ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ২

অস্তরাগের আলোয় লাল হয়ে রয়েছে নদীপাড়ের আকাশ। ঘরে ফিরছে ক্লান্ত পাখির দল। ইছামতীর চরের এই পাশটায় কক্ষনো আসেনি লাল্টু। ভয় করত। বাবা বলেছিল, এ পারে নাকি অনেক আত্মারা ঘুরে বেড়ায়। বাচ্চা ছেলেমেয়েদের একলা পেলেই তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু আজ সেই বাবার জন্যেই সব ভয় ভেঙে ছুটে আসতে হল লাল্টুকে। কাঠ সাজানো বিছানাটায় বাবাকে শুইয়ে দিল গাঁয়ের কাকা-জ্যাঠারা। তারপর ছোট্ট লাল্টুর হাতে একটা জ্বলন্ত মশাল ধরিয়ে বলল, ‘নে, এবার বাপের মুখে আগুন দে।’ আঁতকে উঠেছিল বেচারা। কিছুতেই আগুন দেবে না সে। সব্বাই বোঝাল, এমন করতে নেই বাবা। ছেলে হয়ে বাপের মুখে আগুন না দিলে নিশীথ নাকি স্বগগে যেতে পারবে না। মেয়েদের শ্মশানে আসতে নেই। কিন্তু লাল্টুর ছোটোপিসি এসেছে। কীই বা করবে? সে ছাড়া তো লাল্টুর আর কেউ নেই। বড়ো পিসি বাড়িতেই কেঁদেকেটে অজ্ঞান হয়ে গেছে ভাইয়ের চলে যাওয়ায়। একমাত্র শক্তপোক্ত ছোটোপিসি। পিসেমশাইয়ের হাতে চ্যালাকাঠের বাড়ি খেয়ে-খেয়ে এক্কেবারে পেটানো চেহারা হয়ে গেছে তার। নামেই পিসেমশাই! শ্যালক মরতে বউকে পাঠিয়েই খালাস। সে নিজে এ তল্লাট মাড়ায়নি পর্যন্ত। তাই বাধ্য হয়েই লাল্টুর ছোপ্পিকে আসতে হয়েছে। সেও আঁচলে চোখ-নাক মুছতে মুছতে ভাইপোকে বোঝাল। জ্বলন্ত পাটকাঠি ধরা দশ বছরের ভাইপোর হাতটা ধরে ছোটোপিসিই মৃত দাদাকে প্রদক্ষিণ করে মুখে আগুন দিয়েছিল। লাল্টু পিসির আঁচলের আড়ালে দাঁড়িয়েই দেখল নিষ্ঠুর ডোমগুলো কী নির্মমভাবে ওর বাবার নিথর দেহটাকে পিটিয়ে পিটিয়ে শুইয়ে দিচ্ছে। ছোটোপিসি লাল্টুর চোখ চেপে ধরছে বারবার। এই নৃশংস দৃশ্যগুলো কিছুতেই সে তার ভাইপোকে দেখতে দিতে চায় না।

বাবার চিতা যখন নিভে গেল। একে একে শ্মশানযাত্রীরা ফিরে গেল। ছোট্ট লাল্টু অস্থি ভাসিয়ে তখনও চিতার পোড়া কাঠের পাশে বসে বুঝতে পারছিল না, বাবার অত বড় শরীরটা কীভাবে চোখের সামনে ছোট্ট একটা কলসির মধ্যে ঢুকে গেল। মুহূর্তে একটা মানুষ কীভাবে ‘নেই’ হয়ে গেল!

‘এবার চল লাল্টু।’

মরা নদীর মতো নিষ্পাপ চোখদুটো তুলে তার ছোপ্পির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘কোথায় ছোপ্পি?’ সরু হাতদুটো দিয়ে আদরের ভাইপোটাকে বুকের কাছে জাপটে নিল ছোটোপিসি।

***

‘স্যার ফোন করেছিলেন?’

গলাটা বেশ ভারী শোনালো শিবাঙ্গীর।

‘আরে ফোন তো দেখলাম তুমি করেছিলে। তুমি কোথায় এখন?’

শিবাঙ্গীর ফোন না পেয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিল স্বয়ম্ভু। বেশ অনেকক্ষণ পর শিবাঙ্গীর ফোন আসাতে প্রায় হামলে পড়ে বিছানা থেকে ফোনটা তোলে।

‘বাড়ি ফিরছি স্যার। পারলাম না আমি।’

শিবাঙ্গীর যে চোখ ভারী হয়ে এসেছে সেটা ফোনের এপার থেকেই আঁচ করতে পারল স্বয়ম্ভু।

‘কী হয়েছে? খুলে বলো।’

‘বিট্টু দেবনাথ।’

নামটা শুনেই কুঁচকে থাকা কপালটা টানটান হয়ে যায়। এই নামটা শুনবে বলেই আশা করেছিল স্বয়ম্ভু।

‘কোথায় সে?’

‘সালকিয়ার একটা এঁদো গলির মধ্যে গা ঢাকা দিয়েছিল। খোচর আপনাকে না পেয়ে আমায় জানায়।’

‘কালু?’

‘না স্যার, রহমত।

‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ। তারপর?’

‘আমি আপনাকে ট্রাই করি। দেখলাম সুইচড অফ।’

‘হ্যাঁ! কীভাবে যে বন্ধ হল বুঝলাম না। এদিকে ফোনে ফিফটি পার্সেন্ট চার্জ ছিল। যাই হোক, তারপর?’

‘আমি গোলাবাড়ি থানাকে ইনফর্ম করি। ওরা বিট পেট্রলিংয়ে যারা ছিলেন তাদের বলে দেন। আমি পৌঁছোবার আগেই ওখানকার থানা থেকে লোক পৌঁছে যায়। ডেরাটা ঘিরে ফেলে। আমার পৌঁছোতে পঞ্চাশ মিনিট মতো লাগে। তার আগেই খবর পাই বিট্টু কীভাবে যেন খবর পেয়ে পালিয়েছে। কোনদিকে গেছে সেটা ডিউটি অফিসার জানাতেই আমি গাড়ি রেখে দৌড়োই। কারণ ওদিকে এত গলি গাড়ি ঢুকবে না। ধরেও ফেলেছিলাম। কিন্তু এ ভয়ানক ধুরন্ধর। হঠাৎ করে আমার চোখে জল ছিটিয়ে রেললাইন টপকে ভেগে গেল শালা। আর মালগাড়িটা আসারও সময় পেল না। ঠিক ওই সময়েই…!’

‘খেয়েছ?’

অত্যন্ত নরম স্বরে প্রশ্নটা করল স্বয়ম্ভু। এই সময় এমন আদুরে প্রশ্নে প্রথমটায় একটু হকচকিয়ে গেল শিবাঙ্গী। পরক্ষণেই বুঝল স্বয়ম্ভুর প্রশ্নের ইঙ্গিত। উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ স্যার। একটা ঘুষি।’

‘মাত্র? অবিশ্যি সক্কাল সক্কাল হালকা খাবারই ভালো। আর তুমি কী খাওয়ালে?’

‘অত সকালে দোকান খোলেনি তাই ভালো কিছু পাইনি। ওই পেটে আর তলপেটে কয়েকটা ঘুষি। তারপর চুলের মুঠি ধরে…’

‘চুলের মুঠি? কেন? গায়ে জামা ছিল না?’

‘না স্যার, স্যান্ডো গেঞ্জি।’

‘হুমমমম!’

স্বয়ম্ভুর দীর্ঘশ্বাস। ‘তা গলায় এত আপশোসের সুর কেন?’

‘কী বলছেন স্যার? হাতের মুঠোয় পেয়েও কিচ্ছু করতে পারলাম না।’

‘দোষটা তোমার নয়। দোষটা আমাদের সবার ভাবনা চিন্তার। তুমি তোমার জায়গা থেকে একদম রাইট টাইমে রাইট অ্যাকশন নিয়েছ। ভুলটা করেছি লোকটাকে ছোটোখাটো অপরাধী ভেবে। আসলে লোকটি মহা ঘোড়েল।’

‘অসম্ভব ভালো দৌড়োয়। আমাদের জান বের করে দিয়েছে। উপস্থিত বুদ্ধি সাংঘাতিক, যেটা পাক্কা খেলোয়াড় না হলে হয় না।’

‘পাশের বাড়ির বউদিকে ওইরকমভাবে মেরে যে এতদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে সে আমাদের ডিপার্টমেন্টকে ভালোই জ্বালাবে।

নাকে একটা গন্ধ এসে লাগতেই পিছন ঘুরে স্বয়ম্ভু দেখে সুচিত্রা কখন এসে সারা ঘরে ধূপ ঘোরাচ্ছে। ‘আচ্ছা শোনো, তুমি বাড়ি যাও রেস্ট করো। বাকিটা আমি দেখছি। আর ভেরি সরি।’

‘কেন স্যার?’

‘আমার ফোনটা খোলা থাকলে তোমার এত হয়রানি হত না। এত বিপদে পড়তে হত না।’

মায়ের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো একটু জোরের সঙ্গেই বলল স্বয়ম্ভু। খেয়াল করল পিছন ফিরে ধূপ ঘোরাতে ঘোরাতে সুচিত্রার হাতটা থেমে গেছে। তারপর হাতটা ওপর থেকে নীচে নেমে এল।

‘বাই।’

ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্বয়ম্ভূ সুচিত্রার উদ্দেশে বলে, ‘কিছু বলবে মা?’ সুচিত্রা যেন একমনে ঠাকুর ডাকছিল এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল। ছেলের কথায় চটক ভাঙল এমন ভান করে স্বয়ম্ভুর দিকে ঘুরল। কিন্তু ঘাবড়ে যাবার চিহ্নমাত্র নেই। ধূপ ঘোরাতে ঘোরাতে উত্তর দিল সুচিত্রা, ‘কী আবার বলব? আজকে একটা শুভদিন। সেদিনও সকাল হতে না হতেই একে খুন, তাকে খুন। এর বিপদ তার বিপদ! যতসব! কার আবার বিপদ হল শুনি?’

এই শেষ কথাটাই আসল, স্বয়ম্ভু জানে। চোখের কোনায় চলকে ওঠা ফিচেল হাসিটা লুকিয়ে উত্তর দিল, ‘শিবাঙ্গীর!’

আঁতকে উঠল সুচিত্রা। ‘মানে? কী হয়েছে ওর?’

‘রাত তিনটে থেকে একটা দাগি খুনির পিছনে সকাল অবধি দৌড়োতে হয়েছে ওকে। খুনিটা একসময় ওর ওপর চড়াও হয়। মাথায় মারে। গলা টিপে ধরে। আরও অনেক কিছু…!’

‘কী বলছিস? অনেক কিছু মানে?কী করেছে?’

সুচিত্রা প্রায় কাঁদো কাঁদো। যতই হোক। সইয়ের মেয়ে বলে কথা। আলাদা একটা স্নেহ তো আছেই মেয়েটার ওপর। স্বয়ম্ভূ রসিয়ে রসিয়ে বলে ওঠে, ‘মানে অনেক কিছু করতে চেয়েছিল। চপার দিয়ে গলা কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিল।’

‘ও মা গো, এ কী সব্বোনাশ!’

আঁচল মুখে চেপে ভয়ে কাঁপতে থাকে সুচিত্রা। স্বয়ম্ভু বোঝে ডোজটা একটু বেশিই পড়ে যাচ্ছে। তাই গলা নরম করে বলে, ‘এগুলো হতে পারত। হয়নি। পুলিশ এসে ওকে রেসকিউ করেছে।

সুচিত্রা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। পরক্ষণেই তড়পে ওঠে, ‘তা মেয়েটাকে এই বিপদের মধ্যে পাঠিয়ে তুই পেছন উলটে শুয়ে পড়ে রইলি? একবার যেতে পারলি না?’

‘কী করে যাব মা? শিবাঙ্গী আমায় খবর দিতে দশবার ফোন করেছিল। কিন্তু আমার ফোনটা তো বন্ধ। ফিফটি পার্সেন্ট চার্জ থাকা সত্ত্বেও! অদ্ভুত! আজ ফোনটা খোলা থাকলে শিবাঙ্গীর এত বড়ো বিপদ হত না।’ বেগতিক বুঝে সুচিত্রা চোখ নামিয়ে ধূপ ঘোরাতে থাকে। খানিকটা তুতলিয়ে বলে, ‘তত… তা অত রাতেই বা গুন্ডা ধরতে যাবার কী ছিল? একটু পরেই তো সকাল হত।’

‘ঠিক কথা। গুন্ডার তো সকাল অবধি ওয়েট করার কথা ছিল সেই বা করেনি কেন?’

ছেলের দিকে একবার অপাঙ্গে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যায়। ছেলেই পেছন থেকে ডাকে, ‘শোনো মা।’ সুচিত্রা ঘুরে তাকায়। ‘আজকের পর থেকে খবরদার তুমি আমার ফোনে হাত দেবে না। সুচিত্রা কোনও উত্তর দেয় না। ভালোই বোঝে কী সর্বনাশ করে ফেলেছে। ছেলে আবার ডাকে, ‘আরেকটা কথা।

আবারও ঘাড় ঘোরানো পুতুলের মতো ঘুরে তাকাল সুচিত্রা। ছেলে বলল, ‘মহালয়ার সঙ্গে দুর্গাপুজোর কোনও লিঙ্ক নেই। তাই এটা কোনও শুভদিন নয়। অশুভও নয়। তবে পুণ্যের দিন বলা যেতে পারে। কারণ এই দিনে পিতৃপুরুষদের জলদান করা হয়। আর তেনারা স্বর্গ থেকে নেমে এসে চুকচুক করে জল খেয়ে আশীর্বাদ করে কেটে পড়েন।’

‘তোর বাবা আর আমার কপালে তো সেটুকুও জুটবে বলে মনে হয় না। হুঁ! বেশি জান্তা!’

এতক্ষণ ধরে ছেলে ঠুকছিল। এবারে সুযোগ বুঝে মোক্ষম পেরেক ঠুকে দিয়ে ঘর ছাড়ল মা। এ ব্যাপারে সত্যিই ছেলে নিরুত্তর। তর্পণ-টর্পণ করা যে স্বয়ম্ভুর ধাতে নেই সে কথা ভালোই জানে সুচিত্রা। আজ অবধি ছেলেকে দিয়ে অষ্টমীর অঞ্জলিটুকু দেওয়াতে পারল না। স্বয়ম্ভূ নাস্তিক নয় তবে অতি আস্তিকও নয়। স্বয়ম্ভুর কখনও মনে হয় ভগবান আছেন, আবার কখনও মনে হয় নেই। আসলে জীবন যখন যেমন দেখায় স্বয়ম্ভুও তখন তেমন করেই জীবনটাকে দেখে।

সরু, চ্যাপ্টা, কালো মুখ। নীচের ঠোঁটটা ওপরেরটার তুলনায় একটু মোটা। এক মাথা ঠাস ঢেউ খেলানো চুল। বেশিরভাগ সময়েই বেঁধে রাখে। খোলা রাখলে এমন ঝাঁকড়া হয়ে ফুলে থাকে যে মন্দাকিনীর মুখটা আরও প্যাকাটির মতো দেখতে লাগে। গলার স্বরে বেশ জোর আছে মেয়েটার। সাত সকালে গাংশালিকের খাঁচায় খাবার দিতে দিতে গলা ছেড়ে গান গাইছে মন্দাকিনী। গাওয়া উচিত ছিল রাম তেরি গঙ্গা মইলি। কিন্তু সেটা না গেয়ে গলা উঁচিয়ে গাইছে ‘ময়না বলো তুমি…’

‘কৃষ্ণ রাঁধে।’

ঠাকুরের নামটা শালিক পাখির মুখ দিয়ে বেরোল। মন্দাকিনী গাইল, ‘তাকে মন দিতে যে চাই…’ শালিক বলল, ‘কেমন বাঁধে!’

এই কারণেই প্রত্যেকদিন গান গায় মন্দাকিনী। খুব মজা লাগে ওর। যে যা বলে এই শালিক সেগুলোই উগরে দেয়। মগজের হার্ড ডিস্কেও বেশ ভালো স্পেস তার। তাই মনেও রাখে অনেক কিছু। মন্দাকিনীর বেসুরো গলার গান বেশ খানিকক্ষণ চলার পর ঘরের ভেতর থেকে আরও একটা গলা প্রবল গর্জনে তেড়ে আসে, ‘থামবি তুই? কতদিন বলেছি এ সব ভুলভাল জিনিস শেখাবি না। দূর করে দেব।’ মন্দাকিনী এক ঝলক ঘরের দোরের ঝুলন্ত পর্দার দিকে দৃষ্টি হেনে জনৈকর উদ্দেশে মুখ ব্যাঁকাল। সেও পালটা গলা তুলল, ‘পাখিটাকে তো ঠাকুরের নাম শেকাচ্ছি। তাও সহ্য হচ্ছে না?’

‘দরকার নেই অমন ঠাকুরের নাম শেখানোর। যতসব বাচালে গান।’

‘তোমার মতো রসকষহীন বুড়ো আমি একটাও দেকিনি।

‘মুখে নুড়ো জ্বেলে দেব মন্দাকিনী।’

এবারেও ঘরের ভেতর থেকেই কথাখানা উড়ে এল। শালিকও সঙ্গে সঙ্গে, ‘গুঁড়ো দেঁব, পুঁড়ো দেঁবঁ’ বলে ওঠে।

‘বা বা! কী ভালো শিক্ষেই পেল। যেমন মাস্টার তেমন তার পাখি।’

মন্দাকিনী রাগ দেখিয়ে পা ঠুকে খাঁচার সামনে থেকে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শালিক বলে ওঠে, ‘রাঁগ কঁল্লি, রাগ কঁল্লি?’ মন্দাকিনী সরু ঘাড়টাকে বেঁকিয়ে ছদ্মরাগে চোখ পাকায়, ‘মরণ!’

কনফারেন্স রুমের অন্ধকারে প্রোজেক্টরে ঝলসে উঠছে লাশের ছবি। রিমোটের নিয়ন্ত্রণ স্বয়ম্ভু সেনের হাতে। লম্বা টেবিলটার সামনের সিটেই বসে আছেন ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের জয়েন্ট সিপি শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। মুখটা ভার। কান দুটো খাড়া করে শুনছেন স্বয়ম্ভুর কথা।

‘লক্ষ্মীরানি মণ্ডল। বয়স বত্রিশ। উচ্চতা চার ফুট নয় ইঞ্চি। কবরডাঙা বস্তিতে থাকত। লোকের বাড়ি ঠিকে কাজ করত। বাড়িতে রাজমিস্ত্রী স্বামী আর শাশুড়ি। নিঃসন্তান।

স্বয়ম্ভূ রিমোটে চাপ দিতেই পরের স্লাইড ভেসে ওঠে যেখানে লক্ষ্মীরানির পাশে দেখা যায় তার স্বামীকে। গায়ের রং কালো, মোটা গোঁফ, গালে কাটা দাগ আছে।

‘শম্ভু মণ্ডল। প্রতি রাতে নেশা করে বউ পেটাত। তাতে ইন্ধন জোগাত তার মা।’ আবার রিমোট টিপতেই লক্ষ্মীরানি ও শম্ভুর পাশে ফুটে ওঠে জাঁদরেল এক বুড়ির ফটো। ‘কান্তা মণ্ডল।’ চুপচাপ কনফারেন্সটা জয়েন্ট সিপির কণ্ঠে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। ‘এরাই কি লক্ষ্মীরানির মৃত্যুর কারণ?’

‘স্যার, সেটা এখনও প্রমাণিত নয়। কারণ যেদিন রাতে লক্ষ্মীরানি মার্ডার হয় সেদিন স্বামী আর শাশুড়ি মিলে খুবই অত্যাচার করে বউটার ওপর। মারলে তখনই মারতে পারত। কিন্তু সেটা হয়নি। ভোর রাতের দিকে লক্ষ্মী যখন ঘুম থেকে ওঠে বাইরে বাথরুমে আসে তখনই খুনটা ঘটে। শম্ভু আর কান্তার দাবি তারা নাকি তখন ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন। দুটো বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য, খুনি পিছন থেকে লক্ষ্মীরানির গলায় ছুরি চালায়। ছুরিটা লক্ষ্মীর গলার ডানদিক থেকে বাঁদিকে আসে।’

‘খুনি বাঁ হাতি!’

‘ইয়েস স্যার। আরেকটা জিনিস, লক্ষ্মীরানির শাড়ির আঁচলে প্রায় হাজার দেড়েক টাকা পাওয়া যায়।’

‘সে হয়তো কোনও সময় আঁচলে বেঁধে রেখেছিল।’

‘হতে পারে। কিন্তু স্যার, মাসের শেষে কোনও বাড়িতেই মাইনে দেয় না। লক্ষ্মীরানির সংসারের যা অবস্থা তাতে মাসের শেষে দেড় হাজার টাকা মানে অনেক। ধরে নিলাম সে জমিয়েছিল। তাহলে সে জমানো টাকা আঁচলে বাঁধবে কেন?’

‘সো, হোয়াট ডু ইউ থিংক? ওয়াজ লক্ষ্মীরানি ট্রাইং টু এসকেপ?’

‘সেটার সম্ভাবনাই বেশি।’

‘হুম!’

‘শাশুড়িকে আমরা ছেড়ে দিয়েছি। কারণ উনি ডান হাতি। তা ছাড়া শাশুড়ির পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। কারণ উনি নিজে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারেন না। লক্ষ্মীর গলা পর্যন্ত হাত তো পৌঁছোবেই না উপরন্তু গায়েও অত শক্তি নেই। ছবিটা যদিও এর ঠিক উলটো। আর শম্ভুর পক্ষে সম্ভব হলেও সেও ডান হাতি। বাঁ হাতে এত নিখুঁতভাবে এক টানে ক্যারোটিড আর্টারি কাটা ইম্পসেবল।’

‘মোটিভ?’

‘লক্ষ্মীর ওপর অত্যাচার করত এটা স্বীকার করেছে। শম্ভুর রেকর্ড চেক করা হয়েছে। মদ খাওয়া ছাড়া বাইরে কোথাও কোনও অসামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যোগাযোগ পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া কথাতেও কোনও অসঙ্গতি নেই। সার্চ অ্যান্ড সিজারেও বিশেষ কিছু মেলেনি। এমনকি ভিক্টিমের হয়ে কেউ এদের নামে এফ আই আর-ও করেনি। তাই শম্ভুকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।

‘তোমরা শিওর যে ও বাইরে কাউকে দিয়ে খুন করায়নি।

‘সেই কারণেই শম্ভুর ওপর নজর রাখা হয়েছে স্যার। তবে এখনও সেরকম কিছুই পাওয়া যায়নি। নিয়মিত কাজে যায় সময়মতো। ফিরেও আসে। তবে আজকাল মদের ঠেকে আর যাচ্ছে না। ঘরে এসে মদ খায়।’

‘কেন?’

‘হয়তো ভয় পেয়েছে বা এই খুনের কেসে ফেঁসে গেছে বলে কেউ ওর সঙ্গে আড্ডা দিতে চায় না। অর্থাৎ এই অত্যাচার আর পালিয়ে যাবার মাঝে স্বামী ও শাশুড়ি ছাড়া কেউ তো আছে।’

‘হুম। নেক্সট।’

জয়েন্ট সিপির সঙ্গে এসিপি, ডিসিপি ও স্পেশ্যাল কমিশনার অফ পুলিশ বসে আছে। রয়েছে সি আই ডি অফিসার। এদের মধ্যেই চুপ করে বসে শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু যত কেসগুলোর ভিতরে প্রবেশ করছে শিবাঙ্গীর বুকটা তত ভারি হয়ে উঠছে। পাশে বসে থাকা আরেক সহকর্মী এস আই রাজারাম স্বয়ম্ভুর কথার ফাঁকে-ফাঁকে শিবাঙ্গীর মুখের পেশির নড়াচড়া লক্ষ করছে। এস আই কৌশিকের নজর অবশ্য প্রোজেক্টরে।

‘শান্তি দাস। যাদবপুর রেলস্টেশনের কাছে ভাড়া থাকত। আয়ার কাজ করত। বাড়িতে স্বামী আর দুই মেয়ে। স্বামীর নাম দীননাথ দাস। স্টেশনে একটা চায়ের দোকান আছে। এরও একই সমস্যা। গার্হস্থ্য হিংসা। তবে এই দীননাথের আগে পুলিশ কেস ছিল। ঢাকুরিয়ার একটি আনাজওয়ালির সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক হয়। তারপর সেই মেয়েটিই দীননাথের নামে পুলিশে ডায়রি করে শারীরিক অত্যাচারের। তখন ঢাকুরিয়া থেকে এদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়। যাদবপুরে এসে বাড়ি ভাড়া নেয়। খুনের আগের দিন স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া এবং তার পরের দিন কাজ থেকে ফেরার পথে বাড়িতে আসার সময় গলিতে খুন হয় শান্তি দাস।

‘মোডাস অপারেন্ডি?’

‘লক্ষ্মীরানি মণ্ডলের খুনেরই রিপিটেশন। শুধু লক্ষ্মীরানি ভোর রাতে ওদের বস্তির কমন টয়লেটে যেতে গিয়ে খুন হয়। আর এ রাত সাড়ে নটার সময় বাড়ির সামনের গলিতে।’

‘লোক ছিল না?’

‘ওই গলিতে লোক কমই থাকে। বেশ কয়েকটা বাড়ি গায়ে গায়ে তৈরি হয়ে একটা গলির মতো রাস্তা তৈরি হয়েছে। ফেরার সময় শর্টকাট হবে বলেই শান্তি ওই রাস্তা দিয়ে ফিরত।’

‘খুনি যদি একজনই হয় তাহলে মোটিভ কী? এরও তো অবস্থা খুব একটা ভালো নয় যে টাকাপয়সার জন্য মার্ডার হবে।

‘এটাই অদ্ভুত স্যার। এক্ষেত্রে যেহেতু এর হাজব্যান্ড দীননাথের নামে অলরেডি

একটা এফ আই আর দায়ের হয়েছে তাই একে কোর্টে তোলা হয়েছে। কেসটায় এখনও পর্যন্ত একটাই হিয়ারিং হয়েছে।’

‘তুমি কি পার্সোনালি দীননাথের সঙ্গে কথা বলেছ?’

‘নো স্যার।’

‘কেন?’

স্বয়ম্ভূ এবার যেন একটু সংকোচ নিয়েই বলে, ‘আসলে সবেমাত্র এই কেসগুলো আমার হাতে এসেছে স্যার। এবার এক এক করে সবার সঙ্গেই কথা বলব!’

‘সেটা যত তাড়াতাড়ি হয় আমাদের জন্য ততই মঙ্গল। সামনেই পুজো। ‘শিওর স্যার।’

‘নেক্সট।’

‘শান্তি দাসের খুনের সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সোনারপুরে এই একইভাবে আরেক মহিলা মার্ডার হয়েছেন যার নাম বীণা সাহা। তিনিও বিবাহিতা। বেশ স্বচ্ছল ঘরের মেয়ে। বেলেঘাটায় এডফাইন্স নামক একটি কোম্পানিতে জব করতেন। মেনলি লেদারের ব্যাগ এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট হয়। ইনিও গার্হস্থ্য হিংসার শিকার। তার হাজব্যান্ডের সঙ্গে ডিভোর্সের মামলাও চলছে এবং সেটা একেবারেই মিউচুয়াল নয়।’

‘মানে সোনারপুরে বাপের বাড়ি?’

‘না স্যার। বাপের বাড়ি রাজপুরে। বীণা তার বর্তমান প্রেমিকের সঙ্গে থাকতেন। লাভ ম্যারেজ করেছিলেন বলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিল না।’

‘খুনটা কে করেছে বলে ধারণা? স্বামী?’

‘জেরায় এখনও কিচ্ছু স্বীকার করানো যায়নি। আশপাশে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এই প্রেমিক মানুষটি নাকি মেয়েটার ওপর মেন্টাল টর্চার করত। যদিও প্রেমিক ছেলেটি এ কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।

‘আশপাশের লোক জানল কী করে? চিৎকার চ্যাঁচামেচি হত নাকি?’

‘মেয়েটিই কাউকে একটা বলেছিল। তারপর সেটাই রাষ্ট্র হয়ে যায়।’

‘টকের জ্বালায় পালিয়ে এসে তেঁতুলতলায় বাস।’

ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্টেরই আরেক পদাধিকারী কথাটি বলে উঠলেন। শুভঙ্কর হাসলেন না। শুধু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘কী নিয়ে মেন্টাল টর্চার?’

‘প্রেমিক ছেলেটি মানে সৈকত দত্তের চাকরি চলে যায়। তারপর প্রতিদিন বীণার কাছ থেকে টাকা চাইতে থাকে। প্রথম প্রথম মেয়েটি টাকা দিলেও পরে যখন বুঝতে পারে এটাই ছেলেটির স্বভাব তখন টাকা দিতে অস্বীকার করে। তারপর থেকেই ছেলেটি তাকে ছেড়ে যাবার হুমকি দেয়। বীণা ভেঙে পড়ে। তখনই পাড়ার এক মহিলার কাছে গিয়ে তার দুঃখের কথা বলে ফেলে।’

‘এর কাছে পড়ে থাকার কী ছিল তাহলে?’

‘ভালোবাসা। বীণা পাগলের মতো এই ছেলেটিকে ভালোবাসত। তা ছাড়া ছেড়ে যাবে কোথায়? স্বামীর অকথ্য অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে প্রেমিককে আঁকড়ে ধরল। কিন্তু সেই প্রেমিকও মানসিক নির্যাতন শুরু করল। বাপের বাড়ির দরজা ও বন্ধ।’

বন্ধ কনফারেন্স রুমটায় জড়ো হওয়া পুরুষগুলোর বুক থেকেও একটা চাপা শ্বাস নিজেদের অজান্তেই বেরিয়ে এল।

‘ছেলে মেয়ে?’

প্রশ্নটা এসিপি নন্দন উপাধ্যায় করলেন।

‘নেই। একবার মিস ক্যারেজ হয়েছিল।’

কথাটা বলতে বলতেই রিমোট টিপে বীণার ডেডবডির ছবিটা সামনে আনল স্বয়ম্ভু। চোখ দুটো খোলা। তবে আগের দুজনে ঘটনাস্থলে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কিন্তু বীণা চিৎ হয়ে পড়ে আছে এবং গলায় আঘাতের সঙ্গে নাক দিয়েও রক্তক্ষরণ হয়েছে।

‘ভিক্টিম মার্ডারারকে দেখেছিল?’

ছবিটা দেখেই বললেন শুভঙ্কর। স্বয়ম্ভু উত্তর দিল, ‘সম্ভবত। তাই এর গলায় ধারালো অস্ত্রটা বাঁদিক থেকে ডানদিকে চলেছে। ধস্তাধস্তিও হয়েছিল। তাই নাক দিয়ে রক্ত। আর এই পুরোটা ঘটে রাত সাড়ে দশটা থেকে পৌনে এগারোটার মধ্যে। বীণা অফিস থেকে ফিরছিল কারণ বীণার অফ ডে ছিল বৃহস্পতিবার। আর ছবিতে যে সিঁড়িটা দেখছি সেটাই ওদের বাড়ির এন্ট্রি।’

‘ছেলেটি কোথায় ছিল?’

‘বাড়িতেই। ওয়েব সিরিজ দেখছিল। বীণার গলার আওয়াজ পেতেই বাইরে এসে দেখে খুন হয়ে পড়ে আছে। মেয়েটির মা-বাবা হাজব্যান্ডের নামে এফ আই আর করেছেন। কিন্তু হাজব্যান্ড অ্যান্টিসিপেটরি বেল পেয়ে যায়। সৈকতের নামে কেউ কমপ্লেন করেনি।’

‘ওয়েপন অফ অফেন্স?’

‘কোনও খুনেই ট্রেস পাওয়া যায়নি। তবে ফরেন্সিক রিপোর্ট অনুযায়ী ধারালো ছুরি জাতীয় কিছু।’

‘নেক্সট?’

স্বয়ম্ভুর তৎপরতায় নতুন ভিক্টিমের ছবি ফুটে উঠল। তবে এর পরিচয় স্বয়ম্ভু দেবার আগেই শুভঙ্কর বলে উঠলেন, ‘সুমিতা ধর। পিকনিক গার্ডেন। হাউজ ওয়াইফ। পাড়ার এক ভাড়াটের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক। মধ্যরাতে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে খুন হয়ে যায়। একেও কি স্বামী মারধর করত?’

‘হ্যাঁ স্যার। মারধরের মাত্রা এমন ছাড়িয়ে গিয়েছিল বাঙ্গুরে অ্যাডমিট হয়েছিল। হাজব্যান্ড সাগর ধর মুখ খোলেনি। যথারীতি খুন অস্বীকার করে এবং সব দোষ প্রেমিক বিট্টু দেবনাথের ওপর দেয়।

‘আর বিট্টু দেবনাথ পলাতক। আমরা তাকে ধরেও ধরতে পারিনি এমনই সে সুপারম্যান!’

কথাটার মধ্যে যে একটা খোঁচা আছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না কারও। ঠিক এরকম কিছু শোনার আশঙ্কাতেই ভয়ে কাঁটা হয়ে বসেছিল শিবাঙ্গী। শুভঙ্করের কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকে আড়চোখে একবার শিবাঙ্গীকে মেপে নিল। তার মুখ নীচু। রাজারামের মুখটাও থমথমে। কৌশিক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সরাসরি শিবাঙ্গীর মুখের দিকে তাকাল। কনফারেন্স রুমের কোনও কিছুই স্বয়ম্ভুর দৃষ্টি এড়ায় না। হাল ধরতে বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ স্যার, পলাতক ঠিকই। তবে গত দু-সপ্তাহে আমরা যার টিকিটিও ছুঁতে পারিনি, আমাদের ডিপার্টমেন্টের শিবাঙ্গী বসু কিন্তু অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাকে ধরেছিল। কয়েক ঘাও দিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত লোকটি পালিয়ে যায়। তখনও ধরতে পারত যদি না একটা মালগাড়ি সামনে এসে যেত। খোঁজ এখনও চলছে স্যার আর আশা করি খুব শিগগিরিই আমরা কেসটা সলভ করতে পারব।’

স্বয়ম্ভুর লম্বা বক্তৃতার মাঝে শুভঙ্কর কাঞ্জিলালের বসার ধরনে অনেকরকমের পরিবর্তন হল। প্রথমে বুকের কাছে হাত জড়ো করে বসেছিলেন। তারপর গালে হাত দিলেন, এরপর পায়ের ওপর পা তুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। শিবাঙ্গীর মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। ঘরের অন্ধকারটা শুধু লজ্জাবস্ত্রের মতো শিবাঙ্গীকে আড়াল করে রাখল। সবশেষে শুভঙ্কর বললেন, ‘তুমি নিজে যাওনি কেন? তাহলে হয়তো এতক্ষণে একটা লিড পাওয়া যেত।’ জয়েন্ট সিপির কথায় প্রচ্ছন্ন হয়ে লুকিয়ে থাকা পুরুষ-নারীর ক্ষমতার পার্থক্যটা চোখ ভারী করে তুলল শিবাঙ্গীর। কান দুটো গরম হয়ে গেল।

‘আসলে দোষটা আমার ফোনের ব্যাটারির স্যার। শিবাঙ্গী আমায় ব্যাক টু ব্যাক কল করেছিল। বাট ফোনটা সুইচড অফ হয়ে গিয়েছিল।’

‘চার্জ দাওনি…’

‘ছিল, ছিল স্যার। কিন্তু তা সত্ত্বেও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনও একটা প্রবলেম হয়েছে। তাই… তবে স্যার আমায় না পেয়ে শিবাঙ্গী বসু নিমেষের মধ্যে সাউথ থেকে নর্থে গিয়ে বিট্টুকে ট্র্যাক করেছে। ট্রেনটা না এলে বিট্টু আজ আমাদেরই…’

কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ডিসিপি মণিময় গুপ্ত বলে ওঠেন, ‘লাভটা কী হল? অপরাধী যে পালটা অ্যাকশন দিতে পারে এটা মাথায় রাখা উচিত ছিল। তা ছাড়া ডিপার্টমেন্টে আরও তো এস আই আছে। তাদের জানালেই…’ এবার শিবাঙ্গীর মুখ না খুললেই নয়। অত্যন্ত লজ্জাবনত মুখে ‘সরি স্যার’ বলল শিবাঙ্গী।

আবারও একটা বড়োসড়ো শ্বাস ফেলে শুভঙ্কর জানতে চাইলেন এর পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারে। স্বয়ম্ভু জানাল যে রেললাইন টপকে উধাও হয়ে গিয়েছিল বিটু দেবনাথ। সেখানে তক্ষুনি পাহারা মোতায়েন করা হয়েছে। স্থলপথে আর উধাও হবার জায়গা নেই। জলপথে পালাতে গেলে গঙ্গায় ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ইতোমধ্যেই অতিবাহিত। এখনও বিট্টুর খবর নেই।

‘তোমার কী মনে হয় স্বয়ন্তু, এরকম খুনগুলো কেন হচ্ছে? খুনি টাকাপয়সা গয়নাগাটি কিচ্ছু নিচ্ছে না। শুধু খুন করে চলে যাচ্ছে। আর কাদের খুন করছে? না যারা সবাই অলরেডি ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার। অদ্ভুত! এটা তো কোনও পুরোনো শত্রুতা হতে পারে না।’

‘খুনির মোটিভ এখনও পরিষ্কার নয় স্যার। আরও কিছু তদন্ত না করে বলাটা মুশকিল।’

‘যত তাড়াতাড়ি পারো এর একটা সলিউশন বের কর। এর মধ্যেই কয়েকজন রিপোর্টার এটা নিয়ে ছোটোখাটো রিপোর্ট করেছে। এর বেশি কিন্তু যেন না হয়।’

‘আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট স্যার।’

‘ট্রাই নয় স্বয়ম্ভু। তোমাকেই করতে হবে। ঠিক আগের কেসটার মতো। আমাদের পুরো ডিপার্টমেন্ট কিন্তু তোমার দিকে তাকিয়ে আছে।’

‘শিওর স্যার।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *