ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ৪

আজকেও কারখানায় যায়নি প্রশান্ত। মাসের পনেরো তারিখ পেরোতে না পেরোতে ভাড়ার শূন্য। ঝুনু কতবার বলেছে নিয়মিত কাজে যাও। নইলে সংসার চলছে না। প্রশান্ত কানে কথা তো নেয়ই না। উপরন্তু সক্কাল সক্কাল পাশের পাড়ার ভাটিখানার মালিকের বাড়ি থেকে মদ কিনে বন্ধুদের সঙ্গে মদ গিলে আজ বাড়ি ফিরেছে। বেলা বেড়েছে। চোখ লাল করে বউয়ের কাছে ভাত চেয়েছে। রান্নাঘরে বসেছিল ঝুনু। লাল্টু গতকালের ভাতে জল ঢেলে একটু আলু সেদ্ধ নিয়ে খাচ্ছে। বরের ডাক শুনেও ঝুনু উত্তর দেয়নি কোনও। প্রশান্ত টলতে টলতে এসে কাঁচা খিস্তি দিয়ে জানতে চায় যে এতবার ডাকছে সে, ঝুনু সাড়া দিচ্ছে না কেন? ঝুনু গম্ভীর স্বরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘উত্তর দিয়ে হবেটা কী? খেতে চাইবে তো? নাও খাও।’ বলেই ফাঁকা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িটা মাটিতে ঘষে ঠেলে দেয়। ফাঁকা হাঁড়িটা গড়াতে গড়াতে দোরের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশান্তর পায়ের কাছে গিয়ে থামে। বউয়ের ঝাঁঝেই খানিক নেশা চটকে গেছে প্রশান্তর। তারপর ঘরে হাঁড়ি চড়েনি দেখে মাথায় আগুন চড়ে যায়। পান্তা ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে গিয়ে থেমে যায় লাল্টুর হাত। ভয়ার্ত চোখে চেয়ে থাকে পিসেমশাইয়ের দিকে। দেখে প্রশান্তও লাল চোখ দুটো নিয়ে গিলে খেতে আসছে। বুকটা কেঁপে ওঠে লাল্টুর। কাল সন্ধেবেলাতেই ওর চোখের সামনে বেদম মার খেয়েছে পিসি। ঘরে চাল-ডাল এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাচ্ছে কী করে? লক্ষ্যটা ছিল লাল্টুই। লাল্টুর হয়ে মুখ বুজে পিসিই মার খেয়েছে। হজম করেছে। একটা কথাও বলেনি। আবার এখন। ভাবতে ভাবতেই ফাঁকা হাঁড়িটা প্রশান্ত সজোরে চালিয়ে দেয় ঝুনুর মুখে। ঘুরে গিয়ে মুখ থুবড়ে প্রায় শুয়ে পড়ে ঝুনু। লাল্টু ভয়ে কাঁপতে থাকে। প্রশান্ত দানবের মতো রাগে গরগর করতে করতে বলে, ‘শালি বাঁজা মাগি।’ বলেই ঝুনুর পেটে সপাটে লাথি। ‘এখনও অবধি নিজে একটাও পেটে ধরতে পারলি না। এদিকে পরের ছেলেকে গান্ডেপিন্ডে গিলিয়ে পীরিত মাড়ানো হচ্ছে?’ প্রশান্তর ডান পা-টা ওপরে উঠে ঝুনুর মাজা বরাবর সজোরে নেমে এল। যন্ত্রণায় কোঁকিয়ে উঠল ঝুনু। এবার ফাঁকা হাঁড়িটা দিয়েই ঝুনুর শরীরে যেখানে পারল সেখানে পরপর মারতে থাকল। ভাতের থালা থেকে দূরে সরে যেতে থাকল লাল্টু। চোখ ফেটে জল এল। রান্নাঘর ছেড়ে বেরোবার আগে লাল্টু একবার বলে উঠল, ‘পিসেমশাই, ছোপ্পিকে মেরো না।’ কথাটা শুনে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রাক্ষসের মতো লাল্টুর দিকে তাকাল প্রশান্ত। তুতলে উঠল লাল্টু, ‘আ… আমি আর খা…খাব না।’ ঝুনু ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে লাল্টুর দিকে চেয়ে রইল। ছোট্ট ভাইপোর কথাটা ঝুনুর শরীরের যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে বুকের ব্যথাটাকে বাড়িয়ে দিল।

***

বড়োসড়ো একটা থাবা এসে প্রকাশের বাবার গলার কাছের জামাটা খামচে ধরে টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে এল। কাঁদো কাঁদো প্রকাশের বাবার মুখটা এক্কেবারে স্বয়ম্ভু সেনের মুখের কাছে।

‘আ…আমি খুন করিনি স্যার। বিস…বিশ্বাস করুন স্যার। আমি খুন করিনি।’

স্বয়ম্ভু একটাও কথা না বলে কটমট করে লোকটার চোখের ওপর চোখ রেখে খানিক চুপ করে থাকে। জেলের জালে ধরা পড়েছে খতরনক মাছ। জল থেকে শূন্যে উঠে উথালিপাথালি লেজ ঝাপটাচ্ছে। স্বয়ম্ভুর হাতের মুষ্টি দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে চেপে দিচ্ছে লোকটার গলা।

পাশের বাড়ির স্বপ্না সহ আরও কয়েকজন চেঁচিয়ে ওঠে। ‘ওই খুন করেছে স্যার। প্রতিদিন বউটার ওপর অত্যাচার করত। জানোয়ারের মতো মারত।’ আঠারো উনিশ বছরের একটি স্থানীয় ছেলে আগবাড়িয়ে বলে ওঠে, ‘দশটা রুলের গুঁতো দিন স্যার। ফরফরিয়ে সব বের করে দেবে।’

‘না না স্যার। বিশ্বাস করুন। মিনতিকে আমি খুন করিনি।’

কাঁদতে কাঁদতে একই কথা বলে চলেছে প্রকাশের বাবা। স্বয়ম্ভু বলে, ‘জানি তুই খুন করিসনি।’

গোয়েন্দার মুখে এই কথা শুনে আশপাশের লোকজন সমেত প্রকাশের বাবা নিজেও ভড়কে গেছে।

‘কিন্তু তুই যে খুন করাসনি তার কী প্রমাণ আছে?’

দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলল স্বয়ম্ভু।

‘না না স্যার, সত্যি বলছি। আমি কিচ্ছু জানি না।

‘তোর বউয়ের গায়ে কালশিটেগুলো কীসের?’

লোকটা এবার চুপ।

‘কী রে বল কীসের দাগ ওগুলো?’

লোকটার ঠোঁট ফুঁড়ে কথা বেরোচ্ছে না আর। ‘খুনের জন্য না হোক। স্ত্রীকে মারধোর করার জন্য তোকে অ্যারেস্ট করলাম। যাহ!’ বলেই স্থানীয় পুলিশের দিকে লোকটাকে ছুড়ে দেয় স্বয়ম্ভু।

বাণীকণ্ঠ বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে রেখেছে প্রকাশকে। ঘর থেকে বেরিয়ে আসা সিঁড়ির ওপর বসে আছে। সারা মুখে শুকিয়ে যাওয়া কান্না। এর মধ্যেই অকুস্থলে মিডিয়া এসে হাজির। নানা মুনির নানা প্রশ্ন। কেউ কেউ বাচ্চাটাকেও প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে এসেছিল। কিছু পুলিশের সহায়তায় শিবাঙ্গী তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। প্রকাশের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে শিবাঙ্গী। বাণীকণ্ঠকে প্রশ্ন করে, ‘আপনি কে হন?’

‘মাস্টারমশাই। ও আমার কাছে পড়তে যায়।’

‘কোথায় থাকেন?’

‘চণ্ডী ঘোষ রোড। এই গলি দিয়ে সোজা গেলেই।’

শিবাঙ্গী প্রকাশের দিকে স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। সেই সময়েই প্রকাশের বাবাকে ছেলের চোখের সামনে দিয়ে পুলিশ গাড়িতে তোলে।

স্বয়ম্ভূ এসে দাঁড়ায় প্রকাশের সামনে। এইটুকু ছেলেকে ঠিক কী প্রশ্ন করবে ভেবে পায় না। ছেলেটা কেমন যেন পাথরের মতো হয়ে গেছে। শিবাঙ্গী বলে, ‘কাল বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল?’ প্রকাশ নীরবে ঘাড় নাড়ে।

‘প্রতিদিন হত না মাঝে মাঝে?’

‘প্রত্যেকদিন। বাবা মাকে মারত।’

‘কেন?’

‘মা বাবাকে মদ খেতে দিত না। বাবাও মাকে কোনও টাকা দিত না। আমার স্কুল ছাড়িয়ে দিতে বলেছিল।’

‘হুম!’

লুটিয়ে পড়ে থাকা ডেডবডির ছবি উঠল বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে। ফরেন্সিকের ডক্টর তুহিনশুভ্র ভালো করে চশমাটা মুছে নিল।

‘অ্যাকশন রাইট টু লেফট হয়েছে তো?’

বলতে বলতে তুহিনের পাশে এসে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু। চশমাটা চোখে আঁটসাট করে বসাতে বসাতে তুহিন উত্তর দিল, ‘হুম। মোডাস অপারেন্ডি আগেরগুলোর মতোই। পিছন থেকে অ্যাটাক।’

‘আরও একটা নিরীহ মানুষ!’

‘সামনে পুজো। বড়ো কত্তা তো রেড অ্যালার্ট জারি করে দিয়েছে। পুজোর আগেই

ধরতে হবে।’

‘সেই কারণেই তো আমি এখানে তুহিনদা। নইলে তো লোকাল পুলিশ‍ই সামলাত।’

‘সবথেকে মুশকিল হল সবকটা খুন পাবলিক প্লেসে হচ্ছে। ফুটপ্রিন্ট নেই। ফিঙ্গারপ্রিন্টও নেই। খুন করতে গেলে ভিক্টিমকে ধরতে তো হয় সেখানে একটাও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই!’

‘ভয়ানক সাবধানি খুনি। দুর্দান্ত প্ল্যানিং।’

স্বয়ম্ভু কখনও একদিকে তাকিয়ে বা যার সঙ্গে কথা বলছে শুধুমাত্র তার দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। প্রশ্ন-উত্তর যাই করুক চোখ সবসময় বনবন করে চতুর্দিকে ঘুরছে। পাশের বাড়ির বউটা মানে স্বপ্না মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছে। দেখাদেখি আরও কয়েকটা মেয়ে-বউয়ের চোখে জল। পুরুষগুলোর চোখে মুখে ভয় কিংবা হতাশা।

ওদিকে রিপোর্টার দলের কিছু বাইট উড়ে আসছে স্বয়ম্ভু আর তুহিনের কানে। ‘এই নিয়ে পরপর চারটে খুন। প্রতিটাতেই ভিক্টিম মেয়ে এবং গলার নলি কেটে খুন করা হয়েছে।’

তুহিন ভুরু কুঁচকে গলা চেপে বলল, ‘চারটে বলছে কেন? পাঁচটা তো।’ রিপোর্টারদের দিকে তাকিয়েই স্বয়ম্ভু বলল, ‘সোনারপুরের কেসটা মিস করেছে বোধহয়। তবে একটা বিষয় অ্যালার্মিং। মিডিয়াও এই খুনগুলোকে একই সুতোয় জুড়ছে কিন্তু।’

কথাটা শেষ হতেই একটি বিশেষ জায়গায় চোখ পড়ে স্বয়ম্ভুর। প্রকাশের পাশের বাড়ির বউটা, যে একটু আগেই মুখে আঁচল চেপে কাঁদছিল সে হঠাৎ ভিড় থেকে দূরে গিয়ে একটি লোকের সঙ্গে কী যেন কথা বলছে। বারবারই ছেলেটিকে ঠেলে চলে যেতে বলছে মনে হল। ছেলেটিও চলে গেল। স্বপ্না আবারও আঁচলে মুখ চেপে ভিড়ের সামনে এসে দাঁড়াল। মিনতির ডেডবডিটা দেখে মুহূর্তে চোখে জলও চলে এল।

‘স্যার।’

তুহিনের পাশে এসে দাঁড়াল তার অ্যাসিস্ট্যান্ট।

‘কী খবর সাত্যকি?

‘বিশেষ কিছুই নেই স্যার। খুনি গাড়ি করে আসেনি। হেঁটেই এসেছে। তবে এই রাস্তায় তো ফুটপ্রিন্ট পাওয়া সম্ভব নয়। যদি থেকেও থাকে তাহলে সকাল থেকে এত মানুষের হাঁটাচলায় সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। লোকটা ঘরেও ঢোকেনি যে সেখানে তার পায়ের ছাপ পাব।’

‘খুন হলেই খালি আমরা ‘লোকটা’ বলি তাই না? সাবকনশাস মাইন্ডে অপরাধী মানেই পুরুষ ভেবে নিই আমরা।’

স্বয়ম্ভূ কথাগুলো বলে চুপ করে যায়। তুহিন বলে ওঠে, ‘কেন ভায়া, তুমি কি নারীত্বের কোনও চিহ্ন পেলে নাকি?’

‘না। শুধু একটা কথাই ভাবাচ্ছে।’

‘কী?’

‘আপনার কথা অনুযায়ী ঘটনাটা রাত একটা থেকে দুটোর মধ্যে ঘটে।’

‘কারেক্ট।’

‘তাহলে অত রাতে একটা মহিলা কেন দরজা খুলে বাড়ির বাইরে আসবে? বাথরুম বাড়ির ভেতরেই। তাহলে কেউ কি ডেকেছিল? যদি ডাকে তাহলে কে? কোনও পুরুষ? চারপাশের মানুষের ফিডব্যাক ওয়াইজ বউটি নিতান্তই ঘরোয়া, ভদ্র, সন্তান পালনকারী এক নির্যাতিতা গৃহিণী। পরকীয়ার কোনও কেস নেই। তাহলে ডাকল কে?’

‘ডাকতেই হবে কেন? স্বামীর অত্যাচার থেকে পালাতেও তো চাইতে পারে।

‘উঁহু। লক্ষ্মীরানির পিছুটান নেই। তাই ও পালাতে পারে। কিন্তু মিনতি তো… শুনছ সে ছেলের পড়াশুনো নিয়ে স্বামীর অকথ্য অত্যাচার সহ্য করত। যে ছেলেকে নিয়ে এত কনসার্ন হবে সে ছেলেকে ছেড়ে পালাবে? আর শুধু তাই নয়, মহিলাটি বাড়ির বাইরে পা দেওয়া মাত্রই ঘ্যাচাং? কোনওরকম হাতাহাতি নেই, কিচ্ছু নেই। তার মানে খুব কাছের কেউ জড়িয়ে আছে এখানে। যে এই বউটাকে খুব ভালো করে জানে। যে একবার ডাকলেই নির্দ্বিধায় মাঝরাতে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে পড়তে পারে। আরও একটা বিষয়, এক্ষেত্রেও খুনি লেফট হ্যান্ডেড। ঠিক এর আগের চারটের মতো। তার মানে প্রতিটা খুন একজনই করছে, একইভাবে, একই অস্ত্র দিয়ে।’

তোমার মগজে এত তাড়াতাড়ি হাওয়া লাগে কী করে বলো তো ভায়া? অবিশ্যি বেড়াল আর কথাকলির কেসটা যেভাবে তুমি সলভ করলে তাতে…

‘অ্যাই বডিটা সরাও এখান থেকে।’

তুহিন বুঝল, এই প্রশংসা স্বয়ম্ভুর মোটেও পছন্দ হল না কিংবা এ ক’দিনে শুনে শুনে কান পচে গেছে। তাই নিজে থেকেই চুপ করে গেল।

মাত্র একটা রাতের ব্যবধানে প্রকাশের মা কেমন বডি হয়ে গেল। সাদা কাপড়ের মুখ থেকে ভালো করে ঢেকে স্ট্রেচারে তোলা হল মিনতিকে। প্রকাশ হাউমাউ করে কেঁদে মাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল। শিবাঙ্গী ও বাণীকণ্ঠ দুটো হাত ধরে আটকে রাখল ছেলেটাকে। জালে পড়া কই মাছের মতো ছটফট করছে প্রকাশ। ‘মা, মা’ করে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে চাইছে। স্বয়ম্ভু অসহায় চোখে প্রকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। স্বপ্নাও দৌড়ে আসে প্রকাশকে শান্ত করতে। অনেক কষ্টে বাণীকণ্ঠ নিজের বুকে টেনে নেয় ছেলেটাকে।

‘মা, বাপ সব গেল। এবার এই ছেলেটার কী হবে ম্যাডাম?’

বাণীকণ্ঠের প্রশ্ন শেষ হতেই ভিড় ঠেলে একটা ডাক ভেসে আসে, ‘বাবু!’

বাণীকণ্ঠ দেখে মন্দাকিনীকে সঙ্গে নিয়ে তার ছেলে এসে হাজির।

‘তুমি না খেয়ে না দেয়ে কেন এসেছ? ওষুধ পর্যন্ত খাওনি।’

‘কী বলছিস বাবু? এই ছেলেটার যে সব গেল। আমি এখন বসে বসে খাব?’

ক্রন্দনরত প্রকাশের মুখটা দেখে মায়াই হল বাবু’র। শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘আপনি?’ বাণীকণ্ঠের ছেলে হাত জোড় করে পরিচয় দিল, ‘আমি ডক্টর দিব্যময় মুখার্জি। ইনি আমার বাবা।’

‘ডক্টর?’

পাশ থেকে প্রশ্নটা উড়ে আসতেই স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায় সবাই। দিব্যময় আলতো হেসে বলে, ‘ইয়েস।’

‘কীসের?’

স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন।

‘অর্থোপেডিক সার্জেন।’

স্বয়ম্ভু এক ঝলক চোখ চালিয়ে নিমেষের মধ্যে মেপে নিল ডাক্তারকে। পাঁচ ফুট নয়, সাড়ে নয় মতো লম্বা। নজরকাড়া চেহারা। রীতিমতো যে শরীর চর্চা করে দেখলেই বোঝা যায়। এমনিতে ক্লিন শেভই থাকেন। তবে এখন গালে আর নাকের নীচে হালকা দাড়ি আর গোঁফের আচ্ছাদন। কাজের চাপে কাটতে পারেননি বোধহয়। মাথার চুলগুলোও বেশ বড়ো হয়েছে। মনে মনে একটা ধারণা করে নিল স্বয়ম্ভু। দিব্যময়ের চোখের পাতাগুলো বেশ বড়ো বড়ো আর সাজানো। যে কোনও মানুষের চোখ টেনে ধরবে।

‘কোথায় প্র্যাকটিস করেন?’ স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করে। ‘হেলথ লাইন।’

‘ওকে।’

এইসব কেজো কথায় কোনও আগ্রহ নেই বাণীকণ্ঠের। সে আবারও গলা তুলে প্রশ্ন করল, ‘এই বাচ্চাটার কী হবে?’

স্বয়ম্ভূ জিজ্ঞেস করে, ‘প্রকাশ, তোমার আর কেউ আছে? মানে আত্মীয় স্বজন?’ ফোঁপাতে ফোঁপাতে উত্তর দেয় প্রকাশ, ‘মামা, মামি আর দাদু।’

.

স্বয়ম্ভূ লোকাল থানার ইন্সপেক্টরকে জিজ্ঞেস করে, ‘খবর যায়নি?’

‘গেছে স্যার। ওর মামা কাজের সূত্রে রাজস্থান। আর দাদু কানে শোনেন না। নিজে খুব একটা নড়াচড়া করতে পারেন বলে মনে হল না। আমাদের লোক গিয়েছিল। আর ওর মামি আসবে না বলল।

‘আসবে না মানে?’

‘বলেছেন এইসব নোংরামিতে জড়াবেন না।

‘মামদোবাজি নাকি? যদিও খুনের কোনও মোটিভ না পেলে ওর বাবাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’

‘ওই বাজে লোকটার সঙ্গে আমি থাকব না। ওর জন্যেই আমার মা মরে গেছে।’ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠল প্রকাশ। শিবাঙ্গী স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়।

স্বয়ম্ভূ হাঁটু মুড়ে ছেলেটার সামনে বসে প্রশ্ন করে, ‘বাবার জন্যেই মা মরেছে! কেন? তুমি কি কিছু দেখেছ?’

‘বাবা মাকে সহ্য করতে পারত না। ও ছাড়া আর কে মারবে? আমার মাকে সবাই ভালোবাসত।’

‘আচ্ছা, প্রকাশ তুমিই তো প্রথম তোমার মাকে দেখেছ এখানে পড়ে থাকতে, তাই না?’

‘হ্যাঁ।’

‘অত রাতে তুমি বাইরে কেন এলে?’

‘পেচ্ছাপ পেয়েছিল। বাথরুমে যাব বলে উঠে মনে হল মা একা বাইরের ঘরে শুয়ে আছে, একবার দেখি। সেটা দেখতে এসেই দেখি মা নেই। ঘরের দরজা খোলা। বাইরে এসে দেখি…

বুকের ছোট্ট খাঁচাখানা অথৈ কান্নায় আবারও ফুলে উঠল। অনেকক্ষণ ধরে স্বপ্না এঁদের সব কথা শুনছিল। কিন্তু এবার বাচ্চাটাকে কে রাখবে সেই নিয়ে কথা শুরু হতেই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে চুপচাপ সরে গেল। আড়চোখে স্বপ্নাকে নজর করল স্বয়ম্ভু।

‘আচ্ছা বাবু, আমি যদি ওর দায়িত্ব নিই।’

বাণীকণ্ঠ বলে উঠল। বুড়োর কথা শুনে মন্দাকিনীর চোখ প্রায় ঠেলে বেরিয়ে আসে।

‘খেপেছ নাকি? তোমায় কে দেখে তার ঠিক নেই। তুমি আবার একটা বাচ্চার দায়িত্ব নেবে? না না, ওসব ঝামেলায় যেও না।’

মন্দাকিনী নীরবে ঘাড় নেড়ে দিব্যময়ের কথায় সায় দেয়।

দিব্যময় বলে উঠল, ‘একটা কথা বলব স্যার। বলছি, আমি বেশ কয়েকটি এন জিওর সঙ্গে যুক্ত। তাদের আন্ডারে অনেক ভালো ভালো অনাথ আশ্রম আছে। আপনারা নিজেরাও চেক করে নিতে পারেন। সেখানে যদি এই ছেলেটিকে রাখি তাহলে কোনও প্রবলেম হবে?’

স্বয়ম্ভু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘না দিব্যময়বাবু, আইনত সেটা সম্ভব নয়। প্রথমে ওর বাবা ওর দায়িত্ব পাবে। এক্ষেত্রে ছেলেটি বাবার কাছে নিজেকে সেফ মনে করছে না। তাই মামারবাড়িকে দায়িত্ব নিতেই হবে। সেটাও যদি কোনওভাবে সম্ভব না হয় তাহলে গভর্নমেন্টের যে হোম আছে সেখানে প্রকাশকে রাখা হবে। যেহেতু প্রকাশ অনাথ নয় তাই একে কেউ অ্যাডপ্ট করতে পারবে না। আপাতত।’

‘ও হো, তবে তো বড়ো মুশকিল হল।’

‘মুনশিবাবু, ওর মামারবাড়িতে লোক পাঠান। মামাকে খবর পাঠিয়ে আনাবার ব্যবস্থা করুন।’

স্বয়ম্ভু বলল।

‘শিওর স্যার।’

জবাব দিলেন লোকাল থানার ইন্সপেক্টর সুরঞ্জন মুনশি। স্বয়ম্ভু আরও বলল, ‘আমি এখানকার সবকটা সিসিটিভির ফুটেজ চেক করব। ব্যবস্থা করুন।’

‘ওকে স্যার।’

সুরঞ্জন সঙ্গে সঙ্গে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ডিউটি অফিসারকে হুকুম পাস করাতে সে তার মোবাইল বের করে থানায় খবর দেয়।

স্বয়ম্ভূ করমর্দনের উদ্দেশ্যে ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয় দিব্যময়ের দিকে। ‘নাইস টু মিট ইউ।’ এই সৌজন্যের জন্য প্রস্তুত ছিল না দিব্যময়। তাও সে তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয়। স্বয়ম্ভু বলে, ‘একজন ডাক্তার হওয়ার সঙ্গে আপনি যে এরকম সমাজসেবামূলক

কাজের সঙ্গেও যুক্ত আছেন জেনে খুব ভালো লাগল।’

দিব্যময় হাসল। বলল, ‘ঠিক, চিকিৎসাটাকে এখন আর কেউ সমাজসেবার মধ্যে ধরে না।’

‘নো নো, দ্যাটস নট হোয়াট আই মিন্ট।’

পালটা হেসে জবাব দিল দিব্যময়, ‘আরে না না। আমিও এমনিই বললাম।’

‘দেখা হবে।’

‘শিওর। কোনও দরকার লাগলে বলবেন প্লিজ।’

দিব্যময় মুক্তর মতো দাঁতগুলো ছড়িয়ে হাসল।

শিবাঙ্গী প্রকাশের মুখের সামনে ঝুঁকে আদরের সুরে বলে, ‘প্রকাশ, তুমি ছোটো। একা তো থাকতে পারবে না। তাই তোমাকে আমরা খুব ভালো একটা জায়গায় রাখব যেখানে তোমার মতো আরও অনেক বন্ধু আছে। সেখানে তুমি খেলবে, পড়াশুনো করবে। আর বাবার কাছে না থাকলেও মামার বাড়িতে তো থাকতেই পারবে।’

চোখ ভর্তি জল নিয়ে শিবাঙ্গীর দিকে তাকায় প্রকাশ। নিভে আসা দুটো চোখের তারা। কোথাও কোনও আলো নেই সেখানে। এক অন্ধকার থেকে আরেক অন্ধকারে যাবার সুড়ঙ্গ আছে শুধু।

রিজেন্ট পার্ক পুলিশ স্টেশনে ঝড়ের বেগে ঢুকে এল স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী আর সুরঞ্জন মুনশি। মুনশির কথামতো ডিউটি অফিসার আগেই থানায় এসে ল্যাপটপ নিয়ে তৈরি ছিল।

‘কাল রাত বারোটা থেকে আড়াইটের মধ্যে ওই চত্বরের ফুটেজ দেখান।’

ফুটেজ চলছে। ল্যাম্পপোস্টের সাদা টিউবলাইটের আলো পড়ে প্রকাশের বাড়ির গলির মুখটা আলোকিত। সিসিটিভিতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে গলির মুখ সমেত গাড়ি চলাচলের রাস্তাটা। রাত বাড়ছে। কমে আসছে লোকজন, গাড়িঘোড়া। সন্দেহজনক কেউ চোখে পড়ছে না। তিন চারটে লোক গলির ভেতর ঢুকল আর বেরোল।

‘এই গলিটায় ঢোকার আর কোনও রাস্তা আছে?’

জানতে চাইল স্বয়ম্ভু। সুরঞ্জন ডিউটি অফিসারের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায়। এর ফাঁকেই স্বয়ম্ভু আড়চোখে সুরঞ্জনকে মেপে নেয় এক ঝলকে। ডিউটি অফিসার উত্তর দেয়, ‘আছে স্যার। এই মেন রোডটার প্যারালাল আরেকটা রাস্তা আছে। ওখান দিয়েও টোটো-অটো-ক্যাব সব চলে।’

‘ফুটেজ আছে?’

‘আছে স্যার। এখনই দেখাব?’

‘না, আগে এটা দেখে নিই।’

‘ওকে স্যার।’

বলেই ফুটেজটা প্লে করে কিছুটা এগোতেই ‘স্টপ স্টপ’ বলে উত্তেজিত হয়ে ওঠে স্বয়ম্ভু। ফুটেজ পজ হয়। কিছুটা রিওয়াইন্ড করতে বলে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পজ করে দেয়। তারপর জুম। শিবাঙ্গী ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘এটা তো ওই পাশের বাড়ির মহিলাটা।’

‘কারেক্ট। যে আজ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছিল। তারপর ছেলেটার কাস্টডির কথা উঠতেই মুখে আঁচল চেপে কেটে পড়ে। রাত বারোটা পঁয়ত্রিশে এই মহিলা গলি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কোথায়? গলি থেকে বেরিয়ে ডানদিকে বেঁকে গেলেন। মুনশিবাবু এর উলটোদিকের ফুটেজটা দেখান, যেখানে মহিলাটিকে দেখা যাবে।’

যথারীতি আবারও অধস্তন ডিউটি অফিসারকে চোখের ঈশারা সুরঞ্জনের। স্বভাববশত, ডিউটি অফিসারটি ‘শিওর স্যার’ বলেই এই ফুটেজ মিনিমাইজ করে আরেকটি ক্যামেরার ফুটেজ ওপেন করে। যেখানে দেখা যায় মহিলাটি রাতে শুনশান ফুটপাথ ধরে বেশ খানিকটা এগিয়ে রাস্তা পার হয়। তারপর কোথায় যায় সেটা আর বোঝা যায় না। কারণ অপ্রতুল ক্যামেরার জন্য ওদিককার কোনও ফুটেজ নেই। এই ক্যামেরাটিকে ফরোয়ার্ড করে রাত দুটো পর্যন্ত মহিলাটির আর ট্রেস পাওয়া যায় না। ফিরে যাওয়া হয় প্রথম ক্যামেরা মানে গলির ক্যামেরার ফুটেজে। বারোটা পঁয়ত্রিশের পর আবার রাত একটা পনেরো মিনিটে গিয়ে মহিলাটিকে দেখা যায়। রাস্তা ক্রস করে বাড়ির গলিতে ঢুকে গেল।

‘বারোটা পঁয়ত্রিশ থেকে একটা পনেরো। এতক্ষণ ধরে এত রাতে কোন কাজ করেন মহিলা?’

সুরঞ্জন ঠোঁটের কোণে মুচকি হেসে বলে, ‘মেয়েদের মধ্যরাতে কী আর কাজের অভাব স্যার। তখনই তো খেলার সময়। তার ওপরে বরের নাইট ডিউটি…’ শিবাঙ্গীর চোখে চোখ পড়তেই বেলুনের হাওয়া বেরিয়ে যাবার মতোই কথাগুলো হারিয়ে গেল সুরঞ্জনের। কটমট করে তাকিয়ে আছে শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু একগাল হেসে বলল, ‘হুঁ হুঁ! আপনার তো বেশ ভালোই অভিজ্ঞতা আছে মনে হচ্ছে সুরঞ্জনবাবু। তা আপনিও কারও খেলার সঙ্গী-টঙ্গী হন নাকি?’

বেচারা ইন্সপেক্টর অধস্তনের সামনে মুখটা কোথায় লুকোবে ভেবে পায় না। জিভ-টিভ কেটে এপাশ ওপাশ ঘাড় নাড়ে।

রাত একটা চল্লিশ। ফুটেজটা আবার থামে। স্বপ্না গলি থেকে বেরিয়ে যেদিকে বেঁকে গিয়েছিল ঠিক সেই দিক থেকেই একটি মহিলার আবির্ভাব হয়। বেশ লম্বা। গায়ের রং সম্ভবত শ্যামলা। পরনে কালো চুড়িদার। পিঠ ছাপানো খোলা চুল। ওড়নাটাকে মাথা থেকে ঘোমটার মতো দিয়ে গলার কাছে পেঁচিয়ে রাখা। মহিলাটির পিঠের দিক ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে। ঠিক যে সময়ে মহিলাটি বাঁদিক ঘুরে গলিতে ঢুকতে যাবে অমনি ফুটেজ পজ করা হল। নাহ! জুম করেও মুখটা স্পষ্ট নয়। প্রোফাইলে যেটুকু যা বোঝা যাচ্ছে। আরেকটা ক্যামেরাতেও মুখটা উলটোদিকের প্রোফাইল। মহিলাটির হাঁটাচলা দেখে স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর মনে হল সিসিটিভির কার্যকারিতা সম্পর্কে ইনি বেশ ওয়াকিবহাল। মুখটাকে এমনভাবে আড়াল করে হেঁটে গলির ভিতর ঢুকে গেল যেন মুখটা ঢাকা কিন্তু ঢাকা নয় এমন একটা অবস্থা। গলিটার মধ্যে মহিলাটি ঢুকে বেশ খানিকটা গিয়ে বাঁদিকে বেঁকে যায়। গলির মধ্যে ক্যামেরা নেই। তাই বাকিটা কল্পনা। সেই মহিলাটিই রাত একটা আটান্ন মিনিটে গলি থেকে বেরিয়ে একটি অটোয় উঠে পড়ে। এই সময় রাস্তার উলটো ফুটের দ্বিতীয় ক্যামেরাটিকে যথাসম্ভব জুম করে মহিলাটির মুখটিকে সামনে আনা হয়। কিন্তু অর্ধেক মুখ তো ওড়নাতেই ঢাকা। বাকিটা তেমন একটা বোঝা গেল না কারণ পুরো মুখটাই নীচু করে ছিল। বলাই বাহুল্য, অটোটি মিনিট পাঁচেক আগেই ওই গলির মোড়ে এসে দাঁড়ায় এবং মহিলাটি উঠে পড়ে। অটো সোজা বেরিয়ে যায়।

‘এ কী! মহিলাটি যে দিক দিয়ে এসেছিল অটোটা তো তার উলটো দিকে গেল।’

শিবাঙ্গী বলে উঠল। স্বয়ম্ভু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘রতন, এর ছবি বের করে সবকটা পিএস-এ ছড়িয়ে দাও। আর অটোর নম্বরটা ট্রেস করো।’ রতন মানে সুরঞ্জনের ডিউটি অফিসার স্মার্টলি জবাব দিল, ‘ওকে স্যার।’ স্বয়ম্ভু আবারও এক গাল হাসি হেসে সুরঞ্জনকে বলল, ‘আপনাকে বললেও কাজটা ওই করবে তো তাই সরাসরি ওকেই বললাম। কিছু মনে করলেন না তো?’

‘এ… এ মা! কী যে বলেন স্যার।’

ভালো মানুষের ভান করেই কড়া গলায় হুকুম ছুড়ল সুরঞ্জন, ‘রতন, কাজটা যেন তাড়াতাড়ি হয়।’ স্বয়ম্ভু একটা শ্বাস ছাড়ল। তারপরেই গটগট করে থানা ছেড়ে বেরিয়ে

যাবার জন্য পা বাড়াল।

‘মহিলাটাকে তুলে আনি স্যার?’

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘কোন মহিলা?’

‘ওই যে পাশের বাড়ির বউটা।’

‘কী করবেন? খেলবেন?’

‘এ মা না না। মানে ও অত রাতে কী করছিল। কোথায় গেল সেসব…’

‘একদম নয়।’

স্বয়ম্ভুর গলায় কড়া সুর।

‘ওকে স্যার।’

‘শুধু নজর রাখবেন আর আমায় রিপোর্ট করবেন। ওই মহিলা যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পায় ওকে ফলো করা হচ্ছে।’

‘ওকে ওকে স্যার। একদম ক্লিয়ার।’

একেবারে গদগদ হয়ে উত্তর দিল সুরঞ্জন। যেন গোয়েন্দার ধান্দা ও এখনই ধরে ফেলেছে। ‘কিন্তু স্যার এই মালটার কী করব? বেড়ন দিই?’

স্বয়ম্ভু বুঝল সুরঞ্জন মিনতির স্বামীর কথা জিজ্ঞেস করছে। ‘লোকটা খুনি নয়। মানে সরাসরি খুন করেনি। আর ওর বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনও অভিযোগ দায়ের হয়নি। তাই বেড়নের ভয় দেখিয়ে দেখুন কিছু বের করতে পারেন কি না।’

‘সুপারি দিয়েছিল স্যার।’

‘সুপারি দিয়ে নিজে মদ গিলে অকাতরে ঘুমোল। সুপারি কিলার বউটাকে আদৌ মারতে পারল না ছড়াল সেটা জানতে সজাগ থাকবে না? শুনলেন তো বাচ্চাটা বলল যে ও গিয়ে বাবাকে ডাকে। বাবার ঘুমই ভাঙছিল না। তারপরে ছেলের জোরাজুরিতে ওঠে। যান, দেখুন এগুলো ছাড়া আর কিছু বলে নাকি।’

‘আচ্ছা স্যার।’

‘বাই দ্য ওয়ে, গতকাল রাতে যে মেয়েটি প্রকাশকে বাড়িতে দিতে এসেছিল টিউশনের পর…’

‘হ্যাঁ স্যার, ওই মাস্টারের কাজের মেয়েটা।’

‘ওদের অ্যাড্রেসটা নিয়েছেন?’

সঙ্গে সঙ্গে সপাত করে গোলাপি রঙের জিভটা এক হাত বেরিয়ে এল সুরঞ্জনের। রাগে চোখ ছোটো হয়ে এল স্বয়ম্ভুর। ‘এই রতওওওওন…’ স্বয়ম্ভু হাঁক দিতেই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল এ এস আই রতন পাল। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের কোঠায়। বাণীকণ্ঠ মুখার্জির ঠিকানা জিজ্ঞেস করাতেই রতন বলল, ‘হ্যাঁ স্যার জানি। ওই চণ্ডী ঘোষ রোডের দিকটায়। পোস্টাল অ্যাড্রেস নেই। তবে নিয়ে যেতে পারব। এই অঞ্চলে মাস্টারমশাইয়ের বেশ নামডাক আছে।’ স্বয়ম্ভূ সুরঞ্জনকে বলল, ‘নিয়ে যাচ্ছি।’

‘শি…শিওর স্যার।’

রতনকে সঙ্গে নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। গাড়িতে উঠেই শিবাঙ্গীর ফোনটা বেজে উঠল। মা ফোন করেছে।

‘বলো… হ্যাঁ হ্যাঁ।… হুম!… ডিম টোস্ট…

স্বয়ম্ভু আড়চোখে শিবাঙ্গীকে দেখল। শিবাঙ্গী আরও বেশ কয়েকবার ‘হ্যাঁ… হুম’ করল। তারপর ‘হ্যাঁ রাখো রাখো’ বলেই কী মনে হল তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করল, ‘প্রেশারের ওষুধটা খেয়েছ?… ঠিক বলছ?… আচ্ছা। রাখো।’ এবার ফোনটা কেটে স্বয়ম্ভুর দিকে চোখ পড়তেই দেখল দুটো অন্তর্ভেদী চোখের তারা শিবাঙ্গীকে স্ক্যান করছে। ‘কী হল স্যার?’

‘নাহ! কিছু না তো।’

বলেই জানলার বাইরে মুখ ফিরিয়ে ফিকফিক করে হাসল। শিবাঙ্গীও ঠোঁট চেপে হাসি লুকাল।

.

সবুজ পাতাগুলো কুচকুচ করে চিবিয়ে খাচ্ছে সাদা খরগোশটা। বাণীকণ্ঠ মুখার্জি মাঝে মাঝে খাবার এগিয়ে দিচ্ছে খরগোশটাকে। টিভিতে খবরের চ্যানেল। ঘুরেফিরে সেই একই খবর দেখিয়ে চলেছে। রিমোট টিপে টিভিটা বন্ধ করে দিল বাণীকণ্ঠ। বেশ খানিকক্ষণ ধরেই বিটকেল ‘কৃষ্ণ রাধে কৃষ্ণ রাঁধে’ করে হেদিয়ে মরছে। এতদিনে বাণীকণ্ঠ বুঝে গেছে এই রাধাকেষ্টর নাম নেওয়া মানে শালিকের খিদে পেয়েছে।

‘এই মন্দাআআআআ… বিটকেলকে খেতে দিলিইইইই?’

গলা তুলল বাণীকণ্ঠ। কলতলায় বাসন মাজছিল মন্দা। উত্তর দিল, ‘অনেকক্ষণ।’ সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেল বিটকেল বলছে, ‘মন্দাআআআ, খেতেঁ দেঁ, খেতেঁ দেঁএএ!’ বাণীকণ্ঠ আবার বলল, ‘ওই দ্যাখ খেতে চাইছে কেন?’

‘ভীমরতি ধরেছে, তোমার মতো।’

.

ঠিক এই সময় বাইরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ানোর শব্দ। খরগোশকে খাওয়াতে খাওয়াতে বাণীকণ্ঠের হাত থেমে যায়। সজাগ হয়ে ওঠে কান দুটো। কতগুলো বুটের শব্দ দরজার কাছে এসে থামে এবং তার পরেই কলিংবেল বাজার শব্দ। হাই পাওয়ারের চশমা থেকেই দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দরজার দিকে। আরও দু-বার কলিং বেল বাজে।

‘কে এল একটু দেখো না মেসোওওও।’

বাড়ির পিছনের কলতলা থেকেই চেঁচিয়ে বলে মন্দাকিনী। যথারীতি বিটকেল কেনই বা চুপ থাকে। সেও ‘কেঁ এল কেঁ এল? বাঁবু এঁলি বাঁবু এঁলি?’ করে গলা সেধে নিল।

দরজা খুলতেই স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী ও রতনকে দেখে একটু ঘাবড়েই গেল বাণীকণ্ঠ। স্বয়ম্ভু বলল, ‘কটা জরুরি কথা ছিল। ভিতরে আসতে পারি?’

‘কী ব্যাপারে?’

‘মিনতি গুহ খুনের ব্যাপারে।’

ছ্যাৎ করে উঠল বাণীকণ্ঠের বুক। তুতলিয়ে বলল, ‘মানে, আমি তো কিছুই এ ব্যাপারে জানি না স্যার। আপনাদের কী বলব?’

‘ঘরে গিয়ে কথা বললে ভালো হয় স্যার। আসলে ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে পুলিশ এলে নানা লোকে নানা কথা বলবে তাই আর কী!’

‘আসুন আসুন।’

.

বাণীকণ্ঠ সবাইকে নিয়ে ভিতরে আসে। স্বয়ম্ভূ ভালো করে বাড়ির চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। একেবারেই সাধারণ বাড়ি। পাশাপাশি বড়ো বড়ো দুটো ঘর। তার সামনে লম্বা বারান্দা। বারান্দার এককোণে রান্নার ব্যবস্থা। একটা সাদা খরগোশ আড়াল থেকে উঁকি মেরে স্বয়ম্ভুকে এক প্রস্থ মেপে নিল। চোখ পড়ল খাঁচাবন্দি শালিকটার দিকে।

‘খাঁচায় পাখি পোষা এখন কিন্তু বেআইনি স্যার।’

স্বয়ম্ভু বলল। বাণীকণ্ঠ কিচ্ছু বলল না। খাঁচার দরজাটা খুলে শালিকটাকে ছেড়ে দিল। মাস্টারের এমন কাণ্ড দেখে সকলেই হতচকিত। শালিকটা ডানা ঝাপটে সারা বারান্দা ঘুরে বেড়াতে লাগল। কিন্তু বাইরে গেল না।

‘বাহ! ভালোই পোষ মানিয়েছেন।

বাণীকণ্ঠ শান্ত স্বরে বলল, ‘কী জিজ্ঞাস্য বলুন। ও মাফ করবেন, বসতে বলতেই ভুলে গেছি।’

‘না না ঠিক আছে। আপনার বেশিক্ষণ নেব না। বলছি, প্রকাশ কাল পড়তে এসেছিল আপনার কাছে?’

‘সকালেই তো বললাম স্যার। হ্যাঁ, কাল সন্ধেবেলায় এসেছিল। পড়া পারছিল না বলে ছাড়তে দেরি হয়েছিল। আমার সব কাজ করে যে মেয়েটি, মন্দাকিনী, ওকে পৌঁছে দিয়ে আসে।’

‘ধন্যবাদ। বাড়িতে আর কে কে আছে?’

‘মানুষের মধ্যে আমি আর মন্দাকিনী। আর বাকি দুজনকে তো দেখতেই পাচ্ছেন।’

‘দিব্যময়বাবু?’

‘বাবু আগে এখানে থাকত। লাস্ট তিন বছর ফ্ল্যাট কিনে রুবিতে থাকে।’

‘উনি কি ম্যারেড?’

‘না না। বলে বলে মুখের ফ্যানা উঠে গেছে।’

‘আপনার ওয়াইফ?

‘আট বছর হল নেই। লিভার ক্যান্সার।’

‘ওহ! সরি।’

‘আমরা একটু কাজের মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাই।’

এতক্ষণ শান্ত হয়ে অবলীলায় স্বয়ম্ভুর প্রশ্নের উত্তরগুলো দিয়ে যাচ্ছিল বাণীকণ্ঠ। এবার একটু থমকাল। তবে প্রশ্ন করল না কোনও। বাণীকণ্ঠ ডাকল, ‘এই মন্দাআআআআ…!’

সঙ্গে সঙ্গে খ্যারখেরে তীক্ষ্ণ গলায় টেবিলের ওপর বসে চেঁচিয়ে উঠল বিটকেল, ‘মন্দাআঁ মন্দাআঁ!’

স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী আর রতন তো আকাশ থেকে পড়ে।

‘সর্বনাশ! শালিক পাখি কথাও বলে?’ শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে।

‘এটা গাংশালিক শিবাঙ্গী। এদের ঠিকমতো ট্রেনিং দিলে এরা প্রায় মানুষের মতোই গুছিয়ে কথা বলতে পারে।’ স্বয়ম্ভু বলে।

বাণীকণ্ঠ জানায়, ‘বলে বলে ছাত্রদের সহজ পাঠ মুখস্থ করাতে পারি না। কিন্তু বিটকেলের সব মুখস্থ।’

‘বিটকেল! নাম?’

স্বয়ম্ভু জানতে চায়।

‘হ্যাঁ। এর চেয়ে আর ভালো নাম খুঁজে পাইনি।’

ইতোমধ্যে কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে মন্দা এসে হাজির। এক ঝটকায় যে মন্দার মুখটা শুকিয়ে গেছে তা বলাই বাহুল্য। বাণীকণ্ঠ বলে, ‘এই মন্দা, এনারা কিছু প্রশ্ন করবেন তোকে।’ কোনও জবাব না দিলেও ভয়েতে যে রোগাপাতলা মন্দাকিনীর বুক শুকিয়ে এসেছে তা দেখলে যে কেউ বলে দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *