৬০
॥ দিল্লি ॥
বিদুর টেবিলে বসে পা নাচাচ্ছেন। তুষার বিদুরের চেম্বারে তার সামনে বসে ল্যাপটপে কয়েকটা ইন্সট্রাকশন মেইল করে ল্যাপটপটা বন্ধ করে বললেন, ‘কাশ্মীরের লিডটা প্রথম আর পি-কে দিয়েছিল না ওরা? আরিফের ব্যাপারে?’
বিদুর মাথা নাড়লেন, ‘রাইট। আর পি-কে দিয়েছিল। কেন?’
তুষার বললেন, ‘আর পি-কে ডাকো। কথা বলি।’
বিদুর আর পি-কে ডেকে নিলেন।
তুষার শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আবার কাশ্মীরে ঝামেলা করার প্ল্যান শুরু করেছে। এখন অবধি কাউকে পাওয়া যায়নি। বিনিময় প্রথা চালু করো বিদুর। নইলে আবার বড়ো কিছু হবে আমরা অন্ধকারে থেকে যাব। এই অপদার্থতার দায় আমি নিতে পারব না।’
বিদুর বললেন, ‘লাস্ট ছ-মাসে তেরোটা বড়ো অপারেশন করেছি আমরা। ওই তেরোটা লোক ধরা না পড়লে কাশ্মীরে এমনিতেই বড়ো কিছু হত। ঘাবড়াচ্ছেন কেন?’
তুষার বললেন, ‘জায়গাটা কাশ্মীর বলেই। সামনে বেশ কয়েকটা বড়ো ইভেন্ট আছে, নেতারা যাবেন…’
বিদুর তুষারকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘নেতাদেরই থ্রেট থাকবে ধরে নিচ্ছেন কেন? আম আদমিও তো হতে পারে। ওদের কাছে হিন্দুস্তানি খুনই হল আসল নেশা। তা যারাই হোক না কেন?’
তুষার বললেন, ‘সাধারণ মানুষকে ওরা টার্গেট করলে কিন্তু আমার বেরোনোর জায়গা থাকবে না বিদুর। কটা পয়েন্ট দেখব? ওরা যেকোনো জায়গা দিয়ে ঢুকতে পারে। ঋষি কি কিছু আপডেট দিয়েছে?’
বিদুর বললেন, ‘গ্রাম নিয়ে ভয় পাচ্ছে। গ্রামে ওরা লুকিয়ে থাকতে পারে।’
আর পি দরজায় নক করলেন। বিদুর ইশারায় আর পি-কে রুমে প্রবেশ করতে বলেন। আর পি-কে বসতে বলে তুষার বললেন, ‘তোমার এই প্রাইভেট নাম্বারের ফোনগুলো আর কিছু নিউজ দিয়েছে?’
আর পি মাথা নাড়লেন, ‘না স্যার। দেয়নি।’
তুষার বললেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি কাশ্মীর নিয়ে। ওরা আবার ফোন করলে কথা বের করার চেষ্টা করতে হবে আর পি।’
আর পি বললেন, ‘আমি কী কথা বের করব স্যার? অনেক টাকা চায় তো! এত টাকা গ্র্যান্ট হবে কী করে?’
তুষার বললেন, ‘অন্য কোনো টোপ দিয়ে যাবে। সেটা ইনফরমেশন হোক কিংবা অন্য কোনো ফেবার। মোস্তাকের ব্যাপারেও জানতে চাইতে পার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তোমাকেই ডিসিশন নিতে হবে।’
আর পি বললেন, ‘আমি চেষ্টা করব স্যার। মাঝে মাঝে মনে হয় ওরা আমাদের মধ্যেই আছে। আমাদের খুব ভালো করে চেনে। যদিও উচ্চারণটা ও পারের বলেই মনে হয়, তবুও অস্বস্তি হয়।’
বিদুর বললেন, ‘তা তো হতেই পারে আর পি। ওদের দলে যেভাবে তোমার লোক এসেছে, তোমার দলেও ওর লোক থাকতেই পারে। না থাকার গ্যারান্টিটা তো কেউ দেবে না।’
আর পি বললেন, ‘চিন্তায় ফেলে দিলেন স্যার। তাহলে কি ওদের ভয় পেতে হবে?’
বিদুর বললেন, ‘না। তবে আমাদের বিশ্বস্ত মানুষের বৃত্তটা ছোটো করে আনতে হবে। কাশ্মীর নিয়ে ডার্ক ওয়েবে খোঁজা শুরু করো। ওদের কোনো আর্মস ডিলিং হয়েছে নাকি রিসেন্টলি, সেসব দেখো। দেখে জানাও।’
আর পি বললেন, ‘কাশ্মীরে না, বাংলাদেশে হয়েছে। ওদের বেশ কয়েকটা অ্যাসাইনমেন্ট রংপুরে পৌঁছেছে। আমাদের সন্দেহ সেগুলো আমস।’
তুষার বললেন, ‘হ্যাঁ, গোলা বারুদ জড়ো করছে। সে করুক।’
আর পি অবাক হলেন, ‘স্যার ওটা নিয়ে চাপ নেই?’
তুষার বললেন, ‘আছে তো। ওরা এগোতে গেলেই আমরা বুঝতে পারব কোনো করিডোর প্ল্যানিং-এর মধ্যে রেখেছে ওরা। তবে ওরা পূর্ব থেকে গোটা দেশ উজিয়ে কাশ্মীরে অন্তত আর্মস পাঠাবে না, এটুকু বুদ্ধি আশা করি ওদের আছে। এই জন্যই আমার কাশ্মীর সম্পর্কিত কোনো প্ল্যান ওদের এখনই আছে নাকি, তাই নিয়ে জানতে চাইছি।’
আর পি বললেন, ‘আজ রাতের মধ্যেই একটা কম্প্রিহেনসিভ রিপোর্ট দিতে পারব স্যার। আমি নিজেও দেখছি।’
তুষার বললেন, ‘গুড। লড়াই জারি রাখো। আমরা আমাদের কাজ করে যাই। আমি এখন নো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। যেভাবেই হোক সব থ্রেট একদিন নির্মূল হবে, আমরা করেই ছাড়ব।’
৬১
॥ ঢাকা।।
ছাত্র ইউনিয়ন রুমে রাশেদ বসেছিল। সে একটা নতুন চশমা কিনেছে। তার চশমার দাম নিয়েই কয়েকজন ছাত্র আলোচনা করছে।
হঠাৎ রাশেদের চোখ গেল জানলার বাইরে। রাখি ধীর পায়ে হাঁটছে। সে মফিজুলকে বলল, ‘অ্যাই মফিজ, রাখিকে ডেকে নিয়ে আয়। যা যা।’
মফিজুল দৌড়ে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাখিকে নিয়ে এল। রাশেদ বলল, ‘কীরে রাখি, রুমানের খবর কী?’
রাখি মাথা নাড়ল, ‘জানি না।’
‘একা একা ঘুরছিস যে? তোর বান্ধবী কই?’
রাখি আবারও মাথা নাড়ল, ‘জানি না।’
রাশেদ চোখ পিটপিট করে বলল, ‘কাল রাতে রুমান নাই হয়ে গেছে। নাই মানে বুঝস?’
রাখি চমকে উঠল। রাশেদ বলল, ‘তৌফিকভাই খুব কষ্ট পেয়েছিল। ভাই জেলে গেছে, আর তুই রুমানের সঙ্গে লটরপটর করলি, এবার মনে হয় ভাই একটু আনন্দ পাবে। তুইও মিটিয়ে ফেল ভাইয়ের সঙ্গে।
রাখির চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। সে বলল, ‘আমার ক্লাস আছে। আসলাম।’
রাশেদ মফিজুলকে ডাকল, ‘কীরে মফিজ, তৌফিকভাই কোই রে?’
মফিজুল বলল, ‘হোস্টেলের ঘরে। মদ খেয়ে পড়ে আছে।’
রাশেদ দুঃখিত কণ্ঠে বলল, ‘দেখলি? তৌফিকভাই তোর দুঃখে কত কষ্ট পাইসে? যা, তুই হোস্টেলে যা, দু-জনে ঘরে গিয়ে জড়ায় জুড়ায় ধর, চুমাচুমি কইরা সব ঠিক কইরা নে।’
সবাই হেসে উঠল। রাখি ঘর থেকে জোর পায়ে বেরিয়ে গেল।
মফিজুল বলল, ‘ভাই, রাখি খুব মজা পাইছে মনে হয়।
রাশেদ বলল, ‘মজা তো পাইবই। কতদিন পর আইসে কলেজে, আমাদেরও মজা পাওয়া দরকার।’
মফিজুল বলল, ‘আমরা কী করে মজা পাব ভাইজান?’
রাশেদ শুধু হাসল। তার হাসি থেকেই বাকিরা বুঝে গেল রাশেদ কী বলতে চাইছে।
তারা কেউই জানে না রাখি কলেজে এসেছে প্রিন্সিপাল স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। তারা আজকেই দেশ ছেড়ে চলে যাবে। বাবা সব ব্যবস্থা করেছে। পরীক্ষা হয়নি। যদি একটা শংসাপত্র পাওয়া যায়, তাহলেও হবে।
ভবিষ্যতে কী হতে চলেছে, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। বাবাও জানে না। শুধু একটা কাগজ নিয়ে যাবে। কাজে লাগলে লাগবে।
প্রিন্সিপাল রুমে গিয়ে রাখি জানতে পারল প্রিন্সিপাল সাহেব কলেজে আসেনি। সে ফ্যাকাল্টি রুমের দিকে যেতে গিয়েও গেল না। বাবা বলেছে কাউকে কিছু বলা যাবে না। একমাত্র প্রিন্সিপাল স্যার ছাড়া কেউই বিশ্বাসযোগ্য নেই। রাখির চোখ ফেটে জল আসছিল। এ ক-দিন শুধু দরজা বন্ধ করে কেঁদেছে সে। সব কিছু চোখের সামনে শেষ হয়ে গেল। গ্রামের বাড়িতে লুঠপাঠ হয়ে গেছে সব। বাবার ব্যবসা তুমুল অনিশ্চয়তার মুখে। হাতে যা টাকাপয়সা সোনাদানা ছিল, সব জড়ো করে দেশ ছাড়বে তারা। কীভাবে কী হবে এখনও তার কিছু জানে না। কলেজে এসেছিল যদি কাজটা হয়।
কলেজে আর থেকে লাভ নেই বুঝে কলেজ থেকে বেরোতে গিয়েই তৌফিকের মুখোমুখি হয়ে গেল সে। তৌফিক তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কীরে, আবার এসেছিস? তোর রুমান তো আর নেই। উপরে চলে গেছে। এবার কারটা ধরবি?’
রাখি উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে যেতে গেল। তৌফিক তাকে সজোরে একটা চড় কষালো। গোটা কলেজের সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। কেউ কেউ ফোন বের করেছে। তৌফিক চিৎকার করতে শুরু করল, ‘জানতাম, তোরা নিমকহারামের জাত, দেখে নিলাম। লজ্জা লাগে না? আমি ছিলাম না আর রুমানের সঙ্গে ঘুরে বেরিয়েছিস?’
রাখি হাঁটতে শুরু করল। পিছন পিছন তৌফিক হাঁটতে হাঁটতে তার মাথায় চাপড় মারতে লাগল। রাখির মনে হচ্ছিল সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। কলেজের বাইরে বাবা গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখেই ছুটে এসে তৌফিকের মুখে ঘুষি মারল, ‘এত সাহস? তুই আমার মেয়ের গায়ে হাত দিচ্ছিস?’
তৌফিক ভাবতে পারেনি তাকে কেউ এভাবে ছুটে এসে মারতে পারে। সে ভেবেই নিয়েছিল নিপুণ চলে যাবার পর সে কলেজের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে গেছে। সে চিৎকার করল, ‘এই, কে কোথায় আছিস? আঙ্কেলকে ধর তো।’
রাখির বাবা উত্তমবাবু তৌফিককে ওই অবস্থাতেই জামার কলার ধরে পরপর মুখে ঘুষি মারতে শুরু করলেন। তৌফিকের মুখ থেকে আচমকা রক্ত বেরিয়ে এল।
রাশেদের কাছে খবর দিতে দৌড়োল একজন। তৌফিক নেতিয়ে পড়ছিল।
রাখির বাবা রাখির হাত ধরে গাড়িতে তুললেন, ‘চল।’
রাখি আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল, ‘বাবা, ও কি মরে গেছে?’
রাখির বাবা গাড়ি স্টার্ট করে বললেন ‘মরলে বাঁচা যায়। দেশ থেকে একটা গর্ভস্রাব কমবে।’
রাখির মা গাড়ির ভিতরে বসে স্তম্ভিত হয়ে সব দেখছিলেন। বললেন, ‘কী গো, তুমি ছেলেটাকে মেরে ফেললে নাকি?’
রাখির বাবা লুকিং গ্লাসে দেখলেন কলেজের ছেলে-মেয়েরা তৌফিককে ঘিরে জড়ো হয়েছে। গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘তাহলে বুঝব জীবনে একটা ভালো কাজ করেছি। এখন এসব নিয়ে মাথা ঘামিও না। যত তাড়াতাড়ি ঢাকা ছাড়া যায়, তত ভালো।’
রাখি ভাবতে পারছিল না তার বাবা এই কাজ করতে পারে। আজীবন শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কী হতে পারে, তার বাবাকে না দেখলে বিশ্বাস করতেই পারত না সে…
*****
অরাজকতার চেহারাটা আগে একরকম দেখেছেন সোমনাথ। তারপর অনেক বছর কেটেছে।
যাকে মব বলা হয়, একগাদা লোক একসঙ্গে প্রবল রেগে কাউকে মারতে দৌড়োচ্ছে, টিভি দেখে দেখে সেই মবদের দেখে প্রবল প্রেশার চড়িয়েছেন।
মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থেকেছেন।
সকাল হলে বুঝতে পেরেছেন শুধু সূর্য উঠলেই নিরাপত্তা আসে না। নিরাপত্তার জন্য আরও অনেক কিছুর দরকার পড়ে।
টিভিতে দেখাচ্ছে এক লীগের নেতার বাড়িতে যারা কাজ করত, তাদের জনগণ ধরে মারছে। লোকগুলো কিছু বলতে চাইছে, বলতে পারছে না। মেয়েদেরও ছাড়ছে না।
রাগ তো কমে এসেছে, তবে এখন যেটা হচ্ছে সেটা কী? প্রবল হতাশা থেকেই যে এইভাবে মারছে, তা বোঝা যাচ্ছে। সকাল থেকে জয়দেব ফ্ল্যাটে নেই। বীথি রান্না করে টিভি দেখছেন।
সোমনাথকে টিভির ঘরে ঢুকতে দেখে বললেন, ‘খেয়ে নেবে?’
সোমনাথ বললেন, ‘নাহ। দরকার নেই। জয়দেব ফিরুক।’
বীথি বললেন, ‘ও আজ ফিরবে না।’
সোমনাথ অবাক হলেন, ‘কেন? কী হয়েছে? তোমাকে বলে গেছে নাকি?’
বীথি বললেন, ‘হ্যাঁ, বলল একদিন পরে আসবে। তোমাকে বলে দিতে বলেছিল। তুমি তখন ঘুমোচ্ছিলে।’
সোমনাথ বললেন, ‘ওহ, তাহলে আমাকে খেতে দিয়ে দাও। আমি খেয়েনি।’
‘বসে পড়ো।’
সোমনাথ খেতে বসলেন। ক-দিন ধরে ভালো করে খেতে পারছেন না।
এখন খেতে ইচ্ছে করছিল। একটু বেশি ভাত নিয়ে খেলেন।
খোন্দকার সাহেবদের ফোন করতে বারণ করেছে জয়দেব। কারো সঙ্গেই এখন কোনো যোগাযোগ করতে বারণ করা আছে। ভাত খেয়ে উঠে টিভি থেকে একটা খবর শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাদের কলেজের ছাত্রনেতাকে কোনো ছাত্রীর বাবা খুন করে পালিয়েছেন। টিভিতে উত্তেজিত নেতাদের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। রাশেদ বলছে ছাত্রীর বাবা নাকি র এজেন্ট ছিলেন। ধরা পড়ার ভয়ে নেতাকে মেরে ফেরার হয়ে গেছে।
সোমনাথ অবাক হলেন না। অরাজকতার সময় সব কিছু হতে পারে। কিছুদিন পর এরা নিজেরাই নিজেদের মারতে শুরু করবে দিব্যচোখে দেখতে পেলেন তিনি। ক্ষমতা দখল করা হয় প্রবল লোভ থেকে। ক্ষমতা পাবার পর দেখা যায় সেটা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কুক্ষিগত হয়ে যায়। সেটা দেখার পর বাকিদের মধ্যে প্রথমে হতাশা তৈরি হয়, পরে হিংসে আসে।
এই সময়টা তেমন সময়। যে ছাত্রদের সামনে রেখে ক্ষমতা পালটানো হয়েছে, দু-দিন পরে সেই ছাত্রদের দমন করার প্রাণপণ চেষ্টা শুরু হবে। তৌফিককে ছাত্রীর বাবা মেরেছে? তৌফিক কি সেই ছাত্রীর সঙ্গে কোনো অসভ্যতা করেছিল? এখন প্রকৃত খবর বাইরে বেরিয়ে আসবে না। কলেজে থাকলে হয়তো কিছুটা জানা যেত।
ছোটো ছোটো ছেলেগুলো কলেজে এলে অবাধ স্বাধীনতা পাওয়া মাত্র ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করে। কোনো দেশের পরিবর্তন যে ছাত্রেরা ঘটাবে, তারা যদি মধ্যযুগীয় মানসিকতার কবলেই থাকে, তবে কোনোােভাবেই প্রকৃত পরিবর্তন ঘটে না।
কলেজের হোস্টেলে একটা ভিখিরি ছেলেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে র এজেন্ট সন্দেহ করে মারা হয়েছে। খবরটা দেখার পর থেকে সোমনাথ ঠিক করে ঘুমোতে পারেননি। এরা কি সত্যিই জানে এরা কী চাইছে?
ছাত্র আন্দোলনগুলোর প্রাথমিক লক্ষ্য তৈরির কারণগুলো স্পষ্ট থাকে, আন্দোলন সাফল্য পেলে ছাত্ররা সেগুলোই সবার আগে ভুলে যায়। কোটা দূর করা লক্ষ্য ছিল যেখানে, সেখানে এখন নিজেদের মধ্যে মারামারি, শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানোটাই মূল মন্ত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সোমনাথের কলেজ যেতে ইচ্ছে করছিল। এভাবে ঘরে আটকে থাকলে তো নিজেকে কাপুরুষ বলে মনে হয়।
তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তার কলেজে এখন এত বড়ো কাণ্ড ঘটেছে, আর তিনি নিজেকে দরজা বন্ধ করে রেখে দিয়েছেন। নিপুণ এখন কী ভাবছে? সেও তো এ-রকম পরিস্থিতিতেই আছে? তার এখন কলেজে যেতে ইচ্ছে করছে না?
এই ফ্ল্যাটে একটাই ল্যান্ড লাইন আছে। সেটায় শুধু ফোন আসে। আউটগোইং বন্ধ আছে। ফোনটা রিং হতে শুরু করল। সোমনাথ ফোন ধরতেই ওপ্রান্ত থেকে জয়দেবের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘কাকাবাবু, আপনি কিন্তু এখন কোনোভাবেই ঘর থেকে বেরোবেন না। গোটা শহরে হাই অ্যালার্ট জারি হয়েছে। ওরা আবার র এজেন্ট খোঁজার নামে লোক মারার প্ল্যান করেছে।’
সোমনাথ উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘সেকি? তুমি কোথায়?’
জয়দেব বলল, ‘আমাকে নিয়ে ভাববেন না কাকাবাবু, আমি ঠিক আছি। আপনি বা কাকিমা কেউ বেরোবেন না। ঠিক আছে?’
সোমনাথ ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘ঠিক আছে বাবা। তাই হবে, তাই হবে।’
৬২
॥ দিল্লি ॥
সকাল থেকে বিদুর বার তিনেক অফিস থেকে বেরিয়েছেন। শেষবার পাঁচটায় বেরিয়েছেন। তারপর ফেরেননি এখনও। সন্ধ্যে সাতটা বেজে গেছে। দীপ্তি বাড়ি যেতে পারছে না। বিদুরকে বলে বাড়ি ফেরাটা একপ্রকার অভ্যাস হয়ে গেছে তার।
ডেস্কে বসে উশখুশ করছিল সে।
আর পি ব্যস্ত হয়ে অফিসে ঢুকলেন। দীপ্তিকে বসে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন, ‘কী হল? তুমি পিজিতে ফিরবে না?’
দীপ্তি বলল, ‘বিদুর স্যার বেরিয়েছেন। না ফিরলে কী করে বেরোই?’
আর পি বললেন, ‘তুমি চলে যাও। হাই প্রোফাইল মিটিং আছে, কখন ফিরবেন কেউ জানে না। আমিই তো এলাম একটা ফাইল নিতে। চেম্বার খোলা আছে তো?’
দীপ্তি বলল, ‘হ্যাঁ।’
আর পি বিদুরের চেম্বার থেকে ফাইল নিয়ে বেরোতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘একটা মেসেজ করেই বেরোও বরং। না দেখলে যদি রেগে যান? বসের মেজাজ তো?’
দীপ্তি হেসে ফেলল, আর পি ঠিকই বলেছেন। বিদুর এমনই। সে বিদুরকে মেসেজ করতেই ওপ্রান্ত থেকে উত্তর এসে গেল, ‘হ্যাঁ বেরিয়ে যাও। নো প্রবলেম।’
সে কম্পিউটার শাট ডাউন করে বেরোলো।
বিল্ডিং-এর বাইরে যেতেই দেখল সুহাস দাঁড়িয়ে আছে। সুহাসকে সে কোনোদিন এই অফিসের ঠিকানা বলেনি। সে অবাকই হল, ‘তুমি এখানে?’
সুহাস বলল, ‘তুমিই তো মেসেজ করে এই ঠিকানা দিয়েছ। সেটা দেখেই চলে এসেছি!’
দীপ্তি অবাক হয়ে বলল, ‘আমি মেসেজ করেছি? দেখি!’
সুহাস তার ফোন এগিয়ে দিল। দীপ্তি দেখল ঠিকই। তার নাম্বার থেকেই মেসেজ গেছে!
সে সঙ্গে সঙ্গে বিদুরকে ফোন করল। বিদুর ফোন কেটে মেসেজ করলেন, ‘সুহাসের সঙ্গে যাও। ইটস ওকে।’
দীপ্তির রাগ হল। তার ফোন ব্যবহার করে মেসেজ করল কেন লোকটা? এটা তো বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। সুহাস বলল, কী হল? যাবে না?
দীপ্তি বাইকে উঠে বসল। সুহাস গাড়ি নিয়ে খানিকটা যাবার পর বলল, ‘এই অফিসে তুমি কী কাজ কর?’
দীপ্তি সুহাসের পিঠে হালকা একটা চাপড় মেরে বলল, ‘কিছু না। চলো কফি খাই।’
একটা কফি শপে দাঁড় করাল সুহাস। দু-জনে টেবল নিয়ে বসে ঠিক করল কফি আর স্যান্ডউইচ অর্ডার করবে। সুহাস বিলিং কাউন্টারের দিকে যেতেই কাচের বাইরে চোখ গেল দীপ্তির। একটা বাইকে দু-জন আছে। দু-জনেই হেলমেট পরা। কালো জ্যাকেট পরে চুপ করে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।
দীপ্তি উঠতে যেতেই তার ফোনে মেসেজ এল, ‘বসে থাকো। আমি দেখছি।
দীপ্তি অবাক হল। সে তো এখন প্রশান্তদের সঙ্গে কাজ করে না। তাহলে প্রশান্ত তাকে মেসেজ করল কেন? সে সঙ্গে সঙ্গে প্রশান্তকে ফোন করল, প্রশান্ত ফোন ধরে বলল, ‘কী হল?’
দীপ্তি বলল, ‘তুই আমার উপর নজর রাখছিস কেন?’
‘অর্ডার আছে। ওই লিফট ইন্সিডেন্টের পর থেকে নজর রাখছি। চিন্তা করিস না। আমি দেখে নেবো।’
‘কী দেখে নিবি? এরা কারা?’
‘গাজিয়াবাদ পার্টি। তোকে আটকে ছেলেটাকে ছাড়ানোর প্ল্যানে আছে।’
‘কোনো ছেলেটা? ওই লিফটের?’
‘হুঁ। দেখিস না। ওরা যাতে বুঝতে না পারে তুই জানতে পেরেছিস কিছু। আমি জানিয়ে দিয়েছি। আপাতত ক্যাফেতেই থাক। প্রেম-ট্রেম কর। হোটেল গেলে যা। আমি বুঝে নেবো।’
‘এগুলো খুবই অস্বস্তিকর ব্যাপার, কোনো প্রাইভেসি নেই।’
‘হাসাস না। ফোন রাখ। কাজ করতে দে।’
ফোন কেটে গেল। দীপ্তি আড়চোখে দেখল বাইকটার পেছনে একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। ছেলেগুলো বাইক স্টার্ট করতে গিয়ে ব্যর্থ হল।
পুলিশ বাইক আরোহীদের দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
অর্ডার করে এসে সুহাস বসল। বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী হচ্ছে?’
দীপ্তি বলল, ‘কে জানে? পুলিশের কাজ আর কী!’
সুহাস বলল, ‘তাই হবে। তারপর? কী প্ল্যান আজ?’
দীপ্তি ক্লান্ত গলায় বলল, ‘পিজিতে যাব। আর কিছু ভালো লাগছে না সুহাস। এবার
সেটল হতে হবে হয়তো। আমি ভীষণ টায়ার্ড।’
সুহাস ভীষণ খুশি হল, ‘সিরিয়াসলি? বাড়িতে কথা বলব?’
দীপ্তি বলল, ‘কথা বলো। কিন্তু আমি চাকরি ছাড়ব না। আলাদা থাকব তুমি আর আমি। ডান?’
সুহাস একটুও না ভেবে বলল, ‘ডান।’
ছেলেগুলোকে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে। দীপ্তি চোখ বন্ধ করল। দিন দিন এই উত্তেজনাগুলো অসহ্য হয়ে যাচ্ছে। সত্যি কি কোনোদিন এসব থেকে বেরোতে পারবে সে? নাকি যত দিন যাবে, তত জড়িয়ে পড়বে এই গোলকধাঁধায়? কে জানে!
৬৩
॥ ঢাকা।।
প্রধান উপদেষ্টা মিটিং ডেকেছেন। ইসলামাবাদে যারা যাচ্ছেন, তাদের নিয়ে তিনি নিজের চেম্বারে বসেছেন।
সোবাহান সাহেবের ডানপায়ের দিকে নজর গেল মুস্তাকিনের। ভদ্রলোকের পা কাঁপছে। কেন কাঁপছে বোঝা যাচ্ছে না। তার সাগরেদরা শহরে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। মুস্তাকিনের সঙ্গে সোবাহান সাহেবের সম্পর্ক কোনোকালেই খুব একটা মধুর নয়। মুস্তাকিন চুপ করে বসে আছেন। সকালেই হাসানের থেকে নিয়ে প্রোজেক্ট প্ল্যান জমা দিয়েছেন ওয়াকার সাহেবকে। ওয়াকার সাহেব প্ল্যান দেখে খুশি হয়েছেন। জানিয়েছেন এ-রকম আরও কয়েকটা প্ল্যান বানিয়ে দিতে হবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের প্রোজেক্ট অ্যাপ্রুভাল খুব শিগগিরিই হবার কথা।
ওয়াকার সাহেব বললেন, ‘আপনারা যারা ইসলামাবাদে যাচ্ছেন, তাদের প্রত্যেককেই একটা সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে হবে। সবাইকে বোঝাতে হবে, বাংলাদেশ কীভাবে পাকিস্তানকে আবার নিজের বন্ধু হিসেবে পেতে আগ্রহী। দুই দেশ মিলিতভাবে কাজ করলে ভারতের প্ল্যান ব্যর্থ হবে। আপনারা জানেন ভারত আমাদের দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল, আমাদের বার্তা এখন এটাই। কোনোভাবেই আমরা কারো পায়ের তলায় থাকব না।’
সোবাহান দাঁত বের করলেন, ‘যা বলেছেন জনাব। শুনেও খুশি হলাম। সরকারে থাকাকালীন আমি অনেকবার ইসলামাবাদে গেছি। শীতকালে খুব ঠান্ডা পড়ে। এখন তো তেমন ঠান্ডা পড়বে না, ঘুরতে ভালো লাগবে।’
ওয়াকার ঠান্ডা চোখে সোবাহানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার উপর আমাদের সবার অনেক আশা ভরসা। আশা করব আপনি সে মর্যাদা রাখবেন।
সোবাহান হাত কচলালেন। মিটিং-এ আরও কিছু বিষয়ে বক্তব্য রাখলেন ওয়াকার। মৈত্রী সম্পর্ক সুদৃঢ় করার বিষয়েও তিনি কিছুক্ষণ কথা বললেন।
মিটিং শেষ হতে সবাইকে ঘর ছেড়ে চলে যাবার কথা বলে হঠাৎ করেই মুস্তাকিন সাহেবকে বললেন, ‘আপনি একটু থাকবেন জনাব। একটু কথা আছে।’
মুস্তাকিন মাথা নেড়ে বসে রইলেন। ঘর খালি হবার পর ওয়াকার বললেন, ‘আনোয়ারের ফান্ড লাগবে মুস্তাকিন সাহেব।’
মুস্তাকিন বললেন, ‘আপনাকে তো আমি প্রোজেক্ট প্ল্যান জমা দিলাম।’
ওয়াকার হাসিমুখে বললেন, ‘সে ফান্ড আসতে আসতে ছ-মাস। এক বছরও হতে পারে। অত দিন আমরা কী করে অপেক্ষা করব বলুন তো? আগামী এক বছরের মধ্যে আমাদের ক্যাম্পগুলো বানাতে হবে।’
মুস্তাকিন অবাক হলেন, ‘তবে? ফান্ড কোত্থেকে পাব জনাব?’
ওয়াকার বললেন, ‘আপনি এত উঁচু পদে বসেছেন, গোটা দেশের শিল্পপতিরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। করেনি?’
মুস্তাকিন বললেন, ‘এখনো সেভাবে করেনি জনাব। হতে পারে তারা এখনো কন্ট্রোল সেন্টারটা কোথায় আছে, বুঝে উঠতে পারেনি।’
ওয়াকার বললেন, ‘সেটা বোঝানোর দায় আপনারই। আমাদের না। আপনি নিশ্চয়ই দেখছেন সোবাহান সাহেব কীভাবে কাজটা করছেন। খবর পাচ্ছেন তো?’
মুস্তাকিন বুঝলেন ওয়াকার কী বলতে চাইছেন। বললেন, ‘কত ফান্ড লাগবে?’
ওয়াকার বললেন, ‘আপাতত ফিফটি ক্রোড়।’
মুস্তাকিনের মাথায় চাপ-চাপ ব্যথা হতে শুরু করল। বললেন, ‘কতদিনের মধ্যে?’
ওয়াকার বললেন, ‘ইসলামাবাদ থেকে আপনি ফেরার আগেই দরকার। আপনার সমস্ত নেটওয়ার্ক অ্যাক্টিভেট করুন মুস্তাকিন সাহেব। এদেশে ক্ষমতায় থাকতে হলে আমাদের অনেক রকম কাজ করতে হবে। তার মধ্যে এটাও একটা। আমার আপনার উপর ভরসা আছে। আনোয়ারও আপনাকে পছন্দ করে। আশা করি আপনি আমাদের কাউকেই হতাশ করবেন না।’
মোস্তাকিন বললেন, ‘আমি দেখছি জনাব। কয়েকটা ফোন করা দরকার। সিকিউরিটি মানি ডিমান্ড করলে কেউ যদি প্রেসে যায়?’
ওয়াকার হো-হো করে হেসে উঠলেন, ‘আপনার মনে হয় প্রেস এখানে কোনো কিছু করতে পারবে? আপনিই সব কিছু। আপনি যা খুশি করুন, কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। কাজ শুরু করুন। কাশ্মীর বর্ডার যেমন ইন্ডিয়ার মাথাব্যথা, বাংলাদেশ বর্ডারকে তার তিনগুণ মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে হবে। এই দেশ মুজাহিদিন তৈরি করবে, ইন্ডিয়াকে বরবাদ করে দেবে। আমরা করব সেই কাজ।
ওয়াকার উঠে দাঁড়িয়ে মুস্তাকিনের কাঁধে হাত রেখে বেরিয়ে গেলেন। মুস্তাকিন ওয়াকারের এই মূর্তি কোনোদিন দেখেননি। খানিকটা অবাক হলেন তিনি। এটা কোনো শান্ত শিষ্ট ভদ্রলোকের মূর্তি নয়।
এ যেন খুব ঠান্ডা মাথার কোনো… মুস্তাকিন দ্রুত ঘর ত্যাগ করে তার গাড়িতে বসে ড্রাইভারকে বললেন, ‘বাসায় চলো।’
মিটিং-এ ফোন নিয়ে ঢুকতে বাধা ছিল না। ফোনের রেকর্ডার অন করেই মিটিং-এ ঢুকেছিলেন মুস্তাকিন। রেকর্ডার অফ করে চুপ করে বসে বাইরের ঢাকা শহরটা দেখতে শুরু করলেন তিনি। কোনোকিছুই আর আগের মতো নেই। জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ বড্ড দ্রুত রং পাল্টাচ্ছে, কিছু বোঝার আগেই
ফোনে একটা মেসেজ এসেছে। তাতে শুধু একটা কথা লেখা, ‘আপনার দাবি মেনে নেওয়া হচ্ছে। ইউ মে প্রসিড স্যার।’
মুস্তাকিনের মুখের হাসি ফিরে এল। রেকর্ডেড ফাইলটার কাছে এসে তার আঙুল থমকে গেল…
*****
ঢাকা ছাড়ার পর রাখির মাথা ধরে গেল। মা পেছনের সিটে বসে নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছে।
রাখির বাবা উত্তমবাবু একটাও কথা না বলে গাড়ি চালাচ্ছেন। রাখি চোখ বন্ধ করতে পারছে না। বন্ধ করলেই তৌফিকের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। একটা ছেলে আয়নাঘরে যাবার পর এভাবে পালটে যেতে পারে, সে ধারণা করতে পারেনি। একদিকে রাশেদরা, অন্যদিকে তৌফিক।
সে চিরকাল দেখে এসেছে তৌফিক সবসময় বিদ্রোহীর ভূমিকায় থেকেছে। সরকারের বিরোধিতায় স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছে। সে ছেলেটা এ-রকম হয়ে গেল! বাবা কি ওকে মেরে ফেলল। গাড়ি চালাচ্ছে বলে সে বাবাকে কিচ্ছু বলতে পারছে না। ফোন অফ করে রাখতে বলেছে।
গতকাল রাতেই বাবা বলে দিয়েছিল আজই সেই দিন। জামা কাপড়, সার্টিফিকেট সব ব্যাগের মধ্যে ভরে নিয়েছিল রাতেই। সকালে বাবা বলল একবার কলেজ হয়েই যাবে। এতবছরের পড়াশোনা তো এভাবে বিফলে যেতে পারে না। যদিও ভারতে তাদের সেই শূন্য থেকেই শুরু করতে হবে। বাবা রাতে বেশ কয়েকবার বলে ফেলেছে বর্ডারে এখন কঠিন সিকিউরিটি থাকবে। দরকার হলে তারা যশোরে কয়েকদিন থেকে যাবে। তৌফিকের ঘটনার পর যশোরে থাকাটাও নিরাপদ হবে নাকি বুঝতে পারছিল না সে
রাস্তাঘাট ফাঁকা। বেশ কিছুদিন ধরে রাতের রাজপথে চুরি ডাকাতির খবর দেখানো চলছে। দিনের বেলাতেই যাচ্ছে তারা।
কথা ছিল রাস্তায় খেয়ে নেবে, কিন্তু গাড়ি দাঁড় করানোর কথা এখন ভাবা যাবে না। গতি বাড়ছে। রাখির ভয় লাগছে। বাবা কেমন চুপ করে গেছে।
বেশ কয়েকদিন ধরেই বাবা এ-রকম হয়ে গেছিল। কারো সঙ্গে কোনো কথা বলছে না। রাত জেগে বসে থাকছে। মাঝে মাঝে শুধু নিজের মনেই বলে চলেছে ‘এত দিনের এত কষ্ট করে তৈরি করা সম্পত্তি, সব আগুন ধরিয়ে দিল ওরা।’
এই যন্ত্রণা বাবা নিতে পারছে না বুঝতে পারছে রাখি।
রাখির ধারণা ছিল রাস্তায় কিছু-না-কিছু হবে। হয় পুলিশ ধরবে, নয় সেনা। নয় রাস্তায় কিছু-না-কিছু বাধা পাবে। এসবের কোনোকিছুই হল না।
বিকেলের মধ্যে তারা নির্বিঘ্নে যশোরে পৌঁছে গেল। মিনু পিসি থাকে যশোরের গ্রামে। তাদের দেখে ছুটে এল, কাঁদতে কাঁদতে রাখিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘উফ, আমি সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করছি, এত দেরি হল কেন?’
রাখি বাবার দিকে একবার দেখে বলল, ‘কলেজে একটু দেরি হয়ে গেল পিসি।’
পিসি বলল, ‘আয়, আয়, ভেতরে এসে বোস।
বাবা বলল, ‘গাড়িটা যেন কেউ না দেখে। কোনোদিকে রাখব?’
পিসি দেখিয়ে দিল। বাড়ির পেছনের দিকে নিয়ে গিয়ে গাড়িটা খড়ের গাদায় লুকিয়ে ফেলা হল।
রাতে তাদের বর্ডার পেরোনোর কথা। গাড়িটা এখানেই থেকে যাবে। কত সাধের গাড়ি। তার বন্ধুদের সবার সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি। বাবা নতুন গাড়ি কিনেছিল। সে গাড়িও এদেশে থেকে যাবে।
বাবা ঘরের ভেতর গিয়ে সটান বিছানায় শুয়ে কাঁদতে শুরু করল। বাবার দেখাদেখি মাও কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। রাখি শুধু চুপ করে বসে রইল।
পিসি অবাক হয়ে গেল, ‘কীরে দাদা, কী হয়েছে?’
উত্তম সব খুলে বললেন। পিসি মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘সেকিরে, এত কিছু হয়ে গেল? আমি তো টিভিও দেখিনি, খবরে দেখলে জানা যেত।’
পিসি তড়িঘড়ি টিভি চালাতে যেতেই লোডশেডিং হয়ে গেল। পিসি বলল, ‘এই চলছে ক-দিন ধরে। কারেন্টই থাকে না। কিন্তু এবার কী হবে?’
বাবা বলল, ‘আজকেই বর্ডার পেরোতে হবে। আমি আর এদেশে থাকার টেনশন নিতে পারছি না।’
পিসি বলল, ‘কাকে বলেছিস? তুই তো শুধু ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে বলেছিস। আমি সেটুকুই করেছি। আমি কিন্তু কাউকে চিনি না দাদা।’
বাবা বলল, ‘আছে। ভাবিস না।’
পিসি একটু আশ্বস্ত হল।
বাবা রাখিকে বলল, ‘তুই ঘুমিয়ে নে। আজ রাতে ঘুম নাও হতে পারে।’
রাখি বলল, ‘আমার খিদে পেয়েছে।’
উত্তম জোরে জোরে মাথা নাড়তে শুরু করলেন, ‘তাই তো। আজ খাওয়া হয়নি। দে দে মিনু, ভাত দে।’
রাখি বুঝতে পারছিল বাবা আর বাবার মধ্যে নেই। তার সব কিছু তোলপাড় হচ্ছে এখন…
৬৪
।। দিল্লি।।
চিফ ম্যাপটার দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছেন। বিদুর বললেন, ‘আমার ইন্টেল অনুযায়ী আই এস আই চট্টগ্রাম ডক থেকে ঠিক এই এলাকায় ওদের সমস্ত জিনিসপত্র ডাম্প করেছে। এখান থেকে শিলিগুড়ি খুবই কাছে। এখান থেকেই ওরা নর্থ ইস্টের এজেন্সিগুলোকে আর্মস সাপ্লাই করা শুরু করবে।’
চিফ বললেন, ‘বর্ডার থেকে এই জায়গাটা কত দূরে?’
বিদুর বললেন, ‘পঁচিশ কিলোমিটার। পারমিশন পাওয়া যাবে না।’
চিফ বললেন, ‘তবে? তুমি কী চাইছ?’
বিদুর বললেন, ‘পারমিশন।’
তুষার এতক্ষণ চুপ করে স্ক্রিন দেখছিলেন। এবার মুখ খুলে বললেন, ‘বাংলাদেশের ভিতরে, সেটা বর্ডার থেকে যত কাছেই হোক, কোনোরকম অপারেশনের পারমিশন দেওয়া সম্ভব না বিদুর, তুমি খুব ভালো করে জান।
বিদুর বললেন, ‘জানি তো। না জানার কথা না। আমি বর্ডারের এপার থেকে কিছু করব না। ইন ফ্যাক্ট, আমি এই আর্মসগুলোর ব্যাপারে লিস্ট ইন্টারেস্টেড। ওরা এদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করলে আমরা ঠিক ধরে ফেলব।’
চিফ বললেন, ‘তবে? কীসের পারমিশন চাইছ?’
বিদুর চিফের কথার উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘এই উইকে বাংলাদেশি ডেলিগেটরা ইসলামাবাদে বৈঠকে বসছে। এই গোটা অপারেশনটা ওরা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে করেছে। সি আই এ-র দূর থেকে হাওয়া দিয়েছে, ঢাকায় আই এস আই প্রত্যক্ষভাবে মদত দিয়ে এসব করেছে।
তুষার বললেন, ‘সেসব তো জানা কথা। তুমি কী বলছ?’
বিদুর বললেন, ‘স্টেপ আপ করতে চাইছি। আর বসে থাকতে চাইছি না। এভাবে দেখে গেলে ওরা মাথায় চড়ে বসবে। ভবিষ্যতে আর কোনো আশার আলো দেখতে পাবে না কেউ।’
চিফ উত্তর দিলেন না। পেপারওয়েট নিয়ে খেলতে শুরু করলেন। তুষার বললেন, ‘ওদের পি এম এদেশে আসার পর থেকে র এজেন্ট খোঁজার নাম করে উইচ হান্টিং শুরু হয়েছে বিদুর। পাগলের মতো যাকে পাচ্ছে, তাকেই র এজেন্ট বলে ঝুলিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কোনোরকম অপারেশন চালানোটা কি ঠিক হবে?’
বিদুর বললেন, ‘যদি কিছু না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো আলো দেখতে পাবে না, এটুকু জেনে রাখো। বানশালকে জেরা করে এটুকু বুঝতে পেরেছি, ওরা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বর্ডার পয়েন্টগুলোতে মুজফফরাবাদ স্টাইলে ক্যাম্প তৈরি করতে শুরু করবে। ট্রেনিং হবে, এবং সেখান থেকে একের পর এক মুজাহিদিন ইন্ডিয়াতে পাঠানোর কাজ হবে। আই এস আই থেকে লোকজন আসাও শুরু হয়েছে। ওই আনোয়ারের দলের লোকজন ঢাকা থেকে এই শিলিগুড়ি বর্ডারেও পৌঁছে গেছে। সুতরাং বুঝতেই পারছ ওরা খুব তাড়াতাড়ি বড়ো কিছু করার দিকে এগোচ্ছে।’
চিফ বললেন, ‘ওকে, এগুলো ওদের থেকে প্রত্যাশিত ছিল। নতুন কিছু করছে না এখনই রংপুরের ক্যাম্পটা ভাঙতে যাওয়া ঠিক হবে? খুব বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে না ব্যাপারটা? যাই হোক, তুমি কী করতে চাইছ?’
তুষার বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, বিদুর, এবার ঝেড়ে কাশো। কী চাইছ বলো।’
বিদুর বললেন, ‘ঢাকার একটা সেল অ্যাক্টিভেট করতে চাইছি।’
তুষার চোখ বড়ো বড়ো করলেন, ‘তুমি শিয়োর?’
বিদুর একটুও না ভেবে বললেন, ‘হ্যাঁ।’
চিফ বললেন, ‘এতটা মরিয়া হয়ে যাচ্ছ কেন?’
বিদুর বললেন, ‘তোমরা তাহলে দশ-বারো ঘণ্টা আমাকে দাও। আমি কতগুলো রেকর্ডিং শোনাচ্ছি। ওরা ঠিক কী কী করতে চাইছে, সব শোনো। আচ্ছা, অতক্ষণ শুনতে হবে না। এক বিখ্যাত লোক স্পষ্ট নির্দেশ দিচ্ছে আনোয়ারের জন্য ফান্ড জোগাড় করে দিতে হবে। শোনো।’
বিদুর ল্যাপটপে মুস্তাকিন সাহেবের রেকর্ডিংটা চালিয়ে দিলেন। তুষার রেকর্ডিংটা শুনে বললেন, ‘কাজটা ভালো হয়েছে। কিন্তু এই রেকর্ডিংটা আমরা এখন ব্যবহার করতে পারব না।’
বিদুর বললেন, ‘রেকর্ডিং-এর ভিত্তিতে স্টেপ তো নিতে পারি? একটা ছোটো অপারেশন, কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না। কিন্তু ওদের এই সমস্ত উদ্যমকে আমরা গোড়া থেকে ছেঁটে ফেলতে পারব। কিছুদিন অন্তত একটা ব্রিদিং স্পেস পেতে পারি।’
তুষার চিফকে বললেন, ‘আমার মনে হয় বিদুরের প্রস্তাব মেনে নেওয়া উচিত। এই অপারেশনটা করা দরকার।’
চিফ বললেন, ‘অপারেশন প্ল্যানিং কে করেছে বিদুর?’
বিদুর বললেন, ‘আর পি, ফাইল নিয়ে বসে আছে বাইরে। ডাকব?’
চিফ মাথা নাড়লেন, ‘ডাকো। কিন্তু আমরা কাজটা পারব তো?’
বিদুর আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন, ‘অবশ্যই পারব। পারতেই হবে।’
