পরিচারিকা – অর্পিতা সরকার

‘কী ব্যাপার গো গুঞ্জা আজ এত দেরি করে এলে?’

গুঞ্জাকে দিদি বলা উচিত রাগিণীর। কারণ, গুঞ্জা অন্তত ওর থেকে বয়েসে বছর পাঁচেকের তো বড় হবেই। কিন্তু গুঞ্জা স্ট্রেট বলে দিয়েছে ওকে যেন গুঞ্জা বলেই ডাকা হয়। নামের আগেপাশে দিদি-মাসি ও পছন্দ করে না। সত্যি বলতে কী কলকাতায় ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার পরে রাগিণীর প্রথম চিন্তাই হয়েছিল, বিশ্বস্ত পরিচারিকা পাবে তো! অফিসের কাজে অভ্যস্ত হলেও ঘরের কাজে রাগিণী যাকে বলে একেবারে অষ্টরম্ভা।

তাই বর্ধমান থেকে কলকাতায় শিফট করার সময় বাবা-মায়েরও একই চিন্তা ছিল, রাগিণী আদৌ একা সব ম্যানেজ করতে পারবে তো! কমপ্লেক্সের ফ্ল্যাটে এই এক সুবিধা, সিকিউরিটি থেকে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি সব ফোন করলেই হাজির হয়। তেমনিই পরিচারিকাও পেয়ে গেল একটা ফোনেই। কমিটির হেডকে ফোন করেছিল রাগিণী। ভদ্রলোক ভীষণ হেল্পফুল। বললেন, ‘ওহ আপনি ভট্টাচার্যদের ফ্ল্যাটে ভাড়া এসেছেন? ব্লক এ, সেকেন্ড ফ্লোর তো? নো প্রবলেম ম্যাডাম। আমি তিনজন পরিচারিকাকে পাঠাচ্ছি ইন্টারভিউ নিয়ে আপনি একজনকে রেখে দিন।’

সর্বনাশ! পরিচারিকাদের আবার ইন্টারভিউ! ওদের বাড়ির এতদিনের পরিচারিকা যমুনামাসিকে তো মাও ঘাঁটাতে সাহস করে না। মা গজগজ করে বলে, ‘যমুনাকে একটা কথা বললে অন্তত দশটা শোনাবে। কাজে চটপটে হলে কী হবে, ওর সঙ্গে কথায় পারবে এমন লোক নাকি আমাদের বর্ধমানের গোলাপবাগ চত্বরে কেউ নেই।’

তাই রাগিণী ওদের বাড়ির সবাই মোটামুটি যমুনামাসিকে সমঝে চলত। জেঠিমাদের বাড়ির পরিচারিকা বিন্দুপিসিকেও ভয় পেত জেঠিমা। বলত, ‘বিন্দুকে কিছু বলার উপায় নেই, দু’দিন ইচ্ছে করে কাজে আসবে না।’

তো এদের নিয়ে রাগিণীর বেশ ভয়ই আছে। এদের ইন্টারভিউ নিতে হবে শুনে এমনিই হাত ঘামতে লাগল।

প্রথম পরিচারিকার নাম টগর। সে বয়েসে ছোট। কিন্তু কথাবার্তায় চৌকশ। ফ্ল্যাটের দুটো ঘর আর ডাইনিং ঘুরে বলল, ‘এই ছোট টিভি দেখেন নাকি আপনি?

আমি আবার যাদের বাড়িতে বাহান্ন ইঞ্চির কম টিভি থাকে তাদের কাজ করি না।’

ফার্নিশড ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে রাগিণী। টিভির সাইজ ছাপান্ন হবে। কিন্তু টিভি দিয়ে রাগিণী করবেটা কী? দিনরাত কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রেখে রেখে আর টিভি দেখতে ইচ্ছে করে না ওর। শুধু মনে হয় বাড়ি ফিরে চোখ বন্ধ করে একটু গান শুনতে। ছুটির দিনে দু-একটা উপন্যাস নিয়ে বসে ও। টিভি দেখার সময় কোথায়! বত্রিশ ইঞ্চি টিভি ঘরে থাকলে কাজের লোক পাওয়া যাবে না এমন কষ্টকল্পনা ও জীবনে করতে পারেনি।

টগরকে ঠিক কী বলা উচিত বুঝতে না পেরে রাগিণী বলল, ‘আমি তো এটা ফার্নিশড ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি। তাই ওদের যা সাজানো ছিল সেটাই আছে। আমি নতুন করে কিছু সাজাব না এই ফ্ল্যাটে।’

টগর বলল, ‘ও বাবা তাহলে আমার আর কাজ করা হল না। বড় টিভি নেই, ডিস ওয়াশার নেই যে বাড়িতে সে বাড়িতে টগর টিকতে পারে না।’

যেমন ঝড়ের বেগে এসেছিল, তেমন চলে গেল টগর। সোফায় ধপ করে বসে পড়ল রাগিণী। ও ওর বসকে বলেছিল, ‘স্যার অফিসে বসার টেবিলটা অল্প নড়ছে, সমস্যা হচ্ছে। এটা চেঞ্জ করা প্রয়োজন।’

বস বলেছিলেন, ‘রাগিণী, আমি ধনঞ্জয়কে বলে দেব।’

পরের দিন থেকে আর সমস্যা হবে না। রাগিণী অফিসে গিয়ে নতুন টেবিল দেখবে আশা করেছিল। গিয়ে দেখেছিল, টেবিলের চারকোনাতে ছোট বড় বিভিন্ন সাইজের প্যাকিং দেওয়া। টেবিল আর নড়ছে না। ধনঞ্জয় মানে ওদের অফিসের গ্রুপ ডি এসবে ওস্তাদ। নিজের মনেই একচোট হেসে নিল রাগিণী। ওর থেকে তার মানে টগরের ডিম্যান্ড বেশি। তা অবশ্য ঠিক। ওষুধ কোম্পানির এই মুহূর্তে এতগুলো অফিস হয়েছে বিভিন্ন শহরে যে রেগুলার ফ্রেশ ছেলে-মেয়ে জব পাচ্ছে। কেউ ছেড়ে দিলে কোম্পানির কিছুই যায় আসে না। মোটা মাইনে দেয় কোম্পানি।

রাগিণী বি ফার্ম পাশ করে এই কোম্পানিতে ঢুকেছে। তারপরেও রোজই অনলাইনে টুকটাক ডিগ্রি বাড়িয়েই চলেছে। রিসেন্ট যে প্রমোশনটা পেয়েছে, তাতে স্যালারির ইনক্রিমেন্ট হয়েছে ভালোই। কিন্তু নিজের শহর ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে কলকাতায়। ফ্ল্যাটটা স্বর্ণাভর দৌলতে মন্দ পায়নি। কিন্তু পরিচারিকা! তার দর্শন পাওয়া আর ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পাওয়া মোটামুটি একই ব্যাপার মনে হচ্ছে।

গ্যাসে চায়ের জল চাপাতেই আবার বেল বাজল রাগিণীর ফ্ল্যাটে। দরজাটা খুলতেই একজন মধ্যবয়সী মহিলা ঝড়ের বেগে ঢুকে বলল, ‘নতুন এলেন বুঝি। শুনলাম কাজের লোক খুঁজছেন। আমার নাম নয়না। লোকে আমায় অসীমের মা বলে ডাকে। আমি চায়ে দু’চামচ চিনি খাই।’ গ্যাসের সসপ্যানে দিকে তাকিয়ে বলল।

রাগিণী সাধারণত চা পাতা দিয়ে চা করে না। ডিপ দিয়েই কাজ চালায়। আরেকটা কাপে দু’চামচ চিনি দিয়ে তারপর ডিপ ডোবাল।

অসীমের মা বলল, ‘সকালে ক’টায় আসতে হবে?’

রাগিণী চায়ের কাপটা ওর সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমাকে অফিস বেরোতে হবে মোটামুটি দশটার সময়। তার আগে ঘর মুছে, রান্না করে দিলেই চলবে। এই সাড়ে আটটা নাগাদ এলেই হবে।’

অসীমের মা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘তা আপনি কি একা থাকবেন নাকি এই ফ্ল্যাটে? আপনার স্বামী থাকবে না?’

রাগিণী হেসে বলল, ‘আমি বিয়ে করিনি এখনও।’

অসীমের মা আপাদমস্তক ওকে দেখে বলল, ‘দেখতে শুনতে তো মন্দ নয়, তাহলে বিয়ে হচ্ছে না কেন? কোনো রোগ আছে নাকি!’

গলা দিয়ে গরম তরলটা নামার ফলেই কিনা জানে না রাগিণী, আচমকাই ওর বলা কথাটা একটু কঠিন শোনাল। ও বেশ কেটে কেটে বলল, ‘এই ফ্ল্যাটটা আমি একা ভাড়া নিয়েছি। বিয়ে আমি এখনও করিনি। যেদিন বুঝব সেদিন করব। হয়নি নয় করিনি।’

অসীমের মা কী বুঝল কে জানে! বলল, ‘কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমি যাদের বাড়িতে কাজ করি অসীমও তাদের বাড়িতে টুকিটাকি ইলেকট্রিকের কাজ বা অন্যান্য কাজ করে দেয়। কিন্তু আপনার বাড়িতে তো ওকে ঢুকতে দিতে পারব না। সমর্থ মেয়ে, কোথায় কী অঘটন ঘটিয়ে আসবেন তারপর আমার বেচারা ছেলেটার ঘাড়ে দোষ পড়বে।’

রাগিণী মাথার দু’দিকের শিরাগুলোর আকস্মিক দপদপানি টের পেল। এত সাহস কী করে হয় এই মহিলার! এমন কল্পনাতীত নোংরা কথা ওকে বলার! নিজেদের এরা মনে করেটা কী?

রাগিণী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপনি এখন আসুন। আপনার অসীম টম ক্রুজ জানলে আমিও আপনাকে অ্যাপ্রোচ করতাম না কাজের জন্য।’

অসীমের মা কিছু না বুঝেই তলানিটুকুতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না। অল্পবয়সী ছেলে তো, তাই সামলে রাখতে হয়।’

অসীমের মা বেরিয়ে যাওয়ার পরেই জোম্যাটো খুলে দুপুরের খাবার অর্ডার করল রাগিণী। চা, বিস্কিট, জ্যাম-পাউরুটি খেয়ে তো আর দুপুর কাটানো সম্ভব নয়। আগামীকাল থেকে অফিস ক্যান্টিনে খেয়ে নেবে। এ যা হাল বুঝছে তাতে এত সহজে এখানে পরিচারিকা পাবে বলে তো মনে হচ্ছে না।

ল্যাপটপ খুলে বসল রাগিণী। কয়েকটা ডেটা লোড করতে হবে, কাজগুলো জমে গেছে। আজ সকাল থেকে কোনো কাজই করতে পারেনি। নতুন জায়গায় শিফট হলে বেশ ধকল হয়। জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতেই একবেলা কেটে গেল। বেলটা বাজছে। খাবার তো ওকে মিনিমাম বত্রিশ মিনিট পরে দেখাল। এখন তো মাত্র পনেরো মিনিট হয়েছে। বেলটা বাজল, দরজা খুলতেই একটা মিষ্টি মুখের বছর ত্রিশের মেয়ে লাজুক মুখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপনার বাড়িতে শুনলাম কাজের লোক লাগবে। তাই এলাম।’

দুজনকে দেখে অলরেডি রাগিণীর ভ্রু বেঁকে গেছে। তিন নম্বর যে আলাদা কিছু হবে না সেটা ও বেশ বুঝতে পারছে। এই কমপ্লেক্সে সব পরিচারিকাই মনে হয় এমন অদ্ভুত টাইপের। মহিলা ফ্ল্যাটে ঢুকেই বলল, ‘আমার নাম গুঞ্জা। আমায় দিদি, মাসি বলে ডাকবে না। গুঞ্জা বলে ডাকবে কেমন?’

রাগিণী দ্বিতীয় আবদার শোনার জন্য রেডি হচ্ছিল।

গুঞ্জা বলল, ‘আমায় কী কী কাজ করতে হবে? আর মাইনে কত দেবে?’

রাগিণী রান্না, টিফিন, ঘর মোছা, বাসন মাজা সব বলার পরে ও বলল, ‘তাহলে তুমি আমায় পাঁচ হাজার দিও। তুমি একা থাকবে তো? একার আর কাজ কতটুকু। ওই পাঁচ হাজারেই হবে।’

রাগিণী রাজি হয়ে গেল।

রাগিণী জানত বর্ধমানের মতো হাজার তিনেকে ও কাউকে পাবে না এই কলকাতার অফিস পাড়ায়। যাক গে, কাউকে যে পেয়েছে এটাই অনেক। গুঞ্জার মুখটা ভীষণ মিষ্টি। শ্যামলা গায়ের রং, টানটান ফিগার, একঢাল চুল বেশ পরিপাটি করে বোঝা যাচ্ছে। বেলটা বাজতেই গুঞ্জা নিজেই গিয়ে দরজা খুলল। জোম্যাটোর কাছ থেকে প্যাকেটটা নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। বেসিনে হাত ধুয়ে প্লেটে বেশ সুন্দর করে সাজিয়ে রাগিণীকে বলল, ‘এসো খেয়ে নাও। তোমার ডাকনাম কিছু নেই?’

রাগিণী বলল, ‘মা ডাকে মুনাই বলে।’

গুঞ্জা হেসে বলল, ‘তাহলে আমিও মুনাই বলব।’

রাগিণী বলল, ‘তুমি খাবে না?’

গুঞ্জা বলল, ‘এই তো বাড়ি গিয়ে খেয়ে নেব। রেঁধে রেখে আসি বুঝলে। গিয়ে গায়ে জল ঢেলে খেতে বসি।’

রাগিণী বলল, ‘তোমার বাড়িতে আর কে কে আছে?’

গুঞ্জা হেসে বলল, ‘আমরা কর্তা গিন্নি দুজন। ছেলে-মেয়ে এখনও হয়নি।’ মুচকি হেসে বলল, ‘আগে নিজেদের জীবনটা একটু এনজয় করি তারপর ছেলেমেয়ে নেব’খন। তুমিও তো বিয়ে করোনি, তাই না?’

রাগিণীর মাথায় আবারও অসীমের মায়ের অদ্ভুত অসহ্য কথাটা ঘুরে এল। বিয়ে না করলে যেন এ পৃথিবীতে আহ্নিক গতি বন্ধ হয়ে যাবে। বিরক্তিতে ভ্রুটা কুঁচকে যাওয়ার আগেই গুঞ্জা বলল, ‘বেশ করেছ বিয়ে করোনি। মোটা মাইনে চাকরি করো, একা ফ্ল্যাটে আছ, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে একটু এনজয় করো। বাকি জীবন তো পরেই আছে সংসারের ঘানি টানার জন্য। যে ক’দিন পারো ফ্রি হয়ে আনন্দ করো। যাই হোক, বাজার কি আমি করে আনব? নাকি তুমি করে আনবে? যদি আমায় করতে হয় তো টাকা দিয়ে দিও আর লিস্ট দিয়ে দিও।’

রাগিণীর বেশ ভালো লাগছে গুঞ্জাকে। মেয়েটা ঝর্ণার মতো হাসে, সরলরেখায় কথা বলে।

রাগিণী বলল, ‘তুমি কাল সকাল থেকেই এসো গুঞ্জা। বাজার আমি অনলাইনে করে রাখব।’

আজ তিনমাস হল গুঞ্জা রাগিণীর ফ্ল্যাটে কাজে লেগেছে। দু’দিন বাদ দিয়ে কামাই নেই। বলে, ‘ধুর, বাড়িতে বসে থাকতে অসহ্য লাগে। মোট তিনবাড়ি কাজ করে গুঞ্জা। রান্না করে শুধু রাগিণীরই। বাকি বাড়ি দুটোতে শুধু ঘর মোছার কাজ।’

রাগিণীর জীবন এখন গুঞ্জার দয়ায় ঝিঙ্গালালা। সকালে সময় মতো চা থেকে সুন্দর টিফিন, রকমারি ব্রেকফাস্ট, সন্ধের ফেরার পরে গরম চা সঙ্গে টায়ের প্লেট, সব মিলিয়ে বেশ সুখী জীবন।

সত্যি বলতে কী, এই তিনমাসে গুঞ্জার ওপরে একটু বেশিই নির্ভরশীল হয়ে গেছে। যে দু’দিন গুঞ্জা আসেনি সে দু’দিন ওর আটশো স্কয়ারফিটের ফ্ল্যাটে নিস্তব্ধতা নেমেছিল। একটা অদ্ভুত শূন্যতা বিরাজ করছিল যেন। রাগিণী বুঝেছিল, মানুষ সত্যিই অভ্যাসের দাস।

আজ রবিবার, গুঞ্জার বেলের আওয়াজেই সাধারণত ঘুম ভাঙে রাগিণীর। আজ গুঞ্জা এল প্রায় সাড়ে ন’টা নাগাদ। রাগিণী গড়িমসি করে সবে চা-টা নিয়ে বসেছে, তখন ঢুকল গুঞ্জা।

রাগিণী আবারও জিজ্ঞাসা করল, ‘কী গো আজ এত দেরি কেন? শরীর ঠিক আছে তো?’

গুঞ্জা হেসে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ শরীর ঠিক আছে। আসলে গতকাল সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। ফিরে ঘুমিয়েছি আর দেরি হয়ে গেল। তারপরে আবার বিশ্বাস গিন্নির আজকেই যত কাজ মনে পড়ল। ওদের বাড়ির কাজ সেরে এলাম।’

রাগিণী বলল, ‘তা কী সিনেমা দেখলে?’

‘ওই যে ”বেলাশুরু” দেখলাম। আমি সৌমিত্রবাবুর ফ্যান। যেদিন মারা গেলেন সেদিন আমি শুধু কেঁদেছি। কালকেও সিনেমা হলে কেঁদেছি।’

রাগিণী বলল, ‘তোমার বরও গিয়েছিল বুঝি?’

গুঞ্জা হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, ওর শখেই তো যাওয়া গো। সে আবার আমায় এত ভালোবাসে যে আমায় ছাড়া কোনো চুলোয় নড়বে না। ঝগড়া হোক, ঝামেলা হোক আমায় নিয়ে যাবেই।’

গুঞ্জার লজ্জা পাওয়া হাসিটা দেখে একটু লেগপুল করার ইচ্ছে ছিল রাগিণীর কিন্তু তার আগেই স্বর্ণাভর ফোন এল।

ফোনটা রিসিভ করতেই স্বর্ণাভ বলল, ‘কী গো, কী করছ? এত মেসেজ করছি সিন করছ না কেন?’

রাগিণী বলল, ‘এই যে আমার মেড আজ দেরিতে এসেছে, তাই ল্যাদ খাচ্ছিলাম।’

স্বর্ণাভ বলল, ‘মুভি দেখতে যাবে?’

রাগিণী লাফিয়ে বলল, ‘যাব। বেলাশুরু চলো।’

স্বর্ণাভ করুণ গলায় বলল, ‘বাংলা সিনেমা? ডক্টর স্ট্রেঞ্জ দেখলে হয় না?’

রাগিণী আদুরে সুরে বলল, ‘না, হয় না।’

স্বর্ণাভ বলল, ‘দেন ওকে। আমি আসছি, রেডি হয়ে থেকো।’

স্বর্ণাভ এই গ্রিন ভ্যালি কমপ্লেক্সের ব্লক ডি-র ছ’তলায় থাকে। স্বর্ণাভ আর রাগিণী একই অফিসে জব করে। পরিচয়টা হয়েছিল একটা কনফারেন্সে গিয়ে। তখন রাগিণী সদ্য এই কোম্পানি জয়েন করেছে। কলকাতায় কোম্পানির একটা বড় কনফারেন্স ছিল। সেই সূত্রেই এসেছিল। ছোট পিসির ফ্ল্যাটে উঠেছিল আগের দিন। ওখান থেকেই গিয়েছিল কনফারেন্সে। ওখানের কারোর সঙ্গে তেমন পরিচয় ছিল না। তখনই স্বর্ণাভ এসে উপযাচক হয়ে পরিচয় করেছিল। বলেছিল, ‘কফি খেয়েছেন? চলুন এখন বড় বড় মাথারা বক্তব্য রাখবেন। আমরা চুনোপুঁটি মানুষ, তার থেকে বরং গলা ভিজিয়ে আসা ভালো।’

সেই শুরু স্বর্ণাভর সঙ্গে আলাপের। তারপরে ফোন নম্বর বিনিময় থেকে শুরু করে ফেসবুক ফ্রেন্ড হয়েছিল ওরা খুব তাড়াতাড়ি। রাগিণী বা স্বর্ণাভ কেউই কোনোদিন কাউকে প্রোপোজ করেনি। ওরা শুধু জানত, যে-কোনো সমস্যায় ওরা একে অপরকে সাহায্য করবে। না লিখিত কোনো চুক্তি নয়, এ ছিল ওদের অলিখিত চুক্তি। ওদের সমস্ত অনুভূতিগুলোই ছিল ভীষণ রকমের ব্যক্তিগত। কেউই কারোর কাছে সে অনুভূতির প্রকাশ করে ফেলেনি কখনও। শুধু নিজের মধ্যে একটু একটু করে প্রশ্রয় পেয়েছে অনুভূতিগুলো। রাগিণী জানে, স্বর্ণাভ ওকে ভালোবাসে। স্বর্ণাভও হয়তো জানে রাগিণীর মনের কথা। কিন্তু সেভাবে বলা হয়নি কিছুই। স্বর্ণাভর প্রিয় রং, ফেভারিট খাবার সব জানে রাগিণী। ওর একান্ত ব্যক্তিগত সবকিছুই ও শেয়ার করে স্বর্ণাভর সঙ্গে, শুধু এখনও বলা হয়ে ওঠেনি, রাগিণী ওকে ভালোবাসে। কোনো এক বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যার অপেক্ষা, নাকি কোনো ক্লান্ত দুপুরের অপেক্ষা, নাকি পাতা ঝরার মরশুমের অপেক্ষায় রয়েছে রাগিণী যেদিন ও স্বর্ণাভকে বলে দেবে ভালোবাসি। হাঁটবে আমার সঙ্গে গোটা একটা জীবন?

নাকি এসব কিছুর অপেক্ষাতেই নয়, শুধু নিজেদেরকে আরও পরিপাটি করে বেঁধে রাখার সরঞ্জামের অপেক্ষায় আছে ওরা!

‘কী গো, কী আকাশ-বাতাস ভাবছ তুমি?’

গুঞ্জা ব্রাউন ব্রেড আর ডিমের অমলেট এনে সামনে রেখেছে। ‘সিনেমা দেখতে যাবে? কার সঙ্গে? বয়ফ্রেন্ড?’

কে জানে কেন আজ আচমকা একমুঠো আবির এসে রাঙিয়ে দিতে চাইছে রাগিণীর গাল।

সেদিকে তাকিয়েই গুঞ্জা বলল, ‘আসবে নাকি এখানে? তাহলে দেখব কেমন মানিয়েছে।’ গুঞ্জার উত্তেজনার যেন শেষ নেই।

রাগিণী বলল, ‘ও আমার ফ্রেন্ড। এই কমপ্লেক্সেই ওরও ফ্ল্যাট আছে। ও-ই আমায় কলকাতায় বদলি হয়েছি শুনে এই ফ্ল্যাটটা ঠিক করে দিয়েছে।’

যেদিন রাগিণী প্রথম খবর পেয়েছিল, ওকে কলকাতা অফিসে শিফট করতে হবে সেদিনই প্রথম মনে হয়েছিল, কলকাতায় গিয়ে সব ম্যানেজ করবে কী করে! তখন অবশ্য একটা মুখ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল, সেটা স্বর্ণাভর। সন্ধেবেলায় ওকে ফোন করে বলেছিল, ‘আমায় তোমার অফিসে যেতে হবে। ট্রান্সফার হয়ে গেল।’

স্বর্ণাভর গলার খুশিটুকু চাপা থাকেনি সেদিন। উচ্ছ্বসিত হয়ে স্বর্ণাভ বলেছিল, ‘সত্যি বলছ রাগিণী? তোমার সঙ্গে এবার থেকে রেগুলার দেখা হবে আমার? উফ আমি তো জাস্ট ভাবতেই পারছি না।’

রাগিণী আলগা সুরে বলেছিল, ‘তাতে তোমার লাভ?’

স্বর্ণাভ বলেছিল, ‘সব কিছুতে কি লাভ লোকসানের হিসেব চলে? শরতের আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। কারণ ব্যাখ্যা করতে দিলে বাংলার প্রবন্ধ লেখা প্রফেসরও ঘাবড়ে গিয়ে বলবেন, আনন্দর কি কোনো ব্যাখ্যা হয়? তেমনিই তুমি কলকাতা আসবে, রোজ দেখা হবে শুনে অদ্ভুত একটা ফিলিংস হচ্ছে রাগিণী।’ আচমকাই কলকাতায় পার্মানেন্টলি থাকার একটা রিজন পেয়ে গিয়েছিল রাগিণী। মনে হয়েছিল, একজন অন্তত আছে যে চায় ও তিলোত্তমায় আসুক।

বাবা, মায়ের জন্য, নিজের ঘরটার জন্য মনখারাপ করলেও স্বর্ণাভর কথাতেই কিছুটা ভরসা পেয়েছিল। স্বর্ণাভ অবশ্য ওর ভরসা রেখেছে। সস্তায় ফার্নিশড ফ্ল্যাট খুঁজে দিয়েছে। অফিস যাওয়ার শাটল থেকে শুরু করে যাবতীয় কিছু সামলে দিয়েছে। সত্যি বলতে কী, ও-ই এই কমপ্লেক্সের কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। সেইজন্যই গুঞ্জাকেও পেয়ে গেছে ও।

গুঞ্জা আপন মনে রান্নাঘরে কাজ করছে। রাগিণী আলমারি খুলে জোরে ডাকল গুঞ্জাকে।

গুঞ্জা এসে বলল, ‘বলো, আরেককাপ চা লাগবে নাকি?’

রাগিণী হেসে বলল, ‘এই নাও, এই চুড়িদার দুটো তুমি পরবে।’

গুঞ্জা একটু চমকে গিয়ে বলল, ‘একেবারে দিয়ে দিলে? এ তো একদম নতুন!’

রাগিণী মুচকি হেসে বলল, ‘নতুনই তো। কিন্তু একজন বলেছে এই শ্যাওলা গ্রিন রংটা নাকি আমায় মানায় না। তাই আর রিস্ক নিলাম না।’

গুঞ্জা আন্তরিকতার ছোঁয়া পেয়ে বলল, ‘আমি বলব তোমায় কোন রঙে মানায়?’

রাগিণী আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে আনমনে বলল, ‘কোন রঙে?’

গুঞ্জা একমুখ হেসে বলল, ‘নীল রঙে। আকাশনীল রঙে। তোমার মনটা তো আকাশের মতো বড়, তাই তোমায় এই রঙেই ভালো লাগে।’

রাগিণী একটা নীলচে কুর্তি বের করে বলল, ‘ব্যস। আজ নীল পরব। গুঞ্জার কথাই শেষ কথা। আচ্ছা গুঞ্জা, তুমি তো আমার থেকে বড়, তাহলে আমায় দিদি বলতে দিলে না কেন?’

গুঞ্জা বলল, ‘আমি নিজের নামটা শুনতে চাই বারবার। তাই দিদি, মাসি এসব বারণ করি। এই নামটা আমার খুব পছন্দের গো।’

রাগিণী বলল, ‘এই নামটা কি তোমার বরের দেওয়া নাকি?’

গুঞ্জা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। বাবার দেওয়া নাম ছিল জয়ন্তী। ও ডাকে গুঞ্জা বলে। আমি চাই সবাই এই নামেই ডাকুক।’

রাগিণী খাওয়া-দাওয়া করে নিজের ঘরে গেল রেস্ট নিতে। এসময় গুঞ্জা রান্নাঘর পরিষ্কার করে। বেলের আওয়াজ শুনতে পেল ও। রাগিণী বিছানা ছেড়ে ওঠার আগেই গুঞ্জা দরজাটা খুলে দিয়েছে। স্বর্ণাভর গলা শুনতে পেল রাগিণী। তিনমাসের মধ্যে আজ প্রথম ওর ফ্ল্যাটে এল স্বর্ণাভ।

গুঞ্জা পড়িমরি করে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি সন্ধেবেলা এসে সব পরিষ্কার করব। এখন চললাম।’

অদ্ভুত বিহেভ করল গুঞ্জা! রাগিণীর ভ্রু কুঁচকে গেছে। পুরুষ মানুষ দেখে এত লজ্জা পাওয়ার মেয়ে তো গুঞ্জা নয়। ইলেকট্রিক মিস্ত্রির সঙ্গে বেশ বকবক করছিল সেদিন। পেপারওয়ালার সঙ্গেও গল্প জমায় ও। তাহলে আজ হঠাৎ স্বর্ণাভকে দেখে এমন আচরণের কারণ কী! তাছাড়া গোটা মুখটা ওড়নায় ঢেকে বেরিয়ে গেল কেন গুঞ্জা!

স্বর্ণাভ বাইরের সোফায় বসেছে। ওকে দেখেই বলল, ‘এ কী, এখনও রেডি হওনি? বিকেল চারটের শো তো তোমার বেলাশুরুর।’

রাগিণীর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছে। গুঞ্জার হল কী!

রান্নাঘরে সব ছড়ানো পড়ে আছে। অত্যন্ত গোছানো পরিপাটি মেয়ে ও। এভাবে ছুটে পালাল কেন? মনটা কেমন অস্থির হয়ে গেল রাগিণীর।

ওকে অন্যমনস্ক দেখে স্বর্ণাভ বলল, ‘কিছু হয়েছে রাগিণী? এনি প্রবলেম?’

রাগিণী নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘নাথিং সিরিয়াস। জাস্ট টেন মিনিটস। আমি আসছি রেডি হয়ে।’

ফ্রিজ থেকে কোল্ড ড্রিংক নিয়ে স্বর্ণাভকে একটা গ্লাসে দিয়ে বলল, ‘তুমি খাও আমি আসছি।’

গুঞ্জার কথা মতো আকাশনীল কুর্তিটাই পরল ও সাদা পেন্সিল প্যান্টের ওপরে। বাইরে রোদের তেজ কমে এলেও এখনও যথেষ্ট আছে দেখেই সানগ্লাসটা নিয়ে নিল রাগিণী। এই প্রথম ও স্বর্ণাভর বাইকে চাপল। অফিসে বাইক নিয়ে যায় না স্বর্ণাভ, তাই দিন চারেক একসঙ্গে অফিস থেকে বেরোলেও ওরা উবেরে করে বাড়ি ফিরেছে।

বাইকে বসতেই স্বর্ণাভ বলল, ‘সাবধানে ধরে বসো। আমি ড্রাইভার হিসাবে তেমন নাম করতে পারিনি বলে মা অফিস অবধি যেতে দেয় না। নেহাত কাছের মলে যাব শুনে আর আটকায়নি। তাই বুঝতেই পারছ কাঁচা ড্রাইভারের বাইকে বসলে একটু সাবধান হয়ে বসতেই হবে। এনি ওয়ে, তোমাকে কি এর আগে কেউ বলেছে নীল রঙে তোমায় মারাত্মক লাগে? রূপম ইসলাম বোধহয় তোমায় দেখেই গেয়েছিলেন, নীল রং ছিল ভীষণ প্রিয় আচ্ছা রাগিণী, তোমার অহংকার হয় না কখনো?’

রাগিণী স্বর্ণাভর কাঁধে হাতটা আলতো করে রেখে বলল, ‘কীসের অহংকার?’

স্বর্ণাভ বলল, ‘না, শুনেছি সুন্দরী মেয়েরা নাকি অহংকারী হয়। আর তুমি অযথা নিরহংকার হতে যাবেই বা কেন? তুমি কি জানো তোমার দিকে একবার তাকালে দৃষ্টি স্থির হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভবনা রয়েছে?’

রাগিণী বলল, ‘হঠাৎ তোমার হল কী স্বর্ণাভ?’

স্বর্ণাভ বলল, ‘সেটা তো আমিও খুঁজছি। তোমাদের সবজান্তা গুগল অবধি বলতে পারছে না এই অনুভূতির নাম কী! পাড়ার ডেঁপো ছেলেদের জিজ্ঞাসা করলে বলছে, দাদা প্রেমে পড়েছে। মা বলছে, পেট গরম হয়েছে। বাবা আরেককাঠি এগিয়ে বলল, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের এফেক্ট। বাকি রইলে তুমি রাগিণী। তুমিই বলো এমন অনুভূতির নাম কী?’

রাগিণী নরম হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে বলল, ‘রোগটা কঠিন। কালটিভেট করতে হচ্ছে।

নীল কুর্তির যে-কোনো মেয়ে দেখলেই কি এমন হচ্ছে? নাকি বিশেষ কাউকে? এমন ছোট ছোট গবেষণা আছে। তাকে সামনে দেখলে হচ্ছে, নাকি রাতে ঘুমের আগেও হচ্ছে! নাকি দিবারাত্র তার নিঃশব্দ আনাগোনা চলছে?’

স্বর্ণাভ বলল, ‘একজনকে কেন্দ্র করেই সব অনুভূতির আবর্তন চলছে। দ্বিতীয় কেউ দূরেও নেই।’

রাগিণী মুচকি হেসে বলল, ‘তাহলে তো ভাবতে হবে। সময় লাগবে।’

স্বর্ণাভ বলল, ‘পরিচয়টা প্রায় বছর দুয়েকের হলেও ঘনিষ্ঠতার মেয়াদ মাত্র মাস তিনেক। এই তিনমাসে আমি ফিল করছি, সামথিং রং। আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন হয়েছে রাগিণী। ভাবনা-চিন্তাগুলো একটু তাড়াতাড়ি করলে হয় না? মানে এই উল্টো করে টাঙিয়ে রাখার মতো অদ্ভুত একটা অনুভূতি নিয়ে জীবন চালানোটা বেশ কঠিন।’

রাগিণী বেশ বুঝতে পারছে, স্বর্ণাভ প্রোপোজ করতে পারছে না। তাই এসব উড়ো কথার জাল বিস্তার করছে।

মুভি দেখে রাগিণীর ফ্ল্যাটে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে স্বর্ণাভ। যাওয়ার সময় বলেছে, ‘তুমি কি জানো তোমায় কাঁদলেও সুন্দর লাগে? সিনেমা হলে দেখলাম, বাচ্চার মতো কাঁদছিলে। খুব ইচ্ছে করছিল, মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু অতটা অধিকার আমি বোধহয় এখনও পাইনি। যদি কখনও পাই, তাহলে আজকের ইচ্ছেটুকু পূরণ করে নেব।’

রাগিণীর খুব ইচ্ছে করছিল বলতে, ‘অধিকার নিজেকেই নিয়ে নিতে হয় মাঝে মাঝে।’ কিন্তু ওই আচমকা লজ্জাবশত বলা হল না।

ফ্ল্যাটে ঢুকতেই বেল বাজল। রাগিণী ভেবেছিল, স্বর্ণাভ হয়তো এসেছে কিছু বলবে বলে। দরজা খুলে দেখল গুঞ্জা দাঁড়িয়ে আছে। মুখে-চোখে একটা আতঙ্ক। আনমনাভাবে বলল, ‘তুমি চা খাবে? আমি রান্নাঘরটা পরিষ্কার করে নিই আগে।’

রাগিণী ওকে বসিয়ে বলল, ‘তুমি স্বর্ণাভকে দেখে অমন ভূত দেখার মতো তখন পালালে কেন?’

গুঞ্জা অস্বীকারের ভঙ্গিমায় বলল, ‘পালাইনি তো। এমনিই শরীরটা ভালো লাগছিল না তাই। ওই দাদাবাবু কি প্রায়ই এই ফ্ল্যাটে আসবে নাকি গো?’

রাগিণী ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘তাতে কি তোমার কোনো সমস্যা আছে গুঞ্জা? তুমি কি চেনো স্বর্ণাভকে? তুমি তো অনেকদিন এই কমপ্লেক্সে কাজ করছ, ওকে চেনো নাকি?’

গুঞ্জা তীব্রভাবে মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘না না, আমি চিনব কী করে! এত বড় কমপ্লেক্স। কত ফ্ল্যাট এখানে। আমি চিনি না।’

রাগিণী বলল, ‘ও আমার বয়ফ্রেন্ড হলে কেমন হবে গুঞ্জা? আমাদের মানাবে?’

গুঞ্জা দায়সারা ঘাড় নেড়ে বলল, ‘তুমি বসো, আমি চা আনছি।’

রান্নাঘর গুছিয়ে, বেশি করে রান্না করে রাত নয়টার সময় চলে গেল গুঞ্জা। অন্যদিন গুনগুন করে গান গায়। সিরিয়াল দেখে। নিজেকেই চারবার আয়নায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে নেয়। আজ যেন তার কিছুতেও মন নেই। ভীষণ রকমের অন্যমনস্ক হয়ে রয়েছে। রাগিণী কিছু প্রশ্ন করলে হুঁ বা হ্যাঁ তে উত্তর দিচ্ছে। একটা প্রাণচঞ্চল ঝর্ণাকে আচমকাই যেন কেউ বাঁধ দিয়ে আটকে দিয়েছে।

ঝর্ণাটা যেন তার গতিরোধ হবার কারণে গুমরে মরছে।

গুঞ্জা চলে যাওয়ার পরেই রাগিণী ফোন করল স্বর্ণাভকে। স্বর্ণাভ কিছু বলার আগেই রাগিণী আচমকা প্রশ্ন করল, ‘তুমি গুঞ্জাকে চেনো?’

স্বর্ণাভ বলল, ‘তোমার মেডের নাম তো গুঞ্জা বলেছিলে। এটা কি অন্য কোনো গুঞ্জার কথা বলছ?’

রাগিণী বলল, ‘আমার মেড গুঞ্জার কথাই বলছি। চেনো ওকে?’

স্বর্ণাভ একটু থেমে বলল, ‘না, এই নামের কাউকে আমি চিনি না। কেন বলো তো? তোমার মেড তো আমায় দেখে আজকে তড়িঘড়ি পালাল। কেসটা কী?’

রাগিণী বলল, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। সামথিং হ্যাপেন্ড।’

রোজই গুঞ্জার বেল আর বেড-টিতে ঠিক করে ঘুমটা ভাঙে রাগিণীর। ঘুম ভেঙে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে গেছে ও। বেলা ন’টা বাজে, এখনও গুঞ্জা আসেনি?

ছটফট করে উঠে ওয়াশরুমে ঢুকল ও। এমনিই বেশ দেরি হয়েছে। রেডি হতে হবে তাড়াতাড়ি। গুঞ্জা তো না বলে এমন আচমকা কামাই করে না! তাহলে কি ওর বরের শরীর খারাপ করল নাকি! নিজের দেরি হওয়া সত্ত্বেও গুঞ্জার নম্বর ডায়াল করল রাগিণী। ফোন সুইচড অফ। এবারে সত্যিই রাগিণীর দুশ্চিন্তা হচ্ছে। গুঞ্জা এই তিনমাসে ওপর পরিবারের একজন হয়ে গেছে। এতটাই বিশ্বাসী যে এদিকের জিনিস ওদিক হয়নি। এমনকি সেদিন চার হাজার টাকা টেবিলে রেখে বেরিয়ে গিয়েছিল রাগিণী। গুঞ্জাই যত্ন করে তুলে রেখেছিল। ও ফিরতেই ধমক দিয়ে ফেরত দিয়েছে। রাগিণীর সোনার আংটি পেয়েছিল বিছানা ঝাড়তে গিয়ে সেটাও যত্ন করে ফেরত দিয়েছে। প্রতিবারই দিদিসুলভ বকুনি অবশ্য রাগিণীর প্রাপ্য ছিল। ওকে যত্ন করে খেতে দেওয়া থেকে ওর টিফিন গুছিয়ে দেওয়া সবই যেন গুঞ্জার নিজের কাজ ছিল। কবে যে এতটা আপন করে নিয়েছিল ও রাগিণীকে, সত্যিই বুঝতে পারেনি। ফ্রিজে বেশ কিছু রান্না দেখে রাগিণী বুঝতে পারল, গুঞ্জা আজকের রান্না করে রেখে গেছে। কিন্তু আজ যে আসবে না সেটা বলে গেল না কেন! ফোনটাই বা অফ কেন করে রেখেছে!

অফিসে গিয়েও একটু অন্যমনস্ক ছিল রাগিণী।

হঠাৎই স্বর্ণাভ এসে বলল, ‘রাগিণী, তোমার মেডের নাম কি জয়ন্তী?’

রাগিণীর মনে পড়ল, গুঞ্জা বলেছিল বাবা ওর নাম দিয়েছিল জয়ন্তী। ও ঘাড় নেড়ে স্বর্ণাভকে বলল, ‘হ্যাঁ জয়ন্তী।’

স্বর্ণাভ বলল, ‘বুঝেছি ও কেন আমায় দেখে পালাল কালকে। তুমি এত বড় কমপ্লেক্সে আর লোক পেলে না? শেষ পর্যন্ত একটা চোরকে রাখলে? প্রতিটা কাজের মেয়ে অন্তত পাঁচ-ছটা বাড়িতে কাজ করে। ও কেন দুটো বাড়িতে তোমার সন্দেহ হয়নি কখনও?

আরে এই কমপ্লেক্সে ওকে সবাই চেনে চোর বলে। ও আমার মায়ের সোনার হার চুরি করেছিল। নেহাত গরিবের মেয়ে তাই মা জেলে দেয়নি। আর হারটা যেহেতু পাওয়া যায়নি তাই দোষ দেওয়া যায়নি। ওই জন্যই ও আমায় দেখে পালাল। আমি যদি চিনে ফেলি! তোমায় বললে কাজটা চলে যাবে তাই।’

চমকে উঠেছে রাগিণী। গুঞ্জা চোর! ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। এমন নয় যে পরিচারিকা চোর এটা এই প্রথম শুনল ও। কিন্তু গুঞ্জার ওই সরল হাসিটার মধ্যে চুরির ইতিহাস লুকিয়ে আছে এটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে ওর। অফিস আসার আগেই সিকিউরিটি অফিস থেকে গুঞ্জার বাড়ির ঠিকানাটা লিখে এনেছে রাগিণী। ওদের কমপ্লেক্সের কাছেই জানাল সিকিউরিটি। ফেরার পথে ওর বাড়িতে একবার ঘুরে যাবে এমনই ভেবেছিল রাগিণী।

এখন স্বর্ণাভর কথা শুনে বেশ বুঝতে পারছে কিছু একটা গন্ডগোল আছে। কিন্তু রাগিণীর ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি পর্যন্ত রাগিণী ওকে দিতে চেয়েছিল ওর কাজের সুবিধার জন্য। সেটাও নেয়নি গুঞ্জা, আজ তাকে চোর ভাবতে কষ্ট হচ্ছে ওর। এদিকে স্বর্ণাভকে অবিশ্বাস করবে এমন জোর কোথায়? আর তাছাড়া অযথা স্বর্ণাভ মিথ্যে বলবেই বা কেন গুঞ্জার নামে!

স্বর্ণাভ বলল, ‘তুমি ওকে ছাড়িয়ে দাও। আমি মাকে বলছি একটা ভালো মেড তোমার জন্য দেখে দিতে। এনিওয়ে, আমাদের বাড়ি কবে যাবে? মা তোমায় দেখতে চাইছে।’

রাগিণী হেসে বলল, ‘যেদিন তুমি নিয়ে যাবে!’

অফিস থেকে ফেরার পথে রাগিণীর মনে হল, একবার গুঞ্জার মুখোমুখি হওয়া দরকার। এভাবে ঠকাবে ও রাগিণীকে এটা যেন কিছুতেই রাগিণী মেনে নিতে পারছে না। বাড়ি বলতে একটা ঘর, সামনে বারান্দা, টিনের চাল। তিলোত্তমার জমকালো জীবন এখানে প্রবেশ করতে পারেনি। গলিটাতেও কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। পাশে বড় বড় কমপ্লেক্স, শপিং মল, টাওয়ারের ভিড়ে এই ছোট্ট, নিতান্ত মাটিতে মিশে যাওয়া ঘরগুলো যেন চোখেই পড়ে না। অথচ এখানে গুঞ্জার মতো অনেকেই বাস করে। যারা সকাল হলেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে কাজ করতে যায় আর ক্লান্ত হয়ে ফেরে এই হাওয়া-বাতাসহীন দমবন্ধ গলিতে।

রাগিণী ওর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বেশ জোরেই ডাকল, ‘গুঞ্জা…’

এলোথেলো পোশাক, উস্কোখুস্কো চুলে যে মেয়েটা বেরিয়ে এল, তাকে গুঞ্জা বলে চিনতে কষ্ট হচ্ছে। এক রাতে যেন ওর চেহারা আর মনে কেউ বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছে। ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে যেন গুঞ্জা।

রাগিণী বলল, ‘তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।’

গুঞ্জা দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে বলল, ‘জানি কী বলবে! আমি চোর, তাই তো? স্বর্ণাভর মায়ের দু’ভরির হার চুরি করে পালিয়েছিলাম, তাই তো? হ্যাঁ গো ঠিকই বলেছে ও, সত্যিই আমি চুরি করেছিলাম। তোমার বয়ফ্রেন্ডকে দেখে ওই জন্যই ভয়ে পালিয়ে এসেছি। আমি আর কাজে যাব না রাগিণী। আমায় ক্ষমা করো।’

রাগিণী কোনো কথা না বলে ওর ঘরে ঢুকে গেল। একটা ছোট্ট সিঙ্গেল চৌকি, ছোট একটা কাঠের টেবিল, বড় একটা আয়না লাগানো রয়েছে। টেবিলে একটা বেশ সুন্দর দেখতে ছেলের ছবি ফ্রেমে বাঁধানো।

রাগিণী দেখল, সুন্দর করে পরিপাটি করে রেখেছে ঘরটাকে। আসবাব কম ঠিকই কিন্তু ছিমছাম সৌন্দর্যের অভাব নেই।

ছেলেটার ছবির দিকে তাকিয়ে রাগিণী বলল, ‘ওটা কে?’

মাথা নিচু করে গুঞ্জা বলল, ‘আমার বর।’

রাগিণী ধমকের সুরে বলল, ‘মিথ্যে বলছ। এই ঘর, বিছানা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমি একা থাকো। কে ওটা?’

গুঞ্জা কাঁদছে, ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মাটিতেই বসে পড়ল ধপ করে। বলল, ‘ওর নাম নির্মল। এখন শ্রাবণীর বর। ওর সঙ্গে আমার প্রেম ছিল। ওই যে তোমাদের কমপ্লেক্সের ডান দিকে যে কমপ্লেক্স আছে সিটি টাউন নামে ওখানের সিকিউরিটি ছিল। আমি তখন সিটি টাউনে দুটো ফ্ল্যাটে কাজে ঢুকেছিলাম। মা লোকের বাড়ি রান্না করত। সেই পরিচয়েই কাজে ঢুকি। তখনই ওখানের সিকিউরিটি নির্মলের সঙ্গে আমার ভালোবাসা হয়। আমরা বিয়ে করবও ঠিক করি। নির্মল আমায় গুঞ্জা বলে ডাকত। মদ, ভাঙ খায় না, কোনো দোষ নেই, এমন ছেলে লাখে একটা পাওয়া যায়। আমার কপাল ভালো ছিল তাই আমার প্রেমে পড়ল। আমি বেশি বেশি কাজ করে নিজেদের একটা ঘর তুলব ভেবে আরও তিন বাড়িতে কাজ নিলাম। তার মধ্যে সতীশবাবুদের বাড়িতেও কাজে ঢুকলাম। স্বর্ণাভর বাবা সতীশবাবু পেশায় ইঞ্জিনিয়ার।

বৌদি গিয়েছিল চারদিনের জন্য বাপের বাড়ি। আর স্বর্ণাভ অফিস থেকে ট্যুরে গিয়েছিল। আমি রান্না করতে ঢুকলেই আমায় জোর করে রেপ করল।’

বলতে বলতেই অঝোরে কাঁদছিল গুঞ্জা।

রাগিণী নিশ্চুপ বসে আছে। স্বর্ণাভর সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত মনে পড়ে যাচ্ছে।

সতীশবাবু বলেছিল, ‘কাউকে বললে বদনাম করে তাড়াবে বাড়ি থেকে। এ চত্বরে আর কাজ পাব না। তবুও বৌদি বাড়ি ফিরতেই আমি বলেছিলাম। বৌদি সব শুনে আমাকেই হার চুরির দায় দিল। কমিটিতে জানাল। আমার ব্যাগ সার্চ করে কিছু পেল না। কিন্তু আমায় আর কোনো বাড়িতে কাজে নিল না। এক বছর আমি প্রায় বসে ছিলাম। নির্মল আমার চুরির খবর জানতে পেরে আমায় ছেড়ে দিল। আমার মায়েরও কাজ চলে গেল। হয়তো মরা উচিত ছিল আমার। কিন্তু আমি নিজেকে বড্ড ভালোবাসি, আমার এই একমাথা চুল, কোমরের ভাঁজ, ঠোঁটের হাসি এগুলো আমার খুব প্রিয়। তাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আর মরতে ইচ্ছে করল না। এই কমিটির সেক্রেটারি খুব ভালো মানুষ। ও আমাকে আবার দুটো কাজ জুটিয়ে দিল। তোমার কাজটা পাওয়ার পরে আমি নিশ্চিন্ত হলাম। জলখাবার থেকে দুপুর, রাতের খাওয়া সব তুমি দিচ্ছিলে। তখনই ভেবেছিলাম, এই ভাড়া বাড়ি ছেড়ে একটা ঘর কিনব। কিন্তু সে সুখ আমার সইল না। স্বর্ণাভ তোমার বয়ফ্রেন্ড। ওকে দেখেই বুঝেছিলাম, ও আমার নামে মিথ্যে কথা বলবেই। তুমি মুখের ওপর বলবে, গুঞ্জা বেরিয়ে যাও। তার আগেই আমি বেরিয়ে এলাম। বিয়ে আমার হয়নি। কিন্তু অবিবাহিত বললে কেউ কাজ দেয় না গো। তাই মিথ্যে বলতে হল। আর নির্মলকে আমি মনে মনে বরই মানতাম।’

রাগিণী বলল, ‘কাল সকালে আসবে কাজে। আমার দরকার আছে।’

গুঞ্জা বলল, ‘তুমি অবিশ্বাস করতে পারো। আমার হাতে কোনো প্রমাণ নেই। তার থেকে বরং আমি আর যাব না তোমার বাড়ি।’

রাগিণী বলল, ‘এগুলো স্বর্ণাভ জানে?’

গুঞ্জা বলল, ‘বাবার চরিত্র না জানার তো কিছু নেই। আমার হাতে টাকা দিয়ে ও-ই তো বলেছিল, কেউ যেন আসল ঘটনা না জানে।’ গুঞ্জা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘কেস করলে না কেন গুঞ্জা? থানায় গেলে না কেন?’

গুঞ্জা বলল, ‘গরিবের কথা কে শুনবে? নিজের বাবা, মা তাড়িয়ে দিল বাড়ি থেকে। নির্মল মুখ ফেরাল। কেন শুনবে আমাদের কথা কেউ?’

* * *

‘কী ব্যাপার সকাল সকাল তলব? অফিস যাবে না? নাকি একসঙ্গে যাওয়ার প্ল্যান?’

স্বর্ণাভর দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগিণী বলল, ‘ভালো করে দেখো তো জয়ন্তীকে তুমি ঠিক কীভাবে চেনো?’

গুঞ্জা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘরের দরজায়।

স্বর্ণাভ বিরক্তির সুরে বলল, ‘তাহলে একটা কাজের লোকের কথায় তুমি বিশ্বাস করলে, তাই তো? ও নিশ্চয়ই বলছে, আমার বাবা ওকে রেপ করেছে। আমি ওর মুখে টাকা গুঁজেছি। এসব মিথ্যে তুমি বিশ্বাস করলে রাগিণী? আমাদের এতদিনের সবকিছু মুহূর্তে মিথ্যে হয়ে গেল?’

রাগিণী বলল, ‘স্বর্ণাভ, তুমি কী করে জানলে গুঞ্জা আমাকে এগুলো বলেছে?’

স্বর্ণাভ থতমত খেয়ে বলল, ‘না মানে, এসব মিথ্যে কথাই তো এরা বলে। রাগিণী তুমি প্লিজ একটা কাজের মেয়ের কথাতে…’

রাগিণী দৃঢ় স্বরে বলল, ‘একটা মেয়ের কথাতে বিশ্বাস করলাম। কারণ ওর চোখে যে সততা ছিল, সেটা এই মুহূর্তে তোমার চোখে নেই স্বর্ণাভ।’

স্বর্ণাভ ভেঙে পড়া গলায় বলল, ‘কিন্তু, সেটা তো বাবার দোষ আমি কী করেছি?’

রাগিণী বলল, ‘বাবার অপরাধ ঢাকতে গিয়ে একটা নিরীহ মেয়েকে বদনাম দিয়েছ। তুমি এসো স্বর্ণাভ। আজ থেকে তুমি শুধুই আমার অফিস কলিগ।’

স্বর্ণাভ চলে গেছে।

রাগিণী স্থির হয়ে বসে আছে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কষ্টটা কি গুঞ্জার সঙ্গে শেয়ার করা যায়? যায় হয়তো, কারণ ওরও তো এভাবেই সম্পর্ক ভেঙেছিল।

গুঞ্জা চায়ের কাপটা এনে সামনে রেখে বলল, ‘কেঁদো না। তোমার সলমনের মতো ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে দেখো।’

রাগিণী হেসে বলল, ‘আমি রণবীরের ফ্যান। এবার থেকে সান্ত্বনা দিলে সলমান নয়, রণবীর বলবে, বুঝেছ!’

দুজনের যন্ত্রণার আকার, আয়তন হয়তো একই রকম। তাই গুঞ্জাও কাঁদছিল রাগিণীর সঙ্গে। আবার রাগিণী হাসলে গুঞ্জার মুখেও হাসি ফুটছে। সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলো বোধহয় এভাবেই মিশে যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *