ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ৮

ক্লাস টিচার শ্রীপদ পরীক্ষার খাতাগুলো জমা নিচ্ছেন। লাল্টু খাতাটা জমা দিতেই শ্রীপদ ভালো করে দেখে বললেন, ‘কে সই করেছে?’

‘ছোপ্পি। এই… মানে পিসি।

শ্রীপদর সামনের দিকের উঁচু দাঁতগুলোর আশপাশের প্রতিবেশীরা অল্প করে উঁকিঝুকি দিয়ে উঠল। ‘ছোটো পিসি?’

‘হ্যাঁ।’

‘আমি কিন্তু তোর কাছ থেকে আরও ভালো নম্বর আশা করেছিলাম। এত ভালো মাথা তোর। সামনের বার আরও ভালো নম্বর চাই কিন্তু।’

লাল্টু নীরবে ঘাড় নেড়ে সিটে চলে এল। এবার বীরেশের পালা। সে রীতিমতো ফ্যাশন প্যারেড করে স্মার্টলি পরীক্ষার খাতাটা শ্রীপদ স্যারের হাতে ধরিয়ে দিল। স্যারের মুখখানা কেমন যেন নিঙড়ানো ন্যাতার মতো হয়ে গেল। বীরেশকেও সেই একই প্রশ্ন শ্রীপদবাবুর, ‘কে সই করেছে?’ টকাস করে উত্তর দিল বীরেশ, ‘বাবা!’

‘নম্বর দেখে কী বলল?’

‘নতুন কেনা চটিটা দিয়ে ঠেঙাল।’

সঙ্গে সঙ্গে সারা ক্লাস হো হো করে হেসে উঠতেই শ্রীপদবাবু টেবিলে দু’বার ডাস্টার ঠুকলেন। তারপর বীরেশের দিকে চেয়ে বললেন, ‘পঞ্চাশে পাঁচ! শুধু ঠেঙিয়েই ছেড়ে দিল?’

‘না। দু-দিন খেতে দেয়নি ঠিক করে।

‘আমি হলে সাতদিন দিতুম না। অপদার্থ। এমন করলে উঁচু ক্লাসে উঠবি কী করে?’

‘উ… উঠে যাব স্যার।’

‘হ্যাঁ… তার আগে ইশকুলটাই না উঠে যায়। যা।’

মাস্টারমশাইয়ের ধমক খেয়েও আবারও একইভাবে গটমটিয়ে হেঁটে লাল্টুর পাশে বসল। লাল্টু খুব করুণ চোখে বীরেশের দিকে চেয়ে রইল। টিফিনের সময় নিজের খাবারটুকু বীরেশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আজ আমার খাবারটাও তুই খা বীরু।’

‘আমি টিফিন এনেছি তো।’

‘তাও খা। দু-দিন খেতে দেয়নি। তোর কত খিদে পেয়েছে বল তো।’

লাল্টুর কথা শুনে বীরু তো হেসে খুন।

‘কী হল? হাসছিস কেন?’

‘বুদ্ধু। তুই ওসব সত্যি ভেবেছিস নাকি?

লাল্টু চোখ বড়ো বড়ো করল, ‘সত্যি নয়?’

‘ধুস।’

‘শুধু মেরেছে?’

‘রেজাল্ট জানলে তো মারবে।’

‘মানে? কী বলছিস?’

‘বাবা-মা জানে না আমার অঙ্কের খাতা বেরিয়েছে।’

‘তাহলে সই কে করল?’

‘আমি।’

‘কী করে?’

‘বাবার সই ভাল্লো করে প্র্যাকটিস করেছি। তারপর খাতায় সই করে দিয়েছি।’ লাল্টু চপাট করে নিজের কপাল চাপড়ে বলল, ‘এই সর্বনাশ কেন করলি? এবার যদি তোকে পুলিশে ধরে?’

‘পুলিশ?’

‘হ্যাঁ। পুলিশেরা হাতের লেখা পরীক্ষা করলে ঠিক ধরতে পারে কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে। সিনেমায় দেখিসনি?’

‘করুক না। তবুও পুলিশ আমায় ধরতে পারবে না।

‘কেন?’

বিজ্ঞের মতো হাসে বীরেশ। ‘দেখবি? দাঁড়া।’ টিফিনের সময় ক্লাস খালি। কেউ কেউ দূরে ছুটে বেড়াচ্ছে। বীরেশ একটা খাতা খুলে বাঁ হাতে গোটা গোটা অক্ষরে কিছু একটা লিখে খাতাটা লাল্টুর মুখের সামনে মেলে ধরে। সুন্দর হাতের লেখায় লাল্টুর নাম জ্বলজ্বল করছে। লাল্টুর বিস্ময়ে চোখ বড়ো করে হাঁ মুখটা হাত দিয়ে ঢেকে নেয়।

***

খিদিরপুর সুইং ব্রিজ। মাথার ওপর সূর্য। এই মুহূর্তে কোনও জাহাজ আসার খবর নেই। চারচাকাগুলো খানিকটা নিয়ন্ত্রিত গতিতে ব্রিজের ওপর দিয়ে ছুটছে। ব্রিজের ফুট ধরে দু-একটা মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। বেলা বাড়ছে। খিদিরপুরের পুলিশ ফোর্স নিয়ে ডকে পৌঁছে গেছে। পি এস-এর সাব ইন্সপেক্টরের মোবাইলে বিট্টুর ছবি। ওসি নিজে নেমেছে মাঠে। তার কানে ধরা লালবাজারের সাইবার সেল। সেখান থেকেই প্রদ্যুৎ

অনবরত লোকেশন বলে চলেছে। সঙ্গে কল কনফারেন্সে রাজারাম। লোকেশন অনুযায়ী ওসির নজরে একটি মেয়ে। বেশ খানিক দূরে ডকের ওপর দাঁড়িয়ে। এলোচুল জলছোঁয়া হাওয়ায় উড়ছে। আনমনে জলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে।

‘মেয়েটা কি আপনাদের দেখতে পেয়েছে?’

রাজারামের প্রশ্ন। খিদিরপুরের সাউথ পোর্ট পুলিশ স্টেশনের ওসি জানালেন, ‘না। একভাবে দাঁড়িয়ে আছে।’

‘মহিলা কনস্টেবল আছে?’

‘না। আসলে বিট্টু ছেলে বলে আর…’

‘হুম।’

নিমেষের মধ্যে পুলিশ মেয়েটিকে ঘিরে নিল। প্রদ্যুৎ নিশ্চিত করল এটাই লোকেশন। মেয়েটি ঘুরে তাকাতেই দেখা গেল মেয়েটির দু-চোখ ভর্তি জল। পুলিশ দেখে তড়িঘড়ি চোখ মুছে নিল। ওসি বলল, ‘আমরা সাউথ পোর্ট পুলিশ স্টেশন থেকে আসছি। আপনার ফোনটা দিন তো?’ মেয়েটির হাতেই মোবাইল ধরা ছিল। সে প্ৰশ্ন করল, ‘কী ব্যাপার?’

‘বললাম না পুলিশ স্টেশন থেকে আসছি। আপনার ফোনটা লাগবে।’

‘কেন? আমার মোবাইল আপনাদের দেব কেন?’

বলেই একটু নাক টানল মেয়েটি। কাঁদছিল।

‘একজন খুনি পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকেই খুঁজছি আমরা। যার মোবাইল লোকেশন এইখানেই দেখাচ্ছে। প্লিজ মোবাইলটা দিন।’

‘পালিয়ে যাওয়া আসামি হলে এখানে নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে থাকতাম না?’

ফোনের মধ্যে রাজারাম সব শুনছে। সঙ্গে সঙ্গে রাজারাম জানতে চাইল, ‘ওনার নামটা জিজ্ঞেস করুন তো।’ ফোনের ওপার থেকে হুকুম আসাতে একটু বিরক্তই হলেন ওসি। তাও প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার নামটা জানতে পারি?’

‘সুচেতা পাল।’

‘আমরা যাকে খুঁজছি তার নাম বিট্টু দেবনাথ। ছবিটা দেখাও।’

সাব ইনস্পেক্টর মোবাইল তুলে ছবিটা দেখালেন। ‘এখানে দেখেছেন এর মধ্যে?’ সুচেতা ঘাড় নাড়ল। ‘এখন কেন, কোনও দিনই দেখিনি।’ মেয়েটির চোখে অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। ইচ্ছে করলেও অবিশ্বাস করার উপায় নেই।

‘আজ সকালে আপনার ফোনে কোনও এস এম এস ঢুকেছে, আননোন নম্বর থেকে?’

সুচেতা এবার চমকাল। ‘হ্যাঁ ঢুকেছে। কিন্তু সেটা আপনারা কীভাবে জানলেন

ওসি আর সাব ইনস্পেক্টর একে অপরের দিকে চাইল। ওসি বললেন, ‘এস এম এসটা দেখব।’

একটু চুপ থেকে সুচেতা বলল, ‘যদিও এটা পার্সোনাল তবুও দেখুন…!’ লক খুলে নিজের মোবাইলটা বাড়িয়ে দিল। ওসি সেটা নিয়ে লাস্ট এস এম এস চেক করছেন, ঠিক তখনই রাজারাম গাড়ি থেকে নামল। ওসির দুটো ভুরুর মাঝে কিঞ্চিৎ কুঞ্চন দেখা দিল। তারপর অবাক চোখে মেয়েটির দিকে চাইল। সুচেতার চোখ তখন আবারও দূরে দিগন্তের দিকে হারিয়ে গেছে।

‘এটাই এসেছে শুধু? আর কিছু?’

দূরে তাকিয়ে মেয়েটি বলল, ‘চেক করে নিন না। দিলাম তো মোবাইলটা।’ ওসি কনস্টেবলদের বললেন, চারপাশটা ভালো করে চেক করতে আর কোনও মোবাইল পড়ে আছে কিনা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে তল্লাশি শুরু হল। রাজারাম ফোনটা নিয়ে এস এম এস চেক করল। সেও যেন কিঞ্চিৎ ধাক্কা খেল। এস এম এসের বয়ানটা এমনই, ‘Sorry সুচেতা। আসার আগে তোমায় ইচ্ছে করেই বলিনি। কষ্ট পেতে তুমি। আমি কানাডায় শিফট করেছি। I couldn’t convince my parents. They absolutely don’t want our relationship. You already know the reason. Tell me, which parents would ever want their family line to end without an heir? এটা আমার নম্বর। কোনওদিন কোনওরকম অসুবিধেয় পড়লে আমায় জানিও। Again sorry… নিজের জীবনটাকে নতুন করে সাজিও।

‘আপনার ভালোবাসার মানুষের নম্বর সেভ করেননি?’

সুচেতার জল ছেঁচা দুটো চোখের তারা আছড়ে পড়ল রাজারামের ওপর। ‘লেখা আছে তো। কানাডায় শিফট করেছে। এটা ওর নতুন নম্বর।’ নিজের বোকামিতেই নিজে লজ্জা পেল রাজারাম। মোবাইলের আগে কোডটা দেখলেই বোঝা যেত। সব থেকে বড়ো কথা, বিট্টুর নম্বরের এস এম এসের সময় আর এই সময়টার মধ্যে ঘণ্টাদেড়েকের পার্থক্য। তাও রাজারাম প্রশ্ন করল, ‘কোথায় থাকেন আপনি?’

‘কালীঘাট।’

‘এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’

‘আমরা এখানেই আসতাম। বড্ড প্রিয় জায়গা। আশা করি, আপনাদের আসামি আমি নই। কাইন্ডলি ফোনটা যদি…’

সুচেতা হাত বাড়াল। রাজারাম মোবাইলটা দিয়ে দিল। মেয়েটি আবারও সেই একইভাবে পিছন ফিরে জলের দিকে তাকাল। লোকগুলো এসে খবর দিল আশপাশে কোথাও কোনও মোবাইল নেই।

‘হয়তো এস এম এসটা পড়ে এই জলের মধ্যেই ফেলে দিয়ে আবার পালিয়েছে বিট।

স্বয়ম্ভুকে কথাগুলো বলতেই ফোনের ওপার থেকে স্বয়ম্ভু বলল, ‘আশপাশে কোনও গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছ কী?’ রাজারাম ভালো করে ছানবিন করে বলল, ‘না স্যার। বিট্টু আবার পালাল স্যার।’

‘ও এখানে আসেইনি। পালাবে কী করে?’

‘মানে?’

‘বিট্টুকে যে কাজে লাগিয়েছে সে বিট্টুর নম্বরটা নিয়ে খেলা করছে। নইলে বিট্টুর টাওয়ার লোকেশনে অন্য কেউ হতে পারে না।’

‘এটা সম্ভব কীভাবে?’

‘এই লোকটি হয় সিম ক্লোন করছে অথবা রাউটিং ম্যানিপুলেশন।’

‘নেটওয়ার্ক হ্যাক করে ফেলছে?’

‘অসম্ভব নয়। নইলে ভাবো না, বিট্টুর ফোন যে লোকেশনে দেখাচ্ছে সেখানে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে? তার নম্বরটাও আলাদা! কিন্তু আমি ড্যাম শিওর, এস এম এসটা বিট্টুর কাছেই গেছে। এদিকে লোকেশন অন্য। এদিকে স্পটও মুভ করেনি। তার মানে মেয়েটা একই জায়গায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমরা দেখছি বিট্টুর মোবাইলের টাওয়ার। হ্যাকার আশপাশে বসেই কাজটা করছে। ওই অঞ্চলের এরকম অনেক ফোনের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে র‍্যান্ডম একটা নম্বর সিলেক্ট করেছে। যে ওই ডকে দাঁড়িয়ে। পি এসকে এ ব্যাপারে ডিটেলস দিয়ে কাজে লেগে পড়তে বলো। এলাকার সবকটা ক্যাফে, কম্পিউটার সেন্টার, কোনও ভ্যান যদি থাকে বা আশপাশের অফিসগুলো তল্লাশি করতে বলো। বিশেষ করে খোঁজ নিতে বলো এলাকার বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনও দোকান বা ক্যাফে বা এই জাতীয় যা যা আছে সবখানে। আর আমাদের সাইবার সেলেও ব্যাপারটা জানাও। নেটওয়ার্ক ম্যানুপুলেশন রিস্কি হলেও এখন সম্ভব। আরও একটা ইম্পর্টেন্ট পার্ট, লোকটা সব মেয়েদেরই টার্গেট করছে। সে খুনই হোক বা স্কেপ গোট। যে নম্বর থেকে কলটা এসেছিল সেও একটা মেয়ের নম্বর। যাই হোক, আমি পৌঁছে গেছি। রাখছি।’

‘ওকে স্যার।’

রাজারাম ফোনটা রেখে মেয়েটির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সুচেতা পাশের লোকের উপস্থিতি বুঝেও তাকাল না। রাজারাম শান্ত গলায় বলল, ‘এখান থেকে চলুন।

‘ঘণ্টাখানেক হল দাঁড়িয়ে আছি। এখনও যখন মরিনি। তখন আর মরবও না।

বুদ্ধিমতী মেয়ে। ছিপছিপে চেহারা। যথার্থ পানপাতার মতো মুখ। চুলের বার্গেন্ডি কালারটা ফেড হয়ে গেছে। ডান হাতে সেলাইয়ের দাগ। ‘বলছি এলাকাটা ভালো নয়। আমরা যাকে খুঁজতে এসেছি সে কিন্তু ডেঞ্জারাস।’

‘সব হারিয়েই বসে আছি স্যার। আমার থেকে সে আর কিচ্ছু পাবে না।

রাজারাম আর কথা না বাড়িয়ে চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ কী মনে হওয়াতে ঘুরে তাকাল। বলল, ‘হেরে বসে থাকাটা কোনও কাজের কথা নয়। কেউ অন্যায় করলে রুখে দাঁড়ানোটা দরকার। সহ্য করে বেঁচে থাকাটা মরে যাওয়ারই সামিল।’ রাজারাম গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল। পুলিশে থিকথিক ব্রিজটা হঠাৎ যেন খাঁ খাঁ করে উঠল। সুচেতা চোখের জলটা মুছে একটা বড়ো শ্বাস নিল।

ডক্টর দিব্যময় ওয়াশরুমে গেছে দেখে অতনু গলায় জেলুসিল ঢেলে নিল। সকাল থেকেই বুক জ্বালা করছে। ওষুধের শিশির ছিপিটা আটকে পিছন ফিরতেই হাত থেকে শিশিটা প্রায় পড়ে যায় আর কি। মূর্তিমান বিভীষিকার মতো জ্বলন্ত দুটো চোখে অতনুর দিকে চেয়ে আছে দিব্যময়। সবে আমতা আমতা করে সাফাই গাইতে শুরু করেছিল অতনু, দিব্যময় বলে উঠল, ‘লজ্জা করে না, না তোর? তুই না একজন ডাক্তার?’

‘হ্যাঁ স্যার। মানে কাল রাতে একটু দেরি…’

‘একদম ফালতু বকবি না অতনু। চেম্বার থেকে দূর করে দেব।’

অতনু চুপ। এখন বেশি কিছু বললে বাইরের পেশেন্টগুলোর সামনেই ন্যাংটা করে ছেড়ে দেবে।

‘আজ কোনটা? কবিরাজি না কাটলেট? নাকি একেবারে পোড়া তেলে ভাজা চপচপে চপ? আচ্ছা, এই বেলায় কোথায় এ সব ভাজে আমায় বল তো? কোন পাড়ায় থাকিস তুই আমাকে একদিন দেখাস তো।’

‘সরি স্যার।’

‘আমার কিচ্ছু হবে না বিশ্বাস কর। সর্বনাশটা তোরই হচ্ছে।’

‘স্যার পরের পেশেন্টকে পাঠাব?’

এক নার্স দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে প্রশ্ন করল। দিব্যময় একেবারে তিরিক্ষে জবাব দিল, ‘না। আগে ঘরের পেশেন্টের ব্যবস্থা করি।’ সেই নার্স গলাটাকে আরও একটু বাড়িয়ে অতনুকে দেখে বলল, ‘স্যার, ওটা আপনার লস্ট কেস। বাঁচাতে পারবেন না। নার্সের কথা শুনে চোখ পাকাল অতনু। দিব্যময় বলল, ‘মানে?’

‘ডক্টর অতনুর আজকের ব্রেকফাস্ট ছিল মুড়ির সঙ্গে দুটো আলুর চপ আর একটা বেগুনি। ফুলুরি তখনও ভাজা হয়নি তাই খেতে পারেনি। সময় বেলা পৌনে এগারোটা।’

‘মানে? তোমরা কি আমার পিছনে স্পাইং করছ নাকি?’

দিব্যময় পারলে অতনুকে ভস্ম করে দেয়। মুখ কাঁচুমাচু করে অতনু বলে, ‘না স্যার, রোহিনীদিরা এরকম ইয়ার্কি মারে। এত কিছুও না।’ দিব্যময়রের শরীরের রক্ত ফুটছে। মনে হচ্ছে টান মেরে অতনুর জিভটা ছিঁড়ে ফেলুক।

‘ঠিকই বলেছ রোহিনী, এটা আমার লস্ট কেস। আজ থেকে আর একটা ওটিতেও তুই ঢুকবি না।’

‘স্যার স্যার স্যার… আর হবে না স্যার।’

‘তুই থাকবি না ব্যস। রোহিনী, পেশেন্ট পাঠাও।’

‘স্যার স্যার বিশ্বাস করুন আজকেই আমার শেষ খাওয়া।’

‘আমার কাছেও তোর আজই শেষ আসা।’

রোহিনী ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে ঘর ছাড়ল। দিব্যময় অতনুর কোথায় কর্ণপাত না করে বলল, ‘একটা ওষুধের প্যাকেট দিচ্ছি, দয়া করে সেটা আমার বাড়িতে পৌঁছে দিলে ভালো হয়। চিন্ময় আজ ছুটি নিয়েছে। নইলে তাকে দিয়েই পাঠাতাম। আর্জেন্ট।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার নিশ্চয়ই। দিন না। স্যার আর হবে না।’

‘নে ধর। বাবার হাতে দিবি।’

‘আচ্ছা স্যার।’

‘কিছু মনে করিস না যেন।’

‘এ মা! না না স্যার।’

অতনু বেশ গদগদ হয়ে বলল। পেশেন্ট ঢুকে এল। অতনু ঘর ছাড়তেই মুচকি হাসল দিব্যময়।

‘সুপ্রিয়া ঘোষ?’

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চুড়িদার পরা মেয়েটি ভয়ে ভয়ে ঘাড় নাড়ল। পাশে হলুদ মাখা হাতে সুপ্রিয়ার মা ও অন্যপাশে বাবা। মেয়ের বয়সের তুলনায় বাবা মায়ের বয়স একটু বেশিই। বাবার পরনে নীল চেক লুঙ্গি ও গেরুয়া ফতুয়া। তিনিই বললেন, হয়েছে যদি একটু বলেন। সুপ্রিয়া কী করেছে?’

‘কী

‘নাইন টু জিরো ফোর টু এইট ফাইভ নাইন ডবল থ্রি। এটা তোমার মোবাইল নম্বর?’

স্বয়ম্ভু একেবারে গড়গড় করে বলে গেল নম্বরটা। অদ্ভুত লাগল শিবাঙ্গীর। এই কাল রাতে সিনেমার নাম গোলাচ্ছিল লোকটা। এখন আবার গড়গড় করে অচেনা

একটা ফোন নম্বর বলে গেল মাত্র এক দু-বার দেখেই। সুপ্রিয়া ভীত গলায় বলল, ‘হ্যাঁ। এটা আমার নম্বর।’

‘বিট্টু দেবনাথ কে হয়?’

‘বিট্টু দেবনাথ? এ নামে তো কাউকে চিনি না।’

সুপ্রিয়ার মা এবার বলে উঠল, ‘একটু প্লিজ বলুন না, কী হয়েছে? বিট্টু দেবনাথ কে?’

‘উত্তরটা আপনার মেয়ের কাছেই আছে।’

‘কী রে সুপি, কে বিট্টু দেবনাথ?’

‘আমি এ নামে কাউকে চিনি না মা।’

এবার শিবাঙ্গী বেশ কড়া গলাতেই বলল, ‘কালীর ঘরে বারো নম্বর এ পারা সাপ। ফোর হাইফেন নাইনটি নাইন। সকাল এগারোটা বাইশ মিনিটে তোমার নম্বর থেকে একটা এস এম এস গেছে বিট্টু দেবনাথের নম্বরে যেখানে এই ধাঁধাটা লেখা ছিল।’

‘বিশ্বাস করুন, আমি কাউকে কোনও এস এম এস করিনি। সত্যি কথা বলতে কি এখন তো এস এম এস করিই না। যা হয় হোয়াটস্যাপে।’

‘মোবাইলটা দেখি।’

সুপ্রিয়া পাশের ঘরে ফোনটা আনতে যায়। সেই ফাঁকে স্বয়ম্ভূ সুপ্রিয়ার বাবাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি কি করেন?’

‘কে কে দাস কলেজে ক্ল্যারিকাল জব করি।’

‘আপনার মেয়ে?’

‘কে কে দাসেই পড়ে। ফার্স্ট ইয়ার। পাস।

সুপ্রিয়া ফোনটা নিয়ে এল। শিবাঙ্গী খেয়াল করল মেয়েটির হাত বেশ কাঁপছে। এক ঝলক সুপ্রিয়াকে দেখে ফোনটা চেক করতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ড বাদেই শিবাঙ্গী সুপ্রিয়ার দিকে তাকায়। বলে, ‘কলেজে পড়া মেয়ে যে এত বোকা হয় জানতাম না তো।’ সুপ্রিয়া ব্যোমকে যায়। স্বয়ম্ভুও বুঝতে পারে না শিবাঙ্গীর কথা।

‘ফোন থেকে যা যা তুমি ডিলিট কর তা সব গিয়ে জমা হয় রিসাইকেল বিনে। সেখান থেকেও ডিলিট করতে হয় সুপ্রিয়া। যদিও সেখান থেকে ডিলিট করলেও পুলিশ সব উদ্ধার করতে পারে। এই যে স্যার সেই এস এম এস।’

স্বয়ম্ভু সুপ্রিয়ার দিকে তাকাতেই সে বলে ওঠে, ‘বিশ্বাস করুন স্যার আমি এই এস এম এস করিনি। আমি জানি না কে বিট্টু?’

‘অথচ তার নম্বরে তোমার থেকে মেসেজ যাচ্ছে!’

এবার সুপ্রিয়ার বাবা-মাও মেয়েকে চেপে ধরে। ছটফট করে ওঠে সুপ্রিয়া।

‘বিট্টু দেবনাথ একজন পালিয়ে যাওয়া আসামি। আমরা তাকে খুঁজছি। তুমি বিট্টুকে না চিনলে তোমার ফোনে তার নম্বর এল কী করে?’

‘আমি জানি না বিশ্বাস করুন।’

‘সকাল দশটা বাইশে তুমি কি বাড়িতেই ছিলে?’

স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল।

একটু ভেবে সুপ্রিয়া বলল, ‘না। পড়ে ফিরছিলাম।’

‘তোর ফোনটা যে পড়ে গিয়েছিল সেটা বল।’

পাশ থেকে সুপ্রিয়ার মা বলে উঠলেন। শিবাঙ্গী মায়ের কথার লেজ ধরেই প্রশ্ন

ছোড়ে, ‘কখন কোথায়?’

‘এই কালীবাড়ির পাশেই একটা দোকান আছে। ঠাকুরের মিষ্টি-টিষ্টি পাওয়া যায়। আমি বাড়ির ঠাকুরের জন্য সেখান থেকেই মিষ্টি কিনে আসছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে একটি লোক ডাকল।

***

‘শুনছেন!’

চড়া রোদে ঠিকমতো তাকাতে পারছে না সুপ্রিয়া। তাই চোখ ছোটো করেই লোকটাকে দেখল। একটা মোবাইল বাড়িয়ে বললেন, ‘এটা বোধহয় আপনার ফোন।’ সুপ্রিয়া চট করে জিনসের পকেট চেক করে দেখল সেখানে ফোন নেই। তারপর ওই ফোনটা হাতে নিয়েই সুপ্রিয়া আপ্লুত হয়ে বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। এটা আমারই। আপনি

কোথায় পেলেন?’

‘রিকশা থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেছে। আপনি খেয়াল করেননি। রিকশাওয়ালাও দেখেনি। আমি কচুরি খাচ্ছিলাম। দেখতে পেয়েই দৌড়ে এলাম। রিকশাওয়ালা বলল, আপনি এদিকেই এসেছেন। সুপ্রিয়া দাস আপনার নাম তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘মোবাইলে ছবিটা আছে তাই আপনাকে রাস্তাতেই চিনতে পারলাম। আসছি হ্যাঁ।’

‘থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনি ছিলেন তাই…’

কৃতজ্ঞতার স্বর উপচে পড়ছে সুপ্রিয়ার গলা দিয়ে।

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘কীরকম দেখতে ছেলেটাকে?’

‘এক গাল দাড়ি। গোঁফটা বেশ মোটা। ফর্সা। মাথায় টুপি ছিল।’

‘লম্বা না বেঁটে?’

‘স্ট্যান্ডার্ড হাইট।’

‘এখানে কার মতো হবে?’

‘এই বাবার মতো।’

‘পাঁচ ফুট সাত কিংবা আট।’

স্বয়ম্ভু আওড়াল। সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রিয়ার বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ আমার হাইট ওরকমই।’

‘রোগা না মোটা?’

‘না না মোটা নয়। একটা কালো রঙের টি শার্ট পরেছিল। চোখে সানগ্লাস।’

‘আর প্যান্ট?

‘ঠিক দেখিনি। আসলে এত রোদ্দুর ছিল।’

শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, ও যখন তোমায় ফোন দেয় তখন ক’টা বাজে?’

‘ঘড়ি দেখিনি। তবে…

মনে পড়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে সুপ্রিয়া ফোনের স্ক্রিনটা দেখেছিল আর সেখানেই ফুটে উঠেছিল সময়। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখেছিলাম, দশটা সাতাশ।’

‘তুমি কি রিকশা করে ফিরেছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘কটায় রিকশা থেকে নেমেছ খেয়াল আছে?’

‘দশটা পনেরো হবে। কারণ স্যারের বাড়ি থেকে রিকশায় এখানে আসতে মিনিট সাতেক লাগে। দশটা পাঁচে বেরিয়েছিলাম।’

স্বয়ম্ভু জানতে চায়, ‘ফোন লক থাকে না?’

‘হ্যাঁ। ফোন তো লকই ছিল।’

স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। সুপ্রিয়াকে বলল, ‘ফোনটা দু-দিনের জন্য আমাদের কাছে থাকবে। অফিসিয়ালি চেক করা হবে। তারপর ফেরত পাবে। প্রয়োজনে ডেকে পাঠাব। চলে যাবেন।’

‘স্যার, আমার আর ফোন নেই।’

‘বাড়িতে অন্য কারও আছে তো?’

সুপ্রিয়ার বাবা বললেন, ‘আমার আছে। কিন্তু ও তো মেসেজ করেনি। ওর ফোনটা কেন…!’

‘শুনুন মনোজয়বাবু, এই যে এস এম এস এসেছে আমরা সন্দেহ করছি এটা একটা ঠিকানা। খুনি বিশেষ একজনকে পাঠিয়েছে যে পরবর্তী খুনটা করবে।’

আঁতকে ওঠে সুপ্রিয়া ও তার বাবা-মা। স্বয়ম্ভু বলে, ‘এখানে আপনাদের কোনও শত্রু আছে?’

‘না স্যার। শত্রু কেউ নেই। কারও সঙ্গে পারতপক্ষে কোনও বাগবিতণ্ডায় জড়াই না। আমার মেয়েরও স্বভাব খুব ভালো। ওকে সবাই ভালোবাসে।’

‘হুম। এই মন্দিরে যান?’

মনোজয়বাবু এবার গুম মেরে গেলেন। সুপ্রিয়ার মা-ও একটু যেন ইতস্তত করলেন। শিবাঙ্গী বলল, ‘কী হল, স্যারের প্রশ্নের উত্তর দিন। মন্দিরে যান না?’ সুপ্রিয়ার মা বললেন, ‘কী আর বলব? সামনেই মায়ের মন্দির। যাবার জন্য প্রাণটা হু হু করে। কিন্তু পুজো দিতে মন চায় না।’

‘কেন?’

‘মন্দিরের পুরোহিত অতীব জঘন্য একটি লোক। দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো উগরে দিল মনোজয়।

‘কারণ?’

স্বয়ম্ভূ মুখটাকে ওপরদিকে চোখ ছোটো করে আড়ে তাকায় মনোজয়ের দিকে। এরকমভাবে না তাকালেও চলে। কিন্তু তাও স্বয়ম্ভু এমন কিছু মুখভঙ্গি করে যাতে উলটোদিকের লোকটি খানিক হলেও ঘাবড়ে গিয়ে সত্যি কথা বলে। মনোজয় টোক গিলে বললেন, ‘এই বছর তিনেক আগে পাশের পাড়ার নন্দকিশোর গোস্বামী এই বাসনাকালী মন্দিরের পুরোহিত হিসেবে কাজ শুরু করেন। অনেক কাল থেকেই গোস্বামী বাড়ির নামডাক আছে।’

‘এর আগে কে পুজো করতেন?’

‘সুখময় মুখার্জি। বড়ো অমায়িক মানুষ ছিলেন। হার্ট অ্যাটাকে অকালে চলে গেলেন। তারপরই নন্দকিশোর কাজটা পায়।’

‘তার সঙ্গে আপনাদের অশান্তিটা বাঁধল কীসে?’

‘সেদিন আমার মেয়ের জন্মদিন ছিল। মায়ের কাছে পুজো দিতে গেছি। পুজো শেষে আমার মেয়ে মায়ের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গিয়েছিল। প্রতিবারই করে। সেবারেও করতে গেল। কিন্তু নন্দকিশোর এমন তেড়ে উঠল সকলের সামনে। বলে নাকি আমরা বামুন নয় বলে মায়ের পায়ে হাত দিতে পারব না। আমার মাথায় রাগ উঠে গেল। হাত পেতে দক্ষিণা নেবার বেলায় তো কোনও বাছবিচার নেই, তাহলে মায়ের পায়ে কেন আমরা হাত দিতে পারব না বলুন তো?’

‘হুম। ঝগড়া হল?’

‘হ্যাঁ। আমি বললাম, এর আগে তো সুখময় আমাদের কোনওদিন বাধা দেয়নি, তাহলে এখন কেন বাধা দিচ্ছ? তখন ওই নন্দ কী বলল জানেন? বলে নাকি, একজন মব্রাহ্মণ গোয়ালাকে মায়ের পা ছুঁইয়ে সুখময় যে পাপ করেছিল তাতেই নাকি সে অকালে মারা গেছে। লজ্জায় ঘেন্নায় আমরা কেউ তারপর থেকে ও মুখো হইনি। মা যতদিন না এর সঠিক বিচার করবে তদ্দিন আমরা কেউ ওই মন্দিরে যাব না। তারপর থেকে ওই নন্দের ছায়াও মাড়াই না।’

***

‘কেঁ এঁলিঁ রেঁ? কেঁ এঁলিঁ রেঁ?’

অতনু ফিক করে হেসে ফেলে। পাখির সঙ্গেই রসিকতা করে, ‘আমি অতনু। আমায় চেনো তুমি?’

‘চেঁনোঁ তুঁমি? চেঁনোঁ তুঁমি?’

অতনু আগেই ডেকেছিল। আবারও ডাকল, ‘কেউ আছেন?’ ভিতর থেকে বয়স্ক লোকের গলা তীরের বেগে ছুটে এল, ‘এই মন্দা দ্যাখ নাআআআ।’

‘মঁন্দাঁ এই মঁন্দাঁ।’

হঠাৎ একটা দরজা খোলার শব্দ। সেখান থেকেই একটা খনখনে গলার তোড় ভেসে এল। ‘নিজে একটু দেকতে পাচ্চ না? বলি মানুষের হায়া বলে কিছু আছে তো নাকি…!’ কথাটা বলেই মন্দাকিনী হাঁটার গতি কমে গেল। গ্রিল দিয়েই অতনুকে দেখেছে সে। সেই সময়েই বাণীকণ্ঠ মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসে। ‘কে বাবা তুমি?’

‘আমি অতনু মেসোমশাই। স্যার, মানে ডক্টর দিব্যময় মুখার্জি আমায় পাঠালেন।’ মন্দা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখে হালকা হাসি নিয়েই মন্দাকে এক ঝলক মেপে নিল অতনু। মন্দাকিনীও চ্যাপ্টা মুখে ঢলো ঢলো ভাব ফুটিয়ে চেয়ে রইল অতনুর দিকে।

‘ও হো হো হো, বাবু বলছিল বটে। এসো এসো।’

‘না না মেসোমশাই, আমি আজ ভেতরে যাব না। চেম্বারে ফিরতে হবে। এই মেডিসিনগুলো স্যার পাঠিয়েছেন।’

ওষুধের প্যাকেটটা এগিয়ে দিতে বাণীকণ্ঠ সেটা গ্রহণ করে। ‘আরে চেম্বার তো থাকবেই। একটু চা খেয়ে যাও। এই মন্দা চা বসা।’

‘না না মেসোমশাই, আজ সত্যিই সময় নেই। আমি অন্যদিন আসব।’

‘সে সময় কি আর আসবে বাবা? তোমার স্যার আমায় যে রাক্ষসীর হাতে দিয়ে গেছে পরেরদিন হয়তো দেখবে সে আমার মাথাটি চিবিয়ে বসে আছে।’

মন্দার ঢলো ঢলো মুখেই আগুন জ্বালো ভাব। জ্বলেও উঠল, ‘এই যে শোনো, তোমার স্যারকে গিয়ে বোলো তার বাবাকে যেন কোনও বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে রেখে আসে।’

‘অ্যাই হতচ্ছাড়ি, তুমি-তুমি করছিস কি? আপনি করে বল। ইনিও একজন ডাক্তার।’

দাঁত খিঁচিয়ে উঠল বাণীকণ্ঠ।

মন্দাকিনী নিজেকে সামলে নিল। ‘শ…শরি!’

‘আরে না না ঠিক আছে। কোনও ব্যাপার না। আমি আজ আসি কেমন?’

‘এসো। কী আর বলি? ও হো, শোনো।’

‘হ্যাঁ বলুন।’

‘বলছি এই মেয়ে তোমার স্যারের কানে বিষ ঢেলে আমার বাইরে যাওয়াটি বন্ধ করেছে।’

আবারও মন্দাকিনীকে খোঁচা দিল বাণীকণ্ঠ। ‘তা এই যে আমার চুলগুলো বড়ো হয়েছে। গালভর্তি দাড়ির জঙ্গল হয়ে গেছে, এগুলো তো কাটতে হবে। সেক্ষেত্রে আমি কী করব? দাড়ি না হয় আমি কেটে নেব। কিন্তু চুল তো পারব না বাবা!’

‘হ্যাঁ, চোখে ন্যাবাও হয়েছে। সেটাও দাদাবাবুকে বোলো তো। এই দু-দিন আগে দাড়ি কেটেছে। কী দাড়ি হয়েছে কি হয়নি অমনি ওনাকে দাড়ি কাটতে হবে।’

‘আমার দাড়ি আমি বুঝব। তোর অত মাথা ঘামানোর দরকার কী রে মেয়ে?’ মন্দাকিনী মুখ ব্যাঁকাল। অতনু আবার হেসে বলল, ‘আচ্ছা, স্যারকে আমি বলছি। উনি আপনার ব্যবস্থা করে দেবেন নিশ্চয়ই। আমি আসি কেমন?’

‘এসো বাবা এসো।’

অতনু আড়চোখে মন্দাকিনীর দিকে দৃষ্টি ছুড়ে বেরিয়ে গেল। অমনি বাণীকণ্ঠের মুখে যেন কালমেঘ পাতার রস ছড়িয়ে পড়ল। ‘আর কোনওদিন যদি দেখেছি বাইরের

লোককে তুমি করে কথা বলতে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।’

বিটকেল অমনি তাল ধরল, ‘বের করে দেব। বের করে দেব।’

‘চুপ কর হতচ্ছাড়া।’

বিটকেলকে ধমকেই মন্দাকিনীর পোড়া কাঠের মতো মুখের ভাবে অকস্ম্যাৎ ললিতালালিত্য খেলে গেল। নখের মধ্যে নখ ঘষে, ঠোঁট কামড়ে সোহাগী সাপিনীর মতো হেলেদুলে বাণীকণ্ঠের দিকে এগিয়ে ফিশফিশ করে মন্দাকিনী বলল, ‘তুমি করেই তো বলব। ও যে আমার আজ্জন্মের লাগর গো! হুঁঃ!’ মুখ বেঁকিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল মন্দা। ও ভালোই জানে কীসে বুড়োর হাড়ে জ্বলন ধরে। বাণীকণ্ঠ দাঁতে দাঁতে কটমট করে বলে ওঠে, ‘আজই… আজই বাবুকে বলে তোর বেলেল্লাপনা ঘোচাচ্ছি। দাঁড়া।’ রাগে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢুকে গেল বাণীকণ্ঠ। মন্দার চোখের তারায় কালনাগিনীর হাসি ফুটে উঠল।

***

কালীমন্দিরের সামনেই চারপাশ বাঁধানো জলাশয়। ঘড়িতে দুপুর পৌনে একটা। চড়া রোদ। তবু জলাশয়ের পরিষ্কার টলটলে জলে নীল আকাশে শরত মেঘের ছায়া। মনটা জুড়িয়ে যাবার কথা। কিন্তু ঝিলের পাশের সাদা রং করা লোহার বেঞ্চিতে বসে স্বয়ম্ভু-শিবাঙ্গী দুজনেরই মন জ্বলছে।

‘আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে শিবাঙ্গী, খুনি আমাদের ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে।’

‘ইচ্ছে করেই আমাদের সব জানিয়ে চোখের সামনে দিয়ে খুন করে বেরোবে।’

‘এই মুহূর্তে আমরা যে এখানে বসে আছি সেটাও খুনি দেখছে, আমি শিওর।’

শরীরে অল্প কাঁপুনি টের পেল শিবাঙ্গী। এপাশে ওপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে শিবাঙ্গীর চোখদুটো সেই বিশেষ গুপ্ত মুখটিকে খুঁজে নেবার চেষ্টা করল। জলাশয়ের উলটোদিকে বসেই একটি চ্যাংড়া ছোড়া মুখের মধ্যে ছুড়ে-ছড়ে বাদাম বা ছোলা জাতীয় কিছু খাচ্ছে। পাশে বসে একটি অল্পবয়সি মেয়ে। হয়তো প্রেমিকা। এই দুপুরে প্রেম করছে? ছেলেটির চোখ মোবাইলে। প্রেমিকার চোখও। সন্দেহ করার মতো কিছু নেই। অন্য আরেকটি দিকে গাছের ছায়ায় তিনজন বয়স্ক। বেশভূষা থেকে এ অঞ্চলেরই মনে হচ্ছে। তেমন কোনও মুখ পেল না শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভূ বলল, ‘মাত্র পাঁচ মিনিটে একটা অচেনা ফোনের লক খুলে বিট্টুর নম্বরে টেক্সট পাঠিয়ে সেটা আবার ডিলিট করে সুপ্রিয়াকে ফোন ফেরত দিল। কতটা টেকনিক্যালি সাউন্ড হলে এটা হয় ভাবো।’

‘ফোন কুড়িয়ে পাওয়াটা মিথ্যে কথা স্যার। সুপ্রিয়ার পকেট থেকে ফোনটা ওই ছেলেটাই চুরি করে কাজটি সেরেছে। নইলে সুপ্রিয়ার পকেট থেকে ফোন পড়বে এটা তো কারও জানা থাকতে পারে না। তার ওপর দারুণ রিসার্চ। পুরোহিতের সঙ্গে যে মেয়েটির পরিবারের খারাপ সম্পর্ক আছে সেটাও খবর নিয়েছে। অ্যাটলিস্ট একটা কোনও শত্রুতার অ্যাঙ্গেল তো আছে। তাই এখানে খুন হলেও হতে পারে। তাই সুপ্রিয়াকেই টার্গেট করা হয়েছে।’

‘কিন্তু এটা তো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স নয়।’

‘তা ঠিক। আচ্ছা, বলছিলাম ওই বদমাইশ পুরোহিত কোনওভাবে তার বউকে ধরে ঠ্যাঙায় না তো? যে বাইরের লোকের সঙ্গে এর খারাপ বিহেভিয়ার করে সে নিশ্চয়ই বাড়িতে ধোয়া তুলসীপাতা নয়!’

‘তাহলে সুপ্রিয়া কেন? জাস্ট র‍্যান্ডম?’

‘খিদিরপুরের মেয়েটা কেন? র‍্যান্ডামই তো।’

স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী যেন একে অপরকে জেরা করতে শুরু করেছে। ওরা জানে এভাবেই হাতড়াতে হাতড়াতে ঠিক একটা লিড পেয়ে যাবে।

হঠাৎ শিবাঙ্গীর মগজের কোনও একটা দিক আলোকিত হয়ে ওঠে। ‘স্যার, খুনি খুনের প্যাটার্ন পালটাবে কিনা জানি না। তবে মোটিভটা পালটেছে।’

‘মানে?’

‘এতদিন সেইসব মহিলারাই খুন হচ্ছিল যারা অত্যাচার সত্ত্বেও প্রতিবাদ করেনি। এক্ষেত্রে সুপ্রিয়ার বাবা প্রতিবাদ করেছিল। তাই সুপ্রিয়াকে মারার প্রশ্নই নেই। খুনির টার্গেট পুরোহিত। যে প্রতিবাদ করেছে খুনি এবার তার মোবাইল থেকে সুপারি কিলারকে ঠিকানা পাঠিয়েছে। সঙ্গে আমাদেরও ইনভলভ করেছে চ্যালেঞ্জ করার জন্য।’

স্বয়ম্ভুর শ্বাস ঘন ঘন পড়ছে। মনে মনে হেঁয়ালিটা আরও একবার আওড়ে নিল সে। ‘চলো শিবাঙ্গী…!’ বলতেই শিবাঙ্গী বলে ওঠে, ‘পুরোহিতের বাড়ি?’

‘না। ওকে কিচ্ছু জানাব না।

‘তবে?’

‘এই মন্দিরটা যাঁদের তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। শুধু ফোর হাইফেন নাইনটি নাইন-টাই গুলিয়ে দিচ্ছে। চার নম্বর কী হতে পারে?’

‘মা কালীর চারটে হাত!’

‘উঁহু।’

‘চারে, চতুর্থ প্রহর?’

‘দাঁড়াচ্ছে না।’

‘চতুর্থ দিন? কিন্তু কীসের?’

স্বয়ম্ভু থমকে গেল। চোখদুটো চকচক করে উঠল তার। উল্লসিত অথচ চাপা কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ব্রাভো শিবাঙ্গী ব্রাভো! আজ তৃতীয়া কাল চতুর্থী।’ শিবাঙ্গী নিজেও হতচকিত হয়ে যায়। ‘কিন্তু স্যার, কাল তো রবিবার নয়।’ স্বয়ম্ভু একটু ভাবনায় পড়ল। অপরাধী খেলাচ্ছে না তো? নিজের মনকেই প্রবোধ দিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, ‘সাবধানের মার নেই শিবাঙ্গী। আমাদের একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে।’ স্বয়ম্ভু ডান হাতের মুষ্টি দিয়ে বাঁ হাতের তালুতে আঘাত করে বলে, ‘বাকি রইল নাইনটি নাইন।’ স্বয়ম্ভূ ভালো করে মন্দিরের সারা গায়ে খুঁজতে থাকে নাইনটি নাইন লেখা কোনও নকশা বা নম্বর কিছু আছে কিনা। তাহলে এক্কেবারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ভালো করে মন্দির চত্বর ছুঁড়েও তেমন কিছুই খুঁজে পাওয়া গেল না। এইসময় মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। বাইরের চাতালে ছায়া দেখে একটা পাগল কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। ছেঁড়া ময়লা কাপড়, হাতে পায়ে বড়ো বড়ো নখ। পাগলটার পাশেই একটা কালো কুকুর চুপ করে বসে। কপালে আর গলায় রুমালটা ঘষে নিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, ‘কাল এই মন্দিরে কিছু একটা হতে চলেছে। সজাগ থাকতে হবে।’

‘খুনি তো আমাদের চেনে।

‘ওই জন্যেই তো তুমি আর আমি থাকব ছদ্মবেশে। বাকি সব নরমাল। ও হো আরেকটা কথা, আজ সন্ধেবেলা তোমার স্বপ্নার বাড়ি যাবার কথা।

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘যাবে না।’

‘কেন স্যার?’

‘আরেকটু খেলুক ওরা। এখনি সাবধান করে দিলে চাপ।’

‘ওকে স্যার। শুধু একটাই চিন্তা, বিট্টু কি উবে গেল? প্রতিটা থানায় ওর ছবি দেওয়া আছে। কিন্তু কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। কেন?’

‘পালাতে গিয়ে গঙ্গায় ডুবে যায়নি তো?’

‘তাহলে তো বড়ি ভেসে উঠবে। তা ছাড়া বিট্টুর সঙ্গেই ওর ফোন ছিল। গঙ্গায় ডুবলে সেটাও অচল হয়ে যাওয়ার কথা।’

‘তাহলে?’

‘আগামীকাল সন্ধে পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। চলো।’

মন্দিরের চাতাল থেকে নেমে বাইরে বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। পাগলটা ময়লা কাপড়ের নীচে কুণ্ডলী ভেঙে হাত-পা টানটান করে শু’ল। আধবুড়ো দাড়ি- গোঁফের ফাঁকে আলতো হাসির রেখা ঝিলিক দিয়ে উঠল।

দুপুর দুটো বাজতে চলেছে। অনেক কষ্টে একটা এসি রেস্টুরেন্টে ঢুকে দুটো মুখে তুলেছে স্বয়ম্ভু। ফোন বেজে ওঠে। ‘এর আবার কী হল?’ বলেই কল রিসিভ করে স্বয়ম্ভু, ‘বলুন মুনশিবাবু।’

‘জেনে ফেলেছি স্যার।’

মহাসিন্ধুর ওপার থেকে প্রবল উচ্ছ্বাস। পেটে খাবার পড়েছে, তায় আবার চাইনিজ। স্বয়ম্ভুও এখন রসিকতার মুডে, ‘জেনে ফেলেছেন? যাক তাহলে তো আর আমাদের জানার দরকার নেই।’

‘অ্যাঁ!’

সিন্ধুর ওপারে মুনশি ভেবলে ভ।

‘না মানে কী জেনেছেন সেটা না বললে বুঝি কী করে বলুন।’

স্বয়ম্ভুর কথায় হো হো হেসে ওঠেন সুরঞ্জন মুনশি। ‘রসিক লোক বটে স্যার। বলছি শুনুন। লোকটার নাম অরণ্য তপাদার। বয়স এই পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশের আশপাশে। চাকরি-বাকরি কিসসু করে না। বাড়ি থেকেও বেরোয় না। মাঝেমধ্যে সামনের দোকানে যায়। ব্যস।’ সামনের কাচের গ্লাসটাকে নিজের মাথায় ভাঙতে ইচ্ছে করছিল স্বয়ম্ভুর। শিবাঙ্গীর ফোনে কেউ হোয়াটসঅ্যাপ করল। ‘দাঁড়ান দাঁড়ান মুনশিবাবু। এইভাবে ইনফরমেশন দিলে আমি কেন, স্বয়ং ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এলেও বুঝতে পারবে না। এটা কে? কার সম্পর্কে বলছেন?’

‘আরে ওই যে স্বপ্নার প্রেমিক। মাঝরাতে অভিসার।’

স্বয়ম্ভুর চোখের মণিদুটো গোটা ব্রহ্মাণ্ড প্রদক্ষিণ করে এল। ‘বুঝলাম। ওই লোকটার সঙ্গে কথা বলেছেন নাকি?’

‘না না। সব আমার সোর্স খবর এনেছে।’

‘বাহ! বাহ! আপনার লা জবাব সোর্স। আজ রাতেও নজর রাখুন। মাইন্ড ইট, শুধু নজর।’

‘আচ্ছা।’

‘রতন যেন না যায়। অন্য কাউকে পাঠাবেন আপনাদের সোর্স থেকে।

মুনশি যেন একটু থমকে যায়। ‘ও আচ্ছা। না মানে রতনের অসুবিধে ছিল না।’

‘আমার অসুবিধে আছে। রতন যেন না যায়।’

‘ওকে ওকে স্যার।’

‘গুড নাইট।’

বলেই ফোনটা কেটে দিল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী হেসে ফেলল। ‘কী বলছে যে এত রেগে গেলেন?’

‘মুনশি ধরেই নিয়েছে স্বপ্না তার প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতেই যায়। নইলে মাঝরাতে আর কেউ অন্য কারণে বেরোতে পারে না।’

‘আপনার কী মনে হয়?’

স্বয়ম্ভু থেমে গেল, ‘জানি না। হতেও পারে। তবে মুনশির মতো ডেফিনিট করে বলতে পারছি না।’

‘বলছি তিলজলা থানায় সাগর ধরকে তুলে আনা হয়েছে। লাঞ্চ করে রাজারাম যাচ্ছে।’

‘কে জানাল?’

‘রাজারাম। হোয়াটসঅ্যাপ করল।’

‘অও! ভালো ভালো। টিম মেম্বারদের সঙ্গে এভাবে হোয়াটসঅ্যাপে কন্ট্যাক্ট রাখবে সবসময়।’

শিবাঙ্গীর চাউনিতে পরিবর্তন এল। স্বয়ম্ভু বুঝল সেটা। ‘না মানে একে অপরের কাজের আপডেট রাখলে টিমটাই স্ট্রং হবে এই আর কি।’

‘না আসলে আপনি ব্যস্ত থাকবেন বলে আপনাকে আর…’

‘ইটস ওকে ওকে। নো ইস্যু। খাও খাও ঠান্ডা হয়ে যাবে।

শিবাঙ্গী আলগা চালে এক পলক স্বয়ম্ভুকে দেখে নিয়ে এগ চিকেন হাক্কা নুডলসটা মুখে তুলল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *