সোনাঝুরিতে বৃষ্টি নামল – অর্পিতা সরকার

‘তোমার বাবা হঠাৎ তোমাদের অতবড় বাড়িটাকে জগন্নাথদাকে উইল করে কেন দিয়ে গেলেন সে বিষয়ে কিছু জানো? শান্তিনিকেতনে একটা তিনতলা বাগান বাড়ি আছে শুনে আমার অনেক কলিগ বলেছিল, ফাটাফাটি একটা রিসোর্ট করতে। সত্যি বলতে কি আমি ইন্টিরিয়ারের সঙ্গেও কথা বলেছিলাম এ বিষয়ে। এখন শুনছি জগন্নাথদাকে উইল করে লিখে দিয়ে গেছেন। অরিত্র আমার মনে হয় না সিগারেটের ধোঁয়া ওড়ালেই এর উত্তর তুমি পেয়ে যাবে। তাই এই এক ঘন্টায় চার নম্বর সিগারেটটা ধরানোর চেষ্টা না করাই ভালো।’ অরিত্র বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি যখন জানো পারমিতা উত্তরগুলো আমার কাছে নেই তখন অকারণে আমায় কেন প্রশ্নগুলো করছো?’ পারমিতা চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ব্যঙ্গাত্মক ঢঙে বলল, ‘আসলে কলেজে প্রেম করার সময় যখন শুনেছিলে আমি রবীন্দ্রসংগীত গাই তখন নিজেদের শান্তিনিকেতনের বাড়িটার বড়াই করেছিলে কিনা তাই। তুমি নিশ্চয়ই এ কথা বলবে না, শেষ বয়সে তোমার বাবার দেখাশোনা আমি করিনি। তাকে কলকাতায় নিয়ে এসে সমস্ত ট্রিটমেন্ট করানো থেকে শুরু করে, যাবতীয় দায়িত্ব নিয়েছি। তোমার দিদি তো পুনে থেকে আসতেই পারল না। একবার নামমাত্র বাবাকে দেখে গেছে একবছরের অসুস্থতার সময়।’

অরিত্র দশতলার ফ্ল্যাটের বিশাল জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ছোটবেলায় ছুটির দিনে শান্তিনিকেতনের বাড়ির ছাদে ওরা বসতো মাদুর পেতে। মা খালি গলায় গান গাইত, বাবা কবিতা বলত আর ওরা দুই ভাইবোন তারা চেনার চেষ্টা করত। বাবা হাতে ধরে অরিত্রকে তারা চিনিয়েছিল। আজও শরতের আকাশে তারারা ঝকঝক করছে। আর কিছুদিন পরেই দুর্গাপুজো। তিলোত্তমা তারই প্রস্তুতিতে এখন ভীষণ ব্যস্ত।

বাঁশের প্যান্ডেল বাধা রয়েছে মোড়ে মোড়ে। অরিত্রর আজ পুরোনো জীবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে বারংবার। সেই পুজোর শপিং করতে যাওয়া, ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে রোল খাওয়া, কত আনন্দ ছিল জীবনটাতে। দিদিও তখন এত সাবধানী হয়ে যায়নি। বরং ভাইয়ের জামায় অসাবধানে খাবার পড়লে তাড়াতাড়ি পরিষ্কার করে দেবার চেষ্টা করেছে। ওর থেকে মাত্র পাঁচ বছরের বড় দিদি চোখ রাঙিয়ে বলেছে, ‘নতুন জামায় দাগ লেগে যাবে যে!’

স্মৃতির হলদে পাতাগুলো ওল্টালে এমন কত আনন্দের মুহূর্তের দেখা পায় অরিত্র। কিন্তু ওই মুহূর্তগুলো যে শুধুই ছিল হয়ে গেছে সেটা বুঝেছে একটু আগেই দিদির ফোনটা পেয়ে। ‘কি রে বাবার যে এমন উইল করা ছিল তুই জানতিস না? আমি তো চিরটাকাল জানতাম বেলুড়ের বাড়ি আর ব্যবসা তুই নিবি আর আমি শান্তিনিকেতনের বাড়িটা। এখন শুনছি সেই বাড়িটা নাকি জগন্নাথকে লিখে দিয়ে গেছে। তাহলে বেলুড়ের বাড়ি আর ব্যবসার থেকেই আমায় ভাগ দিস। সব যেন আত্মসাৎ করে নিস না। মনে রাখিস বিট্টু, তোর যেমন রোহন আছে আমারও দিব্য আছে। দিব্যকে ওর দাদুর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করিস না।’

অরিত্র একটাও কথা বলেনি ফোনে। শুধু চুপ করে শুনেছে। সবটা শুনে পারমিতা বলেছে, ‘তোমার দিদির কি মিনিমাম লাজলজ্জা নেই? নিজেদের অত থাকার পরেও এখানে ভরসায় বসে আছে? এত লোভী মেয়ে আমি কখনও দেখিনি বাবা।’ অরিত্রর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, ‘এসব আলোচনা এখন থাক না পারমিতা। বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে পারিনি, বাবার কঠিন নির্দেশ ছিল। তাছাড়া দেহদান করে গিয়েছিল বাবা। সবকিছুর পরেও বাবা চলে গেছে মাত্র দিন পনেরো হল।’ এর মধ্যেই তাকে নিয়ে এত আলোচনা আর সহ্য হচ্ছে না অরিত্রর। কিন্তু সাংসারিক শান্তি বজায় রাখতে বাবার নামে ক্রমাগত বলা কথাগুলো চুপচাপ শুনেই চলছে। জগন্নাথদাকে বাবা ছেলের মতো মানুষ করেছে। তাকে সম্পত্তি দিয়েছে বলে কষ্ট হচ্ছে না অরিত্রর কিন্তু সকলে যখন ওর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলছে, বাবার সঙ্গে শেষে কোনো মনোমালিন্য হয়েছিল নাকি? হঠাৎ কোটি টাকার সম্পত্তি জগন্নাথকে কেন? অথবা আড়ালে আলোচনা হচ্ছে শেষ বয়সে ছেলে ঠিক মতো দেখেনি তাই আদিত্যনারায়ণ ছেলেকে বঞ্চিত করে পালিত ছেলেকে দিয়ে গেছে।

ঠিক এই বাক্যগুলোতেই আপত্তি অরিত্রর।

বাবার সঙ্গে সেভাবে ঘনিষ্ঠতা ওর হলো কবে যে সেটা ভাঙবে বা ছিঁড়বে? ছোট থেকেই দেখেছে বাবা নামক মানুষটা ভীষণ রকমের ব্যস্ত। দিনরাত কাজ আর কাজ। সিমেন্টের ডিলার শিপ, রাইস মিল, আইসক্রিমের ডিলারশিপ নিয়ে সে এক বিশাল কর্মকাণ্ড। নামকরা ব্যবসাদার ওর বাবা আদিত্যনারায়ণ। বেলুড়ে ওদের বাড়িটা ছিল এল শেপের তিনতলা। উঁচু পাঁচিল ঘেরা বড় উঠোন। আর বাড়ির ঠিক পিছনেই ছিল একটা পুকুর। পুকুরটা বাবা কিনতে চেয়েছিল জয়চন্দ্র জেঠুর কাছ থেকে কিন্তু ওই জেঠু বিক্রি করেনি। অরিত্রর অনেক স্মৃতি ছিল ওই পুকুরকে ঘিরে। পুকুরধারে বড় বড় গাছের কারণে জায়গাটা দিনের বেলাতেও একটু অন্ধকার থাকতো। বৃষ্টি হলে বেশ স্যাঁতস্যাঁতে ভাব। মাটি থেকে একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ বেরোত। ওখানে একটা গুলঞ্চ গাছ ছিল। গাছটা ছিল অরিত্রর ভীষণ প্রিয়। মনখারাপের দিনে ওই গাছের নীচে গিয়ে বসে থাকত ও। অদ্ভুত একটা আপন লাগত ওই জায়গাটা। লোকজন বিশেষ যেত না ওদিকটায়। অরিত্র কতদিন ওখানে বসে নিজেকে রাজা উজির ভেবেছে। ও ভাবত ওর বাড়ির লোকজনও বুঝি জানে না এই গুলঞ্চর লুকানো জায়গাটা। সে ভুল ওর ভেঙেছিল ক্লাস এইটের রেজাল্ট আউটের দিনে।

ছোট থেকে ও আর দিদি বাবার ঘরে গেলে পা টিপে টিপে যেত। মা বা ঠাকুমা বলত, বাবা খুব ক্লান্ত। একটু ঘুমাচ্ছে একদম বিরক্ত করবে না। বাবা মানে ওদের কাছে দূরের একটা মানুষ। ছোটবেলায় তবুও ছুটির দিনে শান্তিনিকেতনের বাড়িতে বেড়াতে যেত ওরা। বাড়িটা নাকি শখ করে বানিয়েছিল অরিত্রর দাদু। বিশাল বাগানের মধ্যে ছোট্ট একতলা বাড়ি। দাদু মারা যাবার পরে বাবাই ওটাকে বিশাল বাড়ি বানিয়েছিল। ওই বাড়িতে গেলে বাবাকে একটু অন্য মুডে দেখতে পেত ওরা। কিন্তু বেলুড়ে থাকলে বাবার সঙ্গে কথাই হত কটা?

বাবা হয়তো জানতই না অরিত্র আর আত্রেয়ী কোন ক্লাসে পড়ে! এইটের রেজাল্টটা তেমন ভালো হয়নি অরিত্রর। দিদি বরাবরই পড়াশোনায় ভালো ছিল। তাই দিদির ভাই হিসাবে ওর ওপরে ভালো রেজাল্ট করার একটা চাপ অলিখিতভাবেই চলে এসেছিল। সেই মনোমতো রেজাল্ট হয়নি বলেই বাড়ি ফিরতে ভয় করছিল। তাই গুলঞ্চ গাছের নীচে নিরাপদ আশ্রয়ে স্কুল ফেরত অরিত্র বসেছিল বহুক্ষণ। দেখেছিল, মা ছাদে উঠে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। হয়তো ওর ফেরার সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে বলেই দুশ্চিন্তায় মা ছাদে উঠেছে। দিদিও মনে হল মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

হঠাৎই কাঁধে একটা হাত এসে পড়েছিল। চমকে উঠেছিল অরিত্র। এদিকে লোকজন তেমন আসে না। জয়জেঠুর পুকুরের মাছ ধরার দিন ছাড়া। ভূতে তখনও অগাধ বিশ্বাস ছিল অরিত্রর। তাই চমকে উঠেই তাকিয়েছিল। ভূত দেখলে হয়তো ভাবত নিরিবিলি জায়গায় তেনাদের বাস হতেই পারে। কিন্তু যাকে দেখেছিল চোখ তুলে তাকে এখানে দেখবে এ যেন কল্পনার অতীত।

ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। খুব গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বাবা বলেছিল, ‘বাড়িতে সবাই চিন্তা করছে। বাড়ি চলো। রেজাল্ট খারাপ হলে পরের পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়, এখানে বসে বাড়ির লোকজনকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে নেই। সামনে ক্লাস নাইন, ভালো করে পড়তে হবে।’

সেদিন বাবার ওই ছোঁয়াটুকু বড্ড আন্তরিক লেগেছিল অরিত্রর। খুব ইচ্ছে করছিল বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে। কিন্তু অতটা সাহস হয়নি। জিজ্ঞাসা করা হয়নি কখনও বাবা কী করে জানল ওর গোপন আস্তানার কথা!

কিন্তু সেদিন ওই ছোট্ট মাথায় এটুকু বুঝেছিল দেখতে না পেলেও একটা অদৃশ্য সুতো বাঁধা আছে ওর আর বাবার মধ্যে। হতে পারে সুতোটা খুব মোটা বা টেকসই নয়। হতে পারে একটু পলকাই কিন্তু ওই অদৃশ্য সুতোটাকে সেদিন অনুভব করেছিল অরিত্র। এমন অনুভূতি আরও কয়েকবার হওয়ার পরে অরিত্র বুঝেছিল বাবা নামক মানুষটার লক্ষ সবদিকে। এই জন্যই হয়তো সফল বিজনেস ম্যান হতে পেরেছে। কিন্তু আলাদা কোন আবেগ কখনোই ছিল না বাবাকে ঘিরে। অরিত্রর সবটুকু ঘিরে ছিল ওর মা। রাগ, অভিমান সবটুকু মায়ের কাছে। দিদিও কখনও কখনও অরিত্রর চোখে মা হয়ে উঠেছিল অবশ্য। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফাইনাল ইয়ারে উঠে যেদিন শুনেছিল মায়ের লাংস ক্যানসার হয়েছে সেদিন ওর চোখের সামনে দুলে উঠেছিল গোটা পৃথিবী। দিদি কাঁদছিল, ছোটমাসি এসেও কাঁদছিল, শুধু শুকনো চোখে তাকিয়ে ছিল বাবা।

অদ্ভুত একটা রাগ হচ্ছিল তখন বাবার ওপরে অরিত্রর। এত কঠিন কেন লোকটা! টাকার অভাব ওদের কোনোদিনই ছিল না, বরং প্রাচুর্য বলাই শ্রেয়। তাই মাকে সব বেস্ট ট্রিটমেন্ট দিয়েছিল বাবা। কিন্তু মা বাঁচেনি। মা মারা যাবার পরে বাবা দিনরাত কাজে মগ্ন থাকত। আরও টাকার ঠিক কী দরকার বোঝেনি অরিত্র। দিদি কলেজে জয়েন করল প্রফেসর হিসাবে। আর অরিত্র আরও একা হয়ে গেল। বরাবরই বন্ধুবান্ধব কম ছিল ওর। আর পাঁচজনের মতো নিজেকে এক্সপ্রেস করতে পারত না ও। ওর নিজের দুঃখ, নিজের কষ্টগুলো একান্তভাবেই ওর ছিল। একমাত্র মা ছিল যাকে কিছুই বোঝাতে হত না। পড়ার টেবিলে বসে পড়তে পড়তে দুবার মা বলে ডাকলেই মা কফির কাপ নিয়ে এসে টেবিলে রেখে বলত, ‘খিদে মরে যাবে, রাতে তখন কম খাবো বলবি না।’ এমন কতকিছু যে অরিত্র বলার আগেই মা বুঝে যেত তার ইয়ত্তা নেই। তাই মা চলে যাবার পরে অরিত্র অদ্ভুত রকমের চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। খুব ইচ্ছে করত বাবার সঙ্গে বসে একটু গল্প করতে। কিন্তু আদিত্যনারায়ণের সময় কোথায় সময় নষ্ট করার? দিদির সঙ্গে যদিবা বাবার একটু সাংসারিক প্রয়োজনে কথা হত অরিত্রর সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা বাক্যও ব্যয় হত না। মাসের প্রথমই বাবা প্রশ্ন করত, কত টাকা লাগবে? অরিত্রর অ্যামাউন্টটা জেনে নিয়ে সেটা দিয়ে দিত বিনাবাক্যব্যয়ে। অদ্ভুত একটা ধোঁয়াশা মিশে ছিল ওদের সম্পর্কের মধ্যে। অরিত্রও কখনও এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেনি, ‘বাবা তোমার ক্লান্ত লাগে না?’

বাবাও কখনও এগিয়ে এসে জানতে চায়নি, অরিত্রর মায়ের জন্য মনখারাপ করে কিনা।

ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল এক্সামের পরে বাবা অরিত্রকে বলেছিল, ‘শান্তিনিকেতন যাবি?’

অরিত্র আর বাবা গাড়ি করে গিয়েছিল শান্তিনিকেতন। বাড়িতে ঢুকতেই একটা বছর ছাব্বিশের ছেলে এসে ওদের আপ্যায়ন করেছিল।

বাবা অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘ওর নাম জগন্নাথ। বিএ পাস করেছে। কিন্তু চাকরি পায়নি। অভাবের সংসারে। দাদাদের বাড়িতে বসে খায় বলে অনেক কথা শুনতে হয়। তাই ওকে আমি নিয়ে এলাম। ওকে করুণা করে নয় বরং আমার প্রয়োজনে। শান্তিনিকেতনে একটা হোটেল খুলেছি সেটা আর বাড়ি, বাগানের দেখাশোনার দায়িত্ব ওকে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে আছি।’

অরিত্রর খুব রাগ হয়েছিল। নিজের বাবা কবে কোথায় হোটেল খুলছে সেটুকু জানার অধিকারও যেন ওর নেই।

তবে জগন্নাথদা অরিত্রকে মাথায় করে রেখেছিল। ও যে ওদের আশ্রিত সেটা বারংবার বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওর ব্যবহারে। অরিত্রর কোনো কিছু প্রয়োজন হলে দেরি না করে হাজির করছিল ওর সামনে। মাত্র দিন তিনেকের মধ্যেই জগন্নাথদাকে ভালো লেগে গেল অরিত্রর। মানুষটার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। চুপ করে থেকেও যেন অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়। ভালোবাসতে জানে, আগলে রাখতে জানে।

সন্ধের দিকে ঘুমিয়ে গিয়েছিল অরিত্র। আচমকা কারোর একটা আদরে ঘুম ভেঙে গেল। দেখল টেবিলে চা আর শিঙাড়া রাখা। আর জগন্নাথদা অরিত্রর মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে, ‘ওঠো, সন্ধে হয়ে গেল যে। চা খাবে না?’

কতদিন পরে যেন আবার মায়ের মতো প্রশ্রয় পেয়েছিল অরিত্র। জগন্নাথদা অরিত্রর গোটা গা ম্যাসাজ করতে করতে বকবক করছিল। ও রামপুরহাটের ছেলে। আদিত্যনারায়ণের সঙ্গে পরিচয়টা কাকতালীয়ভাবেই। আদিত্যবাবু হোটেল খুলবে বলে জায়গা কেনার জন্য ফাইনাল ডিল করতে গিয়েছিল বিপুল বনিকের সঙ্গে। জগন্নাথের বাবার চায়ের দোকানে বসেই কথা হচ্ছিল। জগন্নাথের বাবা মারা যাওয়ার পরে, ওর দাদাই চালায় চায়ের দোকানটা। বাবা তখন বলেছিলেন, বিশ্বাসী ছেলের অভাব। বেলুড়, কলকাতা ছেড়ে এখানে এসে পড়ে থাকার সময় আদিত্যনারায়ণের নেই। অথচ এখানে একটা খাওয়ার আর সাময়িক বিশ্রামের হোটেল টাইপ খোলার ইচ্ছে বহুদিনের। তখনই নাকি জগন্নাথের দাদা সুযোগ বুঝে ওকে লাগিয়ে দিয়েছিল এই কাজে। শিক্ষিত ছেলে দেখে বাবাও এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। সেই থেকেই জগন্নাথ এ বাড়ির বাসিন্দা। হোটেলের ম্যানেজার আর বাড়ির কেয়ার টেকার।

অরিত্র তারপর একা একা এসেছে শান্তিনিকেতনে শুধু জগন্নাথদার আন্তরিক আদর খাবে বলে।

ক্যাম্পাসিংয়ে জব জয়েন করার আগেই বাবা আরেকবার মুখোমুখি বসেছিল অরিত্রর। ‘তোমার দিদি তো কলেজের চাকরি নিয়ে পুনে চলে গেল। ওখানেই বোধহয় কোনো কলিগকে পছন্দ করেছে সে। বিয়ে করে ওখানেই সেট করতে চায়। তুমিও চাকরি করবে বলছো, বয়েস তো আমার হচ্ছে, এসব ব্যবসা দেখবে কে? ভেবেছিলাম ব্যবসগুলো তোমায় বুঝিয়ে দিয়ে শেষ জীবনটা শান্তিনিকেতনে কাটাব।’

ওদিকে পারমিতার ইচ্ছে অরিত্র চাকরি করুক। সিমেন্ট, রাইস মিল এসবে টাকা হয়তো প্রচুর ইনকাম করবে, কিন্তু উঁচু পোস্টে চাকরি করলে নাকি স্ট্যান্ডার্ড বাড়বে।

বাবার মুখে সেই প্রথম ক্লান্তি দেখেছিল অরিত্র। মানুষটা মায়ের মৃত্যুর পরেও ভেঙে চুরমার হয়েছিল কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়নি। কিন্তু এখন ভালো করে তাকালে বোঝা যায় কপালে চিরস্থায়ী দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে, ঠোঁটের কোণে অনেক কিছু না পাওয়ার বেদনা রয়েছে। যার এত টাকা তারও না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে! অন্যরা শুনলে হয়তো বলবে, এ অকারণ দুঃখবিলাস। ধনীরা সবেতে বিলাস খোঁজে, তেমনি প্রাচুর্যের মাঝেওদুঃখ খোঁজাটা হয়তো একটা অবসর যাপন। অরিত্র অপলক তাকিয়ে ছিল বাবার দিকে। এতদিন মনে হতো ঝড়ঝাপ্টা কিছুতেই মানুষটার কিছু যায় আসে না। দু-একটা ডালপালা ভাঙলেও শক্ত কাণ্ড নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু আজ দেখে মনে হচ্ছে চোখের কোণে অনেক নির্ঘুম রাত্রের অতৃপ্তি জমে রয়েছে। ঋজু মানুষগুলো যখন একটু বেঁকে যায় তখন তাদের দেখতে যে এতটা অসহায় লাগে সেই প্রথম বুঝেছিল অরিত্র। পারমিতাকে বুঝিয়ে বলতে হবে কিছু একটা। কিন্তু যে মানুষটা কোনোদিন অরিত্রর কাছে কিছুই চায়নি সে যখন এমন করে ওকে সবটুকু দিতে চাইছে সেটা না নিয়ে বাবাকে অপমান করতে পারেনি অরিত্র।

বলেছিল, ‘ঠিক আছে বাবা তুমি যা চাইছো তাই হবে।’ ছোটবেলায় যখন ওরা ঘুড়ি ওড়াবার প্রস্তুতি নিত আর আকাশ জুড়ে মেঘ করত তখন ওদের বড্ড মনকেমন করত। কিন্তু আচমকা যখন সেই মেঘ কেটে গিয়ে ঝকমকে রোদ উঠত তখন ওদের মুখে অনাবিল হাসি খেলে যেত। বাবা কোনোদিনই খুব হাসেনি। হাসিতে তেমন অভ্যস্ত নয় আদিত্যনারায়ণ। তবুও অরিত্র দেখল মেঘ কেটে একটা ঝলমলে হাসি মুখ। মনে মনে ভেবেছিল, আজীবন শুধু হাত পেতে নিয়েই গেছে। এই প্রথম সুযোগ এসেছে একটুও ফেরত দেবার। অরিত্রকে নিয়ে নতুন উদ্যমে সব ব্যবসার খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিয়েছিল বাবা। নিজে পছন্দ করে দশতলার ওপরে এই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল অরিত্রর নামে। বলেছিল, ‘বেলুড়ে তুই সপ্তাহে দুদিন যাবি। জয়দীপ ভালো ছেলে ও সামলে নেবে রাইস মিল। তুই বরং সিমেন্টের দিকটা কলকাতায় থেকেই দেখাশোনা কর।’ অরিত্র কোনোদিন বুঝতেই পারেনি ওর রক্তে এভাবে ব্যবসার নেশা আছে। আদিত্যনারায়ণ দেখে এতদিন ও মনে করত লোকটা একটা টাকা রোজকারের মেশিন। এর জীবন বলে কিছুই নেই। কিন্তু নিজে ব্যবসায় ঢোকার পরে অরিত্র বুঝেছিল, একটা দুরন্ত নেশা আছে যে কাজে। যে নেশা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।

বাবা যে ওর কাজে খুশি হচ্ছিল সেটা মুখে বলেনি কোনোদিন। শুধু একটা করে ব্যবসা ওর নামে ট্রান্সফার করছিল। ব্যাংকের অ্যাকাউন্টগুলো সব জয়েন্ট নামে করে দিচ্ছিল। অদ্ভুত রকমের হিম শীতল লোক। একদিন ছেলের পিঠে হাত দিয়ে বলতে পারেনি, ‘তুই সত্যিই আমার ছেলে।’ শুধুই নিঃশব্দে ওর কাজের প্রশংসা করে চলেছিল এভাবেই। জীবনটা চলছিল সুন্দর ছন্দে শুধু বাবার সঙ্গে দূরত্বটা কোনোদিন ঘুঁচে যায়নি অরিত্রর। হয়ত দুজনের কেউই চায়নি। ওই নির্দিষ্ট দূরত্বটুকু বজায় রেখেই বাবা এসে বলেছিল, ‘দিদি তোকে জানিয়েছিল নাকি আগে কিছু?’

অরিত্র অবাক হয়ে বলেছিল, ‘কী জানাবে?’

বাবা হালছাড়া গলায় বলেছিল, ‘ও ওখানে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করেছে জানালো। আমি বললাম তাহলে এখানে একটা অনুষ্ঠান করা হোক, কী বলিস তুই? সমাজ বহির্ভূত তো আমরা নই। নিজেদের মালাবদলের একটা ছবি পাঠিয়ে দায় সেরেছে।’ সেই প্রথম অরিত্রর মনে হয়েছিল, এই পরিবারের প্রধান সদস্যের কাছে বাবা কিছু পরামর্শ চাইছে। নিজেকে হঠাৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল অরিত্রর। বলেছিল, ‘তুমি দিদিকে ফিরতে বলো, লজ বুক করা থেকে ক্যাটারিং, নিমন্ত্রণ সব আমি দেখছি। বাবা আনমনে বলেছিল, ‘তোমার মা থাকলে গয়না শাড়ি কীসব দিতে হয় সেসব করতে পারত। সব দায়িত্ব আমার কাঁধে দিয়ে নিশ্চিন্তে চলে গেল সে। যাইহোক আমি বুড়িকে বলছি, এসে কদিন এদিকটা সামলাতে।’ বুড়িপিসিকে বাবা খুব স্নেহ করত। বুড়িপিসি আসলে বাবার খুড়তুতো বোন। দিদি আর জামাইবাবু ফিরেছিল বেলুড়ের বাড়িতে। এলাহী আয়োজন করেছিল আদিত্যনারায়ণ মেয়ের বিয়েতে।

সবকিছুই করেছিল তবুও যেন বাবার কোথাও একটা ভয়ানক অতৃপ্তি ছিল। ছোটবেলায় ওর হাঁটু কেটে গেলে বাড়ির সবাইকে লুকিয়ে ওষুধ লাগিয়ে দেওয়া দিদিটা যেন বড্ড বদলে গেছে। এটাই মনে হয়েছিল অরিত্রর। পুনে ফেরার সময় ওকে বলেছিল, ‘ব্যবসা করছিস কর। সব টাকা যেন নিজে ভোগ করিস না। এতে কিন্তু আদিত্যনারায়ণের মেয়ে হিসাবে আমারও পূর্ণ অধিকার আছে।’ পারমিতা একটা কথা ঠিকই বলে, সময়ে কিছুই বলতে পারে না অরিত্র। ও শুধু ওর পাল্টে যাওয়া দিদির মধ্যে সেই আগের দিদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। ওর হয়তো বলা উচিত ছিল, ‘ব্যবসা থেকে বাড়ি কোনটা সামলাচ্ছিস তুই যে অধিকারের কথা বলতে আসিস?’ কিন্তু ওই কে অতীতে ফিরে গিয়ে আতিপাতি করে খুঁজছিল তখন সেই স্কুলবেলার দিদিটাকে। তাই আর বলা হল না কিছুই।

দিদির বিয়ের বছর খানেকের মধ্যেই পারমিতার বাড়ি থেকে প্রেশার আসতে শুরু করল বিয়ের। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দের কথা বলবে কী করে সেই ভাবনা বহুবার এসেছে মনে। কিন্তু কোনো সরল সমাধান পায়নি খুঁজে। বেলুড়ের বাড়িতে ও আর বাবা ছাড়া চারজন পরিচারিকা রয়েছে। অত বড় বাড়িতে ওরা দুজনে কাছাকাছি থাকলেও আকারে বড় হবার কারণেই যেন দোতলা আর তিনতলার দূরত্ব অনেক বেশি মনে হয়। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যবসা সংক্রান্ত কথা ছাড়া আর কিছুই বলা হয় না ওর। এর চেয়ে বরং কলকাতার চার বেডরুমের ফ্ল্যাটটা ভালো। বেশ জড়িয়ে রাখে স্বল্প জায়গায়।

বাবা কলকাতার ফ্ল্যাটে এলেই পারমিতার কথা বলবে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিল অরিত্র। কিন্তু কলকাতার ফ্ল্যাটে আসার আগেই বাবার ফোন পেয়েছিল অরিত্র। সামনের সপ্তাহে বেলুড়ে আসার দরকার নেই। আমি শান্তিনিকেতনে থাকব ওখানেই এসো ডিরেক্ট।

শান্তিনিকেতনের বাড়ি শুনলেই মনটা শহরের গলিঘুঁজি, ব্যস্ততা ছেড়ে হালকা হয়ে যায়।

শান্তিনিকেতন বাড়িতে পৌঁছাতেই অরিত্র বুঝেছিল ওর আড়ালে কিছু একটা চলছে। জগন্নাথদা, কাকলীদি, মাধবকাকা সবার ঠোঁটে হাসি। সবাই যেন ওকে দেখে বেশ কৌতুক অনুভব করছে। নিজেকে আয়নায় দেখে বুঝেছিল দুকেজি ওজন বৃদ্ধি ছাড়া তেমন কিছু পরিবর্তন হয়নি। তাহলে এদের মনে এত খুশি কেন! কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই বলছে, ‘বিকেলে দেখতে পাবে।’

বিকেলে বাবা ঘরে এসে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, শতরূপা আর ওর মাকে আসতে বলেছি বাড়িতে। একটু রেডি হয়ে থেকো। অরিত্র প্রশ্ন করেছিল, ‘শতরূপা কে বাবা?’

বাবা নিজের স্বাভাবিক গাম্ভীর্য বজায় রেখেই বলেছিল, ‘এখানেরই মেয়ে। বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটিতে মিউজিক নিয়ে মাস্টার্স কম্পিলিট করেছে। বাবা নেই। মা মানুষ করেছে মেয়েকে। মাও এখন বিভিন্ন রোগে জর্জরিত। কদিন বাঁচবে কে জানে! মেয়েটা বড় ভালো। চমৎকার গান গায়।’ এর বেশি আর কিছুই বাবা বলেনি।

বিকেলে শতরূপা এসেছিল। সত্যিই ভারী সুন্দর গান গায় মেয়েটি। খালি গলায় গান শুনিয়েছিল। সাধারণ চেহারার মধ্যেও একটা অসাধারণত্বের ছাপ। বেশ মার্জিত কথাবার্তা। সকলে বাইরে বেরোলে শতরূপা বলেছিল, ‘আপনি কি আদৌ জানেন আজ আমরা কেন আপনার বাড়িতে এসেছি?’ অরিত্র অজ্ঞতার সুরে বলেছিল, ‘আপনারা হয়তো বাবার পরিচিত তাই। মানুষ মানুষের বাড়িতে আসতেই পারে। এতে এত কারণের কী আছে?’

শতরূপা বলেছিল, ‘হ্যাঁ উনি আমাদের পরিচিত। এখানের একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের গেস্ট হয়ে এসেছিলেন উনি। তখনই আমার গান শুনে ওনার পছন্দ হয়। আমার মাকে বলেছিলেন, আপনার মেয়ের সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে দিতে চাই। আপনার মাও সম্ভবত শান্তিনিকেতনের মেয়ে ছিলেন। তিনিও গান জানতেন। দেখুন, আমার মা নিতান্ত কন্যাদায়গ্রস্ত। তাই এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। কিন্তু আপনাকে দেখে আমার মনে হল আপনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে আছেন। তাই বিষয়টা বলার প্রয়োজন বোধ করলাম।’

অরিত্রর চোখের সামনে যেন সব দুলছিল। পারমিতার সঙ্গে তিন বছরের সম্পর্ক। ওদের বাড়িতে জানে। বিয়ের কথা বলতে চাইছে। নেহাত বাবাকে কীভাবে বলবে ভেবেই অরিত্র একটু গড়িমসি করছে। তাই বলে অন্য কাউকে বিয়ে সেটা কিছুতেই সম্ভব নয়। অরিত্র কাঁপা গলায় বলেছিল, ‘শতরূপা আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমি একজনকে ভালোবাসি। তাকেই বিয়ে করব। এ ব্যাপারে বাবা আমায় একটা শব্দও জানায়নি। তাহলে আপনাদের এভাবে অপমানিত হতে হত না।’

শতরূপা মিষ্টি স্বরে বলেছিল, ‘এতে অপমানের কি আছে! মানুষ মানুষের বাড়িতে আসতেই পারে।’

শতরূপা ওর মাকে জানিয়েছিল অরিত্রর কথা। ওরা ফিরে গিয়েছিল। নিজের ঘরে চুপ করে বসেছিল অরিত্র। জানালা দিয়ে সোনাঝুরি গাছ দেখা যাচ্ছে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে সোনাঝুরির বন। সেদিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অরিত্র। বাবা ওর বিয়ের কথাও ভেবেছে? এতদিন পর্যন্ত অরিত্র ভাবত মানুষটা ব্যবসা আর টাকা ছাড়া কোনদিন কিছু ভাবল না। কিন্তু বাবা যে ওকে সংসারী করার কথাও ভেবেছে এটাতেই আশ্চর্য হয়েছে ও। কিন্তু এক্ষেত্রে ও নিরুপায়। বাবার কথায় মত দিতে পারেনি। বাবা এসে কখন পিছনে দাঁড়িয়েছিল বুঝতে পারেনি অরিত্র। জোৎস্নার আলোর লুটোপুটি দেখছিল আনমনে। মাথায় চলছিল বিরামহীন ভাবনা।

বাবা এসে বলেছিল, ‘তোমার পছন্দের মেয়েটির অভিভাবকদের আসতে বলো। মেয়েটিকেও আনতে বলো। এই বাড়িতেই আসুক না হয়। অসুবিধা হবে না তো?’

পারমিতার বহুদিনের ইচ্ছে ছিল শান্তিনিকেতনের বাড়িটা দেখার। তাই ওর যে অসুবিধা হবে না সেটা অরিত্র জানে।

একটু অপ্রস্তুত গলায় অরিত্র বলেছিল, ‘সরি বাবা। তোমার সম্মান নষ্ট হলো।’

আদিত্যনারায়ণ নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখেই বলেছিলেন, ‘তোমার কথার যেমন মূল্য আছে। আমারও আছে। তাই এত সহজে আমার সম্মানহানি আমি হতে দিই না।’

পারমিতাকে অপছন্দ হবার কোন কারণ ছিল না বাবার। ওদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। বাবা সবকিছুর দায়িত্ব অরিত্রর কাঁধে দিয়ে পাকাপাকিভাবে শান্তিনিকেতনে থেকে গিয়েছিল। কাজের চাপে অরিত্র সময় নেহাতই কম পেত। তবুও যেত মাঝে মাঝে ও বাড়িতে। কিন্তু বাবা যেন ইচ্ছে করেই সবকিছুর থেকে নিজেকে নির্বাসন দিয়েছিল। তাই ব্যবসার কথা বললে বলতো, ‘তোমরা আছো সামলাও। নিজেরা সিদ্ধান্ত নাও।’

কলকাতায় এসেও থাকত কিছুদিন করে। পারমিতা যত্নের ত্রুটি করেনি। তবুও দূরত্বটা যেন বাড়তে বাড়তে কয়েক যোজন হয়ে গিয়েছিল। সংখ্যা দিয়ে আর সেটাকে মাপা যেত না। দেখেই মনে হত মানুষটা এবার শুধুই বিশ্রাম চায়। অসম্ভব প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষটাকে ক্লান্ত দেখতে ভালো লাগত না অরিত্রর। আসলে যাকে জীবনে বিশ্রাম নিতে দেখেনি তাকেই শুয়ে বসে থাকতে দেখলে অভ্যস্ত চোখের বড় অস্বস্তি হয়।

পুপুন হবার পরে আবারও বাবাকে একটু চনমনে দেখেছিল অরিত্র। নাতিকে নিয়ে মেতে ছিল কিছুদিন। তারপরে আচমকাই খেয়াল করেছিল, শরীর ভাঙছে বাবার। আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নামার মতোই বাবার গোটা শরীর জুড়ে বার্ধক্য যেন থাবা বসাচ্ছে। কিছুটা জোর করেই বাবাকে ডাক্তার দেখিয়েছিল অরিত্র। তখনই ধরা পড়েছিল দুটো কিডনিই ড্যামেজ। বহু ডায়ালিসিস দিয়েও বাবাকে বাঁচাতে পারেনি অরিত্র। বেস্ট নার্সিংহোমে ট্রিটমেন্ট করিয়েও লাভ হয়নি। দুজনের মৃত্যু এত কাছ থেকে দেখার পরে অরিত্র বুঝেছিল, শুধু টাকায় মানুষকে বাঁচানো যায় না। যাদের টাকা নেই তারা ভাবে হয়তো চিকিৎসা করাতে পারলে বাঁচানো যেত আর যাদের অঢেল টাকা আছে তারা ভাবে লাভ কী হল!

বাবা দেহ দান করে গিয়েছিল। বলে গিয়েছিল শ্রাদ্ধানুষ্ঠান না করতে। অরিত্র অনেক কটূক্তি শুনেও বাবার নির্দেশই পালন করে গেছে। অরিত্রর উচিত ছিল বড় করে ঘটা করে বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা। এমন অনেক মন্তব্য ও শুনেছিল আত্মীয়, পরিজনদের মুখ থেকে। তারপরেই সবাই ঝুঁকে পড়েছিল আদিত্যনারায়ণের সম্পত্তির বিলিবন্টনের দিকে। কাকে কী দিয়ে গেছে নিয়ে সকলেই খুব চিন্তিত ছিল। সেই দলে পারমিতা আর দিদিকে দেখে একটু লজ্জাই করেছিল অরিত্রর।

বাবার উকিল বিকাশকাকু এসে শুনিয়েছিলেন, সেই ভয়ঙ্কর কথাটা। শান্তিনিকেতনের বাগান সহ বাড়ি এবং অন্নপূর্ণা হোটেলটা জগন্নাথের নামে দিয়ে গেছে বাবা। বেলুড়ের বাড়ি, সমস্ত ব্যবসা অরিত্রর নামে। কলকাতার ফ্ল্যাট এমনিতেই অরিত্রর নামেই কিনেছিল বাবা।

দিদির নামে, পারমিতার নামে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছে। দিদির মেয়ে আর অরিত্রর ছেলেকেও বঞ্চিত করেনি বাবা। তাদেরও দিয়ে গেছে মোটা অঙ্কের টাকা। এমনকি বুড়িপিসির ছেলের নামেও টাকা দিয়ে গেছে বাবা। এরপরেও সকলের আলোচনার অভিমুখ ঘুরে গিয়ে পড়েছে শান্তিনিকেতনের বাড়িটা নিয়ে। অরিত্র ঠিক কী এমন দোষ করেছিল যে ওটা পালিত পুত্র ওই জগন্নাথকে দিয়ে যেতে হবে!

এই একই প্রশ্ন শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল অরিত্র।

‘শুনছো এত আকাশ-পাতাল না ভেবে একবার শান্তিনিকেতন ঘুরে আসলে হয় না? জগন্নাথদাকে কিছু বলে গেছেন নাকি জেনে আসবে একবার?

না মানে অত পছন্দের বাড়িটা দিয়ে দিল? ওটা আর আমাদের নয় ভাবতেই যেন কষ্ট হচ্ছে।’ পারমিতা একঘেয়ে এই একই কথা বলেই চলেছে। অরিত্র বলল, ‘ঠিক আছে আমি কাল যাব একবার ওখানে।’ পারমিতা বলল, ‘শোনো আমি একটা ল ইয়ারের সঙ্গে কথা বলেছি। বাড়িটা নিয়ে লড়লে হয়তো জগন্নাথদা হেরে যাবে। সেটাও করা যায়। আর যদি জগন্নাথদা কিছু না জেনে থাকে তাহলে চুপচাপ ওকে ওই বাড়ি ছেড়ে দিতে বলবে।’

অরিত্র পারমিতার কথার উত্তর না দিয়েই নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল।

জগন্নাথদা সেই একই আছে। একইরকম ভাবে হাঁকডাক শুরু করে দিল। ‘আরে সবাই কোথায় আছিস? শিগগির আয়। ছোট দাদাবাবু এসেছে। একটা ফোন করলে না কেন? এখন আমি মাছের মাথা কোথায় পাই? ডাল বানাবো কী দিয়ে?’ অরিত্র শান্ত গলায় বলল, অত অস্থির হওয়ার কিছু হয়নি। তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।

ড্রয়িং রুমে বসতেই কাঁচের গ্লাসে শরবত নিয়ে এসে যে মেয়েটি অরিত্রর সামনে দাঁড়ালো তাকে অরিত্র আগে দেখেছে। একটু খেয়াল করতেই মনে পড়ল, সিঁদুর শাঁখা পরা, তাঁতের শাড়ির মেয়েটা শতরূপা।

জগন্নাথদা আগে বাড়িয়ে বলল, ‘ও এবাড়িতে থাকে না। এই দুদিন বিমলের মা আসছে না বলে বাকিদের খাওয়ার যাতে অসুবিধা না হয় তাই নিয়ে এসেছি।’

অরিত্র বলল, ‘আপনার নাম শতরূপা তাই না?’

শতরূপা হেসে বলল, ‘জেঠু আমায় রূপা বলে ডাকতেন। আমার স্বামীকে জগন্নাথ বললেও আমি ছিলাম আদরের রূপা। আরেকটু হলেই অরিত্রর গলায় লাগত শরবতটা।’ তার আগেই শতরূপা বলল, ‘আসলে আমি এই বাড়িতে থাকি না তো। শুধু জেঠু এলে সেকদিন থাকতাম। তাই বিয়ের পর আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি। জগন্নাথকেই জেঠু আমার জন্য নির্বাচন করেছিলেন। ওনার নির্বাচন যে কতটা সঠিক ছিল তা এই বছর ছয়েকের বিবাহিত জীবনে প্রতি পদে অনুভব করছি। একজন সত্যিকারের মানুষকে উনি আমায় দিয়ে গেলেন।’

জগন্নাথদা নিজের প্রশংসা সহ্য করতে না পেরে তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘তোমরা গল্প করো। আমি দেখি ওদিকটায়।’

অরিত্র কিছু বলার আগেই শতরূপা শান্ত গলায় বলল, ‘আমি জানি আপনি কী জন্য এসেছেন। আমি ওকে বলেছিলাম কলকাতায় গিয়ে ওটা ফেরত দিয়ে আসতে। কিন্তু ও ভয়ে যেতে চায়নি। এই বাড়ি বা সম্পত্তি আপনার। জেঠু স্নেহের বশে দিয়ে গেলেও এ কখনও আমাদের নয়। আমার মা গত হয়েছেন। ওই বাড়িটাকেই সারিয়ে সুরিয়ে বেশ আছি। এখানেই একটা স্কুলে মিউজিক টিচার হিসাবে চাকরি করি। চলে যায় জানেন। তাই আপনার সম্পত্তি আপনি নিয়ে আমাদের ঋণ মুক্ত করুন। জেঠু দলিলের এক কপি ওকেও দিয়ে গেছে। আমি বারণ করেছিলাম জেঠুকে। কিন্তু উনি শোনেননি। অসুস্থ মানুষের শেষ ইচ্ছে তাই আমরা আর বেশি বাধা দিইনি। হোটেলটা ওর প্রাণ। এ বাড়িও ওর বড্ড আপন। আপনাদের তো একজন কেয়ার টেকার লাগবেই। তাই যদি দয়া করে ওকেই রাখেন মাইনে দিয়ে তাহলে ওকেও কষ্ট পেতে হয় না।’

অরিত্রর আচমকা একটা কথা মনে হল, জগন্নাথদা বড্ড লাকি। বাবা হয়তো ওর থেকেও বেশি ভালোবাসত জগন্নাথদাকে। তাই বাবা কী কী খেতে ভালবাসত সেটা মা মারা যাবার পরে একমাত্র জানতো জগন্নাথদা। জগন্নাথদা সত্যিই লাকি কারণ এমন একজন স্ত্রী পেয়েছে, যে স্বামীর যাতে কষ্ট না হয় তাই আর্জি জানাচ্ছে। অরিত্র না হতে পারল ভালো ছেলে, না স্বামী। পারমিতার তো অভিযোগের কোনো শেষ নেই ওকে ঘিরে। বাবাও তো কোনোদিন নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মোচন করল না ওর কাছে। জগন্নাথদাকে হিংসে হচ্ছে অরিত্রর। বাবার শেষ জীবনটা এদের সঙ্গেই কাটিয়ে গেল। কত মুহূর্ত থেকে গেল এই বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। অরিত্র ইচ্ছে করলেও আর সেই মুহূর্তগুলোর শামিল হতে পারবে না। শতরূপা বলল, ‘জেঠু আপনার জন্য একটা প্যাকেট রেখে গেছেন ওপরে আপনার ঘরে। বলেছেন আমি মারা যাবার পরে অরিত্র এলে ওর হাতে দিতে। আপনার জগন্নাথদা ভুলো মনের বলে আমাকেও বলে গেছে।’

অরিত্র ধীর পায়ে ওপরে উঠে এলো। এ বাড়ির কানায় কানায় কত স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। মুঠোয় যেটুকু ভরা যায় সেটুকু কুড়িয়ে নিতে নিতেই উঠল অরিত্র।

বড় কাঠের আলমারিটা খুলতেই একটা বড় ব্রাউন প্যাকেট পেলো ও। বিছানায় রেখে প্যাকেটটা খুলতেই একটা চিঠি আর ছোট ছোট কিছু জামা প্যান্ট পেল। আর অরিত্রর সেই ক্লাস এইটের অঙ্কে কম নম্বর পাওয়া রেজাল্টটা যেটা ও লুকিয়ে রেখেছিল। চমকে উঠল অরিত্র। এগুলো বাবা যত্নে রেখেছিল? ছোট্ট স্কুলড্রেসটা তো ওর নার্সারির ড্রেস। গ্রে আর ব্লু রঙের। বাবা এগুলো জমিয়ে রেখেছে?

চিঠিটা পড়তে শুরু করল অরিত্র। ‘তোর কিছু পার্সোনাল জিনিস আমার কাছে ছিল। সেগুলো ফেরত দিলাম। আমি আর বেশিদিন নেই। ডক্টর খাসনবিশ আমায় সবটা বুঝিয়ে বলেছেন গত সপ্তাহে। আমি আজ আমার উইল করলাম। জানি, তুই বা আত্রেয়ী হয়তো আমার ওপরে রাগ করবি। কারণ শান্তিনিকেতনের বাড়িটা আমি জগন্নাথ আর শতরূপাকে দিয়ে দিলাম। সঙ্গে তোর মায়ের নামে করা অন্নপূর্ণা হোটেলটাও। জানি এবাড়ির সঙ্গে তোর অনেক স্মৃতি জড়িত। কিন্তু পারমিতা হয়তো এই বাড়িটাকে কোনো রিসোর্ট বানাবে ভেবেছিল। আত্রেয়ী ভেবেছিল, এর ভাগ নিয়ে বিক্রি করে দেবে। আসলে বাড়িটা তোর দাদুর তৈরি। আমি তখন সদ্য কলেজে উঠেছি। বাবার সঙ্গে প্রায় আসতাম গাঁথনি কতটা উঠল দেখার জন্য। সেই থেকেই শান্তিনিকেতনকে চেনা। তখনই পরিচয় হয়েছিল দেবযানীর সঙ্গে। ভালো গান গাইতো দেবযানী। আমায় খুব বিশ্বাস করেছিল। ভেবেছিল ভালোবাসলেই তার পরিণতি ঘটে। কিন্তু বাবা যেদিন অন্নপূর্ণাকে পছন্দ করে এসে বলেছিল, এর সঙ্গে বিয়ে করতে হবে সেদিন কেন কে জানে বাবার গাম্ভীর্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারিনি ওই সোনাঝুরির জঙ্গলের ওপাশে একটা ছোট্ট একতলা বাড়িতে একটা মেয়ে আমায় মনে করে রবীন্দ্রসংগীত গাইছে। না অরিত্র বলতে পারিনি। বরং দেবযানীকে বলেছিলাম, ক্ষমা করো। তারপর শান্তিনিকেতন গেলেও আর কখনও দেখা হয়নি দেবযানীর সঙ্গে। নিজেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে নিয়েছিল ও। আর তোমার মা এসে আমার সবটুকু ভরিয়ে দিয়েছিল। ব্যবসার নেশায় পাগল হয়ে গেলাম। তোরা এলি আমাদের জীবনে। জীবনটা পরিপূর্ণ হল ধীরে ধীরে। দেবযানীর স্মৃতি হারিয়ে গেল শান্তিনিকেতনের খোয়াইয়ের ধার থেকে। তারপর হঠাৎ দেখলাম ওকে এই প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে। স্টেজে গান গাইছে। চমকে উঠলাম। বাইশ বছর বয়সের দেবযানী মঞ্চে এলো কী করে!

পরিচয় করে জানতে পারলাম শতরূপার মা দেবযানী। ওর বাবা মারা গেছে বেশ কিছু বছর আগেই। দেবযানীর শরীরেও নানা রোগের বাসা। ভাবলাম প্রায়শ্চিত্ত করি। শতরূপার সঙ্গে বিয়ে দিই তোর। কিন্তু তুই আমার মতো ভীতু নোস। তুই সাহসী। তাই পারমিতাকেই বউ করে আনলি। নিজের ভালোবাসাকে সম্মান দিলি। আমি খুশি হয়েছি অরিত্র। কিন্তু আবারও দেবযানীর সামনে ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না। তাই জগন্নাথের সঙ্গে বিয়ে দিলাম শতরূপার। মেয়েটা আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিল। ওরা খুব ভালো আছে। ওদের মেয়ে রূপকথা আমায় দাদাই বলে ডাকে। বড্ড যত্ন করে ওরা আমায়। ভাবলাম, শান্তিনিকেতনের বাড়ি আর হোটেলটা ওদের থাকুক। ওরাই এটাকে আগলে রাখবে। তোর যখন ইচ্ছে আসবি এবাড়িতে। জগন্নাথ আমায় কথা দিয়েছে তোর কোনো অযত্ন ও করবে না। রাগ করিস না বুড়ো, বাবাকে ক্ষমা করিস।’

বুড়ো নামটা কতদিন পরে শুনলো অরিত্র। মা ওকে বুড়ো বলে ডাকত।

অরিত্র খেয়াল করেনি কখন ওর চোখ ভিজে গেছে।

সোনাঝুরিতে আচমকাই বৃষ্টি নেমেছে। জানালার দিকে অপলক তাকিয়ে বসে আছে অরিত্র। দূরে দেখতে পাচ্ছে একটা কাপল একই ছাতার তলায় হেসে লুটোপুটি। আদিত্যনারায়ণ আর দেবযানী কি এভাবেই ভালোবেসে ছিল শান্তিনিকেতনকে? হয়তো।

পারমিতা ফোন করছে…

রিসিভ করতেই ফিসফিস করে বলল, ‘কী বলছে ওরা জানে সব?’

অরিত্র ভাবলেশহীন ভাবে বলল, ‘জগন্নাথদা বাড়িটা ফেরত দিতে চেয়েছিল। আমি নিইনি। আদিত্যনারায়ণ তো কিছু কম রেখে যাননি যে কাউকে উপহার দেওয়া জিনিস ফিরিয়ে নিতে হবে। এ বাড়ি আমাদের দুইভাইয়ের থাকল, যার যখন ইচ্ছে সে আসবে। জগন্নাথদাই সব থেকে বেশি আগলে রাখতে পারবে বাড়িটাকে। তুমি যদি কোনো রিসর্ট করতে চাও জানিও, আমি জমি কিনে দেব এখানে। কিন্তু এ বাড়িটা রিসর্ট হবে না পারমিতা।’

ফোনটা কেটে দেওয়ার সময় পারমিতা বলল, ‘চিপ সেন্টিমেন্ট নিয়ে বসে থাকো।’

আবারও সোনাঝুরির দিকে তাকালো অরিত্র।

ওই তো দেবযানীকে আদিত্য বলছে, ভালোবাসা মানেই শুধু পরিণতি নয়। ভালোবাসা মানে গোপন কুঠুরিতে না পাওয়ার তীব্র যন্ত্রণা। ক্ষতবিক্ষত মনে তার আনাগোনার ছাপ রয়ে যায় আজীবন।

ওই তো আদিত্য দেবযানীর পাশে হাঁটতে হাঁটতে আবৃত্তি করছে

”আমরা দুজনা স্বর্গ-খেলনা গড়িব না ধরণীতে

মুগ্ধ ললিত অশ্রুগলিত গীতে

পঞ্চশরের বেদনামাধুরী দিয়ে

বাসররাত্রি রচিব না মোরা প্রিয়ে

ভাগ্যের পায়ে দুর্বল প্রাণে ভিক্ষা না যেন যাচি।

কিছু নাই ভয়, জানি নিশ্চয় তুমি আছ আমি আছি।”

বাবার লেখা চিঠিটাতে আরেকবার হাত বোলালো অরিত্র। কেন যে বাবাকে অপ্রয়োজনেও আরেকবার জড়িয়ে ধরা হল না! কিছু আফসোস আজীবন রয়ে যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *