ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ১১

১১

ঝুনু ভালো করে ভাত বেড়ে লাল্টুর মুখের সামনে ধরল। ‘দাঁড়া, হাতটা ধুয়ে খাইয়ে দিচ্ছি।’

‘না না লাগবে না।’

লাল্টু বলল।

‘ও মা! ভাঙা হাতে খাবি কী করে?’

লাল্টু কালকেই হাত ভেঙেছে। ঝুনুকে বলেছিল, খেলতে গিয়ে মাঠে পড়ে গেছে। কিন্তু রাতে মুদির দোকানের করিমচাচা লাল্টুর ভান্ডা ফুঁড়ে দিয়েছে। আগবাড়িয়ে বদমাইশ পিসেমশাইয়ের কাছে লাল্টুর খবর নিতে গিয়েছিল। সে তো শুনে হাঁ। ‘হাত ভেঙেছে লাল্টু? কী করে?’

‘কী করে আবার? মারপিট করে। যদিও লাল্টু একদম ঠিক কাজই করেছে।’

‘কী কাজ?’

প্রশ্নটার মধ্যে যে তীব্র হ্যালাচ্ছেদ্দা মিশে ছিল সেটা বলাইবাহুল্য। কারণ, লাল্টু ভালো কাজ করতেই পারে না।

‘লাল্টুর এক বন্ধুর কাছ থেকে জোর করে ক’টা ছেলে প্রতিদিন খাবার কেড়ে খেয়ে নেয় আর ছেলেটা কিচ্ছু বলে না। খিদের জ্বালায় কাঁদে। তা আজ ওই ছেলেগুলোকে লাল্টু এক হাত করে নিয়েছে। তার মধ্যে একটা মহা ডানপিটে। পালিয়ে যাবার আগে লাল্টুকে লাথি মেরে ইটের ওপর ফেলে দিয়েছে। তাতেই ডান হাতটি গেছে ভেঙে। কী ভাগ্যি, আমি সেখান দিয়ে যাচ্ছিলুম। তাই চট করে আমাদের তন্ময় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে প্লাস্টার করালুম। বেচারা। ওইটুকু ছেলে!’

‘হুঁ! দরদ কত। পোঁদে দম নেই তো লড়তে যাওয়া কেন? যার কেড়ে খাচ্ছিল সে বুঝত। ফালতু যত ঝামেলা এবার আমার ঘাড়ে।’

জামার হাতায় ঘাম মুছে উলটোমুখে পা চালাল প্রশান্ত। বিড়বিড় করে প্রশান্তর উদ্দেশে গাল পাড়ল করিম, ‘কার কাছে বললুম! কুলাঙ্গার!’

‘ভাঙা হাতে খাব কেন? আরেকটা হাতে খাব। দেখবে? দেখো।’

বলেই লাল্টু বাঁ হাতে খাবার মাখতে শুরু করল। আঙুলগুলো যতই এক জায়গায় এনে ভাত মাখতে যায় ততই সেগুলো এদিক-সেদিক বেঁকে ভাত ছড়িয়ে ফেলে। লাল্টু তবু বাঁ হাতেই খাবে। ঝুনু তো হেসেই খুন। ‘ওরে ওভাবে কী ভাত খাওয়া যায় নাকি?’

‘কেন যাবে না? বীরেশ তো দিব্যি পারে। জানো ছোপ্পি, বীরেশ বাঁ হাতে লিখতেও পারে। কী সুন্দর হাতের লেখা। এবার পরীক্ষায় ওই তো…’

এই রে! লাল্টু এবার একটু বেশিই বলে ফেলছিল। চেপে গেল। ঝুনু চেপে ধরল। কিন্তু লাল্টু মুখ খুলল না। ‘ওই বীরেশ তোর এখন গুরুঠাকুর হয়েছে না রে? দিনরাত খালি বীরেশ আর বীরেশ।’

‘বীরেশ যদি পারে আমি কেন পারব না? আজ থেকে আমি বাঁ হাতেই খাব।’

‘ছেলের জেদ ষোলো আনা।’

কথাটা কানেও তুলল না লাল্টু। বাঁ হাতটিকে ডান হাতের মতো সচল করার পূর্ণ প্রচেষ্টা চলতে থাকল তার। বাঁ হাতে লেখা, স্নানের সময় বাঁ হাতে টিউবওয়েল পাম্প করে বালতি ভরা। হাত সেরে গেছে। তাও বাজার করে ফেরার সময় বাঁ হাতে ভারী ব্যাগ নিয়ে যায় লাল্টু। পিছন থেকে করিমচাচা চিৎকার করে, ‘ভারী ব্যাগ দু-হাতে নে।’ কে শোনে কার কথা?

***

অমাবস্যা কাটিয়ে চাঁদ আবার তার পূর্ণ যৌবন ফিরে পাচ্ছে একটু একটু করে। রূপ খুলছে চতুর্থীর চাঁদের। আলোক মালায় ঝলমল করছে বাসনাকালী মন্দির। এ মন্দির কালীর হলেও প্রথমা তিথি থেকে দশমী পর্যন্ত বেশ ঘটা করে পুজো হয়। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। অনেক মানুষ মন্দিরের সামনে ভৈরবশিবের থানে প্রণাম ঠুকে মায়ের দোরে মাথা ঠেকাচ্ছেন।

ঢোলা ঢোলা প্যান্ট, চেক কাটা শার্ট, মাথায় লাল রঙের বড়োসড়ো পাগড়ি আর হাতে মোটা বালা। গালভর্তি দাড়িটা এতটাই লম্বা হয়েছে যে চিবুকের কাছে ছোটো মতন একটা খোঁপা বাঁধা। লোকটা মায়ের মন্দিরে এসে অনেকক্ষণ আগেই প্ৰণাম সেরে পুজো দেখছেন। ঘণ্টা আর আরতির তালে তালে দুলছেন। চোখে পুরোনো চশমা। ফ্রেমের রং চটে গেছে। তারই পাশে এসে দেয়াল ধরে ধরে বসল এক বৃদ্ধা। হাঁটুতে হয়তো সমস্যা আছে। পাঞ্জাবি লোকটা একটু সরে জায়গা দিল।

‘হাঁটুতে প্রোবলেম হলে চেয়ারে ব্যাঠিয়ে না।’

পাঞ্জাবি বললেন। চওড়া করে সিঁদুর আর লাল পেড়ে শাড়ি পরা বৃদ্ধার চশমা ঠেলে বিরক্তির চোখ দুটো বেরিয়ে এল। ‘মায়ের সামনে কেউ চেয়ারে বসে? যত্তসব!’ মহিলাটির গলায় যেন কেউ ফুটো করে দিয়েছে। ফসফস করে হাওয়া সব বেরিয়ে গিয়ে ঘষঘষে একটা টোন বেরিয়ে আসছে। ‘ও সোনাই, আমার পুজোটা একটু এগিয়ে দে না বাবা! মহিলার কথা শুনে পাঞ্জাবি এবার খেয়াল করল এক গাল কুচকুচে দাড়ি নিয়ে এলোমেলো হয়ে থাকা বৃদ্ধার ছেলেটি একটা পুজোর ডালা মন্দিরের মধ্যে চালান করে দিল।

‘মা, তুমি এখানে বোসো। আমি গেটের কাছে আছি।’

‘ও মা! মায়ের সামনে বোস।’

‘আমার এ সব পোষায় না। তুমি বোসো। ওঠার সময় মিসড কল দিও এসে তুলে দাঁড় করিয়ে দেব।’

ছেলে ফরফর করে চলে গেল। বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের দিকে তাকাতে গিয়েই পাঞ্জাবির চোখে চোখ পড়ল।

‘আপকা পুত্তর?’

কেজো হাসি ঝেড়ে বৃদ্ধা মাতৃ বিগ্রহের দিকে তাকাল। ‘তুলে নাও মা। আর কেন?’ বৃদ্ধার ভক্তিময়ী সাজগোজের পিছনে জমে থাকা হাহুতাশ পাঞ্জাবি লোকটাকেও ছুঁয়ে গেল।

পুরোহিতের গলায় বাংলা উচ্চারণে সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ বিকট শুনতে লাগছে। তবু চারপাশে সেই মন্ত্র গমগম করছে। মেয়ে-বউরা থেকে থেকেই উলু দিয়ে উঠছেন। বৃদ্ধার পুত্তর বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে মন্দিরের ছবি তুলছিল। এমন সময় একটি অটো এসে মন্দির থেকে কিছুটা তফাতে দাঁড়াল। ভাড়া মিটিয়ে বাণীকণ্ঠ মন্দিরের দিকে এল। ছেলেটি মোবাইলে ছবি তুলল বাণীকণ্ঠের। বাণীকণ্ঠ এপাশ ওপাশ ভালো করে দেখল। সামনের জলাশয়ের চারপাশে একবার চোখ চালাল। তারপর মন্দিরে ঢুকে গর্ভগৃহের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করল। পাঞ্জাবি ভদ্রলোক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে শিবের থানের সামনে দাঁড়ালেন। বাণীকণ্ঠ মোবাইলে কাকে যেন কী বলছে। মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল বেশ হতাশ হল। ফোনটা রেখে মন্দিরের চাতালে বসল বাণীকণ্ঠ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও একটি ছেলে মন্দিরে এল। কেমন যেন হাবভাব। জামাকাপড় এলোমেলো। শার্ট-প্যান্ট যে ময়লা সেটা বলা চলে না। তবে ধোপদুরস্ত নয়। বেশ কিছুদিন শেভ করেনি। বয়স এমন কিছু না হলেও দাড়িতে কাঁচার সঙ্গে কিছু পাকাও আছে। গায়ের রং চাপা। উচ্চতা পাঁচ ফুট ছয়ের বেশি হবে না। চোখ দুটো উদাসীন। হাতে নেই কোনও পূজার ডালা। তবু মন্দিরে এসে মাকে প্রণাম করছে। পাঞ্জাবি লোকটা চোখ বুজে ভাবতে লাগলেন কোথায় দেখেছে? লোকটা নমস্কার সেরে বাণীকণ্ঠের পাশে গিয়েই বসল। দুজনে কি পরিচিত? হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় একেবারেই। তখনই মাথার মধ্যে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল পাঞ্জাবির। বাইরে বৃদ্ধার ছেলেটা দাঁড়িয়ে ছিল। এই পাঞ্জাবি ভদ্রলোক তার কাছে গিয়ে নিজে থেকেই বিড়বিড় করলেন। পিছন ফিরে যখন বাণীকণ্ঠের পাশে তাকালেন দেখলেন সেই লোকটি নেই। ঝট করে দ্রুত পায়ে এসে মন্দিরের দরজার দিকে তাকাতেই দেখলেন লোকটি পূজারিকে কিছু একটা দিচ্ছে। পূজারি হাত বাড়াচ্ছে। পাঞ্জাবি দৌড়ে এসে চিৎকার করে হিন্দি উচ্চারণে বলে উঠলেন, ‘জ্যায় মা কালী। জ্যায় মা মহাকালী।’ বলেই একেবারে এমন করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে মাটিতে শুয়ে পড়লেন যে ধাক্কা লেগে লোকটির হাতের জিনিসটি পুরোহিতের হাতে পৌঁছোবার আগেই ঠুংঠাং শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেল। স্বভাবতই পুরোহিত বিরক্ত হয়ে রেগে গেলেন। লোকটিও মেজাজ দেখিয়ে উঠল, ‘আরে অদ্ভুত লোক তো।’ ততক্ষণে পাঞ্জাবির চোখের সামনে মাটিতে পড়ে আছে দেড় আঙুল লম্বা একটি পিতলের খাপ যার মধ্যে থেকে একটা ছুরির বাঁট বেরিয়ে আছে। চোখের পলকে পাঞ্জাবি সেটি তুলে নিয়ে ঘ্যাঁচ করে খুলে নিল। লোকটি খেঁকিয়ে উঠল, ‘একি! খুলছেন কেন?’

‘মায়ের মন্দিরে চাকু? ইহ কী হ্যায়?’

পিছনে কয়েকজন বেশ কোলাহল করে ওঠেন। বৃদ্ধা কৌতূহলী হয়ে মুখ বাড়ান। পুরোহিত বলেন, ‘এটা উনি মায়ের পায়ে ছোঁয়াতে এসেছেন।

‘চাকু?’

ছুরির মালিক বলে ওঠেন, ‘হাঁ হাঁ চাকু। ঠাকুরমশাইকে দিয়ে দিন।’

‘পর চাকু কিঁউ?’

‘আপনার জেনে কাজ কী? দিন।’

লোকটি আবার খেঁকিয়ে উঠল। পিছনের বৃদ্ধা বলে উঠলেন, ‘না না, এ তো ঠিক নয়। এতগুলো মানুষের মধ্যে চাকু দেওয়া নেওয়া হবে কেন? এই সোনাই এই দ্যাখ কীসব হচ্ছে।’ বৃদ্ধা চেঁচিয়ে মন্দির চত্বর মাতিয়ে তুললেন। সোনাই পুত্তর অমনি ছুটে এল। সঙ্গে আরও কয়েকজন। লোকটি বেকায়দায় পড়ে বলল, ‘এটা আমার মায়ের জিনিস। খাপটা দেখেছেন? সলিড পিতলের।’ জিনিসটা যে পুরোনো সেটা দেখেই বুঝেছেন পাঞ্জাবি ভদ্রলোক।

‘তা এই মায়ের চাকু মায়ের পায়ে দিবেন মানে কুছ সমঝ নেহি আয়া।’

এবার লোকটি তুতলে উঠল, ‘এ… এটা দিয়ে ঠাকুরের ফল-টল কাটি। কিন্তু কীভাবে যেন ডাস্টবিনে পড়ে গিয়েছিল। তাই ভালো করে মেজে ধুয়ে মায়ের পায়ে ঠেকিয়ে শোধন করে নিয়ে যাচ্ছি। দিন তো এটা। অনেক হয়েছে।’ লোকটি ছুরিটি প্রায় পাঞ্জাবি ভদ্রলোকের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল। লোকটির এই আকস্মিক পরিবর্তনে সকলেই হতভম্ব। বৃদ্ধার বাবু তার মা ও এই পাঞ্জাবি ভদ্রলোকের দিকে তাকায়। বিস্মিত ও সন্দেহজনক দৃষ্টিতে বৃদ্ধা ও তার সোনাইয়ের দিকে তাকাতে গিয়ে শিবের থানে চোখ আটকে যায়। বাণীকণ্ঠ উধাও। চোখের ভাষা পড়তে পেরেছে বাবু। পিছন ঘুরে তাকাতে সেও চমকে ওঠে। এদিক-সেদিক কোনওদিকেই বাণীকণ্ঠ নেই। সোনাই দৌড়ে রাস্তায় যায়। সেখানেও নেই। কেবল ছুরি হাতে ছেলেটি তরতর করে হেঁটে এগিয়ে চলেছে। কেমন করে যেন হাঁটে ছেলেটি। ঠিক স্বাভাবিক নয়।

‘স্বপ্নার প্রেমিককে আর সন্দেহের ঊর্দ্ধে রাখা গেল না রাজারাম।’

সোনাইয়ের কানের কাছে এসে পাঞ্জাবি ভদ্রলোকবেশী স্বয়ম্ভূ কথাটা বলল।

‘স্বপ্না মানে মিনতি গুহর প্রতিবেশী?’

‘ইয়েস।’

চারপাশ দেখতে দেখতে স্বয়ম্ভু বলল, ‘বাণীকণ্ঠই বা বেছে বেছে এখানে কেন

এলেন? গোলমালের মাঝে চলেও গেলেন!’

‘স্বপ্নার ফুটেজে বাণীকণ্ঠকে দেখা, একই গলিতে ঢোকা, আবার আজ পাশাপাশি এসে বসা, এ সব কাকতালীয় হতে পারে না স্যার।’

‘আরও একটা ভয়ানক বিষয় খেয়াল করেছি। ওই ছুরিওয়ালার পায়ে বেশ গন্ধ। পা ঘামেও। আমি তো ওর পায়ের কাছেই পড়েছিলাম।’

‘তাহলে যেতে দিলেন কেন? ওকে ফলো করি?’

‘অলরেডি ওকে ফলো করছে আমার লোক। এমনকি ওর পাড়াতেও। মঞ্জু কি এই লোকটার জন্য মাঝরাতে অমলেট বানাবে?’

একগুচ্ছ অবিশ্বাস নিয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে ঠোঁট ওলটালো স্বয়ম্ভু। ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল।

‘বলো তুহিনদা।’

‘তুমি যেটা সন্দেহ করেছিলে মঞ্জুর শরীরের তার কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কোনও কসমেটিক্স প্রিজার্ভেটিভ নেই। শুধুমাত্র ওই ভাজা তেলের গন্ধ ছাড়া তেমন একটা কিছু পাইনি। আমার মনে হয় মঞ্জুকে ও স্পর্শই করেনি। এমনকি বাকিদের স্কিন থেকে মার্ডারারের স্কিন স্পেসিমেন মানে ওই একটা-দুটো চুল যাও বা পাওয়া গিয়েছিল এক্ষেত্রে সেটাও পাইনি।’

‘স্বাভাবিক। মঞ্জুকে মারতে শুধু ছুরিটা চালিয়েছে আর কোনও কসরতই করতে হয়নি। বাকিগুলো?’

‘আমাদের আর মঞ্জুর পা বাদ দিলে আর একটিমাত্র পায়ের মাপ পাওয়া গেছে।’

‘মাপটা কি পঁচিশ থেকে সাতাশের মধ্যে?’

‘কারেক্ট। ছাব্বিশ সেন্টিমিটার। কিন্তু তুমি কী করে জানলে?’

‘মানুষটার হাইট পাঁচ ফুট ছয়ের বেশি নয়।’

‘তুমি কি দেখেছ তাকে?’

‘যদি এই-ই হয় তাহলে দেখেছি। পায়ের গন্ধও পেয়েছি।’

‘ধরেছ?’

ফোনের ওপারে তুহিনের গলায় উত্তেজনা চরম।

‘পায়ের গন্ধ দিয়ে খুনি ধরার মতো ছুঁদে গোয়েন্দা আমি নই তুহিনদা। আর ধরলেও আমাদের আইন তাকে নাচতে নাচতে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। হাতে নাতে ধরতে হবে। চটপট পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করো। রিপোর্ট চাই। রাখলাম।’

ফোনটা রেখেই স্বয়ম্ভু রাজারামকে প্রশ্ন করল, ‘ওই ছুরিওয়ালা গন্ধগোকুল এল কেন রাজারাম?’

‘পরিবেশটা দেখতে এসেছিল স্যার।’

‘লোক আছে বলছ?’

‘ডেফিনেটলি।’

‘ওই লোকের উদ্দেশ্যই যদি হয় ছুরিটা পুরোহিতের হাতে ট্রান্সফার করা তাহলে সেটা তো হল না। আমরা বেকার দাঁড়িয়ে নেই তো?’

‘পুজো শুরুর আগে মন্দিরের ভিতরও চেক করেছি। কিছুই নেই।

‘রিডলে সাপের কথা ছিল। বাইরে মহাদেবের থান। সেখানেও সাপ আছে।’

‘কিন্তু স্যার, সেখানে তো কেউ লুকিয়ে থাকতে পারবে না। জায়গাটা তো খোলা।’

‘ধ্যাৎ! চারপাশে সন্দেহ করার মতো এত জিনিস। কিন্তু কোনওটাই মেলাতে পারছি না।’

‘এখন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই স্যার।’

‘আচ্ছা ধরো লোকটা ছুরিটা পুরোহিতের হাতে ট্রান্সফার করে দিল। তাতে কী হত? পুরোহিত খুন করত?’

যুক্তিটা নিজেরই অত্যন্ত ক্লিশেড লাগল বলে মুখে একটা বিরক্তির শব্দ করল স্বয়ম্ভু।

***

পৃথিবীটা বড়ো আজব। একই মাটিতে একইরকম ঘটনা একই সঙ্গে ঘটে চলেছে। তবু চরিত্রগত, অবস্থানগত কত আলাদা। একই, কিন্তু এক নয়। এই চেনা হয়েও অচেনার আড়ালে কত সহস্র রহস্য যে ঘনীভূত হয়ে ওঠে তার খবর রাখে ক’জন? নিজের বাড়িতে অন্ধকার ঘরে অল্প পাওয়ারের টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বসে কাটলেটে কামড় দিচ্ছে আর দু-তিনটে করে কাটা শশা আর পিঁয়াজ মুখে পুরছে অতনু। কানে ধরা মোবাইল। ‘নিজেকে প্রস্তুত করছি।’

‘এখনও তোমায় পোস্তুত হতে হয়? পোথমবার তো নয়।’

মন্দাকিনীও একলা বাড়িতে কানে মোবাইল দিয়েছে।

অতনু বলল, ‘এর আগেরবারগুলোয় চ্যালেঞ্জ ছিল না। কিন্তু এবারের অপারেশনে চ্যালেঞ্জ আছে।’

‘সত্যি বলো, টেনশন কোচ্চ!’

মন্দাকিনীর মুখেও যেন সেই ভয়ের আবহ।

‘করছি। তাই তো নিজেকে হালকা করছি। কাজটা ঠান্ডা মাথায় করতে হবে। একসঙ্গে দুটো।’

হাতে ধরা আধখানা কাটলেটটা সামনের টেবিলে রাখল অতনু।

‘দুটো?’

মন্দার প্রশ্ন।

‘ন্যাকা! জানো না নাকি?’

ভ্যাংচাল অতনু।

মন্দার গলা ভারী, ‘এভাবে আর কতদিন? একদিন তো থামতে হবে।

‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেইদিন হব শান্ত! রাখি। লাভ ইউ।’

মন্দা ফোনের স্পিকারে একটা চুমু খেল। বুকটা ভারী হয়ে আছে। এতক্ষণ যেন কানের কাছে কোনও এক বিপুল আন্দোলনের ঢেউ তার গম্ভীর নিনাদে আছড়ে পড়ছিল। মন্দাকিনী তার কতকটা বুঝল আর কতকটা অন্তরে তোলপাড় করে গেল। ওপারের ফোন কাটতেই পাশের ঘর থেকে ছেলেপিলের কোলাহলটা যেন একটু বেশিই কানে এসে ঝাপটা মারল। মুখটা ব্যাজার করারও টাইম পেল না। কলিংবেল বেজে উঠল।

বাণীকণ্ঠর বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে সাড়ে আটটা হয়ে গেল। বাড়ির ভিতর থেকে কলকল করে ছেলেপুলেদের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

‘দু-দিন বাদে পুজো। বাচ্চাগুলো সেই কখন থেকে এসে বসে আছে। এদিকে মাস্টারেরই পাত্তা নেই। আজ আর পড়িয়ে কাজ নেই। বাড়ি পাঠিয়ে দাও। ওই রাতবিরেতে ছেলেপুলেদের বাড়ি নে যেতে পারব না বলে দিলাম।’

ছ্যারছ্যার করে কথাগুলো শুনিয়ে গেল মন্দাকিনী। চশমার মোটা কাচের মধ্যে দিয়ে একবার মন্দার দিকে ক্লান্ত দৃষ্টি হেনে ঘরে যেতে যেতে বলল, ‘কড়া করে একটু চা করে দে। দুধ চিনি দিয়ে করবি।’

‘সুগারের ওষুধগুলো খেয়ে আর লাভ কী?

‘বেশি ওস্তাদি করিস না।’

দিব্যি খাঁচার মধ্যে ঝিমোচ্ছিল বিটকেল। হঠাৎ ডানা ঝাপটে গলার শির ফুলিয়ে বলে উঠল, ‘কঁরিস নাঁ করিস নাঁ।’

‘কষ্ট তো তুমিই পাবে তাই বলছিলুম।’

‘থাক। তোকে আর দরদ দেখাতে হবে না। চা দে।’

‘বলছি শোনো না।’

মন্দাকিনীর গলায় হঠাৎ করেই নরম সুর।

‘উফ কীইইই?’

বিরক্ত হয়ে ঘাড় ফেরাল বাণীকণ্ঠ। ‘ওই… ওই সে এসেছিল…’

‘কে?’

‘ওই বিমল।’

‘বাবা! নামটা একেবারে হৃদয়ে গেঁথে গেছে দেখছি। না আসেনি। ওর সেলুনে ভিড় ছিল।’

‘ও আসেনি।’

কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল মন্দাকিনী। বৈরাগী ভাব দেখে বাণীকণ্ঠ বলল, ‘কেন? দুঃখ পেলি নাকি?’

‘দুঁঃখঁ পেঁলিঁ? দুঁঃখঁ পেঁলিঁ?’

বিটকেলের ফুট কাটা ব্যাপারটা সবার সয়ে গেছে। তাই কেউ পাত্তাই দেয় না। ‘দুঃখ নয়, চিন্তা। ভেবেছিলুম ছেলেটা থাকবে। তাই ছেড়েছিলুম। ও মা! সে ব্যাটা পুজো-পুজো করে তোমায় নাচিয়ে নিজেই কেটে পোল্ল?’

‘ধুর।’

একরাশ বিরক্তি উগরে দিয়ে পর্দা উড়িয়ে ঘরে ঢুকে গেল বাণীকণ্ঠ। দোরের পাশেই বসে ছিল সাদা খরগোশটা। আচমকা ঝড় ওঠায় সে বেচারি ভয় পেয়ে তুডুক তুড়ুক লাফিয়ে সোজা টেবিলের নীচে।

গাড়িতে বসেই মোবাইল দেখতে দেখতে হাই তুলল শিবাঙ্গী। বৃদ্ধার পরচুল কুটকুট করছে মাথায়। বাসনাকালীবাড়ি থেকে বেশ খানিক দূরেই গাড়িটা দাঁড়িয়ে। গাড়িতে হ্যালান দিয়ে সিগারেট ধরিয়েছে স্বয়ম্ভু। রাজারাম পায়চারি করছে আর জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটছে। স্বয়ম্ভূ আলতো স্বরে ডাকল, ‘রাজারাম…!’

‘স্যার।’

‘নির্ভয়ে খেতে পারো। আমি তো আর তোমার বাপ-ঠাকুরদা নই।’

রাজারাম হাসল। মোবাইলটাকে পকেটে রেখে তারও অন্য পকেট থেকে বেরোল সিগারেট। খোলা দরজার সামনে বসেই শিবাঙ্গী বচন ঝাড়ল, ‘ছুপ্পা রুস্তম। ও নাকি খায় না। হুঁ!’ ভুরু কুঁচকে প্রতিবাদ করল রাজারাম, ‘কবে বলেছি রে তোকে যে আমি এ সব খাই না। হ্যাঁ, বেশি নয়।’ স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর মুখের গোঁড়ায় জ্বলন্ত সিগারেট ধরে বলল, ‘কাউন্টার নেবে নাকি?’

‘ধ্যাত।’

সিগারেটে আগুন ধরাতে ধরাতে কুঞ্চিত চোখে ব্যাপারটা দেখল রাজারাম। স্বয়ম্ভুর কাউন্টার পার্ট শিবাঙ্গীকে? লাইটারের আগুনটা জ্বলে উঠলেও খানিকক্ষণ পর সিগারেটে স্পর্শ করল। শিবাঙ্গী বলল, ‘ডাহা ঠকান ঠকিয়েছে। ইচ্ছে করে আমাদের মিস লিড করেছে।’

‘অরণ্য তপাদারও ছুরি নিয়ে নিজের বাড়িতে ঢুকে দরজা দিয়েছে।’ স্বয়ম্ভু বলল। ‘খুনি আমাদের খেলাচ্ছে স্যার।’

রাজারাম বলল।

‘সে তো প্রতি কেসেই খেলি। খেলতে খেলতে খপ করে পাকড়ে ফেলার মজাই আলাদা।’

‘পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে আর আপনি মজা পাচ্ছেন।

‘মারুক। যত ডন মারবে ছুঁচোর শরীর তত খোলতাই হবে।’

‘গ্যাস হয়ে উবে যাবে স্যার। সব লোক চলে গেল। মন্দিরও বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে কিছুই হল না।’

‘অদ্ভুত তো। একটা মানুষ টপকে গেলে তুমি খুশি হতে শিবাঙ্গী?’

‘তা কেন স্যার?’

মোবাইলে চোখ রেখেই স্বয়ম্ভু বলল, ‘তবে? আপশোস করছ কেন? তার চেয়ে এইটা ভাবো, যে একটা অপরাধ যেখানে হবার কথা ছিল সেটা আমরা এসেছি বলে হল না। সব সময় নেগেটিভ চিন্তা।’

অকাট্য যুক্তি। ‘কিন্তু স্যার, এইভাবে সং সেজে দলবল নিয়ে কতদিন অপরাধ আটকাব?’ ধোঁয়া ছাড়ল রাজারাম।

‘আরও একটা খটকা লাগছে আমার।’ স্বয়ম্ভু বলল। ‘ধাঁধাটার সম্পূর্ণ কথাটা কিন্তু আমরা এখনও বুঝতে পারিনি।

‘ওটা জাস্ট ভুলভাল। আমাদের মিসলিড করার জন্যই। সব সাজানো ছক।’

‘একজন খুনি খুনের পিছনে সময় না দিয়ে শুধু-শুধু আমাদের পেছনে লাগবে কেন?’

রাজারামের কথার কাউন্টার করল শিবাঙ্গী। হঠাৎই গুম হয়ে গেল স্বয়ম্ভু। মাথার মধ্যে রিডলের লাইনগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। ‘Kalir ghore baro nombor a para sap. 4-99.’ বিড়বিড় করে বলে উঠল স্বয়ম্ভু। রাজারাম আর শিবাঙ্গী স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাতেই স্বয়ম্ভূ বলল, ‘অনেকেই রোমান হরফে বাংলা লিখলে এক্স্যাক্ট উচ্চারণ লেখে না। করো শব্দকে karo লেখে। তেমনি বড়ো শব্দটাকে এখানে আমরা বারো ভাবছি না তো?’

‘কিন্তু পরে তো নম্বর লেখা। বড়ো নম্বর বলে তো কিছু হয় না।’ শিবাঙ্গীর উক্তি।

‘তাহলে তো ঘরে শব্দটাকে ghare লিখত। তা তো লেখেনি।’ রাজারামের যুক্তি।

‘ঠিক কথা। কিন্তু কী জানো তো, হারামিগিরি করলে অনেক রকম ভাবেই করা যায়।’

‘ঠিক বলেছেন স্যার। কেন জানি না এই কালী-ফালির ব্যাপারটা ফেক মনে হচ্ছে।’

রাজারামের কথাকে ধরেই স্বয়ম্ভু বলে, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। আরও একটা বিষয়, পুজোর সময়টুকু ছাড়া মন্দির বন্ধ। আর পুজো হয় সকালে আর সন্ধেয়। লোকটা খুন করছে মাঝরাতেরও পরে। অতএব সকালে ও সন্ধেবেলার অঙ্কটা মিলছে না। আশপাশে খবর নিয়েছি, এখানে যে বাড়িগুলো আছে সেখানে সেভাবে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স কোথাও হয় না। বাইরের লোক অন্তত জানে না। এর আগের কেসগুলোতে সকলেই জানত যে হাজব্যান্ড বউকে মারে। তাহলে কি ফিরে যাব?

শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার এসেছি যখন রাতটুকু দেখেই যাই। রিস্ক নেওয়াটা ঠিক হবে না।’ স্বয়ম্ভূ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘মন্দিরের দিক থেকে একবার টহল দিয়ে আসি।’

‘আমরা ভক্ত। মন্দির বন্ধ হয়ে যাবার পরেই বারবার গেলে মুশকিল। লোক আছে। ঠিক খবর দেবে। মোবাইলে দেখে নাও।’

.

তিনজনে থেকে থেকেই মোবাইল দেখছিল। কারণ মন্দিরের আশপাশে সিভিল ড্রেসে যেসব সিভিক ভলেন্টিয়ার আছে তাঁদের প্রত্যেকের শরীরের কোথাও না কোথাও গোপন ক্যামেরা আছে। যেগুলো স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী আর রাজারামের মোবাইল থেকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে শিবাঙ্গী মোবাইল থেকে চোখ তুলতেই থমকে গেল। স্বয়ম্ভু সামনে দাঁড়িয়ে মাথাটাকে একদিকে অল্প করে হেলিয়ে শিবাঙ্গীকে দেখে যাচ্ছে। ঘিয়ে লাল পেড়ে শাড়ি, হাতে শাঁখা-পলা, মাথায় টকটকে লাল সিঁদুর। চুলটা কাঁচা-পাকা। ‘কিছু বলবেন স্যার?’ শিবাঙ্গী একটু অস্বস্তিতে পড়েই প্রশ্নটা করল স্বয়ম্ভুকে।

‘রাজারাম…’

স্বয়ম্ভু ডাকল।

‘স্যার…!’

কাছে এগিয়ে এল রাজারাম। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, ‘শিবাঙ্গীর চুলটা পাকা না হয়ে কাঁচা হলে কেমন লাগত বলো তো?’

খুনি ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। এমতাবস্থায় শিবাঙ্গীর রূপের বাহার নিয়ে হঠাৎ এমন প্রশ্ন শুনে একটু বিস্মিতই হল রাজারাম। এখনও ঠিক স্বয়ম্ভুকে বুঝে উঠতে পারেনি সে।

‘কী হল? বলো, কেমন লাগত। ‘

শিবাঙ্গী নিজের মুখটা ঠিক কীভাবে রাখলে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে পারবে বুঝতে পারল না। রাজারামের গলায় উষ্ণ ভাতের ঘ্রাণের মতো শান্তি, ‘দারুণ! একদম নতুন বউ!’ রাজারাম বোঝেনি, স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর নয়, রাজারামের মুখের ভাবটাই দেখতে চেয়েছিল। কথাটা বলার পরেও রাজারাম শিবাঙ্গীর দুটো চোখের দিকে নিষ্পলকে চেয়ে আছে। স্বয়ম্ভু ফিশফিশ করে বলল, ‘পিছনে খুনি রাজারাম!’ রাজারাম সহসা ঘুম থেকে ওঠার মতো তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে বোঁ করে এক পাক ঘুরে যায়। স্বয়ম্ভু নিঃশব্দে খিলখিল করে হেসে ওঠে। রাজারাম লজ্জায় মাথা চুলকে বোকা বোকা হাসি হাসে। স্বয়ম্ভু রাজারামের দুটো কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘স্বয়ং বিশ্বামিত্র মুনি নারীর মোহিনী মায়ায় ফেঁসে গেছিলেন। আর তুমি তো সামান্য রা-জা-রা-ম! লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।’ শিবাঙ্গীও ফিক করে হেসে ফেলে।

‘হ্যাঁ তুহিনদা বলো। ডিনারে কী খেলে?’

‘ফিশফ্রাই আর চিকেন কাটলেট।’

‘আরিব্বাস!’

‘মশকরা রাখো। এ সব খাবার আমি খাইনি।’

‘তবে?’

‘খুনি খেয়েছে।’

স্বয়ম্ভু শিরদাঁড়াটা এলিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফরেন্সিক এক্সপার্টের কথা শুনে টানটান হল। তুহিন বলল, ‘ওই যে বলেছিলাম, খুনি মঞ্জুকে স্পর্শই করেনি ওটা ভুল। গলায় ছুরি চালাবার আগে আততায়ী এক হাত দিয়ে মঞ্জুর চুলের মুঠি ধরে। স্বভাবতই সেটা ডান হাত। তাই মঞ্জুর চুলেও সেই তেল লেগে। বোঝাই যাচ্ছে, খুনের খুব বেশি আগে খাবারগুলো খায়নি। বলা ভালো, সদ্য সদ্য খেয়েছিল।’

‘তার মানে খুনি ডানহাতেই খায় আর বাঁহাতে খুন করে। থ্যাংক ইউ তুহিনদা। আর কিছু?’

‘আপাতত না।’

‘গুড নাইট।’

‘কী খবর স্যার?’

শিবাঙ্গীর প্রশ্ন। অন্য কারও নম্বর খুঁজতে খুঁজতেই তুহিনের কথাগুলো জানাল স্বয়ম্ভু।

‘কৌশিক, ইমিডিয়েটলি ঢাকুরিয়া স্টেশন চত্বরে কোন কোন ফাস্টফুডের দোকান খোলা আছে এবং রাত অবধি কোন কোন দোকান খোলা থাকে খবর নাও। যেখানে চিকেন কাটলেট, ফিশফ্রাই এই জাতীয় খাবার পাওয়া যায়। যা যা সোর্স লাগাবার লাগিয়ে দাও। ফোনে না পেলে টেক্সট করবে আমায়। রাখলাম।’

ফোনটা রেখেই দিব্যেন্দু পাড়িয়াকে ফোন করে এই একই কথা বলে স্বয়ম্ভু। শুধু যুক্ত করে উক্ত অঞ্চলের সকল সিসিটিভি ফুটেজের কথাটা। সব স্বয়ম্ভুর চাই। রাজারাম আর শিবাঙ্গী কেউই বুঝতে পারে না এই একই জিনিস দুজনকে বলার মানে কী? স্বয়ম্ভু এক ঝলক দুজনের দিকে তাকিয়েই বিনা প্রশ্নে উত্তর দিল, ‘একজন কিছু মিস করলে আরেকজন যাতে জানাতে পারে তাই দুজনকেই বললাম। এভাবে তাকাবার কী আছে?’ এরপরেও রাজারাম হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেখে স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, ‘কী-ই?’

‘আপনি কি মাইন্ড রিড করতে পারেন?’

‘অল্টারনেট একটা প্রফেশন তো ভেবে রাখতে হবে। গোয়েন্দাগিরি না পোষালে মানুষের মনের কথা বলে বেড়াব আর দু-হাতে পয়সা কামাব।’

কথাটা বলতে বলতে আকাশের দিকে তাকাল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী যে অপাঙ্গে স্বয়ম্ভুর দিকে চেয়ে আছে সেটা কি বুঝল স্বয়ম্ভু?

***

চতুর্থী ফুরোতে চলল। মধ্যযামের চাঁদ আরও উজ্জ্বল। পথে-ঘাটে আলোর বিরাম নেই। তবু যারা আঁধারের যাত্রী তারা ঠিক আলোর পিছনের অন্ধকারটুকুকে খুঁজে নেয়। প্রতি মাঝরাতে স্বপ্না ঠিক কোন আলোর সন্ধানে যায় তা পুলিশের কেন, পাড়া- প্রতিবেশী এমনকি তার স্বামীরও জানা নেই। আজও সে বেরিয়েছে। ভাগ্য ভালো মোড়ের দোকানটা আজ তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তা পেরিয়ে আবার সেই ঈষৎ অন্ধকার মাখা গলি। তারপর সেই বাড়ি। আঁচলের নীচে কী যেন লুকোনো। কিন্তু আজ একটা কাণ্ড হল। বেশ কয়েকবার গেটে শব্দ করা সত্ত্বেও সেই অন্দরের পুরুষ মানুষটি দরজা খুলল না। বেলটা তো সেই কবে থেকেই খারাপ। পা টিপে বেরিয়ে এল স্বপ্না। আবারও এপাশ ওপাশ দেখে বাড়ি ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল। বাঁদিকে তস্য সরু গলি। সেখানে ঢুকে গেল। বাইরের লোকটি একটু ভাবল, ঢুকবে? এমন গলি যে দুজন পাশাপাশি হাঁটা যাবে না। কিন্তু না গেলেও নয়। ঢুকে গেল। দেখা গেল স্বপ্না ওই একই বাড়ির আরেকটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ পিছনদিকেও একটা দরজা আছে। স্বপ্না দরজাটিতে ধাক্কা দিল না। বরং সেখান থেকেও বেরিয়ে আসছে দেখে লোকটি ও এক ছুটে গলির বাইরে এসে অন্ধকারে গা ঢাকা দিল। স্বপ্না রাস্তায় দাঁড়িয়েই কী যেন ভাবল। বেশ বোঝা গেল স্বপ্না বিচলিত। বুকের জামার মধ্যে থেকে মোবাইলটা বের করতে গিয়ে আঁচলের নীচ দিয়ে একটা স্টিলের টিফিন কেরিয়ার উঁকি দিল। কাকে যেন ফোন করল কিন্তু কথা বলল না। নিশ্চয়ই ওই ছেলেটিকে। ফোন তোলেনি নির্ঘাত। স্বপ্নার মুখটা কাঁদো কাঁদো। কপালে আর গলায় এর মধ্যেই ঘাম দেখা দিয়েছে। আঁচল দিয়ে মুছে নিয়ে আবার বাড়ির পথে হাঁটা দিল। স্বপ্না রাস্তা পেরিয়ে নিজের গলিতেই ঢুকে গেল।

***

স্বয়ম্ভূ মোবাইলে চোখ দিয়ে বসেছিল আর মশা মারছিল। ফোনটা বেজে উঠল। রতন। স্বয়ম্ভুর ভুরু কুঁচকে গেল। ‘হ্যাঁ রতন বলো।’ কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা আরও গভীরভাবে স্বয়ম্ভুর ভুরুতে ভাঁজ ফেলে দিল। ‘তুমি বাড়িতে ঢুকতে দেখেছিলে তো?… লোক লাগাও। বেশি দূর যাবে না। হুম!’

এখন আর ছদ্মবেশে থাকার কোনও মানে হয় না। অন্তত পরচুলটা খোলাই যায়। শিবাঙ্গী তাই করেছে। কালীমন্দিরের কাছ থেকে টহল মেরে আসছিল সে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘ছুরিওয়ালার বাড়ির পিছনদিকে একটা দরজা আছে। অরণ্য সেখান দিয়েই কখন ভেগেছে রতন দেখতে পায়নি। স্বপ্নাও জানে না। সে নাকি খাবার নিয়ে যায় ছেলেটির জন্য।’ শিবাঙ্গী যেন আঁতকে ওঠে। ‘সেকি! এ তো সুমিতার কেসের মতো। সুমিতাও বিট্টুর জন্য খাবার নিয়ে যেত।’

‘অথচ এই ছেলেটি বিট্টু নয়। তার মানে খুনির পোষা আরও লোক আছে। যারা একই পদ্ধতিতে কার্যসিদ্ধি করে যাচ্ছে। তবে রতনের একটা বিষয়ে সন্দেহ হয়েছে।’

‘কী?’

‘ছেলেটিকে না পেয়ে স্বপ্নার মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে গিয়েছিল। ঘামছিল।’

‘টেনশন?’

‘প্রিয়জনকে না পেলে মানুষের টেনশন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বপ্না ছেলেটিকে না খুঁজে বাড়ি চলে গেল। কেন? তার মানে কি স্বপ্না জানে যে ছেলেটি কোন কাজে যেতে পারে? এমন কোনও কাজ, যেটা স্বপ্নার ভয়ের কারণ। কিংবা স্বপ্না হয়তো জানে না ছেলেটি কোথায় গেছে।’

‘ডাকাতরা বলি দেবার আগে খড়্গগটা মা কালীর পায়ে ঠেকাত। অরণ্য যদি সেরকম কেউ হয় তাহলে তো…’

কপালটা ঘামে চিটচিট করছিল। পকেট থেকে রুমাল বার করে ঘামটা মুছে নিল স্বয়ম্ভু। দাঁড়ির আঠায় গালদুটো চচ্চড় করছে। মোবাইলটা আবার বেজে উঠল স্বয়ম্ভুর। স্ক্রিনে আননোন নম্বর

‘হ্যালো।… আচ্ছা বলুন… হোয়াট?… আসছি।’ ফোনটা কেটে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে স্বয়ম্ভু।

‘কী হয়েছে স্যার?’

স্বয়ম্ভু চোখ বন্ধ করে। শিবাঙ্গী পুনরায় ডাকবে কি না ভাবছিল। স্বয়ম্ভু গাড়ির গায়ে ঘুষি পাকিয়ে একটা আঘাত করে।

‘স্যার কী হয়েছে?’ শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করে।

‘রাজারামকে ডাকো।’

শিবাঙ্গী তখুনি ফোন করে ডাকে। ছুটে আসে সে। স্বয়ম্ভু বলে, ‘রিডলের উত্তর পেয়ে গেছি।’ শিবাঙ্গী আর রাজারাম একে অপরের দিকে তাকায়। স্বয়ম্ভু বলে, ‘কালীর ঘরে অর্থাৎ কালিকাপুর। বারো নম্বর এ পারা সাপ। পারা মানে পারদ নয়, পাড়া। সাপের পাড়া। সাপুই পাড়া। কালিকাপুরের সাপুই পাড়া।’

‘আর বারো নম্বর এ? ফোর হাইফেন নাইনটি নাইন?’

শিবাঙ্গী জানতে চায়।

‘ফোর মানে চতুর্থী। কলকাতা নাইনটি নাইন মানে কালিকাপুর। বারো এ মানে টুয়েলভ এ। একটা বাড়ির নম্বর। একটু আগেই এই বাড়ির এক মহিলার লাশ পাওয়া গেছে। সেম প্যাটার্ন। খুনটা বেশিক্ষণ হয়নি। পাড়ার লোক পুলিশকে খবর দেয়। লোকাল পি এস থেকে ডিউটি অফিসার কল করেছিল।’

রাজারাম হতাশ হয়ে ফোঁসফোঁস করে শ্বাস নিতে থাকে। স্বয়ম্ভু বলে, ‘খুনিও ঠিক এইভাবে শ্বাস নিচ্ছে রাজারাম। এবার ওর নাক আর গলাটা টিপে ধরতে হবে। লেটস গো।’

আমার ইভনিং শিফটে ডিউটি থাকে বলে প্রতিদিন মাঝরাতের পরেই ফিরি। আজ বরং একটু তাড়াতাড়ি ফিরেছি।’

‘আপনি কী দেখলেন গলিতে ঢুকে?’

‘দেখলাম রুনুদি এখানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।’

আরেক রিপোর্টারের পঁচিশ বছরের ছেলেটিকে প্রশ্ন করে, ‘আপনি এনাকে চিনতেন আগে থেকে?’

‘হ্যাঁ চিনব না কেন? রুনুদির বাড়ির তিনটে বাড়ি পরেই তো আমাদের বাড়ি।’

‘লোকে তো বলছে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার। সেটাই কি কারণ?’

‘সে আমি কী করে বলব?’

‘আপনিই পুলিশকে খবর দেন?’

‘না না, আমি সবাইকে ডাকি। চিৎকার করি। পুলিশকে খবর দিয়েছে বোধহয় শোভনকাকু। শোভনকাকু, তুমিই তো পুলিশকে খবর দিলে না?’

বেশ চিৎকার করেই প্রশ্নটা করে ছেলেটি। মাঝবয়সি লোকটি সম্মতি জ্ঞাপন করে। কিছু রিপোর্টার তাঁকে গিয়েও ধরে। ‘আপনার বাড়ি কোনটা?’

‘এই তো এইটা।’

‘ও বাবা, তার মানে তো আপনাদের বাড়ির সামনেই ঘটনাটা ঘটেছে। আপনারা কিছু শুনতে পাননি?

‘না। আমরা ঘুমোচ্ছিলাম।’

‘রুনু চিৎকার করেননি?’

‘আমরা তো শুনতে পাইনি।’

শিবালয়। বারোর এ, সাপুইপাড়া, কালিকাপুর। দোতলা বাড়িটা থেকে কয়েক পা হেঁটে এলেই গলিটা রাস্তায় পড়ছে। গলি আর রাস্তার মোহনাতেই মহিলার লাশটা পড়ে। গলায় ছুরি, এলোচুল, পরনে হলদের ওপর লালচে ছিটে প্রিন্টের ম্যাক্সি। ডান পা’টা ভাঁজ করে পড়ে আছে। মহিলাটির বাঁ হাতে ক্ষত। ধারালো কিছু দিয়ে কাটা হয়েছে। ডান হাতে পলাটা ভেঙে হাত কেটেছে। গলিতেই পলার ভাঙা টুকরো পাওয়া গেছে। গভীর রাতেও লোকে লোকারণ্য। কোথা থেকে মিডিয়া খবর পেয়ে চলে এসেছে। এক এক করে আরও আসছে। স্বয়ম্ভু এখানেও সেই মেয়েটিকে দেখতে পেল। আঁখি। কিন্তু তেমন একটা পাত্তা না দিয়ে তুহিনশুভ্রর কথায় মন দিল।

‘খুনির সঙ্গে হাতাহাতি হয়েছে তো মাস্ট।’

স্বয়ম্ভূ বলল। উত্তর দিল তুহিন, ‘সে আর বলতে। এই দ্যাখো।’ প্যাকেটের মধ্যে কালো রঙের ওপর নেইল আর্ট করা মেয়েদের বড়ো নখ। তুহিন জানাল, এটি ভিক্টিমের হাতে পাওয়া গেছে।

‘কোনও স্মেল?’

‘মূলত কেমিক্যাল সলভেন্টের স্মেল। এই নেইল পলিশে ইথাইল অ্যাসিটেট, বিউটাইল অ্যাসিটেট এই ধরনের কেমিক্যাল থাকে। তার গন্ধই আমরা পাই।’

‘অর্থাৎ, আসার আগে খুনি রূপচর্চা করে আসে!’

স্বয়ম্ভুর কথাকে ধরেই শিবাঙ্গীর মন্তব্য, ‘মিনতি গুহর মার্ডারের রাতে একজন

মহিলাকেই দেখা গেছে।

‘বীণা সাহার ফরেন্সিকেও কসমেটিক প্রিজার্ভেটিভ।’

স্বয়ম্ভু বলল।

‘সুমিতা ধর মেকআপ শিখতে যেত।’ এবার রাজারাম।

‘কিন্তু সে সম্ভবত পুরুষ মানুষ। কারণ সুমিতা ‘ও’ বলে সম্বোধন করায় খেপে গিয়েছিল। ট্যাক্সির ড্রাইভারটাও পাঞ্জাবি ছেলে।’

তিনজনেই যেন মনে মনে একটা সুতো দিয়ে মালা গাঁথতে চেষ্টা করছে। কিন্তু শেষে এসে সবকিছু আলগা হয়ে যাচ্ছে।। তুহিন শেষে বলল, ‘তাহলে কি মঞ্জুকে আলাদা কেউ মেরেছে?’

‘দলে একজন নেই তুহিনদা। বেশ কিছু লোক আছে। এদিকে খুনের প্যাটার্ন একই। তার মানে কি একজনই করছে? যদি তাই হয় তাহলে সে পুরুষ না নারী? মঞ্জুকে পুরুষ মেরেছে। এখানে আবার নেইল আর্ট করা নখ। সেক্ষেত্রে মহিলা ধরে নেওয়াই যায়।’

‘যদি একজনই হয়?’

শিবাঙ্গী জানতে চাইল। উত্তরটা এল রাজারামের কাছ থেকে, ‘তাহলে নানা ভেক ধরে খুন করা শুধুই আমাদের আমাদের ঘেঁটে দেওয়ার জন্য? এত সময় নষ্ট করবে খুনি?’

‘যে কোনও ফর্ম ফিলাপে এখন মেল আর ফিমেল ছাড়াও আদার বলে একটা অপশন থাকে।’ স্বয়ম্ভু বলল।

তুহিন চোখ কপালে তুলে বলল, ‘খেয়েছে!’

‘হুম। কাটলেট। খেয়েছে?’

দুম করে পালটা প্রশ্নটা ধরতে বেগ পেতে হল তুহিনের। কয়েক সেকেন্ড পরে উত্তর এল, ‘জানি না। এখন তো কিছু বুঝছি না।’

‘তুহিনদা, একটা মালা গেঁথেও গাঁথতে পারছি না। বারবার খুলে যাচ্ছে। আচ্ছা, এখানে তো মহিলার হাতেও উন্ড আছে। ছুরি চালিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।’

‘খুনির প্রথমবারের হিটটা মিস হয়ে মহিলাটির হাতে লেগেছে। তারপরের বার গলায়। যেহেতু আনতাবড়ি ছুরি চালিয়েছে তাই এক্কেবারে গলার মাঝখান থেকে কেটেছে।’

‘তার মানে রক্ত অনেক দূর পর্যন্ত ছিটকেছে। খুনির হাত ভিজবেই। সেই রক্তভেজা হাত কোথায় মুছল? কীভাবে আড়াল করে পালাল মহিলাটি? তিমিরবাবু… ‘

হাঁক দিল স্বয়ম্ভু। বছর বেয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ হবে। স্বয়ম্ভুর থেকে দু-তিন আঙুল লম্বা। সরু চেহারা। ঈশ্বর যেন তাঁকে গড়তে গড়তে থামাতে ভুলে গিয়েছিল। মুখের মধ্যে চোয়াল দুটো বেশ প্রকট। লোকাল পি এসের ডিউটি অফিসার তিমির রুদ্র দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন, ‘বলুন।’ গলাটা বেশ গুরুগম্ভীর। চেহারার সঙ্গে এক্কেবারে বেমানান। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, ‘এখানে কোথায় কোথায় সিসিটিভি আছে?’

‘কলকাতার কটা গলিতে ক্যামেরা আছে বলুন তো?’

‘বুঝলাম। একটাও নেই।’

‘আছে। রাস্তার ওই দিকটায়।’

‘দেখব। এখুনি। ব্যবস্থা করুন।’

অনেকক্ষণ ধরেই একটি মেয়ে গুনগুন করে কেঁদে যাচ্ছিল। তাঁকে দেখিয়ে স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, ‘ওই মহিলা ভিক্টিমের কে হন?’

‘বোন। নিজের।’

‘এখানেই থাকেন?’

‘ওকে নিয়েই তো যত ক্যাচাল। জামাইবাবুর সঙ্গে ইন্টুমিন্টু। রোজ নাকি সে নিয়ে অশান্তি। পাড়ার লোককে জিজ্ঞেস করুন না। হাজব্যান্ড নাকি বলেছিল ডিভোর্সের জন্য। বউ বলেছিল, দেব না। আরও মারধোর বেড়ে গিয়েছিল। এখন দেখুন কেমন মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে নাটক করছে।’

স্বয়ম্ভু ভালো করে দেখল লোকটার দিকে। বয়স পঁয়তাল্লিশের মধ্যেই। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথার চুলও পাতলা হয়ে এসেছে। দেখতে দেখতেই তিমিরকে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু, ‘এই যে মহিলাটা টর্চার্ড হচ্ছে দিনের পর দিন আপনারা কোনও স্টেপ নেননি?’

‘কমপ্লেন না করলে কে যেচে ফ্যামিলির ক্যাচালে ঢোকে বলুন তো?’

‘বুঝেছি। মহিলা কি ফোন নিয়ে বেরিয়েছিলেন?’

‘সম্ভবত। বাড়ি সার্চ করে তো পাওয়া যায়নি। এদিকে মহিলার কাছেও নেই।’

‘নম্বরটা শেয়ার করুন।’

‘এখুনি করছি স্যার।’

ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে স্বয়ম্ভু বলল, ‘শিবাঙ্গী, নম্বরটা ইমিডিয়েট আমাদের অপারেটরকে দাও। পারমিশনের ব্যাপারে আমি দেখে নেব।’

তিমির রুদ্র শিবাঙ্গীর সঙ্গে রুনুর ফোন নম্বর শেয়ার করার সঙ্গে সঙ্গেই একটু তফাতে সরে যায় শিবাঙ্গী।

‘এখানেও খুনিকে ভিক্টিম চিনত। নিশ্চয়ই খুনের আগে খুনি নিজে ফোন করে মহিলাকে বাইরে ডেকেছে। চেনা গলা শুনে বাইরে এসেছে আর অমনি… যাই হোক, আমি একবার হাজব্যান্ডের সঙ্গে কথা বলব।’

তিমির ঘাড় নেড়ে হাজব্যান্ডটিকে দেখিয়ে দেয়।

‘আপনি হাজব্যান্ড তো?’

মাথা থেকে হাত সরিয়ে ওপরে তাকায় লোকটা। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, ‘কী নাম আপনার?’ লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ধনঞ্জয় লাহা!’ পুলিশ দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রন্দনরত শ্যালিকাটি একটু যেন তটস্থ হয়ে যায়। শিবাঙ্গী তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। স্বয়ম্ভু ধনঞ্জয়কে প্রশ্ন করে, ‘বউকে মারধোর করতেন?’ ধনঞ্জয় মুখ নীচু করে। ‘মুখ নীচু করবেন না। উত্তর দিন। কিছু লুকোলে আপনাদেরই বিপদ। প্রতিদিন মারতেন বউকে?

‘প্রতিদিন নয়।’

‘অ।’

স্বয়ম্ভু রাজারামের দিকে তাকিয়ে ভালোমানুষির ভান করে বলল, ‘প্রতিদিন মারত না। মাঝে মাঝে তাই না ধনঞ্জয়বাবু?’ আবারও মুখ নীচু।

‘মারতেন কেন?… চুপ করে থাকবেন না। মারতেন কেন?’

সুরটা ধমকের দিকে টার্ন নিয়েছে স্বয়ম্ভুর।

‘রুনুই ঝগড়া করত। কথা বললে শুনত না।’

‘আচ্ছা! কী কথা বলতেন? ডিভোর্স দিতে?’

পাশের মহিলাটি বেশ ভালোই বুঝতে পারে এবার তার প্রসঙ্গ উঠবে তাই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে সরে যাবার তাল করছিল। ফোনটা সেরে চট করে পথ আটকে দাঁড়ায় শিবাঙ্গী, ‘এখানে দাঁড়ান।’

‘একটু দিদির কাছে…

‘বড্ড ভালোবাসতেন দিদিকে তাই না? ওই জন্যে উঠে পড়ে লেগেছিলেন দিদির সংসার ভাঙার জন্য।’

‘মিথ্যে কথা। ওসব দিদির সন্দেহ।’

ছাড়ল না শিবাঙ্গী। পালটা প্রশ্ন করল, ‘তাই নাকি? তাহলে ধনঞ্জয়বাবু রুনু ম্যাডামকে ডিভোর্সের জন্য চাপ দিতেন কেন? শুনুন, মিথ্যে কথা বলে আমাদের সময় নষ্ট করবেন না। সারা পাড়ার লোক কিন্তু সাক্ষী। লোকাল থানাও জানে।

‘সর্বক্ষণ কোনও মেয়ে যদি তার স্বামীকে সন্দেহ করে তাহলে ডিভোর্স দেবে না তো কী দেবে?’

জামাইবাবুর ধামা ধরল শ্যালিকা।

‘ঠিক কথা। তা আপনি দিদির শ্বশুরবাড়িতে থাকেন কেন? আপনার বাড়ি নেই?’

‘এখান থেকে অফিস কাছে তাই।’

‘কোথায় অফিস?’

‘কসবা।’

‘আর বাড়ি কোথায়?’

একের পর এক প্রশ্ন শিবাঙ্গীই করে চলেছে।

‘শ্যামবাজার।’

‘শ্যামবাজার থেকে মেট্রো ধরলে কালীঘাট, সেখান থেকে একটা অটো। কী এমন দূরের রাস্তা যে দিদির বাড়িতে পড়ে থাকতে হয় আপনাকে? যাই হোক, আপনার নামটাই তো জানা হয়নি।

‘মিনু।’

‘সে তো ডাকনাম। ভালো নাম কী?’

‘সর্বাণী বসু।’

‘দিদি এত রাতে বেরিয়েছিল কেন?’

এবার রাজারামের প্রশ্ন।

‘বলতে পারব না।’

‘ধনঞ্জয়বাবু?’

‘জানি না।’

‘আপনার পাশ থেকে আপনার স্ত্রী উঠে গেল আর আপনি টের পেলেন না?’

‘কী যে বলো রাজারাম। ওনার স্ত্রী ওনার সঙ্গে শু’লে তবে না টের পাবেন। তাই না ধনঞ্জয়বাবু?’

মোচড় দিল স্বয়ম্ভু।

‘আমরা ওপরে শুই। রুনু নীচে শুত।’

‘আমরা!’

বলেই ধনঞ্জয় আর মিনুকে এক ঝলক মেপে নিল স্বয়ম্ভূ। ধনঞ্জয় আমতা-আমতা করে বলল, ‘না মানে, ওপরে দুটো ঘরের একটা ঘরে আমি আর পাশের ঘরে মিনু।’

‘দরকার ছিল না। বেকার দুটো ঘরে ফ্যান চালিয়ে কেন বিল বাড়ান? যাই হোক, মিনু-ধনা মিলে গেল আর রুনু নীচে খুন হল। উনি কি রাতবিরেতে এরকম বাইরে বেরিয়ে যেতেন?’

‘কোনওদিন দেখিনি।’

‘সন্ধেবেলা কী নিয়ে অশান্তি হয়েছিল?’

মিনু-ধনা দুজনেই চুপ।

‘আবার চুপ। এই আপনারা থানায় চলুন তো। ওষুধ না পড়লে কাজ হবে না দেখছি।’

‘না না স্যার, বিশ্বাস করুন রুনুর এমন কী করে হল আমরা সত্যিই কিচ্ছু জানি না’

‘জানেন তো বটেই। বউ ডিভোর্স না দিলে মিনু-ধনা মিলবে কেমন করে? তাই লোক ডেকে সরিয়ে দিলেন।’

‘ছি ছি। এ সব বলবেন না স্যার। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে অশান্তি হত। আমি মারধোর করেছি। অস্বীকার তো করছি না। কিন্তু তাই বলে খুন! এ…এ আমাদের পক্ষে অসম্ভব।’

রাজারাম প্রশ্ন করে, ‘কাউকে সন্দেহ করেন?’ ধনঞ্জয় একবার মিনুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাকে আর সন্দেহ করব স্যার? আমরা কিছুই জানি না?’ শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘রুনু ম্যাডাম কি সাজগোজ করতে খুব ভালোবাসতেন?’

‘হ্যাঁ, দিদি পার্লারে যেত। নিয়ম করে। সংসারে যাই হয়ে যাক। নিজেকে টিপটপ রাখত।’

‘স্বভাবটা কি বরাবরের?’

‘না। এই লাস্ট চার-পাঁচ মাস।’

‘কোন পার্লারে যেত?’

‘বলতে পারব না।’

‘কোনও মহিলা বন্ধু কি বাড়িতে আসত? যে নিজেও বেশ সাজগোজ করে থাকত, এরকম কেউ?’

‘আমরা বাড়ি থাকাকালীন এমন কেউ আসেনি। তবে যখন থাকতাম না তখন বলতে পারব না।’

প্রশ্নগুলো করে শিবাঙ্গী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘ইন্টারোগেশনে ডাকা হলে চলে আসবেন।

কথাটা শুনেই ধনঞ্জয় আর মিনুর মুখটা ছোটো হয়ে গেল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘রাজারাম তুমি বাড়িটা সার্চ করে দেখো। সঙ্গে সাত্যকিকে নিয়ে নাও। তুহিনদা…!’ উত্তর এল, ‘বলো।’

‘সাত্যকিকে একটু লাগবে। রাজারামের সঙ্গে বাড়িটা সার্চ করবে।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। এখানে কিছু নেই আর।’

স্বয়ম্ভুর হঠাৎ কী মনে হওয়াতে ধনঞ্জয়কে বলল, ‘আপনার স্ত্রীর ফোন পাওয়া যাচ্ছে না। তা ফোনের বক্সটা কি পাওয়া যাবে?’

‘সে এখন কোথায় রেখেছে তো জানি না।

‘আছে। দিদির ক্যাবনেটেই আছে।’

মিনু বলে উঠল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘রাজারাম, সবার আগে ফোনের বক্স থেকে আই এম ই আই নম্বরটা আমায় ছবি তুলে পাঠাও।’

‘কী হবে স্যার?’

‘খুনি ফোন চুরি করে তো আর নিজের কাছে রেখে দেবে না। সুইচড অফ করে কোথাও ডাম্প করবে। সেক্ষেত্রে ট্রেস করা যাবে না। হেল্প করবে আই এম ই আই। অ্যাটলিস্ট সেটটাও যদি খুঁজে পাওয়া যায়…’

‘ওকে স্যার।’

সাত্যকিকে সঙ্গে নিয়ে রাজারাম শিবালয়ের দিকে এগিয়ে গেল। সঙ্গে এগোল ধনঞ্জয় ও মিনু। শিবাঙ্গী দুজন কনস্টেবলকে রাজারামের সঙ্গে যেতে বলল।

গলা তোলে স্বয়ম্ভূ, ‘তুহিনদা, আমি একটু থানায় যাচ্ছি। আপনার কাজ হলে বডি ইমিডিয়েটলি শিফট করাবেন।’ সুযোগ পেয়ে তিমিরও চিৎকার করে উঠল, ‘এই ভিড় খালি করো। সরে যান সরে যান।’ স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীকে বলে, ‘তুমি এখানে পাড়ার লোকেদের ইন্টারোগেট করে দেখো কিছু জানতে পারো কিনা। অনেকেই ঢুকে গেছে বাড়িতে। আপাতত যে কজনকে পাও। কেউ কিছু দেখেনি বা শোনেনি হতে পারে না। আশপাশটায় একটু ভালো করে নজর রাখো।’

‘ওকে স্যার।’

স্বয়ম্ভু চলে যায়।

সিসিটিভিতে স্পষ্ট একটি কালো সালোয়ার পরা মেয়ে গলির মধ্যে ঢোকে রাত বারোটা পঞ্চাশে। বারোটা বাহান্নতে একটি লোক একই গলির মধ্যে ঢোকে এবং সে বারোটা চুয়ান্নতে বেরিয়ে আসে। একটা বাজতে তিন মিনিট বাকি যখন, দেখা যায় রুনু রাস্তার মোড়ে এসে একবার এদিক-ওদিক তাকায়। তারপরেই সেই কালো সালোয়ার পরা মেয়েটি পিছনে এসে দাঁড়িয়ে রুনুকে ধরবার মুহূর্তে রুনু ঘুরে তাকায়। মেয়েটি রুনুর হাত ধরে টেনে গলির ভিতর ঢুকিয়ে নেয়। সিসিটিভির আওতার বাইরে। ওই কালো সালোয়ার পরা মেয়েটিই রুনুকে যে টেনেছে সেটা স্পষ্ট। স্বয়ম্ভু বলল, ‘মেয়েটি ভালো করেই জানে কোথায় কত দূর সিসিটিভি আছে।’ রাত একটা তিনের মধ্যে কাজ সেরে গলি থেকে বেরিয়ে সিসিটিভির উলটোপথে হাঁটা শুরু করে খুনি। সিসিটিভিতে দূর পর্যন্ত ধরা পড়লেও মুখ দেখার সম্ভাবনা নেই। ‘যেদিকে পালাল সেদিকে দেখেছেন তিমিরবাবু?’

‘পাঠিয়েছি। কিন্তু কাউকেই দেখেনি। আসলে আমাদের কাছে খবর আসে রাত দেড়টার পর।’

পাশ থেকে আরেক ইনস্পেক্টর বলে ওঠেন, ‘প্রায় পৌনে দুটো।’ তিমির হেঁড়ে গলায় আলতো হাসেন, ‘ততক্ষণে সাধারণ মানুষও ভেগে যাবে।’

‘যে ছেলেটি রুনুর লাশ প্রথম দেখেছে তাকে সিসিটিভিতে দেখতে চাই। সে কখন এসেছে?’

রাত একটা ছাব্বিশ। ছেলেটি গলিতে ঢোকে। তারপর থেকেই লোকজনের আনাগোনা। মধ্যরাতের শূন্য গলি-রাস্তা ভরে উঠছে ধীরে ধীরে। এক সময় পুলিশের গাড়ি এল। তখনই স্বয়ম্ভুর চোখের কোণে কিছু একটা নড়ে উঠল। এমন কিছু যেটা এতক্ষণ ধরে ফুটেজটাতে স্থির ছিল। এত মানুষ ভিড় করেছে, কিন্তু ফুটেজের ডানদিকের ফ্রেমে অর্থাৎ রাস্তার অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা এক চুলও নড়েনি। পুলিশের গাড়ি আসতেই সে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল। স্বয়ম্ভুর নির্দেশে ফুটেজ পিছিয়ে গেল। জুম হল। আরও জুম।

‘স্ট্রেইঞ্জ! এই লোকটাই ওই মহিলাটা গলিতে ঢোকার পর গলিতে ঢুকল আবার বেরিয়েও এল। এসে উলটো ফুটে দাঁড়িয়ে রইল! এর একটা ছবি বের করে এখুনি আমার মোবাইলে দিন তো।’

‘ওকে স্যার।’

ফুটেজ অপারেটর বললেন।

‘চেনা কেউ?’

তিমির রুদ্র জিজ্ঞেস করলেন।

‘চেনা কিনা বুঝতে পারছি না। তবে ঘোরতর সন্দেহজনক।’

এত রাতেও স্বয়ম্ভুর ফোন কেঁপে উঠল। রতন।

‘বলো রতন।’

‘স্যার, অরণ্য তপাদার ধরা পড়েছে।’

‘কোথায়?’

‘মালটা হাঁটতে হাঁটতে সেই গলফগ্রিনের দিকে চলে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়। একটা ফ্ল্যাটে গিয়ে বাওয়াল করেছে।’

‘হাতে ছুরি ছিল?’

‘পকেট থেকে পেয়েছি।’

‘হাতে রক্ত?’

‘না তো স্যার। মালটা তো পাগল।’

‘কেন?’

‘মোনালিসা বলে নাকি কোন মেয়ে ওকে ঠকিয়েছে। সে নাকি ওই ফ্ল্যাটে থাকে। তাই মাঝরাতে বেল দিয়ে কৈফিয়ত আদায় করতে গিয়েছিল। কেন সে এরকম করল।’

‘অদ্ভুত! সিকিওরিটি নেই?’

‘স্ট্যান্ড অ্যালোন। সিকিওরিটি ঘুমোচ্ছিল। ব্যাটা গেট টপকে ঢুকেছে। ফ্ল্যাটের লোক হইচই করাতে সিকিওরিটির ঘুম ভাঙে। ঘা কতক লোকটাকে দিয়েওছে।

‘কে মোনালিসা?’

‘না না স্যার। ওই নামে কেউ থাকেই না। সেই মোনালিসা নাকি ওর পেছনে লোক ফিট করেছে। সবসময় ওকে ফলো করে। আমরা তুলে এনেছি থানায়। একটু ফার্স্ট এড করা হচ্ছে।’

‘এত কেলিয়েছে?’

‘ওই মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিল বলে নাকে-টাকে লেগেছে। কপালটা ছড়েছে। বাড়ির কারও ফোন নম্বর পাওয়া যায় কিনা দেখছি।’

‘মুনশি কী কয়?’

‘স্যারের মাইগ্রেন বেড়েছে। আপডেট দিতে বললেন। কাল সকালে আসবেন।’

‘বুঝলাম। ফোন চেক করে দেখো স্বপ্না ক’বার ওকে কল করেছে।’

‘চেষ্টা করেছি। এখন কেমন থুম মেরে বসে আছে। একটাও কথা বলছে না। দেখছি।’

‘ঠিক আছে।’

ফোনটা রেখে স্বয়ম্ভূ বেশ হতাশই হল। অরণ্য নয়। তাহলে কে? একা তো কিছুতেই নয়। সঙ্গে কতজন আছে? নানান প্রশ্নের ভিড়ের মধ্যেই একটা কথা ঢুকে পড়ল, ‘স্যার, ছবিটা পাঠিয়েছি।’

‘হ্যাঁ। মারধোর করত শুনেছি। চোখে দেখিনি। তবে ঝগড়াঝাঁটির শব্দ প্রায়ই পেতাম।’

কাশলেন লোকটা। ষাটের ওপর বয়স। শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে, ‘মহিলা কেমন ছিলেন?’

‘নরমাল। মানে ভালোই। পাড়ার সকলের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার। ইদানীং সাজগোজটা খুব বেড়ে গিয়েছিল। সাজতে ভালোবাসতেন। বিয়েটিয়ে বাড়িতে বেশ সুন্দর করে সাজতেন। কিন্তু আজকাল এমনি বাজারে গেলেও মনে হত মেকআপ করে গেছেন।

‘উনিই বাজার করতেন?

‘বেশিরভাগ সময়েই। ছুটির দিনে ধনঞ্জয়বাবু যেতেন।

‘একে এত রাত। নির্জন চারপাশ। কোনও শব্দ পাননি?’

‘না। আমি তো ঘুমের ওষুধ খাই। শোভন এসে আমায় না ডাকলে জানতেই পারতুম না।’

‘শোভন কে?’

‘ওই যার বাড়ির সামনে লাশটা পড়ে। শোভনের তো ইনসমনিয়া। সারা রাত জেগেই থাকে। কিছু শুনলে ও শুনতে পারে।

‘আচ্ছা। ধন্যবাদ।’

শোভনবাবু ও তাঁর স্ত্রী সবেমাত্র বাড়িতে ঢুকছিলেন।

‘একটু দাঁড়ান শোভনবাবু।’

শিবাঙ্গীর ডাক শুনে ঘুরে তাকাল।

‘বলুন।’

শোভন কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘দেখুন রিপোর্টারদের যা যা বলার বলেছি। আর কিছু জানি না।’

‘পুলিশকে তো বলেননি। আমার ছোট্ট দুটো কথা ছিল।’

স্বামী-স্ত্রী একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বাধ্য হলেন দাঁড়াতে। শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘আপনার বাড়ির সামনেই পাড়ার একজন খুন হয়ে গেল আপনারা কিছু শোনেননি?’

‘না।’

শোভনের উত্তর।

‘রুনুদেবীর কোনও চিৎকারই আপনাদের কানে যায়নি?’

‘মাঝরাত। অঘোরে ঘুমোচ্ছিলাম।’

বেশ জোরের সঙ্গে উত্তর দিলেন শোভন।

‘ও। কোন ডাক্তারকে দেখান?’

‘মানে?’

‘না মানে, অ্যাকিউট ইনসমনিয়ার রোগী হয়েও অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন তাই বলছি, কোন ডাক্তারকে দেখান? ওষুধ খান?’

‘এ সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।’

শোভনের স্ত্রী বললেন, ‘চলো তুমি ভেতরে চলো।’

‘দেখুন ম্যাডাম, আপনারা যথেষ্ট বয়স্ক। আমি একেবারেই চাই না আইনের দোহাই দিয়ে আপনাদের থানায় নিয়ে গিয়ে জেরা করে হ্যারাস করতে। তাই বলছিলাম, প্লিজ একটু কোঅপারেট করুন। ঠিক কী শুনেছিলেন? কখন শুনেছিলেন? জানলা বা দরজা অল্প ফাঁক করে যা যা দেখেছিলেন সব বলুন।’

‘আ… আমরা কিছু দেখিনি। বিশ্বাস করুন।’

‘শুনেছেন তো শিওর। প্লিজ আমাদের হাতে সময় নেই। বলুন। কে বলতে পারে, কাল আপনাদের কোনও বিপদ আসবে না? খুলে বলুন।’

বেশ কয়েকবার ঢোক গিলে শোভনবাবু বললেন, ‘বাথরুমে উঠেছিলাম।’

‘ক’টার সময়?’

‘প্রায় একটা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে আসতেই বাইরে থেকে একটা চিৎকার শুনি।’

‘কী বলেছিল?’

‘প্রথমটা বোধহয় বাঁচাও বা ওইরকমই একটা। বেলারও ঘুম ভেঙে যায়। আবার একটা আর্তনাদ। তখন ভয়ে ভয়ে ঘরের দরজাটা খুলতে যাই। ও আমায় বারণ করে। তাও খুলি অল্প করে। সামনে পাঁচিল থাকায় ভালো করে দেখতে পাই না। তবে বুঝতে পারি রাস্তায় কিছু একটা অঘটন ঘটেছে। সবে ভাবছি বেরোব, সঙ্গে সঙ্গে একটা লোক…’

‘লোক?’

‘না না, একটা মেয়ে। কালো জামা পরা।’

‘জামা মানে? শার্ট?’

‘না। ওই সালোয়ার।’

‘মুখটা দেখেছেন?’

‘দেখেছি। তবে এক ঝলক। খুনটা করার পর এপাশ ওপাশ তাকাচ্ছিল। কেউ দেখেছে কিনা বোধহয় চেক করছিল। যেই তাকিয়েছে অমনি আমি আস্তে করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছি।’

‘আপনাকে দেখতে পায়নি?’

‘না দেখার চান্সই বেশি। আমার ঘর, বারান্দা সবই তো অন্ধকার। তার ওপর পর্দা ছিল।’

‘কীরকম দেখতে বলতে পারবেন?’

‘পারব না কেন? ওই মুখটা আমাদের চেনা। মেয়েটি সিরিয়ালে অ্যাক্টিং করে। শিবাঙ্গীর মুখের ভাবটা ভেঙেচুরে যায়। ‘সিরিয়াল অ্যাক্টর? কে? কী নাম?’

‘গঙ্গাজলের সই। ওই জি বাংলায় হয়। ওখানেই করে। ক্যারেক্টারটার নাম অ্যারিনা।’

‘মেয়েটার নাম কী?’

‘সেটা ঠিক জানি না।’

‘কমলিনী।’

শোভনের স্ত্রী বলে উঠলেন। ‘মিত্র বা দত্ত কিছু একটা।’

শিবাঙ্গী সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে সার্চ করে একটা ছবি বের করে শোভনদের দেখায়, ‘এই মেয়েটা?’ রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বলে ওঠে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ এই।’ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে শিবাঙ্গীর। এ কোন দিকে মোড় নিয়ে চলেছে এই কেস? একজন অভিনেত্রী সিরিয়াল কিলার?

‘আপনারা ঠিক দেখেছেন তো?’

‘এ মুখ কি ভোলার। আজ সন্ধেবেলাতেও তো দেখলাম। বিশ্বাসই করতে পারছি না, ওই মেয়েটা খুন করছে!’

মোবাইলটা পকেটে ঢোকাতে না ঢোকাতেই আবার টুং করে বেজে উঠল। শিবাঙ্গী দেখল স্বয়ম্ভু হোয়াটসঅ্যাপ করেছে। একটা ছবি। ভালো করে দেখতেই চমকে ওঠে শিবাঙ্গী। সরাসরি ফোন করে স্বয়ম্ভূকে।

‘স্যার, এটা তো বিট্টু।’

‘তুমি শিওর?’

‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট। ছবিতে যেটুকু দেখছি তাতে অবশ্যই বিট্টু। এটা কোথাকার?’

‘এলাকাতেই আছে। ফোর্স পাঠাচ্ছি। তুমি এই অপারেশনে যাবে। একা। তোমার সোর্স কাজে লাগাও এক্ষুনি। আমিও দেখছি।’

‘ওকে স্যার। আপনি ফোর্স পাঠান। আমি রেডি। কিন্তু বিট্টু গেছে কোনদিকে?’

‘সিসিটিভি ফুটেজ পাঠাচ্ছি।’

‘ওকে স্যার। আরেকটা কথা স্যার, রুনুদেবী যে বাড়ির সামনে খুন হয়েছেন সেই বাড়ির লোক খুনিকে দেখেছে। সিরিয়াল অ্যাক্টর কমলিনী মিত্র। গঙ্গাজলের সই বলে একটি সিরিয়ালে অ্যাক্টিং করে।

‘আমার মনে হচ্ছে নাগলোক থেকে অজস্র সাপ বেরিয়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরছে। কাল সকালে দেখব। আগে কান টানার ব্যবস্থা করো। তারপর মাথা।

স্বয়ম্ভু তড়িঘড়ি আশপাশে যে কটা থানা আছে প্রত্যেকটা থানাতে ছবি পাঠিয়ে রাস্তায় নাকাবন্দি করার ব্যবস্থা করে। তিমির রুদ্র এই ব্যাপারে বেশ তৎপর হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে শিবাঙ্গী লালবাজার থেকে খবর পায় যে বিট্টুর মোবাইল নম্বরের কোনও ট্রেসই পাওয়া যাচ্ছে না। রুনুর বড়ি চলে গেছে লাশঘরে। রাজারাম ফিরে এসেছে রুনুর বাড়ি চেক করে। সঙ্গে সাত্যকিও।

‘কিছু পাওয়া গেল?’

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল। সাত্যকি একটি কসমেটিকের কৌটো তুলে দেখায়। শিবাঙ্গী বলে, ‘সিলড! মানে রিসেন্টলি কিনেছেন।’

‘ডেলিভারি করেছে কেউ। এই যে তার বিল। উইথআউট এনি ডেট।’

‘বিটু।’

শিবাঙ্গীর মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়েই এল।

‘হোয়াট?’

বিস্ময় প্রকাশ করল রাজারাম। সঙ্গে সঙ্গে শিবাঙ্গীর মোবাইলে নোটিফিকেশনের শব্দ। সিসিটিভি ফুটেজ। শিবাঙ্গী দেখাল, ‘এই দ্যাখ। বিট্টু এখানে এসেছিল। এই এলাকাতেই আছে।’

‘দেখি একবার।’

ভিডিওটা দেখল রাজারাম। ‘ওয়েট শিবাঙ্গী, রুনু ম্যাডামের হাজব্যান্ড বলছিল একটি ছেলে লাস্ট পনেরো-কুড়িদিন ধরে রুনুকে বাজার দোকান করে দিত। মাঝে মাঝে রুনুও নাকি ওর সঙ্গে বাজারে যেত। মাল-টাল বয়ে দিত। বিটুই কি সে?’

‘লাস্ট কবে দেখেছে বাজার করে দিতে?’

‘গত পরশু। এটা আগে কনফার্ম করি।’

আবারও রুনুর বাড়ির দরজায় ধাক্কা। ধনঞ্জয় দরজা খুললেন। তাকে বিট্টুর ছবি দেখাতেই বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই তো সেই ছেলেটা। বিকাশ না বিলাস কী যেন নাম!’

‘কোথায় থাকে জানেন?’

‘না। তবে এই রাস্তায় উঠে মিনিট পাঁচেক মতো হাঁটলেই ডানদিকে একটা গলি পড়বে। সেখানে কোথাও একটা থাকে।’

‘ওকে।’

রাজারাম আর শিবাঙ্গী চলে যাচ্ছিল। ধনঞ্জয়বাবু ডাকলেন, ‘শুনুন, রুনুর বডিটা আমরা পাব না?’

‘পাবেন। থানা থেকে খবর দেওয়া হবে।’

বাড়িটা থেকে বেশ কিছুটা দূরত্বে এসে শিবাঙ্গী স্বয়ম্ভুকে ফোন করে সবটা জানায়। ‘স্যার পরশুর সিসিটিভি ফুটেজটা একটু চেক করবেন প্লিজ।’ পাশ থেকে রাজারাম বলে, ‘সকাল আটটা থেকে ন’টার মধ্যে।’ শিবাঙ্গী কথাটা রিপিট করে।

‘পাশে কি রাজারাম?’

স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে।

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘ভালো। এক কাজ করো শিবাঙ্গী, আর দেরি কোরো না। তুমি আর রাজারাম এই অপারেশনটায় যাও। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে এখানে প্রাণের ঝুঁকি আছে।’

‘সে তো আমাদের সবসময়েই স্যার।’

‘শোনো, আমার তোমার ওপর পূর্ণ ভরসা আছে। কিন্তু পাশাপাশি তোমাদের সুরক্ষাটাও আমার দেখা কাজ। কেন জানি না মনে হচ্ছে আরেকটা খুন আজ রাতে হবে।’

‘কে?’

‘দেরি কোরো না। বেরিয়ে পড়ো। ফোর্স পৌঁছোয়নি এখনও?’

‘না স্যার। ফোর্সের জন্য ওয়েট করে লাভ নেই। আমি আর রাজারাম বেরিয়ে পড়ছি।’

‘ঠিক আছে। তিমিরবাবু নিজে গেছেন। তোমার নম্বর শেয়ার করে দিচ্ছি। ও আরেকটা কথা, থানায় একজনকে অপারেটরের নম্বর দিয়েছি। ও রুনুর নম্বর ট্রেসের ব্যাপারে কথা বলে নেবে। তুমি অপারেশনে কনসেনট্রেট করো।’

‘ওকে স্যার।’

স্বয়ম্ভূ ফোনটা রাখতেই পাশের ঘর থেকে ছুটে আসে এক কনস্টেবল, ‘স্যার অপারেটরের সঙ্গে কথা বললাম। ভিক্টিমের নম্বর ট্রেস করা যাচ্ছে না। একবার নট রিচেবল বলছে একবার সুইচড অফ বলছে। তবে আই এম ই আই দিয়ে ফোনসেট ট্রেস করা গেছে। ভিক্টিমের বাড়ি থেকে বেশি দূরে নেই।’ স্বয়ম্ভূ পলকের জন্য শ্বাসবন্ধ করে কিছু একটা ভাবে। ‘অ্যাড্রেসটা টেক্সট করুন।’ তৎক্ষণাৎ ফোন গেল প্রদ্যুতের কাছে। বেশ খানিকক্ষণ রিং হবার পর ঘুমজড়ানো গলায় ফোন ধরল প্রদ্যুৎ, ‘হ্যাঁ স্যার।’

‘ও হো, রাতে কি বিজয় আছে?’

‘না। ওর শরীরটা হঠাৎ খারাপ করে। সুকুমারদা আছেন।’

‘সুকুমারদা? তুমি নেই কেন?’

‘আমি বলেছিলাম। সুকুমারদাই জোর করল। আমি এখনও জোয়ান-টোয়ান বলে নাটক শুরু করল। কেন স্যার? কী হয়েছে বলুন না।’

‘একটা কল লিস্ট চাই। হেল্প করতে পারবে কেউ?’

‘উমমম! দাঁড়ান স্যার, আমি কল ব্যাক করছি। মে বি হয়ে যাবে।’

‘জলদি ভাই।’

দু-দিন পরেই পুজো। তাই মেন রোডে আলোর অভাব নেই। কিন্তু গলির ভেতর এখনও ল্যাম্পপোস্টই ভরসা। বিশেষ করে শিবাঙ্গী আর রাজারাম যে গলিতে ঢুকেছে

সেখানে রাতবাতিগুলোও বেশ খানিকটা অন্তর-অন্তর।

‘গলির মধ্যে এত বাড়ি। কীভাবে বুঝবি কোন বাড়িতে আছে?’

‘চোখ-কান খোলা রেখে ঢিল ছুড়তে হবে রাজারাম। কোনও বাড়ির সামনে রেন্ট, পেইং গেস্ট এ সব আছে কিনা দেখবি বা যদি কোনও বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে সেটাও খেয়াল রাখ।’

রাত ফুরোতে চলল। গলির মধ্যে কুকুরগুলো উদ্ভ্রান্তের মতো খুঁজে চলা দুটো মানুষকে দেখে ডেকে ওঠে। ‘শালা এই কুত্তাগুলোর জন্য সব বানচাল না হয়ে যায়!’

‘ফোকাসড রাজারাম ফোকাসড।’

রাজারাম একঝলক মেপে নেয় শিবাঙ্গীকে। মনে মনে আওড়ায়, ‘হুম লেডি শার্লক হোমস।’

‘মা’কে টোন কাটতে নেই সোনাই?’

রাজারাম বুঝতে পারেনি কখন তার মনের বিড়বিড়ানি মুখে চলে এসেছে। শিবাঙ্গী থমকে দাঁড়াল। কানে গোঁজা এয়ারড্রপে নোটিফিকেশন সাউন্ড।

‘কী হল?’

শিবাঙ্গী ফোন চেক করে বলল, ‘স্যার একটা অ্যাড্রেস পাঠিয়েছেন। এখানেই যেতে বলছেন।’

‘আমাকেও। এটা কি বিট…’

কথাটা বলতে গিয়ে সামনের আলো আঁধারি রাস্তায় চোখ আটকে গেল রাজারামের। ‘শিবাঙ্গী সামনে দ্যাখ।’ শিবাঙ্গী দেখল, ব্যাগ কাঁধে একটি ছেলে এগিয়ে আসছে। চেক শার্ট ও জিন্স। গালে চাপা দাড়ি। বাঁ গালে বেশ বড়ো একটা বাদামি রঙের আঁচিল। কাছে আসতে বুঝল কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। ছেলেটিও শিবাঙ্গী আর রাজারামকে দেখে একটু সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে। হাঁটার গতি শ্লথ হয়ে গেল। রাজারামই পথ আটকে দাঁড়াল। ছেলেটি থেমে গেল। ভুরুতে ভাঁজ। ‘কিছু বলবেন? ‘ ছেলেটির গলা দিয়ে প্রায় স্বর বেরোচ্ছে না। ভাঙা ফ্যাসফেঁসে গলা। রাজারাম বলে, ‘এখানেই থাকেন?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু কেন? আপনারা কারা?’

রাজারাম পকেট থেকে আই কার্ড বের করে দেখাতেই চমকে গেল ছেলেটি। ‘পুলিশ? কে…কেন? কী হয়েছে এখানে?’

‘কিছু হয়নি। কী নাম আপনার?’

‘সৌভাগ্য সিনহা।’

‘তা এত রাতে চলেছেন কোথায়?’

‘অফিস। মর্নিং শিফট।’

পটাং করে ঢিল ছোড়ার মতো প্রশ্ন করে শিবাঙ্গী, ‘কোন অফিস? নাম কী?’ কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে ছেলেটি বলে, ‘টেকনো কনসার্ন।’

‘আইটি?’

‘হ্যাঁ।’

‘আই কার্ড আছে?’

শিবাঙ্গীর প্রশ্ন। ছেলেটি একটু ইতস্তত করে প্রথমে জামার পকেটে হাত ঢোকায়। কিছু না পেয়ে প্যান্টের পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করে। ছেলেটি এক বর্ণও মিথ্যে বলেনি। রাজারাম জানতে চায়, ‘এত ভোরে ডিউটি, গাড়ি দেয়নি কোম্পানি?’ ছেলেটি অল্প হাসল যেন। বলল, ‘অত ওপরে উঠিনি। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন না, কিছু কি হয়েছে এখানে?’

‘নিশ্চিন্তে অফিস যান।

ছেলেটি ঘাড় নেড়ে চলে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় শিবাঙ্গী বলে উঠল, ‘দাঁড়ান।’ গোবেচারা ছেলেটির প্রাণপাখিটা বেশ ধড়ফড় করছে। আবার কেন ডাকল রে বাবা! অসহায় মুখে ছেলেটি ঘুরে তাকাল, ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ শিবাঙ্গী দু-পা এগিয়ে এল। ছেলেটির চোখে চোখ রেখে গড়গড় করে স্বয়ম্ভুর পাঠানো ঠিকানাটা বলে গেল। ‘এটা কোথায়? চেনেন?’

‘আমি আসলে এ পাড়ায় বেশিদিন আসিনি। মাস ছয়েক। তবে নম্বরটা শুনে মনে হচ্ছে, সামনে থেকে বাঁদিকের গলি ধরে গেলেই পাবেন। আমি আসি, হ্যাঁ?’

‘গলায় কী হয়েছে?’

‘সিজন চেঞ্জ তো। ভেঙে গেছে। ফ্যারেঞ্জাইটিস আছে।’

শিবাঙ্গী চোখের ইশারায় ছেলেটিকে যাওয়ার অনুমতি দিল। ছেলেটি উলটোমুখে হাঁটতে থাকল। শিবাঙ্গীরাও ঠিকানা চিনে এগোতে থাকল।

‘ঘাবড়ে গেছে বেচারা।’

‘চোখ দুটো ভীষণ চেনা লাগল।’

‘সুন্দর বা বিশ্রী কোনওটাই নয়। অত্যন্ত নরমাল দুটো চোখ।’

শিবাঙ্গী হঠাৎ আবার দাঁড়িয়ে পড়ে, ‘আচ্ছা, ছেলেটার হাঁটা দেখে তো একবারও মনে হল না যে খুব তাড়ায় আছে।’

‘হাতে সময় নিয়ে বেরিয়েছে।’

‘তাহলে শার্টের বোতামগুলো উলটোপালটা লাগানো কেন?

এই কথাটায় রাজারামও থমকাল। সঙ্গে সঙ্গে ফোন বেজে উঠল, ‘তিমিরবাবু বলুন…। …হ্যাঁ আমরা ওই রাস্তাতেই আছি। …আমাদের কাছাকাছি থাকবেন না। …কানেক্ট থাকুন …কিছু হলেই বলব।’

নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাত্রা শুরু করে শিবাঙ্গী-রাজারাম। ছেলেটা পাড়ায় নতুন হতে পারে। পথ নির্দেশ ভুল দেয়নি।

‘বাড়িটা খুঁজে পেয়েছি তিমিরবাবু।… মেন রোড থেকে ডানদিকের গলিতে ঢুকে প্রথম বাঁদিক। তারপর আবার ডানদিক। সোজা এসে বাঁ হাতে হলুদ রঙের বাড়ি। তার পাশ দিয়ে সোজা ঢুকে ডানদিকে আবার বেঁকেই বাঁ হাতে দোতলা বাড়ি।… বুঝতে পারছি না দেখছি।’

শিবাঙ্গী দরজাটা হালকা করে ঠেলতেই বুঝল যে সেটা খোলা। সঙ্গে সঙ্গে রাজারাম শিবাঙ্গীর হাত ধরে ফেলল। শিবাঙ্গীকে পিছনে দিয়ে সামনে দাঁড়াল রাজারাম। কেন? সে কি শিবাঙ্গী মেয়ে বলে? নাকি শিবাঙ্গীর গায়ে কোনও আঁচ লাগতে দেবে না এমন প্রতিজ্ঞা করেছে সে! দরজাটা খুলে গেল। ভিতরে অন্ধকার। ঘরের ভিতর পা রাখতেই বিশ্রী একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল। রাজারামের কাছে এটা নতুন। কিন্তু শিবাঙ্গীর কাছে নয়। ‘সেই মোজার গন্ধ। মঞ্জুর বাড়িতেও ছিল।’

‘গন্ধটা ভীষণ টাটকা।’

‘ঠিক বলেছিস। তিমিরবাবু… সিসিটিভিতে দেখেছেন নিশ্চয়ই যে খুন করেছে তাকে… ফোর্স ছড়িয়ে দিন… বেশিক্ষণ হয়নি এখান থেকে বেরিয়েছে।’

কথাগুলো ফিশফিশ করে বলল শিবাঙ্গী। রাজারাম ঘরের আলো জ্বালল। ফাঁকা। একটা ফ্রিজ, চেয়ার টেবিল, মদের বোতল। ছড়ানো চিপস। পাশের অন্ধকার ঘরে ঢুকে মোবাইলের আলোটা একটা জায়গায় আটকে গেল। মাটিতে বসে বিছানায় মাথা রেখেছে বিট্টু। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চাদর।

‘শিবাঙ্গী…।’

রাজারাম ডেকে ওঠে। ঘরে আলো জ্বলে ওঠে। বিট্টুর গলা সেই একইভাবে চিরে দেওয়া। বিট্টুর চোখ খোলা। মৃতদেহের পাশে কিছুটা দূরত্বে একটা মোবাইল পড়ে। বিট্টুর মুখে মদের গন্ধ। দুই গন্ধের মিশ্রণে মাথাটা ধরে গেল শিবাঙ্গীর। পকেট থেকে সাদা রুমাল বের করে শিবাঙ্গী মোবাইলটা তুলে নেয়। ব্যাটারি, সিম কিছুই নেই। ইথার তরঙ্গে ছুটে যায় খবর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *