৫
পিসির পিঠে নৃশংস আঁচড়। লাল্টুর ছোট্ট দুটো চোখ বিস্ময়ে স্থির। কোনও মানুষ এভাবে আঁচড়াতে কামড়াতে পারে? পিসেমশাই কি সারারাত ধরে পিসিকে পিটিয়েছে?
‘কী রে দে।’
ক্লান্ত গলায় বলল ঝুনু। হাতে বোরোলিনের টিউবটা নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দেখছিল ছোপ্পির পিঠ। আঙুলে করে বোরোলিন তুলেওছিল লাল্টু। কিন্তু আঘাতগুলোর দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। কোনখান থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না। অগত্যা ঘাড়ের কাছ থেকেই শুরু করল। লাল্টুর আঙুলটা আঘাতের ওপর পড়তেই ঝুনু মুখে ‘সসসস’ শব্দ করে উঠল। কপালের শিরা ফুলে উঠল। জ্বলে যাচ্ছে ঝুনুর পিঠটা।
‘ছোপ্পি।’
‘বল।’
‘তুই পিসেমশাইকে মারিস না কেন?’
‘ছি! গুরুজন হয় না।’
গুরুজন! এ কেমন গুরুজন? মনে প্রশ্ন জাগে ছোট্ট লাল্টুর। বলে, ‘গুরুজন হলেই কি মারতে পারে নাকি?’
‘ছোটোরা অন্যায় করলে বড়োরা তো মারবেই।’
‘তুই কী অন্যায় করিস ছোপ্পি? রান্না করিস, খেতে দিস, কাপড় কাচিস, পিসেমশাইয়ের শরীর খারাপ হলে সেবাও করিস। অন্যায়টা কখন করিস?’
নিষ্পাপ প্রশ্নগুলোর কী উত্তর দেবে ঝুনু? ও কি নিজেও জানে ঠিক কোন কারণে ওকে স্বামীর হাতে মার খেতে হয়? বাঁজা বলে? রান্নায় নুন কম বা বেশি হয় বলে? মদ খেতে বাধা দেয় বলে? নাকি স্বামীদের স্বভাবই বউ পেটানো! তাই। সেখানে নির্দিষ্ট
কোনও কারণের দরকার হয় না।
‘ছাড় দিকি। ছোপ্পির অনেক সেবা করেছিস তুই।’
বলতে বলতে উঠে বসছিল ঝুনু। অমনি লাল্টু বলে ওঠে, ‘উঠিস না ছোপ্পি। গায়ের ব্যথাটা একটু কমুক আগে। ইসস, গাঁদা পাতা থাকলে ভালো হত। বেটে বেটে লাগিয়ে দিতাম।’
‘বাবা রে! এ সব কোত্থেকে জানলি?’
‘সিনেমা দেখে।’
লাল্টুর মুখে লাজুক হাসি।
‘সিনেমা! কোত্থেকে দেখলি?’
‘মণিরুলের বাড়ি। ইশকুল থেকে ফেরার পথে সেদিন…’
বলেই চুপ করে গেল লাল্টু। ঝুনু ছদ্মরাগে চোখ পাকিয়ে বলল, ‘ওরে দুষ্টু, তবে যে বললি ইশকুলের দিদিমণি নাকি দেরি করে ছেড়েছে! মণিরুলের বাড়ি সিনেমা দেখছিলি?’
ইসসস! পিসির কাছে কীভাবে ফেঁসে গেল। ছোট্ট ভাইপোটার বালখিল্য দেখে মনে মনে হাসল ঝুনু। লাল চোখ দুটোয় মায়া ভরিয়ে ছোট্ট ভাইপোটার দিকে তাকায় ঝুনু। ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘এই যা ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছিস তাতেই আমার সব ব্যথা সেরে গেছে রে। দেখিস, তুই বড়ো হয়ে মস্ত ডাক্তার হবি। অনেক মানুষের সেবা করবি।’
‘ধুস। ডাক্তার হতে তো অনেক পয়সা লাগে। অত টাকা কে দেবে ছোপ্পি?’
‘ইচ্ছে থাকলে ঠিক জুটে যাবে দেখিস।’
কী জানি কেন, আলতো হেসে কথাটা ঘোরায় ঝুনু। বলে, ‘এই তো ন্যাড়া মাথায় কেমন গুড়ি গুড়ি চুল উঠেছে। সুন্দর লাগছে। তবে যে বড় ন্যাড়া হতে চাইছিলি না!’
‘ছোপ্পি।’
‘বল।’
‘কেউ মরে গেলে ন্যাড়া কেন হতে হয় রে?’
লাল্টুর প্রশ্নটার মধ্যেই যে একটা উষ্ণ প্রতিবাদ ও বিরক্তি মিশেছিল এই রীতিটার বিরুদ্ধে সেটা ঝুনু বুঝল। বলল, ‘এটাই নিয়ম!’
‘তাহলে তুই মরে গেলে পিসেমশাই ন্যাড়া হবে?’
পেটের ভেতরটা নতুন করে মুচড়ে উঠল ঝুনুর। স্বামীর আর কিছুতে জোর না থাক দুটো পায়ে ভালোই জোর আছে। কে জানে, ভিতরের নাড়িভুঁড়িগুলো হয়তো তাদের জায়গাগুলো পালটে নিয়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঝুনু বলে, ‘স্বামীরা ন্যাড়া
হয় না। যে মারা যাচ্ছে তার ছেলেদের ন্যাড়া হতে হয়। এখন সর তো, রান্না না করলে খাবি কী?’ ঝুনু বিছানা থেকে নামতে গিয়েই লাল্টুর কথা শুনে থেমে গেল। লাল্টু বলল, ‘আমি আর খাব না রে ছোপ্পি। তোকে আবার মারবে।’
‘সে তুই না খেলেও আমায় মার খেতে হবে।’
ঝুনু শাড়ির আঁচল সামলে নিয়ে ক্লান্ত শরীরে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। ঘরের কোণে একটা লোহার রড রাখা ছিল। সেটার দিকে তাকিয়ে হাতদুটোকে মুঠো করে লাল্টু। বিছানার চাদরটা লাল্টুর হাতের মুঠোয় কুঁচকে যায়।
***
স্বয়ম্ভু লালবাজারে পা দিয়েই সোজা সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টে সেঁধিয়ে গেল। দ্রুত পায়ে প্রদ্যুতের কাছে যেতে যেতেই প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘প্রদ্যুৎ আর কতক্ষণ ভাই?’ স্বয়ম্ভুকে দেখামাত্রই প্রদ্যুতের মধ্যে একটা চঞ্চলতা লক্ষ করা গেল। ‘এই তো স্যার, আমি ভাবছিলাম আপনার কাছেই যাব।’
‘কিন্তু গেলে না। বলো।’
‘সাতজনের ফোন নম্বর বিলে আছে। তাদের খবরাখবর পেয়েছি। কারণ তারা অনলাইন ট্রান্সকশন করেছিল। কিন্তু তিনজন ক্যাশ পেমেন্ট করেছিলেন। তাদের তো…!’
প্রদ্যুতের মুখের ভাবই বলে দিচ্ছে স্বয়ম্ভু এখানে বিশেষ সুবিধে করতে পারবে না। গম্ভীর হয়ে নিজেই বিড়বিড় করল, ‘মানে সেদিন মিত্র ক্যাফেতে দশজন খরিদ্দার কাটলেট খেয়েছে বা নিয়েছে।
‘রাইট স্যার।’
‘যাঁদের পেয়েছ তাঁদের কীরকম প্রোফাইল?’
প্রদ্যুৎ একটা হাই তুলে চট করে একটা ফাইল থেকে প্রিন্ট আউট বের করল। ‘এই যে স্যার।’ পেপারটা হাতে নিয়ে একবার চোখ বোলালো স্বয়ম্ভু। সাতজনের মধ্যে চারজন মেয়ে ও তিনটে ছেলে। এদের প্রত্যেকের নামের পাশে তাদের বয়স আর ঠিকানা লেখা। কিন্তু যারা ক্যাশে পেমেন্ট করেছে তাদের সন্ধান পাবে কোত্থেকে স্বয়ম্ভু। সবথেকে বড়ো কথা, যে বিশেষ বিলটি সুমিতা ধরের লাশের পাশে পড়েছিল সেটা ক্যাশ পেমেন্ট হয়েছে। বিট্টু দেবনাথ হতেই পারে। মুখ থেকে তাৎক্ষণিক পরাজয়ের একটা অভিব্যক্তি বেরিয়ে এল স্বয়ম্ভুর। প্রদ্যুৎ ভাবল এ হয়তো তার কিঞ্চিৎ অপারগতার জন্যেই। ‘স্যার, ক্যাশ পেমেন্টের বিল থেকে কীভাবে লোক খুঁজে পাব বলুন? তাও যদি ফোন নম্বর থাকত তাহলে না হয়…!’
‘না না প্রদ্যুৎ, ইউ হ্যাভ ডান আ রিয়েলি গ্রেট জব। আজ আপাতত কোনও কাম কাজ নেই। তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে একটা ঘুম দাও।’
‘না না স্যার, ঠিক আছে।’
কৃতজ্ঞতা আর ভালো লাগায় ভরে গেল প্রদ্যুতের চোখ মুখ। স্বয়ম্ভু চলে যেতে আরেক সহকর্মী নিজের কাজ করতে করতেই বিচ্ছিরি রকমের একটা আওয়াজ করে হাই তুলল। দু-হাত মাথার ওপর তুলে আড়মোড়া ভাঙতে গিয়ে দেখল প্ৰদ্যুৎ কটমট করে তার দিকে চেয়ে আছে। বছর বাহান্নর লোকটা বলে উঠল, ‘সরি ভাই, আমাদের চোখের দিকে তো আর কেউ তাকায় না তাই একটু হাই তুললে শব্দ হয় আর কি!’ ভদ্রলোকের কথাটা ঠিক করে ফুরোলও না, তড়িৎবেগে একটা ডাক ঢুকে এল ঘরের মধ্যে। ‘সুকুমারদা…!’ প্রদ্যুৎ আর ভদ্রলোকটি তাকিয়ে দেখল পায়েতে ঘোড়ার খুরের শব্দ তুলে স্বয়ম্ভু ঢুকে এসেছে। ‘আপনার তো কাল রাতে ভালোই ঘুম হয়েছে। তাই আজ আপনি একটু রাত অবধি থাকবেন। যখন তখন দরকার হতে পারে আমার। প্রদ্যুৎ দেরি না করে বাড়ি যাও। কাল এসো।’ উত্তরেরও অপেক্ষা করল না স্বয়ম্ভু। কোনও এক দৈবমায়ায় চোখের নিমেষে উধাও হয়ে গেল। প্রদ্যুৎ তার ঘুম জড়ানো লাল চোখ তুলে সুকুমারের দিকে তাকাল। ‘এই জন্যেই বলে, বেশি আওয়াজ করতে নেই।’ বলেই নীরবে একটা বড়ো হাই তুলে ব্যাগটা কাঁধে তুলে ঘর ছাড়ল প্রদ্যুৎ। সুকুমারেরও এবার একটা বড়ো হাই উঠল কিন্তু শব্দ হল না। ধ্যাৎ! জিনিসটা বড়ো ছোঁয়াচে!
ষাটোর্ধ্ব মহিলাটি ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে।
‘এই পায়ের অবস্থাও খারাপ।’
ডক্টর দিব্যময় মহিলাটির হাঁটুতে চাপ দিয়ে ডান পা-টা ভাঁজ করছিল। মহিলাটি প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে ওঠে, ‘পা সোজা করে হাঁটতে পারি না ডাক্তারবাবু। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে প্রাণ বেরিয়ে যায়।’
‘যাবেই তো। বাঁ হাঁটু এমনিতেই মাইনাসে রান করছে। নিন উঠে পড়ুন।’
দিব্যময় এসে নিজের চেয়ারে বসল। সামনে মহিলাটির ছেলে উদ্বিগ্ন মুখে বসে। চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে দিব্যময়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট। ফর্সা, সুন্দর চেহারা। উচ্চতা পাঁচ ফুট সাতের বেশি নয়। মাথার বাঁদিকে সিঁথি কাটা ঠাস কালো চুল। নদীর জলে হালকা ঢেউয়ের মতো চুলেও একটা দৃষ্টিমনোহর তরঙ্গ আছে। শুধু দুটো কানের পাশে আর মাথার পিছনদিকের বেশ কিছু চুল অল্প বয়সেই পেকে গেছে। দিব্যময় তাকেই ডাকল এবার, ‘অতনু এক্স রে রিপোর্টগুলো দে তো।’
‘হ্যাঁ স্যার।’
পাশের টেবিলের ওপরে রাখা ছিল দুটো এক্স রে প্লেট। এগিয়ে দিল দিব্যময়কে। প্লেটদুটো ভিউবক্সে ফেলে খানিকক্ষণ দেখল দিব্যময়। তারপর বলল, ‘দেখুন, দুটো হাঁটুরই খুব খারাপ অবস্থা। এখন ফিজিওথেরাপি আর ওষুধ খেয়ে দেখতেই পারেন। কিন্তু আমি সাজেস্ট করব এই ধরনের পেশেন্টকে ফেলে না রেখে ইমিডিয়েট অপারেট করিয়ে নিন। নইলে ব্যাপারটা আরও ক্রিটিক্যাল হয়ে যাবে। আর যত বেশি হাড় ক্ষয়ে যাবে তত অপারেশনের পরেও রিকভারির চান্স কম।’ ছেলেটি ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করল, ‘দুটোই?’
‘করা যেতেই পারে। তবে ওনার যা বয়স তাতে একটা একটা করে করাই বেটার। পোস্ট অপারেটিভ নি রিপ্লেসমেন্টে প্রচুর যন্ত্রণা হয় এবং সেটা পেশেন্ট যত নিতে পারবে তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে।’
‘মা কি আদৌ সুস্থ হবে?
‘হবে মানে? দৌড়োবে।’
এই কথাগুলোর মাঝেই অতনুর মোবাইল দু-বার কেঁপে উঠেছে। দু-বারই কেটে দিয়েছে। অতনু একটু উশখুশ করছে দেখে দিব্যময় বলে ওঠে, ‘অতনু, ফোনটা ধরে নে।’
‘না না স্যার। সেরকম কিছু নয়।’
চোখ তুলে এক পলক অতনুর চোখে চোখ রেখে দিব্যময় বলে, ‘শিওর?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘মাসিমাআআআ, ভয় পাচ্ছেন নাকি?’
যেন ছেলের বন্ধু কথা বলে উঠল, এমনভাবেই বয়স্কার কাছে গিয়ে সাহস দিল দিব্যময়। ভীতু মুখটায় হাসি ফুটল। ছেলে জিজ্ঞেস করল, ‘ডাক্তারবাবু কীরকম খরচা হবে?’
‘মেডিক্লেম আছে?’
ছেলেটি দু-পাশে ঘাড় নাড়ল। দিব্যময় অবাক হয়ে বলল, ‘সে কি! একটা মেডিক্লেম করোনি?’ ছেলেটি আনত চোখে বলল, ‘ছিল। বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। চালাতে পারছিলাম না। কোভিডে বাবা চলে গেল। পেনশনও নেই। আমার যে চাকরিটা ছিল সেখান থেকেও স্যালারি কমিয়ে দিল। তারপর যাও বা বাড়াল তাতে সংসার চালিয়ে আর মেডিক্লেম করাটা সম্ভব নয়।’ দিব্যময় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ‘তাহলে?’ ছেলেটি বলল, ‘আপনি বরং ওষুধই দিন তাতে যদ্দিন মা সুস্থ থাকে।
‘লাখখানেক জোগাড় করতে পারবে?’
দিব্যময়ের কথা শুনে ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘লাখখানেকে হয়ে যাবে?’
‘আমার ফিজ এক লাখ আশি। সেটা না হয় মুকুব করে দিলাম। বলে কয়ে হসপিটালের বিলটাও না হয় কিছু কম করা গেল। কিন্তু মিনিমাম লাখখানেক তো লাগবেই ভাই।’
হতাশায় ভরা ছেলেটির মুখে কিঞ্চিৎ আলোর রেখা। ‘হয়ে যাবে মনে হয়। আমি একটু দেখে নিই।’
‘বেশ দেখে নিয়ে জানাও।’
দিব্যময়ের এমন রূপ অতনু অনেকবার দেখেছে। এমনি এমনি কী আর ডক্টর দিব্যময় মুখার্জির লেজুড় হয়ে পড়ে আছে।
‘স্যার।’
দিব্যময় চোখ তুলল। অতনু বলল, ‘এই সোমবার যে ওটিটা আছে সেখানে কী আমি…’
‘থাকবি। এখন থেকে আমার সবকটা ওটিতেই অ্যাসিস্ট করবি।’
‘থ্যাংক ইউ স্যার। থ্যাং ইউ সো মাচ।’
‘নেক্সট।’
.
দেয়ালে ঝোলানো ছোটো একটা ঠাকুরের সিংহাসন। সেখানে দাঁড়িয়েই ধূপ দেখাচ্ছে বাণীকণ্ঠ। এক বালতি কাপড় কেচে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায় মন্দাকিনী। ‘আমি ছাদে গেলাম কাচাগুলো মেলতে। এসে খেতে দেব।’ বাণীকণ্ঠ ঘুরেও তাকাল না। মন্দাকিনী সিঁড়ি দিয়ে তরতরিয়ে উঠে ছাদে গেল। ন্যাড়া ছাদ। ফুরফুর করছে হাওয়া। বালতিটা রেখেই চুড়িদার তুলে কোমরে গোঁজা ফোনটা বের করল। সিঁড়ির দিকটা ভালো করে দেখে একটা নম্বর ডায়াল করল। খানিক চুপ থেকে গলা চেপে বলল, ‘খালি কেটে দিচ্ছিলে কেন ফোনটা?
অতনুর এবার ফুরসৎ মিলেছে ফোনটা রিসিভ করার। হাসপাতালের চারতলার ফাঁকা টেরেসে গিয়ে ফোনের ওপারে থাকা মানুষটার কথার উত্তর দিয়ে চলেছে, ‘পেশেন্ট ছিল তো। ধরব কীভাবে? জরুরি কিছু?’
মন্দা ছাদের সিঁড়ির দিকে একদৃষ্টে নজর রেখে কথা বলছে, ‘বলছি আমাদের বাড়িতে গোয়েন্দাটা এসেছিল।’
আশঙ্কায় ভুরুটা কুঁচকে উঠল অতনুর, ‘কেন? কী চায়?’
মন্দা বলল, ‘চাইবে আবার কী? প্রশ্নের পর প্রশ্ন। আমি কখন বাচ্চাটাকে নিয়ে গেলাম। কী দেখলাম? পোকাশ আমায় কিছু বলেছে কি না, এ সব। মেসোকেও ছাড়েনি। আর সঙ্গে রয়েছে বিটকেল। উফফফ! ব্যাটা পুলিশ যা পোশ্ন করছে, বিটকেলটাও সেই কথাগুলো আওড়ে চলেছে।’
অতনুর মুখে চিন্তার ছায়া। একটা ঢেঁকুর উঠতেই মুখটা টক হয়ে গেল, ‘কী মনে হল? ঝামেলা করতে পারে?’
সন্দিগ্ধ মনে মন্দার উত্তর, ‘সেরকম কিছু তো মনে হল না। তবে খামোকা আমাদের বাড়িতেই কেন এল কে জানে?’
অতনুর গলার স্বর ধরে এল, ‘এই ধরনের লোকেরা অনেক কায়দা জানে। এরপর যদি আবার আসে তখন কী করবে?’
মন্দাকিনী আঙুলের ফাঁকে কোঁকড়া চুল পাকাতে পাকাতে রোয়াব নিল, ‘শোনো আমিও মন্দাকিনী। সাত ঘাটের জল খাওয়া মেয়ে। আমায় লেবড়ে দেওয়া এত সোজা না। সত্যি যদি ল্যালা হতাম তাহলে এদ্দিন পড়ে পড়ে ওই পোকাশের মায়ের মতো মার খেতাম। যাক গে শোনো, এখন রাখছি। মেসো এক্ষুনি চেল্লাবে। রাখি।’
আবারও একটা ঢেঁকুরের শব্দ ফোনের ওপার থেকে কানে আসতেই মন্দাকিনী গলা চেপে গোয়েন্দা হয়ে গেল, ‘তুমি আবার সাতসকালে ভাজাভুজি খেয়েছ? কী করে খাও বলো তো?’
মাথায় গভীর ভাবনার বোঝা নিয়েই অতনু আলতো হেসে ফোনের স্পিকারে চুমু খেল।
ঠোঁটজুড়ে একটা আহ্লাদি হাসি ছড়িয়ে মন্দাকিনী বলে উঠল, ‘থাক। খুব হয়েছে।’
বাণীকণ্ঠ পুজো সেরে পাশের ঘরে ঢোকে কাপড় বদলাতে। কী যেন মনে হয় মানুষটার, আজ বাড়িতে যে গোয়েন্দা এসেছিল, চাড্ডি প্রশ্ন করে মাথা খেয়ে গেছে, এ সব কি একবার বাবুকে জানাবে? এখন তো হসপিটালে চেম্বার করছে। ব্যস্ত। নাহ! তাও জানানো উচিত। পরে কোনও গন্ডগোল হলে তখন বাবুই বাপকে তুলোধোনা করে ছাড়বে। কিন্তু ভাবাই সার। তন্নতন্ন করে খুঁজেও সারা ঘরে ফোনটা খুঁজে পেল না। কাপড় না বদলেই দ্রজা খুলে বাইরে এল। মন্দার নাম ধরে হাঁক দিল। বাইরে খাবার টেবিল, মেঝের আনাচকানাচ, পাশের ঘর কোত্থাও মোবাইলটা নেই। বাড়িতে তো মাত্র দুজন মানুষ। ডিটেকটিভ আর পুলিশ ছাড়া সকাল থেকে বাড়িতে কেউ আসেনি। তাহলে গেল কোথায়? আরও বারকয়েক মন্দার নাম ধরে গলা সেধে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল বাণীকণ্ঠ। বিটকেলও বার চারেক মন্দাকে ডেকে ফেলেছে। ঝনঝন করতে করতে খালি বালতিটা উঠোনের এক ধারে রেখে মন্দা বলে ওঠে, ‘বলেই তো গেলাম। এরপরেও তোমার এত হাঁকডাক কেন শুনি?’ বাণীকণ্ঠ হাই পাওয়ারের চশমার কাচ ভেদ করে ড্যালা ড্যালা দুটো চোখ পাকিয়ে বলল, ‘আজকাল তোর বড্ড চোপা হয়েছে মন্দা। বলি আমি মালিক না তুই মালিক?’
‘উফফফ বাবা রে বাবা। তুমি আমার মালিক, আমি তোমার ঝি। হল? কী বলবে বল।’
‘আমার ফোনটা কোথায় গেল?’
তুতলে উঠল মন্দা, ‘আচ্ছা জ্বালা তো। তো…তোমার ফোন কী আমি নিয়ে ঘুরছি নাকি? দেখি সরো।’
‘তবে কি গোয়েন্দা এসে চুরি করে নিয়ে গেল?’
উত্তর দিল না মন্দাকিনী। শুধু সরসর করে সাপের মতো এঁকেবেঁকে একটা ঘরে ঢুকে গেল। চুড়িদারের তলা থেকে ফোনটা বের করে সোফার একটা খাঁজে গুঁজে রাখল। তারপর বেরিয়ে আসতেই বাণীকণ্ঠ বলল, ‘পেলি?’
‘না। দাঁড়াও। আমার ফোন থেকে ফোন করে দেখি।
মন্দাকিনীর কম দামি অ্যান্ড্রয়েড ফোনটা উলটোনো হাঁড়িটার ওপর রাখা ছিল। সেখান থেকে নিয়ে কল করতেই শোনা গেল কোথাও থেকে যেন ফোনটা বাজছে। উদ্ধার করে আনল মন্দাকিনীই। ‘এই তো সোফার খাঁজে পড়েছিল। নিজে যেখানে সেখানে রাখবে আর আমায় দিনরাত ঘাড় ধরে বের করে দেবার হুমকি দেবে। চলো খাবে চলো। প্রেশারের ওষুধটা খাও।’ মন্দা চলে যাচ্ছিল। বাণীকণ্ঠ ডাকল, ‘দাঁড়া।’
‘কী হয়েছে?’
ফিরে দু-পা এগিয়ে এল মন্দা। বাণীকণ্ঠ মন্দার চোখে চোখ রেখে এগিয়ে গেল। মন্দার বুকটা ছ্যাঁক করে উঠল। বুড়োটা কি ধরে ফেলেছে মন্দাকিনীর চালাকি?
‘কী… কী হয়েছে?’
‘কাল বিকেলে আমি যখন ক্লাস করাচ্ছিলাম তখন কোথায় বেরিয়েছিলি?’
‘ক্যা… ক্যানো? বলেই তো গেলাম, ও পাড়ায় আমার এক বন্ধু কাজ করে সুজাতা তার ঘরে যাচ্ছি।’
বলেই ঢোক গিলল মন্দা।
‘তোর বন্ধু কী কাজ করে?’
‘আমার মতোই। বাসন মাজে।’
‘মাইনে কত পায়?’
‘ক্যানো বলো দিকি? এত খবরে তোমার কাজ কী?’
বাণীকণ্ঠ এবার একটা কাগজের টুকরো বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘এটা কোত্থেকে এল? কে খাওয়াল কাটলেট? সুজাতা?’
মন্দা ঝপ করে বিলটা কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে। বাণীকণ্ঠের সন্দেহ আরও বাড়ে। মন্দা বলে, ‘লোকের বাড়ি খেটে খাই বলে কি একটা কাটলেট ও খেতে পারি না?’
‘একদম কথা ঘোরাবি না মন্দা। আমি মোটেও তা বলিনি।’
‘তাহলে জানতে চাইছ কেন, সুজাতা খাওয়াল না আমি খাওয়ালাম?’
কথাটা শেষ করে এক দণ্ড বাণীকণ্ঠের সামনে দাঁড়াল না মন্দাকিনী। লাঠির ঘা খাওয়া সাপিনীর মতো কোমর হেলিয়ে অন্য ঘরে চলে গেল।
মুখোমুখি স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। মাঝে খাবার টেবিল। একটা ছেলে খাবার ভর্তি দুটো থালা রেখে দিয়ে গেল। স্বয়ম্ভু মোবাইল কানে দিয়েই চোখের ইশারায় শিবাঙ্গীকে শুরু করতে বলল। শিবাঙ্গী চোখ টিপল।
‘হ্যাঁ রতন, বলছি ছেলেটাকে ঠিকঠাক হোমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তো?… বেশ। কোনও অযত্ন যেন না হয়। একটু নজরে রাখতে বোলো ছেলেটাকে। সবে এমন একটা ঘটনা… হুম। আর বস তো এখনও কিছু জানাল না আমায়… কী ব্যাপারে
আর? মিনতি গুহর স্বামীকে জেরা করে কিছু পেল কি না!… হুম। দেখো তো একটু। রাখলাম।’
ফোনটা কেটে ভাতের থালাটাকে সামনে টানল। ‘তুমি কেন বসে আছ? শুরু করো বললাম।’
‘আমার অবাক লাগছে।’ শিবাঙ্গী বলল।
‘কীসে?’
‘আগের কেসে তো সব জেরা নিজে করেছেন। কাউকে ছাড়েননি। এই কেসে মিনতি গুহর বরকে ওই বাতেলাবাজ সুরঞ্জনের ওপর ছাড়লেন। বাচ্চাটাকেও কিছু প্রশ্ন করলেন না।’
স্বয়ম্ভূ তাকাল। শিবাঙ্গী বুঝল, তার বসের মুখে হাসি নেই ঠিকই, চোখে চোখে ভালোই হাসেন। মানে মনে মনে হাসলেই সেটা চোখে ফুটে ওঠে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘স্বামী-স্ত্রীর পেটাপিটি নিয়ে আলাদা কিছু জানার নেই তো। আর বাচ্চাটার মা এখনও লাশকাটা ঘরে। এরপর ওইটুকু ছেলে গিয়ে মায়ের মুখে আগুন দেবে। একটা নৃশংস মুহূর্ত রচনা হবে তাকে নিয়ে। তার আগে একটু নিজেকে সামলে নিক।
‘ওকে জেরা করে কিছু পাওয়া যাবে না বলছেন?’
পোস্তর কটা আলু ডাল দিয়ে মাখা ভাতের মধ্যে টেনে স্বয়ম্ভু বলল, ‘এইটি ফাইভ পার্সেন্ট চান্স নেই। এই দেখেছ, রতনকে কল করলাম অথচ জিজ্ঞেস করলাম না ওই সিসিটিভির মহিলার ছবি থানাগুলোতে গেছে কিনা!’
‘গেছে।’
শিবাঙ্গী জানাল। বলল, ‘পার্কস্ট্রিট থানায় আমার এক বন্ধু আছে। সেই ফোন করেছিল।’
‘বন্ধু?’
‘হুম।’
স্বয়ম্ভুর কথার রিফ্লেক্সে উত্তরটা বেরিয়ে এলেও ‘বন্ধু’ বলার ধরনে অন্য কিছুর যেন ইঙ্গিত! শিবাঙ্গী ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কেন? থাকতে পারে না?’
‘তা কেন থাকবে না? অবাক লাগে একটা কথা ভেবে অর্ধেক সময়েই তো আমার পেছু পেছু এঁটুলির মতো লেগে থাকো। চারপাশের থানায় এত বন্ধু পাতাও কখন?’
শিবাঙ্গী ঘাড়ের সঙ্গে ভুরু নাচাল। খাবার চিবোতে চিবোতে আলতো হাসি ঠোঁটে রেখে বলল, ‘ক্যালি থাকা চাই।’
‘তা ঠিক।’
বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল স্বয়ম্ভুর। বলল, ‘খেয়ে উঠে একটু তোমার সঙ্গে বসব। এই সম্পূর্ণ ব্যাপারটাকে সাজাতে হবে।
‘ওকে স্যার।’
স্বয়ম্ভুর মুখটা বেঁকে গেল। বলল, ‘আছ তো ক্যান্টিনে। এখানেও স্যার স্যার কোরো না তো।’
‘এটা অফিস ক্যান্টিন স্যার। চিত্তবাবুর ক্যান্টিন নয়। আর এই ঘর পালটে পালটে ডাক পালটাতে পারব না স্যার, সরি।’
ড্যাপড্যাপে বাঁকা চোখে স্বয়ম্ভু চাইল শিবাঙ্গীর দিকে। ছদ্ম ধমকানি দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি খাও। লেক থানায় যাব।’ শিবাঙ্গী প্রথম চোটে ঘাড় নেড়েই থমকে গেল। ‘লেক থানা কেন? এই তো বললেন আমায় নিয়ে বসবেন।’
কাঁটা বেছে মাছটা মুখে তুলে স্বয়ম্ভু বলল, ‘না বসে যদি ঘুরি তাতে প্রবলেম আছে?’
‘আজকাল আপনি বড্ড ফ্রিকল মাইন্ড হয়ে গেছেন, স্যার।’
শেষের শব্দটায় একটু বেশিই জোর দিয়ে নিজেই ফিক করে হাসল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু পাত্তাও দিল না। মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে বলল, ‘শুরু থেকে শুরু করতে হবে শিবাঙ্গী। আমরা পঞ্চম খুন থেকে ধরে কিছু সমাধান করতে পারব না।’
‘তাহলে তো হরিদেবপুর পুলিশ স্টেশন দিয়ে শুরু করতে হয় আমাদের।’
‘কবরডাঙ্গার কেসটা ফ্ল্যাট। লক্ষ্মীরানির কোনও প্রেমিক নেই। পুরোনো কোনও কেস নেই। স্বামী শম্ভু বা শাশুড়ি কেউ মারেনি। লক্ষ্মীর ওপর কারও কোনও রাগ নেই। সুইসাইড তো করেইনি। একমাত্র সে স্বামী শাশুড়ির দ্বারা অত্যাচারিত হত।’
‘তার মানে তো খুন সেই করেছে মানে অন্যান্য কেসগুলো যে ঘটিয়েছে।’
‘একদমই তাই।’
‘কিন্তু কেন? এমনি-এমনি খুনির খুন করতে ইচ্ছে হল আর রাতে বেরিয়ে যাকে দেখল মেরে দিল তা তো নয়!’
‘এইখানেই লক্ষ্মীরানির কেসটা ফ্ল্যাট। যে কেসে খুনির কোনও মোটিভের খোঁজই পাওয়া যায় না সেই কেস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা মানে সময় নষ্ট। তার চেয়ে একই কেসে, যেখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে একজন বিশেষ লোকই খুন করেছে এবং সেইসব ভিক্টিমদের গল্পে কিছু মোচড়ও আছে সেইগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে হয়তো কিছু মিললেও মিলতে পারে। তারপরে তো রইলই লক্ষ্মীরানি।’
স্বয়ম্ভু কথাশেষে খেয়াল করল শিবাঙ্গী বাঁ হাতটা গালে দিয়ে স্বয়ম্ভুর মুখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে আছে।
‘কী হল? হাঁ করে কী দেখছ?’
শিবাঙ্গী তার পোজ থেকে বিন্দুমাত্র না নড়ে বলল, ‘কেস নিয়ে কথা বললেন না জিলিপি ভাজলেন কিচ্ছু বোঝা গেল না।’
‘বুঝবে। লগে লগে আছ তো।’
.
‘শুভ সন্ধে দিব্যেন্দুবাবু। পারমিশন না নিয়েই ঢুকে পড়লাম।’
এক্কেবারে সোজা লেক থানার ইন্সপেক্টর দিব্যেন্দু পাড়িয়ার ঘরে হানা দিল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী।
‘আরে স্যার, আসুন আসুন। আপনি কষ্ট করে এলেন কেন? আমায় খবর দিলেই
তো পারতেন।’
সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভুর হাসি-হাসি মুখটা পালটে গেল। কিঞ্চিৎ ফ্যাকাশে মুখে বলল, ‘অ। অ্যাদ্দিন বাদে দেখা হল সেটা পছন্দ হল না!’
দিব্যেন্দু পাড়িয়া লজ্জায় গড়াইয়া পড়িল। ‘ছি ছি স্যার কী যে বলেন। বসুন প্লিজ। ম্যাডাম প্লিজ।’ হাত দিয়ে চেয়ারের দিকে নির্দেশ করল দিব্যেন্দু।
‘মঞ্জু বসাক নামের এক আনাজবিক্রেতা গত বছর আপনাদের থানায় এসে ডায়েরি করে দীননাথ দাস নামের এক ব্যক্তির নামে। দীননাথের ঢাকুরিয়া রেলস্টেশনে চায়ের দোকান ছিল।’ স্বয়ম্ভু বলে।
‘হ্যাঁ। যাদবপুর পি এস-এর ডিউটি অফিসার কুশল পাণ্ডে এসেছিলেন আমার কাছে। দীননাথের স্ত্রীর মার্ডার হয়েছে তো মাসখানেক আগে।’
‘ইয়েস। এটার ডিটেলস চাই।’
‘স্যার ডিটেলস বলতে কিছুই প্রমাণ হয়নি। কিন্তু সাক্ষীসাবুদ যা ছিল মানে ওই বস্তির লোকজন আর কী, তারা বলেছিল দীননাথ নাকি মঞ্জুর বাড়িতে অনেক রাত কাটিয়েছে। তারা দেখেছে ভোরবেলা মঞ্জুর ঘর থেকে বেরোতে। কিন্তু দীননাথের স্ত্রী ব্যাপারটা পুরো ডিনাই করেন। উনি বলেছিলেন, দীননাথ নাকি রাতে বাড়িতেই থাকত।’
‘সে তো হাজব্যান্ডকে বাঁচাতে।’
শিবাঙ্গী বলে ওঠে। দিব্যেন্দু জানায়, ‘সেরকমই। এক্ষেত্রে মঞ্জু প্রেগনেন্ট হয়ে পড়লে না হয় কথা ছিল কিন্তু সেক্ষেত্রে দীননাথ টনটনে। কেসে কোনও ছ্যাঁদা রাখেনি। তাই কেসটা ধোপে টেকেনি।’
‘মঞ্জু কি অবিবাহিতা?’
‘না না। স্বামী মরে গেছে। বাড়িতে একাই।’
‘সোনায় সোহাগা। মঞ্জু কী বলেছিল? দীননাথ জোর করত?’
‘না। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু স্ত্রী বোধহয় কোনওভাবে জেনে ফেলে অশান্তি করে।’
‘কী করে জানলেন?’
‘আশপাশের বাড়ির লোকজনই বলেছিল। আসলে গায়ে গায়ে বাড়ি তো তাই অনেকেই অনেক কথা শুনেছে। যদিও আসল সময়ে কেউই মুখ খোলেনি।’
শিবাঙ্গী মুখ খুলল, ‘স্যার আমার মনে হয় একবার মঞ্জুর সঙ্গে কথা বলি আমরা। ওর বাড়ি যাই।’
‘দিব্যেন্দুবাবু যাবেন নাকি?’
স্বয়ম্ভু আচমকা জিজ্ঞেস করে। ঢোঁক গেলে দিব্যেন্দু। ‘এখুনি?’
‘হ্যাঁ। কেন অসুবিধে আছে?’
‘না মানে ও তো আনাজ বিক্রি করে স্টেশন বাজারে।’
‘তাতে কী?’
‘এখন ও কাজে আছে।’
স্বয়ম্ভু সোজা হয়ে বসে একটু দিব্যেন্দুর দিকে এগিয়ে যায়। বলে, ‘আমি এখুনি যেতে চাই। আপনি ব্যবস্থা করুন।’ দিব্যেন্দু আমতা আমতা করে বলে, ‘আসলে স্যার কদিন আগেই মঞ্জুর বাড়িতে পুলিশ গিয়েছিল বলে স্থানীয় এম এল এ-র ছেলে এসেছিল পার্টির ছেলেপুলেদের নিয়ে। কেন মঞ্জুকে থানায় ডেকে আনা হয়েছে। এভাবে একলা মেয়েমানুষকে পুলিশ কীভাবে হ্যারাস করতে পারে এ সব নিয়ে খুব হুজ্জোত করে।’
‘আর তাই পুলিশও ল্যাজ গুটিয়ে বসে থাকবে? অদ্ভুত।’
‘তা নয় স্যার। আসলে বুঝতেই তো পারছেন রুলিং পার্টির ঝামেলা…’
‘লিসন দিব্যেন্দুবাবু, আপনার গায়ে কিন্তু এখনও এই উর্দিটা আছে। আর সেটা পরেই আপনি এই কথাগুলো বলছেন একজন সরকারি গোয়েন্দাকে।
‘সরি স্যার।’
‘ব্যবস্থা করুন। বাজারে নাকি বাড়িতে?’
পুলিশের গাড়িটা যখন ঢাকুরিয়া স্টেশন বাজারে পৌঁছোল তখন প্রায় সন্ধে হব হব খবর পাওয়া গেল আজ দুপুরেই মঞ্জু বাড়ি চলে গেছে। যথারীতি মঞ্জুর বাড়ির সামনে এসেই গাড়িটা থামল। একতলা পাকা বাড়ি। সদ্য রং হয়েছে। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে শিবাঙ্গী বলল, ‘মঞ্জুর আনাজের বিক্রিবাটা বেশ ভালোই মনে হচ্ছে।’ দিব্যেন্দু একটু বোকা বোকা হেসে শিবাঙ্গীর দিকে তাকায়। স্বয়ম্ভু গলার স্বরে একটু মেজাজ এনেই বলে, ‘যান ডাকুন মঞ্জুদেবীকে।’ দিব্যেন্দুও পালটা হুকুম ছুড়ল তাঁর অধস্তনকে। সেই লোকটিও অমনি তুড়ুক তুড়ুক লাফিয়ে বাইরের লোহার ছোটো গেটটি খুলে ভিতরের গেটের পাশে লেপ্টে থাকা বেলটি দু-বার টিপে দিল। ভিতর থেকে সাড়া না পেয়ে আবার বেল দিল। স্বয়ম্ভু হাত উলটে ঘড়ি দেখে মুখ তুলতেই কী যেন একটা দেখতে পেল। চোখটা চলে গেল মঞ্জুর বাড়ির পাশের সরু গলিটায়। এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে কিছুটা ছুটে গেল গলি দিয়ে। শিবাঙ্গী আর দিব্যেন্দু থ। শিবাঙ্গী যাবে কী যাবে না ভাবতে না ভাবতেই দেখল স্বয়ম্ভু বাড়ির শেষ মাথায় গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পকেট থেকে মোবাইল বের করল। কী যেন রেকর্ড করল।
‘স্যার কী করছেন?’
শিবাঙ্গী এক পলক দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বোধহয় কোনও ধেড়ে ইঁদুর দেখতে পেয়েছেন।’ শিবাঙ্গীর এহেন হেঁয়ালি উত্তরে দিব্যেন্দুর ভুরু কুঁচকে গেল।
স্বয়ম্ভু মোবাইলটাকে পকেটে পুরে গেটের কাছে এসে দেখে তখনও গেট খোলেনি। মনের আনন্দে পটাপট কলিংবেলের সুইচ টিপতে লাগল। দরজা খোলার শব্দ হতে সেই বেলের আওয়াজ থামল। চেককাটা শাড়ি। আঁচলটা কোমরে গোঁজা। গায়ের রং শ্যামলা। চোখ দুটো পটলচেরা না হলেও কালো মণিদুটোতে কিছু একটা
ব্যাপার আছে। যেন অজস্র কথা কালো নয়নতারার এপাশে ওপাশে নেচে বেড়াচ্ছে। উচ্চতা পাঁচ দুইয়ের বেশি কিছুতেই নয়।
‘কী ব্যাপার সার? আবার আমার বাড়িতে।’
মঞ্জু যে বিরক্ত হয়েছে সেটা হাবেভাবে ভালো করেই বুঝিয়ে দিল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘এবার শুধু পুলিশ নয়। গোয়েন্দাও এসেছে। আমি, স্বয়ম্ভু সেন। মঞ্জু বসাক তো? বাবার নাম চিরঞ্জিৎ ঢোল। মা করুণাময়ী অনেক কাল আগেই মারা গেছেন। স্বামী বিজন বসাক গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করে।’
এত তথ্য শুনে মঞ্জুর মুখ শুকিয়ে যাবে এ তো স্বাভাবিক। কিন্তু সবথেকে দেখার মতো দিব্যেন্দুর বদন। যেন টিনের পাতে কেউ দমাদ্দম হাতুড়ি পিটিয়ে ভেঙে দুমড়ে দিয়েছে।
‘দরজাটা খুলুন। ভিতরে গিয়ে কথা বলব। নইলে বাড়িতে গোয়েন্দা এসেছে এটা লোকজন জানাজানি হলে খুব একটা ভালো হবে না।’
মঞ্জু আর একটা কথাও না বলে ছিটকিনি খুলতে থাকে। তখনই স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, ‘নার্ভের অসুখ আছে নাকি?’ গেট খুলতে খুলতেই মঞ্জু বলে, ‘আআ… আজ্ঞে না তো।’
‘তাহলে হাত কাঁপছে কেন? চলুন ভেতরে চলুন।’
স্বয়ম্ভূ ঘরে ঢুকল। সবুজ রং করা দেয়াল। জানলায় ঝোলানো লম্বা পর্দায় অজস্র চন্দ্রমল্লিকা ফুটে রয়েছে। ঘরে ঢুকেই শিবাঙ্গী নাক টানছে দেখে স্বয়ম্ভু বলল, ‘রজনীগন্ধায় তোমার এলার্জি নেই তো শিবাঙ্গী?’ কথার ইঙ্গিত বুঝল যোগ্য সহকর্মিনীটি। উত্তর দিল, ‘না থাকলেও হয়ে যাবে স্যার।’
‘বাড়িটাকে তো একেবারে ফুলের নার্সারি বানিয়ে ফেলেছেন মঞ্জু দেবী।’
‘মানে?’
‘জানলায় চন্দ্রমল্লিকা, ঘরের বাতাসে চড়া রজনীগন্ধা। বাড়িতে আর কে কে আছে?’
প্রশ্ন করতে করতেই গটমট করে ভিতরের ঘরে সেঁধিয়ে গেল স্বয়ম্ভু। সঙ্গে গেল শিবাঙ্গী আর দিব্যেন্দু। মঞ্জু অত্যন্ত বিনয়ী কণ্ঠে জবাব দিল, ‘কেউ না সার। আমি একাই।’
‘এখন আপনি একাই ছিলেন?’ এই প্রশ্নটা করল শিবাঙ্গী।
‘হ্যাঁ। আসলে আমার শরীর খারাপ বলে তাতাড়ি ঘরে চলে এসিচি। ঘুমোচ্ছিলুম। তাই তো দরজা খুলতে দেরি হল।’
‘দেরি? কই? আমরা তো একবার মাত্র বেল বাজালুম আর আপনি অমনি চলে এলেন।
মঞ্জুর দোখনে কথার ধরন নকল করেই বলে উঠল স্বয়ম্ভু।
‘কই নাতো। আপনারা তো অনেক্ষণ ধরে বেল বাজিয়েছেন।
‘বাওয়া! ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও আপনি শুনতে পেয়েছেন যে আমরা অনেকক্ষণ ধরে বেল বাজাচ্ছি?’
শিবাঙ্গী মাটির একটি নির্দিষ্ট জায়গায় হাঁটু মুড়ে বসে বলল, ‘শুধু তাই নয় স্যার, মঞ্জু দেবী বোধহয় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সিগারেটও খান।
সবার নজর শিবাঙ্গীর সামনের মাটিটায়। সিগারেটের ছাই পড়ে আছে। স্বয়ম্ভু ছাইয়ের দিকে তাকিয়েই বলল, ‘আসলে শিবাঙ্গী উনি তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে ওই পিছনের দরজাটা খুলে দেবার জন্য ছুটে যাচ্ছিলেন তো। তখনই মুখ থেকে সিগারেটটা মাটিতে পড়ে যায়। ওই দ্যাখো না ভিতরের ঘরের বিছানার চাদরটা ঘেঁটে কী অবস্থা। আপনারা তো ওই ঘরেই শুয়েছিলেন তাই না?’
‘হ্যাঁ স্যার। না… মানে আমি একাই…।’
‘ও হো সরি সরি, আপনি তো বললেন একা ছিলেন।’
‘তাহলে পিছনের দরজা খুলেছিলেন কেন?’
‘কে বলল?’
মঞ্জু উত্তেজিত।
‘খোলেননি? তাহলে বোধহয় আমারই ভুল। তবে মঞ্জু দেবী, সব ঠিকঠাক করলেন। সিগারেটের গন্ধ ঢাকতে রুম ফ্রেশনারও ছড়ালেন অথচ বিছানার চাদরটাকে টানটান করতে ভুলে গেলেন?’
দিব্যেন্দুর মাথার দশ হাত ওপর থেকে পুরো ব্যাপারটা বেরিয়ে যাচ্ছে। শান্তি দাসের মৃত্যুর তদন্ত করতে এসে এ সব প্রশ্ন কেন করছে?
মঞ্জু চুপ করে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, ‘আপনেরা কীসের জন্য এসেচেন বলুন তো।’
‘আপনার বাড়ির দরজা জানলাগুলো সব নতুন করিয়েছেন?’
মঞ্জুর প্রশ্নের উত্তর কিছুতেই এটা হয় না। তবু স্বয়ম্ভূ শেলের মতো প্রশ্ন ছুড়ে দিল। ‘হ্যাঁ। কেন?’
‘কাঠের মিস্তিরিকে সব টাকা মিটিয়ে দিয়েছেন?’
‘না। এখনও কিচু বাকি আচে। কেন বলুন তো? ও কি আমার নামে নালিশ করেচে?’
স্বয়ম্ভু হেসে ফেলে বলে, ‘ছুতোর খদ্দেরের কাছে টাকা পায়নি বলে কারও বাড়িতে গোয়েন্দা গেছে এ আমি কেন, কেউই শোনেনি। কী পাড়িয়া বাবু, আপনি এমন কেস পেয়েছেন নাকি?’
ফ্যাক করে হেসে দিব্যেন্দু জানাল, ‘না স্যার।’
‘যাই হোক, বাকি টাকাটা দেবার আগে ওই জানলাটা সারিয়ে দিতে বলবেন।’ স্বয়ম্ভুর কথা শুনে মঞ্জু থ। ভেবলে যাওয়া মুখটা দেখে স্বয়ম্ভূ আবার বলল, ‘লোকটা মহা ঠকান ঠকিয়েছে আপনাকে। এই দেখুন, আসুন…!’
বলেই আবার বাইরের ঘরে গিয়ে একটা জানলার পর্দা সরিয়ে স্বয়ম্ভু দেখায় জানলার পাল্লায় একটা গোল গর্ত।
‘এই দেখুন, নতুন জানলায় কেমন গোল করে একটা গর্ত করে রেখেছে। এটা তো ডিফেক্টিভ। তাই একদম টাকা দেবেন না।’
মঞ্জু ঢোক গিলছে। সকলে অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে। ছিদ্রে চোখ পাতলে বাইরে কে এসেছে তা স্পষ্ট দেখা যায়।
‘মঞ্জু দেবী, আপনার শরীরটা নতুন করে খারাপ করছে বোধহয়। এখানে বসুন। আসুন আসুন।’
বাইরের ঘরের সোফাটা দেখিয়ে কথাটা বলল স্বয়ম্ভু। গোয়েন্দার এমন আদর যত্ন যে সিঁদুরে মেঘ সে ভালোই বোঝে সবজিবিক্রেতা মঞ্জু।
‘না না ঠিক আচি।’
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে মঞ্জুর।
‘আরে বসুনই না। আমাদের আরও কথা আছে। দাঁড়িয়ে থাকলে মাথাফাতা ঘুরে পড়ে যেতে পারেন। বসুন।’
স্বয়ম্ভুর নির্দেশের তালে তাল মেলাল শিবাঙ্গী। একটু কড়াস্বরেই মঞ্জুকে বসার হুকুম করল। সিঙ্গল সোফাটায় মঞ্জু বসল। কুঁকড়ে। স্বয়ম্ভুর কথা মেনে দিব্যেন্দু আর শিবাঙ্গীও বসল। ঘরের মধ্যেই পায়চারি করতে করতে স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, ‘শান্তি দাসকে খুন করলেন কেন?’
মঞ্জুর মাথায় বজ্রাঘাত। কেঁপে উঠল। ‘আমি মারিনি সার। বিশ্বাস করুন। ওদের সাতে আমি কোনও সম্পক্কো রাখিনি।’ প্রায় কাঁদো কাঁদো মঞ্জু। ‘আমি তো কদিন আগেই এই সারদের বললুম। দিব্যেন্দুর দিকে তাকাল মঞ্জু। পালটা ঝাঁঝ দেখাল দিব্যেন্দু, ‘আবার বলবে। স্যার যতবার জিজ্ঞেস করবে বলবে।’
‘আচ্ছা মঞ্জু, দীননাথের সঙ্গে তোমার ঠিক কী সম্পর্ক ছিল?’
স্বয়ম্ভুর প্রশ্নে চোখ নামাল মঞ্জু। নীচু স্বরে বলল, ‘আমারে বিয়ে করবে বলেছিল মিনসেটা।
‘তুমি জানতে না ওর স্ত্রী, সন্তান সবাই আছে।’
‘পোখমে জানতুম না। দীননাথই পরে বলেছিল।’
‘তখন সরে আসোনি কেন?’
মঞ্জু চুপ। খানিক নীরবতার পর বলল, ‘ভালোবাসা করার পর কী করে সরব?’
‘ঠিক কথা। তোমাদের আবার ভালোবাসা হয় না, করো। তা মঞ্জু, ও তোমার কাছে আসত নাকি তুমি যেতে ওর কাছে?’
‘ওই আসত। আমার পেচু পেচু ঘর অবধি চলে এসচিল।’
‘এই বাড়িতে?’
মঞ্জু দুপাশে মাথা নেড়ে বলল, ‘তকন বস্তিতে থাকতুম। সেখেনে।
‘তারপর?’
‘তারপর একদিন বলল আমায় বিয়ে কত্তে পারবে না। ওর বউ ডিভোস দিচ্চে না। ক্যাচাল কচ্চে। আমি ক্ষেপে গেলুম। পুলিশে নালিশ করলুম।’
‘প্রমাণ তো হয়নি কিছু। তাহলে দীননাথকে এখান থেকে চলে কেন যেতে হল?’
‘ওই বস্তির লোগদের নে ঝামেলা করলুম। সব্বাই পোতিবাদ কল্লে। বলল, এখেনে এই নোংরা ফ্যামিলিকে থাকতে দেবে না। ওরা বাধ্য হল ঘর ছাড়তে।’
‘বাবা! তার মানে তোমাকে বস্তির লোকেরা খুব ভালোবাসে।’
‘হুম। তা তো বাসেই।’
এতক্ষণ ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিল স্বয়ম্ভু। এবার মঞ্জুর কাছে এসে দাঁড়াল। মঞ্জু ভয়ে ভয়ে ঘাড় তুলে স্বয়ম্ভুর মুখের দিকে চাইতেই আরেকখানা মোক্ষম প্রশ্নবাণ ছুটে এল মঞ্জুর দিকে।
‘এরা তো ওই বস্তির লোকই ছিল না যারা তোমার স্বামীর মৃত্যুর পর পুলিশের কাছে বয়ান দিয়েছিল যে তুমিই নাকি তোমার স্বামীকে জ্বালিয়ে দিয়েছ?’
মঞ্জুর শরীরের হাড়গুলোর খটখট স্বয়ম্ভুর কানে স্পষ্ট বাজল। মঞ্জুর সামনে বসেই দিব্যেন্দু পাড়িয়ার দিকে ঝট করে মাথাটা ঘুরিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল, ‘কী দিব্যেন্দুবাবু, এরকম একটা ডায়েরি হয়েছিল তো?’
দিব্যেন্দু ঢোক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
‘তাহলে শান্তি দাসের কেসে সেটা চেপে কেন যাওয়া হল? কার নির্দেশে?’
স্বয়ম্ভুর রক্তচক্ষু দিব্যেন্দুর দিক থেকে সহসা ঘুরে মঞ্জুর দিকে। ‘যে বস্তিবাসীরা আপনার শত্রু ছিল হঠাৎ করে তারা কীভাবে আপনার বন্ধু হয়ে উঠল মঞ্জু দেবী?’
‘আ…আমি জানি না। বোধহয় ওরা বুঝতে পেরেছিল আমি খারাপ নই। তাই…’
‘কীভাবে বুঝল? না, মানে দুম করে সবাই তো একসঙ্গে পালটে যেতে পারে না। তাহলে তাদের বোঝালটা কে? কী দিয়ে বোঝাল?’
‘আমি জানি না সার।’
‘আমরা আসার আগে আপনার ঘরে কে ছিল সেটা জানেন তো?’
‘আমি তো একাই…’
‘শাট আপ! একের পর এক মিথ্যে!’
ধমকে উঠল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘হাজতে নিয়ে গিয়ে ঘা কতক দিলেই সব সত্যি বলে দেবে। যাব স্যার?’
‘কী যাবেন নাকি লকআপে?’
স্বয়ম্ভুর পালটা ধমকে মঞ্জু হাউমাউ করে ওঠে, ‘না না সার। আমি কিচ্ছু করিনি সার। আমি শান্তিকে মারিনি বিশ্বাস যান।’
‘আমি জিজ্ঞেস করেছি ঘরে কে ছিল?’
‘কে…কেউ ছিল না সার। বিশ্বাস যান।’
‘দিব্যেন্দুবাবু…’
মঞ্জুর দিকে তাকিয়েই রাগত স্বরে বলল স্বয়ম্ভু। বাধ্য ছাত্রের মতো উত্তর এল, ‘স্যার!’
‘পাশের শোবার ঘরে যান। খাটের নীচে একটা ছোটো বাক্স পড়ে আছে। ওটা নিয়ে আসুন।
দিব্যেন্দু ঝট করে উঠে সোজা পাশের ঘরে ঢুকে পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জিনিসটা নিয়ে বাইরের ঘরে এল।
‘মঞ্জু ম্যাডামের সামনে ধরুন।’
দিব্যেন্দুর একটু সংকোচ হল। স্বয়ম্ভু কটমট করে তাকাতেই আদেশ পালন হল। মঞ্জু আঁতকে উঠল। মুখে আঁচল চাপা দিল লজ্জায়। শিবাঙ্গী একবার স্বয়ম্ভুর চোখের দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল, স্বয়ম্ভূ তো পাশের ঘরেই ঢোকেনি। ভিতরের খাবার ঘরে দাঁড়িয়ে একবার শোবার ঘরে চোখ চালিয়ে ছিল বটে। তখনই তার চোখের মধ্যে লাগানো দুটো আতস কাচে খাটের নীচের জিনিসটা ধরা পড়েছে। বাপ রে!
‘শিবাঙ্গী…’
এই সময় ঝট করে নিজের নামটা স্বয়ম্ভুর মুখে শুনে একটু নড়ে ওঠে শিবাঙ্গী। কীরকম হ্যাংলার মতো তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ! সেটাও নিশ্চয়ই খেয়াল করেছে লোকটা।
‘ইয়েস স্যার।’
‘বাকি প্রশ্ন তুমি করো।’
যাক নিশ্চিন্ত। হাল ধরল শিবাঙ্গী। দিব্যেন্দুর হাত থেকে কন্ডোমের প্যাকেটটা নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘এটা কার?’ মঞ্জু লজ্জায় চুপ
‘চুপ থেকে লাভ নেই। ঝটপট নামটা বলুন।’
মঞ্জু তবুও চুপ। আর সময় দিল না স্বয়ম্ভু। নিজের মোবাইলটা হাতে নিয়ে মঞ্জুর মুখের সামনে ধরে বলল, ‘জিনিসটা বোধহয় এনার। তাই না?’
শিবাঙ্গী আর দিব্যেন্দু ঘাড় বেঁকিয়ে হাঁ করে স্বয়ম্ভুর মোবাইলে একটা ভিডিও দেখল। যেখানে একটি পুরুষ মানুষ মঞ্জুর বাড়ির পিছনের গেট দিয়ে চোরের মতো বেরিয়ে গেল। মঞ্জু খুব সাবধানে দরজা বন্ধ করল।
‘এম এল এর ছেলেকে বলে দেবেন, সে যদি সত্যিই পুরুষমানুষ হয় তাহলে যেন কাপুরুষের মতো পিছনের দরজা দিয়ে না পালিয়ে সামনের দরজা দিয়েই যাতায়াত করে। আর হ্যাঁ, শান্তি দাসের কেসে আপনি আর আপনার ওই বিশেষ বন্ধুটি কিন্তু আমাদের সাসপেক্ট। মানে আমরা আপনাদেরকেই সন্দেহ করছি।’
‘আমি খুন করিনি সার বিশ্বাস যান, আমি শান্তিকে মারিনি।
স্বয়ম্ভুর পায়ে আছড়ে পড়ে কেঁদে ফেলে মঞ্জু। স্বয়ম্ভু কয়েক পা পিছু হেঁটে সরে যায়।
‘সেটা কোর্টে প্রমাণ হবে। আপনাকে ভালোবেসে ওই এম এল এর ছেলে যদি সারা বস্তিকে এক জোট করে একটা পরিবারকে উচ্ছেদ করতে পারে তাহলে আপনাকে শান্তি দিতে ওই শান্তির ছেলে শান্তি দাসকেও মার্ডার করতে পারে। আজকের মতো আসি। আবার দেখা হবে।’
স্বয়ম্ভুর সঙ্গে শিবাঙ্গী আর দিব্যেন্দুও বেরিয়ে আসে। সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। আশপাশের আলোগুলো জ্বলে উঠছে একে একে।
‘ওই মঞ্জুর মালিককে কাল থানায় ডেকে পাঠান। আমি নিজে থাকব।’ গাড়িতে ওঠার আগে দিব্যেন্দুর দিকে হুকুম ছুড়ে দিল স্বয়ম্ভু।
‘আজ্ঞে স্যার?’
দিব্যেন্দু যেন কিছুই বুঝল না।
‘কথায় কথায় আজ্ঞে আজ্ঞে করবেন না তো। মঞ্জুর মালিক কে জানেন না? ‘হ্যাঁ স্যার।’
‘তাহলে যান। যা বললাম করুন।’
বুকে বিশ মন পাথর চাপিয়ে দিব্যেন্দু তার থানার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়। শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভূ তাদের গাড়িতে উঠে বসে।
‘প্রথমাও পড়ল না, বুঝিয়ে দিল এবারে দশমী পর্যন্ত কেমন যাবে।’
গাড়িতে উঠেই স্বয়ম্ভুর প্রথম কথা।
‘আমি তো মহালয়া থেকেই বুঝছি।’
সামনের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলেই শিবাঙ্গী আড়চোখে স্বয়ম্ভুর মুখটা মেপে নিল। হেসে ফেলল স্বয়ম্ভু।
‘চলো হে সারথি। দিদিমণিকে বাড়িতে নামিয়ে আমায় নামাবে।’
স্বয়ম্ভুর হুকুম পেয়ে গাড়ি ছুটল সাজো সাজো রব ওঠা শহরের বুক চিরে।
