৩
খোলা উঠোনের এক কোণে কলতলা। শনিবারে কারখানায় হাফ ছুটি। বাড়ি এসে এক বালতি জল হুশ করে মাথায় ঢালতেই লোহার গেট খোলার শব্দটা হল। লোহার বালতিটা কলতলায় নামিয়ে রেখে হাত চালিয়ে মুখের ওপর জমে থাকা জল সরিয়ে তাকাল প্রশান্ত। ঝুনু বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে বাড়ি ঢুকছে। সঙ্গে নয় বছরের লাল্টু। কাছা নিয়েছে। প্রশান্তর ভুরুদুটো কুঁচকে গেল। টিউবওয়েলের মাথার ওপরে রাখা গামছাটা ঝেড়ে গা মুছতে থাকে। ঝুনু সিমেন্ট ভাঙা দাওয়ায় মালপত্তর রেখে ভাইপোকে ডাকল, ‘এখানে একটু জিরিয়ে নে। পিসেমশাইয়ের হলে কলতলায় পা ধুয়ে ঘরে ঢুকবি।’ আলুথালু চুল সমেত মাথাটা ঢক করে কাত হয়ে গেল।
ঝুনু রান্নাঘর থেকে একটা স্টিলের গ্লাসে জল এনে লাল্টুকে দিল। প্রশান্ত ততক্ষণে গামছা দিয়ে ভিজে বগল মুছতে মুছতে দাওয়ার কাছে চলে এসেছে।
‘ব্যাপার কী? এ এখানে?’
ঝুনুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল প্রশাস্ত। ঝুনু এক ঝলক স্বামীর দিকে তাকিয়ে লাল্টুকে বলল, ‘লাল্টু যা, হাত-পা ধুয়ে আয়।’ ফাঁকা গ্লাসটা পিসির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাধ্য ছেলের মতো কলতলার দিকে এগিয়ে গেল লাল্টু। এই ফাঁকে প্রশান্তকে জবাব দিল ঝুনু, ‘বাড়িতে তো কেউ নেই। কার কাছে থাকবে ছেলেটা? দিদিরা নিল না। তাই আমিই…!
প্রশান্তর হাত-পা স্থির হয়ে গেছে। চোখ পাকিয়ে বলল, ‘আমি মানে? আমি কী? ওই ছেলে কি এখন আমাদের এখানে…!’
‘কোথায় যাবে বলো?’
‘শালি হারামজাদি! এটা আমার বাড়ি রে। কোনও অনাথ আশ্ৰম না।’
প্রশান্ত উত্তেজিত হয়ে উঠোন থেকে দাওয়ায় উঠে রাগত চোখদুটো ঝুনুর ওপর রাখল।
‘এ… এভাবে বোলো না। ও তো আমারই ভাইপো। আমায় বড্ড ভালোবাসে। ওকে ফেলে…’
‘চোপ ঢেমনি।’
ঝুনু চোখ বুঝে নিজেকে সামলাল। এই শব্দগুলো শুনে শুনে কান সয়ে গেছে। কলতলা থেকেই পিসেমশাইয়ের সুবচনটি কানে গেল লাল্টুর। কিন্তু পিছন ফিরে তাকাল না।
‘এখন থেকে পরের ছেলেকে চারবেলা গেলাতে হবে?’
‘তোমার খাবারে ভাগ বসাবে না। আমি যা খাব, ও সেখান থেকেই খাবে।’
‘ওর তো এখন হবিষ্যি করার কথা।’
ঝুনু ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। ‘আমিও তো তাই করি।’ কথাটা বলে রান্নাঘরে যেতে যেতে গলা তুলে বলল, ‘লাল্টুউউউ, রান্নাঘরে আয়।’
প্রশান্তর সর্বাঙ্গে ধিকিধিকি আগুনটা জ্বলতেই থাকল।
***
মনের মধ্যে এক পশলা মেঘ নিয়ে লালবাজারের লম্বা করিডরটা দিয়ে হাঁটছে শিবাঙ্গী। মুখে সেই মেঘের ছায়া। পাশে পাশে হাঁটছে তার বস স্বয়ম্ভু। অন্য পাশে কৌশিক আর রাজারাম। স্বয়ম্ভু আড়চোখে দেখে নিচ্ছে তার সহকারিণীর মুখের ভাব। এরই মাঝে কৌশিক বলল, ‘স্যার, বিট্টু দেবনাথ যে জায়গা থেকে উধাও হয়ে গেল আমি একটু সেই জায়গাটা দেখতে চাই।’ ঠিক যেন কথাটা ফুরোবার অপেক্ষায় ছিল স্বয়ম্ভু। হাঁটতে হাঁটতে পট করে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকাল, ‘আমি বলেছি তোমায়?’
‘না স্যার। মানে আমার মনে হচ্ছে বিট্টু ওই জায়গাতেই গা ঢাকা দিয়ে আছে। সামহাউ সেটা কারও চোখে পড়েনি বা পড়ছে না।’
‘চোখে পড়েনি,’ শব্দটা শিবাঙ্গীর দিকে মারণাস্ত্রের মতো ধেয়ে গেল। স্বয়ম্ভু চুপ থাকল না, ‘কার চোখে পড়ার কথা বলছ কৌশিক?’
‘আমাদের যে টিমটা ওই চত্বরে আছে বিট্টুকে ধরার জন্য।’
‘ওখানে কেউ নেই। ‘
‘মানে?’
কৌশিক আকাশ থেকে পড়ল। কিন্তু রাজারামের মুখে তেমন কোনও অভিব্যক্তি নেই। সে যেন কিছু আঁচ করেছে।
‘পলাতক সন্দেহভাজনকে একটু স্পেস দিতে হয় কৌশিক। ছেড়ে খেলতে জানতে হয়। যত বজ্র আঁটুনি তত ফসকা গেরো হবার চান্স।’
‘কিন্তু স্যার আপনি যে…’
‘শোনো কৌশিক, তুমি একটা কাজ করো।’
‘স্যার।’
‘গোপনে দীননাথের হোয়্যার অ্যাবাউটস জোগাড় করো। আজকের মধ্যেই।’
‘ওকে স্যার।’
‘বেস্ট অফ লাক।’
কৌশিক জায়গাটা ছাড়তে বাধ্য হল। রাজারাম একটু ইতস্তত করছিল কিছু বলবে বলে, তার আগেই স্বয়ম্ভু বলল, ‘রাজারাম।’
‘স্যার।’
‘সাগর ধরকে ধরে মুখ খোলাবার ব্যবস্থা করো। বিট্টু দেবনাথ যে তার বউয়ের প্রেমিক সেটা সাগর কীভাবে জানল? কেনই বা বিট্টুকে সন্দেহ করছে?’
‘ওকে স্যার। বাট, আমরা কি কোনও কারণ ছাড়াই বিট্টুর পিছনে দৌড়োচ্ছি?’
‘কারণ একটাই। এক, বিট্টুর সঙ্গে প্রায়ই রাতে দেখা করত সুমিতা। সেটা এলাকাবাসীদের চোখ এড়ায়নি। সাগরও এই একই বয়ান দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সাগর সবকিছু জানা সত্ত্বেও বিট্টুর সঙ্গে হাতেনাতে তার বউকে কোনওদিন ধরেনি। কেন? যে স্বামী জানে যে তার বউ রাত হলেই অভিসারে যায় সে তো এমনিতেই ওঁৎ পেতে বসে থাকবে। সেটা না করে ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছিল। ব্যাপারটা ঠিক মিলছে না। তিলজলা থানা ওপর-ওপর একটা বয়ান রেডি করে জমা করেছে। প্রয়োজন পড়লে পিএসে গিয়ে অফিসারকে চাপ দিয়ে সব বের করবে। জাস্ট কল মি হোয়েনএভার ইউ রান ইনটু ট্রাবল।’
‘শিওর স্যার।’
রাজারাম যে যাবার আগে শিবাঙ্গীর দিকে একটু আলতো দৃষ্টি ছুড়ে চলে গেল সেটা ভালোই নজর করল স্বয়ম্ভু। পাশাপাশি এটাও খেয়াল করল, একমুখ কালো মেঘ নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে শিবাঙ্গী।
‘মিত্র ক্যাফের কাটলেট খেতে ইচ্ছে করছে খুব।’
আলটপকা কথাটাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুড়ে দিয়ে নিজের চেম্বারের দিকে হাঁটতে থাকল স্বয়ম্ভু। কিন্তু কথাটা যে আদৌ উদ্দেশ্যহীন নয় সে ভালোই বুঝল শিবাঙ্গী। তবু অফিসের ডেকোরাম মেনেই উত্তর দিল সে, ‘ওকে স্যার। আপনি কি গাড়ি নেবেন?
তাহলে সঞ্জয়কে বলব।’
স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়ল। শিবাঙ্গী ঠিক বুঝতে পারেনি যে তার স্যার এইভাবে করিডরের মাঝে দাঁড়িয়ে পড়বে। তাই সে দু-পা এগিয়ে থেমে ফিরে তাকায়। ‘কী হল স্যার?’
‘সঞ্জয়ের নম্বর আমার কাছেও আছে। প্রয়োজন হলে তাকে আমিও ফোন করে গাড়ি বের করার কথা বলতে পারি।’
পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আই টি সেলের আরেক সহকর্মী। স্বয়ম্ভুর কানের কাছে ‘ম্যাও’ বলে ডেকেই চলে গেল। কথাকলির পরেও ম্যাও স্বয়ম্ভুর পিছন ছাড়ছে না। সহকর্মীরা অনেকেই স্বয়ম্ভুর আশপাশে ‘ম্যাও ম্যাও’ বলে ডেকে ওঠে। একদিকে ভালোই। ‘কথাকলি স্বয়ম্ভু’ ডাকটা বড়োই উৎকট। অন্যান্যবারের মতো এবারেও স্বয়ম্ভূ ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে আবার শিবাঙ্গীর দিকে চোখ ফেরাল। বলল, ‘একা একা কাটলেট খাওয়ায় কোনও মজা নেই। তাই তুমি এখন আমার সঙ্গে যাবে।’
‘ইচ্ছে করছে না স্যার।’
‘এটা আমার অর্ডার।’
শিবাঙ্গীর চোখের দুটো পাতা ঝটিতি স্বয়ম্ভুর দিকে উঠেই নেমে গেল। এই ‘অর্ডার’টা যে মোটেও হুকুম নয় সেটা শিবাঙ্গী জানে। তবুও বাধ্য মেয়ের মতো বসের সঙ্গে গাড়িতে চেপে বসে আর মনে মনে নিজেকে আরও বেশি অযোগ্য বলে দুষতে থাকে।
‘তোমার কাটলেট ভালো লাগে না?’
গাড়ির জানলার বাইরে তাকিয়েই কথাটা বলল স্বয়ম্ভু।
‘লাগে। তবে সান্ত্বনা ভালো লাগে না। নিজেকে আরও ফেইলিওর বলে মনে হয়। উত্তর দিল শিবাঙ্গী।
‘ঠিক এই জিনিসটাই তোমার মন থেকে সরাতে হবে শিবাঙ্গী। নইলে সারাজীবন তুমি কারও না কারও অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়েই থেকে যাবে।
অবুঝ অব্যক্ত প্রশ্ন নিয়ে তাকাল শিবাঙ্গী। ব্যক্ত করল স্বয়ম্ভু, ‘তুমি যেটা করবে সেটাতেই সফল হবে কে বলল তোমায়? বসেদের ট্যারাব্যাকা কথাও শুনতে হবে।
তার জন্য চোখ ভারী করলে চলবে না। কান-মাথা গরম করলেও চলবে না। গায়ের চামড়াটাকে গন্ডারের বানিয়ে ফেলতে হবে শিবাঙ্গী। নিজের মনকে বোঝাতে হবে
আপামর জনসাধারণের কাছে যে কথাগুলো লজ্জার, অপমানের সেটা আমাদের কাছে গায়ে সুড়সুড়ি পিঁপড়ে ওঠার মতো। হয় ঝেড়ে ফেলো, নয়তো টিপে মেরে
ফেলো। কারণ আমরা অসাধারণ। পেশার প্রয়োজনে, সমাজের প্রয়োজনে আমাদের অসাধারণই হতে হবে। আরে বাবা তুমি নিজে তো জানো যে তোমার কাজে কোথাও কোনও ফাঁকি নেই। সেটাই তো আসল। সেটাকে বজায় রেখে এগিয়ে চলো। ওই কনফারেন্স রুমে কে তোমায় কী বলল, কে তোমার ওপর হাসল তাতে তোমার বয়েই গেল। এই ছুটকো ছাটকা অপমানগুলো সময় ঠিক ভুলিয়ে দেবে। বুঝলে?’
‘তাহলে আমার মন ভোলাতে কাটলেট খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?’
স্বয়ম্ভু চোখ পাকাল। বলল, ‘আজ মহালয়া তাই। হল?’
বেলাদুপুরে রাস্তার ভিড় ঠেলে গাড়িটা হু হু করে ছুটে গেল মিত্র ক্যাফের দিকে।
গোলপার্ক থেকে গাড়িটা ঘুরে গলির মধ্যে ঢুকতেই জ্বলজ্বল করে উঠল মিত্র ক্যাফে। নীল ব্যাকড্রপে হলুদে লেখা দোকানের নাম। সামনে এসে গাড়িটা থামল। স্বয়ম্ভু গটগট করে ক্যাফের সামনে চলে গেল। দু-তিনজন কাস্টমার ঘুরঘুর করছিল। এখানে ফুটপাথে দাঁড়িয়েই খেতে হবে। বসার কোনও জায়গা নেই। পুরো ব্যাপারটাতেই শিবাঙ্গী বেশ অবাক। চুপ করে স্বয়ম্ভুর কাণ্ডকারখানা ফলো করতে লাগল। প্ৰথমেই দোকানের একটি ছেলেকে ডাকল। ছেলেটি এগিয়ে আসতেই নিজের মোবাইল খুলে কী একটা দেখিয়ে স্বয়ম্ভূ বলল, ‘এই বিলটা এই দোকানের তো?’ ছেলেটা ভুরু কুঁচকে ভালো করে দেখে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘মনে তো হচ্ছে। কেন বলুন তো?’
‘এর কোনও ডুপ্লিকেট কপি পাওয়া যাবে?
‘না দাদা।’
স্বয়ম্ভু বুঝল ছেলেটি পাত্তাটা কমই দিচ্ছে। বাধ্য হয়ে পকেট থেকে নিজের আই কার্ডটি বের করে ছেলেটির মুখের সামনে ধরে বলল, ‘ডুপ্লিকেট কপিটা আমার চাই।’ ছেলেটি একেবারে অ্যাটেনশন মোডে। ‘এক মিনিট স্যার। এই সুশান্তদা…’ বলে ডেকে একটু খাঁজের ভিতর বসে থাকা একটা লোকের দিকে এগিয়ে গেল। শিবাঙ্গী স্বয়ম্ভুর দিকে চেয়ে ভুরু নাচাল। স্বয়ম্ভু চোখ টিপল। ছেলেটি ভিতর থেকে বসে থাকা ছেলেটিকে নিয়ে এল। তার মুখে বেশ ভয়-ভয় ব্যাপার। ‘কী হয়েছে স্যার?’
‘সেটা না জানলেও চলবে। আপনি শুধু বলুন এই বিলটার কোনও ডুপ্লিকেট কপি আমায় দিতে পারবেন কি না।’
ছেলেটি ভালো করে দেখল। বলল, ‘স্যার এখানে তো সব লেখাই নষ্ট হয়েছে। বিল নম্বরটাও ঠিক মতো বোঝা যাচ্ছে না। শুধু ডেট দেখা যাচ্ছে। সারাদিনের বিল দেখতে গেলে স্যার…’
‘সময় লাগবে তো? লাগুক। এই ডুপ্লিকেট কপিটা আমার চাই। এখুনি। এক কাজ করুন, এই দিনের সবকটা বিল দিয়ে দিন। ততক্ষণ দুটো চিকেন কাটলেট।’
‘শিওর স্যার।’
আর কথা না বাড়িয়ে দোকানের লোকগুলো যে যার কাজে লেগে পড়ল।
‘তাই ভাবি। শোভাবাজার, শ্যামবাজার ছেড়ে হঠাৎ গোলপার্কের মিত্র ক্যাফেতে আসা কেন!’
শিবাঙ্গীর কথা শুনে মুচকি হাসি স্বয়ম্ভুর ঠোঁটে। বলল, ‘সুমিতা ধরের লাশের কাছে একমাত্র এটাই পাওয়া গেছে। তাও জলে ভেজা।’
‘মানে পিকনিক গার্ডেন।’
‘ইয়েস।’
‘বিট্টু দেবনাথ?’
শিবাঙ্গীর চোখে-মুখে অপার বিস্ময়। স্বয়ম্ভুর পালটা প্রশ্ন, ‘কেন, হতে পারে না?’
‘না মানে, বিটু মিত্র ক্যাফে থেকে এত দাম দিয়ে খাবার খাবে সেটা আমার কাছে একটু অবিশ্বাস্য।’
‘বুঝলাম। তবে সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। এখানে তো সিসিটিভিও নেই যে সেদিনের ফুটেজ চাইব।’
কথাটা বলেই এদিক-সেদিক তাকিয়ে কাছেপিঠের ল্যাম্পপোস্টগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিল।
‘কনফারেন্সে বললেন না তো।’
শিবাঙ্গীর প্রশ্ন।
‘আমি কাউকে বিশ্বাস করি না। সরষের মধ্যেই যে ভূত থাকে তার প্রমাণ তো আগের দুটো কেসেই পেলে।’
‘সরষের মধ্যে তো পেতনিও থাকতে পারে।’
শিবাঙ্গীর মুখে আলগা রসিকতা। কথার ইঙ্গিত বুঝে স্বয়ম্ভূ বলল, ‘ওই জন্যেই তো পেতনিকেও জানাইনি।
‘এখন জানালেন যে।’
‘কনফারেন্সে জানালে ভূত না পেতনি কে কেসটা কেঁচিয়ে দিল সেটা তদন্ত করতেই সময় নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু এখন সে সম্ভাবনা নেই। কিছু হলেই চোখ বন্ধ করে পেতনিকেই ক্যাচ কট কট।’
শিবাঙ্গীর মুখের সামনে মুষ্টি পাকায় স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীর ভুরুতে টঙ্কার। ‘স্যার, কাটলেট রেডি।’
***
টিভিতে রাতের সিরিয়াল চলছে। এক জা আর ননদ মিলে বাড়ির ছোটো বউয়ের খাবারে বিষ মেশাচ্ছে। মন্দাকিনীর চোখ টিভিতে থাকলে কী হবে, হাত দু-খানা বেলনচাকিতে ঘষে চলেছে। রুটিগুলো বেশ গোল গোলই হচ্ছে। থেকে থেকেই পাশের ঘর থেকে বাড়ির মালিকের গলা দেয়াল ফুঁড়ে এ ঘরে আসছে। মন্দাকিনীর বিরক্ত লাগছে। সারাদিন ছাত্র ঠ্যাঙাবে আর পড়া না পারলেই গাঁক গাঁক করে চিৎকার করবে। যে ছাত্রগুলো আবার পড়া পারে না তাদের বাড়তি সময় ধরে রাতে আটকে রাখবে। টগর ফুলের একটা গাছের ডাল থেকে পাতা ছেঁটে মাস্টারের বেত তৈরি হয়েছে। সেইটে চলবে সপাং সপাং।
গোল গোল চোখের শ্যামলা ছেলেটা ঘা পাঁচেক খেয়ে গেছে। হাঁটু দুটো বুকের কাছে জড়ো করে গুটিশুটি মেরে বসে। চোখের কোল ছাপিয়ে টুপ টুপ জল পড়ছে। বাণীকণ্ঠ মুখুজ্যে ছাড়ার পাত্র নয়। সোফার ওপর বসে বাঁ হাতে ছোপটি নাচিয়ে মাটিতে বসা ছেলেটিকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে, ‘শক্ত কাঠের তক্তা দিয়ে কার নৌকো তৈরি? বল আগে। নইলে আজ তোকে মেরেই তক্তা বানিয়ে দেব। কী রে বল।’ ডান হাতের তর্জনীটা তুড়ুক তুড়ুক নড়ছে আর ‘কী রে বল, কী রে বল’ করে চলেছে বাণীকণ্ঠ। মাস্টারমশাইয়ের ধমকের চোটে কথাই আটকে যাচ্ছে বেচারির। কয়েকবার আম-উম করে কুঁতিয়ে ছেলেটি ভয়ে-ভয়ে জবাব দিল, ‘মুক্তিনাথ!’
সপাং!
‘মুক্তিনাথ হারামজাদা?’
আবার সপাং। একেকবার বেতের বাড়ি পড়ছে আর কাঠের খাঁচায় বন্দি পোষা গাংশালিকটা ঝটপট করে ডানা ঝাপটিয়ে উঠছে। পোষা সাদা তুলতুলে খরগোশটা ঘরের দোরে মুখ বাড়িয়ে কান খাড়া করে আছে। ঘরে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না।
‘মুক্তিনাথের ভাইয়ের নাম কী বল। চুপ করে থাকবি না প্রকাশ। আগের দিন পাখি পড়া পড়িয়েছি তোদের। সব্বার মুখস্থ হয়ে গেছে। তোর কেন হল না? বল। মুক্তিনাথের ভাইয়ের নাম কী?’
‘শক্তিনাথ শক্তিনাথ।’
গলার লোমগুলো ফুলিয়ে বারান্দা থেকে উত্তর দিল পোষা গাংশালিকটা। ঘরের দরজার বাইরেই মাস্টারের দৃষ্টিপথের সামনে পাখিটা ঝুলছে। বাণীকণ্ঠ আরও খেপে গেল। গাংশালিকের ওপর নয়। প্রকাশের ওপর। ‘দ্যাখ দ্যাখ হতচ্ছাড়া, তোর পড়া একটা শালিক পাখিরও মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু তোর হল না। ফেল! ডাহা ফেল করবি তুই।’
‘ফেঁল কঁরবিঁ ফেঁল কঁরবিঁ।
ঠিক এই সময় বেলনচাকি উঁচিয়ে খরগোশের মুণ্ডু ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকে এল মন্দাকিনী। ‘বলি তোমার ব্যাপারটা কী শুনি। তুমি কি একদিনেই একে বেদ্যাসাগর বানিয়ে দেবে নাকি?’ হাই পাওয়ারের চশমার মধ্যে দিয়ে বাণীকণ্ঠ মুখ তুলে তাকায়। ‘তুই এখন যা মন্দাকিনী। ফোপরদালালি করিস না।’ মন্দাকিনীও ছাড়বার পাত্রী নয়, ‘এরপর তো পেশার হাই করে চোখ উলটে পড়ে থাকলে আমাকেই দেখতে হবে। একে তো চোখের মাথা খেয়েই বসে আছ। এরপর এত চিৎকার কল্লে… দাঁড়াও, হচ্ছে তোমার ব্যবস্থা। এবার দাদাকে আমি সব বলব। দাদা পইপই করে মানা করে গেচে তোমাকে টেশ নিতে। তুমি সেই টেশ নেবে।
‘রাখ তোর দাদা। সে আমার গার্জেন না আমি তার গার্জেন? তুই… তুই যা। এই প্রকাশ, বল আগে পড়িসনি কেন? আমি তোদের সঙ্গে সকাল বিকেল ছেলেখেলা করি? অ্যাঁ? আমার সময়ের দাম নেই? কুলাঙ্গার!’
‘কুঁঙারঁ কুঁঙারঁ।’
সপাং। আবার বেত চলল।
‘অ্যাই ছেলে তোর মা কখন নিতে আসবে রে?’
মন্দাকিনী ফুট কাটল। তার ওপর দিয়েই বাণীকণ্ঠ মুখুজ্যে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ভালো। মায়ের সঙ্গে বিদেয় হ। পরদিন থেকে আর তোকে পড়াব না।’
‘বিঁদে হুঁ। বিঁদে হুঁ।’
আবারও গাংশালিকটা কুঁইকুঁই করে উঠল। বাণীকণ্ঠ খেঁচিয়ে উঠল, ‘অ্যাই, থাম তুই। সব ব্যাপারে ফুট কাটতে হবে ওকে।’ প্রকাশের দিকে তাকিয়ে রাগের চোটে গাছের ডাল কেটে বানানো ছোপটিটা ঝপাং করে পাশের সোফায় রাখল।
‘অ্যাই, তোর মা কখন আসবে?’
‘আসবে না।’
কাঁদতে কাঁদতে বলল প্ৰকাশ।
‘আসবে না মানে? তোকে বাড়ি নিয়ে যাবে কে?’
গালে গজিয়ে ওঠা সাদা দাঁড়িতে আঙুল চালিয়ে চুলকোতে চুলকোতে জিজ্ঞেস করল বাণীকণ্ঠ।
‘একাই যাব।’
ছেলের কথা শুনে বাণীকণ্ঠের সঙ্গে মন্দাকিনীও হতবাক। বলল, ‘এইটুকু ছেলে এত রাতে একা যাবে? সে আবার হয় নাকি?’
‘না না, এই মন্দাকিনী আমার ফোনটা দে তো। ওর মাকে ফোন করি।’
‘না না, ফোন কোরো না। আমি যেতে পারব।’
‘কেন? ফোন করব না কেন?’
‘এখন বাবা ঘরে চলে এসেছে।’
‘তাতে কী?’
প্ৰকাশ চুপ। দুচোখ বেয়ে অতিরিক্ত দুটো নোনতা ধারা নেমে এল। বাণীকণ্ঠ খেচিয়ে উঠল, ‘কী রে? বাপ ঘরে এসেছে তো কী?’
‘এই সময় বাবা মাকে ধরে মারে?’
খরগোশের কানের মতোই বাণীকণ্ঠ আর মন্দাকিনীর কান দুটোও খাড়া হয়ে উঠল। গাংশালিকটা ঘাড় বেঁকিয়ে চোখ পাকিয়ে চেয়ে রইল। প্রকাশ বলল, ‘কাল বাবা বাড়ি ছিল বলে সারাদিন মাকে মেরেছে। ঝগড়া করেছে।’
‘কে…কেন?’
বাণীকণ্ঠের গলাটা কেঁপে উঠল।
‘আমার বইগুলো বাবা জ্বালিয়ে দিতে গেছিল। মা জ্বালাতে দেয়নি। তাই।’
মন্দাকিনীর চোখটা কড়কড় করে উঠল। নাতিউচ্চ বুকটা ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। বাণীকণ্ঠ মরমে মরে গেল। এতক্ষণের খ্যাকখেঁকে গলার স্বরে কে যেন মলম মাখিয়ে দিল, ‘এদিকে আয়। কী রে আয়। মারব না। আয়।’
প্রকাশ ভয়ে ভয়ে মাস্টারের পাশে এসে বসল। বাণীকণ্ঠ মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘এই জন্যে তোর পড়া হয় না?’ ওপর-নীচে ঘাড় নাড়ল ছোট্ট ছেলেটি। বাণীকণ্ঠের নাক-মুখ দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
‘মন্দা, যা দুটো রুটি আর তরকারি নিয়ে আয় তো।’
মন্দাকিনী বুঝল এ খাবার কার জন্য। নরম স্বরেই একটু আপত্তি জানাল, ‘গোনাগুনতি কিন্তু।’
‘না খেটে খেটে তো গতরে দুব্বো গজিয়ে ফেললি। আরও রুটি করবি। যা নিয়ে আয় এখন।’
আবার সেই আগের মতো খ্যাকখ্যাক করে উঠেছে বুড়ো মাস্টারটা। গলা ফুলিয়ে কেটে পড়ল মন্দাকিনী। মিনিট তিনেকের মধ্যে খাবার এনে ছেলেটার সামনে রাখল। চকচক করে উঠল প্রকাশের চোখদুটো।
‘নে খা। আমি তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব।’
এই ঠ্যাঙাবে, এই আবার কাছে টেনে গিলিয়ে-কুটিয়ে বাড়ি পাঠাবে। বুড়োর লীলা বোঝা ভার। আপাতত বাণীকণ্ঠের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করল মন্দাকিনী। ‘এই রাত্তিরে তুমি কোত্থাও বেরোবে না। তারপর কোথায় না কোথায় চোখ উলটে পড়ে থাকবে। সে আরেক চিত্তির। পোকাশকে বরং আমিই টুক করে দিয়ে আসব।’
বাণীকণ্ঠ হাইপাওয়ারের চশমার মধ্যে দিয়ে গোলগোল চোখ পাকিয়ে তাকায়, ‘বাবা! মহারানির দয়া হল যে! তোর আবার কষ্ট হবে না তো?’
‘দিনরাত ঠেস মেরে কতা। এই মন্দা বিদেয় হলে বুঝবে কত ধানে কত চাল।’
‘কঁত চাল কঁত চাল।’
বাইরে থেকে বিটকেলও ফুট কাটল।
‘এখন ছেলেটাকে বাড়ি দিয়ে আয়। কাল সকালে আমায় এক কাপ চা করে দিয়ে দূর হয়ে যাবি।
বেশ গম্ভীর স্বরে কথাটা বলল বাণীকণ্ঠ। মাস্টারের কথা শুনে ভুরু বেঁকে গেল মন্দাকিনীর। বুড়োটার জ্বালায় দিনরাত অতিষ্ঠ হয়ে গেল তার। যাও, এখন আবার নতুন করে আটা মেখে রুটি কর। যত্তসব। নিঃশব্দে মুখ বেঁকিয়ে ঘর ছাড়ল মন্দাকিনী।
রীতিমতো হামলে পড়ে দুটো রুটি আর তরকারি খেতে থাকে প্রকাশ। জঠরে যেন অনেক কালের ক্ষুধা। বাণীকণ্ঠ ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘খা খা।’ হাই পাওয়ারের কাচটা ঝাপসা হয়ে আসে।
***
ঘুষিটা এমনভাবে নাকের ওপর এসে পড়ল যে খানিকক্ষণ চোখে অন্ধকার দেখল বউটা। তার মধ্যেই কষে একটা লাথি এসে পড়ল কোমরের কাছে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। অকথ্য গালাগাল তো চলছেই। নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে এল। এর মধ্যেও বউটা ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত সাড়ে দশটা। এখনও ছেলেটাকে আনতে যেতে পারল না। এখন মদ্যপ স্বামীর আঘাতের উত্তর দেওয়ার সময় নেই। এখুনি কোনওভাবে বেরিয়ে ছেলেকে নিয়ে আসতে হবে। বউটা দরজার দিকে এগোচ্ছিল। স্বামী চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে আবার ভিতরের দিকে নিয়ে এল।
‘ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও। ছেলেটাকে আনতে হবে।’
‘জাহান্নমে যাক। আগে আমার পয়সা দে।’
ঝামরে উঠল বউ। ‘একটা পয়সাও দেব না। নিজে ছাইপাঁশ গিলে পেট ভরাবে। আমরা খাব কী? ছেলেটা খাবে কী? ভেবেছ একবারও?’
বউটার চুপসে থাকা পেটে সজোরে আরেকখানা লাথি কষিয়ে লোকটা বলল, ‘লাত্থি খাবে খানকির ছেলে।’ পেট চেপে হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ল বউটা। নাক থেকে রক্ত ঝরেই যাচ্ছে। কপালের কোণটায় কালশিটে।
দরজার কাছে এসে থমকে গেল মন্দাকিনী। পাশে দাঁড়িয়ে প্রকাশ। শরীরে তার কাঁপুনি শুরু হয়েছে। মন্দাকিনী এপাশ ওপাশ তাকিয়ে দেখল যে কটা মুখ জানলা দিয়ে, দরজা দিয়ে কৌতূহলী হয়ে বেরিয়ে ছিল সেগুলো টুপটাপ করে গর্তে সেঁধিয়ে গেল। ভিতর থেকে আরও কিছু মারের শব্দ আর কটুকথা দরজা ভেদ করে কানের পর্দায় এসে ঝড় তুলছে মন্দাকিনীর।
দুম দুম! দুম দুম!
ইচ্ছে করেই যেন দরজাটায় জোরে জোরে ধাক্কা দিল। ভিতরের শব্দদূষণ তিলেকের জন্য থামল। নতুন করে শুরু হওয়ার আগে মন্দাকিনী আবার ধাক্কা মারল দরজায়। দরজা খুলল। সারা গায়ে কালশিটে, নাকে-ঠোঁটে রক্তের ছাপ মুছতে মুছতে ভেজা চোখেই দরজা খুলল বউটা। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না।
‘মাআআআ…।’
ছুটে গিয়ে বউটাকে জড়িয়ে ধরল প্রকাশ। ভীষণ লজ্জায় পড়ল বউটা। মন্দাকিনীর দিকে চেয়ে কষ্ট করে হাসি এনে বলল, ‘এই ভাবছিলাম আনতে যাব। আসলে শরীরটা এত খারাপ লাগছিল।’ কথাটা শুনেই মন্দাকিনীর কপালের পাশের রগ দুটো ফুলে উঠল। ভিতর থেকে মাতালের প্রলাপ অনবরত চলছেই। মন্দাকিনী মুখ ফেরাতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। চার-পা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ভিতরের গোলযোগ আবার শুরু হয়েছে। এবার বোধহয় ছেলেটা। নাকি মা-টাই!
দরজার কাছে এগিয়ে গেল মন্দাকিনী। মাতালের কথাগুলো স্পষ্ট। কথার অধিকাংশই অশ্রাব্য। প্রকাশের মা ককিয়ে উঠছে। প্রকাশ চিৎকার করে কাঁদছে। মাকে ছাড়াতে চাইছে বোধহয়। বাপটা বলছে মাগিটাকে আজ কেটেই ফেলবে। উত্তেজনার পারদ হু হু করে চড়ছে। যেন ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনটা হঠাৎ করে দাবানল হয়ে উঠেছে। ভিতরে কাচের বোতল ভাঙল। প্রকাশ আর্তনাদ করে উঠল। বউটার গলাতেও ভয়ার্ত চিৎকার। চূড়ান্ত হাতাহাতি, দাপাদাপি…
‘অ্যাইইইই শালা হারামির বাচ্চাআআআআআ…।’
ভাগ্যিস দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছিল বউটা। ভাঙা বোতলটা বউটার পেটে ঢুকে যাওয়ার মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ল মন্দাকিনী। ঘাবড়ে গিয়ে ছিটকে গেল মাতাল লোকটা। ‘শালা বউ ঠেঙিয়ে মরদগিরি ফলাচ্ছিস? এই আমাদের মতো মেয়েদের পাল্লায় পড়লে না ওটা কেটে ঝুলিয়ে দিতাম।’ চোখের ইশারায় লোকটার বারমুডার দিকে ইঙ্গিত করে ‘ওটা’র মানেটা বুঝিয়ে দেয় মন্দাকিনী। বউটা বিছানার এক ধারে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছে আর ব্যথায় কাতরাচ্ছে। প্রকাশ কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে রেখেছে। লোকটা পালটা তড়পে ওঠে, ‘এই শালি তুই আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কেন বলছিস রে? বেরো। নইলে খাল খিঁচে নেব।’
আর অপেক্ষা নয়। মন্দাকিনীর মাথায় আগুন ছুটছে। গলা তুলে এগিয়ে যায় লোকটার দিকে।
‘তাই নাকি রে? আমার খাল খিঁচবি? চল শালা পুলিশের কাছে। মেয়েদের গায়ে হাত তোলার শাস্তি কী দেখবি চল। চল।’
লোকটার হাত ধরে টান মারে মন্দাকিনী। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয় লোকটা। মন্দাকিনী বউটাকে বলে, ‘এই তুমি এখুনি চলো থানায়। সারা গায়ে মারের চিহ্ন দেখে পুলিশ কেমন কেস না নেয় দেখি। আমি সাক্ষী দেব, আমি।’
‘না না। আ…আমি যাব না। তুমি যাও। চলে যাও।’
মন্দাকিনী যেন আকাশ থেকে পড়ল। ‘যাবে না মানে? এই লোকটা তোমায় তো এক্ষুনি মেরে ফেলছিল।’
‘ও কিচ্ছু না গো। ওকে থানায় নিয়ে গেলে আমরা খাব কী? ছেলেটা তো ভেসে যাবে।’
‘আর তুমি মরে গেলে ছেলেটা বাঁচবে?’
‘মরব না মরব না। ও মদ খেলে এরকম একটু করে। আমি গায়ে ওষুধ লাগিয়ে নেব। থানায় কিচ্ছু বোলো না প্লিজ।
অদৃশ্য কেউ যেন মন্দাকিনীর মুখের ওপরেই একটা ঘুষি চালিয়ে চুপ করিয়ে দিল। ‘স্বামীর হাতে প্রতিদিন মার খাবে তবু মুখ খুলবে না?’
বউটা নিরুত্তর। ছেলেকে জড়িয়ে কেঁদে চলেছে। মাতাল ঢ্যামনাটা ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসছে। নিজের গালেই নিজের চড় মারতে ইচ্ছে করল মন্দাকিনীর। প্রকাশের দিকে এক পলক চেয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।
মন্দাকিনী কয়েক পা এগিয়েই কী মনে হওয়াতে দাঁড়িয়ে পড়ল। শব্দ করে প্রকাশের বাড়ির দরজাটা বন্ধ হল। পাশের বাড়ির দরজায় গিয়ে অল্প করে টোকা দিল মন্দাকিনী। দরজা খুলল একটা বউ। বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশের বেশি নয়।
‘কাকে চাই?’
‘আপনি লক্ষ্মী কাকিমা তো? মানে প্রকাশের লক্ষ্মী কাকিমা!’
‘না না। আমার নাম তো স্বপ্না। লক্ষ্মী নামে তো এখানে…
‘ও হো। আমিই তাহলে গুলিয়েছি।’
মন্দাকিনী লজ্জায় পড়ল। বউটা ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু বলবে?’
‘ওই পোকাশ যে বাড়িতে পড়তে যায় আমি সে বাড়িতে কাজ করি। ছেলেটাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসেছিলাম। এসে যা দেখলাম…’
মন্দাকিনীর মুখটা দুঃখে ঘৃণায় ভরে উঠল।
‘আর বলো কেন… প্রতিদিন এই এক জিনিস। সন্ধে পেরোলে জানলা খুলে রাখতে পারি না। ঘরে বাচ্চা আছে। কী শিখছে বলো তো!’
‘আপনারা কিছু বলেন না?’
‘ও বাবা! ওই লোকের সঙ্গে কে মুখ লাগাবে? মিনতিকেও কতবার বলেছি বাপের বাড়িতে জানা।’
‘মিনতি? ও, পোকাশের মায়ের নাম?’
‘হ্যাঁ।’
‘বাপের বাড়ি থেকে আসেনি?’
‘বলেইনি। বরের নামে আমাদের কাছেই কিছু বলে না। যতসব সতীপনা। কদ্দিন এই অত্যাচার সহ্য করে দেখব। একদিন ঠিক মরে পড়ে থাকবে দেখো। এত খারাপ লাগে ওর জন্য।’
মন্দাকিনীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তারপর মুখে একটা নকল হাসি এনে বলল, ‘আচ্ছা, আসি গো দিদি।’ বউটা ঘাড় নেড়ে দরজা বন্ধ করল।
পা চালিয়ে গলির আলো পেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল মন্দাকিনী। জায়গাটা কিচ্ছুক্ষণের জন্য শুনশান হয়ে রইল। গলির পাশে গাছের ছায়ায় ঘাপটি মেরে ছিল এক দলা অন্ধকার। সেই আঁধারে লুকিয়ে থাকা জোড়া চোখদুটো হাই পাওয়ারের কাচ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল।
***
‘ফোঁন এঁসেঁছে। ফোঁন এঁসেঁছে।’
প্রায় বার পাঁচেক চিল্লোবার পরে পর্দা সরিয়ে ঘরে এল বাণীকণ্ঠ। খেয়ে হাত-মুখ ধুচ্ছিল। তাই আসতে দেরি হল। ডান হাতে মোবাইলটা বিছানা থেকে তুলে বাঁ হাত দিয়ে কল রিসিভ করে কানে দিল। ‘হ্যাঁ বাবু, বল।’
‘বাঁবুঁ এঁলি? বাঁবুঁ এঁলি?
এমন ফুট কাটা সহ্য হয়ে গেছে বাণীকণ্ঠের। ভুরু কুঁচকে একবার শালিকটাকে বক্রদৃষ্টি হানতে না হানতেই ফোনের ওপার থেকে চেনা গলাটা ভেসে এল, ‘তুমি এত রাতে আবার বেরিয়েছিলে? কতবার বলেছি রাতে বেরোবে না। আজকাল চোখেও তো কম দেখো। কোথাও পড়ে-টড়ে গেলে কী হবে বলো তো?’
‘ব্যস, এরই মধ্যে খবর চলে গেছে?’
বলতে বলতেই বাণীকণ্ঠ দেখে দরজার বাইরে একটা ছায়া। একপাশে সরিয়ে রাখা পর্দার আড়ালে এসে কেউ দাঁড়িয়েছে। সেই ছায়াকে শুনিয়ে শুনিয়েই বলল, ‘দাঁড়া কাল সকালটা হোক একবার। তোর এই লেডি খোচরটাকে যদি না দূর করেছি আমার নাম বাণীকণ্ঠ মুখুজ্যে না।’
‘বাবু, বাজে বকা থামাও।’
উষ্ণ ধমক ভেসে এল।
‘তুই তো জানিস, রাতে খেয়ে উঠে একটু পায়চারি না করলে আমার ঘুম আসে না।’
‘ঘরের ভেতর হাঁটো না। আর আজ মোটেও তুমি খেয়ে পায়চারি করতে যাওনি বাবু।’
‘হয়েছে। অনেক ওস্তাদি করেছিস।’
বাণীকণ্ঠের কণ্ঠে স্নেহের সুর ঝরে পড়ল। ‘হ্যাঁরে বাবু, খেয়েছিস তো? রাত করিস না।’
মধ্যে আবার ফুট কাটল শালিকটা, ‘খেয়েছিস বাবু? খেয়েছিস?’
‘ধুত্তেরি থাম তো। একটু কথা বলার জো নেই।
খেঁকিয়ে উঠল বাণীকণ্ঠ। ওপার থেকে শালিকের কীর্তি ঠাওর করে বাবু হেসে
হেসে বলল, ‘এবার খাব।’
‘সে কী! অনেক রাত হল তো রে।’
‘চাপে আছি বাবু। হসপিটালে এমার্জেন্সি ডিউটি। তার ওপর এন জিওতে একটা বাচ্চার অ্যাডমিশন ছিল।
‘ওই কর। সমাজসেবা করে বেড়া। আরে আগে নিজে বাঁচ, তবে না সমাজ সেবা!’
‘ঠিক এটাই তোমায় বোঝাবার চেষ্টা করছি বাবু। এই বয়সে এত ছাত্র পড়িয়ে হবেটা কী? তাও যদি মাস গেলে দু-পয়সা পেতে।’
‘ও মা! পাই তো।’
‘থামো তো। কুড়ি-পঞ্চাশ টাকায় ছাত্র পড়াচ্ছ। মিনিমাম একশো তো করতে পারো।’
‘ওরে বাবু, কত বাচ্চার সেটুকু দেবারও ক্ষমতা নেই রে। তারা কি তবে লেখাপড়া করবে না? এই তো আজকেই, খানিক আগে। প্রকাশ বলে যে ছেলেটা পড়ে! বাপের ইলেকট্রিকের দোকান। নিত্যদিন চোখের ওপর মাকে বাপের হাতে মার খেতে দেখে দু-বেলা ঠিক করে খেতে পর্যন্ত পায় না। অথচ পয়সা নেই এমনটা নয় কিন্তু। তাও… আমার থেকে দুটো রুটি দিয়েছি। সে কী বলব বাবু তোকে, যেন কত্তদিনের ক্ষুধা! হাউ হাউ করে খেল জানিস। এত খারাপ লাগল। এদের কাছ থেকে পয়সা চাওয়া যায় বল তুই? তুই বা এত এন জিও করিস কেন? সেখানে কেন বিনে পয়সায় চিকিৎসা করিস?’
‘কী আর করব, বাপের ধারা ছেলে তো পাবেই।’
হ্যা হ্যা করে হেসে ফেলল বাণীকণ্ঠ। বলল, ‘যাক গে, তুই আর রাত করিস না বাবু। খেয়ে নে। ও হো, ছোটোর নাতিটা ফোন করেছিল রে।’
‘কে বুবলাই?’
‘হ্যাঁ। আর কে? সে তো খালি বড়ো দাদু তুমি কবে আসবে আর কবে আসবে করে গেল।’
‘চলে যাও একদিন। গাড়ি পাঠিয়ে দেব।’
‘এই তো পাটুলি আর ঢালাই ব্রিজের মাঝে। এইটুকুর জন্য গাড়ি লাগবে না।’
‘বাবু তোমার বয়স হয়েছে সেটা স্বীকার করতে শেখো।’
‘আচ্ছা বুঝেছি। বলছি পুজোতে কটাদিন ওদের ওখানে থাকতে বলছে।’
‘থেকো।’
‘কতদিন আসিস না। কবে আসবি রে?’
‘ও মা! এই তো গত মাসে গেলাম।’
একটা মাঝারি মাপের শ্বাস ফেলে বাণীকণ্ঠ বলল, ‘প্রথমে ছিল গত দিন, তারপর হল গত সপ্তাহ। এখন মাস!’
‘ওরে বাবা অত হাহুতাশ করতে হবে না। যাব যাব। এখন রাখছি। জরুরি কাজ আছে।’
‘আগে খাবি। তারপর কাজে যাবি।’
ওপার থেকে ঈষৎ হাসির ঝলক। ‘আচ্ছা আচ্ছা। ঠিক আছে। শুয়ে পড়। রাখলাম।’
‘হ্যাঁ, রাখ রাখ।’
ফোনটা কেটে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে মন্দাকিনী আড়ি-টাড়ি পেতে ঘুমোতে চলে গেছে। একা প্রহরী শালিক। খাঁচার পাশে মুখ এনে বাণীকণ্ঠ বলে, ‘সারাদিন অনেক বকেছিস। এবার ঘুমো।’
‘ঘুমো ঘুমো।’
ফিক করে হেসে আজ রাতের মতো ঘরে ঢুকে গেল বাণীকণ্ঠ।
রাত গভীর হয়েছে। মানুষের গলার আওয়াজ কমে সারমেয়দের ডাকাডাকি বেড়েছে। পাশের মেন রোড ধরে বড়ো বড়ো ট্রাক যাবার শব্দ। সেই শব্দের সঙ্গে মিশেই আলাদা একটা শব্দ হল ঘরের দরজায়। কেউ যেন টোকা দিল। বাইরের ঘরে ছেঁড়া সোফাটায় রাস্তার কুকুরের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে একা শুয়ে ছিল মিনতি। ভিতরে শোবার ঘরে ঠাঁই হয়নি। প্রকাশও বিছানায় বাপের পাশে শুতে চায়নি। কিন্তু সিজন চেঞ্জের সময় ঠান্ডা লেগে যাবে বলে জোর করে ছেলেকে বাপের পাশে শুতে বাধ্য করেছে মিনতি। ঘুম আসেনি তার। সারা গায়ে বড্ড ব্যথা। পেটের কাছটায় যন্ত্রণায় থেকে থেকেই মোচড় দিচ্ছে। শব্দটা প্রথমবার হতেই মিনতির কানে যায়। প্রথমটায় অবাক হয়ে কান পাতে। ভুল শুনল না তো? না, দরজায় সত্যিই কেউ টোকা দিল। ঘড়িতে রাত পৌনে দুটো। এত রাতে কে এল?
আবার টোকা। এবার একটা মহিলা যেন মিনতির নাম ধরে ডাকল। মিনতি উঠে দরজায় কান পাতল। অতি সাবধানি স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কে? কে?’ বাইরে থেকে উত্তর
এল, ‘স্বপ্না। দরজা খোলো।’
পাশের বাড়ির স্বপ্না। এত রাতে! বুকে আশঙ্কা নিয়ে দরজা খুলল মিনতি।
ঘড়িতে রাত সাড়ে তিনটে। জানলার পাশে কুকুরের বিকট চিৎকারে চমকে উঠে বসল প্রকাশ। পাশের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে বাবা। তবু ওর পাশের বিছানাটা খালি-খালি লাগছে। মা নেই যে। বেচারি মা-টা বাইরের ঘরে একলা শুয়ে। ঘুমিয়েছে কী? নাকি অন্যান্য রাতের মতো কাঁদছে? খুব ধীরভাবে বিছানা থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় প্রকাশ। বাইরের ঘরে এসে চমকে যায়। দরজা হাট করে খোলা। বাইরের গলিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পর্দার আড়াল থেকে। ঘরে মা নেই। বাবার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রকাশকে একা ফেলে মা কি তবে চলে গেল?
‘মা। ও মা!’
ভয়ে ভয়ে ডাকল। মিনতির সাড়া নেই। বাইরে কুকুরের ডাক। সাহস করে দরজার বাইরে মুখ বাড়াল প্রকাশ। চোখের সোজাসুজি শুনশান গলিরাস্তা। কুকুরটা আবার ডাকতেই নীচের দিকে চোখ নামাল প্রকাশ। আঁতকে উঠল। কুকুরটা ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ছটফট করছে। তার পাশেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে মিনতি। পা দুটো অল্প ভাঁজ করে ডানপাশে এলিয়ে আছে। বুকের দিকটা চিৎ হয়ে আছে। গলির আলোটা মুখের ওপর পড়েছে। গলার কাছ থেকে টাটকা লাল রক্ত বেরিয়ে পিচরাস্তা রাঙিয়ে তুলেছে। ঘর থেকে রাস্তায় পা রাখতে গেলে তিনটে সিঁড়ি নামতে হয়। প্ৰকাশ আতঙ্কিত হয়ে দুটো সিঁড়ি নেমে বোবার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ ভরে আসে জলে। ঝরঝর করে দু-গাল বেয়ে ঝরে পড়ে সে জল। অস্ফুটে ‘মা’ বলে কেঁদে ওঠে।
