ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ১

লজেন্সের বয়ামের ফাঁকগুলো দিয়ে জুলজুল করে দেখছে দুটো চোখ। সারে সারে বয়ামভর্তি হরেক রঙের মেলা। কোনওটা রসালো, কোনওটা চিটচিটে মিষ্টি, কোনওটা আবার কষটা টক। গোলাপি জিভটা ভিজে উঠেছে লাল্টুর। এগারো বছরেও লজেন্সের প্রতি লোভটা যায়নি ওর।

‘অ এসে গিচিস? দাঁড়া। এই সুকান্তওওওও… লাল্টুর থলে তিনটে নে আয় তো।’

মুদিখানার বৃদ্ধ দোকানি করিমচাচা সরু গোল ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে লাল্টুর চোখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। ছেলেটার গায়ে হলদে জামা আর ছাই রঙের হাফ প্যান্ট। পাট করে আঁচড়ানো চুল। ছেলেটার নাম লাল্টু হলেও চেহারাটা লাল্টু মার্কা নয়। তবে গায়ের রংটা পরিষ্কার বলে লিকলিকে চেহারাতেও বেশ একটা নজরকাড়া ভাব আছে।

বছর বিশের সুকান্ত দোকানের ভিতর থেকে বাইরে এসে লাল্টুর পায়ের কাছে তিনটে থলি ভর্তি বাজার রাখল। লাল্টু নীরব চোখে তিনটে থলির দিকে তাকিয়ে এক এক করে দু-হাতে দুটো তুলে নিল। আরেকটা কোনওরকমে তুলতে গিয়ে প্রায় হিমশিম খেয়ে গেল বেচারি।

দোকানের ভিতর থেকেই লজেন্সের বয়ামগুলো ডিঙিয়ে করিমচাচা লাল্টুর দিকে উঁকি দিয়ে বলল, ‘কতবার বলিচি তোর পিসেমশাইকে নে আসবি। তুই এটুক ছেলে এতগুলো পারিস নাকি?’ লাল্টু অসহায় চোখে করিমের দিকে চেয়ে বলল, ‘এই দুটো রেকে আসি চাচা। তারপর এটা নিয়ে যাবখন।

‘কেন? তোর পিসেমশাই কচ্চেটা কী? দিনরাত তো ও পাড়ার মদের ঠেকে লটকে থাকে। তাকে নে যেতে বল।’

মনে জমে ওঠা ভয়টা করিমচাচাকে বুঝতে দেয় না লাল্টু। চোখ নামিয়ে নেয়। সুকান্ত তড়াক করে লাফিয়ে দোকানে ঢুকে করিমের কানে কানে যেন কী সব বলল। করিমের মুখটা নিঙড়ানো ন্যাতার মতো হয়ে গেল। একদলা ঘেন্না উগরে দিয়ে বলল, ‘হু! বউ পেটাবার সময় আচে। বাজার করার বেলায় এই কচি ছেলে। মাগনায় কাজের লোক পেয়েচে কিনা! এই সুকান্ত, তুই যা দিকিনি, দুটো ব্যাগ ওর বাড়িতে দে আয়। এ লাল্টু, তুই একটা ব্যাগ নে।’ মালিকের কথামতো সুকান্ত দোকান থেকে বেরিয়ে এসে দুটো ব্যাগ নিয়ে হাঁটা দিল। পিছন পিছন চলল লাল্টু।

‘এ লাল্টু শোন।’

এক দণ্ড থেমে ঘুরে তাকাল ছোটো ছেলেটি। করিমচাচা একটা বয়াম থেকে দুটো লজেন্স বের করে আঙুলের ভাঁজে ধরে বলল, ‘নে যা।’ লাল্টু অবাক। করিম বলল, ‘পয়সা লাগবে না। নে যা।’ লাল্টু ঢোক গিলল। করিমচাচার আঙুলের ভাঁজে সোনালি মোড়কে মোড়া লজেন্স দুটো সোনার হরিণের কানের মতো হাতছানি দিচ্ছে।

কলাবাগানের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা। বাতাসে আশ্বিনের গন্ধ। কলাবাগানের মাঝেই ইতিউতি ছড়িয়ে শিউলি ফুলের গাছ। পথ আলো করে ফুটে ঝরে আছে শিউলি ফুল। কিন্তু এই শিউলি যে লাল্টুর জন্ম শত্তুর। কালকেই হাঁচতে হাঁচতে প্ৰাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল তার। যাবার সময়েও নাকে হাতচাপা দিয়ে গেছে লাল্টু। কিন্তু এখন দু-হাতে দুটো ব্যাগ। মাঝরাস্তায় এসে ব্যাটা সুকান্ত নিজে একটা ব্যাগ রেখে আরেকটা লাল্টুকে ধরিয়ে দিয়েছে। তাই নাক চাপার অবকাশ নেই। বারবার হাঁচছে। হাত উলটে নাকটা চুলকে নিচ্ছে। আবার হাঁচছে। একটা লজেন্স পকেটে রেখে আরেকটা চিবোচ্ছিল। হাঁচির চোটে ফক করে সেটা মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে রাস্তায়। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল লাল্টু। সুকান্ত চলতি হিন্দি গান গুনগুন করতে করতে সামনে এগিয়ে চলেছে। লাল্টুর দিকে খেয়ালই নেই।

জং ধরা লোহার গেটটা খোলাই ছিল। তবু সুকান্ত ঢুকল না। লাল্টু ধীর পায়ে ঢুকে গেল। ছোটো ছোটো চোখে অজানা ভয়। দোকানে যাবার আগে যে বাড়ি রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল, সেটা যেন এখন অত্যধিক থমথমে। চারপাশ থেকে পাখি ডাকার শব্দ কানে এসে লাগছে। পিছনে ফিরে চাইতেই সুকান্ত বলে উঠল, ‘আমি ঢুকব না। সকাল থেকে তোদের বাড়িতে যা ক্যাচাল চলছিল। তুই ওটা রেখে এসে এ দুটো নিয়ে যা।’ বেচারা লাল্টু! একাই গুটিগুটি পায়ে একটা থলে হাতে ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ঘর থেকে হুড়মুড় করে দাওয়ায় বেরিয়ে এল হাঁটুর ওপর লুঙ্গি পরা একটা লোক। কালো, মাঝারি উচ্চতা, খালি গা। মাথার চুল এলোমেলো। লোকটা ঘরের ভিতর ভয়ংকর কিছু একটা দেখে পিছু হাঁটতে হাঁটতে ছিটকে বেরোল। দাওয়ার সিঁড়িতে এসে টলে গেল। মুখের সামনেই লাল্টুকে দেখে থমকে গেল। চোখ দুটো লাল। খানিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে সুকান্তও ভেবলে গেছে।

‘পিসেমশাই!’

দুটো হাত তুলে কাঁপতে কাঁপতে দু-পাশে মাথা নাড়ছে লাল্টুর পিসেমশাই।

‘এ কী! তোমার হাতে, কপালে রক্ত কেন?

চমকে উঠল লোকটা। নিজের হাতদুটো দেখল।

‘না! না না, না!’

লাল্টু দৌড়ে ভিতরে গেল। সেই ফাঁকে দৌড়ে পালাল লাল্টুর পিসেমশাই। সুকান্ত বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছিল সেই সুযোগে। হঠাৎ ভিতর থেকে লাল্টু চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘ছোপ্পিইইইইই… ছোপ্লিইইইইই…!’ সুকান্ত আর ঢুকল না। এক ছুট্টে কলাবাগান পার।

হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘরের দরজার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে লাল্টু। চোখের সামনে যা দেখছে তা সহ্য করতে পারছে না। লাল্টুর ছোটো পিসি সদ্য কাটাপড়া লতানে গাছের মতো মাটিতে লুটিয়ে। মাথার দিকটা থেঁতলে গেছে। খানিকটা তফাতে রক্তমেখে পড়ে আছে পাথরের ভারী নোড়াটা। লাল্টু দেখত, ওর ছোপ্পি কপালের ঘাম মুছতে মুছতে এই নোড়াটা দিয়েই কত ভালোমন্দ খাবারের মশলা বাটত শিলে। আজ শয়তান লোকটা রাগের মাথায় ওর পিসিকেই বেটে দিয়ে গেল!

***

‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির।’ তবু এখনও শেষ হয়নি স্ট্রিটলাইটের নাইট ডিউটি। ‘ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা।’ সেই মেঘ চুঁইয়ে ক্লান্তির কুয়াশা নেমেছে রাতচরাদের শরীরে। ‘প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনবার্তা।’ চিড় ধরা রকের ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়েছিল পাড়ার আদরের ভুলু। চকিতে চোখ খুলে মুখ তুলে তাকাল। কী যেন হবে! কেউ যেন আসছে। ওরাই তো সবার আগে শব্দ পায়। পুরোনো কলকাতার প্রাচীন বাড়িগুলোর গা থেকে যে সকল গাছ পাতাসমেত তাদের শাখামুখ বের করে আছে তাদের শরীরে হিম জমতে শুরু করেছে। মধ্যরাতে কোথাও কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। তারই মাঝে ‘আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নবমাধুরীর সঞ্জীবন।’ পথের খানাখন্দে জল জমেছে টলটলে। সেখানেই স্নিকার পরা ছুটন্ত পা ঝপাস করে পড়তেই কাদাজল ছিটকে ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। তারপরেই আরও কয়েকটা বুট পরা পা ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ তুলে গলি, তস্য গলি মাতিয়ে পিছন পিছন ছুটে আসে। সবার আগে একটি মেয়ে ছুটছে। স্কিন টাইট জিন্সে গোঁজা অফ হোয়াইট শার্ট। কোমরের রিভলভার হাতের মুঠোয়। পাতি গার্ডার দিয়ে বাঁধা পিঠছোঁয়া চুলটা ঘোড়ার লেজের মতো ছোটার গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুলছে। চোখের সীমারেখা জুড়ে হালকা কাজলটা রাতের কালোর মতোই হারাতে বসেছে। লক্ষ্যভেদী দৃষ্টি শিবাঙ্গীর চোখে। তারও আগে ফুট পনেরোর দূরত্বে হাঁটুর ওপর লুঙ্গি গুটিয়ে ছেঁড়া ময়লা স্যান্ডো গেঞ্জি পরা লোকটা প্রাণপণে ছুটে চলেছে। অনেকক্ষণ ছুটছে। লোকটাকে কিছুতেই বাগে আনতে পারছে না শিবাঙ্গী ও পুলিশবাহিনী। ঘাবড়ে দেবার জন্যেই লোকটার পায়ের পাশ লক্ষ্য করে একটা গুলি চালাল শিবাঙ্গী। লোকটা থাড়িমাড়ি খেয়ে পড়বে-পড়বে করেও সামলে নিয়ে ছুট লাগাল। এদিক সেদিক বাঁশ বাঁধা কমপ্লিট। কোথাও ত্রিপলের ওপর রঙিন কাপড় জড়ানোও শেষ। আজ অনেক জায়গাতেই পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীর উদ্বোধন। প্যান্ডেল ফুঁড়ে জেট গতিতে দৌড়োচ্ছে শিবাঙ্গী। পিছনে উর্দিধারী পুলিশবাহিনীও শিবাঙ্গীর সঙ্গে দৌড়ে পেরে উঠছে না। গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোর খড়খড়ি গলে বীরেন ভদ্রের গলা, ‘তাই আনন্দিতা শ্যামলী মাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন। আজ চিৎশক্তিরূপিণী বিশ্বজননীর শারদশ্রীবিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবধিতা।’

আলো ফুটেছে। গতকাল রাতের মেঘগুলো আকাশকে ছাড়পত্র দিয়েছে। কিন্তু শিবাঙ্গী ছাড়ার পাত্রী নয়। আশপাশে কী আছে জানে না সে। সিংহীর মতো ক্ষিপ্র গতিতে লক্ষ্য স্থির রেখে ছুটে চলেছে। বাজার এলাকার পাশে বেশ কয়েকটা ফাঁকা ঠ্যালাগাড়ি দাঁড় করানো ছিল। সামনে ছুটতে থাকা স্যান্ডো গেঞ্জি পরা লোকটি হঠাৎ ঘুরে তাকিয়ে একটা ঠ্যালাগাড়ি গায়ের জোরে ঘুরিয়ে শিবাঙ্গীর দিকে ঠেলে দেয়। ধেয়ে আসা ঠ্যালার ওপর ভর দিয়ে শিবাঙ্গী লাফিয়ে ওঠে। ঢেঁকির মতো গাড়িটা পিছন থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ততক্ষণে লোকটি সোজা বাজারের মধ্যে। শিবাঙ্গী রাস্তায় নেমেই হুমড়ি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পুলিশের দলকে দু-ভাগে ভাগ করে ছড়িয়ে দেয়। শিবাঙ্গী বাজারের মধ্যে না ঢুকে অন্য আরেকটি রাস্তা বেছে নেয়। লোকটির লক্ষ্য বুঝে ফেলেছে শিবাঙ্গী। ওকে যেভাবে হোক রেললাইনের ধারে যেতে হবে। লোকটি যদি কোনওভাবে ট্রেন ধরে কেটে পড়ে তাহলে তাকে ধরা মুশকিল হবে।

ঝুপড়ির আড়াল থেকে ঘনকৃষ্ণ চোখদুটো বেরিয়ে এল। ছুটতে ছুটতে জিভ বেরিয়ে এসেছে লোকটার। চোখের জলে ঘামের জলে মিশে একাকার। পুলিশ আজ ওর টিকিটা ধরতে পারলেই কেল্লাফতে। এ জীবনের মতো শ্রীকৃষ্ণের আঁতুড়ঘরেই কাটাতে হবে।

প্রতিবার মহালয়ার ভোরে সুচিত্রা দায়িত্ব নিয়ে সারা পাড়াকে আকাশবাণীর বিশেষ বেতার অনুষ্ঠানটি শোনায়। এখন সারা বাড়িতে গমগম করছে সমবেত কণ্ঠের ‘জয় জয় জপ্যজয়ে।’ উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছিল স্বয়ম্ভু। ঘুমচোখে হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা টেনে নিয়ে আসে চোখের সামনে। মোবাইল থেকে এক ঝাঁক আলো এসে চোখে পড়বেই এমন সম্ভাবনায় আগে থেকেই চোখ কুঁচকে যায় তার। কিন্তু নাহ, মোবাইলে আলো জ্বলে না।

‘ও শিট।’

যেন কোনও দুরূহ অপরাধ ঘটিয়ে ফেলেছে এমন করে উঠে বসে স্বয়ম্ভু। কখন যে মোবাইলটা বন্ধ হয়ে গেছে কে জানে? চার্জে দিয়ে ফোন অন করতেই শিবাঙ্গীর তিনটে মিসড কলের নোটিফিকেশন। সময় রাত দুটো আটচল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। মুহূর্তে রিংব্যাক। ফোন বেজে যায়। একটু চিন্তাতেই পড়ে যায় স্বয়ম্ভু। এত রাতে ফোন করেছে মানে নিশ্চয়ই কোনও প্রফেশনাল হ্যাজাডস। তাহলে কি বিট্টু দেবনাথের খোঁজ পেল? এর পাশাপাশি একটা অন্য চিন্তাও উঁকি দিল, শিবাঙ্গী ঠিক আছে তো?

রেলবস্তির পাশে মোটা লোহার লম্বা ফলা লাগানো রেলিং। চট করে কোনও মানুষ যেন টপকে যেতে না পারে। পলাতক লোকটার পক্ষেও একটু কষ্টকর এই বাধা টপকানো। তাই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলেছে রেললাইনকে পাশে রেখে। একটা না একটা খাপ-খোপ পাবেই। পেলেই গলে রেললাইন পার। ওদিকে আরেকটু ছুটলেই গঙ্গা। ডুব সাঁতারটা ভালোই জানে বিট্টু। অন্তত খানিকক্ষণ জলের তলায় অদৃশ্য হয়ে তো থাকতে পারবে। অনেকক্ষণ পিছনে কোনও লোকের পায়ের শব্দ পাচ্ছে না বিটু। ওই মেয়েছেলেটাকেও দেখতে পাচ্ছে না। উর্দিধারী ফেউগুলো ল্যাল ল্যাল করে ছুটে আসছিল। ছুটলেই যদি পুলিশ হওয়া যেত তাহলে বিট্টুও পুলিশ বনে যেত। তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো জিভ বার করে হাঁফাচ্ছে বিট্টু। এবার খাঁচায় বাতাস ফুরিয়েছে। ওই তো স্তূপ করে রাখা ফুলের সামনেই রেলিং গলে যাবার জায়গা। এই সময় ফুলওয়ালারা হাওড়ার ফুলবাজার থেকে ফুল কিনে দোকান সাজায়। কেউ আবার সাপ্লাই করে নানা জায়গায়। বিট্টুর ঠোঁটে ফুল ফুটল। শালারা নির্ঘাত বিট্টুকে হারিয়ে আনতাবড়ি ছুটে মরছে। সময় নষ্ট না করে রেলিংয়ের ফাঁকের কাছে ছুটে গেল বিটু ঠিক সেই মুহূর্তে ফুলের স্তূপে বিস্ফোরণ। চতুর্দিকে ফুল ছড়িয়ে রিভলভার তাক করে ফুলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল শিবাঙ্গী। শান্ত লোকবিহীন সরু জায়গাটায় ব্যাপারটা কী ঘটল সেটা বোঝার আগেই শিবাঙ্গী বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল বিট্টুর ঘাড়ে। সজোরে শিবাঙ্গীর বজ্রমুঠির আঘাত এসে পড়তে লাগল বিটুর পেটে-তলপেটে। ছিটকে গিয়ে লোহার রেলিংয়ে ধাক্কা খেল বিট্টু। চুলের মুঠি ধরে বিট্টুকে তুলে সোজা কপালের পাশে বন্দুকের নল।

‘একটু এদিক ওদিক করলে খোপড়ি খুলে নেব হারামজাদা। চুপচাপ চল।’

শিবাঙ্গী তড়পে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের হুইসল শোনা যায়। স্টেশন ছেড়ে এসে এই জায়গাটা থেকেই ট্রেনগুলো স্পিড নেয়। ঘর্মাক্ত কাঁপা কাঁপা হাত দুটো ওপরে তোলে বিট্টু। শিবাঙ্গীর বজ্রমুষ্টিতে বিট্টুর চুলের মুঠি। বিট্টু যেদিক দিয়ে ছুটে এসেছে ঠিক তার উলটো রাস্তায় বিট্টুকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে শিবাঙ্গী। দলের লোক কোথায় চরকি পাক খাচ্ছে কে জানে! আশপাশে যে ক’জন লোক ছিল সবাই তটস্থ হয়ে সরে রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। ট্রেনটা ছুটে আসছে। বিট্টুর কান ট্রেনের শব্দে। একটা বিহারী বউ স্টিলের জগ থেকে গলায় জল ঢেলে কুলকুচি করছিল। বিট্টু চোখের পলকে সেই মহিলার হাত থেকে জলভর্তি জগটা ছিনিয়ে শিবাঙ্গীর মুখে ছুড়ে দেয়। বিট্টু নামকরা গুন্ডা, সুপারি কিলার বা সিরিয়াল কিলিং করা ব্যক্তি হলে এমনটা আশা করাই যেত। কিন্তু বিট্টুর ঝুলিতে মাত্র একটা খুন। তার আগে এমন কোনও কেস হিস্ট্রি নেই। সে মাথায় নল ধরা সত্ত্বেও এমন পাক্কা ভিলেন মার্কা উলটো চাল দেবে কে জানত? শিবাঙ্গী নিমেষের জন্য জলের তোড়ে লক্ষ্যচ্যুত হয়। রিভলভারের নল সরে যায়। বিট্টুর গাট্টাগোট্টা চেহারার একটা ঘুষি এসে সপাটে পড়ে শিবাঙ্গীর গালে। একটা ঝুপড়ি দোকানের বেঞ্চের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সেই সুযোগে বিটু রেলিং গলে লাইনের ওপর। পুলিশের একটা দল খুঁজতে খুঁজতে ঘটনাস্থলে এসে পড়ে। তারাও দৌড়োয় বিট্টুর পিছনে। শিবাঙ্গী গুলি চালায়। লক্ষ্যচ্যুত হয় সে গুলি। রেলিং দিয়ে গলে যায় শিবাঙ্গী ও পুলিশবাহিনী। ধেয়ে আসা ট্রেনটা এক্কেবারে মুখের সামনে। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চলন্ত ট্রেনের সামনেই লম্বা লাফ দেয় বিট্টু। প্রত্যক্ষদর্শীরা বিটুর ট্রেনে কাটা পড়ার দৃশ্য কল্পনা করে হায় হায় করে ওঠে। শিবাঙ্গীরা থমকে যায় কারণ বিট্টুর কাটা পড়া কেউ আটকাতে পারবে না। কিন্তু না, নিমেষের ভগ্নাংশে বিটু প্রায় উড়ে গিয়ে ট্রেন টপকে পাশের ট্র্যাকে মুখ থুবড়ে পড়ে। ট্রেনটা ঝপাং ঝপাং করে ছুটে চলে শিবাঙ্গী আর বিট্টুর মাঝখান দিয়ে। অপরাধী একটুর জন্যে ফসকে যাওয়ার তীব্র আপশোসে হাওয়ায় ঘুষি চালিয়ে চিৎকার করে ওঠে শিবাঙ্গী। পুলিশবাহিনী তথৈবচ। মাটিতে ঝুঁকে পড়ে ছুটে চলা লোহার চাকাগুলোর ফাঁকে চোখ রেখে শিবাঙ্গী দেখে বিট্টু প্রাণপণে দৌড়ে রেললাইন পার হয়ে উলটো দিকের রাস্তায় নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। রেললাইন থেকে পাশের রাস্তাটা বেশ খানিকটা নীচের দিকে ছিল বলে বিটু চোখের নিমেষে হারিয়ে মিলিয়ে গেল। চব্বিশ বগির মালগাড়িটা লক্ষণরেখা হয়ে আজকের মতো বাঁচিয়ে দিল বিট্টুকে। শিবাঙ্গী শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। ছুটে চলা মালগাড়ির হাওয়ার ঝাপটায় এলোমেলো চুলগুলো চোখের ওপর মরীচিকা এঁকে চলল তার। বেতারে তখন দুর্গার ত্রিশূলে বধ হয়েছে মহিষাসুর। শান্ত সুরে সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে, ‘জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী, দুর্গা শিবা ক্ষমাধাত্রী স্বহা স্বধা নমোস্তুতে!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *