ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ১২

১২

‘আপনি কিন্তু এখনও বললেন না বাড়িতে কে আছে।’

সারারাত জেগে ক্লান্ত শরীরে প্রশ্ন করল রতন। আপনার ফোনে লাস্ট কল দিদি বলে সেভ আছে। এ কি আপনার নিজের দিদি?

শেষ ঘণ্টা তিনেক ধরে যা করছে এখনও তাই করল। চোখ তুলে জুলজুল করে রতনের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। ধৈর্যের শেষ সীমা পেরোতে চলেছে। রতন আবার বলল, ‘এভাবে বসে থেকে লাভ নেই অরণ্যবাবু। বাড়ির কেউ না এলে আপনাকে জেলেই পচে মরতে হবে। তারপর কোথায় চালান হয়ে যাবেন কেউ জানে না।’

‘কোথায় আর চালান হব? চালান তো মোনালিসা করে দিয়েছে আমায়। আমি ওকে ছাড়ব না।’

এতক্ষণে মুখ খুলল অরণ্য।

‘আবার মোনালিসা? তিন ঘণ্টা আগে মোনালিসায় কথা থেমেছিল। তিন ঘণ্টা পর আবার মোনালিসা? এ তো আচ্ছা জ্বালা হল! এই দাসবাবু।’

কনস্টেবল এগিয়ে এল, ‘স্যার?’

‘একে গারদেই রাখুন। সকাল হলে দেখছি। এবার একটু না গড়ালে শরীর ছেড়ে দেবে।’

‘বলছি তো আপনাকে। কোত্থেকে একটা বদ্ধ পাগলকে ধরে এনে নিজের রাত বরবাদ করলেন।’

ভোর হচ্ছে। বিট্টুর লাশ চলে গেল মুর্দাঘরে। তুহিনশুভ্র আসতে পারেনি। রোহিত এসে ফরেন্সিক এভিডেন্স কালেক্ট করে নিয়েছে। বিট্টু বাড়িওয়ালার কাছে নকল পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভাড়া নিয়েছিল। বিলাস বিশ্বাস। সে যে এমন অবিশ্বাসের কাজ করবে বয়স্ক বাড়িওয়ালা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

‘আর কাউকে আসতে দেখেননি? কোনও ছেলে বা মেয়ে?’

‘না সেরকম কেউ… এক-দুদিন অবশ্য একটি ছেলেকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি।

স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, ‘রাতের বেলা না দিনের বেলা?’

‘দিনের বেলাতেই।’

‘কীরকম দেখতে?’ শিবাঙ্গীর প্রশ্ন।

‘গালভর্তি দাড়ি। একটা আঁচিলও আছে মুখে। কানে দুল।’

আঁতকে ওঠে শিবাঙ্গী আর রাজারাম। সঙ্গে স্বয়ম্ভুও। কারণ, কাল রাতে দেখা ছেলেটির কথা আগেই স্বয়ম্ভুকে জানিয়েছিল দুজনে।

‘ফর্সা না কালো?’ শিবাঙ্গীর প্রশ্ন।

‘ফর্সাই।’

‘মাথার চুলটা দেখেছেন?’ এবার রাজারাম।

‘না। প্রতিবারই টুপি পরা অবস্থায় দেখেছি। তবে খুব বেশি চুল আছে বলে মনে হয় না।’

‘হুবহু এক দেখতে। কী যেন নাম বলল…’

মনে মনে নামটা হাতড়াতে থাকল শিবাঙ্গী। ‘সৌভাগ্য সিনহা।’

রাজারাম মনে করিয়ে দিল। শিবাঙ্গী কপাল চাপড়ে সামনের বাড়ির সিঁড়িতে বসে পড়ল।

‘থ্যাংক ইউ সান্যালবাবু। থানায় ডাক পড়তে পারে আপনার। আর গ্রাউন্ড ফ্লোরটা আমরা সিল করে দিয়ে যাচ্ছি। থানায় ইনফর্ম না করে কোত্থাও যাবেন না।’

একটানা বলে গেল স্বয়ম্ভু।

‘আমার ছেলে আসছে। আমাদের নিয়ে যাবে। এখানে একা থাকা আমাদের বুড়োবুড়ির পক্ষে ইম্পসেবল। প্লিজ থানা যেন না আটকায় একটু দেখবেন।

‘আমি কথা বলে রাখব। তবে নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনাদের কোনও ক্ষতি হবে না।’

বয়স্ক সান্যালবাবু হাত উলটে ‘কী যে হবে’ ভাব নিয়ে বিদায় নিলেন।

‘চোখের সামনে দিয়ে খুনি বেরিয়ে গেল। আমরা দুজন বুঝতেই পারলাম না।’ শিবাঙ্গীর কথাগুলো তিমিরের কানে যেতেই তিনি কাছে এসে বললেন, ‘শুধু আপনি নন ম্যাডাম, আমরাও দেখেছি। কিন্তু বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি। কী নরম্যাল বিহেভিয়ার!’

‘শিবাঙ্গীর চোখদুটো খুব চেনা লেগেছিল।’

রাজারামের এই কথাটায় খটকা লাগল স্বয়ম্ভুর। ‘তার মানে এই চোখ আগেও দেখেছ?’ স্বয়ম্ভু সংশয় প্রকাশ করল।

‘হ্যাঁ স্যার। কিন্তু কোথায় কিছুতেই মনে করতে পারছি না। খুব রিসেন্টলি।

‘খুনটা তার মানে কোনও মেয়ে নয়। ছেলে করছে।’

রাজারামের কথার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল শিবাঙ্গী, ‘সেটা কীভাবে সম্ভব? রুনুদেবীর নেবার নিজে দেখেছে ওই সিরিয়াল আর্টিস্টকে। খুনটা চোখের সামনে হয়েছে।’

‘গলা কাটছে, দেখেছে?’ স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন।

‘না স্যার। সামনে পাঁচিল ছিল। তাই মার্ডার মোমেন্টে দেখেনি। কিন্তু রুনুদেবীর বড়ি পড়ে যাবার পর খুনি মুখ তুলে এপাশ ওপাশ দেখছিল।’

তখনই দেখেছে।

রাজারাম বলল, ‘স্যার, আমার মনে হচ্ছে, মাস্টার মাইন্ড এই ছেলেটা মানে এখানে আসার সময় যাকে আমরা দেখেছি। সে বিট্টুর মতো কিছু লোককে কাজে লাগিয়েছে।

‘আয়ুষ্মান একেই ফোন করে ডিটেলস দিচ্ছিল। এখন বুঝতে পারছি, এই ছেলেটাকেই প্রকাশও দেখেছিল।’

শিবাঙ্গী লাফিয়ে ওঠে। আসলে চলকে ওঠে স্মৃতি। প্রকাশ বলেছিল, আরও একটি ছেলেকে ওদের গলিতে কয়েকদিন ঘুরঘুর করতে দেখেছে। সে কোনও কাজ করত না। শুধু ওদের বাড়ির সামনে মাঝেমধ্যে আসত। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘লোকটা কি শুধু স্বপ্নাকাকির সঙ্গে কথা বলত?’ প্রকাশ জানিয়েছিল, ‘না। মায়ের সঙ্গেও কথা বলেছিল।’

‘কী কথা?’

স্বয়ম্ভু প্রকাশের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। প্রকাশ ভাবে। ‘আমি শুনিনি। দেখেছি দূর থেকে। তবে মা খুব বিরক্ত হয়েছিল।’

‘কী করে বুঝলে? মা বলেছিল?’

‘না। মা জানলা দিয়ে স্বপ্নাকাকিকে গলা চেপে ফিশফিশ করে কী যেন বলছিল। কাকি হাসল। বলল, ভালোই তো। না করলে কেন? মা বলল, মরণ। আমার তো আর ভীমরতি হয়নি। এরকম অনেক লোক ঘুরঘুর করে। টালিগঞ্জের কাছে বাড়ি হয়ে এই এক জ্বালা হয়েছে। এরপরও স্বপ্নাকাকি এসে মাকে অভিনয় করতে যেতে বলে। হাতে নাকি পয়সা পাবে। নিজে কিছু তো করতে পারবে।

‘অভিনয়?’

‘হ্যাঁ তো। ছেলেটা নাকি ছেলেমেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে সিরিয়াল করায়।’

সেদিনের কথাগুলো মনে পড়তেই স্বয়ম্ভু দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘শুয়োরের বাচ্চা কত বড়ো চালু মাল আমিও দেখব। অলরেডি ভুল করতে শুরু করেছে। বিট্টুকে মারার প্ল্যান ছিল না তবু মারল। ইচ্ছে করে আমাদের চ্যালেঞ্জ করতে রুনুর মোবাইল ফেলে গেল। গাধাটা ভেবেছে সিম কার্ড আর ব্যাটারি খুলে নিলেই সব শেষ! এরা এই ওভার কনফিডেন্সেই ধরা পড়ে। ছেড়ে খেলার প্লাস পয়েন্ট।’

স্বয়ম্ভুর ঠোঁটে বাঁকা হাসি।

শুধু তাই নয়। প্রতিবার যাতে ওকে সেভাবে শক্তি প্রয়োগ না করতে হয় প্ল্যান ঠিক সেইভাবে সাজিয়েছে। হাতাহাতি হলেই প্রমাণ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এখানেও তাই। রুনুকে খুনের পর বিট্টুর বাড়িতেই আশ্রয় নেবে প্ল্যান ছিল। খুনি বিট্টুর পরিচিত। তাই টুক করে পিছন থেকে ছুরি চালিয়ে দিলেই হল।

বিশ্লেষণ করল রাজারাম। তবু খটকা লাগল শিবাঙ্গীর। ‘যে এত প্ল্যান করে খুন করছে সে কি আর ফোনের ব্যাপারে একটুও পড়াশুনো করেনি স্যার?’

‘দেখো, একটা মানুষ সব ক্ষেত্রে পারফেক্ট হতে পারে না। কিছু না কিছু লুপ হোলস তার থাকবেই। যদিও এই খুনি নিজের লুপ হোলস সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল। ও ভালো করেই জানে, ডেলিভারি করা নতুন কসমেটিক্সের কন্টেনারে বিট্টুর হাতের ছাপ পাওয়া যাবে। যদিও রিপোর্ট আসেনি। তাও আমি শিওর ওটা বিট্টুরই। এমনকি রুনুর ফোনের কল লিস্ট পেলেই বিট্টুর নতুন নম্বর ধরা পড়বে। তাই ওকে না সরালে চাপ।’

‘রুনু দেবীর কললিস্ট পাওয়া গেছে?’

‘গেছে।’

‘আপনি বিট্টুর নতুন নম্বর জানতেন?’

‘না। কাল রাতে প্রদ্যুতের ঘুম ভাঙিয়ে ওর বিশেষ এক টেলিকম অপারেটরের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করে সব ডিটেইলস পেয়েছি। ওখানে এই বিলাস বিশ্বাস নামটাই ছিল। কিন্তু ছবিটা বিট্টুর। খুনিও আর বিট্টুকে কাজে লাগাতে চায়নি। তাই একটু আলগা দিয়েছিল। সব মিলিয়েই মনে হল এবার বিট্টুর পালা। মঞ্জুর মতো।’

‘এক এক করে পাপের সব সাক্ষীদের সরিয়ে দিচ্ছে।’

‘হুম। আমি কি আর এমনি এমনি তোমাদের অপারেশনে পাঠিয়ে থানায় বসেছিলাম? সমস্যার রুট না জানতে পারলে আমাদের দৌড়েই মরতে হবে। যাই হোক, সারারাত অনেক ধকল গেছে তোমাদের। বাড়ি গিয়ে রেস্ট করে এসো।’

‘না স্যার।’

রাজারাম আর শিবাঙ্গীর গলা একসঙ্গে বেজে উঠল। শিবাঙ্গী সিঁড়ি থেকে উঠে দাঁড়াল। রাজারাম বলল, ‘চোখের সামনে দিয়ে খুনি বেরিয়ে গেছে। এখন সবার আগে ওই অভিনেত্রীকে জেরা করা প্রয়োজন।’

‘একদম ঠিক। কাল ওর নাম সার্চ করতেই দেখলাম বিজিত চ্যাটার্জির রিসেন্ট ছবিতে ও লিড ক্যারেক্টার। বর্ধমান রাজবাড়িতে শুটিং চলছে।’

‘ও বাবা, তার মানে তো ও এখন বর্ধমানে।’

শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু দুজনেই হেসে ফেলল। ‘না না, আলিপুরে।’ শিবাঙ্গীর কথা শুনে হতভম্ব রাজারাম, ‘যাক্কলা!’

***

‘মধুরিমা।’

নার্সিংহোমে ঢুকেই হাঁক দেয় দিব্যময়। ছুটে আসে পোশাক পরিহিত নার্স। ‘গুড মর্নিং স্যার। বলুন।’

‘অতনুকে দেখেছ?’

‘ডক্টর অতনু তো আসেননি।’

‘আজব। ওটি আছে এক ঘণ্টায়। ফোনেও পাচ্ছি না। নট রিচেবল বলছে।’

‘এরকম তো উনি করেন না।’

সঙ্গে সঙ্গে এক বয়স্ক নার্স ফুট কাটল, ‘দেখুন গিয়ে কোথায় চপ কাটলেট খাচ্ছে।’ আশপাশে যাঁরা ছিলেন সকলেই হেসে উঠলেন।

‘এটা কি মশকরা করার সময়? অতনু এলেই চেম্বারে পাঠাবে।’

ডাক্তারের ধমকে সব গম্ভীর। মধুরিমা শুধু সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। দিব্যময় ঘরে ঢুকে যেতেই মধুরিমা দেখল বেশ দ্রুত পায়ে অতনু এগিয়ে আসছে।

.

‘মে আই কাম ইন স্যার?’

দিব্যময় চোখ তুলতেই হাঁ হাঁ করে উঠল, ‘কোথায় ছিলি এতক্ষণ। ওটি আছে ভুলে…!’ অতনু ঘরে ঢুকে এসেছে ততক্ষণে। দিব্যময়ের কথা থেমে গেছে, ‘এ কি, গালে কে আঁচড় দিল? চোখের নীচে কালি। গলার কাছে হালকা কালশিটে। কী ব্যাপার অতনু? সাত সকালে কার সঙ্গে মারামারি করে এলি?’

‘ও… ও কিছু নয় স্যার। ওটি আছে ভুলতে পারি?’

‘কিছু নয় মানে?’

দিব্যময় চেয়ার ছেড়ে উঠে অতনুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ইচ্ছে করে কালশিটের ওপর হাত দিতেই ব্যথায় কেঁপে উঠল অতনু। ‘কাল রাতে বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎ কারেন্ট অফ। আমাদের গলিটা তো ঘুটঘুটে অন্ধকার। ইটে এমন হোঁচট খেলাম যে মুখ থুবড়ে পড়লাম। গালটা দেয়ালে ঘষে গেল আর একটা ইটে লেগে এখানে কালশিটে।’ দিব্যময় কিচ্ছু বলল না। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল খানিক। অতনু দিব্যময়ের চোখে চোখ রাখতে পারল না। গম্ভীর গলায় দিব্যময় বলল, ‘তুই কি ভুলে যাচ্ছিস যে আমি একজন ডাক্তার। হঠাৎ পড়ে গিয়ে লেগে ইনজুরি আর হাতাহাতি করার ইনজুরির তফাৎটা আমি বুঝি না?’

‘ছাড়ুন না স্যার।’

অতনু দিব্যময়কে পাশ কাটিয়ে ড্রয়ারের দিকে চলে গেল। কয়েকটা ফাইল বের করে টেবিলে রাখল। ‘আমি বরং পেশেন্টকে একটু চেক করে আসি। ওটির তো বেশিক্ষণ নেই।’ দিব্যময়ের অনুমতির জন্য অপেক্ষা না করে ঘর ছাড়ল অতনু। দিব্যময় আকাশ পাতাল চিন্তা করতে করতে নিজের চেয়ারে বসে পড়ল।

***

বর্ধমান রাজবাড়ির দিকে যেতে যেতেই স্বয়ম্ভুর মোবাইলে ভিডিওটা ঢুকল। তুহিনশুভ্র পাঠিয়েছে। সঙ্গে একটা খবরের কাগজের ফ্রন্ট পেজের ছবি। কাগজের নাম সাপ্তাহিক প্রভাকর। হেডলাইন ‘কলকাতায় সিরিয়াল কিলিং, পুজোয় বেরোলেই মৃত্যু মহিলাদের স্বয়ম্ভুর ভুরুটা কুঁচকে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল আঁখি চ্যাটার্জির মুখটা। নীরব অথচ কী চনমনে, অল্প কথায় আগুন জ্বালতে পারে। কাল রাতেও মেয়েটি সাংবাদিকদের ভিড়ে ছিল। স্বয়ম্ভুকে প্রশ্ন করতেই পারত। কিন্তু কাছেও ঘেঁষেনি। একটা সাপ্তাহিক পত্রিকার এত সোর্স যে খুন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে যাচ্ছে? সাতপাঁচ না ভেবেই ভিডিওটা চালিয়ে দিল স্বয়ম্ভু। ক্যামেরার সামনে আঁখি চ্যাটার্জি। নিজেই ধরে আছে ক্যামেরা। সাত সকালে সে আবার কালিকাপুরের সাপুইপাড়ায় গিয়ে হাজির হয়েছে! খুনের স্পটের সামনে দাঁড়িয়েই বাইট দিচ্ছে! ‘চারদিকে পুজোর মরসুম। আজ বাদে কাল মায়ের বোধন। অথচ এই সময়েই শহর জোড়া আলোর মধ্যেই একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছেন মহিলারা। সেই মহিলারাই খুন হচ্ছেন যাঁরা গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু মুখ খুলছেন না। মুখ বুঝে সহ্য করছেন সব অত্যাচার। কারণ, পতি নাকি পরমগুরু! খুনির রাগ সেইখানেই আছড়ে পড়ছে। ভয়ংকর বিপজ্জনক কেস! এর আগে কলকাতাতে এমন ঘটনা একটাও ঘটেনি। আমি এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি কালিকাপুরের সাপুইপাড়ায়। ঠিক এই জায়গাতেই কাল অর্থাৎ চতুর্থীর মধ্যরাতে খুন হয়ে গেলেন এক ভদ্রমহিলা। এখান থেকে তিন-চারটে বাড়ি পরেই রুনুদেবীর বাড়ি। খবর পেয়ে রাত দেড়টা নাগাদ পুলিশ আসে। পরে লালবাজারের গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেনও তার টিম নিয়ে এখানে আসেন। মানে বুঝতে পারছেন তো এই খুনটা মোটেও প্রথম খুন নয়। কারণ একটা খুন হলেই সেটা গোয়েন্দা বিভাগের হাতে কোনওভাবেই যায় না। কিন্তু এখানে তাঁরা এলেন। কেন জানেন? কারণ এর আগে আরও পাঁচটি এই একই কেস, একই খুন হয়েছে শহরে। কবরডাঙ্গা বস্তিতে লক্ষ্মীরানি মণ্ডল, যাদবপুরে শান্তি দাস, সোনারপুরে বীণা সাহা, পিকনিক গার্ডেনে সুমিতা ধর, রিজেন্ট পার্ক এলাকায় মিনতি দাস, মাফ করবেন, মিনতি গুহ আর গতকাল সকালে লাশ পাওয়া গেছে মঞ্জু নস্কর নামক এক আনাজ বিক্রেতার যিনি ঢাকুরিয়ার থাকতেন। রাতে এখানে রুনু লাহা। এই আনাজ বিক্রেতা মঞ্জুও এক সময় তার স্বামীর দ্বারা অত্যাচারিত হতেন। অদ্ভুতভাবেই পুলিশের তরফ থেকে এই সিরিয়াল কিলিংয়ের কেসটাকে মিডিয়ার কাছে চেপে রাখা হয়েছে। এই প্রথম শহরে ঘটতে থাকা সিরিয়াল কিলিং নিয়ে আমরা সাপ্তাহিক প্রভাকর কথা বলছি। এই ভিডিওটা আপনারা যত পারবেন সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিন। কারণ এই কেস স্টাডি করে যেটুকু দেখা যাচ্ছে খুনির মোটিভই হল অত্যাচারিত হয়েও মুখ বুঝে থাকা মহিলাদের খুন করা। এখনও আমাদের সমাজে বহু মহিলারা বাইরে সুখী দাম্পত্যের ভান করে ঘরে অত্যাচারিত হন। তাঁরা মুখ খুলতে ভয় পান। কিন্তু আর নয়। প্লিজ সবাই মুখ খুলুন। মুখ বুজে অত্যাচার মেনে নেবেন না। কে বলতে পারে, সিরিয়াল কিলারের পরবর্তী টার্গেট হয়তো আপনিই। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, লোকে বলছে নাকি সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে এই সিরিয়াল কিলার একজন মহিলা। কিন্তু কোথাও তার মুখ দেখা যায়নি। তাই বলছি, আর চুপ করে থাকবেন না, রেইজ ইউর ভয়েস। প্রশ্ন করুন প্রশাসনকে, কেন তাঁরা এমন এক ভয়ানক খবর এখনও চেপে রাখতে চাইছেন? কেন তাঁরা শহরবাসীকে সাবধান করছেন না? পুলিশের খবর চেপে রাখার জন্যেই বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন মহিলারা। তাহলে কি পুলিশ সব কিছু জেনে বুঝে চুপ করে আছে? কোনওভাবে কি তাঁরা অপরাধীকে আড়াল করতে চাইছেন? কেন? সাপ্তাহিক প্রভাকর নিউজ পেপার থেকে রিপোর্টার আঁখি চ্যাটার্জি।’

রাজারাম আর স্বয়ম্ভু কান খাড়া করে সবটা শুনল। শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার, এই মেয়ে কিন্তু ডেঞ্জারাস। একেবারে স্পটে দাঁড়িয়ে গড়গড় করে খুনের লিস্ট দিয়ে গেল।’

‘সেটাই তো চিন্তার শিবাঙ্গী। এই মেয়ে হয় মারাত্মক ইন্টেলিজেন্ট, স্টুডিয়াস আর নয়তো হাইলি সাসপিশিয়াস।’

‘বিট্টুর খুনের খবর। জানে না বোধহয়। বলল না তো।’ রাজারাম বলল।

‘এতক্ষণে আশা করি জেনে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এত তাড়াতাড়ি একটা নগণ্যস্য নগণ্য পেপার খবর পায় কী করে? বাই দ্য ওয়ে, খবরটায় দেখো তো রুনুর খুনের কথাটাও কি ছাপা হয়েছে?’

স্বয়ম্ভুর মুখ দিয়ে কথাটা খসতেই শিবাঙ্গী আর রাজারাম চোখ বোলাল। শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার পুরো খবরটা নেই।’

‘তুহিনদাকে জিজ্ঞেস করো। ততক্ষণে আমি আরেকটা ফোন সারি।’ শিবাঙ্গী তুহিনশুভ্রকে ফোন করে। এদিকে স্বয়ম্ভুও কৌশিককে ফোন করে বলে, ‘গতকাল ঢাকুরিয়া বাজারের যে আনাজ বিক্রেতা মহিলাটি খুন হয়েছে… হ্যাঁ মঞ্জু, তার সম্পর্কে একটু ভালো করে আজকেই খোঁজখবর নাও। ওই পুলিশকে জিজ্ঞেস করে হবে না। মঞ্জু আগে যে বস্তিতে থাকত সেখানে যাও। প্রতিটা লোকের সঙ্গে কথা বলো। স্পেশালি ওর হাজব্যান্ডের কথা, ওদের দাম্পত্যের কথা জানো তো। জানাও আমায়।’

‘স্যার আমরা তো জানি ওর সম্পর্কে। ওর হাজব্যান্ড আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল। লোকের সন্দেহ ছিল মঞ্জুই নাকি ওর স্বামীকে…’ রাজারাম বলল।

‘ওখানেই খটকা রাজারাম। এই আঁখি মেয়েটি অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলল যে মঞ্জুও নাকি ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার। এদিকে আমাদের কাছে উলটো খবরটাই আছে। মেয়েটি কে যে পুলিশের থেকেও বেশি খবর রাখে?

তুহিনের ফোনটা রেখে শিবাঙ্গী জানাল, ‘না স্যার, রুনুর খবরটা নেই। তাই বোধহয় তড়িঘড়ি ভিডিও করেছে।’

‘রাজারাম, ভিডিওটা বিজয়, প্রদ্যুৎ, প্রাঞ্জল কাউকে একটা পাঠিয়ে মেয়েটার প্রোফাইল অ্যান্ড অল চেক করতে বলো তো।’

‘শিওর স্যার।’

স্যার শব্দটা হাই-এর মধ্যে মিশে হারিয়ে গেল। স্বয়ম্ভূ মুচকি হাসল। ‘আহা রে! বেচারা রাজারাম। এমন হারামি বসের পাল্লায় পড়েছে যে নাওয়া-খাওয়া-ঘুম সব ঘুচতে বসেছে।’

‘না না স্যার, কী বলছেন এ সব?’

বেশ লাজুক স্বরে হেসে হেসে বলল রাজারাম। অমনি ফুট কাটল শিবাঙ্গী, ‘খাটুক খাটুক। আর কত বসে বসে ভুঁড়ি ফোলাবে?’ ভিডিওটা সেন্ড করতে করতে আড়চোখে শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে রাজারাম বলল, ‘এর উত্তর পরে দেব।’

সামনের সিটে বসে স্বয়ম্ভু বলল, ‘দু-দিন আগের রেস্টুরেন্টের বিলটা এখনও আমার ওয়ালেটে, বুঝলে রাজারাম। তোমায় দিয়ে দেব, একটু চোখ বুলিয়ে নিও।’

‘ও বাবা! তাই নাকি? দেবেন তো। দেখব।’

‘ইস! দেবেন তো দেখব। তুই দেখে কী করবি? বিলের টাকাটা দিবি?’

খ্যারখ্যার করে উঠল শিবাঙ্গী।

‘আমার সঙ্গে তো আর খেতে যাস না। গেলেই দিতাম।’

কথাটা বলতেই গাড়ির মধ্যেকার হাওয়াটা কেমন যেন হয়ে গেল। রাজারামও বুঝল, কথাটা ভুল জায়গায় বলে ফেলেছে। স্যার কিছু মনে করলেন না তো? পরিবেশটা হালকা হল স্বয়ম্ভুর কথায়, ‘হুম! সাধে কী আর বলেছি, বেচারা রাজারাম!’ বলে এমন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যে ড্রাইভার সঞ্জয়ও মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।

রাজারামের ফোনে নোটিফিকেশন। ‘স্যার, প্রদ্যুৎ বলছে ভিডিওটা অলরেডি ভাইরাল। ওর বাড়িতে সবার মোবাইলেও এসেছে।’ রাজারামের কথায় রিয়্যাক্ট করার আগেই স্বয়ম্ভুর ফোনে জয়েন্ট সিপি শুভঙ্কর কলিং। ‘হ্যাঁ স্যার… না স্যার… আমরা কিচ্ছু বলিনি… সেটাই বের করার চেষ্টা করছি স্যার… ওকে!’ ফোনটা রাখতেই পিছন সিট থেকে দুটো মুখ গোল গোল চোখ পাকিয়ে সামনের সিটের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। স্বয়ম্ভূ নিজেই ঘাড় ঘুরিয়ে কথাটা বলতে গিয়ে চমকে গেল। ‘গিলে খাবে নাকি?’ শিবাঙ্গী আর রাজারাম দুজনেই অপ্রস্তুত!

‘না না, ফোনটা এল তাই।’

শিবাঙ্গী ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করল। স্বয়ম্ভু দাঁত খ্যাচাল, ‘বস ঝাড় খেলে বড়ো আমোদ হয় না?’

‘এ মা, তা কেন?’

শিবাঙ্গী ঝাড় খাওয়া কেন্নোর মতো গুটিয়ে গেল। স্বয়ম্ভু ঝাঁ ঝাঁ করে শোনাল, ‘বাইরের একটা মেয়ে কীভাবে এত খুনের খবর পেয়ে যায়? নিশ্চয়ই তোমার টিমের কেউ এ সব লিক করছে। ওপর থেকে ঝাড় আসছে। সকাল থেকে আটটা মিডিয়ার ফোন চলে এসেছে। বেশি পাকামো মেরে তো বিট্টুকে ছেড়ে রেখেছিলে। কী হল? পেলে তার লাশ! হবে না, হবে না। খেলা অন্যভাবে সাজাতে হবে। বুঝলে?’ বাইরের লোক শুনলে ভাববে এইসব কথা বোধহয় শিবাঙ্গী আর রাজারামকে বলছে। কিন্তু না, এরা দুজনেই এখন স্বয়ম্ভুর বেশ কিছু হাবভাব বুঝে ফেলেছে। এই সব কথা জয়েন্ট সিপি শুভঙ্কর কাঞ্জিলালের কথা।

মেন রোড থেকে পুলিশের গাড়িটা ভিতরে ঢুকে একেবারে বর্ধমান রাজবাড়ির গাড়ি বারান্দার সামনে থামল। স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী আর রাজারাম তিনজনেই নামল। ছড়িয়ে থাকা শুটিংয়ের লোকগুলো অবাক হয়ে তিনমূর্তিকে দেখতে থাকে। গাড়িতে পুলিশ লেখা না থাকলে বোঝার উপায় নেই যে এরা পুলিশের লোক। শিবাঙ্গীর গায়ে গতকালের লাল পেড়ে শাড়ি। শুধু আঁচলটা কষে কোমরে গোঁজা। স্বয়ম্ভু পাঞ্জাবি সেজেছিল বলে দাড়ি, গোঁফ আর পাগড়ি খুলেও ফিটফাট। কিন্তু রাজারামের গায়ে টি শার্ট আর জিন্স। তাও হ্যালব্যাল করছে। কোনওভাবেই পুলিশের অ্যাটায়ারের সঙ্গে যায় না। শুটিংটা দোতলায় হচ্ছে বুঝে তিনমূর্তি সেগুন কাঠের রেলিং ঘেরা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে থাকে। কানে আসতে থাকে বাকবিতণ্ডার কোলাহল। কেউ যেন চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আমি যদি একটা মাস্ক তৈরি করতে পারি তাহলে আরও একশোটা মাস্ক তৈরি করে দিতে পারব।’

‘এটা হলিউড নয় সোমনাথদা। এখানে ম্যাক্সিমাম চোদ্দদিনে শুটিং গোটাতে হয়। আশা করি সেটা তুমি জানো।’

‘ক্লাইম্যাক্স সিন। হেব্বি বাওয়াল।’

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে রাজারাম বলল।

‘তোর মুণ্ডু। বিজিত চ্যাটার্জি পরিচালক। অ্যাক্টর নয়। বিজিত চ্যাটার্জি কারও একটা মুখোশ খুলছে।’

শিবাঙ্গীর কথা শেষ হতে-হতে ওপরে উঠে গেছে তিনজনে। সেটের মাঝে দাঁড়িয়ে বিজিত তড়পাচ্ছে একটি বয়স্ক লোকের ওপর। সেও পালটা ঝাড়ছে।

‘তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ বিজিত, এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমার ছত্তিরিশ বছর হয়ে গেছে। তুমি তো সবে বিশের কোটাও পেরোওনি। এর মধ্যেই এত অহংকার?’

এলোমেলো মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে দূরের বারান্দার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল বিজিত। বয়স্কের কথা শুনে তরতর করে তেড়ে এল সে, ‘সোমনাথদা, ফালতু ঘ্যাম দেখাবে না। ফালতু ঘ্যাম দেখাবে না। তোমার জন্য আমার শুটিং লাটে উঠতে বসেছে। ইউ ডেফিনিটলি ও অল অফ আস অ্যান অ্যাপোলজি।’

‘আমি একবারও অস্বীকার করেছি কী? বলছি তো কীভাবে হল আমি নিজেই বুঝতে পারছি না।’

রাজারাম বিড়বিড় করে, ‘বিজিতের ব্যবহার এত রুড? একটা বয়স্ক লোককে কীভাবে বলছে!’ বিজিত আবার চিৎকার করে উঠল, ‘তোমার মতো একটা ইরেস্পন্সেবল ওয়ার্থলেস মেকআপ আর্টিস্ট, যে কিনা কোটি কোটি টাকা বাজেটের ফিল্মের মেকআপের প্রপস ঠিক মতো রাখতে পারে না সে কীভাবে এই ইন্ডাস্ট্রিতে ছত্তিরিশ বছর কাটাল সেটাও আমি বুঝতে পারছি না।’

‘বিজিত তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।’

‘আরে থামো থামো। আমি গিল্ডে তোমার নামে কমপ্লেইন করব। তখন বুঝবে কার সীমা কত দূর।’

‘যা খুশি করে নাও তুমি। আমিও তোমাকে…’

বিজিতের পাশে দাঁড়িয়ে এক বেঁটেখাটো লোক ব্যাপারটা থামাতে চেষ্টা করল। উলটে সেও বিজিতের কাছ থেকে বেমক্কা খিস্তি খেয়ে গেল।

‘রাজারাম ঠিকই বলেছিল, ক্লাইম্যাক্স সিন। তবে রিয়েল।’

বিড়বিড় করেই গটমট করে অকুস্থলের দিকে এগিয়ে গেল স্বয়ম্ভু। সঙ্গে শিবাঙ্গী ও রাজারাম। শুরুতেই বাজখাই গলায় স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, ‘এক্সকিউজ মি, এক্সকিউজ মি!’ স্বয়ম্ভুর দু-বার হাঁকডাকে ঝুপ করে সন্ধে নামার মতো নীরবতা নেমে আসে ওই শুটিং-অট্টালিকায়। রেলা নিয়ে বিজিত বলে ওঠে, ‘এই কী ব্যাপার? কে আপনারা? বাইরে যান। এই প্রোডাকশন, বাইরে থেকে যে কেউ ঢুকে আসছে দেখতে পাচ্ছ না?’ স্বয়ম্ভু কোনও উত্তর না দিয়ে শুধু নিজের আই কার্ডটি বের করে বিজিতের মুখের সামনে ধরতেই গগনবিদারী হুংকার নিমেষের মধ্যে চুপসে চুয়ান্ন। প্রথমে কী ভেবে যেন বিজিত সামনের বয়স্ক মেকআপ আর্টিস্টের দিকে তাকায়। তারপর জিজ্ঞেস করেন, ‘পুলিশ! কেন?’

‘হোয়্যার ইজ মিস কমলিনী মিত্র?’

পাশের সেই বেঁটেখাটো লোকটি আবার বলে ওঠেন, ‘মিসেস কমলিনী।’ ভুরু বেঁকিয়ে চোখ ফুলিয়ে নাটকীয় বিস্ময় প্রকাশ করে স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীর দিকে এক ঝলক তাকায়। সে এই তথ্যটা দেয়নি স্বয়ম্ভূকে। শিবাঙ্গীও যারপরনাই অবাক। ছবি দেখে তো বাচ্চা মেয়ে মনে হয়েছিল।

‘কমলিনীকে কেন? কিছু হয়েছে?’

বিজিত প্রশ্নটা করেন। স্বয়ম্ভু চোখে চোখ রেখে একই প্রশ্ন করে, ‘কমলিনী কোথায়? আমরা তাঁর সঙ্গেই কথা বলব।’

মেকআপ রুমের দরজা ঠেলে শুটিংয়ের এডি ঢুকে খানিক ভীতমুখেই বলল, ‘কমলিনী, পুলিশ এসেছে তোমার সঙ্গে কথা বলতে।’ কমলিনী অর্ধেক মেকআপ করে আয়নার সামনেই বসেছিল। মুখ ফেরাতেই দেখে তিনজন অপরিচিত ঘরে ঢুকে এসেছে।

‘কী ব্যাপার? আপনারা কারা?’

‘বলল তো পুলিশ। শুনতে পাননি?’

কড়া গলায় উত্তরটা দিতে দিতেই শিবাঙ্গী নিজের আই কার্ড বের করল। স্বয়ম্ভু আর রাজারামও। ফর্সা পাতলা চেহারার কমলিনী আচমকা ঘাবড়ে যায়। ‘কী ব্যাপার?’ স্বয়ম্ভূ এডি মেয়েটিকে ঘর ছাড়তে অনুরোধ করল। ‘ওনার সঙ্গে আমাদের কিছু কথা আছে। প্লিজ।’ এডি মেয়েটি চলে গেল দরজা ভেজিয়ে। শিবাঙ্গী কমলিনীকে বসতে বলে নিজেই বসে পড়ল। স্বয়ম্ভু আর রাজারাম দুটো চেয়ার টেনে নিজেদের জায়গা করে নিল।

‘কমলিনী মিত্র। আসল বাড়ি ব্যান্ডেল। কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কে একটি দু- কামরার ফ্ল্যাটে থাকেন। আশা করি ঠিক বলছি।’ পরপর বলে গেল শিবাঙ্গী।

‘হ্যাঁ, কিন্তু কী হয়েছেটা কী?’

‘কাল রাত সাড়ে বারোটার পর আপনি কোথায় ছিলেন?’

‘আমার ফ্ল্যাটে।’

‘মানে দেশপ্রিয় পার্কে?

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু রাত বারোটা পঞ্চাশে আপনাকে কালিকাপুরে দেখা গেছে যে। সিসিটিভি ফুটেজ আছে।

‘আমায়! রাত বারোটার পর! অসম্ভব! আমার ফ্ল্যাটের সিকিউরিটিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন সেও একই কথা বলবে।’

‘সে তো আপনি শিখিয়ে দিয়েছেন। ওই জন্যে সবার আগে সিকিউরিটির কথা বললেন।’

‘তাহলে কীভাবে প্রমাণ করতে পারি বলুন? আমার ফোনের লোকেশন দেখুন। তাহলেই তো প্রমাণ হয়ে যাবে।’

‘বাবা! আটঘাট সবই তো জানেন দেখছি।’

‘Nowdays they show all these in cheap movies and web shows. No one even has to work hard for it anymore l’

বেশ ঘাড় নাচিয়ে কথাগুলো বলে গেলেন অভিনেত্রী কমলিনী।

‘আমরা তো বলিনি যে আপনি ফোন নিয়ে গেছিলেন। আপনি কালিকাপুর গিয়েছিলেন। আপনার ফোনটা বাড়িতেই ছিল।’

‘আমি এখনও জানতে পারলাম না ঠিক কোন কারণে আমায় এই প্রশ্নগুলো করছেন? কী হয়েছে?

‘খুন।’

‘হোয়াট? মার্ডার!’

‘হুম। কাল রাতে কালিকাপুরের সাপুইপাড়ায়…’

‘ওয়েট ওয়েট ওয়েট! কালিকাপুরে মার্ডার মানে ওই হাউজ ওয়াইফ? ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স!’

‘কী করে জানলেন?’

কমলিনী নিজের মোবাইল থেকে আঁখির ভিডিওটা চালিয়ে দিল। স্বয়ম্ভুর চোয়াল শক্ত হল। মনে মনে আঁখির জন্য রাগও হল। শিবাঙ্গী রাজারামের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ‘বুঝলাম। শুধু সিসিটিভি নয়, একজন প্রত্যক্ষদর্শী ও আছেন, র‍্যাদার দুজন। যাঁরা আপনাকে খুন করতে দেখেছেন। গঙ্গাজলের সই সিরিয়ালটা ওনারাও দেখেন। তাই আপনাকে এক ঝলক দেখেই চিনতে পেরেছেন।

‘দেখুন ম্যাডাম, আমি কাল রাতে আমার ফ্ল্যাটেই ছিলাম। ইনফ্যাক্ট লাস্ট তিনদিন ধরে এই বাড়িতে শ্যুট চলছে। বাড়ি ফিরতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে যাচ্ছে। তারপর আর খুন করার মতো ইচ্ছে হয় না জানেন। আর সিসিটিভি ফুটেজ আমাকে দেখাতে পারবেন?’

‘তদন্তের স্বার্থে নয়।

‘অথচ আপনারা র‍্যান্ডাম এসে আমায় মার্ডারের অ্যালিগেশন দিচ্ছেন। অদ্ভুত!’

‘আপনার কোনও যমজ বোন-টোন আছে?’

‘নো। আমি একাই।’

‘থাকেনও একা?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনার হাজব্যান্ড?’

‘আমরা সেপারেশনে আছি।’

‘উনি থাকেন কোথায়? ‘ ‘বেলঘড়িয়া। আর কিছু?’

‘কী কাজ করেন?’

‘টেলিকম ডিপার্টমেন্টে। নাম নৈঋত দাশগুপ্ত। বয়স চৌত্রিশ। উচ্চতা পাঁচ ফুট সাড়ে ছয় থেকে সাতের মধ্যে। আর কিছু? ও, ফর্সা। দেখতে ভালো। কিন্তু আমাদের মানসিকতার মিল হয়নি বলে…’

কমলিনীর কথার মধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়ে স্বয়ম্ভু। কমলিনী থেমে যায়। ‘আবার দেখা হতে পারে কমলিনী ম্যাডাম। কোর্টেও ডাকা হতে পারে। তবু যতটুকু ইনফরমেশন দিয়েছেন তার জন্য ধন্যবাদ।’ দলবল নিয়ে স্বয়ম্ভূ ঘর ছাড়ল। করিডর দিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতে গিয়ে দেখল সেই বয়স্ক মেকআপ আর্টিস্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে একা একা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে।

‘এত হাই পাওয়ারের চশমা পরে মেকআপ করতে পারেন?’

স্বয়ম্ভুর কানের কাছে বিড়বিড় করল রাজারাম। স্বয়ম্ভুও ফিশফিশিয়ে উত্তর দিল, ‘গত বছর ইনিই জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন অপর্ণা সেনের ছবিটার জন্য।’

‘ও! ইনিই সেই সোমনাথ চৌধুরী?’

‘রাইট।’

‘তাকেও এরকমভাবে সেটে অপমানিত হতে হয়?

রাজারাম হতবাক। স্বয়ম্ভু বলে, ‘এটাই ইন্ডাস্ট্রি ভাই। ভালো কাজ করো মাথায় তুলে নাচবে। একটু পান থেকে চুন খসুক, রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেবে। চলো।

তিনমূর্তিই চলে যাবার উদ্যোগ নিলে স্বয়ম্ভু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। সোমনাথ এক হাতে সিগারেট নিয়ে অন্য হাতে একটা জিনিস তুলে ধরে আপন মনে দেখতে থাকে। সেই জিনিসটাই প্রথমে স্বয়ম্ভু ও পরে শিবাঙ্গী আর রাজারামের চোখ টেনে ধরে। সোমনাথের হাতে একটি মাস্ক যাকে দেখতে হুবহু অভিনেত্রী কমলিনীর মতো। মুখোশের দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, ‘সোমনাথ চৌধুরী প্রস্থেটিক মেক আপ করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল।’

‘কালকের খুনিও কি এই একই মাস্ক পরে…’

শিবাঙ্গীর মুখের কথা শেষ হতে না হতেই স্বয়ম্ভু সোজা সোমনাথের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ‘নমস্কার সোমনাথবাবু।’ ভদ্রলোক চকিতে তাকালেন। তারপর কিঞ্চিৎ অস্বস্তি নিয়ে সিগারেট হাতে প্রতি নমস্কার জানালেন।

‘আপনার হাতের মাস্কটা একটু দেখতে পারি?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোমনাথ মাস্কটিকে স্বয়ম্ভুর হাতে তুলে দেন। ‘রাবারের তৈরি?’ প্রশ্ন করে স্বয়ম্ভু।

‘না। সিলিকন।’

‘অনবদ্য কাজ আপনার।’

‘অনেক যত্ন করেই রেখেছিলাম জানেন। কীভাবে কোথায় খোঁচা লেগে যে মাস্কটার গালটা নষ্ট হয়ে গেল!’

আপশোসে গলা ধরে এল বয়স্ক লোকটার।

‘খোঁচা লেগে? না সোমনাথবাবু। এ তো কারও নখের আঁচড়ের মতো।

‘আমার বাড়িতে নখের আঁচড় দেবার মতো কেউ নেই। এক যদি ইঁদুরে কাটে… তাও এরকম!’

‘ঠিক কখন দেখলেন এটার এরকম অবস্থা?’

‘সকালে উঠে যখন শুটিংয়ে আসব তখন। রাতেও ঠিক ছিল। আমি তো বলতেই পারতাম এটা চুরি হয়ে গেছে, রাস্তায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু মিথ্যে আমি বলব কেন বলুন? সত্যিই তো এটা আমার বাড়িতেই নষ্ট হয়েছে।

‘এটা যে ঘরে রেখে ছিলেন সে ঘরে আর কেউ ঢুকেছিল কি, আপনি ছাড়া?’

‘না। আমার ঘরে ঢোকার মতো কেউ নেই।’

এক্কেবারে শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা বারান্দায় ফেলেই পা দিয়ে পিষে দিলেন সোমনাথ।

‘নার্ভের ওষুধ খান?’

রাজারাম প্রশ্ন করল। সোমনাথ যেন অন্য জগতে ছিলেন। সেখান থেকে ইহজগতে আছড়ে পড়লেন, ‘অ্যাঁ? না তো।’

‘এত হাত কাঁপছে কেন?’

‘বয়স হয়েছে। এত উত্তেজনা সহ্য হয় না।

‘তুহিনদা, রুনুদেবীর হাতের নখগুলো এক্সামিন করেছ?’

স্বয়ম্ভুর কানে মোবাইল। তুহিন উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, ‘আরে আমি তোমাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম। আবার কাটলেট এবং সেটা ডেফিনিটলি চিকেন কাটলেট।’

‘দুজনেরই?’

‘না না, শুধু রুনু লাহার হাত থেকে। স্পেশালি কবজির কাছ থেকে।’

‘কবজি ধরেই তো টেনেছে। আচ্ছা যেটা জিজ্ঞেস করছি বলো…’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ করেছি। ডান হাতের নখের মধ্যে সিলিকনের স্যাম্পেল পেয়েছি।’

না চাইতেও স্বয়ম্ভুর চোখটা সোমনাথের দিকে ঘুরে গেল। ‘কটা আঙুল? দুটো?’

‘হ্যাঁ দুটো। তুমি জানলে কী করে?’

‘পরে বলছি।’

ফোনটা কেটেই সোমনাথকে প্রশ্ন করে স্বয়ম্ভু, ‘কাল আপনি ঠিক কত রাতে বাড়ি ফিরেছেন সোমনাথবাবু?’

‘কেন বলুন তো?’

‘বলুন না।’

‘সাড়ে বারোটার পর। শুটিংয়ের গাড়ি আমায় এই বারোটা পঁয়ত্রিশে বাড়িতে নামায়।’

‘কোথায় থাকেন?’

‘হালতু। কসবায়।’

‘আপনি গাড়ি থেকে নামলেন। তারপর?’

‘বাড়িতে ঢুকে জামাকাপড়…’

‘কেউ দরজা খুলে দিল? নাকি আপনি নিজেই…’

‘না না, আমি নিজেই খুললাম। কেউ তো থাকে না।’

‘বিয়ে-থা করেননি।’

‘করেছিলাম। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় স্ত্রী মারা যান।’

‘কী হয়েছিল?’

একটু ইতস্তত করে সোমনাথ বলেন, ‘সুইসাইড করেন।’

‘কেন?’

‘বাচ্চা-বাচ্চা করে পাগল হয়ে গিয়েছিল। তারপর যেদিন ও জানতে পারে যে ও কোনওদিনই মা হতে পারবে না, তখন আর নিতে পারেনি। তারপর থেকে গুম হয়ে যায়। আমি একদিন শুটিং থেকে ফিরে দেখি হাতের শিরা কেটে… সব শেষ।’

‘সরি সোমনাথবাবু। আসলে না চাইলেও আমাদের অনেক প্রশ্নই করতে হয়। ‘না না, ইটস ওকে।’

‘আচ্ছা, বাড়ি ফিরে আপনি কি সত্যিই এই মাস্কটা দেখেছিলেন যে ঘরে একদম ঠিক অবস্থায় আছে?’

সোমনাথ ভাবলেন। বললেন, ‘কে জানে? মনে তো হচ্ছে! ঠিক মনে করতে পারছি না।’

স্বয়ম্ভূ একটু ভালো করে সোমনাথকে মেপে নিয়ে বলল, ‘কাল রাতের কথা মনে

করতে পারছেন না?’

‘সম্ভবত দেখেছিলাম। আসলে চোখে এত পাওয়ার। কী দেখতে কী দেখেছি, তখন এই আঁচড়ের দাগ ছিল কিনা তাও মনে নেই।

‘বেশ! তবে এই জিনিসটা আপনাকে আমাদের দিয়ে দিতে হবে।’

স্বয়ম্ভুর কথা শুনে হতভম্ব সোমনাথ। ‘এই নষ্ট মাস্কটা নিয়ে আপনি কী করবেন?’

‘কাল একটা খুন হয়েছে। আমাদের সন্দেহ সেই খুনের সঙ্গে এই মাস্কটার একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে।’

‘কী বলছেন স্বয়ম্ভুবাবু? এটা আমার নিজের হাতে তৈরি। এটা দিয়ে কে কীভাবে খুন করবে?’

সোমনাথের শরীরে কাঁপুনি যেন বেড়ে গেল। শুটিংয়ের একটি লোক সব কথা আড়ি পেতে শুনেই চলে যায়।

‘প্রত্যক্ষদর্শীর মত, যে মেয়েটি খুন করেছে সে…’

বলেই কমলিনীর মুখের মাস্কটি তুলে দেখায় স্বয়ম্ভু। চামড়ার ওপর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় সোমনাথের গলার নলি ওপর-নীচে ওঠানামা করল।

‘বিশ্বস্ত সূত্রে খবর, টলিউড ইন্ডাস্ট্রির স্বনামধন্য মেকআপ আর্টিস্ট, যিনি গত বছর অপর্ণা সেনের ছবিতে অনবদ্য কাজের জন্য জাতীয় সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন, সেই সোমনাথ চৌধুরীকে আজ শুটিং স্পটে গিয়ে গোয়েন্দা দপ্তর জিজ্ঞাসাবাদ করে। শুধু তাই না, সেই একই শুটিং স্পটেরই একটি বন্ধ ঘরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় অভিনেত্রী কমলিনী মিত্রকে। কারণটা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠবে আপনাদের। কলকাতায় সাতাশে আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে একের পর এক খুন। এখনও পর্যন্ত মোট আটটা খুন হয়েছে। গতকাল একই সঙ্গে দু-দুটো মার্ডার হয়ে গেছে কালিকাপুর এরিয়ায়। এর মধ্যে সাতজন মহিলা। একজন পুরুষ। মহিলাদের মধ্যে এমন ছয়জন খুন হয়েছেন যাঁরা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার…’

***

‘বুঝতে পারছ? খুব তো মেয়ের সঙ্গে নেচেছিলে মেয়েকে অ্যাক্টিংয়ে নামাবে বলে। কী অবস্থা দেখো!

টিভি থেকে চোখটা নামিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিমল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দম্পতির কথা ওর মনোযোগ কেড়ে নিল। স্বামীর কথায় উত্তর দিল বউ, ‘কোথায় ক্রিমিনাল নেই বলো তো? ঘরে ঘরে কত ক্রিমিনাল আছে তুমি জানো? এটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলে খবরে এসেছে।’

‘এখনও তর্ক করবে?’

‘তর্ক নয়। এটাই সত্যি। নিউজ পেপার খুললেই হাজারটা খুনের খবর। কাজের লোক বৃদ্ধ মালিককে মার্ডার করে, প্রেমিকের হাতে গৃহবধূ খুন, সম্পত্তির লোভে বাপ-মাকে কেটে টুকরো করে জলের ট্যাঙ্কে ফেলে রেখেছে ছেলে। এরা সবাই অ্যাক্টিং করে?’

‘যাক গে, তোমার সঙ্গে তর্ক করতে পারব না।

বিমলের মনটা তেতো হয়ে গেল। টিভির নিউজটা বড্ড একঘেয়ে লাগছে। করিডরের দিকে এগোতে গিয়েই হেলথ লাইনের রিসেপশন থেকে অ্যানাউন্স করল, ‘তন্দ্রা জানার বাড়ির লোক।’

‘হ্যাঁ আছি।’

বলেই বিমল দৌড়ল। রিসেপশনিস্ট জানাল, ‘আগামীকাল তন্দ্রাকে ডক্টর রিলিজ করে দেবেন। আজ বিকেলে ডক্টর থাকবেন। চাইলে দেখা করতে পারেন।’

‘থ্যাংক ইউ।’

‘বাই দ্য ওয়ে, আপনি কি তন্দ্রা জানার হাজব্যান্ড?’

‘না না। আমি ওর… মানে তন্দ্রা আমার পার্লারে কাজ করে।

‘ও। ওনার হাজব্যান্ড আসবেন না?’

বিমলের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, ‘কোন মুখে আসবেন? ওর জন্যই তো তন্দ্ৰা আজ এখানে।’

‘সে যাই হোক। আপনি তো ওর লিগাল গার্জেন নন।’

‘নার্সিংহোমের বিলটা আমিই দিচ্ছি এখনও। ওর হাজব্যান্ড একটি পয়সাও দেয়নি। তাই আমিই গার্জেন। অসুবিধে হলে ডক্টর দিব্যময় মুখার্জির সঙ্গে কথা বলে নেবেন।’ রিসেপশনিস্ট মেয়েটির মুখটা ছোটো হয়ে গেল। ‘ও হো, এক সেকেন্ড। একটা বিলে আপনাকে একটু সাইন করতে হবে।’

‘দিন।’

ডান হাতটি বাড়িয়ে রিসেপশনিস্টের দেওয়া পেনটা নিয়ে খসখস করে সই করে দিল বিমল। ‘এবার যাই?’

‘ইয়েস স্যার।’

অনেক ইতস্তত করে বিমল তার ডান হাতটা তন্দ্রার মাথায় রাখল। চোখ মেলে তাকাল তন্দ্রা। চোখের পাতা ভারী হয়ে আছে মেয়েটার। বিশেষ করে ডান চোখের পাতা। ফোলাটা আর কালশিটেটা এখনও আছে। তন্দ্রার স্বর ফুটল, ‘বিমলদা। এসেছ?’

‘হুম। আর কারও আশা করছিলি?’

ঢোঁক গিলল তন্দ্রা। ছলছল করে উঠল চোখ দুটো। ‘বাবা-মা খবর পায়নি বোধহয়!’

‘পেয়েছিল। আমিই দিয়েছিলাম।’

‘তাই?’

হাসি ফুটল মেয়েটার মুখে। কিন্তু বেশিক্ষণ সেই হাসি ধরে রাখতে পারল না, ‘কই, আসেনি তো?’ বিমল মাথা নীচু করে পাশের চেয়ারটায় বসল। বিমলের মুখ দেখেই তন্দ্রা বুঝে নিয়েছে মোদ্দা কথাটা। এরপরও মেয়েটার কাটা ঠোঁটে হাসি ঝিলিক দিল। হাসি? নাকি নিয়তির ধারালো ছুরি! ‘দেখেছ তো, আমার অবস্থার কথা কেন বাবা- মাকে জানাইনি? তোমরা বারবার বলেছ পুলিশে নালিশ করতে। কিন্তু তার পরেরটা কেউ ভাবো না। ও জেলে চলে গেলে আমি যাব কোথায়? কে দেখবে আমায়?’

‘এখন কে দেখছে তোকে?’

তন্দ্রা তাকাল বিমলের দিকে। ‘বল। তোর স্বামী তোকে দেখছে, তাই না?’

‘রাগ কোরো না। মারুক, কাটুক যাই হয়ে যাক, ও আমার মাথার ছাদ কেড়ে নেবে না। আমি জানি।’

‘জানিস, এক্ষুনি একটা খবরে দেখলাম, কলকাতায় নাকি সিরিয়াল কিলিং শুরু হয়েছে। কারা খুন হচ্ছে জানিস?’

তন্দ্রার চোখে বিস্ময় আর প্রশ্ন একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। বিমল বলল, ‘যে সব বউরা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স সহ্য করেও পুলিশের কাছে যাচ্ছে না, খুনি তাদেরকে মারছে।’

‘খুনি কি পাগল?’

‘জানি না। তবে খুনিকে যদি আমি চিনতাম নিজে তোকে খুন করার সুপারি দিতাম।

ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা ফুঁড়ে প্রথম ফ্যানটা যেমন চলকে ওঠে ঠিক তেমনি করে তন্দ্রার ঠোঁট চিরে হাসিটা বেরিয়ে এল। ‘বেঁচে যেতাম।’ ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল বিমল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘ইডিয়ট! এখন আসি। কাল এসে তোকে বাড়ি নিয়ে যাব।’

‘কালই ছেড়ে দেবে?’

‘হ্যাঁ। কেন? আর ক’দিন থাকবি?’

লজ্জা পেয়ে জুলজুল করে চেয়ে থাকা চোখদুটো নামিয়ে নিল তন্দ্ৰা। ‘আমি জানি, নার্সিংহোমের সব টাকা তুমি দিচ্ছ।’

‘ধুস। তোর বর তো আমায় ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়েছে। বলেছে ওর আদরের বউটাকে খুব ভালো করে সুস্থ করে আমি যেন বাড়ি নিয়ে যাই।’

‘আমার মাইনে থেকে কেটে নিও বিমলদা। আমি বলছি…’

‘ভেবে দেখব।’

‘আমার জায়গায় কাউকে নাওনি তো?’

‘শোন, আমি হলাম ব্যবসায়ী মাল। যা দিই, তার ডবল উশুল করে নিই। তোর জায়গায় লোক না নিলে আমার পার্লার চলবে কেমন করে শুনি? তা ছাড়া তোর বর তো কাজ করলেই ক্যালাবে। আবার নার্সিংহোমে এসে ভর্তি হবি। টাকা আসবে কোত্থেকে? বাড়ি ফের। তারপর গয়নাগাটি যা আছে সব বেচে হোক, বন্ধক দিয়ে হোক আমার টাকা শোধ করবি। নইলে আমি তোকে পুলিশে দেব।’

তন্দ্রার মুখে গ্রহণের ছায়া। বিমলের একটু খারাপই লাগল। একে সারা শরীরের স্বামীর দেওয়া ব্যথা নিয়ে কাহিল বেচারি। তার ওপর কথার চাবুক! গলাটা নরম করে শান্ত মুখে বিমল বলল, ‘এত কিছু ভাবতে হবে না। কাল এসে ছাড়িয়ে আবার খোঁয়াড়ে পুরে দেব। থাকিস তোর হারামি বরটার সঙ্গে। চলি।’

বিমল চলে গেল। তন্দ্রার খুব ইচ্ছে করছিল একটা প্রণাম করতে। শরীরে দিল না।

সব টিভি চ্যানেলেই এখন এক্সক্লুজিভ নিউজ। সবাই দাবি করছে ‘আমরাই দেখিয়েছি লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ কীভাবে লুকিয়ে গিয়েছিল সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনা। দফায় দফায় টেলিফোনে ধরা হচ্ছে কমলিনীকে। সোমনাথ বেচারি এক্কেবারে ক্যামেরার সামনে। কমলিনী কেঁদেই ফেলেছে। সোমনাথ কাঁদো কাঁদো।

‘এক্কেবারে মিথ্যে কথা। মিডিয়া তিল থেকে তাল করছে। আমি খুনের সঙ্গে জড়িত হলে পুলিশ আমায় ছেড়ে রেখে দিত? আপনারা কি সব বোকা হয়ে গেলেন?’

সোমনাথ মেজাজ হারাচ্ছে। টিভির ক্যামেরাতেও ধরা পড়ছে সোমনাথের কাঁপুনি। সাংবাদিকের প্রশ্ন, ‘তাহলে এই সিরিয়াল কিলিংয়ের জন্য আপনাকে কেন জেরা করা হল?’

‘আবার আপনারা ভুল করছেন। খোলা ছাদের নীচে শুটিং স্পটে এসে গোয়েন্দা বিভাগ জেরা করে না। ওনারা কয়েকটা প্রশ্ন করেছেন মাত্ৰ।’

‘কিন্তু খুনের সঙ্গে আপনার নামটাই বা কেন উঠে এল? অন্য কেউ নয় কেন?’

‘সে আমি কী করে জানব? স্বয়ম্ভু সেনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।’

শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল আড়চোখে স্বয়ম্ভুর দিকে দেখে নিলেন। স্বয়ম্ভুও অসহায় মুখে শুভঙ্করের চোখে চোখ রাখল। বাইরে থেকে ঘরে ঢুকে এল কৌশিক, ‘স্যার, বাইরে তো সাংবাদিকদের ঢল নেমেছে। সবাই স্বয়ম্ভু সেনের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।’

‘তোমায় যে কাজটা দিয়েছিলাম সেটার কী আপডেট কৌশিক?’

জয়েন্ট সিপির সামনেই স্বয়ম্ভু পালটা প্রশ্ন করল কৌশিককে।

‘ওখান থেকেই আসছি স্যার। প্রথমে সবাই চর্বিত চর্বনই গাইছিল। কিন্তু শেষে একজন মহিলা, এই সত্তরের কাছাকাছি বয়স। সে বলল, মঞ্জু নাকি মন দিয়েই সংসার করত। কিন্তু ওর বর ওকে টর্চার করত। আনাজ বিক্রির টাকা জুয়োর ঠেকে উড়িয়ে দিত। এদিকে মাসের মাঝে টাকা ফুরিয়ে গেলে মঞ্জুর সঙ্গে অশান্তি করত।’

‘তাহলে বাকিরা অন্য কথা কেন বলছে?’

‘ওই যেদিন থেকে এম এল এ-র ছেলের যাতায়াত শুরু হল খেলা গেল ঘুরে। মঞ্জু যা খুশি করতে শুরু করল। স্বামী মারলে পালটা মার দিত। একদিন নাকি সাড়াশি গরম করে বেধড়ক মেরেছিল বরটাকে।’

‘বর পুলিশে যায়নি?’

‘না। চুপচাপ সহ্য করেছে। তারপর নাকি বরটা নিজেই গায়ে আগুন দিয়েছে।’

‘ডাহা মিথ্যে কথা। আমি ফরেন্সিক রিপোর্ট দেখেছি। ওর বরের গায়ের আগুনটা পিঠের দিক থেকে লেগেছিল। মৃত্যুর সময় বরের গা ছিল খালি, নীচে ছিল বার্মুডা। তাই কাপড়ে আগুন লাগার চান্স নেই। তাহলে পিঠে আগুন লাগল কেমন করে?’

‘তার মানে স্যার, বস্তিবাসীরা প্রথমে ঠিকই সন্দেহ করেছিল। মাঝখানে এম এল এ-র ছেলে মাথা গলাতেই সব ঠান্ডা হয়ে যায়।

শিবাঙ্গী বলল।

‘আর এই পুরো কেসটা জানে ওই মেয়েটি, আঁখি চ্যাটার্জি।’

‘হু ইজ আঁখি চ্যাটার্জি?’

শুভঙ্করের প্রশ্ন।

‘স্যার, সাপ্তাহিক প্রভাকরের মেয়েটি।’

‘দ্যাট ভাইরাল গার্ল?’

স্বয়ম্ভু হাসল। ‘ইয়েস স্যার। ও ভাইরাল হল আর এদিকে নিউজ চ্যানেলগুলো আমি করেছি, আমি করেছি বলে হাউমাউ করছে।’

‘যে যা খুশি করুক। আমি জানতে চাই তোমাদের আগে ওই মেয়েটি জানছে কী করে? তার মানে এখানেও তোমরা ফেইলিওর!’

‘সরি স্যার, কিছু মনে করবেন না। গোয়েন্দারা মাঠে নামলেই বাজিমাত করে বেরিয়ে আসবে, টপাটপ ক্রিমিনালদের জেলে ভরে দেবে এই ধারণাটা ফিল্ম ডিরেক্টরদের জন্য কিংবা রাইটার-রিডারদের জন্য ঠিক আছে। বাট বাস্তবে কি সত্যিই তাই হয়? আপনার মনে হয় সেটা? মানে আমি জাস্ট জানতে চাইছি।’

‘পাবলিক এটাই এক্সপেক্ট করে স্বয়ম্ভু। সাধারণ মানুষ যা পারে না, গোয়েন্দারা সেটাই করে দেখায়।

‘নিশ্চয়ই করে দেখায়। তার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় চাই। এর আগের দুটো কেসেও তো দেখলেন।’

‘পাস্ট ইজ পাস্ট স্বয়ম্ভু! আমি বর্তমানে বাঁচি আর আমি চাই আমার টিমও সেভাবেই বাঁচুক। যাও নীচে গিয়ে দাঁত বের করে একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে এসো। নইলে সব ছিঁড়ে খাবে।

জুতোয় আওয়াজ তুলে ঘর কাঁপিয়ে বেরিয়ে গেলেন শুভঙ্কর। স্বয়ম্ভূ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। রাজারাম এগিয়ে এল, ‘স্যার, আপনি পারমিশন দিলে আমি রিপোর্টারদের হ্যান্ডেল করতে পারি।’

কথাটা শুনেই কৌশিকের ভুরু বেঁকে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল।

‘নো। বিট্টুকে ছেড়ে রাখা আমার ডিসিশন। মিডিয়াকে অন্ধকারে রাখাও আমার ডিসিশন। মঞ্জুর অতীত জানতে না পারা আমার ব্যর্থতা। তাই কাঁকড়ার ঝাঁককে আমিই হ্যান্ডেল করব। তা ছাড়া তুমি বা শিবাঙ্গী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে কারও কারও ভুরু ভেঙেচুরে যায়। যেটা নট হেলদি ফর টিম।’

গাঁড় মারিয়েছে! এ কি ইন্দ্রের মতো সহস্রলোচন নাকি? কথাগুলো মনে মনে আওড়াল কৌশিক। স্বয়ম্ভূ গটগট করে ঘর ছাড়তে গিয়েও থমকে গেল। ঝড়ের বেগে পিছন ফিরে কৌশিককে জিজ্ঞেস করল, ‘কৌশিক, শুধু এম এল এ-র ছেলেই আসত মঞ্জুর সঙ্গে দেখা করতে?’

‘হ্যাঁ স্যার। আর তো কারও কথা বলল না কেউ।’

‘হুম।’

অবশেষে ঘর ছাড়ল স্বয়ম্ভু।

‘পুজোর মরসুমে ন’টা খুন হয়ে গেল কলকাতায়।

সাংবাদিক মেয়েটির কথা শেষ হতে না হতেই স্বয়ম্ভুর উত্তর ধেয়ে এল, ‘তাই নাকি? নয় নম্বর খুনটা হয়ে গেছে? আমরা তো জানতাম আটটা।’

পাশের সাংবাদিকদের মধ্যে গুনগুন হাসির রোল। স্বয়ম্ভুর চোখ উত্তর দিতে দিতেই ভিড়ের মধ্যে কাউকে যেন খুঁজতে চেষ্টা করল।

‘সরি, আমার ভুল। এই আটটা খুন পুলিশ আড়ালে রাখল কেন?’

‘কী করত? খুন হয়েছে খুন হয়েছে বলে লাফালাফি করত?’

এবার অন্য আরেক বুমধারী বলে উঠল, ‘তা না করুক, জনগনকে সাবধান তো করতে পারত।’

‘প্রথম কথা, লালবাজার গোয়েন্দা দপ্তরের হাতে কেসটা যখন পৌঁছোয় তখন অলরেডি চারটে খুন হয়ে গেছে। তারপরে আমরা কেসটা হাতে নিয়েছি। পাবলিককে কিছু বলার আগে আমাদের তো ব্যাপারটা বুঝতে হবে।

‘তার মানে এখনও আপনারা কিছুই বুঝতে পারেননি?’

‘সেটা এই মুহূর্তে আপনাদের জানাতে পারছি না। শুধু একটা কথা বলতে পারি, এই পুজোতে মানুষ নির্বিঘ্নে ঠাকুর দেখবে। প্যানিক ছড়াবেন না। কারণ খুনি রাস্তার র‍্যান্ডম লোককে খুন করছে না। করছে সেই সব মহিলাদের যারা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হয়েও মুখ খোলেননি। পুলিশের কাছে যাননি। সাবধানে তাঁরা থাকবেন। বাইরের লোকের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করবেন না। মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়ে কাউকে বাড়িতে অ্যালাও করবেন না।

হঠাৎ একটি মেয়ের গলা, ‘স্যার লক্ষ্মীরানি মণ্ডল লোকের বাড়ি কাজ করতেন। কাউকে বাড়িতে অ্যালাও করেননি। তাহলে সে কীভাবে খুন হল?’ স্বয়ম্ভু এতক্ষণ একেই খুঁজছিল। আঁখি চ্যাটার্জি। কনফারেন্স রুম ভর্তি ভিড়ের মাঝে একদম শেষ সারিতে মুখ গুঁজে বসেছিল।

‘বাড়িতে অ্যালাও করলেই খুন হবে এ কথা কিন্তু বলিনি। ওটা জাস্ট একটা সেফটি। কেউ যদি নিজের জীবনে অচেনা মানুষকে অ্যালাও করেন তাহলেও বিপদ ঘনাতে পারে আর সেটা এই কেসে হয়েছে। যাঁরাই ভিক্টিম তাঁরাই কোনও না কোনওভাবে গত দেড়-দুমাসের মধ্যে অচেনা কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক পাতিয়েছেন। বলছি না সেটা প্রেমিক প্রেমিকার সম্পর্ক। যে কোনও রিলেশন। ভালো মেকআপ শিখিয়ে অভিনয়ে নামাবেন, এমন টোপ দিয়ে অনেক মহিলাকে এরা ফাসাচ্ছে।’

‘এরা? মানে একজন নয়? গ্যাং আছে নাকি?’

টক করে স্বয়ম্ভুর লুজ টক ধরে নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিল আরেক সাংবাদিক। স্বয়ম্ভু মনে মনে জিভ কাটল। এটা বোধহয় না বললেই হত। কিন্তু এবার তো স্বয়ম্ভুকেই মেকআপ ম্যানকে মেকআপ দিয়ে ঢাকতে হবে। সবে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই আবারও আঁখি চ্যাটার্জি, ‘বিটু কি সেই গ্যাংয়েরই লোক?’ স্বয়ম্ভু কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে যায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাজারাম আর কৌশিক মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। শিবাঙ্গীর ভুরুতে নতুন করে ভাঁজ পড়ে।

‘হ্যাঁ। বিট্টু খুনির পোষা লোক।’

‘তাহলে তাকে কেন খুন হতে হল? কে খুন করল? বিট্টু তো পলাতক ছিল। কিন্তু তাকে ধরতে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ব্যর্থ হয়েছিল। মাত্র একজনকে যেখানে পুলিশ ধরতে পারে না সেখানে একটা গ্যাংকে ধরবে কী করে? কোথায় আমাদের নিরাপত্তা?’

আঁখি যেন দুর্বার হয়ে উঠেছে। তাকে আটকানো যাচ্ছে না। শিবাঙ্গীর চোখ কৌশিকের দিকে পড়াতে সে নিজেকে আরও অপরাধী ভাবছে। স্বয়ম্ভূ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘সকল সাংবাদিককে বলছি, আপনারা আমার ইন্টারভিউ নিয়ে একদম সময় নষ্ট করছেন। তার বদলে ওনার, মানে আঁখি চ্যাটার্জির ইন্টারভিউ নিন। কারণ একমাত্র উনিই জোর দিয়ে বলছেন এটা একটা গ্যাংয়ের কাজ। আমরা এ বিষয়ে কিচ্ছু বলিনি।’ স্বয়ম্ভুর কথায় সকলের চোখ ঘুরে আঁখির দিকে। বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিল স্বয়ম্ভু। ঘর ভর্তি লোকের মধ্যে প্রশ্নের গুঞ্জন। এর মধ্যে একজন প্রশ্ন করেই ফেলল, ‘আঁখি আপনার কাছে কি প্রমাণ আছে যে এটা গ্যাংয়ের কাজ? থাকলে আমাদের বলুন।’

‘প্রমাণ আমাদের চারপাশেই আছে। একজন মানুষের পক্ষে এইভাবে খুন করা কখনওই সম্ভব নয়।’

‘আঁখি ম্যাডাম, গলায় প্রেস কার্ড ঝোলালেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। তার জন্য কিছু পড়াশুনো লাগে। সিরিয়াল কিলারদের সম্পর্কে একটু পড়াশুনো করে নিন। তাহলেই বুঝতে পারবেন একা একটা মানুষ ঠিক কী কী করতে পারে।’

স্বয়ম্ভুর এই অপমানে মোটেও স্তব্ধ হল না আঁখি। বরং নিমেষের মধ্যে গলা তুলল, ‘তাহলে মঞ্জু, বিট্টু, আয়ুষ্মান এরা কারা? চারজন সঙ্গী নিয়ে একটা খুনি খুন করে বেড়াচ্ছে সেটা গ্যাং ছাড়া কী?’

‘বেশ। আপনার কথায় গ্যাং। তাতে কী?’

‘তাতে এই, আপনারা সব জেনেশুনে কেন পাবলিককে কিছু জানাননি? তাহলে হয়তো গতকালের মৃত্যুগুলো ঘটতই না।

‘পুলিশের কাজ প্যানিক করানো নয়। আর গোয়েন্দাদের কাজ গোপনে তদন্ত করা। আজ এর চেয়ে একটা বেশি কথাও আপনাদের বলতে পারব না। তবে একটা কথা বলতে পারি, পুজোতে সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুরুন আর যাঁরা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার হচ্ছেন তাঁরা চুপ করে সহ্য না করে পুলিশকে জানান। আমাদের মেইল করুন, ফোন করুন।’

‘স্যার সোমনাথ চৌধুরি আর কমলিনী মিত্র এখানে কীভাবে জড়িত?’

‘কে বলল জড়িত? আমরা শুধু বিশেষ কারণে ওঁদের প্রশ্ন করেছি। দয়া করে ওঁদের বিরক্ত করবেন না।’

‘স্যার, কাউকে সন্দেহ করছেন?’

কলকাতার নামকরা সংবাদপত্রের একজন পুরুষ সাংবাদিক প্রশ্নটি করল।

‘অনেককে সন্দেহ করছি। এমনকি আপনাদেরকেও। কত তথ্য আপনারা জানেন। যা আমরা জানতে পারি না। কীভাবে জানলেন বলুন তো?’

মুহূর্তের নীরবতা। সক্কলে থমকে গেছে। কারও কারও আড়চোখ আঁখির দিকে। স্বয়ম্ভুর আঁখি সেটি ভালো করেই লক্ষ করল। ফিক করে হেসে পরিবেশটাকে হালকা করে দিল স্বয়ম্ভু। ‘জাস্ট জোকিং। আজকের মতো এখানেই ইতি। ধন্যবাদ।’ আরও হাজারও প্রশ্ন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল সাংবাদিকেরা। কিন্তু স্বয়ম্ভু চেয়ার ছেড়ে উঠে ভিতরে চলে গেল। শিবাঙ্গীর চোখ আঁখির দিকে আটকেই রইল। মেয়েটা কেমন যেন মুখ থমথমে করে দাঁড়িয়ে আছে সবার শেষে। কৌশিকের ঠেলা খেতেই শিবাঙ্গীর ঘোর ভাঙল। ‘এবার কি তুই স্পিচ দিবি? সবাই ছেঁকে ধরবে। ভেতরে চল।’

প্রেসমিট সেরে নিজের ঘরে দ্রুত পায়ে ঢুকে টেবিলের ওপরেই বসে পড়ে স্বয়ম্ভু। মাথা নামিয়ে মুখ নীচু করে বসে থাকে। রাজারাম পাশে এসে দাঁড়ায়। অদ্ভুত এক স্থবির মূর্তির মতো চোখের সামনে স্বয়ম্ভুকে দেখছে। আঁখির প্রশ্নগুলো কি স্বয়ম্ভুর মধ্যে এই তোলপাড় এনে দিল? ঘরে ঢুকল শিবাঙ্গী আর কৌশিক। স্বয়ম্ভু আর রাজারামের প্রস্তরমূর্তি চোখের সামনে দেখে কৌশিক ভুরু নাচিয়ে জানতে চায় কী হয়েছে স্বয়ম্ভুর। রাজারাম উত্তরহীন কাঁধ নাচায়। একমাত্র শিবাঙ্গী সাহস করে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। স্বয়ম্ভু চোখ তুলে তাকায়। তাকিয়েই থাকে। চাউনিতে শূন্যতা আর বিস্ময় একই সঙ্গে আলোছায়ার মতো খেলা করছে। শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভুর মাঝে নীরবতার মুহূর্তটা শিবাঙ্গীই ভাঙল, ‘ভাবছেন তো, চতুর্থ নম্বর কে?’ তৎক্ষণাৎ স্বয়ম্ভুর মুখে ছায়া কেটে কেবল আলো। জানত, একমাত্র শিবাঙ্গীই ধরতে পারবে স্বয়ম্ভুর মনের কথাগুলোকে।

‘কোন চতুর্থ জন? কী ব্যাপার একটু বলবি।’

রাজারাম প্রশ্ন করল। শিবাঙ্গী বলল, ‘নানান কথার মাঝে আঁখি চ্যাটার্জি একটা কথা বলে ফেলেছে। চারজন সঙ্গীকে নিয়ে খুনি নাকি খুন করছে। বিট্টু, মঞ্জু আর আয়ুষ্মান মিলে তিনজন। তাহলে চতুর্থ এখনও বাকি।’

‘সেটা হয়তো কথার কথা।’

কৌশিক বলল।

‘না কৌশিক, তাহলে চার-পাঁচজন বলত। ডেফিনিট করে চারজন বলত না।’

‘তার মানে ও নিজেই খুনির আরেকটা লোক।

আবারও কৌশিকের বক্তব্য। এবারে শিবাঙ্গী বলে উঠল, ‘আঁখি চ্যাটার্জি পঞ্চম হলেও হতে পারে। চতুর্থ নয় কিছুতেই। আঁখি এত বোকা নয়। নিজেকে বাঁচিয়েই যা বলার বলবে।’

স্বয়ম্ভু এবার বাধ্য হল কথা বলতে কারণ তার ফোনটা বেজে উঠল। ‘হ্যাঁ রতন বলো। বিকেল গড়িয়ে দিলে যে।’

‘কী করব স্যার? এই অরণ্য মালটা তো মুখই খোলে না। কাল সারারাত আমার বরবাদ করল। ভাবলাম সকাল সকাল বাড়ি যাব। সেটাও হল না। মালটা মেন্টাল পেশেন্ট তাই খুব বেশি চাপও দিতে পারছিলাম না। তার ওপর পরপর তিনজন ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেস নিয়ে হাজির হয়েছে। সেই কেস লেখা। নাজেহাল অবস্থা।’

‘মুনশির মাথাব্যথা সারেনি?’

‘বমি করছেন সকাল থেকে।’

‘ভালো। তা জেরা করে কী পেলে?’

‘অনেক কষ্টে অরণ্য একটা নম্বর দিয়েছে ওর রিলেটিভের। বলল ওর দিদি। ফোন করে দেখি স্বপ্না মণ্ডল।’

‘দিদি? নিজের দিদি?’

‘হ্যাঁ স্যার। একই মায়ের পেটের। এই তো থানায় বসে আছে।’

‘তাহলে মাঝরাতে লুকিয়ে ভাইকে খাবার দেবার কী ছিল?’

‘হাজব্যান্ডের ভয়ে। ওর বর অরণ্যকে সহ্য করতে পারে না। এক সময় অরণ্য চাকরি করত। তারপর হঠাৎ কিছু বন্ধুর পাল্লায় পড়ে বিয়ে করেছিল। সেই মেয়ে বছর দুই ঘর করে ভাগলবা। তার পর থেকেই ওর মাথার প্রবলেম। সব সময় কারা যেন ওকে ফলো করে।’

‘ডাক্তার দেখায়নি?’

‘হ্যাঁ। স্বপ্নার বরই দেখিয়েছিল। কিন্তু অরণ্যকে ওষুধ খাওয়ানো যায়নি। ও যা মনে করে তাই করে। সেই কারণে স্বপ্নার বর শালাকে একদম দেখতে পারে না। এদিকে ভাই রাঁধেও না বাড়েও না। খায়ও না। সেই দেখে স্বপ্নাই প্রতি রাতে সেদিনের আর পরের দিন সকালের খাবারটা দিতে যায়।’

‘আজ তো ওর বর সব জেনে গেল। কী হবে?’

‘কান্নাকাটি করছেন।

একটা বড়োসড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বয়ম্ভু বলল, ‘বেকার সময় নষ্ট। আচ্ছা, ওর বউয়ের নামই কি ওই কী যেন মোনালিসা?’

‘না স্যার। মোনালিসা যে কে সেটা কেউ জানে না। স্বপ্না বললেন ওর ভাইয়ের বউয়ের নাম আঁখি।’

‘কী নাম?’

‘আঁখি। আঁখি দত্ত।’

‘আঁখি দত্ত?’

স্বয়ম্ভুর স্বর চলকে ওঠে। এক লাফে টেবিল থেকে নেমে দাঁড়ায়। স্বয়ম্ভুর মুখে আঁখি নামটা শুনে শিবাঙ্গী, রাজারাম ও কৌশিকও মৌমাছির মতো ঘিরে ধরে তাদের বসকে।

‘চেনেন নাকি স্যার?’

‘আজকের ভাইরাল ভিডিওটা দেখেছ?’

‘না স্যার, কোনও ভিডিওই দেখিনি।’

‘আমি পাঠাচ্ছি। এক্ষুনি দেখো। বুঝতে পারবে আজকে কেন পরপর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেস পাচ্ছ।’

‘ওকে স্যার।’

‘তার আগে একটা কাজ করতে হবে। ভিডিওটা স্বপ্নাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করো তো, মেয়েটিকে চেনে কিনা।’

‘ঠিক আছে স্যার। পাঠান।’

‘আর, ভালো দায়িত্ববান পুলিশ হতে গেলে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে রতন। নইলে অনেক কিছু ঘটে যাবে কিন্তু তুমি কিছুই জানতে পারবে না।’

কথার মাহাত্ম্য বুঝে মিনমিন করল রতন, ‘মনে রাখব স্যার।’

‘জানাও আমায়।’

দু-মিনিটের মধ্যেই রতনের ফোন এল। ওপার থেকে উত্তেজিত গলা, ‘স্যার, এটাই অরণ্যর বউ আঁখি দত্ত।’

‘স্বপ্নাকে থানায় বসিয়ে রাখো। আমি আসছি। এর মধ্যে ছোট্ট একটা কাজ করে রাখো। স্বপ্না কোনও ওষুধ খায় কিনা। খেলে সেগুলো কোথা থেকে কেনে জেনে রাখো।’

‘ওকে স্যার।’

ফোনটা কেটেই নতুন এক নম্বর ডায়াল, ‘এলাকাটা টেক্সট করছি। সঙ্গে একটা ছবিও পাঠাচ্ছি। এখুনি অ্যাকশন নিবি।’ স্বয়ম্ভুর আঙুল যত দ্রুত ছোটে মুখও অত দ্রুত চলতে পারে না। কয়েক সেকেন্ডেই টিমের দিকে ঘুরে স্বয়ম্ভূ বলে, ‘মেঘ না চাইতেই জল। স্বপ্না মণ্ডলের ভাইয়ের বউ আঁখি দত্ত ওরফে আঁখি চ্যাটার্জি। স্বপ্নাকে জেরা করতে আমি আর শিবাঙ্গী যাব। রাজারাম তুমি একবার সংবাদ প্রভাকরের অফিসে ছুঁ মারো। আঁখি চ্যাটার্জির সঙ্গে ভালো করে গল্প করে এসো। পেপারেই অ্যাড্রেস আছে।’

‘ওকে স্যার।’

‘কৌশিক, সোমনাথ চৌধুরিকে আগামীকাল লালবাজারে তলব করো। সকাল দশটার মধ্যে যেন চলে আসেন। সুকুমারদা বাইরে কেন, ভেতরে আসুন।’

স্বয়ম্ভুর ভয়েস হঠাৎ করেই পালটে যেতে চমকে যায় সকলে। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে গুটিগুটি পায়ে সুকুমার ঢুকে আসছে। ‘আপনার মতো সিনিয়র মানুষ ও যদি স্বয়ম্ভু সেনের ঘরে ঢুকতে কুণ্ঠা বোধ করে তাহলে লজ্জায় যে আমার মাথা কাটা যায় দাদা!’ নিভন্ত সূর্যের আলোর মতো হাসি ছড়িয়ে সুকুমার বলেন, ‘সিনিয়র হোক বা জুনিয়র, আমাদের কাজে গোপনীয়তাটাই আসল। তাই ভাবছিলাম তোমাদের কথা শেষ হলে ঢুকব।’ এই প্রসঙ্গে আর কথা বলল না স্বয়ম্ভু, ‘বলুন কী বলবেন?’

‘তেমন কিছু না। ওই পিডিএফটা ঠিক আছে তো?’

‘বেঠিক হলে আমি জানাতাম সুকুমারদা।’

‘যাক। এইটুকুই। তা কোথাও বেবোচ্ছ আবার?’

‘আপাতত ক্যান্টিনে যাচ্ছি। সকাল থেকে আমাদের পেটে কিচ্ছু পড়েনি।’

‘ও হো। যাও যাও যাও। আমি আসি।’

‘আসুন।’

সুকুমারের চলে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল স্বয়ম্ভু। কৌশিক প্রশ্ন করল, ‘স্যার, সোমনাথের তৈরি মাস্ক থেকে কি বিশেষ কোনও এভিডেন্স পাওয়া গেছে?’

‘ওই মাস্কের সিলিকনই মৃত রুনুর নখে আটকে আছে। এটা তো আর ম্যাজিক হতে পারে না।’

‘স্যার, আমার আর খাবার গলা দিয়ে নামবে না। এখনই মনে হচ্ছে সবকটাকে ধরে একসঙ্গে জেরা করি।’

‘আমি চাই না আমার টিমের কেউ গ্যাস্ট্রিকের রুগি হয়ে যাক। লেটস গো ফর লাঞ্চ। ফলো মি।’

এক্কেবারে গোয়েন্দা ফিল্মের হিরোদের মতো কথাটা বলেই গটমট করে হাঁটতে শুরু করল স্বয়ম্ভু। আবারও মোবাইলে কাকে যেন বলল, ‘মিনিট পাঁচ থেকে ছয়ের মধ্যে পালাবে। ফলো করবি। মুখটা ভালো করে দেখিস। রাখছি।’ ক্যান্টিনের দিকে যেতে যেতেই রাজারাম ও শিবাঙ্গীর ফোনে পরিচিত কিছু থানা থেকে খবর এল, একেকটা থানায় গড়ে আটটা থেকে বারোটা করে ডোমেস্টিক ভায়োেলন্সের কেস জমা পড়েছে। শুনে স্বয়ম্ভু বলল, ‘ক্রেডিট গোজ টু আঁখি চ্যাটার্জি।’

‘খুনির উদ্দেশ্য তো তাহলে সফল।’

শিবাঙ্গী বলল। স্বয়ম্ভু ক্যান্টিনে গিয়ে হাঁক-ডাক করে খাবারের অর্ডার দিল। বেলা সাড়ে তিনটে বেজে গেছে। আরও দুটো একই বিষয়ের ফোন এল রাজারাম আর শিবাঙ্গীর ফোনে। মুখে শুকনো হাসি নিয়ে কৌশিক বসেছিল এতক্ষণ। এবার সে পকেট থেকে মোবাইল কানে দিল, ‘হ্যাঁ, মিস্টার ঘোষ, কটা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স জমা পড়ল? পাঁচ-ছ’টা তো হবেই তাই না?’ মুখে বেশ একটা ঝলমলে গর্বের হাসি ঝিলিক দিচ্ছিল। হঠাৎ করেই সেটা কেমন যেন মিইয়ে গেল। স্বয়ম্ভূ ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল কৌশিকের দিকে। ঠোঁট চাপা হাসিতে রাজারাম আর শিবাঙ্গী মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

‘অ… এখনও আসেনি।… না না আমার কাছে খবর আছে আসবে বেশ কয়েকটা। এলেই জানাবেন। হ্যাঁ হ্যাঁ।’

ফোনটা রেখে তিনজোড়া চোখ ওর দিকে দেখে বেশ একটা অস্বস্তিতে পড়ে কৌশিক। ‘খুনি এখনও ঠিক সবাইকে জাগাতে পারেনি।

‘হুম। চিন্তা নেই। জেগে যাবে। কীরে ভানুউউউ… খাবার-টাবার দিবি নাকি? ‘ ভিতর থেকে উত্তর এল, ‘এই যে স্যার।’

যখন থেকে শুনেছে গোয়েন্দাবিভাগের লোক আসছে জেরা করতে তখন থেকে কান্না শুরু হয়েছে স্বপ্নার। নিজে তো নাকের জলে চোখের জলে হচ্ছেই। সঙ্গে রতনেরও মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে ঘ্যানঘ্যান করে। অবশেষে গোয়েন্দার মুখোমুখি বসার সময়টা যখন এল তখন প্রায় অজ্ঞান হয়ে যায় যায় অবস্থা। কোনওরকমে জল খাইয়ে, চোখেমুখে জল ছিটিয়ে থিতু করা হয়েছে। স্বয়ম্ভুর প্রথম কথাই শেলের মতো বিদ্ধ করে স্বপ্নাকে, ‘তাহলে স্বপ্না ম্যাডাম, আপনি স্বীকার করছেন, আপনি অপরাধী। আপনি মিনতি গুহর খুনের সঙ্গে জড়িত। তাই তো?’

‘মানে? এ…এ কী বলছেন স্যার? আমি কী করেছি?’

আবার কান্না!

‘যদি নাই করে থাকেন তাহলে কেঁদে ভাসাচ্ছেন কেন? কীসের এত ভয় আপনার? আমরা তো শুধু কয়েকটা প্রশ্ন করব বলে আপনাকে বসিয়ে রেখেছি। গ্রেপ্তার করেছি কি?

‘স্যার, বাড়িতে আমার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে একা আছে। আমায় ছেড়ে দিন।’

‘সে তো প্রতিদিন রাতেও একাই থাকে।’

স্বপ্না চোখের জল মুছে মাথা নীচু করে। শিবাঙ্গী বলে, ‘আমরা যা যা প্রশ্ন করছি তার সঠিক জবাব দিয়ে দিন। তাহলেই তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে পারবেন।

‘আমি কিছু জানি না স্যার। বিশ্বাস করুন।’

‘আমি তো কোনও প্রশ্ন করিইনি। তাহলে বুঝছেন কী করে আপনি কিছু জানেন না? তার মানে আপনার মনে কোনও বিষয়ে ঘোর সংশয় আছে। আপনি আঁচ করতে পারছেন আমরা কী জানতে চাই আর সেখানেই আপনি গোল পাকিয়ে বসে আছেন, তাই তো?’

স্বপ্না বুঝতে পারে যত কেঁদেকেটে নিজে থেকে বকবক করবে তত গোয়েন্দার কথার জালে জড়িয়ে পড়বে। তাই লক্ষ্মীমেয়ের মতো তুতলিয়ে জিজ্ঞেস করে স্বপ্না, ‘ক… কী জানতে চান বলুন।’

‘আপনি সিনেমা দেখেন?’

‘সিনেমা! হ্যাঁ।’

শিবাঙ্গীর প্রশ্ন, ‘হলে গিয়ে না টিভিতে?’

‘হলে, টিভিতে দুটোই।’

স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন, ‘শেষ কোন সিনেমা হলে দেখেছিলেন?’ ভাবনায় পড়ল স্বপ্না। মাথার মধ্যে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

‘আচ্ছা, বাংলা না হিন্দি, কোন সিনেমা আপনার বেশি প্রিয়?’

শিবাঙ্গী জানতে চাইল। দুজন পালটে পালটে প্রশ্ন করে চলেছে স্বপ্নাকে। উত্তর দিল স্বপ্না, ‘বাংলা। হিন্দিও দেখি।’

‘শেষ কোন সিনেমা দেখেছেন?’

হাতে পটাস করে হাততালি দিয়ে প্রশ্নটা করল স্বয়ম্ভু।

‘বেহুলা-লখিন্দর।’

সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভুর ভুরু কুঁচকে গেল।

‘হলে না টিভিতে?’

‘টিভিতে। কিন্তু এ সব কেন জিজ্ঞেস করছেন?’

‘তার আগে টিভিতে কোন সিনেমা দেখেছেন?’

‘ম…ম… মৌচাক।

‘লাস্ট শনিবার রাতে ভাইকে খাবার দিয়ে কটায় ফিরেছেন?’

‘ওই মাঝরাতেই।’

‘কটায়?’

‘টাইম মনে নেই।’

‘ফালতু বকবেন না। এক দু-সপ্তাহ আগে কী সিনেমা দেখেছেন মনে আছে আর এই সামান্য জিনিসটা মনে নেই?’

‘মনে হয় একটা-সোয়া একটা হবে। তবে ঘড়ি দেখিনি।’

‘কিন্তু চোখের সামনে মিনতিকে খুন হতে দেখেছেন তো, জানলা দিয়ে?’

‘নাহ! কী বলছেন এ সব?’

আঁতকে ওঠে স্বপ্না। ‘আমি কীভাবে দেখব? আমি ঘুমোচ্ছিলাম তো।’

‘কখন ঘুমোচ্ছিলেন?’

‘রাত দুটো-ফুটো হবে।

‘কিন্তু মিনতি তো রাত দেড়টায় খুন হয়ে গেছে।’

স্বয়ম্ভু বলে চলেছে।

‘একদম না। মিনতি দুটো নাগাদই…’

কথাটা আটকে গেল স্বপ্নার। শাড়ির আঁচলটা বুকের ওপর শক্ত করে টেনে নিল সে।

‘বাবা! আপনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও দেখতে পান নাকি?’

স্বয়ম্ভুর কথার প্যাচে ঘাবড়ে গেল স্বপ্না। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলে উঠল, ‘বিশ্বাস করুন আমি কিচ্ছু জানি না। আসলে লোকজন বলাবলি করছিল সেই শুনেই টাইমটা জেনেছি।’

‘বেশ। আপনি কিচ্ছু জানেন না। নাই জানতে পারেন। কিন্তু একটা কথা বলুন, মিনতি যেদিন খুন হল সেদিন সন্ধের পর আপনাকে ডাক্তার কেন দেখতে এল? কী হয়েছিল?’

‘কে বলল এ সব?’

‘প্রশ্ন আমরা করব স্বপ্না ম্যাডাম। আপনি উত্তর দেবেন। ডাক্তার কেন এসেছিল?’

‘ওই একটু প্রেশার বেড়ে ঘাম ভাঙছিল। মাথা ঘুরছিল।’

‘শরীর খারাপ নিয়েই সেদিন বিকেলে বেহুলা-লখিন্দর সিনেমাটা দেখলেন?’

‘সিনেমাটা দেখতে দেখতেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।’

‘সেদিন শুধু প্রেশারই বাড়েনি আপনার, সকালে রান্না করতে গিয়ে হাতটাও পুড়িয়েছিলেন। তরকারি তো পুড়েই ছিল। কী তাই তো?’

স্বয়ম্ভুর মুখে এত কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে স্বপ্না তাকায়। শিবাঙ্গীরও অবস্থা তথৈবচ। এ সব খবর স্যার কবে নিলেন? শিবাঙ্গীকে এ ব্যাপারে কিছু জানাননি।

‘কী হল স্বপ্না ম্যাডাম? এত কীসের চিন্তা মাথায় ঘুরছিল আপনার?’

‘আসলে পাশের বাড়িতে একটা খুন হয়ে গেল। তাই আর কি…’

‘ভয় পেয়েছিলেন তো। স্বাভাবিক। কিন্তু, পরেরদিন রাত থেকেই আবার আপনি মাঝরাতে ভাইকে খাবার দিতে ছুটলেন। চিন্তা হল না একবারও যে বাড়িতে দুটো ছেলে-মেয়ে একা আছে। খুনি যদি আপনার সন্তানদের ক্ষতি করে দেয়?’

‘কেন? আমাদের ক্ষতি করবে কেন? আমি তো ওর কোনও ক্ষতি করিনি।’

‘মিনতি করেছিল?’

স্বপ্না চুপ। শিবাঙ্গী চাপ দিল, ‘কী হল বলুন? মিনতি ক্ষতি করেছিল?’

‘জা… জানি না।’

স্বপ্না তোতলাল। স্বয়ম্ভু এক জায়গায় বসলেও শিবাঙ্গী স্বপ্নার চারপাশে ঘুরঘুর করছে। স্বপ্না উত্তর দিতে দিতে আড়চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে শিবাঙ্গীর দিকে দেখছে। ঘুরতে ঘুরতেই শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে, ‘গলিতে আপনার সঙ্গে একটি ছেলে দেখা করতে আসত। চাপ দাড়ি। ফর্সা। মাথায় টুপি।’ প্রশ্নটা করার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নার চোখ আবার নতুন করে ছলছল করে উঠল। ‘আমি কিচ্ছু জানি না ম্যাডাম। আমার ছেলেমেয়ে বাড়িতে…!’

‘এই শিবাঙ্গী, রতনকে বলো তো ওর স্বামীকে আর ছেলেমেয়েকে তুলে আনতে।’

‘না না স্যার, প্লিজ স্যার প্লিজ। ও আমায় আর ঘরে তুলবে না।’

‘ঘরে তুলবে না? এত দাপট আপনার স্বামীর?’

অঝোরে কাঁদে স্বপ্না। ‘ও যখন জানতে পারবে যে আমি ভাইকে খাবার দিয়ে আসি, জানি না তখন কী করবে!’

‘সে তো একদিন না একদিন জানবেই। ওনার রোজগারের টাকায় দু-বেলা তার শালা বসে বসে খাচ্ছে সেটা কি উনি বুঝতে…

‘না না।’

স্বপ্নার কথার তোড়ে স্বয়ম্ভুর কথা থেমে গেল। এইভাবে না বলার অর্থ খুঁজতে শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু স্থির হয়ে স্বপ্নার মুখের দিকে তাকিয়ে। স্বপ্না কিছু যেন গুটিয়ে নিল, ‘মানে ও যাতে জানতে না পারেন আমি সেইভাবেই ম্যানেজ করি।

‘আর আমি যদি বলি আপনি আপনার পয়সায় অরণ্যবাবুকে খাওয়ান!’

‘আমি? আমি কোত্থেকে…?’

স্বয়ম্ভু তেড়ে ওঠে, ‘একের পর এক মিথ্যে বলে যাচ্ছেন স্বপ্না। এর পরিণতি কতটা ভয়ংকর হবে আমি ভাবতেও পারছেন না।’ বন্ধ ফাঁকা ঘরটায় ধমকের সুরটা ঝংকার দিয়ে উঠল। বুক কাঁপল স্বপ্নার। কিন্তু মুখ ফুটল না। স্বয়ম্ভূ গর্জন করে বলে ওঠে, ‘ওই চাপদাড়ি ছেলেটি আপনাকে পয়সা দেয়।’

‘কেন? কেন ও আমায় পয়সা দেবে?’

‘ও? খুব পরিচিত কাউকেই এই ‘ও’ বলে সম্বোধন করা যায়। অর্থাৎ আপনি স্বীকার করছেন যে চাপদাড়ি ছেলেটি আপনার সঙ্গে কথা বলতে আসত। ভেরি গুড। এবার কারণটা বলে ফেলুন। চট করে বলুন।’

স্বয়ম্ভুর সঙ্গে চাপ দেয় শিবাঙ্গীও।

‘আমি জানি না। বিশ্বাস করুন আমি জানি না।’

‘আমরা জানি।’

চোখের পলকে পাথর হয়ে যায় স্বপ্না। ‘কী জানেন?’

‘আপনি নিজে একজন মেয়ের মা হয়ে ওই ছেলেটাকে মেয়ে সাপ্লাই করেন।’

‘নাআআআ!’

‘হ্যাঁ করেন। অসহায় অত্যাচারিত বউদের টাকার লোভ দেখিয়ে ওই ছেলেটার হাতে তুলে দেন।’

‘মিথ্যে কথা।’

‘এটাই সত্যি। মিনতির সঙ্গেও একই খেলা খেলেছিলেন।’

‘ভুল ভুল ভুল।’

চিৎকার করছে স্বপ্না। স্বয়ম্ভূ তার রোলার চালিয়ে যাচ্ছে, ‘মিনতি কিছুতেই রাজি হয়নি বলে তাঁকে খুন করিয়েছেন আপনি। সিসিটিভি তার প্রমাণ…’

‘না না, আমি তো শুধু…’

‘আমি তো শুধু? বলুন বলুন…’

স্বপ্না এবার নিজের মুখেই আঁচল চাপা দিয়েছে। শিবাঙ্গী কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘চুপ করে থাকলে আমরা আপনাকে তো ছাড়বই না, আপনার ছেলেমেয়ে আর স্বামীকেও টেনে জেলে ঢোকাব। আপনারা সবাই মিনতির মৃত্যুর জন্য দায়ী।’

কান্নায় ভেঙে পড়ে স্বপ্না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *