ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ৯

লন্ড্রি বন্ধ করে বাড়ির সামনে আসতেই খটকা লাগে সাগরের। সাগর বাড়ি ফিরলে তারপর বিট্টুকে খেতে দিতে যাবার কথা সুমিতার। কিন্তু রাত সাড়ে ন’টা বাজে সবে, এর মধ্যে বাড়িতে তালা দিয়ে খাবার নিয়ে চলে গেছে? কী এমন খিদে পেল বিট্টুর? নিজের কাছে একটা চাবি থাকা সত্ত্বেও চোয়াল শক্ত করে খানিক ভাবল সাগর। তারপর উলটোপথে হাঁটা দিয়ে পৌঁছে গেল বিট্টুর বাড়ি। সেখানেও একই দৃশ্য। গেটে তালা ঝুলছে। এতক্ষণ যে তুষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল সেটা এখন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। কয়েকদিন ধরেই সুমিতার মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছে সাগর। আগের থেকে সাজগোজটাও বেড়েছে। দিনরাত হেঁশেলে পড়ে থেকে সুমিতার শরীর থেকে ঘামের গন্ধ ছাড়া অন্য কোনও সুবাস পেত না। কিন্তু কদিন যাবৎ পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছে সে। মাথার আগুন মাথায় নিয়েই বাড়ি ফিরে এল সাগর।

রাত পৌনে বারোটা। বাড়ির সামনে একটা অটো এসে থামার শব্দ। খেয়েদেয়ে ঘর অন্ধকার করে বসেছিল সাগর। আজ ফিরলেই আচ্ছা করে দেবে বউটাকে। কিন্তু সুমিতা ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলে যে এমন চমকে দেবে বুঝতে পারেনি সাগর। ঠোঁটে লিপস্টিক, চোখে কাজল। দুটো গালেও লালচে আভা। কপালে আবার কায়দার টিপ। সিঁথি থেকে সিঁদুর মুছে ফেলেছে। হাতে রংবেরঙের চুড়ি। গায়ের শাড়িটাও এই প্ৰথম দেখছে সাগর।

‘কী দেখছ?’

‘এ…এ সব কী?’

‘কী আবার? সেজেছি। খেয়েছ তো?’

সুমিতা বাইরের ঘর থেকে ভিতরে এসে জল খেল। ‘এত রাতে সেজেগুজে কোত্থেকে ফিরলি তুই? আর এই শাড়িটাই বা কার?’

সুমিতা ছল করে তাকাল। চোখে তার বাচালে রঙ্গ। ‘কেন? তুমিই তো আমায় দিয়েছ। চিনতে পারছ না? অবশ্য তুমি আমায় এত্ত শাড়ি কিনে দিয়েছ যে নিজেরই মনে নেই। তাই না গো?’

এ কথাগুলো যেন সুমিতা নয়, সুমিতার শরীরের মধ্যে থেকে অন্য কেউ বলছে। মাঝরাতে বউয়ের খোঁচানিতে মেজাজ আরও গরম হয়ে গেল। চিৎকার করে উঠল, ‘একদম ফালতু বকবি না। বল এ শাড়ি কার? কোত্থেকে ফিরলি তুই?’

‘চিৎকার কোরো না। বউকে যখন বাজারে নামিয়েইছ তখন এটুকু তো সহ্য করতেই হবে।’

সাগরের হাতের মুষ্টির মধ্যে সুমিতার চুলগুলো তালগোল পাকিয়ে গেল। ‘এই মাগি, ঠিক করে বল কোথায় মাড়াচ্ছিলি?’

‘বিটুর পেট ভরিয়ে তোমার মদের খরচ ওঠে না। তাই আরও কাজের খোঁজে গেছিলাম।

সাগর চুলের মুঠি ধরে সুমিতাকে বিছানার দিকে ঠেলে দিল।

‘শালি খানকিগিরি কচ্চিস তুই আমার সঙ্গে?’

সজোরে এক লাথি সুমিতার পিছনে। সুমিতার মুখ দিয়ে কষ্টের শব্দ বেরিয়ে এল। দু-চোখ লাল হয়ে উঠল। সাগর হাঁটুটা ভাঁজ করে পা দিয়ে সুমিতার গলার ওপর চেপে বসতেই দমটা আটকে আসতে লাগল। ‘বল ঢেমনি, কোথায় গেছিলি? কীসের এত সাজগোজ তোর?’ এভাবেই চলল আরও কিছু উত্তপ্ত ও কাঁচা বাক্যবিনিময়। সুমিতা যখন দেখল আর পেরে উঠবে না সাগরের সঙ্গে তখন ইশারায় বোঝাল যে সে সব বলছে। সাগর সরে গেল বউয়ের গলার ওপর থেকে। উঠে বসে খানিক ধাতস্থ হয়ে বলল, ‘আমি অভিনয় করব। তারই অডিশন দিতে গিসলাম।

‘কী করবি? অভিনয়?’

‘হ্যাঁ। আর তাই একজনের কাছে আমি মেকআপ করা শিখছি। মেকআপ জানলে তাড়াতাড়ি চান্স পাওয়া যায়।’

‘কে সে?’

‘তুমি চিনবে না।’

ছেলে না মেয়ে?’

‘কী করবে জেনে? তোমার তো শুধু পয়সা চাই। ব্যস, তাহলেই তো হল!’

‘ওওওও দাঁড়া দাঁড়া। ওই কলি তোর মাথায় এ সব ঢুকিয়েছে। ওই তোকে মেকআপ শেখাচ্ছে?’

‘কেন? পৃথিবীতে কলি ছাড়া আর কেউ মেকআপ করে না? না জানে না? তোমার ওই কলির দিকে বড়ো নজর না গো?’

‘ঠাটিয়ে এক চড় দেব। এ সব ধ্যাষ্টামো এ বাড়িতে চলবে না। শুধু রাঁধবি আর বিট্টুকে খাওয়াবি। ও যদি কিছু বলে করে দিবি। ব্যস। ও যা পয়সা দেবে তাতেই আমার চলে যাবে।’

‘পারব না। তোমার তাতেই চলে গেলেও আমার চলবে না। আমি কাল থেকেই মেকআপ শিখতে যাব। ও বলেছে, আমায় অ্যাক্টিং শেখাবার লোকের কাছেও নিয়ে যাবে।’

‘ও! এই ‘ও’-টা কে?

‘বলব না।’

ঠাটিয়ে এক চড় মারল সাগর। দু-চোখ ভরা জল নিয়ে রাগে গরগর করে উঠল সুমিতা, ‘কেন? এখন রাগ দেখাচ্ছ কেন? যখন বলেছিলাম বিট্টুর কাছে যাব না তখন তো শোনোনি। আমায় জোর করে ঠেলে দিয়েছিলে। ও ঠিকই বলেছে। তুমি মানুষ নও। জানোয়ার। নিজের ফূর্তির খরচ তোলার জন্য আমায় দিয়ে খাটাও। সংসারের জন্য নয়।’

‘আচ্ছা! তোর মাথাটাও চিবিয়ে খাচ্ছে দেখছি।’

‘হ্যাঁ চেবাচ্ছে। বেশ করেছে। সে আমার ভালো ভাবছে। তোমার মতো নিজের প্রয়োজনে পরপুরুষকে দিয়ে বউয়ের গা ঘষায় না।’

রেগে ওঠারও একটা সীমা থাকে। এবারে সাগরের মাথার শিরাগুলো রাগে ছিঁড়ে গেল। ঘরে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ার তুলে বেধড়ক মারতে থাকে সুমিতাকে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকে সুমিতা। আশপাশের বাড়ি থেকে লোক ছুটে এসে দরজায় ধাক্কা দেয়। শেষে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখে রক্তাক্ত সুমিতা মেঝেতে লুটিয়ে আছে। মাথা ফেটে, হাত-মুখ কেটে ছিন্নভিন্ন দশা। পাড়ার লোক মারমুখী হয়ে সাগরকে মারতে যায়। ঘা কতক সাগরের গায়ের ওপর পড়েও। এর মধ্যে কয়েকজন পুলিশের কাছে যাবার নাম করলে রক্তাক্ত সুমিতা কোঁকিয়ে ওঠে। মিনতি করে পুলিশে না যাওয়ার জন্য।

***

থানার লকআপে সাগর। সেদিন সুমিতার গায়ে ঠিক যে কটা আঘাত সে করেছিল, যতগুলো জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধেছিল, আজ সাগরের গায়ের রক্তজমাট দাগ তার চেয়ে কিছু বেশি বৈ কম নয়। রাজারাম ও স্বয়ম্ভুর চাপে কাঁদতে কাঁদতে সব কথা স্বীকার করে সাগর। রাজারাম বলে, ‘শুরুতেই সব কথা স্বীকার করে নিলে তোর শরীরে আমাদের আর হাত গরম করে আলপনা আঁকতে হত না।

‘দাঁড়াও ভাই, এখনই এত উৎফুল্ল হয়ো না। এখনও আরও কিছু কথা বাকি আছে।’

সাগর ধর নোনতা জলে চিটচিটে হয়ে যাওয়া চোখটা তুলে ভয়ে ভয়ে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়। স্বয়ম্ভু বলে, ‘পৃথিবীতে তো অনেক পুরুষ মানুষ আছে। তুই হঠাৎ বেছে বেছে বিট্টুর প্রতি এত সদয় হলি কেন রে?’

‘এ…এমনিই…!’

স্বয়ম্ভু সাগরের দিকে তাকিয়ে হাতে ধরা কতগুলো ছবি তুলে ধরে। সুমিতার পোস্টমর্টেম করা লাশের ছবি। স্বয়ম্ভু সুমিতার গায়ে মারের দাগগুলোর সঙ্গে সাগরের গায়ের দাগগুলো মেলাতে থাকে। ‘মাথা, কবজি, কাঁধ, বুক, পিঠ, পা… সবটাই শোধবোধ। বাকি শুধু একটাই জায়গা। রাজারাম…!

‘স্যার।’

‘সুমিতার ডান হাতের ওপরের দিকে একটা বড়োসড়ো কালশিটে আছে। কিন্তু সাগরের ডান হাতটা এখনও ফাঁকা। চালাও রুল।’

দুটো দড়ির সঙ্গে সাগরকে বাঁধা। পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। শরীরে বস্ত্র বলতে একটা জাঙ্গিয়া। সাগর ছটফট করে ওঠে, ‘স্যার স্যার স্যার স্যার… বলছি স্যার বলছি। মারবেন না।’ হাউ হাউ করে কেঁদে কথাগুলো বলল সাগর।

‘বলে ফ্যাল।’

সাগর বলল, ‘মদের ঠেকে বহুত দেনা হয়ে গেসল। একদিন ঠেকের মালিক হেব্বি বাওয়াল দিল। লোক ডেকে এনেছিল মারার জন্য। তখন ওই বিটুই টাকাগুলো দিয়ে আমায় বাঁচিয়ে ছিল।’

‘কত দেনা করেছিলি?’

‘সাত হাজার মতো।’

‘বিট্টু সাত হাজার টাকা বের করে দিল? ক্যাশ?’

‘হ্যাঁ স্যার।’

রাজারামের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, ‘বিট্টুকে তার আগে চিনতিস তুই?’

‘মিনালবাবুর ভাড়াটে বলেই চিনতাম। দু-একদিন দেখেছিলাম। আলাপ ছিল না।’

‘তারপর? হঠাৎ তোর জন্য কেন টাকা দিল জিজ্ঞেস করলি না?’

‘বিট্টু বলেছিল টাকা ফেরত দিতে হবে না। শুধু একটা রান্নার লোক দিতে হবে। আর…’

‘আর?’

সাগরের গলা শুকিয়ে আসছে। বাকি কথা মুখে এসেও বেরোচ্ছে না।

‘কী রে বল।’

‘একটু গা-হাত-পা ম্যাসেজ করে দেওয়ার লোক খুঁজছিল।

‘তাই তুই তোর বউকে জোর করে পাঠিয়ে দিলি?’

ভীত-সন্ত্রস্ত চোখের পাতা তুলেই সাগর নামিয়ে নিল। দাঁতে দাঁত চেপে রাজারাম বাকি থাকা রুলের বাড়িটা দিতে গিয়েও পারল না। নিজেকে সামলে নিল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘সুমিতাকে যে অভিনয় শেখাতে চেয়েছিল সে কে? তাকে চিনিস?’

‘না স্যার?’

‘তার নাম জানিস?’

‘না স্যার। সুমিতা ওর ব্যাপারে কোনওদিন কিছু বলেনি।

‘হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তোর বউ গিয়েছিল তার কাছে?’

‘হুম। ও আমায় পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল আর বিট্টুকেও খুশি রেখেছিল বলে আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।’

‘তুই, তোর বউ আর বিট্টুর মাঝে আরও এক অচেনা মানুষ। তাকে তুই চিনলিই না?’

‘মেরে ফেললেও তার নাম আমি বলতে পারব না। সত্যিই তাকে আমি দেখিনি। তবে, সুমিতাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় যে গাড়িতে ওকে তোলা হয়েছিল, সেখানে উঠেই ওর মুখে আমি হাসি দেখেছিলাম। তারপরেই চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলছিল, আমি জানতাম, তুমি আসবে। তুমি অমানুষ নও। সবাই বলেছিল ভুল বকছে। আমিও তাই ভেবেছিলাম।’

‘কাকে দেখে হেসেছিল? দেখেছিস তাকে?

‘মনে হল ড্রাইভারকে দেখে।’

‘কেমন দেখতে তাকে?’

‘মাথায় পাগড়ি, গালে দাড়ি। অন্ধকারে তেমন করে বুঝিনি।’

‘পাঞ্জাবি ড্রাইভার?’

স্বয়ম্ভু উত্তেজিত।

‘হুম।’

‘তুই কোথায় বসেছিলি?’

‘সুমিতার পায়ের কাছে।

‘আরে বাবা সেটা কোনদিকে? ড্রাইভারকে কতটা দেখা যাচ্ছিল?’

‘ড্রাইভারের পিছনে।

হাওয়াতে ঘুষি ছোড়ে স্বয়ম্ভু। রাজারাম প্রশ্ন করে, ‘তাহলে ড্রাইভার যে পাঞ্জাবি সেটা কখন দেখলি?’

‘ওই নামানোর সময় এক ঝলক বুঝেছিলাম।’

স্বয়ম্ভু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ‘ড্রাইভারের পাশে কে বসেছিল?’ সাগর ভাবল, তারপর বলল, ‘তীর্থ বোধহয়।’

‘তোর পাড়ায় থাকে?’

‘হ্যাঁ, সেদিন আমিই বসেছিলাম ড্রাইভারের পাশে। কেন বলুন তো?’

অফিস থেকে ফিরে জামাকাপড় ছাড়ার সময় পায়নি তীর্থ। মেরেকেটে পঁয়ত্রিশ হবে। ফর্সা। বাঁ চোখের পাশে একটা কাটা দাগ আছে। ক্লিন শেভ। রাজারাম প্রশ্ন করল, ‘ড্রাইভার কি পাঞ্জাবি ছিল?’

‘ড্রাই-ভা-র! হ্যাঁ হ্যাঁ। মাথায় পাগড়ি ছিল তো। গালে দাড়ি।’

স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, ‘ড্রাইভারের হাত খেয়াল করেছিলেন? কোনও বালা-টালা পরা ছিল?’

‘ওইভাবে তো ডিটেইলস কিছু দেখিনি। তবে বালা ছিল বলে তো মনে পড়ছে না।’

‘বেশ। হলুদ ট্যাক্সি ছিল না ক্যাব?’

‘না না হলুদ ট্যাক্সি নয়। সাদা গাড়ি। তবে কোনও অ্যাপ থেকে বুক করিনি। মহিলাটির ওরকম অবস্থা দেখে কোনওরকমে সামনে যা গাড়ি পাব সেটাই ধরব মনে করে বেরিয়েছিলাম। গলির মোড়েই সাদা গাড়িটা দেখে জিজ্ঞেস করি। যেতে রাজি হয়।’

‘এই সরু গলির মোড়ে গাড়ি?’

‘কোনওদিন দেখিনি। সেদিনই লাকিলি পেয়ে গেছিলাম।’

‘ভাড়াটা নিশ্চয়ই ক্যাশে দিয়েছিলেন।’

‘হ্যাঁ। ভাড়াটা ক্যাশেই … ‘

বলেই থমকাল তীর্থ। কী যেন মনে পড়াতে বলে উঠল, ‘না স্যার। আমি শিওর যে হাতে বালা ছিল না। কারণ আমি তো টাকাটা ড্রাইভারের হাতেই দিয়েছিলাম।’

‘কোন হাতে নিয়েছিল?’

‘নরমালি মানে ডান হাতেই।’

‘থ্যাংক ইউ তীর্থবাবু।’

পাড়া থেকে বেরোবার আগে স্বয়ম্ভূ তিলেক দাঁড়ায় বিট্টুর ভাড়াবাড়ির দরজার সামনে। ভালো করে নিরীক্ষণ করে রাজারামকে বলে, ‘বিট্টুর ঘর থেকে যে লোকটাকে মুখ ঢেকে বেরোতে দেখেছিলেন মৃণালবাবু সেই লোকটাই সুমিতার নতুন জীবনের কাণ্ডারী। সেই মেকআপ শিখিয়ে অভিনয় জগতে…!’ বলতে বলতে থেমে গেল স্বয়ম্ভু। রাজারাম বুঝল হয়তো কোনও অঙ্ক মিলিয়ে দিতে পেরেছেন স্বয়ম্ভু স্যার।

‘স্যার।’

রাজারাম ডাকল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘রাজারাম, সোনারপুরের বীণা সাহা এবং রিজেন্ট পার্কের মিনতি গুহ, দুজনের ফরেন্সিক রিপোর্টে ফেনক্সিথেনল আর ডায়াথেল থ্যালেট পাওয়া গিয়েছে।’

‘এগুলো কী?’

‘কসমেটিক্স প্রিজার্ভেটিভ।’

‘ফাক। তার মানে খুনি অ্যাক্টিংয়ের সঙ্গে যুক্ত?’

‘বা মডেলিং। কিংবা শুধুই মেক আপ ম্যান।’

‘স্যার। মিনতি গুহর সিসিটিভি ফুটেজেও একটা মেয়েকে দেখা গিয়েছিল না যে অটো ধরে বেরিয়ে গিয়েছিল।’

‘হ্যাঁ। কিন্তু সেই অটোর কোনও ট্রেস পাওয়া যায়নি। নম্বর প্লেট ভুয়ো। আর ওই মেয়েটার মুখটাও তো দেখা যায়নি। সিসিটিভিগুলোর যা অবস্থা তাতে তোমায়

আমায়ও চেনা দায়।’

‘কিন্তু স্যার, ওখানে মেয়ে। এখানে ছেলে। ব্যাপারটা গোলমেলে না?’

‘তোমার কি মনে হয়, একজন এই সব কাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে? খুন একজন করলেও চ্যালাচামুণ্ডা আছে বিস্তর। আর এখানে…’

বিট্টুর বাড়ির দিকে চোখের ইশারা করে স্বয়ম্ভু বলল, ‘বিট্টু ইচ্ছে করেই সেদিন বাইরের আলো জ্বালায়নি। যাতে ওই আগন্তুককে কেউ চিনতে না পারে।

‘এই বিট্টু কি ম্যাজিক জানে? এখনও ধরা পড়ল না সে।’

‘এবার আমাদের বীণা সাহাকে নিয়ে একটু নাড়াঘাঁটা করতে হবে রাজারাম। ওদিকটা আমরা এড়িয়েই যাচ্ছি।’

বিট্টুর কথাটা যেন শুনেও শুনল না স্বয়ম্ভু। বীণা সাহার নামের আড়ালে বিটু দেবনাথকে ঢেকে দিল। কেন? অবাক লাগল রাজারামের। কিন্তু কিছু বলল না। পকেটে মোবাইলটা কেঁপে উঠল। স্বয়ম্ভু ফোন ধরল, ‘বলো কৌশিক।’ ওপার থেকে কী কথা ভেসে এল রাজারামের কানে গেল না। কিন্তু খবরটি যে গুরুতর তা স্বয়ম্ভুর মুখ দেখে আঁচ করা গেল। ‘একদম না কৌশিক। পুলিশ কোনও কিছুতে টাচ করবে না। তুমি এখনই বারণ করো। বলো এই মুহূর্তে ওই এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। শুধু লোকেশনটা আমায় সেন্ড করে দাও।… না না বলছি তো না। পুলিশ জাল বিছিয়ে বসে থাকবে আর পাখি এসে ধরা দেবে এটা এত সহজ নয়। কিচ্ছু করবে না পুলিশ যতক্ষণ না আমি বলছি। রাখছি।’

‘কী হয়েছে স্যার?’

ফোনটা কেটে একটু এদিক-ওদিক চোখ চালিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, ‘বাড়ি যাও রাজারাম। কালকের প্ল্যানটা মাথায় রেখো।

‘মাথায় আছে স্যার। কিন্তু এখন কী…’

‘শোনো…’

রাজারামকে কথা শেষ করতে না দিয়ে স্বয়ম্ভু বলে উঠল, ‘কাল তোমায় পাক্কা খেলোয়াড়ের মতো পারফর্ম করতে হবে। আমি থাকি বা না থাকি, সেটা যেন কোনও ম্যাটার না করে।’ একজন গোয়েন্দা যখন তার নিজের টিমের লোকের কাছ থেকে কিছু আড়াল করে তখন বুঝতে হবে সেটা একান্তই গোপনীয়। তাই রাজারাম অবাক হয়ে চেয়ে থাকলেও কোনও প্রশ্ন করে না। শুধু জিজ্ঞেস করে, ‘বাড়ি যাবেন না?’ রাজারামের মনে অবস্থা বুঝে স্বয়ম্ভু হাসে। বলে, ‘একটা কাজ আছে। তুমি যাও। দেরি কোরো না। গুড নাইট।’

.

প্রাক-পুজোর শহর। আলোয় মোড়া তিলোত্তমা। তবু অন্ধকারের চোরা বাসাগুলো আজও এই শহরেই রয়েছে। যেখানে যত আলো সেখানে তত বেশি অন্ধকার। কারণ, অতিরিক্ত আলোয় মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে যায় বলেই কেউ এর পিছনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারটাকে দেখতে পায় না। কিন্তু এই আলোয় চরে বেড়ানোর ফুরসৎ পায় না স্বয়ম্ভুরা। ওঁরা আলোয় চোখে পট্টি বাঁধে পাছে ঝলসিয়ে যায় আর আঁধারে চোখ মেলে তাকায় যাতে অন্ধকার না গ্রাস করে নেয়। সেই অন্ধকারেই আঁধার রঙের আবরণে আপাদমস্তক ঢেকে লোকটা দ্রুত পায়ে হাঁটছে। আগাছাগুলোর ঘাড় মটকে যাচ্ছে পায়ের চাপে। গত বারো বছর ডকের পাশে পড়ে থাকা এই পরিত্যক্ত কারখানায় কেউ আসেনি। এলাকার লোকজন রাত হলেই নানারকম শব্দ পায় এই পোড়ো কারখানা থেকে। বারো বছর আগে এই কারখানার প্রাচীর ঘেঁষেই বসত দোকানবাজার। একদিন মধ্যরাতে সেখানেই লাগল আগুন। নিমেষের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে গেল বাজার। সেই আগ্রাসী বহ্নিশিখা ছাড়ল না কারাখানাটাকেও। বিদ্যুতের তার বেয়ে রাতের আধো জাগরুক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ল লেলিহান শিখাদের সর্বগ্রাসী নৃত্য। লোকজনের কাছে খবর পৌঁছোবার আগেই অর্ধেকের বেশি ভস্মীভূত। বাজার আর বসে না। কারখানায় লোকও আর আসে না। লোকে বলে এই এলাকায় ভূতের উপদ্রব। যারা রাতে কারখানায় ডিউটিতে ছিলেন তাঁদের মধ্যে ছয়জন পুড়ে মরেছিলেন। বাঁচাতে পারেননি, বাঁচতেও পারেনি। সে থেকেই এ চত্বর বাতিলের খাতায়। তৃতীয়ার মধ্যরাতে তবু লোকটা এসে এই কারখানাতেই ঢুকল। রাস্তা চেনা তাই কোনদিকে যাবে সে ভাবনা নেই। মরা কারখানার গলিঘুঁজি পেরিয়ে একটা মাঝারি খোপ। আশপাশে নষ্ট যন্ত্র, ভেঙে পড়া আসবাব। তারই মাঝে চকচকে ল্যাপটপ আর নেট কানেকশনের ডিভাইজ। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে কানে দিল। একটু পরেই ওপারের আগন্তুককে লোকটি বললেন, ‘পাত্তাড়ি গুটিয়ে নিচ্ছি। পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে…। ধুস, এই ডেরার সন্ধান পেলে কি আর আমি এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারতাম?’ কথাগুলো বলতে বলতে ল্যাপটপ বন্ধ করল। ডিভাইজের সুইচ অফ করে সেটা বড়ো একটা ব্যাগের মধ্যে ঢোকাল। ‘যেভাবে হোক বেরিয়ে যাব। চিন্তা কোরো না। দরকার হলে বাজারের ফর্দ দিও। কাজ হয়ে যাবে।… না, পেমেন্ট এখন নয়। সময় হলে চেয়ে নেব। রাখছি। বেরোতে হবে।’ ফোনটা কেটে প্যান্টের পকেটে রেখে ল্যাপটপটাকে ব্যাগে ভরছিল। ঠিক তখনই একটি পুরুষকণ্ঠ বলে উঠল, ‘হ্যাল্লো মিস্টার ধৃতিমান! লোকটি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘুরে তাকাবার অবস্থায় নেই কারণ সে ভালোই বুঝতে পারছে তার মাথার পিছনে লোহার নল ঠেকানো। পিছন ফিরেই সোজা হয়ে দাঁড়াল লোকটি।

‘হাত তুলুন।’

কড়া গলায় বলল স্বয়ম্ভু। দুটো হাত তুলে পিছন ঘুরেই দাঁড়িয়ে রইল লোকটি।

‘সামনে ঘুরুন।’

ধমকে উঠল। তক্ষুনি লোকটি কাটা পড়া ঘুড়ির মতো মুখ থুবড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। স্বয়ম্ভু সাবধান করতে গিয়েও সম্পূর্ণ কথা মুখ দিয়ে বেরোল না। লোকটার কাছে কি সায়ানাইড ছিল? মুখে দিয়ে ফেলেছিল? এরা তো এমনই হয়। রিভলভার তাক করেই লোকটাকে ফেরাবার জন্য পা দিয়ে দু-বার ঠেলা দিল। লোকটা উলটে সোজা হয়ে গেল। মুখটা কালো কাপড়ে বাঁধা। চোখদুটো শুধু বস্ত্রহীন। মাথায় কালো হুডি। জায়গাটাও আলো অন্ধকারে রহস্যময়। লোকটার মুখ দেখাটা জরুরি। রিভলভার দিয়েই স্বয়ম্ভূ মুখের কাপড়টা সরাবার চেষ্টা করতে থাকে। লোকটির মুখটা দেখার আগেই চোখের নিমেষে একটা সজোরে ঘুষি এসে আছড়ে পড়ল স্বয়ম্ভুর মুখে। ছিটকে পড়ল স্বয়ম্ভু। রিভলভারটা হাতেই রইল। নাকের কাছে বেশ ব্যথা করছে। মুহূর্তের জন্য সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেলেও ভিতরের কোনও এক শক্তি স্বয়ম্ভুকে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে দিল। যদিও ততক্ষণে সামনের লোকটি উধাও হয়ে গেছে। অন্ধকার মুহূর্তে পায়ের শব্দে স্বয়ম্ভু বুঝেছিল লোকটি কোনদিকে গেছে। সেই দিকেই দৌড়োতে গিয়ে দেখল স্বয়ম্ভু যে পথ দিয়ে এসেছে এটা সেই দিকে যাচ্ছে না। মানে এই কারখানা থেকে বেরোবার অন্য পথ আছে কিংবা লোকটি লুকিয়ে আছে এখানেই। বেশ খানিকটা দৌড়ে গেল। যেতেই আলো আঁধারিতে স্বয়ম্ভু লক্ষ করল ধুলোর ওপর পায়ের ছাপ। সেটা লক্ষ করে এগোতে এগোতে দেখে হঠাৎ করে পায়ের ছাপটা উধাও। সঙ্গে সঙ্গে ওপরের দিকে ঘুরে রিভলভার তাক করার আগেই লম্বা কালো অবয়বটা লাফ দিয়ে স্বয়ম্ভুর ঘাড়ের ওপর। প্রকাণ্ড অচল যন্ত্রের গায়ে ধাক্কা খায় স্বয়ম্ভু। লোকটির লম্বা পা বিদ্যুৎগতিতে ধেয়ে আসে স্বয়ম্ভুর দিকে। তলপেটে লাগার মুহূর্তে জুতো পরা পা-টা দুহাতে ধরে লোহার চাকা ঘোরাবার ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে দেয় স্বয়ম্ভু। ল্যাপটপের ব্যাগসমেত লোকটি মুখ থুবড়ে পড়তেই স্বয়ম্ভূ লোকটির পিঠের ওপর লাফিয়ে পড়ে।

‘চালাকি করলেই ঘিলু উড়িয়ে দেব।’

কথাটা বলেই স্বয়ম্ভূ প্রথমে লোকটির ল্যাপটপের ব্যাগটিকে খুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। তার জন্য লোকটাকে দাঁড়াতে হবে। স্বয়ম্ভূ উঠে পড়ে। ধমকে-চমকে লোকটিকেও দাঁড় করায়।

‘ব্যাগটা দে।’

স্বয়ম্ভু বলে।

‘ব্যাগটা খুলে দে।’

লোকটি একটি কথাও বলছে না। বরং বাধ্য ছেলের মতো কাঁধ থেকে ব্যাগের স্ট্রিপটা তুলে মাথা গলিয়ে খুলেও ঘুরে সহসা ঝাপট মারে। স্বয়ম্ভু টলে পাশে সরে যায়। পাশেই ছিল খালি ড্রাম। লাথি মেরে স্বয়ম্ভুর দিকে ছুড়ে দিয়েই লোকটি ধাঁ। স্বয়ম্ভু ড্রামের ওপর দিয়ে লাফিয়ে লোকটির পিছনে ধেয়ে যায়। ‘গুলি চালাতে বাধ্য হব। দাঁড়া বলছি।’ লোকটি ভালোই জানে গুলি চালিয়ে পুলিশ নিজের প্রমাণ নিজে হারাবে না। স্বয়ম্ভুও সেটা বুঝেছে। তবু সে একটা গুলি চালাল লোকটির কানের পাশ লক্ষ্য করে। একদম ঠিক জায়গা দিয়েই গুলিটা ছুটে সশব্দে দূরের দেয়ালটায় আঘাত করল। এতে লোকটির গতি কিছুটা রুদ্ধ হলেও দমল না। চট করে আবার অন্ধকার কারখানাটায় মিলিয়ে গেল। স্বয়ম্ভু থমকে দাঁড়াল। এদিকটায় আলো নেই। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে লাইটটা জ্বালে স্বয়ম্ভু। মোবাইল ধরা বাঁ হাতটা রিভলভার তাক করা ডান হাতের কবজির ওপর রেখে চারপাশ দেখতে থাকে। ঝিঁঝিঁর শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। দূর থেকে কোনও একটা গানের ছেঁড়া ছেঁড়া সুর মাঝেমধ্যে বন্ধ কারখানার বাতাসে খেলিয়ে উঠছে। হঠাৎ বাঁ দিক থেকে একটা কিছু একটা পড়ার ধাতব শব্দ। স্বয়ম্ভুকে দিকভ্রান্ত করার জন্য কিছু একটা ছুড়ে দিয়েছিল লোকটি। স্বয়ম্ভু বাঁদিকে মুখ ঘুরিয়েই ডানদিকে ঘুরে আবারও একটা গুলি করল।

‘আআআআ!’

মানুষের আর্তনাদ। মিশকালো অন্ধকারে দেখাই যাচ্ছে না। গুলিটা কি লোকটার গায়ে লাগল? মরে গেল? স্বয়ম্ভুর মগজ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। আর্তনাদের উৎস লক্ষ্য করে ছুটে গেল। কারখানার দেয়ালের উঁচুর দিকে ঘুলঘুলি। একসময় এক্সস্ট ফ্যান লাগানো থাকত বোধহয়। সেখান দিয়ে বাইরে আলোর চিলতে ঠিকরে এসে পড়েছে। সেই আলোতেই বিন্দু বিন্দু রক্ত। গুলিটা হাতেই লেগেছে নিশ্চয়। পায়ে লাগলে আরও বেশি রক্ত মাটিতে পড়ত। স্বয়ম্ভু মাটির দিকে তাকিয়ে রক্তের ফোটা লক্ষ্য করে এগোতে এগোতে এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছোল যেখানে বাইরে থেকে আসা আলো বেশ কিছুটা জায়গা দখল করে ছড়িয়ে আছে। কেউ নেই সেখানে। স্বয়ম্ভু নিশ্চিত হল যে পায়ে গুলি লাগেনি। কিন্তু হঠাৎ করে একটা জায়গায় এসে রক্তের আর কোনও চিহ্ন নেই কেন? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই স্বয়ম্ভু ঝট করে ঘুরে উপরের দিকে রিভলভার তাক করতেই ভারী কিছু স্বয়ম্ভুর মাথায় এসে পড়ে। ভার সহ্য করতে না পেরে পড়ে যায় সে। হাতের মুঠো আলগা হয়ে ছিটকে যায় রিভলভার। মুহূর্তে সব অন্ধকার হয়ে আসে স্বয়ম্ভুর চোখে। চোখ অন্ধ হলেও কান অত্যন্ত সজাগ। জুতোর শব্দটা যে পড়ে থাকা রিভলভারের দিকে ধেয়ে চলেছে সেটা সে ভালো করেই বুঝতে পারে। শব্দ লক্ষ্য করে সজোরে পা চালায় স্বয়ম্ভু। পরক্ষণেই ধপ করে শব্দ। লোকটার কাঁধের ব্যাগ ছিটকে যায়। স্বয়ম্ভুর দৃষ্টি তখন ফিরে আসছে। ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকটার ওপর। ঘুষি, পালটা ঘুষি, গড়িয়ে পড়া। আবার উঠে দাঁড়িয়ে একে অপরের পেটে লাথি। স্বয়ম্ভূ এক থাবায় মুখের আবরণ খুলতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। লোকটা অ্যাকশনে ট্রেন্ড। নইলে প্রতিপক্ষের আঘাতের কোন ফাঁকে বিদ্যুৎবেগে পালটা মার চালানো উচিত তা সে ভালোই জানে। স্বয়ম্ভূ ঘুরে মারতে যেতেই লোকটি সুড়ুত করে শুয়ে পড়ে। ফাঁকা হাওয়ায় স্বয়ম্ভুর আঘাত ভেসে যায়। ঘুরে আবার পালটা মার। এবার প্রস্তুতি নিতেই দেখে লোকটির হাতে স্বয়ম্ভুর রিভলভার। গুলিটা ছুটে এলে স্বয়ম্ভুর বক্ষ ভেদ করতে বেশি সময় লাগবে না। লোকটি স্বয়ম্ভুর দিকে রিভলভার তাক করেই উঠে দাঁড়ায়। স্বয়ম্ভু দু-হাত ওপরে তুলে সুযোগ খুঁজতে থাকে। ‘ভুল করছেন। বাইরে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। এক পা-ও এখান থেকে পালাতে পারবেন না।’

স্বয়ম্ভু বলল। লোকটা কি মাস্কের আড়ালে হাসল? কিন্তু কেন? সে কি ধরে ফেলেছে স্বয়ম্ভুর উপর চালাকি। সত্যিই তো কেউ নেই বাইরে। স্বয়ম্ভু একাই এসেছে। কী করবে স্বয়ম্ভু? হাতে আর কোনও অস্ত্র নেই। লোকটা হ্যামার টানল। স্বয়ম্ভু মগজ বলল, লোকটা কথা না বাড়িয়ে এখুনি সব শেষ করতে চলেছে। লোকটার আঙুল ট্রিগার স্পর্শ করে। সঙ্গে সঙ্গে একটা গুলি ফাঁকা কারখানাটার করাল ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। স্বয়ম্ভু স্থির। লোকটাও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু পরক্ষণেই কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে লোকটা। রিভলভারটা মাটিতে পড়তেই একটা ধাতব শব্দ হয়। স্বয়ম্ভু দৌড়ে যায়। বিস্ময়ের অন্ত পায় না স্বয়ম্ভু। কে গুলি করল? ওর দলের লোক? না না, সে স্বয়ম্ভুকে বাঁচাবে কেন? নাকি এই ছেলেটি ধরা পড়লে সর্বনাশ হত বলে শেষ করে দিতে চাইল! যন্ত্র ও হাজারও আবর্জনার অন্ধকার ঠেলে বেরিয়ে আসে একটা অবয়ব। বাইরের হালকা আলোয় চিনতে পারে স্বয়ম্ভু। দুটো হাতে ধরা রিভলভারটা এখনও তাক করা মাটির দিকে।

‘শিবাঙ্গী তুমি? তুমি এখানে কী করছ?’

স্বয়ম্ভু আকাশ থেকে পড়েছে।

‘কৌশিকের মুখ থেকে যখন শুনলাম যে স্ট্রং লিড পাওয়া সত্ত্বেও আপনি পুলিশকে চলে যেতে বলেছেন তখনই বুঝেছি, আপনি একাই অ্যাকশনে যাবেন। তাই আমি একবার চান্স নিয়েই নিলাম।’

স্বয়ম্ভূ বাকি কথা বলার আগে লোকটার মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। কেমন দেখতে, সে আদৌ চেনে কিনা কিচ্ছু খেয়াল করে না। সবার আগে নাকের সামনে হাত রাখে। বুকে কান পাতে। কোথাও এতটুকুও স্পন্দনের ইশারা পেলে এখুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু নাহ! আর সম্ভব নয়। চোয়াল শক্ত করে উঠে দাঁড়ায় স্বয়ম্ভু। দু-চোখে আগুন নিয়ে শিবাঙ্গীর দিকে তাকায়। এমন আগুন চোখে শিবাঙ্গীর দিকে কোনওদিন তাকায়নি স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী আর ওই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না। চট করে চোখ নামিয়ে ফেলে। কোনও প্রশ্নের আগেই বলতে শুরু করে, ‘সাফাই দিচ্ছি না স্যার। আমি জানি একটা বড়ো সাক্ষীকে আমরা হারালাম। কিন্তু আর এক মিলি সেকেন্ড দেরি হলে ও আপনাকে…!’ হাঁফিয়ে ওঠে শিবাঙ্গী। চোখ তার ভারী হয়ে ওঠে।

‘আমার জীবনের থেকেও অনেক বেশি দামি ছিল সেই মহিলাদের বাঁচানো যারা স্বামীর অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেও মুখ বুজে থেকেছে যাতে বাঁচতে পারে। কিন্তু একটা জঘন্য লোক তাদের বাঁচতে দিচ্ছে না।

‘এ যে সেই লোক নয় সেটা আপনি ভালো করেই জানেন স্যার। এ শুধুমাত্র ওই লোকের সহকারী। যাকে ধরাটা ভীষণ জরুরি আর সেটা আপনি ছাড়া সম্ভব নয়।’

‘ভুল করছ শিবাঙ্গী। আমাদের কাজে আবেগের কোনও জায়গা নেই। আনকনশাস মাইন্ডে তুমি আমাকে হিরো বানিয়ে দিচ্ছ, যেটা আমি নই। আমাদের ডিপার্টমেন্টে

আরও অনেকে আছে।’

‘কিন্তু আমার তো আপনিই…’

ঝড়ের বেগে কথাটা মুখ ফসকে বলেই থেমে গেল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভুও আচম্বিতে থমকে যায়। কোন কথা বলতে চাইছে শিবাঙ্গী?

‘মাসির জীবনে আর কে আছে আপনি ছাড়া? তা ছাড়া অ্যাকশন গ্রাউন্ডে টিমের প্রত্যেকে একে অপরের পাশে থাকব, আপনিই তো বলেন। আমি তো শুধু আমার টিম মেম্বারের জীবন বাঁচিয়েছি। এতে যদি আমায় সাসপেন্ড হতে হয়, করে দিন।’

সম্পূর্ণ অন্য দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে গেল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভুর গলার উত্তেজনা হারিয়ে গেল। বলল, ‘একটা অনেক বড়ো প্রমাণ বোবা হয়ে গেল শিবাঙ্গী।’ শিবাঙ্গী হঠাৎ বিশেষ একটি দিকে হাঁটতে আরম্ভ করল। লোকটার ল্যাপটপটা তুলে স্বয়ম্ভুর দিকে বাড়িয়ে দিল। এত কিছুর মধ্যে স্বয়ম্ভুর মাথা থেকে এই ল্যাপটপের কথাটাই বেরিয়ে গিয়েছিল। ‘প্রমাণ এখনও আছে স্যার’ আলো চলকে উঠল স্বয়ম্ভর অন্ধচোখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *