ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ৬

রান্নাঘরের সব জানলা খোলেনি বলে ঘরটা মোটামুটি অন্ধকারই আছে। দরজা দিয়ে যেটুকু সকালের আলো এসে পড়েছে তাতেই চটপট কাজ সেরে নেওয়া। ঝুনুর পাশে চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছে লাল্টু। ঝুনুর বুকটা ঢিপঢিপ করছে। কোনওরকমে একটা প্লাস্টিকের টিফিন বক্সে দুটো রুটি আর একটু আলুভাজা পুরে টিনের বাক্সটাতে ভরে দিল। লাল্টুর হাতে টিনের বাক্সটা তুলে দিয়ে বলল, ‘যা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়। বুড়ো বটের থানে খানিক সময় কাটিয়ে ইশকুলে চলে যাবি।’

‘এইভাবে রোজ রোজ চোরের মতো থাকতে আমার ভাল্লাগছে না ছোপ্পি।’

‘কী করবি বল? আমারও কি ভালো লাগছে নিজের বাড়িতে এমন লুকোচুরি খেলতে?’

‘পুলিশের কাছে চ না ছোপ্পি। পিসেমশাইয়ের হাড্ডি জম করে দেবে ওরা।’

‘ছি! গুরুজনদের নিয়ে এমন কথা বলতে নেই।’

‘হুম! গুরুজন না হাতি। পাজি লোক একটা।’

‘পিসেমশাইয়ের ওপর তোর খুব রাগ না রে?’

‘তার থেকে বেশি তোর ওপর। তুই কেন সব মেনে নিস?’

‘পাকামো করিস না। পালা।

সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে ঠিকরে আসা আলোয় একটা মানুষের ছায়া ক্রমে দীর্ঘ হল। থমকে গেল ঝুনু। লাল্টু ভয়ে ভয়ে ঘুরে তাকাল। প্রশান্ত এসে দাঁড়িয়েছে। খানিক পিসি-ভাইপোকে নিরীক্ষণ করে একটা হাই তুলে খুব স্বাভাবিক স্বরেই বলল, ‘ইশকুল যাওয়া হচ্ছে?’ প্রশান্ত রান্নাঘরে ঢুকে এল। ঝুনু হাঁটু মুড়ে বসেছিল। সে সটান দাঁড়িয়ে ভাইপোকে আড়াল করল।

‘ওদের ইশকুলের সুদাম মাস্টার বলছিল। ওই কাল যখন কারখানা থেকে ফিরছিলাম তখন দেখা হল। জিজ্ঞেস করছিল, আমি কেন একটা ইশকুলের ভালো পোশাক কিনে দিই না।’

গলা শুকিয়ে এসেছে ঝুনুর। আঁচ করতে পারছে মেঘ কতটা ঘন হয়ে জমেছে। লাল্টু ছোপ্পির পিছন থেকে এক চোখ বের করে পিসেমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রশান্ত অতীব স্বাভাবিক ও নরম স্বরেই বলে চলেছে, ‘তা আমি তো এ সবের কিছুই জানতাম না। বললাম, ওসব আমার গিন্নি জানে। ওকে শুধোবেন। বলে চলে এসেছি। কী আর বলব বলো? আমার বউ তো আর আমায় মানুষ বলেই জ্ঞান করে না।’

‘আমি তোমায় বলতামই। আসলে তুমি কাজ করে সেই রাতে ফেরো আবার সকাল হলেই…’

‘না না না ঠিইইক আছে। লাল্টু তোমার ভাইপো। তুমি বোঝো গে যাও। আমার ওসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। তা ছেলের মতো যখন লেকাপড়া শিকিয়ে বড়ো কচ্চোই তখন ভালো কথা। ছেলেও বাপ-মায়ের একটু সুরাহা করুক নাকি?’

‘মানে?’

প্রশান্তর মতলবটা ঝুনু আজ ধরতে ব্যর্থ। প্রশান্ত কিছু বলল না। শুধু রান্নাঘরের দেয়ালে ঝুলতে থাকা বাজারের ব্যাগটা এনে ঝুনুর সামনে দাঁড়াল। বলল, ‘ও লাল্টু, আর কত ছোপ্পির পিছে লুকোবি বাবা? আয় বেরিয়ে আয়। ভয় নেই মারধর করব না। আয় আয়।’

লাল্টু কুণ্ঠিত পায়ে বুকে ভয় চেপে সামনে এসে দাঁড়াল।

‘দে, তোর বইয়ের সুটকেসখানা দে দেকি।’

লাল্টু চোখ তুলে চাইতেই ঝুনু এগিয়ে এল। ‘কী করবে সুটকেস নিয়ে?’

‘আমি কি তোমাকে বলেছি? সরো। আরে সরো না।’

ঝুনুকে ঠেলে সরিয়ে দিল। ‘কী রে ব্যাগটা দে।’ এবার গলায় উষ্ণতার আঁচ পেয়ে বই ভর্তি সুটকেসখানা পিসেমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিল। প্রশান্ত সেটা নিয়ে বাজারের ব্যাগখানা ওর হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘আজ থেকে সকাল হলে এই ব্যাগ নিয়ে সোজা করিমচাচার দোকানে যাবি। আশপাশে বাজার বসে। সেখানেও যাবি। সকালের বাজারটা এবার থেকে তোর দায়িত্ব। কেমন? তারপর বাজার থেকে ফিরে এলে এই সুটকেস নিয়ে ইশকুল যাসখুন।’

ঝুনু বাধা দিল। ধোপে টিকল না। বাজারের থলি হাতে তুলে নিল লাল্টু।

‘পিসির কাছ থেকে বুঝে নে আজকে কী কী বাজার হবে।

পরের কথাগুলো ঝুনুর চোখে কঠিন দুটো চোখ রেখে প্রশান্ত বলল, ‘তোমার যখনই যা দরকার লাগবে আজ থেকে ওকেই বোলো। নইলে ইশকুল তো দূর, ভাতের থালায় লাখি মেরে দূর করে দেব। দুটোকেই। চা বসাও।’

লুঙ্গিটাকে কোমরের কাছে শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল প্রশান্ত। লাল্টু অর্থপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তার আদরের ছোপ্পির দিকে তাকাল। অনেক প্রশ্ন তার। কিন্তু কার কাছে করবে? যাকে বলতে পারে সে কেবল নীরবে চোখের জল ফেলে। বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না।

***

গরম থাক। তবু প্রথমার আকাশটা যেন মন ভালো করে দিচ্ছে। ঠিক ওই ছোটোবেলায় পড়া সহজ পাঠের কবিতাটার মতো, ‘গগনে গগনে বরষণ শেষে মেঘেরা পেয়েছে ছাড়া, বাতাসে বাতাসে ফেরে ভেসে ভেসে নাহি কোনও কাজে তাড়া।’ আজ সকালটায় সত্যিই খুব একটা তাড়া নেই দিব্যময়ের। একটানা অনেকদিন হেকটিক শিডিউল হলে একদিন একটু আলগা রাখে নিজেকে। গাড়িটা নিয়ে সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়েছে। চুল-দাড়ি বেশ বড়ো হয়েছে। সেগুলোকে একটু কেটে ছেঁটে ঠিক না করলে ভদ্রসমাজে চলা দায় হবে। গাড়ি চালাতে চালাতেই নিয়মমতো এক প্রস্থ কথা সেরে নিল বাবুর সঙ্গে। রোজ মন্দাকিনীর কিছু না কিছু নালিশ থাকেই বাণীকণ্ঠের নামে। আজ ওষুধ খায়নি। কাল খাবার খায়নি। পরশু না বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তরশু ওকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে বলেছে। এমনই আরও নানান ফিরিস্তি। দিব্যময় শোনে আর মনে মনে হাসে। আচ্ছা অভিভাবকের পাল্লায় পড়েছে তার বাবু।

দিব্যময়ের কাছেপিঠে অনেক ভালো সালোনই আছে। তবে নিজের সৌন্দর্য চেতনার সম্পর্কে দিব্যময় বরাবরই সচেতন। নিজেকে কীসে কেমন মানায় সে ভালো করেই জানে। তাই রুবিতে নিজের ফ্ল্যাট থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে পাটুলির একটা সালোনে এসে নিজেকে সাজিয়ে তোলে।

‘কী রে বিমল, জায়গা আছে না অন্য রাস্তা ধরব?’

ইউনিকর্ন সালোনের দরজাটা ফাঁক করে কথাটা বলল দিব্যময়। সোফায় বসে মোবাইল ঘাঁটছিল তেত্রিশ বছরের বিমল। দিব্যময়ের গলা শুনে ঝট করে মুখ তুলে এক গাল হাসল সে। ‘আসুন ডাক্তারবাবু। আপনি আসবেন বলে আমি নিজে বসে আছি সকাল থেকে। নইলে কে এত সকালে আসে?’

বিমল উঠে দাঁড়াল। মাথার দু-পাশ এবং পিছনের দিকের চুলগুলো এমন ছোটো করে ছাঁটা যে শাঁস বেরিয়ে এসেছে। বাকিটায় ঠাস চুল। দেখলে মনে হয় মাথার মাঝে কে যেন একটা সরা বসিয়ে দিয়েছে। ঘাড়ের কাছে ট্যাটুতে ইংরিজিতে লেখা ‘কসমিক’। ডানকানে দুটো ফুটো করে সিলভার কালারের রিং আটকানো। জিম করা চেহারা। এক কথায় হাল ফ্যাশনের ফর্সা রঙের চাম্পুস ছেলে বিমল। এই সালোনের পুরোটাই ফলস সিলিং করে ঝলমলে আলোয় সাজানো। আধুনিক যন্ত্রপাতি। পাটুলির মেন রোডের ওপরেই ইউনিকর্ন সালোন এ তল্লাটের সবচেয়ে বড়ো সাজসজ্জার ঠিকানা। ইউনিসেক্স। তাই নারী-পুরুষের ভিড় সব সময়েই। স্পা, ব্রাইডাল মেক আপ, হেয়ার কালার সবারই আলাদা আলাদা ঘর। কেবল পুরুষদের চুল কাটার জায়গাটা মেন দরজা দিয়ে ঢুকেই। তবু বিশেষ একটি ঘরের দরজা খুলে বিমল বলল, ‘আসুন স্যার।’ দিব্যময়ের জন্য আলাদা ঘর। কিন্তু দিব্যময় কিছুতেই যাবে না। ‘না বিমল, এ সব করিস না। আমি এখানেই কম্ফর্টেবল।’ বিমল এগিয়ে এসে নিজের হাতের মধ্যে ডাক্তারের হাত পেঁচিয়ে বলে, ‘কিন্তু আমি কম্ফর্টেবল নই। চলুন।’

‘এ তো আচ্ছা বিপদ।

সালোনের অন্যান্য কর্মচারীরা হাসছে। ডাক্তারবাবু এদেরও বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। দিব্যময়কে হাত ধরে বিশেষ ঘরটিতে ঢোকাবার সময় আড়চোখে দেখল সালোনের একটি মেয়ে দরজা ঠেলে ঢুকেই থমকে গেল। বিমলের চোখে চোখ পড়েছে তার। এরপর মেয়েটি বোকা বোকা হাসবে। বিমল জানে। তাই সেই হাসির ডেলিভারির অপেক্ষা না করে ঘরে ঢুকে গেল।

আলাদা সাজানো ঘরে ঢুকিয়ে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসিয়ে বিমল বলল, ‘চুল তো পাকতে শুরু করেছে স্যার। এবার একটু কালার করে দিই।’

‘খবরদার না।’

‘তাহলে একটু ফেশিয়াল। দেব, জিৎ না পোসেনজিত?’

‘মাথা থেঁতলে দেব তোর। শুধু চুল দাড়ি কাটবে।’

বিমল মুখ ব্যাজার করে। ‘ধুসসস, আপনাকে সাজাবার আমার কত্তদিনের শখ জানেন? বিয়ে থা তো করবেন না। অন্তত আমার সেলুনে এসে একটু সাজুগুজু করুন না। আমি দেখে চোখ সার্থক করি।’

‘তুই কাজটা শুরু করবি না বকবক করবি বল। আমার কিন্তু সময় নেই বিমল। ‘রাগ করছেন কেন। করছি তো। আপনাকে দেখলে আপশোস হয় তাই বলছিলাম।’

‘আপশোস কেন?’

দিব্যময়ের গায়ে একধরনের কালো সিন্থেটিক কাপড় ঢাকা দিয়ে ঘাড়ের কাছে বেঁধে দিল বিমল। বলল, ‘আজকাল নতুন নতুন হিরোর যা ছিরি, শুনি তো সব। দেখিও। তাদের থেকে আপনি ঢের বেশি সুন্দর। মাঠে নামলে না…!’

‘হিরোইনের লাইন লেগে যাবে বলছিস?’

‘হিরোইন তো পরে। আগে প্রোডিউসাররা আপনাকে নেবার জন্য হামলে পড়বে। এই রে, কাঁচিটা বাইরে। দাঁড়ান আসছি।’

বিমল ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে একটা আয়নার সামনে এল। তার নীচের ড্রয়ার থেকে কাঁচি বের করে ঘুরে তাকাতেই সেই মেয়েটি একদম মুখের সামনে। সালোনের পোশাক গায়ে চাপিয়ে নিয়েছে। ‘এভাবে কতদিন? সময় মতো ঢুকলে কাজে আসিস নইলে বাড়ি যা।’ নীচু গলায় কড়া সুরে বাজল বিমল।

‘আর হবে না দাদা। আসলে কাল রাত থেকে এত দাঁতে ব্যথা। সঙ্গে আবার মাইগ্রেন। তাই একটু লেট…’

‘হুম। দাঁত আর মাথায় ব্যথাটা চামড়ার ওপর দিয়েই ফুটে উঠেছে।’

কথাটা বলে চলে যায় বিমল। সামনের আয়নায় ফুটে ওঠে মেয়েটার মুখ। গালে আর কপালে কালশিটে। আরেকটি মেয়ে কাস্টমারের শ্যাম্পু শেষ করে পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে গেল, ‘বাপের বাড়িতে এবার জানা তন্দ্রা। কোনদিন খুন হয়ে পড়ে থাকবি।’ তন্দ্রার চোখ ভারী হলেও মুখে সেই বোকাবোকা হাসি।

দিব্যময়ের চুলে কুচকুচ কাঁচি চালাচ্ছে আর গল্প করছে বিমল। দিব্যময় ঘাড় গুঁজে মিটিমিটি হাসছে, ‘দু-পয়সা বেশি রোজগারের জন্য আমাকে আর কত বার খাওয়াবি বিমল? আচ্ছা নে, আজ না হয় তোকে চুল কাটার সঙ্গে ফেশিয়ালের দামটাও দিয়ে দেব।’

বিমলের হাত থেমে গেল। সামনের আয়নায় ফুটে ওঠা দিব্যময়ের চোখের দিকে ভ্যাবলা হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘এটা কী বললেন ডাক্তারবাবু? আপনার কাছ থেকে আমি এই সামান্য চুলদাড়ির পয়সা নেব?’

দিব্যময়ের চোখ গোল গোল, ‘বিমল, আজ যদি আবার সেই একই জিনিস করেছিস তাহলে কিন্তু আর কোনওদিন তোর সেলুনে আসব না বলে দিলাম।’

‘সেলুন নয় স্যার, সালোন।’

‘ওই হল।’

‘আমার কর্মচারীদের কাছে চুলদাড়ি কেটে পয়সা দেন সে আলাদা কথা। কিন্তু আমি নিজে হাতে আপনার থেকে কিচ্ছু নিতে পারব না। আপনি না থাকলে এই এত বড়ো সালোন অ্যান্ড পার্লার হত? এত লোক রাখতে পারতাম?’

‘ব্যস ব্যস ব্যস। অনেক হয়েছে। তোর কর্মচারীকে ডাক। আমি তার কাছেই কাটাব।’

‘ঘাড় নীচু করুন।’

‘কী?’

‘ঘাড় নীচু করুন।’

বেশ জোর দিয়ে বলল বিমল। এইটুকু জোর ও ডাক্তারবাবুর ওপর খাটাতেই পারে। দিব্যময়ের ঘাড়টা পিছন থেকে ঠেলে নীচু করে দিল বিমল। তারপর চুলে কাঁচি চালাতে চালাতে বলল, ‘আইনত এই সালোনটা আমার। তাই আমি কাকে ডাকব না ডাকব সেটা আমি ঠিক করব। চুপ করে চুল কেটে নিন।’

‘তোর বহুত বাড় বেড়েছে বুঝলি তো।’

বিমল ফিকফিক হাসছে।

‘তোর গলার কাছে কী হয়েছে রে?’

দিব্যময়ের প্রশ্ন শুনে বিমল মুখ তুলে আয়নায় গলা দেখে। গলার বাঁদিকে কালো লম্বা দাগ। বিমল বলল, ‘কিছুর দাগ-ফাগ লেগেছে বোধহয়।’ কাঁচিটা রেখে একটা ওয়েট টিস্যু নিয়ে ভালো করে ঘষে ঘষে দাগটা তুলতে লাগল বিমল।

ডিম-টোস্টে বড়োসড়ো একটা কামড় বসাল লোকটি। আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে টেবিলের ওপারে বসে থাকা লেক থানার ইন্সপেক্টর দিব্যেন্দু পাড়িয়াকে বলল, ‘লোকটা বেশ ধুরন্ধর না?’ দিব্যেন্দু বিস্ফারিত নেত্রে বলল, ‘আরে এ স্বয়ম্ভু সেন। এর আগে বেড়ালের কেসটা সলভ করল না।’

‘কোন বেড়াল?’

লোকটার মুখে হ্যালাছেদ্দা ভাব।

‘আরে ওই যে, খুন হওয়ার আগে লোকগুলো একটা ফোন পাচ্ছিল যেখানে একটা বেড়াল ম্যাও ম্যাও করে ডাকছিল। আমিও তো ওই কেসটার ইনভেস্টিগেশনে ছিলাম স্বয়ম্ভুবাবুর সঙ্গে। তারপরে এম এল এ-র কেসটাকে যেভাবে হ্যান্ডেল করলেন, বাপ রে! তখনই বুঝেছি, বেশ কড়া ধাতের লোক।

‘আসছে তো। দেখুন না, কেমন ওই কড়া মালকে কড়কে দিই। শালা আমার পোঁদে লেগেছে! জানে আমি কে?’

‘চম্পক মজুমদার।’

উত্তরটা বাইরে থেকে এল। ব্যস্ততা দেখিয়ে উঠে দাঁড়াল দিব্যেন্দু। বাঁ হাতে ডিম টোস্টটা তুলে নতুন একটা কামড় বসাতে গিয়েও থমকে যায় চম্পক। স্বয়ম্ভু সোজা ঘরে ঢুকে এসে দিব্যেন্দুকে বলে, ‘থানাটা যে কারও ব্রেকফাস্ট করার জায়গা নয় সেটা আপনি জানেন না?’

‘হ্যাঁ স্যার। মানে ওনার খুব খিদে পেয়েছে বললেন তাই…’

‘তাই থানাটাকে রেস্টুরেন্ট বানিয়ে ফেললেন? যে কেউ এসে বলবে স্যার বিরিয়ানি খাওয়ান আর আপনি খাইয়ে দেবেন?’

‘সরি স্যা…’

দিব্যেন্দুর ক্ষমা চাওয়ার ওপর দিয়েই চম্পক চেয়ারে বসে রেলা নিয়ে বাঁ হাতের তর্জনী উঁচিয়ে বলে ওঠে, ‘এই এই এই মিস্টার শম্ভু না কী যেন, যে কেউ মানে? আমি আর যে কেউ এক?’

স্বয়ম্ভুর বাঁ হাতের থাবাটা চম্পকের বুক আর গলার মাঝে ধপ করে পড়ল। মুঠোয় চলে এল শার্টের কলার আর শুরুর দুটো বোতাম। চম্পককে টেনে তোলবার সময় চেয়ারটা দড়াম করে উলটে গেল। আওয়াজ শুনে বাইরে থেকে কনস্টেবলরা উঁকিঝুঁকি দিল। এইটুকুতেই চম্পক বাক্যহারা। হঠাৎ যে এমন একখানা কাণ্ড ঘটে যাবে সেটা এম এল এ-র ছেলে ঠাওর করতে পারেনি। চোয়াল শক্ত করে স্বয়ম্ভু বলে, ‘ঠিক বলেছিস। এক নয়। বাকিরা পুরুষ আর তুই শালা নপুংসক।’

গর্জে কেঁপে ওঠে চম্পক। স্বয়ম্ভুর হাতের মুঠি আরও শক্ত হয় চম্পকের গলার ওপর।

‘শালা! রোয়াব তো ভালোই আছে। পুলিশের সামনে একলা একটা মহিলাকে ফেলে কাল পিছনের দরজা দিয়ে ভেগে গেলি কেন বানচোত? আর গেলি তো গেলি কন্ডোমের প্যাকেটটা ফেলে মঞ্জুকে গেঁড়িয়ে দিয়ে গেলি?’

‘বা… বাড়াবাড়ি করছেন। বাবাকে বললে কিন্তু…’

স্বয়ম্ভু সপাটে চড়াবে বলে হাতটা শূন্যে তুলতেই চমকে যায় চম্পক। স্বয়ম্ভু ফ্যাক করে হেসে বলে, ‘চম্পক তো, তাই চমকে দিলাম। দিব্যেন্দুবাবু ইন্টারোগেশন রুমটা খুলুন।’

‘ইয়েস স্যার।’

পালিয়ে যাওয়া বাড়ির ছেলেকে হাতেনাতে ধরে যেমন করে ঘরে এনে ফেলে তেমনি করেই চম্পককে চেয়ার টেবিলের সামনে এনে স্বয়ম্ভূ বলল, ‘বসুন।’

‘কাজটা ভালো করেছেন না স্যার।’

জামার কলার ঠিক করতে করতে বলল চম্পক।

‘বোস।’

ধমকের সুরে ঠিক ‘আপনি’ শব্দটা স্বয়ম্ভুর মুখ দিয়ে বেরোয় না। চম্পক বসার পরেই প্রথম প্রশ্ন, ‘শান্তি দাসকে মারলেন কেন?’

‘কে শান্তি?’

‘আরে আপনার মঞ্জুর মনের মানুষ দীননাথ দাসের স্ত্রী। যদিও সেটা পাস্ট টেন্স।’

‘আমি কাউকে মারিনি।’

‘তাহলে কে মেরেছে?’

‘আমি কী করে জানব?’

স্বয়ম্ভূ খানিক চুপ থেকে দিব্যেন্দুকে দিয়ে খাতা পেন আনায়। চম্পককে বলে নিজের নাম লিখতে। চম্পক বলে, ‘কেন?’

‘ভয় নেই স্থাবর অস্থাবর লিখিয়ে নেব না। নাম লিখুন।’

‘না।’

মুখের ওপর জবাব চম্পকের। ‘বেশ, তাহলে যা ইচ্ছে লিখুন।’

‘আমি কি এখানে হাতের লেখা প্র্যাকটিস করতে এসেছি?’

গলা চড়াল স্বয়ম্ভু, ‘আর আমি কি এখানে ছিঁড়তে এসেছি? কী মনে হয়? লিখুন।’ এ আদমি যে সহজে ছোড়নেওয়ালা নয় সেটা বুঝে গেছে চম্পক। ডান হাতে কলম তুলে কী লেখা যায় ভাবতে থাকে। মাথাটা শূন্য হয়ে গেছে মুহূর্তে। স্বয়ম্ভু বলে দিল, ‘কী লিখবেন বুঝতে পারছেন না তো? আমি বলছি, লিখুন। ছোটো খোকা বলে অ আ, শেখেনি সে কথা কওয়া। লিখে ফেলুন।’

কলম চলল খসখস। একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকল স্বয়ম্ভু। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

লেখা শেষ করে একটু রাগ দেখিয়েই খাতাটা স্বয়ম্ভুর দিকে ঠেলে দিল। কান গরম হয়ে উঠেছে তার। দাঁতে দাঁত চেপে চম্পক বলল, ‘আজ অবধি আমার বাপ-মা কোনওদিন আমায় এভাবে লিখতে বলেনি।’

‘ওই জন্যেই এই অবস্থা। ‘ক’-এর পর ‘আ’ বসালে যে কওয়া বানান হয় না সেটাও জানেন না। তা কদ্দিনের প্রেম?’

চম্পক চুপ। ‘কী হল? কদ্দিন ধরে লটরঘটর চলছে ওই আনাজওয়ালির সঙ্গে? ঠিকঠাক তথ্য দেবেন বলে দিলাম। নইলে গোয়েন্দার গুঁতুনি ওইখানে পড়লে না সব ভড়ভড় করে বেরোবে। কদ্দিন ধরে মঞ্জুর বিছানায় খেলছেন?’

‘চার বছর।’

স্বয়ম্ভুর একটা ভুরু উঠে গেল। চম্পকের দিকে তাকিয়েই দিব্যেন্দুকে প্রশ্ন ছুড়ল, ‘দিব্যেন্দুবাবু, দীননাথের বিরুদ্ধে মঞ্জুর নালিশটা কবে জমা পড়েছিল?’

‘আড়াই-তিন বছর আগে।’

‘তিন না আড়াই?’

‘আজ্ঞে তারিখটা দেখতে হবে। তবে সালটা দু-হাজার একুশ। দোলের পরে পরেই।’

‘মানে আড়াই। অর্থাৎ অঙ্কটা দাঁড়াল দু-হাজার কুড়ি থেকে একুশের দোল পর্যন্ত মঞ্জু দুজনের সঙ্গেই…’

স্বয়ম্ভু ঘুরছে ইন্টারোগেশন রুমের মধ্যে আর নিজের মনে বিড়বিড় করে অঙ্ক সাজাচ্ছে। ‘দু-হাজার কুড়ি মানে কোভিডের টাইম। সেই সময় মঞ্জুর ব্যবসা এক্কেবারে বন্ধ। তাহলে খাওয়া পরা? দীননাথের তো সেই অবস্থা নেই। অবস্থা ভালো একজনেরই।’

ঝট করে ঘুরে চম্পকের দিকে তাকায় স্বয়ম্ভু। এগিয়ে আসে। বলে, ‘চম্পকবাবু

মঞ্জুকে খাওয়াবে, পরাবে, ভরণপোষণ করবে আর তার বদলে চম্পককে মনোরঞ্জন দেবে মঞ্জু। কি তাই তো?’

মুখে কুলুপ এঁটেছে চম্পক। শুধু একবার চোখ তুলে স্বয়ম্ভুকে মেপে নিল সে। মৌনং সম্মতি লক্ষ্মণং। ‘এর জন্যেই প্রয়োজন হল দীননাথের নামে ডায়েরি করে তাকে জেলে পুরে দেওয়ার। নইলে জীবন থেকে সরানো যাবে না। খুব ভালোভাবেই জানত এ ডায়েরি ধোপে ঢেঁকবার নয়। তাই নিজের ক্ষমতা খাটিয়ে বস্তির লোকজন নিয়ে দীননাথের পরিবারকে ঘরছাড়া করা হল।’

কথা বলতে বলতেই চট করে দিব্যেন্দুর দিকে ঘুরে গেল স্বয়ম্ভু। বলল, ‘কিন্তু কোভিড পিরিয়ডে যেখানে বিয়েতে পঞ্চাশজনের বেশি লোক অ্যালাউড ছিল না সেখানে গোটা বস্তির লোক জমায়েত করার জন্য এই এম এল এ-র ছেলের বিরুদ্ধে কোনও স্টেপ নেওয়া হয়েছিল কি?’

এবার দিব্যেন্দুও চুপ। মাথা নীচু। স্বয়ম্ভূ হাসল, ‘হুম! কী সুন্দর! সাসপেক্টও চুপ। পুলিশও চুপ। সাসপেক্টেরও মাথা নীচু। পুলিশেরও…!’ শেষ কথাগুলো আর মুখ দিয়ে বেরোল না স্বয়ম্ভুর।

‘দশই সেপ্টেম্বর সন্ধের পর, কোথায় ছিলেন চম্পক?’

স্বয়ম্ভু একটা কথা বলতে বলতে বা ভাবতে ভাবতে দুম করে অন্য একটা প্রশ্ন করে বসে। উত্তরদাতা ভড়কে যেতে বাধ্য। চম্পকও ব্যতিক্রম নয়। ‘দশ!’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ দশ। গত মাসের দশ তারিখ। রবিবার ছিল।’

‘মনে নেই। এক মাস আগে কী করেছি কী করে বলব?’

‘না, সেটা তো ঠিক কথা। তবে সেই দিনকার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। সেদিন শান্তি দাস খুন হয়।’

চম্পক এক ঝলক স্বয়ম্ভুকে দেখে অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। কিন্তু স্বয়ম্ভুর চোখ সোজাসুজি চম্পকের মুখে। ‘কী হল? বলুন।’

‘বিশ্বাস করুন আমার কিচ্ছু মনে নেই।’

‘আমি বলি?’

চম্পক চোখ তুলে তাকায়।

‘আপনি সেদিন সন্ধে থেকেই যাদবপুর স্টেশনের আশপাশে ঘুরঘুর করছিলেন। কারও ওপর নজর রাখছিলেন।

‘মিথ্যে কথা। আমি গত একমাস যাদবপুরের ধারে কাছে যাইনি। আর সেদিন তো যাইইনি।’

‘তাহলে কোথায় ছিলেন?’

‘আমি সেদিন বোধহয় গড়িয়াহাটে ছিলাম।’

‘কেন?’

‘পুজোর বাজার করছিলাম।’

‘সঙ্গে কে ছিল?’

চম্পক চোখের পলক তুলেই নামিয়ে নেয়। স্বয়ম্ভূই উত্তরটা দেয়, ‘মঞ্জু বসাক?’ চম্পক ওপর নীচে ঘাড় নাড়ে।

‘কটায় বাড়ি ফিরেছিলেন?’

‘ওই সাড়ে ন’টা দশটায় মঞ্জুকে নামিয়ে আমি বাড়ি চলে যাই। তারপর খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

চম্পকের উদ্দেশে স্বয়ম্ভু বলল, ‘এখন বাড়ি যেতে পারেন। তবে শান্তি দাসের মার্ডার কেসের সঙ্গে যদি কোনওভাবে আপনি জড়িত থাকেন, তাহলে যত বড়ো বাপের ব্যাটাই হোন না কেন, নিস্তার নেই।’ কথাগুলো বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়েই যাচ্ছিল, হঠাৎ কী মনে হওয়াতে দিব্যেন্দুর দিকে দৃষ্টি হেনে ঘুরে দাঁড়াল। ‘দিব্যেন্দুবাবু…!

‘আজ্ঞে স্যার! না মানে শুধু স্যার!’

আগেরদিনের ‘আজ্ঞে’ নিয়ে আপত্তিটা চট করে মনে পড়ে গেল দিব্যেন্দুর। ‘এরপর আর কোনও দিন যদি দেখি আপনি বাইরের লোকদের ধরে ধরে থানায় বসিয়ে ডিম পাউরুটি গেলাচ্ছেন, তাহলে আপনার কিন্তু খবর আছে।’

বদ্ধ ইন্টারোগেশন রুমে স্বয়ম্ভুর হুমকিটা দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঘুরতে লাগল। দিব্যেন্দুর চোখদুটো লাল হয়ে উঠল।

থানা থেকে বেরিয়েই মোবাইল কানে দেয় স্বয়ম্ভু। ‘রঞ্জিত, একটা নম্বর সেন্ড করলাম। গত মাসের দশ তারিখ কখন কোথায় কোথায় ছিল দেখো তো। আমায় কলে না পেলে ডিটেলসটা টেক্সট করে রাখবে।’ গাড়িতে উঠে ড্রাইভার সঞ্জয়কে বলল, ‘কাঁটাপুকুর।’

‘ওকে স্যার।’

স্টার্ট দিল সঞ্জয়। মুহূর্তে আরেকটা ফোন।

‘বলুন সুরঞ্জনবাবু।’

রিজেন্ট পার্ক থানার অফিসার সুরঞ্জন বলল, ‘কাল রাতে স্বপ্না দেবী বাড়ি থেকে বেরোননি।’

‘স্বাভাবিক। কাল রবিবার ছিল। হাজব্যান্ড বাড়ি থাকলে মাঝরাতে বউ কী করে বেরোয়? বাই দ্য ওয়ে, হাজব্যান্ড কী করে?’

‘শ্যামবাজারে একটা লেদার কারখানায় কাজ করে।’

‘সেখানে রাতে কাজ হয়? খোঁজ নিয়েছেন?’

‘হ্যাঁ স্যার। ওখানে শিফটিং ডিউটি।’

‘ওকে। আজ রাতটা ভাইটাল। খেয়াল রাখবেন।’

‘শিওর স্যার।’

ফোনটা রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। জানলার বাইরে তাকাতেই মনটা মুচড়ে উঠল স্বয়ম্ভুর। কী জীবন মাইরি! আকাশ বলছে পুজো এসেছে। শহরের অলি-গলি বলছে পুজো এসেছে আর জীবন বলছে আশপাশে ক্রিমিনাল ঘুরছে। সাবধানে থাক।

‘শালা।’

নিজেকে নিজেই গাল দিল। পুজোর প্যান্ডেল, বাজার, হইচই সবকিছুর পাশ কাটিয়ে স্বয়ম্ভু ঢুকল কাঁটাপুকুর। মুর্দাঘর। শিবাঙ্গী আগেই পৌঁছেছে। স্বয়ম্ভুর জন্য অপেক্ষা করছিল।

‘এম এল এ-র ছেলে কিছু বলল স্যার?’

‘ছেলেটা মেয়েবাজ। মুখে যতই হামবড়া দেখাক ভিতরে আসলে একটা ভিতুর ডিম। তা ছাড়া চম্পক…

বলেই নিজের ডান হাত তুলে দেখায়। ডান হাত দেখানোর ইঙ্গিত বুঝে ফেলে শিবাঙ্গী। হতাশ হয়ে বলে, ‘কাউকে দিয়েও তো করাতে পারে।

‘এইট্টি ফাইভ পার্সেন্ট না। ফিফটিন পার্সেন্টের জন্য খোঁজ নিতে বলে এসেছি।’

‘একটা কাজ করব স্যার? সমরকে খোঁজ নিতে বলব?’

‘খোচর?’

‘হুম। ও তো ওই বাঘাযতীনের সাইডেই থাকে।’

‘দেখো। ওকে বোলো, চম্পকের চেনা এমন কোনও মেয়ে আছে কিনা যে বাঁ হাতে কাজ করে। বা চম্পকের বাবার পোষা কোনও গুন্ডা!’

‘ওকে স্যার।’

‘তা তিনি কই?’

‘আপনার জন্যেই ওয়েট করছে। চলুন।’

মিনতির বড়ি বিবস্ত্র করে শোয়ানো। বুক থেকে তলপেট পর্যন্ত সেলাই। স্কালটাও সেলাই করে জোড়া। যেন ভেঙে যাওয়া কোনও পুতুল সুতো দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ফরেন্সিক এক্সপার্ট তুহিনশুভ্র বলল, ‘তোমার সন্দেহই সঠিক স্বয়ম্ভু। খুনি একজন মহিলা।’

‘এটা আগে সন্দেহ থাকলেও এখন প্রায় প্রমাণিত।’

স্বয়ম্ভুর কথা শুনেই তুহিনের চক্ষু বিস্ফারিত। ‘বলো কী হে? এর মধ্যে খুনি ক্যাচ কট কট?’

‘না না। শুধু সিসিটিভিতে দেখা গেছে একটি মহিলাকে মিনতিদের গলিতে ঢুকে কুড়ি মিনিট পরে বেরিয়ে আসতে। সেই সময়েই এই খুন। কিন্তু আপনি কী এমন পেলেন?’

‘ফেনক্সিথেনল (Phenoxyethanol) অ্যান্ড প্রপিলিন গ্লাইকোল (Propylene Glycol)। এই দুটোই মেয়েদের কসমেটিক্সে ইউজ করা হয় ফর প্রিজার্ভেশন।

‘মেক আপ?’

‘কারেক্ট। ভিক্টিমের মাথার বাঁদিকে চুলে কিছুটা লেগে ছিল। ল্যাব রিপোর্টও ডান।’

স্বয়ম্ভুর ভুরু কুঁচকে গেল। ডক্টর তুহিন বলল, ‘খুনের আগে পিছন থেকে ডান হাত দিয়ে ভিক্টিমের মুখ চেপে ধরে বাঁ হাত দিয়ে গলায় খুব যত্ন করে ছুরি চালানো হয়েছে। এই মুখ চেপে ধরার সময় স্বাভাবিকভাবেই ভিক্টিমকে বুকের কাছে চেপে ধরতে হয়েছে। ঠিক তখনই কোনওভাবে খুনির মুখের ফাউন্ডেশন ভিক্টিমের চুলে লেগেছে এবং আরও একটা জিনিস ভিক্টিমের পিঠের দিকের ব্লাউজে আটকে ছিল যেটা পরে পেয়েছি।’

‘কী? ‘ ‘ওয়েট।’

তুহিন একটা প্লাস্টিকের সিলড পাউচ নিয়ে এসে স্বয়ম্ভুকে দিল। পাউচের মধ্যে ছোট্ট একটা সিলভার কালারের গোলমতন জিনিস।

‘কী এটা?’

স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল। উত্তর দিল শিবাঙ্গী, ‘স্যার এটা মনে হয় খুনির জামায় ছিল। এইরকম ছোটো ছোটো সিলভার বল দিয়ে অনেক সালোয়ারের বুকে ডিজাইন করা থাকে। এর ভেতর কিছু কিছু সময় ঝুমঝুমিও থাকে। মেয়েরা হাঁটলে চললে ঝুমঝুম করে খুব হালকা শব্দ হয়।’

‘বাবা! নূপুর পা থেকে বুকে উঠে এসেছে। ভালো।’

আড়চোখে স্বয়ম্ভুকে দেখে নিল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভূ প্রশ্ন করল তুহিনকে, ‘ডিএনএ স্যাম্পেল নিয়েছ?’

বেশ হতাশ হয়েই উত্তর দিল তুহিন, ‘নিয়ে তো ছিই। কিন্তু মেলাব কার সঙ্গে?’

‘হুম। মেকআপ করে মাঝরাতে খুন করতে এল? তাও আবার ঝুমঝুমি দেওয়া জামা পরে!’

মিনতির ফ্যাকাশে মুখের দিকে চেয়ে কথাগুলো আওড়াল। ‘একবার ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে হবে শিবাঙ্গী। আচ্ছা ওর মামা মামির কী খবর?’

‘পুলিশ গিয়েছিল। ওর মামি রাজি হয়েছে প্রকাশের দায়িত্ব নিতে। তবে সেটা বাধ্য হয়ে। শ্মশানে আসবে না।’

‘প্রকাশের বাবা নিজে খুন করেনি। কিন্তু কাউকে দিয়ে তো করাতেই… ধুস।’

কথাগুলো বলতে বলতে নিজেই বিরক্ত হয়ে গেল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করল, ‘কী হল স্যার?’

‘প্রতিটা সাসপেক্টই নিজে খুন করছে না। কাউকে না কাউকে দিয়ে খুন করাচ্ছে। আর সেটা একজনই। অদ্ভুত কেস মাইরি।’

‘আর সবাই কোনও না কোনওভাবে অত্যাচারিত। গার্হস্থ্য হিংসার শিকার।

শিবাঙ্গী পয়েন্টটা ধরিয়ে দিল স্বয়ম্ভূকে। সহসা স্বয়ম্ভুর মাথার মধ্যে আলোর ঝলক। ‘আচ্ছা তুহিনদা, সোনারপুরে যে মহিলা খুন হন…!

‘বীণা সাহা। চব্বিশে সেপ্টেম্বর!

শিবাঙ্গী বলে উঠল। স্বয়ম্ভূ বলল, ‘রাইট। বীণা সাহার সঙ্গে তো খুনির ধস্তাধস্তি হয়। তার মানে বীণার হাতেও কিছু… বীণার ফরেন্সিক টেস্ট যিনি করেছেন তাকে ডেকে পাঠান তো।’

হাজির হল ডক্টর ইন্দ্রনাথ বারিক। পরিষ্কার গায়ের রং। পাঁচ ফুট আট-নয় হবে। ব্যাক ব্রাশ করা চুল। বয়স ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ। চেক কাটা সাদা শার্টটা চকলেট রঙের প্যান্টের মধ্যে গোঁজা। ডান নাকের পাশে বাদামি রঙের আঁচিল ছাড়া চেহারায় নজর করার মতো কিছু নেই। স্পষ্ট জানাল, খুনি ভিক্টিমের নাকে ঘুষি মারে। তাতে নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। স্কিন স্পেসিমেন্ট থেকে ডায়াথেল থ্যালেট (diethyl phthalate) আর প্রপিলিন গ্লাইকোল (Propylene Glycol) পাওয়া গেছে।

‘এগুলো মেকআপের সঙ্গে রিলেটেড কী?’

‘ইয়েস।’

‘মানে হাতেও মেকআপ করেছিল মহিলা?’

‘নট নেসেসারি। মেকআপ করে হাত হয়তো ক্লিন করেনি।’

বলল ইন্দ্ৰনাথ।

‘থ্যাংক ইউ ডক্টর।

কলতান মুখরিত সরকারি অবজারবেশন হোমটি আড়িয়াদহে। যেখানে শুধু ছেলেদেরই রাখা হয়। সব মিলিয়ে সাতাত্তরজন বাচ্চা। একটা শিশু যখন জন্মায় প্রথমেই তাকে কাঁদিয়ে দেওয়া হয়। নিজে থেকে না কাঁদলে মেরেধরে কাঁদাতে হয়। ডাক্তারি ব্যাখ্যা যাই হোক, জীবনের ব্যাখ্যা বোধহয় অন্য। শুরুতেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়, এ জীবনে তুমি হাসবে কিনা জানা নেই। কিন্তু কাঁদতে তোমায় হবেই। ওটাই অনিবার্য নিয়তি। তাই জন্মেই কাঁদতে শেখো। এই সরকারি আশ্রমে কত নাবালক ছুটে বেড়াচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট্ট বুকটায় তাদের কান্নাটিকে গোপন করে। কেউ বা চোখের জলের সমুদ্র বানিয়ে চুপ করে বসে আছে। কারও বুকে হয়তো ওই চোখের জলের সাগর তোলপাড় করেই সুনামির প্রবল সম্ভাবনা। তাদের গল্প বলতে গেলে বেলা ফুরোবে। আপাতত নিজের পোড়া কপালটা জানলার গরাদে ঠেকিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছে প্রকাশ। গালের ওপর শুকনো নোনা জলের দাগ। এক রাতেই চোখের নীচে কালি পড়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ছে তার সেই কবিতাটা। বাণীকণ্ঠ পড়িয়েছিল, ‘ছুটির দিনে কেমন সুরে পুজোর সানাই বাজে দূরে, তিনটে শালিক ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে।’ এই লাইনটা মনে পড়লেও প্রকাশের চোখে ভেসে ওঠে বিটকেলটার ছবি। কেমন টপাটপ শালিকটা পড়া বলে দেয়। আর বাণীকণ্ঠ আরও রেগে গিয়ে ছোপটির বাড়ি কষিয়ে দেয় প্রকাশের পিঠে। তখন খুব খারাপ লাগত। রাগ হত। মাস্টারমশাই বুঝত না প্রকাশ কেন পড়া করে আসেনি। আজ সেই খারাপ লাগাগুলোই ছোট্ট ছেলেটার বুকে ভালো লাগার দিন হয়ে বাজছে। মাঝে মাত্র দুটো রাত। কেমন আমূল পালটে গেল ওর জীবন। মুহূর্তে দুটো জীবন যেন ভাগ হয়ে গেল। বাইরে বাচ্চার কোলাহল প্রকাশের কানেই যাচ্ছে না।

তবে দরজা খোলার শব্দটা কানে গেল। দেখল সেই গোয়েন্দাটা সঙ্গে মহিলা পুলিশটাকে নিয়ে এসেছে। প্রকাশের মুখ ফুটে কে যেন ঠেলে বের করে দিল প্রশ্নটা, ‘আমার মাকে তোমরা সবাই পুড়িয়ে দিলে?’

বাচ্চাটাকে কীভাবে প্রশ্ন করবে, কী কী প্রশ্ন করবে সব রাস্তায় আসতে আসতে সাজিয়ে এসেছিল স্বয়ম্ভু। কিন্তু প্রকাশের প্রশ্নটাই যেন সবকিছু তালগোল পাকিয়ে সরাসরি হৃৎপিণ্ডে ধাক্কা দিল। শিবাঙ্গীর চোখটা কড়কড় করে উঠল। স্বয়ম্ভু এগিয়ে এসে প্রকাশকে জড়িয়ে ধরে বসল। বলল, ‘না। তোমার মা এখনও আছে। তবে এবার শ্মশানে নিয়ে যেতে হবে। তুমি যেতে চাও?’

প্রকাশ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। শিবাঙ্গী বলল, ‘তুমি না যেতে চাইলে আমরা কেউ তোমায় জোর করব না প্রকাশ। কী চাও তুমি? যাবে?’

প্রকাশ স্বয়ম্ভুদের আসতে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। এখন শিবাঙ্গীর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আবার এক ফালতি বিছানাটার ওপর বসে পড়ে। বলে,

বোবা মায়ের গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিলে মা ভীষণ কাঁদত। যন্ত্রণায় ছটফট করত। পরমুহূর্তেই মুখ চোখ পালটে যায় প্রকাশের। ‘না না। আমি যাব না। আমি মায়ের মুখে আগুন দিতে পারব না। কিছুতেই পারব না।’ প্রকাশ কাঁপতে থাকে। শিবাঙ্গী এসে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘না না। তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না প্রকাশ। যা করার আমরাই করব। তুমি শান্ত হও।’ স্বয়ম্ভু প্রকাশের অবস্থা দেখে চোখ বুজে ফেলে। প্রকাশ শান্ত হলে জিজ্ঞেস করে, ‘মুখে যে আগুন দিতে হয় সেটা তোমায় কে বলল?’

‘মা-ই তো বলত। বাবাকে। সারা গায়েই তো ছ্যাকা দিয়েছ। মুখটাই বা বাদ দিচ্ছ কেন? মরার আগেই মুখে আগুন দিয়ে দাও।’

স্বয়ম্ভুর চোখের সামনে মিনতির নগ্ন ডেড বডিটা ঝলসে উঠল যেন। সত্যিই ওর শরীরের নানা জায়গায় পোড়া দাগ ছিল। এমনকি স্তনটাও বাদ রাখেনি জানোয়ারটা। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল স্বয়ম্ভু।

‘বুঝলাম। আচ্ছা প্রকাশ, মনে করে আমায় একটা কথা বলো তো, তুমি যখন তোমার মাকে বাইরে পড়ে থাকতে দেখলে তখন কী আর কাউকে দেখতে পেয়েছিলে?’

স্বয়ম্ভুর প্রশ্নে চিন্তান্বিত প্রকাশ। একটু ভেবে বলে, ‘না।’

‘তোমার বাবা তখন কোথায় ছিল?’

শিবাঙ্গী জানতে চায়।

‘ঘুমোচ্ছিল। অনেকবার ডাকার পরে তারপর ওঠে।’

‘তুমি ডেকেছিলে?’

প্রকাশের মাথাটা ওপর নীচে নড়ে ওঠে। এই প্রশ্নটা ইচ্ছে করেই পুনরায় জানতে চায় শিবাঙ্গী। মিলিয়ে দেখল, আগের দেওয়া উত্তর আর এই উত্তর আদপে মেলে কিনা।

এবার স্বয়ম্ভু জানতে চায়, ‘আচ্ছা প্রকাশ, তোমার মায়ের সঙ্গে বাইরের কারও ঝগড়া হত? বা এমন কেউ আছে যে তোমার মায়ের ক্ষতি করতে চায়?’

‘বাবা ছাড়া মায়ের সঙ্গে কারও কোনওদিন ঝগড়া হত না। আমার মা খুব ভালো ছিল।’

‘এর মধ্যে অচেনা কাউকে দেখেছিলে মায়ের পিছন পিছন ঘুরতে? বা তোমার বাড়ির কাছেপিঠে হয়তো ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন কেউ যাকে তোমরা চেনো না। এই বিষয়ে কেউ কোনও কথা বলত কী?’

খানিক ভেবে এবারেও প্রকাশের জবাব, ‘না তো। এরকম কেউ ছিল না। কেউ কথাও বলেনি।’

‘আচ্ছা তোমার মায়ের বন্ধু কে ছিল?’

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে। প্রকাশ বলে, ‘সবাই। সবাই মায়ের বন্ধু।’

‘বিশেষ কেউ? মানে বলছি সবথেকে প্রিয় বন্ধু কেউ আছে?’

স্বয়ম্ভুর প্রশ্নে প্রকাশের জবাব, ‘স্বপ্না কাকি। ওই যে আমাদের পাশের বাড়ির কাকিটা। ও আমার মায়ের খুব বন্ধু। বাবা না থাকলে মাঝে মাঝেই আসে।’

‘বাবা না থাকলে?’

‘হ্যাঁ। বাবাকে কেউ পছন্দ করে না।’

‘এসে কী গল্প করত?’

‘অনেক রকম। কাকি সারাদিন কী করল। মা কী করল। মা কী খেল। মা কোথায় কখন যাবে।’

‘আর?’

কৌতূহলী কণ্ঠস্বরটা আরেকটু চাপল স্বয়ম্ভু।

‘আর! আর কোথাও বেড়াতে যাবে কিনা। কী সিনেমা দেখল। মাকে কতবার সিনেমা দেখতে নিয়ে যেতে চেয়েছে স্বপ্না কাকি। কিন্তু মা যায়নি।’

‘কেন?’

‘আমি একা থাকতে পারি না যে।’

এটাই হয়। যে যেটা পারে না, নিয়তি তাকে দিয়েই সেটা বেশি করে করায়। গভীর একটা শ্বাস ফেলে স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর চোখে চোখ রাখে। দেখে শিবাঙ্গীও বিশেষ কারণে তাকিয়ে আছে। স্বয়ম্ভু বুঝে ফেলে যে শিবাঙ্গীর মন যা সন্দেহ করছে স্বয়ম্ভুর মনও তাই। নইলে একই সময়ে দুজন একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকায় না। এর আগে এমন কতবার ওদের দুটো চোখের সঙ্গে মনেরও মিল হয়েছে।

‘স্বপ্না কাকি কোনও কাজ করত?’ শিবাঙ্গী জিজ্ঞাসা করে।

‘না। বাড়িতেই থাকত।’ প্রকাশ উত্তর দেয়।

স্বয়ম্ভূ আরও একবার বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, ‘বেশ। আমরা এবার উঠি কেমন। লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকবে। আমরা আবার আসব তোমায় দেখতে। আর খুব শিগগিরি তোমার মামি এসে তোমায় নিয়ে যাবে।

প্রকাশ হ্যাঁ বা না কোনও জবাবই দিল না। এইটুকু বয়সেই বুঝে গেছে কেউ ওর উত্তরের অপেক্ষা করবে না। এই বিরাট পৃথিবীটাতে ওর মতামত জানার আর কেউ নেই। তাই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর যাবার পথের দিকে চেয়ে। কিন্তু আচমকাই প্রকাশের ভিতর থেকে ডাকটা বেরিয়ে এল, ‘শোনো।’ স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী ঘুরে তাকায়। প্রকাশ বলে, ‘আরেকজনকে দেখেছি আমি।’

‘কাকে?’

স্বয়ম্ভু এগিয়ে আসে।

‘একটা ছেলেকে ‘

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *