ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ১৪

১৪

‘শুভ সপ্তমী ইনস্পেক্টর ভট্ট। আসতে পারি?’

সোনারপুর থানার ইনস্পেক্টর নিজের আসনেই বিরাজমান ছিলেন। স্বয়ম্ভুকে দেখে সৌজন্যতার খাতিরে উঠে দাঁড়ালেন। ‘আরে স্বয়ম্ভুবাবু, আসুন আসুন। বসুন।’ হাত মিলিয়ে বসতে বললেন। ‘তা সপ্তমীর সকালে হঠাৎ আমাদের স্মরণ করলেন যে?’

‘না করে আর উপায় আছে? চারপাশে যা শুরু হয়েছে।’

‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স?’

‘আর কী? ক’খানা কেস পেলেন?’

‘আর বলবেন না মশাই, আমরা কেস নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছি। বিরক্তি ধরে গেছে। বর বউকে আদর করে থাপ্পর মারলেও কেস লেখাতে চলে আসছে। দু-দিনে এই এলাকায় সাতাশটা কেস ভাবতে পারেন?’

‘ভাবতে আমরা বাধ্য। খুনি আমাদের মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। হয়তো আমরা দেখেছি তাকে কিন্তু খুনি বলে রেকগনাইজ করিনি।’

‘আঁখি চ্যাটার্জিকে তুলেছেন শুনলাম। কী বুঝলেন?’

‘বিশেষ কিছুই না। খুনির সঙ্গে যোগসাজশের কোনও অকাট্য প্রমাণ নেই। আয়ুষ্মান নাকি আঁখিকে কিছুই বলত না। সে জানত তার প্রেমিক…

‘দাঁড়ান দাঁড়ান। আয়ুষ্মান মানে ওই খিদিরপুর?’

‘হ্যাঁ। আঁখি কি তার গার্লফ্রেন্ড?’

‘শুধু প্রেমিকা নন, একেবারে লিভ ইন পার্টনার। এদিকে তার জলজ্যান্ত স্বামী এখনও বর্তমান। যদিও সে মানসিকভাবে সুস্থ নয়। যাই হোক, এ সব কথা বাদ দিন। সৈকত দত্ত…’

হাজারও কথার মধ্যে নামটা হঠাৎ শুনে একটু হোঁচটই খেলেন ভট্টবাবু। সেটা বুঝেই স্বয়ম্ভু বলল, ‘বীণা সাহার প্রেমিক।’

‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ। বলুন।’

‘তার নামে অন্যান্য লোক, বলা ভালো স্বয়ং খুনি সিম কার্ড তুলে ইউজ করছে।’

‘সেকি!’

‘ইয়েস। তাই তাকে জেরা করাটা ভীষণ জরুরি।’

‘আরে মশাই এই সৈকত তো পাক্কা খেলুড়ে লোক।’

‘কেন?’

‘দু-দিন আগেই ওর নামে থানায় একটা কমপ্লেইন লজ হয় একজন ডক্টরের গায়ে হাত তোলার জন্য। জানা যায়, সেই ডক্টরের যে গার্লফ্রেন্ড সে নাকি এই সৈকতের প্রাক্তন।’

বীণা মরে যেতে সৈকত সেই মেয়ের দিকে ঢলেছে।

‘বাপ রে বাপ!’

‘দু-তিনদিন আগে সেই ডক্টরের সঙ্গে সৈকতের হাতাহাতিও হয়। থানায় ডেকে সৈকতকে কড়কেও দিয়েছি। তা আপনি কি ওকে একবার ডাকতে চান?’

‘ডাক্তারের নামটা জানতে পারি?’

‘হ্যাঁ শিওর। এই সুবাইইইইর, সুবীইইইর…’

বাইরে থেকে উত্তর এল, ‘যাই স্যার।’ দৌড়ে এল খাকি পোশাক পরা সুবীর। নাকের নীচে এক ঝোড়া গোঁফ, মাথার সব চুল যেন দুটো ভুরুতে এসে জড়ো হয়েছে। মাথায় টাক।

‘দু-দিন আগে ওই ডাক্তারটার নামটা যেন কী?

‘ওই গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ।’

‘ডক্টর অতনু সোম।’

‘হ্যাঁ, অতনু।’

স্বয়ম্ভুর মাথায় চিড়িক দিয়ে উঠল। এই কেসটা যেন স্বয়ম্ভুকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীটা গোল। ‘একবার ডাকা যায়?’ স্বয়ম্ভু বলল।

‘সৈকতকে তো?’

‘সৈকত, অতনু আর তার গার্লফ্রেন্ডকে।’

‘এরাও কি এই কেসে …

অর্ধেক কথা বলেই থেমে গেলেন ভট্ট। স্বয়ম্ভু বলল, ‘আসলে আমাদের সবটুকুই সন্দেহের ওপর চলছে মিস্টার ভট্ট। এই মনে হচ্ছে এ ব্যাটা নির্ঘাত দোষী। ও মা! পরক্ষণেই ব্যাপারটা কীরকম যেন জোলো হয়ে যাচ্ছে। তাই একটাও চান্স ছাড়তে চাইছি না।

‘বেশ তো। আমি ডেকে পাঠাচ্ছি।’

‘এক সেকেন্ড, বলছি অতনু এই থানাতেই কমপ্লেন করল কেন? হাতাহাতি কি এই এরিয়াতেই হয়েছে?’

‘আসলে সৈকত এখানকার আর মেয়েটাও নয়াবাদের। ওটাও সোনারপুরের আন্ডারে। তাই আর কি…’

‘ডেকে নিন।’

‘আমি সেদিনই দেখে বুঝেছি এ অন্য কেস। পড়ে গেলে কেমন লাগতে পারে জানি না নাকি?’

দিব্যময় বেশ উত্তেজিত। সামনে অবনত মস্তকে অতনু দাঁড়িয়ে। ‘তুই যে একটা পুলিশ কেসে নিজেকে জড়িয়েছিস আমাকে একবারও জানাবি না?’

‘আমি যাব আর আসব স্যার।’

‘হ্যাঁ, যাব আর আসব! পুলিশ তো তোকে মিষ্টি খাওয়াবে বলে ডেকেছে কিনা। যা চলে যা। কোনও প্রবলেম হলে আগে জানাবি।’

‘হ্যাঁ স্যার নিশ্চয়ই।’

‘অপদার্থ।’

অতনু আর একটা কথাও না বাড়িয়ে চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

‘আমি তো বুঝতেই পারছি না সাত সকালে আমাকে এভাবে ডেকে আনার অর্থ কী?

থানায় ঢোকা থেকেই তিরিক্ষে মেজাজ দেখাচ্ছে সৈকত দত্ত। ঠিক ইন্টারোগেশন রুম বলা যায় না। তবে এই থানার এক পাশের একটি বন্ধ ঘরে স্বয়ম্ভূ আর ইনস্পেক্টর ভট্টের মুখোমুখি সৈকত।’

‘আমরাও বুঝতে পারছি না জানেন, আপনার আধারকার্ডের ডিটেইলস দিয়ে আপনারই নামে খুনি কীভাবে মোবাইলের সিম ব্যবহার করে।’

‘মানে? কী বলছেন কী?

সৈকতের মেজাজটা খিঁচরে ছিল, এবার মুখের অভিব্যক্তিটাও টেরেবেঁকে গেল। ‘একটু মনে করে বলুন তো, আপনি কোথায় কোথায় কাকে কাকে আপনার আধার ডিটেইলস শেয়ার করেছিলেন। এক্ষেত্রে ফটোকপি দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

‘ও বাবা সে কি বলা সহজ নাকি? অনেক ক্ষেত্রেই দিয়েছি। হাজারটা কাজে দিয়েছি।’

‘শেষ কী কী মনে পড়ছে?’

‘শেষ! শেষ! আগে আমি ভদ্রেশ্বরে থাকতাম। পরে সোনারপুরে আসাতে আমার সবকিছু চেঞ্জ করতে হয়। সেইখানে দিয়েছি। ভোটার কার্ডে আমার নামের স্পেলিং ভুল ছিল সেটা করার সময় দিয়েছি।’

‘কাকে কাকে দিয়েছেন?’

‘এটা বলা অসম্ভব। আমার নিজেরই মনে নেই। তবে শেষে ওই ভোটার কার্ড ঠিক করার জন্য আমি বীণাকে আধারকার্ড দিয়েছিলাম। ওই কাউকে দিয়ে করিয়ে দেবে বলেছিল।’

‘কাকে দিয়ে?’

‘ও যে পার্লারে যায় সেখানকার একটি মেয়েকে দেবে বলেছিল।’

‘কোথাকার পার্লার?’

‘তা জানি না।’

‘আপনার ভালোবাসার মানুষ কোথায় যাচ্ছে সেটা জিজ্ঞেস করেননি?’

‘না। করিনি। তবে এখন মনে হয় ভুল করেছি।’

‘কেন?’

‘জানলে হয়তো বীণাকে খুন হতে হত না।’

‘তার মানে আপনার মনে হয় বীণার খুনের পিছনে পার্লারের লোক জড়িত?’

‘জানি না। তবে কাউকেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে পারছি না।’

‘বীণার প্রাক্তন স্বামীকে আপনার সন্দেহের তালিকায় রাখছেন না কেন?’

‘রাখছি না কে বলল? আমি তো বলেইছি আপনাদের যে ওকে ডেকে জেরা করুন।’

‘গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। কিন্তু উনি সেইসময় কলকাতায় ছিলেন না বলে বেল পেয়ে যান। উনি যে সুপারি দিয়েছিলেন কাউকে সেটাও প্রমাণিত হয়নি। আচ্ছা সৈকতবাবু, পাপিয়া তো আপনার প্রাক্তন প্ৰেমিকা।’

সৈকত এবার অস্বস্তিতে পড়ল। ‘কী হল? প্রাক্তন তো?’ স্বয়ম্ভু রিপিট করল। ‘সবই তো জানেন। বেকার প্রশ্ন করছেন কেন?’

‘প্রাক্তন কি প্রাক্তন নয়? হ্যাঁ বা না। কোনটা?’

‘প্রাক্তন ছিল। কিন্তু এখন আবার ওর সঙ্গে অ্যাটাচমেন্ট হয়েছে।’

‘কে করল? পাপিয়া না আপনি?’

‘আমিই পাপিয়াকে নিয়ে নতুন করে ভাবনা চিন্তা শুরু করি।’

‘পাপিয়ার মত?’

‘ও রাজি।’

‘রাজি? তাহলে ডক্টর অতনুর সঙ্গে মারপিট করার প্রয়োজন হল কেন?’

‘আরে ও শালা জোর করে পাপিয়াকে ধরে রাখবে। অনেকবার ভালো কথায় বলেছি, শোনেনি। সেদিন মাথায় রাগ উঠে গেল।’

‘বীণা মারা যাওয়ার পর পাপিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ নাকি আগেই?’

‘না না পরেই।’

‘একা লাগছিল তাই না?’

‘হুম।’

‘কিন্তু আমি যদি বলি বীণা মারা যাওয়ার আগেই আপনি পাপিয়ার প্রতি আবার দুর্বল হয়ে পড়েন। প্রতিদিন পাপিয়াকে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্টক করতেন। পাপিয়াকে পেতেই বীণাকে খুন করান আপনি।

‘এ সব কী বলছেন? যা খুশি বানিয়ে গল্প বললেই হল নাকি।’

‘আমরা হোমওয়ার্ক না করে আসি না সৈকতবাবু। আপনার সোশ্যাল মিডিয়ার পুরো রিপোর্ট আমাদের কাছে আছে। আপনি তো বীণা মারা যাওয়ার আগেই পাপিয়াকে মেসেঞ্জারে পিং করেছিলেন, কী গো, আমায় ছেড়ে ভালো আছ তো?’

কথাটা বলতে বলতেই পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজটা বের করে সৈকতের সামনে ধরে। মেসেঞ্জারের ফটোকপি।

সৈকতের মাথা নীচু হয়ে যায়।

‘পাপিয়া কি শুরুতেই হ্যাঁ বলে দিল?’

‘না। ও দোনামোনা করছিল। কোনদিকে যাবে ভেবে পাচ্ছিল না। পরে ও আমাকেই চুজ করে।’

‘পাপিয়াকে বিয়ে করবেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী খাওয়াবেন? কিছুই তো করেন না। নাকি বীণাকে যেরকম টাকা চেয়ে মেন্টাল টর্চার করতেন সেরকমই করবেন।’

‘মিথ্যে কথা। আমি মোটেও টর্চার করতাম না।’

‘পাড়ার লোক বলেছে। সবাই মিথ্যে বলতে পারে না সৈকতবাবু।’

‘বীণার স্বভাব ছিল পাড়ার লোকের কাছে গিয়ে আমার নামে বদনাম করার।’

‘তাই? কিন্তু বীণা তো স্বামী সংসার সব ছেড়ে আপনার সঙ্গে থাকছিল।

‘কী করত? বাপের বাড়ি নেয় না। স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমাকে ধরল। আমিও ফেঁসে গেলাম। থাকলাম একসঙ্গে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম বীণা সাইকি। সবকিছুতে ওর প্রবলেম।’

‘অথচ এই সাইকির কাছ থেকেই একবার দশ হাজার, একবার সাড়ে ছয় হাজার, একবার তিন হাজার যখন যেরকম পেরেছেন টাকা নিয়ে গেছেন। সব ব্যাংক স্টেটমেন্ট কিন্তু আমাদের কাছে আছে সৈকতবাবু। আপনি জানতেন যে বীণার যাবার কোনও জায়গা নেই তাই দিনের পর দিন তাকে চাপ দিয়ে টাকা হাতিয়েছেন।’

‘হাতিয়েছি মানে? ওগুলো কি আমার ফূর্তির জন্য? সংসারের জন্যই তো নিয়েছিলাম।’

‘তাই নাকি? তাহলে বীণা দেবীর অ্যাকাউন্ট থেকে যে মুদির দোকানের টাকা, সবজি বাজারের টাকা, মাছ বাজারের টাকা সব যেত সেগুলো? দুটো মানুষের সংসারে কত খরচা থাকে সৈকতবাবু যাতে আপনাকে বীণা টাকা দেবার পরেও এতকিছু নিজে খরচা করত?’

‘আচ্ছা, আপনারা হঠাৎ এইসব টাকা নিয়ে পড়লেন কেন বলুন তো? এতদিন হয়ে গেল খুনিকে ধরতে পারছেন না বলে কেসটা ঘোরাতে চাইছেন না তো?’

‘এত টাকা বীণা দেবী আপনাকে কেন দিত?’

সৈকতের চোখে চোখ রেখে স্বয়ম্ভু নীচু অথচ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল।

‘আ…আমার দরকার হত।’

‘কেন?’

‘আজকাল চাকরির চেষ্টা করতে গেলেও পয়সা লাগে। বিভিন্ন লোককে পয়সা

দিতে হয়।’

‘পয়সাগুলো অ্যাকাউন্টে ঢোকার পর আপনি সবসময় এটিএম থেকে টাকা তুলেছেন। কখনওই কোনও ব্যাংক ট্রানজাকশন করেননি। কাকে দিয়েছেন টাকাগুলো?’

‘আরে মশাই, যারা ঘুষ নিয়ে চাকরি দেয় তারা কি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে নেবে নাকি?’

‘বেশ তো, কাদের কাদের টাকা দিয়েছেন আপনি এখানে এখুনি ডিটেইলস দিন।’

‘আমার মনে নেই।’

‘ইয়ার্কি মারছেন নাকি? তিন-চার মাসের মধ্যে কাকে টাকা দিয়েছেন ভুলে

গেছেন?’

‘বিশ্বাস করে যাদের টাকা দিয়েছিলাম তারা বলেছিল আমায় ব্যাঙ্কে চাকরি পাইয়ে দেবে। কিন্তু টাকা নিয়ে তারা কেটে পড়েছে।’

‘পুলিশে জানিয়েছিলেন?’

‘না’

‘কেন?’

‘কোনও প্রমাণ নেই আমার কাছে। কী জানাব? কে বিশ্বাস করবে?’

‘আপনি এত বোকা? এটাও আমাদের মানতে হবে?’

‘বিশ্বাস করা না করা আপনাদের ব্যাপার। বাট এটাই সত্যি।’

‘বীণা সাহা মারা গেছেন চব্বিশে সেপ্টেম্বর। তার পর থেকে আজ বাইশে অক্টোবর। এই এক মাস আপনার চলল কী করে? পুরো টাকাই তো ওই ঘুষখোরদের হাতে দিয়ে দিয়েছেন।’

‘টুকটাক আমার কিছু ছিল তাই দিয়েই সেদ্ধ ভাত, ডাল-ভাত জুটে যাচ্ছে। কদ্দিন চলবে জানি না।’

‘হুম। এর মধ্যে আবার প্রাক্তন প্রেমিকাকে ফিরিয়ে আনার চাপ। নিজের খাবার জোগাড়ের পয়সা নেই এদিকে শংকরাকে ডাকছেন। বেশ। আপনি বাইরে গিয়ে বসুন। এখন যাবেন না।’

‘আমার একটা ইন্টারভিউ ছিল আজ।’

‘ক্যান্সেল। যাবেন না। বাইরে বসুন। ভট্টবাবু পাপিয়া এসেছে?’

‘হ্যাঁ। দশ মিনিট হল। ডাক্তারও এসেছে।’

এতক্ষণ পিঠ সোজা করে বসেছিল স্বয়ম্ভু। এবার পিঠটাকে হেলিয়ে দিয়ে একটু

রিল্যাক্স করল। চোখ কিন্তু সৈকতের মুখে। মহাশয়ের মুখটা যে শুকিয়ে এসেছে সেটা কাউকে বলে দিতে হবে না।

‘চলুন সৈকতবাবু।’

ভট্টবাবু বললেন।

‘দেখবেন ভট্টবাবু, পাপিয়ার সঙ্গে সৈকতের কোনও চোখাচুখি যেন না হয়। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে সৈকতের।

‘নিশ্চয়ই।’

সুকুমার মল্লিক অনেকক্ষণ ধরে নিজের সিস্টেম খোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ। পাসওয়ার্ড কিছুতে ম্যাচ করছে না। ‘ধুস শালা! হলটা কী?’

‘কী হয়েছে সুকুমারদা?’

নিজের জায়গা থেকে গলা তুলল বিজয়।

‘আরে দ্যাখ না, মেশিনটা খুলছে না কিছুতেই। কী হল বল তো?’

‘বোঝো, তুমি লোকের বন্ধ ফোন খুলে দাও আর এখন নিজেই নিজের মেশিন খুলতে পারছ না?’

বিজয় ঠাট্টা করল। প্রদ্যুৎ ফুট কাটল, ‘বয়স হচ্ছে সুকুমারদা। কতদিন মেশিনটা কাজে লাগে না বলো তো।’

‘মারব থাবড়া। বাপের বয়সি লোকের সঙ্গে ফাজলামো করছিস?’

‘সরি ডার্লিং।’

‘এই মেশিনে কি তোরা কেউ হাত দিয়েছিলি?’

‘কেন? আমাদের মেশিন তো ঠিক আছে। খামোকা তোমার মেশিন নিয়ে টানাটানি করব কেন? আর ওটা মেশিন নয় দাদা, কম্পিউটার বলে ওটাকে।’

‘আমি মেশিনই বলব। তোরা যতই যাই বল, এই মেশিনে কেউ তো হাত দিয়েই ছিল।’

‘ঠিক ধরেছেন সুকুমারদা। আপনার মেশিনের সিকিওরিটি লক চেঞ্জ করা হয়েছে। রাজারাম আর শিবাঙ্গী ঘরে ঢুকে এল। সুকুমার অবাক। ‘কেন? কী হয়েছে?’

‘স্বয়ম্ভু স্যার বলেছেন। আপনি ওই মেশিন র‍্যাদার কোনও মেশিনেই আর হাত দেবেন না। আপনি অপেক্ষা করুন। স্যার একটা বিশেষ কাজ সেরে আসছেন।’

‘মানেটা কী? এইভাবে আমার পারমিশন ছাড়া আমার মেশিনে কেন হাত দেওয়া হল? আর স্বয়ম্ভু বলার কে?’

‘রাজারাম বলল তো সুকুমারদা, স্যার আসছেন। তিনি নিজেই সবটা জানাবেন।’

থমথমে সুরে বলল শিবাঙ্গী। সুকুমার ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলছেন আর বলছেন, ‘না না, এ তো মেনে নেওয়া যায় না। আমি লালবাজারের একজন সিনিয়র পার্সন। কোনও কিছু না বলে আমার মেশিন লক করে দেবার অধিকার কে দিয়েছে স্বয়ম্ভূকে? ভালো ভালো দু-খানা কেস সলভ করেছে বলে কি নিজেকে শার্লক হোমস ভাবছে নাকি? আমি… আমি সিপিকে জানাব। জয়েন্ট সিপিকেও জানাব।’

রাগে রীতিমতো কাঁপছেন সুকুমার। নিজের জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। বোধহয় জয়েন্ট সিপির ঘরের দিকে। রাজারাম আটকাল, ‘নিজের বিপদ নিজেই বাড়াচ্ছেন দাদা। দাঁড়িয়ে যান। আমরা সব জানি। কিন্তু কিচ্ছু বলতে পারব না স্যারকে ছাড়া। এবার দেখে নিন জয়েন্ট সিপির ঘরে যাবেন নাকি চুপচাপ নিজের সিটে বসবেন।’

সুকুমার চোখ পিটপিট করে প্রশ্ন করল, ‘কী জানো? কী জানার কথা বলছ?’

‘স্বয়ম্ভু স্যার এলে জানতে পারবেন। নিজের সিটে গিয়ে বসুন।’

সুকুমার আর কথা বাড়ালেন না। চুপচাপ গিয়ে নিজের সিটে বসলেন। চোখ নীচু, কপালে ঘাম। অস্থির-অস্থির ভাব। কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। রাজারাম আর শিবাঙ্গী দুজনেই সুকুমারের সোজাসুজি বসল কিছু হাত দূরত্বে। মিনিট দু-তিন পর পকেট থেকে মোবাইল বের করে কিছু একটা টাইপ করলেন সুকুমার। তারপর আবার সেটা পকেটে ভরে রাখলেন। বিশাল ঘরটার কোণের দিকে প্রদ্যুৎ আর বিজয় বসে। প্রদ্যুৎ ঘুরে চাইল রাজারামের দিকে। শিবাঙ্গীও খেয়াল করল। রাজারাম উঠে গেল। প্রদ্যুতের সামনে খোলা স্ক্রিনে চোখ রেখেই ফিশফিশ করে বলল, ‘ট্র্যাক উইথ ডিটেইলস।’

‘হুম।’

ছোট্ট কথায় উত্তর দিয়ে নিজের কাজে লেগে গেল প্ৰদ্যুৎ।

‘সিক্সটিনথ আগস্ট। আমার বার্থ ডে। হঠাৎ দেখি সকালে উইশ করেছে হোয়াটসঅ্যাপে।’

ইতস্তত করে পাপিয়া কথাগুলো বলল। ছিপছিপে চেহারায় ফর্সা গড়ন। মুখটা পানপাতার মতো। নাকটা টিকালো। ঘাড় ছাপিয়ে মাথার চুল পিঠ ছুঁইছুঁই। লং স্কার্ট পরে এসেছে। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, ‘আর কিছু?’

‘কেমন আছ? আমায় কি মিস করো? আমি তোমায় মিস করি খুব।’

‘উত্তর দিতেন?’

‘প্রথমদিকে দিতাম না। কিন্তু তারপর দিতে বাধ্য হই।’

‘কেন?’

পাপিয়া চুপ।

‘কী হল? বাধ্য কেন? ভয় দেখাত?’

‘হুম।’

বলেই কেঁদে ফেলে পাপিয়া। অঝোর কান্না।

‘কাঁদছেন কেন? কী বলত সৈকত।’

‘প্লিজ এ সব কথা অতনুকে জানাবেন না। ও আমায় ছেড়ে চলে যাবে তাহলে।’

‘কী এমন কথা যা জানলে অতনু আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে? কেঁদে লাভ নেই পাপিয়া। বলতে আপনাকে হবেই।’

চোখ মুছে, নাক টেনে দু-তিনবার স্বয়ম্ভু আর ভট্টবাবুর দিকে চেয়ে অত্যন্ত নীচু স্বরে বলল, ‘একটা ভিডিও।’

‘কীসের?’

‘আমার আর সৈকতের।’

এতক্ষণের চাপা শ্বাসটা ছাড়ল স্বয়ম্ভু। ‘ব্ল্যাকমেল করে পয়সা নিচ্ছিল তাই তো? তাও আবার ক্যাশে। অ্যাকাউন্টে দিতে বারণ করেছিল।’ ফুঁপিয়ে উঠল পাপিয়া। ‘ওকে বিশ্বাস করেছিলাম। খুব বিশ্বাস করেছিলাম।’ কান্নার গমকে বাকি কথাগুলো আর বোঝা গেল না।

‘ভিডিওটা আছে আপনার কাছে?’

‘না। আমি দেখেই ডিলিট করে দিয়েছি।’

‘ফোনটা দেখি। লক খুলে দেবেন।’

পাপিয়া লক খুলে ফোনটা এগিয়ে দেয়। স্বয়ম্ভু দু-মিনিটের মধ্যে ভিডিওটা বের করে পাপিয়াকে দেখায়, ‘এই ভিডিওটা তো?’ পাপিয়া আতঙ্কিত, ‘হ্যাঁ। এটাই। কিন্তু আমি তো…!’

‘ফোনে কম্পিউটারের মতো রিসাইকেল বিন বলে একটা জায়গা থাকে। এটা সেখানেই থেকে গিয়েছিল। তিন মাস পর নিজে থেকেই ডিলিট হয়ে যেত। বাই দ্য ওয়ে, এই ফোনটা এখন আমাদের কাছেই থাকবে। পরে থানা থেকে এসে কালেক্ট করে নেবেন। থানা থেকেই ফোন করা হবে। এবার বলুন তো, এখনও পর্যন্ত কত টাকা দিয়েছেন?’

‘কুড়ি হাজার।’

‘কোত্থেকে পেলেন?’

‘কিছু আমার জমানো ছিল। কিছুটা টিউশনি থেকে। আর কিছুটা ধার করেছি।’

‘অতনুর থেকে?’

‘হুম।’

‘কী বলেছেন ওনাকে?’

‘কিছু বলিনি। বলেছি আমার লাগবে। কারণ জানানো যাবে না।’

‘অতনু কত দিয়েছেন?’

‘সাত হাজার।’

‘শুনুন, এখন থেকে আর একটা টাকাও ওই জানোয়ারটাকে দেবেন না। বরং যা দিয়েছেন সেটুকু উদ্ধার করার চেষ্টা করছি।’

বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় নাড়ল পাপিয়া।

‘আচ্ছা, আপনি যখন অতনুর সঙ্গে মেলামেশা করেন আপনার কোনও গন্ধ লাগে না?’

‘মানে? কীসের গন্ধ?’

‘গায়ের গন্ধ!’

‘না তো। মাঝেমধ্যে ডেটল আর ওষুধের গন্ধ পাই।

‘না মানে অনেকের তো গায়ে গন্ধ হয়, পায়ে গন্ধ হয় তাই বলছিলাম। সেরকম কিছু…’

‘না না। গায়ে কখনওই কোনও বাজে গন্ধ আমি পাইনি। আর পায়ের গন্ধ তো নয়-ই।

কথাটা বলতে গিয়ে পাপিয়ার মুখটা বিরক্তিতে ভরে উঠল। এমন প্রশ্নও যে পুলিশ করতে পারে ভাবতে পারেনি সে।

‘তবে একটা জিনিসের গন্ধ আপনি অবশ্যই পেয়েছেন।’

‘কীসের?’

‘কাটলেটের গন্ধ।’

‘শুধু কাটলেট নয়, চপ, ফুলুরি, সিঙ্গাড়া কোনও কিছুই বাদ যায় না।’

উত্তরটা খুব সহজভাবেই এল। স্বয়ম্ভূ হয়তো আরও গভীর কিছু আশা করেছিল। যাই হোক, যেটুকু পাওয়া গেল সেটুকুই বা কম কী? ‘যাবার আগে সৈকত দত্তের নামে একটা এফ আই আর করে যাবেন। যদি আপনি চান। নইলে সৈকত তার বাঁদরামো চালিয়েই যাবে আর আপনাকে সকলের সামনে অপদস্থ হতে হবে। বলুন কী চান?’

‘যদি এফ আই আর করি তাহলে কি আমায় কোর্টে যেতে হবে?’

‘হ্যাঁ হবে। সব বলতেও হবে।’

পাপিয়ার পাপড়িগুলো সব গুটিয়ে যায়। স্বয়ম্ভু বোঝায়, ‘শুনুন, কেসটা এখন পুলিশের হাতে এসে গেছে তো তাই এটাকে চেপে রাখা সম্ভব নয়। আপনি যদি এফ আই আর না করেন তাহলে আইন ধরে নেবে এতে আপনারও কিছু হাত আছে। তার ওপর একটা মার্ডার কেস অলরেডি চলছে।’

‘কিন্তু আমরা তো কমপ্লেইন করেছি।’

‘শুধু কমপ্লেইন আর এফ আই আর-এর মধ্যে পার্থক্য আছে। এফ আই আর

করলে আমরা গ্রেপ্তার করতে পারব। সৈকতের মতো লোককে ছেড়ে রাখা মানে ও আরও মেয়েদের জীবন ধ্বংস করবে। তা ছাড়া জানেনই তো, ওনার যে লিভ ইন পার্টনার ছিল সৈকত তাকেও মেন্টাল টর্চার করত টাকার জন্য। এবার বলুন…

‘বেশ। আমি এফ আই আর করব।’

‘গুড। ভট্টবাবু ওনাকে নিয়ে যান আর অতনুবাবুকে পাঠিয়ে দিন।’

ভট্ট পাপিয়াকে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে যেতেই স্বয়ম্ভুর মোবাইল বেজে ওঠে। রাজারাম কলিং।

‘বলো।’

‘সুকুমারদা একটা আননোন নম্বরে মেসেজ পাঠিয়েছেন।’

‘কী লিখেছেন?’

‘বাই।’

‘সর্বনাশ। লোকটাকে কড়া নজরে রাখো। কোনও কিছু যেন উনি না খান। জল খেলে তোমরা দাঁড়িয়ে জল খাওয়াবে। তার আগে চেক করে নেবে মুখের মধ্যে কিছু আছে কিনা।

‘একদম। আসল খবরটা আগে শুনুন স্যার।’

‘বলে ফেলো।’

‘নম্বরটা বীণা সাহার।’

চমকে উঠল স্বয়ম্ভু। ‘ফাক। তার মানে আমরা যেটা ভাবছিলাম সেটা ভুল। আঁখি চ্যাটার্জির সঙ্গে অবশ্যই মার্ডারারের কন্ট্যাক্ট আছে। নইলে খুনির সিম সৈকত দত্ত আর আঁখির বীণা। আর দেরি কোরো না রাজারাম। তুমি সুকুমারদাকে পাহারা দাও আর শিবাঙ্গী আর কৌশিককে আঁখিকে তুলে আনতে পাঠাও। সোজা লালবাজার।’

কথা বলতে বলতেই স্বয়ম্ভু অতনুকে ইশারা করে বসার জন্য। অতনু যেন আজব কোনও জীব দেখেছে এমন ভাব। ‘আমি আসছি। রাখলাম।’ কান থেকে ফোনটা সরিয়েই সহাস্য বদনে স্বয়ম্ভু বলে উঠল, ‘কী অতনুবাবু, কালকেই বলেছিলাম দেখা হবে। দেখলেন তো। পরেরদিনই কেমন ফলে গেল। তা কেমন আছেন বলুন?’

‘কী বলব বলুন? আপনি তো সব জেনেই ডেকে পাঠিয়েছেন।’

‘পুলিশরা সব জানে অতনুবাবু। শুধুমুধু কাল আমায় অতগুলো ঢপ দিলেন। পড়ে গিয়ে মুখে লেগেছে। হ্যান হয়েছে, ত্যান হয়েছে। আবার আপনার স্যারকেও অন্য কথা বলেছেন। কী দরকার ভাই? প্যায়ার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া?’

লজ্জায় ডক্টর অতনুর মাথা হেঁট হয়ে যায়।

‘না না, মাথা নীচু হওয়ার কিছু নেই। আমি শুধু প্রথম থেকে জানতে চাই। ঠিক কীভাবে আপনাদের আলাপ। কবে থেকে সৈকত আবার ঢুকে পড়ল আপনাদের জীবনে, এই আর কী। কিচ্ছু লুকোবেন না কিন্তু। তাহলে আপনারই বিপদ।’

‘আমাদের দেখা হওয়াটা অনেকটা সিনেমার মতো। আমি বাইক নিয়ে নয়াবাদের দিকে পেশেন্ট দেখে বাড়ি ফিরছিলাম। সে সময় পাপিয়াও টিউশনি পড়িয়ে সাইকেল চালিয়ে আসছিল। একটা রাস্তার টার্নের মুখে লাগল ধাক্কা। বাইকের ধাক্কা খেয়ে একটা মেয়ে সাইকেল নিয়ে পড়ে যাওয়াটা মুখের কথা নয়। পায়ের হাড়ে লেগেছিল।’

‘উফফ! আপনি তো আবার হাড়ের ডাক্তার। দিলেন হাড়ে হাড়ে ঠুকে।’

প্রচণ্ড উৎসাহিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে স্বয়ম্ভু কথাগুলো বলাতে হেসে ফেলল অতনু। ‘ও তো ভেবেছিল নির্ঘাত ওর পা ভেঙেছে। সে কিছুতেই বোঝাতে পারি না পা ভাঙলে কেউ এভাবে থাকতে পারে না। অগত্যা বললাম, যে আমি একজন অর্থোপেডিক। বাইকে পাপিয়াকে বসিয়ে, এক হাতে বাইক আর অন্য হাতে সাইকেল ধরে কোনওরকমে হেলথ লাইনে এলাম। তারপর থেকে ওর চিকিৎসার ভার আমার ওপরেই বর্তাল। দোষ করেছি আমি। তাই প্রায়শ্চিত্তটা আমাকেই করতে হল।

‘প্রেমটাও তো হল, সেটা বলুন।’

‘হ্যাঁ, তা হল।’

‘এটা তো বুঝলাম। সৈকত কবে থেকে এন্ট্রি মারল?’

‘পাপিয়ার জন্মদিনের দিন। ও আমায় আগেই সৈকতের কথা বলেছিল। ছেলেটাই ওকে ছেড়ে গিয়েছিল।’

‘সে তো যাবেই। ওর তো চাকরি করা মেয়ে দরকার ছিল। এ সব টিউশন- ফিউশনে কী হবে?

‘ও প্রথমে উত্তর দিত না। কিন্তু পরের দিকে এত বিরক্ত করতে শুরু করল যে ও উত্তর দিতে বাধ্য হল। তারপর বলল দেখা করতে। প্রথমে পাপিয়া না-ই বলেছিল। তারপর ওরও যে কী হল, বলল একবার অন্তত দেখা করে আসি। সেই দেখা করার পর থেকেই পাপিয়া প্রায়দিনই মন মরা হয়ে থাকত। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে দিন কাটাত। কিচ্ছু বলত না। আমিও বুঝতাম না। ও যখন ফোন করত তখন সঙ্গে সঙ্গে না ধরলে প্যানিক করত।’

***

সেদিন ছেলেটি তার মাকে নিয়ে চেম্বার ছাড়ার পর অতনুর মনটা ভারী হয়েছিল। কী জানি? ছেলেটা এক লাখ টাকাই বা জোগাড় করবে কোথা থেকে? স্যার নেহাত ভালো তাই নিজের ফিজটা মুকুব করে দিল। নিজের ছোটোবেলাটা চলকে উঠছিল অতনুর চোখের সামনে। ঠিক সেই সময়েই আবার ফোন। রিসিভ করতেই হ্যালো বলারও সুযোগ পায়নি অতনু, ওপাশ থেকে চড়া ও চিন্তিত কণ্ঠে, ‘কী গো, সেই কখন থেকে কল করছি। ধরছ না কেন?’

‘পেশেন্ট ছিল তো। ধরব কীভাবে? জরুরি কিছু?’

‘সৈকত আবার এসেছিল। একেবারে আমাদের গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ফোন করেছে এমন শয়তান।’

আশঙ্কায় ভুরুটা কুঁচকে উঠল অতনুর, ‘কেন? কী চায়?’

‘চা… চাইবে আবার কী? খালি দেখা করবে নাকি।’

অতনুর মুখে চিন্তার ছায়া। একটা ঢেঁকুর উঠতেই মুখটা টক হয়ে গেল, ‘কী মনে হল? ঝামেলা করতে পারে?’

সন্দিগ্ধ মনে পাপিয়ার উত্তর, ‘আমি না গেলে ঝামেলা করবে। গেলে কোনও ঝামেলা নেই। ওর তো সেই একই কথা। আমি যেন ফিরে যাই। আমি বরং বলি আমার খুব শরীর খারাপ। আমায় একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে? দায়িত্ব এলেই কেটে পড়বে।’

অতনুর গলার স্বর ধরে এল, ‘এই ধরনের লোকেরা অনেক কায়দা জানে। এরপর যদি আবার আসে তখন কী করবে?’

‘তেমন হলে তোমাকে ডাকব। তুমি সামলাবে।

আবারও একটা ঢেঁকুরের শব্দ ফোনের ওপার থেকে কানে আসতেই পাপিয়া বলল, ‘তুমি কি সকাল সকালই কাটলেট গিলেছ নাকি? এত হালুমহুলুম করছ কেন?’ মাথায় গভীর ভাবনার বোঝা নিয়েই অতনু আলতো হেসে ফোনের স্পিকারে চুমু খেল।

‘দেখেছ, এখন অমনি ঘুষ। তোমার চুমু তোমার কাছেই রাখো। মরছি আমি নিজের জ্বালায়।’

ফোনটা কেটে যায়।

***

‘কালকেও একই কেস। ও যখন ফোন করেছে তখন আমি সেলুনে। পরে ফোন করে ওর গলা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেছি। ও ভেবেছিল সৈকত হয়তো আমাকে খুন করে দিয়েছে।’

‘সৈকত কি ওকে সেরকম ভয় দেখিয়েছিল?’

‘জানি না স্যার। কেন জানি না মনে হয়, পাপিয়া আমার কাছ থেকে কিছু একটা লুকোচ্ছে। দু-দিন আগে আমি যখন সৈকতের মুখোমুখি হলাম স্পষ্ট ভদ্রভাষায় বললাম, আমরা দুজন স্টেডি রিলেশনশিপে আছি। প্লিজ সরে যান। উলটে আমায় যা নয় তাই বলল। আমার রাগ চড়ে গেল। হাত চালিয়ে দিলাম। শেষে আমায় হুমকি দিল, সাতদিনের মধ্যে আমি এই সম্পর্ক থেকে না বেরিয়ে গেলে পাপিয়ার ক্ষতির জন্য ও দায়ী থাকবে।’

‘কী ক্ষতি জিজ্ঞেস করেননি?’

‘বলেনি। পাপিয়াকেও বারবার বলছি। কিন্তু কিছু না কিছু বলে এড়িয়ে যাচ্ছে।’

‘শুনুন অতনুবাবু, আপনি একজন ডাক্তার। সেই সূত্রে ধরে নিতে পারি আপনি আদ্যন্ত একজন বিজ্ঞানমনস্ক খোলা মনের মানুষ। তাই যে মানুষটিকে ভালবাসছেন তখন তার ভালো মন্দ সবটুকুকেই বাসবেন আশা করি। কী তাই তো?’

‘হ্যাঁ অবশ্যই। কিন্তু কেন বলছেন এ কথা?’

‘বলছি তার কারণ পাপিয়া আপনাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তাই ও আপনাকে হারাতে ভয় পাচ্ছে।’

‘কিন্তু কেন? আমি তো আর সৈকত নই।’

‘এক্স্যাক্টলি। সেটাই আপনাকে পাপিয়াকে বিশ্বাস করাতে হবে। আমি বলছি শুনুন, পাপিয়ার সঙ্গে সৈকতের একটা সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে ওরা কোনও এক সময় কাছাকাছি এসেছিল। ঘনিষ্ঠ হয়েছিল, যেটা খুবই স্বাভাবিক। এখানে অস্বাভাবিকের কিচ্ছু নেই। কিন্তু ওই হারামি সৈকত সেই ভালোবাসার মুহূর্তটা লুকিয়ে ক্যামেরাবন্দি করে এখন পাপিয়াকে ব্ল্যাকমেইল করছে। ওর কাছ থেকে টাকা চাইছে। যার মধ্যে আপনার থেকে নেওয়া সাত হাজার টাকাও রয়েছে।’

অতনু নড়ছে না। চোখের পাতাও পড়ছে না। ও কিছু ভাবছে নাকি ওর মাথা জুড়ে শুধুই শূন্য, অনন্ত শূন্য!

‘অতনুবাবু…’

স্বয়ম্ভুর ডাকে চোখের তারা নড়ল অতনুর। দু-হাতে মুখ ঢাকল। স্বয়ম্ভু গলা নামিয়ে বলল, ‘পাপিয়া কিন্তু আপনাদের সম্পর্কটাকে বাঁচানোর জন্য এখন এফ আই আর-ও করেছে সৈকতের নামে। আমরা এখনই ওকে গ্রেপ্তার করছি। আর ওই ভিডিও ছড়ানো তো দূরে থাক, চিরতরে ডিলিট করার ব্যবস্থা আমরা করব।’

‘আমি এ সব নিয়ে ভাবছিই না স্যার।’

মুখ তুলল অতনু।

‘তবে?’

‘পাপিয়া আমায় এইটুকু বিশ্বাস করতে পারল না?’

‘ওই যে বললাম, হারানোর ভয়ে। আসলে ঘর পোড়া গোরু তো। এবার একটা ড্রামা সিন ক্রিয়েট করব আমি। দেখুন। হেব্বি আনন্দ পাবেন, কথা দিলাম।’

ম্যাজিকের মতো ওই বন্ধ ঘরের দৃশ্যটা পালটে গেল। অতনুর পাশে পাপিয়া। স্বয়ম্ভু, ভট্ট আর এঁদের সকলের সামনে সৈকত দত্ত। একটা ঘরেই।

‘কী হচ্ছে কিছু বলবেন কি?’

সৈকত রেলা নিয়ে বলে উঠল। স্বয়ম্ভু ঠাটিয়ে একটা চড় মারল সকলের সামনে আর বলল, ‘সেকশন সিক্সটি সিক্স ই, কারও ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও না জানিয়ে ক্যাপচার ও ব্যবহার করা।’

সৈকত চমকে বিস্ফারিত নেত্র। ভাবতে পারেনি এমন ডাকাতিয়া আক্রমণ তাকে করা হবে। উলটো গালে আবার একটা চড়। ‘সেকশন থ্রি এইটি থ্রি অ্যান্ড থ্রি এইটি ফোর, এক্সটরশন কেস। কাউকে ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে অবৈধ অর্থ আদায়।’ এবার ডান হাতে চুলের মুঠি ধরে টেনে বাঁ হাতের কনুই দিয়ে সজোরে মেরুদণ্ড বরাবর গুঁতো। ‘সেকশন থ্রি ফিফটি ফোর সি, মহিলার অনিচ্ছাসত্ত্বেও অশ্লীল ভিডিও তুলে সামাজিকভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা।’ এবার একটা পেটে মুষ্ট্যাঘাত। ‘এই সবকটা কেসে তোকে আজ এখন থেকে জেলে ভরা হল। যা, শ্রীঘরে বিনিপয়সায় খেতে পাবি। আর কোনও মেয়েকে ব্ল্যাকমেইল করতে হবে না। এরপর তো প্রেমিকার খুনের কেস ঝুলছেই।’ অতনুর হাতটা শক্ত করে ধরে আছে পাপিয়া। পাপিয়ার দারুণ আনন্দ হচ্ছে। চোখে জল চলে এসেছে।

‘কী পাপিয়া, আর ভয় নেই। প্যায়ার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া? চুটিয়ে প্রেম করো।’ দু-হাত জড়ো করে স্বয়ম্ভুকে বলল পাপিয়া, ‘থ্যাংক ইউ সো মাচ স্যার।’

‘আরে ধুর। এ তো আমাদের কাজ। তাহলে ভট্টবাবু, যা যা করার করে নিন। আমি যেন আপডেট পাই।’

‘শিওর শিওর।’

‘চলি। ওদিকে আবার অন্য ধোলাই দিতে হবে।’

‘সপ্তমীতেই অসুর বধ করবেন নাকি?’

‘চাইছি তো, হচ্ছে কই? মুখোশ পরে কে যে রাতের অন্ধকারে নেচে বেড়াচ্ছে সে তো বুইতে পাচ্চিনি। দেখি। টাটা বাই।’

লালবাজার এত নিস্তব্ধ কবে কোনকালে ছিল তা কারও মনে নেই। সাইবার ডিপার্টমেন্টে যেন নীরবতা পালন চলছে। স্বয়ম্ভূ এসে গেছে। রাজারাম, প্রদ্যুৎ, বিজয়, প্রাঞ্জল সকলে দাঁড়িয়েছিল ঘরটাতে। কোনও এক নাটকের সূত্রপাত অথবা যবনিকা পতন হবে তার আশায়। কিন্তু স্বয়ম্ভু সেই ভস্মে ঘি ঢেলে দিল। সকলকে কিছুক্ষণের জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বলল। কয়েক সেকেন্ডে ঘর ফাঁকা হয়ে গেল। স্বয়ম্ভূ দুটো প্রিন্ট আউট করা কাগজ নিয়ে সুকুমারের সামনে রাখল। আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে বলল, ‘মিত্র ক্যাফের দুশো মিটারের মধ্যে যে ক’টা মোবাইল অ্যাক্টিভেট ছিল তার একটা লিস্ট দিতে বলেছিলাম। আপনি এই লিস্টটা দিয়েছেন। আর এই লিস্টটা প্রদ্যুৎ বের করে দিয়েছে। দুটোর মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। পার্থক্যটা ঠিক কী সেটা বের করে আমায় বলুন। তাড়া নেই। আমি অপেক্ষা করছি।’

সুকুমার কিছুই করলেন না। মুখ নীচু রেখেই বললেন, ‘কিছুই দেখার প্রয়োজন নেই। আমারটায় একটা ফোন নম্বর নেই। এটুকুই শুধু পার্থক্য।’ স্বয়ম্ভু নিশ্চুপ হয়ে খানিক সুকুমারের দিকে চেয়ে থেকে বলল, ‘কেন করলেন সুকুমারদা? দু-নম্বরি করাটা আপনার স্বভাববিরুদ্ধ। তাই তো আপনি খেয়ালই করলেন না একটা নাম বাদ হওয়ার সঙ্গে সিরিয়াল নম্বরটাও বাদ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি তো তাড়া দিচ্ছিলাম। তাই আপনি যাকে দিয়ে এটা করালেন সে নাম বাদ দিতে গিয়ে সিরিয়াল নম্বরটাও বাদ দিয়ে দিল। তাতে হল কি, সাতাশির পর অষ্টআশি না হয়ে উননব্বই হয়ে গেল।’

সুকুমার চোখের চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।

‘আপনার কিছু বলার আছে সুকুমারদা?’

দু-পাশে মাথা নাড়লেন।

‘তাহলে এবার খুনির নাম বলে ফেলুন।’

ঝটিতি মাথা তুলে সুকুমার বললেন, ‘না না স্বয়ম্ভূ, বিশ্বাস করো আমি খুনিকে চিনি না। কোনওদিন দেখিওনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম ধৃতিমানের মৃত্যুর পরিশোধ নিক আয়ুষ্মান। আয়ুষ্মানের সুত্র ধরেই আমার আঁখির সঙ্গে পরিচিতি। আসলে ধৃতিমান আমার প্রাণের বন্ধু ছিল। ধৃতির বউ প্রতিমা আমার দূর সম্পর্কের বোন। সেই সূত্রে আমি আয়ুষ্মানের মামা। ধৃতিকে যখন এখান থেকে বের করে দেওয়া হল। তখন ও আমার হাত ধরে বলেছিল, সুকুমার, আমার যদি কিছু হয়ে যায় আমার ছেলেকে আর বউটাকে দেখিস। আমি কি তখন ভাবতে পেরেছিলাম যে ও এমন কিছু করার কথা ভেবেছিল।’

‘তাহলে আপনি তো আপনার বন্ধুকে ঠকিয়েছেন সুকুমারদা। ছেলেকে দেখিস মানে তো এটা নয় যে তাকে অনৈতিক কাজকর্মে উৎসাহিত করা, সাহায্য করা। বরং উলটোটা হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল।’

‘কী লাভ স্বয়ম্ভু? কী লাভ হল? আমি তো চিরকাল নীতির পথে থেকেই কাজ করেছি। তাতে আমি এই একই জায়গায় আটকে রইলাম। না হল প্রোমোশন, না হল কিছু। ধৃতিও চিরকাল সৎভাবে কাজ করে গেল। এখানে একটা বাপের ব্যাটা আছে কিনা দেখাক যে ওর দক্ষতা নিয়ে কথা বলতে পারবে। মাত্র একটা ভুল, সে তার নিজের শালাকে ধরিয়ে দেয়নি। এর জন্য তার সারাটা জীবন তছনছ হয়ে গেল? তাই আয়ুষ্মান যখন বলল, ও কাউকে সাহায্য করছে একটা বড়ো কাজে কিন্তু সেটা ঠিক আইনি পথে নয়, আমার সাহায্য লাগবে। কিছু খবর দরকার মতো ওদের দিতে হবে। আমি বুঝিনি ওরা মানুষ মারবে। তাই আমি কথা দিই আমি সাহায্য করব।’

‘পরে তো জানতে পেরেছিলেন যে কাজটা কী হচ্ছে?’

‘তখন ওকে প্রশ্নও করেছিলাম। আয়ুষ্মান বলেছিল, এই দেশে তো আরও হাজারটা খুন হচ্ছে। তাতে কার কী এসে গেছে? ও নিজে তো আর খুন করছে না। ও শুধু সিম ক্লোনিং, হ্যাকিং এ সব করছে। আমি ভেবে দেখলাম ঠিকই তো। ও যদি ওর বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চায় অন্যায় তো কিছু নেই।

‘সেই কারণে আপনি লালবাজারের ভিতরের কথা বাইরে সাপ্লাই করবেন? আমরা যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন রাত না ঘুমিয়ে টেনশনে কাটাচ্ছি, সেটা আপনার চোখে পড়ছে না?’

‘পড়েছে। খারাপও লাগত। কিন্তু তখনই ধৃতির মুখটা মনে পড়ত। এই আইন ওকে কী দিয়েছে? আমি কী পেয়েছি এতকাল কাজ করে?’

‘সেটাই আসল সুকুমারদা। অন্যের দুঃখের সঙ্গে নিজের ফ্রাস্ট্রেশনকে মিশিয়ে ন্যায় অন্যায় বোধটাই হারিয়ে ফেলেছেন। ধৃতিমান যে অন্যায় করেছিলেন আপনি তার চেয়েও শতগুণ বেশি অন্যায় করেছেন। আর খুনির সঙ্গে যোগাযোগ নেই আপনার? মজা করছেন আপনি?’

‘আমার সঙ্গে সত্যিই খুনির কোনও কন্ট্যাক্ট নেই স্বয়ম্ভু। এবার বিশ্বাস অবিশ্বাস তোমার ব্যাপার।’

‘তাহলে আঁখি চ্যাটার্জির নতুন মোবাইল নম্বর কীভাবে মৃত বীণা সাহার নামে হল? খুনির ফোনের নম্বর বীণার প্রেমিক সৈকতের। আবার আঁখির নম্বর বীণার নামে তোলা। আঁখি কীভাবে চিনল বীণাকে?’

‘আমি জানি না স্বয়ম্ভু। আমি এ সবের কিচ্ছু জানি না। আমাকে নিয়ে তোমাদের যা ইচ্ছে করো। আমি বুঝে গেছি, আমার সব শেষ। সব শেষ।’

নীরবে কেঁদে ফেলেন সুকুমার মল্লিক। স্বয়ম্ভূ মাথার চুলে একবার সজোরে পাঁচটা আঙুল চালিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল সকলে। যোগ হয়েছে শুধু শিবাঙ্গী আর কৌশিক।

‘কী খবর শিবাঙ্গী-কৌশিক?’

‘বসিয়ে রেখেছি।’

‘যতক্ষণ না বলছে ওই নতুন সিম কোথা থেকে পেল ততক্ষণ চাবকে ছাল তুলে নাও। আমি শুভঙ্কর স্যারের ঘরে যাচ্ছি। রাজারাম, প্রদ্যুৎ, বিজয় সুকুমারদার ওপর নজর রাখো।’

‘স্যার চাবকাবো?’

শিবাঙ্গীর ইতস্তত ভাব দেখে কড়া চোখে তাকাল স্বয়ম্ভূ, ‘হ্যাঁ। কেন পারবে না? হাতে ব্যথা? কষ্ট হবে?’

‘না না, মানে আপনিই তো মারতে বারণ করেন।’

‘এখন মারতে বলছি। শুরু থেকেই এমন বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ো যেন মিথ্যে বলার জায়গাটুকুও সে না পায়।’

আর কথা না বাড়িয়ে সোজা জয়েন্ট সিপির ঘরের দিকে পা বাড়াল স্বয়ম্ভু।

ইন্টারোগেশন রুমের কাঠের দরজাটা বাজ পড়ার শব্দে খুলে যেতেই কেঁপে উঠল আঁখি। শিবাঙ্গী ঝড়ের বেগে সোজা এসে হাতের রুলটা প্রচণ্ড জোরে টেবিলে ঠুকল। আঁখি স্থির, নিশ্চল। স্বাভাবিকের চেয়ে আরও দুইঘাট স্বর চড়িয়ে প্রশ্ন করল শিবাঙ্গী, ‘সিম কার্ডটা কে দিয়েছে আপনাকে?’

আঁখি শিবাঙ্গীর আঁখিতে আঁখি রেখে চুপ

‘আমি একটা প্রশ্ন করছি আঁখি। সিমকার্ড আপনাকে কে তুলে দিয়েছে?’

‘আয়ুষ্মান।’

ডান হাতে রুল ধরা ছিল তাই বাঁ হাতেই সপাটে একটা চড় আঁখির গালে। ‘মিথ্যে কথা বলার জায়গা পাস না, না? তোর মরা প্রেমিক তোকে সিমকার্ড দিয়েছে তাও আবার আরেক মরা মানুষের নামে?’ দাঁতে দাঁত চিপে আঁখি বলে, ‘আমাকে যা খুশি বলুন, আয়ুষ্মানকে নিয়ে আর একটাও খারাপ কথা আমি শুনব না।

খপ করে বাঁ হাত দিয়ে আঁখির গালটা টিপে ধরে শিবাঙ্গী বলে, ‘বেশ করব। শালা একটা জোচ্চর ক্রিমিনাল। বল কে সিমকার্ড তুলেছে বীণা সাহার নামে?’

‘আয়ুষ্মান।’

‘আয়ুষ্মান মারা যাওয়ার একদিন বাদে এই সিমটা ইস্যু হয়েছে। আয়ুষ্মান করেছে?’

‘তাহলে ধরে নিন না আমি করেছি।’

‘ওই শালি, ধরব কেন রে? ধরব কেন? এই যে তোকে ধরেছি, এবার তুই-ই সব বলবি।’

‘বলব না।’

‘দেমাক দেখাস না আঁখি চ্যাটার্জি। মারতে মারতে হুলিয়া পালটে দেব। ভালোয় ভালোয় বলছি বল।’

‘বললাম তো আমি তুলেছি।’

‘বেশ। তাই সই। তুই বীণা সাহার ডিটেইলস পেলি কী করে? আর কেনই বা বীণার নামে তুললি?’

‘যাতে কেউ না ধরতে পারে।’

‘যার নামে লাইন তার কাছে ওটিপি যায়। সেটা কীভাবে সম্ভব হল?’

‘জানি না। যে দিয়েছে জানে।’

‘কে দিয়েছে?’

‘সেটা পুলিশের কাজ।’

ঠাটিয়ে আবার চড় আঁখির গালে। প্রকাশ না করলেই শিবাঙ্গীর হাতের তালুটা চচ্চড় করে উঠল।

‘ডিটেইলস পেলি কী করে?’

প্রশ্ন করে শিবাঙ্গী।

‘রিপোর্টাররা কখনও সোর্স বলে না।’

‘চোপ শালা। বালের কাগজ তার আবার রিপোর্টার।’

আঁখি হাসে। ‘মেয়েদের মুখে খিস্তি শুনতে আমার বেশ লাগে।’

‘শুনেছিস কী? এই তো সবে শুরু হল রে। তোর বাপ-ঠাকুরদা চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ছেড়ে দেব। বারোভাতারি খানকি। শেষবারের মতো বলছি, সত্যি করে বল, সিমটা কে তুলে দিয়েছে?’

কাচের ওপার থেকে কৌশিকের কান গরম হয়ে উঠেছে দুটো শব্দতেই। অন্য কারুর মুখ থেকে শুনলে কিছুই মনে হত না। কিন্তু শিবাঙ্গী খিস্তি দিচ্ছে এ যেন অভাবনীয়। ওপাশে শিবাঙ্গী মুখ ঝামরে উঠল, ‘কী রে বল কে দিয়ে এই সিম?’

‘হবে, বারোটা ভাতারের মধ্যে কোনও একটা ভাতার। মনে রাখা যায় বলুন তো?’ অবলীলায় রিল্যাক্স মুডে কথাটা বলে দিল মেয়েটি। শিবাঙ্গীর মাথায় আগুন চড়ে গেছে। চিৎকার করে উঠল, ‘নিমাআআআ, রিতাআআআ।’ হাঁক দেওয়া মাত্রই মোটা দড়ি হাতে দুজন মেয়ে ঢুকে এল।

‘বাঁধ শালিকে। আজ দেখি মাগির পোঁদে কত্ত দম।’

আঁখির নিশ্বাস ঘন হয়েছে। নিয়া আর রিতা দুই মহিলা কনস্টেবল মিলে আঁখিকে ভালো করে চেয়ারের সঙ্গে বাঁধল। হাতদুটোকে পেঁচিয়ে পিছনে আর চেয়ারের দুটো পায়ার সঙ্গে আঁখির দুটো পা বাঁধা হল।

‘চার বালতি জল আর ইলেক্ট্রিক শকের ব্যবস্থা কর। ততক্ষণে আমি একটু হাত গরম করি।

‘গরম করবেন আবার জলও ঢালবেন? ভালো। দেখবেন, ঠান্ডা গরমে আবার শরীর খারাপ না করে।

সপাটে রুলের বাড়ি পড়ল আঁখির হাতের ওপর। কোকিয়ে উঠল আঁখি। অন্য হাতে আবারও। এরপর পায়ে দমাদ্দম। তারপর পেটে মারল এক খোঁচা। আঁখির চোখ, দাঁত ঠিকরে বেরিয়ে এল।

‘মারতে আমার ভালো লাগে না আঁখি। বলে দে, কে তোকে এই সিম দিয়েছে। তোর নিজের নামে সিম থাকলে কোনও ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু বীণা সাহার নামে কেন?’

‘বেশ। আয়ুষ্মান মারা যাওয়ার একদিন বাদে সিম ইস্যু হয়েছে বলে আপনার অসুবিধে তো? তাহলে ধরে নিন বিট্টু দিয়েছে। অসুবিধে নেই তো?’

‘তুই বুঝতে পারছিস নিজে কী বললি?’

আঁখি মার খেয়ে হাঁফাচ্ছে। শিবাঙ্গী বলল, ‘এতক্ষণ শুধু আয়ুষ্মানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। তাতে সরাসরি খুনের সঙ্গে তোর কন্ট্যাক্ট নাও থাকতে পারত। কিন্তু এখন একেবারে বিট্টুর নাম করলি যে কিনা সরাসরি খুনির সঙ্গে অ্যাটাচড। তাই ভাবি, সব খুনের খুঁটিনাটি তোর নখদর্পণে কীভাবে? খুন হলে তুই পৌঁছে যাস কীভাবে?’

ঝোঁকের মাথায় শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে গিয়ে বড়ো গোলমাল পাকিয়ে ফেলল আঁখি। শিবাঙ্গী আঁখির মুখের কাছে মুখ এনে আহত সাপিনীর মতো হিসহিসে গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘খুনগুলো কে করছে? নামটা বল।’

‘জানি না।’

শিবাঙ্গী এক লাথি মারল। চেয়ার সমেত মুখ থুবড়ে পড়ল আঁখি। রুলের আঘাতে পাছা থেকে পিঠ লাল হয়ে উঠল। একেবারে ধোপাবাড়িতে যেমন সাবান জলে চোবানো কাপড় আছড়ে ফেলে কাঠের তক্তা বা ব্যাটন দিয়ে পেটে তেমনি করে কয়েক ঘা দিল শিবাঙ্গী। হাতের কবজিটা টনটন করছে বলে দু-পাক ঘুরিয়ে নিল। আঁখির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা রক্তে যন্ত্রণার ফ্যানা বুড়বুড় করছে।

‘নাম বল। খুনগুলো কে করেছে।’

আঁখি চুপ। শিবাঙ্গী রিতা ও নিমাকে হুকুম করে আঁখিকে তুলে বসিয়ে দিতে। আদেশ পালন হয় সঙ্গে সঙ্গে।

‘ফেললেনই যদি তুললেন কেন?’

রক্তমাখা দাঁতগুলো বের করে আঁখি বলল। ‘বাইরে চার পাঁচটা মিডিয়াকে ডেকে বলে দেব, তুই নিজে মুখে স্বীকার করেছিস যে খুনির সঙ্গে তোর যোগাযোগ আছে। সবাই জানে বিট্টু পলাতক অপরাধী ছিল। অতএব সব্বাই বিশ্বাস করবে। সাপ্তাহিক প্রভাকরের সাংবাদিক আঁখি চ্যাটার্জি কীভাবে জানল এত খুনের ব্যাপারস্যাপার সবাই বুঝতে পারবে। তুই তো গেলিই। সঙ্গে তোদের ওই সংবাদ প্রভাকরের অফিসের ও ভরাডুবি করিয়ে ছাড়ব।’

‘আমার সঙ্গে যদি খুনির সত্যিই যোগাযোগ থাকত তাহলে আমি আজকেও পালাতাম।’

‘ফালতু বকিস না। আজ তুই ভাবতেই পারিসনি তোর নতুন নম্বরটা আমরা পেয়ে যাব। সুকুমারদার ফোনটা যে ট্যাপ হতে পারে সেটা তোদের ভাবনারও বাইরে। বেকার সময় নষ্ট না করে বলে দে খুনগুলো কে করছে?’

‘জানি না।’

‘রিতাআআআ…’

নামটা জোরে ডেকে উঠতেই মেয়েটি এক বালতি জল গায়ের জোরে ছুড়ে দেয় আঁখির মুখে। সামলাতে না পেরে খাবি খেতে খেতে আবার চেয়ার নিয়ে উলটে পড়ে। হাঁটুতে, কোমরে বেশ চোট পায়। কোঁকিয়ে ওঠে। কাঁদতে থাকে। শিবাঙ্গী জুতোর নীচে চেপে ধরে আঁখির আঙুল। আঁখি চিৎকার করে ওঠে। ‘ঢেমনি শালি, এই আঙুলগুলো দিয়েই লিখেছিলিস না রিপোর্টগুলো? পুলিশের পোঁদে কাঠি দিবি তুই? হারামির বাচ্চা!’ পায়ের চাপ আরও বাড়িয়ে জোর গলায় ধমকায়, ‘বল কে খুন করেছে এতগুলো। কোথায় থাকে?’ আঁখির ডান হাতের আঙুলগুলোর যে রক্ত-মাংস-অস্থি একে অপরের সঙ্গে সব একাকার হয়ে যাচ্ছে। তার টনটনে ব্যথাটা পাশের ঘর থেকে কৌশিকও অনুভব করতে পারছে। আঁখির চিৎকার আর নেওয়া যাচ্ছে না। কান থেকে হেডফোন নামিয়ে রাখল। শিবাঙ্গী কি মাত্রা ছাড়াচ্ছে? ফিরিয়ে আনা উচিত ওর? চেয়ার ছেড়ে দুই ঘরের মাঝে যে কাচের দেওয়াল তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল কৌশিক। ওপার থেকে কৌশিককে কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

‘আমায় মেরে ফেলুন। তবু জানতে পারবেন না খুনির নাম।’

শিবাঙ্গী সপাটে এক লাথি মারে ডান কাঁধে। ভারী চেয়ারটার সঙ্গে বাঁধা বলে নড়তেও পারছে না আঁখি। হাউ হাউ করে কাঁদছে। শিবাঙ্গী উলটো হাতে কপাল আর মুখের ঘাম মুছে নিল।

‘তুই ভালো করেই জানিস তোকে আমরা মারব না। কারণ তোদের মতো আমরা খুনি নই। তোর মুখ থেকে খুনির নাম আমি বের করেই ছাড়ব।’

দুজন মহিলা কনস্টেবলকে চোখের ইশারায় শিবাঙ্গী বলে গেল আঁখিকে তুলে বসানোর জন্য। পাশের ঘরে ঢুকেই হাতের রুলটা টেবিলের ওপর ছুড়ে দিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। কৌশিক চট করে গ্লাসভর্তি জলটা বাড়িয়ে দিল শিবাঙ্গীর দিকে, ‘ম্যাডাম প্লিজ!’ কৌশিকের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে জলটা নিল, ‘থ্যাংকস! কীরকম ট্যাটা মহিলা দেখলি?’

‘না তো।’

‘মানে? দেখিসনি?’

‘আমি তো শুধু তোকে দেখছিলাম। কী সুন্দর খিস্তি দিচ্ছিস, বেধড়ক কেলিয়ে হাতের সুখ করছিস।’

‘দিজ ইজ নট দ্য টাইম ফর সিলি জোকস অ্যাট অল কৌশিক।’

‘সত্যি বলছি, তোকে পুরো অন্য রূপে দেখলাম। আপশোস হচ্ছে স্বয়ম্ভু সেনের জন্য। এই রূপে তোকে দেখতে পেল না।’

‘রাবিশ।’

বাকি জলটা একবারে খেয়ে নিল।

‘আমি তো ভাবতেই পারছি না। সুকুমারদা?’

শুভঙ্কর কাঞ্জিলালের স্বরে প্রবল বিস্ময়। ‘এই বয়সে লোকটাকে জেলে পাঠাতে হবে? আমাদেরই লোক! হায় রে!’ দু-হাতে মুখ ঢেকে মাথা নাড়ান শুভঙ্কর।

‘স্যার, এইখানেই আমার কথা। জেলে পাঠালেই কি সব সমাধান হয়ে যাবে? আমরা তো আটকে দিয়েছি পুরো ব্যাপারটাকে। এই কথা বাইরে পাঁচকান যাতে না হয় তার ব্যবস্থা আমি করছি।’

‘মানে কী করতে বলছ তুমি?’

‘নজরবন্দি। যতদিন না এই সিরিয়াল কিলিংয়ের সমাধান হচ্ছে, খুনি ধরা পড়ছে ততদিন আমরা যদি সুকুমারদাকে নজরবন্দি করে রাখি। সঙ্গে ওর বাড়ির লোককে জানিয়ে দেব যে সুকুমারদাকে কিছুদিনের জন্য একটা গোপন তদন্তের কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে।’

‘তারপর? ধরো কেস তুমি সলভ করে ফেললে, তারপর তো সেই ওকে জেলেই ঢোকাতে হবে।’

‘সেটা না করে আমরা যদি তাঁকে শুধুমাত্র স্যাক করি। কাউকে কিছু না জানিয়ে বলা হবে ভলেন্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়েছেন। তাহলে?’

খানিক ড্যাব ড্যাব করে শুভঙ্কর স্বয়ম্ভুর দিকে চেয়ে রইলেন। বললেন, ‘কিছু মনে কোরো না, আমি তো তোমার মধ্যেও পাক্কা ক্রিমিনাল হওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। সুকুমার ইজ আ ক্রিমিনাল। ও যেটা করেছে সেটা শুধু অন্যায় নয়, অপরাধ।’

‘আর সুকুমারের সঙ্গে যেটা এত কাল হয়েছে, দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে একই জায়গায় বসিয়ে রাখা। ডিসিপির সোর্স না থাকলে বিজয়ের চাকরিটা কী হত স্যার? এটা আমি আপনি সবাই জানি। জেনেশুনে ‘মাস্টারমশাই আপনি কিচ্ছু জানেন না’-র ভান করে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে।’

‘কেন? বিজয়ের কাজে খুঁত আছে কোনও?’

‘সুকুমারদার কাজে কী খুঁত পেয়েছি আমরা? ওনার নামে ডিপার্টমেন্টে একটা কমপ্লেইন আছে?’

‘তোমার সাকরেদদের জিজ্ঞেস করো জানতে পারবে।’

‘চোখের সামনে একটা লোক সেই কবে থেকে দেখে যাচ্ছে ওর হাঁটুর বয়সি ছেলেগুলোর উন্নতি হচ্ছে। অথচ উনি একই স্থানে। সেক্ষেত্রে একটু খিটখিটে হওয়াটা স্বাভাবিক নয় কি? ছেলেগুলোকে মনে মনে হিংসে করাটা স্বাভাবিক নয়?’

‘এই শোনো স্বয়ম্ভু, তোমার সঙ্গে এ নিয়ে আমি তর্ক করতে চাইছি না। আমি এই মুহূর্তে হায়ার অথোরিটিকে কল করে সবটা জানাচ্ছি। ওঁরা যা ডিসিশন নেবেন সেটাই ফাইনাল।’

‘ধৃতিমানের ছেলেটা বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে এক্সট্রিম ট্যালেন্ট থাকা সত্ত্বেও ক্রিমিনাল হয়ে গুলি খেয়ে মরল। সুকুমারদারও একটাই ছেলে। আমরা আরও একটা আয়ুষ্মানের জন্ম দিতে চলেছি স্যার। মানুষ ক্রিমিনাল হয়ে তো জন্মায় না স্যার। প্রাপ্য জিনিস না পেতে পেতে অপরাধমনষ্ক হয়ে পড়ে।’

‘জ্ঞানের বুলি আইন শুনবে না। তোমার চৈতন্যবাণী শুনতে গেলে আমাকেও হাজতে যেতে হবে। সরি।’

হাতে মোবাইল তুলে ফোন করতে যাচ্ছিল। ক্ষণেক থেমে বলল, ‘আমি আলোচনা করে দেখতে পারি, জেল কাস্টডিটা এড়ানো যায় কিনা।’

‘সেটা হলে আমাদের মানসম্মানটাও বাঁচবে স্যার। একবার যদি খবর লিক হয়ে যায় যে বাঘের ঘরেই ঘোগের বাসা, তাহলে কিন্তু মুখ দেখাবার জো থাকবে না।’

‘ধন্যবাদ। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আমার মগজ ধোলাই করার জন্য। এবার তুমি এসো। আমি কথা বলে জানাচ্ছি।’

স্যালুট ঠুকে ঘর ছাড়ল স্বয়ম্ভু।

সুকুমার সেই থেকে নিজের চেয়ারে মুখ নীচু করে একভাবে বসে আছেন। স্বয়ম্ভু ঘরে ঢুকে সুকুমারের সামনেই জিজ্ঞাসা করল, ‘কী খবর শিবাঙ্গী?’ শিবাঙ্গী উত্তর দেবার আগেই উত্তেজিত হয়ে কৌশিক জবাব দিল, ‘মেরে পাট পাট করে দিয়েছে স্যার। সে কি খিস্তিইইই!’ শিবাঙ্গী চোখ পাকাতেই বাকিদের ফিকফিক হাসি। স্বয়ম্ভু এগিয়ে এসে বলল, ‘ধড়ে প্রাণ আছে তো?’

‘নাআআআ স্যার ওসব কিছু…’

‘অ্যাঁ মানে? মেরে ফেলেছ?’

আঁতকে লাফিয়ে ওঠে স্বয়ম্ভু। সামনে দু-হাত নেড়ে বোঝায় শিবাঙ্গী, ‘না না স্যার তা বলিনি। দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। কিন্তু মার খেয়েও খুনির নাম মুখ দিয়ে বের করেনি। তবে খুনির সঙ্গে যে যোগাযোগ আছে সেটা নিশ্চিত।’

‘কী করে বুঝলে?’

শিবাঙ্গী খুলে বলে সবটা। চিন্তান্বিত হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভু বলে, ‘হুম! খুনি এই কারণেই আঁখিকে বেছে নিয়েছে। মেয়েটার মেরুদণ্ড আছে। ভেতরে একটা জোর আছে।’ ঝট করে চোখ তুলে সুকুমারের দিকে তাকায় স্বয়ম্ভু। বলতে বলতে সুকুমারের দিকে এগোতে থাকে সে। ‘কী সুকুমারদা, সব যখন ধরা পড়েই গেছে তখন খুনির নামটা বলে দিন না দাদা। আমি নিজে শুভঙ্কর স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। আপনাকে যাতে জেলে যেতে না হয় আর ব্যাপারটা যাতে এই চার দেয়াল ও এই ক’টা মানুষের মধ্যেই থাকে সেসব দেখা হচ্ছে। তবে কথা কিছু দিতে পারছি না।’

সুকুমারের কোনও বিকার নেই। চোখ খোলা কিন্তু মাটির দিকে। মুখটা বুকের মধ্যে গুঁজে চুপটি করে বসে আছে। স্বয়ম্ভু বলে চলেছে, ‘আজ শুধু আপনার জন্য আমাদের টিমের এত হেনস্থা সুকুমারদা। আপনি সত্যিই খুনির নাম জানেন না? যাকে খবর ট্রান্সফার করতেন সে যদি জানে তার মানে আপনিও জানেন। সে বাইরের লোক। ক্যালানি দিলে বুকে বাজবে না। কিন্তু আপনাকে যদি এ সব করে… না দাদা। আমরা কেউ চাই না বিশ্বাস করুন। বলে দিন না দাদা, কার মেরুদণ্ড আছে, কার নেই, কে স্বামীর অত্যাচার সহ্য করে বাঁচবে কে প্রতিবাদ করবে সেটা যার যার তার তারের হাতেই ছাড়ুন। মানুষ মেরে কি বিপ্লব হয় বলুন তো? বলে দিন দাদা বলে দিন। আর কেন…!’ থমকে যায় স্বয়ম্ভু। খেয়াল করে সুকুমারের মুখ দিয়ে খুব ধীরে আঠালো লালা গড়িয়ে বুকের দিকে নেমে আসছে।

‘সুকুমারদা। সুকুমারদা।’

সুকুমারের ডান কাঁধে হাত রাখে স্বয়ম্ভু। সুকুমারের চোখ খোলা। তবু কোনও সাড়া নেই। ঠ্যালা দিতেই পাশের টেবিলে কাটা গাছের মতো নেতিয়ে পড়েন সুকুমার। ছুটে আসে সবাই। স্বয়ম্ভু স্তব্ধবাক। সকলে ডাকডাকি করল। মুখে জল দিল। কেউ নাড়ি খুঁজে পেল না। স্বয়ম্ভূ নির্নিমেষ নয়নে সুকুমারের দিকে চেয়ে বলে উঠল, ‘কপাল করে জন্মেছিল মাইরি। বেঁচে গেল!’

***

‘বেকার এই পুজোগণ্ডার দিনে এই বুড়োটাকে ডাকলি। আমার জন্য তোরা বেরোচ্ছিস না, কিছু করছিস না, আমার খারাপ লাগছে।

বাণীকণ্ঠ রাতের খাবার শেষে আঁচিয়ে কথাটা বলল। অমনি তার নাতি তুতুতু করে বলে উঠল, ‘ধুস, বাবার তো আজকে ছুতিই নেই। যাব কী কলে? কাল ছব্বাই যাব। তাই না মা?’

‘দেখেছেন জেঠু, আমাদের কিন্তু উত্তর দিতে হল না।’ নাতিই উত্তর দিল।

‘নাতিবাবু আমার নায়েক হয়ে গেছে গোওওও!’

‘কাল জেঠু আমাদের সঙ্গে একটু বেরোবেন। বাবাও যাবেন। ভালো লাগবে।’ ছেলের বউয়ের কথায় নীলকণ্ঠ চোখ পাকাল, ‘খেপেছ? তোমরা যাচ্ছ যাও। আমাদের দুই বুড়োকে বাদ দাও বউমা।’

‘কেন বাদ দেবে কেন? নীলা তো ঠিকই বলেছে।’

ছেলে ফ্রেশ হয়ে জামাকাপড় পালটে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ‘তুমি আর জেঠু একসঙ্গে ভালোই তো।’

‘আমাদের কী আর শরীরে সেই জোর আছে রে?’ বাণীকণ্ঠ বলল, ‘ওই খেয়ে উঠে রাতে একটু হাঁটতে বেরোই। নইলে ঘুম আসে না। তা সে তোরা তো দোরে খিল তুলে আটকে দিলি।’

‘আজকেও তাই করব জেঠু। এত রাতে বাইরে বেরোবেন না। এমনিতেই রাস্তা গুলিয়ে ফেলেন।’ নীলা বলল।

‘সে আমি ঠিক চিনে নেব। বাইরে কীরকম তেড়ে সব ঠাকুর দেখতে যাচ্ছে দ্যাখো দেখি।’

‘আমাদের এই এস্টেট অঞ্চলটা সেসবের থেকে আলাদা গো। এখানে অর্ধেক বাড়ি খালি। যেগুলোতে লোকজন আছে তাদের বেশিরভাগ সব বুড়োবুড়ি। আমাদের মতন জোয়ান হাতে গোনা। এদিকে এস্টেটটা দেখো কী বিশাল এলাকা নিয়ে।’ কথাগুলো বলতে বলতে ভাত মাখল নীলকণ্ঠের ছেলে।

‘কটা বাড়ি আছে রে?’

বাণীকণ্ঠ প্রশ্ন করল। নীলকণ্ঠের ছেলে উত্তর দিল, ‘তাআআআ নয় নয় করে দেড় হাজার ফ্ল্যাট তো বটেই। বেশি বই কম না। এখন বাইরে বেরিয়ে দেখো না, এস্টেটের রাস্তা শুনশান। একটা-দুটো লোক শুধু হেঁটে যাচ্ছে হয়তো। এদিকে বাইরে জনজোয়ার। অবশ্য, এই যে বাড়ি ফিরলাম সেরকম ভিড় কিন্তু দেখলাম না।’

‘দাঁড়া, সবে তো সপ্তমী।’ নীলকণ্ঠ বলল টাওয়েলে হাত মুছতে মুছতে।

বউমা বলল, ‘লাস্ট দু-তিন বছর ধরে তো তৃতীয়া থেকে ভিড় শুরু হয়ে যায়।’ ভাতের প্রথম গরাসটা মুখে তুলে ছেলে বলল, ‘আসলে সবার মধ্যে একটা ভয় ধরে গেছে। মিডিয়া এমন করে ওই খুনগুলোকে হাইপ করছে।’ কথাটা শুনেই যেন বাণীকণ্ঠের কানটা চুলকে উঠল। প্রকাশের মুখটা মনে পড়ল। গোপনে একটা শ্বাস ছাড়ল।

‘সত্যি বাবা! কী যে হচ্ছে কে জানে। আর খেয়াল করেছ সব ঘটনাগুলো কিন্তু আমাদের চারপাশেই ঘটছে। মানে একটা খুন হয়তো সোনারপুরে হল, আরেকটা হল গিয়ে ওই হুগলির কোথাও একটা। এরকম নয় কিন্তু।’

‘বাবা, ঘরে বসে বসে তো বেশ গোয়েন্দার মতো খবরাখবর রাখছ তুমি।’

নীলকণ্ঠের কথায় একটু লাজুক স্বরে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘লেডি শার্লক বলছেন?’ নীলকণ্ঠের নজর পড়ল তার দাদাটির দিকে, ‘কী রে দাদা! গুম মেরে গেলি যে।’

‘ভাবছি।’

‘কী ভাবছিস?’

‘আমি তো আর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার নই। তাহলে তো আমার ভয় নেই।

‘জেঠুউউউ! হবে নাআআআ। ঘরে গিয়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো ঘুমিয়ে পড়বেন। বউমা ছদ্মবকুনি দিল। নাতিও তাল মিলিয়ে সরু গলা গম্ভীর করে আধো স্বরে ধমক দিল, ‘বাইরে একটা দুত্তু লোক ঘুচ্চে। মেয়েদের ঘ্যাচ ঘ্যাঁচ করে মাচ্চে!’ কথাটা শুনেই বুবলাইয়ের বাবা-মা সতর্ক হয়ে ওঠে। বুঝতে পারে সব আলোচনা বাচ্চার সামনে না হওয়াই ভালো। বাণীকণ্ঠ বলল, ‘খালি দুত্তুলোকই ঘ্যাচ করতে পারে নাকি? আমিও দুত্তুলোককে ঘ্যাঁচ করে দেব।’

‘বুবলাই শুতে যাও। দেরি কোরো না।’

এই কথাটাই বুবলাই মায়ের সুর নকল করে বাণীকণ্ঠকে বলল। চটাস করে নিজের কপাল চাপড়াল বাণীকণ্ঠ। কী দিনকাল এল বাবা রে! হেসে ফেলল সবাই। শেষে বউমার একটা কথায় বাণীকণ্ঠ কপাল থেকে হাত সরিয়ে চোখ তুলে তাকাল।

‘এই এস্টেটে বেশ কয়েকজন আছে যারা রোজ হাজব্যান্ড, শাশুড়ি এদের হাতে মার খায়। কিন্তু বুক ফাটলেও মুখ ফোটে না।’

বাণীকণ্ঠ গম্ভীর গলায় বলল, ‘তুমি চেনো তাদের? আলাপ আছে?’

‘চিনি অনেককেই তবে কথা হয় না।’

বাণীকণ্ঠ সোফা ছেড়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেলেন। নাতিকে গুডনাইটটুকুও বললেন না। যেন কোনও ভাবনার অথৈ গহিনে হেঁটে গেল বাণীকণ্ঠ।

বহু পুরোনো ফ্ল্যাট নিয়ে তৈরি এই এস্টেট সপ্তমীর রাতেও ঝিমোচ্ছে। পুজো থেকে যেন অনেক দূরে এই এস্টেটের অবস্থান। আলাদা কোনও দ্বীপ। অথচ পাশের লম্বা খালটা টপকালেই উড়ন্ত ছুটন্ত বাইপাস। শাঁ শাঁ গাড়ির মিছিল। মাইকে পুজোর ফাংশান। যথারীতি ঘুম আসেনি বাণীকণ্ঠের। মার্জারপদে ঘর ছেড়ে লালচে আলোর ডাইনিং। মাঝরাতে উঠে বাথরুমে যেতে যাতে অসুবিধে না হয় তার জন্য মাঝের আলোটা জ্বলে। তবু হাই পাওয়ারের প্রকোপে সামনের জায়গাটা হাতড়ে হাতড়ে রান্নাঘরে ঢোকে বাণীকণ্ঠ। আলোটাও জ্বালে। একবার চোখ বোলাতেই কাটলারি সেট রাখা জায়গাটায় চোখ পড়ে। লকলকে জিভের মতো ঝুলছে চকচকে ছুরিটা। টুক করে তুলে ধারটা দেখে নিল। তেমন হলে এ দিয়ে কাজ ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এটা নিয়ে বাইরে যাওয়াটা রিস্কি। একটা ফল কাটার ছুরি দেখেছিল বউমার হাতে। সেটা ফোল্ড করা যায়। সেটা কোথায়? আরও একটু ছানবিন। সেটাই পেয়ে গেল বাণীকণ্ঠ। এটার ধার আগেই পরখ করে রেখেছিল। ঝট করে পকেটে পুরে রান্নাঘরের আলো নেভাল। দরজার চাবিটা পাশের দেয়ালেই ঝুলছে। সেটা তুলে খুব সন্তর্পণে ছিটকিনি খুলে চাবিটা ঘোরায়। দরজা খুলে যায়। দেরি না করে টুক করে বাইরে বেরিয়ে আবার বাইরে থেকে চাবি ঘুরিয়ে লক করে দেয়। ভিতর থেকে সহজেই কেউ দরজা খুলে বেরোতে পারবে। কিন্তু চাবি ছাড়া ঢুকতে পারবে না।

লোকহীন সড়কে সারমেয়দের চোখে এমনিই সন্দেহ লেগে থাকে। সেইখানে এক বৃদ্ধ খামোকা মধ্যরাতে চরতে বেরিয়েছে এ ব্যাপারটা তারা মোটেও পছন্দ করল না। ঘেউ ঘেউ করে বাণীকণ্ঠের আগে-পিছে চরকি পাক খেতে লাগল। কিন্তু বাণীকণ্ঠের কাছে তেমন একটা পাত্তা না পেয়ে নিজেরাই একসময় সরে পড়ল। ভেবেছিল বাড়ি থেকে বেরিয়ে একেবারে চারপাশে পথচিহ্ন নজর করতে করতে যাবে। কিন্তু কুকুরগুলোর পাল্লায় পড়ে কটা যে বাঁক ঘুরল সে আর খেয়াল রইল না বাণীকণ্ঠের। কী আর হবে? মোবাইল তো সঙ্গে নিয়েই বেরিয়েছে। লজ্জাঘেন্নার মাথা খেয়ে ফোন করবে ভাইপোকে। এসে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। ভাবতে ভাবতেই আলোছায়ার মধ্যে একটা অবয়ব। হেঁটে আসছে। বাণীকণ্ঠ মনে মনে হাসল। এই তো, পথে মানুষ আছে। তাও আবার মেয়ে! মেয়েটি পাশ দিয়ে হেঁটে সোজা উলটোদিকে চলে গেল। পরনে কালো সালোয়ার কামিজ। মাঝখানে যেন হাঁটার গতিটা খানিক থমকে ছিল। কেন? সে কি এত রাতে এক বৃদ্ধকে দেখে? মেয়েটিকে ভালো করে নিরীক্ষণ করতে পিছনে ঘাড় ঘোরাল বাণীকণ্ঠ। মেয়েটি একটু দ্রুত পায়েই যেন পরবর্তী বাঁকে হারিয়ে গেল। হারিয়ে যাবার আগে সেও কি একবার বাণীকণ্ঠের দিকে চাইল?

একেই রাস্তায় ঘুম। নিঃশব্দ চরাচর কল্পনা করা বৃথা। তার ওপর দ্রুতবেগে কারও ছুটে আসার পদধ্বনি। এক্কেবারে যেন গায়ের ওপরে এসে পড়ছে। ছেঁড়া চাদরের আড়াল থেকে মুখটা বের করতেই চোখের ওপর একটা কালোরঙের মানুষ যেন উড়ে বেরিয়ে গেল। পাগলটা বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকে দেখল। ও বাবা! এ আবার মেয়েমানুষ! ওকি! দাঁড়িয়ে পড়ল কেন? পকেট থেকে কী একটা বের করল। হাতের চাপে কী যেন খুলল। তারপর ছুড়ে ফেলে দিল। পাগলটা ঘুমচোখে যা দেখল তাতে তার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল।

***

ঝুমুর ঝামুর বাজনা সমেত মাঝরাতে মোবাইলটা নেচে উঠল। স্বয়ম্ভু চোখ কচলে দেখল আননোন নম্বর। ‘হ্যালো… হ্যাঁ বলছি। আচ্ছা। কী হয়েছে?’ শোওয়া অবস্থা থেকে শরীরটা যেন শক খেয়ে কিছুটা ওপর দিকে উঠে গেল। ‘আসছি।’ মোবাইলটা কান থেকে রেখে সোজা হয়ে উঠে বসল। কানে ভেসে আসা খবরটা কয়েক পলক নিশ্চল করে দিল স্বয়ম্ভূকে। মনে মনে গালাগাল দিল, এই শালা শুয়োরের বাচ্চাটা আর বাঁচতে দেবে না। সুকুমারের দাহকার্য শেষ করে এমনিতেই রাতে ফিরে মনটা ভার হয়ে ছিল। তার ওপর আবার..

‘সরি শিবাঙ্গী। এখানে তোমার না গেলেই নয় তাই কল করছি।… পাটুলি উপনগরীতে স্বর্ণশিখর এস্টেটের এক মহিলা খুন হয়েছে। অল্পবয়সি। চলে এসো। লোকেশন পাঠিয়ে দিচ্ছি। বাই দ্য ওয়ে, হ্যাপি মহাষ্টমী। চলে এসো।’

যারা ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল তারা ফিরে হতবাক। যারা ঘুমিয়েছিলেন তারা চোখ কচলে লাল করে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। মহিলারা জানলায়-দরজায় মুখ বাড়িয়ে গল্প বুনছেন। লাশ ঘিরে আলোর ঝলক। স্থানীয় ডিউটি অফিসারের প্রশ্নে যে বাড়ির সামনে খুন হয়েছে সেই বাড়ির লোকটি জানায় যে তারা মানুষের চিৎকার চেঁচামেচির কোনও শব্দই পাননি। খুনটা নিঃশব্দে হয়েছে। মাঝে কারও একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর আর কাশির শব্দ শোনা গেলেও ঘুমন্ত মানুষগুলো বিশেষ পাত্তা দেয়নি।

‘তাহলে আপনার বাড়ির সামনে যে লাশ পড়ে আছে সেটা জানলেন কী করে?’

স্বয়ম্ভু করল প্রশ্নটা।

‘বিবেকদা ফোন করে জানালো তো। ওই সোজা বাড়িটা।’

আঙুল নির্দেশ করল সোজাসুজি বাড়িটার দিকে। উনি রাতে উঠেছিলেন। জানলা খোলাই ছিল। তা হঠাৎ দেখেন কেউ একজন এখানে পড়ে আছে। আমায় জানান। আমি বেরিয়ে দেখি এই কাণ্ড।

‘এনাকে চেনেন?’

‘হ্যাঁ ওই তো ওর হাজব্যান্ড দাঁড়িয়ে আছে। তিলক। মেয়েটার নাম তন্দ্রা।’

‘তন্দ্ৰা কী?’

পাশ থেকে আরেক প্রতিবেশী বলে উঠলেন, ‘জানা। তন্দ্রা জানা। ‘কেমন ছিল এই মহিলা?’

‘কথা হয়নি আমার সঙ্গে। খুব চুপচাপ।’

পাশ থেকে আবার একজন ফুট কাটলেন, ‘বর আর শাশুড়ির ভয়ে।’

‘কেন?’

স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন।

‘মেন্টাল, ফিজিক্যাল সব চলত। বিশেষ করে মেয়েটার কাজ করা নিয়ে।’

‘মেয়েটা কোথায় কাজ করত?’

‘এই পাটুলির একটা পার্লারে। হেলথ লাইনে ভর্তি ছিল তো তন্দ্ৰা।’

‘হেলথ লাইন?’

এই নামটা সিরিয়াল কিলিংয়ের সময় থেকেই যেন স্বয়ম্ভুর আশপাশে ঘুরছে। তাই একটু বেশিই সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু।

‘ওর বর এমন মেরে ছিল যে হেলথ লাইনে ভর্তি হতে হয়েছিল। এমন হারামি পরিবার বউটাকে দেখতে, ভর্তি করতে কিচ্ছু করতে যায়নি।’

‘তাহলে কে নিয়ে গেল?’

‘ওদের পার্লারের যে মালিক সেই-ই নাকি সব করেছে।’

‘কী নাম তার?’

‘তা তো বলতে পারব না স্যার।’

‘কোন পার্লার?’

‘এই রে… এটাও জানি না।’

আবারও সেই ঘুরেফিরে একই রাস্তায় ভিড়িয়ে দিচ্ছে ইউনিভার্স। এটা কি সেই পাটুলির পার্লার? বিমল না ছেলেটার নাম? এই মেয়েটির কথাই কি দিব্যময়কে বলেছিল ছেলেটি? স্বয়ম্ভুর ভাবনার মাঝেই দৌড়ে এসে ঢুকল শিবাঙ্গী, ‘স্যার দাসবাবু বললেন এই অঞ্চলের সবকটি সিসিটিভি অকেজো। কোনও কানেকশন পাচ্ছে না।

‘কিন্তু ক্যামেরাগুলো পুরোনো তো নয় যে অকেজো হয়ে যাবে।’

কান থেকে মোবাইল নামিয়ে এগিয়ে এলেন স্থানীয় ডিউটি অফিসার দাসবাবু, ‘স্যার কেউ বা কারা ইচ্ছে করে এস্টেটের ঠিক এই জায়গাগুলোর সিসিটিভির তার কেটে দিয়েছে।’

‘লোক এসে তার কেটে দিয়ে চলে গেল। কেউ জানতে পারল না?’

‘জিজ্ঞাসাবাদ করছি স্যার।’

‘শুনুন, কবে থেকে এগুলো কাজ করছে না খবর নিন। আর তার আগের ফুটেজে সন্দেহজনক কাউকে দেখা যাচ্ছে কিনা জানাতে বলুন।’

‘ওকে।’

দাসবাবু সঙ্গে সঙ্গে কাউকে একটা কল করে বললেন, ‘এই দেখো তো, সিসিটিভিগুলো কখন থেকে অকেজো। জানাও।’

স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী লাশের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। গলা কেটে বেরিয়ে আসা রক্তে ভেসে যাচ্ছে পিচসড়ক। স্বয়ম্ভূ হাঁটু মুড়ে বসে উঁকি দিল রাস্তায় পড়ে থাকা অর্ধেক ঢাকা মুখটায়। শিবাঙ্গী চেঁচাল, ‘এই স্ট্রেচারে তোলো এবার।’ হুকুম হওয়া মাত্রই ছুটে এল লোকজন। সন্তর্পণে লাশটাকে স্ট্রেচারে তোলা হল। গায়ে সাদা চাদর ঢাকা দেওয়া হল। মুখটা ঢাকতে যাচ্ছিল কিন্তু স্বয়ম্ভু বাধা দিল, ‘মুখটা খোলা থাক।’ স্ট্রেচারটাকে পাশে রাখা হল। তন্দ্রা যে জায়গায় পড়েছিল ভালো করে সেটাকে মার্ক করে ঘিরে দেওয়া হল।

হঠাৎ তিন-চারটে গাড়ি এসে ভিড় করে জায়গাটায়। তিনটে টিভি চ্যানেল, একটা খবরের কাগজ। ওদের দেখেই স্বয়ম্ভু চোখ কপালে তুলল, ‘আবার এসে সেই বোকা বোকা প্রশ্ন করবে। খুনটা কে করল বলে মনে হচ্ছে আপনার?’

‘স্যার, মেয়েটার গায়ে অনেক আঘাতের চিহ্ন।’

‘হবেই তো। ওই যে দাঁড়িয়ে আছে ধম্মের ষাঁড়। এমন মার মেরেছে যে হেলথ লাইনে ভর্তি ছিল মেয়েটি। হাতে প্লাস্টার করা দেখছ না। মাথাতেও ফেট্টি। ফাটিয়ে দিয়েছিল।’

‘ইস! আচ্ছা স্যার, ডক্টর দিব্যময়ের সঙ্গে যখন আমরা কথা বলতে গিয়েছিলাম তখন একটি ছেলেকে দেখেছিলাম যে তার পার্লারের মহিলাকর্মীকে ওখানে ভর্তি করেছিল।’

‘ঠিকই ধরেছ। এই মেয়েটিই অ্যাডমিট ছিল।’

‘ছেলেটি যাবার আগে বলেছিল, তন্দ্রাকে একটু দেখবেন। আর ওই ছেলেটির পার্লারও আছে। ওই নাকি সব করেছে।

‘বিমল। গতকালই তো ওই ছেলেটাকে রেস্টুরেন্টে দেখলাম। এই মেয়েটাকে নিয়েই বেরোচ্ছিল।’

‘কাল আবার কোন রেস্টুরেন্টে গেলেন? একা?’

সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভুর একটা ভুরু উঠে গেল। তেরচা চোখে শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না দোকা। অসুবিধে আছে?’ চট করে মুখে ফুটে ওঠা কৌতূহল দমন করে শিবাঙ্গী বলল, ‘আমি কি তা বলেছি?’

‘তবে?’

‘কে ছিল, রাজারাম?’

এবার আর তেরচা চোখে নয়। সরাসরি চোখে চোখ রেখে শিবাঙ্গীকে স্বয়ম্ভু বলল, ‘কেন? তুমি রাজারামকে নিয়ে ইন্ডথালিয়ায় খেয়েছ বলে কি আমিও রাজারামকে নিয়েই খাব? আমার জীবনে কি আর কেউ থাকতে নেই?’

‘আপনি? মানে কী করে?’

শিবাঙ্গীর চোখ প্রায় ঠেলে বেরিয়ে আসে।

‘কাজের কথায় এসো।’

হুকুমের সুর স্বয়ম্ভুর গলায়। ‘কাল হেলথ লাইন থেকে ছাড়িয়ে তন্দ্রাকে বোধহয় কিছু খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। ছেলেটি বুঝতে পেরেছিল মেয়েটা হয়তো বাড়িতে গেলে খেতে পাবে না।’

‘বাবা! আজকাল এমন বস তো দেখাই যায় না।’

কথাটা যা ভেবে শিবাঙ্গী বলল, স্বয়ম্ভুর চোখের দিকে তাকাতেই সেই মানেটা গেল পালটে।

‘কী বেইমান কী বেইমান!’

ফিশফিশ করল স্বয়ম্ভু।

‘স্যার আমি ওভাবে…!’

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফরেন্সিক টিমের রোহিত একটি মোবাইল কুড়িয়ে এনে বলে, ‘স্যার, খানিকটা দূরে এটা পাওয়া গেছে। একদম ইনট্যাক্ট।’

স্বয়ম্ভুর হাতে গ্লাভস পরাই ছিল। ফোনটা নিয়ে বাটন টিপতেই চমক, স্ক্রিন সেভারে একটা শালিক। ‘বোঝো, লোকে তো বলে এক শালিক দেখা নাকি খারাপ। এ তো নিজের স্ক্রিন সেভারেই…!’ বলতে বলতে কথাগুলো নিজে থেকেই হারিয়ে যায়। চোখের মণি ঘুরতে থাকে স্বয়ম্ভুর। কাউকে যেন খুঁজতে চাইছে। ‘শিবাঙ্গী, ছবিটা ভালো করে দেখো তো। চিনতে পারছ কিনা।’ ভালো করে ছবিটাকে পর্যবেক্ষণ করতেই শিবাঙ্গীও চমকায়। ‘এ তো সেই শালিকটা। ডক্টর দিব্যময়ের বাবার।’

‘তাহলে এই ফোনটা কার? বাবার না ছেলের?’

তিলেক চুপ। তারপরেই হাঁক পাড়ে, ‘দাসবাবুউউউ! জানলেন?’

দাসের কানে ফোন ধরাই ছিল। ‘স্যার, বলছে আজ বিকেলের পর থেকেই নাকি এক এক করে কানেকশন কাটা হয়েছে।’

‘আজ বিকেল?’

‘একটি লোককে দেখা গেছে। দাড়িওলা। চোখে কালো চশমা। সাইকেল আর সঙ্গে একটা লম্বা মই নিয়ে এই কাজগুলো করছে।’

‘কেউ দেখেনি এখানে?’

উত্তেজনায় গলাটা চড়ে গেছে স্বয়ম্ভুর।

‘লোকজন তো হাঁটাচলা করছিল। কয়েকজন খেয়ালও করেছেন। বাট মই নিয়ে কাজ করছে দেখে ভেবেছে হয়তো ইলেক্ট্রিক সাপ্লাইয়ের লোক। তেমন পাত্তা দেয়নি।

‘যে কটা সিসিটিভি অক্ষত আছে সবকটা ইমিডিয়েট আমি দেখতে চাই।’

‘নো প্রবলেম। থানায় গিয়ে দেখবেন নাকি ফুটেজ পাঠাতে বলব?’

‘কোনটা সুবিধে হবে?’

‘থানায় গেলে। বড়ো স্ক্রিনে দেখতে পাবেন। নইলে পাঠাতে সময় লাগবে।’

‘সেখানেই যাব।’

দাসবাবুর দিক থেকে স্বয়ম্ভুর মুখটা ঝট করে রোহিতের দিকে ঘুরে যায়। প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা তুহিনদার ব্যাপার কী? অর্ধেক সময়ে আসছে না কেন?

‘স্যারের আজকাল ঘন ঘন শরীর খারাপ হচ্ছে। মাথা ঘোরে। যা খায় অম্বল হয়ে যায়।’

‘বুড়ো হয়েছে অথচ কারও কথা শুনবে না।’

রোহিত হাসল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘যাই হোক, কী বুঝছ বলো তো?’

‘স্যার, ভিক্টিমের সঙ্গে খুনির কোনওরকমের হাতাহাতি হয়নি। অন্যান্যবারের মতো এবারেও নির্বিঘ্নে মেরে চলে গেছে। তবে এবারে ভিক্টিমের গায়ে কিন্তু কোনও তেলের গন্ধ নেই।’

‘মানে কাটলেট খেয়ে আসেনি। কেন? সময় ছিল না?’

স্বয়ম্ভু নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছে। ‘তন্দ্রাকে বাইরে ডেকে কয়েক পা এগিয়ে এনে এই বাঁকটার মুখে মেরেছে। কারণ এখানকার আলোটা জ্বলে না। অথবা খুনির কারসাজিতে এটিও গেছে।’

‘সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, স্যার একটু এদিকে আসুন।’

স্বয়ম্ভু এগোল রোহিতের সঙ্গে। ‘রাস্তার পাশের ঘাসগুলো খেয়াল করুন। ‘দেখেছি আগেই। এই ঘাসের ওপর কেউ কিছু খুঁজেছে। আগাছাগুলো সদ্যই মোড়ানো হয়েছে।’

‘কারেক্ট স্যার।’

স্বয়ম্ভূ আবারও বাণীকণ্ঠের মোবাইলটার দিকে এক ঝলক চায়। ‘এই মোবাইলের লকটা আগে খুলতে হবে।’

পাশ থেকে শিবাঙ্গী বলে, ‘স্যার, ওই হারামি স্বামীদেবতাটির সঙ্গে কথা বলবেন না?’

‘শুধু কথা? কত কিছু করা বাকি আছে! বাই দ্য ওয়ে দাসবাবু, ভিক্টিমের ফোন নিশ্চয়ই পাওয়া যাচ্ছে না?’

‘না স্যার। আপনি থানায় চলুন। সিসিটিভির ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

‘দাঁড়ান, আসল কাজটাই তো বাকি।’

স্বয়ম্ভু সোজা তন্দ্রার স্বামীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। যোগ্য সহকারিণীর মতো শিবাঙ্গীও গেল পিছু পিছু। স্বামী প্রাণীটি ঘাবড়ে মুখ তুলে তাকাল। কী করবে ঠিক বুঝতে পারার আগেই দমাস করে একটা ঘুষি গালে গিয়ে পড়ল তার। রাস্তাতেই পড়ে গেল তিলক। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন তটস্থ হয়ে তাকাল। রিপোর্টারগুলো হুড়মুড়িয়ে ধেয়ে এল। স্বয়ম্ভু লোকটির কলার ধরে রাস্তা থেকে তুলল। ততক্ষণে ক্যামেরা চলতে শুরু করেছে বেশ কয়েকটা। তন্দ্রার স্বামী নিজেকে বাঁচাতে গলা তুলল, ‘আপনি ক্যামেরার সামনে আমায় মারছেন কেন?’ পরক্ষণেই ঠাসিয়ে একটা চড় মেরেই স্বয়ম্ভু রিপোর্টারদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই জানোয়ার লোকটি তার স্ত্রীর শরীরে যতগুলো আঘাতের চিহ্ন এঁকেছে, আমি ঠিক ততগুলো চিহ্ন এর শরীরে আঁকব। আপনারা লাইভ করুন, রেকর্ড করুন। যা ইচ্ছে করুন। এদের মতো পশুগুলোর জন্যই এতগুলো মহিলাকে মরতে হচ্ছে।’ বলেই গদাম করে তলপেটে একটা ঘুষি আর উলটো গালে আরেকটা চড়। রিপোর্টাররা উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। রাতের উপনগরীর শিরায় হঠাৎ করে কেউ যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলিয়ে দিয়েছে। শিবাঙ্গী দু-চোখে যা দেখছে তা এক্কেবারে আনকোরা নতুন। এইভাবে সকলকে চমকে দিয়ে পাবলিক প্লেসে এলোপাথাড়ি মারতে স্বয়ম্ভুকে কোনওদিন দেখেনি।

স্বয়ম্ভুর দুটো হাতের তালু দু-পাশ থেকে সবেগে চটাস শব্দে লোকটার দুটো কান ঘেঁষে পড়ল। বাঁ হাতে লোকটার ঘাড় ধরে আবার ক্যামেরায় বাইট দিল স্বয়ম্ভু, ‘এই খুনগুলো যে বা যারা করছ তারা ভালো করে দেখো, আমি স্বয়ম্ভু সেন, নিজে হাতে জানোয়ারটার কী হাল করছি। আর হ্যাঁ, ভিক্টিম তন্দ্রা জানার আঘাতের সব রিপোর্ট হেলথ লাইন নার্সিংহোমে রয়েছে। প্রমাণ ছাড়া স্বয়ম্ভু ক্যালায় না।’ এরপর আর কথা নয়, স্বয়ম্ভুর হাতের দমাদ্দম চড়, কিল, ঘুষি মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তন্দ্রার স্বামীকে কালশিটে আর রক্তে সাজিয়ে দিল। তিলকের বয়স্কা মা কার থেকে যেন খবর পেয়ে দৌড়ে এলেন। পুলিশের হাত থেকে ছেলেকে বাঁচাতে। বিশেষ সুবিধে করতে পারলেন না কারণ ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘মা-টাকেও ঘা কতক দিন স্যার। ওই মহিলাই নাটের গুরু।’ স্বয়ম্ভু ধমক দিল মহিলাকে, ‘কী করতে এসেছেন আপনি? ছেলেকে বাঁচাতে? ওই দেখুন আপনারই মতো একটা মেয়ে যে বাপের ঘর ছেড়ে আপনার ঘরে এসেছিল, তার লাশটা মাটিতে পড়ে। মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু, তাই আপনার মতো মহিলাদেরও ব্যবস্থা হবে। এই ক্যামেরার সামনে বললাম। আপাতত আপনার ছেলের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ আছে তাই তাকেই শ্রীঘরে পাঠাচ্ছি।’

রিপোর্টারদের সঙ্গে আরও খান বিশেক ফোনে শুধু ফেসবুক লাইভ চলছে। সপ্তমীর শেষ রাত জমজমাট। যদিও তিথি অনুযায়ী সপ্তমী পেরিয়ে অষ্টমী শুরু হয়ে গেছে। স্বয়ম্ভূ জোর গলায় ঘোষণা করে, ‘আমি স্বয়ম্ভু সেন, একটা কথা সবাইকে বলছি, কান খুলে শুনুন, পুজোতে সব্বাই নির্ভয়ে ঘুরুন। যে সকল মেয়েরা তাদের শ্বশুরবাড়ি হোক, বাপের বাড়ি হোক, যেখানেই অত্যাচারিত হচ্ছেন বা হবেন, সঙ্গে সঙ্গে থানায় রিপোর্ট করুন। একজন পুলিশও এই কেসে অবহেলা করলে নির্দ্বিধায় লালবাজারে কল করে হোক, ফেসবুকে হোক যেভাবে হোক জানাবেন। সেই পুলিশকে আমরা দেখে নেব। কিন্তু প্লিজ, কারও ভয়ে ঘরের মধ্যে গুটিয়ে বসে থাকবেন না। আপাতত এই অমানুষটার ব্যবস্থা করি।’

‘আ… আমি খুন করিনি। বিশ্বাস করুন আমি খুন করিনি।

তন্দ্রার স্বামী কাঁপা গলায় বলে ওঠে। ‘চোপ শালা। দাসবাবু…!’ লোকটার ঘাড় ধরে দাসের দিকে ছুড়ে দিল স্বয়ম্ভু। দাসবাবু টুক করে লুফে নিলেন। রিপোর্টাররা বাইট দিতে শুরু করেছে, ‘স্বয়ম্ভু সেন যা দৃশ্য দেখালেন, এমন দৃশ্য আমরা সবাই সিনেমায় দেখেছি। সত্যি যদি এমনই ব্যবস্থা হয় তাহলে কলকাতা আবারও সত্যিকারের ভালোবাসার শহর হয়ে উঠবে। এই তিলোত্তমায় আর কেউ কোনও নারীর গায়ে হাত দিতে পারবে না। সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। কিন্তু যাঁদের প্রাণ বেঘোরে গেল তাদের খুনি কোথায়? ধরা কি পড়বে আদৌ নাকি এ সবই পুলিশের আই ওয়াশ?’

‘পাবলিক প্লেসে এভাবে ঠ্যাঙালেন, ওপর মহল থেকে এক্ষুনি না ফোন আসে।’

‘আসুক। মাঝেমধ্যে একটু আইন-টাইন না ভাঙলে সেলিব্রিটি হওয়া যায় না। আমি তো আর ভালো মানুষকে মারিনি। একটা অপরাধীকে কেলিয়েছি। কেন, তোমার ভয় করছে? ক্যামেরায় তোমার ছবিও উঠে গেল বলে?’

‘ধুস। আমার হেব্বি লেগেছে।’

‘হুম। আঁখির রেকর্ডিংটা শুনলাম। এত খিস্তি জানলে কোত্থেকে?’

এমন একটা উদ্ভট প্রশ্ন শুনে শিবাঙ্গী একটু ন্যাকামি করেই বলল, ‘মা শিখিয়েছে স্যার।’ স্বয়ম্ভু খ্যাক করে হেসেই কন্ট্রোল করে নিল।

মিনতির প্রতিবেশী স্বপ্না ঠিক যেমন বর্ণনা দিয়েছিল দাড়িওয়ালা ছেলেটির, এখানেও ঠিক তেমনই। কারোর বুঝতে বাকি রইল না এই ছেলেটিই আসল কালপ্রিট। অত লম্বা মইটা নিয়ে সাইকেল চালিয়ে এক এক করে সিসি ক্যামেরার কানেকশনগুলো কাটছে।

ছেলেটা যদি ওর ক্ষুরধার বুদ্ধিগুলো ভালো কাজে লাগাত, হয়তো দেশের কিছু উন্নতি হত।’ স্বয়ম্ভু বলল।

‘ইচ্ছে করেই সাইকেল নিয়েছে। নম্বর ট্রেস করতে পারবে না কেউ।’ শিবাঙ্গী বলল।

‘গায়ের জোরও ভালোই আছে। নইলে এই এত বড়ো মইয়ের কম ওজন নাকি? একা সামলাচ্ছে কী করে?’

স্বয়ম্ভু বলল, ‘ভালো করে খেয়াল করো শিবাঙ্গী, ছেলেটি কখনও বাঁ হাতে আবার কখনও ডান হাতে কানেকশনগুলো কাটছে।’

‘হুম। সব্যসাচী।’

‘আজ রাতে কোন ক্যামেরা কাজ করছে দেখি।’

স্বয়ম্ভূ দেখল এস্টেটের দু-দিকে বেরোবার পথ। একদিক দিয়ে বেরোলে পাটুলির ভিতরের রাস্তায় ওঠা যায়। যেদিকের সবকটি সিসিক্যামেরাই অকেজো

‘তার মানে সাসপেক্ট এদিক দিয়েই বেরিয়েছে। তাই এই রাস্তাটা ক্লিয়ার করে রেখেছে। উলটো দিকটা দেখি।’

‘এদিকেরটা এখনও চলছে স্যার।’

‘কোথায় উঠছে এটা?’

‘গড়িয়া স্টেশন রোডের পাশে যে সার্ভিস রোডটা আছে সেখানে।

‘এদিকের ফুটেজগুলো দেখি।’

একটু পরেই স্বয়ম্ভূ আর শিবাঙ্গী চমকে ওঠে। ‘ডক্টর দিব্যময়ের বাবা!’ শিবাঙ্গীর কণ্ঠে উত্তেজনা।

বাণীকণ্ঠ টলতে টলতে উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়োচ্ছে আর এপাশ ওপাশ চারপাশের বাড়িগুলো দেখছে।

‘মুখে জুম ইন করো তো।

স্বয়ম্ভুর হুকুমে ফুটেজ জুম ইন হল। বাণীকণ্ঠের মুখে রক্তের দাগ। জামার হাতাতেও লালচে দাগ সুস্পষ্ট। এস্টেটের গেট দিয়ে বেরিয়ে সোজা সার্ভিস রোডে উঠলেন।

‘রোডে কোনও সিসিটিভি নেই?’

‘আছে স্যার, এক মিনিট।’

ফুটেজ চলল। বাণীকণ্ঠ দিশাহীন হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একটা হলুদ ট্যাক্সি দড়িয়ে ছিল। তাকে গিয়েই কীসব যেন বলল। হাত নেড়ে অনেক কিছু বোঝাল। তারপর গাড়িতে উঠে পড়ল। ট্যাক্সিটা সামনে থেকে খালের কালভাট টপকে স্টেশন রোড নিল।

‘স্যার, গড়িয়ার দিকে টার্ন নিল।

শিবাঙ্গী বলে উঠল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘ওনার বাড়ি পৌঁছতে হলে গড়িয়ার দিকেই টান নিতে হবে।

‘কিন্তু এখানে উনি কী করছেন?’

‘জানি না।’

‘তবে কী বাণীকণ্ঠ এই খুনের সঙ্গে…’

‘নাও হতে পারে শিবাঙ্গী। উনি হয়তো খুনটাই দেখে ফেলেছিলেন।’

‘তাহলে গায়ে রক্ত কেন?’

‘খুনি তাকে ছেড়েই বা দিল কেন? সরি মুনশি, ভেরি সরি। তোমার সুখের ঘুম চৌপাট হল বলে।’

বিড়বিড় করতে করতেই মোবাইল কানে দিল স্বয়ম্ভু। ওদিকে রিং হচ্ছে। এদিকে স্বয়ম্ভু বলল, ‘দাসবাবু আমাদের একটা গাড়ি লাগবে।’

‘রেডি আছে স্যার।’

‘থ্যাংক ইউ। হ্যাঁ মুনশিবাবু, ঘুমোচ্ছিলেন?’

শিবাঙ্গী থানার দেয়ালের ঘড়িটা একঝলক দেখে নিল। রাত তিনটে বাজতে চলেছে। এই সময় ঘুমোবে না তো কী করবে?

‘বলছিলাম কি এক্ষুনি লোক নিয়ে বাণীকণ্ঠ মুখার্জির বাড়ি যেতে হবে। আমরা আসছি। একসঙ্গে ঢুকব কেমন? চট করে রেডি হয়ে থানায় আসুন।’

এরপরের ফোনটা গেল রাজারামের কাছে। ‘রেডি হয়ে নাও রাজারাম। সেজেগুজে ডক্টর দিব্যময়ের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে ওয়েট করো।… সব সময় মতো বলব। স্বয়ম্ভু সেনের সিক্সথ সেন্স যদি ভুল না করে তাহলে ওখানেই তোমার কাজ আছে। অ্যাড্রেসটা টেক্সট করছি।’ ফোনটা রেখে শিবাঙ্গীর মুখের দিকে তাকিয়েই এক হাত জিভ কাটল স্বয়ম্ভু।

‘কী হল?’

‘বেকার ফোনটা করলাম। এটা তো তুমিই করে জানিয়ে দিতে পারতে।

‘এরকম একটা সিরিয়াস পরিস্থিতিতেও? বাই দ্য ওয়ে, এটা মশকরা না খোঁচা?’

শিবাঙ্গী প্রশ্নটা করেই ফেলল।

‘সে তুমি যেভাবে নেবে।

পাড়ায় পুলিশের গাড়ি ঢুকতেই নাইট পেট্রোলিংয়ে থাকা কুকুরগুলো ‘প্রহর জাগো’ বলে ডেকে উঠল। বাণীকণ্ঠের বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়াতেই থমকাল

স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী ও সুরঞ্জন মুনশি।

‘নক করব?’

চাপা গলায় প্রশ্ন করল শিবাঙ্গী।

‘একবার ঠেলে দেখো।’

স্বয়ম্ভুর সাজেশন। শিবাঙ্গী সেটাই করল। দরজাটা ফাঁক হয়ে গেল। স্বয়ম্ভু একটা গভীর শ্বাসের সঙ্গে চোখ বন্ধ করল। যা ভেবেছিল ঠিক তাই। শিবাঙ্গীকে টপকে নিজে সামনে এসে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ল। ছোট্ট উঠোন। ডানদিকে বাড়িতে ঢোকার গেট তালাহীন। শুধু ছিটকিনিটা লাগানো। গোটা বাড়ি অন্ধকার। স্বয়ম্ভু কোমর থেকে রিভলভার বের করে পজিশন নেয়। শিবাঙ্গীও তাই। লোহার গেট পেরোলে বারান্দা।

‘গেটে নক করুন।’

মুনশিকে বলে স্বয়ম্ভু। মুনশিও রিভলভার হাতে নিয়ে গেটে শব্দ করে। একবার, দুবার, তিনবার। খাঁচায় বন্দি শালিকটা ‘কেঁ কেঁ’ করে এমন চিৎকার করে ওঠে মুনশি একটা সিঁড়ি হড়কে নীচের সিঁড়িতে নেমে আসে।

‘কে আছেন বাড়িতে? বেরিয়ে আসুন।’

স্বয়ম্ভু গলা তোলে। আবার শালিক চ্যাচ্যায়, ‘বেঁরোঁ বেঁরোঁ। কেঁ এঁলিঁ বেঁরোঁ।’

‘এটা কী পাখি?’

‘শালিক।’

মুনশির প্রশ্নের উত্তর দেয় শিবাঙ্গী। ‘শালিকেও কথা বলে?’ স্বয়ম্ভূ আবার চিৎকার করে, ‘কী হল? কে আছেন বাড়িতে?’

ভিতর থেকে একটা মহিলার সরু গলা মিনমিন করে বাজে, ‘বাইরে কে?’

‘পুলিশ। বেরিয়ে আসুন।’

‘পুঁলিঁশ। পুঁলিঁশ।’

আলো জ্বলে ওঠে। মন্দাকিনী বেরিয়ে আসে ভীত মুখে। শিবাঙ্গী, স্বয়ম্ভু সকলেই বারান্দায় উঠে পড়েছে। ‘আ…আপনারা এত রাতে? কী হয়েছে? ঢু…ঢু…ঢুকলেন কী করে?’

‘যে এসেছিল সে কোথায়?’

স্বয়ম্ভু আলটপকা বোমা ফেলল।

‘কে? কই? কেউ তো আসেনি।’

‘তাহলে দরজা খোলা কেন?’

‘ও হো, হ্যাঁ হ্যাঁ এই ঘণ্টাখানেক আগে দাদা এসেছে। কিন্তু তারপর তো আমি দরজা দিয়ে দিয়েছি।’

‘দাদা? ডক্টর দিব্যময়?’

‘হ্যাঁ।’

‘কোথায় উনি?’

‘ঘ…ঘরে।’

স্বয়ম্ভু রিভলভার নামলে বাকিরাও সেটাকে ফলো করে। ‘বাণীকণ্ঠবাবু কই?’

‘ঘরে। ঘুমোচ্ছে। কেন স্যার কী হয়েছে? আমার খুব ভয় কচ্চে।’

‘আমরা ঘরে যাব।’

‘মেসোর ঘুম ভাঙলে মাথা ধরে যায়।’

‘যাক। আমরা এখুনি ঘরে যাব। ডাকো বাণীকণ্ঠবাবুকে।’

‘আপনারা ডাকেন না। মাঝরাতে ডাকলে আমায় মুখের তোড়ে উড়িয়ে দেবে।’

‘আমরা আছি তো। ডাকো শিগগির।’

স্বয়ম্ভুর হম্বিতম্বির কাছে মন্দা অসহায়। দরজার কাছে গিয়ে দু-তিনবার ডাকল মন্দাকিনী।

‘তুমি যে বললে দাদা এসেছে। তাকেও ডাকো। কেউ তো সাড়া দিচ্ছে না।’ শিবাঙ্গী বলল। মন্দাকিনী ডক্টর দিব্যময়কে ডাকল। সেও নিরুত্তর।

‘স্যার, সাড়া দিচ্ছে না তো।’

‘দরজাটা খোলো।’

স্বয়ম্ভুর গলাটা নিস্তেজ শোনাল। ঝড়ের আগে যেমন থমথমে চারপাশ। মন্দা দরজা ঠেলতেই অন্ধকার ঘরটা হাট হয়ে গেল। বাইরের আলো দরজার কপাট ভেদ করে ঘরের মেঝেতে একটা আলোর সুড়ঙ্গ তৈরি করল। মন্দা ভিতরে গিয়ে আলো জ্বালল। বিছানা ফাঁকা। মাটিতে বাণীকণ্ঠের রক্তাক্ত শরীর লুটোচ্ছে। গোল গোল চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। চশমা পাশে ছিটকে পড়েছে। ঘরের ঘিয়ে রঙের মেঝেতে টাটকা রক্তের মানচিত্র। গলা চিরে চিৎকার করে উঠল মন্দাকিনী। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দেয়ালে পিঠ ঘষটে ঘষটে ঘরের কোণে দরজার পাশে বসে পড়ল। মাথা নীচু করে স্বয়ম্ভু বলল, ‘এটারই আশঙ্কা করেছিলাম।’ শিবাঙ্গী ঘুরে মন্দাকিনীর সামনে, ‘উঠে দাঁড়াও। দাঁড়াও।’ অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মন্দা উঠে দাঁড়াল। দু-চোখে টলটল করছে ভয়ের সমুদ্র। কোনও ফল হবে না জেনেও কোনও এক অসম্ভবের আশায় বাণীকণ্ঠের নাড়ি টিপে দেখল স্বয়ম্ভু। কোনও সাড়া নেই। বাঁদিকে হেলে থাকা মুখটা এপাশ ওপাশ করে ক্ষতস্থানটা ভালো করে নিরীক্ষণ করল। হাফ পাঞ্জাবিটার পকেট হাতড়াতেই একটা ফোল্ডেড নাইফ পেল। কিন্তু সেটা যে কোনও কাজেই লাগেনি সেটা বোঝাই যাচ্ছে।

‘পাশের ঘরে খুন হয়ে গেল আর তুমি জানতেও পারলে না?’

শিবাঙ্গী কড়া স্বরে প্রশ্নটা করল মন্দাকে।

‘কী করে জানব ম্যাডাম? দাদা তো এসে…’

কথাটা বলতে বলতে মন্দা চুপ করে গেল। আপনা থেকেই চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল।

‘কী হল থামলে কেন? বলো।’

তড়পে উঠল শিবাঙ্গী। ‘কোনও চালাকি করার চেষ্টা করবে না। বাণীকণ্ঠবাবু কোথায় গিয়েছিলেন এত রাতে? তারপর দাদাই বা এল কেন? কখন চলে গেল? সব বলো।’

মাটিতে লুটিয়ে থাকা বাণীকণ্ঠের লাশের দিকে চেয়ে ফোঁপাতে থাকে মন্দাকিনী।

***

মধ্যরাতে ক্রমাগত বেল বেজে চলেছে। মন্দাকিনী চমকে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। সাহস করে বারান্দায় আসতেই শোনে বাইরে থেকে বাণীকণ্ঠের গলা। দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে পড়ে বাণীকণ্ঠ। ‘মন্দা বাইরে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। আমি টাকা দিচ্ছি ওকে একটু দিয়ে আয়।’

‘তুমি এত রাতে এলে কেন? কী হয়েছে?’

‘সব পরে বলছি। টাকাটা দিয়ে আয়।’

বাণীকণ্ঠ ঘরে ঢুকে আলমারি খুলল। সেখান থেকে টাকা বের করে দেওয়াতে মন্দা ট্যাক্সিকে বিদেয় করে দিয়ে এল।

‘কী হয়েছেটা কী বলবে তো। একি, তোমার জামায় এ কীসের দাগ?’

‘রক্ত।’

‘মানে? পড়ে-ধরে গেছ নাকি? সারা শরীর কাঁপছে!

মন্দাকিনী উতলা।

‘মন্দা… মন্দা আমার ফোনটা কোথায় পড়েছে জানি না। তুই একটু বাবুকে কল কর। এক্ষুনি কর।’

‘এত রাতে?’

‘তুই বুঝতে পারছিস না। আমি বলছি ফোন করে আমায় দে।’

মন্দা চট করে নিজের মোবাইল এনে দিব্যময়কে কল করে। ‘ফোন তো অফ বলছে। নিশ্চয়ই রাতে কোনও অপারেশন কচ্চে। তুমি বরং জামাকাপড় ছেড়ে জল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকালে দাদাকে ডাকব।’

‘কাল সকাল? সকাল হবে তো মন্দা?’

‘ও মা! এ আবার কী কথা? কেন যে এত রাতে চলে এলে তাই তো বুঝতে পারছি না।’

‘তুই কিন্তু ভালো করে দরজাগুলো বন্ধ করে দে। কেউ ডাকলেও খুলবি না।’

‘মেসো, তুমি কি কিছু দেখে ভয় পেয়েছ?’

‘অ্যাঁ? না না। কিছু না। আমি বাবুকে বলব।’

‘জামাটা ছেড়ে ফেলো। তোমার লাগেনি তো কোথাও? গালে কী হয়েছে?’

‘উফফ কিচ্ছু হয়নি। তুই যা তো। যা। আমি ঠিক আছি।’

***

চোখ মুছল মন্দাকিনী। বলল, ‘তারপর আধঘণ্টা পর আবার দরজায় ধাক্কা। দেখি দাদা। বলল, কোথায় নাকি ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল। ফেরার পথে এখানে এসেছে। আজ রাতটা থেকে চলে যাবে। আমি ভাবলাম, ভালোই হল। মেসো ছেলে ছেলে করে হেদোচ্ছিল। আমি দরজা বন্ধ করে ঘরে চলে গেলাম। তারপর এ সব কখন কীভাবে হয়েছে কিচ্ছু জানি না বিশ্বাস করুন। দাদাই বা তার বাবাকে কেন খুন করল জানি না।’ স্বয়ম্ভু এতক্ষণ বাণীকণ্ঠের মুখের দিকে চেয়েছিল। এবার মন্দার দিকে ঘুরে তাকাল, ‘তুমি জানো যে দাদাই খুন করেছে?’

‘নইলে আর কে? দাদা ছাড়া তো কেউ আসেনিকো।’

আবারও অঝোরে কাঁদল মন্দাকিনী। কান্নায় ভেঙে পড়ল। স্বয়ম্ভুর চোখ মন্দার কাঁধে আটকে গেল। কেন? ঠিক তখনই চট করে স্বয়ম্ভু বারান্দায় চলে গেল শালিকের খাঁচার সামনে। ভালো করে শালিকটিকে নিরীক্ষণ করতে করতে শিবাঙ্গীর নাম ধরে ডাকল। শালিকটা চমকে উঠলেও নাকি সুরে শিবাঙ্গীর নাম ধরতে ভুল হল না।

‘বলুন স্যার।’

‘মন্দাকিনীর ঘরে যাও। যা যা পাবে নিয়ে এসো।’

‘ওকে স্যার।’

স্বয়ম্ভূ সুরঞ্জন মুনশিকে বলল, ‘ইমিডিয়েটলি দিব্যময়কে তুলে আনার জন্য লোক পাঠান। রাজারাম ওখানেই ওয়েট করছে। যা করার, যা বলার ওই করবে। অবশ্য বাড়িতে যদি থেকে থাকে তো।’

‘ঠিক আছে।’

ওদিকে শিবাঙ্গী ঘরের ভিতর ঢুকল। টিউবলাইট জ্বালালো। ড্রেসিং টেবিল আছে। তার ড্রয়ারে মেয়েলি সাজগোজের জিনিস ছাড়া কিছুই নেই। খাটের নীচে ট্রাঙ্ক। সেটা টেনে বাইরে এনে ডালাটা খুলল। সেখানেও পুরনো জামাকাপড়, দু-তিনটে থালা গ্লাস, একটা ছোটো আয়না আর… থমকে গেল শিবাঙ্গী। আয়নাটার মধ্যে কিছু যেন আছে। আয়নাটা নড়লেই খুটখুট করে শব্দ হচ্ছে। চারপাশ টেনেটুনে দেখতেই কাচটা প্লাস্টিকের গা থেকে একটু উঠে যেতে টুক করে কী যেন একটা খসে পড়ল। একটা মোবাইলের সিম! শিবাঙ্গীর কপালে ঘাম জমেছে। সিমটা নিয়েই বেরিয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু বিছানার দিকে চোখ পড়তেই মনে হল চাদর, তোষকগুলোও তুলে একটু দেখা যাক। কিছুই পেল না। শুধু মাথার বালিশটা হাতে নিতেই খটকা লাগল।

‘কোথায় যাচ্ছ?’

মন্দা গুটিগুটি পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিল। মাঝপথে বাধ সাধল স্বয়ম্ভু। ‘এইখানে দাঁড়াও। আমরা না বললে একটা পাও নড়বে না।’ মুখ শুকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মন্দা। স্বয়ম্ভু মন্দার চোখে চোখ রেখে এগিয়ে এল। মন্দাকিনী ভয়ে এক পা পিছোতেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল।

‘আজ দেয়ালেই তোমার পিঠ ঠেকেছে মন্দাকিনী। পালাবার পথ নেই।

তড়িতাহতের মতো চোখ তুলে চাইল মন্দা। স্বয়ম্ভু কথা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন মুনশি। শিবাঙ্গীও এসে দাঁড়িয়েছে একটু তফাতে।

‘শালিক পাখিটা কি রাতে ছাড়া থাকে?’

‘না তো।’

‘তাহলে আজ কেন ছাড়া ছিল?’

মন্দা অবাক! এই মদ্দা পুলিশটা জানল কীভাবে? গলা শুকিয়ে আসছে তার। ‘কী হলওওও? আজ কেন ছাড়া ছিল?’

‘মেসো চলে যাওয়ার পর থেকে বিটকেলের মন খুব খারাপ হয়েছিল। তাই ওকে রাতে আমিই ওই ঘরে রেখেছিলাম। ও আর পুতুলি মানে খরগোশটা মেসোর বিছানাতে ছিল। মেসোর গায়ের গন্ধ পেলে যদি ওদের ভালো লাগে।’

‘বেশ। বাণীকণ্ঠকে ঠিক কখন খুন করা হয়েছে?’

‘আমি জানি না স্যার। আমি কী করে জানব?’

‘কিন্তু আমরা যে জেনে ফেলেছি মন্দা।’

মন্দা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে টলটলে চোখ দুটো নিয়ে তাকিয়ে আছে। ‘বাণীকণ্ঠ খুন হয়ে যাবার পর তুমি এই ঘরে ঢুকেছিলে। বাণীকণ্ঠকে দেখতে। তারপর তুমিই এই দরজাটাকে বাইরে থেকে টেনে দিয়ে পাশের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চলে গেছ। ঠান্ডা মাথার ক্রিমিনাল তুমি। খুন না করলেও খুনিকে সাহায্য অবশ্যই করেছ।’

‘না না। এ মিথ্যে।’

‘এটাই সত্যি। বাণীকণ্ঠ পাশের ঘরে খুন হয়েছে তুমি জানতে। আমরা যাতে তোমায় সন্দেহ না করি তাই তুমি পালাওনি। এতদিন বাণীকণ্ঠ খাইয়েছে, পরিয়েছে তাই হয়তো খানিক দুঃখও পেয়েছ তুমি। তার প্রমাণ এই বালিশ।’

একটানা বলে গেল শিবাঙ্গী। ‘স্যার, বালিশটা দেখুন। এইখানে দেখুন মন্দার মাথার চুল এবং এই জায়গাটা তুলনামূলক চাপা। অর্থাৎ মাথাটা এদিকেই ছিল আর এদিকটা ভিজে সপসপে। অনেকক্ষণ ধরে বালিশে মুখ গুঁজে কেউ কাঁদলে এমন করেই ভিজে ওঠে।

‘না না ম্যাডাম, বিশ্বাস করেন। ওটা ঘাম। ঘুমোতে ঘুমোতে কখন ঘেমে গেছিলাম বুজতে পারিনি।

‘ঠাটিয়ে এক চড় মারব। ওই সরু গলার ঘামে এতখানি ভিজে গেল? বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছ?’

মন্দা ঘাম মোছে। নাকের জল আর চোখের জল এক হয়ে গেছে শ্যামলা মুখটায়। ‘এই ম্যাডামের হাত থেকে বালিশটা নিয়ে সাবধানে রাখো।’ কনস্টেবলকে হুকুম করলেন মুনশি।

‘শুধু এইটাই নয় স্যার। এই যে দেখুন।’

দুটো আঙুলের ডগায় সিমকার্ডটা সবার সামনে তুলে ধরে। এবার আর মন্দা তার চমক আড়ালে রাখতে পারে না।

‘খাটের নীচে ট্রাঙ্ক। তার মধ্যে কাপড়। তার নীচে আয়না। সেই আয়নার মধ্যে ছিল এই সিম। এটা কোন উগ্রপন্থীর সিম যে এইভাবে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল।’

‘আমি জানি না ওটা কার। এ বাড়িতে আসার পর ওই ট্রাঙ্কটা আমায় মেসো দিয়েছিল। ওই আয়নাটাও আমার নয়। বোদয় মাসিমার ছিল। আমি তো শুধু কাপড় রেখেছিলাম।

‘মেয়ের গাটস দেখেছ? এখনও মিথ্যে বলে চলেছে।’

‘মিথ্যে বলছি না স্যার, বিশ্বাস যান।’

‘বেশ। বিশ্বাস করলাম। আমাকে একটা কথা বলো মন্দাকিনী, তোমার কাঁধে সালোয়ারের ওপর রক্তের দাগ এল কী করে?’

মন্দার শরীর কেঁপে উঠল। তেরচা চোখে দেখল স্পষ্ট দুটো পায়ের ছাপ।

‘ওই পা দুটো বিটকেলের। তাই তো মন্দা?’

‘জা…জা…জানি না। জানি না স্যার কীভাবে…’

শিবাঙ্গী নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে না পেরে ঠাটিয়ে একটা চড় কষিয়ে দিল। মন্দাকিনী কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ল। বাড়ির বাইরে গাড়ি এসে দাঁড়াল। দিব্যময় এক ছুটে বাড়ির ভিতর। স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী, পুলিশ সকলকে দেখে আকাশ থেকে পড়ল। স্বয়ম্ভু খেয়াল করে খাঁচায় বন্দি শালিকটা দিব্যময়কে দেখেই খাঁচার একপাশ থেকে আরেক পাশে সরে গেল। দিব্যময় কারুর সঙ্গে কথা না বলে ছুটে ঘরে ঢুকে থমকে যায়। কাঁপা দুটো হাত তার বাবুর মুখ ছোঁবার জন্য বাড়াতেই স্বয়ম্ভু বাধা দেয়, ‘হাত দেবেন না।’ দিব্যময়ের চোখদুটো টকটক করছে লাল। দু-গাল বেয়ে নোনতা জলের ধারা। স্বয়ম্ভুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমি কি দুঃস্বপ্ন দেখছি স্বয়ম্ভুবাবু? এ সত্যি নয়। সত্যি নয়। এ হতেই পারে না। আমার বাবা নির্ভেজাল, সাধারণ, অজাতশত্রু একটা মানুষ। তাকে কেন…!’ কান্নায় গলা জড়িয়ে আসে।

‘মন্দার বক্তব্য অনুযায়ী আপনি মধ্যরাতে বাড়িতে আসেন। তারপর কখন কোন ফাঁকে চলে যান মন্দা জানে না। তাহলে দাঁড়াল, খুনটা আপনি করেছেন।

কাঁদতে কাঁদতে বুকফাটা যন্ত্রণায় হা হা করে হেসে উঠেই কান্নায় ভেঙে বিছানায় বসে পড়েন দিব্যময়।। ‘আমি, আমার বাবুকে! কেন? কেন স্বয়ম্ভুবাবু? আমি কখন এলাম? আপনারাই তো আমাকে আমার ফ্ল্যাট থেকে নিয়ে এলেন। আমার ফ্ল্যাটে সিসিটিভি চেক করুন। এখানেও, এই রাস্তার মোড়েও সিসিটিভি আছে। চেক করুন। প্লিজ। তা ছাড়া বাবু তো কাকার বাড়ি গিয়েছিল ওই পাটুলির স্বর্ণশিখর এস্টেটে। সেখান থেকে এখানে কখন এল?’

‘স্বর্ণশিখর এস্টেটে একটি মেয়ে খুন হয়েছে মাঝরাতে। সিসিটিভিতে দেখা গেছে আপনার বাবা রক্তমাখা এই জামাটা পরেই উদ্ভ্রান্তের মতন পালাচ্ছিলেন। বাইরে থেকে ট্যাক্সি ধরে এখানে আসেন। আপনাকে নাকি ফোন করে সুইচড অফ পেয়েছে মন্দাকিনী।

‘আমি একজন ডাক্তার স্বয়ম্ভুবাবু। আমার ফোন কোনওদিন সুইচড অফ থাকে না। স্পেশালি বাবুর জন্য। আর বাবুকে পালাতে দেখা গেছে মানেটা কী? কেন?’

‘সেটা তো আমাদের কাছেও রহস্য।’

এই সময় মুনশি জানায় সিসিটিভি ফুটেজ এসে গেছে। থানা থেকেই পাঠিয়ে দিয়েছে। না বলাতেই এই প্রথম একটা ঠিক কাজ করলেন সুরঞ্জন মুনশি। ইতোমধ্যে ফরেন্সিকের রোহিতও খবর পেয়ে স্বর্ণশিখর এস্টেট থেকে এসে হাজির হয়। অকুস্থল পরীক্ষা করে রোহিত জানায়, ‘খুনি ডান হাতেই ছুরি চালিয়েছে আর সেটা আচমকা। তাই রক্তের ছিটে লেগেছে দেয়ালে আর এই শোকেসের ওপরটায়। ভিক্টিমকে মারার আগে সময় দিয়েছে খুনি। হাতাহাতি হতেও পারে। কারণ এই শোকেসের ওপরের এবং ভিতরের একটা-দুটো জিনিস উলটে গেছে।’

‘এটাও তো হতে পারে রোহিত যে ভিক্টিম নিজেকে বাঁচাতে পিছিয়ে যাচ্ছিল। শোকেসে গিয়ে ধাক্কা খায়।’

‘হ্যাঁ স্যার, অসম্ভব কিছুই না। ভিক্টিম হয়তো এই শোকেসের ওপরে ফ্লাওয়ার ভাস বা এই টর্চ নিয়ে আঘাত করতে চেয়েছিলেন বলে পিছিয়ে শোকেসের দিকে গিয়েছিলেন।

‘হুম। আর এখানেই বসেছিল শালিক পাখিটা। পাখিটার শরীরের ডানদিকে রক্তের ছিটে। ডানার নীচেও লেগে আছে রক্তের দাগ।’

‘স্বাভাবিক। পাখিটা ভয় পেয়ে ডানা ঝাপটায় আর সেই সময়েই রক্ত ছিটকে লাগে।’

‘খুনের একমাত্র সৎ সাক্ষী শালিক।’

স্বয়ম্ভু বিড়বিড় করল।

বারান্দায় পুলিশের কনস্টেবল ধরে রেখেছে মন্দাকে। টেবিলে বসে মোবাইলে সিসিটিভি দেখা চলছে। রাত দুটো পঞ্চান্ন। একটা ট্যাক্সি থেকে নামে দিব্যময়। পরনে মেরুন রঙের শার্ট, ব্ল্যাক প্যান্ট। জুম করে মুখটা স্পষ্ট দেখা যায় দিব্যময়ের। স্বয়ম্ভু দিব্যময়ের দিকে আড়চোখে তাকায়।

‘এটা আমি নই। এই কালারের শার্ট আমার নেই।’

ফুটেজের দিব্যময় গলিতে ঢুকে যায়। এরপর রাত তিনটে চোদ্দ। দ্রুত পায়ে গলি থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধরে সোজা হেঁটে যায় দিব্যময়। একসময় সিসিটিভির আওতার বাইরে। দাঁড়িয়ে গাড়ি ধরার চেষ্টাটুকুও করেনি।

‘এবার বলুন, আপনারই মতো দেখতে এ কে?’

‘আমি জানি না স্বয়ম্ভুবাবু। কিচ্ছু জানি না।’

‘আচ্ছা দিব্যময়বাবু, আপনার এমন কোনও চেনাজানা আছে যে আপনার মুখের ছাঁচ তুলেছে এর মধ্যে?’

‘মুখের ছাঁচ? না না, আমার মুখের ছাঁচ তুলবে কেন?’

‘তা তো ঠিক। অবশ্য ব্যাপারটা ছবি দেখেও হতে পারে। কিন্তু সেটা…

‘কী বলছেন বলুন তো?’

দিব্যময়ের শোকসন্তপ্ত মস্তিষ্কে স্বয়ম্ভুর কথাগুলো ধাঁধার মতো লাগছে।

‘আপনার কোনও শত্রু আছে? মানে সন্দেহ করেন?’ স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন। ‘আমার জানা নেই।’

‘এখানে একমাত্র সবটা জানে মন্দাকিনী।

দিব্যময় এগিয়ে আসে মন্দার কাছে, ‘বল না মন্দা, যা জানিস বলে দে না। তোর মেসো তোকে মুখ করত, কটু কথা বলত। কিন্তু ভালোও তো বাসত বল। স্নেহ করত। তোকে না খাইয়ে কখনও খায়নি বাবু। সেই তুই…!’ হাঁটুর খাঁজে মুখ গুঁজে মন্দাকিনী হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলেই চলল, ‘আমি জানি না। কিচ্ছু জানি না। কিচ্ছু জানি না।’

‘স্যার, এবার বডিটা নিয়ে যেতে হবে।’

স্বয়ম্ভুর পারমিশন চাইল এক কনস্টেবল। দিব্যময়ের চোখের সামনে দিয়ে তার বাবু বাণীকণ্ঠ মুখুজ্যে বডি হয়ে চলে গেল। নিজের বুকে হাত রেখে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে দিব্যময় তার বাবুর সঙ্গেই যাচ্ছিল কিন্তু আবারও স্বয়ম্ভু বাধা হয়ে দাঁড়াল। দিব্যময় ফিরে চাইল। সামনেই খাঁচাটা। শালিকটা নিজেকে কেমন যেন গুটিয়ে নিল। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা দিব্যময়বাবু, এর আগে আপনি যতবার এসেছেন ততবার শালিকটা আপনার সঙ্গে কীভাবে ইন্টার‍্যাকশন করত বলতে পারবেন?’

‘শুধু এলে নয়। ফোন করলেও ও বলে উঠত, কী রে বাবু এলি? কী রে বাবু এলি?’

‘কিন্তু আজ আপনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও ও কোনও রেসপন্স করছে না। ওর সঙ্গে একবার কথা বলার চেষ্টা করুন তো।’

‘আমার ভালো লাগছে না স্বয়ম্ভুবাবু।’

‘এটা দরকার দিব্যময়বাবু। প্লিজ করুন।’

অনিচ্ছাসত্ত্বেও দিব্যময় বিটকেলের খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ‘বিটকেল, বাবু চলে গেল রে। তোকে আর কেউ পড়া মুখস্থ করাবে না।’

‘আপনার নামটা বলুন।’

গলা চেপে দিব্যময় ইন্সট্রাকশন দিল।

‘আমি বাবু, চিনতে পারছিস? আমি বাবু এসেছি।’

খাঁচার যেদিকে দিব্যময় দাঁড়িয়ে শালিকটা ঠিক তার উলটোদিকে সরে গেছে। ‘বাবু’ বলাতে ঘাড় কাত করে টানা চোখে তাকাল। কিন্তু কথা বলল না।

‘কী করা যায় বলো তো শিবাঙ্গী?’

ফিশফিশ করল স্বয়ম্ভু। ‘এক সেকেন্ড! ডাক্তারবাবু এদিকে একটু আসবেন প্লিজ।’ শিবাঙ্গী চট করে একটা ছুরি ডাক্তারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই ছুরিটা নিয়ে পাখিটার দিকে নিজের নাম বলতে বলতে এগিয়ে যান।’

‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এ সব কী হচ্ছে?’

‘একটা চান্স নিচ্ছি। প্লিজ। নইলে আপনারই বিপদ।’

শিবাঙ্গী বোঝাল।

বাইরে আলো ফুটছে। আবার কোথাও মাইকে অষ্টমীর ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী বাজছে। মন্দা হাঁটু মুড়ে মুখ নীচু করে বসে আছে। নিঃশ্বাসও যেন তার পড়ছে না। শিবাঙ্গীর কথা মতো দিব্যময় চকচকে ছুরিটা উঁচিয়ে শালিক পাখিটার দিকে এগিয়ে যায়। ‘আমি বাবু, চিনতে পারছিস?’ ডানা ঝাপটে ওঠে বিটকেল। সরে যায় কয়েক পা।

‘বিটকেল, আমি বাবু। চিনতে পারছিস?’

আবার ডানা ঝাপটায় শালিকটা। বিরক্ত হয়ে দিব্যময় গলা চেপে রাগের স্বরে বলে ওঠে, ‘আমি বাবুউউউউ, বাবু আমি… বাবুউউউ…!’ বাবু নামটাতেই কেঁদে ফেলে দিব্যময়।

পাখি বলে ওঠে, ‘নাঁ বিঁমঁল নাঁ বিঁমঁল!’ আচম্বিতে কান্না ভুলে চোখ তোলে দিব্যময়। মন্দার দুই চোখ আতঙ্কে পুড়ে যাচ্ছে। স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী, রাজারাম সবাই হতবাক। দিব্যময় বলে, ‘কী বললি? আমি বাবু। বাবু, বাবু।’ শালিক আবার বলল, ‘তুঁইঁ বিঁমঁল তুঁইঁ বিঁমঁল!’

দিব্যময় বিস্মিত চোখে মন্দাকিনীর দিকে তাকায়। দিব্যময় আর মন্দার দৃষ্টি বিনিময় শিবাঙ্গী, স্বয়ম্ভু আর রাজারামকে স্তম্ভিত করে দেয়।

‘মন্দা, সে কি তবে বিমল ছিল? চুপ করে থাকিস না মন্দা। বল। বিমল? ‘ নামটা উচ্চারণের মধ্যে শত শত অবিশ্বাস ঝড়ে পড়ল দিব্যময়ের। মন্দা দৃঢ়ভাবে বলল, ‘যে এসেছিল তার মুখটা আপনার মতো। আর কিচ্ছু জানি না।’

স্বয়ম্ভু এগিয়ে এল, ‘দিব্যময়বাবু, এই বিমল কি সে, যার পার্লার আছে?’

‘আমি শুধু একটা বিমলকেই চিনি স্বয়ম্ভুবাবু। ওর পার্লার আছে। বিমলই একদিন মন্দাকিনীর কোনও একটা কাজের জন্য আমার কাছে দরবার করতে এসেছিল। তখন আমিও একটা বিশ্বস্ত লোক খুঁজছিলাম বাবার জন্য। বিমলের কথায় রেখে দিলাম মন্দাকিনীকে।’

‘আচ্ছা বিমল কি মেকআপও করতে পারে?’

‘খুব ভালো পারে। ব্রাইডাল মেকআপ থেকে শুরু করে আরও নানান মেকআপের ট্রেনিং ও নিজে দেয়।’

‘আচ্ছা বিমলের পায়ে গন্ধ হওয়ার রোগ আছে কি? জানেন?’

‘হ্যাঁ। ওর প্ল্যান্টার ব্রোমহাইড্রসিস আছে।’

‘ওর কি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কোনও রিলেশন আছে?’

দরজা খুলতেই চমকে উঠলেন জাতীয় পুরস্কার জয়ী সোমনাথ চৌধুরি। ওই যে হয় না, জানলা খুলতেই একটা আধলা ইট এসে পড়ল কপালে, স্বয়ম্ভুর প্রশ্নটা এমন করেই উড়ে গিয়ে স্বনামধন্য সোমনাথের কপালে লাগল। ‘বিমল কোথায়?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *