১৫
অনুমতির অপেক্ষা না করেই স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী, দিব্যময় ঢুকে পড়ে বাড়ির মধ্যে। সোমনাথ থতোমতো খেয়ে যান। ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আপনারা বিমলকে কেন খুঁজছেন?
‘কোন ঘরে ঘুমোচ্ছে বিমল? চটপট বলুন।’
‘ওপরের ঘরে।’
এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে সদলবলে দোতলায় উঠে বন্ধ ঘরের দরজাটা ঠেলে খুলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী। হাতে রিভলভারের টার্গেট বিছানায় শুয়ে থাকা বিমলের দিকে। আচমকা শব্দে বিমল ঘুম থেকে উঠে বসে পড়েছে। অবাক চোখে স্বয়ম্ভুদের দিকে তাকিয়ে। ডক্টর দিব্যময় ঢুকে এলেন ঘরে।
‘স্যার, আপনারা!’
দিব্যময় নীরব। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে। স্বয়ম্ভু-শিবাঙ্গীর চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। সোমনাথও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ঘরে ঢুকে এলেন। সকলেরই প্রস্তরবৎ মূর্তি দেখে সোমনাথ বলে উঠলেন, ‘এ সব কী হচ্ছে? বিমলের শরীর খারাপ স্বয়ম্ভুবাবু।’
‘পেট খারাপ কিংবা গ্যাস্ট্রিক কিংবা অম্বল-চোঁয়া ঢেঁকুর, নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনও একটা?’
সোমনাথ বিস্মিত চোখে বললেন, ‘হ্যাঁ, গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা। কিন্তু আপনি কী করে জানলেন? আর এভাবে বন্দুকই বা তাক করে আছেন কেন?’
‘সোমনাথবাবু, আপনি যে এই ছেলেটিকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছিলেন, সেদিন সেকথা বলেননি কেন?
‘বিমল বড়ো হবার পর ওকে আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি চাইনি ও আমার পরিচয়ে পরিচিত হোক। এমনকি বালিয়াতে ও যে বাড়িতে থাকে সেটার ভাড়াও বিমল দেয়। ও নিজের চেষ্টায় দিব্যময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলাপ করেছে। নিজেই পার্লার করেছে। দিব্যময় ওকে অর্থ সাহায্য করে ইউনিকর্ন সেলুনটা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখানে আমার কোনও অবদানই নেই। তাই আমার কোনও কিছুর সঙ্গে বিমলের নাম জড়াতে চাইনি। একা একা নিজের পায়ে দাঁড়ালে ওর মেরুদণ্ডটা শক্ত হবে।’
‘ওইখানেই তো সমস্যা হয়েছে সোমনাথবাবু। ও শুধু নিজের মেরুদণ্ড নয়, সমাজের অনেক অত্যাচারিত মেয়েদের মেরুদণ্ড শক্ত করার ভার নিয়ে সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলেছে। কলকাতা শহরে যে সিরিয়াল কিলিং হচ্ছে তার মাস্টার মাইন্ড আপনার পালিত পুত্র বিমল চৌধুরি।’
‘আপনার সমস্যাটা কি স্বয়ম্ভুবাবু? কেন আমাদের পেছনে পড়েছেন? প্রথমে আমাকে লালবাজারে ডেকে জেরা করলেন। এবার বিমলকে? কী ভেবেছেন কী আপনারা? শরীরে আইনের উর্দি থাকলেই সব করে ফেলা যায়?’
উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন সোমনাথ। উত্তর দিলেন দিব্যময়, ‘স্বয়ম্ভুবাবু একদম ঠিক কথা বলছেন সোমনাথদা। বিমল আজ আমার বাবাকেও খুন করেছে। ও একটা খুনি।’
‘দিব্যময়!’
সোমনাথের গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। বিছানায় বসেই বিমল শক্ত গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?’ বিমল বিছানা থেকে পা দুটো মাটিতে নামাল।
‘যাক। ছেলের মুখ ফুটেছে এবার। একটা নয়, হাজারটা প্রমাণ।’
‘কী প্ৰমাণ?’
‘সব বলব। তবে এখানে নয়। লালবাজারে জামাই আদর করতে করতে একে একে জানাব। চল।’
‘অসম্ভব। কিছুতেই নয়। বিমলকে এভাবে কোন অধিকারে আপনারা গ্রেপ্তার করছেন? আগে প্রমাণ দেখান।’
স্বয়ম্ভূ মুনশিকে ডাকল। সুরঞ্জন মুনশি একটা ব্যাগ হাতে ঘরে ঢুকলেন। সেই ব্যাগ থেকেই বেরিয়ে এল সিলিকনের তৈরি ডক্টর দিব্যময়ের মুখোশ। সোমনাথ চমকে উঠলেন। বিমলের দিকে তাকালেন। বিমলের চোখ ভাষাহীন। চোখের তারায় খাঁ খাঁ করছে শূন্যতা।
‘বাড়ির তালা ভেঙে আরও জিনিস পেয়েছি। আরও তিনটে মেয়ের মুখোশ। রক্তমাখা কালো চুড়িদার। যেটা পরে আজ তন্দ্রা জানাকে খুন করেছিস। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। মুনশিবাবু, খোকাকে দেখান।
মুনশি যেন সান্তাক্লজের ঝোলা থেকে একের পর এক রোমাঞ্চকর জিনিস বের করেই চলেছেন। এবার বেরিয়ে এল প্যাকেটে মোড়া রক্তমাখা রাবারের গ্লাভস আর একটা মোবাইল। একটা ঘন নীল রঙের সালোয়ার যার বুকের কাছে বেশ কিছু সিলভার কালারের ঝুমঝুমির মতো ঝুলছে। মিনতি গুহর শরীর থেকে এই ঝুমঝুমিগুলোরই কয়েকটা পাওয়া গিয়েছিল। স্বয়ম্ভুর কথায় প্রমাণ মিলে যাওয়ায় বিমলের দুটো ভুরুর মাঝে একটা ছোট্ট ভাঁজ পড়ল।
স্বর্ণশিখর এস্টেট থেকে পুলিশের গাড়ি বেরিয়ে মেন রোডের দিকে ছুটছে।
‘স্টপ স্টপ স্টপ।’
স্বয়ম্ভূ উচ্চস্বরে গাড়ি থামাল। সবাই হকচকিয়ে গেছে।
‘কী হয়েছে স্যার?’
‘গাড়ি থেকে নামো শিবাঙ্গী। দাসবাবু আসুন।’
স্বয়ম্ভু নিজেও তড়াক করে নেমে যেদিকে এগিয়ে গেল, দেখা গেল একটা উন্মাদ প্রকৃতির লোক হাতে রক্তাক্ত গ্লাভস পড়ে মোবাইল হাতে নিয়ে হাসছে আর অঙ্গভঙ্গি করছে।
‘এ সব কী? কোত্থেকে পেলেন?’
স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল পাগলটাকে। দাস বললেন, ‘পাগলটা খুন করেছে নাকি?’
‘আমি নয় আমি নয়। একটা কালো মতো মেয়ে মানুষ মেরেছে।’
হোক পাগলের কথা। কিন্তু বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক। তাই চমকে উঠল সবাই।
‘কোন মেয়ে? চেনেন তাকে?’
পাগলটা মাথা নেড়ে, চুলকে বলল, ‘না তো। আমি কীভাবে চিনব? এই দ্যাখো না রক্ত। টাটকা কাঁচা রক্ত।’
‘এগুলো কোথা থেকে পেলেন আপনি?’
শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল। পাগলটা আর কথা বলল না। কেবল আঙুল দিয়ে একটা দিকে নির্দেশ করল। স্বয়ম্ভূ, শিবাঙ্গী আর দাসবাবু হাতে গ্লাভস পরে নিল। তারপর পাগলটার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে দেখল ব্যাটারি, সিম কিচ্ছু নেই। সঙ্গে কিছু কনস্টেবল ছিলই। স্বয়ম্ভুর আদেশে পাগলের অঙ্গুলিনির্দেশ করা জায়গাতে শুরু হল খোঁজাখুঁজি। ছোট্ট একটা পাঁচিল। সেটা টপকে সবুজ ঘাসের পাড়। সেখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আবর্জনা। বেশ খানিকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর সিম কার্ডটি পাওয়া গেলেও ব্যাটারি পাওয়া গেল না।
***
খাটে বসেই মাটির দিকে মাথাটা নীচু করে রেখেছে বিমল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘ভেবেছিলে পুলিশকে শুধু গোল গোল করে ঘুরিয়ে যাবে! আজও তাই হত। যদি না ডাক্তারবাবুর বাবার পোষা কথা বলা শালিক পাখিটা তোমার নাম বলত।’ বিমলের চোখ-মুখের পরিবর্তন নিমেষে প্রকট হয়ে উঠল।
‘পাখিটা বিমলের নাম না বললে আমরাও মন্দাকিনীর কাছ থেকে সবকিছু জানতে পারতাম না।’
বিমল নড়ে উঠল। স্বয়ম্ভুও আড়চোখে শিবাঙ্গীকে মেপে নিল।
‘মন্দাকিনী?
সন্দেহ ছুড়ে দিল বিমল।
‘হ্যাঁ। তোর প্রেমিকা। তোর কাটলেট খাওয়ার সঙ্গিনী। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে সবটুকু জানত। সুমিতা ধরকে খুন করার দিন বিকেলে মিত্র ক্যাফেতে দুজনে কাটলেট খেয়েছিলিস তো। ক্যাশে পেমেন্ট করেছিলিস। নিজের ফোনের সিমটা সৈকত দত্তের নামে তুললি আর মন্দাকিনীরটা তার নামেই রাখলি? আসলে তুই তো কল্পনাই করতে পারিসনি যে এমন দিনও আসতে পারে। ভেবেছিলি আয়ুষ্মানকে ধরে হাই টেকনোলজি ইউজ করে নেটওয়ার্ক হ্যাক করবি আর লালবাজারকে আঙুলের ডগায় নাচাবি। ধাঁধাও বানিয়ে ফেললি। বাসনাকালী বাড়িকে ঘিরে থ্রিলার স্ক্রিপ্টও লিখে ফেললি। সেই ফাঁকে কালিকাপুরে খুন করলি। তাও আবার যে মানুষটা তোকে খাইয়ে দাইয়ে বড়ো করল তারই তৈরি প্রস্থেটিক মাস্ক ঝেড়ে কাণ্ড ঘটালি। কিন্তু কেসটা জন্ডিস হয়ে গেল গালের মধ্যে রুনুদেবীর আঙুলের আঁচড় লেগে। হল তো হল। তাতে কী গেল এল? তোর টিকিটাও কেউ ছুঁতে পারল না। মাঝখান থেকে ফেঁসে গেল অভিনেত্রী কমলিনী মিত্র। তাঁকে ধরতে গিয়ে ভাগ্যিস আমাদের চোখে সোমনাথবাবুর তৈরি ওই মাস্কটা চোখে পড়ল তাই সোমনাথবাবু পর্যন্ত পৌঁছোতে পারলাম। এবার তুই ভয় পেলি। খারাপ লাগল। তোর জন্য এই ভালো মানুষটার বিপদ হবে? তাই বুদ্ধি করে আরও একটা স্ক্রিপ্ট বানালি নাজমাকে নিয়ে। আমরা যখন সোমনাথবাবুকে জেরা করছি ঠিক সেই সময় নাজমাকে কাঁদতে কাঁদতে ফোন করালি। নাজমা ঠিক তোর শেখানো কথাগুলোই বলে চলল। তার বিনিময় নাজমা পেল মোটা টাকা। যাঁদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তারা স্বপ্ন দেখল গড়িয়াহাটে শপিং করার। এত সাহস, আমাদের চোখের সামনে দিয়েই অফিস গোয়িং কচি ছেলে সেজে ভালো মানুষটির মতো বিট্টুকে খুন করে কেটে পড়লি। এই একই মেকআপে কালিকাপুরের পাড়াতে দেখা গেছে। শুধু বাদামি রঙের আঁচিলটা ছিল না। সেম মেকআপে স্বর্ণশিখর এস্টেটে ইলেক্ট্রিক সাপ্লাইয়ের লোক সেজে সিসি ক্যামেরার কানেকশন কেটেছিস। আবার এই রূপেই স্বপ্না মণ্ডলকে অভিনয়ের নামে হাত করতে চেয়েছিলি মিনতি গুহকে মারবি বলে। মিনতির ছেলে প্রকাশ তোকেই দেখেছিল। তোর পায়ের গন্ধ মঞ্জুর ঘরে আর বাণীকণ্ঠের ঘরে পেয়েছি। কারণ তোর এই অসুখটা আছে। কনফার্মড বাই ডক্টর দিব্যময় মুখার্জি। আর কত প্রমাণ চাস? আর আপনি সোমনাথবাবু, সেদিন তো আপনার সন্তানের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। বিমলের কথা বলেননি তার মানে আপনি খুব ভালো করেই জানতেন বিমল কী করে বেড়াচ্ছে?’
‘আপনারা আমার স্ত্রী সন্তানের কথা জানতে চেয়েছিলেন। আমি সেটুকুই বলেছি।’
‘প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন। আপনি জানতেন না বিমল কী করে বেড়াচ্ছে?’
‘আমি যদি না বলি, আপনারা মানবেন?’
সোমনাথ বিমলের পাশে গিয়ে বসল। কাঁপা কাঁপা ডান হাতটা দিয়ে বিমলের চিবুক ধরে মুখটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁরে, তোকে কি আমি মানুষ করতে ভুল করলাম? নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসা দিয়ে ভুল করলাম? জানেন স্বয়ম্ভুবাবু, ও না ছোটো থেকে আমার একটা কথারও অবাধ্য হয়নি। স্কুলে ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয়নি। আমার শরীর খারাপ হলে সারারাত মাথার কাছে বসে সেবা করে গেছে। ও আমায় ভুলিয়ে দিয়েছিল যে আমার কোনও বায়োলজিকালি সন্তান নেই। মানুষ অপরাধী তৈরি হলে কিছু তো একটা সিমটম থাকবে তার মধ্যে, ওর মধ্যে যা ছিল সব ভালো মানুষের সিমটম। নাজমা ওকে ভাই-ভাই করে চোখে হারায়। আমি চেয়েছিলাম ও যা হতে চায় ও তাই হোক। হঠাৎ একদিন বলল, কাকু, আমি লোকের চুল কাটব। আমি তো অবাক। বললাম, এত কাজ থাকতে শেষে নাপিত হবি? ও বলল, ধুস আমি তো পার্লারের নাপিত হব। বিশাল বড়ো আমার পার্লার হবে। আমি বউও সাজাব। আমার খুব ভালো লাগল। সব, সব শিখিয়েছি আমি। ভালো ভালো লোক রেখে ট্রেনিং দিয়েছি। এমনকি ওই প্রস্থেটিক মাস্কের প্রতি ওর বরাবরের ইন্টারেস্ট। ও এত ভালো শিখে ফেলল যে ছবি দেখেও মাস্ক বানিয়ে দিতে পারে।
‘জানি। তারই ফলশ্রুতি ডাক্তারবাবুর মাস্ক।’ স্বয়ম্ভু বলল।
এতক্ষণ চুপ ছিলেন দিব্যময়। বিমলের মুখের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এলেন। সপাটে একটা চড় কষালেন বিমলের গালে। সোমনাথ দু-চোখ বন্ধ করে নিলেন। দিব্যময় বলল, ‘বেইমান! কেন মারলি বাবুকে? ওই বুড়ো লোকটা কী ক্ষতি করেছিল তোর? এতগুলো মেয়ে নিজের জীবন নিজের মতো বাঁচত। তার দায় নিতে গিয়ে তুই তাদেরকে শেষ করে কী উদ্ধার করলি? চুপ থাকবি না বিমল, বল। শুধু পুলিশ কেন জানবে? আমাদেরও জানার অধিকার আছে। উত্তর চাই। বল। বল বিমল।’ প্ৰচণ্ড রাগে কেঁপে উঠলেন দিব্যময়।
‘কী করে জানলেন স্যার যে আমি মেরেছি? শালিক পাখি বলেছে? অ্যাঁ?’
হা হা করে হেসে ওঠে বিমল। ‘লালবাজারের গোয়েন্দাদের এখন এমন দুর্দশা যে একটা শালিক পাখির থেকে বয়ান নিয়ে ক্রিমিনাল ধরতে বেরোচ্ছে?’ চড়াত করে স্বয়ম্ভুর মাথার মধ্যে কেউ ইলেক্ট্রিকের শক দিল। ‘মন্দাকিনী স্বীকার করেছে।’
বিমলের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। ‘আপনারা গল্প দেবেন আর আমি বিশ্বাস করে যাব? মন্দা আমার প্রেমিকা। আমি আর ও একসঙ্গে কাটলেট খেয়েছি তার ফুটেজ দেখাতে পারবেন?’
‘প্রয়োজন হলে দেখাব।’
‘দেখান। আপনারা যে গল্প দিচ্ছেন না, সেটা আগে প্রমাণ করুন।
‘তুই যে অতি ধুরন্ধর সে আমরা ভালোই জানি। কোথায় সিসি ক্যামেরা আছে সেটার খোঁজ নিয়ে তারপর কোথাও যাস।’
‘অর্থাৎ, কোনও ফুটেজ দেখাতে পারবেন না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে আমাকে অ্যারেস্ট করতে এসেছেন? কীসের ভিত্তিতে কাকুর মতো সম্মানীয় মানুষকে হেনস্থা করছেন?’
‘তোর বাড়ি থেকে যেগুলো পাওয়া গেল তার কী সাফাই দিবি?’
‘আমার ঘরের তালা ভেঙে আপনারাই যে ওগুলো রাখেননি তার প্রমাণ কী? এই কলকাতা শহরে একটাই বিমল আছে? একজনের পায়েতেই গন্ধ হয়? কেউ কি আমায় কোথাও স্বচক্ষে দেখেছে খুন করতে? কেউ বলেছে যে ওই যে বিমল, যার পার্লার আছে সে এই খুনগুলো করেছে? ফোন নম্বরটা আবার কার যেন নাম বললেন তার নামে। এরা কারা? আমি কাউকে চিনি না। আপনারা যে বিমলকে খুঁজছেন আমি সেই বিমল নই।’
‘এইভাবে তর্ক করে তোর জেলে যাওয়াটা আটকাতে পারবি না বিমল। তোর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করবে এবার। ফুট প্রিন্টও পাওয়া গেছে মঞ্জুর বাড়িতে। সেটাও ম্যাচ করে যাবে।’
‘ফিউচার টেন্স! স্বয়ম্ভুবাবু, এখন যান। ফিউচারে আসবেন।’
স্বয়ম্ভু হাসল। ‘নিজেকে এত চালাক ভাবিস না রে। এখনও আরও কিছু…!’
কথাটা শেষ হল না। স্বয়ম্ভুর ফোনে ভিডিও কলে রাজারাম। ‘বলো রাজারাম। কেবিনে গেছ?’
‘হ্যাঁ স্যার। এই যে উনি। আগের চেয়ে বেটার। কথা বলতে পারছেন।’
ভিডিয়োতে মঞ্জুর বাড়ির পাশের প্রতিবেশী ভদ্রলোক, রাজীব। নার্সিংহোমের বেডে। ‘আপনাকে একজন কে দেখাচ্ছি। সে আপনাকে দেখতে পাবে না। আপনি তাকে দেখতে পাবেন। দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা।’
‘দেখান।’
স্বয়ম্ভু ভিডিওটা রোটেড করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে রাজীবের ভুরু কুঁচকে যায়। স্বয়ম্ভুর ক্যামেরায় বিমল। রাজীবের মুখ ভয়ে শুকিয়ে যায়। ‘বলুন, চিনতে পারছেন একে?’
‘বিলক্ষণ। এই… এই সেই ছেলে। যে মঞ্জুকে মার্ডার করেছে।
‘আপনি ঠিক বলছেন তো? ভালো করে দেখে বলুন।’
‘এই মুখ আমি ভুলব না স্যার। ও সেদিন স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ছিল। কানে দুল ছিল। মঞ্জু কী যেন রান্না করছিল। বাথরুমে গিয়ে ভাবলাম এত রাতে শব্দ কোথা থেকে আসছে বলে জানলা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখি মঞ্জুর পিছনে ছেলেটি দাঁড়িয়ে। ঘাড়ে একটা ট্যাটুও আছে।’
স্বয়ম্ভু সঙ্গে সঙ্গে বিমলের জামাটা ঘাড়ের কাছে সরিয়ে ক্যামেরাটা ধরে। রাজীব বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ এই জায়গাতেই ছিল। ডিজাইন মনে নেই। আপনি যেদিন নার্সিংহোমে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, সেদিন এখানেই আমি এই ছেলেটিকে দেখেছিলাম একটি মেয়েকে নিয়ে বেরোচ্ছিল। তাই তো শেষে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’
স্বয়ম্ভু বুঝতে পারল, সেদিন রাজীববাবু দুই চক্ষু কেন বিস্ফারিত করে ঘরের বাইরের দিকে তাকিয়েছিলেন!
‘কীভাবে খুন করল?’
‘প্রথমে পিছন থেকে মেয়েটির চুলের মুঠি ধরল। তারপরেই ছুরি দিয়ে গলাটা কেটে দিল। গলগল করে রক্ত। উফফ সেই ভয়ানক দৃশ্য দেখে আমি কোনওরকমে বাথরুমের আলোটা নেভাই। তারপর বুকে অসহ্য ব্যথা হয়। এরপর আর কিছু মনে নেই।’
‘থ্যাংক ইউ সো মাচ। রাজারাম, এবার ওনাকে রেস্ট করতে দাও।’
‘ওকে স্যার। তুমি লালবাজারে চলে যাও। আমি গোপাল ঠাকুরকে নিয়ে যাচ্ছি।’ ভিডিওটা কেটে গেল। স্বয়ম্ভু আর একটাও কথা বলল না। শুধু বিমলের দিকে চেয়ে রইল। বিমলও চুপ। শিবাঙ্গী এগিয়ে এল। ‘স্যার, আমরা আরও একটা পয়েন্ট মিস করে যাচ্ছিলাম।’
‘কোনটা বলো তো?’
‘মিনতির শরীরে ফেনক্সিথেনল ও প্রপিলিন গ্লাইকোল আর বীণার বডিতে প্রপিলিন গ্লাইকোল অ্যান্ড ডায়াথেল থ্যালেট পাওয়া গেছে।’
‘কারেক্ট কারেক্ট কারেক্ট। থ্যাংক ইউ শিবাঙ্গী। আমার তো মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিল। কসমেটিক প্রিজার্ভেশনে কাজে লাগে। এই মুহূর্তে বিমলের স্কিন টেস্ট করলেও এমন অনেক কিছু পাওয়া যাবে। ভালো করে মুখ ধুতে পারেনি রাতে। মুনশিবাবু, বাছাধনকে বরণ করে গাড়িতে তুলুন।’
‘আমি সব বলব।’
বিমল বলে উঠল। স্বয়ম্ভু-শিবাঙ্গীর একটু খটকা লাগল। এই জাতের ক্রিমিনাল কোনও ক্যালানি ছাড়াই সব বলবে বলছে! বিমল বলল, ‘শুধু একটা শর্তে। নইলে মেরে ধরেও আমার মুখ খোলাতে পারবেন না।’
‘হয়েছে হয়েছে। লেকচার ছেড়ে আসল কথায় আয়। কীসের শর্ত?’
‘আমার কেসের সঙ্গে সোমনাথ চৌধুরির নামটা যেন কোনওভাবে না জড়ায়।
সোমনাথ এতক্ষণ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসেছিলেন। বিমলের কথায় আঙুলের ফাঁক দিয়ে বিমলের দিকে তাকান। স্বয়ম্ভু বেশ কড়া করেই উত্তর দিল, ‘ন্যাকামো করার জায়গা পাস না? সোমনাথ চৌধুরির বাড়ি থেকে ক্রিমিনাল ধরা পড়ছে। এলাকার সব লোক নিশ্চয়ই তোদেরকে জানে। কেউ জানতে পারবে না?’
‘তবু, আপনারা যতটা পারেন কাকুকে আড়ালে রাখবেন। আমার জন্য কাকুর অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমি চাই না, দেবতার মতো এই মানুষটার আর কোনও ক্ষতি হোক।’
সোমনাথ দাঁতে দাঁত চিপে সপাটে একটা চড় মারল বিমলকে। ‘তোর দয়া আমি চাই না রে জানোয়ার। আজ বুঝতে পারছি, তোকে আনার সময় ওই মুদির দোকানের চাচা বলেছিল তোর পিসিকে নাকি পিসেমশাই মেরে ফেলেছে। কিন্তু না, ভুল জানত সবাই। তোর পিসিকে তুই-ই মেরেছিলি।’ বিমল ঠান্ডা চোখে চেয়ে থাকে সোমনাথের দিকে। স্বয়ম্ভু-শিবাঙ্গী আর মুনশি নতুন অপরাধের গন্ধ পেয়ে স্তম্ভিত।
‘পিসিকে খুন? কী হয়েছিল সোমনাথবাবু? খুলে বলুন।’
‘বললাম তো, আমি সব বলব। আর কিচ্ছু লুকাব না। কারণ আমার আর কিচ্ছু পাওয়ার নেই।’
‘এতগুলো খুন করে তুই কী পেলি?’
‘থানায় থানায় খোঁজ নিন। জানতে পারবেন। ন’জনকে মেরে নব্বই জনের মেরুদণ্ড সোজা করেছি। বোবা মুখগুলোতে ভাষা ফুটিয়েছি। যারা অন্যায় করে তাদের তো শাস্তি যে কেউ দিতে পারে। কিন্তু অন্যায় যারা মুখ বুঝে সহ্য করে আমার কাছে তারাই হল সবথেকে বড়ো অপরাধী। কারণ তারাই পরোক্ষভাবে অপরাধ ও অপরাধীর জন্ম দেয়। আজ আমার ফাঁসি হলেও দুঃখ নেই। চলুন স্যার।’
মুনশির সঙ্গে বেরিয়ে যাবার আগে বিমল দিব্যময়ের দিকে তাকিয়ে দুটো হাত জোড় করে প্রণাম করে বলে, ‘সবথেকে বড়ো পাপটা আমি আজ করেছি। মারতে আমি চাইনি।
‘স্যার, হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলেন কেন?’
গাড়ি করে লালবাজার যাওয়ার পথে শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে। স্বয়ম্ভু বলে, ‘দু-দিন আগে আমার মা একটা কথা বলেছিল। বলেছিল, খুনি যদি ধরা পড়ে তাহলে তার কেস ফাইলে আমি যেন তার শত অপরাধের পাশে একটা জিনিস মেনশন করি।’
‘কী?’
‘সাতজনকে মেরে ও সত্তরজন মেয়ের মেরুদণ্ড শক্ত করে দিয়ে গেছে।’
শিবাঙ্গীর বুক ঠেলে একটা শ্বাস বেরিয়ে আসে।
***
তন্দ্রা হাতে মোবাইল নিয়ে অন্ধকারে অতি সন্তর্পণে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর কিছুটা এগিয়ে এপাশ ওপাশ তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। ফোনে বলল, ডানদিকে বাঁকের মুখে। সেই মতো আরও একটু এগিয়ে ডানদিকে এগোতে যায়। দু-পা এগোতেই অন্ধকারের আড়াল ছিঁড়ে এক দানব পিছন থেকে এসে ডান হাতে মুখ চেপে ধরে আর বাঁ হাতে ছুরিটা গলায় চালিয়ে দেয়। তন্দ্রার চোখ বুজে আসে। কাটা লতানে গাছের মতো রাস্তায় এলিয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে একটা হাত খুনির চুল ধরে পিছন থেকে সজোরে টান মারে। সঙ্গে সঙ্গে চামড়ার সঙ্গে লেগে থাকা প্রস্থেটিক মাস্কটা চচ্চড় করে খুলে যায়। বিমল ঘুরে দেখে ডক্টর দিব্যময়ের বাবা
‘তুমি? তুমি খুন করলে?’
বাণীকণ্ঠের মুখে সজোরে পালটা ঘুষি গিয়ে পড়তেই বাণীকণ্ঠ মুখ থুবড়ে পড়ে। বিমল ঝটিতি বাণীকণ্ঠের হাত থেকে মাস্কটা কেড়ে নিয়ে পালাতে যায়। বাণীকণ্ঠ দু-হাত দিয়ে বিমলের পা জড়িয়ে চিৎকার করতে যান। কিন্তু গলা দিয়ে ফ্যাসফেঁসে একটা শব্দ বেরিয়ে আসে। ভয়ে, উত্তেজনায় কথা বন্ধ হয়ে যায় বাণীকণ্ঠের। বিমল পা ছাড়াতে বাঁ হাত দিয়ে আবার একটা ঘুষি মারে বাণীকণ্ঠের গালে। চোখের চশমা ছিটকে পড়ে। গালে রক্ত লেগে যায়। বিমল নিজের মুখটাকে নতুন করে মহিলার ছদ্মবেশের আড়ালে ঢাকার প্রয়াস করতে করতে দৌড়ে পালায়। বাঁকের মুখে ঘুরে একটিবার বাণীকন্ঠের দিকে চেয়ে দেখে বিমল। তিনি তখনও চশমা হাতড়ে চলেছেন।
***
ক্যামেরা চলছে। জল ভরা ফোলা চোখে চেয়ারে বসে আছে মন্দাকিনী। সামনে শিবাঙ্গী। মন্দা বলল, ‘আমি তখন ঘুমোচ্ছিলাম। অচেনা নম্বর থেকে ফোনটা এল। বুঝলাম বিমলই করেছে। ও খুব হাঁফাচ্ছে। বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমি বললাম, কী? ও বলল, স্যারের বাবা নাকি বিমলকে চিনে ফেলেছে। চোখের সামনে খুনটা হতে দেখেছে। আমি আঁতকে উঠলাম।’
***
মন্দা বিছানায় বসে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে আর মোবাইলে বিমলকে বলছে, ‘এবার কী হবে? মেসো তো এখানেও নেই। ভাইয়ের বাড়ি গেছে।
‘কী করব মন্দা? ইচ্ছে করছিল বুড়োটাকে দিই শেষ করে। কিন্তু পারলাম না। স্যারের মুখটা মনে পড়ল।’
‘তুমি পালাও। এখনি পালাও। মেসো এখানে থাকলে না হয় আমি কিছু করতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু সেটাও তো নেই।’
‘রাখছি আমি। দেখি কী করতে পারি।’
ফোনটা কেটে গেল। মন্দার চোখে আর ঘুম এল না। ঘরের মধ্যেই পায়চারি করতে লাগল। প্রায় মিনিট পনেরো-কুড়ি পর দরজায় ধাক্কা। বাণীকণ্ঠ বাড়ি আসে। ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে মন্দা দরজা দিয়ে দেয়। চট করে বাইরে দাঁড়িয়েই বিমলের নতুন নম্বরে কল করে।
‘মেসো এখানে চলে এসেছে। এবার?’
বিমল চুপ। মন্দা খোঁচায়, ‘হ্যালো।’
‘ফোনটা অন রেখে মেসোর সঙ্গে কথা বলো। স্যারকে জানিয়েছে কিনা জানার চেষ্টা করো।’
ঘরের ভিতর থেকে বাণীকণ্ঠের ডাক শোনা যায়। যথারীতি বিটকেলের ঘুম ভেঙে গেছে। সেও নাকি সুরে মন্দাকে ডেকে উঠল। মন্দা ছুট্টে ঘরের ভিতর গিয়ে দেখে বাণীকণ্ঠ বিছানায় বসে হাঁফাচ্ছে।
‘কী হয়েছে তোমার মেসো? এত রাতে এখানে এলে কেন? তোমার গালে রক্ত! জামাতেও… কী হয়েছে? পড়ে-ধরে গেছ নাকি? কতবার বলেছি রাতে বেরোবে না।’
‘থাম দিকিনি। তুই এক কাজ কর, এক্ষুনি একবার বাবুকে ফোন কর।’
‘দাদাকে! কেন?’
‘ওকে বল এক্ষুনি চলে আসতে।’
‘মেসো কী হয়েছে তোমার বলবে তো?’
‘সর্বনাশ হয়ে গেছে মন্দা! সর্বনাশ! আমি যে তাকে দেখে ফেলেছি।’
‘কাকে?’
‘উফফ! কথা বাড়াস না। ফোনটা কর।’
‘তোমার ফোন কই?’
‘জানি না। কোথাও পড়ে-টড়ে গেছে। ফোনটা কর মন্দা।’
‘দাঁড়াও দাঁড়াও।’
মন্দা বাণীকণ্ঠের সামনে থেকে সরে গিয়ে কানে ফোন দেয়। গলা ঝাড়ে। ওপারে বিমল বুঝতে পারে মন্দা শুনছে। ‘শোনো, ভুলেও ফোন করবে না। বলো, ফোন লাগছে না। সুইচড অফ। আমি আসছি। দরজা খুলে রাখো।’ মন্দা আঁতকে উঠল। আলোআঁধারিতে বাণীকণ্ঠের চোখ এড়িয়ে গেল মন্দার আঁতকে ওঠা। বিটকেল এখনও মনের সুখে ঘরের মধ্যে উড়ে বেড়াচ্ছে। পুতুলি লক্ষ্মী খরগোশ। বিছানার একপাশে বসে আছে। বিমলের শেখানো কথাই বলে মন্দা। বাণীকণ্ঠ ভয় পেয়ে যায়। মন্দা বলে, দরজা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকালে দাদাকে কল করবে। বাণীকণ্ঠ তাই করে। মিনিট দশেকের মধ্যেই সদর ঠেলে কেউ একজন ঢুকে আসে। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে মন্দা বাইরে গিয়ে দেখে দিব্যময় এসেছে। বুকের ভেতরটা ধড়াস করে ওঠে। কিন্তু দিব্যময় কাছে এসে দাঁড়াতেই চটক ভাঙে মন্দার। ‘তুমি?’ বিমল সঙ্গে সঙ্গে মন্দার মুখে হাত চাপা দেয়। মন্দা সেই হাত সরিয়ে দিয়ে উৎকণ্ঠিত স্বরে বলে ওঠে, ‘কী, কী করবে তুমি?’
‘কিচ্ছু করার নেই মন্দা। ‘
‘না না, এটা কোরো না।’
‘না করলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমিও কি চাই এই কাজ করতে? এতদিন এত খুন করেছি, আমার পাপবোধ হয়নি। কিন্তু আজ, আমি জানি, আমি পাপ করছি। কিচ্ছু করার নেই।
বিমল মন্দার হাত ছাড়িয়ে বাণীকণ্ঠের ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা মারে। ভিতর থেকে প্রশ্ন আসে, ‘কে?’
বিমল মুখে রুমাল চেপে বলে, ‘বাবু আমি। মন্দা ফোন করেছিল। কী হয়েছে? দরজা খোলো।’ তক্ষুনি দরজা খুলে কাতর চোখদুটো তুলে বাণীকণ্ঠ বাবুর মুখের দিকে তাকায়। বিমল ঝট করে ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে দেয়। ঘুরে দাঁড়ায় বাণীকণ্ঠের দিকে।
‘বাবু সর্বনাশ হয়ে গেছে। ওই বিমল একটা মেয়েকে খুন করেছে। আমি সব দেখে ফেলেছি।’
বিমল দু-পা এগোয় বাণীকণ্ঠের দিকে। চোখে চোখ রেখে বলে, ‘কেন দেখলে বাবু? কতবার বলেছি রাতে বেরিও না। বেরিও না। শোনো না কথা
বাণীকণ্ঠের কানে দিব্যময়ের গলাটা যেন অন্য সুরে বাজে।
‘তোর গলাটা এরকম লাগছে কেন বাবু?’
বিমল এক পা এগোয়। ‘কীরকম? বিমলের মতো?’ বিমলের পকেট থেকে একটা ছুরি বেরিয়ে আসে। শালিক পাখির প্রাণটাও বুঝি ধড়াস করে ওঠে। ঘাড় বেঁকিয়ে টানা টানা চোখে অবশ্যম্ভাবী ভয়ংকরতাকে প্রত্যক্ষ করতে থাকে। হাই পাওয়ারের চশমার আড়ালে বাণীকণ্ঠের চক্ষু বিকট আকার ধারণ করে। ‘কে তুই? তুই আমার বাবু নোস। তুই কে?’ বাণীকণ্ঠ শোকেসের দিকে পিছোতে থাকে। বিমল এগোতে থাকে। বিমলের মনেও তোলপাড় চলছে। এক অদ্ভুত দোলাচল। নিজেরই মনে হচ্ছে ওর হাত বোধহয় আজ কাঁপছে। তাই একটু বেশিই জোর দিয়ে ছুরিটাকে চেপে ধরেছে।
‘আমি বাবু, চিনতে পারছ না? বাবু আমি।’
‘না, তুই বাবু না। তুই বিমল।’
‘আমি বাবু। বিশ্বাস করো।
‘তুই বিমল।’
শালিকটা ফরফর করে উঠে শোকেসের ওপর এসে বসে। বাণীকণ্ঠ শোকেসের গায়ে ধাক্কা খেয়ে টাল খেয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিমলের ডান হাতে ধরা ছুরিটায় ফালা হয়ে যায় বাণীকণ্ঠের কণ্ঠনালী। শালিকটা ক্যা ক্যা ডেকে ডানা ঝাপটে ওঠে। মন্দা বাইরে থেকে ‘অক’ করে একটা শব্দ শুনতে পায়। তারপরেই ধপ করে শরীরটা লুটিয়ে পড়ার আওয়াজ। নিজের মুখে হাত চাপা দিয়ে ছুটে দরজার কাছ থেকে সরে গিয়ে গুমরে কেঁদে ওঠে। মন্দার বুকের ভিতর থেকে যে আর্তনাদের কান্না ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে, সেটাকে কিছুতেই বেরোতে দেওয়া যাবে না। তাই যতটা সম্ভব মুখটাকে দু-হাতে চেপে রাখে। পাশে বিমল এসে দাঁড়ায়। মন্দা জল ছাপানো চোখে বিমলের দিকে চায়। দেখে তার দু-চোখেও জলের আভাস। বিমল বেসিনে গিয়ে চট করে হাত আর ছুরিটা ধুয়ে নেয়। তারপর হাত মুছে ছুরিটা ভাঁজ করে পকেটে পুরে বেরিয়ে যাবার আগে বলে, ‘তুই চুপ করে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। পাশের ঘরে কী ঘটেছে তুই কিচ্ছু জানিস না। পুলিশ আসবে না। সকালে উঠে আগে স্যারকে ফোন করে বলবি কাল রাতেই মেসো ফিরে এসেছে। তোমায় আসতে বলছে। তারপর স্যার এলে বলবি, ঘুমোচ্ছে বলে ডাকিনি।’
‘আর ঘরে ঢুকে যখন দেখবে এই অবস্থা। তখন তো আমাকে পুলিশে দেবে।’
‘কেউ মানুষ খুন করে পাশের ঘরে ঘুমোয় না। বরং পালালেই সন্দেহ করবে।’
‘আর খুনিটা ঢুকল কোথা থেকে?’
‘বলবি রাতে এমন করে মেসো ফিরেছিল যে তুই দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছিস। শুধু ভেজিয়ে রেখেছিলি। আমি আসি।’
চলে যেতে গিয়েও ফিরে চাইল বিমল। মন্দার কাছে ফিরে এসে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। গভীর আশ্লেষে চুম্বন করে মন্দাকে বিদায় জানাল সে।
মন্দা ঘরের ভেজানো দরজা খুলে ভীত দৃষ্টিতে বাণীকণ্ঠের দিকে তাকাল। বুকটা কেঁপে উঠল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটি। শালিকটা বাণীকণ্ঠের বুকের ওপর বসে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে। মন্দা আসাতে একবার মন্দার দিকে, একবার বাণীকণ্ঠের দিকে! কী যে দেখছিল, কীই বা বুঝছিল কে জানে? উড়ে, হেঁটে বাণীকণ্ঠের চারপাশে একবার ঘুরপাক খেয়ে নিল সে। মন্দা হাউ হাউ করে দরজার সামনে বসে হাতজোড় করে কেঁদে চলল। শালিকটা মন্দার কাঁধে উড়ে এসে বসল। বিটকেলকে ধরে বারান্দায় খাঁচায় পুরে দিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে বালিশে উপুড় হয়ে অঝোরে কেঁদে চলল মন্দাকিনী।
***
‘আমার কাকুর কোনও ক্ষতি হবে না তো স্যার? ওকে দেখবেন তো?’ সামনে বসে থাকা স্বয়ম্ভুকে প্রশ্ন করে বিমল। চোখ মুখে এমন নিষ্পাপ অভিব্যক্তি, প্রিয়জনের জন্য এত চিন্তা, কে বলবে বিমল ন’টা খুন করেছে?
‘ন’টা নয় স্যার। দশটা।’
‘আর কাকে মেরেছিস?’
‘আগে কথা দিন। কাকুকে দেখবেন। কোনও ক্ষতি হতে দেবেন না।
‘চেষ্টা করব। আচ্ছা বিমল, তুই তো রাক্ষস নোস। তোর মধ্যে আপনজনের জন্য এত চিন্তা, এত ভালোবাসা সব আছে। তাহলে খুনগুলো করলি কেন? কে তোকে ওই মেয়েগুলোর ঠেকা নিতে বলেছিল?’
ক্যামেরায় রেকর্ডিং চলছে। বিমল ক্যামেরার দিকে লুক দিয়ে উত্তর দিল, ‘যাদের খুন করেছি আমি তাদেরকেও ভালোবাসতাম। আমি মারার আগে প্রত্যেককে নিজের পায়ে দাঁড়াবার, নিজে কিছু করার পথ বাতলে দিয়েছিলাম। প্রতিবাদ করতে বলেছিলাম। সময় দিয়েছিলাম তাদের।’
‘ওই জুনিয়র আর্টিস্টের রোল?’
‘ওটা একটা রাস্তা ছিল। লক্ষ্মীরানি, সুমিতা, মিনতি সবাইকে বলেছিলাম, ভালো করে মেকআপ করা শিখে নাও। আমি কাজ দেব। লাগবে না তোমাদের ওই স্বামীর দেওয়া অন্নবস্ত্র। দূর করে দাও। শান্তি আর বীণা তো নিজেরাই রোজগার করত। স্বাবলম্বী ছিল। তারপরেও শান্তি পরকীয়া করা স্বামীর পেছন ছাড়ল না আর বীণার প্রেমের ন্যাকামি গেল না। বাকিরাও তাদের পতি পরমেশ্বরের বিরুদ্ধে মুখ খুলল না। মেরে দিলাম। ওপরওলা আমাদের এই অমূল্য জীবন দিয়েছে কি অত্যাচার সহ্য করে বেঁচে থাকার জন্য? নাহ, দরকার নেই বাঁচার ওদের। ওরা বেঁচে থাকলে আরও একটা লাল্টু জন্মাবে।’
‘লাল্টু কে?’
বিমল হাসে। ‘আমার হারিয়ে যাওয়া ডাক নাম। আসল নাম বিমল দাস। কাকু আমায় ওই চৌধুরি পদবিটা ধার দিয়েছে।’
‘লাল্টুর গল্পে পরে আসছি। তার আগে বল, ক্যারোটিড আর্টারি কাটলেই মৃত্যু, সেটা কে বলল তোকে?’
বিমল হাসল। ‘ডাক্তারবাবু। একদিন ওনার শেভ করার সময় একটু হাতটা ফসকে যায়। তখনই স্যার বলে, কী করছিস বিমল? আরেকটু হলেই তো খুন করে দিতিস। আমি বললাম, কী যে বলেন, এইটুকুতে খুন? তখন স্যার বললেন, জানিস এখানে ক্যারোটিড আর্টারি থাকে। গলার দুপাশেই থাকে। ঠিক জায়গা বুঝে ছুরি চালালে একবারেই ঘ্যাচাং ফু। তখন কি আর ভেবেছিলাম, এটাও আমার কাজে লাগবে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্বয়ম্ভু। প্রশ্ন করল, ‘মঞ্জুকে মারলি কেন? সে তো তোর লোক ছিল।’
‘শুধু আমার লোকই ছিল না। ওকে আমি খুব সম্মান করতাম। আমার দেখানো পথেই চলেছে। ওর বরটাও ওকে হেব্বি ক্যালাত।’
‘কী করে জানলি? আগে থেকে চিনতিস?’
‘না। শাস্তিকে চিনতাম। আয়ার কাজ করত। কাকুর একবার খুব শরীর খারাপ হয়। হার্টের সমস্যা। প্রায় চোদ্দদিন হেলথ লাইনে ভর্তি থাকে। বাড়ি ফেরার পর মাসখানেক একদম রেস্ট নিতে বলেছিল ডক্টর। তখনই কাকুকে দেখা শোনার জন্য শান্তিকে রাখা হয়। জানতে পারি শান্তির বর দীননাথের পরকীয়ার কথা। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, বরকে ছেড়ে দাও। বলেছিল, মেয়েরা আছে। আমি বললাম, নিজে তো রোজগার করো। আরও করবে। আমি তোমার একটা মেয়েকে আমার পার্লারে কাজ দেব। শান্তি বলেছিল, না। বরকে ও ভালোবাসে। একে পরকীয়া তার ওপর আবার গায়ে নাকি সিগারেটের ছ্যাকাও দেয়। তবু, স্বামী বলে কথা। শান্তির সূত্র ধরেই মঞ্জুকে চেনা। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, বস্তিতে মঞ্জুর বদনাম আছে যে সে নাকি স্বামীকে পুড়িয়ে মেরেছে। কিন্তু কেন? এমনি এমনি একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে পুড়িয়ে দিল? অনেক খোঁজ নিয়ে একটা বুড়ি আমায় বলে, মঞ্জুকে ওর বর প্রতিদিন মারধোর করত। সেই শোধ নিতেই মঞ্জু এই স্টেপ নেয়। আমি তখনই মনে মনে ঠিক করে নিই, এই মেয়েটাকে পটাতে হবে। মেরুদণ্ড আছে বটে।’
‘বরকে পুড়িয়ে মারাটা তোর কাছে মেরুদণ্ড থাকার নমুনা?’
স্বয়ম্ভুর প্রশ্নে আবারও হাসি বিমলের ঠোঁটে। ‘স্যার, যে যেভাবে দেখে। আপনি দেখছেন বরকে পুড়িয়ে মারা আর আমি দেখছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। মঞ্জু যখন স্বামীর দ্বারা অত্যাচারিত তখন সুযোগ নেয় দীননাথ। শান্তি দাসের বর। ব্যাটার মেয়েছেলে দেখলেই ছোঁকছোকানি। কিন্তু মঞ্জু বুঝেছিল এই দীননাথ তাকে ভোগ করা ছাড়া আর কিসসু করতে পারবে না। বিপদের দিনে অর্থ সাহায্যও পাবে না। কারণ ওর ঘরে বউ, বাচ্চা সব আছে। তখন এম এল এ-র ছেলেকে আঁকড়ে ধরেছিল। ছেলেটিও গুণধর। সেও এই সুযোগে ভালো করে মঞ্জুকে চুষে নিয়েছে। মরুক গে যাক। আমার কাজ হলেই হল।
***
মঞ্জু সেদিন বাজার থেকে বাড়িতে ফিরছিল। বিমল পিছন থেকে ডাকে। মঞ্জু দাঁড়ায়। বিমলকে দেখেই ভুরু কুঁচকে যায়। ‘আবার এয়েচ? কী চাও কি তুমি?’
‘সাহায্য।’
‘মানুষ মাত্তে আমি পারবুনি। আমারে কি খুনি পেয়েচ?’
‘সারা বস্তিবাসী জানে কে কাকে পুড়িয়ে মেরেছিল।’
মঞ্জুর চলা থেমে গেল। কড়া দৃষ্টি নিয়ে তাকাল বিমলের দিকে। ‘বেশি বাড় বেড়োনি। ঝড়ে উড়ে যাবে।’ মঞ্জুর চোখেমুখে সেদিন ধারালো কাস্তের ঝিলিক দেখেছিল বিমল। বাঁকা হাসি নিয়ে বিমল বলেছিল, ‘এইটাই চাই মঞ্জু। আর কিচ্ছু চাই না।
‘মানে?’
‘তোমার এই তেজটার জন্যই তোমায় আমার এত ভালো লাগে। আমি জানি তুমি কতটা অত্যাচার সহ্য করে স্বামীকে মেরেছ। আমার কাজটাও সেটাই। যারা বরের কাছ থেকে দিনরাত অত্যাচার সহ্য করে, কিন্তু প্রতিবাদ করে না। তিলে তিলে মরে আর তাদের সন্তানদেরও মারে। আমি সেই মেয়েদের মুক্তি দেব। তোমায় কিচ্ছু করতে হবে না। শুধু সাহায্য করবে। আমার দলে থাকবে। ব্যস! বদলে কাজ হিসেবে টাকাও পাবে। টাকা লাগবে না তোমার?’
মঞ্জুর চোখদুটোয় আশঙ্কার সঙ্গে লোভটাও চকচক করে ওঠে।
***
‘মঞ্জুকে মারতেও আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। কিচ্ছু করার ছিল না।’
‘বুঝলাম। কিন্তু তুই সারাদিন ঘুরে ঘুরে এত লোকের ইনফো জোগাড় করে পার্লার চালাতিস কী করে?’
‘আমার পার্লারটাই আমার রিসার্চের জায়গা স্যার। আমায় ঘুরতে হত না। ইনফরমেশন ঘুরেফিরে আমার পার্লারেই চলে আসত। কত মানুষ কতরকম সমস্যা নিয়ে আসে। আমার দোকানে যেসব ছেলেমেয়েগুলো কাজ করে তাদের সঙ্গে গল্প করে। সেখান থেকেই তো জানতে পারি, কোন কোন মহিলা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার। তারপর তাদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে দিই। লোক ফিট করি। বিট্টু, আয়ুষ্মান, তারপর আঁখি। বিট্টু কাকুর কাছে কাজ চাইতে এসেছিল। অনেক দিন ঘুরঘুর করেছে। কাজ পায়নি। তারপর আমিই ডেকে নিলাম। বাড়িতে অসুস্থ মা। তাই কাজটা খুব দরকার ছিল। সিনেমায় অ্যাক্টিংয়ের শখ ছিল। তাই রিয়েল লাইফেও অ্যাক্টিংয়ের কাজে লাগিয়ে দিলাম।’
‘বিট্টুকে কেন মারলি?’
‘ওকে আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। তার ওপর ওর টাকার চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছিল।’
‘ওর মায়ের কী হয়েছে?’
‘হয়েছিল। ক্যান্সার। মা মারা যাওয়ার পরও টাকা চেয়ে শালা আমাকেই ব্ল্যাকমেল করত। কাকুকে নাকি সব জানিয়ে দেবে বলেছিল।’
‘আর আঁখি চ্যাটার্জি? তার সঙ্গেও তো তোর ভালোই কন্ট্যাক্ট ছিল।’
বিমলের মুখে আবারও অমল হাসি। ‘লাস্টবার বীণা সাহার নামে সিম কার্ডটা না দিয়ে ওর নামে দিলেই ভালো হত।’ নিজের ঊরুর ওপর চটাস করে চড় মেরে আক্ষেপ করে ওঠে, ‘ওটাই একটু…!’
‘কানা মনে মনে জানা। বলে ফ্যাল। আঁখিকে আয়ুষ্মানের থ্রতে পেলি তো?’
‘ওর একটা পাস্ট আছে। তাই আঁখিও আমার দলে ভিড়ে গেল। নইলে পেতাম কিনা জানি না। আমি কিন্তু কাউকে জোর করিনি স্যার।’
‘বুঝেছি। তুই নিষ্পাপ আসামি। পাস্টের কেসটা কী?’
রাজারাম আর শিবাঙ্গীর মুখোমুখি আঁখি চ্যাটার্জি। আর কিছু লুকোবার প্রয়োজন নেই তার। জায়গাও নেই। তাই তার বয়ানও রেকর্ড হচ্ছে।
‘আমার বাবা পুলিশ ছিল। মাকে প্রচণ্ড মারত। আমি তখন অনেক ছোটো। একদিন দরজার আড়াল থেকে দেখলাম, বাবা মাকে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলল। পুলিশের লোক। আইন হাতের মুঠোয়। ডাক্তারকে দিয়ে নরমাল হার্ট অ্যাটাক লিখিয়ে জ্বালিয়ে দিল। সেই থেকে পুলিশ জাতটাকে আমি ঘৃণা করি। পুলিশের ছদ্মবেশে সবাই একেকটা ক্রিমিনাল।
শিবাঙ্গী একবার রাজারামের দিকে তাকায়। চোয়াল শক্ত হলেও কিচ্ছু করার নেই তাদের। আঁখি বলে চলেছে, ‘দুটো একইরকম দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা যখন এক হয়ে মিলে যায় তখন সেটা প্রতিহিংসার আগুন হয়ে ওঠে। দুজনেই প্রতিশোধের নেশায় ছুটতে থাকে। সব কিছু ভুলেই থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বেছে বেছে সেই আয়ুষ্মানের সঙ্গেই আমার ভালোবাসা হল। আয়ুষ্মানের শত্রু পুলিশ। আমারও শত্রু পুলিশ। আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নিয়েছে।’ শেষ কথাটা বলে ঠান্ডা চোখে শিবাঙ্গীর দিকে তাকাল আঁখি। শিবাঙ্গী আঁখির চোখে চোখ রাখতে পারল না। অস্বস্তিটা কাটাতে হাল ধরল রাজারাম, ‘তাই বলে মানুষ মারার রাস্তায় হাঁটতে হল?’
‘চাইনি। বিমলের সঙ্গে হাত মেলাতে চাইনি। কিন্তু আয়ুষ্মানকে হারাবার পর আমার আর মাথার ঠিক ছিল না। সুকুমারদার সাহায্য তো ছিলই। ভাবলাম, মারতে নাই বা পারি। মানুষ মারাকে হাতিয়ার করে পুলিশকে হেনস্থা তো করতে পারব। সবার সামনে আইনের ঠুনকো মুখোশ তো খুলে দিতে পারব।’
‘কেসটা কোর্টে উঠলে আঁখির খুব বেশি সাজা হবে না। ওই আই পি সি ওয়ান এইট্টি টু, টু জিরো থ্রি বা খুব বেশি হলে ওয়ান টোয়েন্টি বি।’
লালবাজারে নিজের ঘরে কোমর সোজা রেখে বডিটাকে একবার ডানদিকে আর বাঁদিকে হেলাতে হেলাতে কথাগুলো বলল স্বয়ম্ভু। শরীরটাকে একটু ছাড়িয়ে নিল। রাজারাম বলল, ‘ছ-মাস থেকে দু-বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা দুটোই।’
‘কিন্তু স্যার, মিনতিকে খুন করার আগে তো কেউ একজন মিনতিকে ডেকেছিল। সেটা কে? ওই পাশের বাড়ির মহিলা নয় তো?’
কৌশিক প্রশ্ন করল।
‘স্বপ্না আবার স্বপ্না নয়ও।’
‘মানে?’
‘আয়ুষ্মানের ল্যাপটপ থেকে অনেক কষ্টে ডিলিট হয়ে যাওয়া কিছু এ আই ভয়েস রিট্রিভ করেছে প্রদ্যুৎ। সেখানে একটা ভয়েস আছে স্বপ্নার। মিনতিকে নাম ধরে ডাকছে। মিনতি খুনের রাতে মন্দাকিনী ইচ্ছে করেই প্রকাশকে বাড়ি পৌঁছোতে যায় যাতে মিনতি আর প্রশান্তর অশান্তিটা স্বচক্ষে দেখতে পারে। দেখেও। ফেরার পথে ইচ্ছে করে স্বপ্নার বাড়িতে গিয়ে নানা কথা বলে স্বপ্নার ভয়েস রেকর্ড করে নিজের মোবাইলে। সেই ভয়েস ওর মোবাইল থেকে পাওয়াও গেছে। মন্দাকিনী সেটা বিমলকে সেন্ড করে। বিমল সেটা আয়ুষ্মানকে পাঠায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ আইতে স্বপ্নার ভয়েসে মিনতিকে ডাকার স্ক্রিপ্টটা বসিয়ে একটা অডিও রেডি করে দেয় আয়ুষ্মান।’
‘সেটা কীভাবে সম্ভব?’
উত্তরটা দেয় রাজারাম, ‘এই ধর আমি বললাম, কৌশিক, একবার বাইরে আয়। এবার আমার কাছে স্যারের ভয়েস আছে। আমি করলাম কি, ‘কৌশিক একবার বাইরে আয়’ কথাটাকে স্যারের ভয়েসের ওপর বসিয়ে দিলাম। আউটপুটে শোনা গেল স্যার বলছে ‘কৌশিক একবার বাইরে আয়।’
‘শিট।’
শিবাঙ্গী গালে হাত দিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে ভাবতে বলল, ‘একটা ছেলে, এত ট্যালেন্টেড! এত মানুষকে নিয়ে দুর্দান্ত একটা মার্ডার মিস্ট্রি সাজিয়ে ফেলল। কেন? সে কি আর কিছু করতে পারত না? এমন একটা উদ্ভট লক্ষ্য!’
‘মেন্টাল পেশেন্ট ছাড়া আর কিছুই নয়।’
কৌশিক মন্তব্য করল। স্বয়ম্ভূ বলল, ‘সেই। কোনও মানুষ আমাদের ধারণার বাইরে কোনও কাজ করলেই আমরা তাকে পাগল বলে চালিয়ে দিই। মেন্টাল! চলো সবাই, শুভঙ্কর স্যারকে বিমলের ভিডিওটা দেখাতে হবে। কৌশিক, ওই ভিডিওতে লাল্টু বলে একটা ছেলের গল্প আছে। ভালো করে শুনবে কিন্তু। বুঝতে পারবে, মেন্টাল কী জিনিস!’
***
সন্ধেবেলা পড়তে বসে হেঁচেই চলেছে লাল্টু। প্রায় পঁচিশ-তিরিশটা হাঁচি। থামার নাম নেই। নাক চুলকে লাল করে ফেলেছে বেচারি। ঝুনু এক বাটি পায়েস নিয়ে ঘরে ঢুকে আসে।
‘পই পই করে বললাম, নাকটা ঢেকে রাখ। গন্ধটা তো তাহলে যেত না নাকে। দ্যাখো দিকি।’
‘এই শরৎকাল কেন আসে ছোপ্পি?’
‘শোনো ছেলের কথা। তোর শিউলি ফুলে এলার্জি বলে কি শরৎকাল আসা বন্ধ করে দেবে? আর শরৎকাল না এলে তোর জন্মদিনটাও যে আসত না।’
‘ধুত। শীতকালে তো জন্মাতে পারতাম বা গরমকালে। কেন যে শরতে জন্মাতে গেলাম। হ্যাঁচ্চো।’
ভাইপোর কথা শুনে ঝুনু হেসেই মরে। ‘নে পায়েসটা ধর, খেয়ে ফেল। আমি জানলাগুলো বন্ধ করে দিই। তাহলে আর শিউলি ফুলের গন্ধ আসবে না।’ পায়েসের বাটিটা হাতে নিয়ে প্রাণভরে গন্ধ শুঁকল লাল্টু। ‘আআআআহ! কী সুন্দর গন্ধ রে ছোপ্পি!’ ঝুনু জানলা বন্ধ করে দিয়ে ভাইপোর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ‘আজ এগারো বছর হল তোর। বউদি আর দাদা থাকলে আরও কত কী করত!’
‘মা মোটেও এত সুন্দর পায়েস রাঁধতে পারত না।’
‘হয়েছে। এখন চটপট খা তো।’
‘হ্যাঁ, চটপট গিলে নে। পিসেমশাই যেন দেখতে না পায়।’
কথাটা কানে যেতেই ঝুনু আর লাল্টু চমকে উঠল। সন্ধের মধ্যেই প্ৰশান্ত বাড়ি ফিরবে এ অকল্পনীয়। ‘তুমি এই সময়? ভাটিখানা কি বন্ধ?’ প্রশান্ত এগিয়ে এল, ‘না গো গিন্নি, ভাটিখানায় মদের গন্ধ ছাপিয়ে তোমার হাতের পায়েসের গন্ধ পেলুম যে। আহ! কী সুবাস!’ অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল ঝুনুর বুক। ‘লাল্টু, যা রান্নাঘরে বসে খা। যা।’ লাল্টুও বিপদের আশঙ্কা করে পায়েসের বাটি হাতে ঘর ছাড়ল।
‘তুমি বোসো। চা নিয়ে আসছি।’
প্রশান্ত ঝুনুর হাত টেনে ধরল। ‘দাঁড়াও দাঁড়াও, গোবিন্দভোগের পয়সা পেলে কোত্থেকে? দুধের পয়সা? আজকাল রোজগার কোচ্চ বুঝি?’
‘রোজগার কেন করতে যাব? আমার ছিল। জমিয়ে রেখেছিলাম।’
‘কোত্থেকে জমিয়েছিলি? অ্যাঁ? কোত্থেকে জমালি বল? সেই তো আমারটা মেরেই জমিয়েছিস। তাই ভাবি, শাক ভাত আর ডাল ভাত ছাড়া আমার জোটে না কেন কিছু।’
‘বাজে কেন বকছ? অর্ধেক দিন কাজে যাও না। মাসের মাইনেটাও পুরো ঘরে আনো না। শাক ভাত, ডাল ভাত ছাড়া আর কী আশা কর।’
ঝুনুর কানের ওপর একটা থাপ্পড় পড়তেই কান চেপে দেয়ালের দিকে সরে গেল ঝুনু। ‘শালা হারামি মাগি। আমি পুরো মাইনে আনি না তাও তোর পেয়ারের ভাইপোর মুখে গোবিন্দভোগের পায়েস উঠছে অ্যাঁ?’ বাঘের থাবা পড়ার মতো ঝুনুর চুলের মুঠি খামচে ধরে প্রশান্ত। কোন ভাতারকে খাইয়ে পয়সা পাস? এইইইই…!’ সজোরে দেয়ালে মাথা ঠুকে দিতেই কোঁকিয়ে ওঠে ঝুনু।
‘গায়ে হাত তুলবে না বলে দিলাম।’
প্রশান্ত আরও দু-বার দেয়ালে মাথা ঠুকে দিয়ে হাঁটু দিয়ে তলপেটে মারল এক লাথি। যন্ত্রণায় চিৎকার করে কেঁদে উঠল ঝুনু। মাটিতে বসে পড়ল। বাইরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে লাল্টু। দু-চোখের নোনতা জল টুপটাপ ঝরল মিষ্টি পায়েসের বাটিটাতে। সেদিন ভাইপোকে আদর করে পায়েস খাওয়ানোর এক অভিনব শাস্তি পেল ঝুনু। প্রশান্ত ঝুনুর মুখে পেচ্ছাপ করে দিল। চুলের মুঠি ধরে হাঁ করিয়ে খাইয়েছিল। যেটুকু মাটিতে পরেছিল সেটুকুর ওপরও গায়ের জোরে ঝুনুর মুখটা ঘষে দিয়েছিল একাধিকবার। বাইরে দাঁড়িয়ে লাল্টু পায়েসের বাটির ওপরেই বমি করে ফেলেছিল।
সারারাত ঘেন্নায় বারবার গা গুলিয়ে গুলিয়ে উঠেছিল ঝুনুর। ততবারই ঘরের বাইরে গিয়ে হড়হড় করে বমি করেছিল। এক সময় দাওয়ার ওপর খুঁটি ধরে বসে কাঁদতে কাঁদতে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘ঠাকুর, তুলে নাও আমায়। আর পারছি না। মুক্তি দাও।’ ভক্তবাঞ্ছা ঘরের গোপাল শুনেছিল সেই আর্তি। রান্নাঘরে চাটাইয়ের ওপর চুপ করে বসে সারারাত ভেবেছিল লাল্টু। ছোপ্পিকে এই প্রথম কিছু চাইতে দেখল সে।
গোবিন্দভোগের রেশ পরেরদিন সকালেও ঝুনুকে রেহাই দেয়নি। স্নানের জল কেন তোলা হয়নি, এই ছুতোয় গরম খুন্তির ছ্যাঁকা পর্যন্ত খেয়েছে ঝুনু। পিসেমশাই বেরিয়ে যাবার পর ছোপ্পি যখন শৌচাগারের দরজা দিয়েছে লাল্টু তখন কাল রাতের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে মাঠে নেমেছে। দাওয়ার দিকে রান্নাঘরের একটা জানলা। সেই রান্নাঘরের ভিতর জানলার মাথায় একটা সিমেন্টের ঢালাই করে তাক বানানো। লাল্টু জানে, স্নান সেরে ছোপ্পি এই জানলার পাশ থেকেই বাটার মশলাগুলো নেবে। কিন্তু না, তাহলে ওর উদ্দেশ্য সফল হবে না। তাই বাটার মশলাগুলোকে ঠিক জানলার সামনেটায় এনে রাখল। যাতে ঝুনু মশলার কৌটো নিতে জানলার সামনেটাতেই দাঁড়ায়। এরপর ঘর থেকে একটা সুতো এনে ভারী নোড়ার গায়ে বেঁধে দিল। একটা টুলের ওপর চড়ে যেখানে মশলাগুলো আছে সেখানে দাঁড়ায়। নোড়াটাকে জানলার মাথায় সিমেন্টের ঢালাই করা তাকের ওপর অতি সাবধানে তুলে দেয়। সুতোটা ঝুলতে থাকে। নীচে নেমে সুতোটাকে জানলার কপাটের পাশ দিয়ে জানলার বাইরে বের করে দেয়। এবার শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ঝুনু বাথরুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে। লাল্টু জানলার পাশে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঝুনু আসে জানলার সামনে। অবাক হয়ে যায় মশলার কৌটোগুলোর স্থান পরিবর্তন দেখে। জানলার সামনে দাঁড়িয়েই চিন্তা করে। ওই কি এখানে রেখেছে? ভাবনা ফুরোয় না। বাইরের সুতোয় টান পড়তেই ভারী পাথরের নোড়াটা ঝপাৎ করে নীচের দিকে পড়ে। ভিতর থেকে ঝুনুর গলার শব্দ শোনা যায়। মরণ চিৎকার। রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। লাল্টু দেখে তখনও ঝুনু নড়ছে। ছুটে গিয়ে নোড়া থেকে সুতো কেটে নেয়। তারপর সেটাকে হাতে তুলে নিয়ে ছোপ্পির মাথায় ফেলে দেয়। ফ্যাচাত করে একটা শব্দের সঙ্গে সব শেষ হয়ে যায়। লাল্টুর পায়ে রক্ত ছিটকে এসে লেগেছে। হাতেও রক্তের দাগ। দৌড়ে কলতলায়। পায়ের নীচে রক্ত লাগেনি তাই মাটিতে ছাপও পড়ল না। ভালো করে হাত-পা ধুয়ে কলতলাটাও পরিষ্কার করে দেয়। রক্তের ফোঁটাও পড়ে রইল না। বাজারের ব্যাগ নিয়ে লাল্টু বেরিয়ে পড়ল বাজারে।
করিমচাচার দোকানের হেল্পার বছর বিশেকের সুকান্তর সঙ্গে লাল্টু বাজার করে বাড়ি ফিরতেই দেখে পিসেমশাই প্রশান্ত ভয়ার্ত মুখে টাল খেয়ে ঘরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছে। হাতে, কপালে রক্ত মাখা। দুটো হাত তুলে কাঁপতে কাঁপতে দু-পাশে মাথা নাড়ছে লাল্টুর পিসেমশাই।
‘এ কী! তোমার হাতে, কপালে রক্ত কেন?
চমকে উঠল প্রশান্ত। নিজের হাতদুটো দেখল।
‘না! না না, নাহ!’
লাল্টু দৌড়ে ভিতরে গেল। সেই ফাঁকে দৌড়ে পালাল লাল্টুর পিসেমশাই। সুকান্ত বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছিল সেই সুযোগে। হঠাৎ ভিতর থেকে লাল্টু চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘ছোপ্পিইইইইই… ছোপ্পিইইইইই…!’ সুকান্ত আর ঢুকল না। এক ছুট্টে কলাবাগান পার
পুলিশ এল। গাঁয়ের প্রতিটা লোক প্রশান্তকেই দোষী সাব্যস্ত করল। পুলিশ একবেলার মধ্যেই উদ্ধার করল প্রশান্তকে। একটা গোটা গাঁ যেখানে প্রশান্তের বিপক্ষে সেখানে তদন্তের আর প্রশ্নই আসে না। পুলিশও এ বাড়ির কাণ্ডকারখানা সম্পর্কে অবগত ছিল। তাই প্রশান্তেরই হাজতবাস নিশ্চিত হল।
ছোপ্পির ঘরেই দিনরাত একা কাটতে থাকল লাল্টুর। কখনও করিমচাচা, কখনও পাড়ার কাকিমারা রেঁধেবেড়ে দিয়ে যায়, খাবার কিনে দিয়ে যায়। বেশিদিন এমন গেল না। বসিরহাটে ইছামতীর পাড়ে সেট পড়ল ফিল্মের। শুটিং শুরু হল। লাল্টুও গেল শুটিং দেখতে। শুটিংয়ের লোকের কাছে গিয়ে কাজ চাইল লাল্টু। দু-তিনদিন এমন হবার পর নজর পড়ল সোমনাথের। সোমনাথ চৌধুরি। টুকটাক মেকআপ বক্স এগিয়ে দেওয়া, খাবার এনে দেওয়া, লোকেশন শিফট হলে সাজগোজের প্রপস বয়ে দেওয়া। সব কাজই করতে লাগল লাল্টু। লাল্টুর রোগা শরীরে ফর্সা আদুরে মুখখানা দেখে ধীরে ধীরে মায়া পড়ে গেল সোমনাথের। তার ওপর করিমচাচার কাছ থেকে লাল্টুর জীবনের কথা জেনে আরও যেন গলে গেলেন সোমনাথ।
***
‘সেই আমার প্রথম খুন। দিনটা ছিল রবিবার। ভাবলাম, আবার যখন ছোপ্পির মতো কোনও মেয়েকে কষ্টের হাত থেকে মুক্তি দেব তখন সেটা রবিবারেই করব। আমার জন্য এই বারটাই পয়া। দেখুন না, যতদিন রবিবারে খুন করেছি আপনারা আমার টিকিটাও ছুঁতে পারেননি। যেই অন্য বারে মানুষ মারলাম, ধরা পড়ে গেলাম।’
‘পুজোর সময়টাই বাছলি কেন?’
স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল।
‘পুজোর সময়েই তো শিউলি ফুল ফোটে। যা আমার জন্য বিষ। ভাগ্য ভালো শহরে আজকাল আর শিউলি গাছ দেখা যায় না। উফ! ভাবলেই নাক সুরসুর করে ওঠে।’
স্বয়ম্ভু বিস্মিত নয়নে নির্নিমেষ বিমলের দিকে চেয়ে আছে। বিমলও অবাক হয়ে স্বয়ম্ভুকে দেখে যাচ্ছে। কেউ কথা বলছে না। ভিডিওতে স্বয়ম্ভুর গলা শোনা গেল, ‘তুই কি জানিস যে তুই একটা বদ্ধ উন্মাদ। একটা পাগল!’
হো হো করে হেসে উঠল বিমল। প্রাণ খোলা হাসি তার। আসবাব শূন্য ইন্টারোগেশন রুমটার প্রতিটা দেয়ালে বিমলের হাসি ধাক্কা খেতে খেতে… খেতে খেতে ঘুরতে লাগল। স্বয়ম্ভুকে চমকে দিয়ে অকস্মাৎ হাসি থেমে গেল। বিমল বলল, ‘আইনস্টাইনকে পাগল বলা হত। গ্যালিলিওকেও পাগল বলেছিল। রামকৃষ্ণের নামই তো পাগল ঠাকুর। আমিও পাগল! ক্ষতি কী?
এরপর স্বয়ম্ভু আর কোনও কথা বলতে পারেনি। চেয়ার ছেড়ে উঠে ভিডিওটা অফ করে দিয়েছিল।
স্ক্রিন ব্ল্যাক। শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল নির্বাক। স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী, রাজারাম, কৌশিক সকলেই চুপ। নিস্তব্ধ কক্ষ। নীরবতা ভাঙল রাজারাম। বলে উঠল, ‘পি টি এস ডি-টাই বিমলকে ট্রিগার করেছে।
‘হোয়াট ইজ পি টি এস ডি?’
প্রশ্ন করল শুভঙ্কর।
‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার। ছোটোবেলায় ঘটে যাওয়া ভয়ংকর কিছু ঘটনা যা একটা মানুষকে স্বাভাবিক জীবন থেকে আলাদা করে দেয়। সে ভয় পেতে পারে, ঘৃণা করতে পারে, মানুষও মারতে পারে ওই ট্রমাটার জন্য। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় অডিটরি হ্যালুসিনেশন।’
‘সেটা আবার কী?’
এবার কৌশিকের প্রশ্ন। উত্তর দেয় শিবাঙ্গী, ‘আমির মধ্যে আরেকটা আমি। যে সম্পূর্ণ আমার থেকে আলাদা।’
‘সেটারই বা মানে কী?’
আবারও কৌশিকের অসহায় প্রশ্ন। রাজারাম বলল, ‘বিমলের মধ্যে একটা আলাদা বিমল আছে। যে কোনওরকমের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কথা শুনলেই খেপে ওঠে। বারবার ওকে ভিতর থেকে বলে ওঠে, অমুককে মেরে ফেলো। অমুককে সরিয়ে দে। এই সোসাইটিতে অমুক লোকটার দরকার নেই। তার কারণ ওর সেই পিটিএসডি।’
‘বুঝলাম।’
ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন শুভঙ্কর। ‘এক্সট্রিমলি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট।’
‘এক্সাক্টলি স্যার। সাইকোলজির ভাষায় এটা অ্যান্টি সোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার।’
রাজারাম বলল।
‘বাবা! তোমরা দুজন কি সাইকোলজির স্টুডেন্ট নাকি?’
লজ্জা পেল রাজারাম। শিবাঙ্গী হেসে বলল, ‘না স্যার, আসলে এই কেসটা চলাকালীন যে সময়ে রাজারামের কোনও কাজ থাকত না তখন আমাদের যিনি সাইকোলজিস্ট আছেন ডক্টর কৃত্তিকা চতুর্বেদী, ও ওনার সঙ্গে এই কেসের প্যাটার্ন নিয়ে ডিসকাস করেছে কয়েকবার। আর ওর কাছ থেকেই আমি জেনেছি।’
স্বয়ম্ভূ মুখে হাসি নিয়েই ঠোঁট ওল্টাল। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে শিবাঙ্গী আর রাজারাম। এক ঝলক দেখে নিল। রাজারাম বলল, ‘আমার বরাবরই সাইকোলজির প্রতি ইন্টারেস্ট আছে। তাই একটু কথা বললাম।’
‘খুব ভালো। আই অ্যাম ইম্প্রেসড। স্বয়ম্ভুউউউ…’
বলে সবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল, তার ওপর দিয়ে স্বয়ম্ভূ বলতে শুরু করল, ‘স্যার, মঞ্জুর বাড়িতে ফুটপ্রিন্ট, বাণীকণ্ঠ মুখার্জির বাড়ির দরজায়, বেসিনের কলে, বিটুর ভাড়া বাড়ির বেসিনের কলে, সব জায়গার ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিমলের সঙ্গে ম্যাচ করেছে। বিমল যে সাইকেল করে স্বর্ণশিখর এস্টেটে সিসিটিভির কানেকশন কাটতে গিয়েছিল সেটাও পাওয়া গেছে ওরই বাড়ি থেকে। মন্দাকিনীর সঙ্গে বিমলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কল রেকর্ডিংও আমরা পেয়েছি। যদিও বিমল সবটাই স্বীকার করেছে।
‘ওয়েল ডান স্বয়ম্ভু। মহালয়া থেকে অষ্টমীর মধ্যে এত ডিফিকাল্ট কেস সলভ করে শুধু আমারই নয়, গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সম্মান বাড়িয়েছ।’
‘ক্রেডিট গোজ টু শিবাঙ্গী বসু অ্যান্ড মাই টিম। শিবাঙ্গীর মাথাতেই প্ৰথম আসে ছুরি হাতে যদি ক্রাইম সিনের রিপিটেশন করানো যায় তাহলে হয়তো শালিকটা আসল কথাটা বলতে পারে। আর সেটাই হয়।’
শিবাঙ্গী একটু লজ্জাই পায়।
‘কারেক্ট। সেদিন কনফারেন্সে বলা আমার কথাগুলো উইথড্র করছি। ওয়েল ডান শিবাঙ্গী।’
‘থ্যাংক ইউ স্যার।’
‘তবে স্যার, ম্যান অফ দ্য ম্যাচ কিন্তু শালিক পাখিটা। ঠিক সময়ে ও যদি নামটা না বলত তাহলে কিছুই হত না।’
‘সত্যি। টিয়া কথা বলে জানতাম। শালিক পাখি কথা বলে!’
‘স্যার ইউটিউবে প্রচুর ভিডিও আছে। শালিক পাখির মেমরিও থাকে।’
‘তাই নাকি?’
স্বয়ম্ভুর টেবিলের ওপর খাঁচাবন্দি পাখিটাকে রাখা। চুপটি করে বসে আছে বিটকেল। হাঁক নেই ডাক নেই। খাঁচার সামনে আসতেই শিবাঙ্গীর মনে পড়ে মন্দার বলা শেষ কথাগুলো…
***
‘খুব রাগ হচ্ছে না, শালিক পাখিটার ওপর? ত
মন্দাকে জিজ্ঞেস করে শিবাঙ্গী। মাথাটাকে একদিকে হেলিয়ে মন্দা হাসে। ‘না না। রাগ কেন হবে? আসলে বিটকেলের দুনিয়ায় পাপ বলে কিছু নেই কো। মিথ্যে বলেও কিচ্ছু নেই কো।’
শিবাঙ্গী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মন্দা ডাকে, ‘শুনুন।’
‘বলো।’
‘বিটকেল যখন কৃষ্ণ রাধে কৃষ্ণ রাধে বলবে না, তখন ওকে খেতে দেবেন। আসলে আমিই গান গেয়ে গেয়ে ওকে খেতে দিতাম কিনা। ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে, তাকে মন দিতে যে চাই কেমন বাঁধে! খেতে দেবেন হ্যাঁ?’
দু-ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে মন্দার চোখ ঠেলে।
***
‘আচ্ছা, মন্দা কি জানত, শালিকের ইংরিজি নাম ম্যায়না?’
স্বয়ম্ভু প্রশ্নটা করল। কাকে? শিবাঙ্গী? রাজারাম নাকি কৌশিককে? জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছে স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী বলল, ‘খাবার দিয়েছি। তাও খাচ্ছে না।’
‘তোমার বাড়িতে তো হারমোনিয়াম আছে, গান-টান শিখেছ। গাও না দু-কলি। দেখো খায় কি না।’ স্বয়ম্ভু বলল।
শিবাঙ্গী গলা ঝাড়ল। মিনমিনে সুরে গাইতে শুরু করল, ‘ময়না বলো তুমি…!’ নীরব কিছুক্ষণ! শালিকটা তাকাল। কিন্তু কিচ্ছু বলল না। শিবাঙ্গী আবার গাইল, ‘ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে, তাকে মন দিতে যে চাই কেমন বাধে!’ পাখিটা গাইল না। আবার মুখটা ঘুরিয়ে নিল।
কেসটা কোর্টে উঠবে। কিন্তু শালিক পাখিটাকে তোলা যাবে না। আইনের আদালতে শালিকের কোনও মূল্য নেই। স্বয়ন্তু তার পরিচিত এক মানুষ, যিনি বনদপ্তরে কাজ করেন, তাঁকে ডেকে বিটকেলকে হ্যান্ডওভার করে। স্বয়ম্ভুর খুব ইচ্ছে করছিল শালিক পাখিটাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে। কিন্তু আইন সে অনুমতি দেয় না। তাই কাঠের খাঁচার মধ্যে করেই বিটকেল চলে গেল। স্বয়ম্ভু কথা বলতে চেষ্টা করল কিন্তু পাখিটা একটা কথাও বলল না। ওই টানা টানা চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভুর মনটা ভারী হয়ে গেল।
‘শালিক পাখিটা বোধহয় বোবা হয়ে গেল জানো। আর কোনওদিন কথা বলবে না। ওর হেসে খেলে বেড়ানোর বিশ্বাসের পৃথিবীটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
লালবাজারের বাইরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলল স্বয়ম্ভু। সারা আকাশ জুড়ে দশমীর আলো ঝলমল করছে। বুকে বিসর্জনের বাজনা
‘দিব্যময়কে পাখিটা দিলেন না কেন স্যার?’
প্রশ্ন করে শিবাঙ্গী।
‘পাখিটাকে কী করে বোঝাই বলো, যে ওটাই বাবু, বিমল নয়।’
শিবাঙ্গী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘বাড়ি যাবেন তো?’
‘যাব। তবে তার আগে একটু কাজ আছে।’
‘আবার কী কাজ?’
‘প্রকাশের মামার বাড়ি যাব।’
‘কেন স্যার? কিছু হয়েছে?’
উদ্বিগ্ন শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভূ আলতো হাসল। বলল, ‘না না হয়নি কিছুই। তবে খারাপ কিছু হওয়ার আগে শৈশবের খোঁজটা রাখতে চাই। যাতে আর একটাও বিমল না জন্মায়।’
‘আমি যাই আপনার সঙ্গে?’
স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর চোখে চোখ রাখে। বলে, ‘সারা কেসে দুজনে একসঙ্গে দৌড়োলে, খুনিকে ধরলে, সাইকোলজির ক্লাস করলে। আর কেস ফুরোতেই আবার আমার পেছু নেবে?’
স্যার এ সব কী বলছেন? কেন বলছেন? শিবাঙ্গী বাকরুদ্ধ। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর মন টের পায়। খোলসা করে, ‘দোতলায় রাজারাম কেমন একা দাঁড়িয়ে আছে দেখো। যাও, দুজন একসঙ্গে একটু কোথাও থেকে খেয়ে এসো। বেচারার বড়ো সাধ, তোমার খাবারের বিল দেওয়ার।’
শিবাঙ্গীর ভুরু গেল কুঁচকে। ‘বাবা রে বাবা! কী হিংসুটে আপনি!’
ঠিক ওই শালিক পাখিটার মতোই ঘাড় বেঁকিয়ে শিবাঙ্গীর দিকে তাকাল স্বয়ম্ভু। হাঁ করল কিছু বলার জন্য। আটকে গেল। একটা উষ্ণ বাতাস মুখগহ্বর থেকে ডানা মেলে বাইরে এসেই মিলিয়ে গেল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘শুভ বিজয়া।’ অতি দ্রুত পা চালিয়ে লালবাড়িটার চৌহদ্দি টপকে বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী জানে, স্বয়ম্ভু নিজের কাজে অফিসের গাড়ি ব্যবহার করে না।
‘স্যার কী বলে গেল রে?’
চমকে উঠল শিবাঙ্গী। পিছন ঘুরে দেখল রাজারাম কখন যেন চুপিচুপি দোতলা থেকে নেমে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
‘কী আর বলবে। বলল, আমাদের মন দিয়ে সাইকোলজির ক্লাসটা করতে।
‘অ্যাঁ?’
শিবাঙ্গী ফ্যাক করে হেসে ফেলল। সেই হাসির হাওয়া লাগল রাজারামের মুখেও। হঠাৎ করেই যেন আশপাশের পুজো প্যান্ডেলের মাইকটা যেন জোরে বেজে উঠল, ‘চল রাস্তায় সাজি ট্রামলাইন আর কবিতায় শুয়ে কাপ্লেট, আহা উত্তাপ কত সুন্দর তুই থার্মোমিটারে মাপলে…!’
***
