হেসে বলল, ‘আমার নাম কিন্তু পার্থই থাকবে পাল্টে মহাত্মা গান্ধী রাখতে পারব না।’
প্রীতিলতা বলল, ‘আপনি আমায় প্রীতি ডাকতে পারেন। কোনো তাড়া নেই। আপনি ভেবেচিন্তে জানাবেন। ধরুন আপনারা পাঁচজনে মিলে ফুচকা খেতে গেছেন। ফুচকাওয়ালা বলল, ”ঝাল কেমন দেব?”
দেখবেন দলের বাঙাল ছেলেটি লাফিয়ে বলবে, ”বেশি বেশি। কান দিয়ে যেন হাওয়া বাইর হয়, এমন ঝাল দিয়েন।”
আপনি তখন কাঁচুমাচু করে বলার চেষ্টা করছিলেন, মাঝামাঝি দিন। বাকিরাও হয়তো আপনার দলেই ছিল। কিন্তু ওই ছেলেটির ”ঝাল বেশি খাবি না, বাচ্চা নাকি তোরা? ঘটি তোরা মিষ্টি ফুচকা খা…” এসব শোনার ভয়ে চুপ করে গেলেন।
তারপর আর কী? নাকের জলে চোখের জলে হয়ে আসল আনন্দটাই মাঠে মারা গেল। তাই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিন। এ তো দুটো মিষ্টি খেয়ে নিলে কমে যাবে। কিন্তু জীবনটা তো সহজ নয়। বিয়েটা আপনার, তাই আমি নয় এই সিদ্ধান্ত আপনাকে নিতে হবে।’
পার্থ চেয়েছিল প্রীতিলতাকে ওদের বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে আসতে। প্রীতিলতা রাজি হয়নি। বলেছিল, ‘বাবা-মা দেখলে অকারণ সম্পর্কটাকে বাড়াতে চাইবে। আমি চাই বাইরের কোনো প্রেশার ছাড়া আপনি সিদ্ধান্ত নিন।’
পার্থ নিজের বাড়িতে ঢুকতেই বাবা বললেন, ‘তাহলে তুই প্রীতিলতার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিলি? ক্ষুদিরামবাবু আজ কল করেছিলেন। ওঁরা অন্য পাত্র আনবেন মেয়ের জন্য।
যদি রাজি না থাকিস তাহলে অযথা ঝুলিয়ে রেখে তো লাভ নেই।’
পার্থ বলতেই যাচ্ছিল, ”ওই স্বাধীনতা সংগ্রামী পরিবারের সঙ্গে বিয়ে করা কি ঠিক হচ্ছে? এরা নিজেদের নাম নিয়ে রীতিমত অবসেসড। সবাই যেন রিয়েল চরিত্রে বিলং করে। ওর ছোটমামার কথাবার্তা তো পুরো ভাষণের মতো। যেন মুক্তি আন্দোলনের নেতা। ওঁদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কাটানো কিন্তু সত্যিই কঠিন। অদ্ভুত একটা জগতে বাস করে ওই পরিবারের লোকজন। তাই ‘না’ বলে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
পার্থর মা বললেন, ‘আমার তো বাপু মেয়েটাকে খুবই পছন্দ হয়েছে। যেমন দেখতে তেমনই সুন্দর কথা।’
বাবা বললেন, ‘তাছাড়া প্রীতিলতা চাকরিও করে ভালোই। বেশ ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে। আমারও পছন্দ।’
পাশ থেকে জেঠিমা বললেন, ‘আমার তো ছবি দেখেই পছন্দ হয়েছিল।’
জেঠু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আশা করি পার্থরও পছন্দই হয়েছে। এমন মেয়েকে অকারণে অপছন্দ হতে যাবেই বা কেন?’
পার্থ ঘাড় নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ আমারও পছন্দ হয়েছে।’
নিজের ঘরে ঢোকার আগেই শুনতে পেল ফোনে বাবা বেশ জোরে জোরে বলছেন, ‘হ্যাঁ ক্ষুদিরামবাবু, মেয়ে আমাদের সকলের খুব পছন্দ।’
নিজের ঘরে ঢুকতেই হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ ঢুকল, ‘আপনাকে বলেছিলাম নিজেই নিজের ফুচকার ঝাল ঠিক করুন, তা নয় সকলের কথাতে রাজি হয়ে গেলেন?’
পার্থ শুধু লিখল, ‘জিভটাকে পাল্টে ফেলছি। এবার থেকে ঝাল খেয়ে যেন কষ্ট না হয়।’
হোয়াটসঅ্যাপ ডিপিতে প্রীতিলতার একটা মিষ্টি ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ”এ জন্মের কোটা পূরণ করতে আমি প্রস্তুত।”
