ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে – ১৩

১৩

সুবোধ মজুমদারের খুশি আর ধরে না। সেক্টর ফাইভে কর্মী ছাঁটাই অভিযানে বলি হওয়ার পর হাতে বেশ কিছু টাকা আসে। কিছু তো একটা করতে হবে। বহুদিনের শখ ছিল একটা নিউজ পেপারের অফিস করার। খানিক খেলতে খেলতেই তৈরি হয় সাপ্তাহিক প্রভাকর। এত খেটেও বিক্রিবাটা তেমন ছিল না। শেষ তিন বছর ধরে সাপ্তাহিক প্রভাকরকে দাঁড় করাতে কী না করেছেন। আঁখি চ্যাটার্জিই ভিডিও করার পরামর্শ দেয়। পেপার বিক্রির আগে তার নামটাকে অ্যাস্টাবলিশ করা দরকার। আঁখির পরামর্শেই প্রথমে পেজ খোলেন। তাতে মেরে কেটে মাস তিনেকে ছশো মতো সাবস্ক্রাইবার। তারপর আঁখিই খুঁজে খুঁজে খবর জোগাড় করে নিয়ে আসে। খুন তো অনেক হয়। কিন্তু একটার সঙ্গে আরেকটাকে জুড়ে এমন একখানা সিরিয়াল কিলিংয়ের সূত্র বের করা চাট্টিখানি কথা? আঁখিই ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিডিওর সামনে প্রথম বলে এটা সিরিয়াল কিলিং। পুজোতে বেরোলেই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার মহিলারা খুন হয়ে যাবেন। এমন কথা এই মেয়েটিই প্রথম বলে। ভিডিওটা মাত্র একদিনে মিলিয়ন ভিউ পায়। সাবস্ক্রাইবার একদিনে বেড়ে ছশো থেকে দেড় হাজার। সেই খুশিতেই সুবোধবাবু বিকেলে চাউমিন আর চিলি চিকেন অর্ডার করে অফিসে স্টাফদের খাওয়াচ্ছেন। আঁখিকে নিয়ে স্টাফের সংখ্যা পাঁচজন। সকলেই ফ্রিল্যান্সার। আঁখির নামে উল্লাসধ্বনির সঙ্গে শুরু হল খাওয়া। তানিয়া আঁখিকে জড়িয়ে ধরল, ‘থ্যাংক ইউ আঁখিদি। তুমি আরও এমন ভাইরাল খবর দাও। আমরা আবারও চাউমিন আর চিলি চিকেন খাই।’ প্রীতম বলে উঠল, ‘নজরটাকে একটু বড়ো কর তানিয়া। পরেরবার চিকেন বিরিয়ানি বল।’

‘ইসসস! খেতে পেলে শুতে চায়।’

হো হো করে হাসে সুবোধবাবু, ‘হবে হবে। চিকেন কেন? মাটন বিরিয়ানিও হবে। শুধু আঁখি খবর আনলেই হবে? তোমরাও দেখাও কিছু।’ তানিয়া আর প্রীতমের মুখটা একটু ছোটো হয়ে গেল। সুবোধবাবু সেটা বুঝে, ‘নাও, শুরু করো। ঠান্ডা হলে ভালো লাগবে না।’ এত কথা, এত হাসি, তবু আঁখি যেন কোন অতল ভাবনায় ডুবে আছে।

‘কী গো আঁখিদি, চুপ করে আছ কেন? তুমি এখন ভাইরাল। এনজয় করো।’

তানিয়ার সঙ্গে প্রীতম গলা মেলাল, ‘আজ থেকে আঁখিদি নয়, ভাইরাল দিদি।’ আবারও এক হাসির দমকা বাতাস বইল। এবার আঁখিও হাসল। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। আঁখি কল রিসিভ করতে একটু দূরে সরে যায়।

‘হুম।’

হ্যালো শব্দটাও উচ্চারণ করে না আঁখি। মুখের অভিব্যক্তি কেমন যেন পালটে যেতে থাকে। একসময় ফোন কেটেই বলে ওঠে, ‘সুবোধদা, আমায় এখুনি বেরিয়ে যেতে হবে। কাজ আছে।’

‘কোথায়? কিছু হয়েছে আবার?’

‘পার্সোনাল। প্লিজ।’

‘সে যাও। কিন্তু খেয়ে যাও।’

আঁখি হাসল। ‘সময় হবে না। আমারটা সবাই ভাগ করে খেয়ে নাও।’ একটাই ঘরে কাঠের পাটাতন দিয়ে দুটো ঘর বানানো। সেই ঘরে ঢুকে নিজের ব্যাগ নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এল। দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবার আগে আরেকবার ফিরে চাইল, ‘আমাকে যেই খুঁজতে আসুক, বোলো আমার একটা পার্সোনাল কাজে বেরিয়ে গেছি। কলকাতার বাইরে। কোথায় কেউ জানো না। প্লিজ। বাই সবাইকে।’ আঁখি বেরিয়ে যেতে তানিয়া সরাসরি সুবোধবাবুকে বলল, ‘সুবোধদা, মাটন বিরিয়ানি খাওয়াবেন বলেছেন কিন্তু।’ সুবোধ কোনও উত্তর দিতে পারলেন না।

রাস্তায় পা দেওয়ার আগে মুখ বাড়িয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল আঁখি। তারপর দ্রুত পা চালাল মেন রোডের দিকে। ঠিক মতো দম নিতে পারছে না। আঁখির মনে হচ্ছে নিঃশ্বাসের শব্দটা যদি কেউ শুনতে পেয়ে যায়। রাস্তায় যাকে দেখছে তাকেই সন্দেহভাজন মনে হচ্ছে। হাজার একটা কথা ভাবতে ভাবতে গাঙ্গুলিবাগানের মোড়ে এসে পৌঁছোতেই একটা হলুদ ট্যাক্সি দেখতে পায়। ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে পায়। বাসে ওঠার সময় নেই। তাই বেশি টাকা খরচা হলেও কিচ্ছু করার নেই। ট্যাক্সিটা বেরিয়ে যেতে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাইকটা ছুটতে শুরু করল ট্যাক্সির পিছন পিছন। গাঙ্গুলিবাগান থেকে বাঘাযতীন হয়ে ট্যাক্সিটা ডানদিকে বেঁকে গলফগ্রিনের দিকে ঘুরে গেল। খানিকটা যেতে যেতেই আঁখি খেয়াল করল একটা বাইক তার গাড়িকে ফলো করছে। বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠল।

‘দাদা, আপনি লর্ডসের দিকে চলুন। আমি ওখানেই নামব।’

‘এই তো বললেন, রানিকুঠির দিকে। আবার এখন বলছেন…’

‘সরি দাদা। হঠাৎ একটা কাজ এসে গেছে। আপনি একটু চলুন।’

ভাগ্যক্রমে একটি সিগনালে পিছনের বাইকটা আটকে পড়ে কিন্তু আঁখির ট্যাক্সিটা বেরিয়ে যায়।

***

জল খেয়ে কাচের গ্লাসটা টেবিলে রাখে স্বপ্না। নাক টেনে ধাতস্থ হয়ে বলে, ‘ছেলেটা জুনিয়র আর্টিস্ট সাপ্লাই করে টালিগঞ্জ পাড়ায়।’

‘আপনার সঙ্গে আলাপ কীভাবে?’

‘আমি একদিন মেয়েকে স্কুল থেকে দিয়ে ফিরছিলাম। তখনই আমায় ধরে। বলে ওর নাকি আমায় পছন্দ হয়েছে। একটা অভিনয়ের ব্যাপার আছে, করতে হবে। আমি তো শুনে থ। বাপের জন্মে আমি কোনওদিন অ্যাক্টিং করিনি। মনে মনে খুব ইচ্ছে ছিল প্রসেনজিতের সঙ্গে অ্যাক্টিং করব। আসলে আমাদের অলি-গলির মধ্যে মাঝেমধ্যেই দেখতাম শুটিং হত। অনেক পয়সাও পাওয়া যায় শুনেছি। একা স্বামীর রোজগারে আর কত চলে? ঘরে চারটে পেট। তাই আমিও রাজি হয়ে যাই। কিন্তু ওর পারমিশন না নিয়ে আমি তো করতে পারি না। তখন ছেলেটিই বলে, পারমিশন পরে নেবেন। আগে আপনি রোলটা পারবেন কি না সেটা দেখা হোক। সিলেক্ট হলে ছেলেটাই নাকি আমার হাজব্যান্ডের সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু আমি সাহস পাই না। রাজিও হই না। সেই সময় আমার ভাই একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসে।’

‘কী কাণ্ড?’

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে।

‘সাউথ সিটির একটি ফ্ল্যাটে গিয়ে নাকি আমার ভাই বেল বাজিয়ে কী সব বাজে কথা বলেছে। ওখানে সব বড়োলোকরা থাকে। ওরাই নাকি পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ আমার ভাইকে অ্যারেস্ট করে আমাকে ফোন করে।

‘মানে এটা আপনার ভাইয়ের সেকেন্ড কেস?’

‘হ্যাঁ। কে মোনালিসা, ও তাকে খালি খুঁজে বেড়ায়।’

‘চেনেন তাকে?’

‘কেউ থাকলে তো চিনব। ওর বউ চলে যাবার পর থেকে মাথাটা আরও খারাপ হয়ে গেছে।’

‘তারপর? পুলিশে ধরে কী করল?

স্বপ্না এবার কথাটা বলতে ইতস্তত করছে। বুঝতে পারছে না পরের কথাগুলো বলাটা ঠিক হবে কিনা। স্বয়ম্ভূ আবারও জানতে চাইল, ‘বলুন পুলিশ কী বলল?’

‘আমার হাজব্যান্ড গেল না। আমাকেও যেতে বারণ করল। কিন্তু মায়ের পেটের ভাই তো। জেলে পচবে? আমি গেলাম। পুলিশকে সব বললাম ওর অসুখের ব্যাপারে।’

‘কী অসুখ?’

‘কী যেন… সিজোফ্রেনিয়া।’

‘স্কিৎজোফ্রেনিয়া।’ শিবাঙ্গী ধরিয়ে দিল।

‘হ্যাঁ ওই। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছে খায়নি। তারপর মাসে একটা করে ইঞ্জেকশনের কথা বলেছেন কিন্তু সেটার অনেক দাম। ক্ষমতা হয়নি। শেষে পুলিশ আড়ালে নিয়ে গিয়ে সাত হাজার টাকা চাইল। নইলে ভাইকে নাকি ছাড়ানো যাবে না। যে লোকের বাড়িতে বেল দিয়ে ডিস্টার্ব করেছে তারা কোর্টে যাবে। আমি কোত্থেকে পাব টাকা? হাজব্যান্ডকে বললে, আমায় কেটে ফেলবে। বাধ্য হয়ে সৈকতকে বললাম।’

‘সৈকত?’ স্বয়ম্ভু জানতে চাইল।

‘ওই ছেলেটা, সৈকত দত্ত।’

‘বিলাস বিশ্বাস নয়?’

শিবাঙ্গী রীতিমতো অবাক।

‘না না, বিলাস কেন হবে? ওর নাম তো সৈকত দত্ত।’

নামটা শোনার পর স্বয়ম্ভু দু-বার বিড়বিড় করল। ‘কোথায় থাকে কিছু বলেছে?’

‘সোনারপুরের দিকে কোথাও একটা।’

সঙ্গে সঙ্গে টেবিল চাবড়ে ‘বুঝেছি’ বলে ওঠে স্বয়ম্ভু।

‘আপনি চেনেন?’

শিবাঙ্গী বলে। ‘তুমিও চেনো।’ স্মৃতির অতল হাতড়েও শিবাঙ্গী সৈকতকে খুঁজে পেল না। স্বয়ম্ভু চটপট নিজের মোবাইল ঘেঁটে একটা ছবি বের করে স্বপ্নাকে দেখায়। ‘এই সেই ছেলেটা তো?’ ছেলেটাকে চিনতে স্বপ্নার চোখের পাতা কুঁচকে যায়। সৈকতের গালভর্তি দাড়ি, সুন্দর করে ছাঁটা গোঁফ। গায়ের রং শ্যামলা। ছবিটা দেখেই শিবাঙ্গী চিনতে পারে। ‘বীণা সাহার প্রেমিক?’ চট করে চোখের পাতা ফেলে সম্মতি জানায় স্বয়ম্ভু। মুখে খুশির রেখা, অপরাধীর কাছাকাছি পৌঁছোনোর। কিন্তু স্বপ্নার উত্তর স্বয়ম্ভূ আর শিবাঙ্গীকে আবারও সমাধানের থেকে দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়।

‘না না, এই ছেলেটা না।

‘এ নয়?’

‘সৈকতের দাড়িটা আরও ঘন ছিল। গোঁফটাও বেশ মোটা। আর বেশ ফর্সা।’ স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী শামুকের মতো গুটিয়ে যায়।

‘সোনারপুরে থাকে, নামও সৈকত দত্ত। অথচ এ নয়?’

‘না স্যার।’

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে, ‘ছেলেটার ফোন নম্বর আছে আপনার কাছে?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু নম্বরটায় আর ফোন যায় না।’

‘দিন দেখি নম্বরটা।’

সত্যিই নম্বরটা নট রিচেবল। ‘ইমিডিয়েটলি নম্বরটার ডিটেইলস চাও।’

স্বয়ম্ভুর হুকুম হওয়া মাত্রই শিবাঙ্গী কাজ শুরু করল। সেই ফাঁকে স্বপ্না বলতে থাকল, ‘সৈকত নিজে ছুটে এল। সাত হাজার টাকা দিয়ে বাঁচাল আমার ভাইকে।’

‘সাউথ সিটির মতো অত পশ এরিয়ায় কমপ্লেক্সে ঢুকে বেল বাজিয়ে দিল সিকিউরিটি দেখল না?’

‘জানি না স্যার। আমাদের পুলিশ এটাই বলে ভয় দেখিয়েছিল।’

‘টাকা যে নিয়েছিল তার রিসিপ্ট দিয়েছিল?’

‘নাহ!’

স্বয়ম্ভু চোখ নামিয়ে শ্বাস ছাড়ল। শিবাঙ্গীও এই প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাইল না। কারণ ঘরের কোথায় কোথায় ছ্যাদা আছে সেটা একমাত্র ঘরের বাসিন্দারাই জানে।

‘আপনি সাত হাজারটা টাকা নিশ্চয়ই সৈকত দত্তকে ফেরত দিতে পারেননি।’ প্রসঙ্গ ঘোরাল শিবাঙ্গী।

‘কোত্থেকে দেব? আমি তো রোজগার করি না।’

‘সেই সুযোগটাই সৈকত দত্ত নিল। আপনাকে বাধ্য করল অডিশন দিতে।’

‘শুধু তাই নয়, আমি ওকে তিন-চারজন মেয়েও জোগাড় করে দিয়েছি। শেষে ওর পছন্দ হল মিনতিকে।

‘কেন মিনতিকে কেন?’

‘ওর মতো একটা ক্যারেক্টার আছে নাকি। মিনতিকেও সরাসরি বলেছে। ও রাজি হয়নি। অনেক টাকার লোভ দেখাল। তাতেও মিনতি রাজি হল না। কিন্তু সৈকত ছাড়ল না। মিনতির হাঁড়ির খবর জানানোর কাজটা আমার ওপরেই দেয়। মিনতি কোথায় কখন যাচ্ছে, কী করছে, কী ভাবছে। সৈকত জেনেছিল ওর বরের খুব টাকার খাঁই। সেটারই ফাঁদ পাতে সৈকত। ওর জন্যই মিনতির ওপর অত্যাচার বাড়ায় ওর স্বামী।

‘কী করে?’

কেঁদে ফেলে স্বপ্না। ‘মিনতি খুব সরল মনের মেয়ে ছিল। ওর সঙ্গে গল্প করলে ও অনেক কিছুই আমায় বলে দিত। ওর বর প্রকাশকে পড়াশুনো করাতেই চাইত না। এতে অনেক খরচ হয়ে যাচ্ছে। মদের খরচে টান পড়ছে। কিন্তু মিনতি ওর বরকে লুকিয়ে ছেলের জন্য নতুন বই, জামা সব কিনত। তারপর সেগুলোতে পুরোনো মলাট দিয়ে দিত যাতে ওর বাবা বুঝতে না পারে। স্কুল থেকে পিটির ড্রেস কিনতে বলেছিল। মিনতি খুব চিন্তায় পড়ে। সংসার থেকে টাকা সরিয়েই ছেলের ড্রেস কিনে দেয়।’

‘কিন্তু এতে সৈকতের ফাঁদ পাতার কী হল?’

‘সৈকতের বুদ্ধিতে আমি এইসব কথা মিনতির কাছ থেকে জেনে ওর বাবার কানে তুলে দিতাম। বলেছিলাম, মিনতিকে যেন না বলে। তাহলে আমি এইরকম খবর আরও দিতে পারব। ওর বাবা খুব খুশি হয়েছিল। সঙ্গে বেড়েছিল মিনতির ওপর অত্যাচারের পরিমাণ।’

‘এতে ছেলেটার লাভ কী ছিল?’

‘সৈকতের পরামর্শে আমিই মিনতিকে প্রতিদিন বলতে থাকি পুলিশের কাছে যেতে। ওর স্বামীর নামে নালিশ করতে। কিন্তু প্রতিবার ও আমায় ফিরিয়ে দেয়। ও বারবার বলত, বর হাজতে গেলে সংসার চলবে কী করে?’

‘ঠিকই তো।’

‘আমিও এই কথাই সৈকতকে বলেছিলাম। মিনতির বর জেলে গেলে ওরা তো না খেতে পেয়ে মরবে। সৈকত বলেছিল, ও এটাই চায়। টাকার টান পড়লেই মিনতি অ্যাক্টিং করতে বাধ্য হবে।’

‘মাই গড। এ ছেলে তো রীতিমতো পাগল। খেয়েদেয়ে কাজ নেই?’

স্বয়ম্ভুর তালে তাল ঠোকে শিবাঙ্গীও, ‘এ সব করে ছেলেটা কী পাচ্ছে? না টাকা চুরি করছে, না গয়নাগাটি হাতাচ্ছে। মানুষ তো একটা লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।

‘ছেলেটার অত্যাচারিত মহিলাদের ওপর অনেক রাগ।’

‘ব্যাপারটা উলটো হলে ভালো হত না। অ্যাটলিস্ট সমাজ থেকে কিছু অসুর কমত।’

স্বয়ম্ভূ স্বপ্নার মুখের সামনে এগিয়ে এল, ‘এরপর কী হল? ছেলেটা যখন কিছু পেল না। কোনও লাভই হল না তখন মিনতিকেই মেরে দিল, তাই তো?’

‘না। ওই ছেলেটা মারেনি।’

বন্ধ ঘরটার বাতাস কয়েক পল থেমে গেল। শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে কে মারল? চুপ করে থাকবেন না। রাত হয়ে গেছে কিন্তু।’ স্বয়ম্ভুর ফোন রিং হচ্ছে। কিন্তু স্বয়ম্ভু কেটে দিচ্ছে। স্বপ্না বলল, ‘সেদিন রাতে ভাইকে খেতে দিয়ে এসে শুয়েছি। ঘুম আসেনি আমার। সন্ধেবেলায় প্রতাপদা মিনতিকে অনেকক্ষণ ধরে মেরেছে। খুব কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা। লজ্জায়, অপরাধবোধে আমার ঘুম আসছিল না। হঠাৎ আমার নাম ধরে একটা ডাক শুনতে পেলাম। স্বপ্না, স্বপ্না… কোথায় তুই?’

‘কে ডাকল?’

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল।

‘মনে হল মিনতির গলা। খাটে উঠে বসে মশারি তুলে বেরোচ্ছি। আবার একটা শব্দ। গোঙানির। আমি একটু ভয় পেয়ে যাই। বরটা কি ওকে মেরে দিল? বাঁচানোর জন্য ডাকছিল আমায়। প্রথমেই আমার এটা মনে হয়। আমি খুব অল্প করে জানলা ফাঁক করে দেখি…’

শরীরের সঙ্গে স্বরও কেঁপে উঠল স্বপ্নার। ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে।

‘সাসপেন্সটা একটু কম হলে ভালো হয় স্বপ্না। কী দেখলেন বলুন।’

স্বয়ম্ভুর দিকে জল ভরা লাল চোখটা তুলে স্বপ্না বলল, ‘একটা মেয়ে। হাতে ছুরি ধরা। রক্ত পড়ছে। মিনতি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। ওর গলা দিয়ে রক্ত …

‘মেয়েটা কীরকম দেখতে? কোনও সিরিয়াল স্টারের মতো? মানে অভিনয় করে?’

‘না তো। গায়ের রং অল্প চাপা। বুক পর্যন্ত চুল। চেনা কেউ না।’

বর্ণনা না মিললেও শিবাঙ্গী স্বপ্নার মুখের সামনে অভিনেত্রী কমলিনীর ছবি ধরে। ‘না না, এনাকে তো চিনি। এ নয়। কোনও স্টার নয়।’

স্বয়ম্ভুর ফোন আবার বাজছে। পকেট থেকে বের করে রিসিভ করার আগে শিবাঙ্গীকে বলে, ‘কুন্দনকে ইমিডিয়েটলি ডেকে পাঠাও। এখানে।’

‘ওকে স্যার।’

স্বয়ম্ভূ ফোন রিসিভ করে, ‘হ্যাঁ বলো… লর্ডসের মোড়ে! ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করোনি কোথায় গেল?… তুমি ছিলে বাইকে আর ও ট্যাক্সি থেকে নেমে হাঁটল বা ছুটল… তাতেও দেখতে পেলে না?… যাই হোক… পালিয়েছে এটাই মোদ্দাকথা। ঠিক আছে।’

ফোনটা ছেড়েই স্বপ্নাকে প্রশ্ন করে স্বয়ম্ভু, ‘আচ্ছা, মিনতি আপনার নাম ধরেই ডাকল কেন? ওর স্বামী তো মারেনি। তার মানে কি আপনি মিনতির দরজায় টোকা মেরে মিনতিকে বাইরে ডেকে নিজের ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়েছিলেন? যাতে ওই মহিলার খুন করতে সুবিধে হয়?’

‘স্যার, আমি মহিলাটাকে চিনি না। আপনারা যদি না বিশ্বাস করেন আমার কিছুই করার নেই। ওই তো বললেন, সিসিটিভিতে দেখেছেন নাকি। সেখানে দেখুন না আমি আছি কিনা।’

স্বয়ম্ভু একবার শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে চোখটা নামিয়ে নেয়।

স্বপ্না প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘স্যার আমি তো সব বলেছি। এবার তো আমাকে ছাড়ুন। আমার ছেলেমেয়ে দুটো না জানি কী করছে।’ স্বয়ম্ভু ঠান্ডা চোখে তাকায়। কিছুক্ষণ নীরব থাকে। ‘ছেলেমেয়েগুলোর জন্য খুব চিন্তা হয় না? প্রকাশও তো কারও সন্তান। তাকে মাতৃহারা করে দিলেন? বাবা তো থেকেও নেই। এভাবে অনাথ করে দিলেন? মিনতিকে আপনি খুন করেননি। কিন্তু মিনতির এই পরিণতির জন্য আপনিও সমানভাবে দায়ী। সেটা কি অস্বীকার করেন?’ স্বপ্নার মুখ নীচু হয়ে যায়। কী বলবে বুঝতে পারে না। ‘আমি আমার ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে এত বড়ো ফাঁদে পড়েছি স্যার। নইলে আমার সঙ্গে মিনতির কোনও শত্রুতা ছিল না। আমি ভাবতেও পারিনি ওর এই ভয়ানক পরিনতি হবে।

‘প্রকাশের অনাথ হওয়ার দায় কার স্বপ্নাদেবী?’

স্বপ্নার মুখটা একটু যেন কঠোর হয়ে ওঠে। গলা নামিয়ে বলে, ‘পুলিশ যে বেআইনিভাবে অতগুলো টাকা হাতিয়ে নিল, তার জন্যই তো এত কিছু। তার দায় কে নেবে স্যার?’

সাধারণকে অতি সাধারণ ভেবে ফেলাটা স্বয়ম্ভুর ভুল। আইনের ঘেরাটোপে বসে আইনরক্ষকদের অপরাধগুলোকে ওভারলুক করতে হয়। চোখের সামনে এটাই দেখেছে স্বয়ম্ভু। কোনও দিন সুযোগ এলে এদেরও মুখোশ খুলবে সে। খুলবেই। কে জানে? সেদিন হয়তো তাকে আইনের পোশাকটা ছেড়ে ফেলতে হবে। স্বপ্না স্বয়ম্ভুকে চুপ করিয়ে দিয়েছে। শিবাঙ্গী বুঝতে পারে। তাই হালটা সে নিজেই ধরে নেয়, আরও কিছু জানার বাকি আছে স্বপ্না ম্যাডাম। আমরা আপনার হাজব্যান্ডকে জানিয়ে দিচ্ছি যে আপনি আমাদের কাছে নির্বিঘ্নে আছেন এবং আমরাই রাতে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব। আপনি আপাতত আমায় বলুন তো, অরণ্যবাবুর স্ত্রী আঁখি দত্ত ওরফে আঁখি চ্যাটার্জি সংসার ছেড়ে চলে গেলেন কেন?

‘সংসারটা করল কবে? সব সময়েই তো মোবাইলে কীসব বকবক করে চলেছে। ‘সে তো এখন। যখন সংসারে ছিল তখন তো নয়।’

‘কে বলেছে আপনাদের? ও মেয়ে একটা চরানে মেয়ে। আপনাকে চারপাক চরিয়ে এ হাট থেকে ও হাটে বেচে দেবে।’

‘মানে?’

‘ভাতের হাঁড়িতে ভাত পুড়ে ঝাঁ। গন্ধে ভরে গেছে সারাবাড়ি। কিন্তু সে মেয়ে ছাদে গিয়ে ফুলগাছের সঙ্গে ভিডিও করছে। ভাইটা আমার সারাদিন খেটেখুটে ফিরেছে খেতে দে তাকে, তা নয়, তখন সে ভিডিও করতে ব্যস্ত। কী নিয়ে জানেন? মেয়েদের যেসব অসুখবিসুখ করে সেসব নিয়ে। জ্ঞান দিচ্ছে। অশুচি বলে কিছু হয় না। কেন তারা ওই সময়ে পুজো করবে না এইসব। নোংরা নোংরা। ওর সম্পর্কে যত কম বলা হবে তত ভালো।’

‘আপনার ভাই তখন সুস্থ ছিলেন?’

‘তখন আমার ভাই একটা অফিসে চাকরি করত। সুস্থ না থাকলে করতে পারে?’

‘সব বুঝলাম, কিন্তু কী এমন হল যে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হল?’

‘ওইসব মেয়েরা যা করে। নিজের স্বামীকে মনে ধরে না বলে পরপুরুষের হাত ধরে ঘর ছাড়ে।’

‘সে কে? চেনেন?’

‘একবার দেখেছিলাম। গড়িয়াহাটে। নির্লজ্জের মতো ঘুরছে। আবার হাত ধরে। ‘কীরকম দেখতে?’

স্বপ্না একটু ভাবল। ‘ভালো দেখতে। ওই রূপের মোহেই তো মরে সব।’

‘ভালো মানে কীরকম ভালো?’

প্রশ্নটা করে স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীকে বসতে ইশারা করে নিজে মহিলার চারপাশে ঘুরতে থাকে।

‘ফর্সা। লম্বা। চোখে চশমা।’

‘চশমার ফ্রেমটা দেখেছিলেন? কীরকম ছিল?’

‘কোনও রং ছিল না।’

‘রিমলেস! কী করে জানেন?’

‘না। তবে ভাইকে নাকি ছেলেটির সম্পর্কে অনেক প্রশংসা করে বলত, ছেলেটা নাকি কম্পিউটারের অনেক কাজ জানে।

‘কী কাজ?’

‘অরণ্যকে অফিসের কাজে অনেক সময়েই কলকাতার নানান জায়গায় ঘুরতে হত। একদিন বাড়ি ফেরার পর আঁখি নাকি হুবহু সব বলে দিয়েছিল যে ভাই সেদিন কোথায়-কোথায় কখন গিয়েছিল, কতক্ষণ ছিল। এমনকি কোন কোন সময়ে ফোনে কথা বলেছে সেটাও।’

শিবাঙ্গীর দৃষ্টি বিস্ফারিত হয়ে যায়। স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়। দুজনের কানেই আঁখির বলা একটা শব্দ বাজতে থাকে, ‘গ্যাং… গ্যাং’! শিবাঙ্গী আয়ুষ্মানের ছবি দেখাতেই স্বপ্না লাফিয়ে ওঠে। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই ছেলেটাই তো। এর ছবি ভাইও আমায় দেখিয়েছিল। একে আপনারা চেনেন?’

‘এর বাবা আমাদেরই লালবাজারে কাজ করতেন।’

স্বপ্না ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে বলে, ‘এও পুলিশের লোক!’ শিবাঙ্গীর ফোনটা বেজে উঠল, ‘হ্যাঁ বলুন… আচ্ছা…!’ এইটুকু কথা বলেই শিবাঙ্গীর বিস্মিত দুটো চোখ স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়। খানিক নীরবতার শেষে শিবাঙ্গী বলে ওঠে, ‘হোয়াটসঅ্যাপ করেছেন? দেখছি।’ কলটা কেটেই হোয়াটসঅ্যাপ চেক করে শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভূকেও দেখায়। টেলিকম অপারেটর থেকে জানিয়েছে যে স্বপ্না যে ছেলেটিকে চিনত তার নাম সৈকত দত্ত। ঠিকানা হুবহু বীণা সাহার প্রেমিকের। লালবাজার থেকে বিজয় জানিয়েছে আধার কার্ডের নম্বর একই। ছবিটাও বীণা সাহার প্রেমিক সৈকত দত্তের। অথচ স্বপ্নার দেখা লোক এ নয়।

‘সৈকত দত্তের আধারকার্ড এই ছেলেটির হাতে পৌঁছোল কী করে?’

স্বয়ম্ভু বিড়বিড় করল। শিবাঙ্গী বলল, ‘বীণার সঙ্গে খুনির সখ্যতা ছিল বাকি কেসগুলোর মতোই। হয় বীণাই কোনও কারণে দিয়েছে। অথবা কোনও দিন যে কোনও কারণের জন্যেই হোক সৈকত দত্তের সঙ্গে খুনি মিট করে। আধার কার্ড চুরি করে অথবা কোনও ছুতোয় চায়। চুরিটাকে প্রায়োরিটি দিচ্ছি কারণ বাসনাকালী মন্দিরের ওখানে ওই মেয়েটার…!’

‘সুপ্রিয়া।’

শিবাঙ্গী মনে করিয়ে দিল।

‘কারেক্ট। সুপ্রিয়ার ফোনটা ওই ছেলেটি পকেটমারি করেছিল।’

স্বপ্নার ভাঙা রেকর্ড আবার বাজে। ‘স্যার ছেড়ে দিন না। বাড়িতে ছেলেমেয়েগুলো…!’

‘ওরা আর বাড়িতে নেই।’

আঁতকে ওঠে স্বপ্না। স্বয়ম্ভু বলে, ‘আপনার স্বামী সমেত ছেলেমেয়েদের থানাতে নিয়ে আসা হয়েছে। সসম্মানে বসিয়ে চা-জলখাবার দেওয়া হয়েছে। কুন্দন কদ্দূর দেখো তো।’ শেষ কথাটা শিবাঙ্গীর উদ্দেশে।

কুন্দন ফরেন্সিক স্কেচ আর্টিস্ট। লোকের মুখে বর্ণনা শুনে এঁকে দেয়। স্বপ্না দ্বিতীয় প্রত্যক্ষদর্শী যে খুনিকে দেখেছে। বলা ভালো, ছদ্মবেশি খুনিকে দেখেছে। আজ এসে স্বয়ম্ভুর মনে হয় মিনতি গুহ খুনের রাতে যে অটো নিয়ে এসেছিল সে সম্ভবত বিট্টু। আজ আর তার সঠিক প্রমাণ পাওয়ার উপায় নেই। কারণ বিট্টু আর নেই। অটোটারও ট্রেস পাওয়া যায়নি। ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যে কুন্দন এঁকে ফেলেছে স্বপ্নার দেখা খুনির চিত্র। যা দেখে স্বয়ম্ভু আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। চেয়ারে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে। শিবাঙ্গীরও একই দশা।

‘স্যার, ইনি পরিচিত?’

রতন প্রশ্ন করে।

‘বীণা সাহা। মিনতি গুহর মৃত্যুর আগেই সে খুন হয়ে গেছে।’

‘তাহলে এটা?’

স্বয়ম্ভু হাসল। আর কথা বলার শক্তি নেই।

‘খুনি অনেক বড়ো মাপের শিল্পী। ছবি দেখেই মুখোশ বানিয়ে ফেলছে!’

কথাটা শিবাঙ্গী বললেও কথার সুরে ঘোর অবিশ্বাসের বীজ লুকিয়ে আছে।

‘অথবা ভিক্টিমকে বসিয়ে রেখে যত্ন করে মুখের ছাঁচ বানাচ্ছে। তারপর মুখোশ।’

চেয়ারে মাথা নীচু করে বসে কথাটা বলল স্বয়ম্ভু।

‘সোমনাথ বীণা সাহার পরিচিত?’

‘জানি না। কাল সকালে ডেকেছি। বাই দ্য ওয়ে, স্বপ্না ম্যাডাম আপনারা আসতে পারেন। আর এই যে অরণ্যবাবু, দয়া করে আর কারও বাড়ি গিয়ে বেল বাজাবেন না। কারণ আপনার মোনালিসা অনেকদিন আগেই ছবি হয়ে গেছে।

গায়ে যেন চাবুকের ঘা পড়ল অরণ্যর। চমকে তাকাল।

‘লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, আপনার মোনালিসাকে ছবি করে দিয়ে গেছে। যান বাড়ি যান।’

স্বপ্না তার স্বামী, সন্তান ও ভাই অরণ্য সমেত থানা থেকে বিদায় নিচ্ছিল, তখনই স্বয়ম্ভু ডাকল, ‘স্বপ্না ম্যাডাম!’ স্বপ্নার বুকে নতুন করে ধাক্কা লাগল। আবার না জানি কী বলে!

‘বলুন।’

‘সৈকতের শরীরে মানে হাতে, পায়ে, মুখে কোনও লক্ষ্য করার মতো কিছু ছিল কী? মানে কোনও কাটা দাগ, সেলাইয়ের দাগ বা ধরুন ট্যাটুজাতীয় কিছু!’

স্বপ্না ভাবতে থাকে।

‘পঞ্চমীও কেটে গেল। কাল ষষ্ঠী। পুজোয় ক’টা জামাকাপড় হল শিবাঙ্গী?’

গাড়ির সিটে মাথাটাকে এলিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু। জানলা খোলা। সদ্য হিমপড়া বাতাস মুখে লাগছে। সামনেই শিবাঙ্গীর বাড়ি। গলি দিয়েই গাড়ি যাচ্ছে। শিবাঙ্গী জবাব দিল, ‘পুজোর বাজার করতে দিলেন কই? খুনির পেছনে তো লেলিয়ে দিলেন।’

‘কেন? কেউ দেয়নি?’

‘আদ্দামড়া ধাড়ি মেয়েকে কোন আত্মীয় পুজোয় জামা দেয় স্যার?’

‘আহ! আবার স্যার!’

বিরক্ত প্রকাশ করল। শিবাঙ্গী হাই তুলল।

‘যত খুশি হাই তুলে নাও। কাল সকাল সকাল তোমায় লাগবে।’

‘সোমনাথের জেরায়?’

‘তারও আগে। ভোরবেলা থেকে এক জায়গায় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হবে।’

‘কোথায়?’

‘সময় মতো জানিয়ে দেব।’

শিবাঙ্গী হাত উলটে ঘড়ি দেখল। রাত দশটা বাজতে চলেছে। এখনও সময় হয়নি জানানোর? ব্যাপারটা বুঝে স্বয়ম্ভুও হাসল, তবে মনে মনে। বলল, ‘আমরা যাব বলে আঁখি চ্যাটার্জি অফিস থেকে ছুটে পালিয়েছে।’

‘জানল কী করে আমরা যাব?’

‘গুড। এরপর গাঙ্গুলিবাগান থেকে সে ট্যাক্সি নিয়ে বাঘাযতীন হয়ে রানিকুঠি যাবার কানেক্টর রাস্তাটা ধরে গলফগ্রিন থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে লর্ডস চলে গেল। লর্ডসই যদি যাবে যাদবপুর হয়ে গেলেই তো শর্ট কাট হত। সেটা না করে অতটা ঘুরে বেকার ট্যাক্সিভাড়াটা কেন দিল?’

‘অন্য কোথাও যাচ্ছিল। মাঝপথে অন্য কিছু ভেবে গাড়ি ঘুরিয়েছে। আপনি তো বলছেন পালাচ্ছিল। তাহলে কি কেউ ফলো করছিল? সন্দেহ করেছে কাউকে?’

‘এক্সেলেন্ট।’

‘রানিকুঠির দিকেই তার মানে মূলত আসার উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু রানিকুঠিতে কার বাড়ি? যদ্দূর জেনেছি মেয়েটি শেষ কয়েক মাস আয়ুষ্মানের সঙ্গেই ছিল। কিন্তু ওর বাপের বাড়ি হাওড়া রামরাজাতলায়।’

‘আপনি এত খবর নিলেন কখন?’

শিবাঙ্গী আকাশ থেকে পড়ল।

‘ওই যে বাড়ি এসে গেছে তোমার। যাও। ভালো করে ঘুমোও।’

‘কী করে ঘুমোব? আপনি তো এখনও জানালেনই না কাল ভোরে কোথায় যেতে হবে। কখন আপনার মেসেজ আসবে সেই আশায় বসে থাকতে হবে।

‘আঁখি চ্যাটার্জি ওরফে আঁখি দত্ত। রানিকুঠির দিকে ওর নিরাপদ আশ্রয় কোনটা হতে পারে?’

পালটা প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু। গাড়িটা শিবাঙ্গীর বাড়ির সামনে থামল। কিন্তু শিবাঙ্গী ভাবনায় ডুবে বসে রইল। খানিক ভাবতেই চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল, ‘ইজ দ্যাট পসেবল টু?’

‘হোয়াই নট? কারও সন্দেহ হবে না। অন্য কোনও চেনা জানার বাড়িও থাকতে পারে। তবে আঁখি যেরকম ডেয়ার ডেভিল চরিত্রের তাতে এটারই বেশি সম্ভাবনা। আমি মুনশিকে বলে ব্যবস্থা করে রাখছি।’

‘ওরে বাবা আবার মুনশি? ব্যাটা কাজের কাজ কিচ্ছু করে না খালি ক্রিম খাওয়ার ধান্দা।’

‘বেশি রতন-রতন করলে রতনেরই ক্ষতি। যাও যাও বাড়ি যাও। আর শোনো, খোচরদের সঙ্গে একটু খেজুরটা জমিয়ে রেখো। একটা হোয়াটসঅ্যাপেই কাজ হয়ে যাবে।’

শিবাঙ্গী হাসল। ‘গুড নাইট!’

‘তাই যেন হয়।’

‘হবে হবে।’

মাথা নাড়িয়ে আশ্বাস দিয়ে নেমে গেল শিবাঙ্গী।

‘কাল একবার তোর মেজমাসির বাড়ি আমায় নিয়ে যাবি ভোলা?’

রাতের খাবার খেতে খেতে স্বয়ম্ভু বলে, ‘মা, আমার এখন মরার সময় নেই।’

‘ও আবার কী কথা? বেগুনভাজা নিবি একটা?’

‘না।’

টেবিলে আঁক কাটতে কাটতে সুচিত্রা বলল, ‘কদিন ধরে খুব মনটা টানছে। মেয়েটা চলে গেল বছর ঘুরতে চলল। ফোন করলেই সুমিত্রা কাঁদে। চল না ভোলা। কাল তো ষষ্ঠী। ছুটি নেই?’

‘আচ্ছা আমি কি স্কুলে পড়ি না দশটা পাঁচটা চাকরি করি যে ষষ্ঠী বলে ছুটি পাব? হাজিগাজি সিনেমা না দেখে খবর শোনো, খবর। বুঝতে পারবে কলকাতায় কী চলছে।’

‘জানি। ন্যাকা বউগুলোকে ধরে ধরে খুন করছে। ভালোই করছে।’

সবে চিকেনের টুকরোটা মুখে দিতে যাবে, মায়ের কথা শুনে দুই চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল স্বয়ম্ভুর। ‘এ সব কী বলছ তুমি? বউগুলো খুন হচ্ছে ভালো হচ্ছে?’

‘হচ্ছেই তো। এই ন্যাকা লবঙ্গলতিকাগুলোর জন্যেই তো হাড়পাজি ছেলেগুলোর

এত বাড়। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।’

‘তাই বলে খুন করবে? সাতটা মহিলাকে খুন করেছে জানো?’

‘সে তো মাথায় গন্ডগোল আছে তাই মেরে বেড়াচ্ছে। আমি হলে বউগুলোকে টেনে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ঠাস ঠাস করে চড়াতাম।

হতবাক স্বয়ম্ভু। সুচিত্রা সাধারণ এক গৃহবধূ হয়েই সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেন। তারও এত রাগ মেয়েগুলোর ওপর? তাহলে খুনির মনে কী চলে? ভাবতেই স্বয়ম্ভুর শরীর কেঁপে উঠল। অবাক হয়ে বলল, ‘তুমিও মেয়েগুলোকে মারতে চাও?’

‘চুপ করে থাকলে সারাজীবন সহ্যই করতে হবে। কেন সহ্য করব বলতে পারিস?’

‘তুমি আবার কী সহ্য করলে মা?’

‘না না, আমার কথা বলিনি। মেয়েদের কথা বলছি। ওই শার্ট প্যান্টুলুন পরে নারী স্বাধীনতার বুলি কপচালে আর ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুকফুক করে বিড়ি ফুঁকলেই স্বাধীন হওয়া যায় না। নিজের মেরুদণ্ডটা সোজা রাখতে হয়।’

স্বয়ম্ভুর তরকারি মাখা হাতটা থেমে আছে। সুচিত্রা বলতে বলতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। ‘সবসময় তোর বাবার কথা শুনে চললে আজ আর তোকে মানুষ করতে পারতাম না। সেদিন জোর না করলে আজও আমাদের আসানসোলেই পড়ে থাকতে হত।’

‘বাড়িটা খারাপ ছিল?’

‘বাড়ির মানুষগুলো একেকটা চিজ ছিল। উঠতে বসতে খোঁটা। তোর বাবার কানে বিষ ঢালা। তারপর সেই সব বিষ আমার ওপর উগরে দিত মানুষটা। আমি যেন ডাস্টবিন! তখন যদি জেদ ধরে সব সম্পক্কো ঘুচিয়ে বেরিয়ে না আসতাম তাহলে আজকের এই বাড়িঘর কিচ্ছু হত না। তোকেও পেতাম না।’

‘কেন? আমায় পেতে না কেন?’

স্বয়ম্ভু প্রশ্নটা করতেই সুচিত্রা বলে, ‘ছাড় তো। যত সব পুরোনো কাসুন্দি। অনেক রাত হয়েছে। খেয়ে শুতে যা। কতদিন ঠিক করে ঘুমোসনি।’ টেবিল থেকে উঠে রান্নাঘরে চলে যাচ্ছিল সুচিত্রা। হঠাৎ ফিরে এল, বলল, ‘হ্যাঁ রে ভোলা, ওই খুনিকে যদি ধরা ত পারিস তাহলে কি ফাঁসি দিবি?’

‘আমি ফাঁসি দেবার কে? আদালত দিতে পারে।’

‘তুই তো কেসটা সাজাবি। খবরেই বলছিল, প্রত্যেকটা থানায় নাকি হুহু করে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেস জমা পড়ছে। কেসটা সাজাবার সময় এটাও উল্লেখ করিস কিন্তু।’

‘কোনটা?’

‘এই যে খুনিটা সাতটা মেয়ের প্রাণ নিয়ে সত্তরটা মেয়ের মেরুদণ্ডের জোর বাড়িয়ে দিয়েছে। আজ তারা সাহস করে স্বামীর বিরুদ্ধে মুখ খুলছে। একটা প্রতিবাদ তো করছে। চুপ করে বসে আছিস কেন? খেয়ে শুতে যা।’

ছেলে কোনও এক অথৈ ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিল বলে শেষ পাতে সেই মাতৃসুলভ খ্যাচখ্যাচানির লঙ্কাটা ঘষে দিল সুচিত্রা। মাকে ভীষণ অচেনা লাগছে স্বয়ম্ভুর। দিনরাত ভোলা-ভোলা করে মাথা খাওয়া মানুষটা যে এত গভীরে ভাবতে পারে তা কোনওদিনও জানা হয়নি স্বয়ম্ভুর। একটা অপরাধী তার অপরাধ দিয়ে এভাবেই কি সবাইকে জাগিয়ে দিচ্ছে? একেই বোধহয় বলে, বিষে বিষে বিষক্ষয়।

কোত্থেকে যেন একটা সুর বেজে উঠেছে। ঝটকা লাগল স্বয়ম্ভুর। ফ্রিজে খাবার তুলতে তুলতে সুচিত্রা বিরক্তি প্রকাশ করল, ‘উফ! শান্তি মতো খাবার জো নেই।’

‘হ্যাঁ, কী খবর?’

কলটা রিসিভ করতেই হল স্বয়ম্ভূকে। ‘পেয়েছ?… আচ্ছা… কার নম্বর কিছু বুঝেছ?… সৈকত দত্ত?… তুমি ঠিক দেখেছ?… ও টেলিকম থেকেই… থ্যাংক ইউ… একটা কথা… পাঁচ কান যেন না হয়।’

ফোনটা রেখে দিয়েই মাংসের গ্রেভি মাখা আঙুলগুলো চেটে চেটে পরিষ্কার করে নিল স্বয়ম্ভু।

ষষ্ঠীর ভোর। আর কিছু দণ্ড পরেই কলাবউ স্নানে যাবে। কিন্তু স্নানে যাবার আগেই তাকে ধরতে হবে। বার দশেক কলিংবেল বাজানোর পর ভিতর থেকে ছিটকিনি খোলার শব্দ হল। অরণ্যই দরজা খুলল। গেটের বাইরে শিবাঙ্গী, সুরঞ্জন মুনশি ও একরাশ পুলিশ দেখেই চোখমুখের হাল বদলে গেল।

‘সরি অরণ্যবাবু, সক্কাল সক্কাল ডিস্টার্ব করার জন্য। তবে ঘুম যে ভাঙাইনি তা আপনার চোখ দেখেই বুঝতে পারছি। কাল সারা রাত ঘুমোননি তো?’ শিবাঙ্গী বলল।

‘কেন? ঘুমোব না কেন?’

‘ঘুমিয়েছেন? বাহ! আমরা ভাবলাম কাল অতক্ষণ থানায় বসিয়ে রাখা হয়েছিল বলে বোধহয় ভয়ে পেয়ে রাতে জেগে থাকবেন। যাই হোক, গেটের তালাটা খুলুন। আমরা একবার বাড়িটা সার্চ করব।’

‘সার্চ কেন?’

‘গেটটা খুলুন বলছি।’

‘দেরি কেন করছেন। খুলুন খুলুন। আমাদের সময় নেই।’ মুনশির সামনে দাঁড়িয়ে শিবাঙ্গী হুকুম চালাবে এ কেমন কথা? তাই মুনশিও খানিক হম্বিতম্বি করে উঠল।

‘কী চান আপনারা? আমার বাড়িতে কী আছে?’

‘আপনার বাড়ি…’

মুনশি সবে গলা চড়াচ্ছিল। শিবাঙ্গী হাত তুলে থামিয়ে দিল। তারপর কোমর থেকে রিভলভার বের করে বলল, ‘এটার একটা গুলি খরচা করলেই গেটের তালাটা কিন্তু ভেঙে যাবে। তাতে কী হবে বলুন তো? পাড়ার লোক জড়ো হয়ে যাবে। লোকে আপনাকে সন্দেহ করবে। আপনাকে পাড়া ছাড়াও করতে পারে। সেটা কি ভালো হবে? তার চেয়ে গেটটা খুলে দিন না। আমরা তো চোর-ডাকাত নই যে সব চুরি করে নিয়ে পালাব। খুলুন গেটটা।

‘কী হল খুলবেন না ভাঙব?’

মুনশি আবার তড়পাল। শিবাঙ্গীর এক ঘাট ওপর দিয়ে ওঁকে যেতেই হবে। অরণ্য ভিতরে ঢুকে গেল। শিবাঙ্গীও গেটের সামনে থেকে সরে পাশের সরু গলিটা দিয়ে এক্কেবারে বাড়ির পিছন দরজার সামনে গিয়ে হাজির হল। সঙ্গে সঙ্গে খুটখাট শব্দ ভিতরে। কড়া না নাড়তেই দরজাটাও খুলে গেল। সামনের মানুষটাকে দেখে শিবাঙ্গী এক গাল হাসল। ‘থ্যাংক ইউ মোনালিসা। বাড়িটা সার্চ করে আর সময় নষ্ট করতে হল না। কলাবউ ক্যাচ কট কট!’

‘জানি আপনার শুটিংয়ে ব্যাঘাত হল। তবু আমরা নিরুপায় সোমনাথবাবু।’ বিনয়ের সঙ্গে বলল স্বয়ম্ভু।

‘এ জন্মে সজ্ঞানে তো কোনও পাপ করিনি। কিন্তু গতজন্মে নিশ্চয়ই কোনও পাপ করেছিলাম। নইলে আমাকেও পুলিশ জেরা করার সুযোগ পায়!’

‘আমরা এত নিকৃষ্ট নই স্যার। আপনি হয়তো জাতীয় সম্মান পেতে পারেন, কিন্তু আমাদের কাজটাও কিন্তু সম্মানের। তাই নরকে চলে এসেছেন এটা ভাবাটা একটু বাড়াবাড়ি নয় কি?’

‘অবশ্যই বাড়াবাড়ি নয়। কোনও প্রমাণ ছাড়া, কারণ ছাড়া, আমাকে এভাবে ধরে আনাটা আপনাদের বাড়াবাড়ি?’ এক রাশ ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলল আঁখি।

মুখের সামনে চোখে চোখ রেখে বসে আছে শিবাঙ্গী। লালবাজারের একটা ঘরে স্বয়ম্ভু সোমনাথকে নিয়ে আর অন্য ঘরে শিবাঙ্গীর মুখোমুখি আঁখি চ্যাটার্জি।

‘কী অদ্ভুত না! আপনি কারণ শব্দটা পরে বলে প্রমাণ শব্দটাকে আগে বসালেন। কারণ সাবকনশাস মাইন্ডে আপনার এটাই চলছে আমরা আপনার বিরুদ্ধে কী প্ৰমাণ পেয়েছি? আদৌ কি পেয়েছি? অর্থাৎ কিছু একটা প্রমাণ পাওয়ার কেস আছে। তাই না মিসেস আঁখি দত্ত? উপস, সরি। আপনি তো আবার চ্যাটার্জি ইউজ করেন।’

‘কথার জাল বুনে আঁখি চ্যাটার্জিকে টলানো যাবে না।’ বেশ দৃঢ়স্বরে জানাল আঁখি।

‘এতই যখন কনফিডেন্স তখন চোরের মতো পিছন দরজা দিয়ে পালাচ্ছিলেন কেন সেটাই বলুন না।’ শিবাঙ্গীর স্বর মুদারা থেকে তারার দিকে ধাবমান।

‘ভয়ে।’

‘ভয়ে! কেন?’

‘আয়ুষ্মানের মতো আমাকেও যদি আপনারা খুন করে দেন।’

‘আপনার মনে হয় স্যার, আমি খুন করতে পারি?’ সোমনাথ অত্যন্ত নরম স্বরে প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় স্বয়ম্ভুর দিকে।

‘না মনে হওয়ার কারণ? আপনার বয়স নাকি স্টেটাস?’

‘সবটাই। মানুষকে দেখে তো বোঝা যায়!’

‘যায় না সোমনাথবাবু। তাহলে খুনিকে দেখেও খুনি মনে হত। যাই হোক, আপনার তৈরি প্রস্থেটিক মাস্কে যে আঁচড়ের দাগ পাওয়া গেছে সেটা গত পরশু রাতে খুন হওয়া রুনু লাহার নখের আঁচড়। ভিক্টিমের নখে লেগে থাকা সিলিকনের টুকরো আর আপনার তৈরি মাস্কের মেটেরিয়াল হুবহু এক। ইনফ্যাক্ট আপনার তৈরি মাস্কটায় রুনুর নেইল পলিশের দাগ। সম্ভবত মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেই উনি নেইল পলিশ লাগিয়েছিলেন। তাই ভালো করে শুকোয়নি।’

সোমনাথ হাঁ করে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। কথা বলার শক্তি হারিয়েছে যেন।

‘কীভাবে সম্ভব হল সোমনাথবাবু?’

‘অসম্ভবের কী আছে?’ ভুরু কুঁচকে পালটা প্রশ্ন করল আঁখি।

‘কিছু নেই বলছেন?’ শিবাঙ্গীর কোয়্যারি।

‘না। আমি অরণ্যকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। ডিভোর্স দিয়েছিলাম কি? আমাদের বিয়েটা কিন্তু আইনত আজও বৈধ। তাই আমি কেন স্বামীর বাড়িতে চলে এসেছি সেটার উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।’

শিবাঙ্গী বুঝল, এ মেয়ে বড়ো কঠিন ঠাঁই। সহজে গলবে না। ‘অরণ্যবাবুকে ছেড়ে কেন গিয়েছিলেন? আশা করি এটা আপনি বলবেন!

‘আমি ভ্লগিং করতাম। কিন্তু অরণ্য আর অরণ্যর ফ্যামিলি সেটা পছন্দ করত না।’

‘ফ্যামিলি মানে?’

‘অরণ্যর দিদি। সবসময় ভাইয়ের কানে বিষ ঢালত। নিজের সংসার ফেলে আমার সংসারে নাক গলাত। কিছু বললেই বলত, আমি তোমাদের ভালো চাই। এই ভালোর চাওয়ার চক্করে আমার জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। অরণ্যও কেমন যেন মালিকের মতো ব্যবহার করতে শুরু করল আমার সঙ্গে। আমি লেখাপড়া জানা মেয়ে। কারও পায়ের তলায় কেন থাকব? প্রতিদিন আমার ফলোয়ার বাড়ছিল। লাইক শেয়ার সব হুহু করে বেড়ে যাচ্ছিল। মনিটাইজেশনও চালু হয়ে গিয়েছিল। একদিন দেখলাম আমার একটা প্রোফাইলও আর নেই। বিশ্বাস করে অরণ্যকে আমার আই ডি, পাসওয়ার্ড দিয়েছিলাম অনেক আগে। ও সেটাই কাজে লাগাল। আমি গেলাম খেপে। আমার তিলে তিলে গড়ে তোলা জায়গাটা এক নিমেষে ধ্বংস করে দিল অরণ্য। কিন্তু এতে ওর ওপর যত না রাগ হল তার থেকে শতগুণ বেশি রাগ হল দিদির ওপর। দিদির প্ররোচনাতেই অরণ্য এই কাজটা করে। নইলে এইসব ভ্লগিং করার কথা তো অরণ্যই আমায় বলেছিল।’

‘তাই চলে গেলেন?’

‘প্রোফাইল ফেরত পেতে আমি পাগল হয়ে যাই। নানান টেকনিক্যাল লোকের কাছে ছুটতে ছুটতে আয়ুষ্মানের কাছে গিয়ে পৌঁছোই। ওই আমায় আমার পুরোনো প্রোফাইলটা রিট্রিভ করে দেয়।’

‘ডিলিট হয়ে যাওয়া প্রোফাইল রিট্রিভ করে দিল?’

‘অরণ্য ডিলিট করতে পারেনি। ও এ সবে ভীষণ কাঁচা। ডিঅ্যাক্টিভেট করে কোনওভাবে ব্লক-টক কিছু একটা করে ফেলেছিল। আয়ুষ্মানই সব করে দেয়।’

সঙ্গে সঙ্গে শিবাঙ্গী বলল, ‘সঙ্গে আপনার মনটাও চুরি করে নেয়।’

‘চুরি? আমার বাড়ি থেকে কে চুরি করবে? আর চুরি করে খুন করল, তারপর আবার ফিরিয়ে দিয়ে গেল? একি ভোজবাজি নাকি?’ সোমনাথ বেশ জোর গলায় বলেন।

‘সেটাই তো আমরা জানতে চাইছি।’

‘আমি জানি না। বিশ্বাস করুন।’

‘আপনার বাড়িতে কাজের লোক কজন আছে?’

‘একজন।’

‘কী কী কাজ করে সে?’

‘ঘর ঝাঁট দেওয়া, মোছা।’

‘আর রান্না?’

‘আমিই করি। একটা তরকারি আর ভাত।’

‘কাজ করে রান্না করার সময় পান?’

‘কাজটা যেমন নেসেসারি তেমনি খাওয়াটাও, তাই হয়ে যায়।’

‘আপনি যখন বাড়ি থাকেন না তখন কি কাজের লোকের ছুটি নাকি সে এসে কাজ করে দিয়ে যায়?’

‘মাঝে মাঝে করে।’

‘তার মানে কাজের লোকের কাছে চাবি থাকে?’

‘সবসময় থাকে না। মাঝেমধ্যে। শুনুন স্যার, আমার কাজের মেয়েটি আজকের নয়। শেষ দশ বচ্ছর ধরে কাজ করছে।’

‘মেয়ে?’

‘নাজমা। যেমন নিজে পরিষ্কার তেমনি আমার বাড়িঘর ঝকঝকে তকতকে করে রাখে। আমি যদি কোথাও ভুলবশত বিন্দুমাত্র নোংরা করে ফেলি, হয়েই যায়। আসলে নানারকম মেটেরিয়াল নিয়ে কাজ তো কোথায় কী পড়ছে খেয়াল থাকে না। ওই নাজমা একেবারে ঝেড়েপুছে সাফ করে রাখে। বড়ো অভাবী মেয়ে। মেয়ের ঘরের দুই নাতিকে ওই-ই বড়ো করছে। মেয়ের বরটা অন্য মেয়েকে নিয়ে ভেগে গেছে।’

‘নাজমার বয়স?’

‘এই রে। এক্স্যাক্ট তো জানি না। তবে ওই কত হবে? বছর বিয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ!’

ঘরের দরজা খোলার শব্দ হতেই স্বয়ম্ভুর চোখটা সোমনাথের ওপর থেকে দরজার দিকে যায়। হাতে একটা মোবাইল নিয়ে কৌশিক ঢুকে আসে। ‘স্যার, অনেকক্ষণ থেকে নাজমা বলে কেউ ওনাকে ফোন করছে। প্রায় দশ-বারোবার কল করেছে। আবার এখন!’

‘রিসিভ করেছ?’

‘না স্যার।’

সোমনাথ একটু বিচলিত হয়ে পড়ে। ‘স্যার একটু ধরে নিই স্যার, ও এতবার ফোন করছে মানে নিশ্চয়ই কোনও বিপদে পড়েছে।’

‘ফোনটা স্পিকারে দাও।’

স্বয়ম্ভুর কথামতো কৌশিক ফোনটা রিসিভ করে সোমনাথের মুখের সামনে ধরল। ইশারায় কথা বলতে বলল।

‘হ্যালো… নাজমা বলো কিছু হয়েছে?’

‘দাদাবাবু গোওওও… সব আমার দোষ গো দাদা, আমার জন্যি পুলিশ তমায় ধরিসে।’

‘মানে? তুই কোথায়? তুই কী করে জানলি?’

‘আমি কেন? মহল্লার সব্বাই জানে তো। খবরে তো বলতিসে। অয় ছেঁড়া মুখোশের জন্যি তমায় নাকি ধরিসে।’

স্বয়ম্ভুর মাথায় বাজ। এই খবরটাও লিক হয়েছে? কড়া চোখে কৌশিকের দিকে তাকাতেই কৌশিক নীরবে ঘাড় নাড়ে। সে কিছুই জানে না। নাজমা বেশ উচ্চস্বরে বলে চলেছে, ‘পুলিশকে বলো না দাদা, তুমি কিছু করনি গো। তুমি তো যত্ন করেই রেকিসিলে। আমিই যত নষ্টের গোড়া। হিরোইন হবার শখ হইসিল।

‘নাজমা, খোলসা করে বল। তুই কী করেছিস?’

‘সেদিন ঘর পোস্কার কত্তি কত্তি ওই অ্যারিনার মুখোশটা দেখি আমার এত লোভ হল কী বলব! ভেবেসিলাম আমারেও বুজি অ্যারিনার মতো সোন্দর দেখাবে। তাই আমিই ওই মুখোশটা মুখে পরে দ্যাকসিলুম। তখনই বেল বাজল। ভাবলুম তুমি বোধয় ফিরে এলে। তাই হুটোপাটি করি খোলবার জন্যি গাল ধরে টান মেরিছিলুম। বুসতে পারিনি গো দাদা, অমন করি ছিঁড়ি যাবে। আমার জন্যি, সব আমার জন্যি। দাদা গো, অই মুখশটার দাম আমার মাইনে থেকি কেটে লিও। তুমি পুলিশকে বলো না গো তোমায় ছেড়ি দিতি। আমি পুলিশকে বললি অরা কি আমায় ধোরে লি যাবে?’

সোমনাথ কপাল চাপড়ে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়। স্বয়ম্ভু চুপ।

‘দাদা গো কতা বলতিসো না কেন?’

‘কেউ তোকে ধরবে না। নিশ্চিন্তে থাক। রাখ এখন।’

‘তুমি পুলিশকে আমার নামে বলি দাও দাদা।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, তুই ছাড়।’

ফোনটা কেটে দেয় কৌশিক। ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাসে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

ছেড়ে দেব তো নিশ্চয়ই। তার আগে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর চাই আঁখি।’

‘আর কী?’

‘আয়ুষ্মান কাজ কী করত? মানে সোর্স অফ ইনকাম?’

‘ফ্রিল্যান্স। সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার সংক্রান্তই।

‘মাসে কত রোজগার ছিল?’

‘বলতে পারব না।’

‘অ্যাহ! এই তো বাজে কথা বলছেন।’

‘বাজে আমি বকি না। আমি সত্যিই জানি না।’

‘আয়ুষ্মান দু-নম্বরি কাজ করত সেটা জানেন নিশ্চয়ই?’

আঁখি খানিক চুপ থেকে বলে, ‘নাহ! ও আমায় বলেছিল জীবনের সেরা কাজটা এবার ও পেয়েছে। যার জন্য ও নাকি এতদিন এতকিছু শিখেছে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী কাজ? ও বলেছিল, আগে হোক। তারপর বলব।’

‘উনি যখন খিদিরপুরের ওই কারখানায় তখন আপনি কোথায় ছিলেন?’

‘বললে বিশ্বাস করবেন তো? তার চেয়ে ভালো নয় কি আমার লোকেশন ট্রেস করে দেখে নিন।’

‘বড্ড চালাক আপনি। খুব ভালো করেই জানেন যে আপনার সিম কার্ডের কোনও ট্রেস নেই তাই লোকেশন ট্র্যাক করাটাও চাপের। আচ্ছা, আপনি লর্ডসের মোড়ে নেমে সিমটা ফেলে দিলেন কেন?’

‘আপনারা কুড়িয়ে পেয়েছেন তো। তাহলেই হল?’

‘আমরা কুড়িয়ে পেয়েছি মানে?’

‘ও পাননি? তাহলে এত শিওর হয়ে বলছেন কী করে যে আমি লর্ডসের মোড়েই সিম ফেলেছি।’

হাতের রুলটা সশব্দে টেবিলের ওপর চাপড়ে মেজাজ দেখিয়ে উঠল শিবাঙ্গী, ‘পালাচ্ছিলেন কেন অফিস থেকে? জানলেন কী করে আমরা যাব?’ শিবাঙ্গীর মেজাজ হারানোয় আঁখির বেশ আমোদ হল। হা হা করে হেসে উঠল। ‘আপনি কী করে জানলেন যে আমি জানতে পেরেছিলাম পুলিশ আসবে?’

‘আমরা প্রশ্ন করব আপনি নন।’

‘আমি জানতাম না। জানলে বেরোতাম না।’

‘মিথ্যে কথা। অফিসে থাকাকালীন আপনার ফোনে বিশেষ কেউ কল করে জানায় যে পুলিশের লোক যাবে। তাই মুখের চিলি চিকেন-চাউমিন ফেলে পালিয়ে যান। আবার অফিসে বলে যান পার্সোনাল কাজে কলকাতার বাইরে গেছেন। কেন? কী এমন কাজ পড়ল যে কলকাতার বাইরে যাবার ঢপটা দিতে হল? কী ভেবেছিলেন? পুলিশ মাথা থেকে মগজটাকে খুলে ঘুরে বেড়ায়? যত বুদ্ধি আপনার ঘটে!’

‘শুরুতেই বললাম তো, প্রাণের ভয়ে।’

আঁখি নয়, এবারে যেন আঁখির গলায় অন্য কোনও মানুষ কথা বলল। শিবাঙ্গী এক্কেবারে আঁখির মুখের কাছে মুখ এনে ফিশফিশ করে প্রশ্ন করে, ‘মঞ্জু, বিট্টু, আয়ুষ্মান, খুনির এই তিনসঙ্গী। কিন্তু আপনি চারজনের কথা বলেছেন। চার নম্বরটা কে আঁখি? আপনি নাকি আরও একজন অন্য কেউ?’

‘কো… কোথায় বলেছি?’

‘বাহ রে বাহ! প্রেসমিটে নিজেই বলে নিজেই ভুলে গেলেন?’

‘আপনারা পারেনও। ওটা কথার কথা!

‘আপনি যদি এতই ধোয়া তুলসীপাতা হন তাহলে তড়িঘড়ি সিম খুলে ফেললেন কেন? কেন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে রানিকুঠি বলে লর্ডস যেতে বললেন? প্রাণের ভয়ে? সরি, আপনাকে এতটাও গাড়ল ভাবতে পারছি না যে বিশ্বাস করতে হবে আপনি পুলিশকে সুপারি কিলার ভাবেন।’

আঁখি ক্লান্ত শ্বাস ফেলে। ‘কী চান আপনারা? কোনও কিছুই তো লুকোইনি আপনাদের থেকে?’

‘আপনাকে কে ফোন করে খবর দেয় যে আমরা যাচ্ছি? খুন হলেই আপনি কীভাবে খবর পেয়ে স্পটে পৌঁছে যান? আমরা মিডিয়া। অন্যান্যরা যেভাবে খবর পেয়ে যায় আমিও সেভাবে এ সব গল্প দেবেন না প্লিজ। এতই যদি আপনাদের সোর্স থাকত তাহলে সাপ্তাহিক প্রভাকর অনেক আগেই দৈনিক প্রভাকর হয়ে যেত।’

‘আপনি যে আপনার বসের যোগ্য সহকারী সে ভালোই বুঝতে পারছি। বস যেভাবে আমাদের ছোটো বলে অপমান করেছিল আপনিও সেভাবেই… আচ্ছা আপনাদের প্রবলেমটা কোথায়? আমরা ছোটো, ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র হয়েও আপনাদের থেকে এগিয়ে যাচ্ছি বলে জ্বালা ধরছে? আঁতে লাগছে না? ভাবতেই পারছেন না আমরা এত ইনফরমেশন কীভাবে জোগাড় করে ফেলছি।’

‘ধরে নিন তাই। জানছেন কী করে?’

‘আরও মিডিয়া তো একই খবর করছে। তাদেরকে ধরেছেন কী?’

‘শুরুটা আপনাকেই দিয়ে হচ্ছে।’

আঁখি হাসল। ‘ধন্যবাদ শিবাঙ্গী ম্যাডাম। এত অপমানের পরেও অন্তত নিজে মুখে স্বীকার করলেন যে আমরা ছোটো হয়েও একটা কিছুর কাণ্ডারী। ইস, এটা যদি রেকর্ড করে রাখতে পারতাম।’

‘ফালতু সময় নষ্ট করছেন। উত্তরটা দিন।

‘একটাই উত্তর, দাবানলের জন্য একটাই স্ফুলিঙ্গ যথেষ্ট আর আমি সেটাই করেছি। অজস্র মেয়েদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আমিটাকে জাগিয়ে তুলেছি। শুধু একটা কথায়, এই পুজোতে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার মেয়েরা খুন হবে। কারও পুজো নিরাপদে কাটবে না। দেখুন, থানায় থানায় কত কেস জমা পড়ছে। একটা সময় লক আপগুলো আসামিদের আর জায়গাই দিতে পারবে না।

‘প্রশ্নটা মোটিভ নিয়ে নয়, মোডাস অপারেন্ডি নিয়ে। মানুষের ভালো করতে গেলে খুন করতে হবে এটাই একটা ক্রিমিনাল মনোবৃত্তি।’

‘ঠেলে যখন মানুষের ঘুম ভাঙানো যায় না, তখন তাকে ধাক্কা দিতে হয়। আর ধাক্কা দিয়ে না হলে মেরে ঘুম ভাঙাতে হয়।’

‘এই তো, আস্তিনের সাপ ধীরে ধীরে বেরোচ্ছে। আপনি যে খুনির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন আপনার কথাতেই তার প্রমাণ। খুনিটা কে? বলে ফেলুন। শাস্তি কিছুটা কম হলেও হতে পারে।

‘ক্রিমিনাল ধরা আপনাদের কাজ। রিপোর্টাররা শুধু তথ্য জোগাড় করে প্রশ্ন করতে পারে। তবু প্রশ্নটা যখন করলেন, তখন খুলেই বলি। আমি সত্যিই খুনিকে চিনি না। মানুষ মারাকে সমর্থনও করি না।’

‘তাহলে কী চান?’

‘আপনাদের সর্বনাশ!

‘মানে?’

‘আয়ুষ্মানের বাবাকে পুলিশ ক্ষমা করেনি। তাই তাকে মরতে হয়েছিল। আর আয়ুষ্মানকে গ্রেপ্তার না করে আপনারা, না না, আপনি, আপনি মেরেই ফেললেন? শুধুমাত্র আপনার বসকে বাঁচাতে? পায়ে গুলি করতে পারতেন। হাতে গুলি করতে পারতেন। তা না করে একেবারে ব… বুকে!’

আঁখির চোখে আগুন। তবু দু-ফোঁটা জল চলকে উঠল। শিবাঙ্গীর কাছে জবাব নেই। কারণ সত্যিই তো ওর চোখের সামনে সেই অন্ধকার কারখানাতে একটাই আলো জ্বলছিল। স্বয়ম্ভু সেন। সেই আলোকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্ধকারটাকে এক্কেবারে নির্মূল করতে চেয়েছিল। যেন ভবিষ্যতে এক বিন্দু আঁধারও তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে।

‘বুঝেছি, আপনি ভালো মানুষের মতো উত্তর দেবেন না।’

‘ক্যামেরা তো বসানো আছে। রেকর্ডিংও হচ্ছে। সবাইকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করুন তো, আমি আপনার কোন কথার উত্তরটা দিইনি? সব দিয়েছি। এখন আপনি যদি না নিতে পারেন সেটা আপনার ফেইলিওর।

‘এই ক্যামেরাতেই আপনি স্বীকার করেছেন আপনি পুলিশের ক্ষতি করতে চান। এর জন্যেই কিন্তু আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পারি।

‘বেশ তো। আমি তো আপত্তি করিনি। সত্যি বলার জন্য, পুলিশের কাজে ছ্যাঁদা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আপনি যদি আমায় গ্রেপ্তার করেন করুন। আমার অফিস থেকে খোঁজ করে সব ঠিক জানবে। তারপরে আবার একটা খবর বেরোবে, পুলিশের ব্যর্থতা সকলের সামনে নিয়ে আসার জন্য সাপ্তাহিক প্রভাকরের সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। রাঘব বোয়াল খবরের চ্যানেল আর কাগজগুলোকে আমাদের গেলার জন্য মুখিয়েই আছে। তারাও খবর করবে। বুঝতে পারছেন, আমাদের কাগজ কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে যাবে? প্লিজ শিবাঙ্গী ম্যাডাম, আমায় অ্যারেস্ট করুন। আমি এটাই চেয়েছিলাম বিশ্বাস করুন। কিছু একটা করে খবরে আসতে। লোকে আমায় জানবে, চিনবে। যে যা খুশি বলে বলুন, আমি যে রাঘব বোয়ালদের মাঝে দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় প্রশ্ন করেছিলাম প্রশাসনকে সেটা তো হাইলাইটেড হবে। কেউ করুক না করুক সাপ্তাহিক প্রভাকর করবেই। প্লিজ ম্যাডাম, আমায় অ্যারেস্ট করুন।’

শিবাঙ্গী ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কাচের উলটোদিক থেকে স্বয়ম্ভু দেখছিল সবকিছু। হেডফোনে শুনছিল সব কথোপকথন। সেই ঘরেই ঢুকে পড়ল শিবাঙ্গী। ‘স্যার, ভালো কথায় কাজ হওয়ার নয়। এমন কথার প্যাঁচ আমিও যে পালটা দেব সুযোগই পাচ্ছি না।’

‘দরকার নেই। ছেড়ে খেলো। আঁখির প্রতিটা পদক্ষেপ নজরে রাখো।’

‘ছেড়ে দেব?’

‘দেখো শিবাঙ্গী, মেরেধরে হুমকি দিয়ে সবসময় সঠিক তথ্য বের করা যায় না। সে ভয় পেয়ে এমন কিছু বলতেই পারে, স্পেশ্যালি এইরকম ডেয়ার ডেভিল মহিলা, যাতে আমাদের কেসটা আরও লেন্দি হয়ে যায়। নিজেই তো দেখলে কীভাবে গোল গোল করে ঘুরিয়ে যাচ্ছে। সবথেকে ভালো পন্থা, ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। কারণ সময় আর পর্যবেক্ষণ আমাদের হাতে এক্কেবারে হাতেনাতে ধরার মতো জিনিস তুলে দেবে বলেই আমার বিশ্বাস।

কৌশিক উশখুশ করছিল কিছু বলবে বলে। ভাবগতিক বুঝে স্বয়ম্ভুই বলে উঠল, ‘বলো কৌশিক, কিছু বলতে চাও?’ আবার মন পড়ে ফেলেছে স্বয়ম্ভু সেন। আচমকা ধেয়ে যাওয়া প্রশ্ন সামলাতে একটু হকচকিয়ে উপস্থিত মুখগুলোর দিকে একবার করে তাকিয়ে নিল সে। ‘দ্বিধার কারণ নেই কৌশিক। প্রশ্ন করার অধিকার সবার আছে।’

‘বলছিলাম স্যার, শুরু থেকেই তো ছেড়ে খেললেন। তাতে বিট্টু হাতে এল না। খুনিও ধরা পড়ল না।’

‘ঠিক বলেছ। পাশাপাশি এটাও ঠিক, আমাদের প্রতিপক্ষ যত আমাদের ব্যর্থতা দেখবে তত তারা ওভার কনফিডেন্স হয়ে ভুল স্টেপ নেবে। আর সেই লুপ হোলগুলোই আমাদের শকুনের মতো নজর করে এগোতে হবে। একটু ভরসা রাখো। কাজ দেবে।’

মাথা নাড়ল কৌশিক।

ডক্টরের পারমিশন নিয়েই পেশেন্টের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে স্বয়ম্ভু। এই সময় ভিজিটিং আওয়ার শেষ। কিন্তু গোয়েন্দার জন্য বিশেষ ছাড়। তবে পাশে ডক্টর ব্যানার্জি নিজে দাঁড়িয়ে

‘রাজীববাবু… ও রাজীববাবু…’

ডক্টর ব্যানার্জির ডাকে বছর আটচল্লিশের রাজীব চোখ খুললেন। মুখে অক্সিজেন মাস্ক। ‘ইনি স্বয়ম্ভু সেন। লালবাজার থেকে এসেছেন। আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করবেন।’ লালবাজার শব্দটা রাজীবের অসুস্থ মুখে বেশ কয়েকটা ভাঁজ ফেলে দিল। তাই স্বয়ম্ভুই হাল ধরল, ‘ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। আমি বেশি কিছু জিজ্ঞেস করব না। আপনি যতটা পারবেন উত্তর দেবেন।’ কিছুক্ষণের বিরতি। রাজীব ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে দেখে স্বয়ম্ভূ প্রশ্ন করে, ‘মঞ্জুকে কে মারল? আপনি তো দেখেছিলেন?’ স্বয়ম্ভুর চোখ থেকে রাজীবের চোখটা সরে গেল। তারপর বন্ধ হল চোখের পাতা।

‘রাজীববাবু, এড়িয়ে গেলে আপনারই বিপদ। ওখানে আপনার ছেলে, স্ত্রী সবাই থাকে। খুনি কিন্তু আমাদের চারপাশেই ঘুরছে। প্লিজ সাহায্য করুন।’

রাজীব চোখ খুলল। দু-চোখে অপরিসীম আতঙ্ক। প্যারামনিটরে হৃদয়রেখায় অত্যধিক কম্পন।

‘আপনি যেটুকু পারেন বলুন রাজীববাবু।’

ডক্টর ব্যানার্জির চোখ একবার প্যারামনিটর ফলো করছে, আরেকবার রাজীবের দিকে তাকাচ্ছে। রাজীব ভয়ার্ত দৃষ্টি নিয়ে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়।

‘ধীরে ধীরে বলুন রাজীববাবু। চাপ নেবার কিছু নেই।’

স্বয়ম্ভু আশ্বাস দেয়।

‘নাম… ‘

রাজীবের মুখ ফুটে এই কথাটাই বেরোল। তারপর তিনি দু-পাশে ঘাড় নাড়লেন।

‘নাম জানেন না?’

আবারও রাজীব ঘাড় নেড়ে না বলল।

‘ছেলে?’

ঈষৎ ওপর নীচে মাথাটা নড়ল।

‘কীরকম দেখতে বলতে পারবেন? ফর্সা না কালো?’

‘ফস…’

‘ফর্সা। মঞ্জুর চেয়ে লম্বা?’

‘এট্টু…’

স্বয়ম্ভু কান পাতল ঠিক করে শোনার জন্য। ডক্টর ব্যানার্জি স্বয়ম্ভুকে বললেন, ‘স্যার, আর পারমিশন দিতে পারব না।’

‘আর একটা প্রশ্ন। প্লিজ।’

ডক্টর নিরুপায় হয়ে রাজি হয়।

‘রাজীববাবু, ছেলেটি মঞ্জুকে খুন করেছে তাই তো?’

রাজীবের মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দ বেরোল। দু-চোখে সেই ভয়। স্বয়ম্ভু খেয়াল করে ওকে টপকে রাজীবের দৃষ্টি অন্য কোনও একটা দিকে আটকে গেছে। শ্বাসের গতি বাড়ছে ক্রমশ। চোখদুটোও ক্রমশ বড়ো হচ্ছে। স্বয়ম্ভূ মুখ ফিরিয়ে দেখে কাচের বাইরে এক নার্স একটি ছেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বয়ম্ভুর মনে সন্দেহ হয়। ‘আপনি কি এই ছেলেটিকে চেনেন? রাজীববাবু? চেনেন?

‘স্যার, প্লিজ, এসময় মানুষ অনেক কিছু হ্যালুসিনেট করে। তার ওপর উনি একটা শক পেয়েছেন।’

স্বয়ম্ভূ ছুটে আই সি ইউর দরজা খুলে বাইরে যেতেই দেখে ওই ছেলেটির কোলে নার্স তার ছোট্ট মেয়েটিকে তুলে দিচ্ছে। ছুটি হল বোধহয়। এই ছেলেটিও ফর্সা, লম্বা তবে চোখে চশমা আছে।

‘রাজীববাবু খুনির চোখে চশমা ছিল?’

‘স্বয়ম্ভুবাবু প্লিজ। এরকম করলে আমি আর পারমিশন দিতে পারব না।’

রাজীবের শ্বাস উঠেছে। স্বয়ম্ভুর খারাপ লাগল দেখে। ছি ছি! এতটা উচিত হয়নি। পেশা হয়তো মানুষকে পশু করে দেয়।

‘স…সরি ডক্টর। ভেরি সরি।’

‘প্লিজ আপনি বাইরে যান।’

স্বয়ম্ভুর আজ ব্রেকফাস্ট হয়নি। এখন হোটেলগুলোতে লোকে ভিড় করে ভাত খাচ্ছে। কিন্তু ভাত খেতে ইচ্ছে করল না স্বয়ম্ভুর। গলির মধ্যে একটু এগিয়ে গিয়ে একটা ফাস্ট ফুড সেন্টার। ঝাঁ চকচকে। চাউমিন খাওয়া যাক। দরজা ঠেলে দোকানে ঢুকতেই একটা চেনা মুখ। ছেলেটি মশলা চিবোতে চিবোতে দাম মেটাচ্ছে। মনে পড়েছে, এ তো সেই ছেলেটি। ডক্টর দিব্যময়ের কাছে এসে কারুর খেয়াল রাখতে বলছিল। বিপুল না কী যেন নাম। পাশের মেয়েটির মাথায় আর হাতে এখনও ব্যান্ডেজ। তার মানে এই মেয়েটির ওপরেই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স হয়েছিল বলে ছেলেটি নার্সিংহোমে ভর্তি করেছিল! দিব্যময় বলেছিল ছেলেটির পার্লারে নাকি এই মেয়েটি কাজ করে।

‘ভালো আছেন স্যার?’

সেদিনের কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ছেলেটি এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। ‘হ্যাঁ আছি। চিনতে পেরেছ আমায়?’

‘কী যে বলেন স্যার। এই তো পরশু দেখা হল।’

‘ও। ওটা পরশু না? আসলে এখন একেকটা দিনে এত কাজ হচ্ছে দিন গুলিয়ে যাচ্ছে। তার ওপরে পুজো। আজ থেকে তো ষষ্ঠী, সপ্তমী বলে দিন গোনা শুরু হবে। ডেটটাও ভুলে যাব।’

ছেলেটি হাসল। ‘তোমার নাম বিপুল না?’

‘না স্যার, বিমল।’

‘রাইট রাইট।’

‘আসি স্যার।’

‘এসো।’

বিমল তন্দ্রাকে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু স্বয়ম্ভুর মনে একটা কাঁটা বিঁধিয়ে গেল। কিন্তু কেন? একটা ভালো ছেলে তার পার্লারে কাজ করা কর্মচারীর জন্য এত করছে। ইচ্ছে করছে খুনিটার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলতে, দ্যাখ হারামজাদা। খুন করে নয়, ভালোবাসা আর সহমর্মিতা দিয়েও পালটানো যায়।

‘কী খাবেন স্যার?’

ওয়েটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

‘উমমম কী খাব বলে যেন এলাম… ওই একটু…’

কথা থেমে গেল স্বয়ম্ভুর। স্বয়ম্ভুর কোনাকুনি আরও একটি পরিচিত মুখ বসে। হাতে ধরা কাটলেট। চিকেন কাটলেট কি? কিন্তু তার চেয়েও সন্দেহজনক ছেলেটির মুখ। ফর্সা, চোখে চশমা নেই এবং বাঁ গালে আঁচড়ের দাগ। কপালেও মিলিয়ে আসা কালশিটে।

‘স্যার অর্ডারটা?’

ছেলেটির দিকে চেয়েই টক করে বলে উঠল স্বয়ম্ভু, ‘চিকেন কাটলেট।’

‘কটা স্যার?’

‘একটা।’

‘আর কিছু নেবেন না?’

‘আর? হাফ প্লেট চাউ।’

‘হাফ প্লেট?’

ছেলেটা অবাক হল। ‘হ্যাঁ, কেন হবে না?’

‘হ্যাঁ স্যার হবে। আসলে হাফ প্লেট আর ফুল প্লেটের দামের বেশি ফারাক নয় তো তাই বলছিলাম ফুল প্লেট নেওয়াটাই ভালো।’

‘না ভাই, পেটে ধরবে না। হাফ প্লেটই দাও।’

‘ওকে স্যার।’

কান এঁটো করা হাসি দিয়ে ছেলেটিকে বিদেয় করল। ডক্টর দিব্যময়ের জুনিয়র ডক্টর অতনুর দিকে নজর পড়ল স্বয়ম্ভুর। রুনু আর বিট্টু যে রাতে খুন হয় সেদিন সকালেই অতনুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তখন মুখ ছিল পরিষ্কার। আর ঠিক দু-দিন বাদে মুখে আঘাতের চিহ্ন কেন? তাও আবার আঁচড়! ঘা দেখে তো দু-দিনের পুরোনো বলে মনে হচ্ছে না। নাহ! যাই একটু বাজিয়ে আসি। স্বয়ম্ভূ ইচ্ছে করেই অন্য একটা দিক থেকে ঘুরে অতনুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কানে মোবাইল। বেশ জোরেই বলে উঠল, ‘কে বিটুউউউ?’ আচমকা অতনু ঘুরে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়। হালকা হাসি ফুটে ওঠে। ‘আরে আপনি?

‘আরে ডক্টর অতনু যে…। এই শোন না, আমি পরে করছি।’

ইচ্ছে করেই এই সংলাপের অবতারণা। যেন সত্যিই কেউ ফোনের ওপারে ছিল। ‘বসি?’ ভদ্রতা করে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ প্লিজ।’

স্বয়ম্ভু বসতে বসতে শেলটা ছুড়ে দিল। ‘আচ্ছা আপনার নাম তো অতনু। তাহলে বিট্টু নাম শুনে আপনি চমকে তাকালেন কেন?’

‘আসলে কলকাতায় আমায় ডাকনাম ধরে ডাকার কেউ নেই। আপনি হঠাৎ ডেকে উঠলেন।’

‘ডাকনাম!’

‘হ্যাঁ।’

শেলটা যে এইভাবে বাউন্স ব্যাক করবে স্বয়ম্ভূ ভাবেনি।

‘অ। তা সারা মুখে এই এত নকশা করল কে?’

‘কপাল। নিয়তি।’

‘কীভাবে?’

‘ওই আর কী… মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। পড়লাম মুখ থুবড়ে।’

‘অ। মুখ থুবড়ে পড়েই এরকম গালে আঁচড়ের দাগ পড়ল?’

অতনুর মুখের হাসিটা মুহূর্তের জন্য বিলীন হয়ে গেল।

‘দাদা, এই টেবিলে দিন।’

ওয়েটার স্বয়ম্ভুকে খুঁজছিল আগের টেবিলের সামনে গিয়ে। স্বয়ম্ভু ডেকে নিল। চিকেন কাটলেট আর চাউমিন হাতেই স্বয়ম্ভু বলে উঠল, ‘ডেডলি কম্বিনেশন! কী বলেন?’

‘আমার আবার শুধু কাটলেট। স্পেশালি চিকেন কাটলেট। সারাদিন কাটলেট খেয়েই থেকে যেতে পারি। যদিও চপ, ফুলুরি, সিঙাড়াও।’

‘সেকি। ডাক্তারের সঙ্গে এতসব ভাজাভুজি এটাই তো ডেডলি কম্বিনেশন।

অতনু হাসল। ‘স্যার জানলে কেটে ফেলবে। কতবার বলে ওরে খাস না খাস না। আমিও ভাবি, ছেড়েই দেব। কিন্তু এই দোকানের পাশ দিয়ে যেতে গিয়েই তো সব্বোনাশটা হয়ে যায়। তারপর ভাবি, যাআআআক গে, সিগারেট বিড়ি তো আর খাই না। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য তো একটা নেশার দরকার লাগে।

‘ঠিক যেমন খুনির নেশা খুন করা।

‘অ্যাঁ?’

এমন একটা বিকট উদাহরণ শুনে বিষম খেল অতনু। স্বয়ম্ভু হেসে ম্যানেজ দিল, ‘না না, আসলে সারাদিন চোর, ডাকাত, খুনিদের নিয়ে ওঠাবসা করি তো। তাই ও ছাড়া আর ভাবতে পারি না। তা আপনি এপাশেই থাকেন বুঝি?’

‘হ্যাঁ, একটু ভেতরে। চৌবাগার দিকটায়।’

‘চৌবাগা!’

দিব্যি স্বয়ম্ভুর মুখের মধ্যে কাটলেটটা ওলটপালট খাচ্ছিল। আচমকা থেমে গেল। আয়ুষ্মান যে মাস্টার মাইন্ডের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল তার লাস্ট লোকেশন তো চৌবাগাই ছিল।

‘কিছু ভাবছেন স্যার?’

অতনু প্রশ্ন করল।

‘না না, কী আর ভাবব? যা ভাবার সবই তো তিনি ভেবে রাখছেন। আড়ালে বসে!’

এক মুখ হাসি নিয়েই হালকা চালে কথাটা বলল স্বয়ম্ভু।

‘তবে কী জানেন, চিকেন কাটলেট যদি খেতেই হয় তাহলে মিত্র ক্যাফের কাটলেট খাবেন। স্পেশালি গোলপার্কেরটায়।’

‘আরিব্বাস! আপনি তো আমার দলের লোক মশাই। এমন কাটলেট ভক্ত গোয়েন্দা তো জীবনে দেখিনি।

‘আরও গোয়েন্দা দেখেছেন বুঝি?’

‘হ্যাঁ। ফেলুদা, ব্যোমকেশ, শবর, হালের একেন। একেন অবশ্য খাদ্যরসিক।’

‘মিত্র ক্যাফে লাস্ট কবে গেছেন?’

হাসিঠাট্টার মাঝে টক করে একটা সিরিয়াস প্রশ্ন ছেড়ে দিল স্বয়ম্ভু।

‘সে অনেকদিন হল।’

‘গোলপার্কেরটায় খেয়েছেন নিশ্চয়ই?’

অতনুর মুখটা ভেবলে গেল। ‘হ্যাঁ… না, না মনে হয়। গোলপার্কেরটায় মনে হয় না কখনও খেয়েছি। শোভাবাজারেরটায় আর পাটুলিরটায় খেয়েছি।’

‘ও বাবা, পাটুলিতেও আছে নাকি?’

‘হ্যাঁ। বেশ ভালো।’

কথার সুরটা কেমন যেন পালটে গেল অতনুর। স্বয়ম্ভুর মনে হল এই মুহূর্তে অতনুর মুখের সঙ্গে মনের কোনও যোগ নেই। মনের অন্দরে অন্য কিছু যেন চলছে।

‘আচ্ছা স্যার, আমায় এবার উঠতে হবে।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, শিওর। কথা বলে ভালো লাগল।’

‘আমারও।’

‘ও হো, আপনার পুরো নামটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি।’

‘অতনু সোম।’

‘দেখা হবে কিন্তু।’

অতনু থমকে দাঁড়াল। ‘কেন?’

‘ও দেখা করতে চান না?’

‘না না তা না। আসলে আপনি গোয়েন্দা তো তাই ভাবলাম কী জানি বাবা! বিশেষ কোনও কারণে বলছেন কিনা।’

স্বয়ম্ভূ মুখে কাটলেট আর চাউমিন পুরে হো হো করে হেসে উঠল। একটা নুডুলস মুখ থেকে ঝুলছিল। অতনু পিছন ফিরতেই সুড়ুত করে নুডুলসটা মুখের মধ্যে টেনে নিল স্বয়ম্ভু। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সোজা কানে, ‘স্বয়ম্ভু সেন বলছিলাম ডাক্তারবাবু।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন।’

‘একেবারেই পার্সোনাল কারণে আপনাকে কল করেছি। ডিস্টার্ব করলাম না তো?’

‘এ বাবা না না। বলুন না।’

‘বলছিলাম আমার মা ক’দিন ধরেই হাঁটুতে ব্যথা বলছেন। ভাবছি একবার যদি আপনি দেখতেন।

‘বেশ তো নিয়ে আসুন। কোথায় আনবেন বলুন? চেম্বারে না বাড়িতে?’

‘বাড়িতে হলেই বেটার হয়।

‘কবে আসবেন?’

‘সেটা আমি জানিয়ে দেব আপনাকে। মাকে বলি। তেনার মর্জির ব্যাপার। দিব্যময় হাসল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘ডক্টর অতনুর সঙ্গে দেখা হল। একসঙ্গে কাটলেট খেলাম।’

‘দেখেছেন, আবার ওসব খেতে গেছে। এসেই জেলুসিল গলায় ঢালবে।’

‘আপনি আবার বলবেন না যেন আমি বলেছি। তাহলে ভাববে স্বয়ম্ভু সেন গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে চুকলিবাজি করছে।’

উভয়েই হে হে করে হেসে উঠল। হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই প্রশ্নটা পেড়ে ফেলল স্বয়ম্ভু, ‘ওনার মুখে আঁচড়ানোর দাগ দেখলাম। কপালেও কালশিটে। উনি তো বললেন মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে নাকি পড়ে গেছেন। সত্যিই তাই?’

‘ও আপনাকে এই গল্প দিয়েছে?’

‘তাই তো বলল।’

‘ওই পড়ে যাওয়াটা একই আছে। তবে আমায় বলেছিল বাড়ির গলিতে হঠাৎ করে কারেন্ট চলে গিয়েছিল। সামনে নাকি কী সব ইটের স্তূপ করা ছিল। সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়ে ওইরকম ছড়ে গেছে।’

‘ইটের মধ্যে ভূত ছিল বোধহয়। গালে আঁচড়ে দিয়েছে।’

স্বয়ম্ভুর রসিকতায় হেসে উঠল দিব্যময়। ‘যাই হোক, আপনার সময় নষ্ট করলাম।’

‘আরে না না। কোনও ব্যাপার না। আপনি মাকে নিয়ে কল করে চলে আসবেন।’

‘থ্যাংক ইউ ডক্টর, থ্যাংক ইউ।’

‘মাই প্লেজার।’

কান থেকে মোবাইলটা নামিয়ে অন্য একটা নম্বর ডায়াল করে স্বয়ম্ভু। জনৈকর উদ্দেশে বলে, ‘ডক্টর অতনু সোম। ডক্টর দিব্যময় মুখার্জির জুনিয়র। থাকে চৌবাগা।’ এরপর চেটেপুটে চাউমিন আর কাটলেট খেল স্বয়ম্ভু।

***

বাড়ির কাজের মেয়েটা দরজা খুলেই এক গাল হাসল। ‘বউদি এসে গেছ? এসো এসো।’ তন্দ্ৰা ক্লান্ত চোখে আলতো হাসল। ‘এসো বিমলদা।’ তন্দ্রা ডাকল। বিমল তন্দ্রার সঙ্গে বাড়ির ভিতর ঢুকতেই দেখল খাবার টেবিলে তন্দ্রার হাজব্যান্ড আর শাশুড়ি লাঞ্চ করছে। বিমল যে এসেছে তাতে তাদের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। তন্দ্ৰা লজ্জা পেল। কাজের মেয়েটি বরং বলল, ‘ঘরে চলো বউদি। রেস্ট নেবে।’

‘এসো না বিমলদা।’

‘না রে। তুই সাবধানে থাকিস। ওষুধগুলো মনে করে খাবি। সপ্তাখানেক বাদে একটা চেক আপ আছে।’

তন্দ্রা বাধ্য মেয়ের মতো ঘাড় নাড়ল। বিমল বলল, ‘নিজেকে অবহেলা করিস না। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে পার্লারে জয়েন কর। কদ্দিন আমি ঠেকনা দেব?’ তন্দ্রার মুখে হাসির সঙ্গে কোথাও একটা কান্নাও জুড়ে আছে। বিমল নিজে থেকেই তন্দ্রার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একটু দেখবেন তিলকবাবু। ওষুধগুলো যেন ঠিক মতো খায়।

কত করে বললাম আপনাকে, গেলেন না তন্দ্রাকে আনতে।’

‘হাসপাতালে বেশি ভিড় করতে নেই। আপনি ছিলেন তো।’ ভাত চিবোতে চিবোতে তিলকের জবাব।

‘আরেকটা কথা…’

আঙুল চাটছে তিলক। বিমলের দিকে ঘুরল। ‘তন্দ্রা আর ওই সেলুনে যাবে না। ঘরের বউ ঘরের কাজ করবে। এইটেই তো স্বাভাবিক।’

‘তন্দ্রা রোজগার করলে আপনাদের সংসারেই তো পয়সা আসবে।’

‘সেটা নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে।’

এবার শাশুড়ি মুখ খুলল। ‘আমার সংসারের বউ আমরাই বুঝে নেব। কেমন?’ তিলক খেতে শুরু করল। শাশুড়িও বাইরের লোক বলে বিন্দুমাত্র ভদ্রতা দেখাল না বিমলকে। দূরে কাজের মেয়েটি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে। তন্দ্রার দিকে তাকাল বিমল। ‘তুই কিছু বলবি না তন্দ্ৰা?’

তন্দ্রারও মাথা নীচু ছিল। ছলছল চোখ তুলে বলল, ‘আমার গয়না বেচে হলেও তোমার টাকা আমি শোধ করে দেব বিমলদা। এ মাসের মাইনেটাও আমি নেব না। তুমি চলে যাও। আমি তোমার সম্মানের যোগ্য নই।’ বিমল অবাক চোখে স্তব্ধবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মুখ ফিরিয়ে সোজা বাড়ির বাইরে।

***

নিজের কোলে বসিয়ে সাদা খরগোশটাকে খাওয়াচ্ছে বাণীকণ্ঠ। সবুজ পাতাগুলো খরগোশটার মুখের সামনে ধরতেই টুকটুক করে খেয়ে নিচ্ছে। খাওয়াচ্ছে আর আপন মনে বকবক করছে। ‘ক’দিন একদম বাড়ির বাইরে যাবি না কেমন? ঘরের ভেতর আমার বিছানায় শুয়ে, বসে থাকিস।’ কথাটা মুখ থেকে খসার অপেক্ষা শুধু, ডাইনিং টেবিলে খাবারের থালা গোছাতে গোছাতে মন্দাকিনী খ্যারখ্যার করে উঠল, ‘হ্যাঁ, বিছানায় থাকুক আর হেগেমুতে নৈরেকেত্তন করে রাখুক। এই পুজোর মধ্যে চাদর- টাদর আমি কাচতে পারব না বলে দিলুম।’

‘বঁলেঁ দিঁলুঁমঁ বঁলেঁ দিঁলুঁম।’

বিটকেলও বাণীকণ্ঠের আদর খেতে তার পাশে পাশে উড়ে-ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাণীকণ্ঠ অমনি খরগোশটাকে বলল, ‘শোন পুতুলি, মন্দা বেশি বাড়াবাড়ি করলে ও যখন ঘুমোবে তখন ওর মুখে মুতে দিবি কেমন?’

‘হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা দিক না। ঠ্যাং ছিঁড়ে তন্দুরি করে খেয়ে নেব।’

‘ইসসস! তুই কি নৃশংস রে? এমন তুলতুলে প্রাণীটার ঠ্যাং ছেঁড়ার কথা মনে আনলি কী করে? নিজে মা হ’লে বুঝতি। এ মায়া কী মায়া!’

বাণীকণ্ঠের এই কথাটায় মন্দাকিনীর হাত দুটো থেমে গেল। মুখটা ভার হয়ে এল। নরম গলায় বলল, ‘আমি কি আর সত্যি সত্যি ছিঁড়তে যাচ্ছি নাকি?’ কথাটা বলেই বাসন মাজতে থাকল। আহা! মেয়েটাকে কি দুঃখ দিয়ে ফেলল বাণীকণ্ঠ? কোল থেকে খরগোশটাকে নামিয়ে ঘরে চলে গেল। একটু পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে টুকটুক করে হেঁটে মন্দার কাছে গেল। ‘হাতটা ধুয়ে একবার এদিকে ফের দেখি।

‘কেন? কী বলবে বলো না।’

‘হাতটা ধুয়ে এদিকে ফের।

‘দেখছ তো একটা কাজ করছি। এক্ষুনি তোমার গাড়ি এসে যাবে।’

‘ম্যালা কথা বাড়াস না তো। যা বলছি কর। ফের এদিকে।

‘উফ! জ্বালাও বড্ড।’

মন্দা ভালো করে হাত ধুয়ে বাণীকণ্ঠের দিকে ফিরল। ‘কই বলো।’

‘হাতটা মোছ।’

বুড়ো থেকে থেকে কী যে রঙ্গ করে বুঝে উঠতে পারে না মন্দা। পরনের চুড়িদারে ভালো করে হাত মুছল। মুখে এক রাশ বিরক্তি নিয়ে মন্দা বলল, ‘বলো।’

‘চোখ বন্ধ কর।’

‘উফ! বেলাদুপুরে কী রঙ্গ কোচ্চ বলো তো?’

‘চোখটা বন্ধ করে হাতটা পাআআআআত।’

ধমকাল বাণীকণ্ঠ। চোখ বন্ধ করে হাত পাতল মন্দা। বাণীকণ্ঠ মন্দার হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে বলল, ‘নে, দ্যাখ এবার।’ মন্দা চোখ খুলে টাকাটা দেখে ভেবলে গেল। হাসবে না বিরক্ত হবে বুঝতে পারল না। ‘এটা? কী করব?’

‘পুজোতে কিছু কিনে নিস। ইচ্ছে হলে কিছু কিনে খাস। খালি পরের ঝেড়ে কাটলেট সাঁটিয়ে আসিস। এবার তাকেও খাওয়াস।’

লজ্জায় গদগদ হয়ে মন্দা বলল, ‘এমা! দাদা তো শাড়ি দিয়েছে। তুমি আবার এ সব…!’

‘চুপ কর মুখপুড়ি। বেশি পেকেছিস। এ ক’দিন সাবধানে থাকবি। দরজায় ভালো করে তালা দিয়ে বেরোবি। বাইরে যা খুনখারাপি হচ্ছে।’

‘সে তো ন্যাকাবোকা বউগুলো মরছে।’

বাণীকণ্ঠ চোখদুটো বড়ো বড়ো করে তাকাল, ‘তুই জানিস?’

‘ও মা! জানব না কেন? বাজারে যাও না। সব্বক্ষণ এ নিয়েই গুলতানি চলছে।’

‘অ। তা পুজোর মধ্যে কোনও মদ্দা ছেলেকে যেন আবার বাড়িতে ঢোকাস না। ডাক্তার, নাপিত কাউকেই তো বাদ দিস না। খবরদার মন্দা।’

‘অ্যাই, তুমি তোমার পাঁচশো টাকা রাকো তো। পাঁচশো টাকা দিয়ে পাঁচশোখানা জ্ঞান শুনিয়ে দিচ্ছে।’

‘হুম! যেদিন থাকব না সেদিন বুঝবি এ বুড়োর কথাগুলো কত দামি।’

বাইরে থেকে গাড়ির হর্ন শোনা গেল।

‘অয় দ্যাকো, গাড়ি এসে গেছে। তুমি সব গুছিয়ে নিয়েছ তো?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বুড়ো মানুষের আর কী লাগে?’

চটপটে পায়ে বাইরে দরজা খুলতে যেতে যেতে মন্দা গলা তুলে বলল, ‘ওষুধ সব নেবে বলে দিলাম। ওখেনে কিন্তু কাছেপিঠে দোকান নেই। দূর মড়া, সর না।

আরেকটু হলেই মন্দার পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল বিটকেল। ‘সঁর নাঁ সঁর নাঁ’ করতে করতে ফরফর করে ডানা ঝাপটে সরে গেল।

‘ও পাগল হয়ে গেছে। পুরো পাগল। খবরটা দেখার পর থেকেই মাথায় ভূত চেপেছে ওর।’

‘আপনি আপনার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেননি বলছেন?’

‘দেখুন কোন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া অশান্তি হয় না বলুন তো? সেরকমই কথা কাটাকাটি হতে হতে একটা চড় মেরেছি আমি। স্বীকার করছি তো। তার জন্য পুলিশে কমপ্লেন করবে? এর আগেও ও কত কিল-ঘুষি মেরেছে, কই আমি তো কাউকে বলতে যাইনি।’

‘বউ আপনাকে মারত?’

‘না না, ওভাবে নয়। ওই টুকটাক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেমন হয়। কিন্তু সেটা কখনওই ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের পর্যায়ে পৌঁছোয়নি।’

***

মোবাইলের খবরটা দেখতে দেখতে অতনু হাসছে। সে এখন সালোনে বসে আছে। এখনও ওর ডাক পড়েনি। এদিকে নিউজ পোর্টালে ঝড়। অতনুর অঙ্গুলি চালনায় ভিডিও পালটে যায়। একি আবার একটা একইরকম ভিডিও! সাংবাদিকরা, থানাগুলো অদ্ভুত সব রিপোর্ট পাচ্ছে। বউয়ের গায়ে মশা বসেছে। বর একটু মজা করেই চটাপট চড় চালিয়ে দিয়েছে। স্ত্রীয়ের অভিযোগ, একটা মশা কখনও এইভাবে কেউ মারে না। হাজব্যান্ডের উদ্দেশ্য ছিল ওয়াইফকে মারা। বউ করেছে থানায় কমপ্লেন। স্বামী পায়ে ধরেও ছাড়া পাচ্ছে না। বউগুলোর বুকে ভয় ঢুকে গেছে যে স্বামী মারলেই সেই খুনি এসে বউটাকে মেরে দেবে।

সব শেষে দেখা গেল পাড়ার কেষ্ট-বিষ্ট, রিনা মিনারা মিলে প্র্যাংক ভিডিও বানিয়েছে। এখন খ্যাকখ্যাক করে হেসে সবাই গড়াগড়ি খাচ্ছে।

‘অতনুদা চলে এসো।’

অতনুর কানে ইয়ারবাড। তাই ডাকটা কানে যায়নি।

‘ও অতনুদাআআআ…’

‘অ্যাঁ!’

বিমল হাসছে। ‘কী এত মন দিয়ে দেখছ?’

‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স!’

চিবিয়ে চিবিয়ে বলে সোফা থেকে উঠে স্পেশ্যাল ঘরের চেয়ারে গিয়ে বসল অতনু।

‘এই এক হয়েছে পুজোর আগে। বাড়িগুলো থেকে ঝেঁটিয়ে বরগুলোকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।’

‘এতে কার কত লাভ হচ্ছে জানি না ভাই। তবে পুজোর আগের বাজারটা ডাউন হয়ে যাচ্ছে। এই যে পুজোর মার্কেটিং, এ তো ছেলেদের চেয়ে মেয়েদেরই বেশি হিড়িক থাকে।’

‘যা বলেছ। এই সময় গড়িয়াহাট ফাঁকা। ভাবতে পারছ? আজ ষষ্ঠী হয়ে গেল। ঠাকুর দেখার ভিড় নেই। শ্রীভূমি নাকি মাছি তাড়াচ্ছে।’

‘এটা বাড়াবাড়ি ভাই। কালকেই ভিডিও দেখলাম। যেমন ভিড় তেমনই আছে।’

‘না গো, তুলনামূলক অনেক কম।’

‘দেখ গে যা, এই যে এত ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেসে ছেলেগুলো ফাঁসছে এর মধ্যে অর্ধেক সব ঢপ। নির্ঘাত বউ দামি শাড়ি গয়না চেয়েছে কিন্তু বর দেয়নি। ব্যস, দে কেস ঠুকে।’

বিমল খিলখিল করে হেসে উঠল। অতনু বলল, ‘আর এই খুনিও আর সময় পেল না খুন করার। শালা বাস্টার্ড।’

‘কী কাট করব বলো?’

অতনুর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বিমল জিজ্ঞেস করল।

‘অ্যাঁ, ও কাট! কী আবার করবি? পুজোর ছাঁট দে। এই তোর মতো মাথার দু-পাশ চেঁচে দিস না বাবা। আহ, আস্তে রে।’

হঠাৎ কঁকিয়ে উঠল অতনু।

‘ওহ! সরি সরি।’

‘চুলের মুঠি ধরে টানলি কেন?’

‘তুমি স্যারের প্রিয় ছাত্র। তোমার চুল ধরে টানতে পারি? চুলে জট পড়েছিল। সেটাই একটু ছাড়ালাম।’

আয়নার মধ্যে দিয়ে ব্যথাতুর দৃষ্টিতে বিমলের দিকে এক পলক দেখল অতনু।

***

বাণীকণ্ঠ তার ছোটোভাইয়ের ফ্ল্যাটে পা দেওয়া মাত্রই বছর পাঁচের বুবলাই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। বুবলাইয়ের মা বলল, ‘ওরে বড়োদাদুকে বসতে দে আগে।’ বাণীকণ্ঠও বুবলাইকে কোলে তুলে এক চক্কর ঘুরে গেল।

‘সেই কখন থেকে ভাবছি তুই এই এলি এই এলি। এইটুকু পথ আসতে এতটা সময়?’

ঘর থেকে বেরিয়ে এল বাণীকণ্ঠর ছোটো ভাই নীলকণ্ঠ। বাণীকণ্ঠ ভালো করে বুবলাইকে হামি খেয়ে বলল, ‘আরে গাড়িটা রাস্তার মধ্যে গেল বিগড়ে। সেটা ঠিক হল দশ মিনিট ধরে। তারপর তোদের এস্টেটে ঢুকে তো বাপ রে! রাস্তা চেনার জো নেই। সব রাস্তাই একরকম। এ যেন উপনগরীর মধ্যে আরেক নগরী। বাড়ি খুঁজতে গিয়ে গাড়িটাও ঘুরল খানিক।

‘অ্যাদ্দিনেও আমার বাড়ি চিনে উঠতে পারলি না?’

নীলকণ্ঠ বলল। ছেলের বউ বলে উঠল, ‘চিনবে কী করে? জেঠু এখানে আসে কত? আমাদের তো ভুলেই গেছেন।’

‘ত্যাৎ, মা যে কী বলে। বলোদাদু তো আমাদেল ছবাইকে চেনে।’

সবাই হো হো করে হেসে উঠল। বাণীকণ্ঠও ঘাড় নাচাল, ‘হ্যা হ্যা হ্যা দেখেছ তো বউমা তোমরা কিসসু জানো না। আমার দাদুভাই কী সুন্দর জানে।’

‘মা তা বোকা তো।’ ফিশফিশ করল বুবলাই।

‘অ্যাঁ! তাই নাকি?’

‘মার খাবি বুবলাই।’

ছদ্মরাগ দেখাল বুবলাইয়ের মা। বাণীকণ্ঠ শিশুর মতো বলে ওঠে, ‘মা এ সব কী বলছে বল তো? আমি থাকতে তোকে মারবে? দেখি তো কত শক্তি আছে।’ বুবলাইও চুকুত করে একটা হামি দিল তার বলোদাদুর তুলতুলে গালে।

‘একেই তো বাড়িতে এক দাদু মাথা খেয়ে রেখেছে। তার ওপর আপনি আর ধুনোর গন্ধ দেবেন না জেঠু।’

‘তা বললে চলে বউমা? আসলের চেয়ে সুদের দাম বেশি জানো তো।

সোফায় বসল বাণীকণ্ঠ। ‘এবার দিব্যর একটা ব্যবস্থা কর দাদা। এভাবে আর কতদিন?’

‘ধুর ধুর। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি।’

‘বলোদাদু জানো তো আমি তোমাল ঘলটা খুব ছুন্নর করে ছাজিয়েছি।’

‘ও মা তাই নাকি? চলো তো দেখি।’

‘এছো এছো।’

‘ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে, তাঁকে মন দিতে যে চাই কেমন বাধে?’ গান গাইতে গাইতে বিটকেলকে খাঁচায় পুরে দরজা আটকে দিয়ে মন্দাকিনী বলল, ‘কী রে বিটকেল, গা। ময়না বলো তুমি…!’ বিটকেল গাইল না।

‘বাবা! হল কি তোর? গান গাইছিস না যে। ময়না বলোওওও তুমি…’

ময়না গাইল না। আবারও বিটকেল নিরাশ করল মন্দাকে। ‘অ, বুঝেছি। ওই বুড়োটা নেই বলে মন খারাপ?’ বিটকেল তাও চুপ। ফিক করে হেসে মন্দা বলে উঠল, ‘তোদেরও মন খারাপ হয়? ঘরের লোক ঘরে না থাকলে ভালো লাগে না বল?’ বিটকেল মুখ গোঁজ করে বসে থাকে। মন্দা ঘাড় ঘুরিয়ে বারান্দা থেকেই দেখল, পুতুলিও বাণীকণ্ঠের বিছানায় উঠে চুপটি করে বসে আছে। বিটকেলকে বলল, ‘যে ক’দিন বুড়ো বাড়ি নেই সে ক’দিন রাতে তুইও ওই বিছানায় গিয়ে বসে থাকিস। আটকে রাখব না তোকে। কেমন?’ বিটকেল কী বুঝল কী জানি, সে ঘাড় বেঁকিয়ে ঠিক বাণীকণ্ঠের ঘরটার দিকেই এক ঝলক দেখে নিল।

মন্দা ঘরে এসে নিজের বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। মোবাইলটা কানে দিল, ‘কোন রাজকাজ্জটা করচিলে শুনি? পাঁচবার ফোন করেছি।… কোথায়? সেলুনে?!’ মন্দা শরীরটাকে ঘুরিয়ে উপুড় হয়ে শুল। পা দুটো সিলিংয়ের দিকে তুলে নাচাতে নাচাতে বলল, ‘উমমমহ! ন্যাকামো কত। পুজোর ছাঁট দিচ্চিলেন। আমার ফোনের থেকে পুজোর ছাঁট তোমার আগে হল?… কেন আবার? বাড়ি খালি। বুড়ো গেচে।’ ডান হাতের তর্জনীর মধ্যে চুল জড়াতে জড়াতে এক লোলুপ আহ্বান ছুড়ে দিল ফোনের ওপারে থাকা মানুষটিকে, ‘আসবে নাকি?’ ঠোঁট কামড়াল মন্দা। ‘এসো না। একা একা ভালো লাগে নাকি?… কী? উফফফ! এই এক ডাক্তার হয়েছে। তুমি কি ডাক্তারবাবুকে ভয় পাও নাকি?… নাআআআহ! বীরপুরুষ। তাহলে আসচ না কেন?’ হঠাৎ করেই মন্দার শ্যামলা মুখটা থেকে শরতের রোদ্দুর হারিয়ে গেল।

‘আজকেই অপারেশন?… না কল্পে হয় না?… না না ভয় পাব কেন? … কিছু হবে না।… কী করব? বুড়োটা তো ফোন নিয়ে গেচে। তদ্দিন কথা না বলে থাকি কী করে?… হুম! রাখো। টাটা… আমিও লাব ইউ।’

ফোনের মধ্যে চুম্বনের আদানপ্রদান সেরে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল মন্দাকিনী। সিলিংয়ে ঘুরন্ত পাখার দিকে চেয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল।

***

কড়াটা বেশ জোরেই নাড়ল শিবাঙ্গী। পাকা ঘর কিন্তু রাস্তা থেকে খানিক ভিতরে গলি-তস্য গলির ভিতরে। বাড়ির সামনেটায় শ্যাওলা। দরজার মাথায় উর্দুতে কিছু একটা লেখা। দরজা খুলল এক মহিলা। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হবে।

‘নাজমা?’

কড়া গলায় শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল। ঠিক ততটাই নরম ও সরু গলায় উত্তর এল, ‘হ্যাঁ। আপনি?’

‘আমি লালবাজার থেকে আসছি। এ এস আই শিবাঙ্গী বসু।’ পরিচয়পত্র দেখিয়ে খুব একটা উপকার হবে না জেনেও দেখাল।

‘পু…পুলিশ?’

‘হ্যাঁ।’

নাজমার বলার অপেক্ষা না করেই শিবাঙ্গী জুতো পরেই ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। ঘর পাকা হলেও বাড়ির চাল টালির। বিছানায় একটি বাচ্চা ছেলে শুয়ে ছিল এলো গায়ে। সেও উঠে বসেছে কাঁচুমাচু মুখে। ‘সোমনাথবাবুর মুখোশটা আপনিই নষ্ট করেছেন?’ চোখ নামিয়ে বুকের ওপর হাত দিল নাজমা। ভিতরের ঘর থেকে সম্ভবত নাজমার মেয়ে এসে দরজায় দাঁড়াল।

‘কী হল? চুপ কেন? বলুন। আপনি নষ্ট করেছেন?’

‘কত্তি চাইনি। হয়ে গেসে। আর হবেনি ম্যাডাম।’

‘জানেন ওটার কত দাম? ওইটা নষ্ট হওয়ার জন্য লাখ লাখ টাকার শুটিং আটকে গেছে। শুটিং পার্টি আপনার নামে থানায় ডায়েরি করেছে।’

‘সেকি।’

চমকে উঠল নাজমা। ঘরের দোরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিও কাঁদো কাঁদো মুখে নাজমার পাশে এসে দাঁড়াল। ‘আম্মি তুমি কী করসো? কও নাই তো?’

‘তুই ভিত্রে যা সাবিনা। ম্যাডাম, এবারকার মতো ক্ষমা করি দ্যান। আমি তো সব বলিইসি।’

‘কেন? আপনি তো ফোনে বললেন, ধরলে পুলিশ আপনাকে ধরুক। সোমনাথবাবুকে যেন ছেড়ে দেয়। কাউকে না কাউকে ধরতে তো হবে। কীভাবে ছিঁড়লেন?’

‘মুখ থেকি খুলতে গে ছিঁড়ে গেসে ম্যাডাম। আমায় ছেড়ি দ্যান ম্যাডাম। আল্লা আপনার ভালা করবে।’

‘আমার ভালোটা ভাবতে হবে না। নিজের ভালোটা ভাবুন। চলুন আমার সঙ্গে।’

‘না ম্যাডাম না। আপনার জন্যি কী কত্তি পারি কন। আমি করব।

‘আমার জন্য? আমার জন্য আপনি কী করবেন?’

শিবাঙ্গীর মনে খটকা লাগল। এ মহিলার কি ঘুষ-টুস দেওয়া স্বভাব নাকি? নিজের তো উনুনে হাঁড়ি চড়ে না।

‘ম্যাডাম, ওই লক্ষ টাকা তো আমার নেই। আমি আপনাকে … আপনাকে দাঁড়ান…’

বলেই বিছানার তলা থেকে একটা পাঁচশো আর একশো টাকার বান্ডিল বের করে শিবাঙ্গীর দিকে বাড়িয়ে বলল, ‘এ…এইটা নে নেন ম্যাডাম। আমারে ছেড়ি দ্যান।’

শিবাঙ্গী খেয়াল করল বিছানায় বসে থাকা বাচ্চাটির চোখ ছলছল করে উঠেছে। ‘এত টাকা আপনি কোথায় পেলেন?’ ঢোক গিলল নাজমা। ‘কোত্থেকে পাব ম্যাডাম? লোকের বাড়ি খেটি খাই। সেই থেকেই যা পারি তাই বাঁচাই।’

‘আমরা শপিংয়ে যাব না দাদি?’

বিছানায় বসা এলো গায়ের নাতিটা বলে উঠল।

‘চুপ যা। শপিং যাবে। এই সাবিনা, আকবরকে ঘরে নে যা।’

সাবিনা গুটি গুটি পায়ে ছেলেটার দিকে এগোচ্ছিল। শিবাঙ্গী তড়পে উঠল, ‘দাঁড়ান।’ বাচ্চা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল শিবাঙ্গী, ‘তোমার নাম কী বাবু?’

‘আকবর।’

‘বাহ! আচ্ছা, এই টাকা দিয়ে তোমাদের শপিং করার কথা ছিল?’

‘হ্যাঁ তো। দাদি বলেছেল।’

‘কবে?’

‘আজকের সকালেই।’

‘আজকেই?’

শিবাঙ্গীর চোখ মাটির দিকে। নাজমা দুটো পা জড়ো করে মাটিতে আঙুল ঘষছে।

‘হ্যাঁ তো। কাজের বাড়ি থেকে এসেই বলল, আকবরকে আজ হেব্বি আনন্দ করব। আমরা সবাই গড়িয়াহাটে গিয়ে শপিং করব।’

‘ও…ওর কথা ধরবেননি ম্যাডাম। কী বলতে কী বলে? অ্যাই আজ সকালে কখন বললাম? সেই তো হপ্তাখানেক আগেই কয়েসিলুম।’

আড়চোখে মায়ের দিকে দেখছে সাবিনা। শিবাঙ্গী তবু আকবরকেই প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা আকবর, এর আগে তোমরা কখনও শপিংয়ে গেছ?’

আকবর দু-পাশে মাথা নেড়ে না বলল।

‘কেন?’

‘পয়সা থাকে না তো। কী করে যাব?’

‘এখন কী করে পয়সা এল জানো?’

‘না। দাদি বলল কাজের বাড়ি থেকে দেসে।

নাজমা ছদ্মহাসিতে মুখ রাঙিয়ে বলল, ‘পুজো… পুজোর বকশিস দেসে সব।’

‘এই যে বললেন মাইনে থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।’

‘হ্যাঁ, বাঁচিয়েছি তো। তাতে আর কত হয়? এখন বকশিস পেয়ি সব একসঙ্গে করে এই টাকা হইসে।’

‘কিছু মনে করবেন না নাজমা, আপনারা তো মুসলমান। হিন্দু বাড়ি থেকে পুজোতে বকশিস দিয়েছে ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি না?’

‘সবাই দেয় নে ঠিক কতা। তবে কেউ কেউ দেয়। শুধু পুজো তো নয়। পুজোর পরেই তো আমাদের ইদ আছে। ওই জন্যি সবাই দেসে। আপনি নে যান ম্যাডাম। আমি ওদের পরে শপিং করে দেব।’

‘দাদি আমারেও নতুন জামা দেবে বলেসে।’

শিবাঙ্গী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল নাজমার আরেকটি নাতি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার কাছে এসে দাড়িয়েছে। আকবর দশ হলে এই নাতি সাত হবে।

‘শাজাহান, ঘরে যা। খালি বড়োদের মদ্যি কতা কইবে।’

নাজমা একেও ধমকাল। শাজাহান ঘরে চলে গেল।

‘আচ্ছা আকবর, আজকে দুপুরে তুমি কী খেয়েছ?’

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল। আকবর বলল, ‘ডাল ভাত।’

‘কাল রাতে কী খেয়েছ?’

‘জল মুড়ি।’

‘ভাত খাওনি?’

‘ছিল নি তো।’

‘বাড়ির সবাই জল মুড়ি খেয়েছে?’

আকবরের ঘাড়টা ডানদিকে একবার কাত হয়ে গেল। শিবাঙ্গী বাড়ির সকলের দিকে তাকাল। নাজমা, সাবিনা সবারই মুখ নীচু। শিবাঙ্গী আবার প্রশ্ন করল, ‘কাল দুপুরে কী দিয়ে ভাত খেয়েছিলে আকবর?’

‘নুন দিয়ে পাস্তা।’

শিবাঙ্গী হাসল। ‘বাহ! চমৎকার! ঘরে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় তারা শপিং করতে যাবে গড়িয়াহাটে! ঘরের লোককে খেতে না দিয়ে টাকা জমাও নাজমা?’

নাজমার শ্বাস ঘন ঘন পড়ছে। চোখ তুলে তাকাবার সাহস নেই। শিবাঙ্গী এবার মেজাজ চড়াল, ‘একের পর এক মিথ্যে বলে যাচ্ছ নাজমা। তোমার কাছে এই টাকা ছিল না। আজকে তুমি এই টাকাটা পেয়েছ। তোমার কাছে ঠিক কখন এই টাকাটা এসেছে?’ একটু যেন চমকেই গেল নাজমা। ‘কখন মানে?’

‘কখন মানে কবে, কটার সময় এই টাকাটা এসেছে?

‘আমিই সত্যিই কিছু টাকা জমিয়েছিলাম আর বাকিটা দেসে।’

‘নাজমা আমি চাই না তোমায় থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে জেরা করতে। নাতিকে পান্তাভাতে নুন দিয়ে তুমি টাকা জমাচ্ছ এটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। আর তুমি যে যে বাড়িতে কাজ করো সবকটা বাড়ি থেকে খবর নিয়ে এসেছি, তারা কোনও পয়সা তোমায় দেয়নি।’

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে নাজমা কান্নায় ভেঙে পড়ে। বিছানায় বসে পড়ে গুমরে ওঠে।

‘চোখের জলে পুলিশের মন ভেজে না নাজমা। সত্যি করে বলো এই টাকা তোমায় কে দিয়েছে আর কীসের বিনিময়ে দিয়েছে। যদিও আমি জানি তবু তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।’

‘কী জানেন ম্যাডাম? কিচ্ছু জানেননি আপনি। কিচ্ছু না। আমিও জানি আপনি বাড়ি বয়ে উজিয়ে এসে কেন এই পোশ্ন কত্তিসেন। আপনাদের ধারণা হইসে যে কেউ আমারে পয়সা দে সকালের ওই ফোনটা কত্তে কইসে। তাই তো বলেন?’

শিবাঙ্গীর ভুরু কুঁচকে গেল। এ কি নাজমার ওপর চালাকি? এরকম একজন দিন আনা দিন খাওয়া মহিলা কি এত বুদ্ধি ধরতে পারে? নাহ, এ নির্ঘাত কেউ শিখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কে?

‘আপনি আমারে যা বলেন বলুন ম্যাডাম, কিন্তু আল্লার মতো মানুষটারে নে কোনও খারাপ সন্দেহ করবেননি। হাত জোড় কত্তিসি। দাদা আসেন তাই আমি খেয়ে পড়ে বেঁচে আসি।’

‘হয়েছে হয়েছে। এই টাকাটা কে দিল বলো আগে।’

‘একে দু-বেলা খেতি দিতে পারিনি। তার উপ্রে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলা সবাইকে দেকতিসে নতুন জামাকাপড় কিনতিসে, ঘুত্তি যাচ্ছে। ওদের বাপটা তো ভেগিসে। এখন আমিই সব। কোন বুকে পাষান হই থাকি কন তো? জল মুড়ি, পান্তা ভাত এ সব খেয়ে বেঁচে থাকার অভ্যেস আমাদের আসে। তাই কয়েকদিনের জন্যি ভালোমন্দ না খেইয়ে একটু যদি জামাকাপড় কিনি দিতি পারি তাইলে অদের মনটা এটু ভালা হয়। তাই ঝন্টুর কাছ থিকে দু’-হাজার টাকা ধার করিসি।’

‘কে ঝন্টু?’

‘ওই তো পাড়ার মোড়ের যে মুদিখানা আসে, শিদুগগা ভাণ্ডার, ওর মালিক। বিশ্বেস না হলে চলেন, আমার সামনেই জিজ্ঞেস করবেন।’

‘আম্মি, তুমি ধার করিস? শুধবে কী করি? আমারে কইলা কাজের বাড়ি থিকে…।’

সাবিনা গুমরে ওঠে।

‘চুপ যা সাবিনা। তোর ছাগুলারে যদি পালতি পারি ধারও শুধব। দরকার হলি আরও কাজ নেব। কিন্তু আমার নাতিগুলাকে আমি কষ্ট পেতি দোবো নে। চলেন ম্যাডাম, আমারে নে চলেন।

‘থাক। কদ্দিন সোমনাথদাদার বাড়ি কাজ করছ?’

চোখের জল মুছে নাজমা বলল, ‘ও বাবা, সে কি আজকের কতা? দশ-বারো বচ্ছর তো বটেই।’

‘সোমনাথবাবুর স্ত্রীকে দেখেছ তুমি?’

‘নাহ! শুনিসি ছেলেপুলে হবেনি বলে মনের দুঃখে নাকি….

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে।’

বাচ্চাটা কান খাড়া করে আছে বলে শিবাঙ্গীই থামিয়ে দিল।

‘ও বাড়িতে আর কেউ আসা যাওয়া করে?’

‘হ্যাঁ।’

‘কে?’

‘মাঝেমধ্যি ফিলিমস্টার আসে। দাদার আত্মীয়স্বজন আসে।’

‘অভিনেত্রী কমলিনী মিত্র আসে?’

‘সেটা কে?’

‘ওই কী যেন গঙ্গাজলের সই নাকি…’

‘ওওওও! অ্যারিনা। হ্যাঁ, তারে এক্কেরে মুখের সামনে দেকিসি। ওই যে ওর যে মুখোশ তৈরি হল, সে জন্যিই তো এয়েসিল। কতকিসু মাখিয়ে দু-দিনে মুখোশটা তৈরি করে দিলে দাদা। আর আমি সেটাই… ছি ছি ছি ছি।’

‘তোমার মেয়ে কোনও কাজ করে না?’

‘কত্তি গেসিল। মাথা ঘোরে খালি। শরীর ভালা না। তাই ও ঘর দেখে। আমি বাইরে।’

‘আজকাল কি পুজোর মার্কেটিং করতে লোকজন অন্য কোথাও যাচ্ছে রে?’

দুটো প্যাকেট হাতে নিয়ে সামনের দিকে এগোতে এগোতে সুচিত্রা প্রশ্নটা করল। দু-পা সামনে এগিয়ে ছিল স্বয়ম্ভু। পিছন ঘুরে মাকে বলল, ‘আসলে ওই খুনের ঘটনাটা সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তার ওপর মিডিয়া তো আছেই। কে কখন খুন হয়ে যায় সেই ভয়ে বোধহয় কেউ বেরোচ্ছে না।’

‘তাই ভাবি। ষষ্ঠীর সন্ধেবেলা গড়িয়াহাট এত ফাঁকা! যদিও আমার মতো অভাগা আর কে আছে যে ষষ্ঠীতে পুজোর বাজার করছে।’

ব্যস, শুরু হল। নাহ, এখনই টপিকটা ঘোরাতে হবে।

‘মা অনেকক্ষণ ঘুরেছ। এবার কিছু খাই চলো।’

‘থাক। আর কিছু বলছি না। টপিক চেঞ্জ করার জন্য ফালতু পয়সা নষ্ট করার দরকার নেই?’

স্বয়ম্ভূ একেবারে বজ্রাহতের মতো মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। ‘কী দেখছিসটা কী?’

‘কিছু না। বলছি, পয়সা নষ্টের কী আছে? তোমার তো বেরোনোই হয় না। চলো, আজ তোমায় ইন্ডথালিয়ায় খাওয়াই।’

রাস্তা পেরিয়ে ইন্ডথালিয়ায় ঢুকতে যাবে, সেই সময়েই কাচের এপার থেকে স্বয়ম্ভুর নজর পড়ল ভিতরে। দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখোমুখি রাজারাম ও শিবাঙ্গী। শিবাঙ্গী চামচে স্যুপ তুলে ফুঁ দিচ্ছে আর রাজারাম টপাটপ খেয়ে চলেছে। হাসছে, গল্প করছে।

‘কী রে ভোলা, চল।’

‘অ্যাঁ? না মা, এখানে ঢুকব না। চলো তোমায় ক্রিস্টাল চপস্টিক্সে খাওয়াই। ওই তো চলো।’

‘উফ, হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে মেরে ফেলবি তো। এখানেই তো ভালো ছিল।’

‘এই তো সামনে এসো না।’

রেস্টুরেন্টে ঢুকে পছন্দমতো একটা টেবিল বেছে বসে পড়ল মায়ে-পোয়ে। পাশের চেয়ারে কেনাকাটার প্যাকেটগুলো রাখল সুচিত্রা। স্বয়ম্ভু অর্ডার দিল, ‘দুটো ফ্রেশ লাইম, সুইট।’

‘কী খাবে বলো মা।

‘তার আগে তুই বল, ওই রেস্টুরেন্টে ঢুকলি না কেন?’

ওটার চেয়ে এটা আরও ভালো তাই। তোমার তো বেরোনো হয় না তাই ভাবলাম তোমায় বেস্ট রেস্টুরেন্টেই খাওয়াই।’

চোখের কোণে হাসি নিয়ে সুচিত্রা বলল, ‘ওই ছেলেটাই রাজারাম, নারে?’

স্বয়ম্ভু ভ্যাবলা হয়ে গেল। ‘কোন ছেলে? কই?’

‘তুই গোয়েন্দা হলে আমি গোয়েন্দার মা।’

‘উফফ! সিরিয়ালগুলো থেকে এইসব ডায়লগ শেখো না?’

‘কী এমন ক্ষতি হত, ওদের পাশের টেবিলটাই তো খালি ছিল।’

আর লুকোবার জায়গা নেই। তাই অগত্যা হার মেনে স্বয়ম্ভু বলতেই বাধ্য হল, ‘আরে মা, দ্যাখো, আমি হলাম ওদের বস। তার ওপরে আবার তুমি আছ। আমাদের সামনে ওরা কম্ফর্টেবল নাও তো হতে পারে তাই না?

‘তুই হয়তো ভুলে যাস ভোলা, যে তুই আমায় নয়, আমি তোকে পেটে ধরেছি। আর শিবাঙ্গীকেও আমি আজ দেখছি না।’

‘আচ্ছা বুঝেছি। এখন খাবার আসছে। পেটভরে খাও। আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি। তুমি যাবে ওয়াশরুম?’

‘না। তোর যাবার দরকার। তুই-ই যা।’

স্বয়ম্ভু আর কোনও কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। সুচিত্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *