অতনুদের বাড়িতে রোজ কতরকমের রান্না হয়। ওদের বাড়ির সবাই খেতে ভালোবাসে। বলতে গেলে পেটুক ফ্যামিলি। আজ থেকে আর সেসব রান্নার স্বাদ জুটবে না অতনুর জিভে। থাক, ও চলে গেলে বাকিরা ওর ভাগটাও খেয়ে নিক। কদিন আগেই রামায়ণ পড়া শেষ করেছে অতনু। নিজেকে কেমন রামের সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছে করছে ওর। ঠিক যেন রামের বনবাস। অত বড় রাজ্য ছেড়ে, সব সুখ ছেড়ে বনবাসে গিয়ে মাটির কুটিরে ছিল। বড়জেঠিমা তিন রকমের নাড়ু, চিড়ে ভাজা, আমূল দুধের প্যাকেট, সাবুর পাঁপড় আরও কত কী যেন ব্যাগের সামনে এনে রাখল। দুটো ট্রলি আরেকটা বড় ব্যাগ ভর্তি হয়েছে অতনুর জন্য।
দুপুরে আজ বাড়িতে খাসির মাংস, চিংড়ির মালাইকারি, মুড়িঘন্ট এসব রান্না হয়েছে বাড়িতে। অতনু বেশ বুঝতে পারছে ওর পছন্দের রান্নাগুলোই হয়েছে। কিন্তু ওর খেতে ইচ্ছে করছে না। যারা ওকে ভালোবাসে না তারা আবার ওর জন্য এসব রান্না করেছে কেন? ও তো চলেই যাচ্ছে।
অতনু বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় সবার চোখে জল। সবাই বলছে ভালো করে পড়বি। তাছাড়া চিন্তা করিস না, মাসে একবার করে তো বাড়ি আসবি দুদিনের জন্য। আমরাও যাব দেখা করতে। অতনুর চোখে জল নেই। ইচ্ছে করে ঠোঁট কামড়ে সবাইকে প্রণাম করে গাড়িতে উঠে পড়ল অতনু। সারা রাস্তা চুপ করে থাকল অতনু। বাবা গাড়ি চালাতে চালাতেই দু-একটা কথা বলছিল। হোস্টেলে থাকার নিয়মকানুন সম্পর্কে। অতনু চুপচাপ শুনেছিল।
বিকেল পাঁচটায় ও ঢুকল হোস্টেলের রুমে। তিনটে করে বেড রয়েছে। দুটোতে অলরেডি দুটো ছেলে বসে আছে। একটা ফাঁকা ওটাই ওর। ও নিজের ট্রলিব্যাগগুলো মেঝেতে রেখে ঘরে পরার জামাপ্যান্ট নেবে বলে ব্যাগের চেন খুলল। ঘরের বাকি দুটো ছেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আর ব্যাগের দিকে। দুজনেই চমকে উঠে বলল, উরিব্বাস এ তো পুরো খাজনা রে? দুজনেই ছুটে বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় গোটা পনেরোর দল হাজির অতনুর ঘরের সামনে। তার মধ্যে তিনজন বড় দাদা। সম্ভবত ইলেভেনে পড়ে। অতনু কিছু বোঝার আগেই ছোঁ মেরে ওর চানাচুরের প্যাকেট দুটো নিয়ে বলল, এই বাবলা নারকেল এনেছিস নাকি?
অতনু বিরক্তির সুরে বলল, আমার নাম বাবলা নয়। নারকেল আছে ওই ব্যাগে। নিমেষের মধ্যে অতনুর চানাচুর, মুড়ির প্যাকেট, নারকেল সব হওয়া হয়ে গেল ব্যাগ থেকে। আর সকলের হাতে জেঠিমার ভরে দেওয়া নাড়ু একটা করে। দেখে মনে হচ্ছে দুর্ভিক্ষ পীড়িত লোকজন।
ঘন্টাখানেক পরে মনমরা হয়ে বসেছিল অতনু। একজন এসে বলল, এই যে সোজা ডাইনিং হলে চলে আয়। দেরি করলে তুইই ঠকবি। বিষয়টা কী বোঝার জন্যই অতনু গিয়ে হাজির হল ডাইনিং রুমে। মেঝেতে খবরের কাগজ বিছিয়ে তার চারপাশে গোল হয়ে বসেছে সবাই। অতনুকে দেখে হাত নেড়ে সবাই ডাকল। বলল, আমাদের নিষ্ঠুর মনে করিস না রে। দ্যাখ তোর জন্য দুটো নারকেল বাঁচিয়ে রেখেছি। দুটো ছোট ছোট টুকরো নারকেল অতনুর হাতে তুলে দিল একজন। খবরের কাগজের ওপরে মুড়ির স্তূপ। তাতে চানাচুর, পেঁয়াজ, লংকা মেখে ঝালমুড়ি করা হয়েছে। এক ডজন হাত সেখানে এক সঙ্গে পড়ছে। মুড়ি মাখা দেখে খিদে পেয়ে গেল অতনুর। বসে গেল সবার পাশে। বাইরে কেউ একজন ভাঙা বাংলায় খুব চেঁচাচ্ছে। অতনু বলল, কে চেঁচাচ্ছে? গোটা তিনেক ছেলে অবলীলায় বলল, ও আমাদের বাহাদুর সম্রাট সিং ওরফে আমাদের দাদু চেঁচাচ্ছে। আরে আমাদের হোস্টেলের গার্ড ওই দাদু।
অতনু সরল মনে জিজ্ঞাসা করল তো চেঁচাচ্ছেন কেন উনি?
আরও দুজন মুড়ি চিবাতে চিবাতে বলল, ইগনোর করতে শেখ বৎস। তেমন কিছুই না। এই যে মুড়িতে ধনেপাতা আর কাঁচালংকা দেখেছিস এগুলো দাদুর কিচেন গার্ডেনের থেকে চুরি করা। দাদু হোস্টেলের ওই শেষপ্রান্তে একটা ছোট্ট বাগান করেছে। ওখানে অনেক কিছু হয়। বেগুন, লেবু, কাঁচালংকা, টমেটো এমন আরও। সে তোকে একদিন দাদুর বাগানের বেগুনপোড়া টম্যাটো, ধনেপাতা দিয়ে মেখে খাওয়াব আমরা। শুভর মুখস্থ দাদুর বাগানের কোনখানে কী আছে।
পরেরদিন স্কুল যাবার আগে ভাত খেতে বসে দেখল আসল চমক। পাতলা সবজে রঙের ডাল, বাঁধাকপির তরকারি, আর মাছ দুপিস দিয়ে ভাত এলো অতনুর। ওদের রাঁধুনি বেলামাসিই পরিবেশন করে দিচ্ছিল। সঙ্গে এরেকজন রয়েছে তার হাতে ভাতের বালতি।
অতনু বেফাঁস বলে ফেলল, বাঁধাকপি তো রাতে রুটিতে খায় ও। ভাতে তো খাবে না। কথা শেষ হবার আগেই দেখল ওর পাত থেকে কেউ একজন খাবলে বাঁধাকপিটা নিয়ে নিল। বলল, আমি ভাতে, মুড়িতে, রুটিতে সবেতে খাই। সকলে, রাতে যখন পাই তখনই খাই। অতনু অপলক তাকিয়ে থাকল ছেলেটার দিকে। মাছটা মুখে দিতেই একটু কেমন যেন গন্ধ লাগল। অতনু বলল, আমি এমন গন্ধ মাছ খাই না তো। পিসি সরকারের ম্যাজিকের মতো মাছ দুটোও মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেল ওর থালা থেকে। একজন বলল, আমি গন্ধ মাছ খেতে খুব ভালোবাসি রে। তুই রোজ আমায় দিবি। অতনুর পাতে শুধু পাতলা ডাল আর ভাত, পেটে অবুঝ খিদে। বাড়ির রান্নাগুলোর কথা মনে পড়ছে। বড়জেঠিমার হাতের রান্নাগুলো অমৃত।
ওর থালা ফাঁকা দেখে বেলামাসির বোধহয় মায়া হল। তাই একটা মাছের পিস, আরেকটু বাঁধাকপি দিতে দিতে বলল, এখানে সব রাক্ষসের বাস। একবারও কোনো জিনিস খাবো না বলবে না বুঝছো, তাহলেই রাক্ষসের পেটে চলে যাবে সে জিনিস। দুদিন পর থেকেই অতনু বুঝল, বেলামাসির নাম রাঁধুনি বেলা হলেও বেলামাসি রান্নাটা পারে না। অতি বড় হ্যাংলা বাচ্চাও বেলামাসির রান্না খেয়ে প্রশংসা করবে না। কারণ বেলামাসি একই মশলা সব রান্নাতে ব্যবহার করে। তাই সবের টেস্ট আর গন্ধ প্রায় একই হয়ে যায়। রোজই খেতে বসে চোখে জল এসে যায় অতনুর। ওই বিস্বাদ খাবার খেতে কষ্ট হয় ওর। অতনু বুঝতে পারে ওর থেকেও সবজিগুলো বেশি কষ্ট পায়, নিজেদের সত্তা হারিয়ে ফেলার কষ্ট। পটল আর ফুলকপির টেস্ট একই করে দেয় বেলামাসি। জেঠিমাদের বানানো নাড়ু থেকে মোয়া সব হাপিস করে দিয়েছে এই রাক্ষসের দল। খাবার সময় বলেছে, একা খেতে নেই অতনু। এটা হোস্টেলের রুল নয়। যা হবে সবাই ভাগ করে খাব।
প্রায় তিন সপ্তাহ পরে টানা তিনদিন ছুটি হল স্কুল। বাবা ওকে নিতে এসেছে দেখে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। বাড়ি ফিরতেই সবাই বলতে শুরু করল অতনু রোগা হয়ে গেছে। বাবা অনড়, এই ছুতোয় হোস্টেল ছড়ানো যাবে না। রোগা হয়েছে, রোগ তো নয়। তিনদিনে যেন আবার অতনুর জিভের স্বাদ ফিরে এলো। বড়জেঠিমা সব খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল। যখন শুনল বেলামাসি রান্না পারে না, তখন একটা ডায়রিতে অন্তত গোটা কুড়ি রান্নার রেসিপি লিখে বলল, বুবাই এটা দিবি বেলাকে। সহজ করে লেখা আছে। এবার দেখ হোস্টেলে তোর আর কোনো অসুবিধা হবে না।
অতনু চুপিচুপি ডায়রিটা বেলামাসির হাতে দিয়ে বলল, এই রান্নাগুলো তুমি শিখে নাও। দেখো জেঠিমা সব লিখে দিয়েছে কিসে কী মশলা দিতে হবে। এবারে তুমিও দারুণ রান্না করতে পারবে। বেলামাসি মাধ্যমিক পাস। তাই রান্নার রেসিপি পড়তে কোনো সমস্যাই হল না। বেলামাসি এক মুখ হেসে বলল, এবার তুমি দেখো বেলামাসির হাতের কামাল।
অতনু আশায় আশায় পরের দিন টেবিলে বসতেই বেলামাসি এসে বলল, আজ তোমার জেঠিমার রেসিপি মতো সুক্তো করেছি। খেয়ে হাত চাটবে। অতনু আজ দুটি ভাত বেশি নিলো। সুক্তো মেখে ভাত মুখে দিয়ে বুঝলো, সেই একই পাঁচ মেশালি ঝোলের স্বাদ। অথচ বাড়ির তৈরি সুক্তো দিয়েই ভাত খেয়ে ফেলতো অতনু। বেলামাসির মুখে গর্বের হাসি। অতনুর দিকে তাকিয়ে বলল, কি রে ছেলে বল কেমন রেঁধেছি? তোর জেঠিমার মতো তো?
অতনুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, হাতির মাথা। জঘন্য হয়েছে। কিন্তু কাঁচাপাকা চুলের হাত খোঁপা করা মানুষটার কপালের ভাঁজে বহু দুশ্চিন্তার রেখা দেখে কিছুই বলা হল না অতনুর। হেসে বলল, হ্যাঁ খুব ভালো হয়েছে। বেলামাসি বলল, কালকে কাতলা রসা করব খেয়ে দেখিস।
না গত একবছরে বেলামাসির রান্নার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই একই রান্না করে যায় মাসি। সেই সব তরকারির একই স্বাদ। সেই একইভাবে কাতলা, রুই, ইলিশ সবাই কাঁদে জিরে গুঁড়োর গন্ধে। কিন্তু অতনুর জিভের পরিবর্তন হয়েছে। আর তেমন বিস্বাদ লাগে না। হোস্টেলের ঘর, বন্ধুরা, বেলামাসির স্বাদহীন রান্নার মধ্যেও একটা অদ্ভুত টান আছে। বাড়িতে গেলে জেঠিমাদের হাতের সুস্বাদু রান্নার মাঝে যেন বেলামাসির ওই জল রঙের পাতলা ডাল আর কুমড়োর ঘ্যাঁটের স্বাদটুকু মিস করে অতনু। অতনু বুঝেছে রেসিপি জানলে আর মশলা দিলেই রান্না সুস্বাদু হয় না। ‘রান্নার হাত’ কথাটার উদ্ভব হয়েছিল এই কারণেই। বেলামাসি রাঁধুনি হয়েও রান্নাটা পারে না। এটাই মাসির একমাত্র গুণ। সেটা নিয়ে অবশ্য মাসির আক্ষেপ নেই। কারণ হোস্টেলের ছেলেরা বরাবরের হ্যাংলা। তাই মাসির রান্না আঙুল চেটে খায়। সেই কারণে ‘রাঁধুনি অফ দ্য ইয়ারের’ পুরস্কার হোস্টেলের ছেলেরা বছর বছর বেলামাসিকেই দেয়। বেলামাসিও ওই পুরস্কার পেয়ে খুবই খুশি থাকে। হ্যাংলাগুলোকে খাইয়েই তার তৃপ্তি। স্কুল ফেরত আগুন জ্বলা পেট বলে ওঠে… বেলামাসির রান্নাঘর যুগযুগ জিও।
