আয়নাবাড়ি – ৭০

৭০

।। ইসলামাবাদ।।

রাত এগারোটা।

ইসলামাবাদ।

সোবাহান সাহেব অপমানিত মুখে গেস্ট হাউজের ঘরে পায়চারি করছেন। এয়ারপোর্টে তাদের অত্যন্ত শীতল অভ্যর্থনা হয়েছে। সরকারি কোনো উচ্চপদস্থ অফিসিয়াল আসেনি। একজন ক্লার্ক টাইপের ছেলে অপেক্ষা করছিল। কনভয়ও ছিল না কোনো। হোটেলের কাছে এসে সোবাহান ভাঙা ভাঙা উর্দুতে জিজ্ঞেস করেছিলেন আগামীকাল মিটিং ক-টার সময়। ছেলেটা জানিয়েছে সকালেই জানানো হবে।

গেস্ট হাউজের ল্যান্ড লাইন থেকে ওয়াকার সাহেবকে একবার ফোন করেছিলেন। তিনিও ফোন ধরেননি। হাঁটতে হাঁটতে সালাউদ্দিনের ঘরে গিয়ে দরজায় নক করলেন। সালাউদ্দিন দরজা খুলে তাকে দেখে বললেন, ‘আসেন মিয়া। কী বুঝলেন?’

সোবাহান সালাউদ্দিনের ঘরে ঢুকে বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘কিছুই তো বুঝি না। মনে হয় আমরা অগো বান্দির পো। কতকিছু শুনছিলাম। এখানে আইসা তো কিছুই বোঝোন যায় না।’

সালাউদ্দিন তার ফোন এগিয়ে দিলেন, ‘এর জন্য করতাসে। আপনি কিছুই জানেন না।’

ভিডিয়ো চলছে। আনোয়ারের খুনের খবর দেখাচ্ছে ভিডিয়োটাতে। আরেকটু হলেই হাত থেকে ফোনটা পড়ে যেত সোবাহানের। কোনোমতে সামলে নিয়ে বললেন, ‘ওরে খোদা, এ কখন ঘটসে? আমি ফোন পারি না বলে আনি নাই, এর মধ্যে এত কিছু হইল?’

সালাউদ্দিন বললেন, ‘আমি এখন জানলাম। তখন মুস্তাকিনের বিষয়ে এত উত্তেজনা আইছিল, জানতে পারি নাই এইসব হইছে। এই জন্যই হালার পুঁতেরা আমাগো পাত্তা দিতাসে না!’

সোবাহান শ্বাস ছাড়লেন। ভেতরে ভেতরে খুশি হলেন। রজ্জাকদের কালেকশন করা টাকা নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। মিথ্যা কথা বলার পর থেকে প্লেনে উঠে গোটা রাস্তা পেটে একটা অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। এখন সেটা কম কম লাগছে। ঘরের কলিং বেল বাজছে। সালাউদ্দিন উঠে দরজা খুললেন। ক্লার্ক টাইপ ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে স্পষ্ট বাংলায় বলল, ‘আপনাদের আমন খান ডাকছেন। আসুন।’

সোবাহান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন, ‘চলুন সালাউদ্দিন সাহেব। এত রাতে ডাকছেন যখন নিশ্চয়ই কোনো কাম আছে।’

সালাউদ্দিন বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে আর যারা এসেছে?’

ছেলেটা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আপনাদের দু-জনকেই ডাকছেন। চলুন।’

দুজনে বেরোলেন। গেস্ট হাউজের ব্যাঙ্কোয়েট হলে বসে আছে আই এস আই প্রধান আমন খান। তার বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশের বেশি হবে না। অত্যন্ত সুপুরুষ। সোবাহান দাঁত বের করে সালাম দিলেন। তার দেখাদেখি সালাউদ্দিনও একই কাজ করলেন।

আমন খান বিষণ্ণ মুখে বলল, ‘বসুন আপনারা। আজ আমার খুবই দুঃখের দিন। আমার প্রিয় বন্ধু, যে ইস্ট পাকিস্তানকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসত, তাকে খুন করা হয়েছে।’

সোবাহান তার ভাঙা ভাঙা উর্দুতে শোক প্রকাশ করলেন।

আমন বলল, ‘আমি বেশ কয়েকবার ওয়াকার সাহেবকে ফোন করার চেষ্টা করেছি। পাইনি। তিনি কি আপনাদের কারো সঙ্গে কথা বলেছেন?’

সোবাহান বললেন ‘না। আমরাও পাইনি। ফোন ধরছেন না। ভেঙে পড়েছেন হয়তো। আমন বলল, ‘স্বাভাবিক। আমার ধারণা ছিল তিনি মানুষ চিনতে পারেন। দুর্ভাগ্যবশত মুস্তাকিন সাহেবকে চিনতে পারেননি। তিনি লা পাতা হয়ে গেছেন। আপনাদের আমি এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি, পৃথিবীর কোনো প্রান্তে গিয়েই উনি বাঁচতে পারবেন না। আমরা ঠিক খুঁজে বের করব ওকে। আমরা ইস্ট পাকিস্তানে যে বিরাট জয় পেয়েছিলাম, আজ সে স্বাদটা খানিকটা তেতো লাগছে। কোই বাত নেহি, হোতা হ্যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাদের জানাতে এলাম, কাল আপনাদের মিটিং ক্যান্সেল হয়েছে। আপনারা আমার মেহমান, দেশ ঘুরুন, যতদিন খুশি থাকুন, যা খেতে ইচ্ছে হয় খান। শুভ রাত্রি।

আমন উঠে দাঁড়ালো। সোবাহান করমর্দনের জন্য হাত এগোতে গেছিলেন, আমন যেন সেটা দেখেইনি, এমন মুখ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সোবাহান মুখ চুন করে সালাউদ্দিনকে ফিসফিস করে বললেন, ‘আমাগো মানুষ বইলাই মনে করে না।’

সালাউদ্দিন দাঁত বের করলেন, ‘তা কইলে হবে না মিয়াঁ, কন পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’

সোবাহান উত্তর না দিয়ে বিরক্ত মুখে নিজের রুমের দিকে রওনা দিলেন।

সালাউদ্দিনের ফোন বাজছিল। ফোন ধরে কয়েক সেকেন্ড কথা বলেই সালাইউদ্দিন সোবাহানের ঘরের দিকে দৌড়োলেন, ‘মিয়াঁ, সর্বনাশ হয়ে গেছে, রজ্জাক আর আসাদুররে কারা গুলি কইরা দিছে’…

৭১

।। দিল্লি।

কয়েক মাস পরের কথা।

ভোর পাঁচটা। আর পি ঘুমোচ্ছিলেন।

ঘুম ভাঙল রিঙের শব্দে।

আর পি ঘুমঘোরে ফোন রিসিভ করলেন, ‘কে?’

‘কেমন আছেন স্যার? বহুদিন আপনার সঙ্গে কোনো কথাই হয় না, আপনার কথাই মনে হচ্ছিল।’

আর পি বিরক্ত মুখে বললেন, ‘আমার কথা এই ভোরবেলায় মনে পড়ল? ঘুমোতেও দেবেন না নাকি? বলুন কী বলবেন?’

‘কথা তো অনেক কিছুই বলার আছে স্যার। আপনারা আনোয়ারকে মেরে দিলেন। আরিফকে দিলাম, তবুও কাশ্মীরে কিছুই করতে পারলেন না স্যার।’

আর পি উঠে বসলেন, ‘কাশ্মীরে… কী হয়েছে কাশ্মীরে?’

হাসির শব্দ ভেসে এল, ‘সার্চ অপারেশনে কিছুই বেরোয়নি স্যার, তাই না? বানশালের ল্যাপটপও পাননি। তখন টাকা চাইলাম, আপনারা মানলেন না।’

‘বাজে না বকে কী হয়েছে সেটা বলুন।’

‘হবে স্যার। হয়নি।’

‘কী হবে?’

তা আর এখন জেনে কী করবেন স্যার? এই জন্যই তো আমার ফোনগুলো ধরতে হত। যাই হোক, গুড মর্নিং।’

‘হ্যালো… হ্যালো’…

ফোন কেটে গেল।

আর পি হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। মাথায় কিছু আসছে না। তড়িঘড়ি বিদুরকে ফোন করলেন।

একটা রিং-এই ফোন ধরে বিদুর বললেন, ‘গুড মর্নিং। এত ভোরে উঠে গেলে? কী হয়েছে?’

স্যার, ফোন এসেছে।’

‘এদ্দিন পরে?’

‘হইয়া স্যার। কাশ্মীরে কিছু একটা হবে। তখন টাকা দিতে রাজি হইনি, সেই কথাটাও শুনিয়ে দিল।’

‘কোথায় হবে কিছু বলেছে?’

‘না স্যার।’

‘হুঁ, শ্রীনগরই টার্গেট করবে মনে হচ্ছে। এখন সিজন চলছে, প্রচুর পর্যটক যাবে। আমি বলে দিচ্ছি।’

‘স্যার, সব জায়গায় বলে দিন। যেখানে যা আছে।’

‘ঠিক আছে। বর্ডার এলাকাগুলোর ভয়টাই তো বেশি। বিশেষ করে গুলমার্গ-দেখছি আমি।’

‘ওকে স্যার।’

ফোন রাখলেন আর পি। মাথা ভার হয়ে গেছে সকাল থেকেই। ব্যালকনিতে গিয়ে বসলেন। মেসেজ টোন বেজে উঠল, ‘কয়েক মাস ধরে কাশ্মীরেই ছিল স্যার।’

আর পি তড়িঘড়ি রিপ্লাই দিতে গেলেন, ‘লোকেশন দাও। আমি তোমার আগের ডিমান্ড কমপেনসেট করে দিচ্ছি।’

মেসেজ গেল না।

মেসেজটা আবার বিদুরকে পাঠিয়ে দিলেন।

পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই আবার একটা মেসেজ এল তার ফোনে। একটা ছবি পাঠিয়েছে। উর্দুতে লেখা শহীদ আনোয়ার, তোমাকে আমরা ভুলব না। এটা আমরা তোমার জন্য করছি।’

আর পি প্রশান্তকে ফোন করলেন। প্রশান্ত নাইট ডিউটি করছে। ফোন ধরে বলল, গুডমর্নিং স্যার, এত সকালে?’

আর পি বললেন, ‘কাশ্মীর থেকে কোনো কোড ইত্যাদি কিছু পেয়েছ?’

‘না স্যার। কাশ্মীর আজ রাতে ক্লিন আছে।’

‘হতে পারে না। ভালো করে দেখো।’

‘ভালো করেই দেখছি স্যার। কাশ্মীরে কিচ্ছু নেই।’

‘লাস্ট সাত দিনে?’

‘ক্লিন স্যার।’

‘ওকে।’

ফোন রাখলেন আর পি। ঘাম হচ্ছে রীতিমতো।

বিদুর ফোন করছেন। আর পি ধরেই বললেন, ‘প্রশান্তের থেকে জেনে নিয়েছি স্যার। কাশ্মীর ক্লিন বলছে।’

ওপ্রান্ত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ‘ওরা ডিজিটাল মোড ব্যবহার করছে না, তাও হতে পারে। হতে পারে ওরা আভাস পেয়েছে ওদের সমস্ত কথাবার্তা আমরা ডিজিটালি ইন্টারসেপ্ট করে ফেলছি। হতে পারে ওরা এ ক-দিন ওরা কথাই বলেনি নিজেদের মধ্যে।’

আর পি বললেন, ‘তাহলে উপায় স্যার?’

‘ভোর থেকেই শ্রীনগর আর গুলমার্গের তল্লাশি বাড়াতে বলে দেওয়া হয়েছে। চিন্তা কোরো না। এখানে বলে কিছু করতে পারবে না। প্রপাতকে চোখ কান খোলা রাখতে বলো। পরের শিফট কার আছে? শক্তির?’

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘ওকে। ইন্সট্রাকশন দিয়ে দাও। ছোটোখাটো সূত্রও যদি কিছু পাওয়া যায়, সব

উপরমহলে পাঠাতে থাকে যেন।’

‘ওকে স্যার।’

ফোন কেটে গেল।

পুব আকাশ লাল হচ্ছে।

বহুদিন ভেবেছেন কাজটা ছেড়ে দেবেন। অখণ্ড অবসর কাটাবেন। পারেননি।

পারবেনও না হয়তো… কিন্তু এদেশের একটা মানুষেরও রক্তপাত হলে যে ব্যর্থতার দায়ে তাঁর হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হবে, তার দায় কে নেবে?

আর পি চুপ করে বসে রইলেন। আরেকটা দিন। আরেক লড়াই শুরু। কিছুতেই এই যুদ্ধটা হেরে যাওয়া যাবে না।

হারার প্রশ্নই নেই…

***

সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *