৭
ক্লাসের ভিতর বারোর নামতা। একবার করে শ্রীপদ স্যার বাজখাঁই গলায় নামতা বলছেন আর পরক্ষণেই সারা ক্লাস সমবেত কণ্ঠে সুর তুলে একই নামতা আওড়াচ্ছে। কিন্তু ওই এক ক্লাস ছাত্রের মধ্যে লাল্টুর গলা নেই। বাইরে দরজার পাশে চুপটি করে মুখ নীচু করে কান ধরে দাঁড়িয়ে। ইশকুলের স্টাফ, দুয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা এদিক- ওদিক যাচ্ছে আর একবার করে লাল্টুর দিকে তাকিয়ে যাচ্ছে। লাল্টু যেন ভিতর থেকে লজ্জায় দুমড়ে-মুচড়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। ক্লাসের ভিতর নামতা আট ঘর পর্যন্ত যেতেই ঘণ্টা পড়ে যায়। শ্রীপদ স্যার নিজের আসন ছেড়ে উঠে পড়তেই ক্লাসের ভিতর ছাত্রছাত্রীদের গুঞ্জন শুরু। ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে বেশ কটমট চোখে লাল্টুর দিকে তাকান। এমনিতেই কথা বললে মনে হয় মেঘ ডাকল বুঝি! তার ওপর লাল্টুকে একটু বেশিই ভয় পাওয়াতে গলাটাকে একেবারে গভীর এক পাতকুয়োর তলদেশে নিয়ে গিয়ে ফেললেন, ‘কাল থেকে ইশকুল আসতে দেরি হলে আর ক্লাসের বাইরে নয়, হেড স্যারকে বলে একেবারে স্কুলের বাইরে বের করে দেব। ফাঁকিবাজ ছোঁড়া।’ শ্রীপদ মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। লাল্টু ডেকে উঠল, ‘স্যার!’ বিরক্ত হয়ে মুখ ফেরালেন শ্রীপদ, ‘কী হয়েছে?’
‘বারো এক্কে বারো, বারো দুগুণে চব্বিশ, তিন বারোয় ছত্তিরিশ, চার বারোয় আটচল্লিশ…’
নিজের দুটো কান ধরেই লাল্টুর নামতা গড়গড় করে যত এগোতে থাকে শ্রীপদর ভুরুতে তত ভাঁজ পড়তে থাকে। লাল্টু সাত বারোয় চুরাশি পর্যন্ত গিয়ে আটকে যায়। লাল্টুর চোখদুটো তখনও শ্রীপদর চোখে।
‘তারপর? আট বারো?’
শ্রীপদ জিজ্ঞেস করেন। লাল্টু বলে, ‘ঘণ্টা পড়ে গেল যে। আর তো পড়াননি।’ শ্রীপদ কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত। ক্লাসের অন্যান্য ছেলে বাড়িতে গিয়ে অন্তত দশ- বারোবার পড়েও হয়তো সবটা মুখস্থ করতে পারে না। সেখানে এই ছেলেটা একবার শুনেই গোটা নামতাটা নির্ভুল বলে গেল! শ্রীপদ গম্ভীর বিরক্ত মুখটায় আলো ফুটল। তিনি নিজেই লাল্টুর দুটো হাত কান থেকে নামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সময়মতো ইশকুলে আসবি। যা ক্লাসে যা।’ মাথার চুলটা একটু আদুরে চালে ঘেঁটে দিলেন শ্রীপদ। লাল্টুর চোখমুখ থেকেও লজ্জার রক্তিম আভা মুছে গেছে। কিন্তু স্যার যে বললেন সময়মতো ইশকুলে আসতে। সে কী করে হবে? সকালে করিমচাচার দোকান আর বাজারে যে বড্ড ভিড় থাকে।
‘কী করে পারলি রে?’
লাল্টুর ছোট্ট মাথায় নানান চিন্তার মধ্যে জল ঢেলে দিল বীরু। ভালো নাম বীরেশ। লাল্টু আর বীরেশ একই ক্লাসের বন্ধু। ছেলেটার চেহারা বেশ ভালো। না রোগা না মোটা। বেশ একটা লালিত্য আছে। লাল্টুকে ক্লাসে নিয়ে এসে নিজের পাশে বসাল বীরেশ। ‘তুই আগে থেকে পড়ে রেখেছিলি না রে?’ যেন কোনও গুপ্ত কথা ধরে ফেলেছে এমন করে মিচকে হাসি নিয়ে বলল বীরেশ। লাল্টু এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিল, ‘ধুস।’
‘ঢপ দিচ্ছিস? না পড়লে পারলি কী করে?’
‘স্যার তোদের পড়াচ্ছিলেন সেটাই শুনেছি।’
‘একবার শুনেই অত বড়ো নামতা ঝেড়ে দিলি? কী ট্যালেন্ট রে তোর!’
লাল্টু এবার অবাক। ‘কী? কী বললি?’
‘ট্যালেন্ট ট্যালেন্ট।’
‘সেটা কী?’
‘ট্যালেন্ট মানে গুণ। দিদি শিখিয়েছে আমায়।’
‘কে জানে? আমি ওসব জানি না।’
বীরু কাঁধ নাচিয়ে বলল, ‘ট্যালেন্ট আমারও কিছু কম নেই ভাই। আমিও হেবি ট্যালেন্ট।’
বীরুর দিদি প্রতিভার ইংরিজিটা শেখালেও কাল অনুযায়ী সেটার অদলবদলটা আর শেখায়নি। বীরুর কথায় লাল্টু বেশ আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী ট্যালেন্ট রে?’ টিয়াপাখির মতো আড়চোখে ঈষৎ ঘাড় বেঁকিয়ে লাল্টুর দিকে চেয়ে বীরু বলল, ‘হাফ ইয়ার্লির রেজাল্টটা বেরোক না। দেখতে পাবি।’
***
‘ভোলাআআ… এটা খেয়ে নে তো।’
হাতের তালুতে জোয়ান ঢালতে ঢালতে ছেলের ঘরে ঢুকলেন সুচিত্রা। কিন্তু ঘর ফাঁকা। জোয়ান হাতে নিয়েই থমকে দাঁড়ালেন। বিড়বিড় করলেন, ‘ইসসস! কী করেছে ঘরটাকে। এটা আবার কী?’ ভোলার ঘরে এই জিনিসটা নতুন দেখছেন সুচিত্রা। একটা বড়ো বোর্ডে কতগুলো মহিলার ডেডবডির ছবির সঙ্গে আরও কয়েকটা মানুষের ছবি মারা। পাশে তারিখ লেখা।
কেস ১
২৭ আগস্ট।
ভিক্টিম – লক্ষ্মীরানি মণ্ডল। ৩২ বছর। ৪ ফুট ৯ ইঞ্চি। স্বামী শম্ভুনাথ মণ্ডল। পেশায় রাজমিস্ত্রি। শাশুড়ি কান্তা মণ্ডল। দেখতে জাঁদরেল হলেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
বাস — কবরডাঙ্গা বস্তি।
পেশা — লোকের বাড়ি কাজ করত।
মৃত্যু — ক্যারোটিড আর্টারি কেটে।
সময় — ভোররাতে। কমন টয়লেটে যাবার সময়
থানা — হরিদেবপুর।
ঠিক এইভাবেই পরপর কেসগুলো সাজানো। বোর্ডের কাছে যেতেই রক্তাক্ত মৃতদেহের ছবিগুলো দেখে আঁতকে উঠলেন সুচিত্রা। ‘মা গো! এ সব আবার কী? এই ভোলাআআআ…!’
‘কী হয়েছে মা তুমি এ ঘরে?’
স্বয়ম্ভু ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে ঢুকে এল। ‘এ সব কী করেছিস রে? ঘরটাকে তো লাশঘর বানিয়ে রেখেছিস। এ সব ছবি কেউ শোবার ঘরে টাঙিয়ে রাখে?’
‘মা মা খবরদার বলছি, এগুলো নিয়ে তুমি একদম মাথা ঘামাবে না আর ফোন অফ করে দেবার মতো কোনও অঘটন ঘটাবে না। এগুলো এখানেই থাকবে।’
‘শোবার ঘরে মরা মানুষের ছবি রাখতে নেই ভোলা।’
‘মা এটা আমার কাজ। তুমি যাও ঘুমোতে যাও।’
‘এটা ধর।’
‘কী এটা?’
সুচিত্রার হাতে জোয়ান দেখে স্বয়ম্ভু বলল, ‘নুন দেওয়া তো?’
‘হ্যাঁ, নুন দেওয়া। ধর।’
মায়ের হাত থেকে জোয়ান নিয়ে মুখে ছুড়ে দিল স্বয়ম্ভূ। সুচিত্রা বললেন, ‘এ… এরা কি সব খুন হয়েছে?’
‘হুম।’
সুচিত্রা ভয়ার্ত চোখে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। স্বয়ম্ভু বিছানায় বসে ভুরু কুঁচকে মায়ের হাবভাব লক্ষ্য করছে। ‘কী দেখছ? ঘুমোতে যাও।’
‘এগুলো দেখে কী বুঝলি?’
‘কিছুই বুঝিনি। বোঝার চেষ্টা করছি।’
‘আমি বুঝেছি।’
স্বয়ম্ভু ফিক করে হাসল। মোবাইল স্ক্রোল করতে করতে খানিক তাচ্ছিল্য করেই বলল, ‘কী বুঝলে? খুনি কে?’ নিতান্ত মজা করেই কথাটা বলল স্বয়ম্ভূ। সুচিত্রা বলল, ‘খুন করাটা খুনির পার্ট টাইম জব। সারা সপ্তাহ অন্য কাজ করে।’ কথার রিফ্লেক্সে হাসিমুখেই ভ্রূকুঞ্চিত করে স্বয়ম্ভু বলল, ‘মানে?’
মোড়ের মাথায় ঘুপচি পানের দোকানটা এখনও খোলা দেখে বেশ বিরক্তই হল স্বপ্না। মেয়ে আর শাশুড়ির চোখ এড়িয়ে বাইরে বেরোতে পারলেও ওই ঘুপচি দোকানের মালিকের চোখ এড়ানো যাবে কি? অন্য যে রাস্তাটা রয়েছে সেটা বড্ড অন্ধকার। ভয় করে স্বপ্নার। ওই দোকান থেকেই বোধহয় গানের আওয়াজ ভেসে আসছে। এই রাত তোমার আমার, ওই চাঁদ তোমার আমার। কোনও দিন তো এত রাত পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে না। পচা হঠাৎ আজ কেন যে দোকান খুলে রাখল কে জানে। শাড়ির আঁচলটাকে এক্কেবারে কপালের সামনে থেকে টেনে একটু দ্রুত পা চালাল মেন রোডের দিকে। ঘোমটার আড়াল থেকে দোকানের ভিতরটা দেখার চেষ্টা করল স্বপ্না। পচা একমনে মালপত্র তোলাতুলি করছে। এইবার বন্ধ করবে। কাজ করতে করতে যেই পিছন ফিরেছে অমনি স্বপ্না প্রায় দৌড়ে বিপদসীমা পার করে মেন রোড পেরিয়ে অন্য ফুটে চলে গেল। ময়লা একটা পুঁটলি মাথায় দিয়ে মোটা মহিলাটা এই ফুটেই শুয়ে থাকে। ভিক্ষে করে। এরপর আরও দুজন দীনহীন এসে জুটেছে ফুটপাথটায়। কোনও কোনওদিন আরও বেশ কয়েকজনের নিশীথশয়ন এই রাস্তার পাশের বাঁধানো অংশটুকু। আজ বরং লোক কম। স্বপ্না পেটের কাছে শাড়ির নীচে কিছু একটা ঢেকে সন্তর্পণে খানিক এগিয়ে বাঁদিকের একটা গলিতে ঢুকে গেল। তারপর ল্যাম্পপোস্টের চড়া আলোটা পেরিয়ে আরও কয়েক পা। গলিটা ডানদিকে বেঁকেই বাঁদিকে ঘুরে আরও সরু হয়ে গেল। তিনটে বাড়ি পরেই সবুজ রঙের একটা দোতলা বাড়ি। বেশ পুরোনো। রং চটে গেছে। গ্রিলে জং। পরিচর্যা করা হয় না মোটে। কলিংবেলের সুইচ থাকলেও সেটা বাজে না। গেটে ভিতর থেকে তালা। সেই তালাতেই বারকয়েক ঘা দিতে গ্রিলের সঙ্গে সংঘাতে যে ধাতব শব্দটা বেরিয়ে এল তাতেই ভিতরের দরজা খুলে গেল। ঘরের ভিতর অন্ধকার। ছায়াটা এক পুরুষ মানুষের। তালা খুলে স্বপ্নাকে ভিতর নিয়ে চলে গেল। নিঃশব্দে বন্ধ হল দরজাটা।
গলির অন্ধকারে অপেক্ষমাণ মোবাইলে রাত বারোটা তেরো। আবার যখন দরজা খোলার শব্দ হল তখন মোবাইলে রাত একটা বেজে দু-মিনিট। স্বপ্না বেরিয়ে এল। এখনও তার পেটের কাছে কাপড়ের আড়ালে কিছু একটা আছে। রাস্তায় পা দিয়েই এবার বেশ ভালো জোরে পা চালাল স্বপ্না।
‘ওয়েল ডান রতন। সক্কাল সক্কাল খুব ভালো একটা খবর দিয়েছ।’
রিজেন্ট পার্ক থানার এ এস আই রতন এমন একখানা খবর দিল যে স্বয়ম্ভুর মুখটা শরতের সকালের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘তোমার বস জানেন?’
‘না স্যার, জানাবার চেষ্টা করেছি। ওনার ফোন রিং হয়ে যাচ্ছে। আমি ভাবলাম এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ফেলে রাখাটা উচিত হবে না। তাই সরাসরি আপনাকেই…’
নীরবে হাসল স্বয়ম্ভু। রতন সত্যিই ভালো ছেলে। সঙ্গে যথেষ্ট দায়িত্বজ্ঞান। কিন্তু সবশেষে সেও একজন দোষে-গুণে ভরা মানুষ। যদিও সুরঞ্জন মুনশি আদতে একটি ফুটো কলসি। যত না কাজ করে তার চেয়ে বাজায় বেশি। আর সেটা ভালো করে জানে বলেই রতনও তার বসকে ডিঙিয়ে স্বয়ম্ভুর কানে কথাটা তুলল যাতে কিঞ্চিৎ বেশি হলেও সাধুবাদ জোটে।
‘শোনো রতন, তোমায় আনঅফিসিয়ালি একটা কথা বলি। তুমি এখন যেটা করেছ সেটা অবশ্যই ভালো কাজ। কিন্তু আরও ভালো হত তুমি যদি সুরঞ্জনবাবুকে আগে জানিয়ে তারপর আমাকে জানাতে। সেটা ডেকোরাম। নইলে উনি ক্ষুন্ন হতে পারেন।’
‘উনি তো ফোনটাই তুলছেন না।’
‘কতবার করেছ?’
রতন একটু আমতা আমতা করল। ‘এই বারদুয়েক।’
‘ফোন না তুললে আরও দশবার করো। তুমি আমাকে জানিয়েছ বলবে না, কেমন? বলবে আমি তোমায় ফোন করেছি। বাকিটা আমি সামলে নেব। রাখছি এখন।’
ফোনটা কেটে দিল স্বয়ম্ভু। মর্নিং ওয়াক থেকে ফিরে ঘেমো জামাটা খোলারও সময় পায়নি। সুচিত্রা টেবিলে চা দিয়েছে। ‘কী রে ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।’ স্বয়ম্ভু উত্তর দিল, ‘আসছিইই!’ এ রোজকার ব্যাপার। স্বয়ম্ভূ আবারও মোবাইলটা কানে দিল। ‘মর্নিং!’
ওপার থেকে চোখ ডলতে ডলতে শিবাঙ্গীর উত্তর, ‘মর্নিং স্যার। এনি এমার্জেন্সি?’
‘আমি কি এমার্জেন্সি ছাড়া ফোন করতে পারি না?’
‘এ মা! তা কেন? আমি ভাবলাম…..
‘যাক গে শোনো, মিনতি গুহর প্রতিবেশী ওই স্বপ্নাকে কাল রাতে ট্র্যাক করা হয়েছে। রিজেন্ট পার্কের এএসআই রতন নিজে করেছে। কাল রাতে বেরিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় যায় এবং বেশ খানিক বাদে ফিরে আসে। কোথায় যায় তার অ্যাড্রেসটা আমি টেক্সট করছি। তোমার বাড়ির কাছেই তো। একটু খোঁজ খবর নাও।’
‘ওকে স্যার। আর কাউকে দেখা গেছে?’
‘গেছে। একটি পুরুষ মানুষকে। যে বাড়িতে গিয়েছিল সে সেখানেই থাকে। আর আজকেই ওই স্বপ্নার বাড়িতে তুমি যাবে। দেখো কিছু বের করতে পারো কিনা।’
‘ওকে স্যার তাহলে সকালেই ঢুঁ মারি?’
‘এই শোনো, দিন দিন তুমি ফাঁকিবাজ হয়ে যাচ্ছ খালি অফিসে না আসার ধান্দা তোমার।’
‘না না সেটা কেন? তাহলে কখন যাব বলে দিন।’
‘সন্ধেবেলা। তবে আজ নয়। আগে ওই পুরুষ মানুষটির খোঁজ নাও। তারপর।’
‘কোনও উইক ডেতেই যাব তাই তো?’
শিবাঙ্গী এবার যেন স্বয়ম্ভুর মন পড়ে ফেলেছে। কিন্তু স্বয়ম্ভুও এত সহজে ধরা দেবার বান্দা নয়। ‘কেন উইক ডেজ কেন? ছুটির দিনে নয় কেন?’
‘সে আমি যেতেই পারি তবে সেটা আপনার ঠিক পছন্দ হবে বলে তো মনে হয় না।’
‘কেন?’
‘স্বামীর সামনে স্ত্রীর গোপন অভিসার ফাঁস করলে সংসারে চিড় ধরতে পারে। আর সেটা ধরানোতে আপনার বড়ো আপত্তি।’
ফোনের ওপার থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের খবর আসে শিবাঙ্গীর কানে। স্বয়ম্ভু বলে, ‘শোনো শিবাঙ্গী, তুমি এবার থেকে আমার পেছু পেছু ঘোরা বন্ধ করো তো।
‘কেন স্যার?’
‘বেশি বুঝে ফেলেছ আমায় আর সেটা আমি ঠিক পছন্দ করছি না। শার্প নাইন থার্টি লালবাজারে আমি দেখতে চাই। বাই।
শিবাঙ্গীকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী নিজের মনে হেসে বিছানা ছাড়তেই আবার ফোন। স্বয়ম্ভু।
‘হ্যাঁ স্যার, বলুন।’
‘এই তোমার বাজে বকার জন্য না আমি আসল কথাটা বলতেই ভুলে যাই।’
চোখ কপালে তুলল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু বলল, ‘এই কেসের যে খুনি, সে অন্য কোনও জব করে। আর পার্ট টাইমে খুন করে।’
কথাটার কোনও থই পেল না শিবাঙ্গী। ‘বুঝলাম না স্যার। নিউ লিড?’
ডাইনিং টেবিলে বসে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে স্বয়ম্ভূ বলল, ‘আরে ব্যাটা যে কজনকে খুন করেছে সবকটা শনিবার রাত বারোটার পর মানে ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রবিবারে। যাতে আমাদের ছুটির দিনগুলোর পিণ্ডি চটকানো যায়।’
‘আজব।’
‘তার চেয়েও আজব ব্যাপার আছে।’
‘কী?’
‘ইহা আমার মাতৃদেবী বলেছেন।’
‘মাসি?’
‘ইয়েস।’
‘কীভাবে?’
‘আমার ঘরে খুনিদের লিস্ট আর ডেট দেখে পরপর সিনেমার নাম বলে গেলেন।
চোখ বন্ধ করে মনে করে বলতে লাগল স্বয়ম্ভু, ‘লক্ষ্মীরানি মার্ডার কেস, সাতাশে আগস্ট, দূরদর্শনে সপ্তপদী। দশই সেপ্টেম্বর, শান্তি দাস মার্ডার, দূরদর্শনে গৃহদাহ। এরপর বোধহয় চোদ্দই সেপ্টেম্বর…’
‘না স্যার, চব্বিশে সেপ্টেম্বর।
টক করে চোখ খুলল স্বয়ম্ভু। ‘বাবা, তুমিও কি আমার মতো ঘরে লাশের দিনলিপি ঝুলিয়েছ নাকি?’
‘ওই ক্যালেন্ডারে মার্ক করা আছে।’
‘ওয়াহ! হ্যাঁ, তাহলে হল চব্বিশে সেপ্টেম্বর, বীণা সাহা কেস। সেদিন পাগল প্রেমী। এরপর সুমিতা ধর, আটই অক্টোবর, বেহুলা লখিন্দর। এরপর হল…’
‘ধ্যাত, এই স্মৃতিশক্তি নিয়ে তুই গোয়েন্দা হয়েছিস?’
রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে মাঠে নামলেন সুচিত্রা দেবী। ‘আট তারিখে মৌচাক দিয়েছিল। আর তার পরের সপ্তাহে বেহুলা লখিন্দর।’ ফোনের ওপার থেকে শিবাঙ্গী
সবটা শুনে বলল, ‘মাসি তো ফাটিয়ে দিয়েছে।’
‘হ্যাঁ, কার মা দেখতে হবে তো।’
ভোলার মাথায় একটা খুন্তির বাড়ি পড়ল। রঙ্গ করে মায়ের দিকে চেয়ে হাসল স্বয়ম্ভু।
‘এবার তো তার মানে প্রতি রবিবার আমাদের তটস্থ থাকতে হবে স্যার।’
‘পুজোর মধ্যে আর একটাই রবিবার পড়ছে। ষষ্ঠী।’
কথাটা বলেই চায়ের কাপ ঠোঁটের কাছে আনছিল স্বয়ম্ভু। হঠাৎ মগজে বিদ্যুৎ। ‘মা, ও মা।’
‘কী হয়েছে?’
রান্নাঘর থেকে উত্তর এল সুচিত্রার।
‘এই রবিবার কী সিনেমা দিয়েছে গো?’
‘মহিষাসুর বধ। দীপ্তি রায় দুর্গা আর কমল মিত্র অসুর।’
দেখা তো দূর, স্বয়ম্ভু কখনও নামই শোনেনি এই ছবির।
‘কী ভাবছেন স্যার? এই রবিবার আবার কোনও অসুর বধ হবে?’
‘শিবাঙ্গী, লালবাজার ঢুকতে দেরি কোরো না। কথা আছে।’
ফোনটা কেটে যেতেই আকাশের দিকে তাকাল শিবাঙ্গী। শরতের আকাশে কি কালো মেঘ করল? রোদ্দুরটা হঠাৎ নিভে এল কেন?
ল্যাপটপের স্ক্রিনে সিসিটিভির ফুটেজগুলোয় সজাগ চোখ স্বয়ম্ভুর। পিছনে দাঁড়িয়ে শিবাঙ্গী, রাজারাম ও কৌশিক। শিবাঙ্গীর প্রচেষ্টাতেই রিজেন্ট পার্ক পুলিশ স্টেশন থেকে ফুটেজগুলো সকাল-সকাল লালবাজারে এসে হাজির হয়েছে। গতকাল রাতে স্বপ্নার গতিবিধির অনেকটাই ফুটেজ বন্দি। বাকিটা রতনের অবজারভেশন। কিন্তু ফুটেজ দেখতে গিয়ে আরও একটা গোলমাল চোখে পড়ল স্বয়ম্ভুর। রাত এগারোটা আটান্নয় স্বপ্না নিজের গলি থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে চলে যাবার পরেই একই গলি থেকে আরও একজন বেরিয়ে এলেন। এপাশ ওপাশ তাকালেন। চোখে চশমা। ফুটেজ পজ করে জুম করতেই স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হল না লোকটাকে। একে অপরের মুখের দিকে চাইল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। রাজারাম প্রশ্ন করল, ‘ইনি কে স্যার?’
‘মাস্টারমশাই। ওই অঞ্চলেই থাকেন। কী সাম মুখার্জি।’
‘বাণীকণ্ঠ মুখার্জি।’ শিবাঙ্গী ধরিয়ে দিল।
‘কারেক্ট। এত রাতে ইনি এখানে কী করছেন?’
প্রশ্নটা আওড়েই ফুটেজটাকে আবার চালিয়ে দিল স্বয়ম্ভু। স্বপ্না যেদিকে গেছে বৃদ্ধ বাণীকণ্ঠও সেদিকে পা চালাল।
‘ওনার চোখে কিন্তু বেশ হাইপাওয়ার।’
‘সেটা নিয়েই এই মধ্যরাতে একা একা রাস্তায়।’
‘একবার ডাক্তারের ঘাঁটিটা ঘুরে আসা কি জরুরি স্যার?’
শিবাঙ্গী জানতে চাইল। কৌশিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ডাক্তার?’ কৌশিক আসলে এ ব্যাপারে একেবারেই অন্ধকারে। তাই স্বয়ম্ভু উত্তরটা দিল, ‘বাণীকণ্ঠ মুখার্জির ছেলে ডক্টর দিব্যময় মুখার্জি। হেলথ লাইনের অর্থোপেডিক সার্জেন। সুখ্যাতি আছে লোকটার। অনেক এনজিওর সঙ্গেও যুক্ত। আর শিবাঙ্গী, ডাক্তারকে এই মুহূর্তে বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না। কারণ কোনও গ্রাউন্ড নেই। তার চেয়ে এই মাস্টারমশাইয়ের ওপর একটু নজরদারি জারি রাখো। তার আগে দেখা যাক এই ভদ্রলোক ঠিক গেলেন কোথায়?’ অন্য ক্যামেরার ফুটেজ চলতে শুরু করল। দেখা গেল স্বপ্না যে গলিতে ঢুকল বাণীকণ্ঠও সেই গলিতেই ঢুকে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। উপস্থিত সকলের শিরদাঁড়া টানটান হল। ফুটেজে দেখা গেল মিনিট চারেকের মধ্যে সেই গলি ছেড়ে বেরিয়ে এসে বাণীকণ্ঠ আবার নিজের গলিতে ঢুকে পড়ল। মাত্র চারমিনিটের জন্য কোথায় গেল সে?
স্বয়ম্ভুর মোবাইল ছুটে গেল রতনের কানে। ‘হ্যাঁ স্যার বলুন।’
‘আচ্ছা রতন, যে গলিতে স্বপ্না ঢুকেছিল সেই গলিতে ঠিক কী কী আছে?
‘কী কী আছে বলতে?’
‘মানে শুধু কি বাড়ি নাকি কোনও দোকানপাটও আছে?’
তিন-চার সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে রতন বলল, ‘না স্যার। ওই গলিতে তো কোনও দোকান নেই।’
‘হুম!’
‘কেন স্যার?’
‘আচ্ছা তুমি যখন স্বপ্নাকে ফলো করছিলে তখন বয়স্ক কাউকে চোখে পড়েছে?’
‘না স্যার। আসলে আমি ওই মহিলাকেই…’
‘ওকে ওকে। থ্যাংক ইউ।’
কান থেকে ফোন নামিয়ে স্বয়ম্ভু চিন্তায় ডুবে যায়। শিবাঙ্গী, কৌশিক, রাজারাম সকলেই উদ্বিগ্ন। রাজারাম প্রশ্নও করল, ‘কী হয়েছে স্যার?’ উত্তরে পালটা প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু, ‘সাগর ধরকে ধরেছিলে রাজারাম?’ স্যার কি কোনও কিছু গোপন করতে চাইছেন? ভেবলে গিয়েই উত্তরটা দিল রাজারাম, ‘ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম স্যার।’
‘নতুন কিছু পেলে?’
***
গালভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে সাগর বলল, ‘মাস দুই কি আড়াই আগে বিট্টু এখানে ভাড়া আসে।’ রাজারামের ভুরু কুঁচকে যায়। সাগর বলে, ‘সেই তখন থেকেই আমার বউয়ের মধ্যে কেমন যেন পরিবর্তন হতে থাকে।’
‘কীরকম?’
‘একদিন কাজ থেকে ফিরে দেখি, টিফিন বাটি করে ও কার জন্যে যেন খাবার নিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করাতে ও বলল, আমার একার রোজগারে নাকি সংসার চলছে না। তাই ও এবার হোম ডেলিভারি করবে।
‘আমি মানা কল্লুম। শুনল না। জিজ্ঞেস কল্লুম কাকে খাবার দিস? ও বিট্টুর কথা বলল।’
‘একা বিট্টুকেই দিত?’
‘হ্যাঁ। আমায় বলেছিল আস্তে আস্তে নাকি আরও খরিদ্দার হয়ে যাবে।’
‘দু-বেলা খাবার দিত?’
ওপর নীচে ঘাড় নাড়ল সাগর ধর।
‘বেশ। তোমার বউয়ের কি আলাদা মোবাইল ছিল?’
‘না স্যার। আমি তো আগেই বলেছি আপনাদের। বাড়িতে একমাত্র আমারই মোবাইল।’
‘বউকে মোবাইল দাওনি কেন?’
মাথা নীচু করে চুপ সাগর। ‘কী হল? মোবাইল দাওনি কেন? তা ছাড়া হোম ডেলিভারির অর্ডার আসত কোত্থেকে?’
‘কলি যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল।’
‘কলি কে?’
‘পল্লিশ্রী কেলাব আছে না, ওখানে থাকে। ওই সুমিতার সঙ্গে বিট্টুর আলাপ করিয়ে দিয়েছিল।’
‘সুমিতা মোবাইল কিনে দেবার কথা বলেনি?’
‘বলেছে। আমিই দিইনি। লন্ড্রি চালিয়ে এত পয়সা হয় না আমার।’
‘মদ খাওয়ার পয়সা হয়? মদ খেয়ে বউ পেটানোর ইচ্ছেও হয়?’
‘পরপুরুষের সঙ্গে ঢলানিগিরি কল্পে কোন স্বামীর না রাগ হয় বলুন।’
‘বিট্টুর আগেও কেউ ছিল নাকি সুমিতার?’
‘উম… নাহ!’
উত্তরটা দিতে গিয়ে তোতলাল সাগর। মেজাজ নিল রাজারাম, ‘তাহলে? পাড়ার লোক তো বলেছে তুমি নাকি অনেক দিন ধরেই সুমিতাকে মারধোর করো। বউকে হসপিটালে ভর্তিও করতে হয়েছিল।’
সাগরের গলার স্বরে এবার যেন বান ডাকল। মিউ মিউ ছেড়ে জোর গলায় বলে উঠল, ‘বউটা বড়ো বেয়াড়া ছিল স্যার। আমার একটা কথাও শুনত না।’
‘যেমন?’
‘সব সময় খালি পয়সা-পয়সা আর পয়সা। আর সেই পয়সার ছুতোয় খালি বাইরে যাবার ধান্দা।’
‘মানে?’
‘কোথায় ওর কোন বন্ধুর কাপড়ের দোকান আছে। সেখানে নাকি ও সেলাই করবে। পয়সা রোজগার করবে। সেখানে মানা করতেই বায়না ধরল ও নিজে ফলস পাড় বসাবে। সেই জন্যে ওকে লোকের বাড়ি থেকে অর্ডার ধরতে হবে। সেখানেও মানা করতে আমার সঙ্গে রোজ অশান্তি কোত্ত জানেন স্যার! সবসময় এক কথা, আমি আর পারছি না। মেয়েমানুষের অত পয়সার লোভ কীসের তা তো বুঝি না।’
‘লোভ হবে কেন? সুমিতা তো সংসারের ভালোর জন্যেই রোজগার করতে চাইত।’
‘আমি যা করি তাতেই যথেষ্ট স্যার। তা সে মাগি শু… সরি… সুমিতা কিছুতেই শুনত না। তারপর এই হোম ডেলিভারি করতে গিয়েই তো প্রাণটা খোয়াল।’
‘বিট্টু কবে কী খাবে সে অর্ডার কি তোমার মোবাইলেই দিত নাকি?’
‘না না। অর্ডার দেবে কী? পেটরোগা মাল তো। খেলেই নাকি অম্বল, চোঁয়া ঢেঁকুর এ সব হত। তাই রোজ মাছের ঝোল খেত।
‘বাজার কে করে দিত?’
‘সুমিতাই যেত।’
‘বিট্টুর সঙ্গে যে সুমিতা মেলামেশা করে সেটা তুমি জানলে কী করে?’
‘পোথম পোথম আমার সন্দেহ হত। তারপর একদিন দেখি, সুমিতা মাঝরাতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল।’
‘ওয়েট। মাঝরাতে? তুমি তো মদ খেয়ে এসে লাট হয়ে পড়ে থাকো।
‘সেদিন মদটা একটু কমই খেয়েছিলাম। তাই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু কিচ্ছু বলিনি। এর পরেও আরেকদিন বেরিয়ে যায়। আমিও সুমিতার পেছু নিই। দেখি অত রাতে সুমিতা ওই বিট্টু হারামজাদার বাড়ি ঢুকল। সেদিন পনেরো মিনিট বাদে বাড়ি এল। হাতেনাতে ধরলাম। সুমিতা বলল ও নাকি টিফিন কেরিয়ার ফেরত নিতে গিয়েছিল। আমার মাথায় রাগ উঠে গেল। মাঝরাতে বাড়ির বউ নাকি পরপুরুষের বাড়িতে টিফিন কেরিয়ার নিতে গিয়েছিল! এটা মানা যায় বলুন?’
‘সে তো ঠিক। তারপর? আচ্ছা করে দিলেন তো বউটাকে?’
সাগর ঢোঁক গিলল।
‘আপনাদের কোনও বাচ্চাকাচ্চা হয়নি?’
সাগরের চোখের পাতাটা এক ঝটকায় উঠেই নেমে গেল। রাজারাম প্রশ্ন করল, ‘এখন তো অনেকরকম ওষুধ বেরিয়েছে। ডাক্তার দেখিয়েছিলেন?’
‘অত পয়সা কোত্থেকে পাব?’
‘কেন? এই যে বললে তোমার রোজগারেই চলে যায়। মেয়েমানুষের অত রোজগারের কী আছে? সুমিতা হয়তো এটার জন্যেই পয়সা রোজগার করতে চাইত।’
সাগরের মুখের ভাব দেখে রাজারাম বুঝতে পারে সে বোধহয় সঠিক কারণটাই আঁচ করতে পেরেছে। ‘বিট্টুর সঙ্গে কথা হয়েছে এ নিয়ে?’
‘না। ওকে বলে কী করব? নিজের ঘরই যখন ঠিক নেই।’
‘তুমি তো পুলিশের কাছে বলেছ ওই বিটুই নাকি সুমিতাকে মেরেছে। কী তাই তো?’
‘হ্যাঁ স্যার। আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে ওই মাঝরাতেই দেখা করতে গিয়ে…
‘কিন্তু কেন? সুমিতার সঙ্গে যদি বিট্টুর মেলামেশাই থাকে তাহলে খুব বেশি হলে সুমিতাকে নিয়ে পালাবে বিট্টু। মারবে কেন?’
সাগরের কালো ঠোঁটে রাঙা হাসি। ‘স্যার, বর হল পার্মানেন্ট চাকরি। আর প্রেমিক হল ফিল্যান্স। আজ আছে কাল নেই। তাই হয়তো সুমিতাই পালাতে চায়নি।’
‘বিট্টু কী কাজ করত জানো?’
‘বাড়ি থেকেই কিছু একটা করত। বেরিয়ে কামকাজ কিছু করতে তো দেখিনি। সুমিতা তো দু-বেলা খাবার দিতে যেত।’
সাগর ধরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাজারাম বিট্টু যে বাড়িতে ভাড়া থাকত সেখানে হাজির হতেই বাড়িওয়ালার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। লোকটার ওজন কম করে একশো দশ থেকে কুড়ির মধ্যে হবে। দৈর্ঘ্যে স্বাভাবিক আর প্রস্থে অস্বাভাবিক। প্রেশার যে ভালোই আছে সেটা কপালের ঘাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শুকনো কপালে দরজা খুলে পুলিশের লোক দেখেই কপাল ভিজে উঠেছে। ‘দেখুন, হাতজোড় করে বলছি। এর থেকে আমাদের রেহাই দিন। যা বলার সব লোকাল থানাকে জানিয়েছি। কাইন্ডলি জেনে নেবেন।’ হাতজোড় করে কথাগুলো বললেন লোকটি। রাজারাম বেশ শান্ত হয়ে বলল, ‘মৃণালবাবু, আপনারা না জেনেই একজন খুনিকে বাড়িতে জায়গা দিয়েছিলেন। সেই খুনি এখনও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কে বলতে পারে, রাতের অন্ধকারে আপনাদের ঘরে এসেই আবার সে উপস্থিত হল।’
‘মা… মানে? আমাদের এখানে আসবে কেন? আ…আমরা এ সবের মধ্যে নেই স্যার। বিশ্বাস করুন।
‘আরে আরে উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? বেকার প্রেশার বাড়াচ্ছেন।
মৃণালের ভারি শরীরটায় হাঁফ ধরেছে। রাজারাম আরও শান্ত হয়ে বলল, ‘আপনাদের ভালোর জন্যেই বলছি দাদা, আমি য। জিজ্ঞেস করব একটু তার জবাব দিন।’ অনেক বলা কওয়াতে রাজি হলেন মৃণাল। ‘নতুন করে আর কী জানতে চান?’
‘বিট্টু কোথায় কাজ করত বলেছিল কিছু?’
‘হ্যাঁ। প্রথমে বলেছিল কাজ খুঁজতে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। তার ঠিক দু-দিন, না, তিন-চারদিন বাদে বলে কোন একটা ইনশিওরেন্স কোম্পানিতে কাজ পেয়েছে। বাড়িতে বসেই ফোনে ফোনে নাকি ক্লায়েন্ট জোগাড় করে দিতে হবে।
‘কোম্পানির নামটা কি বলেছিল?’
‘দাদা পা-টা একটু তুলে বসুন দিকি।’
বাড়ির কাজের মেয়েটা ঘর মুছছিল। তার কথাতেই মৃণাল পা-দুটোকে সোফার ওপর কষ্ট করে তুলে বলল, ‘হ্যাঁ কী একটা বলেছিল। সত্যি বলতে আমাদের ওসব মনে নেই। মাস গেলে সময়মতো ভাড়া পেলেই হল।’
‘বিট্টুর কাছে কে কে আসত কিছু জানেন?’
‘না। ওসব নজর করার টাইম হয়নি আমাদের। আসলে ভাড়াটের দরজাটা আমাদের ঠিক উলটোদিকে তো।’
‘বুঝলাম। কিন্তু তাও, কখনও আসা যাওয়ার পথেও মানুষের চোখে পড়ে, সেরকম কিছু?
কথাটা শেষ হতেই ভেজা ন্যাতাটি সপাত সপাত করে রাজ’রামের পায়ের আশপাশে পাক খাচ্ছে দেখে নিজেই পা-দুটো তুলে দিল। কাজের মেয়েটি চটপট মুছে সরে গেল। মৃণাল ততক্ষণে বুকের ওপর বসানো ফুটবলের মতো মাথাটাকে এধার- ওধার নাড়িয়ে কিছু যেন ভাবল। ‘একদিন সন্ধেবেলা দোকান থেকে ফিরছিলাম। তখন একটি ছেলেকে দেখেছিলাম। ব্যস।’
‘কীরকম দেখতে?’
‘বলা মুশকিল। ছেলেটার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। সেটা দিয়ে মাস্কের মতো নাক থেকে ঢাকা ছিল।’
‘লম্বা না বেঁটে?’
‘বেঁটে না। আবার একেবারে ঢ্যাঙা লম্বাও না। এই আপনার কাঁধের কাছে হবে।’
‘ফর্সা না কালো?’
‘আলো থাকলে তবে তো বুঝব?’
‘বাড়ির ওই দিকটা আলো নেই?’
‘আছে। কিন্তু সেদিন জ্বালায়নি।’
‘কী পরেছিল?’
কাজের মেয়েটির হাতের ন্যাতা আচমকাই থেমে গেছে। হাতের চুড়ি, কোমর আর বুকের কাপড় ঠিক করার অছিলায় কাজে যেন একটু ঢিলে দিয়েছে। মৃণালবাবু জানান, ‘শার্ট প্যান্টই পরা ছিল। রং বলতে পারব না। তবে একটা জিনিস, চুলটা বেশ কায়দা করে কাটা।’ রাজারাম চিলতে সূত্র পেতেই মৃণালবাবুর দিকে একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে, ‘কায়দা করে মানে? কীরকম কায়দা?’
‘এই আজকালকার ছেলেপিলেরা যেমন কাটে আরকি। মাথার দু-পাশে দু-তিনটে করে সিঁথি। মাঝখানটায় চুলগুলো ঠাস হয়ে ফুলে থাকে। ও হ্যাঁ, এক কানে দুল ছিল।’
‘কোন কানে?’
চোখের চাউনি ছোটো করে অতীতের দৃশ্যটাকে যেন পুনরায় দেখতে চেষ্টা করেন মৃণালবাবু, ‘আমার ডানদিকে… মানে ওর বাঁ কানে। না না, সরি। ছেলেটি আমার উলটোদিকে পাস করছিল মানে ওরও ডান কান। হ্যাঁ, ডান কানে দুল। বাঁ কানে ছিল কিনা জানি না।’
‘এই ছেলেটি ছাড়া আর কেউ আসত?’
‘আসত মানে ওই সুমিতাই আসত দু-বেলা খাবার দিতে।’
‘কতক্ষণ থাকত?’
‘অতশত আমি জানি না।’
‘রাতেও আসত?’
‘হ্যাঁ।’
‘কখন?’
‘দশটায়।’
‘তারপর?’
এবার মৃণালবাবু বেশ অস্বস্তিতে পড়েন। ‘আমরা তো শুধু এই দুটো সময়ই জানতাম। ঘটনাটা ঘটার পর তো শুনলাম মাঝরাতেও নাকি…! পাড়ার লোকে দেখেছে।’
‘কোন লোক দেখেছে? না মানে অত রাতে তো সবাই পাড়ায় ঘোরাঘুরি করে না। নিশ্চয়ই একজন বা দুজন।’
‘সামনের বাড়ির ছেলেটি প্রতিদিনই কাজ থেকে রাত করে ফেরে। সেই-ই দু- তিনদিন নাকি দেখেছে। এ নিয়ে পাড়ায় কানাঘুষোও কম হয়নি।’
‘অনেক ধন্যবাদ মৃণালবাবু।’
রাজারাম হাতজোড় করে উঠে পড়ে। বাড়ি ছাড়লেও পাড়া ছাড়ে না। বাড়িটার ওপর নজর রেখে দাঁড়িয়ে থাকে বেশ খানিকক্ষণ। মিনিট দশেকের মধ্যেই রাজারামের অভীষ্ট পূরণ হয়। কাজের মেয়েটি নিজের মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে যেই কানে দিয়েছে অমনি রাজারাম তার সামনে গিয়ে হাজির। সেই মহিলাও কান থেকে ফোন নামিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে।
‘কী নাম তোমার?’
‘ক…কেন স্যার?’
মেয়েটি বেশ ভয় পেয়েছে।
‘আজব। কেন আবার কী? তোমার নাম আছে তো নাকি?’
‘খেয়ালী।’
‘খামখেয়ালী না বদখেয়ালী?’
কথাটা বলেই রাজারাম নিজেই যেন একটু থমকাল। এইভাবে কোনওদিন ও কথা বলত না। স্বয়ম্ভুর সঙ্গে থাকতে থাকতে তার ধারাই কেমন করে যেন রাজারামের রক্তে ঢুকে পড়ছে।
‘মানে?’
খেয়ালীর সঙ্গে হেঁয়ালিটা বেশিই হয়ে গেছে। সোজা রাস্তায় আসে রাজারাম। ‘খেয়ালী কী? দাস, ঘোষ, দত্ত…’
‘নস্কর।’
‘খেয়ালী নস্কর। সুন্দর নাম। আচ্ছা খেয়ালী তুমি কি এখানেই থাকো?’
‘থানার পাশ দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে ওখান দিয়ে গেলেই আমার পাড়া।’
‘বেশ। এ বাড়িতে কদ্দিন কাজ করছ?’
‘তা হবে বছর দুয়েক। আমি আসি স্যার, কাজের বাড়িতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
‘চটপট কতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দাও। ছেড়ে দেব।’
কাপড় দিয়ে গলার কাছের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে নিল খেয়ালী। রাজারাম প্রশ্ন করল, ‘বিট্টু দেবনাথ আর সুমিতা ধরের মধ্যে কেমন সম্পর্ক ছিল?’
খেয়ালী চুপ।
‘চুপ থাকলে তোমারই দেরি হবে খেয়ালী।’
‘আমি অত কথা কী করে জানব স্যার?’
‘আর আমি যদি বলি তুমি সব জানো।’
মহা ফ্যাসাদে পড়েছে খেয়ালী। ‘আমি? আমি কী করে জানব স্যার?’
‘যে কথা সারা পাড়ার লোক জানে সেটা তুমি জানো না? বেশ তাহলে থানায় ডেকে পাঠাচ্ছি তোমায়। ওখানে বলবে।’
বিচলিত হয়ে পড়ল খেয়ালী। কাকুতিমিনতি করে থানায় যাওয়াটা আটকাল। রাজারাম চাপ দিল। কিন্তু-কিন্তু করে খেয়ালী বলল, ‘দু-বেলা খাবার দিতে আসত। ওর হাতের খাবার ছাড়া বিট্টুবাবুর নাকি মুখে ভাত রুচত না। আসলে ব্যাপার ছিল অন্য। দুজনের মধ্যে পেমপীরিতি ছিল। নইলে খাবার দিতে এসে অতক্ষণ ঘরে কী কোত্ত ওই বউ? শুনেছি নাকি মাঝরাতেও যাতায়াত ছিল।’
‘তার মানে সুমিতার চরিত্র ভালো ছিল না!’
‘না স্যার। ওই বউ খারাপ নয়। বদ তো ওর বরটা।’
‘সাগর? কেন? ও বদ কেন?’
‘ওই তো জোর করে বউটাকে বিট্টুর কাছে পাঠাত। খাবার দেবার জন্য। হোম ডেলিভারি স্যার। ওই জামাকাপড় ইস্তিরি করে আর কত রোজগার হয়? তার ওপর বরের মদের খরচ। তাই বউটাকে কাজে লাগাত। নিঘঘাত খারাপ কাজও করাত স্যার। নইলে বউটাকে কেন মাঝরাতে পাঠাবে বলুন তো?’
‘সুমিতা বাধা দেয়নি?’
‘অশান্তি কোত্ত তো। ওদের পাশেই দত্তদের বাড়ি। ওদের বউটাই তো এ বাড়ির বউদির কাছে এসে গল্প করেছে।’
‘এ বাড়ির বউদি মানে? মৃণালবাবুর বউ?’
‘হ্যাঁ গো স্যার।’
‘কী গল্প?’
‘একদিন নাকি ওই দত্তবাড়ির বউটা শুনেছে। সুমিতা চিৎকার করে বলছিল, তুমি আমায় বেশ্যা বানিয়ে ছেড়েছ। আমি আর শরীর বেচতে পারব না। তার পরদিন রাতে নাকি আবার অশান্তি হয়েছিল। সেদিনই তো বউটাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল সবাই। এমন মেরেছিল মাথা ফাটিয়ে, হাত ভেঙে একেবারে যা তা করেছিল।’
‘পুলিশকে জানায়নি কেউ?’
‘বউটা নাকি আপত্তি করেছিল। আসলে বউটার বাপের বাড়ির জোর নেই তো। ভাইরা দেখে না। বর তাড়িয়ে দিলে যাবে কোন চুলো? তাই আর কেসখামারি কিছু হয়নি।’
***
‘তার মানে সাগর ধর পয়লা নম্বরের ঢপবাজ।’
নিজের চেয়ারে বসেই কথাটা বলল স্বয়ম্ভু।
‘খেয়ালীর কথা অনুযায়ী সেটাই দাঁড়ায়। কিন্তু কলি বলে যে মেয়েটি সুমিতাকে বিট্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল, আদৌ সেটা যদি সত্যি হয় তাহলে তার সঙ্গে কথা বলাটা জরুরি। সেও যদি একই কথা বলে তাহলে সাগর ধরকে তুলে আনতে হবে।’
‘কথা বলেছ?’
‘কলি বাড়িতে নেই। ও ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে। মডেল শুট, মেকআপ। এ সব কাজ করে। সে কাজেই নর্থ বেঙ্গল গেছে। দু-দিন বাদে ফিরবে।
‘হুম। সাগরের কথা অনুযায়ী বিট্টু ছেলেটি পেটরোগা। মাছের ঝোল ছাড়া কিছুই খায় না। তাহলে সুমিতার লাশের পাশে কাটলেটের বিল কার? মৃণালবাবু একটি ছেলেকে মুখ ঢাকা অবস্থায় বিট্টুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে। গরমের মধ্যে গলায়, মুখে কেন কাপড় জড়ানো?’
স্বয়ম্ভু মনে মনে অঙ্ক মেলাবার চেষ্টা করছে। শিবাঙ্গী বলে ওঠে, ‘তৃতীয় কোনও ব্যক্তি?’
‘সম্ভব। বিট্টু শুধু খেলার পুতুল মাত্র।’
রাজারাম বলে, ‘কিন্তু স্যার, এর দরকারটা কী? খুনির মোটিভ যদি হয় অত্যাচারিত যারা হবে তাঁদের খুন করা তাহলে বিট্টুকে দিয়ে কি ফাঁদ পাতবে?’
‘সেটাই ভাবাচ্ছে রাজারাম। এদ্দিন সোজাসাপ্টা একটা হিসেব ছিল যে বিট্টু অবৈধ প্রেমিক। সেই কোনও কারণে সুমিতাকে মেরেছে। মারবেই যদি প্রেমের অভিনয় করার কী ছিল? এদিকে মার্ডার ওয়েপন চলেছে গলার ডানদিক থেকে বাঁদিকে। খুনি বাঁ হাতি।’
‘ওয়েট ওয়েট ওয়েট।’
শিবাঙ্গীর হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়েছে। ‘স্যার, বিট্টু ডান হাতি। কারণ সেদিন আমাকে মেরে পালাবার সময় প্রতিটা মুভমেন্ট ওর রাইট হ্যান্ড দিয়েই ছিল।’
স্বয়ম্ভু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘সাগর ধরকে তুলে আনো। সব সত্যি কথা ওর মুখ দিয়ে স্বীকার করাতে হবে। আমার মনে হয় ও আরও কিছু লুকিয়ে যাচ্ছে।’
‘ওকে স্যার।’
‘শিবাঙ্গী, মুনশিকে একবার কল করে জানতে চাও তো, প্রকাশের মামি আজ কখন এসে ওকে নিয়ে যাচ্ছেন? প্রকাশের প্রতিটা আপডেট আমায় দেবে।’
‘এখুনি জিজ্ঞেস করছি।’
স্বয়ম্ভুর চোখ কৌশিকের দিকে পড়ায় কোনও প্রশ্ন করার আগেই কৌশিক আগবাড়িয়ে বলতে শুরু করে। ওর দায়িত্ব ছিল দীননাথের সম্পর্কে খবর নেওয়া। কিন্তু শুরু থেকে যা যা বলতে শুরু করল কৌশিক তা পুরোনো তথ্যের পুনরাবৃত্তি।
‘তোমায় তো দীননাথের ফাইল মুখস্থ করতে বলিনি কৌশিক। এগুলো আমরা সবাই জানি। নতুন কিছু পেলে কি?’
‘নতুন বলতে স্যার ওই এম এল এ-র ছেলে ক’দিন হল মঞ্জুর বাড়ির দিকে যায়নি।’
‘জানতাম। শালার পোঁদে প্রচুর ভয়। সরি শিবাঙ্গী।’
‘নো ইস্যু।’
অন্ধকার জগতের কীটপতঙ্গ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলেও স্বয়ম্ভুর মধ্যে এখনও সাধারণ সভ্যতাটুকু বজায় আছে যা এই জগতে কাজ করলে ধরে রাখা ভীষণ কঠিন। আর ঠিক এই বোধগুলোই শিবাঙ্গীকে আকর্ষিত করে।
‘ভালো করে স্টাডি করো কৌশিক। দীননাথ শান্তি দাসকে মারেনি। ওই এম এল এ-র ছেলেও না। তার মানে এখানেও থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নম্বর আছে। আছেই। কিন্তু সে কে?’
কৌশিককে কথাগুলো বললেও স্বয়ম্ভুর নজর ছিল শিবাঙ্গীর দিকে। চোখের তারায় অদ্ভুত একটা চঞ্চলতা। ‘কিছু বলবে শিবাঙ্গী?’ শিবাঙ্গী চমকাল না। কারণ এমন মন পড়ে নেওয়ার পরিস্থিতি এই প্রথম নয়। ‘বলছিলাম, এই সানডে কি আমরা স্পেশাল কিছু করছি স্যার?’
‘করছি। আরেকটা খুনের অপেক্ষা।’
‘মানে?’
প্রশ্নটা রাজারামের।
‘খুনি বেছে বেছে রবিবারেই বা শনিবারের মধ্যরাত্রির পর খুন করছে। পুজোর মধ্যে ষষ্ঠী পড়েছে রবিবারে। চারপাশে পুজোর ভিড়। তার মধ্যে একটা দুটোকে টপকে দেওয়া শক্ত কিছু নয়।’
কথাটা বলে দুটো কনুই টেবিলের ওপর রেখে করতল দিয়ে নিজের মুখ ঢাকল স্বয়ম্ভু। ‘এর আগের কেস দুটো কঠিন থাকলেও কিছু না কিছু লিড ছিল। কিন্তু এই কেসে আমরা কেবল এলোপাথাড়ি হাতড়ে চলেছি। কোনদিকে যাব জানি না। যারা মরছে তারা কেউ পুলিশের কাছে যাচ্ছে না অত্যাচারীর সম্পর্কে নালিশ করতে। সেটা যদি হত তাহলেও না হয় খড়ের গাদায় একটা হলেও সূচ খুঁজে পাওয়া যেত। বড্ড অসহায় লাগছে।’
মুখের ওপর থেকে হাত সরাল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘কাটলেটের স্লিপটা থেকে কিছু পাওয়া যায়নি?’ স্বয়ম্ভু বলল, ‘ক্যাশে পেমেন্ট যারা করেছে তাঁদের নম্বর…!’ বলেই নিজে চুপ করে গেল স্বয়ম্ভু। কাউকে যেন দেখতে পেল ঘরের দরজার বাইরে। শিবাঙ্গী, কৌশিক আর রাজারাম বাইরের দিকে তাকাল। কাউকেই দেখতে পেল না। হঠাৎ স্বয়ম্ভু বলে উঠল, ‘থ্যাংক ইউ শিবাঙ্গী। থ্যাংকস আ টন।’ বিদ্যুৎগতিতে চেয়ার থেকে উঠে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু।
একইরকম বিদ্যুৎগতিতে প্রদ্যুতের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। ‘আটই অক্টোবর, বিকেল চারটে উনিশ মিনিটে গোলপার্কে মিত্র ক্যাফের লোকেশনে যতগুলো মোবাইল অ্যাক্টিভেট ছিল তার ডিটেলস আমার চাই। জাস্ট মিত্র ক্যাফের লোকেশনেই।’
‘ওকে স্যার।’
বলা মাত্রই ল্যাপটপের সফটওয়্যার তার কাজ শুরু করল। মিনিট চারেকের মধ্যেই প্রদ্যুৎ জানাল সেদিন ওই সময় মিত্র ক্যাফের দুশো মিটারের মধ্যে একশো বারো থেকে পঁচিশটা মোবাইল অ্যাক্টিভেট ছিল। আসলে আপ ডাউন করছে। কারণ কেউ হয়তো পাস করেছে সেই সময় তখন তার টাওয়ারও ধরে নিচ্ছে।
‘এদের নম্বরের মধ্যে যারা অনলাইন পেমেন্ট করেছিল তাঁদের নম্বর আছে নিশ্চয়ই?’
‘চেক করে বলছি।’
সময় লাগল দশ মিনিট। প্রতিটা নম্বর আছে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘এবার বাকিদের ডিটেইলস আজ ইওডির মধ্যে চাই।’ প্রদ্যুৎ একটু ব্যোমকে গিয়ে সুর টানল, ‘ওওওকে স্যার!’ স্বয়ম্ভু মনে মনে হাসল। সঙ্গে সঙ্গে হাঁক দিল, ‘সুকুমারদা…!’ ওই সেদিন যে শব্দ করে হাই তুলে স্বয়ম্ভুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তিনি ফাইলপত্র থেকে মুখ তুলে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ স্বয়ম্ভু বলো।’
‘প্রদ্যুৎকে একটু হেল্প করে দিন।’
‘আচ্ছা।’
হঠাৎ ঘরের মধ্যে টিক টিক টিক টিক শব্দ। সাইবার বিভাগেরই আরেক অল্প বয়স্ক কর্মী বিজয় ডেকে উঠল, ‘প্রদ্যুৎদা বিট্টুর সিগনাল পাওয়া গেছে।’ খবরটা অন্ধকারে চিলতে আলোর মতোই ঠিকরে এল স্বয়ম্ভুর চোখে। ছুটে এল বিজয়ের ল্যাপটপের কাছে।
‘কোথায় দেখাচ্ছে।’
প্রদ্যুৎ জিজ্ঞাসা করল।
‘খিদিরপুর সুইং ব্রিজ।’
‘মুভিং?’
স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন।
‘না স্যার। একটা জায়গাতেই।’
‘অপারেটরকে বলা আছে?’
‘হ্যাঁ স্যার। এই নম্বরের সব কল রেকর্ড আমাদের পাঠাবে।’
‘আর যদি শুধু হোয়াটসঅ্যাপ বা এস এম এস করে?’
প্ৰদ্যুৎ বলল, ‘শোভনকে ইনফর্ম করা আছে।’
‘ফাইন।’
স্বয়ম্ভু সঙ্গে সঙ্গে শিবাঙ্গী, রাজারাম ও কৌশিককে ডেকে নেয়। সকলে সাইবার সেলে আসার আগেই প্রদ্যুতের মোবাইল বেজে ওঠে। শোভন কলিং। ‘হ্যাঁ শোভন বল।’
‘এই মাত্র বিট্টুর নম্বরে টেক্সট এসেছে। তোকে ফরোয়ার্ড করেছি।’
‘ওকে।’
ফোনটা কেটেই প্রদ্যুৎ নিজের ফোন দেখে। শোভন স্ক্রিনশট পাঠিয়েছে। সেটা দেখেই প্রদ্যুতের নাকের কাছটা বিস্ময়ে কুঁচকে এল।
‘কী পাঠিয়েছে প্রদ্যুৎ?’
‘রিডল।’
‘দেখি।’
স্বয়ম্ভু মোবাইলটা নিয়ে লেখাটা পড়ছে তখনই শিবাঙ্গী, কৌশিক আর রাজারাম
ঘরে এসে ঢুকল। স্বয়ম্ভু দেখল রোমান হরফে বাংলা লেখা। ‘Kalir ghore baro nombor a para sap. 4-99.’ চোখদুটো জ্বলে ওঠে স্বয়ম্ভুর। ‘কোন নম্বর থেকে এসেছে এটা দেখো। ট্র্যাক করো।’ হেঁয়ালিটা সমাধানের কাজে লাগিয়ে দেয় শিবাঙ্গী আর রাজারামকে। কৌশিককে বলে, খিদিরপুর পুলিশ স্টেশনে এখুনি যোগাযোগ করে সুইং ব্রিজে ফোর্স পাঠাতে। তারা যেন আমাদের ডিপার্টেমেন্টের সঙ্গে ওভার ফোন লোকেশন আপডেট নেয়। আদেশ মতো কাজে লেগে পড়ে কৌশিক। এদিকে রাজারাম ও শিবাঙ্গী বিড়বিড় করে নিজের মতো পড়তে থাকে হেঁয়ালিটা। কৌশিক কাজ শেষ করে হেঁয়ালি উদ্ধারে লেগে পড়ে। স্বয়ম্ভু ইতোমধ্যে চার-পাঁচ পাক ঘরের মধ্যেই হেঁটে নিয়েছে।
‘কালীর ঘর! মানে কোনও কালীমন্দির? কালীমন্দিরে শিব থাকে। তার সাপ কিন্তু পারা সাপ! পারা মানে পারদ।’ বলতে বলতে কৌশিক লাফিয়ে উঠল, ‘পারদের শিবলিঙ্গ!’
‘তারপর? ফোর হাইফেন নাইনটি নাইন? সাপের আগে বারো নম্বরই বা কি?’
স্বয়ম্ভু পালটা প্রশ্ন করল। মাথা চুলকে নিল কৌশিক।
শিবাঙ্গী ভেবে চলেছে। স্বয়ম্ভু রাজারামের দিকে তাকাল। সেও চুপ। ‘রাজারাম তুমি কিছু বলবে?’ স্বয়ম্ভুর দিকে তাকিয়ে রাজারাম বলল, ‘স্যার, মা কালীর মন্দিরে খুন হবে? খুনি শিব সেজে মূর্তির আশপাশেই থাকবে। যাকে মারবে সে এলেই… সাপের বিষ দিয়ে খুন করবে?! মানে খুনি প্যাটার্ন চেঞ্জ করছে?
হাল ধরল শিবাঙ্গী, ‘আবারও সেই একই প্রশ্ন, ফোর হাইফেন নাইনটি নাইন! সেটা কী? না স্যার, এটা একটু অন্যকিছুই ইন্ডিকেট করছে।’ কৌশিকের বিশ্লেষণ সমূলে ধ্বংস হওয়াতে একটু ক্ষুন্নই হল মনে হয়। ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে উঠল, ‘বিটুর যা বর্ণনা শুনেছি তাতে ওর ঘটে এই ধাঁধা উদ্ধারের বুদ্ধি আছে বলে তো মনে হয় না।
‘খুনি একটা ধুরন্ধর মানুষ। কোনও গাধা নয় যে কোনও অশিক্ষিত অজ্ঞের কাছে অযথা নিজের পণ্ডিতি ফলাবে। ওদের নিজেদের একটা ভাষা থাকে। সেটা ওরাই বোঝে। কিন্তু বিষয়টা হল এটা এক্ষুনি আমাদের উদ্ধার করতে হবে। এটা যে একটা অ্যাড্রেস সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। যদি কালীমন্দিরই হয় তাহলে কোথাকার? অজস্র কালীমন্দির আছে চারপাশে। আমি শিওর। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে জায়গা। ফোর আর নাইনটি নাইনের আলাদা মানে আছে।’
প্রদ্যুৎ ফোনে লোকেশন আপডেট দিচ্ছে খিদিরপুর পি এসকে। স্বয়ম্ভুর কথা প্রায় থামিয়ে দিয়েই বিজয় বলে উঠল, ‘স্যার, নম্বরটা ট্র্যাক করা গেছে। এখনও চালু আছে!’
‘কোথায়?’
‘কামডহরি। গড়িয়াতে।
‘উফফফ! সেই গড়িয়া? কেবল আমাদের ঘরবাড়ির দিকেই হারামিগুলোর নজর থাকে কেন বলো তো? ম্যাও কেসেও। কথাকলির কেসেও।
‘গড়িয়া অবধি যখন চলে গেছে তখন মিশনপল্লি খুব বেশি দূরে নয় স্যার। মাসিকে আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিন।’
‘ব্রেনোলিয়া খাও শিবাঙ্গী। এত তাড়াতাড়ি কথাকলির কেসটা ভুলে গেলে? কামডহরির কোন স্পটে?’
শিবাঙ্গীকে উত্তর দিতে দিতেই চট করে বিজয়ের দিকে ঘুরে গেল স্বয়ম্ভুর প্রশ্নবাণ ‘বাসনাকালী মন্দির।
কৌশিক ও রাজারাম দুজনেই নিজেদের জায়গা থেকে এক পা করে এগিয়ে এল। তার মানে ওদের সন্দেহই সঠিক। শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার আমরা যাই?’
‘স্পটটা কি বাসনাকালী বাড়িতেই বিজয়?’
‘না স্যার, একটু আগে সেখানেই ছিল। এখন বাসনাকালী বাড়ি ছাড়িয়ে যাচ্ছে।’
‘খুনি কী করে জানল যে বিট্টুর ফোন কখন খোলা হবে? ঠিক সেই সময়েই এস এম এস করল?’
‘দেখা করেছিল দুজনে?’
রাজারাম বলে।
‘তাই যদি হবে তাহলে তখনই তো খুনের ঠিকানা বলে দিতে পারত। তা না করে…
বাকি কথাগুলো স্বয়ম্ভুর ভাবনার অতলে তলিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ স্বয়ম্ভু। তারপরেই ঝড়ের মতন বলে উঠল, ‘রাজারাম তোমার খিদে পেয়েছে?’
‘না তো স্যার।’
‘তাহলে তুমি ইমিডিয়েট খিদিরপুর বেরিয়ে যাও। কৌশিক এখানে প্রদ্যুতের পাশে থেকে আমায় আপডেট দেবে। রাজারাম তুমিও তোমার মতো জানাতে থেকো।’
‘শিওর স্যার।’
‘আচ্ছা এই নম্বরটার মালিক কে?’
বিজয় বলল, নেটওয়ার্ক অপারেটরের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছি।
‘জেনে আমায় জানাও। শিবাঙ্গী লেটস গো। ফোর হাইফেন নাইনটি নাইনের রহস্য যেতে যেতে ক্র্যাক করে ফেলব।’
কথাটা বলতে বলতেই অর্ধেক ঘরে পার হয়ে গেল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী রীতিমতো দৌড়োল সঙ্গে রাজারামও। কৌশিক ফ্যালফ্যাল করে ওদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়েই বলে উঠল, ‘ফেলুদা, ব্যোমকেশ, শবর কারুরই মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্ট লাগেনি। এক্সেপশন!’ ঠোঁট ওলটালো কৌশিক। বিজয় আড়চোখে দেখে মুখ টিপে হাসল।
