১০
কারখানা থেকে ফিরছিল প্রশান্ত। মাথাটা দপদপ করছিল। ম্যানেজারের এত চ্যাটাং চ্যাটাং কথা এক্কেবারেই সহ্য করতে পারে না প্রশান্ত। বেশ করেছে চারদিন বাদে কারখানায় গেছে। ওর জীবনের ওই মালিক। তাই বলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার হুমকি দেবে? আবার বলে কিনা এ মাসের মাইনে থেকে চারদিনের টাকা ও কাটবে। শীতেও সারা শরীর তেতে আছে প্রশান্তর। নিকুচি করেছে চাকরির। একটু দিশি তরল পেটে না ঢাললে মাথা ঠান্ডা হবে না। কিন্তু পথের মাঝে যে ইশকুলে মাস্টার প্রশান্তর গতিপথ ঘুরিয়ে দেবে কে জানত। তিনিও স্কুলের শেষে বাড়িই ফিরছিলেন। রাস্তায় প্রশান্তকে ধরে লাল্টুর নামে খামোকা একগুচ্ছ প্রশংসা করলেন। আজ নাকি ইশকুলের মাঠে খেলার প্রতিযোগিতা ছিল। সেখানে দৌড়ে, অঙ্ক রেসে আর লং জাম্পে ফার্স্ট হয়েছে লাল্টু। একটুর জন্য ফ্রগ রেসে সেকেন্ড হয়ে গেছে বেচারি। ফ্রগ রেস শুনেই প্রশান্তর মুখে কষ্ট করে আনা হাসিটা কীরকম যেন বেঁকে গেল। যাই হোক, সেকেন্ড হয়েছে এটাই আসল কথা সে যেখানেই হোক না কেন। এই অবধি ঠিকই ছিল। কিন্তু শেষে ইশকুলের মাস্টারটা লাল্টুর শারীরিক অবস্থা নিয়ে দুমদাম করে খানকতক জ্ঞান ঝেড়ে দিলেন। লাল্টুকে বেশি করে ফল, পেট ভরে ভাত খাওয়াতে হবে। দিন দিন নাকি রোগা হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। বাড়িতে কি ঠিক করে খায় না?
‘আজ্ঞে, খায় তো। পেট ভরে চারবেলা গে… খায়।’
‘অ।’
মাস্টারমশাই বেশ চিন্তিত। ‘ফল-টল খায়?’
‘ওই এর-তার গাছের ফল চুরি করে দিব্যি খায়।
‘আরে না না। ওভাবে কি পুষ্টি হয় নাকি? দাঁড়াও…’
বলেই নিজের পকেট থেকে ক’টা টাকা বের করে প্রশান্তের হাতে গুঁজে দিতে গেলে প্রশান্ত নিতে চায় না।
‘আরে রাখো রাখো। ফলের যা দাম। এ দিয়ে ছেলেটাকে একটু ভালোমন্দ খাইয়ো। আরে ও আমাদের ইশকুলের গর্ব।
ব্যাপারটা অপমানে লাগলেও টাকাটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিল প্রশান্ত। তবে আর ভাটিখানা গেল না। সোজা বাড়ি। টাকাটা ওর কোচরেই গোঁজা রইল। লাল্টু বন্ধুদের সঙ্গে খেলে ধুলোমেখে বাড়ি ফিরল। গলায় ঝুলছে চারটে চকচকে মেডেল। ঝুনু তো আহ্লাদে আটখানা। কিন্তু প্রশান্তর নজর অন্য জায়গায় আটকেছে। লাল্টুর ইশকুলের পোশাকে। এমনিতে সাদা জামা আর নীল প্যান্ট ইশকুলের পোশাক। কিন্তু আজ লাল্টুর গায়ে সাদা জামা, সাদা প্যান্ট। পায়ে আবার ইশকুলের কালো জুতোর বদলে সাদা জুতো। ঝুনু রান্নাঘরে চুলোতে আগুন ধরাচ্ছিল। রাতের রান্না চাপাতে হবে।
‘লাল্টুর এইসব জামা, প্যান্ট, জুতো কোত্থেকে এল?’
মাটির উনুনের ভিতরটা তখন সবে তেতে উঠেছে। কাঠগুলো জ্বলছে। ঝুনু বলল, ‘কোত্থেকে আসবে? ইশকুল থেকেই দিয়েছে।’
‘ইশকুল থেকে দিয়েছে? জামা, প্যান্ট, জুতো সব?’
জলভর্তি হাঁড়িটা উনুনের ওপর চাপিয়ে দিল ঝুনু। ‘না সব কেন হবে? বলছি কি রাতে আলু ফুলকপি ভাজা আর চারা মাছের ঝাল করছি। বেণুদের পুকুরে আজ জাল ফেলেছিল। কী সুন্দর মাছগুলো…!’
‘কোনগুলো ইশকুল থেকে দিয়েছে?’
প্রশান্তর প্রশ্নটা ঝুনুর কথাগুলোকে মাড়িয়ে চলে গেল।
‘জামা-প্যান্ট। আর জুতোটা বড়দি টাকা পাঠিয়েছিল লাল্টুর জন্য। ওটা দিয়েই কিনেছি।’
‘বাহ! ভালো ভালো। ইসসস! তোমার হাতটা কীরকম যেন খালি খালি লাগছে। সোনার নোয়াটা কোথায় খুললে আবার?’
প্রশান্তর গলায় অতিরিক্ত নরম স্বর। ওদিকে ভাতের জল উষ্ণ হয়ে উঠছে। ঝুনু হাতটাকে নিজের বুকের কাছে লুকিয়ে বলে, ‘কোথায় খালি দেখছ? এই তো শাঁখা পলা পরে আছি।’
‘সোনার নোয়াটা কই?’
‘হাতটা বড়ো চুলকোচ্ছিল। তাই খুলে রেখেছি।
কথাটা শেষ হতেই ঝুনুর মুখখানা উত্তপ্ত অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ির ওপর ঠুকে দিল প্রশান্ত। ভিতরের জল চলকে ঝুনুর মুখে চলকে গড়িয়ে পড়ল। মুখের নরম চামড়ায় গরম জল পড়াতে চিৎকার করে উঠল ঝুনু। ঘরে জামাকাপড় ছেড়ে বই গোছাচ্ছিল লাল্টু। ছোপ্পির গলার শব্দ পেয়েই দৌড়ে রান্নাঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। প্রশান্ত ততক্ষণে উনুনের মধ্যে থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠ বের করে ঝুনুর দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে। ঝুনু পিছন ফিরে মুখে ঘটি থেকে ঠান্ডা জল ঢালছে। লাল্টু দেখে পিসেমশাই এগিয়ে যাচ্ছে তার ছোটো পিসির দিকে। লাল্টু চিৎকার করে ওঠে, ‘ছোপ্পিইইইই…!’ চমকে ঘুরে তাকাতেই আঁতকে আরও তিন পা পিছিয়ে যায় ঝুনু। চিৎকার করে বলে, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে। ফেলে দাও কাঠটা।’
‘মাথা খারাপের দেখেছিসটা কি হারামজাদি? আজ দেখবি। তোকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেব। শালি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবি?’
দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পাশে সরতে সরতে জলের কলসিটা খেয়াল ছিল না। ঝুনুর পা লেগে উলটে যায়। লাল্টু চিৎকার করে বলে, ‘ছেড়ে দাও ছোপ্পিকে। এরকম কোরো না পিসেমশাই।
‘চোপ শালা বেজন্মার বাচ্চা। রেসে ফাস্ট হবি না? আমার পকেট খালি করে নতুন জামা, প্যান্ট জুতো সব পরবি তাই না? আজ তোর সামনে তোর পিসিকে জ্বালিয়ে মারব। দ্যাখ।’
কথাটা শেষ করেই ওই জ্বলন্ত কাঠ দিয়ে ঝুনুর কাঁধের ওপর সপাটে মারে। কিছু স্ফুলিঙ্গ সমেত পোড়া কাঠের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে। ভীষণ আতঙ্কে ঝুনু পাগলের মতো গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকা ফুলকিগুলো ঝাড়তে থাকে। লাল্টু কাঁদছে হাউহাউ করে। প্রশান্ত আবার চ্যালা কাঠটা ঝুনুর ওপর চালায়। কিন্তু ঠিক সময় সরে যেতে ওর গায়ে লাগে না। রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে উঠোনে চলে আসে। সঙ্গে লাল্টুকেও সরিয়ে আনে। ‘আমি চিৎকার করব বলে দিলাম। তোমার অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি। কাঠটা ফেলে দাও।’ প্রশান্ত আরও খেপে যায়। হাওয়ায় কাঠের আগুন নিভে গেলেও স্ফুলিঙ্গ লেগে থাকে। সেই উত্তপ্ত কাঠটা দিয়েই দু-তিন ঘা ঝুনুর পিঠে, গায়ে মারে। ঝুনু যা কোনওদিন করেনি, সেটা আজ করে। পরিত্রাহি চিৎকার করে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে। সন্ধের হিমধোয়া আঁধার কেঁপে ওঠে চিৎকারে। ততক্ষণে আরও ঘা- কতক পড়ে গেছে ঝুনুর শরীরে। পিঠ পুড়ে গেছে। হাতে আর গলাতেও টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। লাল্টুও গলায় যত জোর আছে চিৎকার করে সব পাড়ার লোক জড়ো করে। কিছু লোক তো প্রশান্তকে এই মারে কি সেই মারে। ঝুনুর ক্ষমতা নেই তাঁদের হাত থেকে প্রশান্তকে বাঁচানোর। বয়স্ক পুরুষেরা বলাবলি শুরু করল, এটা খুন করার চেষ্টা। পুলিশকে এখুনি ডাকা হোক। মহিলারা টিউবওয়েল থেকে জল ধরে অঘ্রাণের ঠান্ডার মধ্যে ঝুনুর পোড়া জায়গাগুলোর ওপর ঢালতে থাকে। পুলিশও আসে। প্রশান্তর মুখ শুকিয়ে একটুখানি হয়ে যায়। কিন্তু প্রশান্তকে নিয়ে যেতে পারে না। প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঝুনু স্বয়ং। পুলিশ রেগে যায় ওঁদের সময় নষ্ট করার জন্য। তার চেয়েও বেশি রেগে যায় লাল্টু। উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। শীতের সন্ধেতে ছেলেটা গায়ে কোনও শীতবস্ত্র চাপানোর সুযোগ পায়নি। ঘর থেকে পড়শি মহিলা একটা চাদর এনে লাল্টুকে মুড়ে দিল। কিন্তু লাল্টুর কাঁপুনি কমল না। সে রাতের হিমও ভয়ে পেল লাল্টুর কাঁপুনি দেখে।
***
‘মে আই কাম ইন স্যার?’
জয়েন্ট সিপি শুভঙ্কর কাঞ্জিলালের ঘরে উঁকি দিল স্বয়ম্ভু।
‘হ্যাঁ প্লিজ। আসুন আসুন।’
শুভঙ্কর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। উত্তর দেবার ঢঙেই স্বয়ম্ভু বুঝে গেছে এই মুহূর্তে তাকে কী ঝেলতে হবে। স্বয়ম্ভু এসে দাঁড়িয়ে স্যালুট করতেই বেশ নাটকীয়ভাবে শুভঙ্কর নিজের চেয়ার দেখিয়ে বলে ওঠেন, ‘স্যার আপনি এখানে বসুন, আসুন। প্লিজ।’
‘ছি ছি স্যার, আমি কেন আপনার চেয়ারে বসব?’
‘একশোবার বসবে। হাজারবার বসবে। এত বড়ো বড়ো ডিসিশন তুমি নিজেই নিচ্ছ। আমাদের কাউকে জানাবার প্রয়োজন মনে করছ না। ইউ থিঙ্ক এনি ওয়ান এলস ডিজার্ভস দ্যাট চেয়ার? ডোন্ট কিড ইয়োরসেলফ স্বয়ম্ভু! ইউ আর দ্য অনলি রাইটফুল ওয়ান ফর দ্য জয়েন্ট সিপি’স পোস্ট। নো ওয়ান এলস!’
‘স্যার গুলিটা না চালালে আমি আর এখানে থাকতাম না স্যার।’
‘আর গুলি মারো তোমার গুলিকে। এই কেসে শুরু থেকে পুলিশ ডিপার্টমেন্ট শুধু গুগলিই খেয়ে যাচ্ছে। একটা সলিড লিড নেই। যাও বা মিলল সেটাও … তা ছাড়া তুমি তো এখন নিজেই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছ আর ধড়াদ্ধর ফেল করছ। এসিপি ডিসিপি সকলের সামনে অবলীলায় মিথ্যে বলে যাচ্ছ। লুকিয়ে যাচ্ছ কী স্টেপ নিচ্ছ। তার ফলাফল কী? না অপরাধী এখনও অদৃশ্য। কারণ, আমাদের গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু তাকে মনের আনন্দে ছেড়ে রেখেছে। এদিকে তার ফোনেই খুনের লোকেশন আসছে। কিন্তু গিয়ে দেখা যাচ্ছে ওখানে সেই লোকটিই নেই।
স্বয়ম্ভু এতক্ষণে বুঝল ঠিক কোন কারণে শুভঙ্কর তার ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। ‘কেন লুকিয়েছ স্বয়ম্ভু? আমাদের কেন বলোনি যে তুমি কোনও পুলিশ পোস্টিংই দাওনি বিট্টুকে ধরার জন্য?’
‘আগের কেসগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছি স্যার।’
‘মানে? তুমি তোমার ডিপার্টমেন্টকেই বিশ্বাস করছ না?’
‘ডিপার্টমেন্ট শব্দটা অনেক বড়ো স্যার। এই মুহূর্ত থেকে আমি আমার টিমকেও বিশ্বাস করতে পারব না।
‘কেন?’
‘ঠিক যে কারণে আপনাকে এ বিষয়ে কিছু না বলা সত্ত্বেও আপনি জেনে গেছেন, সেই কারণে।’
শুভঙ্কর থমকে গেলেন। এই হয়েছে এক ঝামেলা। স্বয়ম্ভুর সঙ্গে কথা বলতে বসলে চোখের দিকে তাকিয়ে এমন কিছু বলে যায় যে পালটা আর কিছু বলার জায়গা থাকে না। শ্লেষ্মা না জড়ালেও গলাটা ঝাঁকিয়ে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন শুভঙ্কর। হুকুম ছুড়লেন, ‘আজ চতুর্থী। যেভাবে হোক, ষষ্ঠীর আগে বিট্টুকে চাই।’
‘চেষ্টা করেই চলেছি স্যার।’
‘যে মারা গেছে তার পরিচয় জানা গেছে?’
‘হ্যাঁ স্যার। আয়ুষ্মান মণ্ডল। কিন্তু হয়তো সে এইসব কাজগুলো ধৃতিমান ছদ্মনামে করত। কারণ ওর ইন্টারনেট ডিভাইজ অ্যান্ড ল্যাপটপটা ধৃতিমান মণ্ডল নামে সেভ করা।’
‘কী করত?’
‘ছেলেটি নেটওয়ার্ক হ্যাকিং, সিম ক্লোনিং ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধহস্ত। এত কম বয়সে কীভাবে যে এ সব শিখল!’
‘ওয়েট ওয়েট স্বয়ম্ভু।’
কী যেন একটা মনে পড়ে যায় শুভঙ্করের। ‘ধৃতিমান মণ্ডল! এই নামটা…..!’
‘চেনেন স্যার?’
‘আই থিংক আই অ্যাম সাসপেক্টিং দ্য রাইট পার্সেন।’
‘কে স্যার?’
‘বছর দশেক আগে আমাদের সাইবার সেলে একটি লোক কাজ করত। ওর নাম ছিল ধৃতিমান মণ্ডল। দুনিয়া যখন অনেকটাই পিছিয়ে আছে তখন ধৃতিমান সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিল। ওর কাছে সাইবার ক্রাইমের সলিউশন করা কোনও ব্যাপারই ছিল না।’
‘তিনি কোথায়?’
‘একটা বিশেষ ঘটনায় ধৃতিমানকে প্রথমে সাসপেন্ড ও পরে স্যাক করা হয়। ওর একটা ছেলে ছিল। আই থিঙ্ক, আয়ুষ্মান ধৃতিমানেরই ছেলে।
‘কী ঘটেছিল স্যার?’
‘ব্ল্যাক না হোয়াইট।’
একটি আইসক্রিম, কোল্ডড্রিংক্সের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রাজারাম প্রশ্ন করল শিবাঙ্গীকে।
‘আমার গুলিতে একটা সাক্ষীর প্রাণ চলে গেছে। আর তুই আমার ব্ল্যাক না হোয়াইট খাওয়াতে নিয়ে এসেছিস?’
‘ব্ল্যাক না হোয়াইট?’
রাজারাম নাছোড়। কোনও কথাই তার কানে ঢুকছে না।
‘রাজারাম প্লিজ। ডোন্ট অ্যাক্ট লাইক আ চাইল্ড।’
‘প্রদ্যুৎ, বিজয় দুজনে মিলে ওই ল্যাপটপের নাড়িভুঁড়ি বের করছে। দাদা, দুটো থামস আপ।’
‘আমি সাদা।’
রাজারাম কথা শুনবে না। তাই নিজের পছন্দটা বলেই ফেলল শিবাঙ্গী। রাজারাম দোকানদারকে একটা থামস আপ আরেকটা লিমকা দিতে বলল।
‘আমার জন্য স্যারকে না জানি আর কী কী ঝেলতে হবে।’
বিড়বিড় করল শিবাঙ্গী। রাজারাম শিবাঙ্গীর দিকে চেয়ে আলতো হাসল। বলল, ‘তোর মতো করে কেউই স্বয়ম্ভু সেনকে বোঝে না। নইলে আমিই তো স্যারের সঙ্গে ছিলাম। আমি তো কিছুই আন্দাজ করলাম না। অথচ তুই কেমন হা দেখেই হাওড়া বুঝে গেলি।’ শিবাঙ্গীর প্রশংসার আড়ালে রাজারামের গলায় আপশোসের সুর। দোকানদার সাদা-কালো বাড়িয়ে দিতেই দুজনে ধরে নিল। শিবাঙ্গী বলল, ‘এতে কৃতিত্বের কিচ্ছু নেই। তোর তো বেশিদিন হয়নি। ক’দিন ওর সঙ্গে থাকলেই সবকিছু বুঝে যাবি।’ শিবাঙ্গীর মুখে ‘ও’ সম্বোধনটা রাজারামকে কিঞ্চিৎ হলেও চমকে দিল। শিবাঙ্গী দেখল অদ্ভুত চোখে রাজারাম ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
‘কী?’
লিমকায় চুমুক দিয়ে প্রশ্ন করল শিবাঙ্গী। রাজারাম দু-পাশে মাথা নাড়ল। সেও দুটো চুমুক মেরে বলল, ‘আমরা যাঁদের সঙ্গে বেশিক্ষণ সময় থাকি তারাই কেমন
যেন আমাদের আপনজন হয়ে যায়, না রে? সম্বোধনগুলোও খুব কাছের মানুষের মতো হয়ে যায়।’ এবার লিমকার ঝাঁঝটা হঠাৎ করেই যেন একটু বেশিই মনে হল শিবাঙ্গীর। বাঁ হাত দিয়ে ঠোঁটের ওপর লেগে থাকা পানীয়টুকু মুছে শিবাঙ্গী বলল, ‘ঠিক বলেছিস। এই যেমন রাজারাম আমার কাছে তুমি থেকে তুই হয়ে গেছে।’ লিমকায় ঠোঁট ডোবালেও চোখ কিন্তু রাজারামের দিকে। যাকে বলল সে ঘাড় নাচিয়ে হাসল।
জয়েন্ট সিপির ঘর থেকে বেরোতেই কৌশিককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হল স্বয়ম্ভু। এভাবে যে মুখোমুখি হয়ে যাবে কৌশিকও বোধকরি আশা করেনি।
‘কী ব্যাপার তুমি? সিপির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কী শুনছিলে?’
‘না না স্যার, কিছু শুনিনি। আসলে টেনশন হচ্ছিল খুব।’
‘তাই নাকি? তা কী বিষয়ে?’
‘স্যার যেভাবে আপনাকে ডেকে পাঠালেন তাতে…’
‘ভাবলে বুঝি চাকরিটাই চলে গেল।’
কৌশিকের মুখ থেকে কথা কেড়ে স্বয়ম্ভু কথাটা বলাতে এক হাত জিভ কাটল কৌশিক। ‘এ বাবা! না না স্যার। আসলে আমাদের কিছু অকর্মণ্যতার দায় তো সবসময় আপনাকেই নিতে হয়। তাই লজ্জা করে। আমাদের হাতে অনেক ক্ষমতা। কিন্তু সেই ক্ষমতা কোথায় কীভাবে ব্যবহার করব সেই সেন্সটা সবার মধ্যে তো থাকে না।’ স্বয়ম্ভুর চোখের কোণ কুঁচকে এল। একটা মায়া আয়না যেন ভেসে উঠল তার দুটো চকচকে অক্ষিতারায়। যে আয়নায় সবকিছু স্বচ্ছতার সঙ্গে ধরা পড়ে যায়। কে কার সম্পর্কে কী কথা বলার চেষ্টা করছে সবকিছু বুঝে ফেলে স্বয়ম্ভু। ‘ঠিক বলেছ।’ স্বয়ম্ভু বলল, ‘শুধু অকর্মণ্যতা নয়, বিশ্বাসঘাতকতার দায়টাও আমাকেই মাথা পেতে নিতে হয়। তাই এবার থেকে ভেবেছি সবাইকে বিশ্বাস করব না।’ সামনের করিডর ধরে হাঁটতে শুরু করল স্বয়ম্ভু। পাশে পাশে চলল কৌশিক। ‘এ কথা কেন বললেন স্যার? এরকম কিছু কি ঘটেছে?’
‘কিছু না এমনি। শিবাঙ্গী কোথায়?’
‘ওই তো রাজারামের সঙ্গে বেরোল।’
স্বয়ম্ভুর হাঁটার গতি কিঞ্চিৎ শ্লথ হল যেন। কৌশিক বলে উঠল, ‘না,
‘না, শিবাঙ্গী মনমরা হয়ে বসেছিল বলে রাজারাম হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে কোথায় যেন নিয়ে গেল।’ স্বয়ম্ভু থামল। কী যেন ভাবল। তারপর ফিক করে হেসে বলল, ‘আচ্ছা কৌশিক, তুমি বাড়িতে গিয়ে রাতে সিরিয়ালগুলোর রিপিট টেলিকাস্ট দেখো?’
‘হ্যাঁ স্যার, দেখি।’
বেশ উত্তেজিত হয়ে নিতান্ত সর্বজ্ঞানসম্পন্ন ছাত্রের মতো উত্তর দেয় কৌশিক। ‘কেন স্যার?’ কৌশিকের চোখে চোখ রেখে স্বয়ম্ভু বলল, ‘না! এমনি বললাম। ব্লু পেলাম কিনা!’ কৌশিককে স্তম্ভিত ও বিস্মিত করে যে গতিতে স্বয়ম্ভূ হেঁটে গেল তাকে ধরার মতো ক্ষমতা কৌশিকের নেই।
সাইবার সেলে হানা দিতেই প্রদ্যুৎ আর বিজয় একসঙ্গে কলকলিয়ে উঠল। স্বয়ম্ভুর মুখের ভাব দেখে দুজনেই চুপ করে গেল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘আগে ল্যাপটপ থেকে কী পেলে সেটা বলো।’ প্রদ্যুৎ বলতে শুরু করে। ‘এই ছেলেটি নেটওয়ার্ক হ্যাকিং আর সিম ক্লোনিংয়ে মাস্টার। আমরা লালবাজারে বসে যে সিস্টেম ইউজ করি সেটা ওর ল্যাপটপে!’ প্রদ্যুতের মুখে আশ্চর্য অভিব্যক্তি দেখে স্বয়ম্ভু বলে, ‘সেটাই স্বাভাবিক। ছেলেটি আমাদের ঘরের লোক।’
‘মানে?’
‘পরে বলছি। বাকিটা বলো।’
‘স্যার, রিসেন্ট ফাইল ও রিসেন্ট অ্যাপ্লিকেশনগুলো থেকে স্ক্রিপ্ট ও কনফিগ ফাইল উদ্ধার করেছি। যেখানে কাস্টম কনফিগারেশন বা নেটওয়ার্ক লিস্ট পেয়েছি।’
‘একসঙ্গে অনেকগুলো ডিভাইজ কানেক্টিভিটি পাওয়া গেছে নিশ্চয়ই?’
‘পাঁচটা। তবে একটিমাত্র ডিভাইজ কাজে লাগিয়েছিল।’
‘খিদিরপুরের ওই মেয়েটার ডিভাইজ।’
‘ইয়েস স্যার। একটা ছাড়া বাকি সবকটা ডিসকানেক্টেট। কানেক্ট করার চেষ্টা করেও কিছু করতে পারিনি।’
‘কটা পর্যন্ত কানেক্টেড ছিল বাকিগুলো?’
‘বেলা সাড়ে বারোটা পর্যন্ত।’
‘হুম। তার মানে আয়ুষ্মানের ধরা পড়ার খবর আসল লোকের কাছে পৌঁছে গেছে। খিদিরপুরের খোঁজ পুলিশ পেয়ে গেছে। তাই ওটা অফ করে লাভ নেই। বাকিগুলো অফ করে দিয়েছে। কিন্তু কী করে পেল খবরটা?’
একটা বড়ো প্রশ্ন চিহ্ন স্বয়ম্ভুর মুখের সামনে। উত্তর পেন্ডিং রেখেই প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু, ‘ফরেন্সিক টিম যে হার্ডওয়্যার, পেরিফেরাল ডিভাইজগুলো পেয়েছে সেগুলো দেখেছ?’ এবার বিজয় বলল, ‘সিম কার্ড রিডার থেকে একটা সিম পাওয়া গেছে স্যার। যে সিমে বিট্টুর নম্বর।’
‘হোয়াট? বিট্টুর নম্বর?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
স্বয়ম্ভু চোখ বন্ধ করল। আয়ুষ্মানের মুখটা মনে করার চেষ্টা করল। সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করল বিট্টুর ভোটার কার্ডের ছবির সঙ্গে। যদিও এটা খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা। তাও। নাহ! মিলছে না। আসলে মেলানোটাই সম্ভব নয়। শিবাঙ্গীকে কল করতে গিয়েও থেমে গেল স্বয়ম্ভু। হোয়াটসঅ্যাপ করল, ‘হাওয়া খাওয়া হয়ে গেলে সাইবার সেল। আর্জেন্ট!’
কোল্ড ড্রিংক্সের দোকানে কে টাকা দেবে সেই নিয়ে রাজারামের সঙ্গে কথা টানাটানি চলছিল। সেই সময় স্বয়ম্ভুর মেসেজ ঢোকে।
‘এই দাঁড়া রাজারাম, আমি দেব। দাদা নেবেন না ওর কাছ থেকে। ‘তুই আগে স্যারের হোয়াটসঅ্যাপটা দেখ।’
শিবাঙ্গী পকেট থেকে মোবাইল বের করতে গিয়ে বিস্মিত হল, ‘তুই কী করে জানলি, এটা স্যার।’ ঠোঁট বেঁকিয়ে রহস্য করে হাসল রাজারাম। ‘অ্যাসাইনটোনটা অন্য রকম লাগল কিনা তাই।’ লজ্জায় পড়ল শিবাঙ্গী। রাজারাম এটা কখন খেয়াল করল যে অন্যান্য টোনের থেকে এটা আলাদা! মেসেজটা পড়েই কেমন যেন খটকা লাগল। ‘হাওয়া খাওয়া হয়ে গেলে…!’ নির্ঘাত কৌশিক! সুযোগ পেয়েই কান ভাঙিয়েছে। রাজারাম টাকাটা মিটিয়ে দিল।
‘স্যার ডাকছেন। চ।’
‘তোকে ডাকছেন। তুই যা।’
‘ওকে।’
শিবাঙ্গী দৌড়োল। রাজারাম চেয়ে রইল। হাসি পেল তার। কিন্তু কেন? শিবাঙ্গীর চলে যাওয়ার সঙ্গে পাশের চায়ের দোকান থেকে গানটা ভেসে আসা গানটা মিলে গেল বলে? ‘যখন ডাকল বাঁশি তখন রাধা যাবে যমুনায়।
‘আয়ুষ্মানের মোবাইল নেটওয়ার্ক ট্র্যাক করে বলো লাস্ট তিনচারদিনে এই মোবাইল কোন কোন জায়গা ট্র্যাভেল করেছে। স্পেশালি তার মধ্যে কটা বাজার এলাকা পড়ছে।’
বিজয় বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল। শিবাঙ্গী সাইবার ডিপার্টমেন্টে ঢুকতেই স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন ছুটে যায় তার দিকে, ‘তুমি তো বিট্টুকে দেখেছ আবার কাল আয়ুষ্মানকেও দেখলে। দুজনের মুখের মধ্যে বা চেহারার কোনও মিল পেলে?’ শিবাঙ্গী ভাবনায়
পড়ল। মহালয়ার ভোরে ফুলের বাজারে সম্মুখ সমরের দৃশ্যগুলো একবার তার স্মৃতিপটে জারিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। ‘উমম না স্যার। মুখের মিল তো নেই-ই। বিট্টু শ্যামলা। আয়ুষ্মান একটু পরিষ্কার। দুজনেই রোগা। তবে বিট্টুর বেশ শক্তপোক্ত চেহারা। স্পোর্টস ম্যানদের মতো। কিন্তু আয়ুষ্মান তো… না না স্যার, আমার তো এক
লাগছে না। কেন বলুন তো? আপনার এক মনে হচ্ছে?’
‘আয়ুষ্মানের কাছে একটা সিম পাওয়া গেছে যেখানে বিট্টুর নম্বর। অর্থাৎ বিট্টুর নম্বর ক্লোন করে এই সিমেও রেখেছে। তাই বিট্টুর কাছে যা যা মেসেজ আসছিল তা আয়ুষ্মানের কাছেও আসছিল। যেহেতু আয়ুষ্মানের কাছে খিদিরপুর অঞ্চলের পাঁচটি ডিভাইজ হ্যাক করা ছিল তাই আমাদের মিসগাইড করার জন্য তার মধ্যে একটি ডিভাইজের পাথের সঙ্গে এই ক্লোনড সিমকার্ডটির পাথ কানেক্ট করে দিয়েছে। তাই বিট্টুর ফোন নম্বরের লোকেশন আমাদের কাছে শো করেছে খিদিরপুর ডক ‘
‘বাপ রে বাপ! এ তো সাংঘাতিক মাস্টার প্ল্যান।’
শিবাঙ্গী বাকরুদ্ধ।
‘শুধু তাই নয়, আয়ুষ্মানের ক্ষমতাটা ভাবো একবার। যদিও বাপ কা বেটা, সিপাহি কা ঘোড়া। কুছ নেহি তো থোড়া থোড়া।’
‘মানে?’
‘আজ থেকে দশ বছর আগে একজন আমাদের সাইবার ডিপার্টমেন্টে কাজ করত। তুখোড় বুদ্ধি, অসামান্য প্রজ্ঞা। যে কোনও সাইবার ক্রাইম নিমেষে সলভ করে দেবার ক্ষমতা রাখত সে। দশ বছর আগেই একটা কেস হয়েছিল। মেয়েদের মোবাইলে কেউ একজন একই অশ্লীল ছবি সমেত এম এম এস পাঠাতে থাকে। কলকাতার প্রায় বাইশটা থানায় একই অভিযোগ জমা পড়ার পর কেসটা লালবাজারের হাতে আসে।’
‘ধৃতিমান!’
কাজ করতে করতে সুকুমারদা হঠাৎ নামটা বলে ওঠেন। স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী ঘুরে তাকায়।
‘আপনি চিনতেন সুকুমারদা?’
‘চিনতাম কী বলছ? এই তো আমার পাশেই বসত ধৃতি। ওর বিয়েতেও গেছি। ওর ছেলে হল। অন্নপ্রাশনে নিমন্ত্রণ করল। কিন্তু হঠাৎ কী থেকে যে কী হয়ে গেল। কেসটা ধৃতির কাছে এল। মাত্র দুটো দিন লেগেছিল ওর কেসটা সলভ করতে। প্রায় করেও ফেলেছিল। কিন্তু হঠাৎ ও এমন একটা কিছু পেল যে দুম করে চুপসে গেল। পুলিশ কেসের শেষ সীমায় পৌঁছেও পিছিয়ে আসতে থাকল। আবার নতুন করে সব ঘেঁটে গেল। ধৃতি বা ধৃতি কেন আমরাও, যা যা পাই সব তো নোট ডাউন করে রাখি কারণ এত আই পি অ্যাড্রেস, ভিপিএন মাথায় তো রাখা সম্ভব নয়। ধৃতিও রাখত। কেসটার যখন কোনও থৈ পাওয়া যাচ্ছে না তখন খোঁজ পড়ল ওই নোট ডাউন করা খাতাটার।’
‘খাতা? টাইপ করে রাখতেন না?’
শিবাঙ্গীর প্রশ্ন।
‘ধৃতি পুরনোপন্থী ছিল। আমরা যখন মোবাইলে নম্বর সেভ করতাম, ও তখনও ডায়েরি মেইনটেইন করত। তা সেই খাতাটা আর পাওয়া যায় না। ধৃতিমান তার কাজের খাতা হারিয়ে ফেলেছে এটা কেউ বিশ্বাস করে না। দ্বিতীয়ত, সেটা ভয়ানক বিপজ্জনকও। কারও হাতে পড়লে সর্বনাশ। সিপি গোপনে আলাদা লোক ফিট করেন। আমরা জানতাম না। হঠাৎ একদিন শোনা যায় ধৃতির বাড়িতে পুলিশ হানা দিয়েছে এবং সেখানকার চিলেকোঠা থেকে ওই খাতাটি পাওয়া গেছে।’
‘মানে অপরাধী কি ওনার চেনাজানা কেউ? তাকেই লুকোতে…’
শিবাঙ্গী জানতে চায়। সুকুমার মাথা নাড়ে। স্বয়ম্ভু বলে, ‘ওনার নিজের শালা। অল্প বয়স থেকেই বখাটে। কুসঙ্গে পড়ে জীবন বরবাদ করে। তথ্য লুকোনোর অপরাধে প্রথমে সাসপেন্ড ও পরে স্যাক করা হয় ধৃতিমানকে।’ সুকুমার বলে ওঠেন, ‘ধৃতি কিন্তু ক্ষমা চেয়েছিল। ও নিজে স্বীকার করেছিল সবটা। কিন্তু আইন কি আর তা শোনে? যে ধৃতিমানকে ছাড়া লালবাজারের সাইবার সেল অন্ধ ছিল। সেই ধৃতিমানকেই এক নিমেষে ছেঁটে ফেলল। ধৃতিমান কাকুতি-মিনতি করেছিল। সিপির পায়ে পর্যন্ত পড়েছিল। ওর ছেলে তখন মাধ্যমিক না উচ্চ মাধ্যমিক কিছু একটা দেবে। সে ছেলেও ব্রিলিয়ান্ট। ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয়নি কোনও ক্লাসে। এই সময় চাকরি চলে গেলে ওর পরিবার খেতে পাবে না। ছেলের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু কে শুনবে? আইনের দোহাই দিয়ে ধৃতিকে তাড়িয়ে দিল। এতদিনের এত দক্ষতা, এত কর্মনিষ্ঠা এক মুহূর্তের একটা আবেগের ভুলে সব শেষ হয়ে গেল। সেদিন যদি তাকে ক্ষমা করে দিত তাহলে হয়তো আজকের দিনটা কাউকেই দেখতে হত না।
‘ক্ষমা? এর পরেও? কী বলছেন সুকুমারদা?’
চশমার ভিতর দুটো আঙুল চালিয়ে ভেজা চোখটা মুছে সুকুমার বললেন, ‘জানি না বয়স হচ্ছে বলে কিনা, আর বছর দশেক আগে হলে আমি হয়তো তোমার মতোই ভাবতাম। যে যা হয়েছে বেশ হয়েছে। কিন্তু এখন যেন মনে হয়, এই আইন তো মানুষেরই তৈরি। জীবনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদি আইনটাকে একটু পাশে রেখে মানবিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় তাহলে কি খুব অন্যায় হয়ে যাবে? অ্যাটলিস্ট কয়েকটা মানুষ তো বাঁচবে। যারা আদতে ভালো। যারা শুধুমাত্র আবেগের বশে একটা ভুল করে ফেলেছে। আমি অপরাধকে সমর্থন করছি না। অপরাধী ধরা পড়েছে। তার যথেষ্ট সাজাও হয়েছে। কিন্তু ধৃতিকে কি…!’ একটা বড়ো নাভিশ্বাস উঠে এল সুকুমারের বুক চিরে। তারপরে হালকা হেসে বললেন, ‘কিছু মনে কোরো না বাবা। বুড়ো হচ্ছি তো। তাই দুর্বল হয়ে পড়ছি। সারাদিন এত অপরাধী, এত অপরাধ শুনতে শুনতে, প্রমাণ ঘাঁটতে ঘাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। বারবার মনে হয়, এরা কেন অপরাধী হল? সত্যিই কি এঁরা দায়ী? নাকি সমাজের চাপ? পারিপার্শিক অবক্ষয়? অযথা লালসার হাতছানি? কী? কী আছে এর পেছনে? যাক গে, বাদ দাও। এই সময় বেকার তোমাদের সময় নষ্ট।’ বাইরে থেকে দরজা দিয়ে ফুরফুর করে একটা হাওয়া আসছিল। উত্তপ্ত হৃদয়গুলোকে জুড়িয়ে দেবার জন্য। স্বয়ম্ভূও খানিক্ষণের জন্য চুপ করে গিয়েছিল। নীরবতাটা শিবাঙ্গীই ভাঙল, ‘ধৃতিমান এখন কোথায়?’
গল্পের শেষটা স্বয়ম্ভু বলে, ‘চাকরি যাওয়ার মাসতিনেকের মধ্যে ধৃতিমান গলায় দড়ি দেন। আজ ওর ছেলে আয়ুষ্মান হয়তো তারই প্রতিশোধ নিতে অচেনা খুনি ও বিট্টুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল।’
‘কিন্তু স্যার, খুনির তো পুলিশের ওপর কোনও রাগ আছে বলে মনে হয় না। তার মোটিভ তো আলাদা।’
‘খুনির মোটিভ আলাদা হতেই পারে। খুনির এমন কাউকে লাগবে যে এই ধরনের হ্যাকিং-ক্লোনিং করতে পারে। যে এটা পারে তার মোটিভ আবার আলাদা। আল্টিমেটলি দুজনের কাজই ইল্লিগাল। তাই এক হয়েছে।
সুকুমার ভারাক্রান্ত মনে কপালে হাত দিয়ে বসে থাকে। প্রদ্যুৎ বলে ওঠে, ‘স্যার, আয়ুষ্মান এ আই ইউজার হিসেবেও হাত পাকিয়ে ছিল। সম্ভবত এ আই-এর মাধ্যমে সাউন্ডের কোনও কাজ করত। সব হাইফাই সফটওয়্যার।’ স্বয়ম্ভুর ভুরু কুঁচকে যায়, ‘সাউন্ড! সেটা হয়তো পয়সা রোজগারের অন্য একটা কোনও পথ। এর সঙ্গে খুনের লিঙ্ক আছে বলে মনে হয় না।’
‘হতে পারে।’
‘বিজয় পেলে কিছু?’
স্বয়ম্ভূ জিজ্ঞাসা করে। ‘হ্যাঁ স্যার। আমি গতকাল থেকে আগের পাঁচদিন ধরছি।’
‘হুম।’
‘মহালয়ার দিন আয়ুষ্মানের নম্বর দমদমের নাগেরবাজারে ছিল। তারপরের দিন সন্ধেবেলা রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশন। সেখান থেকে আবার নাগেরবাজার।
‘ওখানে কতক্ষণ ছিল?’
‘আড়াই ঘণ্টা মতন।’
‘সিনেমা দেখতে গিয়েছিল? বেশ, তারপর।’
‘মঙ্গলবার সন্ধে সাতটা নাগাদ ঢাকুরিয়া আসে।’
‘ঢাকুরিয়ার কোথায়?’
আবারও স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে। ‘ঢাকুরিয়া বাজার।’ একসঙ্গে স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী চমকে উঠে বলে ওঠে, ‘ঢাকুরিয়া বাজার?’ অবাক হয়ে যায় প্রদ্যুৎ ও বিজয়।
***
সক্কাল সক্কাল বিমল চলে এসেছে বাণীকণ্ঠের বাড়ি। দিব্যময় বিমলকে তার একটি কোনও কর্মচারীকে বাড়িতে পাঠাতে বলেছিল বাণীকণ্ঠের চুল-দাড়ি কেটে দেবার জন্য।
‘আমি বললাম, মেসোমশাইয়ের চুল কাটবে অন্য কেউ? কেন? আমি যাব। হেব্বি একটা কাট করে দেব। মেসোমশাই নিজেই চমকে যাবে।’
কচাকচ কাঁচির সঙ্গে মুখটাও চলছে ইউনিকর্ন ইউনিসেক্স সালোনের মালিক বিমলের। কথা শুনে তো বাণীকণ্ঠের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। ঘাড় গুঁজে চেয়ারে কালো চাদর গায়ে দিয়ে বসে প্রায় নেচে ওঠে বাণীকণ্ঠ। ‘হেব্বি কাট মানে? এই ছেলে, আমি কিন্তু একজন শিক্ষক। চ্যাঙ্কা ছোঁড়াদের মতো চুল কেটে দিও না।’ মন্দাকিনী মুখপুড়ি সেই কখন থেকে কেষ্টপদে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে বাচালে হাসি হেসেই চলেছে। তাতে বাণীকণ্ঠের মাথা আরও গরম হয়ে যাচ্ছে। বিমলের চোখ বাণীকণ্ঠের মাথার চুল ছাপিয়ে থেকে থেকেই মন্দাকিনীর দিকে। কী সুন্দর হাসে মেয়েটা। মন্দাকিনীও বুকের কাপড় আলগা করে বিমলের নীরব কথার উত্তর দিয়ে চলেছে। থেকে থেকেই আঁচল দিয়ে গলা, বুক মুছে নিচ্ছে। যেন কত গরম লাগছে মন্দাকিনীর।
‘অ্যাই তোর কাজ নেই মন্দা? যা। এখানে দাঁড়িয়ে কাজ কী তোর?’
বাণীকণ্ঠ বলে উঠল।
‘ও মা! বাইরের একটা ছেলে বাড়িতে ঢুকেছে। নজর রাখতে হবে না?’
কেউ কোনও কথা বলেছে আর মন্দাকিনী তার উত্তর দেয়নি এ হতেই পারে না। বিমল ভুরু কুঁচকে মন্দাকিনীর দিকে তাকাল। কী বেহায়া মেয়ে রে বাবা! বাণীকণ্ঠ খিঁচিয়ে উঠল, ‘অ্যাই অসভ্য মেয়ে কোথাকার। এভাবে কেউ বলে? শুনলি তো দাদা পাঠিয়েছে। তুমি কিছু মনে কোরো না বিমল। ও ওরকমই। মুখে কোনও লাগাম নেই।’
‘না না মেসোমশাই। কী আর মনে করব? রাস্তায় অমন কত কুত্তা ঘেউ ঘেউ করে। রেগে গেলে চলে?’
মন্দাকিনী দাঁতে দাঁত চিপে কটমট করে বিমলের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানে। ছেলেটার কথা ভালো না লাগলেও প্রতিবাদ করতে পারল না বাণীকণ্ঠ। শুধু মনে মনে ভাবল, দুটোই এক গোয়ালের গোরু। অশিক্ষিতের মরণ।
***
ঢাকুরিয়া বাজারে গাড়ি থেকে নেমেই পসার নিয়ে বসা মানুষগুলোকে জিজ্ঞেস করে শিবাঙ্গী, ‘মঞ্জু কোথায়? আসেনি?’ খরিদ্দারের প্যাকেটে আলু, পটল ভরে দিয়ে কালো মহিলাটা বলে, ‘না তো। আজ আসেনি।’
‘কেন? জানো কিছু?
‘আমি তো এখেনে থাকি নে। তবে আড়তে মালও নিতে যায় নে। অ্যাই, স্বপওওওন… মঞ্জুর কী হয়েচে জানিস?’
স্বপন মাছ বেচছিল। গলা তুলে বলল, ‘না জানি না। কালও তো এসছিল।’ পুলিশের গাড়ি থেকে বেশ একটু কৌতূহলই হয় সকলের। আনাজওয়ালি প্রশ্ন করে, ‘কেন ম্যাডাম? মঞ্জু কিছু করেছে?’
শিবাঙ্গী উত্তর না দিয়েই গাড়িতে উঠে পড়ে
মঞ্জুর বাড়ির গেটে আজ তালা নেই। বাইরে থেকেই তর্জনী দিয়ে লকটাকে ওপর দিকে ঠ্যালা মারতেই সেটা ঘুরে খুলে গেল। তর্জনীতে তেলতেলে কী যেন একটা লাগল। নাকের কাছে আঙুলটা আনতেই তেলে ভাজা খাবারের গন্ধ। লক খুলে বারান্দায় ঢুকে পড়ল স্বয়ম্ভু ও শিবাঙ্গী। ঘরে ঢোকার দরজায় ঠ্যালা দিতেই সেটাও খুলে যায়। আশ্চর্য হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে স্বয়ম্ভু ও শিবাঙ্গী। হালকা একটা গন্ধ যেন নাকের সামনে থেকে ঘুরে-ঘুরে যাচ্ছে। শিবাঙ্গী নাকের নীচে আঙুল ঘষে। স্বয়ম্ভু আরও একবার বারান্দায় উঁকি মেরে ছেড়ে রাখা জুতোর দিকে দেখে। একটা রবারের হাওয়াই চটি, আরেকটা একটু ভালো-গোছের মেয়েদের জুতো। যেটা এখানে থাকাটা স্বাভাবিক। গন্ধটা কি সেখান থেকেই বেরোচ্ছে? স্বয়ম্ভূ নাকটা জুতো বরাবর নামিয়ে আনল। নাহ! মনে তো হচ্ছে না। ততক্ষণে ঘরের ভিতর ঢুকে গেছে শিবাঙ্গী। বাইরের ঘর থেকেই বার চারেক ডেকেও সাড়া পায় না মঞ্জুর। বাড়ি যেন মানুষহীন। জানলার পর্দাগুলোও সরানো হয়নি। স্বভাবতই বেলা সাড়ে এগারোটাতেও ঘর অন্ধকার। বাইরের ঘর পেরিয়ে ভিতরের ডাইনিং। সেখান থেকেই শোবার ঘরে উঁকি। সেখানেও আবছা আঁধার। শিবাঙ্গী আবার ডাকল। সাড়া নেই। ঘর ফাঁকা। কোথা থেকে যেন স্বয়ম্ভূ ডাকল, ‘শিবাঙ্গী…!’ ডাক শুনে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দেখে স্বয়ম্ভু ভিতরের মাটির দিকে চেয়ে আছে। সেই দৃষ্টি লক্ষ করে শিবাঙ্গী ও তাকায়। মঞ্জুর মাথাটা দরজার দিকে। চোখ উলটে বিস্ফারিত। গলার কাছ থেকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটি। গ্যাসের ওপর প্যানে অমলেট পুড়ে কালো হয়ে রয়েছে। থ্রিলার দৃশ্যের আবহের মতো ভনভন করে বেজে চলেছে মাছির গুঞ্জন।
বাইরের ঘরের সোফায় স্বয়ম্ভুর সামনে এসে বসেন ফরেন্সিক এক্সপার্ট ডক্টর তুহিনশুভ্র দাশগুপ্ত। স্বয়ম্ভূ হাঁটুর ওপর দুটো কনুই ভর দিয়ে ঠোঁটের কাছে দুটো হাত মুষ্টি পাকিয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে বসেছিল। তুহিনের দিকে বাম ভ্রূ তুলে আড়চোখে তাকায়। তুহিন বলে চলে, ‘খুনি ছুরির রক্ত রান্নাঘরের সিঙ্কে ধুয়েছে। সম্ভবত সেই সময় হাতের গ্লাভস খুলে সিঙ্কের পাশে রেখেছিল তাই গ্লাভসে লেগে থাকা রক্ত সিঙ্কের পাশে পাওয়া গেছে। খুনি গ্যাস অফ করেছে তাই সেখানেও ভিক্টিমের ব্লাড স্যাম্পেল। কিন্তু সিঙ্কের ট্যাপের গায়ে লেগে আছে কোনও ভাজা আইটেমের গন্ধ ও তেল। কারণ খুনি হাত দিয়েই সেটা খেয়েছে। ডিম তো পুড়ে ঝাঁ। অতএব সেটা খাবার সম্ভাবনা নেই। আর খুনটা হয়েছে দশ থেকে এগারো ঘণ্টা আগে।’
‘মানে রাত দেড়টা।’
সামনে দাঁড়িয়ে ছিল শিবাঙ্গী। সময়ের হিসেবটা সে-ই করল। স্বয়ম্ভুর থেকে দু- তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিল লেক পুলিশ স্টেশনের ইনস্পেক্টর দিব্যেন্দু পাড়িয়া। ‘অত রাতে কার জন্য ডিম ভাজছিল মঞ্জু? তার মানে চেনা কেউ। চম্পক মজুমদার?’ কথাগুলো পরপর বলে গেলেন দিব্যেন্দু।
‘না। চম্পক নয়। সে ভীতু। খুন তার দ্বারা হবে না। পুলিশের সামনে ছড়া লিখতে গিয়ে যার হাত কাঁপে সে কিছুতেই খুন করতে পারে না।
গম্ভীর গলায় বলল স্বয়ম্ভু। রান্নাঘর থেকে ক্যামেরার শার্টারের শব্দ আসছে। ‘মার্ডারার কিন্তু এখানে ডান হাতি।’
‘হতেই পারে।’
শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার, আমরা যে ঠিক পথে এগোচ্ছি সেটা কিন্তু শিওর। আর খুনির সঙ্গে মঞ্জুর অবশ্যই যোগাযোগ ছিল। মঞ্জু ধরা পড়লে অপরাধীর পর্দা ফাঁস হয়ে যেত। তাই মঞ্জুকে খুন করে দিল। আর ওই মার্ডারার তো লেফট হ্যান্ডেড। কিন্তু এখানে…!’ কথা শেষ না হতেই স্বয়ম্ভূ বলে উঠল, ‘খুনি আসলে সব্যসাচী। যার দুটো হাত একসঙ্গে চলে।’ নিজের দুটো হাত তুলে কথাগুলো বলে স্বয়ম্ভু।
‘কী করে শিওর হোচ্ছ স্বয়ম্ভু? অন্য কাউকে দিয়েও তো…’
‘কক্ষনও না। প্রমাণ লোপাটের কোনও সাক্ষী সে রাখবে না। তাই নিজে হাতেই কাজটা করবে।’
‘একজন ডাক্তারের মতো ছুরি চালাচ্ছে খুনি। ঠিক জানে ক্যারোটিড আর্টারিটা কোথায় থাকে। বাঁচার কোনও সম্ভাবনাই রাখছে না।
তুহিনের কথায় স্বয়ম্ভুর মাথার কোষগুলো ভীষণ সজাগ হয়ে ওঠে।
‘আচ্ছা তুহিনদা, খুনি যদি ডাক্তার নাও হয় তাহলে ক্যারোটিড আর্টারি খুঁজে মারাটা কি সম্ভব?’
‘সম্ভব। তবে তাকে জানতে হবে এটা কোথায় থাকে। সচরাচর গলার মাঝে ছুরি চালিয়ে খুন করার চেষ্টা করা হয়। তাতে সারভাইভ করার অল্প হলেও চান্স থেকে যায়। কারণ সকলেরই ধারণা গলার নলি কেটে খুন করে। কিন্তু যারা একটু পড়াশুনো করে খুন করে তারা গলার পাশ থেকে ছুরি চালায়। সেক্ষেত্রে দু-পাশেই এই আর্টারি থাকার দরুন সেটা কেটে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু অনিবার্য।’
‘হুম। তবে খুনির লিস্টে মঞ্জু ছিল না। আয়ুষ্মান ধরা পড়াতে সে ভয় পেয়ে গেছে। তাই মঞ্জুকে সরিয়ে দিল। ইচ্ছে করে সে ডান হাতে খুন করে আমাদের বিভ্রান্ত করছে। কিন্তু এ সবের থেকে বড়ো কথা হল, খুনি এত তাড়াতাড়ি জানল কী করে আয়ুষ্মানের কথা?’
‘তাহলে কাল ওই কারখানায় সেও কোথাও ছিল?’
শিবাঙ্গীর সংশয়। ‘তাহলে আর তোমাকে গুলি খরচা করতে হত না। হয় সে আমাকে মারত নয় তো আয়ুষ্মানকে। সে ওখানে ছিল না। কারণ তার আগেই যে মাস্টার মাইন্ড তার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল আয়ুষ্মান। যে নম্বরটা এখন নট রিচেবল। কাল রাতের লাস্ট লোকেশন চৌবাগা।
‘সেটা কোথায়?’
তুহিনের প্রশ্ন। উত্তর দিল শিবাঙ্গী, ‘ওই রুবি আনন্দপুর আছে না। ওখান থেকে ভিতরে যে রাস্তাটা সোজা বাসন্তী হাইওয়ে যাচ্ছে ওটার মাঝামাঝি জায়গা। বেশ গ্রাম্য।’
স্বয়ম্ভুর মনে আবারও একটা খোঁচা লাগলেও সেটা নিয়ে ভাবার আগেই ঝনঝন করে বাসন পড়ার শব্দ। তুহিন চিৎকার করে উঠে গেল, ‘এই কী রে! আস্তে কাজ কর। ক্রাইম সিনের কোনও এভিডেন্স যেন হ্যাম্পার না হয়।’ তুহিন রান্নাঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল। স্বয়ম্ভু ডাকল, ‘তুহিনদা, এই দরজা আর বাইরের গেটেও তেলের গন্ধ পাবে। ফিঙ্গার প্রিন্টও পেতে পারো। আর ফ্লোরে যতগুলো ফুট প্রিন্ট পাবে তার মধ্যে একটা ডেফিনিটলি খুনির। কারণ খুনির পা ঘামে। জুতোয় গন্ধ হয়। এর আগে তাই কারও বাড়িতে ঢোকেনি সে। সবাইকে রাস্তায় মেরেছে। যাতে তার পায়ের ছাপ না পড়ে। যদিও সেটা আমার অ্যাসাম্পশন।
‘ওকে। আমি দেখছি।’
পুরুষ-নারী মিলিয়ে প্রায় পাঁচ-সাতজন সাংবাদিকের ক্যামেরা-বুম ঠেলে মঞ্জুর লাশ মর্গে চলে গেল। ভিড়ের মধ্যে স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী আর দিব্যেন্দু আসতেই ছেঁকে ধরল তারা।
‘মঞ্জু তো একজন সামান্য আনাজবিক্রেতা। তাকে কে খুন করল বলে আপনাদের মনে হয়?’
‘সাধারণ-অতি সাধারণ মানুষেরও শত্রু থাকে। সেটা কে খুঁজে বের না করলে কিছু বলতে পারছি না।
‘শোনা যায় মঞ্জুর সঙ্গে নাকি স্থানীয় এম এল এ-র ছেলে চম্পক মজুমদারের সম্পর্ক ছিল। এই মার্ডারের সঙ্গে কি সে কোনওভাবে যুক্ত থাকতে পারে?’
‘একটা মানুষের সঙ্গে হাজারটা মানুষের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাহলে তো সেই হাজারটা মানুষকেই সন্দেহ করা উচিত। খামোকা এম এল এ-র ছেলে কেন একটু বলবেন?’
প্রশ্ন পাতে পড়তেই উত্তর দিচ্ছে স্বয়ম্ভু।
‘আপনি কি কোনওভাবে চম্পকবাবুকে আড়াল করতে চাইছেন?’
‘আপনারা কি কোনওভাবে চম্পকবাবুকে অপরাধী প্রমাণ করতে চাইছেন?
তাহলে কি আপনাদের কোনও সুবিধে হয়?’
‘এরকম ঘুরিয়ে কেন উত্তর দিচ্ছেন স্যার?’
‘শুরুতেই সরাসরি উত্তর দিয়েছি আপনাদের, তদন্ত সবে শুরু হয়েছে। এখন কিচ্ছু বলা যাবে না। ধন্যবাদ। যেতে দিন।’
দিব্যেন্দু তার লোকজন নিয়ে ‘সরুন সরুন’ করে পথ পরিষ্কার করছিলেন। স্বয়ম্ভূ ও সামনের দিকে পা বাড়িয়েছিল। হঠাৎ সেই সাংবাদিক দলের মধ্যে থেকেই আরও একটা প্রশ্ন ধেয়ে এল। একটি শান্ত নারীকণ্ঠ। সাংবাদিকদের গলাগুলো এমনিতেই সপ্তমে চড়ে থাকে। তার মাঝে নরম গলার প্রশ্নটা স্বয়ম্ভুর পথ রোধ করে দাঁড়াল। ‘মঞ্জুর খুনটাও ওই সিরিয়াল কিলারের কাজ তাই না স্যার?’ স্বয়ম্ভু তাকাল মেয়েটির দিকে। ফর্সা, জোড়া ভুরু, মাঝে একটা ছোট্ট টিপ। আকাশি শার্ট আর নেভি ব্লু জিন্স। ‘কোন সিরিয়াল কিলিং?’ মেয়েটি শান্ত গলাতেই জবাব দিল, ‘বীণা সাহা, লক্ষ্মীরানি মণ্ডল, সুমিতা ধর, শান্তি দাস আর মিনতি গুহ। যারা মার খেতে খেতে খুন হয়ে গেল।’ চমকে উঠল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। কে এই সাংবাদিক? যে কেস নিয়ে কোলকাতায় এখনও তেমন চর্চা শুরু হয়নি সেটা নিয়ে এত গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করেছে যে ভিক্টিমদের সবকটা নাম গড়গড় করে বলে গেল! মেয়েটির গলায় ঝোলানো আই কার্ডে চোখ বোলাল স্বয়ম্ভু। আঁখি চ্যাটার্জি। সাপ্তাহিক প্রভাকর। তেমন একটা নাম শোনা যায় না কাগজটার। সপ্তাহে একটা করে ছাপে বোধহয়। আঁখির কথায় পাশ থেকে বাকি সাংবাদিকদের মধ্যে শোরগোল শুরু হয়। প্রশ্নও ধেয়ে আসতে শুরু করেছে। ‘এরা কারা? কবে খুন হল?’ একজন আরেকজনকে বলল, ‘হ্যাঁ কাগজে ছোট্ট একটা খবর হয়েছিল। বাট সেভাবে নজর কাড়েনি।’
‘মহালয়ার দিন রিজেন্ট পার্ক এলাকার যে খুনটা হল তার মানে সেটার সঙ্গে এটার যোগাযোগ আছে?’
‘সরি ম্যাডাম, সাধারণ একটা মার্ডারকে সিরিয়াল কিলিং বলে কোনও সাপ্তাহিককে দৈনিক করে দিতে পারব না।’
কেজো হাসি নিয়ে কথাটা বলেই ভিড় ঠেলে এগোচ্ছিল স্বয়ম্ভু। আঁখি মেয়েটি আবারও বলে উঠল, ‘আজকাল তাহলে সাধারণ মার্ডারেও লালবাজারের গোয়েন্দারা ইনভলভ হয়? কলকাতায় এত কেসের অভাব পড়েছে?’ স্বয়ম্ভুকে এইভাবে এর আগে কেউ আটকাতে পারেনি। অবস্থা বেগতিক বুঝে খেঁকিয়ে উঠলেন দিব্যেন্দু পাড়িয়া। সকলকে তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। স্বয়ম্ভু ফিরে তাকাল না। ক্ষণিক থেমে সোজা গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। শিবাঙ্গী শুধু এক ঝলক মেপে নিল আঁখিকে। সাংবাদিকরা গাড়ির পিছনে ছোটার জন্য ব্যস্ত হচ্ছে। জানলা দিয়েও যদি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু আঁখির সেই তাড়া নেই। দূরে একাকিনী চুপ করে দাঁড়িয়ে পুলিশের গাড়িটার দিকে চেয়ে। কারণ ও জানে, ছোট্ট মাটিটায় দাঁড়িয়েই বড়ো চাকে ঢিল ছুঁড়ে দিয়েছে সে। অব্যর্থ নিশানা। লুকিং গ্লাসের মধ্যে দিয়েই স্বয়ম্ভুর আঁখি হরণ করে নিয়েছে মেয়েটি।
‘এবার একটা ঝড় উঠবে। বুক চিতিয়ে সামলাতে হবে শিবাঙ্গী।’
লুকিং গ্লাসে আঁখির ছায়া উধাও। তবু সেদিকে চেয়েই কথাটা বলে উঠল স্বয়ম্ভু।
‘এর আগে কাগজটার নাম শুনিনি। মেয়েটাকে কোথাও দেখেছি বলেও মনে পড়ে না।’
‘অনেক কষ্টে এই কেস থেকে মিডিয়াকে দূরে রেখেছিলাম। কিন্তু পারলাম না।’
দিব্যেন্দু বলে উঠলেন, ‘চাঁদ সদাগরের কেস, স্যার। লোহার বাসর ঘর বানিয়ে কত চেষ্টা করল মনসাকে আটকাতে। শেষমেশ ছিদ্রটা রয়েই গেল।’
সামনে যে রাস্তাগুলো হু হু করে ওঁদের গাড়ির দিকে ধেয়ে আসছে সেই দিকে চেয়ে স্বয়ম্ভু বলল, ‘ছিদ্রটা দেখলেন দিব্যেন্দুবাবু! কন্সপিরেসিটা দেখলেন না! যে বিশ্বকর্মাকে বিশ্বাস করে চাঁদ সদাগর ঘর বানালেন, সেই বিশ্বকর্মাই মনসার সঙ্গে চুক্তি করে ছিদ্রটা রেখে দিল।’ কথাটা দিব্যেন্দু আর শিবাঙ্গী দুজনেই শুনল। দিব্যেন্দু মনসামঙ্গলের নতুন ব্যাখ্যায় মন দিল আর শিবাঙ্গীর মন আশঙ্কায় কুঁকড়ে এল। ‘আবার ঘরশত্রু?’ ফিশফিশ করলেও শিবাঙ্গীর কথাটা কানে গেল স্বয়ম্ভুর। চোখ বন্ধ করল সে। ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে পকেটে চিৎকার করে উঠল ফোনটা। সুকুমারদা।
‘হ্যাঁ সুকুমারদা… পেয়ে গেছেন? বাহ! পাঠিয়ে দিন।… কেন?… পিডিএফ করে পাঠিয়ে দিন।… না না আমি আজ আর অফিসে ঢুকব না আশা করি। ঠিক আছে।’
ফোনটা রেখে ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়ল স্বয়ম্ভু। তখনই দিব্যেন্দু বলে উঠল, ‘আমায় এই সামনের মোড়ে নামিয়ে দিন।’ দিব্যেন্দু নেমে যাওয়ার পর শিবাঙ্গীকে স্বয়ম্ভু বলল, ‘আটই অক্টোবর মানে সুমিতা ধর যেদিন মার্ডার হয় সেদিন মিত্র ক্যাফের দুশো মিটারের মধ্যে যে কটা মোবাইল অ্যাক্টিভেট ছিল সব ডিটেইলস পাওয়া গেছে।’
‘সুকুমারদা কি ওটাই জানালেন?
‘হ্যাঁ। একশো আঠারো জন।’
‘সর্বনাশ। এ তো খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা। এতজনের মধ্যে থেকে কীভাবে বাছব?’
‘তিষ্ঠ বৎসে। আগে তো লিস্টিখানা দেখতে দাও। কোনও ডাক্তার সেখানে গেছে কিনা দেখি আগে।’
‘দিব্যময়?’
শিবাঙ্গী গলা চেপেই বলল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘কোনও ব্লু তো নেই। তবু! সেদিন অত রাতে ওনার বাবা কোথায় গেছিলেন? বিশেষ করে চোখে যার হাই পাওয়ারের চশমা।’
‘তার জন্য ছেলেকে সন্দেহ!’
‘ঠিক তা নয় শিবাঙ্গী। অত বিজি একজন অর্থোপেডিক সার্জেন, যিনি সকাল আটটা থেকে হেলথ লাইনে পেশেন্ট দেখেন। তিনি হঠাৎ মিনতির খুনের স্পটে সক্কাল সক্কাল পৌঁছোলেন কী করে?’
‘ওই কাজের মেয়েটা, কী যেন নাম…!’
শিবাঙ্গী ভাবতে ভাবতেই জবাব এল স্বয়ম্ভুর কাছ থেকে, ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি।’ শিবাঙ্গী হেসে ফেলল, ‘হ্যাঁ মন্দাকিনী। ওই ডেকে এনেছিল ওনার বাবাকে সামলাবার জন্য।’
‘ভেরি ক্লিশেড।’
‘সেদিন হয়তো পেশেন্ট দেখা ছিল না।’
‘অবশ্যই ছিল। খোঁজ নিয়েছি। কিন্তু এই সুকুমারদাটা করছে কী? একটা পিডিএফ পাঠাতে তো দিন কাবার করে দিল। ও হো, শিবাঙ্গী, তুমি তো মঞ্জুর বাড়ির আশপাশটা খেয়াল করেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘পাশেই একটা বাড়ি ছিল না?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু তালা মারা। বাড়ির লোকটার নাকি কাল রাতে স্ট্রোক হয়েছে। মা আর ছেলে নার্সিং হোমে।
‘কাল রাতে স্ট্রোক? কখন?’
‘সেটা কেউ জানে না।’
‘সঞ্জয়, গাড়ি ঘোরাও। যেখান থেকে এসেছি, আবার সেখানে যাব।’
শিবাঙ্গী অবাক।
মঞ্জুর বাড়ি পুলিশ সিল করে দিয়েছে। তার পাশের বাড়িতে তালা ঝুলছিল। কিন্তু স্বয়ম্ভু ফিরে এসে দেখে সেটা খোলা। ‘ফিরে এসেছে মনে হয়।’ শিবাঙ্গী বলল। স্বয়ম্ভু সটান বেল বাজাল। বাইশ-তেইশ বছরের একটি ছেলে দরজা খুলল।
‘নমস্কার। আমরা লালবাজার থেকে আসছিলাম।’
‘মাফ করবেন। আমরা নার্সিংহোমে ছিলাম তো তাই কিছু জানি না।’
স্বয়ম্ভু থমকাল। ছেলেটা দরজাটাও পুরোটা খোলেনি। কেন? শিশুর মতো হেসে ওঠে স্বয়ম্ভু, ‘এ বাবা! আমরা তো কিছু জিজ্ঞেসই করিনি। তাহলে কী করে বুঝলেন আপনারা জানেন না?’
‘দেখুন, আমাদের খুব বড়ো একটা ক্রাইসিস চলছে। বাবার অবস্থা ভালো না। আপনারা তো পাশের বাড়ির মার্ডার নিয়ে প্রশ্ন করবেন? বিশ্বাস করুন, আমরা কিচ্ছু জানি না এ ব্যাপারে।’
‘শুনে সত্যিই খুব খারাপ লাগছে। কী হয়েছে আপনার বাবার সেটা কি জানতে পারি?’
‘হার্ট অ্যাটাক।’
‘কখন হল?’
‘কা…কাল রাতে।’
‘মাঝরাতে?’
‘হুম।’
‘ও… তার মানে পাড়ার মোড়ে আপনাদের কথাই শুনছিলাম। লোকজন বলাবলি করছিল।’
‘কী… কী বলছিল?’
ছেলেটা বেশ চাপ খেয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
‘কিছু না, ওই আপনার বাবাকে ডিভাইন নার্সিং হোমে নিয়ে গেছেন সেটা নিয়েই…’
‘না না। হেলথ লাইনে।
শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু দুজনের কানেই নামটা ধাক্কা মারলেও মুখের ভাবে সেটা প্রকাশ পেল না।
‘কেন? হঠাৎ হেলথ লাইনেই কেন? চেনাজানা আছে?’
‘না। বাবার মেডিক্লেমে হেলথ লাইন আছে তাই। প্লিজ আপনারা এবার আসুন। কিছু মনে করবেন না।’
মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
‘ছেলেটা দরদর করে ঘামছিল স্যার।’
‘হুম। আমরা বাইরে ঘুরেও এত ঘামছি না। অবশ্য, প্রেশারের প্রবলেম থাকলে অন্য কথা।’
বলেই লাফিয়ে মঞ্জু আর এই বাড়িটির মাঝের সরুগলিতে ঢুকে পড়ে স্বয়ম্ভু। দুটো বাড়ির মাঝে কোমর পর্যন্ত একটি পাঁচিল। ইচ্ছে করলে সহজেই টপকানো যায়। পাঁচিলের এপার আর ওপার দিয়ে একটি করে লোকই যেতে পারবে। তার বেশি নয়। দশ-বারো পা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীও দু-পা পিছনে থমকে যায়। পাশাপাশি দুটো বাড়িরই জানলাগুলো বন্ধ বলে গলির মধ্যে এগোতে অসুবিধে হয়নি। মঞ্জুর রান্নাঘরের জানলা আর উলটোদিকের বাড়ির বাথরুমের জানলা মুখোমুখি। বাথরুম থেকে স্নানের শব্দ আসছে। জানলাটি খোলা থাকলে মোটামুটি বাথরুমে থাকা মানুষটির বুক পর্যন্ত দেখা যেতে পারে।
গাড়িতে উঠেই স্বয়ম্ভূ ড্রাইভারকে হেলথ লাইন যাবার কথা বলতেই শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার, আমাদের কিন্তু…!
‘আই নো শিবাঙ্গী। বাট রাইট নাও, ইটস ইভেন মোর ইম্পর্টেন্ট ফর আস টু গো টু দ্য হেলথ লাইন ইমিডিয়েটলি। আর এই সুকুমারদা… একটু নড়েচড়ে কাজ করে না। একটা পিডিএফ পাঠাতে বুড়ো হয়ে গেল।’
খুব জোর মিনিট পনেরো। হেলথ লাইনের রিসেপশনে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে সঠিক রোগীর সন্ধান পেতে অসুবিধে হল না। ডাক্তার জানালেন, পেশেন্ট আই সি ইউতে রয়েছে। এখন কোনও কথা বলানো যাবে না। স্যালাইন চলছে। সবসময় মনিটরিং করা হচ্ছে। এমনিতেই হার্টের অবস্থা ভালো ছিল না। চেন স্মোকার ছিলেন। তার ওপর কিছু থেকে শক পেয়ে এই অবস্থা।
‘পেশেন্ট কী থেকে শক পেয়েছেন কিছু জানেন? কিছু দেখে ফেলেছিলেন কি?’
‘জানি না। ওয়াইফ আর ছেলে কেউ কিছু বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, রাতে বাথরুমে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ঘরে আসতেই বুকে ব্যথা হয় আর তার পর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।’
স্বয়ম্ভু পকেট থেকে কার্ড বের করে ডাক্তারকে দিয়ে বলল, ‘কিছু হলে অবশ্যই জানাবেন। ইটস ভেরি ভেরি ইম্পর্টেন্ট আর আমাদের সঙ্গে আপনার কথাগুলো কনফিডেনশিয়াল রাখবেন।’
‘শিওর।’
‘আচ্ছা, ডক্টর ব্যানার্জি, ডক্টর দিব্যময় মুখার্জি কি এখন আছেন? কিছু জানেন?’
ডক্টর হাত উলটে ঘড়ি দেখলেন। ‘সম্ভবত না। কাছেই বাড়ি তো। উনি বাড়িতে লাঞ্চ করতে যান। আচ্ছা এবার আমাকে যেতে হবে।’
‘ও শিওর।’
‘থ্যাংক ইউ।’
ডক্টর চলে যেতে স্বয়ম্ভূ একটা ঢেঁকুর তুলল। ‘বেলা অনেক হল শিবাঙ্গী। এবার পেটে কিছু না পড়লে ক্ষুধামান্দ্য রোগ দেখা দেবে।’
‘এই হসপিটালের ক্যান্টিনেই খাওয়াটা সেরে নিলে ভালো হয়।’
‘শেষে হসপিটালের ক্যান্টিন?’
‘আজ আর রেস্টুরেন্ট নয় স্যার।’
‘তুমি যে এতটা পেটরোগা জানতাম না তো।’
‘আপনি যে কত পেটমোটা সে আমার ভালোই জানা আছে।’
‘বুঝেছি, মাসি-বোনঝির পিরিতটা আজকাল বেশিই বেড়েছে।’
‘হ্যাঁ তাই।’
বেশ বড়োসড়ো একটা হল। ধাবার স্টাইলে চেয়ার-টেবিল পাতা। পেশেন্ট পার্টির লোকেরা ভর্তি। এরই মাঝে ফাঁকা টেবিল খুঁজতে লাগল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভূ মেনুর খোঁজে গেছে। পছন্দসই মেনু সবে অর্ডার দিতে যাবে অমনি, ‘স্যার, ডক্টর দিব্যময়।’ শিবাঙ্গী এসে বলল।
‘কোথায়?’
‘ওই যে জানলার ধারের টেবিলে। সামনে একটি ছেলে বসে আছে।’
দূর থেকেই স্বয়ম্ভু নব্য ছেলেটির আদ্যপান্ত মেপে নিল। মাথার দু-পাশ এবং পিছনের দিকের চুলগুলো এমন ছোটো করে ছাঁটা যে শাঁস বেরিয়ে এসেছে। ঘাড়ে ট্যাটু থাকলেও থাকতে পারে। মাথার মাঝ বরাবর লালচে চুলের ঝোপ। ডানকানে দুটো ফুটো করে সিলভার কালারের রিং আটকানো। স্বয়ম্ভুরা এগোতে এগোতেই সামনের ছেলেটি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে চলে যাবার জন্য। সেইক্ষণেই স্বয়ম্ভু ‘গুড আফটার নুন ডক্টর মুখার্জি’ বলে ওঠে। দিব্যময় কিছুটা অবাক হয়ে যায়। চিনে মনে করতে যেটুকু সময়। ‘আরে স্যার আপনি? ভেরি সরি আমি নামটা ঠিক…!’ বেশ একটা লজ্জা-লজ্জা মুখ নিয়ে উঠে দাঁড়াল দিব্যময়।
‘স্বয়ম্ভু সেন। আপনি প্লিজ বসুন। আপনারা বোধহয় কথা বলছিলেন। আমরা অসুবিধে করলাম।’
‘না না স্যার, আমার হয়ে গেছে। আসছি ডাক্তারবাবু। তন্দ্রাকে একটু দেখবেন। ডাক্তারবাবুর সামনে বসে থাকা ছেলেটি চেয়ার ছেড়ে উঠতে-উঠতে কথাটা বলল।
‘আমি জানাচ্ছি তোকে। বাড়ি যা।’
ছেলেটি চলে গেল। দিব্যময়ের সামনের সিটে স্বয়ম্ভু বসতে বসতে জিজ্ঞাসা করল, ‘কারও সিরিয়াস কিছু হয়েছে?’
‘পেশেন্ট সিরিয়াস না হলে কি আর ডাক্তারের কাছে আসে বলুন তো? আসলে এই ছেলেটির একটি সেলুন আছে। ও সরি, এখন তো আবার সালোন বলে। বেশ বড়োসড়ো। পাটুলিতেই। সেখানে একটি মেয়ে কাজ করে। তাকে তার হাজব্যান্ড মেরে হাত ভেঙে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। প্রায়দিনই মারধোর চলত। কালকে রাতে সেটা বাড়াবাড়ির পর্যায় পৌঁছায়। তাকেই ভর্তি করেছে এখানে। সে ব্যাপারেই এসেছিল।’
‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সটা আজকাল যেন বেশিই বেড়ে গেছে। তার ওপর কলকাতায় এমন একজন সিরিয়াল কিলারের আবির্ভাব হয়েছে যে কিনা এই অত্যাচারিত মেয়েদেরই খুন করে বেড়াচ্ছে।’
দিব্যময়ের চোখের দিকে তাকিয়ে একটানা বলে গেল স্বয়ম্ভু।
‘তার মানে ওই বাচ্চা ছেলেটার মা কি ওই জন্যেই…’
স্বয়ম্ভু বুঝল দিব্যময় প্রকাশের মায়ের কথা বলছে।
‘সম্ভবত।’
‘বাই দ্য ওয়ে, আপনারা খাবেন কিছু। আমি বলছি।’
‘না না, ব্যস্ত হবেন না। আমি বলে এসেছি। দশ মিনিট সময় লাগবে বলল।’
যতটা আকাশ থেকে পড়বে ভেবেছিল স্বয়ম্ভু দিব্যময়ের অভিব্যক্তি ততটাও বিস্ময়কর নয়। স্বয়ম্ভু ইচ্ছে করেই কথাটাকে আবার টেনে আনল, ‘আমরা একেবারে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। কী অদ্ভুত ভাবুন তো, যারা অত্যাচার করছে তাদের মারলেও না হয় বুঝতাম। কিন্তু এ তো ভিক্টিমকেই মার্ডার করে দিচ্ছে।’
‘স্বয়ম্ভুবাবু, আমি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নই। তাই এক্সপার্ট কমেন্ট দেব না। তবে কী জানেন, এদের ছোটোবেলার কোনও না কোনও বিষয় মনের মধ্যে ভীষণরকম ট্রিগার করে। সেখান থেকেই তারা এই জাতীয় অপরাধ করতে থাকে। রামন রাঘব, ইউমেশ রেড্ডি, কেরলের কেপি জয়নন্দন কিংবা বাংলার প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার ত্রৈলোক্যতারিণী। এদিকে আবার কালনার চেনম্যান বা নব্বই দশকের সজল বারুই সবাই একই। আবার কারও জিনের মধ্যেই অপরাধ থাকে যেমন হুব্বা শ্যামল। ছোটো থেকেই শয়তান।’
‘বাবা! ডাক্তারবাবু তো দেখছি সিরিয়াল কিলিং নিয়ে বেশ পড়াশুনো করেছেন।’
‘আমি বরাবরই থ্রিলার লাভার। ভেবেছিলাম ডিটেকটিভ হব। কী করে যে ডাক্তার হয়ে গেলাম নিজেও জানি না।’
হাসল দিব্যময়। বলল, ‘আর এই কেসগুলো তো আমাদের ছোটোবেলার। যদিও ত্রৈলোক্যতারিণীকে জানতে পারা দারোগা প্রিয়নাথ পড়ে। তা আপনি আমার সঙ্গে কি এ সব নিয়েই কথা বলতে এলেন?’
ডাক্তারের শেষ প্রশ্নে হেসে ফেলে স্বয়ম্ভু। মনের সন্দেহকে মুখে ফুটতে দেয় না। ‘আসলে সত্যি বলতে কি আমাদের এক পরিচিত এখানে ভর্তি হয়েছে। তাকে দেখতেই এসেছিলাম। এত খিদে পেয়ে গেল যে শিবাঙ্গীই বলল, এই ক্যান্টিনেই খেয়ে নিতে।’
‘ভালো করেছেন। এখানকার খাবার খুব একটা খারাপ নয়।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ও হো, আরেকটা কথা। আপনার বাবা মানে মাস্টারমশাই, ওনার চোখে তো অনেক পাওয়ার। সেই নিয়ে ওনাকে রাতবিরেতে কেন বেরোতে দেন?’
দিব্যময়ের মুখের ভাবটা সহসা পালটে গেল। ‘আমার বাবা! রাতবিরেতে! কবে বলুন তো?’
‘এই তো পরশু রাতে।’
‘আপনারা কীভাবে জানলেন?’
‘সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে।’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান, আপনারা কি কোনওভাবে আমার বাবার ওপর নজ… আমার বাবাকে কি কোনওভাবে সন্দেহ করছেন নাকি?’
‘আরে না না। আসলে মিনতি গুহর কেসটায় তদন্ত করতে গিয়ে সিসিটিভিতে আপনার বাবাকে দেখলাম তাই বলছি।’
.
দিব্যময় কপালে হাত দিয়ে দুটো আঙুল ঘষে বলল, ‘আর বলবেন না, যত বয়স হচ্ছে তত জেদ বাড়ছে। আমি থাকি না। কাজের মেয়েটার কথাও শোনে না। রাতে খেয়েদেয়ে বাবা একটা ওষুধ খায়। প্রেশারের। মাঝরাতে হঠাৎ মনে পড়েছে সেটি খাওয়া হয়নি। খুঁজতে গিয়ে দেখেছে বাড়িতেও নেই। ব্যস টেনশন শুরু। রাতে যদি কিছু হয়ে যায় কী হবে? চুপিচুপি নিজে ওই রাতের বেলায় ওষুধ কিনতে বেরিয়ে ছিল।’
‘অত রাতে কোনও ওষুধের দোকান খোলা থাকে?’
‘অ্যাপোলো টোয়েন্টি ফোর ইনটু সেভেন।’
‘ওষুধ পেয়েছিলেন?’
‘না। আমি পরের দিন পাঠাই।’
‘কিন্তু আমি বলছি… না, আমি নয়, সিসিটিভি বলছে আপনার বাবা যে গলিতে ঢুকেছিলেন সেখানে ওষুধ কেন কোনও দোকানই নেই। সেখানে শুধুই বাড়ি।’
‘সে তো ঠিক জানি না। আচ্ছা দাঁড়ান আমি এখনই বাবাকে জিজ্ঞাসা করছি।’ দিব্যময় মোবাইলটা বের করে বাণীকণ্ঠকে কল করে। জিজ্ঞেস করে। বাণীকণ্ঠ জানায়, ওই গলিতে জগন্নাথ বলে একটি ছেলে থাকে সে নাকি ওষুধের ডিলার। এর আগে দু-একবার বাণীকণ্ঠকে ওষুধ সাপ্লাই দিয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাড়িতে তালা দেখে ফিরে এসেছে।
‘স্যার, আপনি বাড়ি যাননি?’
দিব্যময়কে ক্যান্টিনে দেখে এগিয়ে এল অতনু।
‘না রে, দুশো তিনের পিছনে এত সময় গেল যে আর যেতে ইচ্ছে করল না। তুই লাঞ্চ করেছিস?’
‘এই তো করতে এলাম।’
‘এখানে কিন্তু চপ বা চিকেন কাটলেট পাওয়া যায় না।’
‘স্যার!’
লোকজনের সামনে লজ্জায় পড়ল অতনু। হাসতে হাসতে দিব্যময় অতনুর সঙ্গে স্বয়ম্ভুদের আলাপ করিয়ে দিতেই অতনু রীতিমতো ঘাবড়ে গেল। ‘ডিটেকটিভ স্বয়ম্ভু সেন! নার্সিংহোয়ে কেন? কিছু হয়েছে?’
‘কেন অতনুবাবু, নার্সিংহোমে আসতে গেলে কি গোয়েন্দাদের কেস নিয়েই আসতে হবে?’
স্বয়ম্ভু বলল। অতনু ফ্যাক করে হেসে ফেলল। ‘না না তা না। জাস্ট মনে হল। আপনারা কথা বলুন। আমি লাঞ্চটা সেরে নিই।’ বলে অতনু অন্য টেবিলের দিকে এগোচ্ছিল।
‘অতনুবাবু, আপনি স্যারের সঙ্গে বসুন। আমরা অন্য টেবিলে বসছি।’
‘এ মা না না স্যার, আপনারা বসুন। আমি অন্য…’
‘না না, শুনুন না। আসলে আমরা খেতে খেতে একটা খুনের ব্যাপারে আলোচনা
করব। আপনাদের সামনে করা যাবে না।’
‘খুন! কোথায়?’
অতনু ভাবাচ্যাকা খেল।
‘আরে, ভয় পাবেন না। বসুন আপনি।’
দিব্যময়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে টেবিলটা পালটে ফেলল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। চেয়ারে বসেই স্বয়ন্তু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ‘অতনু কাটলেট ভালোবাসে।’ স্বয়ম্ভু বলল।
‘শুধু ভালোই বাসে না। প্রায়দিনই খায় বলেই মনে হল দিব্যময়ের কথা শুনে।’
হেসে ফেলল স্বয়ম্ভু। খিলখিল করে হেসেই চলল।
‘কী হল?’
‘কথায় বলে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আমাদের হয়েছে সেই অবস্থা। যারাই কাটলেট খায় তারাই খুনি।’
এবার শিবাঙ্গীর পেটটাও হাসিতে গুড়গুড় করে ওঠে। কিন্তু মাথার মধ্যে অজস্র জাল পাকিয়েই চলেছে বলে হাসিটা প্রাণখুলে বেরোতে পারে না। অন্যান্য কেসে তাও কিছু জট খোলে, আবার পাকায়! কিন্তু এ কেস যেন বিষাক্ত মাকড়সার দুর্ভেদ্য জাল। ক্রমশ বড়ো থেকে প্রকাণ্ড হয়ে উঠছে। এমন সময়েই সুকুমারের পিডিএফ ঢোকে। চোখ বোলাতে বোলাতে এক জায়গায় আটকে যায়। স্বয়ম্ভু এক মুখ মেঘ নিয়ে বিড়বিড় করে, ‘আমি যে কোনদিকে যাই!’
‘কেন স্যার? কী হল?
‘অ্যাঁ! না কিছু না।’
শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি হাসল স্বয়ম্ভু। কিন্তু শিবাঙ্গী জানে, স্বয়ম্ভুর হাসিটা একটু বেশিই মিষ্টি। মনের তেতোটা চট করে ধরা পড়ে না। স্বয়ম্ভু কাকে যেন আবার ফোন করার জন্য মোবাইল কানে দিল, ‘হ্যাঁ শোনো। জানি আমি একের পর এক কাজ চাপাচ্ছি। কিন্তু উপায় নেই। হোয়াটসঅ্যাপ করছি। দেখে নিও। বাই দ্য ওয়ে, এটা কিন্তু আবার শিবাঙ্গীকে জানিও না। ইটস কনফিডেনশিয়াল।’ কথাটা বলতে বলতে ভুরু বেঁকিয়ে শিবাঙ্গীর দিকে তাকাল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী চাউনিতে টঙ্কার হানল। ভালোই বুঝল ফোনটা কার কাছে গেছে। ফোনটা কেটেই খ্যাকখ্যাক করে উঠল স্বয়ম্ভু, ‘বসের ফোনে আড়ি না পেতে যাও না খাবারটা হল কিনা দেখো না।’
‘আপনি পারেনও…!’
শিবাঙ্গী উঠে গেল। স্বয়ম্ভূ হালকা হাসি ছুড়ে বাইরের রোদ্দুরের চোখ ডোবাল শরতের রোদে শান্তি নেই। কেবল অশান্তির চিন্তা।
